Home » আন্তর্জাতিক (page 10)

আন্তর্জাতিক

চীনকে মোকাবেলায় ভারত-যুক্তরাষ্ট্র নয়া সামরিক চুক্তি

মোহাম্মদ হাসান শরীফ ::

ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র অতি সম্প্রতি উভয় দেশের সেনা, বিমান ও নৌ ঘাঁটিগুলো পারস্পরিক ব্যবহারের ব্যাপারে সমঝোতায় পৌঁছেছে। আর এর মূল উদ্দেশ্য ভারত মহাসাগরসহ পুরো অঞ্চলে চীনকে যৌথভাবে প্রতিরোধ ও মোকাবেলা করা। ওয়াশিংটন চার বছর ধরে ‘লজিস্টিকস সাপোর্ট এগ্রিমেন্ট’ (‘কৌশলগত সমর্থন চুক্তি’) নামের ওই সমঝোতার জন্য নয়া দিল্লিকে রাজি করানোর চেষ্টা করে যাচ্ছিল। নিরপেক্ষ থাকার একটি ছদ্মবেশ বহাল রাখার জন্য দিল্লি এতে রাজি হচ্ছিল না। কিন্তু নাচতে নেমে ঘোমটা রেখে লাভ কী? তা-ই নরেন্দ্র মোদি সরকার ওই সমঝোতায় রাজি হতে খুব একটা দেরি করেনি। ১২ এপ্রিল দুই দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রী দিল্লিতে বিষয়টি প্রকাশ করেছেন। এর মাধ্যমে এশিয়ায় নতুন সমীকরণের সৃষ্টি হলো। এর প্রতিক্রিয়া হবে দীর্ঘমেয়াদি এবং সেইসাথে ভয়াবহ মাত্রার। ভারতের বিরোধী দলগুলো এই সমঝোতার ব্যাপারে আপত্তি করলেও তাতে খুব একটা জোর ছিল বলে মনে হয়নি। এই সমঝোতার আলোকে দেশ দুটি একে অপরের স্থল, বিমান ও নৌ ঘাঁটিগুলো জ্বালানি ভরা, মেরামতি ও বিশ্রামের জন্য ব্যবহার করতে পারবে।

সমঝোতা হলেও এখনো চুক্তিতে সই হয়নি। তবে নয়া দিল্লিতে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পারিকরের সাথে আলোচনার পর মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী অ্যাশটন কার্টার বলেছেন, ‘সব জটিলতা নিরসনের জন্য আমরা নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছি।’ আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই চুক্তি চূড়ান্ত হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

বলা হচ্ছে, দক্ষিণ চীন সাগর এবং ভারত মহাসাগরে চীনের ক্রমবর্ধমানশীল ভূমিকার কারণে মোদি প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আরো ঘনিষ্ঠ হওয়ার পথ ধরেছেন। এছাড়া ভারতের অস্ত্র উৎপাদন বাড়ানো এবং আমদানি হ্রাস করার জন্য মার্কিন প্রযুক্তিও আরো বেশি বেশি চাচ্ছেন মোদি। নরেন্দ্র মোদির এই চাওয়ার সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কামনার যথেষ্ট মিল রয়েছে। চীনকে মোকাবেলার জন্য মার্কিন সামরিক বাহিনী চায় ভারতের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে। এই লক্ষ্যেই এক বছরের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো ভারত সফরে গেলেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী। তিনি চাচ্ছেন, বারাক ওবামার প্রেসিডেন্ট আমলের শেষ সময়টাতে দুই দেশের সামরিক সম্পর্ক আরো জোরদার করতে।

এই চাওয়া-পাওয়ার রেশ ধরে দুই দেশের মধ্যে খুব তাড়াতাড়ি আরো কয়েকটি সামরিক চুক্তি দেখা যেতে পারে।

তবে দুই দেশ কিন্তু আগে থেকেই সামরিক খাতে সহযোগিতা বাড়িয়ে চলেছিল। ২০১২ সালের চুক্তিবলে দুই দেশ বিমানবাহী রণতরীর নক্সা প্রণয়নের কাজেও এগিয়ে যাচ্ছে।  ভারত আগে রুশ-নির্মিত রণতরী ব্যবহার করত। এখন তারা নিজেরাই এ ধরনের রণতরী বানাতে চাইছে। এছাড়া বিমান বাহিনী আধুনিকায়নের কাজও চলছে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে।

চীনকে প্রতিরোধ করার কথা বলে সাম্প্রতিক সময়ে এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক প্রভাব বাড়িয়ে চলেছে। ফিলিপাইনের সাথেও যুক্তরাষ্ট্রের একটি চুক্তি হচ্ছে। এর মাধ্যমে সেখানে মার্কিন সৈন্য মোতায়েন করা হবে। দক্ষিণ চীন সাগরে চীনকে ঠেকানোর জন্য ফিলিপাইনের ঘাঁটিগুলো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত আগ্রহের বিষয়। জাপান আরো আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র। চলতি বছরেই পূর্ব ও দক্ষিণ চীন সাগরের কাছাকাছি ফিলিপাইন সাগরে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও জাপান যৌথ নৌ মহড়া চালাবে।

অথচ এই সাগরের কয়েকটি দ্বীপ নিয়ে প্রতিবেশীদের সাথে চীনের সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছে। ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সাম্প্রতিক সমঝোতাতেও দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে ওয়াশিংটনের উদ্বেগ প্রকটভাবে ফুটে ওঠেছে। এমন প্রেক্ষাপটে সমঝোতার বিষয়টি চীনের অগোচরে থাকেনি। চীন অবশ্য এখনো সরাসরি সমালোচনা করেনি। বরং ভারতকে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করার অনুরোধ করেছে।

চীনের প্রতিক্রিয়া : সমঝোতা স্বাক্ষরের পরদিন তথা ১৩ এপ্রিল নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে এক প্রশ্নের জবাবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লু কাং কিছুটা সংযতভাবে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারত বেশ প্রভাবশালী দেশ। ভারত বরাবরই স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে। নিজের স্বার্থ অনুযায়ী তারা কূটনৈতিক অবস্থান নেবে।’

তবে এই ইস্যু নিয়ে নয়া দিল্লির সাথে বেইজিং কথা বলবে বলেও তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন। ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পারিকর ১৮ এপ্রিল বেইজিং যাচ্ছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তবে দুই দেশের কেউই এখন পর্যন্ত দুই দিনের এই সফরের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেনি।

 

পানামা পেপার্স : সামাজিক প্রতিবাদের উত্থান

মোহাম্মদ হাসান শরীফ::

বিশ্বজুড়ে এখন একটাই আলোচনা- পানামা পেপার্স। বিশ্বের ৯৯ ভাগ মানুষ যে আশঙ্কা এত দিন করে আসছিল, সেটাই অকাট্যভাবে প্রমাণ করেছে এই পানামা পেপার্স। এখন যা হওয়া উচিত, বিশ্বের ওপর ছড়ি ঘোরানোর কাজে নিয়োজিত বাকি ১ ভাগের কাছ থেকে বকেয়া কর আদায় করে তাদেরকে কারাগারে পাঠানো।

তবে এটাও অনেকের কাছে চমক সৃষ্টিকারী কোনো খবর নয়। বিপুল ফাঁসের মানে হলো সমাজ পরিবর্তনের সম্ভাবনা- এটাই হলো পানামা পেপার্সের আসল তাৎপর্য।

পানামা পেপার্স আসন্ন ফাঁসকরণ যুগের প্রতিনিধিত্ব করছে। এই অ্যাক্টিভিস্ট তত্ত্বটি সবচেয়ে প্রচন্ডভাবে প্রচার করেছে উইকিলিকস। এতে বলা হয়, সত্য, তথ্য উদঘাটন সামাজিক প্রতিবাদের একটি কার্যকর মাধ্যম। অবশ্য নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, এটা কোনো নতুন আইডিয়া নয়। বাইবেলে আছে : ‘তুমি সত্যকে জানবে, সত্য তোমাকে মুক্ত করবে।’ (জন ৮:৩২)। তবে জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ, চেলসি ম্যানিং এবং অ্যাডওয়ার্ড স্নোডেনের মতো বৈশ্বিক হুইসেল- ব্লেয়ারের উত্থানে ফাঁসকরণ এখন ক্রমবর্ধমান হারে সমসাময়িক অ্যাক্টিভিজমের সবচেয়ে পরিচিত কৌশলে পরিণত হয়েছে।

এই ফাঁসের আরেকটি তাৎপর্য রয়েছে। বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দার কথা বলে গরিব মানুষদের বঞ্চিত করা হচ্ছে। একদিকে শাসকশ্রেণী গোপনে অর্থপাচার করছে, অন্যদিকে শ্রমিকদের মজুরি কমানোর জন্য চাপ দিচ্ছে। অর্থাৎ অর্থনৈতিক মন্দা একটা মিথ্যা প্রচারণা। ধনীরা কর না দিয়ে অর্থ পাচার করার কারণেই এর সৃষ্টি।

কত অর্থ পাচার হচ্ছে? দি ট্যাক্স জাস্টিজ নেটওয়ার্ক নামের একটি গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠানের হিসাব অনুযায়ী বিশ্বের মোট সম্পদের ৮ থেকে ১৩ ভাগ তথা ২১ থেকে ৩২ ট্রিলিয়ন ডলার ট্যাক্স হেভেনগুলোতে পাচার করা হয়েছে।

পানামা পেপার্স ফাঁসকরণের কার্যকারিতা পরীক্ষার অনন্য সুযোগ এনে দিয়েছে। পানামা পেপার্স যৌক্তিকভাবে একটি নিখুঁত ফাঁস। প্রথমত, আকারটি সমীহ সৃষ্টিকারী : বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠানের কাছে থাকা ৪০ বছরের রেকর্ড, সোয়া কোটি ফাইল এবং ২.৬ টেরাবাইট ডাটা। এটা একটা পূর্ণাঙ্গ ফাঁস, এর সামনে মানব ইতিহাসে আগের সব ফাঁসের ঘটনা নিতান্তই নগণ্য। দ্বিতীয়ত, অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য শত শত আন্তর্জাতিক সাংবাদিকের গোপনে এক বছরের কাজের নজিরবিহীন ঘটনার ফসল এটি। এটা ফাঁসকরণের বৈশ্বিক পেশাকরণ।

তাহলে কি সত্যিই পানামা পেপার্স ইতিবাচক সামাজিক পরিবর্তন ঘটাবে?

এই ফাঁস রাজপথে বিক্ষোভের সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। পার্লামেন্টে ১০ হাজারের বেশি বিক্ষোভকারীর উপস্থিতিতে ইতোমধ্যেই আইসল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী সিগমুন্ডার ডেবিও গুন্লাগসন পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন পানামা পেপার্সে তার ও তার স্ত্রীর নাম থাকার জের ধরে। মনে রাখা দরকার, এই দফার পানামা পেপার্সে ১৪৩ জন রাজনীতিবিদের নাম আছে। এদের মধ্যে রয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট, আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট, সৌদি আরবের বাদশাহ, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী, ব্রিটিশ হাউজ অব লর্ডসের ছয় সদস্য, চীনা পলিটব্যুরোর সাথে সম্পর্কিত আটটি পরিবার এবং বেশ কয়েকজন ব্রাজিলিয়ান। অনেক দেশেই ব্যাপক বিক্ষোভ হতে পারে বলে ধারণা করার যৌক্তিক কারণ রয়েছে।

পানামা পেপার্সের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় কয়েকটি সরকারের ওপর অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হতে পারে। আগামী দিনে বেশ কয়েকজন অত্যন্ত শক্তিশালী নেতা তাদের বৈধতা হারাতে পারেন। টাইম ম্যাগাজিনের সম্পাদকীয়তে রানা ফুরোহারের মতে, ‘পানামা পেপার্স পুঁজিবাদের সবচেয়ে বড় সঙ্কট সৃষ্টি করতে পারে।’

তবে সঙ্কট ও সামাজিক পরিবর্তনের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। পুঁজিবাদের প্রকৃতির মধ্যেই সঙ্কটের অপরিহার্য বসবাস। সঙ্কটের রেশ ধরে গুটিকতেক রাজনীতিবিদ খসে পড়তে পারেন, কিন্তু তাতে সঙ্কটের সুরাহা হয় না। কারণ আমাদের বিশ্বটি ১% ভন্ডের দুঃশাসনে নিপীড়িত হচ্ছে।

তবে বিশাল ফাঁস এবং বিরাট বিক্ষোভের ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন হওয়ার বিশ্বাসে বিশ্বাসী হওয়ার আগে আমাদের আরো ভালোমতো চিন্তা-ভাবনা করা উচিত। উইকিলিকস ও অ্যাডওয়ার্ড স্নোডেনের বিপুল তথ্য ফাঁস একটু ঢেউ তুলে কি আবার আগের মতোই হয়ে যায়নি। ২০১১ সালে ৮২টি দেশে আর্থিক কেন্দ্রগুলোতে ব্যাপক বিক্ষোভের পরও কি ধনী ও ক্ষমতাধরেরা বহাল তবিয়তে রয়ে যায়নি?

তবে অতীতে কিছু হয়নি বলে সব আশা ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। বরং আশায় বুক বেঁধে এবার ভিন্নভাবে বিক্ষোভে নামতে হবে। পানামা পেপার্সের সবচেয়ে সুন্দর বিষয়টি হলো, এতে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে, প্রতিটি দেশের লোকজন একই বৈশ্বিক শত্রুর মুখে রয়েছে। আপনি যুক্তরাজ্য, ব্রাজিল, রাশিয়া বা পাকিস্তানে- কোথায় আছেন তা কোনো ব্যাপার নয়। নিরেট সত্য হলো, অতি ধনীরা তাদের ক্ষমতা অটুট রাখতে সম্পদকে ব্যবহার করে, তবে একই সঙ্গে তারা করও ফাঁকি দেয়।

পানামা পেপার্সের মাধ্যমে জানা যাচ্ছে, বিশ্ব আজ ভুল লোকের খপ্পরে পড়েছে। ৯৯% মাত্র একভাবেই গভীরতর সমস্যাটির সমাধান করতে পারে। সেটা হলো এমন এক সামাজিক আন্দোলন সৃষ্টি করা যাতে, বিভিন্ন দেশে তারাই নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় গিয়ে বিশ্বকে পরিচালনা করতে পারে। পানামা পেপার্স সফল হবে, যদি এটা ওই উচ্চতর লক্ষ্য অর্জনে একটি ধাপেও অগ্রগতি হাসিল হয়।

(ওয়েবসাইট অবলম্বনে)

ধর্ষণ যুদ্ধাপরাধ : আন্তর্জাতিক আদালতের রায়

আসিফ হাসান ::

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) সম্প্রতি ধর্ষণকে যুদ্ধাস্ত্র এবং ওই কর্মকান্ডকে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে অভিহিত করে রায় দিয়েছে। ২০০২ সালে দি হেগে আদালতটির কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর এই প্রথম এ ধরনের রায় দিল। আদালতটি এছাড়াও প্রথমবারের মতো ‘নেতৃত্বের দায়-দায়িত্বের’ (কমান্ড রেসপনসিবিলিটি) জন্যও কাউকে দোষী সাব্যস্ত করেছে। আদালত ‘মুভমেন্ট ফর দি লিবারেশন অব দি কঙ্গোর’ প্রধান এবং কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতনের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জ্যাঁ-পিয়েরে বেম্বার বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও লুটতরাজসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে রায় দেয়। তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হলেও কত বছরের জেল দেওয়া হয়েছে, তা এখনো জানানো হয়নি।

এর মানে হচ্ছে, কোনো কমান্ডার নিজে ধর্ষণ, খুন বা লুটপাট করার মতো অপরাধে সম্পৃক্ত না থাকলেও তার বাহিনীর অন্য সদস্যদের তা করার অনুমতি দিলে তিনি দোষ্য সাব্যস্ত হবেন। বেম্বার অপরাধমূলক কাজ ঘটেছিল ২০০২ থেকে ২০০৩ সালের মধ্যে। ওই সময় তার প্রায় ১৫ শ’ সদস্যবিশিষ্ট শক্তিশালী মিলিশিয়া বাহিনী সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকের (সিএআর) সীমান্তজুড়ে শত শত লোককে হত্যা করে বলে অভিযোগ রয়েছে।

আফ্রিকারসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কর্মীদের বেশির ভাগই এই রায়কে সমর্থন করলেও আফ্রিকান ইউনিয়ন এবং বেশির ভাগ আফ্রিকান সরকার এখন পর্যন্ত অভিমত প্রকাশে বেশ সংযত রয়েছে। আফ্রিকার প্রায় সব সরকার এবং সাধারণ মানুষ, অনেক আইন বিশেষজ্ঞদের ধারণা -এই আদালত আফ্রিকার-বৈরী। তাদের এমনটা মনে হওয়ার অন্যতম কারণ হলো, আদালত এখন পর্যন্ত তাদেরকে অভিযুক্ত করা হয়েছে, তাদের সবাই আফ্রিকান।  বেম্বাকে ২০০৮ সালে বেলজিয়ামে গ্রেফতার করে হেগে পাঠানো হয়। ২০১০ সালে সেখানেই তার বিচারকাজ শুরু হয়।

তবে আইসিসি অবশ্য নিজেকে আফ্রিকান-বিরোধী হিসেবে পাশ্চাত্যের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছে। আদালতের প্রধান প্রসিকিউটর ফাতু বেনসুদা এবং সিনিয়র আইন কর্মকর্তা জাঁ-জ্যাকস বাডিবাঙ্গা যথাক্রমে গাম্বিয়া ও কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের নাগরিক। বিচারকেরা ছিলেন ব্রাজিল, কেনিয়া ও জাপানের এবং সবাই নারী।

ক্ষতিগ্রস্তদের আইনজীবী ম্যারি-এডিথ ডুমিজাম-লসন অবশ্য এই বিচারে খুশি। বেম্বা ও তার অনুসারীদের বিচারে ৫,২০০-এর বেশি লোক সাক্ষী দিয়েছিল। ম্যারি-এডিথ বলেন, বেশির ভাগ ধর্ষণ ও লুটতরাজ হয়েছিল প্রকাশ্যে, সম্মিলিতভাবে। এটা করা হয়েছিল, শান্তিপূর্ণ নাগরিকদের মধ্যে ভীতি সৃষ্টির লক্ষ্যে।

ধর্মীয় উগ্রতা প্রশ্নে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বৈরিতা

মোহাম্মদ হাসান শরীফ, ইকোনমিস্ট থেকে–
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্ক সাম্প্রতিক সময়ে বেশ ফুলে ফেঁপে ওঠেছে। বিকাশমান বাণিজ্যিক যোগাযোগ, অভিন্ন কৌশলগত উদ্বেগ এবং সমৃদ্ধিশীল ভারতীয় বসতি বন্ধুত্বকে মজবুত করে তুলছে। তবে নিরেট বাস্তবতা হলো উভয় দেশে থাকা বিপুল, বৈচিত্র্য ও বিরোধের জায়গায় ভর্তি- যেগুলো পরিস্থিতি কঠিন করে তুলতে পারে। এসবে এমন একটি আছে যা উভয় দেশ, উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে। সেটা হলো ধর্মীয় স্বাধীনতার সংজ্ঞা।
আমেরিকার ধর্মীয়-স্বাধীনতার দূতদের সৌদি আরব, পাকিস্তান ও চীনের মতো অ-মুক্ত স্থানগুলো সফর করতে পারলেও তৃতীয়বারের মতো ভারতে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। গত ৪ মার্চ ‘ইউনাইটেড স্টেটস কমিশন অন ইন্টারন্যাশনাল রিলিজিয়াস ফ্রিডমের (ইউএসসিআইআরএফ) একটি প্রতিনিধি দলের ভারত যাত্রা শুরু করার কথা ছিল। কিন্তু তারা ভিসা পায়নি। সংস্থাটির কমিশনার ও সাবেক চেয়ারম্যান ক্যাটরিনা ল্যান্টস সুইট বলেছেন, ‘আমরা খুবই হতাশ, এটা সত্যিই সুযোগ হারানো।’
মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এটাকে দুঃখজনক হিসেবে অভিহিত করেছে। কিন্তু ওয়াশিংটন ডিসিতে ভারতীয় দূতাবাস বলেছে, ভারতে সাংবিধানিকভাবে নিশ্চয়তা দেওয়া অধিকার-পরিস্থিতি নিয়ে রায় প্রদান করতে ইচ্ছুক কোনো বিদেশী সংস্থাকে অনুমতির কোনো অবকাশ তারা দেখছে না। এর জবাবে ক্যাটরিনা ল্যান্টস বলেছেন, তাদের সফরের রায় প্রদানের কোনো উদ্দেশ্য ছিল না, বরং মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরকে দেওয়া কমিশনের পরামর্শগুলো ঠিকমতো পৌঁছেছে কিনা তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য একটি নিম্নপর্যায়ের প্রতিনিধিদল পাঠানোর পরিকল্পনা করা হয়েছিল। পরিদর্শকদের আমেরিকান মূল্যবোধ ভারতের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার কোনো ইচ্ছাই ছিল না। তারা বরং সব দেশের পালনীয় আন্তর্জাতিক যে মানদন্ডে ভারত স্বাক্ষর করেছে, সেটা কতটা পালিত হচ্ছে, সেটা খতিয়ে দেখত। কমিশনের অন্যতম উদ্বেগ হলো ভারতের কয়েকটি রাজ্যে ‘ধর্মান্তরবিরোধী’ আইন প্রয়োগ। হিন্দুদের খ্রিস্টান বা ইসলামে ধর্মান্তর ঠেকাতেই মূলত আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছে।
নরম করে বলা যায়, ইউএসসিআইআরএফ ও ভারতীয় নেতৃবৃন্দ বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে কিছুটা জটিল ইতিহাস রয়েছে। ২০০৫ সালে এই যুক্তিতে মোদিকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি যে, গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময় ২০০২ সালে সেখানে সংগঠিত ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার জন্য তিনিও দায়ী। তাকে ১৯৯৮ সালের আমেরিকার ধর্মীয়-স্বাধীনতা আইনের আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়। ওই আইনের আওতাতেই ফেডারেল সরকারের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত, তবে স্বাধীন তদারকি সংস্থা হিসেবে ইউএসসিআইআরএফ প্রতিষ্ঠিত হয়। সংস্থাটি কয়েক বছর পর্যন্ত কিছুটা সফলতার সাথে মোদির ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখতে সক্ষম হয়েছিল। গুজরাট দাঙ্গা এবং এর তদন্ত নিয়ে মোদির অবস্থানকে মেনে না নেওয়ার বিষয় ছিল এটা। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০১২ সালের নভেম্বরে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে সংস্থাটি জানায়, গুজরাট প্রশ্নে ‘পুরোপুরি স্বচ্ছ’ না হওয়া পর্যন্ত মোদিকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে দেওয়া উচিত হবে না।
এসব সিদ্ধান্ত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পক্ষে-বিপক্ষে প্রচ- বিতর্ক হয়। আমেরিকান কট্টর খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী এবং যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী অহিন্দু বংশোদ্ভূতরা দাবি করে, মোদির ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বিরুদ্ধে তাদের হিন্দু জাতীয়তাবাদী নীতি অন্যান্য ধর্মের জন্য বিপর্যয়কর। তবে আমেরিকায় হিন্দু জাতীয়তাবাদী হিন্দুদের মধ্যে বিজেপির বিপুল ও সোচ্চার অনুসারী রয়েছে। এমনকি মোদিকে সশরীরে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে বাধা দেওয়া হলে ভিডিও ক্লিপিংসের মাধ্যমে হলেও বক্তা হিসেবে তার উপস্থিতির দাবি তোলা হয়েছে। ভারতের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিরোধ যুক্তরাষ্ট্রেও পাড়ি দিয়েছে।
মোদি ২০১৪ সালে নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রী হলে তাকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ থেকে বাদ দেওয়া অব্যাহত রাখার কোনো প্রশ্নটি টিকে থাকেনি। তিনি ও বারাক ওবামা কয়েক দফা উচ্চ পর্যায়ের সভা করেন। ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রশ্নে আমেরিকার নির্বাচকম-লীর অনুভূতি এত প্রবল ছিল যে, ২০১৫ সালের জানুয়ারি ভারত সফরের সময় প্রেসিডেন্ট ওবামাকে সব ধর্ম যাতে বিকশিত হতে পারে, তার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে অন্তত কিছু সুপরামর্শ দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। মেহমানের বক্তব্য তার মেজবান পছন্দ না করলেও আমেরিকার কিছু ভোটারকে তা সন্তুষ্ট করেছে।
গত মাসে আট আমেরিকান সিনেটর এবং ২৬ প্রতিনিধি পরিষদ সদস্য ভারতের খ্রিস্টান, মুসলমান ও শিখদের প্রতি আচরণ নিয়ে ‘বিশেষ উদ্বেগ’ প্রকাশ করে মোদিকে একটি চিঠি দিয়েছেন। চিঠিতে তারা বলেন, ৫০টি গ্রাম পরিষদ অ-হিন্দু রীতিনীতিকে অপরাধমূলক কার্যক্রম ঘোষণা করায় ছত্তিশগড়ের খ্রিস্টান ও অন্যান্য সংখ্যালঘুরা দুর্ভোগে রয়েছে; হিন্দু ধর্মে নিষিদ্ধ গরু খাওয়া নিয়ে মুসলমানরা আইন হাতে তুলে নেওয়া লোকজনের সহিংসতার মুখে রয়েছে; আলাদা ধর্মের স্বীকৃতি না দেওয়ায় শিখরা হতাশ হয়ে পড়েছে। তবে একজন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখছেন, এই বোধ থাকায় আমেরিকান আইন প্রণয়নকারীরা তাদের বক্তব্যকে বেশ সতর্কভাবে সংযত রেখেছেন। তারা ‘ধর্মের পূর্ণ স্বাধীনতা’ দেওয়া হবে বলে মোদির দেওয়া প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ‘তা বাস্তবায়ন করার জন্য’ তার প্রতি অনুরোধ জানান।
নিঃসন্দেহে বলা যায়, আমেরিকার এসব আইন প্রণয়নকারীর মতে, মোদিকে চিঠি লিখে আসলে তারা তাদের ভোটারদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করছেন। তবে ওই বক্তৃতায় কর্ণপাত করার কোনো ইচ্ছা সম্ভবত ভারতের বর্তমান ক্ষমতাসীনদের নেই। চাপ প্রয়োগ করা হলে সম্ভবত তারা বলে দেবেন, দুনিয়া এখন বদলে গেছে, বৈশ্বিক বিষয়াদিতে আমেরিকার তুলনামূলক প্রাধান্য ১৯৯৮ সাল থেকে আর আগের মতো নেই।

ভারতের আপত্তিতে অনিশ্চয়তায় গঙ্গা ব্যারেজ

মোহাম্মদ হাসান শরীফ, ফার্স্টপোস্ট থেকে
দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় এলাকায় পানিস্বল্পতা নিরসনে পদ্মায় একটি (গঙ্গা) ব্যারেজ নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিল বাংলাদেশ। কিন্তু ভারত এখন পর্যন্ত পরিকল্পনাটি গ্রহণ না করায় সেটা ঝুলে রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আগের আমলে ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে বাংলাদেশ গঙ্গা ব্যারেজ প্রকল্প প্রস্তাব নিয়ে কাজ শুরু করেছিল।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই সম্ভাবতা যাচাই করে ফেলেছে। রাজবাড়ী জেলার পাংশায় নির্মিতব্য ২.১ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রস্তাবিত ড্যামটি হবে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের ফারাক্কা ব্যারেজ থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার ভাটিতে।
বাংলাদেশ পদ্মা নামে পরিচিত গঙ্গা। আর এটি হলো বাংলাদেশের ভূপৃষ্ঠের পানির অন্যতম উৎস। পানি স্বল্পতা ও লবণাত্মকতা এই অঞ্চলের অভিন্ন সমস্যা। এ থেকে মুক্তি পেতেই ব্যারেজটি নির্মাণে বাংলাদেশ সর্বাধিক অগ্রাধিকার দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে সমুদ্র-স্তর বেড়ে যাওয়ায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাত্মক্ততার সৃষ্টি হচ্ছে। প্রস্তাবিত ড্যামটি নদীগুলোর মাধ্যমে পানি ছেড়ে দিয়ে লবণের মাত্রা কমিয়ে আনবে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতের সমর্থন না থাকলে প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়া হবে কঠিন কাজ।
ভারতের আপত্তি : নয়া দিল্লি ২০১৫ সালের প্রথম দিকে বাংলাদেশ সরকারের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়ে জানায়, ভারতের কারিগরি বিশেষজ্ঞরা ঢাকার পাঠানো প্রকল্প নথিপত্র যাচাই করে এই ড্যাম ভারতে বন্যা সৃষ্টি করবে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। গঙ্গা পশ্চিমবঙ্গের সমতল ভূমি দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। ভারতীয় চিঠিতে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়, নদীটির পানির স্তর সামান্য বাড়লেও বাংলাদেশ সীমান্ত-সংলগ্ন ভারতের বিপুল এলাকা ডুবে যাবে। ঢাকাকে বৈজ্ঞানিক মডেলসহ পুুরো সমীক্ষা প্রতিবেদন পাঠানোর অনুরোধ জানিয়ে নয়া দিল্লি বলেছে, তারা নিশ্চিত হতে চায়, ড্যামের ফলে ভারতীয় ভূখ-ে পানির উচ্চতা বাড়বে না।
বাংলাদেশের পানিসম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ভারত যেসব নথিপত্রের জন্য অনুরোধ করেছিল, সেগুলোর সবই পাঠানো হয়েছে, কিন্তু নয়া দিল্লি এখন পর্যন্ত কোনো সাড়া দেয়নি। নভেম্বরে ভারত সফরকারলে আনিসুল ইসলাম মাহমুদ তার ভারতীয় সমকক্ষ উমা ভারতীর সাথে সাক্ষাত করেছিরেন। তখন তিনি খুব শিগগিরই ভারতের অবস্থান জানাবেন বলে আশ্বাস দিয়েছিলেন।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এ ধরনের বিশাল কোনো ড্যাম নির্মাণ করা বাংলাদেশের একার পক্ষে সম্ভব নয় বলেই ভারতের সহযোগিতা কামনা করেছে। বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারত আরেকটি আন্তর্জাতিক নদী তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন নিয়ে রাজনৈতিক মতানৈক্যে রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের এক অধ্যাপক প্রকল্পটির ব্যাপারে বলেন, ‘ভারতীয় ভূখ-ে বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি হবে- এ ধরনের কারিগরি ইস্যু তুলে ভারত (গঙ্গা) প্রকল্পটি বন্ধ করে দিতে পারে এমন আশঙ্কায় ভারতের সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ।’ তিনি বলেন, তবে বাংলাদেশের মতো ভাটির দেশের কোনো প্রকল্প উজানের দেশের জন্য ক্ষতিকর হওয়ার আশঙ্কা খুবই কম। তিনি বলেন, ভারত যেসব কারিগরি প্রশ্ন তুলেছে, বাংলাদেশের উচিত সেগুলোর দ্রুত জবাব দেওয়া। গত অক্টোবরে বাংলাদেশে নিযুক্ত বিদায়ী ভারতীয় হাইকমিশনারের সাথে বৈঠককালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ড্যাম প্রকল্পটিতে ভারতের সম্পৃক্ততার ওপর গুরুত্বারোপ করেছিলেন।
চীনা সমর্থন?
সমীক্ষা অনুযায়ী, সাত বছরে প্রকল্পটি শেষ করতে প্রায় চার বিলিয়ন ডলার দরকার হবে। কিন্তু এই তহবিলের সংস্থান করতে পারেনি। পানিমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেছেন, গঙ্গা-নির্ভরশীল এলাকায় বর্ধিত কৃষি ও মৎস চাষ এবং সেইসাথে ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে। ফলে পাঁচ বছরের মধ্যেই ব্যারেজ প্রকল্পের ব্যয় ওঠে আসবে।
চীনা প্রতিষ্ঠান হাইড্রোচায়না করপোরেশন ড্যামটি নির্মাণে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। প্রকল্পটির অর্থায়ন নিয়ে তারা বাংলাদেশের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সাথে কয়েকবার বৈঠকও করেছে হাইড্রোচায়না করপোরেশন কর্মকর্তাদেরসাথে। তাদের মতে, চীন সরকার পাঁচ বছরের জন্য বাংলাদেশকে সহজ শর্তে ২০ বিলিয়ন ঋণ দিতে আগ্রহী। হাইড্রোচায়না করপোরেশনের ব্যবসায়িক উন্নয়ন ম্যানেজার ঝাও ইয়াং বলেন, আমরা প্রস্তাবিত গঙ্গা ব্যারেজ প্রকল্পটি বাস্তবায়নে খুবই আগ্রহী। দুই সরকারের আলোচনার মাধ্যমে তহবিলের ব্যবস্থাও হতে পারে।
গঙ্গা ব্যারেজ ১৬৫ কিলোমিটার দীর্ঘ রিজার্ভার সৃষ্টি করবে। ৬২,৫০০ হেক্টর জমিতে ২.৯ বিলিয়ন কিউবিক লিটার পানি মজুতের সক্ষমতা থাকবে এর। মন্ত্রীর ভাষ্যানুযায়ী, ১২৩টি আঞ্চলিক নদীর মাধ্যমে ২৬ জেলায় পানি সরিয়ে নেওয়া যাবে।
ড্যামটি নির্মাণ করা গেলে পানির স্বল্পতা এবং দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে পানির দূষণ প্রতিরোধ করা যাবে বলে বিশেষজ্ঞরা অভিমত প্রকাশ করেছেন। নদীতে পানি নিয়ন্ত্রণ কাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে রিজার্ভারের পানি সারা বছর ব্যবহার করা যাবে। এই পানি সেচ, নৌচলাচল ও লবণাত্মক্ততা দূর করার কাজে লাগবে।
ভারপ্রাপ্ত প্রকল্প পরিচালক রওশন আলী খান বলেন, রিজার্ভারের মাধ্যমে গঙ্গা বেসিন থেকে পানি নির্গমনের ফলে নদীগুলোতে পলিভরাট সমস্যার সমাধান হবে, পানি নিষ্কাষণ সহজ করে দেবে।
এটা বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও বনসম্পদ রক্ষাও করবে বলে তিনি জানান।

অস্ত্র বিক্রি : ভারতসহ উদীয়মান উৎপাদনকারীরা এগিয়ে

আসিফ হাসান
বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম একটি অনুষঙ্গ অস্ত্র। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (সিপরি) এই বাণিজ্যের নানা দিক তুলে ধরেছে আন্তর্জাতিক অস্ত্র বিক্রয় সংক্রান্ত এক রিপোর্টে। তাদের হিসাব মতে, টানা চতুর্থ বছরের মতো অস্ত্র ও সামরিক খাতের বিভিন্ন বিক্রি কমেছে । তবে সেটা সার্বিক হিসাবে নয়, শীর্ষ ১০০ বৃহত্তম অস্ত্র উৎপাদনকারী কোম্পানির অস্ত্র বিক্রির দিক থেকে। ওই শীর্ষ ১০০ বৃহত্তম অস্ত্র উৎপাদনকারী কোম্পানির আয় হয়েছে শুধুমাত্র ২০১৪ সালেই ৪০১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিম ইউরোপের কমেছে : শীর্ষ ১০০ অস্ত্র বিক্রেতা কোম্পানির তালিকায় মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর আধিপত্য অব্যাহত রয়েছে। মোট বাজারের ৫৪.৪ ভাগ তাদের দখলেই। ২০১৩ ও ২০১৪ সালের মধ্যে মার্কিন কোম্পানিগুলোর অস্ত্র বিক্রি কমেছে ৪.১ ভাগ। ২০১২-১৩ মেয়াদেও একই অবস্থা দেখা গিয়েছিল। তবে অনেকের কমলেও কয়েকটি কোম্পানির বিক্রি বেড়েই চলেছে। সেটা হলো লকহিড মার্টিন। তারা ২০০৯ সাল থেকে শীর্ষ ১০০-এ স্থান ধরে রেখেছে। ২০১৪ সালে তাদের অস্ত্র বিক্রি ৩.৪ ভাগ বেড়ে ৩৭.৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। অস্ত্র বিক্রি বাড়ায় তাদের সাথে দ্বিতীয় স্থানে থাকা বোয়িংয়ের সাথে ব্যবধানও বাড়ছে। ২০১৪ সালে বোয়িংয়ের বিক্রি ছিল ২৮.৩ বিলিয়ন ডলার।
আর ২০১৫ সালে হেলিকপ্টার প্রস্তুতকারী সিকোরস্কি এয়ারক্রাফট করপোরেশন কিনে নেওয়ায় লকহিড মার্টিন এবং শীর্ষ ১০ থাকা অন্য কোম্পানিগুলোর মধ্যকার ব্যবধান আগামী বছর আরো বাড়বে। এই ধারণাটি দিয়েছেন সিপরির অস্ত্র ও সামরিক ব্যয়বিষয়ক কর্মসূচির পরিচালক আউড ফ্লয়েন্ট।
২০১৪ সালে পশ্চিম ইউরোপের কোম্পানিগুলোর অস্ত্র বিক্রি ৭.৪ ভাগ কমেছে। কেবল জার্মান (+৯.৪ শতাংশ) ও সুইস (+১১.২ শতাংশ) কোম্পানিগুলো প্রকৃত অর্থে অস্ত্র বিক্রি বাড়াতে পেরেছে। অস্ত্র বিক্রিতে জার্মানির তাৎপর্যপূর্ণ বৃদ্ধির পেছনে রয়েছে জার্মান জাহাজ নির্মাণ কোম্পানি থাইসেনক্রাপের (+২৯.৫ ভাগ) বিক্রি বেড়ে যাওয়া। অন্যদিকে সুইজারল্যান্ডের পিলাটাস এয়ারক্রাফট লাভবান হচ্ছে প্রশিক্ষণ বিমানের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায়। শীর্ষ ১০০-এ থাকা ইউরোপিয়ান কোম্পানির মধ্যে যে সাতটির বিক্রি কমেনি, এই দুটি তাদের অন্যতম।
রুশ অস্ত্র বিক্রি বাড়ছেই : রাশিয়ার অর্থনীতি সমস্যায় থাকলেও তাদের অস্ত্র শিল্প বেশ চাঙ্গা দেখা যাচ্ছে। ২০১৪ সালে তাদের অস্ত্র শিল্প বেশ ভালো ছিল। ২০১৪ সালে শীর্ষ ১০০ কোম্পানির মধ্যে ১০.২ ভাগ তথা ১১টি ছিল রুশ। আগে তাদের সংখ্যা ছিল ৯। শীর্ষ ১০০-এ সম্পূর্ণ নতুন হিসেবে প্রবেশ করেছে হাই প্রিসিশন সিস্টেমস (৩৯তম) ও আরটিআই (৯১তম)। আর নতুন প্রতিষ্ঠিত ইউনাইটেড ইনস্ট্রমেন্ট ম্যানুফেকচারিং করপোরেশন (ইউআইএমসি) ২৪তম হিসেবে তালিকায় ঢুকেছে। তারা সোজভেজডাইয়ের স্থান দখল করেছে। এই কোম্পানিটি ইউআইএমসি গঠন করতে অন্য কোম্পানিগুলোর সাথে মিলে গেছে। রুশ যেসব কোম্পানির অস্ত্র বিক্রি বেড়েছে তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সাফল্য পেয়েছে উরালভ্যাগোনজাভদ। তাদের অস্ত্র বিক্রি বেড়েছে ৭২.৫ ভাগ। আরমাজঅ্যানটের বিক্রি বেড়েছে প্রায় ২৩ ভাগ। তারা এখন ১১ নম্বর স্থানে আছে।
সিপরির সিনিয়র রিসার্চার সাইমন ওয়েজম্যানের মতে, ২০১৩-১৪ সালে রুশ কোম্পানিগুলোর প্রবৃদ্ধি ছিল ৪৮.৪ শতাংশ।
বিপরীতে ইউক্রেনের কোম্পানিগুলোর অস্ত্র বিক্রি ব্যাপকভাবে কমে গেছে। ২০১৩ সালে ৫৮তম স্থানে থাকা উক্রোবোনোন-প্রম ২০১৪ সালে ৯০তম স্থানে নেমে গেছে। তাদের বিক্রি কমেছে ৫০.২ শতাংশ। দেশটির আরেক কোম্পানি মোটর সিচের বিক্রি কমে যাওয়ায় শীর্ষ ১০০ তালিকা থেকেই বাদ পড়ে গেছে। ইউক্রেনের অস্ত্র বিক্রি কমে যাওয়ার কারণ হলো দেশটির পূর্বাঞ্চলে সংঘর্ষ, রাশিয়ার বাজার হারানো এবং স্থানীয় মুদ্রার মূল্য পড়ে যাওয়া।
উদীয়মান উৎপাদনকারীদের অবস্থান জোরদার হচ্ছে : সিপরি ২০১৩ সালে ‘উদীয়মান বাজার’ পরিভাষাটি প্রথমবারের মতো ব্যবহার করেছিল। যেসব দেশ তাদের সামরিক শিল্পকে চাঙ্গা করা শুরু করেছিল, তাদের অবস্থা বোঝানোর জন্যই ছিল এই উদ্যোগ। ২০১৪ সালে এই ক্যাটাগরিতে ছিল ব্রাজিল, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া ও তুরস্ক। ২০১৩ ও ২০১৪ সালের মধ্যে তাদের বিক্রি ৫.১ ভাগ বেড়েছে।
দুটি তুর্কি কোম্পানির শীর্ষ ১০০-এ রয়েছে। ২০১৪ সালে আসেলস্যানের বিক্রি ৫.৬ ভাগ বাড়লেও তাদের স্থান ৬৬তম থেকে ৭৩-এ নেমে গেছে। আর টার্কিশ অ্যারোস্পেশ ইন্ডাস্ট্রির (টিএআই) বিক্রি ১৫.১ ভাগ বাড়ায় তারা ৮৯তম হিসেবে শীর্ষ ১০০ তালিকায় প্রবেশ করেছে।
সিপরির সিনিয়র রিসার্চার সাইমন ওয়েজম্যান বলেন, অস্ত্রের দিক থেকে তুরস্ক আত্মনির্ভরশীল হতে চাচ্ছে। এ কারণেই তারা বেশ আগ্রাসীভাবে রফতানি বাড়াচ্ছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার কোম্পানিগুলো শীর্ষ ১০০-এ স্থান উন্নত করেছে। এশিয়ার ১৫টি কোম্পানি (চীনকে এই হিসাবে রাখা হয়নি) শীর্ষ ১০০-এ স্থান করে নিয়েছে। ওয়েজম্যানের মতে, এশিয়ার অনেক কোম্পানি তাদের বিক্রি স্থিতিশীল রেখেছে। তবে দক্ষিণ কোরিয়ান কোম্পানিগুলো ২০১৩ সালের চেয়ে ২০১৪ সালে বিক্রি বাড়িয়েছে ১০.৫ ভাগ। শীর্ষ ১০০-এ যোগ দেওয়া নতুন দক্ষিণ কোরিয়ান কোম্পানি হলো হুনদাই রোটেম। তারা সামরিক যানবাহন তৈরি করে।

সৌদি-ইরান সম্পর্ক এবং কমছে তেলের দাম

মোহাম্মদ হাসান শরীফ, ফরেন পলিসি অবলম্বনে

তেল উৎপাদনকারী সংস্থা ওপেকের বৃহত্তম দুই সদস্য সৌদি আরব ও ইরানের বাদানুবাদের তীব্রতা ইতোমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ এবং মস্কো থেকে বেইজিং পর্যন্ত কূটনীতিবিদদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। সবার আশঙ্কা ছিল বিশ্ব অর্থনীতির রক্তপ্রবাহ তেল নিয়ে। অথচ এর মধ্যে তেলের দাম কমে যাচ্ছে। সস্তা তেলে বিশ্ব ভেসে যাওয়ার উপক্রম ঘটেছে। 

এক শিয়া ধর্মনেতার ফাঁসি কার্যকর নিয়ে রিয়াদতেহরান উত্তেজনা বাড়ার প্রেক্ষাপটে ইরানের সাথে সৌদি আরবের কূটনীতিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়। এই ঘটনায় তেল ব্যবসায়ীরা প্রথমে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন। বিস্তারিত »