Home » প্রচ্ছদ কথা (page 8)

প্রচ্ছদ কথা

উগ্র-জাতীয়তাবাদী উত্থানের দ্বারপ্রান্তে ইউরোপ!

আসিফ হাসান ::

বেক্সিট ছিল প্রথম অভ্যুত্থান। তারপর দ্বিতীয়টি। সেটা হলো ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়া;  এবার তৃতীয়টি। সেটা হবে ইউরোপে। সেটা কী? উগ্রপন্থীদের ইউরোপের দেশে দেশে ক্ষমতা গ্রহণ। এমনটাই ধারণা ফ্রান্সের উগ্র ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ম্যারিঁ লে পেনের। তিনি এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য মার্কিন ও ব্রিটিশ ভোটারদের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে ‘জেগে ওঠার’ ডাকও দিয়েছেন।

সম্প্রতি ইউরোপের উগ্রপন্থী নেতৃস্থানীয়রা সমবেত হয়েছিলেন জার্মানিতে। বর্তমান জমানায় এসে এ ধরনের সমাবেশ নজিরবিহীন। সেখানেই লে পেন হুংকার দেন, ‘বেক্সিট ইউরোপজুড়ে অপ্রতিরোধ্য প্লাবন সৃষ্টি করেছে। বেক্সিটের পর ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয় ছিল ‘দ্বিতীয় অভ্যুত্থান।’

উপস্থিত কয়েক শ’ ব্যক্তির উপস্থিতিতে তিনি বলেন, ‘ইউরোপ প্রশ্নে তার অবস্থান স্পষ্ট। জনগণের জন্য ক্ষতিকর কোনো ব্যবস্থা তিনি সমর্থন করেন না।’ তিনি আরো বলেন, ‘২০১৬ সাল ছিল অ্যাংলো-স্যাক্সন বিশ্বের জাগরণের বছর। আমি নিশ্চিত, ২০১৭ সালে মহাদেশীয় ইউরোপ জেগে ওঠবে।’

জার্মানির মধ্যাঞ্চল কোবলেনজে এই সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। এর আয়োজক ছিল জার্মানির অলটারনেটিভ ফার ডচেসল্যান্ড (এএফডি) পার্টি। সভার শ্লোগান ছিল ‘ইউরোপের স্বাধীনতা।’

লে পেন অ্যাঙ্গেলা মেরকেলের উদ্বাস্তুনীতির তীব্র সমালোচনা করেন। তার মতে, এই নীতির কারণেই বিপর্যয় নেমে এসেছে। তিনি বলেন, জার্মান জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে দেশটিতে লাখ লাখ উদ্বাস্তু ঢুকিয়েছেন মেরকেল। সভায় ইউরোপের লোকরঞ্জক দলগুলো অংশ নেয়। বিশেষ করে লে পেনের ফ্রন্ট ন্যাশনাল, এএফডি, ইতালির নর্দার্ন লীগ, নেদারল্যান্ডসের ফ্রিডম পার্টি।

চলতি বছর ইউরোপের রাজনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন হতে পারে। বিশেষ করে ফ্রান্স, জার্মানি ও নেদারল্যান্ডে উগ্র ডানপন্থীদের বিপুল জয় হতে পারে। তারা সত্যি সত্যি মনে করছে- বেক্সিট ও ট্রাম্প যখন বিজয় পেয়েছে, তখন তারাও জিতবে। গির্ট উইল্ডার্স, ফ্রাক পেত্রি ও মেরিঁ পেন- সবাই অভিন্নভাবে মনে করেন, জনগণ চায়- আরো নিয়ন্ত্রণ, সীমান্ত, বাজেট আর ব্রাসেলস নিয়ে আরো কড়াকড়ি।

এ দিকে বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, লোকরঞ্জক দলগুলোর জনপ্রিয়তা বাড়ছে।

ডাচ ফ্রিডম পার্টির (পিভিভি) প্রধান উইল্ডার্স প্রায় সব জরিপেই এগিয়ে আছেন। চলতি মাসের নির্বাচনে তার দল বেশ ভালো করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

আর পেত্রির অভিবাসনবিরোধী আলটারনেটিভ ফর জার্মানি পার্টি (এএফডি) সেপ্টেম্বরের নির্বাচনে মেরকেলকে ধরাশায়ী করতে পারেন। পেত্রি মনে করেন, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের (ইউ) কোনোই ভবিষ্যত নেই। লে পেনও ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে ফ্রান্সকে বের করে নিতে গণভোট তথা ফেক্সিট আয়োজন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তিনি ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট হলে জনগণকে চারটি সার্বভৌমত্ব ক্ষমতা ফিরিয়ে দেবেন। এই চারটি হলো : ভূখন্ডগত সার্বভৌমত্ব, অর্থের সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব এবং আইন পরিষদীয় সার্বভৌমত্ব। এসবের মাধ্যমেই তৃতীয় অভ্যুত্থান এগিয়ে যাবে বলে এই উগ্রপন্থীদের সবাই মনে করছেন।

দিল্লির প্রতিরক্ষা চুক্তি প্রস্তাবে আগ্রহী নয় ঢাকা

আমীর খসরু ::

কয়েক দফা স্থগিত হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অবশেষে এপ্রিলে ভারত সফর করতে সম্মত হয়েছেন। এই সফরটি নিয়ে অনেক দিন ধরেই নানা জল্পনা ভাসছে। তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি, গঙ্গা ব্যারেজ এগুলোই খুব বেশি আলোচনায় এসেছে। কিন্তু এখন বোঝা যাচ্ছে, এগুলো স্রেফ হিমবাহের শৃঙ্গ। পানির নিচে থাকা গুরুত্বপূর্ণ অংশটি আড়ালেই থেকে গিয়েছিল। আর সেটা হলো বাংলাদেশকে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তির দিকে নিয়ে যেতে  চাইছে ভারত।

দিল্লি চাচ্ছে, ২৫ বছর মেয়াদি একটি ব্যাপকভিত্তিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি। কিন্তু ঢাকা ভারতের সাথে ওই ধরনের কাঠামোগত চুক্তিতে থাকতে চাইছে না; তবে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় থাকুক তা কামনা করে। বেশ শিথিল, কম আনুষ্ঠানিক সমঝোতা স্মারকের কথা ভাবছে বাংলাদেশ, এমনকি কোনো সময়-সীমা নির্ধারনের কাঠামোও রাখতে চাইছে না।

গত ডিসেম্বরে ঢাকা সফরের সময়ই ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পারিক্কর বাংলাদেশের সাথে বৃহত্তর প্রতিরক্ষা সহযোগিতার আইডিয়াটি প্রকাশ করেছিলেন। এরপর গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ভারতের পররাষ্ট্রসচিব এস. জয়শঙ্করের সফরের সময় এ নিয়ে আরো আলোচনা হয়। জয়শঙ্কর অবশ্য বলেছিলেন, বৈঠকটিতে ‘কানেকটিভিটি ও উন্নয়ন উদ্যোগের’ প্রতি নজর দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা  হয়েছে। তবে আসল কারণটি হতে পারে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তার বিষয়টি।

বাংলাদেশের এক শীর্ষ কূটনীতিক সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টকে বলেছিলেন, ’ভারত চায় দীর্ঘমেয়াদি ব্যাপকভিত্তিক প্রতিরক্ষা চুক্তি। আমরা চাই আরো ধীরে ধীরে ধাপে ধারে গ্রহণ করা পদক্ষেপ। সমঝোতা স্মারক হবে শুরুর জন্য ভালো বিষয়’। ওই কূটনীতিক বলেন, ‘ভারতের সাথে আমরা বৃহত্তর প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চাই। আমাদের দুই দেশের প্রতিরক্ষা বাহিনীর মধ্যকার সম্পর্ক উন্নত হচ্ছে, আমরা একসাথে সন্ত্রাসবাদের হুমকি মোকাবিলা করছি। তবে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির সময় এখনো আসেনি।’ ভারতের প্রস্তাবিত চুক্তিতে দুই সামরিক বাহিনীর মধ্যে সরাসরি সহযোগিতা এবং ভারত থেকে বাংলাদেশে সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি ও সরবরাহ এবং পারস্পরিক ধারণায় থাকা হুমকির বিরুদ্ধে সমন্বিত অভিযানের কথা বলা হয়েছে।

দ্য হিন্দুস্তান টাইমসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারত চাচ্ছে বাংলাদেশের কাছে ৫০ কোটি ডলারের ঋনে সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি করতে। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট-ও একই তথ্য প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, সামরিক সরঞ্জাম কেনার জন্য ভারত ৫০ কোটি ডলার ঋণ দিতে চাইছে বাংলাদেশকে।  বাংলাদেশ হয়তো এই প্রস্তাবকে স্বাগত জানাবে; তবে তা হবে ভিন্নভাবে অর্থাৎ উপকূল রক্ষা বাহিনীর জন্য টহল বিমান এবং বিমান প্রতিরক্ষার জন্য রাডার কেনার কাজে ব্যবহার করবে।

ভারতীয় মিডিয়ার উদ্ধৃতি দিয়ে ফার্স্টপোস্টের খবরে বলা হয়, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতাই ভারতকে ঢাকার সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করতে উৎসাহিত করছে। উল্লেখ্য, ২০০৯ সাল থেকে চীনই বাংলাদেশের বৃহত্তর অস্ত্র সরবরাহকারী। এই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশে আসা অস্ত্রের ৮০ ভাগই সরবরাহ করেছে চীন।

এই ২০১৬ সালের নভেম্বরেও চীনের কাছ থেকে ঢাকা দুটি সাবমেরিন কিনেছে। এই ঘটনায় নয়া-দিল্লির অনেকের চোখ কপালে ঠেকেছে। তখন থেকেই ভারত একটি প্রতিরক্ষা চুক্তির মধ্যে নিয়ে আসতে চাইছে বাংলাদেশকে।

সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের অনেক কর্মকর্তাই ভারতীয় সামরিক সরঞ্জাম কিনকে আগ্রহী নয়। কারণ ভারত নিজেই অন্যান্য দেশের কাছ থেকে অস্ত্র আমদানি করে থাকে। তারা নেপাল ও মিয়ানমারে সরবরাহ করা ভারতীয় অস্ত্রের নিম্নমানের কথাও উল্লেখ করেন।

শেখ হাসিনা চীন ও ভারতের সাথে তার দেশের সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখা অব্যাহত রাখতে চাইছেন। গত নভেম্বরে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিঙের ঢাকা সফরের সময় বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে চীন ও বাংলাদেশ ২৫ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি সই করে।

চীনের ‘মুক্তার মালা’ কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাংলাদেশ। ভারত মহাসাগরে প্রাধান্য বিস্তারের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দেশে সামরিক স্থাপনার কৌশলগত স্থাপন হলো- এই কৌশলের অন্যতম লক্ষ্য।

অবশ্য ২০১৫ সালে শেখ হাসিনার সাথে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দ্বিপক্ষীয় আলোচনার সময় ভারতকে বাংলাদেশের বন্দর ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ায় তা ভারতের ভূ-রাজনৈতিক বিশ্বাস বেড়েছে। আবার চীনকে হতাশ করে হাসিনা সরকার চারটি প্রকল্পের অন্যতম সোনাদিয়া বন্দর পরিকল্পনাও বাতিল করে দেয়। টাইমস অব ইন্ডিয়ার ইন্দ্রানি বাগচির মতে, সিদ্ধান্ত ছিল কৌশলগত এবং ভারতকে বিবেচনায় রেখেই তা করা হয়েছিল।

দিল্লিতে শেখ হাসিনার সফর দুবার পিছিয়েছে, একবার ডিসেম্বরে, আরেকবার ফেব্রুয়ারিতে । দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কারণ হিসেবে উভয় প্রধানমন্ত্রীর পূর্ব-নির্ধারিত কর্মসূচির কথা উল্লেখ করলেও পানিবণ্টন চুক্তিসহ বেশ কয়েকটি বিষয় নিয়ে অচলাবস্থাই সফর স্থগিত হওয়ার মূল কারণ বলে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

ঢাকা ভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক বাংলাদেশ পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রধান শামসুল আরেফিনের মতে, ‘বাংলাদেশ এখনো কৃষিপ্রধান দেশ। আমাদের জন্য নদীর পানি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।’ তিনি বলেন, ‘হাসিনার প্রয়োজন পানিবণ্টনের মতো কিছু চুক্তি নিয়ে ভারত থেকে ফিরতে। তিনি ভারতীয় বিদ্রোহীদের বিদায় করার মতো ভারতের নিরাপত্তা ও কানেকটিভিটিবিষয়ক সব উদ্বেগ দূর করেছেন, ভারতের গোলযোগপূর্ণ উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে পণ্য পরিবহনের জন্য ট্রানজিট দিয়েছেন। এখন ভারতের প্রতিদান দেওয়ার সময়।’ আরেফিন বলেন, নদীর পানিবণ্টনের মতো ইস্যুতে সমাধান পেতে ব্যর্থতা নিশ্চিতভাবেই পল্লীর ভোটাদের ওপর প্রভাব ফেলবে।

একটি ইস্যুতে ভারত ও বাংলাদেশ সম্ভবত একই স্থানে রয়েছে। সেটা হলো সন্ত্রাসবাদ। শেখ হাসিনার আমলে ঢাকা  জঙ্গীবাদ ও  সন্ত্রাসের উত্থান দেখেছে। বাংলাদেশে ঝামেলা সৃষ্টিতে ইন্ধন দেওয়ার জন্য ঢাকা দায়ী করেছে ইসলামাবাদকে। ফলে ঢাকা যখন ২০১৬ সালের ইসলামাবাদের সার্ক শীর্ষ সম্মেলন থেকে প্রত্যাহার করে নেয়, তখন তাতে বিস্ময়ের কিছু ছিল না।

এছাড়া ১৯ সেপ্টেম্বর কাশ্মিরের উরি হামলার পরপরই পাকিস্তানকে নিন্দা করে। দ্য ইকোনমিক টাইমস জানায়, সন্ত্রাস দমনে ভারত ও বাংলাদেশ যৌথ সভাও করেছে।

অবশ্য এপ্রিলে নরেন্দ্র মোদি ও শেখ হাসিনার মধ্যকার বৈঠকের ফলাফলই সব জল্পনা-কল্পনার সমাধান দিতে পারবে।

(সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট ও ফার্স্টপোস্ট অবলম্বনে)

 

ভারতের সিদ্ধান্ত : আর নয় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প

২০২২ সালের পর ভারতে আর কোনো কয়লাভিত্তিক প্রকল্প  নির্মাণ করা হবে না

ওয়েব সাইট অবলম্বনে মোহাম্মদ হাসান শরীফ ::

প্রবল প্রতিবাদের মধ্যেও যখন বাংলাদেশের রামপালে যৌথ উদ্যোগে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণকাজ এগিয়ে চলছে, তখন খোদ ভারতেই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে নীতিগত অবস্থানের ১৮০ ডিগ্রি পরিবর্তন ঘটেছে; অর্থাৎ পুরো পরিবর্তন হয়েছে এসংক্রান্ত পরিকল্পনায়। দেশটির সেন্ট্রাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটি (সিইএ) জানিয়েছে, পাঁচ বছর পরই তারা আর কোনো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্লান্ট স্থাপন করবে না। তারা বরং নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের দিকে যাবে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীলতা ক্রমাগত কমিয়ে আনা হবে।

ভারত কিন্তু বেশ ভাবনা-চিন্তার পরই কয়লা ছেড়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে যাওয়ার কথা ভাবছে। ২০২২ সালের পরে আর কোন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণকাজ তারা করবেনা। তবে দেশটিতে এখনো যে পরিমাণ কয়লার মজুত আছে, তা দিয়ে তারা ২০২৭ সাল পর্যন্ত আনায়াসে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে যেতে পারবে। কিন্তু তারপরও ওই অবস্থান থেকে তারা সরে আসছে।

এই পরিবর্তনের একটি বড় কারণ হলো পরিবেশ দূষণ। আবার দূষণকারী উপাদানগুলো দূর করতে প্রতিষেধকমূলক যেসব পদক্ষেপ নিতে হয়, সেগুলো নিতে গেলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায় অনেক বেশি। এই ব্যয়ভার মেটানো সম্ভব নয়। এ কারণেই  অত্যাধুনিক এবং পরিবেশ দূষণমুক্ত সরঞ্জাম দিয়ে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপানের চাহিদা কমে যাচ্ছে।  ভারতের ন্যাশনাল ইলেকট্রিসিটি প্লানে (২০১৭-২০২২) এ ব্যাপারে একটি রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে,  ২০২১-২২ এবং ২০২৬-২৭ সময়কালে মোট জ্বালানির যথাক্রমে ২০.৩ ও ২০.৩ ভাগ আসবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে।

কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর বেশির ভাগই তৈরি হয়েছে বেসরকারি খাতে। সরকারের এই নীতিগত পরিবর্তনের ফলে প্লান্টে বিনিয়োগে বড় ধরনের সমস্যা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সরকার সিইএ’র পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অগ্রসর হলে ৪,০০০ মেগাওয়াটের আল্ট্রা মেগা পাওয়ার প্লান্টের প্রয়োজন হবে না বলেও মনে করা হচ্ছে।

গত ডিসেম্বরে সিইএ’র খসড়া জাতীয় বিদ্যুত পরিকল্পনাটি প্রকাশিত হয়। বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের তদারকিতে এটা প্রণয়ন করা হয়। ভারতের দ্বাদশ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা (২০১২-১৭) অনুযায়ী, ওই সময়কালে দেশটিতে ১,০১,৬৪৫ মেগাওয়াট নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদন হওয়ার কথা। এগুলোর ৮৫ ভাগই কয়লাভিত্তিক প্লান্ট থেকে আসবে বলে পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তবে এখন পরিকল্পনা করা হয়েছে, ২০২২ সালের পর আর কোনো কয়লাভিত্তিক প্লান্ট নির্মাণ করা হবে না। ২০২২ সাল থেকেই নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ প্লান্টের কাজ বড় আকারে শুরু হবে। ওই বছরে মোট ১৭৫ গিগাওয়াটের নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ প্লান্ট নির্মাণ করা হবে।

২০১৬ সালের মার্চে ভারতের মোট বিদ্যুতের প্রায় ৬১ ভাগ ছিল কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের, ১৪ ভাগ জলবিদ্যু, ১৪ ভাগ নবায়নযোগ্য (বেশির ভাগই বায়ুভিত্তিক), ৮ ভাগ প্রাকৃতিক গ্যাস, ২ ভাগ পরমাণু এবং ১ ভাগ ডিজেলভিত্তিক কেন্দ্রের।

বিদ্যুৎ স্বল্পতা দূর করা এবং প্রতিটি ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাপকভাবে বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ভারতে ১৯৫০ সালে বিদ্যুৎ সামর্থ্য ছিল ১,৭১৩ মেগাওয়াট, ২০১৬ সালের মার্চে দাঁড়ায় ৩০২,০৮৮ মেগাওয়াট। ভারতের  দিক থেকে এটা বড় ধরনের সাফল্য হিসেবেই দেখা হচ্ছিল। কিন্তু এটা করতে গিয়ে পরিবেশের ভয়াবহ দূষণ ঘটে । কোনো কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে ভারতের রাজধানীকে বলা হয়েছে, বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত নগরী। ভারতের অবস্থানও একই পর্যায়ের। অবশ্য কেবল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্যই যে দূষণ ঘটছে, এমন নয়। তবে এটা অন্যতম কারণ।

আবার ভারতই নয়, পরিবেশ সুরক্ষার দিকে পরোয়া না করা দেশগুলোর তালিকায় ভারতের সাথে যেন প্রতিযোগিতা করছে চীন, ব্রাজিল ইত্যাদি দেশ। পরিবেশ দূষণ ওইসব দেশেই সীমিত থাকছে না। বাংলাদেশের মতো দেশ তার শিকার হয়। সমুদ্র স্তরের উচ্চতা বেড়ে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকা তলিয়ে যাওয়ার যে আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে, তার জন্য কিন্তু বাংলাদেশ দায়ী নয়। কিছুটা অগ্রসর দেশগুলো তাদের উন্নয়ন কার্যক্রম এগিয়ে নিতে গিয়ে এমন সব ব্যবস্থা নিচ্ছে, তার সুফল তারা এককভাবে পেলেও কুফলগুলো গরিব দেশগুলোকেও ভোগ করতে হচ্ছে।

এমন এক প্রেক্ষাপটে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনে ভারত ব্যাপক উদ্যোগ নিয়েছে। ২০১৬ সালের মার্চে যেখানে এই খাত থেকে বিদ্যুৎ আসতো ৫২৩ মেগাওয়াট, সেখানে ২০২২ সাল নাগাদ এই খাত থেকে ৫২৩ গিগাওয়াট করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই পরিকল্পনায় কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ৮৫ ভাগ থেকে কমিয়ে ৪৭.৫ ভাগ করার কথা বলা হয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির মধ্যে পানি, পরমাণু, বাতাস, সৌর বিদ্যুতের দিকেই বেশি নজর দেওয়া হবে।

প্রধানমন্ত্রী কার পক্ষে অবস্থান নেবেন- মন্ত্রী নাকি জনগনের?

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

পরিবহন ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়েছে, তারপরেও তিনজন মন্ত্রীর বাণী দিয়ে শুরু করা যাক। মন্ত্রী শাহজাহান খান বলেছেন, “ক্ষুব্দ চালকরা জেল-জুলুম মাথায় নিয়ে কাজ করতে চায় না”। মন্ত্রী আনিসুল হক ধর্মঘটকে ‘দুঃখজনক’ মনে করে বলেছেন, “জনগনকে কষ্ট না দিয়ে আদালতে বক্তব্য দিন”। এই ধর্মঘট আদালত অবমাননা কিনা, সে প্রশ্নে তিনি মনে করেন এটি আদালতের বিবেচ্য বিষয়। মন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন দলের সাধারন সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বললেন, “ধর্মঘট অযৌক্তিক। প্রত্যাহার করা উচিত”।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর সত্যি হলে জানবেন, একজন মন্ত্রীর সরকারী বাসভবনে বসে ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ার সাথে সরাসরি জড়িত একজন মন্ত্রী, একজন প্রতিমন্ত্রী এবং সরকার সমর্থক পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নেতারা। এর মধ্য দিয়ে তারা রাষ্ট্র-জনগনকে জিম্মি করছেন- দোষী সাব্যস্ত হওয়া আদালতে দন্ডপ্রাপ্তদের শাস্তি মওকুফ করানোর জন্য! এখন দেখার বিষয় হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী কি তার মন্ত্রীদের পক্ষে অবস্থান নেবেন, নাকি জনগনের পক্ষে?

সরকারের নৌ-মন্ত্রী শাহজাহান খান সারাদেশের শ্রমিক সংগঠনগুলির শীর্ষ ফোরাম ‘বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনে’র কার্যকরী সভাপতি। বাস ও ট্রাক শ্রমিক সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির সভাপতি সরকারের প্রতিমন্ত্রী মসিউর রহমান রাঙ্গা। গণমাধ্যম জানিয়েছে, যে বৈঠকটি ধর্মঘট আহবানের জন্য মন্ত্রীর সরকারের বাসভবনে অনুষ্টিত হয়েছে সেখানে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় খুবই চাতুর্যের সাথে। দায় এড়াতে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়া হয়নি। কারন ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সরকারের কর্তারা।

জনগন জানে না, গণমাধ্যমে দেয়া নৌমন্ত্রীর বক্তব্য আদালত অবমাননার পর্যায়ে পড়ে কি-না? নিশ্চয়ই সেটি আদালত বিবেচনায় নেবে। নৌমন্ত্রী বলছেন, “সংক্ষুব্দ ব্যক্তি ক্ষোভ প্রকাশ করতেই পারে। আপনিও করেন, আমিও করি। ঠিক একইভাবে ওরাও (শ্রমিক) ক্ষোভ প্রকাশ করছে। চালকরা মনে করছেন, তারা মৃত্যুদন্ডাদেশ বা যাবজ্জীবন রায় মাথায় নিয়ে গাড়ি চালাবেন না। তাই তারা স্বেচ্ছায় গাড়ি চালাচ্ছেন না। এটাকে ধর্মঘট নয়, স্বেচ্ছায় অবসর বলা যেতে পারে”।

এটি হচ্ছে সরকারের মন্ত্রীর বক্তব্য। এটি কি তাহলে সরকারের ভেতরের সরকার। তার ভাষায়, ‘স্বেচ্ছা অবসরে’ থাকা শ্রমিকরা দেশজুড়ে তান্ডব চালাচ্ছে। চড়াও হচ্ছে পুলিশ-র‌্যাবের ওপর। জনগনের কথা তো আসছেই না। তাহলে ধরে নিতে হবে সরকারের মন্ত্রী, সরকার সমর্থক শ্রমিক নেতারা দেশজুড়ে নৈরাজ্য সৃষ্টি করবেন? তারা কি বিচারিক আদালতের রায়ও বদলে দেবেন?

নৌমন্ত্রী ও সমবায় প্রতিমন্ত্রীর এহেন আচরনে দুঃখ পেয়েছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। গণমাধ্যমকে বলেছেন,“তাদের (তার সহকর্মীরা, নাকি পরিবহন শ্রমিকরা) উদ্দেশ্যে বলতে চাই, জনগনকে কষ্ট না দিয়ে আপনারা আদালতে এসে আপনাদের বক্তব্য তুলে ধরেন। আপনাদের বক্তব্য যদি যুক্তিসঙ্গত হয়, তবে তা দেখা হবে। যুক্তিসঙ্গত না হলে দেখা হবে না”।

কি সুন্দর বক্তব্য! যিনি এধরনের কাজে সব সময় সিরিয়াস, তিনি কিনা ধর্মঘটের নামে অবরোধ, ধ্বংসযজ্ঞের মত ব্যাপারে এতটাই যুক্তিবাদী! অন্যদিকে, ক্ষমতাসীন দলের সাধারন সম্পাদক ও মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের তার সহকর্মীদের এবং সমর্থক নেতাদের এরকম কর্মকান্ড অযৌক্তিক বলছেন এবং মনে করছেন, ধর্মঘট প্রত্যাহার করা উচিত।

লঞ্চ দুর্ঘটনা, সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে দায়েরকৃত মামলাগুলির প্রায় কোন অনুসন্ধান বা তদন্ত হয় না। কারন সরকারের কর্তারাই শ্রমিক নেতা এবং অন্যরা সরকারের সক্রিয় সমর্র্থক।  নানা ঘটনা ধামাচাপা দিতে, বিরোধীদলের কর্মসূচি ভেস্তে দিতে ক্ষমতাসীনরা ব্যবহার করা হয়েছে পরিবহন শ্রমিকদের। এজন্যই ক্ষমতাসীনদের আস্কারায় তারা এতই বেপরোয়া যে, ‘দুর্ঘটনা’র নামে মানুষ খুন করে ‘দায়মুক্তি’ দাবি করছে।

গেল ফেব্রুয়ারি মাসে মাত্র তিনদিনে সড়কের মড়কে নিহত ৫৭ জন। জানুয়ারিতে নিহত ৪১৬ জন। সরকারী হিসেব মতে বছরে গড়ে মারা  গেছে আড়াই হাজার। যাত্রী কল্যান সমিতির দাবি- এই সংখ্যা ৮ হাজার। সংখ্যা হয়ে উঠেছে বিবেচ্য। কিন্তু সড়কে চালকের বেপরোয়াত্বের কারনে একজন মানুষও নিহত হলে তার দায় সরকারের। কিন্তু দায় নেয়ার বদলে এখন আদালতের রায় বদলাতে দেশ জুড়ে নামিয়ে আনা হয় ধর্মঘটের নামে নৈরাজ্য!

মিশুক মুনীর ও তারেক মাসুদকে সড়কে যে চালক মেরে ফেলেছিল, তার ড্রাইভিং লাইসেন্স ছিল মেয়াদোত্তীর্ণ এবং গাড়িটি ছিল ফিটনেসবিহীন। এর পর ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানে শিক্ষাগতসহ কিছু যোগ্যতা নির্ধারন করলেও বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। শ্রমিকদের নিয়ে গড়ে তোলা মন্ত্রীর ক্ষমতাবলয়ের প্রভাব এতটাই যে, পরিবহন সেক্টরে সরকার প্রায় কোন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পারে না।

ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতা, মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, আদালতের রায়ের সাথে নাকি জনগনের সম্পর্ক নেই। তিনি কি বলতে চেয়েছেন, ইতিপূর্বে আদালত যে সব যুগান্তকারী রায় দিয়েছে, শাস্তি দিয়েছেন ঘাতকদের তার সাথে জনগন সম্পর্কহীন? কারন মি. কাদের মনে করছেন, “আদালত রায় দিয়েছে, জনগন দেয়নি”। আদালতের দেয়া রায় ও কার্যকর করা জনগনের প্রার্থিত এবং প্রত্যাশিত। সে কারনে এ রায় জনসম্পর্কিত। কিন্ত প্রাক্তন ছাত্রনেতা, রাজনীতিক ওবায়দুল কাদের জানেন, জনগন যখন রায় দেয়, তখন তার পরিনাম কি হয়! ইতিহাসের অজস্র উদাহরন নিশ্চয়ই তাকে স্মরন করিয়ে দিতে হবে না।

আরও চাপের মুখে বিএনপি : লক্ষ্য আগামী নির্বাচন

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

১৯৭৪ সালে জাতীয় সংসদে বাজেট বক্তব্য শুরু করেছিলেন শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ একটি রূপক গল্প দিয়ে। গল্পটি ছিল এরকমঃ এক পীরের মুরীদ ক্ষমতা চাইলো পীরের কাছে- তোর ইচ্ছেয় সবকিছু হবে। পীর রাজী নন, জানিয়ে দিলেন পরিনাম ভাল হবে না। মুরীদ নাছোড়বান্দা। অবশেষে রাজী হলেন পীর। একটি দোয়া লিখে দিলেন। ৪০ দিন নির্জন ঘরে এই দোয়া পড়লে এক দৈত্য আসবে। তাকে যা বলা হবে, করে দেবে। কাজ না দিলে ঘাড় মটকাবে। চল্লিশ দিবস পরে দৈত্য এলো। মুরীদের নির্দেশ পালিত হতে লাগলো। সময় এলো, দৈত্যকে আর কাজ দেয়া যাচ্ছে না। অবস্থা এমন যে, মুরীদের প্রাণ যায়। পীর দিব্যদৃষ্টিতে সব দেখছিলেন। মুরীদের সঙ্গে দৈব যোগাযোগ স্থাপিত হলো। বললেন, বাজার থেকে ঘি কিনে নিয়ে আসো। দৈত্যকে দাও এবং বলো উঠানে যে, কুকুরটি শুয়ে আছে তার লেজ সোজা করতে। ওটি অনন্তকাল চলবে।

শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ যে সময়ের প্রেক্ষাপটে রূপকটি বলেছিলেন, তা থেকে বাংলাদেশ চলে এসেছে ৪২ বছর সামনে। ‘সময় বহিয়া গিয়াছে’ কিন্তু প্রেক্ষাপট কি খুব বেশি বদলেছে? অথবা বলা যায়, এই রাষ্ট্র বহুকাল ধরে পেছন যাত্রায় সামিল ছিল, এখনও রয়েছে অনেকক্ষেত্রেই। রাষ্ট্রের জন্মের গণতান্ত্রিক আকাঙ্খা পরিপূর্ণ হয়নি বলে প্রয়াত রাষ্ট্রনায়কের রূপকটি আজ অবধি প্রাসঙ্গিক।

এক. রাষ্ট্রপতির উদ্যেগে গঠিত সার্চ কমিটির মাধ্যমে একটি নির্বাচন কমিশন মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। সার্চ কমিটির দেয়া নামগুলি থেকে রাষ্ট্রপতি পছন্দের মানুষগুলো বেছে নিয়েছেন। এটুকু হচ্ছে সোজা-সরল কথা। কিন্তু বাস্তবে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কতটুকু? তিনি কি করতে পারেন? তাও সংবিধান বলে দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেয়া ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ব্যতীত তিনি কোন কাজ করবেন না। তাহলে আমরা কি ধরে নিতে পারি, প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি এই নির্বাচন কমিশন নিয়োগ দিয়েছেন?

সিইসি দলীয় লোক বা দলীয় লোক নন। বিশেষ দলের প্রতি তার আনুগত্য আছে, আনুগত্য নেই; এসবই এখন আলোচনার বিষয়। এই কমিশন গঠন নিয়ে রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজসহ অনেকের সাথে আলোচনা হয়েছে। ফলে আগ্রহ ছিল, কি ধরনের মানুষদের কমিশনে নিয়োগ দেয়া হবে! অবশেষে দেখা মিলেছে পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট কমিশনের এবং নানান আলোচনা শুরু হয়েছে, আশঙ্কাও প্রকাশিত হচ্ছে। দায়িত্ব গ্রহনের আগেই যথানিয়মে বিরোধীদল বলে দিয়েছে কমিশন দলীয়, নির্বাচন নিরপেক্ষ হবে না!

কমিশন সম্পর্কে কৌতুহলের প্রাথমিক সুরাহা করেছেন কেবিনেট সচিব। নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার বিএনপির তালিকার এবং কবিতা খানম আওয়ামী লীগের তালিকার-এ তথ্য কেবিনেট সচিবের। পরে থলের বিড়াল বেরোলো এবং নটে গাছটি মুড়োলো। জানা গেল, সিইসিসহ অন্য দুই কমিশনারের নাম এসেছে ১৪ দলভুক্ত ছোট দলগুলো থেকে। বোঝা গেল, এটি ছিল একটি কৌশল। পছন্দের মানুষ আনতে মিত্রদের মাধ্যমে তালিকা দেয়া হয়েছিল। এটি ছিল খুবই চাতুর্যপূর্ণ কৌশল ও আইওয়াশ।

সিইসি মোহাম্মদ নুরুল হুদা প্রশাসন ক্যাডারের ১৯৭৩ ব্যাচ, যেটি একটি ‌’বিশেষ  ব্যাচ’ নামে পরিচিত। তিনি ‘জনতার মঞ্চে’র সাথে যুক্ততা অস্বীকার করেছেন। তবে ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় এসে যুগ্মসচিব নুরুল হুদাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায়। তিনি এর বিরুদ্ধে আইনগত প্রতিকার নিয়ে ২০০৮ সালে ‘ভুতাপেক্ষ’ সচিব মর্যাদায় অবসর নেন। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং অবসর পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের নানা লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।

দুই. কমিশন শপথ ও দায়িত্ব গ্রহন করেছে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি। শুরুতেই দেশের সবচেয়ে বড় উপজেলা বাঘাইছড়ি পৌরসভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত করে ফেলেছেন। তারা উতরে গেছেন; কারন সরকার চায়নি শুরুতেই সামান্য পৌরসভা নির্বাচন নিয়ে কমিশন বিতর্কিত হোক। ক্ষমতাসীনদের আসল দৃষ্টি ক্ষমতার সবুজ জমিনে। এজন্য সরকার চেয়েছে বলে দলের মধ্যে প্রবল প্রতিপক্ষ থাকার পরেও নারায়নগঞ্জের নির্বাচনে হস্তক্ষেপ হয়নি। এখানে তাদের কৃতিত্ব কতটুকু তা ভূতপূর্ব কমিশনের সকলেই জানেন।

শুরুতেই প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে দলীয় লোক বলে অভিহিত করতে শুরু করেছে বিএনপি। আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকলেও এ বিষয়ে কসুর করতো না। অন্যদিকে, ক্ষমতাসীন দল সিইসির ওপর আস্থা রেখেছে, বক্তব্য, বিবৃতিও দিতে শুরু করেছে। ক্ষমতায় থাকলে বিএনপিও তাই করতো। বোঝা যাচ্ছে, এই কমিশনের সামনে একটি বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। প্রশ্ন হচ্ছে, চ্যালেঞ্জগুলি কি কি? সেগুলি তারা সামাল দিতে পারবেন নাকি রকিব কমিশনের যোগ্য উত্তরাধিকার হবেন?

বর্তমান কমিশনের প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, সরকারের সর্বগ্রাসী প্রভাব উপেক্ষা করে একটি অবাধ ও গ্রহনযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান করা। কিন্তু এই দেশে নির্বাচন কমিশন কখনও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রমান করতে সক্ষম হয়নি। এই দেশের ইতিহাসে এমন কোন কমিশন আসেনি যারা ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবকে উপেক্ষা করে স্বাধীনভাবে কাজ করেছে। এমনকি সবচেয়ে ‘শক্তিশালী’ দাবি করা ‘ড. শামসুল হুদা’ কমিশনও তখনকার সেনা-সমর্থিত তত্বাবধায়ক সরকারের ইচ্ছেকেই প্রতিফলিত করেছে।

অতীত ধারাবাহিকতার মধ্যেই কাজ শুরু করতে হচ্ছে নতুন কমিশনকে এবং অবশ্যই ক্ষমতাসীনদের সর্বগ্রাসী প্রভাবের মত চ্যালেঞ্জকে সামনে রেখেই। পেছনে পড়ে আছে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির একক নির্বাচন- যেখানে ১৫৩ জন প্রার্থী ছিলেন প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন। শক্তি প্রয়োগ, সরকারী বাহিনীসমূহের নৈপূন্য এবং সহিংসতার পথে প্রতিহতের চেষ্টার মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের স্মৃতি। এবারে একটি নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ববাদী সরকারের অধীনে নির্বাচন। কি রকম পরিস্থিতি না অপেক্ষা করে আছে কমিশনের সামনে!

তিন. ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে- মোটামুটি নিশ্চিত। নির্বাচন কেমন হবে, তা বলার সময় বোধকরি আসেনি। শ্রদ্ধেয় বদরুদ্দীন উমরের সাথে একমত পোষণ করতে হচ্ছে, “বাংলাদেশে সরকারী ও বিরোধী দলীয় যেসব দল সংসদীয় রাজনীতি করে, তাদের কারো মুখে কোন লাগাম নেই। তারা সবাই জনগনকে গরু-ছাগল ছাড়া আর কিছুই মনে করে না”। এজন্য ২০১৪ সালের নির্বাচনে ক্ষমতাসীনরা জননির্ভর ছিলেন না, ছিলেন ‘আজ্ঞাবহ কমিশন’ এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর এ্যাকশন নির্ভর।

দেশের রাজনীতিতে মত্ত দুই প্রতিদ্ব›দ্বী আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা অতিসামান্য মাত্রায় আদর্শিক হলেও আসলে পুরো জায়গা জুড়ে আছে ক্ষমতার লড়াই। ক্ষমতার খেলায় গত আটবছর ধরে বিএনপি প্রায় পর্যদুস্ত, বিপর্যস্ত ও কোনঠাসা। এই খেলায় বিএনপির আত্মঘাতী প্রবণতা ক্ষমতাসীনদের সফল হতে সহায়তা করেছে। সামরিক ছাউনিতে জন্ম নেয়া দলটি আশির দশকে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামের মধ্যদিয়ে মধ্যপন্থায় বিকশিত হলেও গত দু’দশকে তৈরী হয়েছে চরম ডানপন্থার ঝোঁক। এরপরেও দলটি সম্বিত ফিরে পায়নি। দল গোছানোর প্রচেষ্টায় গত কাউন্সিলের কথিত পুনর্গঠন এর সবচেয়ে বড় উদাহরন।

এই আত্মঘাতী ও জনগনের সাথে সম্পর্কহীন স্রেফ ক্ষমতা ও ডাইন্যাষ্টির রাজনীতি সরকারের জন্য সুযোগ করে দিয়েছে। মাত্র একটি নমুনা হচ্ছে সারা দেশে বিএনপি নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে কম-বেশি সাড়ে বাইশ হাজার। খালেদা জিয়াসহ ১৫৮ নেতার বিরুদ্ধেই মামলা রয়েছে সাড়ে চার হাজার। এর অনেকগুলি মামলার বিচার প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে। আইনী লড়াই বলে দেবে কি আছে বিএনপি নেতৃত্বের ভাগ্যে। তবে আইনী প্রক্রিয়ায় মামলা মোকাবেলার বদলে তারেক রহমান আপাতত: প্রবাসে থাকছেন-এটি নিশ্চিত।

নির্বাচন ঘোষিত হলে বর্জনের হুমকি দেয়ার মত অবস্থানে বিএনপি নেই। দলটির জন্য নির্বাচনে অংশগ্রহনের বিকল্প নেই। তাদের বহুল কথিত “আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পতন বা সরকারকে নির্দলীয়-নিরপেক্ষ নির্বাচন দিতে বাধ্য করা”- এর কোন অবস্থানে তারা নেই। বিএনপির বর্তমান অবস্থান হচ্ছে, নির্বাচনকালীন ‘সহায়ক সরকার’- যার রূপরেখা তারা সহসাই পেশ করবেন। যদিও সরকারের কয়েকজন প্রভাবশালী মন্ত্রী, নেতা ওরকম ধারনা আগেই নাকচ করে দিয়েছেন।

অন্যদিকে, নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের বিষয়ে সরকারের মনোভাব বোঝা গেল প্রভাবশালী মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের বক্তব্যে। তার মতে, “যিনি সরকারের প্রধানমন্ত্রী আছেন, তার অধীনেই নির্বাচন হবে”। সকলেই জানেন, এটি আসলে বাস্তবতা। সেজন্য ‘সহায়ক সরকার’ বা যে নামেই বিএনপি কোন রূপরেখা নিয়ে আসুক না কেন, রাজনীতিতে কি প্রভাব রাখবে সেটি বলার আগে আরো বাস্তবতা হচ্ছে- বিএনপি এই মূহুর্তে কোন বিষয়ে ‘দর কষাকষি’র অবস্থানেও নেই।

চার. একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, খালেদা জিয়া এবং তারেককে ছাড়াই নির্বাচনে অংশ নিতে হতে পারে। মোটামুটি পরিস্কার যে, খালেদার ও তারেকের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলাগুলির বিচার সহসাই নিস্পন্ন হতে চলেছে। বিএনপি ইতিমধ্যে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে আদালতকে প্রভাবিত করা হচ্ছে খালেদা জিয়াকে নির্বাচনের বাইরে রাখতে।

বিচারে সাজা হলে খালেদা ও তারেকের নির্বাচনে অংশগ্রহনের বিষয়টি পুরোপুরি আইনী জটিলতা ও আইনী সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। এরকম পরিস্থিতির সবরকম সুবিধা নেয়ার জন্য সরকার তৈরী আছে। প্রশ্ন হচ্ছে, সংকট মোকাবেলায় বিএনপির প্রস্তুতি কি? শুধুমাত্র ক্ষমতায় যাওয়া এবং দলীয় কিছু লোকের জন্য অবাধ লুন্ঠনের ‘গণতন্ত্র’ কায়েমে জনগন তাদের সাথে সামিল হবে না। যেমনটি সামিল নেই আওয়ামী লীগের সাথেও। সেজন্য অবাধ নির্বাচনে সবকালে ক্ষমতাসীনদের ভয়।

বিএনপি অপর চ্যালেঞ্জটি হচ্ছে, নির্বাচন হবে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে। নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের কথা ছেড়ে দিয়ে সহায়ক সরকারের দাবি করছে বটে, কিন্তু দাবি আদায়ে তাদের অঙ্গীকার বা সক্ষমতা কি আছে? এটি বিএনপিও যেমন বোঝে, সরকারও তেমনি জানে। ফলে নির্বাচনে তাদের অংশ নিতে হবে। অংশ নিয়ে তাদের অভিযোগের যথার্থতা প্রমান করতে হবে যে, বর্তমান নির্বাচন কমিশন ও সরকার ন্যূনতম নিরপেক্ষ ও গ্রহনযোগ্য নির্বাচন করতে সক্ষম নয়।

সা¤প্রতিক বক্তব্যে মনে হচ্ছে, খালেদা ও তারেকের বিরুদ্ধে আদালতের রায় পেতে সরকার উদগ্রীব। বিএনপির অভিযোগ, দলের দুই শীর্ষ নেতাকে নির্বাচন থেকে সরিয়ে দিতে সরকার বদ্ধপরিকর। সরকারের আচরন ও পদক্ষেপ এই অভিযোগকেই উস্কে দেয় এবং বিএনপিকে বিপর্যস্ত ও অপ্রস্তুত অবস্থায় ফেলে দিয়ে একটি নির্বাচন আয়োজনের আভাস মেলে। এরকম সম্ভাবনার মধ্য দিয়ে ২০১৯ সালের নির্বাচন হলে তৃতীয়বারের মত ক্ষমতাসীন হওয়ার ব্যাপারে সরকারের আত্মবিশ্বাসের কমতি নেই।

একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনই কি সমাধান? গত আড়াই দশকে কম-বেশি এরকম ৪টি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই সময়কালে যে দুটি দল ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে, তাদের মনোজমিন এবং প্রায়োগিক সকল ক্ষেত্র জুড়ে আছে শুধুমাত্র ক্ষমতা, গোষ্ঠিতন্ত্র, উত্তরাধিকার এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের অবাধ লুন্ঠন। সবশেষে সম্পদ বিদেশে পাচার করে নিরাপদ থাকা।

টানা আট বছর ক্ষমতায় থাকার প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে আওয়ামী লীগের রাজনীতি ও অর্থনীতির ভিত এখন সুদৃঢ়। দেশের রাজনীতি ও অর্থনীতির প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ নিয়ন্ত্রন তাদের হাতে। মিডিয়া-তথ্য-প্রবাহ ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাও তারা নিয়ন্ত্রন করছেন। এই দলকে ঘিরে বিশাল একটি সুবিধাভোগী গোষ্ঠি দাঁড়িয়ে গেছে। অপরিমেয় অর্থ-বিত্তের মালিক এই গোষ্ঠির সুফল প্রাপ্তি অব্যাহত ও নিশ্চিত রাখতে দলটি দীর্ঘমেয়াদে দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছে ক্ষমতার সবুজ মাঠের দিকে। সেজন্য আগামী নির্বাচনেও সর্বশক্তি নিয়োগ করবে তারা।

ভাষা আন্দোলন : মওলানা ভাসানীর ভূমিকা

শাহ আহমদ রেজা ::

দেশে ইতিহাস বিকৃতির সুচিন্তিত অভিযান চালানোর অভিযোগ শক্তিশালী হয়ে উঠেছে বলেই বিশেষ করে ভাষা আন্দোলনের মাসে আংশিকভাবে হলেও সঠিক ইতিহাস তুলে ধরার পাশাপাশি অসত্য তথ্য সংশোধন করাকে আমরা জাতীয় দায়িত্ব মনে করি। প্রাসঙ্গিক একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বাংলাদেশের জাতীয় নেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। সাধারণ মানুষের মুক্তির জন্য আজীবন সংগ্রাম করেছেন তিনি। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পাকিস্তানের প্রথম বিরোধী দল আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মওলানা ভাসানী। ১৯৫৭ সালের জুলাই পর্যন্ত দলটির সভাপতি হিসেবে তিনি পূর্ব বাংলার তথা পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন আদায়ের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাঁর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের কেন্দ্রে ও পূর্ব পাকিস্তান প্রদেশে সরকার গঠন করেছে (সেপ্টেম্বর, ১৯৫৬)। পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকদের শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে স্বায়ত্তশাসনের যে পর্যায়ক্রমিক আন্দোলন ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে রূপান্তরিত হয়েছিল, মওলানা ভাসানী ছিলেন তার প্রধান নির্মাতা। স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার ডাকও তিনিই প্রথম দিয়েছিলেন। ১৯৫৭ সালের ৭-৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক কাগমারী সম্মেলনে পশ্চিম পাকিস্তানকে ‘আসসালামু আলাইকুম’ জানানোর পর তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৭০ সালের ৩০ নভেম্বর সুরা কাফেরুনের আয়াত উল্লেখ করে বলেছিলেন, ‘লাকুম দ্বীনুকুম ওয়ালিয়া দ্বীন’। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপর আজকের বাংলাদেশ তথা তৎকালীন পূর্ব বাংলার ওপর শোষণ, বঞ্চনা ও অবিচারের সূচনা হলে প্রথমে ব্যক্তিগতভাবে এবং পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগের মাধ্যমে তিনি স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলনকে ক্রমাগত তীব্রতর করেছিলেন। স্বায়ত্তশাসনের বিকল্প হিসেবে পরিপূর্ণ স্বাধীনতার পক্ষে জনমত সংগঠিত করার মাধ্যমে মওলানা ভাসানী সমগ্র পূর্ব বাংলাকে পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছিলেন। স্বাধীনতামুখী সে অবস্থান থেকে জনগণকে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। ব্যর্থ হয়েছিল এমনকি এক পাকিস্তানভিত্তিক সমঝোতার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টাও।

১৯৪৮ সাল থেকে বিকশিত ভাষা আন্দোলনের প্রতিটি পর্যায়ে মওলানা ভাসানীর ছিল বলিষ্ঠ ও গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা নিয়ে বিতর্কের প্রাথমিক পর্যায়ে কেবল বিবৃতিতে বা জনসভার ভাষণে নয়, পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক পার্লামেন্ট ‘ব্যবস্থাপক সভায়’ও তিনি বাংলা ব্যবহারের দাবিতে সোচ্চার থেকেছেন। যেমন প্রাদেশিক ১৯৪৮ সালের ১৭ মার্চ ব্যবস্থাপক সভার অধিবেশনে মওলানা ভাসানী ইংরেজির পরিবর্তে বাংলা ভাষা ব্যবহার করার দাবি জানিয়েছিলেন। বিষয়টি নিয়ে পার্লামেন্টের ভেতরে তিনি অবশ্য আর কথা বলার বা দাবি জানানোর সুযোগ পাননি। কারণ, স্বল্প সময়ের মধ্যে মুসলিম লীগ সরকার মিথ্যা অভিযোগে ব্যবস্থাপক সভায় তাঁর সদস্যপদ বাতিল করিয়েছিল।

ওদিকে, পাকিস্তানের জাতির পিতা ও গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ‘উর্দু এবং একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ বলে ঘোষণা দেয়ার পর থেকে পূর্ব বাংলায় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে অনুসরণ করে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানও ঢাকা সফরে এসে কথিত ‘প্রাদেশিকতার’ কঠোর সমালোচনা করেছিলেন। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিকে অত্যন্ত ‘অশোভন’ আখ্যা দিয়ে তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন, ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার মীমাংসা হইয়া গিয়াছে।’ (১৮ নভেম্বর, ১৯৪৮) তখনও পর্যন্ত আসাম মুসলিম লীগের সাবেক সভাপতি হিসেবে পরিচিত মওলানা ভাসানী প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের রাষ্ট্রভাষা সংক্রান্ত মন্তব্য ও পূর্ব বাংলাবিরোধী বক্তব্যের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করেছিলেন। এভাবে বিরোধিতার মধ্য দিয়েই তাঁর সরকারবিরোধী ভূমিকার আরম্ভ হয়েছিল। ফলে তাঁর ওপর নেমে এসেছিল নির্যাতন। তিনি দক্ষিণ টাঙ্গাইল থেকে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু সরকার তাঁর এই নির্বাচনকে বাতিল করে দেয়। সেই সাথে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ নেয়ার ওপর আরোপিত হয় নিষেধাজ্ঞা। কিন্তু সরকারের সঙ্গে আপস করার পরিবর্তে মওলানা ভাসানী আন্দোলনের পথে এগোতে থাকেন, প্রতিষ্ঠা করেন প্রথম প্রভাবশালী বিরোধী দল আওয়ামী মুসলিম লীগ। ১৯৪৯ সালের অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান আবারও বাংলা ভাষা ও কথিত ‘প্রাদেশিকতার’ সমালোচনা করলে প্রতিবাদে মওলানা ভাসানী ঢাকায় এক বিরাট বিক্ষোভ মিছিলের নেতৃত্ব দেন। প্রধানমন্ত্রীর সফরকালেই আরমানিটোলা ময়দানে তাঁর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জনসভা থেকে রাষ্ট্রভাষাসহ বিভিন্ন বিষয়ে পূর্ব বাংলার দাবি তুলে ধরা হয়। আন্দোলন দমন করার উদ্দেশ্যে ১৯৪৯ সালের ১৪ অক্টোবর মওলানা  ভাসানীকে গ্রেফতার করে সরকার।

লিয়াকত আলী খানের হত্যাকান্ডের পর প্রধানমন্ত্রী পদে নিযুক্তি পেয়ে ঢাকা সফরকালে ঢাকার সন্তান খাজা নাজিমউদ্দিনও উর্দুকেই রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবির বিরোধিতার পাশাপাশি তিনি মওলানা ভাসানীর বিরুদ্ধেও কঠোর বক্তব্য রেখেছিলেন। ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত জনসভায় প্রধানমন্ত্রী নাজিমউদ্দিন মওলানা ভাসানীকে ‘ভারতের চর’ হিসেবে চিহ্নিত করে বলেছিলেন, তাঁর উদ্দেশ্য পাকিস্তানের সংহতি নষ্ট করা। জবাবে এক দীর্ঘ বিবৃতিতে মওলানা ভাসানী বলেছিলেন, জনগণ মুসলিম লীগের শাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে বলে এবং নিজেদের পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে পড়তে শুরু করেছে বলেই খাজা নাজিমউদ্দিন বেসামাল হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে ‘আবোলতাবোল’ অভিযোগ আনছেন।

খাজা নাজিমউদ্দিনের রাষ্ট্রভাষা সংক্রান্ত ঘোষণার প্রতিবাদে ১৯৫২ সালের ৩১ জানুয়ারি বিকেলে ঢাকা বার লাইব্রেরি মিলনায়তনে সর্বস্তরের বিশিষ্ট নাগরিকদের এক সভায় গঠিত হয়েছিল ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ’। ৪০ সদস্যবিশিষ্ট সে কর্মপরিষদের এক নম্বর সদস্য ছিলেন মওলানা ভাসানী। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সময় পর্যন্ত অবিভক্ত বাংলা শাখা মুসলিম লীগের সেক্রেটারি আবুল হাশিম ও আতাউর রহমান খানের মতো প্রবীণ ও প্রতিষ্ঠিত নেতাদের পাশাপাশি অলি আহাদ, মোহাম্মদ তোয়াহা ও আবদুল মতিনের মতো ছাত্র ও যুবনেতারাও এতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলেন। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা কমিটি ঢাকা নগরীর সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ৪ ফেব্রুয়ারি যে ধর্মঘটের এবং সভা ও শোভাযাত্রার কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল কর্মপরিষদের পক্ষ থেকে সে সবের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানানো হয়েছিল। একাধিক বিবৃতি ও ভাষণে মওলানা ভাসানীও কর্মসূচির সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেছিলেন। ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী রাজধানীর সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে সেদিন পাঁচ হাজারের বেশি ছাত্রছাত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে এসে সমবেত হয় এবং দীর্ঘ মিছিল নিয়ে বিক্ষোভ করে। বিকেলে রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত জনসভায় দেয়া ভাষণে মওলানা ভাসানী পূর্ব বাংলার সঙ্গে মুসলিম লীগ সরকারের বিশ্বাসঘাতকতার কঠোর সমালোচনা করেন এবং রাষ্ট্রভাষার দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত অবিরাম সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন।

১৯৫২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার ১৫০ নম্বর মোঘলটুলিতে মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সভায় সরকার ১৪৪ ধারা জারি করলে সেটা ভঙ্গ করা হবে কি হবে না- এই প্রশ্নে দীর্ঘ বিতর্ক চলে। উল্লেখযোগ্যদের মধ্যে অলি আহাদ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার পক্ষে বক্তব্য রেখেছিলেন। তাকে সমর্থন জানিয়ে মওলানা ভাসানী বলেছিলেন, যে সরকার গণআন্দোলনকে বানচাল করার জন্য অন্যায়ভাবে আইন প্রয়োগ করে সে সরকারের জারি করা নিষেধাজ্ঞাকে মাথা নত করে মেনে নেয়ার অর্থ স্বৈরাচারের কাছে আত্মসমর্পণ করা। মওলানা ভাসানীর এই দৃঢ় অবস্থানের ফলে আন্দোলন জোরদার হয়ে ওঠে। ওই সভার এক প্রস্তাবেই ২১ ফেব্রুয়ারি সর্বাত্মক ধর্মঘটের কর্মসূচি ঘোষিত হয়। পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে সরকার ২০ ফেব্রুয়ারি রাত থেকে এক মাসের জন্য সব মিছিল-সমাবেশ নিষিদ্ধ করে ১৪৪ ধারা জারি করে।

চরম উত্তেজনাপূর্ণ সে পরিস্থিতিতে ঢাকার ৯৪ নম্বর নবাবপুরে অবস্থিত আওয়ামী মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় অফিসে অনুষ্ঠিত হয়েছিল সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের জরুরি সভা। এতে দীর্ঘ বিতর্কের পর ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করার পক্ষে বেশি ভোট পড়লেও পরদিন ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করেই বিক্ষোভ মিছিল বের হয়েছিল। সে মিছিলের ওপরই গুলি চালিয়েছিল পুলিশ। আগের কর্মসূচি অনুযায়ী মওলানা ভাসানী এ সময় ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে প্রদেশের বিভিন্নস্থানে আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য সাংগঠনিক সফরে ছিলেন। ২১ ফেব্রুয়ারি গুলিবর্ষণ ও ছাত্রহত্যার খবর জেনেই তিনি ঢাকায় চলে আসেন এবং পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গায়েবানা জানাজায় অংশ নেন। ভাষা সৈনিক মোহাম্মদ সুলতানের মতে তিনিই জানাজার নামাজে ইমামতি করেছিলেন। অন্যদিকে আরেক ভাষা সৈনিক গাজীউল হক বলেছেন, তিনি মোনাজাত পরিচালনা করেছিলেন। ভাষা আন্দোলনের সমর্থক সাপ্তাহিক ‘সৈনিক’ লিখেছিল, ‘মেডিকেল কলেজের সম্মুখে তিনি (অর্থাৎ মওলানা ভাসানী) লক্ষ লোকের একটি গায়েবানা জানাজায় নেতৃত্ব করেন।’ (বশীর আল হেলাল, ‘ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস’, পৃ- ৩৭৪-৩৭৭)

২২ ফেব্রুয়ারি এক বিবৃতিতে মওলানা ভাসানী বলেছিলেন, ‘ঢাকায় যাহা ঘটিয়াছে তাহার নিন্দা করার ভাষা আমার জানা নাই। কোন সভ্য সরকার এরূপ বর্বরোচিত কান্ড করিতে পারে দুনিয়ার ইতিহাসে তার নজির খুঁজিয়া পাই না।… আমি মোমেনশাহী, পাবনা, কুমিল্লা সফর করিয়া গতরাত্রে ঢাকায় ফিরিয়া যাহা দেখিলাম তাতে আমার কলিজা ভাঙ্গিয়া গিয়াছে। নূরুল আমীন সরকার অবশেষে জাতির ভবিষ্যৎ ছাত্রসমাজকে দমাইবার জন্য চরম পন্থা অবলম্বনে মাতিয়াছে।… আমি দাবী করি, অবিলম্বে ১৪৪ ধারা প্রত্যাহার করা হউক, পুলিশী গুলীর তদন্ত করার জন্য হাইকোর্ট জজ ও জনপ্রতিনিধি নিয়া গঠিত কমিশন নিযুক্ত করা হউক। আমি অপরাধীদের প্রকাশ্য বিচার দাবী করিতেছি। এই ব্যাপারে যাদের গ্রেফতার করা হইয়াছে তাদের মুক্তি দেওয়া এবং যাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারী করা হইয়াছে অবিলম্বে তাহা প্রত্যাহার করা হউক। সর্বোপরি শহীদদের পরিবার-পরিজনকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা হউক।…’ (মওলানা ভাসানী প্রতিষ্ঠিত সাপ্তাহিক ইত্তেফাক, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২)

ভাষা আন্দোলনকে ব্যর্থ করে দেয়ার উদ্দেশ্যে সরকার অসংখ্য ছাত্র ও রাজনৈতিক নেতাকে গ্রেফতার করেছিল। মওলানা ভাসানীর বিরুদ্ধে জারি করেছিল গ্রেফতারি পরোয়ানা। মওলানা ভাসানী আদালতে হাজির হয়ে গ্রেফতার বরণ করেছিলেন ১০ এপ্রিল (১৯৫২)। কারাগারেও তাঁর সংগ্রাম অব্যাহত ছিল। রাষ্ট্রভাষা ও স্বায়ত্তশাসনসহ পূর্ব বাংলার বিভিন্ন দাবি পূরণ এবং আন্দোলনকালে গ্রেফতার করা রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি আদায়ের জন্য মওলানা ভাসানী এ সময় নতুন ধরনের অনশন শুরু করেন। সারাদিন তিনি রোজা রাখতেন অর্থাৎ পানাহার করতেন না। অনশন ভাঙতেন সন্ধ্যার পর। তাঁর অনুপ্রেরণায় অন্য অনেক বন্দীও একইভাবে অনশন করতে থাকেন। রাজবন্দী অলি আহাদ ও ধনঞ্জয় দাশ লিখেছেন, মওলানা ভাসানীর পরামর্শে তারা ৩৫ দিন রোজা রেখেছিলেন এবং এর ফলে কারাগারের ভেতরে-বাইরে বন্দীদের মুক্তির জন্য আন্দোলন জোরদার হয়েছিল। পর্যায়ক্রমে অনেকে মুক্তিও পেয়েছিলেন। মওলানা ভাসানীকে মুক্তি দেয়া হয়েছিল ১৯৫৩ সালের ২১ এপ্রিল। রোজা রাখার ধারাবাহিকতায় ১৮ এপ্রিল থেকে তিনি আমরণ অনশন শুরু করেছিলেন। এতে তাঁর শরীর খারাপ হতে থাকে, সে খবর প্রকাশিত হলে জনগণের মধ্যে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। জনমতের চাপে সরকার তাঁকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। উল্লেখ্য, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ১৯৫৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি কারাগারে মওলানা ভাসানী একদিনের অনশন করেছিলেন।

এভাবেই বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার সংগ্রামে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছিলেন মওলানা ভাসানী। সেকালের আরো অনেক নেতাও প্রাথমিক পর্যায়ে অংশ নিয়েছিলেন সত্য কিন্তু তাদের সবাইকে শেষ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। যেমন ভাষা আন্দোলনের অন্যতম ছাত্রনেতা গাজীউল হক জানিয়েছেন, ‘মওলানা ভাসানীসহ যে ৪২ জন নেতা এই আন্দোলনের সপক্ষে ছিলেন, তাঁদের মধ্যে প্রভাবশালী কয়েকজন মন্ত্রিত্ব ও রাষ্ট্রদূতের পদ নিয়ে আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করেন।’ (ধানসিঁড়ি সংকলন, চতুর্থ প্রকাশনা, ১৯৮০, পৃ-৫৮) এখানে পাকিস্তান আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা ও পরবর্তীকালের প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ভূমিকা সম্পর্কেও জানানো দরকার। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় গুলিবর্ষণ ও ছাত্রহত্যার পর সমগ্র প্রদেশে যখন সরকারের বিরুদ্ধে ধিক্কার উঠেছিল এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলন যখন আরো দুর্বার হচ্ছিল তেমন এক পরিস্থিতির মধ্যেও ২৪ ফেব্রুয়ারি পশ্চিম পাকিস্তানের হায়দরাবাদ থেকে প্রদত্ত এক বিবৃতিতে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বলেছিলেন, ‘… ঘটনা বর্তমানে ঘটিলেও বহু পূর্বেই পূর্ব বংগে ভাষা সম্পর্কে বিতর্ক দেখা দিয়াছে। আমি সেই সময় একটি জনসভায়ও এক বিবৃতিতে বলিয়াছিলাম, যে-আদর্শের ভিত্তিতে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে তদনুসারে উর্দুই হইবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা।… বাংলার বুকে অবশ্য উর্দুকে জোর করিয়া চাপাইয়া দেওয়া হইবে না, তবে বিদ্যালয়ে আবশ্যিক দ্বিতীয় ভাষারূপে ইহা পড়ান হইবে এবং যথাসময়ে এই প্রদেশবাসীগণ এই ভাষার সহিত পরিচিত হইয়া উঠিলে প্রদেশের শিক্ষিত সমাজ ও সরকারী কর্মচারীগণ আপনা হইতেই ইহা পড়িতে ও লিখিতে শুরু করিবে। তখন উর্দু তাহাদের নিকট গৌরবজনক মর্যাদাই লাভ করিবে এবং পূর্ব পাকিস্তানীরাও দুই ভাষাভাষী হইবে।…’ (দৈনিক আজাদ, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২)

উল্লেখ্য, মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর এই বক্তব্যের কঠোর বিরোধিতা করে প্রতিবাদ জানিয়েছিল। দলের সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক এক বিবৃতিতে বলেছিলেন, ‘সংবাদপত্রে জনাব সোহরাওয়ার্দীর এক বিবৃতি দেখিয়া আমরা অত্যন্ত বিস্মিত হইলাম। উহাতে তিনি পরোক্ষভাবে উর্দুকেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষারূপে গ্রহণের জন্য ওকালতী করিয়াছেন।… উহাতে তাহার ব্যক্তিগত অভিমতই প্রকাশিত হইয়াছে বলিয়া বুঝিতে হইবে এবং আমরা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করিতেছি যে, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মোছলেম লীগ বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষারূপে গৃহিত না হওয়া পর্যন্ত এবং সরকার কর্তৃক কার্যকরী না করা পর্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন চালাইবে। আওয়ামী লীগের ঘোষণাপত্রে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষারূপে গ্রহণ করিবার দাবী করা হইয়াছে এবং এই প্রতিষ্ঠান গঠিত হওয়ার পর হইতেই আমরা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষারূপে গ্রহণ করিবার জন্য আন্দোলন করিয়া আসিতেছি।’ (দৈনিক আজাদ, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২)

বলা দরকার, দলের পাশাপাশি মওলানা ভাসানী নিজেও প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষেই বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছিলেন। মূলত আওয়ামী লীগ সভাপতি হিসেবে তাঁর অব্যাহত দাবি ও চাপের কারণেই ১৯৫৬ সালে রচিত পাকিস্তানের প্রথম সংবিধানে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছিল।

লেখক : সাংবাদিক ও ইতিহাস গবেষক

ই-মেইল: shahahmadreza@yahoo.com

 

ভারত-বাংলাদেশ প্রাচীর : ট্রাম্পের জন্য উদাহরণ

সুধা রামচন্দ্রন ::

অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ ::

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তার ভাষায় ‘দুর্বৃত্ত, মাদক ব্যবসায়ী এবং ধর্ষণকারীদের’ দূরে রাখতে মেক্সিকোর সাথে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ ৩,২০০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ‘মহা, মহা প্রাচীর’ নির্মাণের যে পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন, সেটা মোটেই নতুন কোনো আইডিয়া নয়। আরো অনেক দেশ- এগুলোর কেউ কেউ ইসলামফোবিয়া বা  ইসলামভীতিতে তাড়িত হয়ে- অবৈধ অভিবাসী, সন্ত্রাসী ও অপরাধীদের দূরে রাখতে তাদের প্রতিবেশীদের সীমান্তে বেড়া দিয়েছে।

এসব দেশের কাছ থেকে শিক্ষা নিলে ট্রাম্প ভালো করবেন। এসব বেড়া বা প্রাচীর কেবল বিশেষভাবে অকার্যকরই হয়নি, এগুলোর নির্মাণ, ব্যবস্থাপনা করা অর্থ ও মানব-জীবনের দিক থেকে বিপুল ব্যয়বহুল।

ভারতের উদাহরণটি বিবেচনা করুন। দেশটি তার প্রতিবেশী পাকিস্তান ও বাংলাদেশ সীমান্তে প্রাচীর দিয়েছে। বাংলাদেশের সাথে সীমান্তে ভারতের প্রাচীর দেওয়ার প্রধান লক্ষ্য হলো- বাংলাদেশী অভিবাসীদের ভারতে প্রবেশ থেকে বিরত রাখা। প্রাচীর নির্মাণের সিদ্ধান্তটি সামনে আসে ১৯৮০-এর দশকে। তখন আসাম রাজ্যে বাংলাদেশীদের অভিবাসন রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত বিস্ফোরক ইস্যুতে পরিণত হয়েছিল।

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে দীর্ঘ ৪,০৯৭ কিলোমিটার ‘ছিদ্রযুক্ত, ঝাঝরা’(পোরাস বর্ডার) সীমান্ত রয়েছে। এই সীমান্ত সমভূমি, নদী, পাহাড়, ধান ক্ষেত দিয়ে এঁকে বেঁকে চলে গেছে। এই সীমান্ত অঞ্চলটি অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ। এখানে বাসকারী লোকজন নানাভাবে আন্তঃসীমান্তের বা এপার-ওপার মিলিয়েই সম্পর্কিত; এই সম্পর্ক কারো কারো কাছে কয়েক শ’বছরের, কারো কারো কাছে নতুন।

আট ফুট উঁচু কাঁটাতারের প্রাচীরের কোনো কোনো স্থান বিদ্যুতায়িত। এ ধরনের প্রাচীর  আছে সীমান্তের প্রায় ৭০ ভাগ এলাকায়; ভয়াবহ কাঠামো। কিন্তু এটা স্বজনদের সাথে সাক্ষাত করা কিংবা জীবিকার নিরাপত্তার সন্ধানে দুর্গম সফর থেকে অভিবাসীদের বিরত রাখতে পারছে না। উভয় পক্ষের চোরাকারবারি, মাদক বাহক, আদম পাচারকারী, গরু কারবারিরা তাদের ব্যবসার জন্য নিয়মিত সীমান্ত অতিক্রম করে থাকে, অনেক সময় ভারতীয় ও বাংলাদেশী সীমান্তরক্ষীদের সম্মতিতেই।

হাওয়াই বিশ্বাবিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং ‘ভায়োলেন্ট বর্ডার্স : রিফ্যুজিস অ্যান্ড দি রাইট টু মুভ’গ্রন্থের লেখক রিস জোন্স বলেন, ‘সীমান্ত বেড়া বলতে গেলে কখনোই অভিবাসন ঠেকাতে পারে না।’ তিনি উল্লেখ করেন, বেশির ভাগ সীমান্ত খুবই দীর্ঘ এবং খুবই হালকাভাবে পাহারা দেওয়া। ফলে ফাঁকা স্থান দিয়ে লোকজনের চলাচলে তেমন কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না।

বাংলাদেশের এক আইনজীবী এবং অভিবাসন নির্গমনের গুরুত্বপূর্ণ সোর্স দ্য ডিপ্লোম্যাটকে বলেন, প্রাচীরটা ‘পানি-নিরোধক’নয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সীমান্ত যখন নদী দিয়ে চলে (সীমান্তের প্রায় ১,১১৬ কিলোমিটার হলো নদীপথে)- সেখানে কোনো প্রাচীর নেই। বাংলাদেশের সাথে আসাম সীমান্তের প্রায় ৪৪ কিলোমিটার ব্র‏হ্মপুত্র নদীতে। এই নদী আবার প্রতি বছর গতি বদলায়। এই নদীতে স্থায়ী প্রাচীর দেওয়া সম্ভব নয়। অবশ্য টহল নৌযান মোতায়েন করা হয়েছে। কিন্তু তা দিয়ে পারাপার তদারকি করা সম্ভব নয়। দুই দেশের লোকজন ফাঁক-ফোকর গলিয়ে ঠিকই পাড়ি দিয়ে দেয়। তাছাড়া প্রাচীরটার ‘অনেক ক্রসিং পয়েন্ট আছে, লোকজন ভুয়া কাগজপত্র কিংবা ঘুষ দিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করতে পারে,’ জানান জোন্স। ফলে সীমান্ত প্রাচীর ‘[মানুষজনের] চলাচলের প্যাটার্ন পাল্টে দিলেও তাদের চলাচল কিন্তু থামাতে পারে না।’

ভারত থেকে সন্ত্রাসীদের দূরে রাখার ব্যাপারে প্রাচীরের সক্ষমতা প্রশ্নে জোন্স বলেন, ভারত-বাংলাদেশ প্রাচীরের ‘সম্ভব কোনো প্রভাব নেই।’তিনি উল্লেখ করেন, সন্ত্রাসীর কাছে ‘ভুয়া কাগজপত্র সংগ্রহ করার মতো টাকা থাকে। সে সহজেই চেকপয়েন্ট দিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করতে পারে। সে বৈধ কাগজপত্র দিয়েও ভ্রমণ করতে পারে।’

অভিবাসী ও অপরাধীদের দূরে রাখতে প্রাচীর কেবল ‘ব্যাপকভাবে অকার্যকরই’নয়, অনেক সময় সেটা বাস্তবায়ন করার জন্য অনেক সহিংস ঘটনাও ঘটে। প্রাচীর দিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করতে চাওয়া লোকজনকে সীমান্তরক্ষীরা নৃশংসবাবে গুলি করে হত্যা করে।

ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের ২০১১ সালে ১৫ বছর বয়স্কা বাংলাদেশী মেয়ে ফেলানির হত্যাকান্ড বিশ্বজুড়ে ক্রোধের সৃষ্টি করে। ২০১০ সালের হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০১ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত বিএসএফ সদস্যরা সীমান্ত অতিক্রমের সময় প্রায় ৯০০ বাংলাদেশীকে হত্যা করেছে।

’এই সহিংসতার শিকার অনেকেই সীমান্ত বেড়া বা  প্রাচীরের  কাছাকাছি বসবাসকারীরা- তাদের জমিতে চাষ করার সময় নিহত হয়েছে,’ জানান ওই বাংলাদেশী আইনজীবী। এভাবে অনেকেই কয়েকদিন সীমান্তের ওপারে তাদের স্বজনের বাড়িতে বেড়ানোর পর বাড়ি ফিরে আসার সময় নিহত হয়েছেন। প্রাচীর দেয়ার মতো যে কাজটি করে সেটা হলো পরিবার ও সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে ঝামেলা পাকানো। আগে লোকজন সহজেই সীমান্ত পাড়ি দিয়ে তাদের স্বজনদের সাথে দেখা করতে যেতে পারতো। কিন্তু প্রাচীর থাকায় এখন ‘তাদেরকে চোরকারবারিদের টাকা দিতে হয়, বিএসএফের সামনে তাদের জীবনের ঝুঁকি নিতে হয়,’ জানান জোন্স।

তাহলে কেন বিশেষ করে সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদী চেতনায় বিশ্বাসী, এমনকি বিদেশীভীতির ‘আবেদনসৃস্টিকারী’ ও এতেকরে সাফল্য লাভকারী সরকারগুলোর কাছে প্রাচীর এত জনপ্রিয়? সীমান্ত প্রাচীর আসলে ‘জাতীয়তাবাদী’ প্রতীক, জানান জোন্স। এগুলো ‘অন্য জনসাধারণকে বাদ দেওয়া-সংক্রান্ত আইডিয়ার’ প্রতিনিধিত্ব করে। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের বেলায় মুসলিম বাংলাদেশীদের কিংবা ট্রাম্পের পরিকল্পিত দেয়ালের বেলায় মেক্সিকানদের দূরে রাখার প্রতীক।

এসব প্রাচীর সরকাকে “কঠোর করে দেখায়, এমনভাবে যেন, তারা তথাকথিত ‘অবৈধ’ ও ‘বহিরাগতদের’ থেকে জনগণকে রক্ষা করতে দৃঢ়প্রত্যয়ী,” জানান ওই আইনজীবী। জোন্সের মতে, প্রাচীর কার্যত যা করে তা হলো, ‘ভারত বা যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসীদের জীবনকে আরো নিরাপত্তাহীন করে দেওয়া।’বস্তুত অভিবাসীদের দূরে না রেখে প্রাচীর ‘প্রায়ই লোকজনকে আরো বেশি সময় রেখে দেয়, সত্যিকার অর্থে সাময়িক শ্রম অভিবাসীদের স্থায়ী অবৈধ বাসিন্দায় পরিণত করে।’

বাংলাদেশের সাথে ভারতের সুসম্পর্ক থাকলেও ভারতের প্রাচীর-নির্মাণ এতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এটা বাংলাদেশী জনসাধারণের চোখে ভারতের ইমেজকে ‘বড়ভাইসুলভ’ হিসেবে বিদ্রুপে পরিণত করেছে। প্রাচীর-নির্মাণকে বন্ধুসুলভ কাজ মনে করা হয় না। বরং প্রাচীরকে ‘অবিশ্বাসের প্রতীক’ বিবেচনা করা হয়, যা পারস্পরিক উপলব্ধিকে চাপা দিয়ে দেয়। বাংলাদেশ এবং দক্ষিণ এশিয়ার বাকি অংশে কাজটি ব্যাপকভাবে সমালোচিত। ২০০৮ সালে দক্ষিণ এশিয়ান ম্যাগাজিন হিমালের এক সম্পাদকীয়তে বলা হয়, প্রাচীর ‘দক্ষিণ এশিয়ার মানচিত্রজুড়ে জনসাধারণের ঐতিহাসিক চলাচলের মুখে উড়ছে, আমাদের অতীত ও বর্তমান উভয়ের কাছে সম্প্রীতিপূর্ণ নয়, এমন কঠোর সীমান্তে পরিণত করেছে।’

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই অঞ্চলের জনসাধারণের মধ্যে মতবিনিময়, বাণিজ্য ও সহযোগিতা বাড়ানোর লক্ষ্যে এসব দেশের মধ্যে বিরতিহীন ভ্রমণের সুযোগ সৃষ্টির পরিকল্পনা নিয়ে বাংলাদেশ, ভুটান, নেপাল ও মিয়ানমারের কাছে ছুটে গেছে। এটা ফলপ্রসূ করার জন্য আন্তঃজাতীয় সড়ক এবং রেল যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রাচীর বৃহত্তর আঞ্চলিক সহযোগিতার এই প্রয়াসের চেতনা ও বিশ্বাসের পরিপন্থী।

দীর্ঘ মেয়াদে প্রাচীর এই অঞ্চলে সাধারণভাবে এবং বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে সমস্যা কেবল বাড়িয়েই তুলতে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ নিচু দেশ। সমুদ্রের স্তর এক মিটার বাড়লে বাংলাদেশের এক পঞ্চমাংশ এলাকা সম্ভবত তলিয়ে যাবে। বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। ভারত তিন দিক দিয়ে দেশটিকে ঘিরে রেখেছে, বেড়া এর জনগণকে কেবল ভেতরে ধাক্কা দিচ্ছে। বাংলাদেশের সবচেয়ে অরক্ষিত উপকূলীয় জেলা হলো খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট। এগুলো ভারতের সীমান্তে অবস্থিত। তাদের বাড়িঘর ও শস্য পানিতে তলিয়ে গেলে তারা কোথায় যাবে?

ভারত সমস্যাটির ব্যাপারে চোখ বন্ধ করে থাকতে পারে না। এটা কেবল অমানবিক হবে বলেই নয়, সমুদ্র স্তর বাড়লে বাংলাদেশের যে সমস্যা হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, ভারতের জন্যও তা একই ধরনের বিপর্যয়কর হবে। বস্তুত, কোনো কোনো সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের সাথে ভারতও জলবায়ু পরিবর্তনে ‘চরম ঝুঁকিপূর্ণ’দেশগুলোর অন্তর্ভুক্ত।

জলবায়ু ইস্যুতে বাংলাদেশের থেকে দূরে না থেকে ভারতের উচিত দেশটির সাথে সহযোগিতা করা। এ জন্য ভারতকে অবশ্যই প্রথমে যে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করতে হবে, তা হলো- প্রাচীর তুলে ফেলা। অবশ্য প্রাচীর দেওয়ার চেয়ে তুলে ফেলা অনেক বেশি কঠিন। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক ইচ্ছা এবং মানসিকতার পরিবর্তন। সবচেয়ে বড় কথা হলো, এটা স্বীকার করা দরকার, ভারত-বাংলাদেশ প্রাচীর এসব দেশের জনগণের জন্য সামান্যই নিরাপত্তা বয়ে এনেছে; বরং এটা নিরাপত্তাহীনতার একটি উৎসে পরিণত হয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো ট্রাম্প কি দেয়ালের লিখন বুঝবেন?

লেখক : ব্যাঙ্গালোরভিত্তিক ফ্রি-ল্যান্স সাংবাদিক ও গবেষক। তিনি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি ও নিরাপত্তা ইস্যুতে লিখে থাকেন। (দ্য ডিপ্লোম্যাট থেকে বাংলা অনুবাদ)