Home » প্রচ্ছদ কথা (page 9)

প্রচ্ছদ কথা

সরকারী তথ্যের সাথে মিল নেই আসল বাজারদরের

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন::

খাদ্যের সংকট নয়, খাদ্য কেনার ক্ষমতা লোপ পেলেই দুর্ভিক্ষ ঘটতে পারে। অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন এ উপমহাদেশে সংঘটিত দুটি দুর্ভিক্ষের কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেছেন, সে সময় খাদ্যের সংকট নয়, বন্টন ব্যবস্থার ত্রুটি এবং খাদ্য কেনার ক্ষমতা না থাকায় বিপুলসংখ্যাক মানুষ খাবার না খেতে পেরে মারা গেছেন। বাংলাদেশে বর্তমানে খাদ্যের কোনো সংকট নেই, রয়েছে খাদ্য কেনার সক্ষমতার অভাব। তবে পরিস্থিতি এতটা খারাপ নয় যে, দুভিক্ষ ঘটতে পারে। তারপরও দ্রব্যমূল্য বেড়ে এমন অবস্থায় উপনীত হয়েছে- যেখানে মানুষ তার খাদ্য তালিকা ছোট করতে বাধ্য হচ্ছে। বাড়ি ভাড়া থেকে নিত্য প্রয়োজনীয় ব্যয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে মানুষকে এটি করতে হচ্ছে। নিত্যপণ্য দিন দিন মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। সরকার দ্রব্যমূল্যের লাগাম টেনে ধরতে ব্যর্থ হওয়ায় সবকিছুই যেন সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে।

বিদায়ী ২০১৬ সালে দেশে সার্বিক জীবনযাত্রার ব্যয়ভার বেড়েছে প্রায় সাড়ে ৬ শতাংশ। ব্যয়বৃদ্ধির এই হার আগের বছরের তুলনায় শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে, এ সময়ে পণ্যমূল্য ও সেবা সার্ভিসের মূল্য বেড়েছে ৫ দশমিক ৮১ শতাংশ। পরিবারের মোট ব্যয়ের সঙ্গে তুলনা করে পণ্য বা সেবার ওজনের ভিত্তিতে জীবনযাত্রা ব্যয়ের এই হিসাব নিয়ে মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ভোক্তা স্বার্থ সংরক্ষণে কর্মকান্ড পরিচালনাকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। গত বছর সব ধরনের চাল ও ডালের দাম ছাড়াও গরুর দুধ, মাংস, আদা, রসুন, চিনি, লবণ, দেশি থান কাপড়, শাড়ি, লুঙ্গি, গেঞ্জি, তোয়ালে এবং গামছার দাম বেড়েছে। বছরজুড়েই অনিশ্চয়তা ছিল সেবা সার্ভিসের মধ্যে গ্যাস ও পানি নিয়ে। একদিকে শহরে ৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া বৃদ্ধি পাওয়ায় ভোক্তার আয়ের সিংহভাগ ব্যয় হয়েছে বাসা ভাড়া পরিশোধে। সেই সঙ্গে দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োজনীয় সেবা সার্ভিসের মধ্যে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং যাতায়াতের ব্যয়ও বৃদ্ধি পেয়েছেই।

সরকার প্রদত্ত মূল্যস্ফীতির তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য নেই বাজারের। প্রতিটি পণ্যের দাম বাড়তির দিকে থাকলেও খাদ্য মূল্যস্ফীতি কীভাবে কে ছে বা কমে, তা কারো বোধগম্য নয়। শুধু চালের দামই প্রকারভেদে কেজিপ্রতি ৩-৫ টাকা বেড়েছে। শুধু খাদ্যপণ্যের দাম নয়, ওষুধের দামও বাড়তির দিকে। গণপরিবহনের ভাড়া বেড়েছে, বেড়েছে বাড়ি ভাড়া। গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৪৫০-৪৮০ টাকা কেজি দরে। মাছের দাম বাড়তি, বেড়েছে গরীবের আমিষের উৎস বয়লার মুরগীর দামও। ভোজ্য তেলের দামও কোনো কারণ ছাড়াই বেড়েছে। চিনির বর্ধিত দাম এখনো বহাল রয়েছে। এসবের কোনো উল্লেখ নেই সরকার প্রদত্ত মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যানে।

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির একটি বড় কারণ রাজনৈতিক অর্থনীতি। অসাধু ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতাদের যোগসাজশে একটি কায়েমী স্বার্থান্ধ চক্র গড়ে উঠেছে, যার কারণে সরকারি-বেসরকারি সব উদ্যোগ সত্ত্বেও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। তাত্ত্বিকভাবে রাজনৈতিক অর্থনীতি বলতে আমরা রাজনীতি ও অর্থনীতির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে বুঝে থাকি। অন্য কথায়, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া ছাড়া অর্থনৈতিক দুষ্কর্ম পরিচালিত হতে পারে না। বাংলাদেশে রাজনৈতিক সুবিধাবাদীদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির ন্যক্কারজনক ও ঘৃণ্য অপতৎপরতায় লিপ্ত হতে পারছে। রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া ছাড়া কখনোই আমদানিকারক, ব্যবসায়ী, মধস্বত্বভোগী বা খুচরা বিক্রেতারা কোনো ফন্দি বাস্তবায়ন করতে পারে না।

সাধারণ মানুষ আজ কোনদিকে যাবে তা ভেবে দিশেহারা। বিশেষ করে সীমিত আয়ের মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের তো দৈনন্দিন জীবন রক্ষা করাই দায়; মুটেমজুর, কামার-কুমার, কৃষি ও দিনমজুর তদুপরি ছিন্নমূল মানুষের কথা তো লেখাই বাহুল্য। ভালো নেই কৃষকরাও। বারবার বাম্পার ফলন ফলিয়েও বাজারে গিয়ে প্রতারিত হতে হচ্ছে তাদের। তারা না পাচ্ছেন ধানের দাম, না চালের। না পাট বা অন্যান্য ফসলের- যেমন শাকসবজি, তরিতরকারি। প্রায় সব স্থানেই মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম প্রবল। মিল ও চাতাল মালিকদের খপ্পরে পড়ে কৃষক একদিকে যেমন ধান-চালের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে সাধারণ মানুষকে বাজারে গিয়ে উচ্চমূল্যে কিনতে হচ্ছে খোরাকির চাল। গত কয়েক মাসে মোটা চালসহ সবরকম চালের দাম বেড়েছে। মাঝখানে একবার সরকার সীমিত পরিমাণে চাল রফতানির সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। পরে অভ্যন্তরীণ খাদ্য নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে স্থগিত করে সিদ্ধান্ত। তবে সরকারের এই সিদ্ধান্তসহ বিরূপ আবহাওয়া, ঘন কুয়াশা ও শৈত্যপ্রবাহের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে চালের বাজারে।

শাকসবজি, আটা, ডাল, তেল, মাছ, মাংস, ডিমের দামেও মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব অস্বীকার করা যাবে না। বর্তমানে বাজারে এমনকি আদা-রসুন-পেঁয়াজ ও অন্যান্য মশলার দামও বাড়ছে। বার্ড ফ্লুর প্রকোপে ছোটবড় অনেক খামার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গত কয়েক বছর ধরেই ডিম ও ব্রয়লারের বাজারে পরিলক্ষিত হচ্ছে ব্যাপক অস্থিরতা। গবাদিপশু ও দুধের ক্ষেত্রেও তাই। মাছও দুর্মূল্য-সহজলভ্য না হওয়ায়। ফলে সামাজিক ও পারিবারিকভাবে প্রবল হয়ে দেখা দিচ্ছে প্রোটিন ঘাটতি। চাল ও আটার দাম বাড়ায় এখন শর্করার ঘাটতিও অনিবার্য। ফলে দু‘বেলা দু’মুঠো খেয়ে সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকাই বর্তমানে রীতিমতো দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সীমিত পরিমাণে ন্যায্যমূল্যে চাল ও আটা বিক্রির ব্যবস্থা করেছে। তবে এ সুযোগ পৌঁছায় না সর্বত্র। কেবল রাজধানী ও নগরজীবনেই সীমাবদ্ধ। গ্রামাঞ্চলে ভিজিএফ, কাবিখা, কাবিটাজাতীয় কিছু সামাজিক কর্মসূচি চালু থাকলেও সেসব সর্বত্রগামী-এমন কথা বলা যাবে না; এরও একটা দলীয় বিবেচনা আছে। ফলে গণমানুষের দুর্ভোগ ও দুশ্চিন্তা বাড়ছেই। বর্তমান আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার নিজেদের কৃষি ও কৃষকবান্ধব বলে পরিচয় দেয়। দেশব্যাপী দারিদ্র্য নিরসন কর্মসূচিতেও তাদের কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ আছে। তবে কৃষকদের ধান-চালের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণসহ সাধারণ মানুষের আয় বাড়ানোর ব্যাপারে তেমন উদ্যোগ-আয়োজন চোখে পড়ে না। গত কয়েক বছরে দেশি-বিদেশী বিনিয়োগ প্রায় বন্ধ। ফলে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি তো দূরের কথা, গ্যাস-বিদ্যুতের অভাবে পুরনোগুলোই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফলে অনিবার্য বাড়ছে বেকারত্ব। বাড়ছে মূল্যস্ফীতি। মাঝখানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে টিসিবিকে সক্রিয় করে তোলার কথা শোনা গেলেও আশব্যঞ্জক অগ্রগতি নেই।

বিশ্লেষকদের দাবি, দেশে কোন পণ্যের চাহিদা কী সে হিসাব নেই সরকারের কাছে। নেই আন্তর্জাতিক বাজারের দাম ও সরবরাহ ব্যবস্থার হালনাগাদ তথ্যও। চাহিদা ও জোগানের মধ্যে সমন্বয় রেখে সারা বছর বাজারে পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার জন্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাও সরকার গড়ে তোলেনি। জরাগ্রস্ত সরকারি বিপণন প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরও নখদন্তহীন। পাস হয়নি প্রতিযোগিতা আইন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে পণ্যের চাহিদা ও আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি সম্পর্কে হালনাগাদ তথ্য সরকারের কাছে থাকতে হবে। আগাম ব্যবস্থা নিয়ে নিশ্চিত করতে হবে চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্য। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির পর তৎপরতা দেখালে চলবে না, এজন্য বছরজুড়েই পণ্যের দামের ওপর নজরদারি রাখতে হবে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশে কোন পণ্যের চাহিদা কত, উৎপাদন কত হবে, কী পরিমাণ আমদানি করতে হবে, কোন দেশে কোন পণ্য পাওয়া যাবে, দাম কেমন হবে- এসব বিষয়ে বিশ্বাসযোগ্য কোনো তথ্য নেই সরকারের কোনো সংস্থার কাছে। ব্যবসায়ীরা যে যার মতো আমদানি করছেন। কখনো দরকারের চেয়ে বেশি আমদানি করে লোকসানের মুখে পড়ছেন ব্যবসায়ীরা, আবার কখনো কম আমদানি করে বাজারে সরবরাহের ঘাটতি তৈরি করে পণ্যের দাম বাড়াচ্ছেন। আন্তর্জাতিক বাজারের কথা বলে তারা নিজেরাই নির্ধারণ করে দিচ্ছেন খাদ্যপণ্যের স্থানীয় বাজার দর। আর সেই দরই সরকার মেনে নিচ্ছে। তাই ভোক্তা অধিকার আইন করে, পরিবেশক প্রথা চালু করে, মোবাইল কোর্ট বসিয়েও খুচরা পর্যায়ে দাম ঠিক রাখা যাচ্ছে না। মোটকথা, সরকারের সদ্বিচ্ছার অভাবই হচ্ছে  এর মূল কারন।

‘স্বৈরাচার’কে ভালবাসা দিবস

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

জয়নাল, জাফর, দিপালীদের কথা মনে আছে? অপার সম্ভাবনাময় টগবগে সেইসব তরুন, সামরিক স্বৈরাচারের প্রতিরোধ করতে গিয়ে নিষ্ঠুর হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছিলেন। দিনটি ছিল ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি; এখন যেটি ‘ভালবাসা দিবস’। মনে আছে রাউফুন বসুনিয়া, সেলিম, দেলোয়ার, নুর হোসেনদের কথা? সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে কথা বলায় যাদের গুলি করে, ট্রাক চাপা দিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। এদের অনেকের মরদেহ গ্রামের কৃষক বাবা মায়ের কাছে পৌছোয়নি।

মাত্র আড়াই দশকে সব চাপা পড়ে গেছে। সব রক্তদান, নির্মম হত্যাকান্ডের ঘটনা বিস্মৃত হয়ে গেছে। কারন, যার নির্দেশে এসব হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়েছিল, যেসব ছাত্রনেতা হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছিলেন, তাদের দল এবং হত্যাকারীর দল এখন ক্ষমতার সহভাগী। যুদ্ধাপরাধী জামায়াতকে পুনর্বাসন ও ক্ষমতার সহভাগী করার পাপ যেমন বিএনপির জন্য অমোচনীয়, তেমনি প্রাক্তন সামরিক স্বৈরাচারকে পুনর্বাসন ও ক্ষমতার সহভাগী করার ঐতিহাসিক দায়ও নিতে হবে আওয়ামী লীগকে।

১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি সামরিক স্বৈরাচার বিরোধী স্মারক দিবস। তখন সামরিক স্বৈরশাসক এরশাদ। তার বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ ছাত্রদের। মাত্র দু’বছর আগে প্রতিরোধহীন ক্ষমতা দখল করা সেনাপ্রধান এরশাদের বিরুদ্ধে সেটিই ছিল প্রথম সংগঠিত প্রতিবাদ। হাজারো শিক্ষার্থীর মিছিলে গুলি চালায় স্বৈরাচারের পুলিশ বাহিনী। মিছিল রক্তাক্ত হয় সেদিন ও পরের দিন যারা শহীদ হয়েছিলেন- তাদের মধ্যে কয়েকজনের নাম জানা গিয়েছিল মাত্র।

রক্তাক্ত ঐ দিনগুলিতে কতজন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছিলেন? সঠিক সংখ্যা জানা যায়নি। জানা যায়নি কখনও। অনেকের মরদেহ ইচ্ছাকৃত মাটিচাপা পড়েছে। স্বজনরা জানতে পারেনি কখনও। স্বৈরাচারী শাসকের নির্দেশে হত্যার পরে লাশ ‘গায়েব’ করে ফেলেছিল পুলিশ। নাম না জানা এসব শিক্ষার্থীদের শেষ ঠিকানা কোথায় হয়েছে – তা আজ অবধি অচিহ্নিত থেকে গেছে; হয়তো চিরদিনের জন্যই!

১৪ ফেব্রুয়ারি এখন ভালবাসা দিবস। ভালবাসা প্রকাশের একটি স্মারক দিন হিসেবে ১৪ ফেব্রুয়ারি ছাড়িয়েছে পশ্চিমা জগতের সীমানা। জায়গা করে নিয়েছে এদেশেও। পশ্চিমা ঢেউ, তথ্য প্রযুক্তি আর বাজার অর্থনীতির লোলুপতা এই দিনের ক্রেজ ক্রমশ: বাড়িয়ে দিচ্ছে। কর্পোরেট বাণিজ্যের অংশ হিসেবে মিডিয়াও ফি-বছর দিনটি নিয়ে হচ্ছে মাতোয়ারা। সোশ্যাল মিডিয়ায় এর জয়-জয়াকার। ইলেকট্রনিক মিডিয়ার অনুষ্ঠান, সংবাদ, টক-শো সব হয়ে উঠেছে এই দিবসের ক্রীড়নক।

এর আড়ালেই চাপা পড়ে আছে এই দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গৌরব-গাঁথা এবং অবশ্যই নিষ্ঠুর ট্রাজেডি। চাপা পড়ে আছে সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে দ্রোহ আর বিদ্রোহ। এরশাদের নিয়োগকৃত মজিদ খানের কুখ্যাত শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-প্রতিরোধের অদম্য গল্প অচিহ্নিত লাশের মত মাটিচাপা পড়ে গেছে। ভালবাসা দিবসের বিকিকিনির আড়ালে রক্তস্নাত আত্মত্যাগ কখন হারিয়ে গেছে বাঙালীর স্মৃতিভ্রষ্টতা, আবেগ আর ভাবালুতায়। রঙভরা বর্তমান প্রভাবিত করছে, রাজনৈতিক সুবিধাবাদ ও নীতিভ্রষ্টতায় এখন প্রায় সকলেই মোহাবিষ্ট।

ভালবাসা দিবসের মত নানা দিবস পালিত হয় বিশ্বে। ৩৬৫ দিনে জাতিসংঘের উদ্যেগে পালিত দিবসের সংখ্যা ১৩২টি। অধিকাংশ দিবস তৈরীর নেপথ্যে থাকে কর্পোরেট বাণিজ্যিক স্বার্থ। এর মধ্যে অন্যতম ভালবাসা দিবস। একজন খ্যাতনামা সাংবাদিক সাপ্তাহিক ‘যায় যায় দিন’ পত্রিকার মধ্য দিয়ে এদেশে ভালবাসা দিবস আমদানী করেন। এটি কি তিনি পরিকল্পিতভাবে করেছিলেন? তখনকার দিনে পত্রিকাটির প্রভাব বিবেচনায় তিনি স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস হিসেবেও দিনটিকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারতেন। তিনি তা করেননি। তিনি যা করেছেন, তা সকলকে বিশেষ করে তরুনদের দারুনভাবে প্রভাবিত করেছে। এর সাথে যোগ হয়েছে কর্পোরেট বাণিজ্য। এখন ভালবাসা দিবস আর বাণিজ্য মিলে-মিশে একাকার।

আমাদের রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবি, সাংস্কৃতি অঙ্গনের মহারথীগন-তারা কি কখনও বলেছেন ১৪ ফেব্রুয়ারি ‘স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস’। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের সাফল্যের পরিনতিতে শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া হয়ে উঠেছেন প্রধান জাতীয় নেতা। এরশাদের পতনের পর তারা পালাক্রমে দেশের কর্ণধার হয়েছেন। প্রথমবার ক্ষমতায় এসে খালেদা জিয়া যতটুকু সফল ছিলেন দ্বিতীয়বার এসে বেশি পরিমানে ব্যর্থ হয়েছেন। দ্বিতীয় মেয়াদে গোপনে-প্রকাশ্যে আপোষের চেষ্টা করেছেন এরশাদের সাথে। পিতার খুনী হিসেবে অভিযুক্তের সাথে তারেক রহমান করেছেন আপোষ-রফার সভা।

শেখ হাসিনা প্রথমবার ক্ষমতায় এসে স্বৈরাচার বিরোধী মতাদর্শ দুরে সরিয়ে দেন। ১৯৮২ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের পরে তারা এরশাদকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে এরশাদের সঙ্গী হয়েছিলেন। ১৯৯৬-র প্রথম মেয়াদে এরশাদকে ক্ষমতার সঙ্গী করেছিলেন। দ্বিতীয় মেয়াদে মহাজোট গড়েছেন এবং ক্ষমতার অংশীদার করেছেন। তৃতীয় মেয়াদে এরশাদকে পুরস্কৃত করেছেন ‘বিশেষ দূত’ হিসেবে। এর ফল হিসেবে হত্যা মামলায় অভিযুক্তের গাড়ি জাতীয় পতাকা শোভিত হয়েছে।

রাজনীতির পঙ্কিলতায় আড়াই দশক পেরিয়ে পতিত স্বৈরাচার ইতিমধ্যে মূল রাজনীতির প্রয়োজনীয় চরিত্রে পরিনত। দলে-বলে হয়েছে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অংশীদার। এই কারনে স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস জনমন থেকে মুছে গেছে। উজ্জল হয়ে উঠেছে ‘ভালবাসা দিবস’। সামরিক স্বৈরাচার পতনের পর কথিত গণতান্ত্রিক শাসকরাও তাকেই অনুসরনীয় রেখেছেন। সরকার ও সরকারী বাহিনী এবং দলীয় ক্যাডারদের আক্রমনাত্মক আচরন বহাল থাকায় মানুষ অতীত রক্তাক্ত দিনগুলিকে বর্তমানের যন্ত্রনায় স্মরণে রাখছে না।

ক্ষমতার লোভ দ্বারা পরিচালিত আওয়ামী লীগ ও বিএনপি স্বৈরাচার প্রতিরোধ বা পতন দিবস কোনটিকেই আর ধারন করে না এবং তাদেও পক্ষে তা সম্ভবও নয়। এরশাদ সাক্ষাতকার দিয়ে নুর হোসেনকে ‘মাদকাসক্ত’ বললেও প্রতিবাদ করে না দুই দল। একই সময়ে ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের বিচ্যুতি ছিল সবচেয়ে বড় বিপর্যয়। তারা ভুলে যেতে থাকে স্বৈরাচার প্রতিরোধ ও পতন দিবস। জয়নাল, দিপালী, নুর হোসেন ও ডা: মিলনদের তারা ভুলে যায়। আবার এরশাদ যে সরকারের ‘বিশেষ’জ দূত সেখানে মেনন ও ইনু দু’জনেই মন্ত্রী। রাজনৈতিক সুবিধা-আপোষের এরচেয়ে বড় উদাহরন আর কি হতে পারে!

ভ্রষ্ট রাজনীতিক, ঠিকাদার, ব্যবসায়ী ছাত্রনেতারা এখন সব ভুলে মগ্ন অর্থ ও প্রতিপত্তি অর্জনে। তারা ভালবাসা দিবস পালনে শরীক হয়েছেন। এখনকার ছাত্রনেতারা ক্ষমতার লোভ বা ভয়ে আপন অস্তিত্ব ভুলে গেছেন। কথিত বুদ্ধিজীবি, সাংস্কৃতিক কর্মী প্রায় সকলেই দলদাস ভূমিকায়। ফলে তরুন প্রজন্মকে কে মনে করিয়ে দেবে ভালবাসা দিবস পালনের পাশাপাশি স্বৈরাচার বিরোধী দিবসও পালন করা জরুরী।

এরশাদের বিরুদ্ধে নয় বছরের ধারাবাহিক আন্দোলন, সেই ক্যালেন্ডারের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ তারিখ ১৪ ফেব্রুয়ারি এখন গতায়ু ইতিহাস। অবৈধ ক্ষমতা দখলকারী সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ ও আত্মাহুতির দিন ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি। জাতির ইতিহাসে এটি ‘স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস’। এরশাদ পতনের পর বিএনপি ও আওয়ামী লীগসহ বাম ঘরানার রাজনৈতিক দলগুলো গুরুত্বের সাথে দিনটি পালন করতো। কিন্তু এখন গণতন্ত্র, স্বৈরাচার, বাম-ডান সব মিলে-মিশে একাকার। আর এজন্যই ১৪ ফেব্রুয়ারি এখন শুধুই ভালবাসার!  স্বৈরাচারকে ভালবাসার?

খুন-জখম : এখন শুধুই নিজেরা বনাম নিজেরা

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

সাংবাদিক হত্যায় কে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর কে রাণার আপ, সে কূটতর্কে না গিয়ে বলা হোক- সাংবাদিকরা হত্যা- নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতি, সাংবাদিকদের মধ্যেকার অনৈক্য, সাংবাদিক নেতৃবৃন্দের দলদাস ভূমিকা এবং পেশাগত মানের নিম্নগামিতা, সর্বোপরি আইনের শাসনহীনতায়। অস্বীকার করি কি করে, এই দেশে এখন সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সাংবাদিক, সম্পাদকের বিরুদ্ধে সম্পাদক, গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে গণমাধ্যম। হালের স্বরাষ্টমন্ত্রীর আবিস্কার ‘ধাক্কা-ধাক্কি’ তত্ত্ব। এই তত্ত্বের মূল বিষয় হচ্ছে, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সাংবাদিকদের নির্যাতন করে না, মাঝে-মধ্যে ‘ধাক্কা’ লেগে যায়।  সেজন্যই তাদের ভাবনায়- কথায় সাংবাদিক হত্যায় কেউ চ্যাম্পিয়ন আর কেউ রানার আপ।

প্রতিপক্ষবিহীন ক্ষমতাসীন দল, ছাত্র-যুব-শ্রমিক সংগঠন। গজিয়ে উঠেছে অজস্র ভূঁইফোড় সংগঠন। শহরে-নগরে, গ্রামে-গঞ্জে জায়গা পেলেই দখল করে কোন না কোন লীগের সাইনবোর্ড টাঙ্গিয়ে দেয়া হয়। বিলবোর্ডে ছেয়ে গেছে সকল জনপদ। প্রতিপক্ষ না থাকায় মাঠ পর্যায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও সংঘাত-হানাহানিতে জড়িয়ে পড়ছে ক্ষমতাসীন দল, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। তাদের হাতে গুলিবিদ্ধ হচ্ছে মাতৃগর্ভের শিশু, মারা পড়ছে সাংবাদিক, পথচারীসহ নিরীহ মানুষ। সংঘর্ষের মূূলে থাকছে নির্বাচনী বিরোধ, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, মাদক ব্যবসা, দখল, ভাগাভাগি ইত্যাদি।

গণমাধ্যম জানাচ্ছে, মাত্র তিনদিনে পাঁচ জেলায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছে। জেলাগুলি হচ্ছে- খুলনা, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, নড়াইল ও শেরপুর। গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছে সাংবাদিক, খবর শুনে মারা গেছে তার নানী। নড়াইলে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি খুন হয়েছেন নির্বাচনকালীন বিরোধের জেরে। শেরপুরে কলেজ অধ্যক্ষ ও আওয়ামী লীগ নেতা এবং ঈশ্বরদীতে যুবলীগ-ছাত্রলীগের চার কর্মী গুলিবিদ্ধ ও অস্ত্রের আঘাতে জখম হয়েছেন। খুলনার ফুলতলায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছে যুবলীগ নেতা।

চাঁদপুরের হাইমচরের উপজেলা সভাপতি ও উপজেলা চেয়ারম্যান ছাত্রদের দিয়ে পদ্মা সেতু বানিয়ে তাদের পিঠের ওপর দিয়ে জুতা পায়ে হেঁটে উল্লাস প্রকাশ করেছেন। দলের সাধারন সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, বহিস্কার করা হয়েছে এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাও নেয়া হবে। বলেননি- কি আইনী ব্যবস্থা নেয়া হবে। আশা করি, মধ্যযুগীয় সামন্ত প্রভুদের মত আচরন করা লোকদের জন্য দল ও আইন শীগগিরই ব্যবস্থা নেবে। তবে মাত্র তিনদিনের পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, দলের নেতা-কর্মীরা এখন কতটা বেপরোয়া!

গত ১৭ জানুয়ারি সুনামগঞ্জে জলমহাল দখলকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের মধ্যে সংঘর্ষে খুন হয় ৩ জন, জখম হয় ২২জন। আগের দিন মঠবাড়িয়ায় স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতাকে কুপিয়ে আহত করা হয়। বছর শুরুর আগের রাতে খুলনায় আওয়ামী লীগ নেতা ও সিটি কাউন্সিলরকে লক্ষ্য করে ছোড়া গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে মারা যান পুজোর ফুল নিতে আসা এক নারী। নগরীর কোটি কোটি টাকার মাদক ব্যবসা এ সংঘর্ষের মূল কারণ বলে গণমাধ্যমগুলির অনুসন্ধানে উঠে আসছে।

গত বছর জুলাইয়ে খুলনা ও কুমিল্লায় অভ্যন্তরীন কোন্দলে ছাত্রলীগের তিন নেতা-কর্মী খুন হন। পরের সাড়ে তিনমাস তারা সংঘর্ষবিহীন কাটালেও নভেম্বরের দিকে আবার গণমাধ্যমের শিরোনামে উঠে আসে। চট্টগ্রামে ক্ষমতাসীন দলের নেতা ১৯ নভেম্বর ছাত্রলীগ কর্মীদের হাতে লাঞ্চিত হন। পরদিন নিজ বাসায় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সহ-সম্পাদকের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। পরিবারের অভিযোগ, হত্যা করে লাশ ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে।

২০১৭ সাল শুরু হওয়ার দিনে গণমাধ্যমে প্রধান শিরোনামগুলিই ছিল ‘বাসায় ঢুকে সংসদ সদস্যকে হত্যা’; ‘খুলনায় আওয়ামী লীগ নেতাকে হত্যার চেষ্টা, গুলিতে গৃহবধু নিহত’; এরকমই আতঙ্ক ছড়ানো সব খবর নিয়ে স্বাগত জানাতে হয়েছে নতুন বছরকে। স্বাভাবিকভাবেই উৎকন্ঠিত মানুষ। দিনে-দুপুরে, রাত-বিরেতে নিজেদের প্রতিপক্ষ বানিয়ে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা ঝাঁপিয়ে পড়ছে ‘ট্রিগারহ্যাপী’ হয়ে উঠছে। মারছে নিরীহদের, নিজেদের তো বটেই।

লক্ষ্য করুন, পর পর দু’দিনের জাতীয় সংবাদপত্রগুলির শিরোনাম, ‘ক্ষমতাসীন দলের সংঘর্ষ: হানাহানি ও খুন-জখমের ঘটনা’; ‘আবার হানাহানিতে আ. লীগ গুলিবিদ্ধ সাংবাদিকের মৃত্যু’; ‘ঘরের আগুনে পুড়ছে আওয়ামী লীগ’; ‘ক্ষমতাসীন দল বেপরোয়া’; ‘শাসক দলে কেন এতো খুনোখুনি’; এর কারণ হিসেবে বিভিন্ন সূত্র, রাজনীতিবিদ ও সুশীল সমাজের বরাতে দেয়া বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দীর্ঘ ক্ষমতায় দেশজুড়ে চরম বেপরোয়া হয়ে উঠেছে আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মী। দলের অনেক মন্ত্রী, এমপি, জেলা চেয়ারম্যান, উপজেলা চেয়ারম্যান, মেয়র ও দলীয় পদধারী নেতারা মধ্যযুগীয় সামন্ত শাসকদের মত আচরন করছেন।

এসব ভাষ্য- বিশ্লেষণে দাবি করা হচ্ছে, ব্যক্তিগত স্বার্থ আর ক্ষমতার দ্বন্দ্ব থেকে বের হতে পারছে না ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা। রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও খুনোখুনিতে জড়িয়ে পড়ছে তারা। অপরাধ দমন বা কমে না আসার কারন হচ্ছে, খুন বা সংঘর্ষের সাথে যারা যুক্ত, সামান্য ব্যতিক্রম ছাড়া, তারা আইন ও বিচারের আওতায় আসছে না। ফলে ক্ষমতাসীন দলের যে কোন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের বদ্ধমূল ধারনা তারা যা খুশি তাই করে পার পেয়ে যেতে পারি। সবচেয়ে বড় আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, তাদের দলীয় সংঘর্ষের বলি হচ্ছে নিরীহ সাধারনরা।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ও প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপির মধ্যে ১৩ টি সংঘর্ষে নিহত হয়েছে ১ জন, আহত হয়েছে ১৯০ জন। কিন্তু ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীন অর্থাৎ আওয়ামী লীগ বনাম আওয়ামী লীগের সংঘর্ষের ঘটনা ৮৮ টি। খুন হয়েছে ৮৩ জন, আহত ১০৫২ জন। ছাত্রলীগ বনাম ছাত্রলীগ, যুবলীগ বনাম যুবলীগ, ছাত্রলীগ বনাম ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ৩৫ টি। নিহত ৪, আহত ২০৬ জন।

আগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য দলকে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত প্রস্তুত করার ঘোষণার পর যেন বেড়ে চলেছে অভ্যন্তরীন কোন্দল, হানাহানি ও সংঘর্ষ। ২০১৬ সালে ছয় দফায় অনুষ্ঠিত ইউপি নির্বাচনে দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়া সহিংসতায় খুন হয়েছিলেন ১১৬ জন, যার মধ্যে ৭১ জন আওয়ামী নেতা-কর্মী।  তার আগের দু’বছর ২০১৪ ও ২০১৫ সালে ক্ষমতাসীন এই দলের অভ্যন্তরীন সংঘর্ষে খুন হয়েছে ৬৭ জন নেতা-কর্মী।

এই পরিসংখ্যান বলে দিচ্ছে, আওয়ামী লীগের বর্তমান প্রতিপক্ষ ক্ষমতাসীন দল। দৃশ্যত: তারা আইনের উর্ধে অবস্থান করছেন। প্রকাশ্য দিবালোকে অস্ত্রের মহড়া ও সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে রক্ত ঝরাচ্ছেন। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পদক্ষেপ নেয়ার বদলে দর্শক বনে যাচ্ছে। এর কারনও ওপেন সিক্রেট। পুলিশের সামনে আগ্নেয়াস্র বহনের ছবি প্রকাশিত হলেও ভাষ্য আসে: পুলিশ খবর নিচ্ছে আগ্নেয়াস্ত্রটি কি বৈধ নাকি অবৈধ! মানে দাঁড়াচ্ছে প্রচলিত আইন ক্ষমতাসীনদের জন্য প্রযোজ্য নয়।

সবকিছুর প্রতি ক্ষমতাসীনদের সীমাহীন অবজ্ঞা। বিরোধী রাজনৈতিক দলের প্রতি ক্ষমতাসীনদের অবজ্ঞা ক্ষমতায় থাকতে না হয় জনগন দেখতে অভ্যস্ত। যারা সরকারের সমালোচনা করেন, মার্কিন লেখক এইচ এল মেনকেনের ভাষায়- চিন্তাশীল মানুষই সরকারের সবচেয়ে বড় শত্রু । এদের প্রতি এবং জনগনের প্রতি চরম অবজ্ঞার বিষয়েও সকলে অভ্যস্ততা অর্জন করেছেন। কিন্তু আইনের শাসনের প্রতি অবজ্ঞা মনে করিয়ে দিচ্ছে, ক্ষমতাসীন হলেই তারা জবাবদিহিতার উর্ধে চলে যান। অন্য দিকে একটি দল নিজের সাংগঠনিক শৃঙ্খলা রক্ষা করতে পারছে না, সেজন্য কি নিরীহ জনসাধারন প্রাণ দিতেই থাকবে?

ময়মনসিংেহের গফরগাওয়ের বাদল মিয়া (৫৮) একজন রেলকর্মী, মারা গেলেন রেলে কাটা পড়ে। এরকম মৃত্যু বাংলাদেশে গ্রামে-গঞ্জে, শহর-বন্দরে আকছার ঘটে থাকে। যে দেশে স্বাভাবিক মৃত্যু গ্যারান্টি প্রশ্নবিদ্ধ, সেখানে বাদল মিয়াদের মৃত্যু কি বিশেষ কোন অর্থ বয়ে আনে! কিন্তু এই বাদল মিয়ার মৃত্যু অর্থহীন নয়, কোন বিচারেই নয়। এক মা ও তার শিশু সন্তানকে রেলে কাটা পড়া থেকে বাঁচাতে নিজেই রেলে কাটা পড়লেন। এই মহত্তম মৃত্যু আমাদের ফিরিয়ে দেয় মুক্তিযুদ্ধের সত্যিকার চেতনার কাছে। যারা আমাদের বর্তমানের জন্য তাদের ভবিষ্যত উৎসর্গ করেছিলেন। অথবা মনে করিয়ে দেয়, গ্রীক পূরাণের প্রমিথিউসকে, আগুন আবিষ্কার করতে গিয়ে যিনি পুড়ে মরে, মানুষকে আগুন জ্বালানো শিখিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন।

সুন্দরবন বাংলাদেশের অস্তিত্বের অংশ

আনু মুহাম্মদ ::

সুন্দরবন নিয়ে সরকারের স্ববিরোধী ভূমিকা বরাবরই প্রকট। প্রধানমন্ত্রী একদিকে আন্তর্জাতিক বাঘ সম্মেলনসহ বিভিন্ন উপলক্ষে সুন্দরবন বাঁচানোর কথা বলেন, অন্যদিকে তাঁর সরকার দেশি বিদেশি মুনাফাখোরদের স্বার্থে সুন্দরবনধ্বংসী নানা তৎপরতায় সক্রিয় থাকে। সুন্দরবনের সুরক্ষার জন্য আমরা সরকারের কাছে বার বার দাবী জানিয়েছি ক্ষতিকর সব পরিবহণ এবং প্রকল্প বন্ধ করতে। কিন্তু সরকার সুন্দরবনের গুরুত্ব সম্পর্কে নির্লিপ্ত থেকে তার সুরক্ষার পরিবর্তে নিকটবর্তী নৌ-পথে বৃহৎ নৌ-পরিবহণের অনুমতি দিয়েছে, বিশাল কয়লা পরিবহণের উপর নির্ভরশীল একাধিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের কাজ করছে, নানা ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নামে ভূমি দস্যুদেরকে জমি দখলের সুযোগ করে দিয়েছে। সুন্দরবন অঞ্চলে সরকারি ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের আরও বনজমি দখলের তৎপরতা এখন জোরদার। বিশ্বব্যাংক ও ইউএসএইডের তহবিলেও তৈরি হচ্ছে নানা প্রকল্প।

সরকারের এসব  ভূমিকা আন্তর্জাতিকভাবেও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। ইতিমধ্যে ইউনেস্কো এবং রামসার সুন্দরবন ঘিরে একাধিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ বিভিন্ন মুনাফামুখি তৎপরতায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। নরওয়ে সুন্দরবন ধ্বংসের এই প্রকল্পে যুক্ত থাকার অভিযোগ তুলে ভারতের এনটিপিসিতে অর্থযোগান বন্ধ করে দিয়েছে। কয়েকটি আন্তর্জাতিক ব্যাংক এই প্রকল্পে অর্থ যোগান না দেবার ঘোষণা দিয়েছে। দেশে সুন্দরবনধ্বংসী রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল ও বিদ্যুৎ সংকটের সমাধানে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের দাবিতে নানা প্রতিবাদী কর্মসূচি অব্যাহত আছে।

কিছুদিন আগে প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করে বলেছেন, ‘সুন্দরবন নিয়ে আন্দোলনকারিরা কেবলমাত্র ভারতের কারণেই এই বিদ্যুৎ প্রকল্পের বিরোধিতা করছে।’ খুবই ভুল কথা। আমরা বার বার বলেছি, যেসব প্রকল্প সুন্দরবনের জন্য ধ্বংসকারি তা ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন এমনকি যদি বাংলাদেশের কোন কোম্পানিরও হয় আমরা তার প্রবল বিরোধী। তিনি আরও বলেছেন ‘আন্দোলনকারিরা মানুষকে রক্ষা না করে কেবল পশু-পাখি  রক্ষায় আন্দোলনে নেমেছে।’ যে কোন সুস্থ মানুষই জানেন যে, সুন্দরবন শুধু যে অমূল্য অনবায়নযোগ্য প্রাকৃতিক সম্পদ তাই নয়, এটি রক্ষার সাথে কোটি কোটি মানুষের জীবনের নিরাপত্তা  জড়িত। প্রতিটি প্রাকৃতিক দুর্যোগে সুন্দরবন লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন রক্ষা করে। সুন্দরবন না থাকলে বাংলাদেশই অরক্ষিত হয়ে পড়বে।

বিশেষজ্ঞরা বিস্তারিত তথ্য ও যুক্তি দিয়ে দেখিয়েছেন যে, প্রাকৃতিক রক্ষাবর্ম হিসেবে বাংলাদেশের মানুষ ও প্রকৃতিকে যে সুন্দরবন রক্ষা করে, এবং অসাধারণ জীববৈচিত্রের আধার হিসেবে যা প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখে- সেই সুন্দরবনকে ধ্বংস করবে এই প্রকল্প। বিভিন্ন প্রকাশনা, গবেষণার মধ্য দিয়ে বিশেষজ্ঞরা  কেনো এই কেন্দ্র বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থবিরোধী, সুন্দরবন ও মানববিধ্বংসী, তা বৈজ্ঞানিক গবেষণালব্ধ তথ্য যুক্তিসহ তুলে ধরেছেন।  এটাও দেখানো হয়েছে যে, ভারতীয় কোম্পানি (এনটিপিসি) নিজদেশের আইন ভঙ্গ করে বাংলাদেশের জন্য সর্বনাশা এই প্রকল্পে চালকশক্তি হিসেবে যুক্ত হয়েছে।

কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র  মারাত্মক পরিবেশ দূষণ ঘটায় বলে সাধারণত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংরক্ষিত বনভূমি ও বসতির ১৫ থেকে ২৫ কিমি এর মধ্যে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের অনুমোদন দেয়া হয়না। ভারতীয় কোম্পানী বাংলাদেশে সুন্দরবনের ৯-১৪ কিমির মধ্যে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণ করতে যাচ্ছে। বাফার জোন বিবেচনা করলে এই দূরত্ব ৪ কিমি। অথচ ভারতেরই ‘ওয়াইল্ড লাইফ প্রটেকশান অ্যাক্ট ১৯৭২’ অনুযায়ী, বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ১৫ কিমি ব্যাসার্ধের মধ্যে এবং ভারতের পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় প্রণীত পরিবেশ সমীক্ষা বা ইআইএ গাইড লাইন ম্যানুয়াল ২০১০ অনুযায়ী, কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ২৫ কিমি এর মধ্যে কোন বাঘ/হাতি সংরক্ষণ অঞ্চল, জৈব বৈচিত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বনাঞ্চল,  জাতীয় উদ্যান, বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য কিংবা অন্যকোন সংরক্ষিত বনাঞ্চল থাকা অনুমোদন করা হয় না। ভারতীয় পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের ‘তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন সংক্রান্ত গাইডলাইন, ১৯৮৭‘ অনুসারেও কোন সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ২৫ কিমি এর মধ্যে কোন কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ স্থাপন করা যায় না। এজন্য গত কয়েকবছরে ভারতের কর্ণাটক, মধ্যপ্রদেশ ও তামিলনাড়–তে তিনটি বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল হয়েছে। অর্থাৎ ভারতীয় কোম্পানি এনটিপিসিকে বাংলাদেশে সুন্দরবনের যতো কাছে পরিবেশ ধ্বংস কারী কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করতে দেয়া হচ্ছে, তার নিজ দেশ ভারতে হলে সেখানকার আইন অনুযায়ী তা তারা করতে পারতো না!

এই ধ্বংসাত্মক প্রকল্পের সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় বলা হচ্ছে যে, এই প্রকল্পে সুপারক্রিটিকাল টেকনলজি ব্যবহার করা হবে, সেজন্য সুন্দরবনের কোন ক্ষতি হবে না। আমাদের প্রশ্ন- প্রথমত, এই প্রযুক্তিতে কিছু কিছু ক্ষেত্রে শতকরা ১০ ভাগ ক্ষতি কম হয় ঠিক, কিন্তু তাতে সুন্দরবনের ধ্বংসের সামগ্রিক  ক্ষতি কীভাবে কমবে? দ্বিতীয়ত, এই প্রযুক্তি যদি সুন্দরবন ধ্বংস ঠেকানোর মতো এতো নিশ্চিত প্রযুক্তি হয়, তাহলে ভারতীয় কোম্পানি কেনো ভারতে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে সকল ক্ষতি দূরীভূত করে না? কেনো গত তিন বছরে তাদের তিনটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাতিল হয়? তৃতীয়ত, একদিকে বলা হচ্ছে, এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সব বিষাক্ত ফ্লাই এ্যাশ সিমেন্ট কারখানায় ব্যবহৃত হবে। আর সারাদেশে সকল সিমেন্ট কারখানা বিজ্ঞাপন দেয়- তাদের সিমেন্টে ফ্লাই এ্যাশ ব্যবহার করা হয় না। এই ধরনের প্রতারণা কেনো?

এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ সরকারি ‘উন্নয়ন’ নীতির কারণে সুন্দরবনের ‘ইকলজিকালি ক্রিটিক্যাল এরিয়া’ বলে স্বীকৃত অঞ্চলেও শতাধিক বনগ্রাসী-ভূমিগ্রাসী বাণিজ্যিক প্রকল্প নেয়া হয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান টেলিটক অবিশ্বাস্য উদ্যোগ নিয়ে সুন্দরবনের ভেতরে ৮টি টাওয়ার বসানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে বিষাক্ত পণ্যবাহী জাহাজ পরিবহণ এখনও অব্যাহত আছে। গত ১৩ জানুয়ারি সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত পশুর নদীতে আবারো একটি ১ হাজার টন কয়লাবাহী জাহাজ ডুবে বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। এর আগে ২০১৪ এবং ২০১৫ সালে তেল, কয়লাসহ বিষাক্ত পণ্যবাহী ৩টি জাহাজ  পশুর এবং শ্যালা নদীতে ডুবেছিল। এর পরিণতিতে দীর্ঘমেয়াদে সুন্দরবনের বিপর্যয় সম্পর্কে হুশিয়ারি দিয়েছেন দেশ-বিদেশের বিশেষজ্ঞরা। এইসব জাহাজ ডুবির পর, প্রতিটি ক্ষেত্রে, সরকারের ভূমিকা ছিল ন্যাক্কারজনক। এবারের ডুবে যাওয়া কয়লাবাহী জাহাজে কয়লার পরিমাণ ছিলো আগেরগুলির তুলনায় দ্বিগুণ। সরকারের ভূমিকার কোনো পরিবর্তন হয়নি।

বন বাঁচানোর জন্য সাধারণ ধর্মঘট বা হরতালের পূর্ব দৃষ্টান্ত আছে কিনা জানিনা তবে ২৬ জানুয়ারি জাতীয় কমিটি আহুত হরতাল করে এই ইতিহাস বাংলাদেশের মানুষই তৈরি করছে। সেখানে পুলিশের বর্বর নিযাতন ও হামলা হয়েছে। কিন্তু তাতে প্রতিরোধের চেতনাকে টলানো যায়নি। কারণ এই আন্দোলনের সৈনিকদের কাছে এই সহজ সত্যটি এখন খুব স্পষ্ট যে, সুন্দরবনের যেমন কোনো বিকল্প নেই, তেমনি সুন্দরবন রক্ষার লড়াইয়ে বিজয়ী হবারও কোনো বিকল্প নেই। তাই ৮ ঘন্টা ধরে পুলিশের লাঠি, গুলি, টিয়ার গ্যাস, জলকামানের অবিরাম আক্রমণ মোকাবিলা করে, নিজের শরীরে জখম নিয়ে তারা জায়গা ধরে রেখেছে, বাংলাদেশ ধরে রেখেছে। এগুলোতে শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়েছে ঠিকই কিন্তু অপ্রতিরোধ্য চেতনা বহুগুণ হয়ে আরও অসংখ্য মানুষের মধ্যে বিস্তৃত হয়েছে। শুধু শাহবাগ নয় ঢাকার হরতালে বিভিন্ন মিছিলে ও দেশের নানাস্থানে সভা সমাবেশে হামলা-হুমকি-ধ্বস্তাধ্বস্তি হয়েছে। একদিকে ভয় দেখিয়ে ভাড়া করে রামপালপন্থী মানববন্ধন সাজিয়ে তা প্রচার করা হয়েছে, অন্যদিকে খুলনায় সুন্দরবন রক্ষার সমাবেশে পুলিশ হামলা করেছে, বন্দুক তুলে শাসিয়েছে। কিন্তু সবজায়গাতেই শ্লোগান আরও জোরদার হয়েছে ‘রামপাল চুক্তি ছুঁড়ে ফেল,  বাংলাদেশ রক্ষা কর’। কেননা সুন্দরবন বাংলাদেশের অস্তিত্বের অংশ।

কেন সংলাপ মধ্যস্থতা আলোচনা ব্যর্থ হয়

আমীর খসরু ::

বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংকট নিরসনে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেকার পারস্পরিক সংলাপ ও আলাপ-আলোচনা, এমনকি মধ্যস্থতার ইতিহাস কোনোক্রমেই সুখকর নয়। এ কারণে সব সময়ই পারস্পরিক আলাপ-আলোচনা কিংবা সংলাপের কথা বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে বহুবার উচ্চারিত এবং কয়েকবার অনুষ্ঠিত হলেও, কোনোটিতেই সংকটের কোনোই সমাধান আসেনি। এর পেছনে নানা যুক্তি খুজে দেখা যেতে পারে এবং অনেকে নানা যুক্তি খুজেও থাকেন। তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, এ পর্যন্ত প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দল কখনোই কার্যকর, স্থিতিশীল এবং সচল-সজীব গণতন্ত্রের স্বপক্ষে কোনো ইতিবাচক কাজ করেনি। এ বিষয়ে তাদের কোনো মাথাব্যাথা রয়েছে এমনটাও মনে হয়নি। গণতন্ত্রকে শুধুমাত্র নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করার বিষয়টি এখন প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। এ কথাটি বলতেই হবে যে, গণতন্ত্র হচ্ছে, সর্বজনের সামগ্রিক অধিকার প্রাপ্তির লক্ষ্যে একটি সম্পূর্ন প্যাকেজ; কোনোক্রমেই আংশিক নয়। একটি সমাজ ও রাষ্ট্রে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য নির্বাচন হচ্ছে একটি পথ এবং পন্থা মাত্র। এই পথ বা পন্থাটি সুচারুরূপে সম্পাদনের পরেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অপরাপর শর্তগুলো অর্থাৎ বাক-ব্যক্তি স্বাধীনতা, মতামত প্রকাশের অবাধ অধিকার, আইনের শাসন, সুশাসন নিশ্চিত করাসহ এ জাতীয় বিষয়গুলো সত্যিকার অর্থেই কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হচ্ছে, গণতন্ত্রে উত্তরণের প্রথম ধাপটি অর্থাৎ ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের সদিচ্ছা এবং সাথে সাথে তাদের প্রজ্ঞা, মেধার ভিত্তিতে, জনগণের কথা মাথায় রেখে শাসন কাজ পরিচালনা  করেনি কখনোই। এ কারণে দুর্বল কাঠামোর গণতন্ত্র এদেশে ক্রমশই দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়েছে। সাধারণ মানুষও এতোদিনে এ কথাটি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে পেরেছেন যে, রাষ্ট্র তাদের জন্য সহায়ক ও সহযোগিতামূলক প্রতিষ্ঠান নয়। এ কারণে রাষ্ট্রের সাথে জনগণের দূরত্ব ক্রমাগত বাড়ছেই।

রাষ্ট্র ব্যবস্থাটির উদ্ভব ও এটি কিভাবে কার্যকর ভাবে চলবে- এ সংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে যে সব রাজনীতি বিজ্ঞানী ও দার্শনিক যুগের পর যুগ নিরন্তর কাজ করে গেছেন, তাদের ভাষ্য মোতাবেক, রাষ্ট্র জনগণের সাথে একটি ‘সামাজিক চুক্তি’র ফসল। সামাজিক চুক্তিটি হচ্ছে- জনগণ তার সব অধিকার রাষ্ট্রের কাছে সমর্পণ করবে; আর রাষ্ট্র জনগণের ওই সব অধিকার নিশ্চিত করাসহ সামগ্রিক কল্যাণ সাধনে সচেষ্ট হবে। এখানে রাষ্ট্রের পক্ষে সরকার ম্যানেজার হিসেবে কাজ করবে।

এ বিষয়টি স্পষ্ট, জনগণকে জোরজবরদস্তি করে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে যে, নির্দিষ্ট সময়ান্তে নির্বাচনই হচ্ছে গণতন্ত্র। শুধুমাত্র নির্বাচনকেন্দ্রীক ব্যবস্থা যে কোনোক্রমেই পরিপূর্ণ গণতন্ত্র নয়, এ কথাটি শাসকরা কোনোভাবেই মনোজগতে স্থায়ীভাবে ঠাই দেননি। আর অধিকতর দুর্ভাগ্য হচ্ছে, এই ভোটাধিকারও এখন বিলুপ্তির পথে। এর নানা আলামত গত বেশ কয়েক বছর ধরে মানুষ প্রত্যক্ষ করছে।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠার আন্দোলন-সংগ্রাম আর লড়াই-এর পেছনে অন্যান্য অনেক কারণ রয়েছে সত্যি, তবে একটি কার্যকর ও স্থিতিশীল গণতন্ত্র সব সময় ক্রিয়াশীল ও জারি থাকবে- জনমনের এই প্রত্যাশাটি ছিল সবচেয়ে বড়মাত্রায়, ব্যাপকভাবে। এ কথাটি মনে রাখতে হবে যে, বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যে দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রাম চলেছে, তাও গড়ে উঠেছিল দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা সামরিক শাসন থেকে উত্তরণ এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। কিন্তু রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজ-অব্দি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বদলে এর উল্টো কাজগুলোই করেছে শাসকবর্গ। স্বাধীনতার পরপরই জরুরি অবস্থা জারি, বিশেষ ক্ষমতা আইনসহ নানা কালা-কানুন সংবিধানে সন্নিবেশিত করা হয়েছে। এরপরে যারাই ক্ষমতায় এসেছে, তারাই এসব অব্যাহত রেখেছে নিজ নিজ স্বার্থে। ওই যে উল্টো যাত্রা শাসকবর্গ শুরু করে দিয়েছিল- তা আজও বিদ্যমান।

এ কথাটি বারবার বলা হচ্ছে যে, আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে রাজনৈতিক সংকট মোকাবেলা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে দীর্ঘকাল সামরিক শাসন প্রত্যক্ষ করেছে, বাংলাদেশসহ এমন অতিদুর্বল গণতন্ত্রসম্পন্ন রাষ্ট্রগুলোতে পারস্পরিক সমঝোতা খুবই জরুরি। দীর্ঘ সামরিক শাসনের পরে বেসামরিক শাসকদের নানাবিধ সমস্যা মোকাবেলা করতে হয় অনিবার্য কারণেই। সামরিক শাসন কি ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে, তার একটি চমৎকার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ তুলে ধরেছে আর্জেন্টিনার আদালত। দীর্ঘ সামরিক শাসনের পরে ১৯৮০’র দশকের মধ্যসময়ে আর্জেন্টিনার সামরিক শাসকদের বিচারের মুখোমুখি করা হয়-হত্যা, গুম, বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডসহ নানা অপকর্মের জন্যে। ওই সময়ে আর্জেন্টিনার আদালত যে পর্যবেক্ষণ দিয়েছিল তাতে বলা হয়েছে, ‘সামরিক শাসন শুধুমাত্র রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই চরম ক্ষতির কারণ হয়েছে তা নয়; ওই শাসন মানুষের মূল্যবোধ, দীর্ঘকালের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ধ্বংসের পাশাপাশি মানুষের ব্যক্তিগত জীবনাচরণের উপরেও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে’। (বিস্তারিত আলোচনার জন্য দেখুন- (Argentina:The Military Juntas And Human Rights; report of the trial of the former junta members, 1985. Amnesty International Publications, UK-1987)

এ কারণেই সামরিক শাসনোত্তর বেসামরিক শাসকদের সতর্ক থাকার পাশাপাশি ওই ক্ষতির হাত থেকে স্থায়ী মুক্তির লক্ষ্যে অবিরাম চেষ্টা চালিয়ে যেতে হয়। ১৯৫৮ সালে দীর্ঘকাল সামরিক ও কর্তৃত্ববাদী শাসন প্রত্যক্ষকারী ভেনিজুয়েলা ও কলম্বিয়ার বেসামরিক শাসক দলগুলো এ লক্ষ্যে পৃথক পৃথকভাবে দুইদেশে দুটি ঐতিহাসিক চুক্তি সম্পাদন করেছিল। ভেনিজুয়েলার Punto-Fijo- নামের চুক্তিতে বলা হয়- প্রেসিডেন্ট যিনিই নির্বাচিত হবেন তিনি হবেন জাতীয় নেতা, কোনো দলের নেতা নন; ১৯৫৮ সালের নির্বাচনের পরে নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক কোয়ালিশন সরকার গঠিত হবে; আর পার্লামেন্টসহ সব পর্যায়ে রাজনৈতিক দলগুলোর আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব থাকবে এবং সব রাজনৈতিক দলগুলোই অরাজনৈতিক, বাধ্যগত ও বেসামরিক শাসকদের অনুগত একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলায় সর্বাত্মক সহায়তা করবে। একইভাবে কলম্বিয়ায়ও প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল প্রায় একই ধরনের চুক্তির মাধ্যমে বেসামরিক শাসনকে দীর্ঘমেয়াদী করার লক্ষ্যে ঐক্যমত্যে পৌছেছিল।

বাংলাদেশের সাথে এর তুলনা করলে দেখা যাবে, এ দেশটিতে এমন কোনো চিন্তা-ভাবনা কখনোই করা হয়নি এবং এখনও করা হচ্ছেনা; ভবিষ্যতে হবে এমন আলামতও দেখা যাচ্ছেনা। ১৯৯০ সালে এরশাদের সামরিক শাসনের পরে তৎকালীন তিনজোট একটি রূপরেখা প্রণয়ন করেছিল। কিন্তু প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষরিত ওই রূপরেখা বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগ কখনোই নেয়া হয়নি। অথচ বিরাট একটি সুযোগ এসেছিল গণতন্ত্রকে সুসংহত ও দীর্ঘমেয়াদী করার জন্যে। ১৯৯১ থেকে শুরু হওয়া বেসামরিক শাসন সম্পর্কে জনমনে উচ্চাশার জন্ম নিলেও, কালক্রমে তা হতাশায় রূপ নিয়েছে। প্রধান দুটো রাজনৈতিক দল ঝগড়া-ফ্যাসাদের পাশাপাশি গণতন্ত্রের পথে বাধা সৃষ্টির লক্ষ্যে পাল্লা দিয়ে কাজ করেছে ও করছে ।

বর্তমান সময়ের ‘গণতন্ত্রে’র হাল-হকিকত সম্পর্কে এদেশের প্রতিটি মানুষ অবহিত এবং তারা উপলব্ধি করতে পারছেন সামগ্রিক পরিস্থিতি সম্পর্কে। ভোটাধিকার, আইনের শাসন, সুশাসন, বাক-ব্যক্তি স্বাধীনতাসহ সর্বজনের ন্যায্য অধিকারগুলো কোন পর্যায়ে রয়েছে- তা তাদের ভালোভাবেই জানা আছে। কাজেই এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনার কোনো প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না।

বর্তমান সময়ে এসে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরেক দফা জটিলতার মধ্যে পড়েছে। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ ফেব্রুয়ারীতে শেষ হয়ে যাবে-এমন প্রেক্ষাপটে একটি স্বাধীন, দলনিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন গঠনের দাবি উঠেছে। রাষ্ট্রপতি ওই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে পৃথক পৃথকভাবে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলাপ-আলোচনা করেছেন। বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের সাথে আলাপ-আলোচনা শেষে রাষ্ট্রপতি বলেছেন, ‘আলোচনা বা সংলাপ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য কমাতে পারে। এ জন্যে রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনার উদ্যোগ নিতে হবে’।

কিন্তু ক্ষমতাসীন পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতির ওই বক্তব্যের পরেও বলা হয়েছে- ‘আলাপ-আলোচনার কোনো প্রয়োজন নেই, রাষ্ট্রপতি সংবিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবেন’। এখানেই হচ্ছে জটিলতার কেন্দ্রবিন্দু। সংবিধানের ১১৮ (১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে-… বাংলাদেশের একটি নির্বাচন কমিশন থাকিবে এবং উক্ত বিষয়ে প্রণীত কোন আইনের বিধানাবলী-সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগদান করিবেন।

কিন্তু ৪৮ (৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- এই সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদের (৩) দফা অনুসারে কেবল প্রধানমন্ত্রী ও  ৯৫ অনুচ্ছেদের (১) দফা অনুসারে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্র ব্যতীত রাষ্ট্রপতি তাঁহার অন্য সকল দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কার্য করিবেন।

আর এ কারণেই ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি ব্যবস্থা নেবেন। রাষ্ট্রপতি রাজনৈতিক দলের মধ্যে আলাপ-আলোচনার যে তাগিদ দিয়েছেন, তা ক্ষমতাসীন পক্ষ কার্যত: নাকচ করে দিয়েছে। কাজেই রাষ্ট্রপতি রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে যে আলোচনা করেছেন তার ভবিষ্যৎ কি হতে পারে, তা সহজেই অনুমান করা যায়।

আগেই বলা হয়েছে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট নিরসনে আলাপ-আলোচনা, সংলাপ ও মধ্যস্থতার ইতিহাস কোনোক্রমেই ইতিবাচক নয়। তৎকালীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আন্দোলন চলাকালে ১৯৯০’র শেষ দিকে সৃষ্ট রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনে কমনওয়েলথ-এর বিশেষ দূত হিসেবে স্যার নিনিয়ান স্টিফেন ঢাকায় এসেছিলেন। ১৯৯৪ সালের নভেম্বরে প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপির সাথে তিনি দফায় দফায় আলোচনাও করেছিলেন। কিন্তু তাতে কোনো ইতিবাচক ফল লাভ হয়নি। ২০১২ সালের ডিসেম্বরে জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত হিসেবে ঢাকা সফর করেছিলেন অস্কার ফার্ন্দানেজ তারানকো। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সাথে আলাপ-আলোচনার পরেও তার মিশন ব্যর্থ হয়েছিল। ওই সময়ে রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও সংকট নিরসনে জাতিসংঘ মহাসচিব নিজে টেলিফোনে আলাপ এবং চিঠি পাঠিয়েছিলেন প্রধান দুই নেত্রীর কাছে। ২০০৬ সালের শেষ দিকে আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল এবং বিএনপি’র তৎকালীন মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূইয়ার মধ্যে সংলাপও ব্যর্থ হয়েছিল।

‘গণতন্ত্র হচ্ছে-আলোচনা ভিত্তিক শাসন’- দার্শনিক ও রাজনীতিবিজ্ঞানী জন স্টুয়ার্ট মিলের এই বিখ্যাত পর্যবেক্ষন বোধকরি বাংলাদেশে অচল। কাজেই যতোক্ষণ পর্যন্ত না গণতন্ত্র বিষয়টি ক্ষমতাসীনসহ শাসকবর্গের মনোজগতে স্থায়ীভাবে ঠাই পাবে, ততোক্ষণ পর্যন্ত সংলাপ, মধ্যস্থতা কিংবা আলাপ-আলোচনা ব্যর্থ হতেই থাকবে।

 

কারা লাভবান কথিত উন্নয়ন উদ্যোগে?

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন ::

অমর্ত্য সেনের মতো আরো অনেকেই আজকাল উন্নয়নকে কেবল কয়েকটি সূচকের মধ্যে সীমিত না রেখে বরং সক্ষমতা অর্জনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। আবার কেউ কেউ মানুষের কল্যাণকে গৌণ ভেবে কেবল উৎপাদন বৃদ্ধি ও উন্নয়নকে গুরুত্ব দিয়েছেন। অমর্ত্য সেন বলেছেন, ‘উন্নয়ন আসলে মানুষের স্বাধীনতার চৌহদ্দি বাড়ানোর প্রক্রিয়া। মানুষ তার নিজের চাওয়া-পাওয়া কতটা মেটাতে পারছে সে প্রশ্নটি উন্নয়নের সংজ্ঞায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ’। একথা ঠিক যে উন্নয়নের জন্য মানুষের চিন্তা ও কাজের স্বাধীনতা বড় প্রয়োজন। আমরা যদি মেনে নিই যে-সৃষ্টিশীলতার মাধ্যমে উন্নয়নকে এগিয়ে নেয়া সম্ভব। তবে সৃষ্টিশীলতার জন্য মানুষকে চিন্তার স্বাধীনতা দিতে হবে। অনিশ্চয়তা আর হুমকির আড়ালে রাখতে হবে ; নইলে সৃষ্টির প্রেরণা আসবে না। আবার উন্নয়ন সাধনই যথেষ্ট নয়। উন্নয়নের ধারাবাহিক গতি বা টেকসই হতে হবে। টেকসই উন্নয়নের ধারণা এসেছে মানুষকে ভবিষ্যতের জন্যেও চিন্তাহীন রাখতে।

গুডল্যান্ড এবং লিডকের মতে, ‘টেকসই উন্নয়নকে সামাজিক এবং কাঠামোগত অর্থনৈতিক রূপান্তরের ধারা বা উন্নয়ন হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা যায়- যা বর্তমানের সহজলভ্য অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সুবিধাসমূহের সর্বোচ্চ বৃদ্ধি সাধন ঘটায় এবং ভবিষ্যতের জন্য তাকে বিপদাপন্ন করে তোলে না।’ উন্নয়ন বলতে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে অর্থনৈতিক উন্নয়ন। অর্থনীতিবিদরা অর্থনৈতিক উন্নয়ন বলতে বুঝিয়েছেন অর্থনৈতিক স্তরের পরিবর্তন। কোন কোন দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধনের মাধ্যমে দেশটিকে এগিয়ে নেয়া বা সামনের স্তরে, অগ্রসর করা। এর মধ্যে রয়েছে দেশটির জাতীয় আয়, মাথাপিছু আয়, উৎপাদন ক্ষমতা ও জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি। অধ্যাপক রস্টোর মতে, বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি, উৎপাদনের নতুন কলাকৌশল ও যন্ত্রপাতির আবিষ্কার, মানুষের নিরবচ্ছিন্ন উদ্যম, মূলধন গঠন ও সন্তান-সন্তুতি লাভের প্রবণতার মধ্যেই দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল উপাদানগুলো নিহিত হয়েছে।

বাংলাদেশের উন্নয়ন হচ্ছে ঠিকই, তবে সেটি ধনীক শ্রেণীর। গরীবরা গরীব হচ্ছে; উচ্চ প্রবৃদ্ধি হলেও আয়ের সুষম বণ্টন না থাকায় বৈষম্য বাড়ছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রথাগত কয়েকটি সূচক হচ্ছে জাতীয় আয়, মাথাপিছু আয়, মানব উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক কল্যাণ। কোন দেশের জাতীয় আয় বাড়তে থাকলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়েছে বলে ধরে নেয়া হয়। যদিও জাতীয় আয় বৃদ্ধির তুলনায় জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার বেশি হলে মাথাপিছু আয়ও জনগণের জীবনযাত্রার মান কমে যায়। যে কারণে অধ্যাপক মেয়ার মাথাপিছু আয়কে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সূচক হিসাবে গ্রহণ করেছেন। তারমতে, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার অপেক্ষা জাতীয় আয় বৃদ্ধির হার অধিক হলেই তাকে উন্নয়ন বলা যায়। জাতীয় আয়কে দেশের জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে প্রকৃত মাথাপিছু আয় পাওয়া যায়। অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম মাপকাঠি মানব উন্নয়ন সূচক। জাতিসংঘ সদস্য রাষ্ট্রসমূহের মানব উন্নয়ন পর্যালোচনা করে মানব উন্নয়ন রিপোর্ট প্রকাশ করে। মানব উন্নয়ন সূচকে মানুষের শিক্ষা, আয়ুষ্কাল, ক্রয়ক্ষমতা প্রভৃতি বিবেচনা করা হয়। তবে এই সূচকে জাতীয়ভাবে তথ্য নেয়া হয়। কিন্তু ধনী-গরীব বৈষম্য, আঞ্চলিক বা গ্রাম শহরের বৈষম্য আমলে নেয়া হয় না। ফলে এই সূচকে প্রকৃত উন্নয়ন বোঝা যায় না। অনুরূপ কথা প্রযোজ্য অর্থনৈতিক কল্যাণের ক্ষেত্রেও। ভোগবাদী ধারণাকে এখানে গুরুত্ব দেয়া হয়।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ হিসাবে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রায় ১৭ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ১৫ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা। এ হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশের অর্থনীতি বড় হয়েছে ২ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা। এর অর্ধেকের বেশি এসেছে ভোগ ব্যয় থেকে। ৩০ শতাংশের বেশি এসেছে বেসরকারি বিনিয়োগ থেকে। আর মাত্র সাড়ে ৫ শতাংশ এসেছে সরকারি ব্যয় থেকে। যেহেতু বাংলাদেশে রফতানি আমদানির চেয়ে কম, তাই নিট রফতানি হিসেবে বাংলাদেশে বৈদেশিক বাণিজ্য থেকে বর্ধনশীল প্রবৃদ্ধিতে কোনো যোগ হয় না।

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) তাদের সাম্প্রতিক এক হিসাবে দেখাচ্ছে, বাংলাদেশে সরকারি ব্যয় গত এক দশকে কয়েক গুণ বাড়লেও জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে সরকারি ব্যয়ের প্রভাব তেমন একটা বাড়েনি। উল্টো কিছুটা কমেছে। ২০১৬ সালে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ কনসলিডেটিং এক্সপোর্ট-লিড গ্রোথ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এডিবি বলছে, ২০০০-০৯ সময়ে বর্ধনশীল জিডিপির ৫৮ দশমিক ১ শতাংশ এসেছে ভোগ ব্যয় থেকে। বেসরকারি বিনিয়োগ থেকে এসেছে ৩৬ শতাংশ। আর সরকারি ব্যয় থেকে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ। অন্যদিকে ২০১০-১৪ সময়ে বর্ধনশীল জিডিপির ৫৪ দশমিক ২ শতাংশ ভোগ ব্যয় থেকে এসেছে। এ সময়ে বেসরকারি বিনিয়োগ থেকে এসেছে ৪১ দশমিক ৭ শতাংশ ও সরকারি ব্যয় থেকে ৫ দশমিক ১ শতাংশ।

বাজেটে ব্যয়ের একটি হয়ে থাকে, উন্নয়ন খাতে ও অন্যটি অনুন্নয়ন খাতে। সরকারের ব্যয়ের সিংহভাগই চলে যাচ্ছে অনুন্নয়ন খাতে। সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতাসহ আরো বিভিন্ন খাতে এ অনুন্নয়ন ব্যয় প্রতি বছরই বাড়ছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে সরকারের প্রশাসনিক ব্যয় ধরা হয়েছে মোট ব্যয়ের ১৩ দশমিক ৯ শতাংশ। এদিকে, উন্নয়ন খাতে সরকারের ব্যয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে। তবে এ ব্যয়ের মান ও এর সময়োপযোগিতা নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন রয়েছে। ফলে জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে এ ব্যয়ের ভ‚মিকা প্রতিফলিত হচ্ছে না। চলতি অর্থবছর ৩ লাখ ৪০ হাজার ৬০৫ কোটি টাকার বাজেটে উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার ৭০০ কোটি টাকা।

সড়ক, রেল ও নৌপথে প্রতি বছর বিপুল অংকের বিনিয়োগ করছে সরকার। তবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সেবাপ্রাপ্তিতে তা তেমন কোনো প্রভাব রাখতে পারছে না। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের তথ্য বলছে, যোগাযোগ অবকাঠামোর মান বিবেচনায় বাংলাদেশের অবস্থান ১৪০টি দেশের মধ্যে ১১৭তম। এর মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থা সড়ক-মহাসড়কের। একই ধরনের অবস্থা রেল ও নৌ-যোগাযোগের ক্ষেত্রেও। যোগাযোগ অবকাঠামোর মানের দিক দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পেছনের সারিতে অবস্থান বাংলাদেশের।

অবকাঠামো উন্নয়নে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এছাড়া অনেক প্রকল্পই চলমান। তবে পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের অভাবে অবকাঠামোগত দুর্বলতা দূরীকরণে ভূমিকা রাখতে পারছে না এসব প্রকল্প। সড়ক-মহাসড়কের উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণে প্রতি বছর বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে। অথচ সারা দেশে সড়ক ও মহাসড়কের ৪০ শতাংশ ভাঙাচোরা। নকশা, পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ সঠিক না হওয়ার কারণে রাজধানীর সব ফুট ওভারব্রিজ অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে। আবার বিপুল অর্থ ব্যয়ে একাধিক ফ্লাই ওভারব্রিজ তৈরি হলেও তা সব শ্রেণীর মানুষের যাতায়াতের চাহিদা পূরণ করতে পারছে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিনিয়োগের সুফল পেতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, আইনের শাসন, নিয়ন্ত্রণ পরিবেশ, জবাবদিহিতার মতো সূচকে বাংলাদেশ এ অঞ্চলের দেশগুলোর চেয়ে পিছিয়ে। বিশ্বব্যাংকের সুশাসন সূচকে দেখা যায়, সার্কের দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে দুর্নীতি এখনো বড় ধরনের উদ্বেগের বিষয়। আর এ দুর্নীতির সিংহভাগই হচ্ছে সরকারি ক্রয়, রাজস্ব ও শুল্ক আদায়ের ক্ষেত্রে। একই চিত্র দেখা যায় শিল্প ও বাসাবাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগের মতো সরকারি নানা পরিষেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে।

বাংলাদেশের উন্নয়নের মূল সুফলভোগী ধনীরা। ধনীরা দ্রুতগতিতে সম্পদ বাড়াচ্ছে, ফলে আয়-বৈষম্য বেড়েই চলেছে। আর দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠি কোনো রকমে বেঁচে রয়েছে।  ২০১৪-১৫ অর্থবছরে দেশের উচ্চবিত্তদের একটি হিসাব করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সেখানেও দেখা যায়, দেশের মোট সম্পদের বেশির ভাগের মালিক মাত্র দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ মানুষ। তাদের বার্ষিক আয় ৪৪ কোটি ২০ লাখ টাকার উপরে। এসব ব্যক্তির সম্পদ আছে কোটি টাকার বেশি। এদের মধ্যে অনেকেই আবার শত কোটি থেকে সহস্রাধিক কোটি টাকার মালিক। হিসাবটি করা হয়েছে আয়কর জমার বিবরণী থেকে। ধারণা করা যায় এতে ব্যাপক গড়মিল রয়েছে। কেউ সম্পদের প্রকৃত তথ্য প্রকাশ করতে চায় না। দেশের অধিকাংশ সম্পদ ধনী শ্রেণীর হাতে বন্ধি। প্রকৃত অর্থে সম্পদের পরিমাণ আরো বেশি হবে। এরাই দেশের অর্থনীতির মূল সুবিধাভোগী। অবকাঠামো নির্মাণ থেকে শুরু করে ব্যাংক প্রতিষ্ঠাসহ নানা সুবিধা কাজে লাগিয়ে সম্পদ সৃষ্টি করছে ধনী শ্রেণী। কারণ সরকারের সুবিধা ভোগ করার মতো সব ধরনের ক্ষমতা তাদেরই রয়েছে। এটাই তাদের সম্পদ বহুগুণে বাড়িয়ে দিচ্ছে। দুর্নীতি আর লুটপাটের মাধ্যমে একটি শ্রেণী দ্রুত অর্থ-বিত্তের মালিক হচ্ছে। ফলে বাধাগ্রস্ত হয়েছে সম্পদের বন্টন ব্যবস্থা। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সম্পদ লুটে ধনী হয়েছে অনেকে। ফলে সমাজে ব্যাপক আয়বৈষম্য বিরাজ করছে। কিন্তু এ সম্পর্কিত যে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তা বাস্তবের তুলনায় কম। কারণ অতি ধনীরা তথ্য দেয় না। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থেকে উচ্চবিত্তরা ও ধনীরা বেশি লাভবান হচ্ছে।

১৯৭০ সালের পাকিস্তানে ২২টি কোটিপতি পরিবারের কথা বলা হতো, যারা রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় পাকিস্তানের শিল্প-বাণিজ্যে আধিপত্য বিস্তার করেছিল। ওই ২২ পরিবারের মধ্যে দুটো পরিবার ছিল তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের, তারও একটি ছিল অবাঙালি। বৈষম্য থেকে মুক্তি লাভের জন্যই বাংলাদেশীরা অস্ত্র হাতে নিয়েছিল। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৪ বছর পর এসে সে বৈষম্য আরো প্রকট হয়েছে। বাংলাদেশেই ২০১২ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব মোতাবেক ২৩ হাজার ২১২ জন কোটিপতি ছিল। ২০১৬ সালে ওই সংখ্যা ৫০ হাজার অতিক্রম করেছে। এটি সম্পদ লুকানোর পরের তথ্যের ভিত্তিতে অর্থাৎ ব্যাংক থেকে সংগ্রহিত। যারা বিদেশের ব্যাংকে অর্থ রাখছেন এবং বিনিয়োগ করেছেন, তাদের সম্পদের হিসাব বাংলাদেশ ব্যাংক বা এনবিআরের কাছে নেই। এটি হিসাবে নিলে ধনীদের সংখ্যা আরো বাড়বে।

সরকারি হিসাবে প্রতিবছর দারিদ্র্যের হার কমেছে। তারপরও সরকারি হিসেবে ৪ কোটি মানুষ দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাস করছে। প্রকৃতপক্ষে দেশে দরিদ্র জনগণের সংখ্যা বেড়েছে। সরকারি দারিদ্র্যের হার নির্ণয় পদ্ধতিতেই রয়েছে গলদ; যাদের আয় দৈনিক ১ ডলারের নিচে তাদের চরম দরিদ্র হিসেবে ধরা হয় বাংলাদেশে। অথচ এ সময়ে প্রতিটি পণ্যের দাম বেড়েছে। জাতিসংঘ পর্যন্ত এখন ডলারের হিসাবে নয়, মাথাপিছু ক্যালরি গ্রহণকে দারিদ্র পরিমাপের একক হিসেবে বিবেচনা করছে। বলা হচ্ছে, এ হিসাব অনুযায়ী দেশে ৩৬ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করে। কিন্তু এ হিসেবেও প্রকৃত সংখ্যা ৫০ শতাংশেরও বেশি হবে।

উল্লেখ্য, বর্তমান উচ্চ দ্রব্যমূল্যের বাজারে ১ ডলার বা ৭৭ টাকা দিয়ে একজন মানুষ তার দৈনিক চাহিদা মেটাতে পারছে না। যারা এক ডলারের হিসাবে তুষ্ট আছে তারা মিলিয়ে দিতে পারবে না এ হিসাব। ১ ডলার সমান বাংলাদেশী ৭৭ টাকা। বর্তমান উচ্চ দ্রব্যমূল্যের বাজারে একজন ব্যক্তি এ টাকা দিয়ে দু’বেলা খাবারেরই চাহিদা মেটাতে পারেন না। যেখানে ১ কেজি মোটা চালের দাম সর্বনিম্ন ৪০ টাকা। আর খাদ্য ছাড়াও রয়েছে বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদি মৌলিক অধিকারের বিষয়। অপরদিকে, মাথাপিছু আয় বাড়লেও মানুষের প্রকৃত আয় না বেড়ে, বরং কমেছে। মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির তুলনায় জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে অনেক বেশি। গত পাঁচ বছরে মানুষের প্রকৃত আয় কমেছে ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ।

‘চরম দারিদ্র্য’ নিয়ে আন্তর্জাতিক সংজ্ঞা হলো, বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলোর দারিদ্র্য সীমার গড়ের আপেক্ষিক দারিদ্র্যমাত্রা, যা কম; অর্থাৎ দৈনিক আয় ১ দশমিক ২৫ ডলারের উপরে উঠার অর্থ দারিদ্র্যমুক্তি নয়। বরং সেটা হলো আগের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম দারিদ্রের অবস্থায় যাওয়া। যদিও ২০৩০ সালের মধ্যে দৈনিক ১ দশমিক ২৫ ডলার মানদন্ডে বাংলাদেশ ২ দশমিক ৪ শতাংশ দারিদ্র্য কমিয়ে আনতে পারে  তখন তা সরকারের পক্ষ থেকে প্রচার করা হবে বিরাট ঐতিহাসিক অর্জন হিসেবে। কিন্তু সেটা অর্জন করতে সক্ষম হলেও দেশের অর্ধেকের বেশি মানুষের দৈনিক আয় থাকবে ৪ ডলারের কম। কাজেই প্রশ্নগুলো থেকেই যাচ্ছে- কার উন্নয়ন, কিসের উন্নয়ন, কারাই বা লাভবান হচ্ছে কথিত উন্নয়ন উদ্যোগে?

আগামী নির্বাচন : বিরোধী দমনে ক্ষমতাসীনরা কেনো এতো মারমুখী?

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

নিতান্ত সাধারনদের আলাপচারিতা দিয়ে শুরু হোক। যাদের প্রাত্যহিক জীবনাচার উদয়াস্ত পরিশ্রমের। কারো সাথে দলীয় রাজনীতির সম্পর্ক নেই। ভোট এলে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেন আর প্রতিবারই আশায় বুক বাঁধেন একটু যদি অবস্থার পরিবর্তন হয়। দেশটা যাতে একটু ভাল থাকে। কিন্তু এই সাধারনরাই এখন সবচেয়ে বেশি অবহেলিত এবং উৎকন্ঠিত। তারা ষড়যন্ত্র বোঝেন না। জানেন না, ক্ষমতায় থাকতে বা যেতে কতরকমের ভয়ঙ্কর খেলা চলে এই রাষ্ট্র-সমাজে। তবে একটি জিনিষ খুব ভালভাবে বোঝেন, ক্ষমতার রাজনীতির দলগুলির সবার চরিত্র-আচরন একই রকম; সেখানে সাধারনের প্রায় অস্তিত্ব নেই।

লেখাটি শুরুর আগে বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে খেটে খাওয়া মানুষের সাধারন মতামত সংগ্রহের চেষ্টা করা হয়েছে। কারখানা শ্রমিক, দোকানী, হকার, ফুচকাওয়ালা, গৃহকর্মী, বীমাকর্মী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, রিক্সা ড্রাইভার, পরিবহন শ্রমিক, ছাত্র-ছাত্রীসহ সমাজের নিম্ন ও মধ্য বর্গের নানানজনের সাথে আলাপ করা হয়েছে। তাদের সমাজ ভাবনায় যেটি উঠে এসেছে, তার মোদ্দা কথাই হচ্ছে, ভয় পাচ্ছেন তারা। এমনকি কথা বলতে এবং মত প্রকাশেও। সারাক্ষণ কাটছে অজানা আতঙ্কে। এই ভয় নিজের জন্য, আত্মজের জন্য, নিকটজনের জন্য, সর্বোপরি বেঁচে থাকার জন্য।

আলাপচারিতায় সাধারনরা একবাক্যে বলেছেন, তাদের কোন অধিকার নেই; অপরাধীদের বিচার নেই। রাতে রিক্সা-গাড়ি চালাতে ভয় লাগে। ছিনতাইকারী, আততায়ী চারিদিকে। পুলিশ তাদের বন্ধু তো নয়ই, বরং উল্টো। সত্য বলা যাচ্ছে না, মত প্রকাশের অধিকার নেই, অপরাধ ঘটলেই বিরোধী দল বা কথিত জঙ্গীদের কাজ বলে দেয়া হচ্ছে, ইত্যাদি। এতসব নেতিবাচক কথার মধ্যেও আশার কথা- বেঁচে আছি, দেশ উঠে দাঁড়াচ্ছে আমাদের চেষ্টায় আর বিদেশে আমাদের ভাই-বেরাদরদের পাঠানো টাকায়।

এরমধ্য দিয়ে কমন পারসেপশন হচ্ছে, রাজনীতিহীনতা ও নির্বাচনের নামে নৈরাজ্য। রাষ্ট্র মানুষের মধ্যে স্থায়ী ভয়-আতঙ্ক ঢুকিয়ে দিয়েছে। অতি সাধারনদের এই অনুভূতি দুর করতে রাষ্ট্রের কোন ন্যায়ানুগ আচরন বা উদ্যোগ আছে- তা দৃশ্যমান নয়। ভীতির বদলে স্বস্তির পরিবেশ, গুজবের বিপরীতে সত্য ভাষণ শাসক ও রাজনীতিকরা ভুলতে বসেছেন। বলা হচ্ছে- ষড়যন্ত্র, অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা, সংসদ সদস্যের খুন নিয়ে নানা গুজব, সবটাই ভয়-আতঙ্ক বাড়িয়ে দিয়েছে। এর কতটা সত্য বা বিশ্বাসযোগ্য নয় তাও বোঝা যাচ্ছেনা।

২০১৪ সালের শুরুতে একটি জাতীয় নির্বাচন হয়েছিল। পাঁচ বছর মেয়াদান্তে একটি নির্বাচন হবে সেটিই স্বাভাবিক। কিন্তু এদেশে নির্বাচন হচ্ছে গণতন্ত্র, নির্বাচন হলেই গণতন্ত্র রক্ষা পায়- রাজনৈতিক দলগুলো এটি বিশ্বাস না করলেও, সকলকে তা-ই গেলাতে চায়। রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন করেছে, তা কখনই সুষ্ঠ-অবাধ হয়নি, সর্বজনগ্রহনযোগ্যতা পায়নি। ঐতিহাসিকভাবে এ ভূখন্ডে যে কয়টি সুষ্ঠ নির্বাচন হয়েছে, সেগুলি হয়  অন্য সরকারের  বা দল নিরপেক্ষ কোন সরকারের অধীনে।

সুতরাং ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়নি, তাই বলা হচ্ছে-এটি গণতন্ত্র হত্যার দিন। যেন এর আগের দিনগুলিতে সারাদেশে গণতন্ত্র টৈ-টম্বুর ছিল। আর যেহেতু প্রায় ভোটারবিহীন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ গদ্দিনশীন থেকেছে, সে কারনে এটি গণতন্ত্র ও সংবিধান রক্ষার নির্বাচন। যে দলটি ২০০৮ সালের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন হওয়ার পরে গণতান্ত্রিক বিকাশের পথ রুদ্ধ করতে কালাকানুন, রাষ্ট্রীয় বাহিনী ব্যবহার, সংবিধান সংশোধন থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রীর একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করেছে, তারা সংবিধান এবং গণতন্ত্রের দোহাই পাড়ছে ক্ষমতা চিরস্থায়ী করতে।

দল হিসেবে বিএনপি ২০১৩, ২০১৪, ২০১৫ সালে সংঘটিত নাশকতার দায়ে অভিযুক্ত। হাজার হাজার মামলায় দলের শীর্ষ থেকে তৃণমূল পর্যন্ত লক্ষাধিক নেতা-কর্মী আসামী হলেও ঐসব মামলাগুলোর কোন বিচার বা শাস্তি জনগন এখনও দেখেনি। রাজনীতিতে এমন একটি আত্মধ্বংসী ট্রেন্ড শুরু হয়েছে যে, নাশকতা মামলায় অভিযুক্তরা জেলায়- উপজেলায় ক্ষমতাসীন দলে আকছার যোগ দেয়ার সাথে সাথে মামলা থেকে রেহাই পেয়ে যাচ্ছে। ক্ষমতাসীন দলের সাধারন সম্পাদক এদেরকে ‘হাইব্রিড’ আওয়ামী লীগার বলছেন এবং দলের কেউ কোন অপরাধ করলে এদের ওপরে দায় চাপিয়ে দিয়ে ধামাচাপা দেয়া হচ্ছে।

দুই. ২০১৫ সালের পর বিএনপি রাজনীতিতে প্রায় নেই। মিডিয়ায় সরব উপস্থিতি আছে। ২০১৬ সালের শুরুতে কাউন্সিল করেছে, পার্টির শীর্ষ নেতৃত্ব খালেদা জিয়া ও তদীয় পুত্র তারেক রহমান কমিটিও তৈরী করেছেন। দলের অভ্যন্তরে কোন্দল চেয়ারপার্সনের সাথে নেতা-কর্মীদের দুরত্ব এবং রাজনীতিহীনতায় দলটি গত দুই বছরেও গুছিয়ে উঠতে পারেনি। সরকারের দমননীতি, মামলা-হামলা, খুন-গুম আতঙ্কে দিশেহারা দলটি অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখায় সদা ব্যস্ত। এজন্য তারা যে কোন সমাবেশ, মিছিল, জনসভা করার ব্যাপারে সরকারের মুখাপেক্ষী। কথা বলা বা মতামত প্রকাশে রাজপথের পরিবর্তে বেছে নিয়েছে ইলেকট্রোনিক গণমাধ্যম।

৫ জানুয়ারি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তাদের ভাষায়, গণতন্ত্র হত্যা দিবস পালন করতে গিয়ে পুলিশের কাছে অনুমতি চেয়ে দরখাস্ত করেছিলেন। পুলিশ অনুমতি দেয়নি, পুলিশ অনুমতি দিয়েছিল ঐতিহ্যবাহী ছাত্রলীগকে, যারা গত ৪ জানুয়ারি ঢাকা শহরে জনদুর্ভোগ নামিয়ে এনে তাদের ঐতিহ্য প্রদর্শন করেছেন। ৫ জানুয়ারি ১৬ জেলায় বিএনপির কালো পতাকা মিছিলের মত নিরীহ কর্মসূচি পুলিশের লাঠিপেটা ও ছাত্রলীগের যৌথ হামলার শিকার হয়েছে বলে গণমাধ্যমগুলি জানাচ্ছে। অন্যদিকে, একই দিনে ‘গণতন্ত্র বিজয় দিবস’ পালনে আওয়ামী লীগ নির্বিঘ্ন সমাবেশ করেছে এবং নগরবাসী বিজয়ের ধারাবাহিক যান চলাচলের দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন বলে খবরে প্রকাশ। ৭ জানুয়ারিও বিএনপিকে এমনকি দলীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশের অনুমতি দেয়া হয়নি নাশকতার আশংকায়।

গণতন্ত্রহীন, একক কর্তৃত্ববাদী একটি দল হিসেবে প্রায় দশককাল ধরে ক্ষমতার বাইরে বিএনপি ঋজু হয়ে দাঁড়াতে পারছে না। এর কারন অনেক। যুদ্ধে পরাজয়ের মত শত কারনের একটি হচ্ছে- গুলি ফুরিয়ে গিয়েছিল, তাহলে অন্য কোন কারন আর উল্লেখের প্রয়োজন হয় না। দশককাল পরে ব্যক্তির ইচ্ছাপূরনের  নেতিবাচক ধারা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে বিএনপি অনেক বিষয় অমীমাংসিত রেখেই। কিন্তু ক্ষমতাসীন দলটি পণ করেছে, বিএনপিকে কোন অবস্থায় ইতিবাচক ধারায় ফিরতে দেয়া হবে না। উস্কানি দেবে, সভা-সমাবেশ, মিছিল-জনসেবা, এমনকি রাজপথেও নামতে দেয়া হবে না। নাশকতা, সহিংসতা সৃষ্টি হলে সব দায় বিএনপির ঘাড়ে চাপিয়ে হামলা-মামলার বেড়াজালে আবারও আটকে ফেলা হবে।

রাষ্ট্রপতির সাথে সাক্ষাত এবং নির্বাচন কমিশন গঠনে দফাওয়ারী প্রস্তাব নিয়ে এন্তার আলোচনা-সমালোচনা হতে পারে। নারায়নগঞ্জ সিটি নির্বাচনে হেরে গিয়ে সুক্ষ কারচুপির অভিযোগ নিয়েও সমালোচনা হতে পারে। তাই বলে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দলকে বারবার নাশকতা সৃষ্টির অভিযোগ এনে কর্মসূচি পালন করতে না দেয়ার পরিনতি কি খুব শুভ? খানিকটা সাবালক হয়ে ওঠা বিএনপি একের পর এক উস্কানি এড়িয়ে যাচ্ছে বটে, কিন্তু এর মধ্য দিয়ে চরমপন্থাকে পরোক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা দেয়ার দায় ক্ষমতাসীনরা কিভাবে এড়িয়ে যাবে?

তিন.  ক্ষমতাসীন দলের মনোজমিনের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে তাদের সাম্প্রতিক বক্তব্যে। কথিত গনতন্ত্রের বিজয় দিবসের বিকেলে ঢাকা উত্তর আওয়ামী লীগের এক সভায় দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, “ক্যান্টনমেন্ট থেকে সাঁজোয়া গাড়ি এসে আপনাকে ক্ষমতায় বসাবে না”। একই বিকেলে ঢাকা দক্ষিণের সভায় দলের সাধারন সম্পাদক ওবায়দুল কাদের প্রশ্ন রেখেছেন, “বিএনপি যদি কোন নির্বাচনে অংশ না নেয় তাহলে কি গণতন্ত্র থেমে থাকবে”? তিনি বিএনপিকে সংঘাতে উস্কানি দেয়ার জন্যও অভিযুক্ত করেছেন।

ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ দুই নেতার বক্তব্য কি কোন মেসেজ দেয়, ইঙ্গিত বহন করে? তাদের বক্তব্যের ফলে জনমনে আরো নেতিবাচক পারসেপশন তৈরী হলে তো বিএনপির দীর্ঘদিনের অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়। কম-বেশি ছয় বছর ধরে বিএনপি একটি অভিযোগের পুনরাবৃত্তি করে আসছে। তাদের ভাষায়, বিএনপিকে নির্বাচনের বাইরে রাখতে সংবিধান সংশোধন থেকে যা কিছু করার দরকার ক্ষমতাসীনরা তা সম্পন্ন করেছেন এবং আগামীতেও সেই ব্যবস্থা করা হচ্ছে। সৈয়দ আশরাফ ও ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্য কি সেই মেসেজই দিয়েছে?

এসবের উত্তর বা মীমাংসা করতে পারতো রাজপথ। কিন্তু রাজপথে নামার সামর্থ্যই নেই বিএনপির বা সেই সামর্থ্যকে শেষ করে দেয়া হয়েছে; সরকারের কাছে একটু অনুমতি, সহনশীলতা ভিক্ষা করে বেড়াচ্ছে। ক্ষমতায় থাকাকালে যে বিষয়গুলি তারা চর্চা করেছে, প্রতিষ্ঠিত করেছে, শতগুন হয়ে সেসবই এখন বুমেরাং হয়ে দেখা দিয়েছে। তাদের তো মনে থাকার কথা, এই নিকট অতীতে আওয়ামী লীঘ আহুত হরতালের দিন হাওয়া ভবন প্রাঙ্গনে তারেক ও আরাফাতের ক্রিকেট খেলার দৃশ্যটি! অনমনীয় দৃঢ়তা নিয়ে মাজা সোজা করে রাজপথে দাঁড়াতে পারলেই কেবল তারা আশা করতে পারে, সরকার বাধ্য হবে তাদের বক্তব্য শুনতে।

চার. পারসেপশন যাই থাকুক, জনান্তিকে অতি সাধারনরা যাই বলুক, তারা আকছার শুনে আসছেন দেশের প্রভুত উন্নয়নের গল্প। সেই উন্নয়ন কেন্দ্রে তারা নেই, তাদের অংশগ্রহনও নেই। কেন, কার জন্য, কিসের জন্য এই উন্নয়ন কিংবা এর হিসেব কোথায়, জবাবদিহিতা কোথায়- তা থেকে সাধারনরা যোজন যোজন দুরত্বে। তারা শুধু শুনছেন এই দেশ এখন নিম্ন মধ্য আয়ের দেশ, জীবন-যাত্রার মান বেড়েছে, মূল্যস্ফীতি সর্বনিম্ন, প্রবৃদ্ধির উচ্চহার, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু, বিদ্যুৎ উৎপাদন দ্বিগুন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা দোরগোড়ায়, ৩০ বিলিয়ন ছাড়ানো রিজার্ভ- এরপরেও সাধারনরা মেলাতে পারেন না অনেক হিসেব।

সরকার প্রধানের দাবি অনুযায়ী, কোন সরকারই এত সাফল্য অর্জন করতে পারেননি, তারপরেও তারা ভয় পান কেন? তাদের ভাষায় জনগন দ্বারা প্রত্যাখাত, পরিত্যাক্ত দলটিকে কিসের ভয়? যেমনটি ক্ষমতাসীন দলের নেতা মাহাবুবুল আলম হানিফ বলেন, ৫ জানুয়ারি রাস্তায় নামলে জনগন বিএনপির মোকাবেলা করবে। হানিফের এই ‘জনগন’ আসলে কারা? নিকট অতীতে ক্ষমতার বিএনপিও একই ভাষায় কথা বলেছে এবং সেসময়ে তাদের কথিত জনগন ছিল পুলিশ ও যুবদল-ছাত্রদল ক্যাডাররা এবং ঝাঁপিয়ে পড়েছে আওয়ামী লীগের ওপর।

পরমতসহিষ্ণুতা যদি গণতন্ত্রের প্রধান আকর হয়ে থাকে, তা এখন বাংলাদেশে নির্বাসিত। ক্রমশ: একক কর্তৃত্বের মধ্যে মেলে ধরা স্বৈরতান্ত্রিক চেতনা ছড়িয়ে পড়ছে সর্বাঙ্গে। শুধুমাত্র গায়ের জোর ভিন্নমতকে সামনে আসতে দিচ্ছে না এবং রাষ্ট্র তাতে উৎসাহ জোগাচ্ছে। গত কয়েক বছর ধরে ভিন্নমত দলনে কঠোরতম অবস্থান এখন আরো চরম আকার ধারন করেছে। রাজনীতি নয়, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীনির্ভর ব্যবস্থায় ক্ষমতাসীনরা বাদে অন্যদের সভা-সমাবেশ, মিছিল নিষেধের বেড়াজালে আটকে যাচ্ছে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা আইনী প্যাচে সংকীর্ণ করে ফেলা হয়েছে।

রাষ্ট্র-রাজনীতির হাত ধরে শক্তিমানদের অসহিষ্ণুতা ও ভিন্নমত দলনের উৎসাহ শুধু গণতান্ত্রিক বিকাশ রুদ্ধ করছে না, মূল রাজনৈতিক ভাবনায় কট্টরপন্থা নিয়ে আসছে। মধ্যপন্থী রাজনৈতিক দলগুলি ও তাদের অনুসারীরা ক্রমশ: কট্টরপন্থায় সমর্পন করছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে ধর্মীয় কট্টরপন্থা, যা এসব দলগুলি সঙ্গী করে নিয়েছে। ধর্ম, রাষ্ট্র ও মুক্তচিন্তার নানান বিতর্কে হারিয়ে গেছে উদার বিবেচনা এবং কট্টরপন্থা ও কর্তৃত্ববাদ হয়ে উঠছে রাষ্ট্র ও সমাজের মানদন্ড। ফলে শিকার হচ্ছে তরুন জনগোষ্ঠি, নেপথ্যে  তাদের ভয়ঙ্কর প্রতিপালকরা।

এই মানদন্ড সুষ্ঠ ও অবাধ নির্বাচন নির্বাসনে পাঠিয়ে দিয়েছে। ক্ষমতাসীনদের প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন এবং একক নির্বাচন হয়ে উঠেছে গণতন্ত্র ও সংবিধান রক্ষার মানদন্ড। ক্ষমতার বাইরের রাজনৈতিক দলটি গত নির্বাচন বর্জন করার প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে আগত নির্বাচনে অংশ নিতে একটু স্পেস তৈরীর জন্য করুণা ভিক্ষা করছে। এতসবের মূল কারন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা বা রাষ্ট্র শাসনে জন-অংশগ্রহন নয়, ক্ষমতাই একমাত্র মোক্ষ। ক্ষমতায় থাকা এবং যাওয়ার জন্য তারা সংবিধান, গণতন্ত্র এবং জনগনের দোহাই দেয়, আহাজারি করে। কিন্তু তাদের ভাবনায় কোথাওই জনগন নেই, থাকতেও পারে না।