Home » অর্থনীতি (page 4)

অর্থনীতি

অপ্রতিরোধ্য অর্থ পাচাররোধে নড়াচড়া নেই কার স্বার্থে?

এম. জাকির হোসেন খান ::

ওয়াশিংটনভিত্তিক গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি’র (জিএফআই)-এর ১ মে ২০১৭ এ প্রকাশিত ‘ইলিসিট ফিন্যান্সিয়াল ফ্লোজ ফ্রম ডেভেলপিং কান্ট্রিজ: ২০০৫-১৪’ শীর্ষক উন্নয়নশীল দেশ থেকে অর্থ পাচার-সংক্রান্ত প্রতিবেদন মতে, ২০১৪ সালে বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের পরিমাণ ১ হাজার কোটি (১০ বিলিয়ন) ডলার বা ৮০ হাজার কোটি টাকার বেশি ছাড়িয়েছে। উল্লেখ্য, ২০০৪ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে ৫ হাজার ৫৮৮ কোটি ডলার এবং শুধু ২০১৩ সালেই অবৈধভাবে বাংলাদেশের বাইরে চলে গেছে ৯৬৬ কোটি ডলারের বেশি। দেশের প্রধান রফতানি খাত বস্ত্র ও পোশাক খাতের বাইরে অন্যান্য রফতানি পণ্যের সম্মিলিত আকারের চেয়ে বেশি অর্থ অবৈধভাবে দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে, যার অধিকাংশই দুর্নীতি এবং কর ফাঁকির মাধ্যমে অর্জিত এ অর্থ আমদানি-রফতানি চালানে জালিয়াতি বা অস্বচ্ছ ব্যবসায়িক লেনদেনের মাধ্যমে পাঁচার হচ্ছে বলে জিএফআই প্রতিবেদনে জানানো হয়।

এর আগে ২০১৪ এর ২০ জুন তারিখে সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক (এসএনবি) এর ‘‘ব্যাংকস ইন সুইজারল্যান্ড ২০১৩” প্রতিবেদনের বরাতে ২০১২ এর তুলনায় ৬২ শতাংশ বেড়ে সুইস ব্যাংকগুলোয় বাংলাদেশিদের ৩,১৬২.৭২ কোটি টাকা গচ্ছিত থাকার সংবাদ প্রকাশ করে। শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মইনুল খান বলেন, গত দুই বছরে কয়েক হাজার প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যাওয়ায় এগুলোর মধ্যে পাঁচ শতাধিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এর মধ্যে মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিদেশে অর্থ পাচার হলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেই বন্ড সুবিধার অপব্যবহার আইনে মামলা করা হয়েছে। মূলত: অর্থ পাচারের ঘটনায় এনবিআরের মামলার সুযোগ না থাকায় এমনটি হয়েছে। তবে সম্প্রতি অর্থ পাচারের অভিযোগে বেশ কয়েকটি মামলা করেছে এনবিআর; তবে চূড়ান্তভাবে প্রকৃত দোষীরা চিহ্নিত হবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়।

উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে সংশোধিত মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১৫ সংসদে পাশ হয়, যার আওতায় এনবিআরকে চোরাচালান ও শুল্ক সংক্রান্ত অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানি লন্ডারিং অপরাধের তদন্তকারী সংস্থা হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হলেও অনুমোদনের জন্য সুনির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ করে না দেয়ার ফলে এ সংক্রান্ত অপরাধের অধিকাংশ ঘটনায় অর্থ পাচারের পরিবর্তে রাজস্ব ফাঁকির মামলায় ঝুঁকছে এনবিআর” (বণিকবার্তা, ২০১৭)। আন্তর্জাতিক সংস্থা এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপ অন মানি লন্ডারিং (এপিজি)’র মতে, মানি লন্ডারিং  প্রতিরোধে আইন করলেও তদন্তের দুর্বলতার কারণেই বাংলাদেশে অর্থ পাচার রোধে সাফল্য কম।

এপিজি গত অক্টোবরে প্রকাশিত ‘অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং অ্যান্ড কাউন্টার টেরোরিস্ট ফিন্যান্সিং মেজারস ইন বাংলাদেশ মিউচুয়াল ইভ্যালুয়েশন রিপোর্ট-২০১৬’ শীর্ষক প্রতিবেদন মতে, ২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত অর্থ পাচার-সংক্রান্ত ৪০০ টি অভিযোগ জমা পড়লেও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) চূড়ান্তভাবে দুদক ৪৩টি মামলায় অর্থ পাচারের অভিযোগে ২১৪ জনের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। কিন্তু বিচার শেষে সাজা হয়েছে মাত্র ৪ জনের, যা প্রাথমিকভাবে প্রাপ্ত মোট অভিযোগের মাত্র ১ শতাংশ। প্রাথমিকভাবে ১৪০ কোটি ডলার বা ১০ হাজার ৯২০ কোটি টাকা পাঁচারের অভিযোগে ৭৬টি অভিযোগের বিপরীতে ২৮৪টি এজাহার দায়ের করা হয় । অর্থ পাচার রোধে কমপ্লায়েন্সের মাত্রা মূল্যায়ন, কারিগরি সহায়তা ও প্রশিক্ষণ, গবেষণা, বৈশ্বিক নীতি উন্নয়ন এবং বেসরকারি খাতকে অর্থ পাঁচার সংক্রান্ত হালনাগাদ তথ্য প্রদানকারী ৪১টি সদস্য দেশের সমন্বয়ে গঠিত এপিজি’র সদস্য বাংলাদেশও। এ প্রেক্ষিতে এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল মজিদ মনে করেন, ‘‘অর্থ পাচার সবচেয়ে বেশি হয় মূল্য ঘোষণার মাধ্যমেই। এ বিষয়ে এনবিআরকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হলেও পর্যাপ্ত জনবল ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এখনো এনবিআরের গড়ে ওঠেনি।  ট্রান্সফার প্রাইসিং সেলসহ এনবিআরের কিছু উইং কাজ করলেও এখনো দৃশ্যমান কিছু দেখা যায়নি। অর্থ পাচার প্রতিরোধে শক্তিশালী আইনও দরকার”।

যদিও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) মনে করে, এখনো আইনের বিধিমালা চূড়ান্ত না করায় পরিপূর্ণভাবে অর্থ পাচারের ঘটনা তদন্ত করা সম্ভব হচ্ছে না তবে, বাস্তবে এটা কতখানি নির্ভরযোগ্য তা প্রশ্নসাপেক্ষ। কারণ তদন্তের সাথে কারিগরি সক্ষমতা এবং তদন্তে নিয়োজিতদের সততা জড়িত। যদি তদন্ত সঠিকভাবেই হয়ে থাকবে তবে, কেন দুদক অভিযুক্তদের মাত্র ১ শতাংশের সাজা নিশ্চিত করতে সক্ষম হলো। আর যদি প্রযুক্তি জ্ঞান কমই থাকে তবে জোহা’র ন্যায় বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নিয়ে যেভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরিতে জড়িতদের যেভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে, ঠিক একইভাবে অন্যগুলোর ক্ষেত্রে সম্ভব নয় কেন? একই সিআইডি যদি বাংলাদেশ ব্যাংকের ৮৫০ কোটি টাকা পাঁচারে জড়িতদের চিহ্নিত করতে পারে; তবে, তাহলে অন্যগুলো কেন পারছেনা? তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন হলো, ২০০৯ সাল থেকে অর্থ পাঁচার আশংকাজনক হারে বাড়লেও কি কারণে বা কার স্বার্থে আইনটি শক্তিশালী করা হয়নি বা এনবিআর কে যথাযথ ক্ষমতা প্রদান করা হয়নি? অর্থ পাঁচারের সব সুযোগ রেখে পাঁচার করার পর যদি তা উদ্ধারে চেষ্টা করা হয়, তাহলে এটা অনেকটা ডাক্তার আসার আগেই রোগী মারা যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটতেই থাকবে।

এপিজি’র মতে, বাংলাদেশ  সাম্প্রতিক বছরগুলোয় উল্লেখযোগ্য হারে অর্থ পাচারের ঝুঁকির মুখোমুখি হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও ঝুঁকির বিষয়টি ওয়াকিবহাল। এজন্য ন্যাশনাল রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট (এনআরএ) ও  সেক্টরাল (খাতভিত্তিক) রিস্ক অ্যাসেসমেন্টের মাধ্যমে জাতীয় কৌশল নির্ধারণের মাধ্যমে কার্যকরভাবে অপ্রতিরোধ্য অর্থ পাঁচার নিয়ন্ত্রণের সুযোগ থাকলেও কেন কি কারণে সরকার তা করছেনা, তা বোধগম্য নয়। উল্লেখ্য, ২০১৫ এর অক্টোবরে এপিজির উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফরে এসে অর্থমন্ত্রীকে সরকারি কেনাকাটায় দুর্বলতা, স্বর্ণ চোরাচালান প্রতিরোধ, রাষ্টায়ত্ত ব্যাংকগুলোয় দুর্বলতার পাশাপাশি মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন-সংক্রান্ত বিষয় তদন্তে দুদকের শিথিলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে। অর্থমন্ত্রী ওই সময় এসব ঘাটতির বিষয়ে জোর দেয়ার কথা বলা হলেও বাস্তবে যে পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি তা সর্বশেষ জিএফআই’র প্রতিবেদনে স্পষ্ট। এরও আগে ২০১১ সালের পর ১০ জুন অর্থমন্ত্রী বাড়তি টাকার উৎস যে অবৈধ তা উল্লেখ করতে গিয়ে বাংলাদেশে কালো টাকার আকার জিডিপির সর্বনি¤œ ৪৮ শতাংশ হতে সর্বোচ্চ ৮২ শতাংশ বলে উল্লেখ করেছিলেন।

২০০৬ এবং ২০০৭ সালে অর্থ পাঁচার বাড়লেও ২০১১ সাল পর্যন্ত এর পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম থাকলেও ২০১২ সাল হতে এর পরিমাণ বাড়তে থাকে এবং ২০১১ এর তুলনায় ২০১৪ সালে ৫ গুণের বেশি কালো অর্থ বাংলাদেশ হতে বিভিন্ন দেশে পাঁচার হয়। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংকের মূদ্রানীতি অনুযায়ী ৫ হাজার ডলার বেশি অর্থ পাঠানো যায় না। চিকিৎসা বা শিক্ষা ব্যয়ের জন্য বিদেশে টাকা পাঠাতে গেলে অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়। আরেকটি চক্র বিদেশ থেকে বৈদেশিক মুদ্রায় প্রবাসীদের রেমিটেন্স সংগ্রহ করে তা বিদেশেই রেখে দিয়ে দেশে টাকায় দায় শোধ করা হয়; তেমনি বিদেশ হতে আমদানির ক্ষেত্রেও একই পদ্ধতি অনুসরণ করায় প্রায় ৪০ শতাংশ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আসছেনা, যেগুলো কোন না কোন বিদেশি ব্যাংকে জমা হচ্ছে।

দেশের গোটা ব্যাংকিং খাতের মোট সম্পদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ রাষ্ট্রায়ত্ত ছয়টি ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ করলেও এর বিপরীতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাব অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোর নন-পারফর্মিং লোনের হার ১১ শতাংশ, উন্নত দেশগুলোর ক্ষেত্রে এ হার কোনোভাবেই ৪ শতাংশের বেশি নয়। এর প্রধান কারণ ক্ষমতাবানদের হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে তা আত্মসাৎ করে লাপাত্তা। শেয়ার বাজার, সোনালি ও বেসিক ব্যাংকসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রায়াত্ব এবং বেসরকারি ব্যাংক হতে হলমার্ক, বিসমিল্লাহ গ্রুপ সহ বিভিন্ন কোম্পানি ক্ষমতাবানদের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ সহায়তায় জালিয়াতির মাধ্যমে ৩০ হাজার কোটি টাকা আত্মসাত করলেও শুধু সরকার ঘনিষ্ঠ হওয়ায় অভিযুক্তদের কেউই বিচারের আওতায় আসছেনা বলে জানিয়েছেন ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞ খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ। সরকারি-বেসরকারি খাতের সাত ব্যাংকের (সোনালী, রূপালী, বেসিক, কৃষি, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন, বাংলাদেশ কমার্স ও আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক) ব্যাংকগুলো নিজের মূলধন তো হারিয়েছেই, উপরন্তু সাড়ে ১৬ হাজার কোটি টাকার ঘাটতিতে পড়ায় ব্যবসার পরিবর্তে এসব ব্যাংক মূলধন জোগান নিয়েই চিন্তিত। আর্থিক খাতে জালিয়াতির এ ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ ব্যাংক হতে ৮কোটি ১০ লাখ ডলারের ওপর রিজার্ভ চুরির মতো অচিন্তনীয় ঘটনা ঘটে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিলিজেন্স ইউনিট গঠনের পর অবৈধভাবে কিভাবে দেশের বাইরে অর্থ পাঁচার হচ্ছে তা বোধগম্য নয়। ব্যাংকিং খাতে অপ্রতিরোধ্য দুর্নীতি প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘‘নিজেদের দলীয় লোকের সমর্থনের কারণে সোনালী ও বেসিক ব্যাংকে আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনায় জড়িত সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাচ্ছে না”।

পৃথিবী জুড়ে তুমুলভাবে ঝড় তোলা পানামা পেপারসে’র মাধ্যমে বৈধ-অবৈধ পথে বিদেশে অর্থ পাঁচারের যে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ বাংলাদেশ সহ পৃথিবীর সকল মানুষের সামনে প্রকাশ পায় কিভাবে স্বল্পোন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর রাজনীতিক এবং ক্ষমতাবানরা অবৈধ পথে উপার্জিত বিত্ত বৈভব উন্নত দেশগুলোতে পাঁচার করছে। শুধু তাই নয়, ভারত, আমেরিকা, দুবাই, বেলারুশ, রাশিয়া, ব্যাংকক এবং সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন ব্যাংকে, এবং মালয়েশিয়ায় ব্যবসায় বিনিয়োগের নামে বা ‘সেকেন্ড হোম’-এর মাধ্যমে প্রকৃত কি পরিমাণ অর্থ পাঁচার করা হয়েছে তার প্রকৃত হিসাব রাষ্ট্রের নাগরিকদের স্বার্থে জানা জরুরি। একের পর এক রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাতের ধারাবাহিক কেলেঙ্কারির চাপা পড়ে যাচ্ছে। এ সুযোগে, বাংলাদেশ থেকে আরো কম করহার ও কম আইনি জটিলতার দেশে আইন এবং বাণিজ্য ব্যবস্থাপর ফাঁক গলে মূলধন পাচার হয়ে যাচ্ছে। প্রশ্ন হলো দুদক, এনবিআর বা বাংলাদেশ ব্যাংকের চোখ ফাঁকি দিয়ে কিভাবে বিদেশে হাজার হাজার কোটি টাকা পাঁচার হলো?

জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য ১৬.৪ এর আওতায় রাষ্ট্রসমূহ ঐক্যমতে উপনীত হয় যে, ২০৩০ এর মধ্যে তারা সন্দেহজনক বা কালো অর্থের পাচার উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমাতে ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি চুরিকৃত সম্পদ পুনরুদ্ধার এবং ফেরত আনার কাজও শক্তিশালী করবে; একইসাথে সব ধরনের সংগঠিত অপরাধ রোধ করবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক, দুদক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং আইন মন্ত্রণালয়/এটর্নি জেনারেলের অফিসের সমন্বয়ে পাঁচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনার স্থায়ী উদ্যোগ গ্রহণের বিকল্প নেই।

ব্যাংকের দুর্নীতির দায় জনগণ কেনো বহন করবে?

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন ::

সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকিং সেক্টরে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার সংক্রান্ত বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর ঘটনা ও তথ্য-উপাত্তের খুবই সামান্য জনগণের সামনে নানাভাবে ও পন্থায় হাজির হয়েছে। একে অপরকে দোষারোপের মাধ্যমে কিংবা আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে প্রকৃত অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। এতদিন বলা হতো ও এটি সত্যও যে, ব্যাংকিং  সেক্টরে অনিয়ম, দুর্নীতি ও লুটপাট দেশের উন্নয়নের পথে প্রধান বাধা। পুঁজিবাজার, বিসমিল্লাহ গ্রুপ, বেসিক ব্যাংক, ডেসটিনি, হলমার্ক কেলেঙ্কারি, এটিএম বুথ বা পাসওয়ার্ড জালিয়াতিসহ সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনা সবাইকে বহুআগেই আতঙ্কিত ও শঙ্কিত করেছে। তাছাড়া দেশের ব্যাংক খাতে তথ্যপ্রযুক্তির নিরাপত্তা দুর্বলতার সুযোগে বেশ কিছু জালিয়াতির ঘটনাও ঘটেছে। আইসিটি বিশেষজ্ঞদেরও ভাবিয়ে তুলেছে এ ধরনের দুর্নীতি, আত্মসাৎ ও জালিয়াতির ঘটনা। ব্যাংকিং  সেক্টরে দুর্নীতি ও জালিয়াতির ঘটনা যুগে যুগে হয়ে আসছে;  যা নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও একেবারে দূর করা যাচ্ছে না। সম্প্রতি জাতীয় প্রেস ক্লাবে সুজনের এক গোলটেবিল বৈঠকে দাবি করা হয়েছে যে, সু-শাসনের অনুপস্থিতির সুযোগে গত ৭ বছরে ৬টি বড় আর্থিক কেলেংকারিতে ৩০ হাজার কোটি টাকা চুরি বা আত্মসাৎ করা হয়েছে। ইতিপূর্বে ভুয়া জমি বন্ধক রেখে টাকা নিয়ে উধাও হওয়ার মতো ঘটনা শোনা যেত। এখন বিজ্ঞান ও তথ্য প্রযুক্তির উন্নয়নের খারাপ দিকটিকে পুজি করিয়ে, বেড়ে চলেছে এসব চাঞ্চল্যকর ঘটনা। তবে আইন ও প্রযুক্তির মধ্যেই সর্ষের ‘‘ভুত” থাকায়, নানা সক্ষমতায় কি আমরা যথেষ্ট?

যে ব্যাংক রাষ্ট্রের অন্যান্য অনুমোদিত ব্যাংকের নিয়মশৃঙ্খলা তদারকির দায়িত্বে নিয়োজিত- খোদ সেই বাংলাদেশ ব্যাংক-এর রিজার্ভ থেকে অর্থ চুরি যাওয়ার ঘটনায় দেশব্যাপী উৎকণ্ঠা সৃষ্টি করেছে। এ ঘটনায় আত্মসাৎকৃত ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার বা ৬৫০ কোটি টাকা উদ্ধারের আশা খুব কম -এমন অভিমত প্রকাশ করেছেন ফিলিপাইনের তদন্তকারী সিনেট কমিটি। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের চুরি হওয়া রিজার্ভে ফিলিপিন্সের মুদ্রা পাচার প্রতিরোধ কর্তৃপক্ষ (এএমএলসি) ও দেশটির সিনেট তদন্ত কমিটি অনুসন্ধান শুরুর পর রিজার্ভ চুরির অর্থ থেকে পাওয়া প্রায় ৯৮ লাখ ডলার ইতোমধ্যে এএমএলসি’র কাছে জমা দিয়েছেন ক্যাসিনোর জাংকেট অপারেটর কিম অং। আবার ফিলিপিন্স কর্তৃপক্ষের তোড়জোড়ে রিজার্ভের এই অর্থ উদ্ধার হলেও পুরো পাওয়া যাবে কিনা- সিনেট কমিটির শুনানিতে যেসব তথ্য বের হয়ে এসেছে তাতে সেটি এখনও পর্যন্ত স্পষ্ট নয়।

এইদিকে, বিদেশি ছয়টি ব্যাংক ও দেশীয় ২৪টি ব্যাংক  অফশোর ব্যাংকিং সেবা দিচ্ছে। কিন্তু আমাদের দেশে কোন পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা ছাড়াই চলছে অফশোর ব্যাংকিং। অফশোর ব্যাংকিং হলো ব্যাংকের ভেতরে বিদেশি ব্যাংকের কার্যক্রম। অফশোর ইউনিটের ব্যবস্থাপনা, হিসাব, আমানত, ঋণ কার্যক্রম সম্পূর্ণ ভিন্ন। শুধু বছর শেষে মুনাফা অথবা লোকসানের হিসাব যুক্ত হয় ব্যাংকের হিসাবে। বাংলাদেশ ব্যাংক ১৯৮৫ সালে ব্যাংকগুলোর অফশোর ব্যাংকিং পরিচালনার জন্য একটি নীতিমালা জারি করে। ৩০ বছর পার হলো কিন্তু অফশোর ব্যাংকিংয়ের জন্য কোনো পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা হয়নি। শুরুতে বিদেশি ব্যাংকগুলো এই সেবায় থাকলেও প্রতিনিয়ত নতুন নতুন ব্যাংক যুক্ত হচ্ছে অফশোর ব্যাংকিং সেবায়। বিদেশি খাতের ছয় ব্যাংকের পাশাপাশি দেশের ২৪টি ব্যাংক এখন এই সেবা দিচ্ছে।

অফশোর ব্যাংকিংয়ে দেশীয় মুদ্রায় কোনো কার্যক্রম পরিচালিত হয় না। এতে শুধু ডলারের পাশাপাশি ইউরো, পাউন্ড, জাপানি ইয়েনের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালিত হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক ১৯৮৫ সাল অফশোর ব্যাংকিংয়ের জন্য একটি নীতিমালা তৈরি করে। এতে বিদেশ থেকে আমানত এনে ঋণ দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ ছিল। তবে কারা ঋণ পাবে, ঋণগ্রহীতা সীমা, ঋণের ব্যবহার এসব বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ নেই। এ সুযোগে ব্যাংকগুলো ঋণের অপব্যবহার করছে। বিদেশ থেকে আমানত সংগ্রহের নিয়ম থাকলেও মূল ব্যাংক থেকে ঋণ করে বিদেশে ঋণ দিচ্ছে অফশোর ইউনিট। আবার এসব ঋণের গ্রহীতাদেরও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। মূলত অর্থ পাচারে ব্যবহৃত হচ্ছে ইউনিটগুলো। এখন অফশোর ব্যাংকিংয়ের জন্য পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা করার উদ্যোগ নিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ইতিমধ্যে নীতিমালার খসড়া প্রস্তুত করেছে। গত দেড় দশকে ব্যাংকিং খাতে ৯টি বড় ধরনের আর্থিক কেলেংকারী সংঘটিত হয়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশ, জনগণ এবং বিপুলসংখ্যক গ্রাহক। এসব অনিয়ম, দুর্নীতি, লুটপাটের সঠিক বিচার না হওয়ায় ব্যাংক জামানতে জনমনে তৈরী হয়েছে আস্থাহীনতা ও উৎকণ্ঠা- যা ফিরিয়ে আনা দরকার। ব্যাংকিং সেক্টরে দুর্নীতি বন্ধে কিছু আগাম সতর্কতা অবলম্বন প্রয়োজন। এতে দুর্নীতি প্রতিরোধ পুরোপুরি সম্ভব না হলেও অন্তত আত্মসাৎকৃত অর্থ উদ্ধারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যাবে। স্বচ্ছতা ও সুশাসনের অভাবে ব্যাংকিং খাত এখন চরম ঝুঁকিতে। বাড়ছে মানি লন্ডারিং। আইনের ভাষায় ‘মানি লন্ডারিং একটা অপরাধ, যার মাধ্যমে বেআইনি কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রাপ্ত সম্পদ এমনভাবে লেনদেন হয়, যাতে মনে হয়, এসব এসেছে কোনো বৈধ উৎস থেকে। এসব বিষয়ে আইন থাকলেও ব্যাংকগুলোকে খুব সতর্ক অবলম্বন করতে হবে।

ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দেখলেও ব্যাংকিং খাতের লুটপাটের চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বর্তমানে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬৩ হাজার ৪৩৫ কোটি টাকা; যা ব্যাংকিং খাতে বিতরণ করা মোট ঋণের ৯ দশমিক ২৩ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তৈরি করা সর্বশেষ প্রতিবেদনে এই তথ্য জানা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর মোট ঋণ স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৭৩ হাজার ৯২০ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিশেষ সুবিধা নিয়ে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকারও বেশি পরিমাণ ঋণ পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠন করা হয়েছে। আর পুনঃতফসিল হওয়া ঋণের মধ্যে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা আবারো খেলাপি হয়ে পড়েছে। সব মিলিয়ে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬৩ হাজার ৪৩৫ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫১ হাজার ৩৭১ কোটি টাকা। এই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১০ হাজার ৮০১ কোটি টাকা। আগের বছরে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫ লাখ ৮৪ হাজার ৬১৫ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে খেলাপি ঋণ ছিল ৫১ হাজার ৩৭১ কোটি টাকা। অবশ্য তিন মাস আগে সেপ্টেম্বরে ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণ ছিল ৬৫ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা- যা মোট ঋণের ১০ দশমিক ৩৪ শতাংশ। সে বিবেচনায় তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি কমেছে তিন হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় খাতের ৬ বাণিজ্যিক ব্যাংকে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার ১২৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১০ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা, বেসিকের ছয় হাজার ৩১১ কোটি টাকা, অগ্রণী ব্যাংকের পাঁচ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা, জনতার চার হাজার ১৯৩ কোটি টাকা, রূপালীর দুই হাজার ৭৯৪ কোটি টাকা এবং বিডিবিএলের ৭৩৪ কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৩ সালের ১ জুলাই থেকে ২০১৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে শিথিল নীতিমালায় বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিয়ে ৫০ হাজার ৬৮১ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বিশেষ সুবিধায় পাওয়া রাষ্ট্রীয় খাতের ৬ বাণিজ্যিক ব্যাংকে পুনঃতফসিলকৃত ঋণের প্রায় ৪০ শতাংশ খেলাপি হয়ে গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল্যায়নে দেখা গেছে, বড় অঙ্কের ঋণে নয়, ছোট ছোট ঋণেও বড় ধরনের দুর্নীতির ঘটনা ঘটছে। খবরে প্রকাশ, রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেডে (বিডিবিএল) গণহারে ঋণে অনিয়ম করা হচ্ছে। জালিয়াতির মাধ্যমে ১৩টি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ১১ কোটি টাকার ঋণ দিয়েছে ব্যাংকটির আশুগঞ্জ শাখা। এর মধ্যে অনেক অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানও ঋণ পেয়েছে। বর্তমানে শাখাটির ৭৮ শতাংশ ঋণই খেলাপি। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, এসব ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কোনো নিয়মের অনুসরণ করেননি। উল্টো গুরুতর অনিয়ম ও জালিয়াতি করা হয়েছে। এর বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ নিয়ে ব্যাংক শাখাটি হুমকির মুখে পড়েছে।

সার্বিক বিচেনায় আমাদের ব্যাংক খাত ভালো চলছে না। ফলে দেশের ব্যাংক খাতে বাড়ছে ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদ। এতে কমছে মূলধন সংরক্ষণের সক্ষমতা। আর এই সক্ষমতা কমে যাওয়ায় ব্যাংকের ঝুঁকিসহন ক্ষমতাও কমে যাচ্ছে। এতে বাড়ছে ঝুঁকির তীব্রতা। গত বছরের জুনে ব্যাংক খাতে ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদ ছিল ৭ লাখ ৪৩ হাজার ৬৬৭ কোটি টাকা। ডিসেম্বর শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৭৫ হাজার ৪৪১ কোটি টাকা; মাত্র ৬ মাসে তা বেড়েছে ৩২ হাজার কোটি টাকা। এত মূলধন সংরক্ষণের হারও আলোচ্য সময়ে কমে গেছে। সব মিলিয়ে প্রয়োজনীয় মূলধন সংরক্ষণ করতে ব্যর্থ হয়েছে ৭টি ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশি¬ষ্ট সূত্রমতে, ভুয়া ঋণ ও পর্যাপ্ত জামানত না রেখে স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক তদবির ও জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে ঋণ দিলে বেড়ে যায় খেলাপি ঋণের পরিমাণ; কমে যায় ব্যাংকের আয়। ফলে ব্যাংকের ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদ বেড়ে যায়।

স¤প্রতি বিবিসি বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে বড় ব্যাংক-তহবিল লোপাটের ঘটনা বলে বিবেচিত এ ঘটনায় লোপাট হওয়া ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার চলে গিয়েছিল ফিলিপাইনের ব্যাংক ও জুয়ার বাজারে। এ অর্থ ফেরত আনার জন্য বাংলাদেশ সরকার এখন চেষ্টা-তদবির করছে। এর কিছু টাকা ফেরত এলেও বাকি টাকা ফেরত আসার বিষয়টি স্থবির হয়ে আছে। এই স্থবিরতার দুটি কারণ জনালেন ফিলিপাইনের এনকোয়ারার পত্রিকার অনুসন্ধানী সাংবাদিক ড্যাক্সিম লুকাস। তিনিই বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি ঘটনাটি প্রথমে বিস্তারিত ফাঁস করে বাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেন। এই চুরি যাওয়া অর্থের বাকি অংশ ফেরত পাওয়ার ব্যাপারে স্থবিরতার প্রথম কারণ হচ্ছে, ফিলিপাইনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে গেছে। দ্বিতীয়ত, সে দেশের অনেক কর্মকর্তা মনে করেন, বাংলাদেশ ব্যাংক তহবিল লোপাটের ঘটনার সাথে জড়িত রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকেরই ভেতরের লোক। সাংবাদিক লুকাস জানিয়েছেন, ফিলিপাইনের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাকে বলেছেন- বাংলাদেশ অযথাই ফিলিপাইনের ওপর বেশি দোষ চাপাচ্ছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত বাংকগুলোতে চলা দুর্নীতি এসব ব্যাংককে কার্যত ফোকলা করে ফেলা হয়েছে। আর এসব রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের দুর্নীতি আর অনিয়মের দায় মেটানো হচ্ছে জনগণের অর্থে। গত তিন বছরে সরকারি ছয় ব্যাংকে ভর্তুকি দেয়া হয়েছে ৭ হাজার ৯০৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থের জোগান দেয়া হয়েছে সোনালী ব্যাংকে, যার পরিমাণ ২ হাজার ৭০৫ কোটি টাকা। আর বেসিক ব্যাংকে দেয়া হয়েছে ২ হাজার ৫৯০ কোটি টাকা। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, সরকারি ব্যাংকের দুর্নীতির দায় জনগণ কেনো বহন করবে

কমছে রেমিট্যান্স প্রবাহ

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন::

বৈদেশিক কর্মসংস্থানে গত বছর রেকর্ড সৃষ্টি করলেও সে অনুপাতে বাড়েনি রেমিট্যান্স প্রবাহ। গত পাচ বছরের মধ্যে রেমিট্যান্স প্রবাহ সর্বনিম্নে নেমেছে। কারণ হিসেবে উঠে এসেছে বিদেশে বেকার শ্রমিকের সংখ্যা বৃদ্ধি, মজুরি কমে যাওয়াসহ মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ভুয়া এজেন্টদের মাধ্যমে ও অবৈধ পন্থায় টাকা পাঠানো। বাংলাদেশ ব্যাংকও রেমিট্যান্স প্রবাহের নিম্নগতির কারণ হিসেবে এগুলোকে দায়ী করছে। বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম উৎস রেমিট্যান্স কমায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামের ধারাবাহিক পতন ও মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থায় অর্থনৈতিক স্থবিরতা, পাউন্ড, ইউরো, রিঙ্গিত ও সিঙ্গাপুর ডলারসহ অন্যান্য দেশের মুদ্রার মান হ্রাস, ডলারের বিনিময় হার হ্রাস, প্রবাসী আয়ের উৎস দেশগুলোতে আইন-কানুন কঠোর হওয়া এবং যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে মানি ট্রান্সফার কোম্পানির ব্যাংক হিসাব বন্ধ করে দেওয়ায় প্রভাব পড়েছে রেমিট্যান্স প্রবাহের ওপর। এছাড়া অবৈধ পথে হুন্ডি আসা বেড়ে যাওয়াও রেমিট্যান্স হ্রাসের কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।

২০১৬ সালেই বিদেশে চাকুরিরত প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ বা রেমিট্যান্সের প্রবাহ কমেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে দেখা গেছে- আলোচ্য বছরে আগের বছরের (২০১৫) তুলনায় রেমিট্যান্সের প্রবাহ কমেছে ১৭১ কোটি ডলার বা ১১ দশমিক ১৫ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০১৬ সালে মোট রেমিটেন্স এসেছে ১৩৬১ কোটি মার্কিন ডলার। অথচ ২০১৫ সালে এর পরিমাণ ছিলো ১৫৩২ কোটি ডলার। তবে ২০১৭ সালে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের প্রবাহ বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকার কিছু পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, বিদেশে বিভিন্ন এক্সচেঞ্জ হাউজের সঙ্গে কথা বলা। সম্প্রতি বিদেশে বাংলাদেশি এক্সচেঞ্জ হাউজের জন্য জামানত ফি কমানো হয়েছে। তথ্যে দেখা গেছে, কেবল ডিসেম্বর মাসে রেমিট্যান্স এসেছে ৯৫ কোটি ৮৭ লাখ ডলার। আর তার আগের মাস নভেম্বরে এসেছে ৯৫ কোটি ১৩ লাখ ডলার। শরণার্থী ও অভিবাসীদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন রামরুর তথ্য মতে, ২০১৬ সালে মোট সাড়ে ৭ লাখ বাংলাদেশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গিয়েছে। এই সংখ্যা ২০১৫ সালের তুলনায় ৩৫ শতাংশ বেশি। গত বছর অর্থাৎ ২০১৫ সালে এই সংখ্যা ছিলো সাড়ে ৫ লাখ।

চলতি বছরের দ্বিতীয় মাস ফেব্রুয়ারিতে দেশে ৯৩ কোটি ৬২ লাখ মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বা রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা; যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় রেমিট্যান্স কমেছে ২০ কোটি ডলার। গত বছর এর পরিমাণ ছিল ১১৩ কোটি ৬২ লাখ ডলার। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমে যাওয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চলা রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা রেমিট্যান্স কমে যাওয়ার কারণ। এছাড়াও বেসরকারি পর্যায়ে জনশক্তি রফতানিতে ভাটা ও হুন্ডি বা অবৈধ পথে প্রবাসী আয় পাঠানোর প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় রেমিট্যান্স প্রবাহ কম গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের (২০১৬-১৭) অষ্টম মাস ফেব্রুয়ারিতে দেশে ৯৩ কোটি ৬২ লাখ মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। এর আগের মাস জানুয়ারিতে পাঠিয়েছিল ১০০ কোটি ৯৪ লাখ ডলার। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে রেমিট্যান্স কমেছে ৭ কোটি ৩২ লাখ ডলার। এদিকে, ফেব্রুয়ারিতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে রেমিট্যান্স এসেছে ২৪ কোটি ৩৮ লাখ ডলার। বিশেষায়িত একটি ব্যাংকের মাধ্যমে ৯৬ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। এছাড়া বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে ৬৭ কোটি ২০ লাখ ডলার এবং বিদেশি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে ১ কোটি ৬ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে।

সংশ্লিষ্টরা  বলছেন, হুন্ডির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ ধারাবাহিকভাবে কমছে। প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বেশ কিছু উদ্যোগ নেয়া হলেও অবস্থার কোনও পরিবর্তন হচ্ছে না। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর চলমান অর্থনৈতিক স্থবিরতা ও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কম থাকায় প্রবাসী আয় কমেছে। অর্থনীতির বেশিরভাগ সূচক ইতিবাচক ধারায় রয়েছে। তবে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স আয়ে পিছিয়ে পড়ছে দেশ। ফলে কয়েক বছর ধরেই মোট দেশজ উৎপাদন ও আয়ে (জিডিপি) এ সূচকটির অবদানও কমছে। বর্তমানে জিডিপিতে এ সূচকের অবদান ৬ শতাংশের ঘরে নেমে এসেছে। অথচ ২০০৮-০৯ থেকে ২০১২-১৩ অর্থবছর পর্যন্ত এর অবদান ৯ শতাংশের বেশি ছিল। শুধু জিডিপিতেই নয়, শীর্ষ রেমিট্যান্স আহরণকারী দেশগুলোর তালিকায়ও অবনমন হয়েছে বাংলাদেশের। ২০১২ সালে শীর্ষ রেমিট্যান্স আহরণকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ সপ্তম অবস্থানে ছিল; কিন্তু বর্তমানে একধাপ অবনতি হয়ে অষ্টমে উঠেছে। এজন্য পাঁচটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে জনশক্তি রফতানিতে ভাটা; অবৈধ পথে প্রবাসী আয় পাঠানোর প্রবণতা বৃদ্ধি; মার্কিন ডলারের বিপরীতে বিভিন্ন মুদ্রার দর পতন; আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য কমে যাওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চলা রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতাকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা । বিশ্লেষকরা বলছেন, চলতি হিসাবের ভারসাম্য বজায় রাখা; বিনিময় হারের স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে রেমিট্যান্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। কিন্তু ধারাবাহিক রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে গেলে বৈদেশিক লেনেদনের চলতি হিসাবের ভারসাম্যে চাপ সৃষ্টির পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিতে এর ধাক্কা লাগতে পারে।

রেমিট্যান্স প্রবাহ কমার বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, জনশক্তি যে হারে বাড়ার কথা, সেভাবে বাড়ছে না। সরকার নানা দেশের সঙ্গে চুক্তি করলেও এর দৃশ্যমান ফল দেখা যাচ্ছে না। উল্টো বিভিন্ন কারণে কিছু লোক দেশে ফেরত আসছে। দ্বিতীয়ত, বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমায় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় প্রবাসীদের বেতন ও মজুরি কমেছে। প্রবাসীদের জীবনযাত্রার ব্যয় আগের চেয়ে বেড়েছে। তৃতীয়ত, ডলারসহ বিভিন্ন মুদ্রার বিপরীতে বাংলাদেশের টাকার মান শক্তিশালী হওয়া। চতুর্থত, অবৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রবণতা বাড়ছে। এক্ষেত্রে মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার হচ্ছে বলে শোনা যাচ্ছে। তিনি বলেন, ধারাবাহিক রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে গেলে তা দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতির জন্য ভালো হবে না। এতে চলতি হিসাবের ভারসাম্যে চাপ তৈরি হবে। এমনিতেই আমাদের রফতানির চেয়ে আমদানি ব্যয় বেশি।

প্রক্রিয়া সহজ ও দ্রুত হওয়ায় প্রবাসী বাংলাদেশীরা অবৈধ উপায়ে দেশে অর্থ পাঠাচ্ছেন বলে অভিযোগ মিলছে। এতে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু হওয়ার পর থেকে হুন্ডির তৎপরতা বেড়ে গেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, বর্তমানে অবৈধভাবে হুন্ডির মাধ্যমে ২২ শতাংশ রেমিট্যান্স আসছে। বিবিএসের বিভিন্ন সময়ের জরিপ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গেল ৩ বছরে হুন্ডি বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। ২০১৩ সালে প্রবাসী আয়ের মাত্র ১০ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ হুন্ডির মাধ্যমে আসত। এখন আসছে ২২ শতাংশ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আসছে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে। মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার করে হুন্ডি হওয়ায় বৈধ পথে রেমিট্যান্স কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে ছোট আকারের রেমিট্যান্সের অধিকাংশই আসছে এ উপায়ে। হুন্ডিকারীরা কৌশলে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সাইনবোর্ড টানিয়ে অর্থ সংগ্রহ করছেন। এরপর মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টের মাধ্যমে তা পৌঁছে দেয়া হচ্ছে সুবিধাভোগীর কাছে। হুন্ডিকারীরাই মূলত কৌশলে এ কাজ করছেন। এজন্য রেমিট্যান্স আহরণে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের পরিবর্তে এজেন্ট ব্যাংকিং ব্যবস্থা ব্যবহার করা যায় কিনা, সে বিষয়টি নিয়ে কাজ কাজ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

তীব্র সামাজিক সংকট : একাংশের হাতে কেন্দ্রীভূত বিশাল সম্পদ

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন::

পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সাধারণ বৈশিষ্ট্য ধন-বৈষম্য । কিন্তু তা যদি একটা সীমা অতিক্রম করে যায়, তাহলে তা যে কোন  সমাজব্যবস্থার জন্যও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। এ বৈষম্য বাড়তে বাড়তে বর্তমানে তা বিপদরেখা অতিক্রম করেছে। বৈষম্য ক্রমাগত বেড়েই চলেছে এবং সাম্প্রতিক সময়ে বৈষম্য বৃদ্ধির হারটাও মারাত্মক বিপদের সংকেত দিচ্ছে। নব্বইয়ের দশকেই প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ পল সুইজি বলেছিলেন, ঐতিহ্যগতভাবে লগ্নির প্রসার প্রকৃত অর্থনীতির সমৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলেছে।…কিন্তু এখন আর তা নয়। এখন পুঁজির মালিক লগ্নি ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করবে, প্রকৃত উৎপাদনশীল সম্পদে নয়। অর্থনীতিবিদ জন মেইনার্ড কেইনস গত শতাব্দীর ত্রিশের দশকেই অর্থনীতির এই ধরনের বিকৃত প্রক্রিয়া এবং সেই কারণে উদ্ভূত ফাটকা পুঁজির ক্ষতিকর প্রভাবের কথা বলেছিলেন।

সম্প্রতি প্রকাশিত অক্সফামের প্রতিবেদনে ধনী-গরিবের বৈষম্যের বেশ কিছু উদাহরণ দিয়ে বলা হয়েছে, বিশ্বের বিরাজমান বৈষম্য ক্রমান্বয়ে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে। বলা হয়েছে, লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের বড় কোম্পানির সূচক হলো এফটিএসই ১০০। এসব বড় কোম্পানির একজন প্রধান নির্বাহী এক বছরে যা আয় করেন, তা বাংলাদেশের পোশাক কারখানার ১০ হাজার শ্রমিকের এক বছরের আয়ের সমান। আবার ভিয়েতনামের একজন গরিব মানুষের ১০ বছরের আয়, ওই দেশের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তির এক দিনের আয়ের সমান। আগামী ২০ বছরে ৫০০ ধনী তাদের উত্তরাধিকারীদের হাতে ২ লাখ ১০ হাজার কোটি ডলারের সম্পদ তুলে দেবেন। এর পরিমাণ ১৩০ কোটি মানুষের দেশ ভারতের মোট দেশজ উৎপাদনের  (জিডিপি) চেয়ে বেশি। ১৯৮৮ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে বিশ্বের ১০ শতাংশ গরিব মানুষের আয় প্রতিবছর গড়ে ৩ ডলার করে বেড়েছে। অন্যদিকে, ওই সময়ে শীর্ষ ১ শতাংশ ধনীর আয় ১৮২ গুণ বেড়েছে। আর ১ শতাংশ ধনী গোষ্ঠীর হাতে যে সম্পদ আছে, তা বিশ্বের বাকি সব মানুষের সম্পদের চেয়ে বেশি। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ক্রমাগত বৈষম্য বৃদ্ধির কারণে অপরাধ বাড়ছে, নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে; দারিদ্র্যবিমোচন প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করছে। এর ফলে হতাশা ও আতঙ্কে থাকা মানুষের সংখ্যা বাড়ছে।

প্রশ্ন হলো, বৈষম্য যেখানে বেড়েই চলে, উচ্চবিত্তের উলম্ফন, নিম্নবিত্ত যেখানে নামছেই, সেই অর্থনীতির কার্যক্রমে নীতি- নৈতিকতা কোথায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পর সমাজের উপরে থাকা ১০ শতাংশ মানুষের আয়ে বৃহৎ উলম্ফন ঘটেছে। নীতিনির্ধারকরা বলছেন, আপাতত বণ্টন ব্যবস্থা নিয়ে মাথা না ঘামালেও চলবে। তাদের যুক্তি, অনুন্নয়নের অন্ধকার থেকে একটি দেশ যখন উন্নয়নের আলোর দিকে পা বাড়ায়, তখন অসাম্য বা বৈষম্য খানিকটা বাড়েই। তাই উন্নয়নের স্বার্থেই এই বৈষম্য মেনে নিতে হয়। প্রশ্ন হলো, এই মেনে নেয়াটা আর কতকাল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ৪৫ বছর অতিক্রান্ত। স্বাধীনতার সময় যত গড়িয়ে চলছে, বাংলাদেশে বৈষম্য ততই বাড়ছে। এই বৈষম্য এখন সমাজ দেহের সর্বত্র ভয়ঙ্করভাবে ফুটে উঠে, তীব্র আর্থ-সামাজিক সঙ্কট সৃষ্টি করছে। এক শ্রেণী মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়া বিশাল সম্পদরাজিই আজকের বাংলাদেশের মৌলিক সঙ্কট।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক সময়ের সফল গবেষক, বতমান যুক্তরাজ্যের অলস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এস আর ওসমানী সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার ব্যাকগ্রাউন্ড ওয়ার্ক করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে, বাংলাদেশে স্বাধীনতা উত্তরকালে প্রতি দশকেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। উন্নয়নের গতি সচল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে আয় বৈষম্যও। গত চার দশকে বৈষম্যের এ অনুপাত দ্বিগুণ হয়েছে। আয় বৈষম্য দেখাতে গিয়ে তিনি ‘পালমা অনুপাত’’ ব্যবহার করেছেন। আয় বৈষম্য পরিমাপে ব্যাপকভাবে ব্যবহার হয় ‘জিনি সহগ’। তবে এর দ্বারা আয় বৈষম্যের ব্যাপকতার সঠিক চিত্র তুলে ধরা সম্ভব নয়। তাই পালমা অনুপাত ব্যবহার করা হয়েছে। পালমা অনুপাত-এর ক্ষেত্রে- একটি দেশের উচ্চবিত্ত মানুষের ১০ শতাংশের আয় ও নিম্নবিত্ত ৪০ শতাংশের আয়ের অনুপাত ব্যবহার করা হয়। এ অনুপাত যত বেশি হবে, আয় বৈষম্য তত বাড়বে। তবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে মধ্যবর্তী পর্যায়ের ৫০ শতাংশ মানুষের আয়ের অনুপাত মোটামুটি অপরিবর্তিত থাকে। তাই পালমা অনুপাত নির্ণয়ে তাদের অংশ বিবেচনা করা হয় না। তবে বৈষম্য পরিমাপে বিশ্বব্যাপীই জিনি সহগের ব্যাপক ব্যবহার হয়ে থাকে। আশির দশকে বাংলাদেশে এ হার ছিল দশমিক ৩৭; ২০১০ সালে যা বেড়ে দাঁড়ায় দশমিক ৪৬। অর্থাৎ গিনি কো-ইফিশিয়েন্ট অনুযায়ীও আমাদের আয় বৈষম্য বৃদ্ধি পেয়েছে।

ড. ওসমানী দেখিয়েছেন, আশির দশকে বাংলাদেশে পালমা অনুপাত ছিল ১ দশমিক ৬৬। ২০১০-এ তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ দশমিক ১১। নব্বইয়ের দশকে এ অনুপাত ছিল ২ দশমিক শূন্য ৮ ও দুই হাজার-এর দশকে ২ দশমিক ৫৬। অর্থাৎ প্রতি দশকেই আয় বৈষম্য বেড়েছে। আর চার দশকে তা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। যদিও এ সময়ে অথনৈতিক প্রবৃদ্ধিও বেড়েছে। আশির দশকে গড় প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৩ দশমিক ৭২, নব্বইয়ের দশকে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪ দশমিক ৮, দুই হাজার-এর দশকে ৫ দশমিক ৮২ ও ২০১০ এর দশকে ৬ দশমিক ১৩। চারদিকে তাকিয়েও বলা যায়, বাংলাদেশে প্রকৃতপক্ষে আয় বৈষম্য আরো  বেশি। কারণ উচ্চবিত্তের ১০ শতাংশ মানুষ কখনই তাদের আয়ের সঠিক হিসাব দেয় না। তাদের অনেকেই অবৈধভাবে জমি দখল করে এবং বিদেশে অর্থ পাচার করে। কিন্তু এসব হিসাব কোথাও থাকে না। তারা যে হিসাব দেয়, তা খুবই নগণ্য। তাই সঠিক তথ্য পাওয়া গেলে পালমা অনুপাতে আয় বৈষম্য আরো কয়েকগুণ বেড়ে যাবে।

সম্পদ যত বাড়ছে বিশ্বের অন্যান্য স্থানের মতো বাংলাদেশেও ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান বা দ্বন্দ্ব ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক অগ্রগতি যে কোনো বিচারেই বিস্ময়ের ব্যাপার। কিন্তু যে সব ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- বিত্তবান ও বিত্তহীনের ব্যবধান কমানোর ক্ষেত্রে ব্যর্থতা। প্রতিবছর যে অর্থনৈতিক অগ্রগতি হচ্ছে তার বেশির ভাগ সুফল যাচ্ছে সামান্য কিছু সংখ্যক ভাগ্যবান ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর কাছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ‘পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারে’র (পিপিআরসি) এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের বিত্তবান-বিত্তহীনের ব্যবধান ক্রমশ বাড়ছে এবং বর্তমানে তা মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রতিবছর যে আয় হয় তার ৪৬ দশমিক ২ শতাংশই চলে যায় উপরের দিকে অবস্থানরত ১০ শতাংশ বিত্তবান মানুষের হাতে। আর একেবারে নিম্ন অবস্থানে থাকা ৪০ শতাংশ দরিদ্র মানুষের হাতে যায় মাত্র ১৩ শতাংশ। সবচেয়ে বিত্তবান ১০ শতাংশ মানুষের মাথাপিছু গড় আয় ৪ হাজার ৯৬২ মার্কিন ডলার। সবচেয়ে দরিদ্র ৪০ শতাংশের মাথাপিছু গড় আয় মাত্র ৩৫৯ মার্কিন ডলার। মাঝের ৪০ শতাংশের মাথাপিছু আয় ৮৬৭ মার্কিন ডলার। এই পরিসংখ্যানে আয় বৈষম্যের যে চিত্র ফুটে ওঠে তা লক্ষণীয়। শহর এবং গ্রামের বিত্তবান মানুষের মধ্যেও আয় বৈষম্য দেখা হয়। রাজধানীর ১০ শতাংশ উচ্চবিত্ত মানুষের গড় আয় ১১ হাজার ৭৯১ মার্কিন ডলার। আয় বৈষম্যের এই চিত্র যে কোনোভাবেই উদ্বেগের সৃষ্টি করে।

 

চীন: পরাশক্তির বিবর্তন-৫৭ : ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড

আনু মুহাম্মদ ::

২০১৩ সালের শেষের দিকে চীন সরকারের পক্ষ থেকে এক জোড়া বিশাল নির্মাণ যজ্ঞ এবং তার সাথে বৈশ্বিক যোগাযোগ ও বাণিজ্যের পরিকল্পনার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়। সড়ক ও সমুদ্র পথ দিয়ে দুটো যোগাযোগ নির্মাণ যজ্ঞ হলো – ‘সিল্ক রোড ইকনমিক বেল্ট’ এবং  ‘টুয়েনটি ফার্স্ট সেঞ্চুরি মেরিটাইম সিল্ক রোড’। এই দুটোকে একসাথে বলা হয় ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড।[i] এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকসহ বিভিন্ন অর্থকরী প্রতিষ্ঠান স্থাপন এবং এই অবকাঠামো সংযোগ উদ্যোগ বৈশ্বিক পর্যায়ে চীনের বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং তার সাথে অর্থনৈতিক রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধির পথ নকশা হিসেবে বিবেচনা করা যায়। এর মধ্যে প্রকাশ ঘটেছে চীনের ভেতরে শিল্প উৎপাদন ক্ষমতা এবং পুঁজি বিনিয়োগের উদ্বৃত্ত ক্ষমতার। কারও কারও ভাষায় চীনের রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের আত্মসম্প্রসারণের তাগিদেরই এটা বহি:প্রকাশ।

সড়কপথে চীন থেকে পাকিস্তান, তুরস্ক, রাশিয়া, ফ্রান্স, ইটালি আবার সমুদ্রপথে ইটালী থেকে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ স্পর্শ করে মালাক্কা প্রণালী মালয়েশিয়া হয়ে আবার চীন। সিঙ্গাপুরের   ভূমিকা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকার কারণে ভারতীয় মহাসাগর থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম চীন পর্যন্ত পাকিস্তান বা বাংলাদেশ হয়ে আরেকটি পথও এই পরিকল্পনার মধ্যে আছে। শ্রীলঙ্কাও এই পথে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সমুদ্রপথের বিভিন্ন বিন্দুতে চীন তাই একাধিক গভীর সমুদ্র বন্দরের কাজে আগ্রহী। প্রথম দিকে রাশিয়া পরিকল্পনায় আগ্রহী না হলেও যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে বিবাদের পর তারা আগ্রহী হয়েছে।

সাম্প্রতিক কালে চীন আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থাতেও বড়ধরনের ভূমিকা গ্রহণ শুরু করেছে। ব্রিকস সদস্যদেশগুলো সহ (ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা) ‘নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক’ প্রতিষ্ঠা বিদ্যমান আর্থিক ব্যবস্থার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। এছাড়া ‘এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক’ (এআইআইবি) চীনের প্রায় একক উদ্যোগে এবং পরিচালনায় কাজ শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ঠেকাতে চেষ্টা করলেও ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশ এর সদস্য হয়েছে। এছাড়া সিল্ক রোড ফান্ডসহ আরও বেশি কিছু আর্থিক ব্যবস্থার উদ্যোগ অব্যাহত রেখেছে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবি, ইউরোপীয় সেন্ট্রাল ব্যাংকের মতো সংস্থার একক কর্তৃত্বশালী অবস্থার জন্য পরিষ্কার একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে চীনের এসব উদ্যোগ।

এসব উদ্যোগের সাথে আর্থিক আয়োজন বিশাল। আগের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে এতো ব্যয়বহুল প্রকল্পের ভার বহন করা সম্ভব নয়। কিন্তু চীন এই প্রকল্পগুলো একের পর এক গ্রহণ করে যাচ্ছে। সিল্ক রোডের সাথে যুক্ত বিভিন্ন দেশে চীনের যেসব প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে সেগুলোর মোট ব্যয় প্রায় ৯০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এআইআইবি, নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, সিল্ক রোড তহবিল এবং এই নেটওয়ার্কে বিভিন্ন প্রকল্পের ব্যয়ভার বহনে মূল ভূমিকা চীনের বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের। চীনের কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ‘এসব বৃহৎ পুঁজিঘন প্রকল্পগুলো নেবার কারণ হলো চীনের উদ্বৃত্ত আভ্যন্তরীণ সঞ্চয় দেশের ভেতর কম উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহার না করে, অতি উৎপাদন ক্ষমতার অপচয় না করে, তা আরও উৎপাদনশীল কাজে লাগানো। যেহেতু ব্যাংকিং খাতেই চীনের আভ্যন্তরীণ সঞ্চয়ের কেন্দ্রীভবন ঘটে সেহেতু এই ব্যাংক এই দায়িত্ব নিতে সক্ষম।’ [ii]

সিএনবিসি-র একই রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, ‘এপর্যন্ত চীনের ব্যাংকগুলো থেকে দেশের বাইরে বিভিন্ন প্রকল্পে যে পরিমাণ ঋণ দেয়া হয়েছে তার পরিমাণ ১.২ ট্রিলিয়ন (বা ১২০০ বিলিয়ন) মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে।’ ঋণের পরিমাণ যেরকম অদৃষ্টপূর্ব হারে বাড়ছে তাতে ভবিষ্যতে এই ঋণের পরিশোধ নিয়ে অবশ্য অনেক বিশেষজ্ঞই চিন্তিত!

এটা ঠিকই যে, চীনে পুঁজি পুঞ্জিভবন ঘটছে অনেক দ্রুত হারে এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার কারণে ব্যক্তি পুঁজিপতির পাশাপাশি রাষ্ট্রের হাতেও বিপুল বিনিয়োগযোগ্য পুঁজির সমাবেশ ঘটেছে। এর কারণে পুঁজির চাপ তৈরি হয়েছে অধিকতর মুনাফাযোগ্য বিনিয়োগের। এই বৈশ্বিক সম্প্রসারণের তাগিদ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বিশ্বের বিদ্যমান ভারসাম্যের সাথে চীনকে বোঝাপড়ায় যেতে হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন চীনকে হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে, ভারত নিজের ও মার্কিন তাগিদে চীনের তৎপরতা বিষয়ে সতর্ক। সিল্করোডের বাস্তবায়ন তাই সামনে মসৃণ হবে না। ইতিমধ্যে চীন সাগরে কর্তৃত্ব নিয়ে জাপানসহ কয়েকটি দেশের প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের মুখে পড়েছে চীন। এরমধ্যে চীনের সামরিক বাজেটও বাড়ানো হয়েছে। এনিয়ে উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে।


[i]Erebus Wong, Lau Kin Chi, Sit Tsui and Wen Tiejun: One Belt, One Road: China’s Strategy for a New Global Financial Order. Monthly Review, vol 68, issue 08, January 2017.  https://monthlyreview.org/2017/01/01/one-belt-one-road/

[ii]http://www.cnbc.com/2017/01/26/ancient-silk-road-revival-plans-could-be-the-new-risk-to-chinese-banks.html

ভারত : নোট বাতিলের এতো বিরম্বনা

ধ্রুবজ্যোতি নন্দী ::

মোদি বলেছিলেন ৫০ দিন। কিন্তু ৮ নভেম্বর রাত সাড়ে ৮টায় ৫০০ এবং ১০০০ টাকার নোট বাতিল করা সেই টেলিভিশন বক্তৃতার পর ১০০ দিন কেটে গেছে। সোমবার থেকে সপ্তাহে টাকা তোলার ঊর্ধ্বসীমা নাকি বাড়িয়ে ৫০,০০০ টাকা করা হয়েছে, যদিও বাইরে ‘নো ক্যাশ’ লেখা এটিএম চোখে পড়ছে এখনও সর্বত্র। যেখানে টাকা আছে, সেখানেও আবার শুধুই ২০০০ টাকার নোট! কিন্তু গত মাস তিনেকে ব্যাংক থেকে নিজের টাকা নিজে তুলতে গিয়ে দুর্ভোগ এমনই স্বাভাবিক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যে একে ভবিতব্য বলেই মেনে নিতে শিখেছেন সাধারণ মানুষ।

নোট বাতিলের আগে ভেবেছিলেন?

৮ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণায় বাজারে চালু নোটের ৮৬% রাতারাতি বাতিল করাকে রিজার্ভ ব্যাংকের নিজস্ব এখতিয়ার সরকারের হস্তক্ষেপ বলে শুরু থেকেই যেমন অনেকে তার বিরোধিতা করেছিলেন, তেমনই আবার এই সিদ্ধান্তকে কালো টাকার দাপট কমানোর লক্ষ্যে, দুর্নীতি দূর করার লক্ষ্যে এক জরুরি পদক্ষেপ মনে করে তাকে স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থনও জানিয়েছিলেন অনেকে। কিন্তু তারপর থেকে ব্যাংক আর এটিএমের সামনে লম্বা লাইন দিনের পর দিন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে কতটা অপ্রস্তুত, অপরিকল্পিত এবং অবিবেচক ছিল সেই সরকারি সিদ্ধান্ত। প্রশ্ন উঠেছে, বাতিল নোট বদলে দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত নোট ছাপতে কতটা সময় লাগবে তা জেনেও কি নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন মোদি, না কি না-জেনেই? যন্ত্রের সংশোধন না করে এটিএম থেকে যে নতুন নোট ছাড়া যাবে না, সে কথা কি জানতেন নোটের মাপ পাল্টানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়? হিসেব করে দেখেছিলেন, সমস্ত এটিএমে নতুন নোটের মাপে আনতে কতটা সময় লাগবে? জানতেন নগদের অভাবে কী সংকট তৈরি হতে পারে অর্থনীতিতে? বুঝেছিলেন, মার খাবে চাষী, দক্ষ কারিগর, ছোট ব্যবসায়ী? নগদের অভাবে লোকে খরচ কমানোয় সংকটে পড়বে ক্ষুদ্রতম কারখানা থেকে বিশাল আবাসন, সাবান-শ্যাম্পুর মতো ভোগ্যপণ্য থেকে পর্যটনের মতো শিল্প, কোটি কোটি শ্রমিক যার সঙ্গে যুক্ত। আন্দাজ ছিল, দিনের পর দিন মানুষের দুর্দশা বাড়বে আর নাজেহাল রিজার্ভ ব্যাংক প্রায় প্রতিদিন নতুন সার্কুলার জারি করে নতুন নিয়ম চালু করবে? নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করার আগে প্রধানমন্ত্রী কার সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন এ সব বিষয়ে? রিজার্ভ ব্যাংকের গভর্নর, ভারতীয় কারেন্সি নোটে যাঁর স্বাক্ষর থাকে, তাঁর সঙ্গে? আলোচনা হয়েছিল মন্ত্রিসভায়? অর্থমন্ত্রী নিজে জানতেন তো?

দেশের সরকার এবং সরকারি দলটি শুরুতে ভেবেছিল, কালো টাকা উদ্ধার হচ্ছে দেখলে নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত দেশের মানুষ পছন্দ করবেই। তাই প্রথম কদিন তো এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর পাওয়াই যায়নি। শুধুই বলা হত, নোট বাতিলের মতো সিদ্ধান্ত তো সকলকে জানিয়ে নেওয়া যায় না। একটা বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছিল ক্রমশ যে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ছাড়া এমন সাহসী সিদ্ধান্ত আর কে নিতে পারেন? এবং, গোপনীয়তার স্বার্থে এ সিদ্ধান্ত একাই নিয়েছেন তিনি।

আপত্তি ছিল রাজনের?

কালো টাকা উদ্ধারের গল্প অবশ্য বেশি দিন গ্রহণযোগ্য রাখা গেল না। বরং, যত দিন এগিয়েছে, ফুৎকারে উড়িয়ে দেওয়ার যাবতীয় চেষ্টা অগ্রাহ্য করে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে উঠে এসেছে নোট বাতিলের ফলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ, এমনকী মৃত্যুর একের পর এক খবর। ততদিনে হাওয়ায় হাওয়ায় শোনা যাচ্ছে যে, রিজার্ভ ব্যাংকের প্রাক্তন গভর্নর রঘুরাম রাজন তীব্র আপত্তি জানিয়েছিলেন নোট বাতিলের প্রস্তাবে- আর সেই জন্যেই গভর্নর হিসেবে অসামান্য যোগ্যতার প্রমাণ দেওয়া সত্ত্বেও মেয়াদ ফুরোতেই তাঁকে বিদায় করে এমন একজনকে শীর্ষ পদটিতে বসানো হয়, যিনি কোনওরকম ওজর-আপত্তি ছাড়াই সরকারি সিদ্ধান্তে সিলমোহর দেবেন। ততদিনে সংসদ তোলপাড় হয়েছে অর্থনীতির বৃদ্ধি হার শ্লথ হওয়ার আশঙ্কায়। ভোটের প্রচারে গিয়ে নোট বাতিলের সুফল বোঝাতে গিয়ে মোদি–ভক্তদের যত তাড়া খেতে হয়েছে পাঞ্জাব-উত্তর প্রদেশে, ততই শোনা গিয়েছে, বিস্তর আলাপ-আলোচনা করেই তো  নেওয়া হয়েছিল এই সিদ্ধান্ত।

কিন্তু সেই ভাষ্যেও যে নানা ভাষা, নানা মত। আপনি বিশ্বাস করবেন কাকে? সংসদীয় পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির ডাকে উর্জিত প্যাটেল গিয়ে জানিয়ে এলেন, সরকার ২০১৬-র জানুয়ারি থেকেই নোট বাতিল সম্পর্কে আলোচনা শুরু করেছিল রিজার্ভ  ব্যাংকের  সঙ্গে। রাজ্যসভায় অরুণ জেটলি তাঁর বক্তৃতায় বললেন, অর্থ মন্ত্রনালয় ফেব্রুয়ারি থেকে রিজার্ভ ব্যাংকের সঙ্গে নোট বাতিল নিয়ে কথাবার্তা শুরু করে। সামান্য ক্ষতি? কিন্তু রাজ্যসভায় তাঁর সেই বক্তৃতায় জেটলি তো এ–ও বলেছিলেন যে, গত বছর মে মাসেই রিজার্ভ ব্যাংকের পরিচালন পরিষদে বাতিল নোটের বদলে আসা নতুন নোটের নকশা নিয়ে আলোচনা শুরু হয় এবং তারপর থেকে নোট বাতিল নিয়ে নিয়মিত, প্রয়োজনে সপ্তাহে-সপ্তাহে, আলোচনা হয়েছে রিজার্ভ  ব্যাংকের বোর্ডে। এদিকে, তথ্য জানার অধিকারবলে তোলা এক প্রশ্নের উত্তরে রিজার্ভ ব্যাংক লিখিতভাবে জানিয়েছে, ২০০০ টাকার নতুন নোট চালু করার সিদ্ধান্ত মে মাসে অনুমোদিত হলেও মে, জুলাই বা আগস্ট মাসের বোর্ড মিটিংয়ে ৫০০ টাকা বা ১০০০ টাকার নোট বাতিল নিয়ে কোনও আলোচনাই হয়নি! তার মানে, এমনই কঠোর ছিল গোপনীয়তার শাসন যে যাঁরা মিটিংয়ে বসলেন, তাঁরা জানলেনও না যে নোট বাতিল নিয়ে আলোচনা হয়ে গেল সেই মিটিংয়ে!

দুর্নীতি, কালো টাকা, জাল নোট, সন্ত্রাস-

তবু, না হয় মেনেই নেওয়া গেল বিস্তর আলাপ–আলোচনার পরেই চূড়ান্ত হয়েছিল নোট বাতিলের এই মহা-সিদ্ধান্ত। কোন লক্ষ্যে, কী প্রয়োজনে? ৮ নভেম্বরের সেই ঐতিহাসিক ঘোষণায় মোদি বলেছিলেন, দেশ থেকে দুর্নীতি, কালো টাকা, জাল টাকার প্রকোপ কমানোর জন্য, সীমান্ত পেরিয়ে আসা সন্ত্রাসের মোকাবিলার জন্য। দুর্নীতি কমবে মানে নোট বাতিলের ফলে ঘুষের আদান-প্রদান বন্ধ হয়ে যাবে? জানি না কার সে আশা ছিল, সাধারণ মানুষের অন্তত ছিল না। হয়ত সরকারের ছিল, মোদি–ভক্তদের ছিল। আশা ছিল, বহ্ন্যুৎসব হবে বাতিল নোটের, পুকুরে-নদীতে ভাসবে বাতিল নোটের বান্ডিল, যখন তখন নোটবৃষ্টি হবে আকাশ থেকে। এসব কিছু তো হলই না, উল্টে আজ তামিলনাডুতে, কাল গুজরাটে, পরশু হায়দরাবাদে লোকজন ধরা পড়তে শুরু করল ২০০০ টাকার বিপুল সংখ্যক নোট নিয়ে। দিল্লির আইনজীবী রোহিত ট্যান্ডনের অফিসে হানা দিয়ে ২ কোটি টাকা পাওয়া গেল কড়কড়ে নতুন ২০০০ টাকার নোটে। বাতিল নোটে কত টাকা ফেরত এল, জানতে চাইলে সরকারের মুখে কুলুপ। দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের গল্পের নটে গাছটি তাই সাত তাড়াতাড়ি গেল মুড়িয়ে। কিন্তু সন্ত্রাস মোকাবিলায় সাফল্যের গল্পটা চলল বেশ অনেক দিন। টেলিভিশন খুললেই শুনি বিজেপি নেতারা বলছেন, কাশ্মীর ঠান্ডা হয়ে গেল শুধু নোট বাতিলের সিদ্ধান্তে। হাওয়ালা বন্ধ, অবস্থা এমনই সঙ্গীন যে পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় হাওয়ালা কারবারিকে আত্মহত্যা করতে হয়েছে বহুতলের ছাদ থেকে ঝাঁপ দিয়ে। নতুন বছর পড়তেই সে ঘুড়িও গেল কেটে। তিনটি ঘটনায় ৬ সেনার মৃত্যুর পর ফেব্রুয়ারিতে সেনাপ্রধান বিপিন রাওয়াতকে বলতে হল, যে সব স্থানীয় যুবক সন্ত্রাসবাদীদের প্রতি সহমর্মিতা দেখাচ্ছে, বা সেনাবাহিনীর ফ্লাশিং আউট অপারেশনে বাধা সৃষ্টি করছে, তাদের সন্ত্রাস-সহযোগী বলে মনে করা হবে এবং সেই মতোই ব্যবহার করা হবে তাদের সঙ্গে। বাদ-প্রতিবাদের তুফান উঠছে সেই মন্তব্যের পক্ষে-বিপক্ষে আর তার মধ্যে দিয়ে কাশ্মীরে শান্তি বিরাজের গল্পটা গেছে পুরোপুরি ঘেঁটে। ছিল বাকি জাল নোট, সে–ও তো ইদানীং নিয়মিত ছবি হয়ে খবরের কাগজের শোভা বাড়াতে শুরু করেছে আবার। নোট বাতিলের এত ঝঞ্ঝাট সহ্য করে তবে শ্লথ হয়ে যাওয়া অর্থনীতি ছাড়া পেলামটা কী? মাস তিনেকের মুখে দাঁড়িয়ে এ প্রশ্ন কি খুব অসঙ্গত?

প্রশ্ন তোলা যাবে, কিন্তু মোদিকে অত সহজে মোটেই গোল দেওয়া যাবে না। কারণ, ইতিমধ্যে তিনি গোলপোস্ট মাঠের দক্ষিণ প্রান্ত থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে বসিয়েছেন পশ্চিম প্রান্তে। দুর্নীতি, কালো টাকা, সন্ত্রাস ছেড়ে তিনি বেশ অনেক দিন ধরেই বলতে শুরু করেছেন ক্যাশলেস ইকনমির কথা। নগদহীন, পরে সংশোধন করে বলা শুরু করেছেন কম নগদের ডিজিটাল অর্থনীতি, চালু হলেই কাশীর ঘাটে স্নানের পুণ্য লাভ করবে ভারতীয় অর্থনীতি। শুদ্ধ, অমলিন সেই অর্থনীতিতে লগ্নির জন্য ছুটে আসবে দেশ-বিদেশের বাণিজ্য সংস্থা, কর্মসংস্থানের নতুন নতুন সুযোগ তৈরি হবে প্রতিদিন এবং  দেশের বৃদ্ধি হার হবে এতই চমকপ্রদ যে তারিফ করবে সারা দুনিয়া!

তবুও ফানুস উড়ছে-

ফানুস তবু এখনও উড়ছে। পাঁচ রাজ্যের নির্বাচনী ফল ঘোষণা পর্যন্ত তার উড়ান নির্বিঘ্নই হওয়ার কথা। তারপর কী হয়, সময়ই বলবে। তবে এরই মধ্যে প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদ এবং জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক অরুণ কুমার ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং দ্য ব্ল্যাক ইকনমি অ্যান্ড ব্ল্যাক মানি ইন ইন্ডিয়া’ নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। সেই বইতে হিসেব দিয়েছেন তিনি, প্রাপ্তবয়স্ক ভারতীয়দের মাত্র ২২% ইন্টারনেট ব্যবহার করেন এবং মাত্র ১৭% স্মার্টফোন। ডিজিটাল অর্থনীতিতে ঝাঁপ দেওয়ার জন্যে আমরা যে কতটা তৈরি তা বুঝে নেওয়ার পক্ষে এইটুকুই যথেষ্ট হওয়া উচিত। তাঁর হিসেবে, নগদে মজুত যে কালো টাকা উদ্ধারের চেষ্টা করেছিল সরকার তা দেশে মজুত মোট কালো ধনের মাত্র ১% এবং শুধুমাত্র ২০১৬ সালে দেশে যে কালো ধন তৈরি হয়েছে, তার ৩.৫%। সরকার যদি নগদে ঘুরতে থাকা সমস্ত কালো টাকা বার করে আনতেও পারত, তাহলেও কোনওই প্রভাব পড়ত না দেশের কালো-অর্থনীতির ওপর, যা নানারকম সক্রিয়তায় ক্রমাগত তৈরি করে চলেছে হিসেব-বহির্ভূত টাকা, বা কালো টাকা। যে সব কারণে কালো টাকা তৈরি হয়, সেগুলি বন্ধ করতে না পারলে কালো টাকার দৌরাত্ম্য বন্ধ করা অসম্ভব।

খুব নতুন কিছু বলেননি বরেণ্য চিন্তাবিদ, সামান্য ভাবনা-চিন্তাতেই নাগাল পাওয়া যায়, এমন কথাই শুনিয়েছেন। কিন্তু নোট বাতিলের ‘ঐতিহাসিক’ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এই কথাগুলি প্রধানমন্ত্রীকে বলার কি কেউ ছিল না? নাকি, মোদির জমানায় তলিয়ে ভাবনা-চিন্তার সংস্কৃতিটাই বিসর্জন দিয়েছেন দেশের আর্থিক নীতি নির্ধারকরা? আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল আগেই বলেছে, এখন ভারত সরকারের অর্থনৈতিক উপদেষ্টাও বলছেন, পূর্ব-প্রত্যাশিত ৭.৬ শতাংশের পরিবর্তে চলতি বছরে ভারতীয় অর্থনীতির সম্ভাব্য বৃদ্ধি হার হতে চলেছে ৬.৬%। ২০১৫-১৬ সালে এই বৃদ্ধি হার ছিল ৭.৫৬%। সমস্ত বড় অর্থনীতির মধ্যে সর্বোচ্চ বৃদ্ধি হার বলে তাই নিয়ে উল্লাসও কিছু কম হয়নি। টানা দু-বছর খরার পর গত বছরেই স্বাভাবিক বর্ষা পেয়েছিল সারা দেশ। কৃষি ক্ষেত্রের, গ্রামীণ ক্ষেত্রের উৎপাদন এবং আয় বৃদ্ধি চাহিদা বাড়াবে, গতি আনবে অর্থনীতিতে, এই ছিল সামগ্রিক প্রত্যাশা। সেই প্রত্যাশার মাথা মুড়িয়ে তাকে টেনে নামানোর দায় কে নেবেন? কে দায় নেবেন কর্মহীনতা বাড়তে বাড়তে ৫ শতাংশে পৌঁছে যাওয়ার? কারখানায় তৈরি জিনিসের উৎপাদন-সূচক মাসের পর মাস নামতে থাকার? ব্যাংক-ঋণের চাহিদা তলানিতে ঠেকার? আজ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর কোনও উচ্চারণে তার সামান্যতম হদিশও পেয়েছেন কেউ? বরং সংসদে প্রধানমন্ত্রী সদর্পে বলেছেন, শরীর যখন সুস্থ, তখনই শরীরে কাটা ছেঁড়া করে নিতে হয়। অর্থনীতি চাঙ্গা ছিল, তাই তখনই এই উচিত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

আজব যুক্তি! কিন্তু ‘সুস্থ’ অর্থনীতি যে অপ্রয়োজনীয় কাটা ছেঁড়ায় ‘অসুস্থ’ হয়ে পড়েছে, এ কথা বেশ কিছু দিন ধরে অস্বীকার করে যাওয়ার পর সরকার এখন শুরু করেছে সান্ত্বনার পালা। নোট সরবরাহ প্রায় স্বাভাবিক হয়ে এসেছে, বলছে সরকার, অর্থনীতিও এবার নাকি ফিরবে তার স্বাভাবিক ছন্দে। কিন্তু না, বাস্তবে তেমন কোনও লক্ষণ এখনও স্পষ্ট নয়। সরকারি-বেসরকারি কোনও গবেষণা সংস্থাই তেমন কোনও লক্ষণ এখনও চিহ্নিত করতে পারেনি। মোদি সরকারের আর পাঁচটা প্রতিশ্রুতির মতো এটাও আর একটা প্রতিশ্রুতি মাত্র। পূরণ হলে মোদি বাঁচবেন কিনা জানি না, তবে দেশ বাঁচবে। আর পূরণ না হলে? মোদি তো ডুববেনই, সঙ্গে দেশটাকেও অনেকখানি ডুবিয়ে দিয়ে যাবেন।

(কলকাতার দৈনিক আজকাল থেকে)

সরকারী তথ্যের সাথে মিল নেই আসল বাজারদরের

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন::

খাদ্যের সংকট নয়, খাদ্য কেনার ক্ষমতা লোপ পেলেই দুর্ভিক্ষ ঘটতে পারে। অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন এ উপমহাদেশে সংঘটিত দুটি দুর্ভিক্ষের কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেছেন, সে সময় খাদ্যের সংকট নয়, বন্টন ব্যবস্থার ত্রুটি এবং খাদ্য কেনার ক্ষমতা না থাকায় বিপুলসংখ্যাক মানুষ খাবার না খেতে পেরে মারা গেছেন। বাংলাদেশে বর্তমানে খাদ্যের কোনো সংকট নেই, রয়েছে খাদ্য কেনার সক্ষমতার অভাব। তবে পরিস্থিতি এতটা খারাপ নয় যে, দুভিক্ষ ঘটতে পারে। তারপরও দ্রব্যমূল্য বেড়ে এমন অবস্থায় উপনীত হয়েছে- যেখানে মানুষ তার খাদ্য তালিকা ছোট করতে বাধ্য হচ্ছে। বাড়ি ভাড়া থেকে নিত্য প্রয়োজনীয় ব্যয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে মানুষকে এটি করতে হচ্ছে। নিত্যপণ্য দিন দিন মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। সরকার দ্রব্যমূল্যের লাগাম টেনে ধরতে ব্যর্থ হওয়ায় সবকিছুই যেন সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে।

বিদায়ী ২০১৬ সালে দেশে সার্বিক জীবনযাত্রার ব্যয়ভার বেড়েছে প্রায় সাড়ে ৬ শতাংশ। ব্যয়বৃদ্ধির এই হার আগের বছরের তুলনায় শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে, এ সময়ে পণ্যমূল্য ও সেবা সার্ভিসের মূল্য বেড়েছে ৫ দশমিক ৮১ শতাংশ। পরিবারের মোট ব্যয়ের সঙ্গে তুলনা করে পণ্য বা সেবার ওজনের ভিত্তিতে জীবনযাত্রা ব্যয়ের এই হিসাব নিয়ে মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ভোক্তা স্বার্থ সংরক্ষণে কর্মকান্ড পরিচালনাকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। গত বছর সব ধরনের চাল ও ডালের দাম ছাড়াও গরুর দুধ, মাংস, আদা, রসুন, চিনি, লবণ, দেশি থান কাপড়, শাড়ি, লুঙ্গি, গেঞ্জি, তোয়ালে এবং গামছার দাম বেড়েছে। বছরজুড়েই অনিশ্চয়তা ছিল সেবা সার্ভিসের মধ্যে গ্যাস ও পানি নিয়ে। একদিকে শহরে ৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া বৃদ্ধি পাওয়ায় ভোক্তার আয়ের সিংহভাগ ব্যয় হয়েছে বাসা ভাড়া পরিশোধে। সেই সঙ্গে দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োজনীয় সেবা সার্ভিসের মধ্যে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং যাতায়াতের ব্যয়ও বৃদ্ধি পেয়েছেই।

সরকার প্রদত্ত মূল্যস্ফীতির তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য নেই বাজারের। প্রতিটি পণ্যের দাম বাড়তির দিকে থাকলেও খাদ্য মূল্যস্ফীতি কীভাবে কে ছে বা কমে, তা কারো বোধগম্য নয়। শুধু চালের দামই প্রকারভেদে কেজিপ্রতি ৩-৫ টাকা বেড়েছে। শুধু খাদ্যপণ্যের দাম নয়, ওষুধের দামও বাড়তির দিকে। গণপরিবহনের ভাড়া বেড়েছে, বেড়েছে বাড়ি ভাড়া। গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৪৫০-৪৮০ টাকা কেজি দরে। মাছের দাম বাড়তি, বেড়েছে গরীবের আমিষের উৎস বয়লার মুরগীর দামও। ভোজ্য তেলের দামও কোনো কারণ ছাড়াই বেড়েছে। চিনির বর্ধিত দাম এখনো বহাল রয়েছে। এসবের কোনো উল্লেখ নেই সরকার প্রদত্ত মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যানে।

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির একটি বড় কারণ রাজনৈতিক অর্থনীতি। অসাধু ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতাদের যোগসাজশে একটি কায়েমী স্বার্থান্ধ চক্র গড়ে উঠেছে, যার কারণে সরকারি-বেসরকারি সব উদ্যোগ সত্ত্বেও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। তাত্ত্বিকভাবে রাজনৈতিক অর্থনীতি বলতে আমরা রাজনীতি ও অর্থনীতির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে বুঝে থাকি। অন্য কথায়, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া ছাড়া অর্থনৈতিক দুষ্কর্ম পরিচালিত হতে পারে না। বাংলাদেশে রাজনৈতিক সুবিধাবাদীদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির ন্যক্কারজনক ও ঘৃণ্য অপতৎপরতায় লিপ্ত হতে পারছে। রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া ছাড়া কখনোই আমদানিকারক, ব্যবসায়ী, মধস্বত্বভোগী বা খুচরা বিক্রেতারা কোনো ফন্দি বাস্তবায়ন করতে পারে না।

সাধারণ মানুষ আজ কোনদিকে যাবে তা ভেবে দিশেহারা। বিশেষ করে সীমিত আয়ের মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের তো দৈনন্দিন জীবন রক্ষা করাই দায়; মুটেমজুর, কামার-কুমার, কৃষি ও দিনমজুর তদুপরি ছিন্নমূল মানুষের কথা তো লেখাই বাহুল্য। ভালো নেই কৃষকরাও। বারবার বাম্পার ফলন ফলিয়েও বাজারে গিয়ে প্রতারিত হতে হচ্ছে তাদের। তারা না পাচ্ছেন ধানের দাম, না চালের। না পাট বা অন্যান্য ফসলের- যেমন শাকসবজি, তরিতরকারি। প্রায় সব স্থানেই মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম প্রবল। মিল ও চাতাল মালিকদের খপ্পরে পড়ে কৃষক একদিকে যেমন ধান-চালের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে সাধারণ মানুষকে বাজারে গিয়ে উচ্চমূল্যে কিনতে হচ্ছে খোরাকির চাল। গত কয়েক মাসে মোটা চালসহ সবরকম চালের দাম বেড়েছে। মাঝখানে একবার সরকার সীমিত পরিমাণে চাল রফতানির সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। পরে অভ্যন্তরীণ খাদ্য নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে স্থগিত করে সিদ্ধান্ত। তবে সরকারের এই সিদ্ধান্তসহ বিরূপ আবহাওয়া, ঘন কুয়াশা ও শৈত্যপ্রবাহের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে চালের বাজারে।

শাকসবজি, আটা, ডাল, তেল, মাছ, মাংস, ডিমের দামেও মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব অস্বীকার করা যাবে না। বর্তমানে বাজারে এমনকি আদা-রসুন-পেঁয়াজ ও অন্যান্য মশলার দামও বাড়ছে। বার্ড ফ্লুর প্রকোপে ছোটবড় অনেক খামার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গত কয়েক বছর ধরেই ডিম ও ব্রয়লারের বাজারে পরিলক্ষিত হচ্ছে ব্যাপক অস্থিরতা। গবাদিপশু ও দুধের ক্ষেত্রেও তাই। মাছও দুর্মূল্য-সহজলভ্য না হওয়ায়। ফলে সামাজিক ও পারিবারিকভাবে প্রবল হয়ে দেখা দিচ্ছে প্রোটিন ঘাটতি। চাল ও আটার দাম বাড়ায় এখন শর্করার ঘাটতিও অনিবার্য। ফলে দু‘বেলা দু’মুঠো খেয়ে সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকাই বর্তমানে রীতিমতো দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সীমিত পরিমাণে ন্যায্যমূল্যে চাল ও আটা বিক্রির ব্যবস্থা করেছে। তবে এ সুযোগ পৌঁছায় না সর্বত্র। কেবল রাজধানী ও নগরজীবনেই সীমাবদ্ধ। গ্রামাঞ্চলে ভিজিএফ, কাবিখা, কাবিটাজাতীয় কিছু সামাজিক কর্মসূচি চালু থাকলেও সেসব সর্বত্রগামী-এমন কথা বলা যাবে না; এরও একটা দলীয় বিবেচনা আছে। ফলে গণমানুষের দুর্ভোগ ও দুশ্চিন্তা বাড়ছেই। বর্তমান আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার নিজেদের কৃষি ও কৃষকবান্ধব বলে পরিচয় দেয়। দেশব্যাপী দারিদ্র্য নিরসন কর্মসূচিতেও তাদের কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ আছে। তবে কৃষকদের ধান-চালের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণসহ সাধারণ মানুষের আয় বাড়ানোর ব্যাপারে তেমন উদ্যোগ-আয়োজন চোখে পড়ে না। গত কয়েক বছরে দেশি-বিদেশী বিনিয়োগ প্রায় বন্ধ। ফলে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি তো দূরের কথা, গ্যাস-বিদ্যুতের অভাবে পুরনোগুলোই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফলে অনিবার্য বাড়ছে বেকারত্ব। বাড়ছে মূল্যস্ফীতি। মাঝখানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে টিসিবিকে সক্রিয় করে তোলার কথা শোনা গেলেও আশব্যঞ্জক অগ্রগতি নেই।

বিশ্লেষকদের দাবি, দেশে কোন পণ্যের চাহিদা কী সে হিসাব নেই সরকারের কাছে। নেই আন্তর্জাতিক বাজারের দাম ও সরবরাহ ব্যবস্থার হালনাগাদ তথ্যও। চাহিদা ও জোগানের মধ্যে সমন্বয় রেখে সারা বছর বাজারে পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার জন্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাও সরকার গড়ে তোলেনি। জরাগ্রস্ত সরকারি বিপণন প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরও নখদন্তহীন। পাস হয়নি প্রতিযোগিতা আইন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে পণ্যের চাহিদা ও আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি সম্পর্কে হালনাগাদ তথ্য সরকারের কাছে থাকতে হবে। আগাম ব্যবস্থা নিয়ে নিশ্চিত করতে হবে চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্য। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির পর তৎপরতা দেখালে চলবে না, এজন্য বছরজুড়েই পণ্যের দামের ওপর নজরদারি রাখতে হবে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশে কোন পণ্যের চাহিদা কত, উৎপাদন কত হবে, কী পরিমাণ আমদানি করতে হবে, কোন দেশে কোন পণ্য পাওয়া যাবে, দাম কেমন হবে- এসব বিষয়ে বিশ্বাসযোগ্য কোনো তথ্য নেই সরকারের কোনো সংস্থার কাছে। ব্যবসায়ীরা যে যার মতো আমদানি করছেন। কখনো দরকারের চেয়ে বেশি আমদানি করে লোকসানের মুখে পড়ছেন ব্যবসায়ীরা, আবার কখনো কম আমদানি করে বাজারে সরবরাহের ঘাটতি তৈরি করে পণ্যের দাম বাড়াচ্ছেন। আন্তর্জাতিক বাজারের কথা বলে তারা নিজেরাই নির্ধারণ করে দিচ্ছেন খাদ্যপণ্যের স্থানীয় বাজার দর। আর সেই দরই সরকার মেনে নিচ্ছে। তাই ভোক্তা অধিকার আইন করে, পরিবেশক প্রথা চালু করে, মোবাইল কোর্ট বসিয়েও খুচরা পর্যায়ে দাম ঠিক রাখা যাচ্ছে না। মোটকথা, সরকারের সদ্বিচ্ছার অভাবই হচ্ছে  এর মূল কারন।