Home » অর্থনীতি (page 6)

অর্থনীতি

চীন : পরাশক্তির বিবর্তন-৫০ : বিশ্ব অর্থনীতিতে চীনের অবস্থান

আনু মুহাম্মদ ::

বার্ষিক জিডিপির সরল হিসাবে চীন এখন যুক্তরাষ্ট্রের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি, এর পরিমাণ প্রায় ১১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার, মাথাপিছু আয় এই হিসাবে প্রায় ৮ হাজার মার্কিন ডলার। আর যদি অর্থনীতির তুলনামূলক ক্রয়ক্ষমতা দিয়ে বিচার করা যায় তাহলে দেখা যাবে চীন যুক্তরাষ্ট্রকে অতিক্রম করে এখন বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি, এর আকার এই হিসেবে প্রায় ১৮ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার, মাথাপিছু আয় প্রায় ১৩ হাজার মার্কিন ডলার। এগুলো সবই চীনা সরকার ও আইএমএফ-এর  হিসাব। (http://www.tradingeconomics.com/china/gdp)

মোট আয়ে সর্বোচ্চ অবস্থানে থাকলেও মাথাপিছু আয়ে চীন প্রায় ৮০টি দেশের পেছনে, পিপিপি-র হিসেবে ৭২টি দেশের পেছনে। সর্বোচ্চ জনসংখ্যা এর একটি কারণ। বিশ্ব বাণিজ্যে চীন এখন বৃহত্তম। এর পরিমাণ প্রায় ৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। তবে বাজার দখলের জন্য দুর্নীতি, নিম্নমানের পণ্য এবং দাম কমিয়ে বাজার ছেয়ে ফেলার বদনাম চীনের প্রায় সবদেশেই।

বৈদেশিক মুদ্রার মজুদে চীন এখন বৃহত্তম, ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি। বিদেশি বিনিয়োগ অন্ত:প্রবাহেও চীন বৃহত্তম, ৩০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি। বিদেশেও চীনের বিনিয়োগ ক্রমেই বাড়ছে, প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার। বিভিন্ন বিদেশি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান কিনে ফেলার ঘটনাও বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র রাজনৈতিকভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করলে সেদেশের বৃহৎ তেল কোম্পানিসহ বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানি এতোদিনে চীনের মালিকানায় চলে যেতো। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ২ ট্রিলিয়ন ডলার মূল্যের সিকিউরিটি এখন চীনের মালিকানায়। একইসঙ্গে সমমূল্যের ট্রেজারী বন্ডের মালিকও চীন। সেই হিসেবে চীনই এখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান ঋণদাতা। অবশ্য গত এক দশকে চীনের নিজের ঋণের পরিমাণও অনেক বেড়েছে। ২০০৭ সাল থেকে চারগুণ বেড়ে এখন তা ২৮ ট্রিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে, যা তার জিডিপির দ্বিগুণেরও বেশি।

২০১৬ সালের ২০ জুলাই ফরচুন পত্রিকা যে বৈশ্বিক বৃহত্তম ৫০০ কোম্পানির তালিকা প্রকাশ করেছিলো তার মধ্যে সবচাইতে বেশি সংখ্যক কোম্পানি ছিলো যুক্তরাষ্ট্রের, ১৩৪টি। এরপরই ছিলো চীনের অবস্থান ১০৩টি। বার্ষিক আয়ের দিক থেকে একেবারে শীর্ষস্থানে আছে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়ালমার্ট। দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ স্থানে আছে চীনা কোম্পানি। এগুলো হলো যথাক্রমে বিদ্যুৎ কোম্পানি স্টেট গ্রীড এবং তেল কোম্পানি চায়না ন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম ও সিনোপেক। পাশাপাশি বিশ্বের বৃহত্তম দশটি ব্যাংকের তালিকায় প্রথম তিনটিই চীনের। এগুলো হল যথাক্রমে ইন্ডাস্ট্রিয়াল এ্যান্ড কমার্শিয়াল ব্যাংক অব চায়না, চায়না কনস্ট্রাকশন ব্যাংক এবং এগ্রিকালচারাল ব্যাংক অব চায়না। (http://www.forbes.com/sites/antoinegara/2016/05/25/the-worlds-largest-banks-in-2016-china-keeps-top-three-spots-but-jpmorgan-rises/#3e45a0666230)

পুঁজিবাদী  বিশ্ব অর্থনীতিতে বিনিয়োগ, বাণিজ্য ইত্যাদিতে তাই চীনের অবস্থান ও প্রভাব দ্রুত নেতৃস্থানীয় পর্যায়ে যাচ্ছে। ২০০৮ এর বিশ্ব আর্থিক সংকটের পর থেকে চীনা মুদ্রা দ্রুত আন্তর্জাতিক মুদ্রায় পরিণত হচ্ছে। ২০১০ সালে রাশিয়া চীনের সাথে তার দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে চীনা মুদ্রা ব্যবহার শুরু করে। এরপর জাপান, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য এবং কানাডাও একইপথ অনুসরণ করে।  ব্রিকস জোট, জোট থেকে বিশ্বব্যাংকের পর্যায়ের একটি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ চীনের বৈশ্বিক ভূমিকার পথ প্রশস্ত করছে। সম্প্রতি চীনের উদ্যোগে ও কর্তৃত্বে যাত্রা শুরু করেছে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি)। এটি এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের একচ্ছত্র আধিপত্য খর্ব করবে এবং এশীয় অঞ্চলে বিনিয়োগে চীনের প্রভাব বৃদ্ধি করবে।

তবে প্রবৃদ্ধির গতি গত কয়েক বছরে কমেছে। সরকারি হিসাবেই দেখা যাচ্ছে ২০১১ সাল পর্যন্ত এক দশকেরও বেশি সময় শতকরা ১০ ভাগের বেশি প্রবৃদ্ধি হার বজায় ছিলো। ২০১২ থেকে এই হারে নিম্নমুখি প্রবণতা দেখা দেয়। ২০১৫ সালে এই হার দাঁড়ায় ৭.৪। এরপর এই হার আরও কমে এখন ৭ এর নীচে নেমে গেছে। এছাড়া বহু খাতে বিনিয়োগ আটকে গেছে, অচলাবস্থা দেখা দিচ্ছে অতিরিক্ত বিনিয়োগের কারণে।[i]

গত তিন দশকে চীনের সমাজের অভ্যন্তরে পরিবর্তন হয়েছে ব্যাপক। কোটি কোটিপতিদের সংখ্যার দিক থেকে এখন চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম। মধ্যবিত্তের আকারও বেড়েছে। তারফলে আভ্যন্তরীণ বাজারও বেড়েছে অনেক। প্রায় ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের ভোগ্যপণ্যের বাজার এখন চীন। বৈষম্যের বিভিন্ন দিক থেকে চীনের পরিস্থতির অবনতি হচ্ছে দ্রুত। চীনের পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলে বিনিয়োগের বড় অংশ যাবার ফলে আঞ্চলিক বৈষম্যও প্রকট হচ্ছে। সরকারি হিসাবেই দেখা যাচ্ছে শহরে মাথাপিছু বার্ষিক আয় যেখানে বেড়েছে শতকরা ৮.৫ হারে, সেখানে গ্রামে তা বেড়েছে শতকরা ৪.২ হারে। আসলে ধনী ও গরীব বৈষম্য এখন ১৯৪৯ সালে বিপ্লবপূর্ব চীনের বৈষম্য থেকেও বেশি। বেকারত্বের হারও বেড়েছে। প্রায় ১২ কোটি মানুষ এখন গ্রাম থেকে উপকূলীয় এলাকায় কাজের সন্ধান করছেন। ১৯৯৮ থেকে ১০ বছরে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান থেকেই ছাঁটাই হয়েছেন প্রায় ৪ কোটি মানুষ। শহরাঞ্চলে এখন বেকারত্বের হার শতকরা ১০ পার হয়েছে।

বেকারত্ব আর বৈষম্য ছাড়াও চীনের উন্নয়ন ধারায় পরিবেশ দূষণ এখন বড় সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। _________________________________________________________

[i] National Bureau of Statistics of China, February 29, 2016

 

বাংলাদেশ কী আসলেই লোপাট হওয়া অর্থ ফেরত পাবে?

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন ::

বারবার ঘোষণা দিয়েও বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে চুরি যাওয়া অর্থ সংক্রান্ত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ থেকে পিছিয়ে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী। কি আছে এই প্রতিবেদনে? কেন এত লুকোচুরি? ইত্যাদি প্রশ্ন আজ মানুষের মুখে মুখে। রিজার্ভ চুরির ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদনে কি আছে সে বিষয়ে এখনো কেউ নিশ্চিত নন। এমনকি ফিলিপাইন সরকার, ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক, অর্থ আদান-প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান সুইফট কেউই এ বিষয়ে জানেন না। যদি প্রতিবেদনে বাংলাদেশের কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের যোগসাজশের সূত্র পাওয়া যায় তাহলে ফিলিপাইন, ফেডারেল রিজার্ভ বা সুইট তা থেকে সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করবে; তারা বাংলাদেশের অর্থ ফেরত দিতে চাইবে না; এ বিষয়ে গড়িমসি করবে-বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকরা এমনটিই মনে করেন। তবে রিজার্ভ চুরির তদন্ত প্রতিবেদনে যদি ভালো কিছু থাকে অর্থাৎ বাংলাদেশের কেউ জড়িত না থাকে তাহলে সেক্ষেত্রে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করলে তাতে অর্থ ফেরত পাওয়ার বিষয়ে তো কোনো সমস্যা থাকার কথা নয়। তবে সেক্ষেত্রে ফেডারেল রিজার্ভ, সুইফট নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিষয়টা খুবই স্পর্শকাতর। কারণ এ তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা বা না করা উভয়ই বিপজ্জনক। একদিকে মানুষ জানতে চায় মূল বিষয়টা কি ঘটেছে। আর তার অগ্রগতিই বা কতদূর। সেটা জানা গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হয়। অন্যদিকে প্রকাশ করলে সমস্যা হবে। প্রথমত, বাংলাদেশের কেউ এর সঙ্গে জড়িত থাকলে চুরি যাওয়া অর্থ ফেরত পাওয়া কঠিন হবে। আর দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের দোষ না হলে ফেডারেল রিজার্ভ বা সুইফটের দুর্বলতার কারণে ঘটলে তারা বলবে এটা কেন চট করে জনসম্মুখে প্রকাশ করা হলো। এ বিষয়ে তারা খারাপ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে পারে। এছাড়া এ বিষয়ে সিআইডি তদন্ত করছে। তাদের তদন্তেও প্রভাব ফেলতে পারে।

রিজার্ভ চুরি বিষয়ে ১৫ মার্চ সরকারের পক্ষ থেকে গঠন করা হয় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি। যার প্রধান করা হয় সাবেক গভর্নর ড. ফরাসউদ্দিনকে। কমিটির অপর দুই সদস্য হলেন- বুয়েটের কম্পিউটার সাইন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ কায়কোবাদ এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব গকুল চাঁদ দাস। গত ২০ এপ্রিল অর্থমন্ত্রীর কাছে অন্তবর্তীকালীন প্রতিবেদন জমা দেন এই কমিটি। ৩০ মে দেওয়া হয় পুরো প্রতিবেদন। এর পর অর্থমন্ত্রী একাধিকবার তদন্ত প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশের কথা বললেও সেটি আর প্রকাশ করা হয়নি।

উল্লেখ্য, গত ফেব্রুয়ারিতে নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে সরিয়ে নেয় সাইবার অপরাধীরা। এরমধ্যে ২ কোটি ডলার শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংক শুরুতেই আটকে দেয় এবং পরে তা ফেরত দিয়েছে। বাকি ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনের জুপিটার শাখার কয়েকটি হিসাব থেকে চলে যায় ওই দেশটির ক্যাসিনোতে। ফিলিপাইনের বিভিন্ন সংস্থা চুরি যাওয়া অর্থের কিছু অংশ নানাভাবে উদ্ধার করে। উদ্ধার হওয়া সেই অর্থের মধ্য থেকে ১ কোটি ৫২ লাখ ডলার ফেরত পেতে ফিলিপাইনের আদালতে বাংলাদেশের একটি আবেদন বিচারাধীন ছিল। বাংলাদেশের হয়ে আবেদনটি করে ফিলিপাইনের অ্যান্টি মানি লন্ডারিং কাউন্সিল (এএমএলসি) ও ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস।

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে চুরি হওয়া ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার ক্ষতি দেখানো হয়নি। বরং তা বাংলাদেশ ব্যাংকের আয়-ব্যয়ের হিসাবে (ব্যালান্সশিট) ‘প্রটেস্টেড বিল’ হিসেবে দেখানো হয়েছে, যা এক ধরনের শ্রেণীকৃত সম্পদ। এই অর্থ আদায় হওয়া বা না হওয়ার ওপর নির্ভর করে চলতি অর্থবছর শেষে চূড়ান্ত হিসাবে নেওয়া হবে। এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তাদের উৎসাহ বোনাস গত বছরের তুলনায় ১টি কমিয়ে ৪টি করা হয়েছে। তবে এই বোনাস তারা পাবেন পুরনো বেতন কাঠামোর মূল বেতনের হারে। এর ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, চুরি হওয়া রিজার্ভের অর্থ ব্যালান্সশিটে কীভাবে দেখানো হবে বিষয়টি বোঝার জন্য আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) টেকনিক্যাল অ্যাসিট্যান্স মিশনের সঙ্গে গত জুনে বৈঠক করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। টেকনিক্যাল অ্যাসিট্যান্স মিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে চুরি হওয়া অর্থ ‘প্রটেস্টেড বিল’ হিসাবে ব্যালান্সশিটে রাখার জন্য বোর্ড সভায় উপস্থাপন করা হয়। ফলে পর্ষদ এটি অনুমোদন করে।

পর্ষদ সভায় জানানো হয়, গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক (এফআরবি) নিউইয়র্ক শাখায় থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার হ্যাক হয়ে যায়। এর মধ্যে শ্রীলংকা থেকে ২ কোটি ডলার ফেরত পাওয়া গেছে। বাকি ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার এখনো পাওয়া যায়নি। ওই অর্থ এফআরবির নিউইয়র্ক শাখায় আলাদা একটি হিসাব খুলে ইতোমধ্যে প্রটেস্টেড বিল হিসাবে রাখা হয়েছে, যা অন্যান্য সম্পদের শ্রেণিভুক্ত। সার্বিক বিবেচনায় আইএমএফ টেকনিক্যাল কমিটি সুপারিশে বলেছে, চুরি হওয়া অর্থ তাৎক্ষণিক ক্ষতি হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হলে ব্যাংকের ইক্যুয়িটির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে। এটি করা সমীচীন হবে না। কারণ চুরি হওয়া অর্থ উদ্ধারে জোর চেষ্টা চলছে। তাই এখনই ক্ষতি হিসেবে তা দেখানো ঠিক নয়।

আইএমএফের সুপারিশে আরও বলা হয়েছে, রিজার্ভ চুরির মামলার আর কোনো অগ্রগতি না হলে গত ২০১৫-১৬ অর্থবছরের আর্থিক বিবরণীতে আর কোনো হিসাবায়ন না করে প্রটেস্টেড বিল হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা যায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক বিবরণীতে নোট হিসেবে এটি সন্নিবেশন করা যেতে পারে। আগামী অর্থবছর থেকে এর যৌক্তিক হিসাবায়ন করা উচিত হবে।

এদিকে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের উৎসাহ বোনাস ‘ইনসেনটিভ বোনাস’ ৪টি মূল বেতনের সমপরিমাণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই বোনাস তারা পাবেন পুরনো স্কেলের মূল বেতন অনুসারে। এর আগে পরপর দুই অর্থবছর তাদের ৫টি করে উৎসাহ বোনাস দেওয়া হয়েছে। ওই সময়ে তারা যে বেতন কাঠামো ভোগ করতেন তার মূল বেতনের হারেই তা দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের লোপাট হওয়া ৮ কোটি ১০ লাখ ডলারের সবটাই ঢুকে পড়েছে ফিলিপাইনের ক্যাসিনোতে। ফিলিপাইন সিনেটের বিশেষ কমিটির শুনানির পরে একজন ক্যাসিনো ব্যবসায়ী রাষ্ট্রীয় তহবিলে ওই অর্থের দেড় কোটি ডলার ফেরত দিয়েছেন। তবে প্রথমে শুনানিতে তিনি বলেছিলেন, তার হাতে পড়েছে সাড়ে তিন কোটি ডলার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওই ব্যবসায়ী আর বাকি দুই কোটি টাকা ফেরত দেননি। কাজেই হদিসহীন রয়ে গেছে বিশাল অংকের বাংলাদেশী অর্থ। এই অর্থ উদ্ধারে এখন আর ফিলিপাইন তেমন একটা উদ্যোগী নয়, যদিও ফিলিপাইন সরকারের দিক থেকে নানা ইতিবাচক কথা বলা হয়েছিল।

অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির ওই বৈঠকে একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। তাতে বলা হয়, নিউইয়র্কের রিজার্ভ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের বন্ডে বিনিয়োগ, ইমপোর্ট বিল ও দাতা সংস্থার ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা হয়। সোসাইটি ফর ওয়ার্ল্ডওয়াইড ইন্টারব্যাংক ফিন্যান্সিয়াল টেলিকমিউনিকেশনের (সুইফট) মাধ্যমে বিশেষ ব্যবস্থায় এসব পেমেন্ট দেয়া হয়। চুরি যাওয়া অর্থ ফেরত আনতে আগষ্ট মাসের শুরুতে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি প্রতিনিধি দল ম্যানিলা যায়। ফিলিপাইন সরকারের কাছে জমা দেয়া এক ক্যাসিনো মালিকের দেড় কোটি ডলার ফিরিয়ে আনার আইনি প্রক্রিয়া সম্পাদনের জন্যই ম্যানিলা যায় প্রতিনিধি দলটি। ফিলিপাইনের বিচার বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতিনিধি দলটি অর্থের মালিকানা দাবি করে আদালতে একটি হলফনামা জমা দিয়েছে।

এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘রিজার্ভ চুরির ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তাদের গাফিলতির বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে তদন্ত প্রতিবেদন না পাওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক দায়ীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি। তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা জরুরি। প্রতিবেদনটি আমরা কমিটির কাছে দিতে বলেছি। কমিটির সব সদস্য মনে করেন, ৮ কোটি ডলার যেটা গেছে, সেটা তো গেছে। কিন্তু দেশের ভাবমূর্তি বড় বিষয়। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করা জরুরি। কারা দায়ী, সেটা বের করতে পারলে অন্যান্য দেশও এ বিষয়ে সজাগ হতে পারবে। রিজার্ভ থেকে খোয়া যাওয়া অর্থ উদ্ধারের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে’।

গত ফেব্রুয়ারিতে নিউইয়র্কের রিজার্ভ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার সরিয়ে নেয় অপরাধীরা। এর মধ্যে ২ কোটি ডলার যায় শ্রীলংকায়, যা উদ্ধার করা হয়েছে বলে সে সময় জানিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। বাকি ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনের (আরসিবিসি) জুপিটার শাখার চার হিসাবের মাধ্যমে চলে যায় দেশটির ক্যাসিনোয়। এরই মধ্যে চুরি যাওয়া অর্থের মধ্যে ১ কোটি ৮০ লাখ ডলার ফিলিপাইনে জব্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে দেড় কোটি ডলার বিভিন্ন আইনি প্রক্রিয়া শেষে আগষ্ট মাসেই পাওয়া যাবে বলে জানিয়েছিলেন ফিলিপাইনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত জন গোমেজ। কিন্তু সে অর্থও এখনো আসেনি, কবে আসবে বা আসবেনা সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।

কর দেয়না কোটিপতিরা : চাপে স্বল্প আয়ের মানুষ

সরকারি হিসাবেই দেশে সোয়া লাখ কোটিপতি

এম. জাকির হোসেন খান ::

ইতিমধ্যে প্রত্যক্ষ আর পরোক্ষ কর ভারে নিমজ্জিত মধ্যবিত্ত বা স্বল্প মানুষের আয়ের ওপর ব্যাপকমাত্রায় করারোপের কথা জানান দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ১৬ হাজার টাকা মাসিক আয় হলেই তাকে কর দিতে হবে। এ ধরনের উদ্যোগ অসম কর ব্যবস্থা এবং সাংবিধানিক সমতা প্রতিষ্ঠা এবং অনৈতিকভাবে উপার্জনের সুযোগ বন্ধ করার নির্দেশনার বিপরীত। উল্লেখ্য, গত জুন মাসেই ৩ লাখ টাকার বেশি আছে এমন ব্যাংক হিসাবগুলোকে করের আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব মতে, ২০১৫ এর ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে এমন হিসাবের সংখ্যা সংখ্যা ৩১ লাখ ৮০ হাজার যার মধ্যে ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠান দুই’ই আছে। সঞ্চয়ী  হিসাবের সংখ্যা সাড়ে ৭ কোটি, যার অধিকাংশ নিম্নমধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত এবং স্বল্প সংখ্যক উচ্চ মধ্যবিত্ত। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন দাড়ায়, আসলে যারা বৈধ এবং অবৈধভাবে কোটিপতি হয়েছে তারা কি ঠিকমতো কর দেয়? এনবিআর কি তাদেরকে করের আওতায় আনতে পেরেছে বা এমন কোন উদ্যোগ কী আছে?

ব্যাংকে টাকা জমা রাখলে কিংবা চাকরিজীবিদের বেতনের ওপর উৎসে করারোপের মাধ্যমে এনবিআর রাজস্ব আয় বৃদ্ধি করছে। অর্থ বিল ২০১২ অনুযায়ী, ব্যাংকগুলো ট্যাক্সপেয়ার্স আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার (টিআইএন) আছে এমন আমানতকারীদের থেকে ১০ শতাংশহারে উৎসে কর কেটে রাখা হয়। যাদের টিআইএন নেই তাদের মুনাফায় ১৫ শতাংশ উৎসে কর কেটে রাখছে। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, ২০০৮ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশে মোট কোটিপতির সংখ্যা ৪৪ হাজার ৩৬৯ জন হলেও অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত গত ২৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে জানান, গত ৭ বছরে দেশে বাংলাদেশে তফসিলি ব্যাংকে কোটি টাকার হিসাবধারীদের  সংখ্যা ১ লাখ ১৪ হাজার ২৬৫ জন। উল্লেখ্য, ২০১৪ সালে ১ লাখ ৮ হাজার ৯৭৪টি কোটি টাকার ব্যাংক হিসাব ছিলো, ২০১৩ সালে ৯৮ হাজার ৫৯১টি, ২০১২ সালে ৯০ হাজার ৬৫৫টি এবং ২০১১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এই সংখ্যা ছিল ৭৮ হাজার ১৫০টি। কিন্তু ওই সংখ্যার মধ্যে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হিসাবও রয়েছে। এমনও প্রতিষ্ঠান আছে যার হিসাব সংখ্যা একশ’রও বেশি। তাই ব্যাংকের হিসাবে কত টাকা রয়েছে, তার ভিত্তিতে ব্যক্তিগত কোটিপতির সংখ্যা নিরূপণ করা সম্ভব নয়।

২০১৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকগুলোতে ব্যক্তি উদ্যোগে এক কোটি টাকার বেশি পরিমাণ অর্থ জমা রয়েছে, এমন ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা ছিলো ৩৭ হাজার ১৭৭টি এবং মোট জমার পরিমাণ ছিলো এক লাখ ৫৫ হাজার ৮১৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে এক থেকে পাঁচ কোটি টাকার হিসাবের সংখ্যা ৩১ হাজার ৪২টি। পাঁচ থেকে ১০ কোটি টাকার ব্যাংক হিসাব তিন হাজার ৬৮৭টি, ১০ থেকে ১৫ কোটি টাকার হিসাব আছে এক হাজার ৮৯টি। আর ৫০ কোটি টাকার ওপরে ব্যাংক ছিল ২৪৮টি। তবে বেসরকারি হিসাবে কোটিপতির প্রকৃত সংখ্যা আরো কয়েকগুণ বেশি। বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্যানুসারে, জ্ঞাত কিংবা অজ্ঞাত প্রায় আড়াই লাখ কোটিপতি রয়েছে বাংলাদেশে। অথচ ১৯৭৫ সালে কোটি টাকার বেশি অর্থ আছে এমন ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা ছিল মাত্র ৪৭টি।

বাস্তবে কোটিপতিদের উপার্জনের তুলনায় কর দাতার সংখ্যা রীতিমত হতাশাজনক। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য মতে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে আয়কর রিটার্নে ১ কোটি টাকার বেশি আয় দেখিয়েছেন মাত্র ৬ হাজার ১৭৫ জন করদাতা। ২০১৪ অর্থবছরে এ সংখ্যা ছিলো ৫ হাজারের কিছু বেশি, ২০১৩ সালে ৫ হাজার ১৪৫ জন, ২০১২ সালে ৪ হাজার ৮৬৫ জন, ২০১১ করবর্ষে সম্পদ বিবরণী অনুযায়ী চূড়ান্ত হিসাবে দুই কোটি টাকার বেশি সম্পদ আছে এমন করদাতার সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৩০৩ জন। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উত্থাপিত হয়, বাঁকি প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার হিসাব বা সংশ্লিষ্ট কোটিপতিরা কেন এখনো কর আওতার বাইরে? এসব কোটিপতির সম্পর্কে কোনো তথ্য কি এনবিআর এর কাছে নেই? একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে জানা যায়, বাংলাদেশে এখন করদানে সক্ষম মানুষ প্রায় ৯৬ লাখ। ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে মাত্র ৮ লাখ ১৫ হাজার ৮৯৪ জন করদাতা আয়কর রিটার্ন দাখিল করেন। এর বিপরীতে আয়কর জমা পড়ে ১ হাজার ৫৩৭ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। শুধু কোটিপতি নয় প্রজাতন্ত্রের বা সরকারি কাজে নিয়োজিত ১৫ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারীর  মধ্যে প্রায় তিন লাখ কর্মকর্তা বৈধভাবে করযোগ্য অর্থ উপার্জন করলেও আয়কর রিটার্ন দাখিল করেন মাত্র ৬৫ হাজার থেকে ৭৫ হাজার। অর্থাৎ আয়কর রিটার্ন জমা দেন না ৭৫ শতাংশ সরকারি কর্মকর্তা। উল্লেখ্য, দেশে বর্তমানে ব্যক্তি করদাতার সংখ্যা মাত্র ১০ লাখ।

কয়েক দিন আগে হঠাৎ করেই এনবিআর-এর অভিযানের প্রেক্ষিতে ল্যান্ড রোভার, মার্সিডিজ বেঞ্জ, বিএমডব্লিউসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের কোটি কোটি টাকার গাড়ি রাস্তার পাশে আনাচে কানাচে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। কোটি টাকার ওপরে (আমদানি শুল্কসহ) দাম এমন প্রায় ৪৯ হাজার গাড়ি নিবন্ধিত আছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কাছে। এর বাইরেও অনিবন্ধিত অবস্থায় আছে অন্তত ৩০০ গাড়ি। বিআরটিএ’র তথ্য অনুযায়ী, ৪৯ হাজার বিলাসবহুল গাড়ির যে নিবন্ধন আছে তার মধ্যে মার্সিডিজ বেঞ্জই প্রায় ২৫ হাজার। একেকটি মার্সিডিজ বেঞ্জ ও লেক্সাস গাড়ি কিনতে খরচ পড়ে গড়ে চার কোটি টাকা, বিএমডব্লিউ ও ল্যান্ড রোভার কিনতে সাত কোটি টাকা পর্যন্ত খরচ পড়ে। প্রশ্ন হলো- প্রায় ৪৯ হাজার গাড়ির মালিকও যদি কর দেয় তাহলে কোটিপতি করদাতার সংখ্যা মাত্র ৬ হাজারের বেশি হয় কিভাবে? শুধু তাই নয়, রিহ্যাব সূত্র অনুযায়ী, ধানমন্ডি, গুলশান এবং বনানীতে ফ্ল্যাটের মূল্য প্রতি বর্গফুট গড়ে ১৫ থেকে ২২ হাজার টাকা। সে হিসাবে এসব এলাকায় একেকটি মধ্যম মানের ফ্লাটের মূল্য কয়েক কোটি টাকা। কয়েক হাজার প্লাট মালিকের মধ্যে কতজন ঠিকমতো কর দেয়?

কর প্রদানে কোটিপতিদের এ অনীহা নতুন কিছু নয়। এনবিআরের চেয়ারম্যান এর মতে, এটা অপ্রত্যাশিত যে, এত কম সংখ্যক ব্যক্তি কোটি টাকার ওপর সম্পদ দেখিয়েছেন। যতই দিন যাচ্ছে, কোটিপতিদের কাছ থেকে কর আদায় করা ততই কঠিন হয়ে পড়ছে। এ ক্ষেত্রে দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে নিয়ে কোটিপতিদের শনাক্ত করার উদ্যোগ এনবিআরের গ্রহণ করা উচিত। এরপর তাদের যথাযথ আইনের আওতায় আনা উচিত। তা না হলে দেশের রাজস্ব আদায় বাড়বে না। উল্লেখ্য, উন্নত দেশগুলোতে যেখানে কর রাজস্ব এবং জিডিপি অনুপাত ৩৩.৮ শতাংশ থেকে ৩৩.৯ শতাংশ এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে গড়ে এ হার ৮%-১২% হলে ও বাংলাদেশের কর রাজস্ব অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন।

বাংলাদেশে নিম্ন রাজস্ব আয়ের প্রধান কারণ ব্যাপক কর ফাঁকি। গোপন বা অনৈতিক উৎস হতে উপার্জনের অবারিত সুযোগ থাকায় রাজস্ব  আয়ের ঘাটতির পাশাপাশি বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, কালো অর্থনীতির সুযোগ বাড়ছে এবং সর্বোপরি ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য বাড়ছে। কালো টাকা সাদা করার সুযোগ শুধুমাত্র বাংলাদেশের সংবিধানের সুস্পষ্ট লংঘন নয়, করারোপ নীতি এবং কর ন্যায়বিচারের অন্যতম প্রধান অন্তরায়। ১৯৭৫-৭৬ অর্থবছর থেকে বর্তমান পর্যন্ত বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ প্রদান করলেও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য মতে, ২০১২-১৩ অর্থ বছর পর্যন্ত সময়কালে মাত্র ১৩ হাজার ৮০৮ কোটি টাকা সাদা করা হয় এবং সরকারের রাজস্ব আয় হয় মাত্র ১,৪৫৫ কোটি টাকা, যা এনবিআরের ২০১৩-১৪ অর্থ বছরে সংশোধিত সর্বমোট রাজস্ব করের মাত্র ১.১৬ শতাংশ। এ ব্যবস্থা চলমান থাকায় অবৈধ অর্থ উপার্জন প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা পাচ্ছে। আর কর ফাঁকি দিয়ে উপার্জিত অবৈধ অর্থ বিদেশে কর-স্বর্গ বলে পরিচিত দেশসমূহে পাঁচার করে তা আবার দেশে নিয়ে আসলেও এনবিআর বা দুদক এসব অর্থের উৎস খুঁজে বের করতে পারেনি বা চায়নি। উল্টো দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত রুই-কাতলাদের নির্বিচারে সততার সনদ দিয়েছে দুদক। উল্লেখ্য, এনবিআর সুত্রে জানা যায়, করস্বর্গ বলে খ্যাত বারমুডা, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ড, কেমান আইল্যান্ড, মরিশাস, পানামা, মাল্টা, ফিলিপাইনসহ বিভিন্নস্থানে বাংলাদেশীদের অবৈধ অর্থ পাচার হচ্ছে।

ম্যাসাচুসেটস বাজেট এবং পলিসি সেন্টার এর কূর্ট ওয়াইজ এবং নোয়াহ এর মতে, ‘করারোপে’র উল্লম্বন সমতা’র আওতায় নাগরিকের ওপর করারোপের ক্ষেত্রে কর প্রদানের সক্ষমতাকে বিবেচনা করার কথা এবং যার আওতায় নিম্ন আয়ের মানুষের তুলনায় ধনীরা তাদের আয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ প্রদানের কথা’। এ প্রেক্ষিতে কর ব্যবস্থাকে সুষম এবং দারিদ্র-বান্ধব করে তোলার প্রথমে বাংলাদেশ ব্যাংক, দুদক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং এনবিআর এর সমন্বয়ে কোটিপতিদের করের আওতায় আনতে হবে। এর পাশাপাশি জনগণের অংশগ্রহণে দেশের প্রচলিত কর আইন সংশোধন করা; পরোক্ষ কর পর্যায়ক্রমে কমিয়ে প্রত্যক্ষ করের অবদান বৃদ্ধি করে কর নীতিমালা দরিদ্রবান্ধব ও কর কাঠামো অধিকতর প্রগতিশীল করা; অত্যাবশ্যকীয় সেবাখাতকে মূল্য সংযোজন করের আওতামুক্ত রাখা; আয়-বৈষম্য এবং মূল্যস্ফীতি বিবেচনা করে (ব্যক্তি এবং কর্পোরেট দেশীয় ছোট ও মাঝারি শিল্পসহ) আয়স্তর, আয়কর হার নির্ধারণ; ব্যক্তির টিআইএন, জাতীয় পরিচয় পত্র, পাসপোর্টের নম্বর এবং কর প্রদান সংক্রান্ত তথ্য একটি সমন্বিত ডাটাবেজের মাধ্যমে সংরক্ষণ ও পরিবীক্ষণের ব্যবস্থা করা; একটি ন্যুনতম সীমার উর্দ্ধে সকল লেনদেন ব্যাংকের মাধ্যমে করার ক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতা প্রদান করা; সকল বৈধ টিআইএনধারীর নাম জনসমক্ষে প্রকাশ করা; এবং সর্বেপারি সকল ক্ষেত্রে পূর্ণ অটোমেশন এবং কার্যকর ই-গভর্নেন্স নিশ্চিত করা; কর ন্যায়পালের পদ পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থ বাজেয়াপ্ত করতে এনবিআরকে আইনী ক্ষমতা দেয়া জরুরি।

খেলাপি ঋণ : তিন মাসের ব্যবধানেই ৪ হাজার কোটি টাকা

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন ::

খেলাপি ঋণের লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না। অব্যবস্থাপনা ও  ঋণের কারণে প্রতি মাসেই অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে চলেছে খেলাপি ঋণের বিশাল অংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ বেড়েছে। ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এ পরিস্থিতি ব্যাংকিং খাতের জন্য অশনিসংকেত। এতে ব্যাংকিং শৃংখলা আরও ভেঙে পড়তে পারে। তারা আরও বলছেন, কিছু ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষই দুর্নীতি এবং অনিয়মের সাথে যুক্ত। এদের যোগসাজশে ঋণ দেয়া হয়। যার কারণে ঋণ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে খেলাপিতে রূপ নিচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ব্যাংক খাতে জুন পর্যন্ত ঋণের স্থিতি ৬ লাখ ৩০ হাজার ১৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়েছে ৬৩ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা; যা মোট ঋণ বিতরণের ১০ দশমিক ০৬ শতাংশ। গত মার্চ প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ ছিল ৫৯ হাজার ৪১১ কোটি টাকা। সে হিসাবে তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতেই। জুন প্রান্তিকে সোনালী, অগ্রণী, জনতা, রূপালী, বিডিবিএল ও বেসিক ব্যাংকে ঋণ খেলাপি হয়েছে ৩০ হাজার ৭৭ কোটি টাকা। যা বিতরণ করা ঋণের ২৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ।

খেলাপি ঋণ স্বাভাবিকভাবে সামান্য কিছুমাত্রায় বিশ্বের সর্বত্র দেখা যায়। কারণ ব্যাংকিং একটি ব্যবসা। অন্য যে কোনো ব্যবসার মতো ব্যাংকিং ব্যবসাতেও সামান্য ক্ষতি হতে পারে। উন্নত বিশ্বের হিসাব মতে একটি ব্যাংকে শতকরা ১ ভাগ শ্রেণীবিন্যাসিত ঋণ হতে পারে। এর পরিমাণ কখনও বেড়ে গিয়ে ২ শতাংশ হলে ব্যাংক সতর্কতা অবলম্বন করে। উল্লেখ্য, ব্যাংক ঋণের ওপরে যে মুনাফা ধার্য করে, তারই একটি অংশ শ্রেণীবিন্যাসিত ঋণের ক্ষতি পোষাতে ব্যয় হয়ে যায়। এ পরিপ্রেক্ষিতে বাংলদেশের ব্যাংকিং অঙ্গনে খেলাপি ঋণের অংক রীতিমতো ভয়াবহ। সব ব্যাংক মিলে ঋণ শ্রেণীবিন্যাসিত করেছে ৬০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। উপরন্তু, আরও ৪০ হাজার কোটি টাকার অধিক শ্রেণীবিন্যাসিত ঋণ ব্যাংকগুলো অবলোপন করেছে; অর্থাৎ প্রদর্শিত হিসাব থেকে সরিয়ে দিয়েছে। এ দুটি হিসাব যোগ করলে বর্তমানে ১ লাখ কোটি টাকা শ্রেণীবিন্যাসিত হয়েছে। এর সোজাসাপ্টা অর্থ দাঁড়ায়, ব্যাংকগুলো জনগণের গচ্ছিত আমানত থেকে ১ লাখ কোটি টাকা নষ্ট করেছে। এটি জনগণের আমানতের খেয়ানত হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।

এ সমস্যাটিকে পর্যালোচনার সুবিধার্থে ২ ভাগে ভাগ করা যায়। এক. সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংক- যেখানে শ্রেণীবিন্যাসিত ঋণের অবস্থা অত্যন্ত সংকটজনক এবং তা জনগণের উদ্বেগের কারণ। দুই. বেসরকারি ব্যাংকগুলো- যেখানে শ্রেণীবিন্যাসিত ঋণের পরিমাণ সরকারি ব্যাংকের চেয়ে কম হলেও এখনই উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি রাখে।  রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সংকটের প্রধান কারণ সর্বব্যাপী দুর্নীতি ও অনিয়ম। এর বিপরীতে বেসরকারি ব্যাংকের সংকটের জন্য দায়ী প্রধানত আগ্রাসী ব্যাংকিং এবং সেই সঙ্গে ৭-৮টি ব্যাংকের অসাধু মালিক পক্ষের কারসাজি। সরকারি ব্যাংকের ম্যানেজিং ডিরেক্টর, ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর, চেয়ারম্যান এবং পর্ষদ সদস্য নিয়োগদান করে থাকে সরকার। সরকারি ব্যাংকের টপ ম্যানেজমেন্টের ওপর নির্ভর করে ব্যাংকের ঋণ ব্যবস্থাপনা তথা সার্বিক গভর্ন্যান্স। ব্যবস্থাপনার তত্ত্ব অনুযায়ী, ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের টপ ম্যানেজমেন্ট দুর্নীতিপরায়ণ ও অনিয়মবাজ হলে নিচের পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ ধীরে ধীরে দুর্নীতিবাজ হয়ে পড়ে এবং পুরো প্রতিষ্ঠানটি দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ বেসিক ব্যাংক। বেসিক ব্যাংক এ দেশের অন্যতম ভালো ব্যাংক হিসেবে পরিচালিত হয়ে আসছিল। এই ব্যাংকের শ্রেণীবিন্যাসিত ঋণ সাধারণত দেড় শতাংশের মধ্যে সীমিত থাকতো। কিন্তু এই ব্যাংকটিতে সরকার যখন আবদুল হাই বাচ্চুকে চেয়ারম্যান নিযুক্ত করল, তখন   তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদত্যাগ করলে অবসরপ্রাপ্ত একজন ব্যাংকারকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগদান করা হলো । এ দুটি নিয়োগই সরকার প্রদত্ত। এখন এই ব্যাংকটির শ্রেণীবিন্যাসিত ঋণ ৬ হাজার কোটি টাকার মতো হবে। সরকার এই দুটি নিয়োগ পরিহার করতে পারলে এ অবস্থার সৃষ্টি হতো না বলেই ধারণা।

প্রতিটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকেই বিগত ৫-৭ বছর যাবৎ নিয়োজিত চেয়ারম্যান, কিছু পর্ষদ সদস্য এবং ঊর্ধ্বতন কতৃপক্ষেরই অনেকে এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা পরিচালকও দায়ী ছিলেন বলে  ধারণা। এ কারণেই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে অনবরত খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং জনগণের আমানত নষ্ট হয়েছে। সরকারি ব্যাংকের ক্ষেত্রে দুর্নীতি প্রসারের একটি কারণ হল দুর্নীতিবাজদের ও অনিয়মকারীদের আইনি দায়মুক্তি। ব্যাংকিং কোম্পানি অ্যাক্টের বিধানমতে ব্যাংকের কোনো পরিচালক বা চেয়ারম্যান অথবা সম্পূর্ণ বোর্ডের দ্বারা জনগণের আমানতের ক্ষতি হচ্ছে- এমন ধারণা হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ওইসব ব্যক্তিকে অপসারণ করতে পারে, এমনকি পর্ষদও ভেঙে দিতে পারে। কিন্তু ওই আইনেই যোগ করা হয়েছে যে, চেয়ারম্যান, পর্ষদ সদস্য বা ব্যবস্থাপনা পরিচালক সরকার কর্তৃক নিয়োজিত হলে বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের অপসারণ করতে পারবে না। এ কারণেই সরকারি ব্যাংকের দুর্নীতিগ্রস্ত চেয়ারম্যান, পরিচালক এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালকবৃন্দ কোনো রকমের দায়বদ্ধতার সম্মুখীন হচ্ছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট-২০১৫ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে ৫৬ ব্যাংকের মধ্যে পাঁচ ব্যাংকের কাছেই রয়েছে মোট খেলাপি ঋণের ৪৯ দশমিক ৯ শতাংশ। আর বাকি ব্যাংকগুলোর কাছে রয়েছে ৫০ দশমিক ৫১ শতাংশ খেলাপি ঋণ। অন্যদিকে, শীর্ষ ১০ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ পরিমাণ হিসাব করলে দাঁড়ায় মোট খেলাপি ঋণের ৬৪ শতাংশ। বাকি ৪৬ ব্যাংকে খেলাপি রয়েছে মাত্র ৩৬ শতাংশ। প্রতিবেদনে ব্যাংকগুলোর নাম উল্লেখ না করলেও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মোট খেলাপি ঋণের প্রায় অর্ধেকেই রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সোনালী, বেসিক, জনতা, অগ্রণী ও বিশেষায়িত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ শতাংশের দিক দিয়ে কমলেও পরিমাণের দিক দিয়ে বেড়েছে।

২০১৪ সালের ৯ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে কমে ২০১৫ সালে ৮ দশমিক ৮ শতাংশে নেমে এসেছে। আলোচ্য সময়ে শীর্ষ ১০ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ পরিমাণ ছিল ৬৪ শতাংশ। ২০১৪ সালে শীর্ষ ৫ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল ৫৩ দশমিক ৬০ শতাংশ। আর শীর্ষ ১০ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল ৬৭ দশমিক ৪০ শতাংশ। দেখা গেছে, ২০১৫ সালে কৃষি খাতে ২৮০ দশমিক ২১ বিলিয়ন ঋণ বিপরীতে খাতটিতে ৪০ দশমিক শূণ্য ৬ বিলিয়ন ঋণ খেলাপি হয়েছে। বাণিজ্যিক ঋণে ১ হাজার ২ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ঋণের বিপরীতে ৮৫ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন খেলাপি ঋণ। শিল্প ঋণে ৭৫৫ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ঋণের বিপরীতে ৭৪ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন খেলাপি ঋণ হয়েছে। এছাড়া তৈরি পোশাক ও বস্ত্রখাতে নেয়া ৭৩৭ দশমিক ৫৩ শতাংশ ঋণের বিপরীতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬১ দশমিক ০৩ শতাংশ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২৪টি খাত উল্লেখ করে খাতভিত্তিক ঋণের চিত্র তুলে ধরেছে। সেখানে দেখা গেছে, ২০১৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিতরণ হওয়া মোট ঋণের ৭৩ দশমিক ৮২ শতাংশ কেন্দ্রীভূত হয়ে আছে ৫ খাতে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ২০ দশমিক ৬৩ শতাংশ রয়েছে পাইকারি ও খুচরা ব্যবসা খাতে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২০ দশমিক ৫৩ শতাংশ ঋণ কেন্দ্রীভূত হয়ে আছে বৃহৎ শিল্পে। শীর্ষ পাঁচটি খাতের মধ্যে পর্যায়ক্রমে বিবিধ খাতে রয়েছে ১১ দশমিক ৬৩ শতাংশ, আমদানি অর্থায়নে ১০ দশমিক ৫৪ শতাংশ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে ১০ দশমিক ৪৯ শতাংশ। সেবা খাতে রয়েছে ৫ দশমিক ২৮ শতাংশ এবং কৃষি খাতে রয়েছে ৫ দশমিক ২০ শতাংশ। আবাসন, রফতানিসহ বিভিন্ন ১৭টি খাতে রয়েছে ১৫দশমিক ৭০ শতাংশ।

চাপা পড়েছে যেসব চাঞ্চল্যকর আর্থিক কেলেঙ্কারি

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন ::

সময়ের সঙ্গে আড়ালে চলে যাচ্ছে অনেক চাঞ্চল্যকর আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনা; অপরাধীরা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। একটা বড় ধরনের অঘটন ঘটার পর সরকার দেখায়, ঝাঁপিয়ে পড়ে তদন্ত করছে। সময়ের পালাবদলে এক সময় তা গতি হারায় বা হারানোর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এরই মধ্যে ঘটে যায় আরেক ঘটনা। কিন্তু রহস্য আর উন্মোচিত হয় না; আড়ালে চলে যায় । গত কয়েক বছরে ঘটে যাওয়া কযেকটি ঘটনার তদন্তের গতি-প্রকৃতির ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে মিলেছে এমনই তথ্য। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, হৈচৈ বা আলোচনা চলার সময় কিছুদিন ঘটনাগুলো গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করেন সংশ্লিষ্টরা। এক পর্যায়ে দেখা দেয় সেই চিরাচরিত ঢিলেমি। আর বেশিরভাগ ঘটনার কূল-কিনারা করতে না পারায় তদন্ত সংশি-ষ্টদের অদক্ষতাও প্রকট হয়ে ওঠে।

আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনা যেন কিছুতেই পিছু ছাড়ছে না আওয়ামী লীগ সরকারের। ব্যাংকিং খাতে ব্যাপক কেলেঙ্কারির পর খোদ রিজার্ভে ঘটে গেছে ডিজিটাল লুণ্ঠন। ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম শেয়ারবাজার কলঙ্কিত হয়। ২০১০ সালে আবার ব্যাপকভাবে শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি ঘটে। এরপর রাষ্ট্রায়ত্ত কি বেসরকারি ব্যাংক, সবগুলোতে পর্যায়ক্রমে চরম অব্যবস্থাপনা লক্ষ করা যায়। ঋণ নীতিমালা ভঙ্গ করে, রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলে ও পরিচালকেরা আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় ডিজিটাল পদ্ধতিতে ব্যাংক লোপাট শুরু হয়। পুঁজিবাজার ও এর বিনিয়োগকারীদের সর্বস্বান্ত করার পর লুটেরাদের দৃষ্টি পড়ে ব্যাংকিং খাতের ওপর। এরপর হয় ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি। সর্বশেষ রিজার্ভ লোপাট।

রিজার্ভ চুরি : ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে কমপক্ষে ৮০০ কোটি টাকা চুরির মাধ্যমে পাচারের ঘটনায় চলে তোলপাড় । বিদেশি হ্যাকাররা অ্যাকাউন্ট ‘হ্যাক’ করে ৮০০ কোটি টাকার সমমূল্যের প্রায় ১০ কোটি মার্কিন ডলার হাতিয়ে নেয় বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে। প্রশ্ন উঠেছে, রিজার্ভ থেকে ৮০০ কোটি টাকা চুরি হলে বাকি রিজার্ভ সুরক্ষা রাখার নিশ্চয়তা কী? সাইবার ক্রাইম থেকে প্রতিরোধেরই বা উপায় কী? সংশি¬ষ্ট ব্যক্তিদের মতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হ্যাকড হওয়ায় বিশ্বব্যাপী আস্থার সংকট দেখা দিয়েছে ও দেবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সাইবার আক্রমণে ৩৫টি ভুয়া পরিশোধ নির্দেশের ৯৫ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলারের মধ্যে ৩০টি নির্দেশের ৮৫ কোটি ডলার বেহাত হওয়া শুরুতেই প্রতিহত করা গেছে। অবশিষ্ট ১০ কোটি ১০ লাখ ডলারের মধ্যে দুই কোটি ডলারের হদিস জানা গেলেও বাকি ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার (প্রায় ৬৩৫ কোটি টাকা) এর কোনো খোঁজ নেই। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যারা এ কাজের সঙ্গে জড়িত, তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের নাড়ি-নক্ষত্র সবই জানত। সংগত কারণে এখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কারও না কারও সম্পৃক্ত থাকার বিষয়টি একরকম নিশ্চিত। তবে কবে এই অর্থ পাওয়া যাবে বা আদৌ পাওয়া যাবে না- তা নিশ্চিত করে বলা মুশকিল।

বিভিন্ন ব্যাংকের আমানত ডাকাতি : ২০১০-১১ অর্থবছরে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর আর্থিক কর্মকান্ডের ওপর সিএজি নিরীক্ষা পরিচালনা করে। তাদের রিপোর্টে শীর্ষ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক সোনালী ব্যাংকে বড় ধরনের ২২টি অনিয়মের ঘটনা শনাক্ত করেছে। এসব অনিয়মের সঙ্গে ৬৬৩ কোটি টাকা জড়িত। রাষ্ট্রায়ত্ত আরেক ব্যাংক অগ্রণী ব্যাংকে ২৪টি ঘটনার মাধ্যমে ৭১৩ কোটি টাকা আর্থিক অনিয়ম ধরা পড়ে। এ বছর ওই দুটি ব্যাংক হিসাবের ওপর পৃথক দুটি অডিট রিপোর্ট তৈরি করেছে সিএসজি। এছাড়া জনতা, রূপালী, বেসিক ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি ব্যাংকসহ সব রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে। সবগুলো ব্যাংকে আর্থিক অনিয়মের পরিমাণ ৭৯৬ কোটি টাকা। ঋণ বিতরণের বিধিমালা ভঙ্গ করায় বেসিক ব্যাংকের ১৬৭ কোটি টাকা আটক করে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি বিভিন্ন সময়ে ইউসিবিএলের বসুন্ধরা শাখা থেকে ৭১ কোটি টাকা, ন্যাশনাল ব্যাংকের দিলকুশা শাখা থেকে ১ কোটি টাকা এবং বেসিক ব্যাংকের প্রধান শাখা থেকে ৬ কোটি টাকা তুলে নিয়েছে। আর সম্পদের প্রকৃত তথ্য গোপন করে সোনালী ব্যাংক থেকে ২ হাজার ৫৫৪ কোটি টাকা ব্যাংক থেকে হাতিয়ে নেয় হলমার্ক গ্রুপ। অন্যদিকে, চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে সোনালী ব্যাংক প্রধান কার্যালয়ে ৪৫০ কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতি ধরা পড়েছে। অডিট বিভাগের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কতিপয় ব্যবসায়ী বিভিন্ন কৌশলে ব্যাংকের টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।

সিএজির প্রতিবেদন অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণ হিসেবে দুর্বল অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষাব্যবস্থা, দুর্বল মনিটরিং ও অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তির শাস্তি না হওয়া, আর্থিক বিধিবিধানগুলো অনুসরণের অভাবকে দায়ী করা হয়েছে। রিপোর্টে সরকার ও কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন সময়ে জারিকৃত আদেশ, নির্দেশ ও প্রজ্ঞাপন, নীতিমালা অনুসরণ করা হচ্ছে না বলে উল্লেখ করা হয়। এছাড়া ত্রুটিপূর্ণ অভ্যন্তরীণ অডিট রিপোর্ট ও  পলিসি প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নে ঊর্ধ্বতন ব্যাংক ব্যবস্থাপনা কর্তৃক কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া, জবাবদিহির ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন ব্যাংক ব্যবস্থাপনার সক্রিয়তার অভাব, অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষাব্যবস্থার স্বাধীনতার ঘাটতি রয়েছে। এছাড়া ঋণ বিতরণের আগে ব্যাংক স্বার্থে ঋণগ্রহীতা নির্বাচন, ঋণ খাতে সম্ভাব্যতা যাচাই, ঋণের সুদ ব্যবহারকরণ ও ডকুমেন্টেশন যথাযথ ও সতর্কতার সঙ্গে করা হয় না।

বাণিজ্যিক ব্যাংকে জালিয়াতি : বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর হিসাবে থাকলেও বাস্তবে কার্যকর নেই প্রায় এক লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা। ফলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এ টাকা থেকে কোনো মুনাফা পাচ্ছে না। কিন্তু ব্যাংকগুলো এ টাকার সুদ পরিশোধ করছে আমানতকারীদের। অন্যদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০১৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতের অবলোপনকৃত ঋণের (রাইট-অফ) পরিমাণ প্রায় ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এসব টাকা আদায়ের সম্ভাবনা খুবই কম। অব্যাহত খেলাপির ধারায় ব্যাংকগুলো হিসাবের বাইরে রেখেছে এসব অর্থ। এর বাইরে ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫৪ হাজার কোটি টাকা। খেলাপি এ টাকা থেকে একদিকে কোনো সুদ আসে না; এর বিপরীতে বিভিন্ন হারে প্রভিশন রাখতে হচ্ছে ব্যাংকগুলোকে। এই টাকা সংগ্রহ করতে ব্যাংকগুলোকে নিয়মিত ঋণের ওপরে অতিরিক্ত সুদ বসাতে হচ্ছে। খেলাপি ঋণের এই বিপুল পরিমাণ টাকার উভয়মুখী অভিঘাতে বিপর্যস্ত ব্যাংকিং খাত।

অন্যদিকে সরকার কয়েকজন ব্যবসায়ীকে সম্প্রতি ঋণ পুনর্গঠন সুবিধার নামে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে তারা ঋণ খেলাপি। পুনর্গঠন সুবিধা পাওয়া ব্যবসায়ীরা ওসব ঋণের সর্বনিম্ন সুদ হার উপভোগ করতে পারবেন। ঋণের ধরনভেদে এ সুবিধা অব্যাহত থাকবে ৬ থেকে ১২ বছর পর্যন্ত। এ ঋণ মূলধারাতে আনার চেষ্টায় সরকার পুনর্গঠন সুবিধা দিলেও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে এ আমানত সংগ্রহ করতে সমান হারে সুদ গুণতে হয়েছে। এ ঋণের লোকসান উঠানোর জন্য উচ্চহারে সুদ বসাতে হচ্ছে নিয়মিত ঋণ গ্রহিতার ওপর।

রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের মোট ঋণের ৬৭ হাজার কোটি টাকা আদায়ের সম্ভাবনা নেই। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা। এরপরই আছে জনতা ব্যাংক প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা। রূপালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৬ হাজার কোটি টাকা। অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫ হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি। অন্যান্য ব্যাংক মিলিয়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকের বিতরণ করা মোট ঋণের বর্তমানে প্রায় ২৫ ভাগই খেলাপি- যা মোট ৩৩ হাজার কোটি টাকা। এদিকে সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী গত ডিসেম্বর পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের অবলোপন করা হয়েছে ৩৪ হাজার কোটি টাকা।

হলমার্ক কেলেঙ্কারি : অন্যতম আলোচিত ঘটনা হলমার্ক কেলেঙ্কারি। কতিপয় ব্যাংক কর্মকর্তা ও পরিচালকের যোগসাজশে হলমার্ক সোনালী ব্যাংক রূপসীবাংলা হোটেল শাখা থেকে প্রায় ৪ হাজারকোটি টাকা বেআইনি ঋণ গ্রহণ করে আত্মসাৎ করে। সেখানেও ক্ষমতাসীন দলের কিছু লোকজন জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে। অর্থমন্ত্রী তখন অত্যন্ত অযাচিতভাবেই বলেন, ৪ হাজার কোটি টাকা কিছুই নয়। হলমার্ক কেলেঙ্কারির পেছনে দু’টি কারণকে চিহ্নিত করেছেন অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের অদক্ষতার ফলেই এত বড় কেলেঙ্কারি হতে পেরেছে। এ ঘটনার দায় অর্থ মন্ত্রণালয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদও এড়াতে পারে না। তারা বলেছেন, এই কেলেঙ্কারি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হলেও সামগ্রিকভাবে দেশের ব্যাংকিং খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এর মাধ্যমে শুধু যে হলমার্কই সুবিধা নিয়েছে, তা নয়। তার পেছনে আছে রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক সুবিধাভোগী চক্র।

বিমানের দুর্নীতি : বিগত চার বছরে নানা দুর্নীতি, লুটপাট দলীয়করণ অব্যবস্থাপনার কারণে ১৩শ’ কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে বিমান। বিমানের একশ্রেণীর উর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিদেশী এয়ারলাইন্সের ব্যবসার পথ সুগম করে দেয়ার নাম করে বিমানের লাভজনক আর্ন্তজাতিক রুটগুলোকে বন্ধ করে সেখানে বিমান পরিবহন সংস্থাকে কাজ পাইয়ে দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠে অনেক আগেই। তার কোনো সুরাহা করা হয়নি। তাছাড়া ফ্লাইট সংকট শিডিউল বিপর্যয়, রুট সংকোচন, অদক্ষ জনবল, যাত্রীদের সঙ্গে অসদাচরণ ও তাদের মূল্যবান সামগ্রী চুরি অনিয়ম এবং দুর্নীতির কারণে এক সময়কার লাভজনক প্রতিষ্ঠান বিমান বর্তমানে শতশত কোটি টাকার লোকসান গুনছে।

রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল দুর্নীতি : বর্তমান সরকারের আমলে সবচেয়ে বেশি লুটপাট হয়েছে বিদ্যুৎ খাতে। ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই শুরু হয়ে তা পরবর্তিকালেও অব্যাহত থাকে। রেন্টাল ও কুইক রেন্টালের নামে সরকারি খাত থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়েছে বলে অভিযোগ আছে। বেসরকারি খাতের ভাড়াভিত্তিক এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের কাজ দেয়া হয় সম্পূর্ণ বিনা টেন্ডারে। প্রায় সবক’টি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের দায়িত্ব পান ক্ষমতাসীনদের আশির্বাদপুষ্টরা কিংবা সরসরি সমর্থক ব্যবসায়ীরা। বিদ্যুৎ সেক্টরের দুর্নীতির বিচার যাতে না হয়, সে জন্য সরকারের তরফ থেকে ইনডেমনিটিও দেয়া হয়েছে।

এমএলএম প্রতিষ্ঠানের জালিয়াতি : ডেসটিনি, যুবক এবং ইউনিপে-টু-ইউসহ বিভিন্ন মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) কোম্পানি হাতিয়ে নিয়েছে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ডেসটিনির গ্রাহকদের গচ্ছা গেছে ৪ হাজার ১১৯ কোটি ২৪ লাখ টাকা। আর ইউনিপে-টু-ইউ এবং যুবকের গ্রাহকরা হারিয়েছেন যথাক্রমে ২ হাজার ৫শ কোটি এবং ২ হাজার ৬শ কোটি টাকা।

ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি : চারটি ব্যাংকের স্থানীয় কার্ড অর্থাৎ এটিএম কার্ড জালিয়াতির মাধ্যমে গ্রাহকের প্রায় ২১ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার তথ্য পায় বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে সিটি ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক ও ইস্টার্ন ব্যাংক রয়েছে। এসব ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে এটিএম কার্ড জালিয়াতি করা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতির ঘটনা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে এর আগে আসেনি। প্রিমিয়ার ব্যাংকের ঘটনায় রীতিমতো বিস্মিত হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তিনটি বুথ থেকে কার্ড জালিয়াতির মাধ্যমে ৩৪ লাখ টাকা গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট থেকে হাতিয়ে নিয়ে যায় জালিয়াতি চক্র।

এভাবে আরো অনেককিছুই চাপা পড়েছে অথবা চাপা দেয়ার পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়েছে।

জঙ্গী হামলা : অর্থনীতিতে বিশাল ধাক্কার আশংকা

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন ::

গত বছরের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে দুই বিদেশী নাগরিককে খুনের ঘটনায় বাংলাদেশ ভ্রমণে সতর্কতা জারি করে বিশ্বের অনেক দেশ। নিরাপত্তা শঙ্কায় একের পর বাংলাদেশ সফর বাতিলও করেন বিদেশী ব্যবসায়ীরা। বছর না ঘুরতে আবারো বিদেশীদের ওপর হামলা। তবে আরো বড় পরিসরে, যা ব্যবসায়ী সমাজের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। গুলশানের হলি আর্টিজান ঘটনায় বেশ কয়েকজন বিদেশি নাগরিক হত্যাকান্ডের শিকার হওয়ার ফলে এ ধরনের ঝুঁকির মাত্রা বহুগুণে বেড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ঈদের জামাতে জঙ্গী হামলা। জঙ্গী হামলার ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলে দেশের বিদেশনির্ভর অর্থনীতির ধারা উল্টোপথে হাঁটবে। যাতে তৈরি পোশাক খাত, জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, রফতানি আয়, বৈদেশিক ঋণ মান এবং এর প্রবাহে নেতিবাচক হুমকির মুখে পড়তে পারে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে বিদেশি বিনিয়োগেও দেখা দিতে পারে অনিশ্চয়তা। পাশাপাশি উন্নয়নের বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়েও সমস্যা দেখা দিতে পারে। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, অধিকাংশ প্রকল্পের বিশেষজ্ঞ হচ্ছেন বিদেশি নাগরিক। পর পর দুটি সন্ত্রাসী হামলার পর সাধারণ মানুষের মনে দেখা দিয়েছে শঙ্কা। ফলে মার্কেট, বিপণি বিতান, হোটেল ও রেস্টুরেন্টে সাধারণ মানুষের পদচারণা সীমিত হয়ে আসছে। তাই সঙ্কুচিত হতে পারে এসব খাতের ব্যবসা বাণিজ্য।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবিএম মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, পরপর দুটি সন্ত্রাসী হামলা বিদেশে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়েছে। নিরাপত্তা শঙ্কায় বিদেশিরা দেশে আসতে চাইবে না। এতে রফতানি খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তিনি আরো বলেন, জাইকা বাংলাদেশের পাশে থাকার ঘোষণা দিলেও তাদের নিরাপত্তা নিয়ে যে হতাশার কথা ব্যক্ত করেছে তা তুলনামূলক সতর্কতাই বলা চলে। এর বাইরে দেশে বড় প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে বিদেশি বিশেষজ্ঞরা কাজ করছেন। তারাও ভ্রমণে নিরাপদবোধ মনে করবেন না। এতে বড় প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে এক ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

গুলশানের হলি আর্টিজান ও শোলাকিয়ায় পরপর দুটি হামলার ঘটনার পর দেশের তৈরি পোশাক খাতে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অনেকে। এরই মধ্যে অনেক বায়ার তাদের সফর বাতিল ও অর্ডার বাতিল করেছেন। গুলশানের হামলার ঘটনায় ইটালির ৯ জন নাগরিক নিহত হন, যাদের প্রত্যেকে পোশাক রফতানির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। সঙ্গত কারণে নিরাপত্তার কারন দেখিয়ে বিদেশি ক্রেতারা এ দেশে আসতে চাইছেন না। ঢাকায় বিদেশি এক পোশাক ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের বৈঠক ছিল ঈদ-পরবর্তী দিন শুক্রবার। ওই ক্রেতা প্রতিষ্ঠান বৈঠকের স্থান বাতিল করে তা পার্শ্ববর্তী দেশের রাজধানী দিল্লিতে নিয়ে গেছে। প্রতিষ্ঠানের পক্ষে কোনো ক্রেতা এ মুহূর্তে ঢাকায় আসবেন না- তা বাংলাদেশি সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাকে জানিয়ে দিয়েছেন তারা। কারণ এ সময়ে ঢাকাকে নিরাপদ মনে করছেন না তারা। পোশাক খাতের অধিকাংশ ক্রেতা প্রতিষ্ঠান ঢাকায় অনুষ্ঠেয় নির্ধারিত বৈঠকগুলো নিয়ে যাচ্ছে হংকং, সিঙ্গাপুর ও ভারতে।

সন্ত্রাসী হামলা বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ঝুঁকিও বাড়াবে বলে মনে করছেন অনেকে। তাদের মতে, এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে দেশের প্রবৃদ্ধিতে। সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের ঋণমানেও এর ছাপ পড়তে পারে বলে এক প্রতিবেদনে জানায় আন্তর্জাতিক ঋণমান সংস্থা ‘মুডি’স। এর কারণ হিসেবে মুডিস বলছে, সন্ত্রাসী কার্যক্রম বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ব্যাহত করতে পারে। আর ঋণমান নিরূপণের একটি অন্যতম মানদন্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে। গুলশানের মতো সহিংস ঘটনা আগামী দিনগুলোয় বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বেড়ে যাওয়ার সংকেত দিচ্ছে।

মুডিসের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, বাংলাদেশ এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় স্বল্প সংখ্যক দেশের অন্যতম, যারা বৈশ্বিক চাহিদা মন্দা সত্ত্বেও রফতানি প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা অব্যাহত রেখেছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে বাংলাদেশের রফতানি আয়ের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৯ দশমিক ২ শতাংশ। মূলত ওষুধ, কাঁচা পাট, নিটওয়্যার এবং ওভেন গার্মেন্ট ও হালকা প্রকৌশল পণ্য রফতানি আয়ের প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু গত কয়েক মাসে দেশে যে হারে জঙ্গী তৎপরতা রয়েছে তাতে গভীর উদ্বেগজনক অবস্থার তৈরি হতে পারে দেশীয় অর্থনীতিতে। সংস্থাটির প্রতিবেদনে উঠে আসে, গত বছর বাংলাদেশে সন্ত্রাসী ঘটনার সংখ্যা ছিল ৪৬৫টি- যা তুলনায় ২০১২ সালে এ ধরনের ঘটনা ঘটে মাত্র ১৮টি। মুডিসেরই অন্য এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কোনো দেশের অর্থনীতির ওপর সহিংস হামলার এমন ঘটনা দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

দেশে জঙ্গী হামলার ঘটনায় বিদেশি বিনিয়োগে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে মনে করা হচ্ছে। কেননা ইতোমধ্যে জাপানের পোশাকের ব্র্যান্ড ইউনিক্লো অতি জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাংলাদেশে সব ধরনের বাণিজ্যিক সফর বাতিল করেছে। সুইডেনের এইচ.অ্যান্ড.এম-সহ অন্য যেসব নামজাদা বিদেশি পোশাক প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশে ব্যবসা রয়েছে, তারা বলেছে, বাংলাদেশ থেকে নিরাপদ কোনো দেশে কার্যক্রম সরিয়ে নেওয়ার আগে তারা এদেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করছে।

সাম্প্রতিক সময়ের হামলার ঘটনায় দেশের পর্যটন শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এরই মধ্যে দেশের পর্যটন এলাকায় হোটেল মোটেলগুলোতে দেশি-বিদেশি অনেকের বুকিং বাতিল করা হয়েছে। প্রতি বছরই বিদেশি পর্যটক ও ব্যবসায়িক কাজে বাংলাদেশে আসা বিদেশি নাগরিকরা ভিড় জমাতেন পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে; কিন্তু গুলশানের হামলার ঘটনায় এ শিল্পে খারাপ প্রভাব পড়েছে। এরই মধ্যে অনেকে তাদের হোটেল ও বিমানের বুকিং বাতিল করেছেন। বিদেশীদের কেউ এখন দেশে আসতে চাইছেন না। বিদেশে যেসব ট্যুর অপারেটর বাংলাদেশ আসার ক্ষেত্রে সহায়তা জোগাত, তারাও এখন বাংলাদেশে ভ্রমণের সেবা দিতে অপরাগতা প্রকাশ করছে।

দেশের টেলিযোগাযোগ খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিদেশী নাগরিক। এদের সিংহভাগই আবার প্রতিষ্ঠানগুলোর উচ্চপদে আসীন। খাতটির ওপর গুলশানের এ ঘটনার প্রভাব সম্পর্কে জানতে চাইলে সেলফোন অপারেটরদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশের (অ্যামটব) মহাসচিব বলেন, শুধু এ খাতের জন্য নয়, ঘটনাটিকে সামগ্রিকভাবে দেখতে হবে। অনেকেই নানা প্রয়োজনে বাংলাদেশে আসছেন। দেশী-বিদেশী সবার কাছে এটি আশঙ্কার বিষয়। এ ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। এটি দেশের ভাবমূর্তিতে প্রভাব ফেলতে পারে। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা না ঘটে, সেজন্য সতর্কতার প্রয়োজন রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, এ ঘটনার পর বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর বিদেশীদের আস্থা ও বিশ্বাস কমে যেতে পারে। বিদেশীরা এ দেশে আসতে ভয়ে থাকবেন। আমাদের দেশী ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সব শ্রেণীর মানুষ আতঙ্কের মধ্যে থাকবে। দেশের যে স্বাভাবিক গতি ছিল, তাতে কিছুটা হলেও ভাটা পড়বে- যা অর্থনীতির ওপর বড় প্রভাব ফেলবে। তবে সরকার কীভাবে সমস্যা থেকে উত্তরণের পদক্ষেপ নেয়, তার ওপর এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব নির্ভর করবে। সরকার যদি ভালোভাবে বিষয়টি মোকাবেলা করতে পারে, তাহলে এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি নাও হতে পারে।

অস্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করছে রাজধানীর পাঁচতারকা ও অভিজাত হোটেলগুলোয়। নিরাপত্তার স্বার্থে রুম সার্ভিস ছাড়া আনুষঙ্গিক অন্যান্য সেবা বন্ধ করে দিয়েছে এসব হোটেল। বিদেশী অতিথিদের বুকিং নেয়া হলেও বন্ধ রাখা হয়েছে। সম্প্রতি গুলশানের হলি আর্টিজানে সন্ত্রাসী হামলার পর নিরাপত্তার কারণে এসব পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে হোটেল কর্তৃপক্ষগুলো।

রাজধানীর গুলশান ও বনানী এলাকার অভিজাত হোটেলগুলোয় গিয়ে দেখা যায়, প্রতিটি হোটেলের সামনেই থমথমে পরিস্থিতি। আশপাশের রাস্তাগুলোয় গাড়ি চলাচল সীমিত করার পাশাপাশি বসানো হয়েছে নিরাপত্তা চৌকি। এ প্রসঙ্গে একটি পাচতারা হোটেল রেডিসনের নিরাপত্তায় নিয়োজিত কর্মকর্তা বলেন, আমাদের সব সার্ভিস বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। নতুন করে কোনো অতিথির বুকিং নেয়া হচ্ছে না। পাশাপাশি আগে থেকে যারা আছেন, তারাও বাইরের গাড়ি নিয়ে হোটেলে প্রবেশ করতে পারছেন না। নিরাপত্তার স্বার্থে হোটেলের গেট থেকে নিজস্ব গাড়ি দিয়ে অতিথিদের ভেতরে নিয়ে আসা হচ্ছে।

রুম সার্ভিস ছাড়া গুলশানের লেকশোর হোটেলে সব ধরনের সেবা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। হোটেলের বাইরে এ-সংক্রান্ত একটি নোটিসও টানিয়েছে লেকশোর কর্তৃপক্ষ। কর্তৃপক্ষ জানায়, বন্ধ হওয়া সার্ভিসগুলোর মধ্যে রয়েছে রেস্টুরেন্ট ও হল বুকিং। লেকশোরের নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানান, গুলশানের অনাকাংখিত ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিদিন সন্ধ্যার পর কয়েকটি সার্ভিস বন্ধ ছিল। গুলশানের পাঁচতারকা হোটেল ওয়েস্টিনে গিয়ে দেখা যায়, হোটেলের পাশের রাস্তা বন্ধ। হোটেলের সামনে কোনো গাড়ি অবস্থান করতে দেয়া হচ্ছে না।

এদিকে গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় বাতিল হয়ে গেছে পর্যটন নগরী সিলেটে দেশী-বিদেশী পর্যটকদের অগ্রিম বুকিং। সিলেটের হোটেল-মোটেল ব্যবসায়ীরা আশা করেছিলেন, ২০১৬ পর্যটনবর্ষে তারা কিছুটা লাভের মুখ দেখবেন। এ বছর রাজনৈতিক হাঙ্গামাও নেই। কিন্তু গুলশানের অনাকাংখিত ঘটনায় ভেস্তে গেছে সব।

নিরাপত্তাজনিত কারণে ঢাকা থেকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনের ভেন্যু সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। চলতি মাসেই এখানে দ্য এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপ অন মানি লন্ডারিংয়ের (এপিজিএমএল) বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। এছাড়া এশিয়া-প্যাসিফিক নেটওয়ার্ক ইনফরমেশন সেন্টারের আরেকটি সম্মেলন হওয়ার কথা ছিল সেপ্টেম্বরে। সম্প্রতি গুলশানে ঘটে যাওয়া জঙ্গী হামলার পরিপ্রেক্ষিতে দুটি সম্মেলনেরই স্থান পরিবর্তন করা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গী হামলার ঘটনায় হামলাকারীসহ ২৮ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ১৮ জনই ছিলেন বিদেশী নাগরিক। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে বিদেশীদের লক্ষ্য করে চালানো বিভিন্ন হামলার ঘটনায় এখানে অবস্থানরত বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের মধ্যে নিরাপত্তার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। গুলশানে হামলার পর নিজেদের নাগরিকদের বাংলাদেশে ভ্রমণের বিষয়ে অতিরিক্ত সাবধানতা অবলম্বনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রসহ বেশ কয়েকটি দেশ এরই মধ্যে বিশেষ সতর্কতা বার্তা জারি করেছে।

বিভিন্ন দেশের ৩৫০ জন প্রতিনিধি নিয়ে ঢাকায় এপিজিএমএলের সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল ২৪-২৮ জুলাই। বিভিন্ন দেশে অবৈধ মুদ্রা পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়নের বিরুদ্ধে কাজ করে যাচ্ছে এপিজিএমএল। এপিজিএমএলের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিবৃতির মাধ্যমে বৈঠকের ভেন্যু পরিবর্তনের কথা জানানো হয়। এতে বলা হয়, জুলাইয়ে ঢাকায় অনুষ্ঠেয় বৈঠকের সময় পরিবর্তন করে সেপ্টেম্বরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বৈঠকের ভেন্যু নির্ধারণ করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। সংস্থাটির বিবৃতিতে বৈঠকের ভেন্যু পরিবর্তনের কোনো কারণ না জানানো হলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, গুলশান হামলার কারণেই এবারের সম্মেলনের ভেন্যু পরিবর্তন করা হয়েছে।

রয়টার্স জানিয়েছে, ফিলিপাইনের কাছ থেকে রিজার্ভের চুরি হয়ে যাওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারে সহযোগিতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণে এবারের সম্মেলনটি ভূমিকা রাখবে বলে আশা করেছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংক ও এ ঘটনার তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তারা। ফেব্রুয়ারিতে নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভে খোলা অ্যাকাউন্ট থেকে হ্যাকারদের সরিয়ে নেয়া ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার পুনরুদ্ধারে এখনো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

অন্যদিকে ঢাকায় এশিয়া-প্যাসিফিক নেটওয়ার্ক ইনফরমেশন সেন্টারের সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল ২৯ সেপ্টেম্বর। ভেন্যু পরিবর্তনের পর টেলিযোগাযোগ-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সম্মেলনটি শ্রীলংকা বা থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে আয়োজকরা জানিয়েছেন। সম্মেলনে বিভিন্ন দেশের ৪৫০ জন প্রতিনিধির অংশ নেয়ার কথা ছিল।

ঈদ : মাসের ১৫ দিনই থাকবে বন্ধ

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন ::

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের টানা নয় দিনের ছুটির ঘোষণা দিয়েছে সরকার। জুলাই মাসের ১৫ দিনই থাকবে ব্যাংক ও সরকারি বন্ধ; ঈদে টানা নয়দিন ও সাপ্তাহিক ছুটি ৬দিন। উন্নয়নশীল একটি দেশের জন্য এতদিন ছুটি অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে। উৎপাদন ও ব্যবসা-বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। পাশাপাশি ব্যাংক, ইন্সুরেন্স, শেয়ারবাজারও নয়দিন ছুটির ঘোষণা দিয়েছে। সবমিলে ‘নয় দিন’ অর্থনীতির উপর কতটা আঘাত পড়বে, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। এ সময়ে বৈদেশিক লেনদেনসহ যাবতীয় কার্যক্রম না  চললে আর্থিক ও নীতিগত বিষয়গুলো কীভাবে সমাধান করা হবে?

সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে দেশের জিডিপি ব্যাপক পরিমাণ কমে যায়। একটি দেশের লক্ষকোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি অবকাঠামো কোন কাজে আসে না। কোটি কোটি টাকা দামের মেশিনারিস অলস পড়ে থাকে। টানা ৯ দিন ছুটি ভোগের সুবিধা পাওয়ায় সরকারি কর্মচারীরা ঈদ উপলক্ষে নিঃসন্দেহে একটি বড় সময় ধরে অখন্ড আনন্দ ভোগ করবেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এত দীর্ঘ সময় ধরে সরকারি অফিস-আদালত বন্ধ থাকলে দেশের অর্থনীতি ও জরুরি কার্যক্রমের কী হবে? ব্যবসায়ী মহল থেকে সরকারি প্রজ্ঞাপন জারির আগেই বেশ কিছু বিষয় উত্থাপন করা হয়েছে, যা মূল্যায়নের দাবি রাখে। তারা বলছেন, টানা ৯ দিনের ছুটিতে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যাপক ক্ষতির আশংকা রয়েছে। ক্ষতিটা সবচেয়ে বেশি হবে চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরকেন্দ্রিক। বন্দরে স্বাভাবিক পণ্য খালাস বিঘ্নিত হলে ব্যবসায়ীরা তো ক্ষতিগ্রস্ত হবেনই, দেখা দেবে পণ্যজটও। এতে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাবে, যার প্রভাব পড়বে পণ্যমূল্যের ওপর। ওদিকে, রফতানিপণ্য জাহাজিকরণের জন্য  শ্রমিক সংকট দেখা দেবে, ফলে বন্ধ থাকবে রফতানি কার্যক্রম এবং এতে জটিলতায় পড়বে ইআরসি সার্টিফিকেটসহ রফতানি সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কার্যক্রম। অর্থাৎ রফতানি অর্ডার বাতিল হওয়ার আশংকাও তৈরি হবে তখন। যথাসময়ে জাহাজিকরণে ব্যর্থ হওয়ার কারণে পণ্যের মূল্যমান কমানোরও সুযোগ নিতে পারে ক্রেতারা। এ তো গেল আমদানি-রফতানি সংশ্লিষ্ট ব্যবসা-বাণিজ্যের কথা। ব্যবসা-বাণিজ্যের অন্যান্য ক্ষেত্রেও দেখা দেবে স্থবিরতা, এর অন্যতম কারণ দীর্ঘ ৯ দিন ব্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। ব্যাংকগুলো টানা ৯ দিন বন্ধ থাকবে বলে সাধারণ গ্রাহকরা যেমন এ সময়ে লেনদেন করতে পারবেন না, তেমনি ক্ষুদ্র-মাঝারি-বৃহৎ ব্যবসা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানও আর্থিক লেনদেনের সুবিধাবঞ্চিত থাকবে। দেশে এমন অনেক ব্যবসা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম বা উৎপাদন প্রক্রিয়া বন্ধ থাকলে সমূহ ক্ষতি গুনতে হয়। ঈদে তিন দিনের ছুটি সহনীয়; কিন্তু ৯ দিন ছুটি মানিয়ে নেয়া এসব প্রতিষ্ঠানের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়বে।

ছুটি ১ জুলাই শুরু হয়ে চলবে ৯ জুলাই পর্যন্ত। দীর্ঘ এই ছুটির কারণে নিরবচ্ছিন্ন আমদানি-রফতানি কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হবে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শিল্প মালিকরা। তারা বলছেন রফতানিমুখী শিল্প, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের মালিকদের স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার মধ্যে ব্যবসা পরিচালনা করতে হয়। নানা প্রতিক‚লতা মোকাবেলা করে বিদেশ থেকে ক্রয়াদেশ সংগ্রহ করতে হয় তাদের। ক্রেতার শর্ত অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পণ্য জাহাজীকরণের লক্ষ্যে কাঁচামাল আমদানি করতে হয়। আমদানিকৃত পণ্য দিয়ে পণ্য তৈরি করে আবার তা রফতানি করতে হয়। টানা নয়দিনের ছুটির কারণে পুরো প্রক্রিয়াটি বাধাগ্রস্ত হবে।

রফতানিকারকদের সংগঠন এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইএবি) সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেন, এমনিতেই চট্টগ্রাম বন্দরে গত এক-দেড় মাসে কনটেইনারজটে আমদানি-রফতানি প্রক্রিয়ায় সময় বেশি লাগছে। ঈদে ব্যাংক, আমদানি-রফতানি সংশ্লিষ্ট ফরোয়ার্ডার, বন্দর, শুল্ক, শিপিং লাইন সবক্ষেত্রেই ছুটির আমেজ থাকবে। সব মিলিয়ে ছুটির মধ্যে বন্দরে পণ্যজট আরো প্রকট আকার ধারণ করবে। শিল্প মালিকরা বলছেন, ঈদের মাসে বিশেষ করে রমজানের সময় বড় একটা সময় উৎপাদন বন্ধ রাখেন শিল্প মালিকরা। জরুরি ক্রয়াদেশ সরবরাহের কথা থাকলে ঈদের আগেই সেসব কাজ শেষ করতে হয়। ঈদের সময় জাহাজীকরণের কথা থাকলেও তা পিছিয়ে দেন সবাই। এবারো তার ব্যতিক্রম হয়নি। ক্রেতাদের অনুরোধ করে এ মাসে জাহাজীকরণের অনেক তারিখ পিছিয়ে নেয়া হয়েছে এরই মধ্যে। এতে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয় শিল্প মালিকদের।

জানা গেছে, সবচেয়ে বড় খাত পোশাক শিল্পের কারখানাগুলো ঈদের ছুটিতে বন্ধ থাকবে। রফতানির ক্ষেত্রে বন্দরে চাপ সেভাবে না থাকলেও আমদানি পণ্য নিয়ে বিপাকে পড়তে হবে। অনেক জাহাজ বন্দরে পৌঁছালেও পণ্য খালাস করা সম্ভব হবে না বলে আশঙ্কা শিল্প মালিকদের। পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, কাজের চাপ থাকলে কিছুটা সমস্যায় পড়তেই হবে মালিকদের। আর ছুটির কারণে অনেক কাজ জমে যাবে। সব কারখানায়ই এখন কাজের চাপ আছে। ফলে উদ্বেগ কিছুটা থাকছেই।

জানা গেছে, বন্দর কার্যক্রম ঈদের ছুটিতেও চালু থাকবে। ৫ থেকে ৭ জুলাই বাদে বাকি দিনগুলোয় শুল্ক বিভাগও খোলা থাকবে। আবার বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী কিছুস্থানে ব্যাংকিং কার্যক্রমও চলবে। তারপরও আমদানি-রফতানি কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। কারণ ঈদের আগে ও পরে লরি-কাভার্ড ভ্যান-ট্রাক চলাচল সাতদিন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এতে আমদানি-রফতানি বাণিজ্য চালু থাকলেও তাতে স্বাভাবিক গতি থাকবে না। রফতানিকারকরা জানিয়েছেন, বহু শিল্প-কারখানার পণ্য ‘রফতানি ঋণপত্রে’ উল্লেখ থাকে ‘নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে’ অবশ্যই শিপমেন্ট করতে হবে। এর ব্যতিক্রম হলে বহু কনসাইনমেন্টের জাহাজীকরণের তারিখ অতিক্রান্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমনটা হলে ১০ গুণ ভাড়া দিয়ে আকাশপথে পণ্য পাঠাতে বাধ্য হবেন রফতানিকারকরা। ক্ষেত্র বিশেষে বিদেশী ক্রেতারা কনসাইনমেন্ট বাতিল করে দিতে পারেন বলেও আশঙ্কাও রয়েছে।

এছাড়াও যেহেতু সাধারনের জন্য ব্যাংক খোলা থাকবেনা, সে কারনে যদি কেউ অসুস্থও হয়ে পড়েন ওই সময়ে, তাহলে চিকিৎসা নিয়ে অর্থ ফেরত দেয়াটা কঠিন হয়ে দাড়াবে দীর্ঘ ব্যাংক ছুটির কারণে। যদি কাউকে বিদেশ যেতে হয় চিকিৎসার জন্য জরুরি ভিত্তিতে তাহলে কোথায় তিনি পাবেন ডলার এবং যদি তার কোনো স্বজন দিতেও চায় তাহলেও কি তা দেয়া সম্ভব হবে?

শপিংমলগুলোর পাশে ব্যাংক খোলা থাকবে, ভালো কথা। কিন্তু সবাই তো শপিংমলে ব্যবসা করেন না। এর বাইরের যারা ঈদের মওসুমে দেদারছে বেচা-বিক্রি করেন পাড়া কিংবা মহল্লায়, তাদের অর্থ তারা কি ঘরে রাখবেন না দোকানে? আর ইতোমধ্যেই তো বলে দেয়া হয়েছে প্রতিটি বাড়ির নিরাপত্তা দেয়া সম্ভব না।