Home » প্রচ্ছদ কথা (page 6)

প্রচ্ছদ কথা

আওয়ামী ‘প্রগতিশীলতা’র নয়া তত্ত্ব

শাহাদত হোসেন বাচ্চুঃ 

রবার্ট লুই ষ্টিভেনসন’র লেখা ‘ড. জেকিল এন্ড মিষ্টার হাইড’ উপন্যাসটির কাহিনী সংক্ষেপ মোটামুটি এরকম- ড. জেকিল একজন সদাশয় মানুষ, চিকিৎসা বিজ্ঞানী ও পরোপকারী। তিনি একটি ওষুধ আবিষ্কার করে বসেন; যেটি খেলে হেন মন্দ ও অমঙ্গলের কাজ নাই যা করা যায় না। বিকল্প ওষুধটিও আবিষ্কার করেন, যা খেলে স্ব-রূপে ফিরতে পারেন।

ভাল মানুষ হেনরী জেকিল ওষুধটি খেয়ে মন্দ মানুষ এডোয়ার্ড হাইডে রূপান্তরিত হচ্ছিলেন এবং সবরকম মন্দ ও অমঙ্গলের কাজ সংঘটন করছিলেন। আবার অন্য ওষুধটি খেয়ে জেকিলে ফেরত আসছিলেন। কিন্তু একসময় বাঁধে বিপত্তি। মন্দ মানুষ হাইডে রূপান্তরিত হতে হতে অন্য ওষুধটি কাজ করছিল না। তিনি ফেরত আসতে পারছিলেন না। ভালকে ছাড়িয়ে গিয়ে মন্দ-কুৎসিত প্রতিষ্ঠা লাভ করতে চলেছিল।

১৮৩৬ সালে লেখা এই কালজয়ী উপন্যাসটি বাংলাদেশের রাজনীতি, রাজনীতিবিদ ও দলদাসদের ক্ষেত্রে চমৎকার রূপক হিসেবে প্রাসঙ্গিক। শাসক শ্রেনী সবকালে কথনে-চলনে-বলনে ড. জেকিলের ভান করেন, আর অন্তরে পুষে রাখেন মি. হাইডের সকল দুষ্কর্ম। তাদের অনেকেই এখন প্রায় হাইডে রূপান্তরিত হয়েছেন, জেকিলে আর ফিরতে পারছেন না।

এক. রাজনীতি এখন আওয়ামী লীগের ‘বাস্তবতা’ এবং ‘প্রগতিশীলতা’- এটি সবশেষ কথিত বয়ান ও তত্ত্ব। তাদের বক্তব্য সত্য হলে ধরে নিতে হবে, কিছুদিন আগেও রাজনীতি ছিল ‘অবাস্তব’ এবং ‘প্রতিক্রিয়াশীল’। ক্ষমতাসীন দলটি এখনও পর্যন্ত খৈ ফোটার মত উচ্চারন করছে ‘স্বাধীনতার পক্ষশক্তি’ এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা। সরকার বা দলের বিপক্ষে যে কোন বক্তব্য, প্রতিবাদ এবং লেখালেখির মধ্যে খুঁজে পায় স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির অপচ্ছায়া বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরোধিতা। সুতরাং তাদের কথায় ধরে নেয়া যায়, সেগুলি ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ এবং ‘অবাস্তব’।

আওয়ামী লীগের মুখপাত্র ও সাধারন সম্পাদকের কথিত ‘রিয়েলষ্টিক এপ্রোচ’- এর রাজনীতি অবশেষে খুঁজে নিয়েছে ধর্মাশ্রয়ী একটি সংগঠনকে। যারা কিছুদিন আগেও ক্ষমতাসীনদের ভাষায় ছিল- স্বাধীনতা বিরোধী, রাজাকার-আলবদরদের উত্তরসূরী এবং পাকিস্তানী গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর অর্থ সাহায্যপুষ্ট। এখন ‘বাস্তব’ রাজনীতির কল্যাণে সেই গোষ্ঠিটি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ শক্তির মিত্রে পরিনত হয়েছে। এর আগে ভোটের রাজনীতিতে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী জামায়াতের সাথে বিএনপির জোটবদ্ধতা ও ক্ষমতা ভাগাভাগি তাহলে ‘বাস্তব’ ছিল?

প্রশ্ন উঠতে পারে, এর মধ্য দিয়ে উনসত্তর বয়সী আওয়ামী লীগ কি তার মৌল চরিত্রের পরিবর্তণ ঘটালো? অথবা কথিত প্রগতি ঘেঁষা দল হিসেবে পুরোনো ধারাই তারা বদলে দিচ্ছেন কিনা? ইতিহাসের আলোচনায় না যেয়ে শেখ হাসিনার আমলে সীমাবদ্ধ থাকছি। আওয়ামী লীগ সবসময় দাবি করে, তারা ধার্মিক তবে ধর্মান্ধ নয়।

এটি বিশ্বাস করলেও নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। আওয়ামী লীগ একসময় জামায়াতের সাথে যুগপৎ আন্দোলন করেছে। ১৯৯১ সালে আওয়ামী লীগের রাষ্ট্রপতি প্রার্থী বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী শীর্ষ দালাল গোলাম আযমকে পবিত্র কোরআন শরীফ উপহার দিয়ে দোয়া চেয়েছেন। ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ খেলাফত মজলিসের সাথে চুক্তি করেছিল। যেমনটি এখন হেফাজতের দাবির কাছে সমর্পিত হয়ে তাদের পক্ষে সাফাই-প্রচারেরও দায়িত্বও নিয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ বিরোধিতাকারী দল জামায়াতে ইসলামের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ভাগাভাগি করার কারণে বিএনপিকে আজ হোক কাল হোক, ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। তেমনি আওয়ামী লীগকে দাঁড়াতে হবে কথিত স্বৈরাচার ও অবৈধ ক্ষমতা দখলকারী এরশাদের বিচার না করে জোটবদ্ধ হয়ে ক্ষমতা ভাগাভাগি করার জন্য। হেফাজতের পৃৃষ্ঠপোষকতা প্রথমে বিএনপি করেছে। এখন আওয়ামী লীগ করছে। আবার সুযোগের অপেক্ষায় বিএনপি। হেফাজত এবং এরশাদের জন্য তারাও অপেক্ষা করে আছে।

দুই. এই আবর্তে ধর্মাশ্রিত ছোট-বড় সংগঠনগুলি আদৃত হয়ে উঠছে বড় দলগুলোর কাছে। কারণ একটাই, ভোটের রাজনীতিতে ধর্মকে ব্যবহার, বেশি বেশি ‘ইসলামী’ হয়ে ওঠা। বামদের সাথে আওয়ামী লীগের বন্ধন থাকলেও তাদের ক্ষীণকায় ভোটের ওপর আওয়ামী লীগের আদৌ ভরসা নেই। আপাতত: নাখোশ হলেও লোম-চর্মবিহীন বামদের কিছুই করার নেই। সেজন্যই হেফাজতসহ উগ্র  ডানপন্থীদের দিকে হাত বাড়িয়েছে ক্ষমতাসীনরা। এরশাদকে দিয়ে ধর্মাশ্রিত দলগুলি নিয়ে গঠন করাচ্ছে আরেকটি জোট।

অভ্যন্তরে অনুদার-অগণতান্ত্রিক চর্চা দলগুলিকে সামন্ত আদলের কাঠামোয় রেখে দিয়েছে। দলের প্রধান ব্যক্তিকে সন্তুষ্ট রাখাই মোক্ষ লাভ। আনুগত্য, অবশ্যই প্রশ্নহীন- এই রাজনীতির মূল বৈশিষ্ট্য। প্রধান ব্যক্তি যদি দেশ বা দলের মৌলিকত্ব বিরোধী কোন পদক্ষেপ নেন বা বক্তব্য দেন, তাহলে সেটি গোটা দলে অনুরণিত হতে থাকে। সকলে প্রধান ব্যক্তিকে সন্তুষ্ট করতে দশ ধাপ এগিয়ে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হন। ভিন্নমত থাকলে এবং তা কষ্মিণকালেও প্রকাশ হয়ে পড়লে আর রক্ষা থাকে না।

এই সর্বময় ক্ষমতা ব্যক্তিকে সাধারন থেকে তো দুরে সরিয়ে দেয়, এমনকি দলের কর্মীদের থেকেও। তিনি ঘেরাটোপে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন ক্ষমতার সর্বোচ্চ মহিমায়। এজন্যই ভারত সফর থেকে ফিরে এসে চুক্তিসমূহ প্রকাশের প্রসঙ্গ উঠলে শেখ হাসিনা তার ওপরে ‘বিশ্বাস’ রাখতে বলেন। একই কথা রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সময় তিনি বলেছেন এবং দাবি করেছেন তারচেয়ে বড় দেশপ্রেমিক আর কেউ নেই। এই কথাগুলি অনেকটা নিয়তিবাদীদের মত, গণতান্ত্রিক নেতৃত্বের মত নয়। আমাদের দেশে ক্ষমতাসীনরা সবসময় একই ভাষায় এবং একই ধরনের কথা বলে থাকেন।

প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় রাজনীতি বা দল এখানে সামর্থ্যবান হয়ে ওঠেনি। শেখ মুজিব, জিয়া, এরশাদ, খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনাই এদেশে এখন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের নাম এবং সবশেষ ও একমাত্র কথা। আগামীতে তারেক বিএনপির এবং জয় হবেন আওয়ামী লীগ নেতা। ব্যক্তি, পরিবার, ডাইন্যাষ্টি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের বিকল্প হয়ে উঠেছে। এর ওপর ভর করে দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতা চক্রাকারে ঘুরপাক খাচ্ছে, সেখানে দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্র চর্চা বা ভিন্নমত প্রকাশের অবকাশ কোথায়!

যে কোন উপায় অবলম্বনে নেতৃত্ব, ক্ষমতায় টিকে থাকার ইচ্ছা শাসকশ্রেনীকে সবসময় টাল-মাটাল করে দেয়। সেক্ষেত্রে বিএনপি বা আওয়ামী লীগ-কারো মধ্যে বৈসাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যাবে না। ফলে যে ন্যূনতম আদর্শ ও নৈতিকতার যে চর্চা বিদ্যমান ছিল- তা রাজনীতি থেকে বিদায় নিয়েছে পুরোপুরিভাবে। এই বিদায় দিতে গিয়ে গনতন্ত্রের প্রথম ধাপ জনগনের ভোটকে প্রথমেই নির্বাসিত করা হয়েছে। আবার ঘোষণাও এসেছে ২০১৪ সালের মত নির্বাচন আর হবে না। সেজন্য আরেকটি নীতি বিগর্হিত কাজের সূচনা হয়েছে ধর্মাশ্রিত সংগঠনগুলিকে ক্ষমতার পালাবদলে রাজনীতির মেইনষ্ট্রিমে বা মূলধারায় নিয়ে আসার মধ্য দিয়ে।

হাওরে মহা-বিপর্যয় : ভুল উন্নয়নের নিদারুন খেসারত

হাসনাত কাইয়ুম ::

হাওরে মহাবিপর্যয় নেমে এসেছে। হাওরের ৭ জেলার সাড়ে ৯ লক্ষ হেক্টর জমিতে ৩০ লক্ষ মেট্রিক টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে বোরো ধান চাষ করা হয়েছিল। গত ২৯ মার্চ থেকে শুরু হয়ে আজ পর্যন্ত বহমান ঢলের পানিতে তার ৮০% তলিয়ে গেছে, যার অর্থমূল্য প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। পরিবেশ দুষনে মারা গেছে ২ হাজার মেট্রিক টন মাছ। কাকড়া, ব্যাঙ, কেঁচো কতো পরিমান মারা গেছে বা জীব-অনুজীব কতো নষ্ট হয়েছে- তার পরিমাপ করার উদ্যোগও কেউ নেয়নি। তবে এসবের প্রতিক্রিয়ায় ১০ হাজার হাঁস মারা পড়েছে। হাওরের একমাত্র ফসল বোরো ধানের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল ২৪ লক্ষ পরিবার, তাদের গবাদিপশু আর সন্তান-সন্তুতিরা এক অবর্ণনীয় পরিস্থিতির মাঝে পড়েছে, যার নজীর নিকট অতীতে নেই।

এ বিপর্যয় অংশ প্রাকৃতিক কিন্তু প্রধানত মনুষ্যসৃষ্ট। বিশেষজ্ঞ মতে এর দায় ‘জলবায়ু পরিবর্তন’-এর, সরকারী মতে, বাধঁ কেটে দেওয়া কৃষকদের; আর প্রতিবাদকারীদের মতে, পাউবো, ঠিকাদার আর ক্ষমতাসীনদের সিন্ডিকেটের। আবহাওয়া অধিদপ্তর কিন্তু জানাচ্ছে এ রকম অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত ৩৫ বছর আগেও একবার হয়েছিলো। তখন হাওরের সিংহভাগ ফসল তলিয়ে যাওয়া, ৭টি জেলা একইভাবে আক্রান্ত হওয়া, একে একে ফসল রক্ষার সবগুলো বাধঁ ভেঙে পড়া, তেমন কিছুর কথা কিন্তু কেউ বলছে না।

৩৫ বছর আগে পরের এ পরিবর্তনের অনেকগুলো ডাইমেনশন নিয়ে আলাপ করা যায়; কিন্তু একটা বড়ো ডাইমেনশন হলো নদীর নাব্যতা। নদী তখন ঢলের পানির অধিকাংশটা বয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো গভীর ছিল। গত ৩৫ বছরের ‘উন্নয়ন’ দিয়ে এই গভীরতাটা আমরা ভরাট করেছি এবং আমাদের মস্তিস্কেরও। মন্ত্রী কৃষকদের বাধঁ কেটে দেওয়ার ফিরিস্তির পাশাপাশি বাধেঁর উচ্চতার সমস্যার কথাও তুলেছেন। আমাদের উন্নয়ন দর্শন ‘বাধঁ এবং আরো উচু বাধঁ’-এর মধ্যে যেভাবে আটকা পড়েছে, তা থেকে বের করে ‘কৃষকদের বাধঁ কেটে দেওয়া’ অভিজ্ঞতার কাছে ফেরত আনতে  না পারলে, এবারের দুর্যোগ থেকে হয়তো কোনভাবে বের হতে পারা যাবে। কিন্তু ভবিষ্যতে আরো বড় বড় দুর্যোগে ‘হাওর’ পড়বেই। মন্ত্রীর পক্ষে এই সামান্য বিষয়টা বোঝা সম্ভব হয়নি যে, বাধঁ যতো উচু হবে তার ভেঙে যাওয়ার আশংকাও তার দ্বিগুন মাত্রায় বৃদ্ধি পাবে। বাধঁ ২ ফুট উচু না করে বাধেঁর ভেতরের গভীরতা ৩ ফুট বাড়ালে যে এর চেয়ে ঢের বেশী পানি বয়ে যাবে, আর বাধঁও ঠিকে থাকবে- এটুকু ভাবতে পারার ক্ষমতাও আমরা দুর্ণীতিবাজদের মুনাফার কাছে বিক্রী করে বসে আছি।

হাওর আসলে কতগুলো?

পত্রিকার রিপোর্ট আর সরকারী পরিসংখ্যান দেখে বাংলাদেশে কতো হাওর আছে তা বোঝার কোন উপায় নেই। ব্রিটিশরা খাজনা আদায়ের জন্য মৌজা, পরগনা ইত্যাদির সৃষ্টি করেছিলো। কৃষকরা তেমন নয়, তারা তাদের সন্তানদের মতো, গরু বাছুরের মতো, তাদের ফসলের মাঠেরও নাম রাখে। সরকারী পন্ডিতরা এ দুয়ের পার্থক্য বুঝেই অথবা না বুঝেই বৃটিশ কায়দাতেই হাওরকে ৩৭৪টি বা ৩৭৬টিতে ভাগ করেছে। এইভাবে ভাগ করা গেলে ছোট ছোট বিভক্ত এইসব ইউনিটকে উন্নয়নের নামে হজম করা সহজ হয়। গত ৫০-৬০ বছরে হজমের এ কাজটি সরকারী সংস্থাগুলোর প্রায় সবাই মিলে একযোগে করে গেছে। তাতে ৭ জেলার ৫০-৫৫টি উপজেলা জুড়ে বিস্তৃত ২০ লক্ষ একরের একক বৈশিষ্টমন্ডিত, পৃথিবীর একমাত্র বৃষ্টিজলের ক্ষুদে এবং প্রতিবছর নবায়নযোগ্য যে সমুদ্রটি আমাদের ছিলো, তার প্রাকৃতিক, বাস্তুতান্ত্রিক -এমনকি অর্থনৈতিক মুল্য জাতি হিসাবে বুঝে উঠার মতো সাবালক হয়ে উঠার আগেই আমরা তার মৃত্যু পরোয়ানা জারী করে বসে আছি।

বাংলাদেশে, বলা ভালো পৃথিবীতে হাওর ধারনা একটাই- এটি অখন্ড, অবিভাজ্য। কথিত ৩৭৬ টি হাওরের মাঝে কোন দেয়াল নেই, ছিলো না। হাওর যে একটা অভিন্ন একক স্বত্তা এটার প্রথম রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেখা যায় ‘হাওর মাস্টার প্ল্যান’-এ। এই মাস্টার প্ল্যান যদিও পুর্ববিবৃত উন্নয়ন দর্শন থেকে পৃথক ছিলো না, তবুও এর কিছু ইতিবাচক দিক ছিলো; কিন্তু বর্তমানে এর প্রবক্তারা তাও আর মানছেন না। হাওর মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী, হাওরের ভেতরে ‘ডুবো সড়ক’ নির্মানের স্বীকৃতি থাকলেও হাওরের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ পরিপন্থী কোন ‘আভুরা সড়ক (বর্ষায় ডুবে যাবে না এমন সড়ক)’ নির্মাণের পরিকল্পনার স্থান ছিলো না। কিন্তু যোগাযোগ ব্যবস্থায় পিছিয়ে থাকা হাওর জনপদের জনগনের দ্রুত যোগাযোগের আকাঙ্খাকে পুজি করে, হাওরে এখন যেসব ‘আভুরা সড়ক’ গড়ে তোলা হচ্ছে- তাতে পানি চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় ব্রিজ, কালভার্ট ,আন্ডারপাস ইত্যাদিরও ব্যবস্থা রাখা হচ্ছেনা; পরিবেশগত পর্যালোচনা তো দুরের কথা। এই সব ‘উন্নয়ন’ হাওরকে ছোট ছোট বিল, ডোবা, বাওরে বিভক্ত করে স্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরী করতে যাচ্ছে বলে পরিবেশ সংগঠনসমুহ দীর্ঘদিন যাবত অভিযোগ করে আসছে।

ইউরেনিয়াম বিতর্ক :

ভারতের সাথে বাংলাদেশের যে ৫৪টি আর্ন্তজাতিক নদী রয়েছে- তার প্রায় ১৮-২০টি নদী এ হাওরাঞ্চলের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে মেঘনা ধরে বঙ্গোপসাগরে গেছে। পৃথিবীর সবচাইতে বৃষ্টিপাতময় অঞ্চল চেরাপুঞ্জি টাঙ্গুয়া থেকে মাত্র ৩০-৩৫ মাইল উজানে। মেঘালয়, আসাম, মিজোরামের বৃষ্টির পানির একটি বড় অংশ এই হাওর বেসিনে নেমে এসে জমা হয়। ফলে হাওরাঞ্চলে আগাম বন্যা নতুন বা অপরিচিত কিছু নয়। ২/৩ বছর পরপরই হাওরের কোন না কোন অংশ দিয়ে আগাম ঢলের পানি নেমে আসে, আমাদের বাধঁগুলি ভেঙে ফসল তলিয়ে যায়, মানুষ কিছুদিন ত্রু টিপুর্ণ বাধঁ নির্মাণের জন্য দায়ীদের বিচারের দাবীতে আন্দোলন করে, একসময় ক্লান্ত হয়ে যায়। কিন্তু কোনদিনই কোন দুর্ণীতিবাজের বিচার হয় না। কিন্তু গোটা হাওরের প্রায় সব মাঠ একের পর এক তলিয়ে যায়, এমন ঘটনা ঘটেনা। আগাম ঢলে ধান তলিয়ে গেলেও প্রজনন মৌসুমে নতুন পানির ছোঁয়ায় মাছের বংশবিস্তার ভালো হয়। কিন্তু ঢলের পানিতে মাছ মরে পচে ভেসে উঠে, কাকড়া, কেচোঁ, ব্যঙ মরে যায়- এমন ঘটনা হাওরবাসী আগে কখনো দেখেনি, শুনেওনি।  হাওরে সার, কীটনাশকের ব্যবহার বহু পুরনো, এটি এ বছর এমন নাটকীয় মাত্রায় বাড়ার কোন রিপোর্ট নেই। কিন্তু মাছ টাঙুয়াতেও মরেছে, হাকালুকিতেও মরেছে, অন্যত্রও মরেছে। এটা নজীরবিহীন।

আমাদের সীমান্তের মাত্র তিন মাইল উজানে মেঘালয়ে অবস্থিত ‘রানিকর’ নদীর পানিদুষন নিয়ে স্থানীয়রা আন্দোলন করেছেন এবং সেসব খবর পত্রিকায় এসেছে, কিন্তু যৌথ নদী কমিশন বা অপরাপর কোন প্রতিষ্ঠান এইসব স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে আমাদের বন্ধুুরাষ্ট্রের কাছ থেকে কোন তথ্য জানতে চেয়েছে- এমন কোন খবর কারো জানা নেই। অথচ ‘জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক পানি প্রবাহ কনভেনশন-১৯৯৭’ অনুযায়ী উজানের দেশ ভাটির দেশকে এইসব তথ্য জানাতে বাধ্য। এবং কোন দেশ তার নিজ দেশের পানি প্রবাহের এমন দুষন করতে পারে না- যা তার ভাটির দেশকে  ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। আমাদের এখানে বিতর্ক চলছে পানিতে ইউরেনিয়াম জনিত তেজস্ক্রিয়তা আছে কি নেই- তা নিয়ে। কিন্তু কি কারনে হাওরে এসব নজীরবিহীন দুষন ঘটলো- তা নিয়ে কোন আলোচনা কোন পক্ষই ঠিকমতো তুলছে না এখনো । এইসব দুষন স্থানীয় কোন স্থাপনাজাত নাকি আন্তর্জাতিক পানিপ্রবাহজাত তা নিরুপন করা এবং এর মোকাবেলার পথ-পদ্ধতি বের করতে না পারলে হাওর এবং সংশ্লিষ্ট এলাকা আরো ভয়াবহ বিপর্যয়ের শিকার হবে ।

হাওর কি শুধুই সুনামগঞ্জ?

আমাদের আশংকা হাওরের ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গচিত্র পেতে আমাদের আরো বেশ কিছুদিন অক্ষো করতে হবে। কিন্তু এ পর্যন্ত যতোটুকু চিত্র আমরা পেয়েছি তাতে এটুকু স্পষ্টভাবেই বলা যায়- পরিবেশ বিপর্যয়ের কারনে কোন এলাকায় এতো স্বল্প সময়ের মধ্যে এতো বিশাল ক্ষয়ক্ষতির ঘটনার নজীর সারা পৃথিবীতেই আর একটাও নেই। কিন্তু এ নজীরবিহীন ঘটনা মোকাবেলায় সরকারী-বেসরকারী প্রস্তুতি নিতান্তই অপ্রতুল। এমনকি আমাদের সরকার, বিরোধী দল, এনজিও, সিভিল সোসাইটি, মিডিয়া, সংস্কৃতিকর্মী কোন পক্ষই এখনো ঘটনার গভীরতা এবং ব্যাপকতাকে বিবেচনায় নিয়ে সম্ভাব্য বিপর্যয়কে মোকাবেলার প্রস্তুতি  নেওয়ার কথা ভাবছে না। মিডিয়ার পরিবেশনা থেকে এটা যে কারো মনে হতে পারে হাওর মানেই সুনামগঞ্জ অথবা সুনামগঞ্জই সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ এলাকা। অথচ এর পাশেই নেত্রকোণার খালিয়াজুড়ি। সুনামগঞ্জের বেশ কয়েকদিন আগেই খালিয়াজুড়ির শতভাগ ফসল তলানো শেষ। লড়াই করার নেতৃত্ব মনোবল কোনটাই আর অবশিষ্ট নেই, কবরের নিস্তব্দতা গোটা এলাকা জুড়ে। একই অবস্থা খোদ রাষ্ট্রপতির এলাকা কিশোরগঞ্জে, হবিগঞ্জে, মৌলভীবাজারে। ফলে মিডিয়ার মনোযোগেও নেই তারা।

উপরোল্লিখিত বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়ে হাওরের মহাবিপর্যয়কে ‘জাতীয় দুর্যোগ’ হিসাবে ঘোষনার দাবীতে উদ্বিগ্ন নাগরিকবৃন্দের পক্ষ থেকে যে সব দাবী-দাওয়া তোলা হয়েছিলো সেগুলোতে আর একবার চোখ বুলিয়ে নিতে পারি :

(১) জীবন-জীবিকার জন্য শুধুমাত্র বোরো চাষের উপর নির্ভরশীল এমন ২৪ লক্ষ পরিবারকে খাদ্য সহায়তার নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে (২) হাওরে সবার জন্য রেশনিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে (৩) সরকারী-বেসরকারী সকলপ্রকার ঋণের সুদ মওকুব করতে হবে এবং কিস্তি আদায় স্থগিত করতে হবে (৪) ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপুরণ অথবা বিনাসুদে দীর্ঘমেয়াদী ঋণ দিতে হবে (৫) হাওরে পানিবাহিত রোগের প্রকোপ যাতে দেখা না দেয়, তার জন্য পর্যাপ্ত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে (৬) শিশুদের শিক্ষা থেকে ঝড়ে পড়া রুখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে এবং একইসাথে বয়োজ্যেষ্ঠদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে  (৭) হাওরের সকল জলমহালের লীজ বাতিল করে উন্মুক্ত জলাশয়ে সকলের মাছ ধরার অধিকার দিতে হবে (৮) হাওরের পরিবেশ দুষনের প্রকৃত কারন নির্ণয় করতে হবে (৯) বাধঁ নির্মানে জড়িত দুর্ণীতিগ্রস্তদের শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে, এবং (১০) স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ, প্রাকৃতিক মৎস্যক্ষেত্র সংরক্ষনসহ পরিবেশ অনুকুল উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে হাওরের সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে হবে।

রামপাল প্রকল্পের বিরুদ্ধে এবার সোচ্চার আন্তর্জাতিক সক্রিয়বাদীরা

রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিরুদ্ধে এবার সোচ্চার হয়েছে আন্তর্জাতিক সক্রিয়বাদীরাও (অ্যাক্টিভিস্ট)। ৭০টিরও বেশি আন্তর্জাতিক অধিকারবাদী ও পরিবেশবাদী গ্রুপ সুন্দরবনের কাছে ওই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছে, এই প্রকল্প রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাসভূমিকে ধ্বংস করবে, পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি হবে এবং লাখ লাখ মানুষ জীবিকা হারাবে। ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যের স্থান সুন্দরবনের প্রান্ত ঘেঁষে ১,৩২০ মেগাওয়াটের রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর সামান্য দূরে একটি কিছু ছোট প্লান্টও বসানো হচ্ছে।

মুম্বাই থেকে রয়টার্স পরিবেশিত খবরে বলা হয়, ২০ এপ্রিল ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কমিটির কাছে লেখা সুইডেন, দক্ষিণ আফ্রিকা ও জাপানসহ বিভিন্ন দেশের সক্রিয়বাদী গ্রুপের লেখা এক চিঠিতে বলা হয়, ‘এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, প্রস্তাবিত রামপাল এবং অরিয়ন বিদ্যুৎ প্লান্টগুলো সুন্দরবনের প্রতিবেশের ওপর মারাত্মক ও অপূরণীয় ক্ষতি করবে।’

চিঠিতে আরো বলা হয়, প্রস্তাবিত কয়লা বিদ্যুৎ প্লান্টটি লাখ লাখ মানষের স্বাস্থ্য ও জীবিকা হুমকিগ্রস্ত করবে। লবণ-সহিষ্ণু সুন্দরবনে থাকা ছোট ছোট দ্বীপে নানা প্রজাতির পাখি ও প্রাণী বাস করে। আর আছে বিশ্ববিখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগার।

রামপাল প্রকল্পটি প্রায় পাঁচ লাখ মানষের জীবিকা সরাসরি নষ্ট করতে পারে। এদের মধ্যে আছে জেলে, কৃষক ও বনজীবী। এছাড়া বন ধ্বংস হলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে আরো লাখ লাখ মানুষ অরক্ষিত হয়ে পড়বে বলে মনে করছে স্থানীয় তেল, গ্যাস খনিজসম্পদ, বিদ্যুৎ ও বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি।

ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে সরকার ২০২২ সালের মধ্যে ২৫টি কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা করেছে। এর বিরুদ্ধে আয়োজিত প্রতিবাদ অনেক স্থানে সহিংসতায় রূপ নেয়। চলতি বছরের প্রথম দিকে চীন-সমর্থিত ২শ ৪ কোটি ডলারের একটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করার সময় একজন নিহত এবং প্রায় এক ডজন মানুষ আহত হন। গত বছর প্লান্টটির বিরুদ্ধে বিক্ষোভের সময় পুলিশের গুলিতে অন্তত চারজন নিহত হন।

চলতি বছরের প্রথম দিকে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে সাবেক মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোরের সমালোচনার জবাবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, বাংলাদেশের অতি জরুরি প্রয়োজন বিদ্যুতের, আর প্রস্তাবিত প্লান্টটি সুন্দরবন থেকে অনেক দূরে।

পরিবেশবাদীরা বলছেন, প্রকৃতি এবং জনসাধারণের জীবিকায় জীবাস্ম-জ্বালানিভিত্তিক প্লান্টের ঝুঁকি এখনো পরিমাপ করা হয়নি।

ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কমিটির কাছে লেখা চিঠিতে আরো বলা হয়েছে, এসব প্রকল্পের কারণে নারীরা বেশি ঝুঁকিতে থাকে। কারণ উচ্ছেদের ফলে জেন্ডার বা নারী-পুরুষের সহিংসতা বেড়ে যায়। এতে করে নারীরা পাচার ও পতিতাবৃত্তিতে জড়িত হওয়ার শঙ্কায় থাকে।

বাংলা-ভারত সম্পর্ক : নতুন সমীকরণে বড় ফ্যাক্টর চীন

গর্গা চ্যাটার্জি, ফার্স্টপোস্ট ডটকম, ভারত

অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শুক্রবার চার দিনের সফরে ভারত সফর শুরু করতে নয়াদিল্লিতে অবতরণ করেন। বাংলাদেশ এবং চীনের মধ্যকার গভীর হতে থাকা সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে এই সফরটি হলো।

এসব সম্পর্ক বহু খাত-সম্পর্কিত এবং অবকাঠামো উন্নয়ন থেকে শুরু করে প্রতিরক্ষা ক্রয়সহ বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তৃত। দুটি সার্বভৌম সরকারের মধ্যকার সব সম্পর্ক পারস্পরিক স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট এবং চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কও ভিন্ন নয়; আর এমনটাই হওয়া উচিত। ভারতের অন্তরাল শক্তির (ডিপ স্টেট) কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গিতে বাংলাদেশ হলো তার ভূ-কৌশলগত প্রভাব-মন্ডলের অংশবিশেষ। ভারত চাইলে যেকোনো মতবাদ গ্রহণ করতে পারে, তবে বাস্তবে এর অর্থ কী, সেটাই বিবেচ্য বিষয়। বাংলাদেশের ভেতরে থাকা নির্দিষ্ট কিছু লবি যা-ই তুলে ধরতে চাক না কেন, বাংলাদেশ কিন্তু সিকিম বা এমনকি ভুটানও নয়। অবশ্য বিশাল কোনো প্রতিবেশীর সাথে কাজ করার সময় হুঁশিয়ার থাকা ভালো, যখন ওই দেশটির সাথে বাংলাদেশের বিপুল বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে।

এই সময়ে এবং পরিস্থিতিতে যেটা বিবেচ্য বিষয়, তা কিন্তু ১৯ শতকের ইউরোপিয়ান জাতিরাষ্ট্রের মডেলের নিরঙ্কুশ রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব নয়। বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় একীভূত হওয়ার এই সময়টাতে কোনো সত্তাই নিরঙ্কুশ সার্বভৌম নয়। যেটা বিবেচ্য বিষয় তা হলো- পুঁজি, পণ্য ও মানব-প্রবাহ ওই ভূখন্ড দিয়ে আসা-যাওয়ার ওপর তার কতটুকু নিয়ন্ত্রণ আছে এবং সেইসাথে যে দেশটির কাছে অর্থনৈতিকভাবে ঋণগ্রস্ত, সে তার নীতি প্রণয়নে কতটা প্রভাব বিস্তার করে। অর্থাৎ সার্বভৌমত্ব একটি ধারণা, যা দাঁড়িপাল্লার বিপরীত অংশ দুটির মতো উঠা-নামা করে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার মতো কোনো কোনো রাজ্য পানামার মতো জাতিসংঘের কোনো কোনো সদস্যভুক্ত দেশের চেয়ে অনেক ব্যাপারে অনেক বেশি সার্বভৌম।

অর্থাৎ সার্বভৌমত্বের মৌলিক পরিমাপ নির্ভর করে কোনো সত্তা তার প্রয়োজন পূরণ করার জন্য বাহিরের ওপর কতটা নির্ভরশীল তার ওপর। বিষয়টা একটি ইস্যু দিয়ে বোঝানো যায় : কোনো দেশ তার চাহিদা পূরণের জন্য বাইরের পুঁজির ওপর কতটা নির্ভরশীল? ঋণকৃত পুঁজির বিচক্ষণ প্রয়োগের মাধ্যমে সামর্থ্য-সৃষ্টি তার ঋণ গ্রহণের ফলে ত্যাগ করা সার্বভৌমত্ব কতটা পুষিয়ে দিচ্ছে? এটা একটা প্রচ্ছন্ন খেলা। ঋণদাতার ইচ্ছায় ঋণ গ্রহণ করা হোক, কিংবা নিজের ইচ্ছায় ঋণ নেওয়া হোক, যেটাই ঘটুক না কেন, ঋণবিষয়ক যেকোনো পরিস্থিতিতে সবসময়ই এটা মূল্যায়ন করতে হবে। এ ধরনের লেনদেনে উইন-উইন পরিস্থিতিতে পৌঁছানো জটিল একটি কাজ। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিঙের সাম্প্রতিক ঢাকা সফরকালে অনুকূল বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপনের সময় চীনা উদ্যোগটি এর একটি ভালো উদাহরণ।

অনেক লম্বা চীনা পকেটের সাথে ভারত অনেক অনেক পিছিয়ে। বেইজিং যে জিনিসটি ঢাকাকে দিতে পারে না, সেটা পর্যন্ত ঢাকাকে দিতে পারেনি দিল্লিও। সেটা হলো ইন্দো-বাংলাদেশ সীমান্তজুড়ে পশ্চিমবঙ্গ থেকে পূর্ববঙ্গে প্রবাহিত তিস্তা নদীর পানিবণ্টন নিয়ে একটি ব্যাপকভিত্তিক চুক্তি। এই বিষয়টি নিয়ে কলকাতার সাথে কাজ করতে হয়েছে দিল্লির। ঢাকার সাথে চুক্তি করার আগে দিল্লিকে প্রথমে কলকাতার সাথে চুক্তি করতে হবে। তিস্তা চুক্তির ফলে ক্ষতির মুখে পড়া পশ্চিমবঙ্গকে পুষিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা হবে এটা। এখন পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গকে এ ধরনের কোনো ক্ষতিপূরণ করার কোনো প্রতিশ্রুতি দিল্লি দেয়নি। ফলে কিছু সময়ের জন্য হলেও কোনো চুক্তি হয়নি। এতে করে ‘সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের’ মতো গৎবাঁধা অবস্থানে ফিরে গেছে দিল্লি। আন্তর্জাতিক সম্পর্কে বাস্তবে কঠোর মানসিকতার কোনোই স্থান নেই।

‘সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের’ এ ধরনের উল্লেখ যখন ভারত  বর্তমানে ক্ষমতাসীন কেন্দ্রীয় সরকার করে, তখন তা এমনটি আরো বেশি সংশয়পূর্ণ হয়ে পড়ে। ক্ষমতাসীন দলটি বারবার জোরালোভাবে ‘অবৈধ বাংলাদেশী’ পরিভাষা ব্যবহার করে যখন নিজের অনুকূলে কাজে লাগানোর জন্য ঐক্যবদ্ধ ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠবাদের ভোট ব্যাংক সৃষ্টি করে, যেমনটা ভারতের অন্য কোনো সর্বভারতীয় দল কখনো করেনি; আর তখন সংশয়ে না পড়ে থাকা যায় না। যখন কেউ সংকীর্ণ অভ্যন্তরীণ উদ্দেশ্যে কারো কাছে দানব হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করে এবং স্বার্থসিদ্ধির জন্য ওই একই ব্যক্তির প্রতি বিপুল সংবর্ধনার আয়োজন করে, তখন এর সাথে সংশ্লিষ্ট সবার জন্যই বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় এই ধারণায় যে, কারো মন থেকে লজ্জার অনুভূতিটি নির্মূল হয়ে যায়নি।

বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জন্য বেইজিং থেকে দুটি সাবমেরিন কেনায় দিল্লি উদ্বিগ্ন। বাংলাদেশের প্রথম সাবমেরিনও এ দুটি। দিল্লি এতে তার ‘আঙিনায়’ বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান প্রভাব দেখতে পাচ্ছে। কিন্তু ‘আঙিনা’ কল্পনা করা যায় বটে, কিন্ত্তু এর মাধ্যমে বাংলাদেশ যে একটি সার্বভৌম দেশ সেই সত্যটি বাতিল করা যায় না। দেশটির মিয়ানমার ও ভারতের সাথে বিরোধমুক্ত সমুদ্রসীমা রয়েছে। ফলে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক অবয়বে বাংলার স্ব-সার্বভৌমত্বের অনেক বড় বিষয় হলো- বঙ্গোপসাগরের ব্যাপারে তার ন্যায়সঙ্গত অংশ বুঝে নেওয়া।

নিজের ন্যায়সঙ্গত অংশ দাবি করার মধ্যে কোনো বিরোধ থাকতে পারে না। কেউ কারো ন্যায়সঙ্গত অধিকারকে যখন অস্বীকার করে, তখন সে সেটা করতে পারে তার পেশীশক্তি প্রদর্শনের জন্য। ঢাকা ও বেইজিংয়ের সম্পর্ক গভীরতর হওয়ার অর্থ হলো, এই শক্তি প্রদর্শন ভারতের পক্ষে সম্ভব নয়। একটা পর্যায় পর্যন্ত বর্তমান গভীরতার ঢাকা-বেইজিং সম্পর্ক ছাড়াই তা হতে পারে। ফলে দিল্লির পক্ষে যেভাবে পারা সম্ভব সেভাবেই ঢাকার সাথে সম্পর্ক সৃষ্টির চেষ্টা করছে, অন্যদিকে বেইজিং নামে পরিচিত নতুন বন্ধুর কাছ থেকে ঢাকাকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য প্রচ্ছন্নভাবে চেষ্টা করছে।

বাস্তবতা হলো চীন, বাংলাদেশ ও নেপাল এখন যৌথ সামরিক মহড়ার কথা ভাবছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার এই অংশ যে বদলে গেছে, সেটাই তুলে ধরছে। দৃঢ়প্রত্যয় তবে উচ্চ ভাবাদর্শকেন্দ্রিক পরোক্ষ-আগ্রাসী একমুখী সময় অতিক্রম করে আমরা এখন নিরাপত্তাহীনতা ও ঈর্ষার বহুমাত্রিক প্রবাহের পাশাপাশি নানামাত্রিক সময়ে প্রবেশ করছি। বাস্তবতার ধারে কাছেও নেই এমন যে কোনো সম্পর্কের সাথে বিভ্রম-ভিত্তিক সম্পর্কের সাথে কেবল ভালোভাবেই তুলনা করা চলে। এটা শৈশব থেকে কৈশোরে পৌঁছার চিহ্নটি ধারণ করে।

ভোটের রাজনীতি : হেফাজতের কাছে আত্মসমর্পণ

হায়দার আকবর খান রনো ::

২০১৩ সালে শাহবাগ চত্বরে যখন গণজাগরণ মঞ্চে হাজার হাজার এমনকি লক্ষাধিক মানুষের জমায়েত হচ্ছিল, তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেটাকে ভালো চোখে দেখেননি। তিনি বেশ অস্বস্তির মধ্যে পড়েছিলেন। অন্যদিকে জামায়াতের সঙ্গী বিএনপি প্রথম থেকেই এর বিরুদ্ধে ছিল। খালেদা জিয়া গণজাগরণ মঞ্চকে ‘নাস্তিকদের’ সমাবেশ পর্যন্ত বলেছিলেন।

গণজাগরণ মঞ্চের পাল্টা সমাবেশের আয়োজন করে হেফাজতে ইসলাম। ২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর মতিঝিল এলাকায় তারা লক্ষাধিক মাদ্রাসার ছাত্র ও অন্যান্যদের জমায়েত করেছিলেন সারাদেশ থেকে। সেদিন তারা মতিঝিল, পল্টন এলাকায় তাণ্ডব সৃষ্টি করেছিল। অনেকে ইসলামী বিপ্লবের স্বপ্ন দেখেছিলেন। বেগম খালেদা জিয়া হেফাজতে ইসলামের এই সকল কাজে উৎসাহ যুগিয়েছিলেন। ভেবেছিলেন, হয়তো বা সরকার পরিবর্তন হবে। কিন্তু তা হয়নি। গভীর রাতে শেখ হাসিনার সরকার পুলিশি এ্যাকশন চালিয়ে ছত্রভঙ্গ করে দেয় হেফাজতের সমাবেশকে। একই সঙ্গে স্বপ্নভঙ্গ ঘটলো ইসলামী বিপ্লবের।

এরপর পাশার দান পাল্টে গেল। হেফাজতের সঙ্গে গোপন সমঝোতা হলো আওয়ামী লীগ সরকারের। দুটি প্রধান রাজনৈতিক দল সঙ্গী করলো দুটি ধর্মান্ধ মৌলবাদী সংগঠনকে। খালেদা জিয়ার জোট সঙ্গী জামায়াত। অন্যদিকে অবিশ্বাস্য মনে হলেও হেফাজত হয়ে উঠলো শেখ হাসিনার সরকারের সহযোগী।

এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। কারণ ইতোপূর্বেও দেখেছি, দুটি প্রধান রাজনৈতিক দল ও তাদের নেতৃত্বের কাছে আদর্শ বলে কোন বস্তু নেই। ভোটের রাজনীতির সুবিধার্থে তারা যেকোনো স্তরে নামতে পারেন।

খালেদা জিয়া জামায়াতকে জোট সঙ্গী করেছেন স্রেফ ভোটের রাজনীতির হিসেব থেকে। অন্যদিকে শেখ হাসিনা একদিকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে জামায়াত নেতাদের মৃত্যুদন্ডাদেশ কার্যকর করেছেন, অপরদিকে হেফাজতের কাছে আত্মসমর্পণ করে অসাম্প্রদায়িকতা, ধর্মনিরপেক্ষতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। ২০০৬ সালে একই রকম ভোটের হিসেব-নিকেশ থেকে আওয়ামী লীগ ‘খেলাফত’-এর সঙ্গে পাচ দফা চুক্তি করেছিল, যা ছিল চরম প্রতিক্রিয়াশীল।

প্রায় একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে চলেছে। মাদ্রাসা ছাত্র ও মাদ্রাসা সংশ্লিষ্টদের ভোট পাবেন এই আশায় শেখ হাসিনা হেফাজতের ঘোর সাম্প্রদায়িক ও প্রতিক্রিয়াশীল দাবিগুলো মেনে নিয়েছেন এবং নিচ্ছেন। হেফাজতের দাবি অনুসারে ইতোপূর্বেই পাঠপুস্তক থেকে হিন্দু লেখকদের রচনা বাদ দেয়া হয়েছে। নাস্তিক অভিযোগে কোনো কোনো মুসলমান কবির উৎকৃষ্ট রচনাও বাদ দেয়া হয়েছিল। হেফাজতকে তুষ্ট করার এটা গেল প্রথম ধাপ।

পরবর্তী ধাপে আমরা দেখছি, প্রধানমন্ত্রী শর্তহীনভাবে কওমী মাদ্রাসার সর্বোচ্চ ডিগ্রিকে এম,এ’র সমমর্যাদা দান করার (যেখানে পঞ্চম শ্রেণীর ঊর্ধ্বে বাংলা, ইংরেজী পর্যন্ত পড়ানো হয় না) এবং সুপ্রীম কোর্টের সামনের স্থাপত্যকে সরিয়ে ফেলার অঙ্গীকার করেছেন। এ বড় ভয়ংকর ইঙ্গিত। পহেলা বৈশাখ নিয়ে হেফাজত প্রমুখ এখনো বিতর্ক তৈরি করে চলেছে। চট্টগ্রামে দেওয়ালের আলপনা মবিল দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন আওয়ামী ওলামা লীগ বাংলা নববর্ষ পালনকে ইসলাম সম্মত নয় বলে ঘোষণা করেছে। এক কথায়, বাঙালী কৃষ্টি, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য সব কিছুকেই বাতিল করতে হবে ঘোর প্রতিক্রিয়াশীল, সাম্প্রদায়িক ও নারী বিদ্বেষী হেফাজতের সন্তুষ্টির জন্য। সুস্থ সংস্কৃতিক চর্চা ও গণতান্ত্রিক চেতনাও আজ হুমকির সম্মুখীন। ভোটের রাজনীতির জন্য কি এতোটা নিচে নামতে হবে?

হেফাজতের সাথে কোনো ধরনের আপোষ ভুল পদক্ষেপ : মেনন

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন ::

সুপ্রীম কোর্টের সামনের ভাস্কর্য ভেঙ্গে ফেলার হেফাজতের দাবির সাথে সহমত পোষণ করা, কওমী মাদ্রাসাকে শর্তহীনভাবে স্বীকৃতি দেয়া ও পহেলা বৈশাখকেন্দ্রীক ঘটনাবলী এবং এর আগে পাঠ্যপুস্তক সংশোধনসহ বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে- যা ধর্ম নিয়ে রাজনীতির অপর নাম হিসেবেই বিবেচনা করা বাঞ্ছনীয়। ধর্ম নিয়ে রাজনীতি, ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতি এবং এই শক্তির সাথে আপোষ যারা করছেন ‘নিছক ভোটের রাজনৈতিক কূটকৌশল হিসেবে’ – তারা সুস্থ উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক ধারার রাজনীতির বিপক্ষের শক্তি।

হেফাজতে ইসলামের সাথে আপোষ এবং তাদের দাবিসমূহ মেনে নেয়া প্রশ্নে মন্ত্রী এবং ১৪ দলের অন্যতম শরীক ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন আমাদের বুধবার-কে দেয়া তার প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, ‘ধর্ম নিয়ে জঙ্গীবাদী গোষ্ঠী গোপনে যা করছে, হেফাজতে ইসলাম ধর্ম নিয়ে প্রকাশ্যে সে কাজগুলোই করে যাচ্ছে। হেফাজত ধর্ম নিয়ে টানাটানির বিষয়কে নিজেদের বলয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখে না, তারা এটাকে একটি রাজনৈতিক রূপ দেয়ার চেষ্টা করে। আমি মনে করি- এই রাজনীতির বিরুদ্ধেই আমাদের লড়াই ছিল এবং এখনো আছে। অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের যাত্রাকে যদি নিবিঘ্ন করতে হয়, তবে হেফাজতের সাথে কোনো দলের আপোষ অথবা তাদের দাবি মানার ফলাফল কখনোই ভালো হবে না; বরঞ্চ এতে হিতে বিপরীত হবে।

আমাদের বুধবার : তাহলে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ যে কাজটি করছে, তাকে ১৪ দলের একটি শরীক দল হিসেবে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করছেন?

রাশেদ খান মেনন : হেফাজতের সাথে কোনো ধরনের আপোষের ব্যাপারটি ভুল পদক্ষেপ বলেই আমার ব্যক্তিগত অভিমত।

আমাদের বুধবার : তাহলে আওয়ামী লীগ কী ভুল পদক্ষেপ নিচ্ছে?

রাশেদ খান মেনন : তা বলার প্রয়োজন নেই। তবে এ কাজটি যেমন করা হচ্ছে, তেমনি ধর্ম নিয়ে যে বাড়াবাড়ি হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী সেকথাও বলছেন। এটা নিয়ে একটি কনফিউশন বা ধুম্রজালের সৃষ্টি হয়েছে, দ্বন্দ্ব দেখা দিচ্ছে। আমার ধারণা এই ধরনের কনফিউশন বা দ্বন্দ্ব থাকা উচিত নয়।

আমাদের বুধবার : এটি রাজনীতির জন্য কতোটা ক্ষতিকর ?

রাশেদ খান মেনন : এটি রাজনীতির জন্য নিঃসন্দেহে ক্ষতিকর। এটি আমাদের গণতান্ত্রিক শক্তির স্পেসকে কমিয়ে দেবে এবং সংকুচিত করবে। অন্যদিকে, মৌলবাদী, ধর্মান্ধদের স্পেসকে বাড়িয়ে দেবে এবং তারা অনেক বেশি সাহসী হবে। আর এরপরে যেসব দাবি নিয়ে তারা আসবে অর্থাৎ সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ভেঙ্গে ফেলা, সংবিধানের মূলনীতি পরিবর্তন করা, জাতীয় পতাকা, জাতীয় সঙ্গীত বাদ দেয়াসহ বিভিন্ন প্রশ্ন উঠে আসবে।

আমাদের বুধবার : ১৪ দলে বিষয়টি উত্থাপন করবেন কিনা ?

রাশেদ খান মেনন : নিশ্চয়ই। যখন আলোচনা হবে, তখন অবশ্যই উত্থাপিত হবে।

আমাদের বুধবার : আপনাকে ধন্যবাদ।

বরখাস্তের ‘মচ্ছব’ : আগামী নির্বাচনের কী ‘বার্তা’ পেয়েছে সরকার

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

ব্যবধান মাত্র পাঁচ দিনের। এর মধ্যে স্থানীয় সরকারের আটজন জনপ্রতিনিধি বরখাস্ত। উচ্চ আদালতের আদেশ পেয়ে পুণর্বহাল হয়ে দায়িত্ব নিতে না নিতেই সরকার বরখাস্ত করছে সিটি মেয়র, উপজেলা চেয়ারম্যান-ভাইস চেয়ারম্যান অথবা ইউনিয়ন পরিষদের প্রতিনিধি। অভিযোগ একটিই, তারা কোন কোন মামলার আসামী এবং চার্জশীটভুক্ত। হাইকোর্ট অবশ্য ইতিমধ্যেই রাজশাহী, সিলেট সিটি মেয়র ও হবিগঞ্জের পৌর মেয়রের বরখাস্ত আদেশ স্থগিত করেছেন।

কুমিল্লা সিটির নবনির্বাচিত মেয়র মনিরুল হকের বিরুদ্ধেও আছে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ। ধরে নেয়া যায়, তার ভাগ্যেও সহসাই জুটতে পারে অমন বরখাস্তের আদেশ; হতে পারে গদিতে বসার সাথে সাথে। কারন মামলার ব্যাপারে বর্তমান ক্ষমতাসীনরা একরকম শৈল্পিক দক্ষতা অর্জন করেছেন। এতটাই যে, সত্য ঘটনায় অনেক সময় মামলা বা অভিযোগ নেয়া হয় না। কিন্তু ঘটনা তৈরী করে মামলা বা অভিযোগ দায়ের করার বিষয়ে তাদের সক্ষমতা ঈর্ষণীয়। যদি কখনও এদের বিরোধী পক্ষ ক্ষমতাসীন হয় তখন দেখা যাবে- এই বিষয়টিই শতগুন বুমেরাং হচ্ছে তাদের জন্য।

হত্যার অভিযোগে চার্জশীটভুক্ত আসামী হয়েও ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্য পদ টিকে থাকে। দু’জন মন্ত্রী সর্বোচ্চ আদালতে শপথ ভঙ্গের দায়ে অভিযুক্ত এবং দন্ডিত। কিন্তু এক যাত্রায় ভিন্ন ফল হিসেবে বরখাস্তের ‘মচ্ছব’ চলছে স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের। গত সাড়ে তিন বছরে মোটে ৩৮১ জন এরকম বরখাস্তের খাঁড়ার মধ্যে পড়েছেন। জাতীয় দৈনিকের রিপোর্ট অনুযায়ী বরখাস্ত আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন শতাধিক জনপ্রতিনিধি (সূত্রঃ দৈনিক যুগান্তর ৪ এপ্রিল; মানবজমিন ৭ এপ্রিল)।

২০১৩ সালে পাঁচ সিটি কর্পোরেশনে নির্বাচিতদের মধ্যে গদিতে আছেন দু’জন। বরিশালের মেয়র এখনও বরখাস্ত হননি, কোন তরিকায় টিকে আছেন, জানা নেই। ফৌজদারি অভিযোগে অভিযুক্ত খুলনার মেয়র সম্প্রতি ফিরেছেন উচ্চ আদালতের নির্দেশে। কিন্তু বরখাস্ত ‘মেলোড্রামা’র আরো নাটকীয়তা অপেক্ষা করছিল। রাজশাহী ও সিলেটের বরখাস্তবকৃত দুই মেয়র উচ্চ আদালতের নির্দেশে ফিরে এসেছিলেন, কিন্তু গদিতে ছিলেন যথাক্রমে আট মিনিট ও দুই ঘন্টা। অত:পর করিৎকর্মা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বরখাস্ত আদেশ নিয়ে ফিরেছেন বাসায়। উচ্চ আদালতের শরনাপন্ন হতে হয় তাদের, স্বপদে ফিরে আসতে।

বরখাস্তকৃত দু’চারজন বাদ দিলে প্রায় সকলেই সরকার বিরোধী, বিশেষ করে বিএনপির রাজনীতির সাথে যুক্ত। রাজনৈতিকভাবে ঘায়েল করার জন্য এই পথ বেছে নেয়া হয়েছে। এরফলে স্থানীয় পর্যায়ে কাঠামোগুলো অকার্যকর হয়ে দলীয় প্রতিষ্ঠানে পরিনত হচ্ছে। এক্ষেত্রে আইন সকলের জন্য সমভাবে প্রযোজ্য হলে প্রশ্ন উঠতো না। সরকারী দলের নির্বাচিত প্রতিনিধি হলে একরকম বিরোধী দলের হলে আরেক রকম- এই অবস্থায় ভরসা হয়ে উঠছে সর্বোচ্চ আদালত।

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিকের মতে; “আইনের ধারাগুলো সরকার খড়গ হিসেবে ব্যবহার করছে। এটি হাতে থাকলে যে কোন গণপ্রতিনিধি সারাক্ষণ ভীত-সন্ত্রস্ত এবং সরকারী নিয়ন্ত্রনে থাকতে বাধ্য থাকেন। এ ধরনের আইনের সুযোগে রাজনৈতিক সরকারগুলো সামরিক শাসকদের মত স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নিয়ন্ত্রন করছে”। তাহলে বিষয়টি দাঁড়াচ্ছে- সরকারই মামলা করছে, তদন্ত করছে, চার্জশীট দিচ্ছে, সবশেষে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় বরখাস্ত আদেশ পাঠিয়ে দিচ্ছে।

এভাবে ঢালাও বরখাস্ত যে একধরনের রাজনৈতিক অপকৌশল এবং অসহিষ্ণুতার স্থূল প্রকাশ বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। গণমাধ্যমকে তিনি বলেছেন, যদিও বিষয়টিকে আইনী খোলসের মধ্যে উপস্থাপন করা হচ্ছে, কিন্তু সিদ্ধান্তটি যে রাজনৈতিক কৌশলের অংশ তা সকলে বুঝতে পারছে। এসব সিদ্ধান্ত বিকেন্দ্রীকরন বা স্থানীয় পর্যায়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় হুমকি।

ফিরে যাই ২০১৩ সালের পাঁচ সিটি নির্বাচনের দিকে। তখনও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে মার্কা লাগেনি। নির্বাচন কমিশনও নতুন। ঐ সিটি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল সমর্থিত প্রার্থীদের একরকম ভরাডুবি ঘটেছিল। এমনকি এ্যাডভোকেট আজামত উল্লাহ’র মত ইমেজের প্রার্থী হেরে গিয়েছিলেন বিএনপি’র বিতর্কিত ইমেজের প্রার্থী অধ্যাপক আব্দুল মান্নানের কাছে।

সে সময়ে একটি অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার খেদোক্তি ছিল, অনেকটা স্বগতোক্তির মত; …“এত উন্নয়ন করার পরেও আমাদের সৎ প্রার্থীরা হেরে গেল, বিপরীতে দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসীরা নির্বাচিত হলো। তাহলে উন্নয়ন করে কি লাভ, কাদের জন্য উন্নয়ন …..”। মনে হচ্ছিলো প্রধানমন্ত্রী নিজেকেই প্রশ্ন করছিলেন! নাকি দলীয় লোকজন, নাকি জনগনকে?

অবশ্য জনগনকে প্রশ্ন করে লাভ নেই। কারন কর্তৃত্ববাদী শাসনের অধীনে জনগনের মতামত প্রদানের একমাত্র মাধ্যম  ভোট। সেখানে সুযোগ পেলেই ভোটাররা তাদের সকল ক্ষোভ-ঘৃণা উগরে দেয় ভোটের মাধ্যমে। তাদের এই মতামত যে খুব ইতিবাচক এটি বলার সুযোগ কম। কারন তারা ভোট দেয় দুঃশাসনের বিরুদ্ধে; বাছ-বিচার করে না। এই জনগনই তো ঝাঁকের কৈয়ের মত ঝাঁক বেঁধে ২০০৮ সালে সংসদে তিন-চতুর্থাংশ আসনে শেখ হাসিনা ও তার দলকে জিতিয়ে ছিল। সেটি ছিল ২০০১ সালের পূণরাবৃত্তি!

২০১৩-র পাঁচ সিটি নির্বাচনে শেখ হাসিনা ‘বার্তা’ পেয়ে গিয়েছিলেন। এটি এখন পরিস্কার যে, সে সময়েই চূড়ান্ত হয়েছিল যে, বিএনপিকে নির্বাচনে আসতে দেয়া যাবে না। ক্ষমতার রাজনীতিতে নব্বইয়ের পরে প্রথম মেয়াদে সাফল্যের ধারাবাহিকতা বিএনপি ধরে রাখতে পারেনি, দ্বিতীয় মেয়াদের ব্যর্থতা অনুসরন করছে তাদের বিরোধী ভূমিকার রাজনীতিতে। ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি শেষ মুহুর্তে অংশ নেয়ার ঘোষণা দিলে কি হতো সে বিশ্লেষণ বিএনপি আজতক করতে সক্ষম হয়নি।

পাঁচ বছর গড়িয়ে কুমিল্লা সিটি নির্বাচন। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এখন দলীয় মার্কা লেগেছে। কুমিল্লার লড়াইটি ছিল দলীয় প্রতীকে, নৌকা বনাম ধানের শীষ। বিএনপির জন্য এই নির্বাচন ছিল ‘এসিড টেষ্ট’। দলটির রাজনীতি নেই, কর্মসূচি নেই, মামলা-হামলায় বিপর্যস্ত, কিন্তু দলের ভোট আছে। দলীয় ভোট বা মার্কার ভোটের চেয়েও আওয়ামী লীগের বিপক্ষে নেতিবাচক ভোট। যেটি মূলত: গত কয়েক দশক ধরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নির্বাচনের বিজয়ের নির্ধারক।

প্রশ্ন উঠতে পারে নারায়নগঞ্জে ক্ষমতাসীনরা জিতলো কিভাবে? উত্তর হচ্ছে, সেখানে সরকারী দল বলতে ভোটাররা বোঝে একটি বিশেষ পরিবারকে। আইভি সেখানে আসলে ‘বিরোধী দল’ হিসেবেই বিবেচিত। সেজন্যই আইভি’র জয় ছিল আগের ধারাবাহিকতা এবং নারায়নগঞ্জে গডফাদার ও অর্গানাইজড ক্রাইমের বিপরীতে সাহসিকতা এবং ব্যক্তি ইমেজের ফলাফল। আইভি অকপট আচরন এবং সোজাসাপ্টা বক্তব্য তাকে গ্রহনযোগ্য করে তুলেছে। ক্ষমতাসীন দলের সাথে যুক্ততা থাকলেও তিনি জনগনের নেতা হয়ে উঠেছেন একেবারেই নিজস্ব ক্যারিশমায়।

পাঁচ বছর আগেও নির্বাচন কমিশন ছিল সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত। সেবারও একটি ‘সার্চ কমিটি’ খুঁজে নিয়েছিল ‘রকিব ধরনের নির্বাচন কমিশন’। সে সময় সিটি নির্বাচনের আগে তাদের তেমন কোন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়নি। এবারেও সার্চ কমিটির সুপারিশে প্রেসিডেন্ট বর্তমান কমিশন নিয়োগ দিয়েছেন এবং কুমিল্লা সিটি নির্বাচনে তাদেরও কোন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়নি। দায়িত্ব নেয়ার পরে প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে তারা সফল হয়েছেন, কারন সরকার তাদের সফল হতে এক রকম বাধ্য করেছে।

নতুন নির্বাচন কমিশন খুবই আনন্দিতও উৎপফুল্ল! যেন সাফল্যের এভারেষ্টে চড়তে যাচ্ছেন। সিইসি তো বলেই ফেলেছেন, ‘গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে’। কিন্তু এখনও তাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ, এই কমিশনকে জাতীয় নির্বাচন করতে হবে। ২০১৩ সালের সিটি নির্বাচনের পরে ‘রকিব কমিশনকে’ নিরপেক্ষ মনে হয়েছিল-যা শেষ পর্যন্ত টেকেনি অনিবার্যভাবেই। ঐ কমিশন ইতিহাস হয়ে গেছে ৫ জানুয়ারির ভোটারবিহীন নির্বাচন এবং পরবর্তীকালের রক্তাক্ত ও চর দখলের স্থানীয় নির্বাচন সম্পন্ন করে। তবে বিদায় নিয়েছেন নারায়নগঞ্জ সিটি নির্বাচনের কথিত ‘সুখস্মৃতি’ সাথে নিয়ে।

এখন অনেককিছুই খুব স্বাভাবিক বলে মনে হচ্ছে। কুমিল্লা সিটি নির্বাচনের আগে টান টান উত্তেজনা। নির্বাচনের পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক। দিনভর অভিযোগ করে আসা বিএনপি প্রার্থী জয় পেয়েছেন। হারার জন্য ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী এবং কেন্দ্রীয় সাধারন সম্পাদক দলীয় কোন্দলকে দায়ী করে বলেছেন, সরকারের জয় হয়েছে। সব মিলিয়ে কেমন চমৎকার গণতান্ত্রিক সুবাতাস! এমনই সুবাতাস ২০১৩ সালে সিটি নির্বাচনের পরেও পাওয়া যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, ভোটের গণতন্ত্রটা বুঝি ফিরে এলো!

কুমিল্লা সিটি নির্বাচনের পরে গণমাধ্যম পোষ্টমর্টেম করেছে এভাবে যে, নির্বাচনের ফলাফল ক্ষমতাসীনদের জন্য একটি বড় বার্তা। যদ্দুর মনে পড়ছে, ২০১৩ সালের সিটি নির্বাচনের পরে গণমাধ্যমগুলি ওরকমই বিশ্লেষণ দেয়ার চেষ্টা করেছিল। বার্তা ক্ষমতাসীনরা পেয়েছিলেন এবং বিএনপিকে বাদ দিয়ে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানে যে কৌশল অবলম্বন করেছিলেন, সেই ফাঁদে বিএনপি নির্বাচনের বাইরে চলে গিয়েছিল। সে সবই এখন ইতিহাস।

এবারেও একই বার্তা ক্ষমতাসীনদের কাছে রয়েছে। দেখার বিষয় হচ্ছে, পরিস্থিতি মোকাবেলায় কি ধরনের লক্ষ্যভেদী কৌশল ক্ষমতাসীন দল নেবে? অন্যদিকে, বিএনপি কি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটাবে, না তারাও লক্ষ্যভেদী কৌশল নির্ধারন করবে আগামী জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহনের লক্ষ্যে? আগামী রাজনীতির গতি-প্রকৃতি বলে দেবে, আগামী সংসদ নির্বাচনটি কেমন হবে।