Home » অর্থনীতি (page 5)

অর্থনীতি

কারা লাভবান কথিত উন্নয়ন উদ্যোগে?

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন ::

অমর্ত্য সেনের মতো আরো অনেকেই আজকাল উন্নয়নকে কেবল কয়েকটি সূচকের মধ্যে সীমিত না রেখে বরং সক্ষমতা অর্জনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। আবার কেউ কেউ মানুষের কল্যাণকে গৌণ ভেবে কেবল উৎপাদন বৃদ্ধি ও উন্নয়নকে গুরুত্ব দিয়েছেন। অমর্ত্য সেন বলেছেন, ‘উন্নয়ন আসলে মানুষের স্বাধীনতার চৌহদ্দি বাড়ানোর প্রক্রিয়া। মানুষ তার নিজের চাওয়া-পাওয়া কতটা মেটাতে পারছে সে প্রশ্নটি উন্নয়নের সংজ্ঞায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ’। একথা ঠিক যে উন্নয়নের জন্য মানুষের চিন্তা ও কাজের স্বাধীনতা বড় প্রয়োজন। আমরা যদি মেনে নিই যে-সৃষ্টিশীলতার মাধ্যমে উন্নয়নকে এগিয়ে নেয়া সম্ভব। তবে সৃষ্টিশীলতার জন্য মানুষকে চিন্তার স্বাধীনতা দিতে হবে। অনিশ্চয়তা আর হুমকির আড়ালে রাখতে হবে ; নইলে সৃষ্টির প্রেরণা আসবে না। আবার উন্নয়ন সাধনই যথেষ্ট নয়। উন্নয়নের ধারাবাহিক গতি বা টেকসই হতে হবে। টেকসই উন্নয়নের ধারণা এসেছে মানুষকে ভবিষ্যতের জন্যেও চিন্তাহীন রাখতে।

গুডল্যান্ড এবং লিডকের মতে, ‘টেকসই উন্নয়নকে সামাজিক এবং কাঠামোগত অর্থনৈতিক রূপান্তরের ধারা বা উন্নয়ন হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা যায়- যা বর্তমানের সহজলভ্য অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সুবিধাসমূহের সর্বোচ্চ বৃদ্ধি সাধন ঘটায় এবং ভবিষ্যতের জন্য তাকে বিপদাপন্ন করে তোলে না।’ উন্নয়ন বলতে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে অর্থনৈতিক উন্নয়ন। অর্থনীতিবিদরা অর্থনৈতিক উন্নয়ন বলতে বুঝিয়েছেন অর্থনৈতিক স্তরের পরিবর্তন। কোন কোন দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধনের মাধ্যমে দেশটিকে এগিয়ে নেয়া বা সামনের স্তরে, অগ্রসর করা। এর মধ্যে রয়েছে দেশটির জাতীয় আয়, মাথাপিছু আয়, উৎপাদন ক্ষমতা ও জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি। অধ্যাপক রস্টোর মতে, বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি, উৎপাদনের নতুন কলাকৌশল ও যন্ত্রপাতির আবিষ্কার, মানুষের নিরবচ্ছিন্ন উদ্যম, মূলধন গঠন ও সন্তান-সন্তুতি লাভের প্রবণতার মধ্যেই দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল উপাদানগুলো নিহিত হয়েছে।

বাংলাদেশের উন্নয়ন হচ্ছে ঠিকই, তবে সেটি ধনীক শ্রেণীর। গরীবরা গরীব হচ্ছে; উচ্চ প্রবৃদ্ধি হলেও আয়ের সুষম বণ্টন না থাকায় বৈষম্য বাড়ছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রথাগত কয়েকটি সূচক হচ্ছে জাতীয় আয়, মাথাপিছু আয়, মানব উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক কল্যাণ। কোন দেশের জাতীয় আয় বাড়তে থাকলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়েছে বলে ধরে নেয়া হয়। যদিও জাতীয় আয় বৃদ্ধির তুলনায় জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার বেশি হলে মাথাপিছু আয়ও জনগণের জীবনযাত্রার মান কমে যায়। যে কারণে অধ্যাপক মেয়ার মাথাপিছু আয়কে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সূচক হিসাবে গ্রহণ করেছেন। তারমতে, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার অপেক্ষা জাতীয় আয় বৃদ্ধির হার অধিক হলেই তাকে উন্নয়ন বলা যায়। জাতীয় আয়কে দেশের জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে প্রকৃত মাথাপিছু আয় পাওয়া যায়। অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম মাপকাঠি মানব উন্নয়ন সূচক। জাতিসংঘ সদস্য রাষ্ট্রসমূহের মানব উন্নয়ন পর্যালোচনা করে মানব উন্নয়ন রিপোর্ট প্রকাশ করে। মানব উন্নয়ন সূচকে মানুষের শিক্ষা, আয়ুষ্কাল, ক্রয়ক্ষমতা প্রভৃতি বিবেচনা করা হয়। তবে এই সূচকে জাতীয়ভাবে তথ্য নেয়া হয়। কিন্তু ধনী-গরীব বৈষম্য, আঞ্চলিক বা গ্রাম শহরের বৈষম্য আমলে নেয়া হয় না। ফলে এই সূচকে প্রকৃত উন্নয়ন বোঝা যায় না। অনুরূপ কথা প্রযোজ্য অর্থনৈতিক কল্যাণের ক্ষেত্রেও। ভোগবাদী ধারণাকে এখানে গুরুত্ব দেয়া হয়।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ হিসাবে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রায় ১৭ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ১৫ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা। এ হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশের অর্থনীতি বড় হয়েছে ২ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা। এর অর্ধেকের বেশি এসেছে ভোগ ব্যয় থেকে। ৩০ শতাংশের বেশি এসেছে বেসরকারি বিনিয়োগ থেকে। আর মাত্র সাড়ে ৫ শতাংশ এসেছে সরকারি ব্যয় থেকে। যেহেতু বাংলাদেশে রফতানি আমদানির চেয়ে কম, তাই নিট রফতানি হিসেবে বাংলাদেশে বৈদেশিক বাণিজ্য থেকে বর্ধনশীল প্রবৃদ্ধিতে কোনো যোগ হয় না।

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) তাদের সাম্প্রতিক এক হিসাবে দেখাচ্ছে, বাংলাদেশে সরকারি ব্যয় গত এক দশকে কয়েক গুণ বাড়লেও জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে সরকারি ব্যয়ের প্রভাব তেমন একটা বাড়েনি। উল্টো কিছুটা কমেছে। ২০১৬ সালে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ কনসলিডেটিং এক্সপোর্ট-লিড গ্রোথ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এডিবি বলছে, ২০০০-০৯ সময়ে বর্ধনশীল জিডিপির ৫৮ দশমিক ১ শতাংশ এসেছে ভোগ ব্যয় থেকে। বেসরকারি বিনিয়োগ থেকে এসেছে ৩৬ শতাংশ। আর সরকারি ব্যয় থেকে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ। অন্যদিকে ২০১০-১৪ সময়ে বর্ধনশীল জিডিপির ৫৪ দশমিক ২ শতাংশ ভোগ ব্যয় থেকে এসেছে। এ সময়ে বেসরকারি বিনিয়োগ থেকে এসেছে ৪১ দশমিক ৭ শতাংশ ও সরকারি ব্যয় থেকে ৫ দশমিক ১ শতাংশ।

বাজেটে ব্যয়ের একটি হয়ে থাকে, উন্নয়ন খাতে ও অন্যটি অনুন্নয়ন খাতে। সরকারের ব্যয়ের সিংহভাগই চলে যাচ্ছে অনুন্নয়ন খাতে। সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতাসহ আরো বিভিন্ন খাতে এ অনুন্নয়ন ব্যয় প্রতি বছরই বাড়ছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে সরকারের প্রশাসনিক ব্যয় ধরা হয়েছে মোট ব্যয়ের ১৩ দশমিক ৯ শতাংশ। এদিকে, উন্নয়ন খাতে সরকারের ব্যয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে। তবে এ ব্যয়ের মান ও এর সময়োপযোগিতা নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন রয়েছে। ফলে জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে এ ব্যয়ের ভ‚মিকা প্রতিফলিত হচ্ছে না। চলতি অর্থবছর ৩ লাখ ৪০ হাজার ৬০৫ কোটি টাকার বাজেটে উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার ৭০০ কোটি টাকা।

সড়ক, রেল ও নৌপথে প্রতি বছর বিপুল অংকের বিনিয়োগ করছে সরকার। তবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সেবাপ্রাপ্তিতে তা তেমন কোনো প্রভাব রাখতে পারছে না। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের তথ্য বলছে, যোগাযোগ অবকাঠামোর মান বিবেচনায় বাংলাদেশের অবস্থান ১৪০টি দেশের মধ্যে ১১৭তম। এর মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থা সড়ক-মহাসড়কের। একই ধরনের অবস্থা রেল ও নৌ-যোগাযোগের ক্ষেত্রেও। যোগাযোগ অবকাঠামোর মানের দিক দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পেছনের সারিতে অবস্থান বাংলাদেশের।

অবকাঠামো উন্নয়নে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এছাড়া অনেক প্রকল্পই চলমান। তবে পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের অভাবে অবকাঠামোগত দুর্বলতা দূরীকরণে ভূমিকা রাখতে পারছে না এসব প্রকল্প। সড়ক-মহাসড়কের উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণে প্রতি বছর বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে। অথচ সারা দেশে সড়ক ও মহাসড়কের ৪০ শতাংশ ভাঙাচোরা। নকশা, পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ সঠিক না হওয়ার কারণে রাজধানীর সব ফুট ওভারব্রিজ অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে। আবার বিপুল অর্থ ব্যয়ে একাধিক ফ্লাই ওভারব্রিজ তৈরি হলেও তা সব শ্রেণীর মানুষের যাতায়াতের চাহিদা পূরণ করতে পারছে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিনিয়োগের সুফল পেতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, আইনের শাসন, নিয়ন্ত্রণ পরিবেশ, জবাবদিহিতার মতো সূচকে বাংলাদেশ এ অঞ্চলের দেশগুলোর চেয়ে পিছিয়ে। বিশ্বব্যাংকের সুশাসন সূচকে দেখা যায়, সার্কের দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে দুর্নীতি এখনো বড় ধরনের উদ্বেগের বিষয়। আর এ দুর্নীতির সিংহভাগই হচ্ছে সরকারি ক্রয়, রাজস্ব ও শুল্ক আদায়ের ক্ষেত্রে। একই চিত্র দেখা যায় শিল্প ও বাসাবাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগের মতো সরকারি নানা পরিষেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে।

বাংলাদেশের উন্নয়নের মূল সুফলভোগী ধনীরা। ধনীরা দ্রুতগতিতে সম্পদ বাড়াচ্ছে, ফলে আয়-বৈষম্য বেড়েই চলেছে। আর দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠি কোনো রকমে বেঁচে রয়েছে।  ২০১৪-১৫ অর্থবছরে দেশের উচ্চবিত্তদের একটি হিসাব করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সেখানেও দেখা যায়, দেশের মোট সম্পদের বেশির ভাগের মালিক মাত্র দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ মানুষ। তাদের বার্ষিক আয় ৪৪ কোটি ২০ লাখ টাকার উপরে। এসব ব্যক্তির সম্পদ আছে কোটি টাকার বেশি। এদের মধ্যে অনেকেই আবার শত কোটি থেকে সহস্রাধিক কোটি টাকার মালিক। হিসাবটি করা হয়েছে আয়কর জমার বিবরণী থেকে। ধারণা করা যায় এতে ব্যাপক গড়মিল রয়েছে। কেউ সম্পদের প্রকৃত তথ্য প্রকাশ করতে চায় না। দেশের অধিকাংশ সম্পদ ধনী শ্রেণীর হাতে বন্ধি। প্রকৃত অর্থে সম্পদের পরিমাণ আরো বেশি হবে। এরাই দেশের অর্থনীতির মূল সুবিধাভোগী। অবকাঠামো নির্মাণ থেকে শুরু করে ব্যাংক প্রতিষ্ঠাসহ নানা সুবিধা কাজে লাগিয়ে সম্পদ সৃষ্টি করছে ধনী শ্রেণী। কারণ সরকারের সুবিধা ভোগ করার মতো সব ধরনের ক্ষমতা তাদেরই রয়েছে। এটাই তাদের সম্পদ বহুগুণে বাড়িয়ে দিচ্ছে। দুর্নীতি আর লুটপাটের মাধ্যমে একটি শ্রেণী দ্রুত অর্থ-বিত্তের মালিক হচ্ছে। ফলে বাধাগ্রস্ত হয়েছে সম্পদের বন্টন ব্যবস্থা। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সম্পদ লুটে ধনী হয়েছে অনেকে। ফলে সমাজে ব্যাপক আয়বৈষম্য বিরাজ করছে। কিন্তু এ সম্পর্কিত যে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তা বাস্তবের তুলনায় কম। কারণ অতি ধনীরা তথ্য দেয় না। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থেকে উচ্চবিত্তরা ও ধনীরা বেশি লাভবান হচ্ছে।

১৯৭০ সালের পাকিস্তানে ২২টি কোটিপতি পরিবারের কথা বলা হতো, যারা রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় পাকিস্তানের শিল্প-বাণিজ্যে আধিপত্য বিস্তার করেছিল। ওই ২২ পরিবারের মধ্যে দুটো পরিবার ছিল তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের, তারও একটি ছিল অবাঙালি। বৈষম্য থেকে মুক্তি লাভের জন্যই বাংলাদেশীরা অস্ত্র হাতে নিয়েছিল। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৪ বছর পর এসে সে বৈষম্য আরো প্রকট হয়েছে। বাংলাদেশেই ২০১২ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব মোতাবেক ২৩ হাজার ২১২ জন কোটিপতি ছিল। ২০১৬ সালে ওই সংখ্যা ৫০ হাজার অতিক্রম করেছে। এটি সম্পদ লুকানোর পরের তথ্যের ভিত্তিতে অর্থাৎ ব্যাংক থেকে সংগ্রহিত। যারা বিদেশের ব্যাংকে অর্থ রাখছেন এবং বিনিয়োগ করেছেন, তাদের সম্পদের হিসাব বাংলাদেশ ব্যাংক বা এনবিআরের কাছে নেই। এটি হিসাবে নিলে ধনীদের সংখ্যা আরো বাড়বে।

সরকারি হিসাবে প্রতিবছর দারিদ্র্যের হার কমেছে। তারপরও সরকারি হিসেবে ৪ কোটি মানুষ দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাস করছে। প্রকৃতপক্ষে দেশে দরিদ্র জনগণের সংখ্যা বেড়েছে। সরকারি দারিদ্র্যের হার নির্ণয় পদ্ধতিতেই রয়েছে গলদ; যাদের আয় দৈনিক ১ ডলারের নিচে তাদের চরম দরিদ্র হিসেবে ধরা হয় বাংলাদেশে। অথচ এ সময়ে প্রতিটি পণ্যের দাম বেড়েছে। জাতিসংঘ পর্যন্ত এখন ডলারের হিসাবে নয়, মাথাপিছু ক্যালরি গ্রহণকে দারিদ্র পরিমাপের একক হিসেবে বিবেচনা করছে। বলা হচ্ছে, এ হিসাব অনুযায়ী দেশে ৩৬ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করে। কিন্তু এ হিসেবেও প্রকৃত সংখ্যা ৫০ শতাংশেরও বেশি হবে।

উল্লেখ্য, বর্তমান উচ্চ দ্রব্যমূল্যের বাজারে ১ ডলার বা ৭৭ টাকা দিয়ে একজন মানুষ তার দৈনিক চাহিদা মেটাতে পারছে না। যারা এক ডলারের হিসাবে তুষ্ট আছে তারা মিলিয়ে দিতে পারবে না এ হিসাব। ১ ডলার সমান বাংলাদেশী ৭৭ টাকা। বর্তমান উচ্চ দ্রব্যমূল্যের বাজারে একজন ব্যক্তি এ টাকা দিয়ে দু’বেলা খাবারেরই চাহিদা মেটাতে পারেন না। যেখানে ১ কেজি মোটা চালের দাম সর্বনিম্ন ৪০ টাকা। আর খাদ্য ছাড়াও রয়েছে বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদি মৌলিক অধিকারের বিষয়। অপরদিকে, মাথাপিছু আয় বাড়লেও মানুষের প্রকৃত আয় না বেড়ে, বরং কমেছে। মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির তুলনায় জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে অনেক বেশি। গত পাঁচ বছরে মানুষের প্রকৃত আয় কমেছে ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ।

‘চরম দারিদ্র্য’ নিয়ে আন্তর্জাতিক সংজ্ঞা হলো, বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলোর দারিদ্র্য সীমার গড়ের আপেক্ষিক দারিদ্র্যমাত্রা, যা কম; অর্থাৎ দৈনিক আয় ১ দশমিক ২৫ ডলারের উপরে উঠার অর্থ দারিদ্র্যমুক্তি নয়। বরং সেটা হলো আগের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম দারিদ্রের অবস্থায় যাওয়া। যদিও ২০৩০ সালের মধ্যে দৈনিক ১ দশমিক ২৫ ডলার মানদন্ডে বাংলাদেশ ২ দশমিক ৪ শতাংশ দারিদ্র্য কমিয়ে আনতে পারে  তখন তা সরকারের পক্ষ থেকে প্রচার করা হবে বিরাট ঐতিহাসিক অর্জন হিসেবে। কিন্তু সেটা অর্জন করতে সক্ষম হলেও দেশের অর্ধেকের বেশি মানুষের দৈনিক আয় থাকবে ৪ ডলারের কম। কাজেই প্রশ্নগুলো থেকেই যাচ্ছে- কার উন্নয়ন, কিসের উন্নয়ন, কারাই বা লাভবান হচ্ছে কথিত উন্নয়ন উদ্যোগে?

রিজার্ভ লোপাট আর অন্যান্য ঘটনার বিচারহীনতার বছর

এম. জাকির হোসেন খান ::

অর্থ পাচার প্রতিরোধে গঠিত আন্তর্জাতিক সংস্থা এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপ অন মানি লন্ডারিং (এপিজি) গত অক্টোবরে প্রকাশিত ‘অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং অ্যান্ড কাউন্টার টেরোরিস্ট ফিন্যান্সিং মেজারস ইন বাংলাদেশ মিউচুয়াল ইভ্যালুয়েশন রিপোর্ট-২০১৬’ শীর্ষক প্রতিবেদন মতে, ২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত অর্থ পাচার-সংক্রান্ত ৪শ’টি অভিযোগ জমা পড়লেও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) চূড়ান্তভাবে ৪৩টি মামলায় অর্থ পাচারের অভিযোগ নিষ্পত্তি করেছে। এতে ২১৪ জনের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিলেও বিচার শেষে সাজা হয়েছে মাত্র চারজনের, যা প্রাথমিকভাবে প্রাপ্ত মোট অভিযোগের মাত্র ১ শতাংশ। উল্লেখ্য, প্রাথমিকভাবে ১৪০ কোটি ডলার বা ১০ হাজার ৯২০ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে ৭৬টি অভিযোগের বিপরীতে ২৮৪টি এজাহার দায়ের করা হয়। বাংলাদেশও অর্থ পাচার রোধে কমপ্লায়েন্সের মাত্রা মূল্যায়ন, কারিগরি সহায়তা ও প্রশিক্ষণ, গবেষণা, বৈশ্বিক নীতি উন্নয়ন এবং বেসরকারি খাতকে অর্থ পাচার সংক্রান্ত হালনাগাদ তথ্য প্রদানকারী ৪১টি সদস্য দেশের সমন্বয়ে গঠিত এপিজি’র সদস্য । যদিও অর্থ পাচার প্রতিরোধে বাংলাদেশ ২০১২ সালে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে যে আইন করেছে -তা এপিজি’র মতে- তদন্তের দুর্বলতার কারণেই বাংলাদেশে অর্থ পাচার রোধে সাফল্য কম।  যদিও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) মনে করে, এখনো আইনের বিধিমালা চূড়ান্ত না করায় পরিপূর্ণভাবে অর্থ পাচারের ঘটনা তদন্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে, বাস্তবে এটা কতখানি নির্ভরযোগ্য বক্তব্য তা প্রশ্নসাপেক্ষ।

উল্লেখ্য, ওয়াশিংটনভিত্তিক গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটির (জিএফআই) সর্বশেষ হিসাবে, ২০০৪ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে ৫ হাজার ৫৮৮ কোটি ডলার এবং ইউএনডিপির অন্য এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্বাধীনতার পর থেকে চার দশকে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা।

এপিজি’র মতে, বাংলাদেশ সাম্প্রতিক বছরগুলোয় উল্লেখযোগ্য হারে অর্থ পাচারের ঝুঁকির মুখোমুখি হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও ঝুঁকির বিষয়টি ওয়াকিবহাল। এজন্য ন্যাশনাল রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট (এনআরএ) এবং সেক্টরাল (খাতভিত্তিক) রিস্ক অ্যাসেসমেন্টের মাধ্যমে যথাযথ জাতীয় কৌশল নির্ধারণ করে কার্যকরভাবে অপ্রতিরোধ্য অর্থ পাচার নিয়ন্ত্রণের সুযোগ রয়েছে; কিন্তু কেন ও কি কারণে সরকার তা করছেনা, তা বোধগম্য নয়। এ ঝুঁকির মাত্রা আরো বাড়ছে; কারন এ ঝুঁকি এসেসম্যান্টের বাইরেও সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন ও সামগ্রিকভাবে সম্ভাব্য হুমকি মোকাবেলা করছে।

২০০৯ সালের পর থেকে অর্থ পাচারের অভিযোগগুলো অধিকাংশ অন্য দেশের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে চিহ্নিত হয় এবং পরবর্তীতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই গণমাধ্যমে তা প্রকাশিত হওয়ার পরই দুদক তদন্তের উদ্যোগ নেয়।  বিশ্বব্যাপী সন্দেহজনক বা কালো অর্থের পাচার সম্পর্কিত গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই) প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্যে জানা যায় ২০০৩-২০১৪ সময়কালে প্রতি বছর গড় বৃদ্ধির হার হিসাবে (২৮.৮৫%) বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১৮.৪১ বিলিয়ন ডলার বা ১ লাখ ৮৪ হাজার ৪১৩ কোটি টাকা পাচার হয়, যা থেকে সরকার কমপক্ষে প্রায় ৩৫ হাজার ৯০৫ কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব সংগ্রহ করতে পারতো। এর আগে ২০১৪ এর ২০ জুন সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক (এসএনবি) এর ‘‘ব্যাংকস ইন সুইজারল্যান্ড ২০১৩” প্রতিবেদনের বরাতে ২০১২ এর তুলনায় ৬২ শতাংশ বেড়ে সুইস ব্যাংকগুলোয় বাংলাদেশিদের ৩,১৬২.৭২ কোটি টাকা গচ্ছিত থাকার সংবাদ প্রকাশ করে। এনবিআর, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ অন্যান্য বিশ্লেষণে প্রাপ্ত তথ্য মতে, বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা হুন্ডির মাধ্যমে, ১০ থেকে ১৬ হাজার কোটি টাকা ট্রান্সফার প্রাইজিং (কম মূল্যে আমদানি দাম দেখানো) এবং অন্যান্য অবৈধ উপায়ে আরো প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ থেকে পাচার হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মূদ্রানীতি অনুযায়ী ৫ হাজার ডলারের বেশি অথ বিদেশে পাঠানো যায় না। বৈধপথে চিকিৎসা বা শিক্ষা ব্যয়ের জন্য বিদেশে টাকা পাঠাতে গেলেও অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়। আরেকটি চক্র বিদেশ থেকে বৈদেশিক মুদ্রায় প্রবাসীদের রেমিটেন্স সংগ্রহ করে ও  তা বিদেশেই রেখে দিয়ে দেশে টাকায় দায় শোধ করা হয়; তেমনি বিদেশ থেকে আমদানির ক্ষেত্রেও একই পদ্ধতি অনুসরণ করায় প্রায় ৪০ শতাংশ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আসছেনা। আর এ অর্থ কোন না কোন বিদেশি ব্যাংকে জমা হচ্ছে।

২০০৬ এবং ২০০৭ সালে অর্থ পাচার বাড়লেও ২০১১ সাল পর্যন্ত এর পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম থাকলেও এরপর থেকে এর পরিমাণ বাড়তে থাকে। ২০১১ এর তুলনায় ২০১৪ সালে ৫ গুণের বেশি কালো অর্থ বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন দেশে পাচার হয়। আর্থিক বিশেষজ্ঞদের মতে, সুইস ব্যাংকে জমাকৃত অর্থ পাচারকৃত  মোট অর্থের বিশাল অংকের একটি ক্ষুদ্রাংশ হতে পারে। কারণ বেনামে বা অন্য কোন দেশের নাগরিক বা প্রতিষ্ঠানের নামে গচ্ছিত অর্থ, মূল্যবান গহনা ও দূর্লভ সামগ্রীর মূল্য অন্তর্ভুক্ত না করায় প্রাক্কলনের পরিমাণ খুবই কম। আর এসব অর্থের উল্লেখযোগ্য অংশ আর্থিক খাতে জালিয়াতির সাথে জড়িত। আর এর প্রমাণ হলো শেয়ার বাজার, সোনালি ও বেসিক ব্যাংকসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ব এবং বেসরকারি ব্যাংক থেকে নানা সহায়তায় হলমার্ক, বিসমিল্লাহ গ্রুপসহ বিভিন্ন কোম্পানির জালিয়াতি। জালিয়াতির মাধ্যমে ৩০ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনা ঘটলেও শুধু ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠ হওয়ায় অভিযুক্তদের কেউই বিচারের আওতায় আসছেনা বলে অভিযোগ করেছেন, ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞ খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ। ব্যাংকিং খাতে অপ্রতিরোধ্য দুর্নীতি প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী সম্প্রতি উল্লেখ করেছিলেন যে, ‘‘নিজেদের দলীয় লোকের সমর্থনের কারণে সোনালী ও বেসিক ব্যাংকে আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনায় জড়িত সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাচ্ছে না”। উল্লেখ্য, দেশের গোটা ব্যাংকিং খাতের মোট সম্পদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ রাষ্ট্রায়ত্ত ছয়টি ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ করলেও এর বিপরীতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাব অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোর নন-পারফর্মিং লোনের হার ১১ শতাংশ। অথচ উন্নত দেশগুলোর ক্ষেত্রে এ হার কোনোভাবেই ৪ শতাংশের বেশি নয়। এর প্রধান কারণ বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাবানরা হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে তা আত্মসাৎ করে।

আর্থিক খাতে জালিয়াতির এ ধারাবাহিকতায় সবশেষ সংযোজন- বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৮ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার রিজার্ভ চুরির মতো অচিন্তনীয় ঘটনা। বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিলিজেন্স ইউনিট গঠনের পরও অবৈধভাবে কিভাবে দেশের বাইরে অর্থ পাচার হয়েছে বা হচ্ছে তা বোধগম্য নয়। পৃথিবী জুড়ে তুমুলভাবে ঝড় তোলা পানামা পেপারসে’র মাধ্যমে বৈধ-অবৈধ পথে বিদেশে অর্থ পাচারের যে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ বাংলাদেশ সহ পৃথিবীর সকল মানুষের সামনে প্রকাশ পেলো তাতে জানা যায়- কিভাবে স্বল্পোন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর রাজনীতিক এবং ক্ষমতাবানরা অবৈধ পথে উপার্জিত বিত্তবৈভব উন্নত দেশগুলোতে পাচার করছে। উল্লেখ্য, রাজনৈতিক এবং ব্যবসা ক্ষেত্রে ক্ষমতাবান ২০জন বাংলাদেশির বড় ব্যবসায়ী নিজ নামে এবং পরিবারের সদস্যদের নামে ‘‘কর স্বর্গ’’ বলে পরিচিত যেমন জার্সি দ্বীপ এবং বৃটিশ ভার্জিন দ্বীপসমূহে অর্থ পাচার করেছে তার খবর ঢাকার নিউ এইজ পত্রিকায় ২০১৩ সালেই প্রকাশ করা হয়। শুধু তাই নয়- আমেরিকা, দুবাই, ব্যাংকক এবং সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন ব্যাংকে, মালয়েশিয়া এবং ভারতে নাগরিকত্ব গ্রহণ বা ‘সেকেন্ড হোম’ বা কথিত ব্যবসায় বিনিয়োগের নামে কি পরিমাণ অর্থ পাচার করা হয়েছে- তার প্রকৃত হিসাব রাষ্ট্রের নাগরিকদের স্বার্থে জানা জরুরি। ২০১৩ এর  শেষ দিকে বিদেশে পাড়ি জমানোর জন্য সেকেন্ড হোম প্রকল্পে আবেদন করেছিলেন ৬৪৮ জন বিশিষ্ট ব্যাক্তি, যাদের অধিকাংশই সুবিধাভোগী রাজনীতিক, শিল্পপতি, ব্যবসায়ী ও আমলা।

প্রশ্ন হলো দুদক, এনবিআর বা বাংলাদেশ ব্যাংকের চোখ ফাঁকি দিয়ে কিভাবে বিদেশে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হলো? এবিষয়টি এখন বলতে গেলে রেওয়াজে পরিনত হয়েছে যে, বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটের পর অন্য  কোনো কেলেঙ্কারি আগে ঘটা ঘটনায় চাপা পড়ে যায়, আর ধরা পড়লেও নানা প্রভাব খাটিয়ে অর্থ বাজেয়াপ্ত এবং শাস্তির মতো ঝুঁকি এড়িয়ে যায়।

দুই হাজার সালের বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ‘‘অর্থনীতিতে ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে এমন দেশের পর্যায়ে দুর্নীতির মাত্রা যদি বাংলাদেশ কমিয়ে নিয়ে আসতে পারতো, তাহলে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার অতিরিক্ত আরো ২.১৪% বৃদ্ধি পেয়ে  ৬% থেকে ৮.১৪% হতো”। অর্থাৎ মাথাপিছু জাতীয় আয় ২০১০-১১ অর্থ বছরে অর্থাৎ ৫ বছর আগেই ১০৪০ ডলারে পৌছতো।

‘ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্স (এফএটিএফ)’ এর আওতায় ‘এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপ অন মানি লন্ডারিং (এপিজি)’ এগমন্ট গ্রুপের আওতায় বিভিন্ন দেশকে পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করে। অথচ বিভিন্ন সময়ে অর্থ চুরি ও লোপাটের ঘটনা  চেপে রেখে দায়মুক্তির সংস্কৃতির জন্ম দেয়া হয়েছে। অথচ বিভিন্ন তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযুক্তদের সুনির্দিষ্ট করা হলেও তাদের কোনো বিচার এখনও হয়নি। বাংলাদেশ সরকার চাইলে তথ্য বিনিময় এবং পাচারকৃত টাকা ফিরিয়ে আনার দ্রুত এবং সহজ পদ্ধতি নির্ধারণে বিভিন্ন দেশের  সরকার এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সাথে সমঝোতায় পৌছাতে পারে।

জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য ১৬.৪ এর আওতায় রাষ্ট্রসমূহ ঐক্যমতে পৌছেছে যে, ২০৩০ এর মধ্যে তারা সন্দেহজনক বা কালো অর্থের পাচার উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমাতে ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি চুরিকৃত সম্পদ পুনরুদ্ধার এবং ফেরত আনার কাজও শক্তিশালী করবে; একইসাথে সব ধরনের সংগঠিত অপরাধ রোধ করবে। এর পাশাপাশি জাতিসংঘ দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদে সাক্ষর করায় বাংলাদেশ সব ধরনের দুর্নীর্তির মাধ্যমে অর্জিত কালো অর্থের উৎস বন্ধ এবং সুইস ব্যাংক সহ ‘‘কর-স্বর্গ” বলে পরিচিত বিভিন্ন দেশ এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমাকৃত সব অবৈধ অর্থ উদ্ধারে সরকারের দায়বদ্ধতা রয়েছে।

চীন: পরাশক্তির বিবর্তন-৫৪ : বাজারমুখি সংস্কারের পেছনে গোল্ডম্যান ও মরগ্যান

আনু মুহাম্মদ ::

একটি দেশ কয়েক দশকে সমাজতান্ত্রিক নীতিমালা ও কর্মপদ্ধতি, হিসাব পদ্ধতি অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি ও প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পর কী করে বাজার অর্থনীতির সর্বাধুনিক ব্যবস্থাপনা, হিসাব পদ্ধতি ও নীতিমালা আয়ত্ত করে ফেললো তা এক বড় বিস্ময়ের বিষয়ই বটে। শুধু আয়ত্তই নয়, পুরনো এবং প্রভাবশালী পুঁজিবাদী বাজার অর্থনীতির প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে মোকাবেলা করে নিজেদের অর্থনীতি সংস্কার করে পাল্লা দিয়ে দ্রুতগতির প্রবৃদ্ধিও নিশ্চিত করলো।

এই বিষয়ে পুরো তথ্য পাওয়া কঠিন তবে যতটুকু জানা যায় তাতে দেখা যায় প্রথমত, বাজারমুখি সংস্কার সম্পর্কে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেবার পর চীনা পার্টি প্রস্তুতি নিতে সময় নিয়েছে, গবেষণা প্রশিক্ষণে বিস্তারিত কর্মসূচি নিয়েছে, বিশে^র পুঁজিবাদী কেন্দ্র দেশগুলোতে লোক পাঠিয়েছে, সেসব দেশের বিশেষজ্ঞদের নিয়োগ দিয়েছে আর সংস্কার নিয়ে খুব ধীরগতিতে অগ্রসর হয়েছে। চীনের বাজারমুখি এই সংস্কার নিয়ে বিশ্বের পুঁজিবাদী সকল প্রতিষ্ঠান বহুজাতিক কোম্পানি, বহুজাতিক ব্যাংক ছাড়াও বিভিন্ন অর্থকরী ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের আগ্রহ ছিলো অপরিসীম। কেননা এর সাথে তাদের বিশাল বাণিজ্যিক স্বার্থ সম্পর্কিত ছিলো। প্রথম থেকেই তাদের অবিরাম যাতায়াত ছিলো। দুপক্ষের আগ্রহেই তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপিত হয়। দীর্ঘমেয়াদে অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনে স্থপতির কাজ প্রধানত এই পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানগুলোই করেছে। এদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় দুটো প্রতিষ্ঠান পুঁজিবাদী বিশ্বে বহু ভাবে পরিচিত- গোল্ডম্যান স্যাকস ও মরগ্যান স্ট্যানলি। দুটো প্রতিষ্ঠানের সাথেই মার্কিন শীর্ষ পর্যায়ের নীতি নির্ধারকরা বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে জড়িত ছিলেন, আছেন। গোল্ডম্যান স্যাকস এর মধ্যে অগ্রগণ্য। এর সাথে আরেকটি প্রতিষ্ঠানের নামও উচ্চারিত হয়। একদিকে চীনের সাথে কাজ করবার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় অর্থকরী প্রতিষ্ঠানের আগ্রাসী প্রতিযোগিতা, অন্যদিকে চীনের সরকারের তাদের ওপর ভর করে বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় প্রভাবশালী অবস্থান সৃষ্টির আকাঙ্খা এই দুই মিলে দ্রুত পরিবর্তন সংঘটিত হয়েছে।

চীনের সংস্কার নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে দুজন বাজারমুখি গবেষক তাই যা বলেছেন তার মধ্যে সত্যতা আছে। তাঁরা বলেছেন, ‘একুশ শতকের নতুন চীন গোল্ডম্যান স্যাকস ও লিংকলেটারস এন্ড পেইনস এর সৃষ্টি, নতুন চীন সৃষ্টিতে এদের ভূমিকা সাংস্কৃতিক বিপ্লবে চীনের ছোট লাল বই-এর মতোই।’[i]এই পশ্চিমা গবেষকদের গবেষণা থেকেই নীচে চীনের বিভিন্ন কোম্পানি কোন কোন বিনিয়োগ সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সাথে পশ্চিমা পুঁজিবাজারে দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে তার একটি তালিকা দেয়া হলো।

*চিহ্নিত কোম্পানিগুলোর চেয়ারম্যান চীনা কমিউিনিস্ট পার্টির সাংগঠনিক কমিটির সাথে যুক্ত।


 

[i] Carl E. Walter, Fraser J.T. Howie: Red Capitalism, The Fragile Financial Foundation of China’s Extraordinary Rise, Wiley, 2012. p 179.

 

রিজার্ভ লোপাট : তদন্ত রিপোর্ট নিয়ে কেন এতো লুকোচুরি

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন ::

রিজার্ভের চুরি হওয়া অর্থের সিংহভাগ অংশ ফেরত পাওয়ার আশা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে। চুরি হয়ে ফিলিপাইনে চলে যাওয়া ৮ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলারের মধ্যে প্রায় দেড় কোটি ডলার এরই মধ্যে ফেরত পেয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু বাকি প্রায় সাড়ে ৬ কোটি ডলার আদৌ ফেরত পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া ফিলিপাইনের রিজাল ব্যাংক (আরসিবিসি) বিবৃতিতে চুরির ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্ত করার জন্য বাংলাদেশের নিজস্ব তদন্তের ফলাফল প্রকাশ করতেও বলেছে। ফলে অর্থ ফেরত পাওয়া নিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন পদক্ষেপ সঠিক ছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

ফিলিপাইনের রিজাল ব্যাংক (আরসিবিসি)-এর পক্ষে বিবৃতিটি দিয়েছেন তাদের আইনজীবী থিয়া দায়েব। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের অসাবধানতার কারণেই তাদের রিজার্ভের ৮ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার চুরি হয়েছে। এ ঘটনার দায় আরসিবিসি নেবে না। চুরি যাওয়া ওই অর্থ উদ্ধারের জন্য ম্যানিলায় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত জন গোমেজ ‘অন্যায্যভাবে গণমাধ্যমকে ব্যবহার করে’ ফিলিপাইনের সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চাইছেন। থিয়া দায়েব ওই বিবৃতিতে আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের অবহেলার কারণেই তাদের রিজার্ভের অর্থ চুরি গেছে। তাই তারা যেন স্বচ্ছতা দেখায়, আমরা সেই আহবান জানাই। ফিলিপাইনের সরকার বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই ঘটনায় সহায়তার জন্য অনেক কিছু করেছে। তাই বাংলাদেশ ব্যাংককেই খুঁজে বের করে দেখাতে হবে আসলে কারা ওই অর্থ চুরি করেছে। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংককে কোনো অর্থ দেওয়ার পরিকল্পনা আরসিবিসির নেই। বরং চুরির ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্ত করার জন্য বাংলাদেশ নিজস্ব তদন্তের ফলাফল প্রকাশ করুক।

পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, অর্থ চুরির ঘটনার প্রায় দেড় মাস পর তা বিদেশী একটি পত্রিকা সূত্রে জানা যায়; এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংক চুরির তথ্য জানলেও তা গোপন রেখেছিল। প্রকাশ করলে উদ্ধার তৎপরতায় ঘাটতি দেখা দিবে এমন অজুহাতে দেশের সর্বোচ্চ মহলকেও বিষয়টি জানায়নি কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অথচ আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ও অর্থনীতি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চুরির তথ্য জানার সঙ্গে সঙ্গেই তা প্রকাশ করলে অনেকভাবেই চুরির অর্থ স্থানান্তর ঠেকানো যেত। এরপর, চুরির ঘটনা প্রকাশের পর তড়িঘড়ি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরসহ কয়েকটি পদে পরিবর্তন আনা হয়। দুইটি তদন্ত কমিটি গঠন করাসহ মামলা দায়ের করা হয়। কিন্তু অর্থ উদ্ধার প্রক্রিয়া এবং এই কাজে জড়িতদের বিষয় উদঘাটনে এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। তদন্ত কমিটি অন্তবর্তীকালিন একটি প্রতিবেদন অর্থমন্ত্রীর কাছে জমা দিলেও সেটি প্রকাশ করা হয়নি। ওই প্রতিবেদনে কী কারণে অর্থ চুরি, কারা জড়িতসহ অনেক তথ্য রয়েছে।

অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নানও স্বীকার করেছেন, রিজার্ভ চুরির অর্থ উদ্ধারে বাংলাদেশের তৎপরতা ফিলিপাইন থেকেও কম। তিনি বলেন, ‘‘আমরা ফিলিপাইনের মতো অতটা করতে পারছি না। তবে তিন মাসের মধ্যে ফেরত দেবে বলার পর আবার তা নিয়ে অন্য রকম কথা বলছে দেশটি। অনেকে এটা নিয়ে গেম খেলছেন। এটি হয়তো ইচ্ছাকৃত নয়।’’ প্রতিমন্ত্রী আরো বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান। এর নিজস্ব একটা ইমেজ থাকা উচিত। বিশ্বের অন্য সব দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকেরই এটা থাকে। প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালে আমি দেখছি, বাংলাদেশ ব্যাংক যাতে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, সে জন্য আমরা সচেতনভাবেই এটা থেকে দূরে থেকেছি।’’

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বাংলাদেশে এ রকম একটি ঘটনা ঘটেছে, সেটি সম্পর্কে আমরা সবচেয়ে বেশি জেনেছি ফিলিপাইনের সংসদের প্রকাশ্য শুনানির মাধ্যমে। সারা বিশ্বে এ নিয়ে এত কিছু হচ্ছে অথচ আমাদের মন্ত্রিসভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে কি না, তা আমরা জানি না। ফিলিপাইনের সংসদ প্রকাশ্য শুনানি করছে, কিন্তু আমাদের অর্থ মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটি কোথায়? আমাদের সংসদীয় কমিটি এ নিয়ে একটি সভাও তো ডাকল না, কোনো আলোচনাও করল না। এ ধরনের বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটিতে উন্মুক্ত আলোচনা হওয়া উচিত। সেই সঙ্গে পরবর্তী সংসদে এটিকে বিষয়ভিত্তিক আলোচনায় নিয়ে আসা দরকার’’।

এদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের চাঞ্চল্যকর রিজার্ভ চুরির তদন্ত রিপোর্ট নিয়ে চলছে লুকোচুরি। সরকার গঠিত ড. ফরাসউদ্দিন কমিটি অর্থমন্ত্রীর কাছে রিপোর্ট পেশের পর কেটে গেছে কয়েক মাস। কিন্তু এখন পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ প্রতিবেদনটি আলোর মুখ দেখেনি। কমিটি অনেক পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ করলেও তার একটিও বাস্তবায়িত হয়নি। শুধু তাই নয়, এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকও এ রিপোর্ট নিয়ে আছে অন্ধকারে। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকে রিপোর্টটি এখনও পাঠানো হয়নি। এছাড়া তদন্তে কয়েকজন কর্মকর্তার যোগসাজশ ও দায়িত্বে অবহেলার কথা সুনির্দিষ্টভাবে বলা হলেও তাদের বিরুদ্ধে ন্যূনতম কোন আইনী পদক্ষেপও নেয়া হয়নি।  রিজার্ভ চুরি সংক্রান্ত তদন্ত রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা বা ব্যাংক সংস্কারের কোনো দিকনির্দেশনা যায়নি। ফলে সুপারিশ বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরিতে প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতাকারী কর্মকর্তাদের শনাক্ত করার দাবী করেছে অপরাধ তদন্ত সংস্থা সিআইডি। তাদের জিজ্ঞাসাবাদও প্রায় শেষ; এখন গ্রেফতার ও আইনী ব্যবস্থা নেয়ার পালা। বাংলাদেশ ব্যাংকের ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরির ঘটনা তদন্তের শেষ পর্যায়ে এসে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে সিআইডির তদন্ত দল। তারা বলছে, রিজার্ভে চুরির আগে চক্রটি অর্থ সরানোর যে পরিকল্পনা করে তা বাস্তবায়ন করা হয় কয়েক ধাপে। এর পেছনে এমন কিছু লোক জড়িত, যারা বাংলাদেশের অর্থনীতি এবং স্থিতিশীল ব্যাংকিং ব্যবস্থা ধ্বংস করতে অনেকদিন ধরেই তৎপর ছিল। এই চক্রান্তের অংশ হিসেবেই বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভে হাত দেয়া হয়। সিআইডি তদন্তকালে কিছু রাঘব বোয়ালের নামও জানতে পারে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সপক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ সংগ্রহের কাজ চলছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তদন্ত দলের একজন কর্মকর্তা এক দৈনিককে বলেছেন, ‘চুরিতে সহায়তাকারীরা বাংলাদেশ ব্যাংকেই আছে। তাদের শনাক্ত করা হয়েছে। তারা এমনভাবে কাজ করেছে যাতে সাইবার চক্র টাকাটা সরিয়ে নিতে পারে। এটা সরাসরি ক্রাইম। এর সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের জড়িত ‘কালপ্রিট’সহ আন্তর্জাতিক চক্রটির বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে এসেছে।’ ওই কর্মকর্তা আরও জানান, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকে এমন কিছু কর্মকর্তা ছিলেন যারা ব্যাংকিং খাতকে ধ্বংস করার জন্য দীর্ঘদিন থেকে অপতৎপরতা চালিয়ে আসছেন। তাদের বিরুদ্ধেও তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহের কাজ চলছে।’

সিআইডির এই কর্মকর্তা আরও বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতরের চক্রটি নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে অর্থ চুরিতে কিভাবে সহায়তা করেছে এবং কতজন জড়িত তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে। তারা দীর্ঘদিনের কৌশল হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে দুর্বল করে ফেলে। এতে করে তাদের সহযোগী হিসেবে বিদেশী চক্র সহজে অর্থ চুরি করতে পেরেছে।

তদন্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল পর্যায়ের ১২-১৩ জন কর্মকর্তার সরাসরি জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে বলে জানা যাচ্ছে। এদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ছাড়াও দেশের বাইরের বিশেষ করে ফিলিপাইন ও শ্রীলংকার ২৩ নাগরিক এবং চীনের ২৩ জুয়াড়ির জড়িত থাকার তথ্য মিলেছে। তবে জুয়াড়িদের নাম-ঠিকানা এখনও বের করা সম্ভব হয়নি। তবে রিজাল ব্যাংকের কর্মকর্তাসহ ফিলিপাইনের ১৬ ও শ্রীলংকার ৭ জনের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

তদন্তের সর্বশেষ অগ্রগতি প্রসঙ্গে সিআইডির তদন্ত দলের প্রধান অতিরিক্ত ডিআইজি (অর্গানাইজড ক্রাইম) মো. শাহ আলম বলেন, আমাদের এখন কিছু বলার সময় এসেছে। তদন্তে বেশ ভালো অগ্রগতি হয়েছে। দেশী-বিদেশী পুরো চক্রটিকে প্রায় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। কার দায় কতটুকু সেটাও নির্ধারণ করা হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, কোয়ালিটি ইনভেস্টিগেশনের স্বার্থে আমরা কিছু সময় নিচ্ছি। বাংলাদেশ ব্যাংকের টাকা ‘কে’ প্রসেস করেছে; ‘কার’ হিসাবে জমা হয়েছে, ওই হিসাব থেকে অন্য কার হিসেবে গেছে- সব তথ্য আমরা পেয়ে গেছি।

তদন্ত টিমের অপর এক কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়ী কর্মকর্তাদের গ্রেফতারের মতো যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ তাদের হাতে চলে এসেছে। চার্জশিটেও তাদের আসামি করা হবে। এই তালিকায় থাকা প্রায় ৩৫ কর্মকর্তার বিদেশ গমনের ওপরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে ৩৫ জনের পাসপোর্ট জব্দ করা হয়েছে। তাদের বিদেশ গমনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছি। তবে তদন্ত শেষে যারা নির্দোষ হবেন, তাদের পাসপোর্ট ফেরত দেয়া হবে। যারা অপরাধী তাদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘‘এটা এক ধরনের ধূম্রজালের সৃষ্টি হয়েছে। নানা মাধ্যমে দেখেছি ও শুনছি- ফরাসউদ্দিনের রিপোর্টে বলা হয়েছে, রিজার্ভ চুরির ঘটনায় ব্যাংলাদেশ ব্যাংকের ৭ জন কর্মকর্তা জড়িত। সিআইডি বলছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের ৫ কর্মকর্তা জড়িত। দুটো রিপোর্টই প্রকাশ করা উচিত’’।

ভারতে নোট বাতিলের প্রভাব : নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষন

কৌশিক বসু

অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ

ভারত সরকার ৮ নভেম্বর সে দেশের সবচেয়ে বড় দুটি নোট অবিলম্বে বাতিলের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। ভারতীয়রা চলতি বছরের শেষ পর্যন্ত বাতিল হওয়া নোটগুলো বদলিয়ে নিতে পারবে। প্রধানমন্ত্রী ‘নরেন্দ্র মোদি’ নামের একটি স্মার্টফোনের মাধ্যমে সরকার একটি সমীক্ষা প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যাতে দেখা গেছে, ৯০ ভাগ লোক তথাকথিত নোটবাতিলকরণ-নীতি সমর্থন করে।

যথার্থভাবেই এই সমীক্ষার সমালোচনা করা হয়েছে। ওই ঘোষণাটির দুই সপ্তাহ পরও ভারতবাসী আতঙ্ক নিয়ে ব্যাংকগুলোতে ছুটছে; এটিএম ও টেলারগুলো সকালে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই টাকাশূন্য হয়ে পড়ছে। ভারতে সব লেনদেনের প্রায় ৯৮ ভাগ হয়ে থাকে নগদে।

বলা হচ্ছে, দুর্নীতি, সন্ত্রাসী কাজে অর্থায়ন ও মুদ্রাস্ফীতি দমনের জন্য এই পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু তা বাস্তবায়ন করার সময় প্রচলিত নিয়মের দিকে নজর না দিয়ে খুবই বাজে রূপরেখা প্রণয়ন করা হয়েছিল। ফলে তা ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এখন পর্যন্ত যে প্রভাব দেখা গেছে তা মধ্য ও নিম্নমধ্যবিত্ত এবং সেইসাথে গরিবদের জন্য বিপর্যয়কর বলে প্রমাণিত হয়েছে। আরো খারাপ কিছুও হতে পারে।

ভারতে ‘কালো টাকা’ নামে পরিচিত কর ফাঁকি দেওয়া নগদ অর্থ বা অন্যান্য আকারে বিপুল সম্পদ রয়েছে। ২০১০ সালের বিশ্বব্যাংকের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, এটাই সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য, ভারতে ‘শ্যাডো অর্থনীতির’ (অবৈধ অর্থনৈতিক কার্যক্রম) পরিমাণ জিডিপির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ।

আয় স্তরের ওপরের স্তরে থাকা লোকজন সবচেয়ে বেশি ফাঁকি দেয় বলে কালো টাকা বৈষম্য বাড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা সৃষ্টি করে। সরকারও অবকাঠামো নির্মাণ, স্বাস্থ্য পরিচর্যা ও শিক্ষার মতো জনসেবামূলক কাজে ব্যয় করার মতো অর্থ থেকে বঞ্চিত হয়। বিশ্বব্যাংকের ২০১২ সালের হিসাব অনুযায়, ভারতে জিডিপির তুলনায় মাত্র ১১ ভাগ লোক কর দিয়ে থাকে। অথচ ব্রাজিলে তা ১৪ ভাগ, দক্ষিণ আফ্রিকায় ২৬ ভাগ এবং ডেনমার্কে প্রায় ৩৫ ভাগ।

এসব সমস্যা নিরসনে সরকারের ইচ্ছা প্রশংসনীয়। তবে নোট বাতিলকরণের কাজটি খুবই কঠোর হয়ে গেছে। এটা দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাময়িকভাবে হয়তো ফলপ্রসূ হবে, কিন্তু তা হলেও পুরো অর্থনীতিকে আঘাত করবে।

পুরনো নোট বদলাতে গিয়ে অনেক ভারতীয় ব্যাংকের সামনে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে গুঁতাগুতি করেছে। বিশেষ করে গরিবদের মধ্যে বেপরোয়া ভাবটি সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। কারণ তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নেই। তারা নগদ আয় দিয়ে দিন চালায়।

আড়াই লাখ রুপির বেশি বদলাতে চাইলে তাকে কারণ দেখাতে হবে; তা না পারলে তাকে জরিমানা গুণতে হবে। এই শর্তটিই দুর্নীতির নতুন পথের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ এখন ছোট ছোট অংশে বিভক্ত হয়ে অবৈধ কুরিয়ারদের বিভিন্ন দল জমা করছে।

নোট বাতিল করার ফলে তারাই সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যারা টার্গেট ছিল না। জুয়েলারি বা ভূ-সম্পত্তি কেনাবেচার কাজটি মূলত নগদে হয়ে থাকে। এদের অনেকেরই অবৈধ অর্থের মজুত থাকে না। আবার তুলনামূলক গরিব নারীরা তাদের সন্তান কিংবা পারিবারিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য স্বামীর অগোচরে কিছু সঞ্চয় করেন। এসবও থাকে নগদ অর্থে। আবার অনেকে কর কর্মকর্তাদের হয়রানির ভয়ে কিছু টাকা গোপন রাখে।

নতুন নীতির কারণে লোকজনের মধ্যে খরচ করার প্রবণতা কমে গেছে। এর ফলে বেশ কিছু নিত্যপণ্যের দাম কমে গেছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কৃষক ও ক্ষুদ্র উৎপাদনকারীরা। তাদের অনেকে তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে আনতে বাধ্য হবে।

আরো বড় সমস্যা আছে। হঠাৎ করে বৈধ নোট অবৈধ হয়ে পড়ায় ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যেতে বাধ্য হবে। তাছাড়া ভারতীয় রুপির এই হাল দেখে অনেকে আরো শক্তিশালী কোনো মুদ্রায় তাদের সঞ্চয় বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হতে পারে।

সরকারের নোট বাতিল করার সিদ্ধান্তে কিছু অবৈধ টাকা বৈধ হবে। এতে কোনো সন্দেহ নেই। অনেকে জরিমানা দিয়ে তাদের কালো টাকা সাদা করবে। কেউ কেউ অবৈধ টাকা নষ্ট করে ফেলবে, যাতে তাদের ব্যবসার দিকে কর্তৃপক্ষের নজর না পড়ে। তবে সার্বিক উপকার হবে কম ও ক্ষণস্থায়ী।

এর একটি কারণ হলো, ভারতে কালো টাকার বড় অংশ আসলে টাকাই নয়। এগুলো সোনা-রুপা, জমি, বিদেশী ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে জমা পড়ে আছে। আর যারা কর ফাঁকি দিয়ে থাকে, তারা এখন আগের নোট বদলিয়ে নতুনগুলো সংগ্রহ করবে।

বাতিলকরণের যৌক্তিকতা দেখাতে গিয়ে সরকার জাল রুপি দিয়ে সন্ত্রাসে অর্থায়নের কথা বলেছিল। এই যুক্তিও ধোপে টেকে না। ইতোমধ্যেই জাল নোট বাজারে চলে এসেছে। ফলে নোট বাতিলকরণ সন্ত্রাসীদের ধরার কাজে সহায়ক হয়নি। বরং যারা বৈধভাবে এই নোট ব্যবহার করতো, যারা জাল নোট তৈরির সাথে জড়িত নয়, তারাই সমস্যায় পড়েছে।

তাছাড়া সাদা টাকার চেয়ে কালো টাকা বেশি মুদ্রাস্ফীতি তৈরি করার যুক্তিও প্রমাণিত নয়। কালো টাকা হলো স্রেফ এমন অর্থ, যা সরকারের বদলে লোকজনের হাতে রয়েছে। মুদ্রাস্ফীতি তৈরি করে অতিরিক্ত অর্থ সরবরাহ। এখানে সাদা বা কালো টাকা পার্থক্য সৃষ্টি করে সামান্যই।

বাতিলকরণের কাজটি হয়তো সদেচ্ছা প্রণোদিত ছিল। কিন্তু তা ছিল একটা বড় ভুল। সরকারের উচিত সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা। অন্তত ৫০০ রুপির নোট বৈধ ঘোষণা করতে পারে। গরিব মানুষেরা এটাই বেশি ব্যবহার করে।

সরকার সত্যিই যদি কালো টাকার পরিমাণ সীমিত করতে চায়, তবে সবচেয়ে ভালো হয় নগদ অর্থহীন সমাজ তৈরির দিকে ভারতকে নিয়ে যাওয়া। ভারতের প্রাপ্তবয়স্ক প্রায় ৫৩ ভাগ লোকের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আছে। তবে এসবের বেশির ভাগই হয়েছে সরকারের উদ্যোগে। ফলে খুব কম অ্যাকাউন্টই ফলপ্রসূ। অন্যদিকে ভারতে রয়েছে ১০০ কোটির বেশি মোবাইল ফোন। এটাই কার্যকর ব্যাংকিং কার্যক্রমের জন্য ব্যবহৃত হতে পারে, যেটাকে বলা হয় মোবাইল ব্যাংকিং।

সব ভারতীয়কে তাদের বায়োমেট্রিক তথ্যের ভিত্তিতে একটি মাত্র আইডি দেওয়ার উদ্যোগটি একটি যথাযথ পদক্ষেপ। ইতোমধ্যেই ১০০ কোটির বেশি লোক নিবন্ধিত হয়েছে।

দুর্নীতি দমন কেবল নগদ এবং এমনকি ব্যাংকিং মুদ্রার মাধ্যমেও সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন পরিবর্তনশীল প্রতিষ্ঠান, মন-মানসিকতার পরিবর্তন এবং অর্থনীতি ও সামাজিক জীবনের জটিলতাকে স্বীকার করে নেওয়া সতর্কভাবে গৃহীত নীতি। সরকার কর ফাঁকির সাজা বাড়াতে পারে, সেকেলে দুর্নীতিবিরোধী আইন সংশোধন করতে পারে।

ভারতের মতো দেশের জন্য, যেখানে অর্থনীতি মূলধারার অর্থনীতির সাথে একেবারে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে, অবৈধ কার্যক্রমের বিরুদ্ধে একটি ব্যর্থ সরকারি হস্তক্ষেপ বৈধভাবে জীবনযাপনের জন্য প্রাণন্তকর সংগ্রামে নিয়োজিত বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে।

কৌশিক বসু : ভারত সরকারের প্রধান উপদেষ্টা (২০০৯-২০১২) এবং বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ (২০১২-২০১৬)

এশিয়ায় অনিশ্চয়তা আর অস্বস্তি :: চীন-মার্কিন বানিজ্য যুদ্ধ!

ইকোনমিস্ট-এর বিশ্লেষণ ::

অনেক অনেক দিন আগে থেকে আমেরিকান গ্র্যান্ড স্ট্যাটেজি তিনটি স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত : উন্মুক্ত বাণিজ্য এবং তা থেকে সৃষ্ট সমৃদ্ধি; জাপান থেকে অস্ট্রেলিয়া হয়ে সিঙ্গাপুর পর্যন্ত দৃঢ় আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক মিত্রতা; এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিকাশ। আমেরিকার নব-নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এগুলোর কোনোটিকে পরোয়া করেন কি না, তা স্পষ্ট নয়। তার বিজয়ে এশিয়ায় আমেরিকান শক্তি ও মর্যাদায় বিরাট আঘাত বিবেচিত হচ্ছে।

বাণিজ্য দিয়ে শুরু করা যাক। কয়েক বছর ধরেই ওবামা প্রশাসন সবার জন্য সমান সুযোগ-সংবলিত, স্বচ্ছ বাণিজ্য চুক্তি হিসেবে ১২ জাতি ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপকে (টিপিপি) এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। দেশে এটা সহজে গ্রহণযোগ্য হবে না মনে হলেও, ধারণা করা হচ্ছিল রিপাবলিকান প্রাধান্যপূর্ণ কংগ্রেস শেষ পর্যন্ত এটা পাশ করে দেবে। এখন তা হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। আইনপ্রণেতারা জাতীয় মনোভাবের প্রতি স্পর্শকাতর এবং ট্রাম্পের ভোটাররা আর যা-র জন্যই ভোট দিয়ে থাকুক না কেন, অন্তত এশিয়ার সাথে ওই বাণিজ্য চুক্তির জন্য নয়।

সত্যি সত্যিই আমেরিকার বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার চীনের সাথে বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করতে চান ট্রাম্প। এই লক্ষ্যে তিনি চীনা পণ্যের ওপর ৪৫ ভাগ কঠিন কর আরোপের কথা ভাবছেন। এ ধরনের যুদ্ধ শুরু হলে সম্ভবত আমেরিকাই হবে এর বৃহত্তম শিকার। আর তা এশিয়ায় বিস্তৃত উৎপাদন নেটওয়ার্ক দিয়ে ধেয়ে চাকরি শেষ করে দেবে, আত্মবিশ্বাসে আঘাত হানবে।

ট্রাম্পের অর্থনৈতিক উপদেষ্টাদের মধ্যে থাকা একমাত্র অর্থনীতিবিদ (বাকিরা আসলে ব্যবসায়ী) পিটার ন্যাভ্যারোর মতে, আমেরিকার উৎপাদন খাতে ধস সৃষ্টির জন্য দায়ী চীন। বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতাকে তিনি মনে করেন বিশ্বের অর্থনৈতিক সমস্যার মূল কারণ। মূলধারার জনমতে এসব দৃষ্টিভঙ্গি বেশ আলোচিত। তবে যেহেতু ট্রাম্প প্রশাসনে ন্যাভ্যারো বিশেষ গুরুত্ব পাবেন, তাই তার মনোভাবকে এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই।

ট্রাম্প বলেছেন, তিনি প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে আমেরিকাকে সরিয়ে নেবেন, চীনের সাথে বারাক ওবামার করা জলবায়ু সমঝোতা, যেটাকে সাইনো (চীন) -আমেরিকান সম্পর্কের গুটিকতেক উজ্জ্বল বিন্দুর অন্যতম মনে করা হয়, বাতিল করে দেবেন।

বিশ্বের বৃহত্তম ও সবচেয়ে প্রাণবন্ত মহাদেশ হিসেবে এশিয়ার প্রতি আরো বেশি মনোযোগ দিতে বারাক ওবামা ‘এশিয়া ভরকেন্দ্র’ ধারণা বিকশিত করে তুলেছিলেন। এটাও এখন হুমকির মুখে পড়েছে। তার জয়ে এশিয়ায় আমেরিকার মিত্ররা বেশ অস্বস্তিতে পড়বে। বারাক ওবামা চেয়েছিলেন চীনের মাধ্যমে উত্তর কোরিয়াকে সংযত করতে। তা না হলে এই দেশটি দূরপাল্লার পরমাণু বোমাবাহী ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করে ফেলতে পারে। সেক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র আক্রান্ত হতে পারে। হিলারি ক্লিনটন সেটা বুঝতেন। আর তা-ই জয় নিশ্চিত মনে করে তিনি এশিয়া বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি টিমও গঠন করে ফেলেছিলেন।

ট্রাম্প কিন্তু এসব কিছু বোঝেন না। এসব ব্যাপারে কে তাকে পরামর্শ দেবে, সেটাও নিশ্চিত নয়। নির্বাচনী প্রচারকাজের সময় তিনি আমেরিকার নিরাপত্তার আশ্বাসে বসে না থেকে জাপান আর দক্ষিণ কোরিয়াকে নিজ নিজ প্রতিরক্ষা খাত জোরদার করার আহবান জানিয়েছেন। তিনি এমনকি দক্ষিণ কোরিয়াকে পরমাণু অস্ত্র তৈরির পরামর্শ দিয়েছেন।

তার এসব কথার সূত্র ধরে বলা যায়, তিনি এশিয়ার সাথে তেমনভাবে সম্পৃক্ত থাকবেন না। আর সেটাই যদি হয়, তবে তা হবে চীনের জন্য মহাসুযোগ। চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি মনে করে, চীন হলো উদীয়মান শক্তি, আর আমেরিকার অবস্থা ভাটার দিকে।

ট্রাম্পের জয় আসলে আমেরিকার দুর্বলতাই ফুটিয়ে তুলেছে। সামরিক বাহিনীর সাথে সম্পৃক্ত  গ্লোবাল টাইমস লিখেছে, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও পাশ্চাত্য সম্ভবত চীনের চেয়ে অনেক বেশি দুর্ভোগ পোহাবে। আমরা এখন কেবল তাকে অবাধে তার কাজ করার সুযোগ দিয়ে তিনি কত বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারেন, তা দেখার অপেক্ষায় থাকতে পারি।’

মোটা চালের দাম বৃদ্ধি : নির্বিকার সরকার, অসহায় মানুষ

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন ::

চাল নিয়ে চলছে চক্রান্ত; সিন্ডিকেট চাল মজুদ করছে। পরিকল্পিতভাবে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে চালের বাজারে। মিলার, পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ী নিজ অবস্থান থেকে অতিমাত্রায় মুনাফার চেষ্টা করছেন। ফলে এক-দুই মাসের ব্যবধানে মণপ্রতি মোটা চালের দাম বেড়েছে প্রায় পাঁচশ’ টাকা। সরু চালের দাম বেড়েছে তিনশ’ টাকা। এ পরিস্থিতিতে সরকার দুস্থ পরিবারের জন্য ১০ টাকা কেজি দরে চাল বাজারে ছেড়েছে। কিন্তু দুর্নীতির কারণে সরকারের এ কর্মসূচি খুব বেশি সফল হচ্ছে না বলে জানা গেছে।

বর্তমানে ইরি, বোরো এবং আমন মৌসুমের মধ্যবর্তী সময় চলছে। বাজারে ধানের সরবরাহ কম। এই সুযোগ নিচ্ছে চাল ব্যবসায়ীদের অসাধু সিন্ডিকেট। তারা চাল ধরে রাখায় দাম বাড়ছে। এতে সবচেয়ে বেশি বেকায়দায় পড়েছেন দুস্থ মানুষগুলো। ব্যবসায়ীদের কারসাজির কারণে তাদের ২৮ টাকা কেজির মোটা চাল ৪০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। দু’মাস আগে ২৮ টাকা কেজি হিসাবে এক মণ চালের দাম ছিল ১১২০ টাকা। এখন সেই চাল কিনতে হচ্ছে ১৬০০ টাকায়। একইভাবে মানভেদে সরু চালের দাম বেড়েছে কেজিপ্রতি সাত থেকে সাড়ে সাত টাকা। অথচ আড়তে চালের কোনো অভাব নেই। তবুও দাম বাড়ছেই।

দেশে মজুদ খাদ্যশস্যের পরিমাণ ১০ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন। এর মধ্যে ৭ লাখ ২৯ হাজার মেট্রিক টন চাল এবং ২ লাখ ৯১ হাজার মেট্রিক টন গম। পাইকারি ব্যবসায়ীদের মতে, মাত্র ১২ থেকে ১৫ মিল মালিকের কাছে চালের বাজার জিম্মি হয়ে পড়েছে। পর্যাপ্ত মজুদ থাকার পরও তারা চাল নিয়ে কারসাজি করছেন। ইচ্ছেমতো চালের সরবরাহ দিচ্ছেন। তারা মজুদ থেকে বাজারজাত করছেন কম; দাম নিয়ন্ত্রণ করছেন। এর ফলে বাজার স্থির থাকছে না। অজুহাত হিসেবে ব্যবসায়ীরা দোষ চাপাচ্ছেন চলতি মৌসুমে সরকারের অভ্যন্তরীণ ধান-চাল সংগ্রহের নীতিকে। সরকার বেশি দামে বাজার থেকে ধান কিনছে বলে মিল মালিকরা অভিযোগ করছেন। তাদের মতে সরকারের সংগ্রহ মূল্যের কারণে বাজারে ধানের দাম বেশি। মিল মালিকরা বেশি দামে ধান কিনে কম দামে চাল বিক্রি করতে পারবে না।

জানা গেছে, দেশে ১৭ হাজার হাস্কিং মিল আছে। এসব মিল প্রতি ১৫ দিনে সাড়ে ১১ লাখ টন চাল তৈরি করতে পারে। কিন্তু ধানের সরবরাহ না পাওয়ায় শত শত মিল চাল উৎপাদন করতে পারেনি। সরকারের পাশাপাশি চালকল মালিকরা যাতে বাজার থেকে ধান সংগ্রহ করতে পারে সেজন্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছিল। কিন্তু খাদ্য মন্ত্রণালয় তা আমলে নেয়নি। সরকার এককভাবে ৮৫ ভাগ ধান কেনায় বেসরকারি মিল মালিকরা ধানের সংকটে পড়ে। তারা কৃষকের কাছ থেকে বেশি দামে ধান কিনে চাল করেছেন। এ কারণে দাম বেশি পড়ছে বলে মিল মালিকরা দাবি করেন।

বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, দেশে চালের কোনো সংকট নেই। বরং প্রতিবছর ৩০ থেকে ৪০ লাখ টন চালের উদ্বৃত্ত থাকছে। চালের যে চাহিদা আছে তার চেয়ে বেশি উৎপাদন হচ্ছে। তিনি বলেন, চাহিদা ৩ কোটি ২৮ লাখ টন। এ বছর উৎপাদন হয়েছে ৩ কোটি ৮৬ লাখ টন। ফলে বিপুল পরিমাণ চাল উদ্বৃত্ত থাকবে। তিনি স্বীকার করেছেন, দেশীয় কৃষকদের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতেই চাল আমদানির ওপর ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। শুধু এ কথা বলেই ক্ষান্ত হয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী। যারা অবৈধভাবে চালের দাম বাড়াচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না সরকার। কর্তৃপক্ষের নাকের সামনেই দাম বাড়ানো হচ্ছে কিন্তু তারা কিছুই বলছে না।

খবর মিলছে, উত্তরাঞ্চলে ধানপ্রধান কয়েকটি জেলা থেকে দেশে চাল সরবরাহ কমে যাওয়ায় দেশের বিভিন্ন স্থানে আকস্মিকভাবে দাম বেড়ে গেছে। উত্তরাঞ্চলের চালপ্রধান চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নওগাঁ, বগুড়াসহ আশপাশের জেলাগুলোর মিল মালিকরা বলছেন, সরকারের খাদ্য সংগ্রহ বা খাদ্য ক্রয়নীতির প্রভাব পড়েছে চালের বাজারে। খুচরা ও পাইকারি বাজারে চালের দাম বাড়ছে। বিশেষ করে গত এক মাসে অন্য চালের তুলনায় মোটা চালের দাম আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় অসুবিধায় পড়েছেন নিম্ন আয়ের মানুষজন।

বাজারে রোজার ঈদের পর থেকে মোটা চালের দাম কেজিতে ১৫ টাকা থেকে ২০ টাকা করে বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে বাজারে মোটা চাল ও চিকন চালের দামের ব্যবধান বর্তমানে খুবই সামান্য। বাজারে চিকন চালের মধ্যে মিনিকেট চালের ৫০ কেজির বস্তা পাইকারি ২২শ থেকে ২৪শ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। নাজিরশাইল (ভাল) ২৩শ টাকা এবং জিরা নাজির ৫০ কেজির বস্তা ২২শ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। নিম্ন আয়ের মানুষের প্রধান খাবার ভাত। আর দাম কম হওয়ার কারণে তারা মূলত মোটা চালই কিনে থাকেন। কিন্তু মোটা চালের দাম অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়ে এখন প্রায় চিকন চালের কাছাকাছি। মোটা চালের দাম অবিলম্বে সহনীয় মাত্রায় নামিয়ে আনতে সরকারের প্রতি জোর দাবি জানান তারা। চালের দাম বৃদ্ধির ব্যাপারে চাল ব্যবসায়ীদের দাবি, সরকারের কিছু নীতির সুযোগ গ্রহণ করে চাতাল ও মিল মালিকদের স্বেচ্ছাচারিতার কারণে চালের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে করে লাভ কম হওয়ায় তাদের ব্যবসাতেও ক্ষতি হচ্ছে। এবারে মোটা চালের দাম সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। ২২ টাকার চাল ৪০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। কেজিপ্রতি এক টাকাও লাভ হচ্ছে না। যারা মোটা চাল কিনতো তারা, অধিকাংশই চিকন চালের সঙ্গে ব্যবধান কম হওয়ায় বাধ্য হয়ে চিকন চাল কিনছেন। বাজারে চাল কিনতে এসে নিম্নআয়ের মানুষজনকে হাঁসফাঁস করতে দেখা গেছে।

গত রোজার ঈদের পর থেকেই উত্তরবঙ্গসহ সারাদেশে চালের দাম বাড়তে শুরু করে। ২২ টাকা কেজি দরের মোটা চালের দাম বেড়ে ৩৮ থেকে ৪০ টাকায় পৌঁছেছে। সরকারের সংগ্রহ নীতির দুর্বলতার কারণেই মোটা চালের দাম বেড়েছে। এছাড়া কৃষকরাও গত কয়েক বছর ক্ষতির শিকার হয়ে মোটা ধান (স্বর্ণা) চাষ কমিয়ে দিয়েছেন। খবর মিলছে, লাভজনক হওয়ায় সবাই চিকন চালের ধান চাষের দিকে ঝুঁকছেন। এসব কারণে মোটা চালের সঙ্কট দেখা দেওয়ায় ‘অটোমেটিক’ চালের দাম বেড়ে যায়। সরকারের চাহিদা পূরণে প্রতিটি মিল মালিক এক সাথে মাঠে নামার পর ধানের দাম বেড়ে গেল। পরিস্থিতি এমন হয় যে, চালের দাম বাড়ার পরেও ২ থেকে ৩শ টাকা লোকসান দিয়ে সরকারকে চাল দিতে হয়েছিল। আর এর প্রভাব পড়ে সার্বিক চালের বাজারে। চিকন জাতের চালের দাম আরও কমতে পারে। তবে নভেম্বরে আমন ধান বাজারে আসার আগ পর্যন্ত মোটা জাতের ধান কিংবা চালের দাম খুব একটা কমবে না। অনেক দিন ধরেই গরিবের খাদ্য মোটা চালের দাম বাড়ছে। কৃষকরা সরাসরি অসহায় ভুক্তভোগী হলেও মজুদদাররা ঠিকই মুনাফা হাতিয়ে নিচ্ছে।