Home » অর্থনীতি (page 3)

অর্থনীতি

চীন : পরাশক্তির বিবর্তন-৬১ : সামরিক হুমকির মুখে চীন

আনু মুহাম্মদ ::

চীনের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধি শুধুবিশ্ব  বাণিজ্য নয় বিশ্ব ক্ষমতার ভারসাম্যেও চাপ সৃষ্টি করেছে। অর্থনৈতিক সংকটে আক্রান্ত যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে চীন নিয়ে বিপরীতমুখি প্রবণতা। একদিকে চীন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান ঋণদাতা, প্রধান বিনিয়োগকারী, প্রধান পণ্য যোগানদাতা হিসেবে বড় ভরসাস্থল অন্যদিকে চীনের অর্থনৈতিক শক্তিবৃদ্ধি, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তার আধিপত্য সম্প্রসারণ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ। মার্কিন প্রশাসন থেকে তাই চীন সম্পর্কে দ্বিমুখি  ভূমিকা দেখা যায়।

দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের অধিকার দাবি নিয়ে সৃষ্ট উত্তেজনায় যুক্তরাষ্ট্রের বড় পৃষ্ঠপোষকতা আছে। দক্ষিণ চীন সাগর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই পথ দিয়েই মার্কিন বন্দর অভিমুখে ১.২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমানের পণ্য পরিবহণ করা হয়। পূর্ব এশিয়া অভিমুখে বিশাল খনিজ-জ্বালানী সম্পদও এই পথ দিয়েই পরিবহণ করা হয়। মোট বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই সমুদ্রে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মৎস্যসম্পদ ছাড়াও বিপুল পরিমাণ খনিজসম্পদ আছে বলে বিশেষজ্ঞরা ধারণা করেন। মার্কিন জ্বালানী বিষয়ক দফতরের হিসাব অনুযায়ী এই সাগর এলাকায় কমপক্ষে ১১ বিলিয়ন ব্যারেল তেল এবং ১৯০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের মজুত আছে।[1]  এই অঞ্চলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য যখন চীন চেষ্টা করছে তখন একই দাবি নিয়ে তার প্রতিদ্বন্দ্বি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, ব্রুনেই, তাইওয়ানসহ অন্যরা। এই বিবাদ ও উত্তেজনা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য খুবই সুবিধাজনক।

[1]http://www.cnbc.com/2015/10/12/chinas-military-and-naval-buildup-in-south-china-sea-threatens-the-us.html

২০১৫ সালে খুবই গোপনীয়তার সাথে যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে সামরিক মহড়া পরিচালনা করে। মহড়ার মূল বিষয় ছিলো মালাক্কা প্রণালীতে চীনের প্রবেশাধিকার বন্ধ করা এবং মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা থেকে তেল, গ্যাস ও কাঁচামাল প্রাপ্তির পথ বন্ধ করা। এসব পরিকল্পনা সফল করতে ফিলিপাইনে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি সক্রিয় করা, জাপানকে যুদ্ধমুখি করা, দক্ষিণ কোরিয়াকে যুদ্ধ উত্তেজনার মধ্যে নিয়ে যাওয়াসহ সবধরনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এটা নিছক ট্রাম্প প্রশাসনের বিষয় নয়, ওবামা প্রশাসনের প্রথম দফাতেই হিলারী ক্লিনটন এবিষয়ে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছিলেন। হিলারী ২০১০ সালেই বলেছিলেন, চীন যে দক্ষিণ চীন সাগরের স্প্রাটলি দ্বীপের ওপর স্বত্তাধিকার দাবি করছে তা যুক্তরাষ্ট্রের নৌচলাচল ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। উল্লেখ্য যে, এই দ্বীপ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের দূরত্ব ১২ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি।

২০০১ সালে ১১ সেপ্টেম্বরের পর থেকে যুদ্ধখাতে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় হয়েছে ৫ ট্রিলিয়ন ডলার। শুধু ইরাকেই দশ লক্ষাধিক মানুষ নিহত এবং ১২ লক্ষ মানুষ উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়েছেন। অন্যদিকে তার তুলনায় অনেক কম বাজেট হলেও চীনের প্রতিরক্ষা ব্যয়বৃদ্ধি, নিত্য নতুন সামরিক সরঞ্জামে সজ্জিত হবার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রে যতোটা উদ্বেগ তার চাইতে বেশি প্রচারণা দেখা যাচ্ছে। কংগ্রসে উত্থাপিত পেন্টাগন বা মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের রিপোর্টে বলা হয়েছে, চীন সামরিক খাতে ব্যয় এখন ১৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২০ সাল নাগাদ তা ২৬০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে যাবে। উল্লেখ্য যে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বাজেট এখন ৭০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি। ২০১৫ সালে পেন্টাগন তার সর্বশেষ ‘যুদ্ধ বিধি’ (Law of War Manual) প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, যেহেতু ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার কোনো চুক্তিতে সই করেনি। সুতরাং পারমাণবিক অস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বৈধ অস্ত্র।’

সম্প্রতি উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা এবং অবরোধ জারির জবাবে তা ব্যবহারের হুমকি ঐ অঞ্চলে যুদ্ধ উত্তেজনা তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ কোরিয়ার ওপর ভর করে বিপুল যুদ্ধ সরঞ্জাম মোতায়েন করেছে। তবে এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতি অনেক দিন থেকেই ক্রমে ক্রমে বাড়ানো হচ্ছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, মার্কিন এই প্রস্তুতিতে উত্তর কোরিয়া নিছক উপলক্ষ, চীনই প্রধান লক্ষ।

বিশ্ব বিখ্যাত তথ্যচিত্র নির্মাতা জন পিলজার সর্বশেষ যে তথ্যচিত্র বানিয়েছেন তার নাম ‘চীনের বিরুদ্ধে অত্যাসন্ন যুদ্ধ (The Coming War on China)।’ তিনি এই বিষয়ে বিস্তারিত লিখেছেনও। [2] তিনি জানিয়েছেন, এই তথ্যচিত্রের তথ্য উপাত্ত সন্ধান ও প্রয়োজনীয় গবেষণা করতে তিনি দুইবছর সময় নিয়েছেন। তিনি দেখেছেন, দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র সবচাইতে ব্যাপক সামরিক প্রস্তুতি নিচ্ছে চীন ঘিরে। সর্বশেষ হিসাবে চীন ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের এখন ৪০০টি সামরিক ঘাঁটি সক্রিয় রয়েছে। এসব ঘাঁটিতে মিসাইল, যুদ্ধজাহাজ এবং পারমাণবিক অস্ত্রসহ বিপুল অস্ত্রশস্ত্র মজুত আছে। বর্তমান মার্কিন সেক্রেটারি অফ ডিফেন্স (প্রতিরক্ষা মন্ত্রী) বলেছেন, ‘মার্কিন নীতি হলো তাদেরকে দমন করা- যারা মার্কিন আধিপত্য কেড়ে নিতে চায়।’

2https://newint.org/features/2016/12/01/the-coming-war-on-china/

 

 

 

 

 

রূপপুরের এপিঠ ওপিঠ-১ : ডাক্তার রোগী তত্ত্ব ও পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প

অরুন কর্মকার ::

‘রূপপুর আজ পরচিতি নাম/ বিশ্বের দরবারে পরমাণু থেকে বিদ্যুৎ/ বাঙালিও আজ পারে/’

এটি একটি ছড়ার অংশবশিষে। ছড়াটির রচয়তিা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী প্রকৌশলী ইয়াফেস ওসমান। ছড়াকার হিসেবে তিনি যথেষ্ট প্রসদ্ধি। তবে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে তিনি শুধু ছড়া লেখেননি। অনেক ‘স্মরণীয়’ উক্তিও করেছেনে। তার একটি হচ্ছে- আমরা (বাংলাদেশে)  রোগী। আর রাশিয়া হচ্ছে ডাক্তার। রোগী ডাক্তারের কাছে গিয়েছে। এখন ডাক্তার যে প্রেসক্রিপশন দেবে রোগী সে অনুযায়ীই চলবে।

এর মাধ্যমে তিনি বুঝিয়েছেনে যে, পারমাণবকি প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ কেন্দ্রে স্থাপনের বিষয়ে বিন্দু বির্সগও আমরা জানি না। আর রাশিয়া হচ্ছে এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ। তাই আমরা রাশিয়ার শরণাপন্ন হয়েছি। এখন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের সব কিছুই (এ টু জেড) রাশিয়ার পরার্মশমত, রাশিয়ার লোকোবল দিয়ে, রাশিয়িার প্রযুক্তি ব্যবহার করে, রাশিয়ার দেওয়া ঋণের অর্থে এবং রাশিয়ার পরিচালনায় বাস্তবায়তি হবে। তাই এই প্রকল্প নিয়ে বাংলাদেশের চিন্তা করার কিছু নেই।

শুরুর দিকে দেশের বিভিন্ন মহলে যখন প্রকল্পটির প্রযুক্তি, জনবল, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ব্যয়, নিরাপত্তা প্রভৃতি নিয়ে কথার্বাতা শুরু হয়, তারই এক পর্যায়ে তিনি ওই উক্তটি করেন। তারপর অনেক পথ হাঁটা হয়েছে। প্রস্তুতির পর্যায় থেকে পায়ে পায়ে প্রকল্পটি পৌঁছে গেছে বাস্তবায়নের পর্যায়ে। প্রকল্পটিকে এই পর্যায়ে পৌছাতে মন্ত্রী ইয়াফেস ওসমানকে নিশ্চয়ই অনেক কাজ করতে হয়েছে। ধরে নেওয়া যায় যে তিনি একজন রোগী হিসেবে, একজন অভিজ্ঞ ডাক্তারের পরার্মশে নিশ্চিন্তেই সে সব করেছেন এবং প্রকল্প নিয়ে নিশ্চিন্তেই আছনে।

তবে পরমাণু প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে একেবারে নিশ্চিন্ত থাকার লোক বিরল। কারণ এই প্রযুক্তি বিজ্ঞানের সবচেয়ে জটিল বিষয়গুলোর একটি। তাছাড়া, পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প শুধুমাত্র প্রযুক্তির বিষয় নয়। এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত রয়েছে পারমানবি তেজস্ক্রিয় র্বজ্য ব্যবস্থাপনা, জননিরাপত্তা, জাতীয় নিরাপত্তা, দুর্ঘটনার দায় (নিউক্লিয়ার লায়াবিলিটি), আন্তর্জাতিক কূটনীতি, সর্বোপরি ব্যবসা। এই প্রকল্পে ক্রেতা-বিক্রেতা আছে, যথাক্রমে বাংলাদেশ ও রাশিয়া। রাশিয়া সব কিছু করে দিলেও শেষ পর্যন্ত ব্যয়সহ সব দায় বাংলাদেশের। এটাই আন্তর্জাতিক আইন।

তাই বিষয়টি নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকা যায় না। থাকা সঙ্গতও নয়। এমনকি যুক্তির খাতিরে ডাক্তার- রোগী তত্ত¡ মেনে নিলেও রোগীকে কিছু জিনিস বুঝতে হয়। যেমন ডাক্তার যে প্রেসক্রিপশন দিয়েছেন, ফার্মেসী থেকে সে অনুযায়ীই ওষুধগুলে দেওয়া হচ্ছে কি না। ডাক্তার যে কোম্পানির ওষুধ লিখিছেনে ফার্মেসী থেকে কি সেটাই  দেয়া হচ্ছে, না কি অন্য কোম্পানীর নিম্নমানের ওষুধ গছানো হচ্ছে। ওষুধগুলো ব্যবহারের নির্দিষ্ট সময়সীমা অতিক্রম করেছে কি না এ বিষয়গুলো না বুঝলে  রোগীর সমস্যা হবেই।

এখন প্রশ্ন হল, রোগী হিসেবে বাংলাদেশ রাশিয়ার দেওয়া প্রেসক্রিপশন ঠিকঠাকভাবে বুঝে ওষুধ ব্যবহার করতে সর্মথ কি না। ভারতের তামিলনাড়– রাজ্যের কুদনকুলমে একটি পারমাণবকি বিদ্যুৎকেন্দ্রে করেছে রাশিয়ার। ওই কেন্দ্রেরে একটি ইউনিটের নির্মাণকাজ যখন শেষ পর্যায়ে তখন ভারতের পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ সংস্থার বিজ্ঞানীরা ইউনিটটির যন্ত্রপাতিসহ সব কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখেন। তাতে বড় ধরনের কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি ধরা পড়ে।

ভারতের বিজ্ঞানীদের পরীক্ষায় উদ্ঘাটিত হয় যে, ইউনিটটির কয়েকটি র্স্পশকাতর স্থানে যে মানের ইস্পাত ব্যবহার করার কথা ছিল, তার চেয়ে নিম্নমানের ইস্পাত ব্যবহার করা হয়েছে। চারটি পাম্পে ত্রুটিপূর্ণ বাল্ব ব্যবহার করা হয়েছে। এই রকম আরও কিছু ত্রু টি উৎঘাটন করার পর রাশিয়া তা পরির্বতন করে দিতে বাধ্য হয়েছে। পাশাপাশি মালামাল কেনার দায়িত্বে রাশিয়ার যে র্কমর্কতা ছিলেন, তাঁকে চাকরিচ্যুত করেছে।

এখানে বিষয়টি দক্ষ ও অভিজ্ঞ জনবলের। তাই প্রশ্ন হলো- ভারতরে মতোও জনবল আমাদের আছে কি না- যারা রাশিয়ার দেওয়া সব কিছু যথাযথভাবে বুঝে নিতে সক্ষম। এক কথায় জবাব হল, নেই। একদিকে জনবল নেই, তার ওপর আমরা রোগী হিসেবে ডাক্তারের পরার্মশ মত চলার জন্য মনস্থরি করে রেখেছি। এই অবস্থায় আমরা কোথায় যাব তা আসলেই যথেষ্ট ভাবনার বিষয়।

বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট পরমাণু প্রকৌশলী মোহাম্মদ নুরুল। র্দীঘ ৩০ বছর যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে র্কমজীবন শেষে অবসর নিয়ে দেশে ফিরে এসেছেনে। তিনি বলেছেন, একটা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য তিনটি জিনিস সমানভাবে গুরুত্বর্পূণ। এর প্রথমটিই হলো জনবল। র্অথাৎ প্রস্তুতি ও নির্মাণ পর্যায়ের কাজর্কম তদারক করার মত জনবল আপনার আছে কি না। যদি না থাকে, আপনাকে অপেক্ষা করতে হবে। অন্যপথও একটা আছে, সেটা হল বিখ্যাৎ কোনো পেশাদার প্রতিষ্ঠানকে পরার্মশক নিয়োগ করা। বাংলাদেশে এর কোনোটাই না করে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে নির্মাণ শুরু করেছে।

জনবল : পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের জনবল মানে শুধু ‘রিঅ্যাক্টর অপারেটর’ নয়। অনেকে বলেন যে, আমরা তো শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জনবল তৈরি করছি। কিন্তু এটাই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জনবল নয়। জনবলের কয়েকটি গ্রুপ আছে। সরকার যখন সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, আমরা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে করবো, তখন সরকারকে উপদেশ দেওয়ার মত জনবল থাকতে হবে- যারা সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে, ঠিকাদারের সঙ্গে আলোচনা ও দরকষাকষি করবে। সেই জনবল কি আমাদের ছিল বা আছে?

পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে-সংক্রান্ত নীতি নির্ধারনী সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য বিশেষায়িত জনবল থাকতে হবে। যারা এই সিদ্ধান্ত নেবেন তাঁদের মধ্যে এমন জনবল থাকতে হবে, যাদের পরমাণু প্রযুক্তি সর্ম্পকে জ্ঞান সরবরাহকারীদের সমপর্যায়ের। যদি তেমন জনবল না থাকে, তাহলে সরবরাহকারীরা যা বলবে তাই শুনতে হবে (রোগী হিসেবে ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন অনুসরণ করার মত)। এ রকম ক্ষেত্রে অনেক খেসারত দেওয়ার আশংকা থাকে।

সমীক্ষা থেকে শুরু করে যন্ত্রপাতির মান, নির্মাণকাজ প্রভৃতি সরবরাহকারীদের সব কাজ তত্ত¡াবধান করার জন্য জনবল থাকতে হবে। প্রযুক্তি নির্বাচনের জন্যও জনবল থাকা দরকার। এর কোনো কিছু ছাড়াই বাংলাদেশ রূপপুর পারমাণবকি বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজ শুরু করেছে।

প্রযুক্তি : রূপপুর প্রকল্পে যে প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে তা ‘থ্রি প্লাস প্রজন্মের প্রযুক্তি’ হিসেবে পরিচিত। এটিই সর্বাধুনিক প্রযুক্তি। তাই সবচেয়ে নিরাপদ বলেও ধারণা করা হয়। রূপপুরে এই প্রযুক্তির ‘ভিভিইআর-১২০০’ নামের যে রিঅ্যাক্টর (পরমাণু চুল্লি) বসানো হবে, এখন পর্যন্ত শুধুমাত্র রাশিয়ায় তেমন একটি রিঅ্যাক্টর চালু হয়েছে, সেখানকার নেভোভরোনেঝ বিদ্যুৎকেন্দ্রে।

এই রিঅ্যাক্টরের দুটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো ১. একটি শক্তিশালী আবরণের (কনটেইনার ডোম) মধ্যে রিঅ্যাক্টর ভবনটি আবৃত থাকে, যাকে কোনো দুর্ঘটনা হলেও ওই আবরণের বাইরে তেজস্ক্রিয়তা ছড়াতে পারে না। শুরু থেকেই আমেরিকার তৈরি রিঅ্যাক্টের এই ব্যবস্থা ছিল। রাশিয়ার রিঅ্যাক্টের ছিল না। এখন করা হয়েছে। ২. রিআ্যাক্টেরর নীচে ‘কেরো ক্যাচার’ নামে একটি ব্যবস্থা রাখা হয়েছে যাতে দুর্ঘটনাজনতি কারণে রিঅ্যাক্টর ক্ষতিগ্রস্ত হলে, এমনকি গেলে গেলেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই গলিত ধাতব ওই কোর ক্যাচারের মধ্যে চলে যাবে এবং সেখান থেকেও কোনো তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়তে পারবে না।

এই প্রযুক্তি আগের চেয়ে অনেক উন্নত। যে আবরণের কথা বলা হল তার ভেতরের প্রেসার এমন মাত্রায় সীমিত রাখা হয় – যা বাইরের পরিবেশের চেয়ে সব সময় কম থাকে। ফলে আবরণ ফেটে  গেলেও বাইরের বাতাসের চাপে ভেতরের বাতাস বাইরে আসতে পারে না। এই প্রযুক্তি নিয়ে গুরুতর কোনো প্রশ্ন বা আপত্তি দেশের অভিজ্ঞ মহলে নেই। বরং শুরুতে সরকার যখন অপেক্ষাকৃত পুরানো প্রযুক্তির, তৃতীয় প্রজন্মের ‘ভিভিইআর-১০০০’ মডেলের রিঅ্যাক্ট নেয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল, তখন তাঁদের দাবি কিংবা সুপারিশের ভিত্তিতেই সরকার র্সবাধুনিক প্রযুক্তি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

প্রচলতি বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে পারমাণবিক বিদু্যুৎকেন্দ্রেরে সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো প্রচলিত বিদ্যুৎকেন্দ্রে বন্ধ করে দিলেই সেখানে তাপ উৎপন্ন হওয়ার প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু পারমাণবিক বিদ্যুকেন্দ্রের তা হয় না। বন্ধ করার পরও র্দীঘদিন ধরে তাপ উৎপন্ন হতে থাকে ‘বি কজ অফ ডিকে হিট’। তাই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করার পরও রিঅ্যাক্টর ঠান্ডা করার ব্যবস্থা চালু রাখতে হয়।

জাপানের ফুকুশিমায় দুর্ঘটনার কারণ ছিল এই ডিকে হিট। কেননা সেখানে ছয়টি রিঅ্যাক্টরই বন্ধ হয়ে গেলেও সুনামির কারণে ঠান্ডা করার ব্যবস্থা বিকল হয়ে যায়। এরপর সেখানকার স্পেন্ট ফুয়েল পিটে রক্ষতি স্পেন্ট ফুয়েল অতিরিক্ত গরম হয়ে আগুন ধরে যায়। রূপপুরে যে প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে সেখানে ঠান্ডা করার দুই ধরণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। একটি প্রাকৃতিক, অন্যটি যান্ত্রিক।

কেনো উন্নয়ন, কাদের জন্য উন্নয়ন

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন ::

অর্থনীতিবিদরা বলেন, উন্নয়ন হচ্ছে মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধি। অর্থাৎ উন্নয়ন তাকেই বলা হয়- যা মানুষের কাজের ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। যেমন পদ্মা সেতু নির্মিত হলে সংযুক্ত জনপদগুলোর জনগণের কর্মক্ষমতা অনেক বেড়ে যাবে । যদি এ সেতুর সংযোগ সড়ক না থাকে, তবে মানুষের কোনো সক্ষমতা বাড়বে না। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যাচ্ছে, বিভিন্ন আমলে সড়কবিহীন শত শত সেতু গ্রামেগঞ্জে ছড়িয়ে রয়েছে যেগুলো শুধু অর্থ লোপাটের প্রতিমূর্তি। বিদ্যুৎবিহীন শত শত খাম্বার কথা ভাবুন। এসব তথাকথিত উন্নয়ন কার্যক্রম মানুষের কাজের ক্ষমতা এক বিন্দুও বাড়ায়নি, বরং ক্ষেত্র বিশেষে ব্যাহত করেছে। তাই উন্নয়ন প্রকল্পগুলো হতে হবে সঠিক জায়গায় ও মানুষের ব্যবহার উপযোগী। অমর্ত্য সেন ভারতবর্ষ ও বাংলাকে দিক নির্দেশনা দিয়ে বলেছেন, অর্থনৈতিক প্রগতি ও সর্বত্র সুষম উন্নয়নের জন্য মানবিক উন্নয়নই এ সময়ের অর্থনৈতিক প্রগতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানবিক উন্নয়ন বলতে মানবসম্পদ, শিক্ষা, চিকিৎসা, পারিবারিক সক্ষমতা অর্জনকে বোঝাতে চেয়েছেন তিনি। আর নাগরিকের এ  মৌল অধিকারগুলোর নিশ্চয়তা দিতে হলে রাষ্ট্র ও সরকারকেই এ ব্যাপারে মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হবে। এ বিষয়ে অমর্ত্য সেন বলেছেন, ভারতবর্ষ ও বাংলায় আর্থ-সামাজিক বৈষম্যের মূলে রয়েছে দরিদ্র মানুষের মৌল অধিকার রক্ষায় সরকারের অপর্যাপ্ত ও লক্ষ্যভ্রষ্ট নীতি সহায়তা ও মন্থর উন্নয়ন কার্যক্রম। একইভাবে চতুর ও সুবিধাভোগী শ্রেণীর ঠগবাজি, ব্যক্তিকেন্দ্রিক ব্যবসার উত্থান এবং তা মানবিক উন্নয়নে ব্যবহার না হওয়া। বিশেষ করে শিক্ষা, চিকিৎসা ও মানবসম্পদ উন্নয়নের মতো মৌল কার্যক্রমগুলো অতিমাত্রার বাণিজ্যিক হয়ে পড়ায় তা সর্বসাধারণের কাছে দুর্লভ ও দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। অমর্ত্য সেন অর্থনৈতিক প্রগতির সঙ্গে মানবিক প্রগতির যোগসূত্র রয়েছে এমনটি স্বীকার করে নিয়েও জোড়ালোভাবে বলেছেন, বেসরকারি খাত দিয়ে কখনও মানবিক উন্নয়ন করা যায় না। অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূলস্রোতে বেসরকারি খাত মুখ্য ভূমিকা রাখলেও মানবিক প্রগতির বিষয়টি কার্যত বেসরকারিখাতের নজরে অবহেলিতই থেকে যায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে দরিদ্র মানুষের এসব অভাব পূরণে রাষ্ট্র কিংবা সরকার যদি তা উন্নয়নে কার্যকরী ভূমিকা না রাখে কিংবা রাখলেও সেটি অপর্যাপ্তই থেকে যায়- তাহলে সমাজে বৈষম্য তৈরি করে।

অমর্ত্য সেন বলেন, বাণিজ্য বাড়লে অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটে। অর্থনৈতিক উন্নতি হলে বেসরকারি খাত সম্প্রসারিত হয়। বেসরকারি খাত বড় হলে মানুষের আয় বাড়ে। এতে ওইসব মানুষের দারিদ্র্য দূর হয়। যখন মানুষে সম্পদ পায় তখন সে উৎসাহিত হয়। এতে তার বিনিয়োগ প্রবণতাও বাড়ে। এর দ্বারা সরকারের রাজস্বও বাড়ে। এভাবেই অর্থনৈতিক প্রগতি ঘটে থাকে। অমর্ত্য সেন বলেন, মানবিক উন্নয়নের দিকে সরকারের নজর না থাকলে বাণিজ্যিক শিক্ষা, চিকিৎসা দিয়ে গণমানুষের চাহিদা পূরণ হয় না। এ ধরনের ব্যবস্থায় ধনীরা সেবা পেলেও, বঞ্চিত হয় গরিব মানুষ। কারণ বাণিজ্যিকীকরণের ফলে এসব সেবার মূল্য বাড়ে এবং সেটি সাধারণের সক্ষমতার বাইরে চলে যায়। তার মতে, এ পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক উন্নয়নে সরকার যতই মনোযোগী হোক না কেন, তা একটা সময় স্থির হয়ে যেতে পারে। মানবিক উন্নয়নের খাতগুলোতে উন্নয়নের দৃষ্টি রাখতে হবে। আর সেটি সরকারকেই করতে হবে। বিশেষ করে দেশের সব নাগরিকের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চিকিৎসার সহজলভ্যতা এবং নারী উন্নয়নসহ মানব উন্নয়নের সর্বদিক নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে।

ব্যক্তি, দেশ ও সমাজ প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়ে চলেছে। সবার স্বপ্ন এগিয়ে যাওয়া। কিন্তু সবাই সমান অগ্রগতি লাভ করতে পারে না। কেউ কেউ পিছিয়েও যায়। কে কি পরিমাণ আগোতে পারছে বা আদৌ পারছে কিনা, না পারলে কেন, এসব জানার দরকার পড়ে। দেশের অগ্রগতি পরিমাপের জন্য সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু পদ্ধতি চালু হয়েছে। জাতীয় আয় বা জিডিপি মেপে কোনো দেশের অগ্রগতি বোঝার প্রচলিত পদ্ধতির ত্রু টি অনেক আগেই চোখে পড়ছে। চেষ্টা চলছে আরো ভালো পদ্ধতি বের করার যাতে একটি দেশের অগ্রগতি সঠিকভাবে বোঝা যায়। এ রকম প্রত্যেক চেষ্টার মূলে রয়েছে মানুষ অর্থাৎ মানুষের কল্যাণ ও সুখ।

অমর্ত্য সেন বলেছেন- জনসাধারণের সক্ষমতার নামই উন্নয়ন। তিনি মনে করেন, ‘মানুষের, সক্ষমতা নির্ভর করে, তার সত্বাধিকারের ওপর, অর্থাৎ কি পরিমাণ দ্রব্য এবং সেবা সামগ্রীতে সে তার স্বত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে তার ওপর। মাথাপিছু কতটা খাদ্য পাওয়া যাবে অথবা মাথাপিছু মোট জাতীয় উৎপাদন কতটা এ ধরনের সাদামাটা নির্দেশকসমূহের ওপর যদি নির্ভর করা হয়, তাহলে অনাহার, ক্ষুধা এবং বঞ্চনার সামগ্রিক চেহারাটা উপলব্ধির পথে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হবে। স্বত্বাধিকার নির্ধারণ ব্যবস্থা, সেই ব্যবস্থায় বিভিন্ন বৃত্তিভোগী কর্মগোষ্ঠীভুক্ত মানুষদের অবস্থা, এ সবের সতর্ক বিশ্লেষণ আবশ্যক। তার মতে, উন্নয়ন আসলে মানুষের স্বাধীনতার চৌহদ্দি বাড়ানোর প্রক্রিয়া। মানুষ তার নিজের চাওয়া-পাওয়া কতদূল মেটাতে পারছে সে প্রশ্নটি উন্নয়নের সংজ্ঞায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

উন্নয়নের কথিত জোয়ারে, সবকিছু দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে, ঐতিহ্যবাহী সমস্যাগুলির সঙ্গে যোগ দিচ্ছে নিত্য নতুন কৃত্রিম সমস্যা। উন্নয়নের নানা তত্ত্বে দেশ ভাসছে, চারিদিকে হৈ হৈ রই রই। অথচ প্রতিদিনই কমছে মানুষের স্বস্তি বোধ। সামাজিক সমস্যার রাষ্ট্রীয়করন এই প্রক্রিয়াকে আরো বেগবান করছে। ‘মাইন্ডসেট’ পরিবর্তনের হাজার এন্তেজাম তথাকথিত উন্নয়নের লক্ষ্য। কিন্তু যাদের উন্নয়নের জন্য এই যজ্ঞ তাদের অকথিত কথা কেউ শোনে না। উন্নয়ন সূচকের উর্ধগতি তত্ত্বেও দিনে দিনে গরীবরা আরো গরীব হচ্ছে, পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নাগরিক ভোগান্তি। অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রথাগত কয়েকটি সূচক হচ্ছে জাতীয় আয়, মাথাপিছু আয়, মানব উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক কল্যাণ। কোন দেশের জাতীয় আয় বাড়তে থাকলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়েছে বলে ধরে নেওয়া হয়। যে কারণে মাথাপিছু আয়কে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সূচক হিসাবে গ্রহণ করা হয়। সে হিসেবে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার অপেক্ষা জাতীয় আয় বৃদ্ধির হার অধিক হলেই তাকে উন্নয়ন বলা যায়। জাতীয় আয়কে দেশের জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে প্রকৃত মাথাপিছু আয় পাওয়া যায়। অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম মাপকাঠি মানব উন্নয়ন সূচক। মানব উন্নয়ন সূচকে মানুষের শিক্ষা, আয়ুষ্কাল, ক্রয় ক্ষমতা প্রভৃতি বিবেচনা করা হয়। তবে এই সূচকে জাতীয়ভাবে তথ্য নেওয়া হয়। কিন্তু ধনী-গরীব বৈষম্য, আঞ্চলিক বা গ্রাম ও শহরের বৈষম্য আমলে নেওয়া হয় না। ফলে এই সূচকে গণমানুষের প্রকৃত উন্নয়ন বোঝা যায় না।

নিম্নআয়ের দেশ থেকে বাংলাদেশের নিম্নমধ্য আয়ের দেশে উত্তরণ ঘটেছে, এটি আমাদের জন্য একটি সুখবর অবশ্যই, যদি সত্য হয়ে থাকে। জনগণের গড় মাথাপিছু আয় বেড়েছে। এতে সুন্দর ভবিষ্যতের কথা ভেবে আমরা নানা স্বপ্নের জাল বুনতে পারি। তবে মনে রাখতে হবে, সেই স্বপ্ন পূরণে জাতীয় আয় বৃদ্ধি বা অর্থনীতির উচ্চ সূচকই যথেষ্ট নয়। দেখা দরকার বৃহত্তর জনগোষ্ঠী এর সুফল কতটা পাচ্ছে। জাতিসংঘের এক সমীক্ষা অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী মাত্র ১ শতাংশ মানুষ পৃথিবীর শতকরা ৪০ ভাগ সম্পদের অধিকারী। আর প্রাপ্তবয়স্ক ১০ শতাংশ বিত্ত-বৈভব ভোগ করছে পৃথিবীর ৮৫ শতাংশ সম্পদ। এই যে ভয়াবহ বৈষম্য- এই জরিপে বাংলাদেশের বাস্তব অবস্থারও প্রতিফলন রয়েছে। এদেশে আয়-বৈষম্য, সম্পদের মালিকানায় বৈষম্য, বিভিন্ন সেবাপ্রাপ্তিতে বৈষম্য এত প্রকট যে তা সাদা চোখেই দেখা যায়, গবেষণার দরকার হয় না। তবুও গবেষণা হওয়া প্রয়োজন; গবেষণা হয়ও। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক গবেষণা জরিপে বলা হয়েছে, দেশে নারী ও শিশুদের উন্নয়নে অনেক অগ্রগতি হলেও ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য এখনও প্রকট। ধনী পরিবারের একজন সদস্য যে সুবিধা পান, তার ছিটেফোঁটাও পান না দরিদ্র পরিবারের কেউ। জরিপে আরও বলা হয়েছে, আঞ্চলিক অবস্থান, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি এখনও চ্যালেঞ্জের মুখে। অর্থাৎ বৈষম্য বড় সমস্যা, এটাই মূলকথা। দেশের গড় আয় বেড়েছে; কিন্তু আয় বৈষম্যের কারণে সমাজে এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। এর কারণ, যে খাতগুলোর মাধ্যমে এই প্রবৃদ্ধি ঘটছে, তার বেশিরভাগ রয়েছে মূলত ধনী বা অবস্থাপন্ন ব্যক্তিদের অধিকারে। দরিদ্রদের নিজেদের সম্পদের পরিমাণ সামান্য। তাই আয় বৃদ্ধি ও উচ্চ প্রবৃদ্ধির সুফল তারা পাচ্ছেন না। জনগণের জীবনমান উন্নয়নের পথে প্রধান অন্তরায় বৈষম্য। যেসব নীতি ও ব্যবস্থার ফলে সমাজে বৈষম্য কমে আসতে পারে, তা কখনও বাস্তবায়িত হয়নি। যেমন সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, শহর ও গ্রামের মধ্যে ব্যবধান কমিয়ে আনা।

চালের দাম : পেটতো আর রাজনীতি বোঝে না

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন ::

দেশের নিম্ন আয়েরর মানুষের প্রতিদিনের খাদ্য ‘মোটা চালে’র দাম এখন ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি। এক কেজি চাল কিনতে হচ্ছে কমপক্ষে  ৪৮ থেকে ৫০  টাকায়। শুধু মোটা চালই নয়, সব ধরনের চালের দামই বিগত যে কোন বছরের তুলনায় অনেক বেড়ে যাওয়ায় কষ্টের মধ্যে পড়েছে শ্রমজীবী মানুষসহ স্বল্প আয়ের পরিবারগুলো। দেশে মোটা চালের দাম বাড়তে বাড়তে কেজিপ্রতি ৫০ টাকায় উঠেছে। এক বছরে বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। বাংলাদেশে এখন মোটা চালের দাম বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। এতে প্রায় দুই কোটি পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তা গুরুতর হুমকির মুখে পড়েছে ও পড়ছে  যাচ্ছে।

প্রশ্ন হলো, চালের দাম এত বেশি বাড়ল কেন? খাদ্যব্যবস্থা পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার ত্রুটি, দূরদৃষ্টির অভাব, খাদ্য নিয়ে সরকারের উদাসিনতাসহ বিভিন্ন কারণের কথা উল্লেখ করতে হচ্ছে। দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ দেখানো; জনগণকে ১০ টাকা কেজি দরে চাল খাওয়ানো’র প্রতিশ্রুতি ইত্যাদির পেছনে যে দলীয় রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করেছে- তা বাস্তবতা সম্পর্কে সঠিক ধারণা রাখার পথে প্রতিবন্ধক হয়েছে। যখন চাল আমদানি করার প্রয়োজন ছিল না, তখন চাল আমদানি করা হয়েছে; একসময় দেশের বাজারে চালের দর এতটা কমে গিয়েছে যে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা পরের মৌসুমে চাল উৎপাদনে নিরুৎসাহিত হয়েছেন। আর এ বছর হাওর-অধ্যুষিত বেশ কয়েকটি জেলায় ব্যাপক ফসলহানি হয়ে বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা সৃষ্টির পরও সরকার আত্মতুষ্টিতে ভুগেছে। অথচ তখনও সরকারের কর্তাব্যক্তিদের মাথায়  চাল আমদানির চিন্তাটুকুও  ঢুকেনি। বরং প্রথম পর্যায়ে চাল আমদানির ওপর ২৮ শতাংশ হারে শুল্কারোপ করা হয়। পরে ঘটনার ভয়াবহতা ও প্রতিক্রিয়া দেখে, অনেক সমালোচনার পর ওই ১৮ শতাংশ শুল্ক কমিয়ে তা ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। কিন্তু তখনই আমদানির চিন্তা করলে আমদানি ব্যয় কম হতো, ওই চালের দামও কম হতো। তাহলে প্রশ্ন ওঠে-এই বিলম্ব কি ইচ্ছাকৃত?

এতা গেলো একটি দিক। তবে যে জটিল বাস্তবতা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা ছিল- তা হলো, সরকারি গুদামে চালের মওজুদ এখন মাত্র ১ লাখ ৮১ হাজার টন (১৮ জুনের হিসাব)। গত ১০ বছরের মধ্যে এটা সর্বনিম্ন মওজুদ। বিশেষজ্ঞরা বলেন, সরকারি গুদামে কমপক্ষে ৬ লাখ টন চাল মওজুদ থাকা অবশ্যই প্রয়োজন। মওজুদ এর চেয়ে কমে গেলে চাল ব্যবসায়ীরা এর সুযোগ নেবেই, আর চালের দাম বাড়বেই। এবার মূলত সেটাই হচ্ছে। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, সরকারের হয় কোন নিয়ন্থন নেই অথবা এটাও ইচ্ছাকৃত; কিংবা ক্ষমতাবানদের হাতে সাধারন মানুষ জিম্মি।

সরকার এখন অভ্যন্তরীন ধান-চালও সংগ্রহ করতেও পারছে না। কারণ, বাজারে চালের দাম ৪৮ থেকে ৫০ টাকা হলেও সরকার-নির্ধারিত ৩৪ টাকা দরে কেউ সরকারকে চাল দেবে না, এটাই স্বাভাবিক। এর চেয়েও গুরুতর বিষয় হলো, বাজারে বর্তমানে কী পরিমাণ চাল আছে, এ সম্পর্কে কোনো তথ্য-উপাত্ত সরকারের কাছেও নেই অথবা তা জনগনের সামনে উপস্থাপিত হচ্ছেনা। অথচ খাদ্য মওজুদ নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী- খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব এটা নিয়মিত মনিটর করা ও হিসাব রাখা। কারণ, এর পরিণতিতে এখন চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত কঠিন হবে।

গত তিন দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতির অবয়বে অনেক পরিবর্তন এসেছে। এক সময় দেশের অর্থনীতির এক তৃতীয়াংশ আসতো কৃষি খাত থেকে। সেখানে বিদায়ী ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে কৃষির জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান চলে এসেছে ১৪ দশমিক ৭৯ শতাংশে। এবার বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো জিডিপির যে হিসাব করেছে- তাতে কৃষি খাতে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে দেখানো হয়েছে। সব চেয়ে বিষ্ময়কর হলো, এতে খাদ্য শস্য খাতে বাড়তি উৎপাদন ধরা হয়েছে ২ দশমিক ৫ শতাংশ। বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদনের ৬০ ভাগ আসে বোরো মৌসুম থেকে । বাকি ৪০ ভাগ আউশ ও আমন থেকে আসে। আউশের উৎপাদন ৭ শতাংশের মতো কম হয়েছে। আমণের উৎপাদন আগের বছরের একই পর্যায়ে রয়েছে। বোরোর উৎপাদনে এবার দুর্যোগ ও হাওরের বিপত্তির কারণে ৬/৭ লাখ টন কম উৎপাদন হবে বলে বলা হচ্ছে। এ হিসাবে কোনভাবেই খাদ্য উৎপাদন বেশি হওয়ার কথা নয়। একই কারণে কৃষিতে ধনাত্মক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাও বাস্তবসম্মত নয়।

চাল নিয়ে রাজনীতির দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে বাংলাদেশে। চাল আর রাজনীতি খুব বেশি দূরের কিছু নয়। এদেশে সবসময়ই চালের দামকে স্পর্শকাতর ইস্যু মনে করা হয়। ভোটের রাজনীতিতেও চাল গুরুত্বপূর্ণ। ‘১০ টাকা কেজি চাল’ নিয়ে বহু বাতচিত হয়েছে। এমন ওয়াদা করা হয়েছিল, নাকি হয়নি তা নিয়েও বিতর্ক চলে আসছে। তবে চালের বর্তমান উচ্চমূল্যে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন মধ্যবিত্ত আর নিম্নবিত্তের মানুষেরা। পেটতো আর রাজনীতি বোঝে না। উচ্চমূল্যে চাল কিনতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারন মানুষ। ওলট-পালট হয়ে যাচ্ছে সংসারের বাজেট। এমনকি পত্রিকায় এও খবর বেরিয়েছে, চালের উচ্চ মূল্যের কারণে নিম্ন আয়ের মানুষ ভাত খাওয়া কমিয়ে দিয়েছেন। ৪-৫ সদস্যের ছোট একটি পরিবারে কেবল চালের পেছনেই খরচ বেড়েছে কমপক্ষে পাঁচশ’ টাকা।

উদ্বেগ চালের দাম বৃদ্ধি নিয়েই

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

পাহাড়ে লাশের মিছিলের সাথে খবর একটাই! চালের দাম বাড়ছে। বাড়ছে তো বাড়ছেই। তিনবেলা মোটা ভাত খাওয়া সাড়ে পনের কোটি বাঙালীর মাথায় হাত, কোথায় গিয়ে থামবে চালের দাম? এই দেশের মানদন্ডে বিশ্ব খাদ্য সংস্থার হিসেবে ‘সুষম খাদ্য’ বলতে যাই থাকুক, এখন মোটা চালের ভাতই চলে যাচ্ছে নাগালের বাইরে। লাফিয়ে লাফিয়ে দাম বাড়ার কারণে জনপদের মানুষ ক্রমশ: আতঙ্ক গ্রস্ত হয়ে পড়ছে নিকট ভবিষ্যত ভাবনায়।

সরকারের গুদামে চালের মজুত নেমে এসেছে ২ লাখ টনের নিচে। বেসরকারী মজুত ১০ লাখ টন কম। দুই খাতেই চালের মজুত আশঙ্কাজনক। ২০১৭ সাল শুরু করেছিল ব্যবসায়ীরা ১০ লাখ টন মজুত কম নিয়ে। ব্যবসায়ীদের দাবি অনুযায়ী, উচুঁমাত্রার শুল্কের কারণে আমদানী করে পোষাচ্ছে না। এদিকে, সব ধরনের চালের দাম মাত্র একমাসে বেড়েছে কম-বেশি ৮ শতাংশ এবং চলতি বছরে বেড়েছে সবশুদ্ধ ৪৮ শতাংশ।

মাত্র ক’দিন আগেও শুনতে শুনতে কানে আসছিল – প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে মন্ত্রী-এমপি, দলীয় নেতা-পাতি নেতাসহ সুবিধাভোগীরা ও দলদাসদের- সকলের মুখে উন্নয়ন সাফল্যের উপচানো গল্প। বলা হচ্ছিলো, কৃষিতে বাংলাদেশের সাফল্য ঈর্ষণীয়; বাংলাদেশ বিশ্বের উদাহরন হয়ে উঠেছে। সরকারের সকলে একযোগে কোরাস গেয়েছেন, দেশ এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে বিপুল কৃষি উৎপাদন-এই দেশ চাল রপ্তানীকারক দেশে পরিনত হয়ে গেছে।

সরকারের বিশ্বস্ত অর্থনীতিবিদদের একজন কাজী খলীকুজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেছেন, “খাদ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে যা ভুল হওয়ার হয়ে গেছে। আমরা খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পুর্ণ- এ আত্মতুষ্টিতে ভুগে দেশে চালের ঘাটতি ও মজুতের বিষয়টি ভুলে গেছি”। খলীকুজ্জামানের কথা সত্য হলে দাঁড়াচ্ছে যে, সরকারের খাদ্য ব্যবস্থাপনা ছিল না এবং ঘাটতি ও মজুত সম্পর্কে তারা অজ্ঞ ছিল। এটি হলে সরকারকে অবশ্যই দায় নিতে হবে এবং শুরু হতে পারে খাদ্যমন্ত্রীর পদত্যাগের মাধ্যমে।

খাদ্যমন্ত্রী অবশ্য ফতোয়া দিয়েছিলেন, বিএনপিপন্থী ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে চালের দাম বেড়ে গেছে। তবে এখন তারা  চুপ মেরে গেছেন। তার অসত্য ও আজব তথ্য শুনতে শুনতে জনগন আসল পরিস্থিতি সম্পর্কে বুঝে গেছে। তার কথা সত্য ধরে নিলে, বিএনপিপন্থী ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে মন্ত্রী হিসেবে সে বা তার সরকার কোন ব্যবস্থা নেয়নি কেন? অথচ দেশের কে না জানে, চাল ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটগুলি ক্ষমতাসীন রাজনীতির সাথে জড়িত। সুতরাং তাদের অনৈতিক মুনাফার দায়ও সরকারের।

একটি অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে, এদেশে মজুত রাখার বিরুদ্ধে আইন আছে, প্রয়োগ নেই। ২০১১ সালে খাদ্য মন্ত্রণালয় কন্ট্রোল অব এসেনসিয়াল ফুড কমোডিটি এ্যাক্ট সংশোধন ও হালনাগাদ করে। ঐ আইনের আওতায় পণ্য মজুতের হিসেব পাক্ষিকভাবে দেয়া হয়েছিল প্রথম দুই বছর। ২০১৪ সাল থেকে এই হিসেব আর পাওয়া যায় না। ফলে বেসরকারী পর্যায়ে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মজুত গড়ে উঠছে নির্বিঘ্নে এবং মজুতদাররা যখন যেমন খুশি বাড়াচ্ছে চালসহ নানা পণ্যমূল্য।

সরকার এতকাল জানিয়ে এসেছে, ধান-চাল উৎপাদন ও মজুতের পরিমানের দিক থেকে দেশ খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন করেছে। এই নিরাপত্তা কতটা ‘ফানুস’ ছিল এবং বাস্তবতা কতটা ভিন্ন, তা এখন চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখানো হচ্ছে। বছরটি শুরুই হয়েছিল যেখানে ১০ লাখ টন ঘাটতি নিয়ে, সেটি পূরণের বদলে মনে হচ্ছে, সরকার লাফিয়ে লাফিয়ে চালের দাম বৃদ্ধি উপভোগ করছে এবং মন্ত্রী এই বাড়ার পেছনে বিএনপিপন্থীদের কারসাজির ভূত দেখতে পাচ্ছেন!

খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার গল্প বলা হলেও খাদ্য ব্যবস্থাপনার দৈন্য এখন ফুটে উঠেছে দগদগে ঘায়ের মত। অন্যদিকে কৃষি বাজারে অব্যবস্থাপনার কারণে কৃষকের ভাগ্যের কোন উন্নয়ন নেই। সরকার কৃষকদের ব্যাংক হিসেব দিয়েছে। ব্যাংক ঋণ নিতে উৎসাহ জুগিয়েছে। ঋণ নিয়ে কৃষক উৎপাদনে গেছেন। কিন্তু ঘরে ফিরেছেন নিঃস্ব হয়ে। কেউ জেলে থাকছেন, পালিয়ে বেড়াচ্ছেন সার্টিফিকেট মামলা মাথায় নিয়ে। এভাবে কথিত খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতা কৃষককে কারাবাস বা পলাতক করছে।

অধিকাংশ কৃষক মনে করেন, চাল আমদানী ও সিন্ডিকেটের হাতে বাজারের নিয়ন্ত্রন চলে যাওয়ায় তারা বিপুল পরিশ্রম করেও ফসলের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। এজন্য ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করা যাচ্ছে না। আটকে যাচ্ছেন আরো নতুন দেনার জালে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, সরকার যেখানে ক’দিন আগেও চাল রপ্তানী করার কথা বলেছে, সেখানে এখন বিপুল পরিমান চাল আমদানীর কথা উঠবে কেন? ফি-বছর এই আমদানীর কারণেই কৃষক ফসলের দাম পায়নি, আটকা পড়ে গেছে ঋণ-মামলা জালে।

প্রতি বছরই বিপুল পরিমান চাল আমদানী করা হয়। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ২ লাখ টন চাল আমদানীর জন্য বাজেটে ৭৮৭ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। অর্থাৎ চাল রপ্তানীর যুগের অবস্থা এটি এবং অর্থবছরের ছয়মাস পেরোতেই বরাদ্দের দ্বিগুনেরও বেশি চাল আমদানী করা হয়। ওই ছয় মাসের আমদানী আগের বছরের মোট ৩ লাখ ৭৪ হাজার টনেরও বেশি। সে সময়ে সরকার মাত্র ৫০ হাজার টন রপ্তানীর ঘোষণা দিয়ে আমদানী করে ৮ গুন বেশি।

খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা দেখাতে গিয়ে সরকার বিপুল আমদানীর এই হিসেব স্বীকার করেনি। ২০১৪ সাল থেকে শুরু হয় ব্যাপক চাল আমদানী। পরিমান ছিল ৪ লাখ ৯ হাজার টন। মন্ত্রীরা সে সময়ে বলেছিলেন, এসব চাল গো-খাদ্য হিসেবে আমদানী করা হয়েছে। কিন্তু ভারতীয় চালের হিন্দি লেখা মোড়ক ও উৎপাদন তারিখ সরকারের মিথ্যাচার প্রতিষ্ঠিত করেছিল। তারপরেও তারা দাবি করেছে, সুগন্ধী চাল ও গো-খাদ্যের বাইরে কোন চাল আমদানী করা হয়নি।

ভেতরে ভেতরে এই সরকার কতটা সিন্ডিকেটবান্ধব তার একটি নমুনা হচ্ছে ২০১৪ সালে ২৮ নভেম্বর প্রকাশিত একটি জাতীয় দৈনিকের রিপোর্ট।  রিপোর্টের বলা হয়, জুলাই ২০১৪ থেকে ২৭ নভেম্বর পর্যন্ত বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে আমদানীকৃত চালের পরিমান কম-বেশি ৮৭ হাজার টন। দেশে আমন ধান কাটা ও মাড়াইয়ের মৌসুমে এই চাল আমদানী করা চলছিল। ফলে কৃষক ফসলের মূল্য নিশ্চিত করতে পারেননি। এভাবেই কথিত কৃষকবান্ধব সরকার চাল আমদানী ও সিন্ডিকেটকে সবসময় সহায়তা দিয়ে এসেছে এবং বাজারের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিয়েছে।

সরকারী ভাষ্যে উৎপাদন ও উন্নয়ন-দুটোই বাড়ছে। তবে খাতগুলি বিচার করলে দেখা যাবে, উৎপাদকরা আছেন ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে। আর কথিত উন্নয়ন কতিপয় মানুষের সুবিধা এনে দিয়ে একটি লুটেরা ধনিক শ্রেনী গড়ে তুলছে। বিপুলসংখ্যক মানুষ এই কথিত উন্নয়ন বৃত্তের বাইরে। দেশের অর্থনীতির প্রধান তিন ভিত্তি কৃষি, গার্মেন্টস শিল্প ও রেমিট্যান্স। এই তিন খাতের মানুষেরাই সবসময়  মানবেতর জীবন-যাপন করছে।

খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে উৎপাদন, মজুত, রপ্তানী-সবকিছু এখন নগ্ন সত্য হয়ে হাজির হয়েছে। হাওড়ে বন্যায় মৌসুমী বোরো ফসল মার খাওয়া, ধানক্ষেতে ব্লাষ্ট রোগের আক্রমন, অতিবৃষ্টি আর বিএনপিপন্থী ব্যবসায়ীদের কারসাজি- দেশের খাদ্য নিরাপত্তা এক লহমায় ধ্বসিয়ে দিয়েছে, এটাও বিশ্বাস করতে হবে? ফি-বছর লাগাতার মিথ্যাচারের নিট রেজাল্ট হচ্ছে, মোটা চালের ওপর নির্ভরশীল মানুষগুলোর সাধ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে মোটা ভাত, ধ্বসে পড়ছে খাদ্য নিরাপত্তা !

সরকারের উদ্ভাবনী শক্তি এবং জনগণের সীমাহীন ভীতি

আমীর খসরু ::

রাষ্ট্র ব্যবস্থাটির গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে বিশ্বজুড়ে চিন্তাশীল ব্যক্তিবর্গ, রাজনীতি বিজ্ঞানী এবং দার্শনিকগণ নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে গেছেন এখন থেকে বহু শত বছর আগে থেকেই। নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি, টমাস হবস, শার্ল লুই মঁতেস্ক্য, জ্যঁ জাঁ রুশো পর্যন্ত যারা রাষ্ট্রের প্রণালীবদ্ধ মতবাদ বিকশিত করেছেন তাদের ভাষ্য- রাষ্ট্র মানবমুক্তির সম্ভাব্য গ্যারান্টি। রুশো প্রথমবারের মতো ‘সামাজিক চুক্তির’ কথা সুস্পষ্টভাবে বলেছেন। আর এর অর্থ হচ্ছে- রাষ্ট্রের কাছে জনগণ তার অধিকার সমর্পণ করবে এবং রাষ্ট্র ব্যক্তির সমস্ত অধিকার রক্ষা ও জীবন যাপনের নিশ্চিতি বিধানে সচেষ্ট হবে। এর ভিত্তিতেই রাষ্ট্রের বৈধতার আইনী অস্তিত্ব বিরাজমান। রাষ্ট্র জনকল্যাণের যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনা করবে- এটাই হচ্ছে তাদের কথা। আর এখানেই রাষ্ট্রের পক্ষে এর ম্যানেজার অর্থাৎ সরকারের রাজস্ব আদায়, আয়-ব্যয়সহ সব ক্ষেত্রেই উদ্দেশ্য থাকা উচিত, জনকল্যাণ এবং জনগণের উন্নয়ন। আর এ কারণেই সরকারের জবাবদিহিতা এবং স্বচ্ছতার প্রশ্নটি বড় করে আসে। এর ব্যতয় যদি হয় তবে রাষ্ট্রের পক্ষে সরকারের সকল কার্যক্রমই আইনের ব্যতয় হিসেবেই আবির্ভূত হয়ে পড়ে।

কিন্তু বাংলাদেশে এমন জিজ্ঞাসা এবং ঔৎসুক্য থাকায় বারণ আছে। এটাও ঠিক যে, পৃথিবীর কোনো দেশের রাষ্ট্র ব্যবস্থাই পুরোপুরি অর্থাৎ শতকরা শতভাগ গণতন্ত্রের গ্যারান্টি দিতে পারেনি। প্রতিনিধিত্বশীল শাসন ব্যবস্থা বা রিপ্রেজেনটেটিভ গভর্নমেন্ট- এর প্রবক্তা জন স্টুয়ার্ড মিল থেকে শুরু করে অনেক রাজনীতি বিজ্ঞানীই এ নিয়ে চিন্তিত ছিলেন এবং এখনো আছেন। কিন্তু যতো বেশি সম্ভব গণতন্ত্র নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। যতো বেশি গণতন্ত্র অর্থাৎ জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকবে, উন্নয়ন ততো বেশি জনকল্যাণমুখী হবে। বর্তমান জামানার প্রখ্যাত দার্শনিক, লেখক সামির আমীন তার সম্পাদিত ফরাসি ভাষায় লিখিত একটি বইয়ে (বিস্তারিত আলোচনার জন্য দেখুন-প্রতিরোধের বিশ্বময়তা, ন্যাশনাল বুক এজেন্সি, কলকাতা, ২০০৪) বলেছেন, উন্নয়ন প্রক্রিয়া বাস্তবায়িত করতে হলে প্রাথমিকভাবে গণ-উদ্যোগের প্রয়োজন হয় না, যা প্রয়োজন তাহলো রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের প্রতি জনগণের সমর্থন।

কিন্তু বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের প্রতি জনগণের সমর্থন আছে কি নেই- সে বিষয়টি আদৌ বিবেচনায় নেয়া হয় না; বরং এর উল্টোটাই ঘটে থাকে সব সময়। আর উল্টো কথা শুনতে শুনতে এখন জনগণ আগাম বুঝে গেছে ক্ষমতাসীনরা কি বলতে চাইবে, চায়, বা চাচ্ছে।

এখন দেশের উপরিতলার মানুষদের জন্য ব্যাপক আলোচনার বিষয়- ‘‘বাজেটে কি করিলে কি হইতো’ জাতীয় বিষয়াবলী। কিন্তু সাধারণ মানুষ দেখছে বাজেটকে ভিন্নভাবে। আবার জিনিসপত্রের দাম বাড়লো কিনা, প্রকৃত আয় কতোটা কমলো ইত্যাকার বিষয়াদিকেই তারা বাজেট হিসেবে মনে করেন। এটা শ্রেষ্ঠতম কিংবা পাপমুক্ত হয়ে পুণ্য লাভের জন্য হয়েছে কিনা সে বিবেচনার সময়টুকুও তাদের নেই।

এতোদিন মধ্যম ও ক্ষুদ্র আয়ের মানুষজন নিরাপত্তার খাতিরেই ব্যাংকে অল্প-স্বল্প অর্থ জমা রেখে নিজ নিজ পরিকল্পনা অনুযায়ী তা ব্যয় করতেন। এখন সেখানেও সরকারের হানা। যারা অর্থাভাবে শপিং মলে যেতে পারেন না, তারা ছোটোখাটো দোকানে গিয়েও দেখেন ‘ভ্যাটের থাবা’।

এই মুহূর্তে র্যা ব-পুলিশ-আইন শৃংখলা রক্ষাবাহিনীর চেয়েও ভ্যাটভীতিই মানুষকে বেশি বিচলিত করছে। ঢালাও ১৫ শতাংশ ভ্যাটের কারণে এর প্রভাব প্রান্তিক মানুষের জীবনকেও বিপর্যস্ত ও বিপন্ন করবে। প্রভাবশালী গবেষণা সংস্থা সিপিডি এ কারণেই বলেছে, এই বাজেট মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের উপরে চাপ সৃষ্টি করবে। সিপিডি নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রণীত বিশাল আকারের এই বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। হয়তো অর্থমন্ত্রী এসব গবেষণালব্ধ কথাকেও কখন বলে বসবেন- রাবিশ!

তবে ভ্যাট, ব্যাংকে গচ্ছিত টাকা কর্তনসহ নিত্যনতুন উদ্ভাবনের জন্যই অর্থমন্ত্রী মুহিত বলার হিম্মত ও সাহস রাখেন এই বলে যে, জীবনের শ্রেষ্ঠতম বাজেটটি তিনি দিয়েছেন। এটা তার পক্ষেই মানায়। কারণ লোপাট হওয়া হাজার হাজার কোটি টাকাকে তিনি যেভাবে তুচ্ছজ্ঞান করে বক্তব্য দিয়েছেন- তাতে এমন কথা তিনি এবং তারা ছাড়া কে বা কারা বলতে পারে?

নতুন উদ্ভাবনী চিন্তা-ভাবনার জন্য অর্থমন্ত্রী মুহিতকেই শুধু বাহবা দিয়ে কোনো লাভ নেই; অধিকাংশ তার প্রাপ্যও নয়। অর্থমন্ত্রীকে যিনি মন্ত্রীসভায় রেখেছেন বাহবা এবং ধন্যবাদটা তারই বেশি প্রাপ্য।

কিন্তু এ কথাটি মনে রাখতে হবে, ভ্যাট বৃদ্ধি ও এর উপরে নির্ভরতা তখনই মানায়, যখন  মানুষের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, তারা সক্ষম হন অর্থনৈতিকভাবে। নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদ অর্মত্য সেন সারা জীবনই এই সক্ষমতার তত্ত্বের কথা বলেছেন। অবশ্য এসব তত্ত্ব জানলে বা শুনলে তো আর শ্রেষ্ঠতম বাজেটটি অর্থমন্ত্রী মুহিত এবং তার সরকারের পক্ষে দেয়া সম্ভব হতো না।

তবে আমজনতার একটিই কথা হচ্ছে-এটাই কি রাষ্ট্রের সাথে জনগণের চুক্তি? এ কথাটি মনে রাখতেই হবে, জনমানুষ যখন ওই চুক্তির উপরে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলবে (অবশ্য ইতোমধ্যে ফেলেছে) তখন আমাদের এই রাষ্ট্র ব্যবস্থাটিই জনগণের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে। আর সেটাই বিশাল এক দুর্ভাবনার বিষয়।

সামনে রোজা : প্রতি সরকারের সময়ের ব্যতিক্রমহীন একই অভিজ্ঞতা

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন::

সামনে রমযান মাস। এ মাসটিকে ঘিরে মুসলিম পরিবারগুলোর নানা প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে। এসব প্রস্তুতির মধ্যে রয়েছে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের কেনাকাটা। এ মাসকে পুঁজি করে কিছু ব্যবসায়ীও রীতিমতো তৎপর হয়ে উঠেছে। এর প্রভাব এরই মধ্যে দেশের খোলা বাজারে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম-খুলনাসহ দেশের কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা যায়, নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিষপত্রের দামের উর্ধ্বগতি। এমনিতে ব্যবসা-বাণিজ্যের দুর্দশা। এ সময়ে পাইকারি বাজার কয়েকজন পুঁজিপতি আর মহাজনের হাতে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে; যারা দ্রব্য মূল্যবৃদ্ধির সংকেত দেয়, নিয়ন্ত্রণ করে, এমনকি নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করার মানসে পণ্য গুদামজাত করে রাখে। রমযান হলেও ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসার উল্টোরূপ দেয়। রমযান আসলে দ্রব্যমূল্যর উর্ধ্বগতি এটা যেন একটি ঐতিহ্য হয়ে গেছে। যার ফলশ্রুতিতে ক্রেতা সাধারণ রমযান এলেই দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির আশংকায় উৎকন্ঠিত থাকেন। রমযানের দিনে যে সব পণ্যের বেশী প্রয়োজন পড়ে সে জাতীয় দ্রব্যের মূল্য এখন বাড়তির দিকে। বিশ্বের সব দেশে উৎসব এলে পণ্য সামগ্রীর দাম কমে কিন্তু বাংলাদেশে তার বিপরীত চিত্র দেখা যায়।

ছোলা, মটর, খেসারি, পিয়াজ, তেল, চিনি, বেসন, মাংস, মাছ, মুরগি বিভিন্ন মসলা, শাক সব্জি সহ প্রভৃতি দ্রব্যের দাম কম বেশী বেড়েছে। রমযানের ইফতারিতে ছোলা ও পিয়াজ এবং কাঁচা মরিচ, অত্যাবশ্যকীয় উপাদান হওয়ায় চাহিদার প্রেক্ষিতে বিক্রেতারাও বাড়িয়ে দিয়েছে ছোলাসহ অন্যান্য দ্রব্যের দাম। এক মাস ব্যবধানে মোটা স্বর্ণা চাল কেজি প্রতি ৩ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৪৫ টাকা দরে, পারিজা চাল ৪৪-৪৫ টাকা, মিনিকেট (ভালো মানের) ৫৬-৫৭ টাকা, মিনিকেট (সাধারণ) ৫৩-৫৪ টাকা, বিআর২৮ ৪৮-৫০ টাকা, সাধারণ মানের নাজিরশাইল ৬ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৫৪ টাকা ও উন্নত মানের নাজিরশাইল ৫৬ টাকা। এছাড়া পাইজাম চাল কেজিতে ২ টাকা বেড়ে ৪৮-৫০ টাকা, বাসমতি ৫৬ টাকা, কাটারিভোগ ৭৬-৭৮ টাকা, হাস্কি নাজির চাল ৪১ টাকা এবং পোলাও চাল ১০০ (পুরাতন), নতুন ৭৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই মুদি পণ্যের দাম ঊর্দ্ধমুখী। বাজারে ছোলা ও ডালের দাম এক ধাপ বেড়েছে। গত সপ্তাহে ৯০ টাকা দরে বিক্রি হওয়া ছোলা এখন বাজারে ৯৫-১০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া মুগ ডালের দাম গত সপ্তাহে কেজিতে ১০ টাকা বাড়ার পর এখন বাজারে আরও ৫ টাকা বেড়ে ১৩৫ টাকা দরে; ভারতীয় মুগ ডাল ১২৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া মাসকলাই ১৩৫ টাকা, দেশি মসুর ডাল ৫ টাকা বৃদ্ধি পেয়ে ১২৫ টাকা ও ভারতীয় মসুর ডাল ৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এদিকে চিনির দাম কেজিতে প্রায় ৫-৮ টাকা বেড়েছে। গত সপ্তাহে ৬৫ টাকা দরে বিক্রি হওয়া চিনি এখন বিক্রি হচ্ছে ৭২-৭৩ টাকা দরে। গত কয়েক সপ্তাহের বাড়তি দামেই বিক্রি হচ্ছে পেঁয়াজ ও রসুন। দেশি রসুন এখন বিক্রি হচ্ছে ১৩০ টাকায়। এছাড়া ভারতীয় রসুন কেজিতে ২৩০ টাকা দরে বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা। গত সপ্তাহের বাড়তি দামেই বিক্রি হচ্ছে প্রায় সব ধরনের ভোজ্য তেল। এখন বাজারে ৫ লিটারের বোতল ব্র্যান্ড ভেদে ৫০০ থেকে ৫১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া প্রতি লিটার ভোজ্য তেল ১০০ থেকে ১০৬ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। লবণ কেজিতে ২ টাকা বেড়ে ৩৮ টাকায়; দারুচিনি ১০ টাকা বেড়ে ৩৬০ টাকা; জিরা ৪৫০ টাকা; শুকনা মরিচ ২০০ টাকা; লবঙ্গ ১৫০০ টাকা; এলাচ ১৬০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

বিদ্যমান অবস্থায় সীমিত আয়ের মানুষের পক্ষে রোজার মাসে সংসার চালানো কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। রমযানকে কেন্দ্র করে দেশের অর্থনৈতিক মন্দাভাব, আমদানি-রফতানি সংক্রান্ত নানা জটিলতা বিভিন্ন প্রেক্ষিতে চালের দাম বেড়েছে, যা কিনা ক্রেতাদের উপর হঠাৎ চাপ প্রয়োগ করছে। পাইকারি ও খুচরা বাজারে সব রকম চালের দাম বেড়েছে। রমযান মাসে দাম আরো বাড়তে পারে বলে ক্রেতারা আশংকা প্রকাশ করছেন। অন্যসব জিনিসপত্রের দাম কিছুটা বাড়িয়ে চালের দামটা কম থাকলে সাধারণ মানুষের স্বস্তি মেলে। কারন চালের মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি মানুষকে আঘাত করে। এদিকে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত এক বৈঠকে রমযান মাসে দ্রব্য মূল্য স্থিতিশীল রাখার আশ্বাস দিয়ে বলেছেন, রমযানের জিনিসপত্রের দাম বাড়বে না। কথাটি কতটুকু কার্যকর হবে তা রমযানের শুরুতে বোঝা যাবে। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, চাহিদা অনুযায়ী দ্রব্যের সরবরাহ প্রচুর রয়েছে। চলতি মাসে দ্রব্যসামগ্রীর দাম যেভাবে বেড়েছে তাতে ক্রেতারা রীতিমত হতাশ হয়ে পড়ছেন। এমনিতে অর্থনৈতিক মন্দাভাব তার উপর দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, শুরু হচ্ছে রমযান, সব মিলিয়ে এক উৎকন্ঠা কাজ করছে। ক্রেতারা মনে করছেন, রমযান মাসে বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব না হলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়ে উঠবে। এজন্য এখনই সংশ্লিষ্ট প্রশাসন কর্তৃপক্ষও ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত।

বিদ্যমান ব্যবস্থায় বাজার পুরোপুরি পুঁজির লগ্নিকারকদের নিয়ন্ত্রণে। অর্থাৎ যাদের আমরা ব্যবসায়ী বলে থাকি। আবার এই ব্যবসায়ীরাই কিন্তু শাসক শ্রেণীর অবিচ্ছেদ্য অংশ। কাজেই তাদের স্বার্থে আঘাত হানার শক্তি-সাহস কারো থাকতে পারে তেমন আশা সুদূর পরাহত। আমাদের গণমাধ্যমগুলো বাজারের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে প্রতি রোজার শুরু থেকে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ ও প্রচার করে। এতে জনগণের কোনো সুফল ঘটে বলে মনে হয় না। নয়তো প্রতি রোজার মাসে অভিন্ন দুর্ভোগ আমাদের পোহাতে হবে কেন? মানুষের ক্রয় ক্ষমতার অধীনে থাকবে খাদ্য-পণ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি। রোজাকে উপলক্ষ্য করে লাগামহীন খাদ্য-পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে এযাবৎকালের একটি সরকারের শাসনামলেও কোন ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা আমাদের দেখা হয়নি। অভিজ্ঞতাগুলো এক এবং অভিন্ন। রোজা এলে মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি যেন অবধারিত। জনগণও এ বিষয়ে পরিস্থিতির অসহায় শিকরে পরিণত হয়েছেন। রোজায় খাদ্য-পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ঘটবে এটা অনিবার্যভাবেই আমাদের মনোজগতে স্থায়ী আসন লাভ করেছে। সে কারণে কেউ টুঁ শব্দ করে না। রোজার মাসে মুনাফাবাজ ব্যবসায়ীদের অতি মুনাফাকে অনিবার্য বলেই বিবেচনা করে থাকি।

সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সরকার যদি কিছু করতে চায় তবে তাকে বিকল্প বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এটা করতে হলে সরকারকে এমন নীতি গ্রহণ করতে হবে- যেন বাজারে আরো ব্যবসায়ী আসতে পারে, ফলে সেখানে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হবে। অথবা হতে পারে সেটা টিসিবিকে শক্তিশালী করা। সরকারের হাতে অবশ্যই বাজার নিয়ন্ত্রণের একটি ব্যবস্থাপনা থাকতে হবে। এটা ছাড়া সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কিছু করা যাবে না। বাজারও নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। কিন্তু সরকার যা করেন তা হচ্ছে, মাঝে মাঝে ব্যবসায়ীদের ডেকে বোঝানোর চেষ্টা করেন, কখনো হুমকি ধামকি দেন, কখনো সবক দিতে চেষ্টা করেন। কিন্তু বাজার নিয়ন্ত্রণে এটা কোনো পদ্ধতি নয়। বাজার নিয়ন্ত্রণ একটা ব্যবস্থাপনার বিষয়, একটা সিস্টেমের বিষয়, সরকারকে এই সিস্টেমে হাত দিতে হবে।

রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে হলে সরকারকে আগে থেকে প্রস্তুতি নিতে হবে। ডাল, ছোলা, তেল, চিনি যা যা প্রয়োজন আগে থেকে আমদানি করে মজুদ করে রাখতে হবে। মজুদ করার ব্যবস্থা না থাকলে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। ২/১ মাস আগে তড়িঘড়ি করে ব্যবস্থা নিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। আবার শুধু রমজানের সময় নয়, পণ্যদ্রব্যের মূল্য অন্য সময়েও বাড়ে। কাজেই টিসিবির হাতে প্রয়োজনীয় মজুদ সব সময় থাকতে হবে এবং তাকে বাজারে উপস্থিত থাকতে হবে। টিসিবি যতদিন দুর্বল থাকবে ততদিন বাজারের নিয়ন্ত্রণ থাকবে অতি মুনাফা খোর ব্যাবসায়ীদের হাতে। ফলে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি চলতেই থাকবে।