Home » প্রচ্ছদ কথা (page 5)

প্রচ্ছদ কথা

গুম : যার উত্তর মিলছে না

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

ফরহাদ মজহার অপহরন ঘটনার আপাত: পরিসমাপ্তি ঘটেছে অনেক প্রশ্ন, অনেক নাটকীয়তা নিয়েই। তিনি কিডন্যাপ করার বর্ণনা পুলিশের কাছে দিয়েছেন, আদালতেও জবানবন্দী দিয়েছেন। পুলিশ বলেছে, তদন্ত করে দেখবেন, জবানবন্দীর সত্যতা। বিএনপি সরকারকেই দায়ী করছে এই অপহরণের জন্য এবং তাদের ভাষায় চাপ সহ্য করতে না পেরে সরকার তাকে ছেড়ে দিয়েছে। তারা আরও বলেছেন, ভারতে মুসলিম নিধন এবং গো-মাংস নিষিদ্ধের প্রতিবাদ করায় মূলত: ফরহাদ মজহারকে এই পরিনতি বরণ করতে হয়েছে।

গত সাড়ে তিন বছরে ফরহাদ মজাহারের মত ‘রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ’ বা অপহৃতদের মধ্যে পরিবারে ফিরতে পেরেছেন মাত্র ২৭ জন। ফিরে আসার এসব ঘটনায় প্রতিটিতে কম-বেশি সমিল লক্ষ্য করা যায়, যেমনটি ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধের ভাষ্য থাকে একই রকম। ঘটনাগুলি মোটামুটি ছক বাঁধা। একটি বড় অংশকে অপহরণের পর ‘উদভ্রান্ত’ বা ‘অপ্রকৃতিস্থ’ অবস্থায় দেশ-বিদেশের কোন সড়কে পাওয়া যায়। ফিরে আসার পরে তারা প্রায়শ: ‘রহস্যজনক স্মৃতিভ্রষ্টতার’ শিকার হন।

২০১৪ সাল থেকে ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত তথাকথিত নিখোঁজ এবং অপহরণ ও গুমের শিকার হয়েছেন ২৮৪ জন। তাদের মধ্যে ৪৪ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। গ্রেফতার দেখানো হয়েছে ৩৬ জনকে এবং পরিবারে ফেরত এসেছেন ২৭ জন। বাকি ১৭৭  হতভাগ্যের কি ঘটেছে জানা যায়নি। আজতক তাদের হদিস মেলেনি। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশকেন্দ্রের ওয়েবসাইট থেকে এই তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এর কোন ঘটনায় অনুসন্ধান, তদন্ত বা বিচার প্রক্রিয়া এগোয়নি।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে ২০১৩ সাল থেকে শত শত মানুষকে অবৈধভাবে আটক করে গোপনে স্থানে লুকিয়ে রাখা হয়েছে বলে উল্লেখ করেছে। প্রতিবেদনে ২০১৬ সালে ৯০ জনকে গুম করা হয়েছে বলে বিস্তারিত তথ্যাদি দেয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে এবছরের প্রথম ৫ মাসেই ৪৮ জনকে গুম করা হয়েছে বলে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়। এছাড়াও আইন শৃংখলা রক্ষাবাহিনীকে এ কাজ পরিচালনায় অবাধ স্বাধীনতা প্রদান করা হয়েছে বলেই প্রতীয়মান হয় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এমনকি মানবাধিকার, মানুষের জীবন ও আইন প্রতি তোয়াক্কা না করাকে সরকারের একটি অভ্যাসে পরিণত হয়েছে বলেও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ওই প্রতিবেদনে বলেছে।

১৬ এপ্রিল ২০১৪ ব্যবসায়ী আবু বকর সিদ্দিক ঢাকা-নারায়নগঞ্জ লিংক রোড থেকে অপহৃত হন। তিনি বাংলাদেশের বিশিষ্ট পরিবেশ আইনবিদ রিজওয়ানা হাসানের স্বামী। অপহরণের ৩৪ ঘন্টা পর চোখ বাঁধা অবস্থায় তাকে মীরপুর রোডে নামিয়ে দেয়া হয়। বাঁধন খুলে কলাবাগানে পুলিশ চেকপোষ্টে আসলে তাকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং জবানবন্দী রেকর্ড করে ছেড়ে দেয়া হয়। এই অপহরণ ঘটনায় দায়েরকৃত মামলাটি হিমাগারে চলে গেছে।

রাজনীতিবিদ মাহমুদুর রহমান মান্না ২০১৫ সালে ২৩ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাতে বনানী থেকে ‘নিখোঁজ’ হন এবং ২১ ঘন্টা পরে পুলিশ তাকে ধানমন্ডী থেকে গ্রেফতার দেখায়। বনানী থেকে সাদা পোষাকধারী পুলিশরা তুলে নিয়ে গেছে বলে তার স্বজনরা অভিযোগ করলেও পুলিশ, র‌্যাব অস্বীকার করে। খুব কমক্ষেত্রেই রাষ্টদ্রোহীতা ও নাশকতা সৃষ্টির অভিযোগ এনে তাকে জেলে রাখা হয়। এরকম স্পর্শকাতর অভিযোগে দায়েরকৃত মামলাটির তদন্ত এগোচ্ছে না বা আদৌ কি হয়েছে জানা যায় না।

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও সে সময়ের মুখপাত্র সালাহউদ্দিন আহমেদ ঢাকার উত্তরা থেকে ‘রহস্যজনক নিখোঁজ’ হন। ৬২ দিন পরে ভারতের শিলংয়ের একটি সড়কে উদভ্রান্ত ও অপ্রকৃতিস্থ অবস্থায় ঘোরাঘুরিরত সালাহউদ্দিনকে পায় ভারতীয় পুলিশ। গণমাধ্যমকে তিনি বলেছিলেন, স্বেচ্ছায় ভারতে যাননি, যারা অপহরণ করেছে তারাই তাকে ভারতে নিয়ে গেছে। এর বেশি তিনি কিছু বলেননি। সালাহউদ্দিনের বিষয়টি নিয়ে বর্তমানে কোন উচ্চ-বাচ্য নেই, এমনকি তার দলও ভুলে গেছে তার কথা!

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির পরে গণমাধ্যমে সাক্ষাতকারদাতা তথ্য ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ তানভীর আহমেদ ২০১৬ সালের ১৬ মার্চ দিনগত রাতে ‘নিখোঁজ’ হন। ৫ দিন পরে এয়ারপোর্ট রোডে উদভ্রান্ত অবস্থায় হাঁটতে থাকা তানভীরকে পুলিশ বাড়ি পৌঁছে দেয়। এই ‘নিখোঁজের’ বিষয়ে কিছুই জানা যায়নি। ঢাকার আদালত পাড়া থেকে নিখোঁজ বিএনপি নেতা হুম্মাম কাদের চৌধুরী ২০১৬ সালের ৪ আগষ্ট ‘নিখোঁজ’ হয়ে সাত মাস পরে অজ্ঞাতস্থান থেকে বাড়ি ফিরে আসলেও কেউ এ বিষয়ে মুখ খোলেনি।

নিখোঁজ, অপহরণ, গুম-যাই বলা হোক- এর শিকার মানুষটির নিকটজনরা প্রায়শ: যে অভিযোগটি করেন-আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তাদের তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। যারা ফিরতে পারেন ভাগ্যের জোরে তাদের বক্তব্যও একইরকম। মাইক্রোবাসে তুলে চোখ বেঁধে তাদের অজ্ঞাতস্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এটুকু বলে আর কিছু মনে করতে পারেন না বা বলেন না  এবং স্রেফ বোবা বনে যান।

ফিরে আসার পর ফরহাদ মজহারের বক্তব্যও ওই একইরকম। পুলিশকে তিনি জানিয়েছেন, শ্যামলীতে তার বাসার সামনে থেকে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে চোখ বেঁধে ফেলা হয়। এরপর তিনি কিছুই জানেন না। কিন্তু চাঞ্চল্যকর হচ্ছে, ‘‘সরকারকে বিব্রত করতে সন্ত্রাসীরা এ কাজ করে থাকতে পারে বলে ফরহাদ মনে করেন’’। ভাবুন তো, জামায়াত-বিএনপি ঘরানার কট্টরপন্থী বুদ্ধিজীবি ফরহাদ মজহার এরকমটিই মনে করছেন! প্রশ্ন উঠেছে, যা ঘটেছিল সেটি কি ফরহাদ মজহার ইচ্ছেকৃত চেপে যাচ্ছেন অথবা নির্দেশিত হয়ে? এ প্রশ্নের উত্তর খুব সহসাই মিলবেনা।

লেখক, কবি, বুদ্ধিজীবি ফরহাদ মজহার কি ঠিক করেছিলেন যে থ্রিলার লিখবেন? এডগার এ্যালান পো’র মত নিজেই থ্রিলারের কেন্দ্রীয় চরিত্র হবেন? সেজন্যই কি সাতসকালে খুলনা যাত্রা করেছিলেন ব্যাগেজ ছাড়াই এবং গফুর নামে টিকিট কেটে ফেরার পথে ব্যাগেজ জোগাড় করে নিয়েছিলেন? নাকি কোন সাজানো মঞ্চে ঈদোত্তর বিশেষ একটি নাটকে মহড়া দিয়ে এলেন। খুব সহসাই এ রহস্যের উন্মোচন হচ্ছে না। পুলিশের খুলনার রেঞ্জ ডিআইজি’র মতে, তিনি ভ্রমনরত অবস্থায় ছিলেন।

ফরহাদ মজহার যদি দিনভর একটি নাটকে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করে থাকেন, তাহলে প্রশ্ন আসবে নাটকের রচয়িতা, পরিকল্পনাকারী ও নির্দেশক কে? এটি কি তিনি নিজেই নাকি বিএনপির দাবি অনুযায়ী সরকার বা কোন এজেন্সি । কিংবা এমন কোন রাজনৈতিক দল যারা অতীত-বর্তমানে এরকম রহস্যজনক নাটক মঞ্চস্থ করতে ও করাতে বিশেষ পারঙ্গমতা অর্জন করেছে।

অনেক প্রশ্ন মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। তিনি এবং তার পরিবারের পক্ষ থেকে শুরু থেকেই বলা হচ্ছিল এটি অপহরণ। বাসা থেকে বের হবার সামান্য পরেই সকাল সাড়ে ৫টার দিকে মোবাইল ফোন করে তার স্ত্রীকে জানালেন, “ওরা আমাকে নিয়ে যাচ্ছে। ওরা আমাকে মেরে ফেলবে”। এই ‘ওরাটা’ কারা সেটি হচ্ছে মূল রহস্যের জায়গা। সরকারের দায়িত্ববান কর্মকর্তারা বলছেন, তিনি ভ্রমন করছিলেন। ক্ষমতাসীন দলের সাধারন সম্পাদক মন্তব্য না করেই পুলিশি তদন্তের হাতে ছেড়ে দিয়েছেন।

সব মিলিয়ে রহস্যোপনাসের প্লট বলে মনে হচ্ছে! কিন্তু দুর্বল গাঁথুনির। ফাঁক-ফোঁকড় অনেক। সত্যি কি ওষুধ কেনার জন্য তিনি বাসা থেকে বেরিয়েছিলেন? নাকি কারো ফোনকলে সাড়া দিয়ে বেরিয়েছিলেন? অপহরণের পরে তাকে ফোন করার সুযোগ দেয়া হয়েছিল এবং তারা ৩৫ লাখ টাকা মুক্তিপণও দাবি করেছে। এরপরে ফোন বন্ধ হয়ে যায়। নাটক নাকি ঘটনা এগিয়ে চলে। জানা যায় ফরহাদ মজহার খুলনায়। রাত ১১ টায় হানিফের গাড়ি থেকে উদ্ধার। সরকারী ভাষ্য, তিনি ভ্রমন করছিলেন।

মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেছেন, “একজন অপহরণ বা নিখোঁজ হওয়ার নির্দিষ্ট সময় পর যদি সরকার বা আইন-শৃংঙ্খলা বাহিনী তার সম্পর্কে কিছু বলতে না পারে তখন সাধারন মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে”। আইনজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, একটা ঘটনারও সুরাহা হয়েছে বলে জানা যায়নি। কারো কোন শাস্তিও হয়নি। ফলে জন-পারসেপশন হচ্ছে, সরকারের সমালোচকদের ক্ষেত্রে রহস্যজনক নিখোঁজের ঘটনা বেশি ঘটছে। এটি দুর করতে হলে অবশ্যই অপরাধীদের খুঁজে বের করে বিচারের সম্মুখীন করতে হবে।

 

চালের দাম : পেটতো আর রাজনীতি বোঝে না

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন ::

দেশের নিম্ন আয়েরর মানুষের প্রতিদিনের খাদ্য ‘মোটা চালে’র দাম এখন ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি। এক কেজি চাল কিনতে হচ্ছে কমপক্ষে  ৪৮ থেকে ৫০  টাকায়। শুধু মোটা চালই নয়, সব ধরনের চালের দামই বিগত যে কোন বছরের তুলনায় অনেক বেড়ে যাওয়ায় কষ্টের মধ্যে পড়েছে শ্রমজীবী মানুষসহ স্বল্প আয়ের পরিবারগুলো। দেশে মোটা চালের দাম বাড়তে বাড়তে কেজিপ্রতি ৫০ টাকায় উঠেছে। এক বছরে বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। বাংলাদেশে এখন মোটা চালের দাম বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। এতে প্রায় দুই কোটি পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তা গুরুতর হুমকির মুখে পড়েছে ও পড়ছে  যাচ্ছে।

প্রশ্ন হলো, চালের দাম এত বেশি বাড়ল কেন? খাদ্যব্যবস্থা পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার ত্রুটি, দূরদৃষ্টির অভাব, খাদ্য নিয়ে সরকারের উদাসিনতাসহ বিভিন্ন কারণের কথা উল্লেখ করতে হচ্ছে। দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ দেখানো; জনগণকে ১০ টাকা কেজি দরে চাল খাওয়ানো’র প্রতিশ্রুতি ইত্যাদির পেছনে যে দলীয় রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করেছে- তা বাস্তবতা সম্পর্কে সঠিক ধারণা রাখার পথে প্রতিবন্ধক হয়েছে। যখন চাল আমদানি করার প্রয়োজন ছিল না, তখন চাল আমদানি করা হয়েছে; একসময় দেশের বাজারে চালের দর এতটা কমে গিয়েছে যে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা পরের মৌসুমে চাল উৎপাদনে নিরুৎসাহিত হয়েছেন। আর এ বছর হাওর-অধ্যুষিত বেশ কয়েকটি জেলায় ব্যাপক ফসলহানি হয়ে বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা সৃষ্টির পরও সরকার আত্মতুষ্টিতে ভুগেছে। অথচ তখনও সরকারের কর্তাব্যক্তিদের মাথায়  চাল আমদানির চিন্তাটুকুও  ঢুকেনি। বরং প্রথম পর্যায়ে চাল আমদানির ওপর ২৮ শতাংশ হারে শুল্কারোপ করা হয়। পরে ঘটনার ভয়াবহতা ও প্রতিক্রিয়া দেখে, অনেক সমালোচনার পর ওই ১৮ শতাংশ শুল্ক কমিয়ে তা ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। কিন্তু তখনই আমদানির চিন্তা করলে আমদানি ব্যয় কম হতো, ওই চালের দামও কম হতো। তাহলে প্রশ্ন ওঠে-এই বিলম্ব কি ইচ্ছাকৃত?

এতা গেলো একটি দিক। তবে যে জটিল বাস্তবতা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা ছিল- তা হলো, সরকারি গুদামে চালের মওজুদ এখন মাত্র ১ লাখ ৮১ হাজার টন (১৮ জুনের হিসাব)। গত ১০ বছরের মধ্যে এটা সর্বনিম্ন মওজুদ। বিশেষজ্ঞরা বলেন, সরকারি গুদামে কমপক্ষে ৬ লাখ টন চাল মওজুদ থাকা অবশ্যই প্রয়োজন। মওজুদ এর চেয়ে কমে গেলে চাল ব্যবসায়ীরা এর সুযোগ নেবেই, আর চালের দাম বাড়বেই। এবার মূলত সেটাই হচ্ছে। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, সরকারের হয় কোন নিয়ন্থন নেই অথবা এটাও ইচ্ছাকৃত; কিংবা ক্ষমতাবানদের হাতে সাধারন মানুষ জিম্মি।

সরকার এখন অভ্যন্তরীন ধান-চালও সংগ্রহ করতেও পারছে না। কারণ, বাজারে চালের দাম ৪৮ থেকে ৫০ টাকা হলেও সরকার-নির্ধারিত ৩৪ টাকা দরে কেউ সরকারকে চাল দেবে না, এটাই স্বাভাবিক। এর চেয়েও গুরুতর বিষয় হলো, বাজারে বর্তমানে কী পরিমাণ চাল আছে, এ সম্পর্কে কোনো তথ্য-উপাত্ত সরকারের কাছেও নেই অথবা তা জনগনের সামনে উপস্থাপিত হচ্ছেনা। অথচ খাদ্য মওজুদ নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী- খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব এটা নিয়মিত মনিটর করা ও হিসাব রাখা। কারণ, এর পরিণতিতে এখন চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত কঠিন হবে।

গত তিন দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতির অবয়বে অনেক পরিবর্তন এসেছে। এক সময় দেশের অর্থনীতির এক তৃতীয়াংশ আসতো কৃষি খাত থেকে। সেখানে বিদায়ী ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে কৃষির জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান চলে এসেছে ১৪ দশমিক ৭৯ শতাংশে। এবার বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো জিডিপির যে হিসাব করেছে- তাতে কৃষি খাতে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে দেখানো হয়েছে। সব চেয়ে বিষ্ময়কর হলো, এতে খাদ্য শস্য খাতে বাড়তি উৎপাদন ধরা হয়েছে ২ দশমিক ৫ শতাংশ। বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদনের ৬০ ভাগ আসে বোরো মৌসুম থেকে । বাকি ৪০ ভাগ আউশ ও আমন থেকে আসে। আউশের উৎপাদন ৭ শতাংশের মতো কম হয়েছে। আমণের উৎপাদন আগের বছরের একই পর্যায়ে রয়েছে। বোরোর উৎপাদনে এবার দুর্যোগ ও হাওরের বিপত্তির কারণে ৬/৭ লাখ টন কম উৎপাদন হবে বলে বলা হচ্ছে। এ হিসাবে কোনভাবেই খাদ্য উৎপাদন বেশি হওয়ার কথা নয়। একই কারণে কৃষিতে ধনাত্মক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাও বাস্তবসম্মত নয়।

চাল নিয়ে রাজনীতির দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে বাংলাদেশে। চাল আর রাজনীতি খুব বেশি দূরের কিছু নয়। এদেশে সবসময়ই চালের দামকে স্পর্শকাতর ইস্যু মনে করা হয়। ভোটের রাজনীতিতেও চাল গুরুত্বপূর্ণ। ‘১০ টাকা কেজি চাল’ নিয়ে বহু বাতচিত হয়েছে। এমন ওয়াদা করা হয়েছিল, নাকি হয়নি তা নিয়েও বিতর্ক চলে আসছে। তবে চালের বর্তমান উচ্চমূল্যে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন মধ্যবিত্ত আর নিম্নবিত্তের মানুষেরা। পেটতো আর রাজনীতি বোঝে না। উচ্চমূল্যে চাল কিনতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারন মানুষ। ওলট-পালট হয়ে যাচ্ছে সংসারের বাজেট। এমনকি পত্রিকায় এও খবর বেরিয়েছে, চালের উচ্চ মূল্যের কারণে নিম্ন আয়ের মানুষ ভাত খাওয়া কমিয়ে দিয়েছেন। ৪-৫ সদস্যের ছোট একটি পরিবারে কেবল চালের পেছনেই খরচ বেড়েছে কমপক্ষে পাঁচশ’ টাকা।

জনগন এখন শুধুই সংখ্যা

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

এক. একেকটি ভয়াবহ, হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে। তখনই শুধু আমাদের গণমাধ্যম হৈ চৈ শুরু করে। রিপোর্ট, সরেজমিন, ষ্টোরি-কোনকিছুই বাদ রাখে না। দিক-বিদিক লম্ফ-ঝম্ফ শুরু হয় সরকারের লোকজনের। তারপর আবার যা তাই। সুন-শান, গভীর নিস্তব্ধতায় সব বিষয় চাপা পড়ে যায়। সরকার-প্রশাসন ওই পর্যন্ত অপেক্ষা করে। তদন্ত কমিটি করে। তদন্ত রিপোর্ট হয় বটে, কেউ জানতে পারে না, কোন সুপারিশ বাস্তবায়নও হয় না। আবার ঘটনা ঘটলে তবেই বিষয়গুলি আলোচনায় আসে।

পাহাড়ে এখন লাশের মিছিল। ক্ষমতাবানরা নিয়মিত পাহাড় কেটে পাহাড়ী জেলাগুলিকে মৃত্যু উপত্যকায় পরিনত করেছে। ঘূর্নিঝড় ‘মোরা’র পর থেকেই আশঙ্কা ছিল আগাম বৃষ্টির- অতি বৃষ্টির। বাস্তবে ঘটেছেও তাই। প্রবল বৃষ্টিতে ধ্বসে পড়া পাহাড়ের নিচে এখন শুধু লাশের সারি। এসব বিষয়ে প্রায় নিশ্চুপ গণমাধ্যমগুলো ঘটনা ঘটে যাবার পরে সরব হয়েছে। খবর দিচ্ছে লাশের সংখ্যার। আর দৌড়াচ্ছে মাইক নিয়ে এর-ওর কাছে, খবর সংগ্রহের ধান্ধায়! আর কত লাশের খবর!

গণমাধ্যম এবং কথিত সুশীল সমাজ-এখন মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। গণমাধ্যম কতটা সত্যানুসন্ধানী, সে নিয়ে অনেক প্রশ্ন তৈরী হয়ে আছে। কথিত সুশীল সমাজ যেমন দলদাস এবং দলকানা, গণমাধ্যমও সেরকম। কর্পোরেটসহ নানা পক্ষের স্বার্থের ধারক হয়ে উঠেছে; জনগণের পক্ষে আসলেই আছে কতোটা?। এর ফলে সরকার, সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যমগুলি প্যারালাল ভূমিকায় চলে আসছে অভিন্ন স্বার্থরক্ষায়।

২০০৭ সালে পাহাড় ধ্বসের পরে গঠিত তদন্ত কমিটি যে রিপোর্ট দিয়েছিল, সুপারিশ করেছিল সেগুলি কেন সরকার বাস্তবায়ন করছে না- এ বিষয়ে গত বছরগুলিতে গণমাধ্যমগুলি একটিও কার্যকর রিপোর্ট করেছে কিনা জানা নেই। অথচ গণমাধ্যমগুলি লাগতার চাপের মধ্যে রাখলে সরকার বাধ্য হতো সুপারিশ বাস্তবায়নে। সবাই যেন ভুলেই গিয়েছিল, ফি-বছর পাহাড় ধ্বসের আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। আর ধ্বস নামলেই মরবে মানুষ, যারা সরকারের ভাষায় ‘ইল্লিগ্যাল’!

কেন ২০০৭ সালের সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি-এর অদ্ভুত উত্তর দিয়েছেন বণ ও পরিবেশমন্ত্রী। তার মতে, যারা সুপারিশ করেছিলেন, তারা মূল্যায়ন করেননি যে কোন কোন সুপারিশ বাস্তবায়ন সরকারের পক্ষে সম্ভব। মানলাম মন্ত্রীর কথা । কিন্তু পাহাড় কাটা বন্ধ হয় না কেন? প্রশাসনের গতানুগতিক উত্তর, প্রভাবশালীদের কারণে তারা বন্ধ করতে পারে না। তাহলে তো কথাই নেই। পাহাড়ও কাটা বন্ধ হবে না- ‘ইল্লিগ্যাল’ নামধারী মানুষগুলোর লাশের মিছিলও বন্ধ হবে না।

দুই. জনগনের নাভিশ্বাস উঠতে খুব সময় বাকি নেই। শাসকরা সবশেষ মরণকামড় বসিয়েছে। এখন আর কোন কিছুই আড়াল নেই। অর্থমন্ত্রীর নয়া ভ্যাট আইন এবং পাপ কর (আবাগরী শুল্ক) জনগনকে একেবারেই কোনঠাসা করে ফেলবে বলে মনে করা হচ্ছে! চালের দাম ইতিমধ্যে হু হু করে বাড়ছে। ছুতো দেয়া হচ্ছে হাওড়াঞ্চলে বন্যার কারণে ফসলহানির। আর রোজার আগেই লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে দ্রব্যমূল্য। ফলে নিশ্চিত হচ্ছে পনের কোটির নাভিশ্বাস!

এই সরকারের বাজারের ওপর কোন নিয়ন্ত্রন নেই। নাকি নিয়ন্ত্রণের কোন ইচ্ছে আছে? বাজার মনিটরিংয়ের নামে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, সিটি কর্পোরেশন মোবাইল কোর্ট পরিচালনার নামে জনগনের সাথে রসিকতা করে। আর ‘ব্যবসা-বান্ধব’ দাবি করে বাজারের নিয়ন্ত্রক ক্ষমতাবানদের সিন্ডিকেটের ওপর ছেড়ে দেয় জনগণের টাকা লুটে নিতে!

মোটা চালের কেজি ৪৫-৪৮ টাকা। ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের হিসেব মতে, গত এক বছরে মোটা চালের দর বেড়েছে ৪২ শতাংশ। বাজার সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে ছেড়ে দেয়ার পরিণতি! ১০ টাকা কেজি দরে চাল, প্রতি পরিবারের একজনের চাকুরি – এরকম রূপকথাসুলভ প্রতিশ্রুতি দেয়ার শিকার একেবারেই সাধারণ, খেটে খাওয়া মানুষগুলি!

সরকারী গুদামে মওজুদ কমেছে চাল সংগ্রহ অভিযান একেবারেই ব্যর্থ। চালের বাজারের নিয়ন্ত্রক ব্যবসায়ীরা বুঝে গেছেন, বাজারে হস্তক্ষেপ করার মত মওজুদ সরকারের কাছে নেই। ফলে তারা অবলীলায় দাম বাড়িয়ে যাচ্ছেন। চাল ব্যবসায়ীদের মওজুদ সম্পর্কে খাদ্যমন্ত্রী অন্ধকারে। কোন পর্যায়ে ধারণা নেই, চালকল মালিক ও ব্যবসায়ীদের কাছে মওজুদের পরিমান কত? সুতরাং কৃত্রিম সংকট তৈরীর সহজ কাজটি করে দাম বাড়াচ্ছে প্রতিদিন।

বিশ্ব বাজারে চালের দাম বাড়ছে ঠিক; বিশেষ করে বাংলাদেশ যে সব দেশ থেকে আমদানী করে। সঠিক সময়ে সিদ্ধান্ত নিলে আমদানী ব্যয় বাড়তো না-এমন বত্তব্য বিশ্লেষকদের। চাল আমদানীর শুল্ক প্রত্যাহার করা হলেও কবে সে চাল বাজারে ঢুকবে সে বিষয়টি অনিশ্চিত। চাল নিয়ে সত্যি সত্যি কি বিপাকে পড়তে যাচ্ছে দেশ? আর কে না জানে, এজন্য দায়ী কারা। কারণ চালের মজুদ নিম্নগামী হওয়ার সাথে সরকার তৎপর হলে আজকের পরিস্থিতি হতো না। এর দায় নিতে হবে না কাউকে!

সিন্ডিকেটগুলির হাতে বাজারের নিয়ন্ত্রন ছেড়ে দেবার পাশাপাশি খোলা বাজারে ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রির নামে লুটপাটের ব্যবস্থা করে দেয়া হয়েছে। ১০ টাকা কেজির চাল যাদের প্রাপ্য তাদের হাতে পৌঁছাচ্ছে না বলেই নানা অভিযোগ।

তিন. নতুন ভ্যাট আইনকে ঘিরে ব্যবসায়ীদের ছক কমপ্লিট। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির ভয়াল খাঁড়া নেমে আসতে যাচ্ছে জনগনের মাথায়। ভ্যাট থাবায় বাড়ছে বিদ্যুৎ গ্যাসের দাম। মূল্যস্ফীতির যে চাপ বাড়তে যাচ্ছে তার গোটা দখলটাই তাদের এভাবে সকলকে বলি হতে হচ্ছে উচ্চকাঙ্খার মূল্য হিসেবে।

এবারের বাজেট সাদা চোখে দেখলেও একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, কোন জবাবদিহিতা না থাকায় কোনই তোয়াক্কা নেই। বেপরোয়া রাজস্ব সংগ্রহের এই বাজেট কতটা বাস্তবায়নযোগ্য সে নিয়ে কোন সংশয়কে পাত্তা দেয়া হচ্ছে না। নিকট অতীতের কোন বাজেটে বরাদ্দ এডিপি’র ষাট শতাংশ অর্জিত হয়নি। এবারে কতগুলি মেগা সাইজের প্রকল্প ফোকাস করা হয়েছে- যা দেখে মনে অনেক ধরনের প্রশ্নই মনের মধ্যে উঠতে পারে।

তবে বলতেই হচ্ছে, এখন জনগনের কোন মূল্যই নেই; এ কারনে তাদের চাওয়া-পাওয়া, আশা-আকাংখা, প্রত্যাশাও মূল্যহীন। এখন তারা শুধুই সংখ্যা; নির্বাচনেও তাদের কোন দাম নেই; প্রয়োজনও নেই।

সরকারের উদ্ভাবনী শক্তি এবং জনগণের সীমাহীন ভীতি

আমীর খসরু ::

রাষ্ট্র ব্যবস্থাটির গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে বিশ্বজুড়ে চিন্তাশীল ব্যক্তিবর্গ, রাজনীতি বিজ্ঞানী এবং দার্শনিকগণ নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে গেছেন এখন থেকে বহু শত বছর আগে থেকেই। নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি, টমাস হবস, শার্ল লুই মঁতেস্ক্য, জ্যঁ জাঁ রুশো পর্যন্ত যারা রাষ্ট্রের প্রণালীবদ্ধ মতবাদ বিকশিত করেছেন তাদের ভাষ্য- রাষ্ট্র মানবমুক্তির সম্ভাব্য গ্যারান্টি। রুশো প্রথমবারের মতো ‘সামাজিক চুক্তির’ কথা সুস্পষ্টভাবে বলেছেন। আর এর অর্থ হচ্ছে- রাষ্ট্রের কাছে জনগণ তার অধিকার সমর্পণ করবে এবং রাষ্ট্র ব্যক্তির সমস্ত অধিকার রক্ষা ও জীবন যাপনের নিশ্চিতি বিধানে সচেষ্ট হবে। এর ভিত্তিতেই রাষ্ট্রের বৈধতার আইনী অস্তিত্ব বিরাজমান। রাষ্ট্র জনকল্যাণের যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনা করবে- এটাই হচ্ছে তাদের কথা। আর এখানেই রাষ্ট্রের পক্ষে এর ম্যানেজার অর্থাৎ সরকারের রাজস্ব আদায়, আয়-ব্যয়সহ সব ক্ষেত্রেই উদ্দেশ্য থাকা উচিত, জনকল্যাণ এবং জনগণের উন্নয়ন। আর এ কারণেই সরকারের জবাবদিহিতা এবং স্বচ্ছতার প্রশ্নটি বড় করে আসে। এর ব্যতয় যদি হয় তবে রাষ্ট্রের পক্ষে সরকারের সকল কার্যক্রমই আইনের ব্যতয় হিসেবেই আবির্ভূত হয়ে পড়ে।

কিন্তু বাংলাদেশে এমন জিজ্ঞাসা এবং ঔৎসুক্য থাকায় বারণ আছে। এটাও ঠিক যে, পৃথিবীর কোনো দেশের রাষ্ট্র ব্যবস্থাই পুরোপুরি অর্থাৎ শতকরা শতভাগ গণতন্ত্রের গ্যারান্টি দিতে পারেনি। প্রতিনিধিত্বশীল শাসন ব্যবস্থা বা রিপ্রেজেনটেটিভ গভর্নমেন্ট- এর প্রবক্তা জন স্টুয়ার্ড মিল থেকে শুরু করে অনেক রাজনীতি বিজ্ঞানীই এ নিয়ে চিন্তিত ছিলেন এবং এখনো আছেন। কিন্তু যতো বেশি সম্ভব গণতন্ত্র নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। যতো বেশি গণতন্ত্র অর্থাৎ জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকবে, উন্নয়ন ততো বেশি জনকল্যাণমুখী হবে। বর্তমান জামানার প্রখ্যাত দার্শনিক, লেখক সামির আমীন তার সম্পাদিত ফরাসি ভাষায় লিখিত একটি বইয়ে (বিস্তারিত আলোচনার জন্য দেখুন-প্রতিরোধের বিশ্বময়তা, ন্যাশনাল বুক এজেন্সি, কলকাতা, ২০০৪) বলেছেন, উন্নয়ন প্রক্রিয়া বাস্তবায়িত করতে হলে প্রাথমিকভাবে গণ-উদ্যোগের প্রয়োজন হয় না, যা প্রয়োজন তাহলো রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের প্রতি জনগণের সমর্থন।

কিন্তু বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের প্রতি জনগণের সমর্থন আছে কি নেই- সে বিষয়টি আদৌ বিবেচনায় নেয়া হয় না; বরং এর উল্টোটাই ঘটে থাকে সব সময়। আর উল্টো কথা শুনতে শুনতে এখন জনগণ আগাম বুঝে গেছে ক্ষমতাসীনরা কি বলতে চাইবে, চায়, বা চাচ্ছে।

এখন দেশের উপরিতলার মানুষদের জন্য ব্যাপক আলোচনার বিষয়- ‘‘বাজেটে কি করিলে কি হইতো’ জাতীয় বিষয়াবলী। কিন্তু সাধারণ মানুষ দেখছে বাজেটকে ভিন্নভাবে। আবার জিনিসপত্রের দাম বাড়লো কিনা, প্রকৃত আয় কতোটা কমলো ইত্যাকার বিষয়াদিকেই তারা বাজেট হিসেবে মনে করেন। এটা শ্রেষ্ঠতম কিংবা পাপমুক্ত হয়ে পুণ্য লাভের জন্য হয়েছে কিনা সে বিবেচনার সময়টুকুও তাদের নেই।

এতোদিন মধ্যম ও ক্ষুদ্র আয়ের মানুষজন নিরাপত্তার খাতিরেই ব্যাংকে অল্প-স্বল্প অর্থ জমা রেখে নিজ নিজ পরিকল্পনা অনুযায়ী তা ব্যয় করতেন। এখন সেখানেও সরকারের হানা। যারা অর্থাভাবে শপিং মলে যেতে পারেন না, তারা ছোটোখাটো দোকানে গিয়েও দেখেন ‘ভ্যাটের থাবা’।

এই মুহূর্তে র্যা ব-পুলিশ-আইন শৃংখলা রক্ষাবাহিনীর চেয়েও ভ্যাটভীতিই মানুষকে বেশি বিচলিত করছে। ঢালাও ১৫ শতাংশ ভ্যাটের কারণে এর প্রভাব প্রান্তিক মানুষের জীবনকেও বিপর্যস্ত ও বিপন্ন করবে। প্রভাবশালী গবেষণা সংস্থা সিপিডি এ কারণেই বলেছে, এই বাজেট মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের উপরে চাপ সৃষ্টি করবে। সিপিডি নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রণীত বিশাল আকারের এই বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। হয়তো অর্থমন্ত্রী এসব গবেষণালব্ধ কথাকেও কখন বলে বসবেন- রাবিশ!

তবে ভ্যাট, ব্যাংকে গচ্ছিত টাকা কর্তনসহ নিত্যনতুন উদ্ভাবনের জন্যই অর্থমন্ত্রী মুহিত বলার হিম্মত ও সাহস রাখেন এই বলে যে, জীবনের শ্রেষ্ঠতম বাজেটটি তিনি দিয়েছেন। এটা তার পক্ষেই মানায়। কারণ লোপাট হওয়া হাজার হাজার কোটি টাকাকে তিনি যেভাবে তুচ্ছজ্ঞান করে বক্তব্য দিয়েছেন- তাতে এমন কথা তিনি এবং তারা ছাড়া কে বা কারা বলতে পারে?

নতুন উদ্ভাবনী চিন্তা-ভাবনার জন্য অর্থমন্ত্রী মুহিতকেই শুধু বাহবা দিয়ে কোনো লাভ নেই; অধিকাংশ তার প্রাপ্যও নয়। অর্থমন্ত্রীকে যিনি মন্ত্রীসভায় রেখেছেন বাহবা এবং ধন্যবাদটা তারই বেশি প্রাপ্য।

কিন্তু এ কথাটি মনে রাখতে হবে, ভ্যাট বৃদ্ধি ও এর উপরে নির্ভরতা তখনই মানায়, যখন  মানুষের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, তারা সক্ষম হন অর্থনৈতিকভাবে। নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদ অর্মত্য সেন সারা জীবনই এই সক্ষমতার তত্ত্বের কথা বলেছেন। অবশ্য এসব তত্ত্ব জানলে বা শুনলে তো আর শ্রেষ্ঠতম বাজেটটি অর্থমন্ত্রী মুহিত এবং তার সরকারের পক্ষে দেয়া সম্ভব হতো না।

তবে আমজনতার একটিই কথা হচ্ছে-এটাই কি রাষ্ট্রের সাথে জনগণের চুক্তি? এ কথাটি মনে রাখতেই হবে, জনমানুষ যখন ওই চুক্তির উপরে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলবে (অবশ্য ইতোমধ্যে ফেলেছে) তখন আমাদের এই রাষ্ট্র ব্যবস্থাটিই জনগণের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে। আর সেটাই বিশাল এক দুর্ভাবনার বিষয়।

বিশ্বজুড়ে অস্ত্রের ঝনঝনানি : বেড়েছে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়া ভারতের সামরিক ব্যয়

মোহাম্মদ হাসান শরীফ ::

বিশ্বজুড়ে অস্ত্রের ঝনঝনানি। আর তার জের ধরে টানা দ্বিতীয় বছরের মতো বেড়েছে অস্ত্র খাতে ব্যয়। ২০১৫ সালের তুলনায় ০.৪ ভাগ বেড়ে ২০১৬ সালে সামরিক খাতে ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬৮৬ বিলিয়ন ডলার। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (সিপরি) এ তথ্য জানিয়েছে। ২০১০ সালের পর এই প্রথম যুক্তরাষ্ট্রসহ উত্তর আমেরিকায় সামরিক ব্যয় বেড়েছে, আর পশ্চিম ইউরোপেও বেড়েছে  টানা দ্বিতীয় বছরের মতো। বিশ্বে ২০১১ সালের পর এবারই প্রথম টানা দ্বিতীয় বছরের মতো সামরিক ব্যয় বাড়ল। তবে কষ্টের মধ্যেও সুখের বিষয় হলো- সেটা ওই বছরের ১৬৯৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেনি।

সামরিক ব্যয়ের ধারায় অঞ্চল ভেদে ব্যাপক পার্থক্য দেখা যায়। এশিয়া, ওশেনিয়া, মধ্য ও পূর্ব ইউরোপ এবং উত্তর আফ্রিকায় বেড়েছে। বিপরীতে মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ আমেরিকা এবং উপ-সাহারীয় এলাকায় কমেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ১ নম্বরেই :

এখনো যুক্তরাষ্ট্রেই সর্বোচ্চ পরিমাণে সামরিক ব্যয় হয়ে থাকে। ২০১৫ সালের তুলনায় দেশটিতে সামরিক ব্যয় ১.৭ ভাগ বেড়ে ৬১১ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যয়ের দেশ চীনে ২০১৫ সালের তুলনায় ৫.৪ ভাগ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১৫ বিলিয়ন ডলার। বৃদ্ধির হারটি গত বছরের চেয়ে অনেক কম। রাশিয়ার ব্যয় ৫.৯ ভাগ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৯.২ বিলিয়ন ডলার। দেশটি তৃতীয় বৃহত্তম ব্যয়কারী। সৌদি আরব ২০১৫ সালে ছিল তৃতীয় স্থানে। এখন সে চতুর্থ স্থানে নেমে গেছে। আঞ্চলিক যুদ্ধ সত্ত্বেও তাদের ব্যয় ৩০ ভাগ কমে হয়েছে ৬৩.৭ বিলিয়ন ডলার। ভারতের সামরিক ব্যয় ৮.৫ ভাগ বেড়ে ৫৫.৯ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। তারা এখন পঞ্চম বৃহত্তম সামরিক ব্যয়ের দেশ।

মার্কিন সামরিক ব্যয় বাড়াটি আশঙ্কাজনক। ধারণা করা হচ্ছে, সামরিক ব্যয় কমানোর ধারা থেকে তারা আবার সরে এসেছে। অর্থনৈতিক সঙ্কট এবং আফগানিস্তান ও ইরাক থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় কমে গিয়েছিল। এখন যুক্তরাষ্ট্রে সার্বিক বাজেটে সংযম দেখা গেলেও সামরিক খাতে ব্যয় বাড়ছে।

ভয়ে বাড়ছে ইউরোপের ব্যয় :

পশ্চিম ইউরোপে সামরিক ব্যয় বেড়েছে টানা দ্বিতীয় বছরের মতো। আগের বছরের চেয়ে তা ২.৬ ভাগ বেড়েছে। তবে এই বৃদ্ধি হয়েছে মূলত তিনটি দেশে। ইতালিতে লক্ষ্যণীয় ১১ ভাগ বেড়েছে। রাশিয়ার কাছ থেকে আক্রমণের শঙ্কায় সার্বিকভাবে মধ্য ইউরোপে ২.৪ ভাগ ব্যয় বেড়ে গেছে।

তেল রফতানিকারক দেশগুলোর কমেছে:

তেলের দাম কমে যাওয়ার যে অর্থনৈতিক সঙ্কটের সৃষ্টি হয়েছে, মূলত সে কারণেই অনেক তেল রফতানিকারক দেশ অস্ত্র আমদানিতে ব্যয় কমাতে বাধ্য হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে সৌদি আরবের কথা বলা যায়। তাদের ব্যয় কমেছে ২৫.৮ বিলিয়ন ডলার। তবে সবচেয়ে বেশি কমেছে ভেনেজুয়েলায়। তারা কমিয়েছে ৫৬ ভাগ। এছাড়া দক্ষিণ সুদান ৫৪ ভাগ, আজারবাইজান ৩৬ ভাগ, ইরাক ৩৬ ভাগ, সৌদি আরব ৩০ ভাগ কমিয়েছে। এছাড়া অ্যাঙ্গোলা, ইকুয়েডর, কাজাখস্তান, মেক্সিকো, ওমান ও পেরুও সামরিক খাতে ব্যয় বেশ কমিয়েছে। তবে আলজেরিয়া, ইরান, কুয়েত, নরওয়ে সামরিক খাতে ব্যয় বেশ বাড়িয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য :

১. বিশ্বে সামরিক খাতের ব্যয় বৈশ্বিক জিডিপির ২.২ ভাগ। জিডিপির হিসাবে মধ্যপ্রাচ্যেই সর্বোচ্চ সামরিক ব্যয় করে থাকে। ২০১৬ সালে জিডিপির ৬.০ ভাগ ব্যয় হয়েছে সামরিক খাতে। সর্বনিম্ন আমেরিকায়। সেখানে জিডিপির ১.৩ ভাগ খরচ হয়েছে এই খাতে।

২. ২০১৬ সালে আফ্রিকায় ব্যয় কমেছে ১.৩ ভাগ। টানা ১১ বছর বাড়ার পর এবারই এখানে ব্যয় কমল। মূলত তেলের আয় কমায় এমনটা ঘটেছে।

৩. এশিয়া ও ওশেনিয়ায় সামরিক ব্যয় বেড়েছে ৪.৬ ভাগ। দক্ষিণ চীন সাগরে আঞ্চলিক বিরোধকে কেন্দ্র করে মূলত এই ব্যয় বেড়েছে।

৪. ইকুয়েডর, মেক্সিকো, পেরু ও ভেনেজুয়েলায় তেল রাজস্ব কমায় মধ্য আমেরিকা, ক্যারিবিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকায় সামরিক ব্যয় কমেছে। অর্থনৈতিক সঙ্কটের কারণে ব্রাজিলে সামরিক ব্যয় কমেছে।

খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে তল্লাশি : ক্ষমতাসীনদের আসল উদ্দেশ্য কী ?

আমীর খসরু ::

গত বেশ কিছুদিন ধরে দেশে জোর-জবরদস্তির মাধ্যমে রাজনৈতিক শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিরাজমান রাখা হলেও, পরিস্থিতিটি যে ভিন্ন ছিল তা সবারই চোখে পড়েছে। জোর-জবরদস্তি, শক্তি ও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে রাজনৈতিক শান্ত পরিস্থিতির বিপরীতে বিরোধী দল বিএনপিও কৌশল পরিবর্তন করেছে। গেলো কিছুদিন আওয়ামী লীগ নির্বাচনী প্রস্তুতি হিসেবে দলের অভ্যন্তরে নানা ধরনের কর্মকান্ড চালাচ্ছে। দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন এলাকার নেতাদের ক্ষোভ ও উদ্বেগের কথা নিজেই শুনছেন এবং বোধকরি এর ভিত্তিতেই আগামী নির্বাচনের কর্মকৌশল তারা নির্ধারণ করবেন। এর বিপরীতে বিএনপিও নানা চেষ্টা-তদবির করছে, নানাবিধ সংকটে সংকটাপন্ন ও কোমড় ভাঙ্গা দলকে সোজা করে দাড় করানোর জন্য। এ লক্ষ্যে অন্যান্য বিষয়গুলো বাদেও অনেকটা হঠাৎ ও অপ্রত্যাশিত হলেও ভিশন-২০৩০ ঘোষণা করে দলের প্রধান খালেদা জিয়া এ কথাটিই জানান দিয়েছেন যে, তারাও আগামী নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

আওয়ামী লীগ যে নির্বাচনের জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে তার বড় ইঙ্গিতবাহী ঘটনা হচ্ছে- ভোটের রাজনীতির কারণে হেফাজতকে কাছে টানা। অপরাপর ইসলামী দলগুলোর সাথেও তাদের কথাবার্তা চলছে-এমনটা শোনা যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ বাম নামধারী কয়েকটি দলের উপরে আর নির্ভর করে ভোটের রাজনীতির অংক কষতে চাইছে না।

বিভিন্ন মহলে এমন একটা জোর ধারণার তৈরি হয়েছে যে, নির্ধারিত সময়ে হোক বা তার কিছুটা আগেই হোক একটি সংসদ নির্বাচন ২০১৮-তেই অনুষ্ঠিত হবে এবং এই নির্বাচনে বিএনপিও অংশ নেবে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দলটি যে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সে দিকে তারা আর যাবেন না, এটাও নিশ্চিত। সরকার চেষ্টা করলেও তারা যে ওই পথে যাবেন না এটাও মোটামুটি নির্ধারিত। বিভিন্ন সূত্রের খবর হচ্ছে, পশ্চিমী দুনিয়ার কূটনৈতিক তৎপরতাও তেমনটিই। তারা চান, সব দলের অংশগ্রহণে, গ্রহণযোগ্য, মোটামুটি অবাধ একটি নির্বাচন হোক। আর এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে দেশের আইনের শাসন, মোটামুটি সুশাসন, বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডসহ মানবাধিকার এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রের ক্রমাবনশীল পরিস্থিতির উন্নয়ন হবে-এমনটা তারা মনে করেন। বিশেষ করে তারা জঙ্গীবাদের আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট অর্থাৎ আইএস-এর স্থানান্তরকরণ ও কৌশল পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে জঙ্গীবাদের অবস্থানকে তারা নিবিড় ও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। পশ্চিমী দুনিয়ার পক্ষ থেকে এ কথাটি ইতোপূর্বে বার বার সরকারকে বলা হয়েছে যে, গণতন্ত্রের অনুপস্থিতি জঙ্গীবাদের উত্থান এবং সম্ভাবনাকে ব্যাপক মাত্রায় বাড়িয়ে তোলে। বাংলাদেশে যে ঠিক তেমনটাই ঘটেছে- এ বিষয়টিও স্মরণে রাখা প্রয়োজন। কিন্তু দুর্ভাগ্য হচ্ছে, সরকার জঙ্গীবাদ ইস্যুকে ব্যাপকভাবে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবেই ব্যবহার করছে।

দেশে যখন একটি নির্বাচনী হাওয়া বইতে শুরু করার ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছিল-ঠিক তখনই বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ে তল্লাশির খবরটি বিস্ময় ও নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। হঠাৎ করে জোর জবরদস্তির শান্তি অবস্থার মধ্যে কেন বিরোধী একটি রাজনৈতিক দলের চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে তল্লাশি চালানো হলো? বিষয়টি তো রাজস্ব বোর্ড বা কাস্টমস গোয়েন্দা বিভাগের বিষয় নয়- বিষয়টি নিঃসন্দেহে সর্বোচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক। কাজেই সর্বোচ্চ পর্যায়ের এমন একটি কার্যক্রম ও কর্মকান্ড ক্ষমতাসীনদের সর্বোচ্চ পর্যায়ের অজ্ঞাতে ঘটতে পারে এমনটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। এর মধ্যদিয়ে কয়েকটি প্রশ্নের জন্ম নিয়েছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার কি চাচ্ছে না যে, আগামী নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করুক? এবং সব দলের অংশগ্রহণ ছাড়া আরেকটি ভোটারবিহীন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক? এ প্রশ্নটিও জনমনে দেখা দিয়েছে যে, সরকার কি দমন-পীড়ন চালিয়ে, মাঠ দখল করে, স্থানীয় সরকারগুলোর আদলে একটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে চায়? এ প্রশ্নটিও উঠেছে যে, বিএনপি নির্বাচনমুখী হোক তা সরকার চায় কি না? উস্কানি দিয়ে বিএনপি নেতাকর্মীদের নামে চলমান মামলা-মোকদ্দমাগুলো আরও জোরদার করে, তারা কি চান মাঠ খালি করতে?

এ কথাটি মনে রাখতে হবে, একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি দ্বিতীয়বার একইভাবে ঘটে না। আর যদি ঘটানোর চেষ্টাও করা হয় তার ফলাফলও ভিন্ন হতে বাধ্য।

এখনও নিশ্চয়ই সময় আছে- জোর-জবরদস্তির কথিত শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নয়- সুস্থ, স্বাভাবিক, অবাধ, গণতান্ত্রিক পরিবেশই পারে প্রকৃত শান্তি, স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে গণতন্ত্রের পথকে সুগম করতে। আর এটাই হচ্ছে, গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠার একমাত্র মাধ্যম।

উন্নয়ন না গণতন্ত্র-সে বিতর্ক এখন অতীতে পরিণত হয়েছে-বোধ করি ক্ষমতাসীনরা বিষয়টি এতোদিনে হলেও বুঝতে সক্ষম হয়েছেন।

অপ্রতিরোধ্য অর্থ পাচাররোধে নড়াচড়া নেই কার স্বার্থে?

এম. জাকির হোসেন খান ::

ওয়াশিংটনভিত্তিক গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি’র (জিএফআই)-এর ১ মে ২০১৭ এ প্রকাশিত ‘ইলিসিট ফিন্যান্সিয়াল ফ্লোজ ফ্রম ডেভেলপিং কান্ট্রিজ: ২০০৫-১৪’ শীর্ষক উন্নয়নশীল দেশ থেকে অর্থ পাচার-সংক্রান্ত প্রতিবেদন মতে, ২০১৪ সালে বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের পরিমাণ ১ হাজার কোটি (১০ বিলিয়ন) ডলার বা ৮০ হাজার কোটি টাকার বেশি ছাড়িয়েছে। উল্লেখ্য, ২০০৪ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে ৫ হাজার ৫৮৮ কোটি ডলার এবং শুধু ২০১৩ সালেই অবৈধভাবে বাংলাদেশের বাইরে চলে গেছে ৯৬৬ কোটি ডলারের বেশি। দেশের প্রধান রফতানি খাত বস্ত্র ও পোশাক খাতের বাইরে অন্যান্য রফতানি পণ্যের সম্মিলিত আকারের চেয়ে বেশি অর্থ অবৈধভাবে দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে, যার অধিকাংশই দুর্নীতি এবং কর ফাঁকির মাধ্যমে অর্জিত এ অর্থ আমদানি-রফতানি চালানে জালিয়াতি বা অস্বচ্ছ ব্যবসায়িক লেনদেনের মাধ্যমে পাঁচার হচ্ছে বলে জিএফআই প্রতিবেদনে জানানো হয়।

এর আগে ২০১৪ এর ২০ জুন তারিখে সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক (এসএনবি) এর ‘‘ব্যাংকস ইন সুইজারল্যান্ড ২০১৩” প্রতিবেদনের বরাতে ২০১২ এর তুলনায় ৬২ শতাংশ বেড়ে সুইস ব্যাংকগুলোয় বাংলাদেশিদের ৩,১৬২.৭২ কোটি টাকা গচ্ছিত থাকার সংবাদ প্রকাশ করে। শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মইনুল খান বলেন, গত দুই বছরে কয়েক হাজার প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যাওয়ায় এগুলোর মধ্যে পাঁচ শতাধিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এর মধ্যে মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিদেশে অর্থ পাচার হলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেই বন্ড সুবিধার অপব্যবহার আইনে মামলা করা হয়েছে। মূলত: অর্থ পাচারের ঘটনায় এনবিআরের মামলার সুযোগ না থাকায় এমনটি হয়েছে। তবে সম্প্রতি অর্থ পাচারের অভিযোগে বেশ কয়েকটি মামলা করেছে এনবিআর; তবে চূড়ান্তভাবে প্রকৃত দোষীরা চিহ্নিত হবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়।

উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে সংশোধিত মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১৫ সংসদে পাশ হয়, যার আওতায় এনবিআরকে চোরাচালান ও শুল্ক সংক্রান্ত অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানি লন্ডারিং অপরাধের তদন্তকারী সংস্থা হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হলেও অনুমোদনের জন্য সুনির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ করে না দেয়ার ফলে এ সংক্রান্ত অপরাধের অধিকাংশ ঘটনায় অর্থ পাচারের পরিবর্তে রাজস্ব ফাঁকির মামলায় ঝুঁকছে এনবিআর” (বণিকবার্তা, ২০১৭)। আন্তর্জাতিক সংস্থা এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপ অন মানি লন্ডারিং (এপিজি)’র মতে, মানি লন্ডারিং  প্রতিরোধে আইন করলেও তদন্তের দুর্বলতার কারণেই বাংলাদেশে অর্থ পাচার রোধে সাফল্য কম।

এপিজি গত অক্টোবরে প্রকাশিত ‘অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং অ্যান্ড কাউন্টার টেরোরিস্ট ফিন্যান্সিং মেজারস ইন বাংলাদেশ মিউচুয়াল ইভ্যালুয়েশন রিপোর্ট-২০১৬’ শীর্ষক প্রতিবেদন মতে, ২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত অর্থ পাচার-সংক্রান্ত ৪০০ টি অভিযোগ জমা পড়লেও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) চূড়ান্তভাবে দুদক ৪৩টি মামলায় অর্থ পাচারের অভিযোগে ২১৪ জনের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। কিন্তু বিচার শেষে সাজা হয়েছে মাত্র ৪ জনের, যা প্রাথমিকভাবে প্রাপ্ত মোট অভিযোগের মাত্র ১ শতাংশ। প্রাথমিকভাবে ১৪০ কোটি ডলার বা ১০ হাজার ৯২০ কোটি টাকা পাঁচারের অভিযোগে ৭৬টি অভিযোগের বিপরীতে ২৮৪টি এজাহার দায়ের করা হয় । অর্থ পাচার রোধে কমপ্লায়েন্সের মাত্রা মূল্যায়ন, কারিগরি সহায়তা ও প্রশিক্ষণ, গবেষণা, বৈশ্বিক নীতি উন্নয়ন এবং বেসরকারি খাতকে অর্থ পাঁচার সংক্রান্ত হালনাগাদ তথ্য প্রদানকারী ৪১টি সদস্য দেশের সমন্বয়ে গঠিত এপিজি’র সদস্য বাংলাদেশও। এ প্রেক্ষিতে এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল মজিদ মনে করেন, ‘‘অর্থ পাচার সবচেয়ে বেশি হয় মূল্য ঘোষণার মাধ্যমেই। এ বিষয়ে এনবিআরকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হলেও পর্যাপ্ত জনবল ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এখনো এনবিআরের গড়ে ওঠেনি।  ট্রান্সফার প্রাইসিং সেলসহ এনবিআরের কিছু উইং কাজ করলেও এখনো দৃশ্যমান কিছু দেখা যায়নি। অর্থ পাচার প্রতিরোধে শক্তিশালী আইনও দরকার”।

যদিও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) মনে করে, এখনো আইনের বিধিমালা চূড়ান্ত না করায় পরিপূর্ণভাবে অর্থ পাচারের ঘটনা তদন্ত করা সম্ভব হচ্ছে না তবে, বাস্তবে এটা কতখানি নির্ভরযোগ্য তা প্রশ্নসাপেক্ষ। কারণ তদন্তের সাথে কারিগরি সক্ষমতা এবং তদন্তে নিয়োজিতদের সততা জড়িত। যদি তদন্ত সঠিকভাবেই হয়ে থাকবে তবে, কেন দুদক অভিযুক্তদের মাত্র ১ শতাংশের সাজা নিশ্চিত করতে সক্ষম হলো। আর যদি প্রযুক্তি জ্ঞান কমই থাকে তবে জোহা’র ন্যায় বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নিয়ে যেভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরিতে জড়িতদের যেভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে, ঠিক একইভাবে অন্যগুলোর ক্ষেত্রে সম্ভব নয় কেন? একই সিআইডি যদি বাংলাদেশ ব্যাংকের ৮৫০ কোটি টাকা পাঁচারে জড়িতদের চিহ্নিত করতে পারে; তবে, তাহলে অন্যগুলো কেন পারছেনা? তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন হলো, ২০০৯ সাল থেকে অর্থ পাঁচার আশংকাজনক হারে বাড়লেও কি কারণে বা কার স্বার্থে আইনটি শক্তিশালী করা হয়নি বা এনবিআর কে যথাযথ ক্ষমতা প্রদান করা হয়নি? অর্থ পাঁচারের সব সুযোগ রেখে পাঁচার করার পর যদি তা উদ্ধারে চেষ্টা করা হয়, তাহলে এটা অনেকটা ডাক্তার আসার আগেই রোগী মারা যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটতেই থাকবে।

এপিজি’র মতে, বাংলাদেশ  সাম্প্রতিক বছরগুলোয় উল্লেখযোগ্য হারে অর্থ পাচারের ঝুঁকির মুখোমুখি হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও ঝুঁকির বিষয়টি ওয়াকিবহাল। এজন্য ন্যাশনাল রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট (এনআরএ) ও  সেক্টরাল (খাতভিত্তিক) রিস্ক অ্যাসেসমেন্টের মাধ্যমে জাতীয় কৌশল নির্ধারণের মাধ্যমে কার্যকরভাবে অপ্রতিরোধ্য অর্থ পাঁচার নিয়ন্ত্রণের সুযোগ থাকলেও কেন কি কারণে সরকার তা করছেনা, তা বোধগম্য নয়। উল্লেখ্য, ২০১৫ এর অক্টোবরে এপিজির উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফরে এসে অর্থমন্ত্রীকে সরকারি কেনাকাটায় দুর্বলতা, স্বর্ণ চোরাচালান প্রতিরোধ, রাষ্টায়ত্ত ব্যাংকগুলোয় দুর্বলতার পাশাপাশি মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন-সংক্রান্ত বিষয় তদন্তে দুদকের শিথিলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে। অর্থমন্ত্রী ওই সময় এসব ঘাটতির বিষয়ে জোর দেয়ার কথা বলা হলেও বাস্তবে যে পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি তা সর্বশেষ জিএফআই’র প্রতিবেদনে স্পষ্ট। এরও আগে ২০১১ সালের পর ১০ জুন অর্থমন্ত্রী বাড়তি টাকার উৎস যে অবৈধ তা উল্লেখ করতে গিয়ে বাংলাদেশে কালো টাকার আকার জিডিপির সর্বনি¤œ ৪৮ শতাংশ হতে সর্বোচ্চ ৮২ শতাংশ বলে উল্লেখ করেছিলেন।

২০০৬ এবং ২০০৭ সালে অর্থ পাঁচার বাড়লেও ২০১১ সাল পর্যন্ত এর পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম থাকলেও ২০১২ সাল হতে এর পরিমাণ বাড়তে থাকে এবং ২০১১ এর তুলনায় ২০১৪ সালে ৫ গুণের বেশি কালো অর্থ বাংলাদেশ হতে বিভিন্ন দেশে পাঁচার হয়। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংকের মূদ্রানীতি অনুযায়ী ৫ হাজার ডলার বেশি অর্থ পাঠানো যায় না। চিকিৎসা বা শিক্ষা ব্যয়ের জন্য বিদেশে টাকা পাঠাতে গেলে অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়। আরেকটি চক্র বিদেশ থেকে বৈদেশিক মুদ্রায় প্রবাসীদের রেমিটেন্স সংগ্রহ করে তা বিদেশেই রেখে দিয়ে দেশে টাকায় দায় শোধ করা হয়; তেমনি বিদেশ হতে আমদানির ক্ষেত্রেও একই পদ্ধতি অনুসরণ করায় প্রায় ৪০ শতাংশ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আসছেনা, যেগুলো কোন না কোন বিদেশি ব্যাংকে জমা হচ্ছে।

দেশের গোটা ব্যাংকিং খাতের মোট সম্পদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ রাষ্ট্রায়ত্ত ছয়টি ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ করলেও এর বিপরীতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাব অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোর নন-পারফর্মিং লোনের হার ১১ শতাংশ, উন্নত দেশগুলোর ক্ষেত্রে এ হার কোনোভাবেই ৪ শতাংশের বেশি নয়। এর প্রধান কারণ ক্ষমতাবানদের হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে তা আত্মসাৎ করে লাপাত্তা। শেয়ার বাজার, সোনালি ও বেসিক ব্যাংকসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রায়াত্ব এবং বেসরকারি ব্যাংক হতে হলমার্ক, বিসমিল্লাহ গ্রুপ সহ বিভিন্ন কোম্পানি ক্ষমতাবানদের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ সহায়তায় জালিয়াতির মাধ্যমে ৩০ হাজার কোটি টাকা আত্মসাত করলেও শুধু সরকার ঘনিষ্ঠ হওয়ায় অভিযুক্তদের কেউই বিচারের আওতায় আসছেনা বলে জানিয়েছেন ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞ খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ। সরকারি-বেসরকারি খাতের সাত ব্যাংকের (সোনালী, রূপালী, বেসিক, কৃষি, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন, বাংলাদেশ কমার্স ও আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক) ব্যাংকগুলো নিজের মূলধন তো হারিয়েছেই, উপরন্তু সাড়ে ১৬ হাজার কোটি টাকার ঘাটতিতে পড়ায় ব্যবসার পরিবর্তে এসব ব্যাংক মূলধন জোগান নিয়েই চিন্তিত। আর্থিক খাতে জালিয়াতির এ ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ ব্যাংক হতে ৮কোটি ১০ লাখ ডলারের ওপর রিজার্ভ চুরির মতো অচিন্তনীয় ঘটনা ঘটে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিলিজেন্স ইউনিট গঠনের পর অবৈধভাবে কিভাবে দেশের বাইরে অর্থ পাঁচার হচ্ছে তা বোধগম্য নয়। ব্যাংকিং খাতে অপ্রতিরোধ্য দুর্নীতি প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘‘নিজেদের দলীয় লোকের সমর্থনের কারণে সোনালী ও বেসিক ব্যাংকে আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনায় জড়িত সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাচ্ছে না”।

পৃথিবী জুড়ে তুমুলভাবে ঝড় তোলা পানামা পেপারসে’র মাধ্যমে বৈধ-অবৈধ পথে বিদেশে অর্থ পাঁচারের যে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ বাংলাদেশ সহ পৃথিবীর সকল মানুষের সামনে প্রকাশ পায় কিভাবে স্বল্পোন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর রাজনীতিক এবং ক্ষমতাবানরা অবৈধ পথে উপার্জিত বিত্ত বৈভব উন্নত দেশগুলোতে পাঁচার করছে। শুধু তাই নয়, ভারত, আমেরিকা, দুবাই, বেলারুশ, রাশিয়া, ব্যাংকক এবং সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন ব্যাংকে, এবং মালয়েশিয়ায় ব্যবসায় বিনিয়োগের নামে বা ‘সেকেন্ড হোম’-এর মাধ্যমে প্রকৃত কি পরিমাণ অর্থ পাঁচার করা হয়েছে তার প্রকৃত হিসাব রাষ্ট্রের নাগরিকদের স্বার্থে জানা জরুরি। একের পর এক রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাতের ধারাবাহিক কেলেঙ্কারির চাপা পড়ে যাচ্ছে। এ সুযোগে, বাংলাদেশ থেকে আরো কম করহার ও কম আইনি জটিলতার দেশে আইন এবং বাণিজ্য ব্যবস্থাপর ফাঁক গলে মূলধন পাচার হয়ে যাচ্ছে। প্রশ্ন হলো দুদক, এনবিআর বা বাংলাদেশ ব্যাংকের চোখ ফাঁকি দিয়ে কিভাবে বিদেশে হাজার হাজার কোটি টাকা পাঁচার হলো?

জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য ১৬.৪ এর আওতায় রাষ্ট্রসমূহ ঐক্যমতে উপনীত হয় যে, ২০৩০ এর মধ্যে তারা সন্দেহজনক বা কালো অর্থের পাচার উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমাতে ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি চুরিকৃত সম্পদ পুনরুদ্ধার এবং ফেরত আনার কাজও শক্তিশালী করবে; একইসাথে সব ধরনের সংগঠিত অপরাধ রোধ করবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক, দুদক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং আইন মন্ত্রণালয়/এটর্নি জেনারেলের অফিসের সমন্বয়ে পাঁচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনার স্থায়ী উদ্যোগ গ্রহণের বিকল্প নেই।