Home » অর্থনীতি (page 2)

অর্থনীতি

তিন মাসেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৫ হাজার কোটি টাকা

বুধবার প্রতিবেদন ::

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান মতে, ২০১৮ সালের মার্চ পর্যন্ত দেশের রাষ্ট্রায়ত্ব বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো মোট ঋণ বিতরণ করেছে ৮ লাখ ২২ হাজার ১৩৭ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়ে গেছে ৮৮ হাজার ৫৮৯ কোটি ৩৭ লাখ টাকা- যা মোট বিতরণ করা ঋণের ১০ দশমিক ৭৮ শতাংশ। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত খেলাপি ছিল ৭৪ হাজার ৩০৩ কোটি ১১ লাখ টাকা। সে হিসাবে মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৪ হাজার ২৮৬ কোটি ২৬ লাখ টাকা। তবে এর বাইরে অবলোপন করা ৫৫ হাজার ৩১১ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ মামলায় আটকে আছে। এ ঋণ হিসাবে নিলে খেলাপি ঋণের প্রকৃত অঙ্ক দাঁড়াবে প্রায় ১ লাখ ৪৩ হাজার ৯০০ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় ব্যাংকের ১ লাখ ৪৬ হাজার ৪১৯ কোটি ৯৯ লাখ টাকা বিতরণের বিপরীতে খেলাপি হয়ে পড়েছে ৪৩ হাজার ৬৮৫ কোটি ৪৪ লাখ টাকা; যা এসব ব্যাংকের মোট বিতরণ করা ঋণের ২৯ দশমিক ৮৪ শতাংশ। তিন মাস আগে এই ছয়টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল ৩৭ হাজার ৩২৬ কোটি টাকা বা ২৬ দশমিক ৫২ শতাংশ। অবলোপন করা ঋণ মন্দ-ঋণ হওয়ায় নীতিমালা অনুযায়ী এসব ঋণ ব্যাংকের খেলাপি ঋণের আর্থিক প্রতিবেদন থেকে আলাদা করে রাখা হয়। এ ছাড়া তথ্য গোপন করে বিপুল অঙ্কের খেলাপিযোগ্য ঋণকে খেলাপি না দেখানোর অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন পরিদর্শনেও এ ধরনের তথ্য উঠে এসেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খেলাপি বা শ্রেণীকৃত ঋণ আদায়ে সবচেয়ে বড় সমস্যা আইনগত জটিলতা। খেলাপি গ্রাহকরা ঋণ পরিশোধ না করার জন্য আইনের বিভিন্ন ফাঁক-ফোকর বের করেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শ্রেণীকরণ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য হাইকোর্টে রিট পিটিশন করে স্থগিতাদেশ নিচ্ছেন। এ সুবাদে তারা অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ সুবিধা নিচ্ছেন। কারণ, একজন ঋণখেলাপি অন্য কোনো ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারেন না। এমনকি জাতীয় কোনো নির্বাচনেও অংশ নিতে পারেন না। এ ক্ষেত্রে আইনগত বাধা না থাকলেও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো প্রকৃতপক্ষে একজন ঋণখেলাপিকেই গ্রাহক হিসেবে গ্রহণ করছে। ওই গ্রাহক আবার খেলাপি হয়ে আবার আদালতে মামলা করছে। এভাবে ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে তারা আইনি প্রক্রিয়া গ্রহণ করছে। এটি মোকাবেলায় ব্যাংকগুলোর ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ আদায় কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।

এদিকে, খেলাপি ঋণ বাড়তে থাকায় ব্যাংকগুলোর তহবিল সংকট প্রকট আকার ধারণ করছে। ব্যাংকগুলো যে ঋণ দিচ্ছে তা আদায় হচ্ছে না। আবার আমানত প্রবাহও কমে গেছে। এতে বেসরকারি ব্যাংকে তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে। এ সংকট মেটাতে ব্যাংকগুলো আমানতের সুদহার সামান্য বাড়িয়ে গ্রাহক টানার চেষ্টা করছে। তবে ঋণের সুদহার বাড়িয়ে দিচ্ছে অনেক বেশি। ২০১৮ সালের মার্চ শেষে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ২১ হাজার ২৯০ কোটি ২৩ লাখ টাকা। এর বিপরীতে খেলাপি হয়েছে ৩৭ হাজার ২৮৯ কোটি টাকা; যা এসব ব্যাংকের মোট বিতরণ করা ঋণের ৬ শতাংশ। তিন মাস আগে ডিসেম্বর পর্যন্ত এ খাতের ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ছিল ২৯ হাজার ৩৯৬ কোটি ১৯ লাখ টাকা। মার্চ শেষে বিদেশি খাতের ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ৩১ হাজার ২২৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকার ঋণের বিপরীতে খেলাপি হয়েছে ২ হাজার ১৮৮ কোটি ৫৯ লাখ টাকা; যা এসব ব্যাংকের মোট বিতরণ করা ঋণের ৭ দশমিক ১ শতাংশ।

তিন মাস আগে বিদেশি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ছিল ২ হাজার ১৫৪ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। অন্যদিকে, এ সময়ে সরকারি মালিকানার দুই বিশেষায়িত ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৩ হাজার ১৯৯ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। এর বিপরীতে খেলাপি হয়েছে ৫ হাজার ৪২৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা; যা এসব ব্যাংকের মোট বিতরণ করা ঋণের ২৩ দশমিক ৩৯ শতাংশ। তিন মাস আগেও এই ব্যাংক দুটির একই পরিমাণ খেলাপি ঋণ ছিল।

গত বছরের শেষ দিকে বিপুল অঙ্কের ঋণ পুন:তফসিলের মাধ্যমে নিয়মিত ও আদায় জোরদায় করায় খেলাপি ঋণ এক অঙ্কের ঘরে নেমে আসে। কিন্তু চলতি বছরে খেলাপি ঋণ আবার লাগামহীনভাবে বাড়তে শুরু করেছে। এর কারণ হিসেবে অর্থনীতিবিদসহ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকগুলো তাদের অডিট রিপোর্ট প্রকাশ করে। তাই সেখানে ভালো অবস্থান দেখাতেই বিভিন্ন কৌশল প্রয়োগ করে থাকে ব্যাংকগুলো। এর মধ্যে অন্যতম হলো খেলাপি ঋণ পুন:তফসিল বা নবায়ন। আর বছরের শেষ সময়ে এসে এই সুবিধা দেয়া-নেয়ার প্রবণতাও বাড়ে। এ ছাড়া শেষ সময়ে ঋণ আদায় কার্যক্রম জোরদার করা হয়। কিন্তু বছরের শুরুতেই ঋণ পুন:তফসিল যেমন কম হয়, তেমনি আদায় কার্যত্রমেও সে রকম গতি থাকে না।

রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তাদের বিশেষ সুবিধা দিতে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ পুন:তফসিল ও পুনর্গঠনে (নিয়মিত) বিশেষ ছাড় দেয়া হয়। ২০১৩ সালের জুলাই থেকে ২০১৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এই আড়াই বছরেই এ সুযোগ নেন দেশের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বড় বড় শিল্প গ্রুপ। এর আওতায় বাংলাদেশ ব্যাংকের অনাপত্তি সাপেক্ষে প্রায় ৪৯ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ নিয়মিত করা হয়েছে। এর বাইরে বিদ্যমান নীতিমালার আওতায় ব্যাংকগুলো নিজেরা আরো ৬৪ হাজার ৮৬২ কোটি টাকার ঋণ নিয়মিত করেছে। সব মিলে ওই সময় পর্যন্ত মোট ১ লাখ ১৩ হাজার ৭৭৬ কোটি টাকার ঋণ বিশেষ সুবিধায় নিয়মিত করা হয়েছে। পরে ব্যাংক খাতে পাঁচ শ’ কোটি টাকার বেশি ঋণ রয়েছে এ রকম ১১টি ব্যবসায়ী গ্রুপকে ১৫ হাজার ২১৮ কোটি টাকার ঋণ পুনর্গঠনের সুযোগ দেয়া হয়। কিন্তু বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত এসব ঋণগ্রাহক যথাসময়ে ফেরত দিচ্ছেন না। ফলে তা আবারো খেলাপি হতে শুরু করেছে।

ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা, রাজনৈতিক বিবেচনায় বড় ঋণখেলাপিদের আইনের আওতায় না আনা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে খেলাপি ঋণ বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ সুবিধায় যেসব ব্যবসায়ী ডাউন পেমেন্ট ছাড়াই খেলাপি ঋণ নবায়ন করেছিলেন ওই সব ঋণ আবার খেলাপিতে পরিণত হচ্ছে। কারণ এ সময়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের কোনো উন্নতি হয়নি। যেসব ব্যবসায়ী খেলাপিতে পরিণত হয়েছিলেন ওই সব ব্যবসায়ী ক্রমন্বয়ে লোকসানের ঘানি টানতে টানতে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন। এর ফলে তারা নবায়ন হওয়া খেলাপি ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে পারছেন না। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক বিবেচনায় অনেক বড় বড় ব্যবসায়ীকে ঋণ দেয়া হয়েছে। কিন্তু ওই সব ব্যবসায়ী ঋণ পরিশোধ করছেন না। আবার রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা ওই সব ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে ব্যাংক মামলা দায়ের করেও তেমন কোনো সুবিধা করতে পারছে না।  তৃতীয়ত, বাংলাদেশ ব্যাংকের দুর্বল তদারকি ব্যবস্থাও খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ার বড় কারণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের দুর্বল তদারকির কারণে হলমার্ক, বিসমিল্লাহ, বেসিক ব্যাংকসহ বড় বড় ঋণ-কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু এসব ঋণ আর পরিশোধ না করায় তা খেলাপিতে পরিণত হচ্ছে। সব মিলে দেশের ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ বেড়ে যাচ্ছে। আর খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকের বিনিয়োগ সক্ষমতাও কমে যাচ্ছে। ব্যাংকগুলো তার আয় থেকে বাড়তি প্রভিশন সংরক্ষণ করতে গিয়ে লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছে।

একজন ঋণখেলাপি অন্য কোনো ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারেন না। এমনকি জাতীয় কোনো নির্বাচনেও অংশগ্রহণ করতে পারেন না। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খেলাপি ঋণ আদায়ের সবচেয়ে বড় জটিলতা হিসেবে দেখা দিয়েছে- আইনগত জটিলতা। শ্রেণীকৃত ঋণ আদায়ে আইনি জটিলতা প্রকট আকার ধারণ করেছে। খেলাপি গ্রাহকেরা ঋণ পরিশোধ না করার জন্য বিভিন্ন আইনি ফাঁকফোকর বের করছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে খেলাপি গ্রাহকরা  শ্রেণীকরন  হতে বেরিয়ে আসার জন্য হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করে শ্রেণীকরনের  ওপর স্থাগিতাদেশ নিচ্ছেন। এ সুবাদে তারা অন্য ব্যাংক থেকে ঋণসুবিধা নিচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে আইনগত বাধা না থাকলেও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো প্রকৃতপক্ষে একজন ঋণখেলাপিকেই গ্রাহক হিসেবে গ্রহণ করছে। ওই গ্রাহক ফের খেলাপি হয়ে আবার আদালতে মামলা দায়ে করছেন। এভাবে ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে তারা আইনি প্রত্রিয়া গ্রহণ করছেন। এতে ব্যাংকগুলোর জন্য অত্যন্ত ব্যয়সাপেক্ষ হয়ে দেখা দিচ্ছে। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ আদায় কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।

রূপপুরের এপিঠ ওপিঠ-৪ : ব্যয় এখনো চূড়ান্ত নয়, পরামর্শকও রাশিয়ার

অরুন কর্মকার ::

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ব্যয়ের প্রকল্প। সরকারিভাবে এখন পর্যন্ত এই প্রকল্পের ব্যয় বলা হচ্ছে এক লাখ ৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ৮০ টাকা হিসাবে ১৩২০ কোটি মার্কিন ডলার)। অর্থাৎ এই প্রকল্পের ব্যয় প্রায় চারটি পদ্মা সেতুর ব্যয়ের সমান। কিন্তু এটাই রূপপুর প্রকল্পের সব ব্যয় নয়। এই প্রকল্পের জন্য আরো অনেক ব্যয়ের হিসাব নিকাশ বাকি আছে।

বিদ্যুৎকেন্দ্রটির আয়ুস্কাল (অন্তত ৬০ বছর) জুড়ে প্রয়োজনীয় জ্বালানি (ইউরেনিয়াম) সরবরাহ, স্পেন্ট ফুয়েল ফেরত নেওয়া, যে কোনো সময় রাশিয়ার কাছ থেকে চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়া, পরামর্শক নিয়োগসহ এখনও রাশিয়ার সঙ্গে কয়েকটি চুক্তি সম্পাদন বাকি আছে। এর প্রতিটি চুক্তির সঙ্গেই আর্থিক সংশ্লেষ রয়েছে। তবে সেই অর্থের পরিমান কত তা চুক্তিগুলো না হওয়া পর্যন্ত বলা সম্ভব নয় বলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানিয়েছে।

এ ছাড়া, রূপপুর প্রকল্পে মালামাল সরবরাহের জন্য নতুন কিছু রেল লাইন স্থাপন, নদীপথ খনন এবং সেখানে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য উন্নত মানের সঞ্চালন লাইন নির্মাণসহ আনুসঙ্গিক অনেক কাজের জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় হবে। সব মিলে এখন পর্যন্ত যে হিসাব সংশ্লিষ্টরা করেছেন তাতে এই প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্রয় হতে পারে ১৮০০ কোটি ডলার। প্রতি ডলার ৮০ টাকা হিসাবে এক লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা।

অন্যদিকে, রূপপুর প্রকল্পের পরামর্শক হিসেবে রাশিয়ারই একটি প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ রুশ সরকারের পক্ষে সে দেশের যে কোম্পানিগুলো রূপপুর প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে তাদের কাজ যথাযথ হচ্ছে কি না, প্রকল্পের যে সব ব্যয় এখনো নির্ধারিত হয়নি সেগুলো নির্ধারণে বাংলাদেশের অবস্থানের পক্ষে কথা বলা, রাশিয়ার সরবরাহকারী কোম্পানিগুলো চুক্তি অনুযায়ী সব যন্ত্রপাতি ও আনুসঙ্গিক জিনিসপত্র দিচ্ছে কি না, এ সবই দেখবে এই পরামর্শক প্রতিষ্ঠান। প্রশ্ন হল—রাশিয়ার সরবরাহকারী কোম্পানিগুলোর কাজকর্ম তদারক করে রাশিয়ারই একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কতটা নিরপেক্ষভাবে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করবে বা করতে পারেব।

ব্যয়: রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে মোট ব্যয় কত হওয়া উচিৎ এবং কত হচ্ছে, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। মোট ২৪০০ মেগাওয়াটের দুই ইউনিটের জন্য রাশিয়ার সঙ্গে সই করা চুক্তিতে ব্যয় নির্ধারিত হয়েছে ১২৬৫ কোটি মার্কিন ডলার। সরকারের পক্ষ থেকে এই ব্যয়কে বলা হচ্ছে ‘ফার্ম অ্যান্ড ফিক্সড’। অর্থাৎ এই ব্যয় আর বাড়বে না।

তবে এর বাইরে সমীক্ষার জন্য ইতিমধ্যে ৫৫০ মিলিয়ন (৫৫ কোটি) ডলার ব্যয় করা হয়েছে। ফলে ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১৩২০ কোটি ডলার। তাতে প্রতি ডলার ৮০ টাকা হিসাবে ব্যয় দাঁড়ায় এক লাখ ৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এই ১৩২০ কোটি ডলারের ৯০ শতাংশ (১১৮৮ কোটি ডলার) রাশিয়ার কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে ঋণ হিসেবে। ঋণের সুদ হবে লন্ডন আন্ত:ব্যাংক লেনদেনের সুদের হার (লাইবর) ও ১ দশমিক ৭৫ শতাংশের যোগফল। অর্থাৎ লাইবর যখন  এক শতাংশ হবে তখন এই সুদের হার হবে ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ। সাধারণত: লাইবর ১ শতাংশের মধ্যেই ওঠানামা করে। এই ঋণ পরিশোধের জন্য ১০ বছর গ্রেস পিরিয়ড থাকবে। তার পরবর্তী ১৮ বছরে সম্পূর্ণ ঋণ সুদাসলে পরিশোধ করতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন হবে প্রায় ১৮০০ কোটি ডলার।

রূপপুর প্রকল্পের ব্যয় ১৩২০ কোটি ডলার ব্যয় ধরেও যদি প্রতি কিলোওয়াট বিদ্যুতের জন্য স্থাপন ব্যয় (ইন্সটলেশন কস্ট) হিসাব করা হয়, তাহলে রূপপুর কেন্দ্রের জন্য তা দাঁড়ায় সাড়ে পাঁচ হাজার ডলার। এর সঙ্গে তুলনা করা যায় আমাদের এই অঞ্চলে রাশিয়ার তৈরি যে সব বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে সেগুলোর। এ রকম একটি হচ্ছে ভারতের তামিলনাড়ুর কুদনকুলম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এই কেন্দ্রের ১ ও ২ নম্বর ইউনিট স্থাপনের কাজ শুরু হয় ২০০২ সালে। এই দুটি ইউনিটে প্রতি কিলোওয়াট বিদ্যুতের জন্য স্থাপন ব্যয় হয়েছে ১৩০০ ডলার।

এরপর ওই একই কেন্দ্রে ৩ ও ৪ নম্বর ইউনিটের কাজ শুরু করা হয়েছে। সেখানে প্রতি কিলোওয়াটের জন্য স্থাপন ব্যয় পড়ছে তিন হাজার ডলার। ১৩০০ থেকে বেড়ে যে তিন হাজার ডলার হয়েছে তার একাধিক কারণ আছে। যেমন, গত ১০/১২ বছরে নির্মাণ সামগ্রির দাম বেড়েছে। ফুকুশিমার দুর্ঘটনার পর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা অনেক বাড়ানো হয়েছে। সে জন্যই এই ব্যয় বৃদ্ধি।

কুদনকুলমের সঙ্গে রূপপুরের পার্থক্য শুধু প্রযুক্তির ক্ষেত্রে। কুদনকুলমের রিঅ্যাক্টর ভিভিইআর-১০০০ মডেলের। আর রূপপুরের রিঅ্যাক্টার ভিভিইআর-১২০০ মডেলের। শুধু এই কারণে প্রতি কিলোওয়াট বিদ্যুতের স্থাপন ব্যয় আড়াই হাজার ডলার বেশি হওয়া অস্বাভাবিক বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।

পরামর্শক রাশিয়ার: রূপপুর প্রকল্পের শুরু থেকেই পরামর্শক নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সরকারের বাইরে বিশেষজ্ঞ মহলে আলোচনা ছিল। বলা হচ্ছিল, আমরা অনেক ছোটখাট সাধারণ প্রকল্পের জন্যও পরামর্শক নিয়োগ করি। কিন্তু রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মত একটি বিশেষায়িত বৈজ্ঞানিক প্রকল্পের জন্য, দেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ ব্যয়ের প্রকল্পের জন্য কোনো পরামর্শক নিয়োগ করছি না কেন।

তা ছাড়া, পরমাণু প্রযুক্তি সম্পর্কে আমাদের জানাশোনাও যখন খুব কম, তখন পরামর্শক নিয়োগ করা খুবই দরকার ছিল। কিন্তু তখন সরকার এ কথা কানে তোলেনি। তবে এখন, প্রকল্পের মূল নির্মাণপর্বে এসে পরামর্শক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ‘রোসটেকনাদজর টিএসও জেএসসি ভিবিও সেফটি’ নামের একটি রুশ কোম্পানিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের পরামর্শক নিয়োগের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এই কোম্পানিকে পরামর্শক নিয়োগ করার প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিপরিষদ কমিটিতে পাঠিয়েছে। এই কোম্পানির পরামর্শক সেবা নেওয়ার জন্য ১২ কোটি (১২০ মিলিয়ন) মার্কিন ডলারের একটি চুক্তি হবে।

কয়েকজন বিশেষজ্ঞ বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকন্দ্রের সব কিছুই করবে রাশিয়া, বাংলাদেশের সঙ্গে রাশিয়ার চুক্তি এমনই। সে ক্ষেত্রে আমাদের উচিৎ ছিল একটা স্বতন্ত্র পরামর্শক নিয়োগ করা যারা আমাদেরকে আমাদের কাজে সাহায্য করবে এবং আমাদের স্বার্থ সুরক্ষা করবে। কিন্তু তা না করে আমরা নিয়োগ করেছি এমন একটি প্রতিষ্ঠানকে যেটি যন্ত্রপাতি সরবরাহকারী কোম্পানিরই একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান। তাঁদের আনুগত্য কোথায় থাকবে, আমাদের প্রতি নাকি তার ‘প্যারেন্টস কোম্পানি’র প্রতি? যদি প্যারেন্টস কোম্পানির প্রতি তার আনুগত্য থাকে সে কি আমাদের সঠিক পরামর্শ দেবে? নাকি সেই কোম্পানির স্বার্থ রক্ষা করে যেটুকু দেওয়া যায় সেটুকু দেবে?

স্বতন্ত্র পরামর্শক থাকলে তাঁরা রাশিয়ানদের বলতো-এই যে তোমরা ১২৬৫ কোটি ডলার দাম নির্ধারণ করেছ এটা অনেক বেশি হয়ে গেছে। আমাদের রাশান কনসালট্যান্ট কি আমাদের সে কথা বলবে যে তোমরা বেশি টাকা দিচ্ছ? এই জিনিসগুলো হলো ‘ম্যাটার অফ এথিকস’ (নৈতিকতার বিষয়)। এই এথিকস কি অমান্য করবে? যদি না করে, তাহলে আমরা তাঁদের কাছ থেকে কী ধরণের পরামর্শ সেবা পেতে পারি সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

ঢাকা থেকে প্রায় ১৬০ কিলোমিটার দূরে পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুরে পদ্মা নদীর পাড়ে দেশের প্রথম এই পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। গত বছর অক্টোবরে প্রকল্পটির মূল নির্মাণপর্ব (ফাস্ট কংক্রিট পোরিং) শুরু হয়েছে। প্রতিটি ১২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিট বিশিষ্ট এই কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে উৎপাদন শুরু হওয়ার কথা ২০২৩ সালে। এর পরের বছর দ্বিতীয় ইউনিটে। রাশিয়ার উদ্ভাবিত সর্বাধুনিক (থ্রি প্লাস জেনারেশন) ভিভিইআর-১২০০ প্রযুক্তির চুল্লি এই কেন্দ্রে বসানো হচ্ছে।

 

 

মধ্যবিত্তের উপরে অর্থমন্ত্রীর কেনো এতো গোস্বা?

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন ::

বাংলাদেশে বাজেট নিয়ে সাধারণ মানুষের কৌতূহল খুব একটা নেই। বাজেট কখন উত্থাপিত হয়, কখন পাস হয়, সাধারণ নাগরিকরা তা নিয়ে ভাবেন না; অনেক সময় খোঁজখবরও রাখেন না। তবে সাধারণ মানুষের বাজেট ভাবনা হচ্ছে কোন কোন জিনিষের দাম সরকার বাড়ালো, কিংবা কতো টাকার আর্থিক চপ বেেস পড়লো । এছাড়া তখনই চিন্তাটা দেখা দেয় যখন নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম হু হু করে বাড়তে থাকে। আবার একশ্রেণির ব্যবসায়ী জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতার আগেই বাজারে সংকেত দেওয়া শুরু করে বাজেট আসন, দাম  বাড়বে! ওসব ব্যবসায়ী বাজেট পাসের আগেই পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির ঘটনার পর বাজেট ভাবনাকে আর অগ্রাহ্য করেনা।

সাধারণত মধ্যবিত্ত হিসেবে একটি দেশের জনগোষ্ঠীর সেই অংশকে বিবেচনা করা হয়, যারা সীমিত আয়ের জীবনযাপন করেন। বাংলাদেশে পেশা বিচার করলে এদের মধ্যে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংবাদিক, এনজিও কর্মী, গবেষক, আইনজীবী, চিকিৎসক, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী, ছোট ঠিকাদার, গ্রামীণ উদ্যোক্তা এবং মাঝারি কৃষকেরা পড়েন।

বাজেটের বিশাল আকারের ব্যাখ্যায় অর্থমন্ত্রী বলেছেন, এ বাজেটের মূল লক্ষ্যবস্তু যেহেতু প্রবৃদ্ধি সেহেতু এর আকার ওই টার্গেটের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া বাঞ্ছনীয়। তার এ যুক্তির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করা কঠিন। প্রবৃদ্ধি ভিন্ন এ দেশের মানুষের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়, এটি পুরোনো কথা। নতুন কথা হলো, প্রবৃদ্ধিই শেষ কথা নয় এবং প্রবৃদ্ধি নিজে গিয়ে সব মানুষের ভাগ্যের উন্নতি ঘটবে না বা  তাদের জন্য উন্নয়ন আসবে না। সেজন্য প্রয়োজন উপযুক্ত সমতাভিত্তিক উন্নয়ন ও  বণ্টনমূলক ব্যবস্থা।

বাজেটে সাধারণ জনগণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো হচ্ছে- স্থানীয় মধ্যবিত্ত যেসব পণ্যের চিহ্নিত গ্রাহক বাজেট বক্তৃতায় সেগুলোর ওপর বাড়তি করারোপের উল্লে¬খ করেছেন অর্থমন্ত্রী। নানা সেবাকেও ভ্যাটের আওতায় আনার উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে সরকারের। বুঝতে কষ্ট হওয়ার কথা নয়, রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণেই এমন উদ্যোগ। এটি অসহায় বাস্তবতা যে, চ‚ড়ান্ত বিচারে সিংহভাগ ভ্যাট মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীকেই গুনতে হবে। অনেকের প্রত্যাশা ছিল, করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানো হবে এবার। তেমন কোনো প্রস্তাব আসেনি। তার মানে আয়করের প্রধান টার্গেটও ওই মধ্যবিত্তই এবং এক্ষেত্রে আহরণ সুবিধাই প্রধান বিবেচ্য বলে প্রতীয়মান। অথচ প্রয়োজন ছিল আয়করের ক্ষেত্রে আয়ের উচ্চস্তরে জোরটা বেশি দেওয়ার । মধ্যবিত্তকে কর বেশি দিতে হয়, এ নিয়ে কারও আক্ষেপ থাকা উচিত নয়। কেননা গুটিকয়েক দেশ বাদ দিলে সাধারণভাবে মধ্যবিত্তরাই সর্বজনীন বৃহত্তম করদাতা (প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর) গোষ্ঠী এবং অর্থনীতির মেরুদন্ড ।

প্রস্তাবিত বাজেটে সিটি করপোরেশন এলাকার কারও যদি আট হাজার বর্গফুট বা এর বেশি আয়তনের গৃহসম্পত্তি থাকে, তাহলে ওই বাড়িওয়ালার আয়করের ওপর সারচার্জ বসবে। এই সারচাজের্র পরিমাণ ওই বাড়িওয়ালার আয়ের ১০ শতাংশ বা কমপক্ষে ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা। বাড়িওয়ালা স্বাভাবিকভাবেই নিজের খরচ কমাতে ফ্ল্যাটের ভাড়া বাড়িয়ে দেবেন।

মধ্যবিত্তদের যাতায়াতে কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্য আনতে শুরু করেছিল রাইড শেয়ারিং উবার, পাঠাওয়ের মতো গাড়ি ও মোটরসাইকেল। উবার, পাঠাওয়ের মতো রাইড শেয়ারিংয়ের ওপর ৫ শতাংশ ভ্যাট বসিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। এমনকি এসব রাইড শেয়ারিং সেবা প্রদানকারী কর্তৃপক্ষের ওপর ৩ থেকে ৪ শতাংশ উৎসে করও বসানো হয়েছে। এতে এসবের সেবা নেওয়ার খরচ বাড়বে।

কর বসেছে পোশাকেও। দেশি ব্র্যান্ডের শার্ট, প্যান্ট, পাঞ্জাবি, সালোয়ার-কামিজ কিনতে এখন থেকে বাড়তি টাকা গুনতে হবে। আগে ভ্যাট ছিল ৪ শতাংশ, এখন হয়েছে ৫ শতাংশ। খরচের কথা চিন্তা করে দেশি ব্র্যান্ডের পোশাক বাদ দিলেও রক্ষা নেই। বড় দোকান থেকে জামাকাপড় কিনলেও ৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হবে, যা আগে ছিল না।

বাড়ি-গাড়ির স্বপ্ন সব মধ্যবিত্তেরই থাকে। কিন্তু এই বাজেটের পর ছোট ফ্ল্যাট কিনতে গেলে খরচ বাড়বে। ১১০০ বর্গফুটের কম আয়তনের ফ্ল্যাটে ভ্যাট দেড় থেকে দুই শতাংশ আরোপ করা হয়েছে। এতে ৫০ লাখ টাকার ফ্ল্যাটে অন্তত ২৫ হাজার টাকা বাড়তি গুনতে হবে। আবার নতুন গাড়ি কেনার সামর্থ্য নেই, রিকন্ডিশন্ড গাড়িতেই ভরসা মধ্যবিত্তের। বাজেটে রিকন্ডিশন্ড গাড়ির অবচয়ন সুবিধাও কমিয়ে দেয়া হয়েছে। আর তাতে গাড়ির দাম বাড়বে। অর্থমন্ত্রী বাজেটে ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি শিগগিরই সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমাবেন। আবার সঞ্চয়পত্র কেনার সুযোগও কমানো হয়েছে।

নৈরাজ্যের ব্যাংকিংখাতের উল্টো নীতিতে চলছে সরকার। পরিবারের পরিচালক সংখ্যা ও মেয়াদ আগেই বাড়ানো হয়েছে। বাজেটে কর্পোরেট কর আড়াই শতাংশ কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে বিনিয়োগ কোন সুবিধা পাবে না। আমানতকারী ও ঋণগ্রহীতারাও কোনো সুবিধা পাবেন না। এই ছাড়ের কারণে বৃহৎ করদাতাদের কাছ থেকে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ২ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা কমানো হয়েছে। অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৩৫ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। ব্যাংকিং খাতে নৈরাজ্য বন্ধ না করে, ব্যাংক ব্যবসায়ীদের চাপে করপোরেট কর হার কমানোর সিদ্ধান্ত অনিয়মকে আরো উস্কে দেবে।

সামষ্টিক অর্থনীতির এখন সবচেয়ে দুর্বলতম দিক চলতি হিসাব ঘাটতি। বৈদেশিক বিনিময়ের লেনদেন কাঠামো। বর্তমানে মেগাপ্রকল্প ও অবকাঠামো নির্মাণের জন্য ব্যাপক আমদানি করা হচ্ছে। তাছাড়া আমদানির মাধ্যমে বাইরে অর্থ পাচারও হচ্ছে। এসব যদি নিয়ন্ত্রণ করা না যায় তাহলে টাকার মূল্যমানের উপর চাপ সৃষ্টি হবে।

চলতি হিসাবের ঘাটতি কমানোর বিষয়ে বাজেটে কিছু বলা হয়নি। আমদানি ব্যয় গড়ে ২৫ শতাংশ হারে বাড়ার ফলে ডলারের দাম বাড়ছে। রিজার্ভ কমে যাচ্ছে। ডলারের বিনিময় মূল্য স্থিতিশীল না থাকলে বাণিজ্য ভারসাম্য নষ্ট হবে, মূল্যস্ফীতি বাড়বে এবং অর্থ পাচারের আশঙ্কাও থেকে যায়।

যুগে যুগে দেশে দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ও জাতীয় উন্নয়নে মধ্যবিত্তের অবদান অনস্বীকার্য। আমাদের দেশও এ থেকে ব্যতিক্রম নয়। কেননা এই মধ্যবিত্ত শ্রেণি সমাজ সুষ্ঠু চিন্তার ধারক ও বাহক। বাংলাদেশের গত কয়েক দশকের উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে মধ্যবিত্তের একটা বিশাল ভূমিকা রয়েছে। রাষ্ট্রের মৌল-কাঠামো অর্থনীতি কার্যত রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে। আবার অর্থনৈতিক উন্নয়ন সামাজিক উন্নয়নের সূচক বৃদ্ধি করে। তখন মানুষের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি পায়। আবার বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধেও যে তিনটি ভিত্তি ছিল অর্থাৎ মানবিক মর্যাদা, সাম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচার- তা এখনো পূর্ণাঙ্গরূপে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এমনকি যে মধ্যবিত্ত শ্রেণিটি নিরন্তর জীবন-সংগ্রাম করে অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে একটা গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল- সেটাও আজ এক ধরনের সংকটে নিপতিত।  একই সঙ্গে সমাজের স্থিতি ও পরিশুদ্ধ সামাজিক সংস্কার যে মধ্যবিত্ত শ্রেণির হাতে হয়, নানা আর্থিক টানাপোড়েন ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে আজ তাদের অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম করতে হচ্ছে। ফলস্বরূপ সামাজিক ঐতিহ্যসম্পন্ন একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে যাচ্ছে, স্বজনরা হচ্ছে অবহেলিত, উপেক্ষিত। রাষ্ট্রে এক ধরনের কর্তৃত্ববাদী শাসনের ফলে আর্থিক শৃংখলা না থাকায় প্রাত্যহিক অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধাগুলো কতিপয় নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর হাতে চলে যাচ্ছে। এতে চরমভাবে উপেক্ষিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ।  ফলে এই কোঠারিভুক্ত স্বার্থান্বেষী সামাজিক পরিবর্তনের সঙ্গে তারা খাপ খাওয়াতে ব্যর্থ হচ্ছে মধ্যবিত্তসহ সাধারন মানুষ।

রূপপুরের এপিঠ ওপিঠ- ৩ :: প্রকল্পে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ অংশগ্রহন !

অরুন কর্মকার ::

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে ভারতের অংশগ্রহণ ক্রমান্বয়ে বেশি করে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে ভারতের কাছ থেকে কিছু সহায়তা নিচ্ছে। এর একটা বড় অংশ জাতীয় পরমাণু কর্মসূচি বাস্তবায়নের কাঠামো তৈরি। পাশাপাশি রূপপুর প্রকল্পের জন্যও জনবল প্রশিক্ষণসহ কিছু সহায়তার বিষয় আছে। এর বাইরে রাশিয়াও রূপপুর প্রকল্পের মৌলিক কাজে রাশিয়াকে যুক্ত করেছে। ফলে ভারতের অংশগ্রহণ হয়ে উঠছে সার্বিক।

এ ধরণের একটি পরিকল্পনা ভারতের ছিল। রাশিয়ার ছিল আগ্রহ। গত ১ মার্চ (২০১৮) মস্কোতে বাংলাদেশ, ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে যে সমঝোতা স্মারকটি (এমওইউ) সই হয়েছে তা এই দুয়েরই ফল। এর মাধ্যমে ভারত ও রাশিয়ার মধ্যেকার সহযোগিতার সম্পর্ক যেমন নুতন মাত্রা পেল তেমনি ভূ-রাজনীতির মঞ্চে ও আন্তর্জাতিক পরমাণু ক্লাবে ভারতের অবস্থান শক্তিশালী হলো। এর মাধ্যমে ভারত চীনকেও বাগে রাখতে রাশিয়াকে পাশে পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে পেরেছে। তবে এই সমঝোতার অংশ হয়ে বাংলাদেশ কী অর্জন করেছে বা করতে চাচ্ছে সে বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো প্রকাশ্যে কিছু বলা হয়নি।

ওই সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, ভারত শুধু যে তাঁদের অভিজ্ঞতা দিয়ে, রূপপুর প্রকল্পের জন্য জনবল প্রশিক্ষণ দিয়ে এবং প্রকল্পের জন্য পরামর্শ সেবা দিয়ে সহায়তা করবে তা নয়। প্রকল্পের স্বার্থে ভারতীয় কোম্পানিগুলো প্রকল্পের নির্মাণ, যন্ত্রপাতি স্থাপন, এমনকি ভারতে উৎপাদিত কিছু সামগ্রী (ম্যাটেরিয়াল) এবং কিছু কিছু যন্ত্রপাতিও (নন-ক্রিটিক্যাল ক্যাটাগরি) সরবরাহ করবে।

সমঝোতা স্মারক সইয়ের পর রোসাতোমের উপ মহাপরিচালক (আন্তর্জাতিক সম্পর্ক) নিকোলাই স্পাস্কি এক বিবৃতিতে এ সব কথা বলেছেন। রাশিয়ার সংবাদ সংস্থা ‘তাস’ এবং ভারতের কিছু কিছু গণমাধ্যম এই খবর প্রকাশ করেছে। ওই সমঝোতা স্মারকে নিজ নিজ দেশের পক্ষে সই করেন মস্কোতে নিয়োজিত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. সাইফুল হক, মস্কোতে ভারতের রাষ্ট্রদূত পংকজ শরণ এবং রোসাতোম তথা রাশিয়ার পক্ষে নিকোলাই স্পাস্কি।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থায় (আইএইএ) কাজ করেছেন এধরনের কয়েকজন পেশাজীবী  বলেছেন, ভারত পৃথিবীর পরমাণু বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান ‘নিউক্লিয়ার সাপ্লায়ার্স গ্রুপ (এনএসজি)-এর সদস্য নয়। এই গ্রুপের সদস্য ছাড়া কোনো দেশ পরমাণু চুল্লি (রিঅ্যাক্টর) নির্মাণে সরাসরি অংশ নিতে পারে না।

অন্যদিকে, রূপপুর প্রকল্পের জন্য বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে সই হওয়া সাধারণ চুক্তি (জেনারেল কন্ট্রাক্ট) অনুযায়ী, প্রকল্পের পূর্ণ (এ টু জেড) বাস্তবায়নের দায়িত্ব রোসাতোম তথা রাশিয়ার। অর্থাৎ এই প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় সব যন্ত্রপাতির নকশা প্রণয়ন, উৎপাদন, সরবরাহ ও বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ তাঁদেরই করার কথা। তাই এ সব কাজে অন্য কোনো দেশ বা তৃতীয় পক্ষকে যুক্ত করা বাংলাদেশ-রাশিয়া দ্বিপাক্ষিক সাধারণ চুক্তির বরখেলাপ কিনা এনিয়ে আইনগত প্রশ্ন আছে। এ ছাড়া, তৃতীয় পক্ষের সরবরাহ করা সামগ্রীর মান ওই দ্বিপাক্ষিক চুক্তি অনুযায়ী নিশ্চিত হবে কিনা, এ সব সামগ্রির দাম ওই চুক্তিতে ধরা দামের সমান হবে কিনা- এ সব প্রশ্নও সংশ্লিষ্ট মহলে দেখা দিয়েছে।

তবে ত্রিদেশীয় সমঝোতা স্মারক হওয়ায় বাংলাদেশ-রাশিয়া দ্বিপাক্ষিক সাধারণ চুক্তির বরখেলাপ হয়েছে কি না জানতে চাইলে বিশিষ্ট আইনজীবী, কোম্পানি ও চুক্তি আইনে অভিজ্ঞ তানজীব-উল আলম এই প্রতিবেদককে বলেন, ক্রেতার (বাংলাদেশ) যদি কোনো আপত্তি না থাকে, প্রকল্পের ক্রেতা যদি তৃতীয় পক্ষের অংশগ্রহণ মেনে নেয়, সে ক্ষেত্রে চুক্তির বরখেলাপ বা আইনের ব্যত্যয় হবে না।

আর তৃতীয় পক্ষের সরবরাহ করা জিনিসপত্রের মান ও দাম সম্পর্কে জানতে চাইলে বিশিষ্ট পরমাণু প্রকৌশলী, যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক পারমানবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রায় ৩০ বছর কর্মকাল শেষে অবসর নেওয়া মো. নূরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘সমঝোতা স্মারকটি বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে সই হওয়া সাধারণ চুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সাধারণ চুক্তি অনুযায়ী, প্রকল্পের ‘এ টু জেড’ করার কথা রাশিয়ার। ভারতের সরবরাহ করা সামগ্রী ও যন্ত্রপাতির কারণে, তা যতই মাইনর হোক না কেন, যদি কোনো সমস্যা দেখা দেয় তার দায় কে নেবে? বাংলাদেশ, রাশিয়া নাকি ভারত?’

মো. নুরুল ইসলাম বলেন, ‘পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন ও এর কিছু সামগ্রি তৈরিতে ভারত অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। প্রয়োজন হলে আমরা আলাদাভাবে ভারতের সঙ্গে চুক্তি করে সে সব বিষয়ে সহায়তা নিতে পারি। জনবল প্রশিক্ষনসহ কিছু কিছু বিষয়ে তা নেওয়াও হবে বলে দুই দেশের সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে সমঝোতা হয়ে আছে। এর বাইরে রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের কোনো চুক্তির আওতায় আমরা ভারতের সহায়তা নেব কেন? তাহলে তো রাশিয়ার সঙ্গে আমাদের চুক্তি সংশোধন করে নেওয়া উচিৎ।’

রূপপুর প্রকল্পের মূল নির্মাণকাজে ভারতীয় বিশেষজ্ঞ নিয়োগের বিষয়টি প্রথম প্রকাশ্যে বলেন রোসাতোমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অ্যালেক্সি লিখাচেভ। গত বছর জুন মাসে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক ফোরামে রূপপুর সংক্রান্ত এক আলোচনায় লিখাচেভ বলেন, ২০১৬ সালে ভারতের গোয়ায় অনুষ্ঠিত ‘ব্রিকস’ শীর্ষ সম্মেলনের সময় ভারতের পক্ষ থেকে তাঁদের দেশের বিশেষজ্ঞদের নিয়োগের ধারণাটি উপস্থাপন করা হয়। বিষয়টি নিয়ে আলোচনায় বাংলাদেশ এ ব্যাপারে কোনো আপত্তি করেনি।

এরপর ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় অনুষ্ঠিত আইএইএর সাধারণ সম্মেলনে ভারতের অংশগ্রহণকারী উর্ধতন কর্মকর্তারা রূপপুর প্রকল্পের জন্য ভারত থেকে কিছু যন্ত্রপাতি ও নির্মাণ সামগ্রি (ইকুইপমেন্ট অ্যান্ড ম্যাটেরিয়ালস) সরবরাহের প্রস্তাব দেন। ‘রোসাতোম নিউজলেটার বাংলাদেশ’-এর গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসের সংখ্যায় (ইস্যু ০০৮) এই খবর প্রকাশিতও হয়েছে।

ওই সময় ভারতের ‘ইকোনমিক টাইমস’-এর এক খবরে বলা হয়, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে কিভাবে একটি অর্থপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে সে বিষয়ে রাশিয়া ও বাংলাদেশের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করছে ভারত। বিদেশের মাটিতে রূপপুরই হবে ভারতের প্রথম কোনো পারমাণবিক প্রকল্প বাস্তবায়নে অংশগ্রহন।

২০১৪ সালে ভারত ও রাশিয়ার মধ্যেকার ‘স্ট্রাটেজিক ভিশন ফর স্ট্রেনদেনিং কো-অপারেশন ইন পিসফুল ইউসেজ অফ অ্যাটমিক এনার্জি’-তে বলা হয়েছে, তৃতীয় কোনো দেশে রাশিয়ার প্রযুক্তিনির্ভর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপিত হলে সেখানে ভারতের নির্মাণ সামগ্রি, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য সেবা প্রদান করা যায় কিনা দুই দেশ তা পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখবে। গত ১ মর্চের এমওইউ এই স্ট্রাটেজি (কৌশল) বাস্তবায়নের মাধ্যম হতে যাচ্ছে।

গত বছর (২০১৭) এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার ও উন্নয়নে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার লক্ষ্যে যে চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে তার আওতায় ভারতের কাছ থেকে রূপপুর প্রকল্পের জন্য পরামর্শক সেবা নেওয়া হচ্ছে। এই প্রকল্পের জন্য জনবল প্রশিক্ষণে ভারতের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। রূপপুর প্রকল্পের জন্য বাংলাদেশী পেশাজীবীরা তামিলনাড়ুর কুদনকুলম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রশিক্ষণ নিতে শুরুও করেছেন।

এ ছাড়া, রূপপুর প্রকল্পের জন্য সরকার ভারতের ‘গ্লোবাল সেন্টার ফর নিউক্লিয়ার এনার্জি পার্টনারশিপ (জিসিএনইপি)’-এর কাছ থেকে পরামর্শক সেবাও নিতে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে জিসিএনইপির সঙ্গে শিগগিরই চুক্তি সই হওয়ার কথা। এগুলো সবই বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির আওতায় নেওয়া হচ্ছে। এর বাইরে রাশিয়া রূপপুর প্রকল্পে তাঁদের কাজের সঙ্গে ভারতকে যুক্ত করার জন্য ১ মার্চের এমওইউ করেছে যার অংশ হয়েছে বাংলাদেশ।

রূপপুর প্রকল্পে ভারতের অংশগ্রহণ সম্পর্কে ‘ইউরেশিয়ারিভিউ ডট কম’ নামের একটি ইন্টারনেটভিত্তিক পত্রিকায় বলা হয়েছে, ভারতের জন্য এই সমঝোতা স্মারক অনেক কারণে গুরুত্বপূর্ণ। যেমন, রূপপুর প্রকল্পে অংশগ্রহণের ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পারমাণবিক প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় ভারত এক্সপোজার পাবে। রুশ বিশেষজ্ঞ ও প্রকৌশলীদের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠভাবে প্রকল্পের সকল পর্যায়ের নির্মাণকাজে অংশ নিতে পারবে যা ভবিষ্যতে ভারতকে রুশ প্রকৌশলী ও বাংলাদেশের পেশাজীবীদের মধ্যে সেতুবন্ধনের কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি করে দেবে। পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের যাবতীয় তথ্য সম্পর্কে জানা এবং সে সব তথ্য ব্যবহারের সামর্থ্য অর্জিত হবে। পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জিত হবে। এই অভিজ্ঞতা তাঁরা অন্য দেশেও কাজে লাগাতে পারবে। মোট কথা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ‘নলেজ পার্টনার’ হিসেবে ভারত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হবে।

তাছাড়া, আন্তর্জাতিক পারমাণবিক অঙ্গনে ভারত একটি দায়িত্ব সম্পন্ন দেশ হিসেবে বিবেচিত হবে। এখানকার অভিজ্ঞতা নিউক্লিয়ার সাপ্লায়ার্স গ্রুপের সদস্যপদ পেতে সহায়ক হবে। সব জেনে-বুঝেই ভারত সুপরিকল্পিতভাবে রূপপুর প্রকল্পে রাশিয়ার সঙ্গী হয়েছে।

ঢাকা থেকে প্রায় ১৬০ কিলোমিটার দূরে পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুরে পদ্মা নদীর পাড়ে দেশের প্রথম এই পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। গত বছর অক্টোবরে প্রকল্পটির মূল নির্মাণপর্ব (ফাস্ট কংক্রিট পোরিং) শুরু হয়েছে। প্রতিটি ১২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিট বিশিষ্ট এই কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে উৎপাদন শুরু হওয়ার কথা ২০২৩ সালে। এর পরের বছর দ্বিতীয় ইউনিটে। রাশিয়ার উদ্ভাবিত সর্বাধুনিক (থ্রি প্লাস জেনারেশন) ভিভিইআর-১২০০ প্রযুক্তির চুল্লি এই কেন্দ্রে বসানো হচ্ছে।

এই প্রকল্প বাস্তবায়নে ১২৬৮ কোটি ডলার ব্যয় ধরা হয়েছে বাংলাদেশ-রাশিয়ার মধ্যে সই হওয়া সাধারণ চুক্তিতে। এই ব্যয়ের ৯০ শতাংশ রাশিয়া ঋণ হিসেবে দিচ্ছে। তবে এর বাইরেও, এই প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কাজের জন্য আরও প্রায় ৪০০ কোটি ডলার ব্যয় হবে বলে সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ধারণা।

শুধু প্রবৃদ্ধি দেখছি, সমতাভিত্তিক উন্নয়ন দেখছি না

গণতন্ত্র ছাড়া যে উন্নয়নটা হয় সেটা দীর্ঘস্থায়ী হয় না

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ ::

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশসমূহে গত চার দশক ধরে বিভিন্ন কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে উন্নয়নের নামে। ’৬০-এর দিকে প্রথম উন্নয়ন দশকের মূল লক্ষ্য ছিল প্রবৃদ্ধি (growth);; দ্বিতীয় দশকে লক্ষ্য ছিল প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সমতা (growth with equity); তারপরের দশকে এলো বিকেন্দ্রীকরণ (decentralization); গণচেতনা (mass awareness) এগুলো; তারপর এখন উদ্দিষ্ট লক্ষ্য হলো অংশগ্রহণমূলক উন্নয়ন (participatory development), পরিবেশের সঙ্গে ভারসাম্যমূলক উন্নয়ন উৎসাহে এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার মদদপুষ্ট বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে। বাংলাদেশও এই রকম কৌশলের বাইরে থাকেনি। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি এরকম বিভিন্ন উন্নয়ন (sustainable  development), নারী উন্নয়ন এগুলো। এই সমস্ত কৌশলই এসেছে দাতা দেশসমূহের প্রচেষ্টার ফলেও গণদারিদ্র্য দূর হয়নি বরং অনেক দেশে বেড়েই চলছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের জন্য দারিদ্র্য একটি বিশাল সমস্যা। বস্তুত আপেক্ষিক দারিদ্র  ক্রমেই চরম আকার ধারণ করছে এবং এটা সামাজিক একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে সামাজিক স্থিতিশীলতাও সঙ্গীন অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে। কোনো কোনো ‘টার্গেট গ্রæপ’ ভিত্তিক প্রকল্প দারিদ্র্য কিছুটা লাঘব করলেও সার্বিকভাবে দারিদ্র্য তেমন কমেনি। বিশাল দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সিংহভাগ পল্লী অঞ্চলে। অতএব দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং পল্লী উন্নয়ন এই দুটির যোগসূত্র রয়েছে। তবে এটা লক্ষ্য করা যায় যে, ‘উন্নয়ন’ শব্দটির অস্পষ্ট ব্যবহারের ফলে অনেক সময় মূল সমস্যা দারিদ্র্য আড়ালে থেকে যায়।

উন্নয়নকে সুশাসন ও গণতন্ত্র থেকে আলাদা করে দেখা ঠিক নয়। উন্নয়ন ও গণতন্ত্র অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। উদাহরণ দেয়া হয়, গণতন্ত্র ছাড়াও বিশ্বের কিছু দেশে উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু সে উন্নয়ন টেকসই ও সমতাভিত্তিক নয়। সেখানে শুধু বস্তুনির্ভর প্রবৃদ্ধি ও ভোগবাদের প্রসার হয়েছে। মূল্যবোধ, ব্যক্তি স্বাধীনতা এগুলোর প্রাধান্য দেয়া হয়নি। বাংলাদেশ ওই পথে চলুক, আমরা সেটি চাই না।

বাংলাদেশে স্বাধীনতার লক্ষ্য ছিল, রাজনৈতিক স্বাধিকার এবং অর্থনৈতিক মুক্তি। বাংলাদেশের জন্য আন্দোলনটা বহু আগে থেকে শুরু হয়েছিল, ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ‘৬৯-র গণ-অভ্যুত্থান। বিশেষ করে ছয় দফা আন্দোলনের যে ভিত্তি ছিল, সেটা ছিল তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি অন্যায় আচরণ এবং এখানকার লোকজনকে অর্থনৈতিকভাবে শোষণ করা থেকে মুক্ত করা। অর্থনীতি মুক্তি অর্জন করার জন্য দরকার ছিল রাজনৈতিক স্বাধীনতা। আমরা স্বাধীনতা অর্জন করলাম। বিভিন্ন দোলাচল, অনিশ্চয়তা ও চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আমরা এ পর্যায়ে এসেছি। আমাদের দেশে আসলে রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নটা শুরু হয়েছে ১৯৯০ থেকে। প্রথম গণতান্ত্রিক সরকার শুরু হলো এবং ১৯৯০-র পর ধারাবাহিকভাবে ভালোভাবেই অর্জনটা ছিল। তার পর আমাদের ফরেন এক্সচেঞ্জ মার্কেট, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার, গার্মেন্ট এবং অন্যান্য সেক্টরে উত্তরোত্তর আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। এই কন্ট্রিবিউশনটা বিশেষ কোনো একটা সরকারের সময়ে হয়নি। ধারাবাহিকভাবে সব সরকারের সময় হয়েছে। তাই এখানে কৃতিত্ব কিন্তু সবার। একক কোনো সরকার এর কৃতিত্ব দাবি করতে পারবে না। আবার ব্যর্থতার ব্যাপারেও এককভাবে কাউকে দোষ দিতে পারবে না।

এদিকে আমি যাচ্ছি না। আমি এখন আমাদের যে মূল চ্যালেঞ্জগুলো এবং সেখানে আমাদের অর্থনৈতিক চিন্তাধারা, রাজনৈতিক চিন্তাধারার কিছু কথা বলব। মানে রাজনৈতিক যে বিশ্লেষণ বা অর্থনীতির যে বিশ্লেষণ, সে বিষয়ে আমি প্রাসঙ্গিক কথা বলব। প্রথমত, চ্যালেঞ্জগুলো আমাদের অর্থনীতির দিক দিয়ে, যেগুলো রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত করা যায়। প্রথম হলো আমরা যে ধারাবাহিকভাবে প্রবৃদ্ধি অর্জন করছি, সেটা এখন কিছুটা মন্থর, আবার বিনিয়োগও মন্থর হয়ে গেছে। দ্বিতীয়ত, দেখছি যে সরকারের যে নীতিগুলো নেওয়া হয়েছে, সেগুলোর ধারাবাহিকতা বা নীতিগুলো যে খুব সুষ্ঠু নীতি হয়েছে সেটাও নয়। আবার নীতিগুলো বাস্তবায়ন যারা করবে, আমলা এবং সরকারের যে নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ আছে তাদের দক্ষতা ও স্বচ্ছতা প্রশ্নবহুল। সব শেষে সার্বিকভাবে যে উন্নয়নগুলো হয়েছে, বিশেষ করে সূচকের দিকটি বেড়েছে, প্রবৃদ্ধি বেড়েছে, ব্যক্তিগত আয় বেড়েছে গড় হিসেবে। কিন্তু তার সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছেছে কিনা। যতটুকু উন্নয়ন হয়েছে, তার সুফল কিন্তু বহুলাংশে সাধারণ মানুষ পায় না। কারণ এখন আমরা দেখছি যে, দিন দিন কিন্তু ধনী-দরিদ্র-নিম্নমধ্যবিত্তের ফারাক বাড়ছে; বঞ্চিতের সংখ্যা বাড়ছে। তবে আপেক্ষিকভাবে কেউ বলতে পারে যে, আগে তো কেউ শার্ট পরত না, প্যান্ট পরতে পারত না, মোবাইল সবার কাছে আছে। সেটা হলো আপেক্ষিকভাবে। একজন রিকশাঅলার মোবাইল আছে, কিন্তু যে ৮ থেকে ১০ বছর আগে রিকশায় চড়তে পারত না, তারা এখন হাজার কোটি টাকার মালিক। তাই ফারাকটা কী। একই ধরনের লোক একই কর্মদক্ষতা কিন্তু সে চলে যাচ্ছে কোথায়। বিভিন্ন ফাঁক-ফোকরে, রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে, এমনকি দুর্নীতির মাধ্যমে। তাই এই অসম উন্নয়নটা অ্যাক্সেপ্টেবল নয়। এই চ্যালেঞ্জগুলো বাংলাদেশের জন্য একটি বড় ব্যাপার। এ জন্য আমরা দেখছি যে, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অস্থিরতা না থাকলেও অশ্চিয়তা আছে। কী হবে, না হবে। কী ধরনের সরকার হবে। আর এখন যে রাজনৈতিক অবস্থাটা আছে বা যে কোনো সময় রাজনৈতিক যে গভর্নমেন্ট আসে, সেখানে আমরা কিন্তু গুড গভর্নেন্স দেখতে পাচ্ছি না। সুশাসনের অভাব আছে। সুশাসনের অভাব মানে স্বচ্ছতা নেই, জবাবদিহিতা নেই। কেউ যদি অন্যায় করে তার কোনো শাস্তি হয় না। সব থেকে মারাত্মক হলো রুল অব ল’ নেই। আইন আছে কিন্তু এটার বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে। রাজনীতির মেজর জিনিসটা যে খালি ভোট দিলে হয়ে গেল তা নয়। সুশাসন ছাড়া কিন্তু কোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। অনেকে বলে, কোনো কোনো দেশে তো মার্শাল ল’ ছিল। কোনো কোনো দেশে তো ডিক্টেটর ছিল। উন্নয়ন হয়েছে। গণতন্ত্র ছাড়া। কিন্তু গণতন্ত্র ছাড়া যে উন্নয়নটা হয় সেটা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। সেখানে ১০ থেকে ২০ বছর পর দেখা গেছে, বেশিরভাগ লোকই দরিদ্র। তাই ওই পথে যাওয়া যাবে না। তার পর রেগুলেটরি বডি যেগুলো আছে, যেমন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন। মানুষের বিবেচনায় তো কাজ করে না, যেভাবে গ্যাস-পেট্রলের দাম বাড়ে। বিটিআরসি নানারকমের নীতি দিচ্ছে। এগুলোর কোনো কনটিনিউটি থাকে না। সরকার চেঞ্জ হলে অন্য সরকার এসে পুরো সিস্টেমই পরিবর্তন করে দেয়। যদিও অনেক ভালো নীতি অনেক সময় নেয়। মোটামুটি যদি ধারাবাহিক থাকে, আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলো যেমন ভারতেও কিন্তু অর্থনীতিবিষয়ক নীতিগুলো একেবারে চেঞ্জ হয়ে যায় না। মোদি এসে তো বলেননি যে, আমরা ইন্ডাস্ট্রি করব না। আমরা এক্সপোর্ট করব না। আমরা ম্যান পাওয়ার বাড়ব না। আমরা আইটি সেক্টরে কাজ করব না। তিনি বলছেন, আমি করব অন্যভাবে। লোকজন কিছু চেঞ্জ হবে। সেটা অন্য কথা। এটা আমেরিকায়ও করে। কিন্তু আমাদের দেশে দুঃখজনকভাবে এগুলো হয় না।

আর ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ তো একেবারেই হয়নি। লোকাল গভর্নমেন্ট অর্গানাইজেশন বলে কিছুই নেই। ঢাকা থেকে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা হয়। ঢাকা থেকে করার ফলে যেটা হয়, আমাদের প্রত্যেকটি অঞ্চলের লোকজন কীভাবে বেঁচে থাকে, তাদের চাহিদা আমলে নেওয়া হয় না। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ তাদের ভূমিকা নগণ্য। এখন আবার অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ইউনিয়ন পরিষদ সচিবদের বেতন দেবে তাদের আয় থেকে।

সরকার বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের বেতন দিয়ে দিচ্ছে হাজার কোটি টাকা। আর ইউনিয়ন পরিষদের সচিবদের বেতন দেবেন না। এটা কোনো কথা হলো নাকি? ওদের কি ট্যাক্স পাওয়ার আছে? ওদের কি অথরিটি দেওয়া হয়েছে? গরিব মানুষদের ওপর আর কত ট্যাক্স চাপাবে? ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়লে, এক্সপোর্ট বাড়লে ট্যাক্স বাড়ে। ওদের কি এক্সপোর্টের ওপর ট্যাক্স ধার্য করার ক্ষমতা আছে? বা আয়ের ওপর ট্যাক্স বসানোর ক্ষমতা আছে? তাই সার্বিকভাবে আমি বলব, আমাদের যে রাজনৈতিক চিন্তাধারা, তা হলো গতানুগতিক। মার্কেট ইকোনমির ওপর, বাজারের ওপর ডিপেন্ড করে আমরা চলব এবং বাজার সবকিছু নির্দিষ্ট করবে। ডিমান্ড অ্যান্ড সাপ্লাই ঠিক করবে। সেভাবে যাবে। আর অর্থনীতিবিদরাও তখন চিন্তা-ভাবনা করছে যে, ঠিক আছে, বাজারের মধ্যে থেকেই আমরা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি বিবেচনা করব। তার মানে কিছু কিছু জায়গায় ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে, সেখানে একটু মলম দিলাম। কিন্তু পুরো শরীরে যখন নানা সিস্টেমেটিক ডিজিজ হয়। আমার যদি ইমিউন সিস্টেম নষ্ট হয়ে যায়। আমার ব্লাড যদি দূষিত হয়। আমার নাকের মধ্যে ওষুধ দিলে, চোখের মধ্যে ওষুধ দিলে কী লাভ হবে। কোনো লাভ হবে না। এখন আমাদের তো হয়েছে সিস্টেমেটিক ডিজিজ। এক জায়গায় তো নয়। এটা সর্বগ্রাসী। পুরো সিস্টেম নষ্ট হয়ে গেছে। আর সেই সিস্টেম মানে রাজনৈতিক সিস্টেম। রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো, অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো, বাজারগুলো এবং লোকাল লেভেলে যে প্রতিষ্ঠানগুলো আছে সেগুলো। স্কুলগুলো এবং স্কুল ম্যানেজিং কমিটিগুলোকেও প্রভাবিত করে পলিটিক্যাল মোটিভেশন।

ব্যাংকিং সেক্টর দীর্ঘদিন ধরেই নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়ে আছে। বর্তমানে এ সেক্টরের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে সুশাসনের অভাব। অভ্যন্তরীণভাবে ব্যাংকিং সেক্টরে সুশাসন বলতে কিছু নেই। দ্বিতীয় সমস্যা হচ্ছে ব্যাংকিং সেক্টরের জন্য যেসব নীতিমালা ও আইন-কানুন আছে, কোম্পানি আইন আছে, আন্তর্জাতিক নর্মস আছে, সেগুলো সঠিকভাবে পরিপালন করা হচ্ছে না। ব্যাংকিং সেক্টরে যেসব নীতিমালা ও আইন আছে, তা আন্তর্জাতিক মানের। কিন্তু এগুলো সঠিকভাবে পরিপালন এবং বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। এর ফলে নানারকম সমস্যা দেখা দিচ্ছে। পরিচালনা বোর্ড থেকে শুরু করে ম্যানেজমেন্ট এবং নিচের দিকে কর্মকর্তা পর্যায়ে কোথাও সুশাসন অনুসৃদ হচ্ছে না। সর্বত্রই মারাত্মক ত্রুটি পরিলক্ষিত হচ্ছে। সবমিলিয়ে ব্যাংকিং সেক্টর এখন মোটেও ভালো অবস্থায় নেই। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোয় সমস্যা সবচেয়ে প্রকট। পরিচালনা বোর্ড ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নির্দেশনা দেবে। তারা নীতিগত বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাবে। আর ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের কাজ হবে সে নীতিমালা বাস্তবায়ন করা। পরিচালনা বোর্ড এবং ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের কার্যপরিধি আইন দ্বারা নির্ধারিত রয়েছে। কিন্তু প্রায়ই শোনা যায় বা অভিযোগ পাওয়া যায়, পরিচালনা বোর্ড ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের কাজে হস্তক্ষেপ করে। এখন দেখা যায়, ব্যাংকের পরিচালনা বোর্ড নীতিগত সিদ্ধান্ত প্রদানের ক্ষেত্রে যত না আগ্রহী, তার চেয়ে ব্যাংকের দৈনন্দিন কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করতেই যেন বেশি উৎসাহী। ফলে ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের পক্ষে স্বাধীনভাবে তাদের সৃজনশীলতাকে ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। তারা পরিচালনা বোর্ডের দ্বারা প্রায়ই নির্দেশিত হয়ে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। এটা কোনোভাবেই ব্যাংকিং সেক্টরের জন্য মঙ্গলজনক নয়। অবশ্য ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট যে সবসময় দক্ষ হয়, তা নয়। অনেক সময় ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের অদক্ষতা এবং ত্রæটির কারণেও সমস্যার সৃষ্টি হয়। এসব নানা কারণে ব্যাংকিং সেক্টরে দুর্নীতি দেখা দিচ্ছে এবং জবাবদিহিতার ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। পরিচালনা বোর্ড ও ম্যানেজমেন্টের মধ্যে পরস্পর দোষারোপ করার প্রবণতা দেখা যায়। ফলে জবাবদিহিতার বিষয়টি গৌণ হয়ে পড়ে। ব্যাংকিং সেক্টরে মনিটরিং এবং সুপারভিশনও খুব দুর্বল। যারা পরিচালনা বোর্ডে পরিচালক বা চেয়ারম্যান হয়ে আসেন, তাদের নিজস্ব ইন্টারেস্ট থাকে। তাদের নিজস্ব ব্যবসা-বাণিজ্য থাকে। আত্মীয়স্বজনের ব্যবসা-বাণিজ্যে সুবিধা প্রদানের জন্য ব্যাংক ম্যানেজমেন্টকে চাপ দিয়ে থাকেন। নিজস্ব লোকদের ঋণ প্রদান বা চাকরি প্রদানের জন্য তারা ম্যানেজমেন্টের ওপর প্রভাব বিস্তার করে থাকেন। এটা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। আগে ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় এমনটি ছিল না। ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে যারা নিয়োগ লাভ করেন, তাদের নিযুক্তি অনেকটাই নির্ভর করে পরিচালনা বোর্ডের ওপর। কাজেই তারা ইচ্ছা করলেই পরিচালনা বোর্ডের সদস্য বা চেয়ারম্যানের পরামর্শ বা নির্দেশনা উপেক্ষা করতে পারেন না। একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ব্যাংকে থাকবেন কিনা, তা অনেকটাই নির্ভর করে পরিচালনা বোর্ডের সদস্যদের সন্তুষ্ট করার ওপর। ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দক্ষতা এবং পারফরম্যান্সের ওপর তার টিকে থাকা-না থাকা তেমন একটা নির্ভর করে না। ব্যাংকের পরিচালনা বোর্ডকে সন্তুষ্ট করতে পারলে, তার পক্ষে এমডি হিসেবে টিকে থাকায় কোনো সমস্যা হয় না। এজন্য দেখবেন কোনো কোনো ব্যাংকের এমডিদের বেতন-ভাতা অত্যন্ত উচ্চ। এদের বেতন-ভাতা অনেক বেশি হওয়ার কারণ হচ্ছে তারা পরিচালকদের কথাবার্তা শোনেন; তাদের নির্দেশনা মোতাবেক কাজ করেন। এতে ব্যাংকের স্বার্থ রক্ষা হলো কিনা, সেটা তাদের বিবেচ্য বিষয় নয়। পরিচালনা বোর্ড তাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি আরোপ করতে চায়। পরিচালনা বোর্ডে অনেকেই থাকেন, যারা সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তারা তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে চান। একজন পরিচালক বা চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকতেই পারে; কিন্তু তা যদি ব্যাংকের কাজে ব্যবহার করতে চান তাহলেই সমস্যা দেখা দেয়। ব্যবস্থাপনার মধ্যেও আবার অনেক লোক আছেন, যারা দক্ষ নন বা নানা ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক যদি অদক্ষ বা দুর্বল হন, তাহলে তার প্রভাব সর্বত্রই পড়ে। এতে নিচের দিকের কর্মীরা নানা দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। দুর্নীতি-অনিয়ম উপর থেকে নিচের দিকে ধাবিত হয়। কাজেই টপ ম্যানেজমেন্ট যদি কঠোরভাবে সুশাসন নিশ্চিত করেন, তাহলে তার প্রভাব নিচের দিকে পড়বেই। কিন্তু আমাদের এখানে টপ ম্যানেজমেন্টের মধ্যেও সমস্যা রয়ে গেছে। সবমিলিয়ে ব্যাংকিং সেক্টরে এখন সুশাসনের অভাব, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা জেঁকে বসেছে।

এখন আমাদের সময় এসেছে এ বিষয়গুলো বিবেচনা করার। সরকার গণতন্ত্র, সুশাসন প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা, গতিশীলতা এনে সুষম ও টেকসই উন্নয়নে সহায়তা করবে, এটাই এখন বিশেষ প্রয়োজন। সরকারের নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান যেমন-বাংলাদেশ ব্যাংক, সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ করপোরেশন সার্বিকভাবে দায়িত্ব পালন করবে। কিছু কিছু জায়গায় পাবলিক সেক্টরগুলো, করপোরেশনগুলোর মূল্য আছে। যেমন আমি উদাহরণ দিই বিদ্যুৎ খাত। বিদ্যুৎ খাতে যখন আমাদের ক্রাইসিস হলো, তখন ঘোড়াশাল, আশুগঞ্জের মতো একটা ৫০০, ৬০০ মেগাওয়াটা বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট করা যেত সরকারি উদ্যোগে এবং নিয়ন্ত্রণে। এটা করলে ইন্ডিভিজুয়াল কুইক রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্ট- যেটা দেখেছি বেসরকারি খাতে সেগুলোর ওপর নির্ভরশীল কম হতো, জনগণ স্বল্পমূল্যে বিদ্যুৎ পেত এবং সরকারি খাত থেকে ভর্তুকির খরচ কমে যেত। পাওয়ার সেক্টরে পাবলিক সেক্টরের ইনভেস্টমেন্ট থাকা উচিত। পৃথিবীর সব দেশেই থাকে। ইনডিপেন্ডেন্ট কিছু কিছু ছোট জায়গায় যেখানে গভর্নমেন্ট একেবারে পৌঁছাতে পারবে না, সেখানে পাওয়ার প্ল্যান্ট কিছু হতে পারে। তবে একেবারে ঢালাওভাবে সব প্রাইভেট সেক্টর করবে না।

মার্কেটিংয়ের বেলায় অ্যাগ্রিকালচার মার্কেটিংয়ে পৃথিবীর অন্যান্য দেশে কিন্তু মার্কেট একেবারে ছেড়ে দেওয়া হয় না। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া কমলা উৎপাদন করে। বিরাট একটা প্রতিষ্ঠান আছে। ওরা ওটার কন্ট্রোলে থাকে উৎপাদকের স্বার্থ দেখার জন্য। এটা বাজারের হাতে ছেড়ে দেয় না। তার পর কানাডায় হুইট (গম) বোর্ড আছে। কানাডার ফার্মাররা যে গম উৎপাদন করে, তাদের স্বার্থে এটা কাজ করে এবং ভোক্তাদের স্বার্থও দেখে। আর এখানে কৃষকদের ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে ফটকাবাজ বা মধ্যস্বত্বভোগী ব্যাপারীদের হাতে। গভর্নমেন্টের তো এখানে কতগুলো রুলস, কতগুলো ফ্যাসিলিটিস থাকবে। এখানে কিন্তু পাবলিক সেক্টর রুল আছে। এখানে পাবলিক সেক্টরের প্রয়োজন। অনেকে বলে, রাষ্ট্রয়ত্ত ব্যাংক সব বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিতে হবে। আমি কিন্তু এর পক্ষপাতী নই। বরং রাষ্ট্রয়ত্ত ব্যাংকগুলোয় যদি সততা ও স্বচ্ছতা নিয়ে আসে, তবে প্রতিযোগিতামূলক আবহ সৃষ্টি হবে ব্যাংকিং খাতে। আসলে সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী যদি একেবারে নাই থাকে, তখন দেখা যাবে কী অবস্থা। অন্যরা ইচ্ছামতো কাজ করবে। অতএব রাষ্ট্রয়ত্ত সব ব্যাংক ছেড়ে দিলে কিন্তু চলবে না। একটা, দুইটা, তিনটা কিন্তু রাখতে হবে। যেমন সোনালী ব্যাংক প্রাইমারি স্কুলের টিচারদের বেতন দেয়। এখন প্রাইভেট ব্যাংকে দিলে কী করবে। টিচারদের বেতনও হয়তো পৌঁছাবে না সময়মতো। সরকারের টাকাটা নিয়ে রেখে দেবে। আরেকজনকে ধার দেবে। তার পর সরকার ট্রেজারি ফি জমা দিল কিন্তু এক মাস, দুই মাস পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকে টাকাটা পাঠালই না। তবে অবশ্য কাজ হচ্ছে রাষ্ট্রয়ত্ত ব্যাংকগুলোর পরিচালনা, ব্যবস্থাপনা ও নজরদারি আরও স্বচ্ছ এবং জোরদার করা। দুর্নীতি, রাজনৈতিক প্রভাব থেকে এগুলোকে মুক্ত করতে হবে।

কয়েক বছর আগে ফরাসি অর্থনীতিবিদ নোবেল প্রাইজ পেয়েছিলেন। তার নাম জ্যাঁ তি হল। তার মূল বিষয়বস্তু হলো, কী করে বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। মার্কেটকে লোকজনের হাতে ছেড়ে দেওয়া চলবে না। তবে নিয়ন্ত্রণ খুব সোজা কাজ নয়। আদেশ-নির্দেশে কাজ হবে না। মেকানিজম তৈরি করতে হবে। চেক অ্যান্ড ব্যালান্স। কেউ যদি এটা না মানে তাহলে তার তখন কী পরিণতি হবে। ফাইন হবে। ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইসিসের ফলে বিভিন্ন দেশে অর্থনৈতিক বিপর্যয় নেমে এসেছে। ইতালি, গ্রিস, স্পেন এখনো এটা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। তাই সেই চিন্তাটা করতে হবে। আমার মনে হয়, আমাদের অর্থনীতিবিদরাও সে চিন্তা করছেন। জ্যাঁ তি হল অন্য লেখকের সঙ্গে আর একটি বই লিখেছেন। ‘ব্যালান্সিং দ্য ব্যাংকস’। ব্যাংকগুলো যা ইচ্ছা তাই করবে, লোকজনকে বিপদে ফেলে আমানত নিয়ে ইনভেস্ট করবে। এটার রেগুলেট করা। কেয়ারফুললি করতে হবে। রেগুলেটকারীরা নিয়ন্ত্রণকারী যেন না হয়। বিশেষ করে ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টরে সেখানে নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু সংবেদনশীল। যথাযথভাবে এটাকে দেখতে হবে।

গভর্নমেন্ট নিশ্চিত করবে ফুড সিকিউরিটি। গভর্নমেন্ট নিশ্চিত করবে সুশাসন। তার  মধ্যে সবাই থাকবে। প্রাইভেট সেক্টরে কাজ করবে। একটা কথা আছে, বাংলাদেশে এখন সুশাসনের অভাব। ইনভেস্টমেন্টের আবহ নেই। পরিবেশ নেই। অবকাঠামোর বা ইনফ্রাস্ট্রাকচারের প্রবলেম আছে। আমরা দ্রুত এগিয়ে যেতে পারছি না। যত তাড়াতাড়ি আমরা এগিয়ে যেতে পারতাম, সেটা পারছি না। একেবারেই যে স্থির হয়ে আছি সেটা নয়। রানওয়েতে কিছুক্ষণ চলার পর প্লেন টেক অফ করে। আমরা কিন্তু টেক অফ স্টেজে চলে এসেছিলাম। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে যে, আসলে এখনো আমরা রানওয়েতেই আছি। তার মানে চলার গতি কম ও রানওয়েটা দীর্ঘ হচ্ছে। এখনো আমরা টেক অফ করে ওপরে উঠতে পারছি না। টেক অফ হলে আলটিমেটলি গ্রোথ রেটে আমরা ছয়, সাত, আট করে ওপরে উঠে যেতাম। সেটা হলে আমাদের দ্রুত একটা উন্নতি দেখতে পারতাম।

রাজনীতির চর্চা জনগণের স্বার্থে হচ্ছে না। দেশে রাজনৈতিক সহনশীলতা ও সুস্থ রাজনীতি চর্চার অভাব প্রকট। জনগণকে বিভিন্ন বিষয়ে সম্পৃক্ত না করার প্রবণতাও বেশি। এতে জনগণের অনেক সমস্যার সমাধান হয় না। সবচেয়ে বড় বিষয় হল, সমস্যাগুলোর সমাধান না করে বরং তা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করা হয় এবং এর দায় অন্যের ঘাড়ে চাপানোর প্রবণতা বিদ্যমান। গণতন্ত্র ও উন্নয়ন দুটোই পাশাপাশি চলতে হবে। আপনি শুধু উন্নয়ন নিশ্চিত করলেন, আর গণতন্ত্রকে পাশ কাটিয়ে গেলেন- তাহলে কিন্তু স্থায়ী, টেকসই, সমতাভিত্তিক ও অর্থবহ সমাজ প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। আমাদের অঙ্গীকার হবে সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। এতে দিনে দিনে কেবল সমস্যার পাহাড় জমছে, কোনো সমাধান পাওয়া যাচ্ছে না। আরেকটা বিষয়, আইনের শাসন আরও দৃশ্যমান হতে হবে। তাহলে সমাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হবে। এর ফলে আমার বিশ্বাস, আমাদের সব সম্ভাবনা কাজে লাগানো সম্ভব হবে।

পরিশেষে, বাংলাদেশের উন্নয়নের গতি ও প্রকৃতি নিয়ে কিছু বলা যায়। সামগ্রিক অর্থনীতির সূচকগুলোর অর্জন ভালো। আমরা প্রবৃদ্ধির ৬-এর বৃত্ত থেকে বেরিয়ে গেছি। এটি ইতিবাচক। সার্বিক উন্নতি সন্তোষজনক। এ জন্য বাংলাদেশ একটা মডেল। দুর্বল দিকটা হল, অর্জনের এ ফলগুলো সমাজের নিচের স্তরে অপেক্ষাকৃত খুব কম পৌঁছেছে। ধরুন ধনাঢ্য শ্রেণী, যারা আগে একটা গাড়িতে চড়ত, তারা এখন একাধিক গাড়িতে চড়ছে। গরিব লোক আগে স্যান্ডেল পরত না, তারা স্যান্ডেল পরছে এবং কিছু মাথাপিছু আয় বেড়েছে। এর বেশি কিছু নয়। অর্থাৎ অর্থনৈতিক বৈষম্য দিন দিন বাড়ছে। যেটা ভালো নিদর্শন নয়। উন্নয়নটা সমতাভিত্তিক হচ্ছে না। সমতাভিত্তিক উন্নয়ন না হলে তা টেকসই হয় না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে আমরা রাজনৈতিক স্বাধিকার ও অর্থনৈতিক মুক্তি এ দুটিই চেয়েছিলাম। সেটি পূরণ হচ্ছে কি? এখন আমরা শুধু প্রবৃদ্ধি দেখছি, সুষম বণ্টন দেখছি না।

(লেখক, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর এবং বর্তমানে  ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ।)

 

রূপপুরের এপিঠ ওপিঠ-২ : তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ও দুর্ঘটনার দায় নিয়ে দুশ্চিন্তা

অরুন কর্মকার ::

পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সবচেয়ে স্পর্শকাতর দুটি বিষয় হলো এর তেজস্ক্রিয় বর্জ্য এবং দুর্ঘটনা। তেজস্ক্রিয় বর্জের ব্যবস্থাপনা একটি বিশেষায়িত বিষয়। এ জন্য প্রযুক্তি যেমন প্রয়োজন তেমনি প্রয়োজন উন্নতমানের প্রশিক্ষিত ও দক্ষ জনবল। এর কোনোটাই বাংলাদেশের নেই। তাই বিষয়টি নিয়ে রূপপুর প্রকল্পের শুরু থেকেই আলোচনা হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে প্রথম থেকেই বলা হচ্ছে যে, রূপপুর প্রকল্পের জ্বালানি যেমন রাশিয়া সরবরাহ করবে, তেমনি এখানকার স্পেন্ট ফুয়েল (ব্যবহৃত জ্বালানির অবশিষ্টাংশ) রাশিয়া ফেরত নেবে। কিন্তু স্পেন্ট ফুয়েল আর তেজস্ক্রিয় বর্জ্য কি এক? এই প্রশ্নের উত্তর জানা দরকার।

অন্যদিকে, পারমাণবিক দুর্ঘটনার দায় (নিউক্লিয়ার লায়াবিলিটি) গ্রহন এবং কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে সেই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার মত সামর্থ্য এরও কোনোটা বাংলাদেশের নেই। অথচ রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে যে চুক্তি (জেনারেল কন্ট্রাক্ট) সই করেছে তাতে বাংলাদেশকেই এই দুর্ঘটনার দায় নিতে হবে। সরকার অবশ্য এই ভেবে নিশ্চিন্ত আছে যে, দুর্ঘটনা ঘটবে না। উন্নততর প্রযুক্তি দুর্ঘটনা এবং তার প্রতিক্রিয়া (কনসিকোয়েন্সেস) ঠেকাবে। কিন্তু বাস্তবে কী হবে তা কারো পক্ষেই বলা সম্ভব নয়।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: পারমাণবিক বর্জে্যর ভয়বহতা সম্পর্কে সবাই অবহিত ও সচেতন। অনেকের ধারণা স্পেন্ট ফুয়েলই হল পারমাণবিক বর্জ্য। আসলে তা নয়। স্পেন্ট ফুয়েল হলো পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত জ্বালানি‌র (ইউরেনিয়াম ২৩২) অবশিষ্টাংশ। একটি নির্দিষ্ট সময় (সাধারণত ৬ মাস) পর পর এই স্পেন্ট ফুয়েল বের করে নিয়ে রিঅ্যাক্টরে নতুন জ্বালানি ভরা রড স্থাপন করা হয়।

বের করা স্পেন্ট ফুয়েল রিসাইকেল করে তিনটি জিনিস পাওয়া যায়—কিছুটা ইউরেনিয়াম -যা পুনরায় বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহার করা যায়, প্লুটোনিয়াম -যা পরমাণু অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহারযোগ্য এবং তেজস্ক্রিয় পারমাণবিক বর্জ্য যার পরিমান খুব কম, কিন্তু অত্যন্ত ভয়াবহ। এই বর্জ্য সিলিকার সঙ্গে মিশিয়ে গলিত কাঁচের মত একটা পদার্থ বানিয়ে তা স্টেইনলেস স্টিলের কনটেইনারে ভরে কংক্রিট দিয়ে শিল্ডিং করে কোনো নির্জন ও শুকনা স্থানে শত শত বছর সংরক্ষণ করতে হয়।

এই স্থানটা হতে হয় এমন যেখানে কোনোদিন পানি আসেনি। এটা মূলত রাখা হয় পরিত্যাক্ত লবন খনিতে। তেজস্ক্রিয় বর্জ্য সংরক্ষণের এটাই মূল পদ্ধতি। কিন্তু এই ধরণের কোনো স্থান বাংলাদেশে নেই। এ ছাড়া, একটা হেভি কংক্রিটের স্ট্রাকচার তৈরি করে একটা জনমানবশুন্য স্থানেও সংরক্ষণ করা যেতে পারে। কিন্তু সেটাও ঝুকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল।

রূপপুরের প্রসঙ্গে বলা হয়, রাশিয়া স্পেন্ট ফুয়েল নিয়ে যাবে। কিন্তু আমাদের নিশ্চিত হতে হবে যে, স্পেন্ট ফুয়েল নিয়ে রিসাইকেল করে প্রকৃত তেজস্ক্রিয় বর্জ্য তাঁরা রেখে দেবে, না কি আমাদের ফেরত দেবে। এ বিষয়ে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। কারণ রাশিয়া স্পেন্ট ফুয়েল ফেরত নেবে বলে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা হলেও এ-সংক্রান্ত কোনো চুক্তি এখনো হয়নি। চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়। তাই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন রয়েই গেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, স্পেন্ট ফুয়েল ছাড়াও পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে আরও দুই ধরণের বর্জ্য হয়। একটি কঠিন (বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত অনেক যন্ত্রপাতিসহ ধাতব বস্ত্ত) এবং অন্যটি তরল বর্জ্য। কঠিন বর্জ্যটা খুব বেশি বিপজ্জনক নয়। কারণ সেগুলো ধুয়ে-মুছে পরিস্কার করা যায়। কিন্তু ওই ধোয়া-মোছার পানিসহ তরল বর্জ্য মারাত্মক। সেগুলো বিশেষ ধরণের ট্যাংকে সংরক্ষণ করতে হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৩০ বছরের কর্মজীবন শেষে অবসর নেওয়া প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম যুক্তরাষ্ট্রের হ্যানফোর্ড রিজার্ভেশনে রাখা তরল পারমাণবিক বর্জ্য সংরক্ষণের কথা উল্লেখ করে বলেন, সেখানে তরল বর্জ্য রাখা ১৫৯টি ট্যাংক আছে। একেকটি ট্যাংকের ধারণ ক্ষমতা ২০ হাজার থেকে ১০ লাখ গ্যালন। তিনি বলেন, প্রথমে তাঁরা বানিয়েছিল সিঙ্গেলশেল ট্যাংক, কোকাকোলার ক্যানের মত। তাঁদের ধারণা ছিল ২০ বছরের মধ্যে নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে সেগুলোকে প্রক্রিয়াজাত করতে পারবে। কিন্তু সেটা পারেনি। ইতিমধ্যে ট্যাংকগুলো ছিদ্র হতে শুরু করে। তখন তাঁরা ডাবলশেল ট্যাংক তৈরি করে। একটা কোকের ক্যান আরেকটা ক্যানের মধ্যে ঢুকিয়ে রাখার মত ব্যবস্থা আর কি। কিন্তু তাতেও কাজ হচ্ছে না। এখন ডাবলশেল ট্যাংকও ছিদ্র হতে শুরু করেছে। তিনি বলেন, বর্তমানে হ্যানফোর্ডে পাঁচ কোটি ৪০ লাখ (৫৪ মিলিয়ন) গ্যালন তরল পারমাণবিক বর্জ্য আছে। এই বর্জের ‘হাফ লাইফ (তেজস্ক্রিয়তা সহনীয় মাত্রায় নেমে আসা)’ হলো ১০ হাজার বছর। যুক্তরাষ্ট্রের সরকার নেভাদায় ভূপৃষ্টের আধা মাইল নীচে একটা ডিপজিটরি তৈরি করেছে। সেখানে বর্জ্যগুলো রাখা হয়েছে ডাবলশেল স্টেইনলেস স্টিলের কনটেইনারে। এরপর কি হবে, এগুলো নিয়ে কি করা যাবে তা কেউ জানে না। সবার আশা হলো একটা বড় ভূমিকম্প হলে ওগুলো চিরদিনের মত মাটির তলায় চাপা পড়বে।

হ্যানফোর্ডে যে ৫৪ মিলিয়ন গ্যালন তরল পারমাণবিক বর্জ্য আছে এর ১০ শতাংশ প্রক্রিয়াকরণ করার জন্য যে প্লান্ট তৈরি করা হচ্ছে তার সর্বশেষ প্রাক্কলিত ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১৪৫০ কোটি ডলার। প্রক্রিয়াকরণের ক্ষমতা এখন ২০ শতাংশ করতে চাচ্ছে। তাতে সম্ভাব্য ব্যয় দাঁড়াবে ২৫০০ থেকে ৩০০০ কোটি ডলার। এটা বলা হচ্ছে মাত্র একটি কেন্দ্রে সংরক্ষিত বর্জের ২০ শতাংশ প্রক্রিয়াকরণ করার কথা। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য কেন্দ্রে তো আরও অনেক বর্জ্য সংরক্ষিত আছে।

‘নিউক্লিয়ার লায়াবিলিটি’: রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের যে চুক্তি হয়েছে (জেনারেল কন্ট্রাক্ট), তাতে এই শিরোনামে একটি ক্লজ আছে। সেখানে বলা হয়েছে, এই প্রকল্পের কাজে দেশে এবং দেশের বাইরে যে কোনো ধরণের দুর্ঘটনা কিংবা ড্যামেজ হলে তার দায় এককভাবে বাংলাদেশের।

অর্থাৎ রাশিয়ায় যন্ত্রপাতি তৈরির সময়ও যদি কোনো ড্যামেজ হয় সে দায়ও বাংলাদেশকে নিতে হবে। অথচ প্রকল্পের ‘এ টু জেড’ করছে রাশিয়া। এই যে তাঁরা করছে, কি করছে, কীভাবে করছে সেটা আমরা তত্ত্বাবধানও করছি না বা করার সামর্থ্যও আমাদের নেই। সুতরাং এই দায় আমরা কেনো নেব এবং কিভাবেই বা নেবো এগুলো গুরুত্বপ্রশ্ন প্রশ্ন যার সমাধান হওয়া দরকার।

আন্তর্জাতিক আইন ও প্রটোকল অনুযায়ী যে দেশ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র করবে অর্থাৎ যে দেশ এই কেন্দ্রের স্বত্ত্বাধিকারী, দুর্ঘটনার দায় তাদের। বিদ্যুৎকন্দ্রের নির্মাণকারী, যন্ত্রপাতি সরবরাহকারী কিংবা অন্য কোনো ঠিকাদারের ভুল-ত্রুটির দায়ও স্বত্ত্বাধিকারীকেই নিতে হবে। এই আইন করা হয়েছে এ জন্য যে, কোনো দেশ যখন এ ধরণের বিদ্যুৎকেন্দ্র করবে তখন তারা যেন সবকিছু বুঝে-শুনে করার মত সামর্থ্য অর্জন করার পর করে। কিন্তু বাংলাদেশ তো তা করেনি।

এ ক্ষেত্রে ভারত একটা কাজ করেছে। যদিও তাঁদের বুঝে-শুনে করার মত সামর্থ্য আছে, তারপরও ২০১০ সালে তাঁরা একটা আইন করে পারমাণবিক দুর্ঘটনার দায় সরবরাহকারী অর্থাৎ রাশিয়ার ওপরও চাপিয়েছে। ওই আইনে বলা হয়েছে, যদি সরবরাহকারীর সরবরাহ করা কোনো যন্ত্রপাতির নিম্নমান বা অন্য কোনো ত্রুটি দুর্ঘটনার কারণ হয় তাহলে তার দায় সরবরাহকারীকেও নিতে হবে।

এই আইন পাস হওয়ার পর রাশিয়া অনেক দিন কুদনকুলম ৩ ও ৪ নম্বর ইউনিটের জন্য চুক্তি করা থেকে পিছিয়ে ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওই আইন মেনেই তাঁরা চুক্তি সই করতে রাজি হয়। অবশ্য এ কারণে তাঁরা ব্যয়ও বাড়িয়ে দিয়েছে। কেননা দুর্ঘটনার দায় যদি তাঁদের নিতে হয় তাহলে বীমার ব্যবস্থা করতে হবে। সেই বীমার প্রিমিয়ামের জন্য বাড়তি খরচ হবে।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত, বাংলাদেশেরও উচিৎ ভারতের ওই আইনের আলোকে একটি আইন করার কথা ভেবে দেখা। কারণ মানুষ যে জিনিস তৈরি করে তা যে শতভাগ নিরাপদ সেই নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না। ‘মারফিস ল’ বলে একটা তত্ত্ব আছে। তত্ত্বটি হচ্ছে—‘ইফ দেয়ার ইজ নাথিং গোজ রং, সামথিং উইল’। যে কোনো যন্ত্রপাতি যে কেনো সময় বিগরাতে পারে। যখনই কোনো দুর্ঘটনা ঘটে তখনই বলা হয়, এইটা যে হতে পারে তা তো জানা ছিল না। একটা দুর্ঘটনা ঘটলে সেটার কারণটুকুই শুধু শুধরানো হয়। চেরনোবিলের ভুল শুধরানো হয়েছে। ফুকুশিমার ভুল শুধরানো হয়েছে। কিন্তু অন্য কোনো রকম ভুল হচ্ছে কিনা তা কি কেউ বলতে পারে?

 

আনুষ্ঠানিক হিসেবেই দেশে কোটিপতির সংখ্যা ৭০ হাজার

এক বছরেই কোটিপতি বেড়েছে সাড়ে ৬ হাজার :: বাড়ছে সীমাহীন বৈষম্য

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন::

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী গত অর্থবছরে দেশে কোটিপতির সংখ্যা ৬৮ হাজার ৮৯১ জন। এর আগের বছরে অর্থাৎ ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এ সংখ্যা ছিল ৬২ হাজার ৪১৮ জন। এক বছরেই কোটিপতি বেড়েছে ৬ হাজার ৪৭৩ জন। ১৯৭২ সালে দেশে কোটিপতি ছিলেন পাঁচজন। স্বাধীনতার ৪৭ বছরে কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে বহুগুণ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের ৪০-৫০ হাজার মানুষের কাছে ৪০ শতাংশের বেশি সম্পদ কেন্দ্রীভূত হওয়ায় দেশে আয়-বৈষম্য বেড়েছে। ধনী-গরিবের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে বিরাট ফারাক।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সব তফসিলি ব্যাংকের কাছ থেকে প্রাপ্ত হিসাবের ভিত্তিতে যে প্রতিবেদন তৈরি করে, সেটাই কোটিপতির সংখ্যা নির্ধারণের নির্ভরযোগ্য ভিত্তি। এটা শুধু কাগজে-কলমে এবং ব্যাংকে গচ্ছিত আর্থিক স্থিতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি। অন্যান্য দিক ও সম্পদের বিবেচনায় এ সংখ্যা আরও অনেক বেশি হবে বলে মনে করছেন ব্যাংক ও অর্থনীতি বিশ্লেষকরা। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর শুরুর ১০-১৫ বছর কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে ধীরগতিতে। ১৯৯০ সালের পর থেকে কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে দ্রুত গতিতে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ১৯৭২ সালে দেশে কোটিপতি অ্যাকাউন্টধারী ছিল মাত্র পাঁচজন। ১৯৭৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৭ জনে। ১৯৮০ সালের ডিসেম্বরে ছিল ৯৮ জন। আলোচ্য সময়ে আমানতের পরিমাণ ছিল সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতের মোট আমানতের ১০ শতাংশ। এরপর ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে কোটিপতির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৯৪৩ জনে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৬ সালের জুনে কোটিপতির সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৫৯৪ জন।

২০০১ সালের সেপ্টেম্বর শেষে কোটিপতির সংখ্যা দাঁড়ায় ৫ হাজার ১৬২ জনে। এরপর অক্টোবর ২০০১ থেকে ডিসেম্বর ২০০৬ পর্যন্ত কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছিল ৮ হাজার ৮৮৭ জনে। অর্থাৎ এ সময়ে কোটিপতির সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ১৪ হাজার জনে। আর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ২ বছরে অর্থাৎ ২০০৭-০৮ সালে বেড়েছিল ৫ হাজার ১১৪। এ সময়ে কোটিপতির সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ১৯ হাজারের বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী ২০০৯ সালের মার্চে দেশে ব্যক্তিপর্যায়ে কোটিপতি অ্যাকাউন্ট ছিল ১২ হাজার ৯১৭টি। ২০১৪ সালে তা দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজার ৬৮৭টিতে। সে হিসাবে এ ৬ বছরে দেশে ব্যক্তিপর্যায়েই কোটিপতি অ্যাকাউন্ট বৃদ্ধি পায় প্রায় ২৭ হাজার ৭৭০টি। প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ২১৫ শতাংশ। অন্যদিকে ২০০৯ সালের মার্চে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক মিলে ব্যাংকে কোটি টাকার ঊর্ধ্বে অ্যাকাউন্ট ছিল ১৯ হাজার ৬৩৬টি। ২০১৪ সালের ডিসেম্বর শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৪ হাজার ৭২৭টিতে। সে হিসাবে ৬ বছরে দেশে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায় মিলে কোটিপতি অ্যাকাউন্ট বৃদ্ধি পায় প্রায় ৩৫ হাজার। প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ১৭৮ শতাংশ। ২০০৮ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশে মোট কোটিপতির সংখ্যা ছিল ৪৪ হাজার ৩৬৯ জন।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, ২০০৯ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ৭ বছরে কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে সব থেকে বেশি; প্রায় ৫৬ হাজার জন। এর মধ্যে আমানতকারীর সংখ্যা বেড়েছে ৩০ হাজার ৪৭৭ জন এবং ঋণগ্রহীতার সংখ্যা বেড়েছে ২৩ হাজার ৭৪৫ জন। এর কারণ হিসাবে তারা মনে করেন, ব্যাংকিং চ্যানেলে কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও গ্রাহক কারসাজি করে বেশকিছু বড় অঙ্কের টাকা লেনদেন করে। এরই প্রভাবে কোটিপতির সংখ্যা বেড়ে থাকতে পারে। এদিকে অতি ধনীদের সম্পদ নিয়ে গবেষণাকারী সংস্থা যুক্তরাজ্যভিত্তিক নাইট ফ্রাংক চলতি বছরের শুরুর দিকে ‘দ্য ওয়েলথ রিপোর্ট ২০১৬ : দ্য গ্লোবাল পারসপেক্টিভ অন প্রাইম প্রপার্টি অ্যান্ড ওয়েলথ’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, বাংলাদেশে কোটিপতি রয়েছেন প্রায় ১১ হাজার, যাদের নীট সম্পদ ৭ কোটি ৮০ লাখ টাকার (১০ লাখ ডলার) বেশি। এছাড়া হাজার কোটি টাকার নীট সম্পদের মালিক রয়েছেন ১৫ জন। তবে স্বীকৃত কোনো বিলিওনিয়ার বাংলাদেশে নেই।

একদিকে কোটিপতির সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে বাড়ছে বৈষম্য। গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (সিপিডি) বলছে, গবেষণায় দেখা যায়, ২০১৬ সালে সমাজের সবচেয়ে নিচের দিকের পাঁচ শতাংশের আয় মোট আয়ের দশমিক ২৩ শতাংশ। যেখানে ২০১০ সালে ছিল দশমিক ৭৮ শতাংশ। অপর গবেষণা সংস্থা উন্নয়ন অন্বেষণ’ বলছে, দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি বাড়ছে। গত ৫ বছর ধরে এ প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের উপরে। কিন্তু এর সুফল সাধারণ জনগণের নাগালের মধ্যে পৌঁছানোর জন্য দূরদর্শী সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতিমালা নেয়া হয়নি। এতে বৈষম্য বেড়েছে। দারিদ্র্য দূরীকরণের হার কমেছে। ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য ক্রমেই বাড়ছে। ২০১০ সালে দেশের ১০ শতাংশ দরিদ্র মানুষের মোট জাতীয় আয়ে ২ শতাংশ অবদান ছিল। কিন্তু ২০১৬ সালে তা কমে ১ দশমিক ০১ শতাংশে নেমে এসেছে। অন্য দিকে ২০১০ সালে দেশের ১০ শতাংশ ধনী লোকের মোট জাতীয় আয়ে অবদান ছিল ৩৫ দশমিক ৮৪ শতাংশ। কিন্তু ২০১৬ সালে তা বেড়ে ৩৮ দশমিক ১৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। ফলে গরিব আরও গরিব হচ্ছে, বিপরীতে ধনীদের সম্পদ বাড়ছে। বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হচ্ছে কর্মসংস্থানহীন। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে ২০০৩ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত দেশে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির বার্ষিক হার ৩ দশমিক ১ শতাংশ। কিন্তু ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ৫ বছরে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার ১ দশমিক ৮ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থনীতির ভাষায় এটির অর্থ- সুবিধাবঞ্চিতদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন হয়নি।

দেশে কোটিপতির অ্যাকাউন্ট বাড়ার অর্থ আমাদের সম্পদ ক্রমেই কিছুসংখ্যক লোকের হাতে কেন্দ্রীভ‚ত হয়ে পড়ছে। এতে ধনী-গরিব বৈষম্য বাড়ছে। উন্নয়ন যা হচ্ছে, তার বেশিরভাগই শহরকেন্দ্রিক। এ কারণে মুষ্টিমেয় কিছু লোক উন্নয়নের সুফল ভোগ করছেন। এতে নিচের দিকের মানুষ বরাবরই উন্নয়নবঞ্চিত থাকছেন। কোটিপতি আমানতকারী বাড়ার অর্থ হলো, টাকাওয়ালাদের কাছে ব্যাংকিং খাত জিম্মি হয়ে পড়ছে। এটা হয়েছে, কল্যাণ অর্থনীতির নীতি থেকে সরকারের সরে যাওয়ার কারণে। বাংলাদেশ এখন পুরোপুরি ধনতান্ত্রিক অর্থনীতিকে অনুসরণ করছে। এই নীতিতে মূলত জোরজুলম করে, যেনতেন ও দুর্নীতি-লুটপাট করে অর্থ বানানো হয়। এখন বাংলাদেশেও তাই হচ্ছে।