Home » আন্তর্জাতিক (page 3)

আন্তর্জাতিক

আরেক জুনের স্মৃতি

ক্ষমতায় যদি সংখ্যাগরিষ্ঠতাসম্পন্ন সরকার থাকে, তখনই কেবল কর্তৃত্ববাদী শাসন ঘোষনা সম্ভব। আর কর্তৃত্ববাদী শাসন তখনই সম্ভব যখন সরকার প্রধান হিসেবে থাকেন  বিপুল কর্মক্ষম ও জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী……

ফ্যালি এস. নরিম্যান

অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ ::

আমার কাছে জুন হলো স্মৃতির মাস : ২৬ জুন ‘জরুরি অবস্থা ঘোষনা দিবস’- আমি এই নামেই একে অভিহিত করে থাকি, আগে দিয়ে ঘটা একটার পর একটা ঘটনা মনে পড়ে। ওই জরুরি অবস্থা ঘোষনা দিবসের কিছু স্মৃতি প্রকাশ করার সময় এখনই। মনে পড়ে ১৯৭৫ সালের ১২ জুন দিনটির কথা। ওই দিনই ইন্দিরা গান্ধীর বিরুদ্ধে রাজ নারায়নের দায়ের করা নির্বাচনী মামলার রায় প্রকাশ করে এলাহাবাদ হাইকোর্ট। এতে অসাধুতা অবলম্বনের দায়ে ইন্দিরা গান্ধীকে দোষী সাব্যস্ত করে ছয় বছরের জন্য সব ধরনের সরকারি পদ গ্রহণে তাকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। কয়েক দিন পর ইন্দিরার আইনজীবী জে বি দাদাচানজি আমাকে বলেছিলেন, ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল আবেদনের যুক্তি এবং স্থগিতাদেশ আবেদন (সুপ্রিম কোর্টে দাখিলের জন্য) পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করার জন্য ইন্দিরা গান্ধী তাকে ব্যক্তিগতভাবে অনুরোধ করেছিলেন। ওইসব নথিপত্র তৈরি করেছিলেন ইন্দিরার নিজস্ব সিনিয়র অ্যাডভোকেট ননি পালকিবালা। তারপরও অনুরোধ করায় তিনি বেশ পুলকিত হয়েছিলেন বলে জানান আমাকে। তিনি কাগজপত্র পুরোপুরি পরীক্ষা করে কিছু পরিবর্তনের পরামর্শ দেন।

আবেদন চূড়ান্ত হওয়ার সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় এবং আমি আইনমন্ত্রী এইচ আর গোখলের (স্থগিত আবেদনের ওপর শেষবারের মতো চোখ বুলিয়ে নিচ্ছিলেন) অফিসে ছিলাম। সিদ্ধার্থ ফোন তুলে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করলেন, কেবল তিনিই এ কাজটি করতে পারতেন। বললেন : ‘আমার কথাটা শুনুন।’ তিনি আবার বললেন, ‘না, ম্যাডাম, আমার কথাটা শুনুন।’ ‘ইন্দিরাজি আমার কথাটা শুনুন।’ একটু ‘শুনুন’- ‘এই আবেদনটি এখনই দাখিল করতে হবে।’ আমি ফোনের অপর প্রান্তে অন্য কারো উপস্থিতি টের পেলাম। ওই সময় ইন্দিরার আশপাশে ভিড় করে থাকা জ্যোতিষীরা আরেকটু শুভ সময়ে আবেদনটি দাখিল করার পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছিলেন! জ্যোতিষীদের পরামর্শে ভক্তি রেখে ১৯৭৫ সালের ২২ জুন আবেদনটি দেরিতে দাখিল করা হলো, অবকাশকালীন বিচারকের বেঞ্চে (বিচারপতি কৃষ্ণা আয়ার) স্থগিত আবেদনটি তালিকাভুক্ত করা হলো। ইন্দিরা গান্ধীর ব্যক্তিগত পছন্দের আইনজীবী পালকিবালা আবেদনের ওপর শুনানিতে অংশ নিলেন। তিনি ভালোভাবেই কাজটি করলেন, স্থগিতাদেশ প্রাপ্য ছিলেন।

পরদিন সন্ধ্যায় আমার স্ত্রী ও আমি ট্রেনযোগে মুম্বাই ছাড়ার সময় আমি ইভিনিং নিউজের একটি খবর পড়লাম। ভেতরের পৃষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ খবরটি প্রকাশ করা হয়েছিল। এতে বলা হয়েছিল, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিবকে বদলি করা হয়েছে। তার জায়গায় রাজস্থান থেকে এস এল খুরানাকে আনা হয়েছে। এই সময় কেনো এই বদলি করা হলো? তখন আমি বিষয়টির দিকে আর কোনো মনোযোগ দেইনি।

ওই সময় স্বরাষ্ট্রসচিব পদে হঠাৎ বদলি আমার কাছে তেমন কোনো ইঙ্গিতবহ বলে মনে হয়নি। পরে বুঝতে পেরেছিলাম, এটা ছিল সতর্কতামূলক প্রস্তুতি। কেবল সঞ্জয় গান্ধী এবং প্রধানমন্ত্রীর দুই-একজন ঘনিষ্ঠজন ছাড়া এই প্রস্তুতি-পর্ব সম্পর্কে কারোরই কোনো ধারণা ছিল না। যদি সুপ্রিম কোর্ট স্থগিতাদেশ খারিজ করে দেন, তবে এই বদলির আলোকে কাজ করা হবে বলে স্থির করা হয়েছিল। কৃষ্ণ আয়ারের নির্দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হলো ২৪ জুন। আমি তখন মুম্বাই। এটা ছিল শর্তসাপেক্ষ স্থগিতাদেশ। ‘অপারেশন ইমার্জেন্সি’ সাথেসাথে চালু হলো। তবে ভারতের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক দায়িত্বশীল রাষ্ট্রপতির সম্মতিহীনভাবে নয়।

ফখরুদ্দিন আলী আহমদের নেতৃত্বে আরো তিন প্রখ্যাত আইনজীবী এইচ আর গোখলে, এস এস রায় ও রজনী প্যাটেল (তারা সবাই কংগ্রেসের সদস্য) ঘোষণায় সই আনার জন্য ২৫ জুনের মধ্যরাতে গেলেন।

এমনকি ২৬ জুন মন্ত্রিসভার সদস্যরা অনুমোদনের আগেই এর আগের রাতেই জরুরি আইনের ঘোষণায় সই হয়ে গেছে এবং কার্যকরও হয়ে গেছে। ওই সময়ের মিসেস গান্ধীর মন্ত্রিসভার অন্যতম যোগ্য সদস্যের মন্তব্য আমার মনে পড়ছে। সকালের মন্ত্রিসভার বৈঠকে মিসেস গান্ধী তাকে জরুরি আইন জারি নিয়ে তার মতামত জানতে চাইলেন। বেশ কায়দা করে বাবুজি জবাবটা দিলেন, ‘ম্যাডাম, আপনি যখন সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছেন, তখন আমি আর কি বলবো?’

আমি ২৭ জুন বোম্বাই থেকে ডাকযোগে দিল্লিতে আইনমন্ত্রীর কাছে আমার পদত্যাগপত্র পাঠালাম। এতে বীরোচিত কিছু ছিল না।

এ ধরনের ঘটনা আমাদের কখনো ভুলে যাওয়া উচিত নয়। আপনারা যারা জরুরি আইনের অভিজ্ঞতা লাভ করেননি, বা এ নিয়ে খুব একটা পড়াশোনা করেননি, তাদের জেনে রাখা উচিত, ক্ষমতায় যদি সংখ্যাগরিষ্ঠতাসম্পন্ন সরকার থাকে, তখনই কেবল কর্তৃত্ববাদী শাসন ঘোষনা সম্ভব। ১৯৭৫ সালের জুনে ভারতে জরুরি আইন জারির সময় দেশটিতে ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার, সরকার প্রধান হিসেবে ছিলেন বিপুল কর্মক্ষম ও জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো সাংবিধানিক দায়িত্বশীলেরা এবং এমনকি সর্বোচ্চ আদালতের কয়েকজন বিচারক পর্যন্ত আমাদের হতাশ করেছেন।

২৫ জুন রাতে পার্লামেন্টের বিরোধী দলের সব এমপিকে প্রতিরোধমূলকভাবে আটক করা হলো, অবশ্য পার্লামেন্টের কার্যক্রম অব্যাহত থাকলো। লোকসভার স্পিকার পর্যন্ত এর প্রশংসা করে প্রকাশ্যে বললেন, এতে করে পার্লামেন্টের কাজকাম ‘আরো সাবলীলভাবে’ করা সম্ভব হবে। আর আদালত রায় দিল, তাদের উচিত পার্লামেন্ট কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করা, কিন্তু আটক থাকার কারণে যেতে পারেননি। কিন্তু তার পরও পার্লামেন্টের এ ধরনের কার্যক্রম বৈধ।

সর্বোচ্চ আদালতের এটা প্রথম লজ্জাজনক রায়। তবে এরপর তারা আরো লজ্জাষ্কর রায় দিয়েছিল (১৯৭৬ সালের এপ্রিলে এডিএম জাবালপুরে)। ওই রায়ে আদালতের সবচেয়ে সিনিয়র পাঁচ বিচারপতির চারজনই সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সংবিধানে প্রদত্ত ব্যক্তি স্বাধীনতার বিধানটি বাতিল করে দিয়েছিলেন। সাহস করে একমাত্র ভিন্নমত প্রকাশ করেছিলেন বিচারপতি এইচ আর খান্না। ভারতের প্রধান বিচারপতি হওয়ার জন্য পরম্পরায় তিনি তিন নম্বর স্থানে ছিলেন। ঐতিহ্য অনুযায়ী, সিনিয়রিটির আলোকেই প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত হয়ে থাকেন। তারপরও তিনি ব্যক্তিগত স্বাধীনতা লঙ্ঘনকে মেনে নিতে পারেননি।

১৯৭৫ সালের জুনে জরুরি অবস্থা জারির পর মিসেস গান্ধী ১৯৭৭ সালের জানুয়ারি নির্বাচনের আয়োজন করেছিলেন। তাতে তিনি পরাজিত হন। ওই সময় বেশির ভাগ মানুষেরই চিন্তায় ছিল, তিনি কি সেনাবাহিনী তলব করবেন? তার তত অবনতি ঘটেনি। তিনি কাজটি করেননি। তিনি কি জনগণের রায় মেনে নেবেন? কয়েকজন আইনজীবী-রাজনীতিবিদের পরামর্শ সত্বেও তিনি মেনে নিয়েছিলেন।  আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের এই ঘটনার ব্যাপারে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী জেমস কালাহানের মন্তব্যও স্মরণ করি। তিনি বলেছিলেন, সত্যিকারের গণতন্ত্রের চূড়ান্ত নিদর্শন হলো, নির্বাচনে পরাজয় বরণকারী সরকারের স্বেচ্ছায় তার বিরোধীদের কাছে ক্ষমতা সমর্পণ করার আগ্রহ।

(লেখক : ভারতের সাংবিধানিক আইন বিশেষজ্ঞ এবং সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট)

পাকিস্তানে চীনা সামরিক ঘাঁটি

আসিফ হাসান ::

চীন তার সামরিক বাহিনীর সামর্থ্য বাড়াচ্ছে, সেইসাথে তার শক্তি প্রদর্শনের সক্ষমতাও গড়ে তুলছে। আর এই লক্ষ্যেই দেশটি বিদেশের মাটিতে দ্বিতীয় ঘাঁটি প্রতিষ্ঠা করার পরিকল্পনা করছে। পাকিস্তানকেই দ্বিতীয় ঘাঁটি স্থাপনের জায়গা হিসেবে বেছে নিয়েছে। সম্প্রতি চীনা সামরিক বাহিনী সম্পর্কে এক প্রতিবেদনে পেন্টাগন এসব কথা জানিয়েছে।

চীনা গণমুক্তি বাহিনী (চায়না পিপলস আর্মি, পিএলএ) বিদেশের মাটিতে প্রথম ঘাঁটি স্থাপন করেছিল ‘হর্ন অব আফ্রিকা’ হিসেবে পরিচিত জিবুতিতে। গত বছরের ফেব্রæয়ারিতে এর নির্মাণকাজ শুরু হয়। আগামী বছর তা শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। চীন আগে বলেছিল, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে আরো বেশি অংশগ্রহণ, সোমালিয়া এবং এডেন উপসাগরীয় এলাকার আশপাশের পানিসীমায় পাহারা কার্যক্রম চালানো এবং মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে তারা এই ঘাঁটিটি প্রতিষ্ঠা করছে।

পেন্টাগনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদেশের মাটিতে ঘাঁটি স্থাপন করা হলে চীন আরো ভালোভাবে এসব কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে। তবে বিদেশে ঘাঁটি নির্মাণে চীনা সামর্থ্য ‘হয়তো দেশগুলোকে তাদের বন্দরে পিএলএ’র উপস্থিতি সমর্থন করতে রাজি হতে বাধ্য করবে।’

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, চীনা নেতারা তাদের সামরিক বাহিনীর ভীতি সৃষ্টিকারী সামর্থ্য বৃদ্ধি, বৈরী শক্তির আস্ফালন প্রতিরোধ এবং তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ মোকাবিলা করার দিকে নজর দিয়ে যাচ্ছেন। এ কারণেই শক্তি প্রদর্শন ক্ষমতা চীনা বলয়ের বাইরেও ছড়িয়ে দেওয়ার বিষয়টি পিএলএ’র আধুনিকায়ন কর্মসূচিতে অনেক বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

তাদের এই আধুনিকায়ন কর্মসূচির অংশ হিসেবেই তারা পূর্ব চীন সাগরে ৪০টিরও বেশি বিমান মোতায়েন করেছে, ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে মিয়াকো প্রণালী ও ফিলিপাইন সাগরে বিশেষ ধরনের প্রশিক্ষণ পরিচালনা করেছে। চীনাদের মোতায়েন করা জিয়ান এইচ-৬কে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ক্যারিয়ার গুয়ামে মার্কিন ঘাঁটিতে আঘাত হানতে পারে বলে পেন্টাগন ধারনা করছে। এইচ-৬কে হলো আধুনিকায়ন করা চীনা নির্মিত, সোভিয়েত আমলের টোপোলেভ টু-১৬ ‘ব্যাজার’ সাবসনিক বোমারু বিমান। এগুলো দূরপাল্লার আক্রমণে ব্যবহার করা যায়। আর ব্যালাস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাণের দিক থেকে চীন এখন শীর্ষ পর্যায়ের দক্ষতা অর্জন করেছে বলেও পেন্টাগনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। চীনের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থাও উন্নত হচ্ছে। তাদের এইচকিউ-১৯ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থা তিন হাজার কিলোমিটার পাল্লার ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও রুখে দিতে পারে।

চীনা সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়ন কর্মসূচির আওতায় সেনা, নৌ ও বিমান- সব বাহিনীর শক্তি বৃদ্ধির বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে বলেও পেন্টাগন মনে করছে।

চীনা নৌবাহিনী অত্যন্ত দ্রুতগতিতে টাইপ ০৫২ ফ্লিট ডিফেন্স ডেসট্রয়ার, টাইপ ০৫৪ ফ্রিগেট নির্মাণে এগিয়ে যাচ্ছে বলেও প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে।

প্রতিবেদনটিতে চীনা সামরিক কার্যক্রম সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকা প্রদান করা হলেও বেশ কিছু দুর্বলতাও চোখে পড়েছে। ডিফেন্স নিউজের মতে, পেন্টাগনের প্রতিবেদনে বেশ কিছু ভ্রান্তি বা সেকেলে তথ্য রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীন চেঙদু-জে-২০ পঞ্চম প্রজন্মের জঙ্গিবিমানের উৎপাদন বাড়াচ্ছে। কিন্তু খবর হলো, গত বছরই চীন এই বিমানের উৎপাদন হার কমিয়ে দিয়েছে।

তাছাড়া প্রতিবেদনে যেসব মানচিত্র ও ইনফোগ্রাফিকস ব্যবহার করা হয়েছে, সেগুলোতে ত্রæটি সহজেই চোখে পড়ে। যেমন হাইনান দ্বীপে চীনা গুরুত্বপূর্ণ নৌবাহিনী ঘাঁটিটির কথা প্রতিবেদনে উল্লেখই নেই। আবার চীনের নর্দার্ন থিয়েটর কমান্ডের বিমান ঘাঁটিটিকে ভুল করে বিমান বাহিনীর বোমারু বিমান ঘাঁটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

আবার চীন নিজেও পেন্টাগনের প্রতিবেদনটি প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, তাদের শক্তি প্রদর্শনের কোনো পরিকল্পনা নেই।

যুক্তরাষ্ট্র হয়তো চীনা সামরিক শক্তি সম্পর্কে ফুলিয়ে ফাপিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। আবার চীনও তাদের সুপ্ত ইচ্ছাটিও অস্বীকার করেছে। দুই বক্তব্যের মাঝামাঝি কিছু একটা কিন্তু থাকতেই পারে। চীনের ‘‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’’- ইনিশিয়েটিভ যেসব দেশের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেছে, সেগুলোর কয়েকটিতে অস্থিতিশীল উপাদান তীব্রভাবে সক্রিয় রয়েছে। চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর ওই প্রকল্পেরই অংশবিশেষ। আর পাকিস্তানে ওই করিডোরের গুরুত্বপূর্ণ অংশটি উত্তপ্ত বেলুচিস্তানে অবস্থিত। সেটার নিরাপত্তা বিধানের জন্য চীন যদি সেখানে সৈন্য মোতায়েন করে, তবে তাতে কি আশ্চর্য হওয়ার কিছু আছে? আফগানিস্তানের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্ক ভালো নয়। ভারতের সাথে তো নয়ই। ভারত ওই চীনা প্রকল্পের বিরোধিতা করছে প্রকাশ্যেই। ফলে প্রকল্পটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি চীনাদের মধ্যে থাকবেই।

চীনা প্রকল্পটির অন্যান্য অংশের ব্যাপারেও একই কথা প্রযোজ্য। বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্য আমাদের আরো কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে বৈকি।

ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে বিশ্ব জ্বালানি নেতৃত্ব যাবে চীনের হাতে

মোহাম্মদ হাসান শরীফ, ফরেন পলিসি থেকে ::

যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক নিয়ে আলোচনার সময় আমরা প্রায়ই এসব বিষয়ের কিছু কিছুকে উত্তেজনাকর হিসেবে অভিহিত করে থাকি। তবে এসবের মধ্যেই পরিবেশগত সুরক্ষা এমন একটি বিষয়- যা নিয়ে এই দুই দেশের সহযোগিতা ঐতিহাসিকভাবে অনেক বেশি আন্তরিকতাপূর্ণ ও ফলপ্রসূ।

এই উর্বর কূটনৈতিক ভিত্তির কারণ একেবারে সহজ। সব দেশ ও জাতি দূষণ কমানোর ব্যাপারে আগ্রহী। কারণ যত দূষণ তত আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য তা ক্ষতিকারক, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য প্রতিবন্ধকতা ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী। তাছাড়া এর কোনো সীমা-পরিসীমা নেই।

২০০৮ সালে বেইজিংয়ে মার্কিন দূতাবাসের ছাদে বাতাসের মান পর্যবেক্ষণকে কেন্দ্র করে পরিবেশগত কূটনীতির একটি শক্তিশালী উদাহরণ সৃষ্টি করা হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল যেকোনো দিনেই বাইরে কতটুকু নিরাপদ তা মার্কিন কূটনৈতিকদের  অবগত করা। অবশ্য, বাতাসের মানবিষয়ক তথ্য-উপাত্ত চীনা নাগরিকদের মধ্যে অপেক্ষাকৃত শুদ্ধ বাতাসের দাবি জোরদার করে। আর তাতেই চীনা সরকার বিশুদ্ধ বাতাস, জলবায়ু পরিবর্তন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে ভাবতে বাধ্য হয়।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সবসময়ই জনস্বাস্থ্য, কল্যাণ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে প্রাকৃতিক সম্পর্কের প্রাপ্যতা বা দুষ্প্রাত্যা প্রবলভাবে প্রভাবিত করে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে ট্রাম্প প্রশাসনের ‘আমেরিকা ফার্ষ্ট’ মন্ত্র বিশুদ্ধ বাতাস, পানি ও ভূমির মৌলিক প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে অন্ধই মনে হচ্ছে। জলবায়ু নেতৃত্বের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র বিপুল অর্থনৈতিক সুযোগ ও কূটনৈতিক সুবিধা গ্রহণ করতে পারে কিংবা চীনের কাছে ছেড়েও দিতে পারে।

উন্নত বিশুদ্ধ জ্বালানির জন্য বায়ু ও সৌর জ্বালানির জন্য কর রেয়াত প্রদানের মতো অভ্যন্তরীণ পদক্ষেপে প্রমাণিত অর্থনৈতিক কল্যাণের মধ্যে রয়েছে দ্রুত বিকাশমান বিশুদ্ধ-জ্বালানি শিল্পের জাগরণ, মধ্যশ্রেণীর লাখ লাখ চাকরি সৃষ্টি, তাৎপর্যপূর্ণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বিকাশ। ওবামা প্রশাসন চেয়েছিল গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ ১৯৯৪ সালের পর্যায়ে নিয়ে আসার জন্য। এতে করে ১১.৩ মিলিয়ন চাকরি সৃষ্টি হতো বলে আশা করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান প্রশাসনের এটা পছন্দ হচ্ছে না।

ট্রাম্প প্রশাসন যদি অভ্যন্তরীণ জলবায়ু পদক্ষেপ প্রশ্নে নেতৃত্ব গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়, জলবায়ু বিষয়ক প্যারিস চুক্তিকে সমর্থন না করে, তবে যুক্তরাষ্ট্রকে চীনের মতো দেশের কাছে প্রতিযোগিতামূলক অর্থনৈতিক সুবিধা ছেড়ে দিতে হবে। এর ফলে আমাদের পরিবার, সমাজ ও দেশের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে পড়বে, আমাদের আন্তর্জাতিক দক্ষতা ও সুবিধার অপচয় ঘটবে। চীন সুযোগটি গ্রহণ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়াবে, কয়লাচালিত বিদ্যুৎ প্লান্টগুলো বাতিল করে দেবে। আগামী পাঁচ বছর ধরে চীন বায়ু-জ্বালানি প্রবৃদ্ধিতে বৃহত্তম দেশ হিসেবেই বিরাজ করবে বলে মনে হচ্ছে।

কার্বন নির্গমন হ্রাসের কাজটি কোনো একক দেশের পক্ষে করা সম্ভব নয়। কার্বন কোনো একটি দেশে আবদ্ধ থাকছে না। ফলে বহুপক্ষীয় সহযোগিতার প্রয়োজন এতে। দেশগুলোর সাহসী ও বিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্তই সমাধান দিতে পারে। আর তাতে সবাই সুস্থ থাকতে পারে।

অতীতে এই কাজে যুক্তরাষ্ট্র ছিল নেতৃত্বে। এতে করে যুক্তরাষ্ট্র অনেক শক্তিশালী ও প্রতিযোগিতামূলক হয়েছিল।

দূষণ কমিয়ে ৪৬ বছরে যুক্তরাষ্ট্র প্রবৃদ্ধি হাসিল করেছিল। জীবনরক্ষাকারী বিধিবিধানে প্রতিটি ডলার ব্যয় করে স্বাস্থ্য সুবিধা পেয়েছিল ৯ ডলার করে। আর তা ছিল অর্থনৈতিক কল্যাণকর। প্রচলিত বায়ু দূষণ কমেছিল ৭০ ভাগ, আর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ২৫০ ভাগ। ২০০৮ সাল নাগাদ পরিবেশগত প্রযুক্তি এবং পরিষেবা শিল্প ১.৭ বিলিয়ন চাকরিকে পৃষ্টপোষকতা করেছিল, ৩০০ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব সৃষ্টি করেছিল। ওই বছর শিল্প রফতানি পণ্য ও পরিষেবার মূল্য ছিল ৪৪ বিলিয়ন ডলার। প্লাস্টিক ও রাবার পণ্যের মতো খাতে যুক্তরাষ্ট্র ছিল শীর্ষে। ওবামা প্রশাসনের আমলে গাড়ি শিল্পে দ্বিগুণ জ্বালানি সাশ্রয়ী ব্যবস্থা প্রবর্তন করে মিলিয়ন মিলিয়ন টন কার্বন দূষণ কমাতে পেরেছিল যুক্তরাষ্ট্র। বর্তমানে শিল্পটি চাঙ্গা হচ্ছিল।

দৃঢ়ভাবে পরিবেশগত নেতৃত্ব প্রদান এবং জলবায়ু নেতৃত্ব খরচের ব্যাপার নয়, বরং এগুলো হলো বিনিয়োগ। প্যারিস চুক্তি থেকে সরে দিয়ে বিশুদ্ধ জ্বালানি বিনিয়োগ এবং অবশিষ্ট বিশ্বকে ভুল ইঙ্গিত দেব। অথচ ঐতিহাসিকভাবেই এসব কাজে নেতৃত্বের জন্য বিশ্ব যুক্তরাষ্ট্রের দিকে তাকিয়ে আছে।

প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার নেতৃত্বে প্যারিস জলবায়ু চুক্তির আগে যৌথ জলবায়ু চুক্তির প্রতি চীনা সমর্থন নিশ্চিত করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। এর সম্পূর্ণ বিপরীতে গত এপ্রিলে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিঙের যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় জলবায়ু নিয়ে একটি কথাও বলা হয়নি। আবার জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক বিশেষ দূতের নাম পর্যন্ত ঘোষণা করেনি ট্রাম্প প্রশাসন।

অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র যদি বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন কার্যক্রম থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়, তবুও বিশ্ব থেমে থাকবে না। তারা কার্বন নিঃসরণ কমানোর পথে চলতেই থাকবে। কেবল যুক্তরাষ্ট্র পড়ে থাকবে স্টেশনে।

যুক্তরাষ্ট্র যদি বিশ্বকে নেতৃত্ব দিতে চায়, সুবিধা হাসিল করতে চায়, তবে যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই জলবায়ু ব্যবস্থার দিকে যেতেই হবে। এ থেকে কোনোভাবেই সরে যাওয়া যাবে না। যুক্তরাষ্ট্র আগে সেই জাতিই ছিল, এবং যুক্তরাষ্ট্রকে আবার সেই জাতিই হতে হবে।

বিশ্বজুড়ে অস্ত্রের ঝনঝনানি : বেড়েছে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়া ভারতের সামরিক ব্যয়

মোহাম্মদ হাসান শরীফ ::

বিশ্বজুড়ে অস্ত্রের ঝনঝনানি। আর তার জের ধরে টানা দ্বিতীয় বছরের মতো বেড়েছে অস্ত্র খাতে ব্যয়। ২০১৫ সালের তুলনায় ০.৪ ভাগ বেড়ে ২০১৬ সালে সামরিক খাতে ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬৮৬ বিলিয়ন ডলার। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (সিপরি) এ তথ্য জানিয়েছে। ২০১০ সালের পর এই প্রথম যুক্তরাষ্ট্রসহ উত্তর আমেরিকায় সামরিক ব্যয় বেড়েছে, আর পশ্চিম ইউরোপেও বেড়েছে  টানা দ্বিতীয় বছরের মতো। বিশ্বে ২০১১ সালের পর এবারই প্রথম টানা দ্বিতীয় বছরের মতো সামরিক ব্যয় বাড়ল। তবে কষ্টের মধ্যেও সুখের বিষয় হলো- সেটা ওই বছরের ১৬৯৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেনি।

সামরিক ব্যয়ের ধারায় অঞ্চল ভেদে ব্যাপক পার্থক্য দেখা যায়। এশিয়া, ওশেনিয়া, মধ্য ও পূর্ব ইউরোপ এবং উত্তর আফ্রিকায় বেড়েছে। বিপরীতে মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ আমেরিকা এবং উপ-সাহারীয় এলাকায় কমেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ১ নম্বরেই :

এখনো যুক্তরাষ্ট্রেই সর্বোচ্চ পরিমাণে সামরিক ব্যয় হয়ে থাকে। ২০১৫ সালের তুলনায় দেশটিতে সামরিক ব্যয় ১.৭ ভাগ বেড়ে ৬১১ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যয়ের দেশ চীনে ২০১৫ সালের তুলনায় ৫.৪ ভাগ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১৫ বিলিয়ন ডলার। বৃদ্ধির হারটি গত বছরের চেয়ে অনেক কম। রাশিয়ার ব্যয় ৫.৯ ভাগ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৯.২ বিলিয়ন ডলার। দেশটি তৃতীয় বৃহত্তম ব্যয়কারী। সৌদি আরব ২০১৫ সালে ছিল তৃতীয় স্থানে। এখন সে চতুর্থ স্থানে নেমে গেছে। আঞ্চলিক যুদ্ধ সত্ত্বেও তাদের ব্যয় ৩০ ভাগ কমে হয়েছে ৬৩.৭ বিলিয়ন ডলার। ভারতের সামরিক ব্যয় ৮.৫ ভাগ বেড়ে ৫৫.৯ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। তারা এখন পঞ্চম বৃহত্তম সামরিক ব্যয়ের দেশ।

মার্কিন সামরিক ব্যয় বাড়াটি আশঙ্কাজনক। ধারণা করা হচ্ছে, সামরিক ব্যয় কমানোর ধারা থেকে তারা আবার সরে এসেছে। অর্থনৈতিক সঙ্কট এবং আফগানিস্তান ও ইরাক থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় কমে গিয়েছিল। এখন যুক্তরাষ্ট্রে সার্বিক বাজেটে সংযম দেখা গেলেও সামরিক খাতে ব্যয় বাড়ছে।

ভয়ে বাড়ছে ইউরোপের ব্যয় :

পশ্চিম ইউরোপে সামরিক ব্যয় বেড়েছে টানা দ্বিতীয় বছরের মতো। আগের বছরের চেয়ে তা ২.৬ ভাগ বেড়েছে। তবে এই বৃদ্ধি হয়েছে মূলত তিনটি দেশে। ইতালিতে লক্ষ্যণীয় ১১ ভাগ বেড়েছে। রাশিয়ার কাছ থেকে আক্রমণের শঙ্কায় সার্বিকভাবে মধ্য ইউরোপে ২.৪ ভাগ ব্যয় বেড়ে গেছে।

তেল রফতানিকারক দেশগুলোর কমেছে:

তেলের দাম কমে যাওয়ার যে অর্থনৈতিক সঙ্কটের সৃষ্টি হয়েছে, মূলত সে কারণেই অনেক তেল রফতানিকারক দেশ অস্ত্র আমদানিতে ব্যয় কমাতে বাধ্য হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে সৌদি আরবের কথা বলা যায়। তাদের ব্যয় কমেছে ২৫.৮ বিলিয়ন ডলার। তবে সবচেয়ে বেশি কমেছে ভেনেজুয়েলায়। তারা কমিয়েছে ৫৬ ভাগ। এছাড়া দক্ষিণ সুদান ৫৪ ভাগ, আজারবাইজান ৩৬ ভাগ, ইরাক ৩৬ ভাগ, সৌদি আরব ৩০ ভাগ কমিয়েছে। এছাড়া অ্যাঙ্গোলা, ইকুয়েডর, কাজাখস্তান, মেক্সিকো, ওমান ও পেরুও সামরিক খাতে ব্যয় বেশ কমিয়েছে। তবে আলজেরিয়া, ইরান, কুয়েত, নরওয়ে সামরিক খাতে ব্যয় বেশ বাড়িয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য :

১. বিশ্বে সামরিক খাতের ব্যয় বৈশ্বিক জিডিপির ২.২ ভাগ। জিডিপির হিসাবে মধ্যপ্রাচ্যেই সর্বোচ্চ সামরিক ব্যয় করে থাকে। ২০১৬ সালে জিডিপির ৬.০ ভাগ ব্যয় হয়েছে সামরিক খাতে। সর্বনিম্ন আমেরিকায়। সেখানে জিডিপির ১.৩ ভাগ খরচ হয়েছে এই খাতে।

২. ২০১৬ সালে আফ্রিকায় ব্যয় কমেছে ১.৩ ভাগ। টানা ১১ বছর বাড়ার পর এবারই এখানে ব্যয় কমল। মূলত তেলের আয় কমায় এমনটা ঘটেছে।

৩. এশিয়া ও ওশেনিয়ায় সামরিক ব্যয় বেড়েছে ৪.৬ ভাগ। দক্ষিণ চীন সাগরে আঞ্চলিক বিরোধকে কেন্দ্র করে মূলত এই ব্যয় বেড়েছে।

৪. ইকুয়েডর, মেক্সিকো, পেরু ও ভেনেজুয়েলায় তেল রাজস্ব কমায় মধ্য আমেরিকা, ক্যারিবিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকায় সামরিক ব্যয় কমেছে। অর্থনৈতিক সঙ্কটের কারণে ব্রাজিলে সামরিক ব্যয় কমেছে।

ট্রাম্পের সৌদি সফর : বিশাল অংকের অস্ত্র বিক্রয় আর ইরানকে হুমকিই উদ্দেশ্য

আমাদের বুধবার বিশ্লেষন ::

প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে সৌদি আরবকে বেছে নেওয়ার পুরস্কার হাতে হাতে পেয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।  সৌদি বাদশাহ ১১০ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র  ক্রয়ের চুক্তি করেছেন। নগদ প্রাপ্তির পাশাপাশি দুই দেশের অভিন্ন শত্রু  ইরানকেও বার্তা দিয়ে দেওয়া হলো এই চুক্তির মাধমে। এছাড়া ইরানের ওপর পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়েও নানা কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে। ইরানি প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির পুন:নির্বাচিত হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ট্রাম্প আর বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সৌদের উপস্থিতিতে চুক্তিটি সই হয়।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের জয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সমীকরণ অনেকটাই বদলে যাচ্ছে। পূর্বসূরি বারাক ওবামার আমলে ইরানের সাথে পরমাণু চুক্তি করে নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়েছিল। এতে সৌদি আরব এবং তার মিত্ররা নাখোশ হয়েছিল। ইসরাইলও তীব্র বিরোধী ছিল ইরানের সাথে চুক্তির।

ট্রাম্প ওই পথে হাঁটছেন না। তিনি কেবল সৌদি আরবের সাথেই চুক্তি করেননি, সৌদি রাজধানীতে মুসলিম দেশগুলোর নেতাদের একটি সম্মেলনেও ভাষণ দেন।

এটাও আবার ২০০৯ সালে কায়রোতে ওবামার ভাষণেরই জবাব বলে মনে হচ্ছে। ওবামা যেমন ওই ভাষণের মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বের সাথে নতুন সম্পর্ক সৃষ্টির ঘোষণা দিয়েছিলেন। ট্রাম্পও সেই অবস্থান পরিবর্তনের ঘোষণা দিলেন আরো বড় পরিসরে। ইরাক যুদ্ধের ফলে মুসলিম বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে যে বিরূপ ধারণার সৃষ্টি হয়েছিল, ওবামা সেটা সংশোধন করার উদ্যোগী হয়েছিলেন। আর ট্রাম্প গত বছর নিজের বলা ‘আমি মনে করি ইসলাম আমাদের ঘৃণা করে’ উক্তিটি কিছুটা মোলায়েম করে নিলেন। তিনি রিয়াদ ভাষণে চরমপন্থার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার কথা বলেন। তার মতে, এটা ‘ভিন্ন বিশ্বাসগুলোর মধ্যকার যুদ্ধ নয়,’ বরং ‘ভালো ও মন্দের’ মধ্যে লড়াই। মুসলিম নেতাদের উদ্দেশে ট্রাম্প আরো বললেন, ‘আমরা এখানে বক্তৃতা ঝাড়তে আসিনি, কী করা উচিত, সেটা বলতেও আমরা এখানে আসিনি।’

তিনি তার শ্রোতাদের স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, কী করতে হবে। তিনি বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে তাদের শত্রু দের ধ্বংস করার জন্য আমেরিকান শক্তির জন্য অপেক্ষা করে থাকলে চলবে না। সুন্দর ভবিষ্যত তখনই কেবল সম্ভব, যদি আপনারা নিজেরাই সন্ত্রাসী আর চরমপন্থীদের ঝেঁটিয়ে বিদায় করেন।’ তিনি পাঁচবার বলেন, ‘তাদেরকে তাড়িয়ে দিন।’

আর এরপর তিনি সেদি আরবের কাছে ১১০ বিলিয়ন ডলারের ‘সুন্দর’ অস্ত্র বিক্রির কথা ঘোষণা করেন। এছাড়া তিনি রিয়াদে গ্লোবাল সেন্টার ফর কম্বেটিং এক্সট্রিমিস্ট আইডলজি এবং টেররিস্ট ফিন্যান্সিং টার্গেটিং সেন্টারের উদ্বোধন করেন।

ইরানকে তিনি সরাসরি অভিযুক্ত করেন আঞ্চলিক বেশির ভাগ সমস্যা সৃষ্টির জন্য। তিনি বলেন, ‘লেবানন থেকে ইরাক, ইয়েমেন পর্যন্ত সবজায়গায় সন্ত্রাসী, মিলিশিয়া এবং অন্যান্য চরমপন্থী গ্রুপগুলোকে তহবিল, অস্ত্র আর প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজটি করছে ইরান।’

তবে জিহাদিদের বেশির ভাগই যে সুন্নি এবং সৌদি আরবেরও যে মানবাধিকার রেকর্ড ভালো নয়, সে তথ্য বেমালুম চেয়ে গেছেন ট্রাম্প।

ইরানের বিরুদ্ধে এই বিষোদগারের ফলে ওবামার আমলে গ্রহীত নীতি পুরোপুরি বদলে গেল বলেই মনে হচ্ছে। সৌদি আচরণেও সেটা বোঝা যাচ্ছে। ইরানের সাথে চুক্তির পর ২০১৬ সালে ওবামা সৌদি আরব গেলে তাকে শীতল সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে ট্রাম্পকে গ্রহণ করা হয় বেশ উষ্ণভাবে।

তবে বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করছেন, ট্রাম্প হঠাৎ করে ইরানের সাথে করা পরমাণু চুক্তি থেকে সরে আসবেন না। তিনি হস্তক্ষেপ করার নীতিও গ্রহণ করবেন না। তাছাড়া সৌদি আরবের সাথে যে সামরিক চুক্তিটি হলো, সেটার অনেক কিছু আগের প্রশাসন আমলেই হয়ে গিয়েছিল। তাছাড়া ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন যুদ্ধেও যুক্তরাষ্ট্র গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহায়তা করে আসছে।

এদিকে, ইরানের বিরুদ্ধে যে ঝাঁঝালো বক্তব্য ট্রাম্প রেখেছেন, তা সত্য নয় বলে মনে করেন বিখ্যাত সাংবাদিক রবার্ট ফিস্ক। ইন্ডিপেন্ডেন্ট পত্রিকায় এক কলামে তিনি বলেছেন, ট্রাম্পের বক্তৃতা ভন্ডামি আর তাচ্ছিল্যে ভরপুর। ফিস্ক লিখেছেন, ট্রাম্প ‘সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় ইন্ধন’ দেওয়ার জন্য আইএস-এর বদলে ইরানকে দায়ী করেছেন। তার এই মন্তব্যের ফলে উদার সংস্কারবাদী নেতা হাসান রুহানিকে পুনঃনির্বাচিত ইরানি জনগণ ‘হতাশ’ই হয়েছে।

ফিস্ক বলেন, তিনি ‘চরমপন্থী ইসলামি সন্ত্রাসবাদী’ পরিভাষাটি পরিহার করে তার জায়গায় ‘ইসলামি চরমপন্থী’ পরিভাষা ব্যবহার করেছেন। দুটির মধ্যে প্রচ্ছন্ন পার্থক্য রয়েছে। ইংরেজিতে কিছু পার্থক্য থাকলেও সাধারণভাবে তিনি যা বুঝিয়েছেন তা হলো সন্ত্রাসীরা মুসলিম।

তারপর ট্রাম্প যখন বলেন, ‘আমাদের বন্ধুরা কখনো আমাদের সমর্থন নিয়ে প্রশ্ন করবে না এবং আমাদের শত্রু রা কখনো আমাদের সংকল্প নিয়ে সংশয়ে থাকবে না’ তা দিয়ে তিনি কি বন্ধু বলতে সৌদিদেরই ধরে নিয়েছেন? নাকি ‘ইসলামি বিশ্বকে’? ইসলামি বিশ্ব বোঝানো হলে তাতে ইরান, সিরিয়া ও ইয়েমেন, এমনকি লিবিয়ার মিলিশিয়ারাও থাকবে। ফিস্ক প্রশ্ন তুলেছেন, ট্রাম্প যাদের শত্রু  বলতে কি আইএস-কে বুঝিয়েছেন? নাকি রাশিয়াকে? নাকি সিরিয়া? নাকি ইরান? নাকি তিনি সুন্নি মুসলিমদের প্রতি বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে শিয়া মুসলিমদেরকে শত্রু  গণ্য করছেন?

চীন যুক্তরাষ্ট্রের কতো বড় শত্রু ?

আসিফ হাসান ::

দক্ষিণ চীন সাগরে বেইজিং তার সামরিক শক্তি বাড়াচ্ছে- তা গোপন কোনো বিষয় নয়। কিন্তু সেখানে যে আরেকটি পরাশক্তি আছে এবং সে তার আধিপত্যকে আরো প্রবল করে যাচ্ছে, সেটা আমরা বুঝতেই পারছি না। একেবারে শক্ত ‘ফাঁস’ দিতে ইতোমধ্যেই চীনের চারপাশে ৪শ’ সামরিক ঘাঁটি তৈরি করে ফেলেছে যুক্তরাষ্ট্র।

পুরস্কারজয়ী সাংবাদিক চলচ্চিত্রকার জন পিলজার নতুন একটি ডকুমেন্টারি নির্মান করেছেন। বিশ্বের সবচেয়ে নতুন, বৃহত্তম বাণিজ্যিক চীনকে শত্রু  হিসেবে গণ্য করার ধারণাটিই তিনি চ্যালেঞ্জ করেছেন এই ডকুমেন্টারিতে। তিনি বেইজিংয়ের একেবারে দোরগোড়ায় যুদ্ধপ্রস্তুতির বিষয়টিও তুলে ধরেছেন।

মার্শাল আইল্যান্ডস, জাপান, কোরিয়া, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রে দুই বছর ধরে ছবি সংগ্রহ করে তিনি এই অঞ্চলে আমেরিকার গোপন ইতিহাস তুলে ধরেছেন। তার এই ডুকেমেন্টারি প্রচলিত ধারণা আমূল পাল্টে দেবে।

তিনি দেখিয়েছেন, অতি গোপন ‘প্রজেক্ট ৪.১’-এর আওতায় মার্শাল আইল্যান্ডসের লোকজনকে কিভাবে পরমাণু গিনি পিগ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

পিলজার জাপান ও কোরিয়াও সফর করেছেন। তিনি লোকজনের সাথে কথা বলেছেন, দেখেছেন তারা কিভাবে মার্কিন সম্প্রসারণ প্রতিরোধ করছে। তিনি জাপানের দ্বীপ ওকিনাওয়াও গিয়েছিলেন। সেখানে ৩২টি মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম সামরিক শক্তিটিকে চ্যালেঞ্জকারী লোকজনের সাথেও তিনি কথা বলেছেন। পিলজার বলেন, বর্তমানে একটি অদ্ভূত ও বিপজ্জনক পরিবেশ বিশ্বের বৃহত্তম সামরিক শক্তি যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হতে যাওয়া দেশ চীনের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করছে।

তিনি বলেন, গত কয়েক বছরে প্ররোচনা, হুমকি, পরস্পরবিরোধী বক্তব্য এবং বিভ্রান্তির ফলে এমন এক অবিশ্বাস সৃষ্টি করেছে, সেটাই ভুল বুঝাবুঝি কিংবা ভুলক্রমে বা দুর্ঘটনাক্রমে সত্যিকার যুদ্ধের শঙ্কা সৃষ্টি করছে।

চীনকে নিয়ে সত্যিই আতঙ্কিত হওয়ার মতো কিছু আছে কিনা সেই প্রশ্নও তিনি তুলেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, চীনকে শক্তভাবে ‘ফাঁস’ দিতে যুক্তরাষ্ট্র দেশটির আশপাশে ৪শটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এসব ঘাঁটির কয়েকটি একেবারে চীনের দোড়গোড়ায়; সেগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র, রণতরী, পরমাণু বোমারু বিমান রয়েছে। চীনা পানিসীমার ঠিক বাইরে নিয়মিত মার্কিন রণতরীগুলো টহল দিয়ে বেড়াচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের যেখানে প্রায় এক হাজারটি বিদেশী ঘাঁটি আছে, সেখানে চীনের রয়েছে মাত্র একটি। এবং সেটাও এত ছোট যে, কোনোভাবেই ক্যালিফোর্নিয়ার ওপর হুমকি সৃষ্টি করতে পারবে না।

তিনি অবশ্য এটাও স্বীকার করেন, দক্ষিণ চীন সাগরে বিতর্কিত দ্বীপগুলোতে এয়ারস্ট্রিপ বানিয়ে বেইজিংও উত্তেজনায় ইন্ধন দিচ্ছে। তবে চীনকে টার্গেট করে যুক্তরাষ্ট্রও যে নতুন নতুন ঘাঁটি বানাচ্ছে, সেকথাও তিনি স্মরণ করিয়ে দেন।

তিনি আরেকটি তথ্য দিয়েছেন। তা হলো ডোনাল্ড ট্রাম্প নন, বারাক ওবামাই দক্ষিণ চীন সাগরের আঞ্চলিক বিতর্ককে পরমাণু শক্তিদের মধ্যকার দ্বন্ধের প্রধান বিষয়ে পরিণত করেছেন। পিলজার বলেন, ২০১১ সালে ক্যানবেরায় গিয়ে ওবামা ‘এশিয়া ভরকেন্দ্র’ ঘোষণা দেন। এই মতবাদের ওপর ভর করেই তিনি চীনকে টার্গেট করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এশিয়া ও প্যাসিফিকে থাকা মার্কিন নৌ ও বিমান বাহিনীর অবস্থানগুলো জোরদার করতে থাকেন।

পিলজার বলেন, ট্রাম্প আসলে কার্টুন-চরিত্রের মতো এবং কিছুটা অনিশ্চত ধরনের মানুষ। সেটা বাদ দিলে মনে হবে, ১৯৫০-এর দশকে কোরিয়ান যুদ্ধের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র যে নীতি অনুসরণ করে আসছিল, তিনি সেটাই বজায় রাখছেন। তার মতে, এ নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার উদ্বেগে থাকার অনেক কারণ রয়েছে।

তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, একদিকে রয়েছে চীন। এই দেশটি অস্ট্রেলিয়ার বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার; অন্যদিকে আছে যুক্তরাষ্ট্র। এই দেশটি অস্ট্রেলিয়ার দীর্ঘস্থায়ী মিত্র। অস্ট্রেলিয়ার রাজনৈতিক, সামরিক, সব দিক দিয়েই সে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল। অনেকটা যুক্তরাষ্ট্রের উপনিবেশ। সাম্প্রতিক সময়ে চীনের প্রতি যে অবস্থান গ্রহণ করেছে অস্ট্রেলিয়া, তাতে করে তার যুক্তরাষ্ট্রর আনুগত্য প্রকাশটাই ফুটে ওঠেছে। আর এটাই পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। এ করে যুক্তরাষ্ট্র-চীন যুদ্ধে সেও পড়ে গেছে। অথচ অস্ট্রেলিয়া সত্যিকারের স্বাধীন দেশ হিসেবে অবস্থান করলে তার কোনো শত্রু ই থাকতো না।

পিলজার চীনের অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে উত্থানের বিষয়টিও তুলে ধরেছেন বেশ ভালোভাবে। গরিব, অন্ধকার নগরীগুলো কিভাবে আধুনিক হয়ে আন্তর্জাতিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে সেটা দেখে তিনি বিস্মিত হয়েছেন। তিনি চীনাদের আশাবাদ দেখেও মুগ্ধ হয়েছেন।

তবে যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে তার আধিপত্য বিস্তারে জোর দিয়েছে, তাতে অনেককে ভীতও দেখাচ্ছে।

তিনি বলেন, এক স্ট্র্যাটেজিস্ট বলেছেন, ‘আমরা [পাশ্চাত্যে] নিজেদের শত্রু  হতে চাই না। তবে আমাদের অব্যাহতভাবে যদি শত্রু  হিসেবেই প্রচার করা হতে থাকে, তবে আমাদের সেজন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।’

আর সে কারণেই চীন দ্রুত তার সামরিক বাহিনীর আকার ও শক্তি বাড়াচ্ছে। আবার যুক্তরাষ্ট্রের একটি মহল সেটাকেই ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে প্রকাশ করছে।

(বিদেশী মিডিয়া থেকে)

ট্রাম্পকে কী ইম্পিচ করা হবে?

আসিফ হাসান, নিউজ উইক থেকে

এফবিআইপ্রধান জেমস কোমিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বরখাস্তের ঘটনাটি প্রেসিডেন্টকে ইম্পিচমেন্টের (অভিশংসন) দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে।

প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেয়াদ সবেমাত্র ১০০ দিন অতিক্রম হলো। কিন্তু এই পুরো সময়টা অতিবাহিত হয়েছে রাশিয়ার সাথে তার বিশেষ উদ্দেশ্যপূর্ণ সম্পর্ক এবং রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ক্রেমলিনের সাথে তার কথিত গোপন আঁতাত নিয়ে সৃষ্ট বিতর্কে। তিনি শেষ পর্যন্ত নির্দোষ প্রমাণিত হন বা না হন, তার শাসনকালের এই পর্যায়ের প্রধান বিষয়ই এটা। তবে এসব বিষয় নিয়ে তদন্তে নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তিকে হঠাৎ করে বরখাস্ত করার ঘটনা বিশেষ অভিশংসনের গণদাবিকে গতিশীল করবে। ক্যাপিটল হিলে ট্রাম্পের রিপাবলিকান সহকর্মীরা যাতে প্রেসিডেন্টের খায়েশ থেকে নিজেদের সরিয়ে রাখেন সে দাবি জোরদার হবে, প্রসিকিউটর নিয়োগের অনুরোধও আসতে পারে। আর এসব ঘটলে ইম্পিচমেন্টের রাস্তা শেষ পর্যন্ত শুরু হয়ে যাবে।

অবশ্য এটাও ঠিক, ইম্পিচমেন্ট মানে এই নয় যে, ট্রাম্প নিশ্চিতভাবেই পদচ্যুত হবেন। ১৯৯৮ সালের ডিসেম্বরে সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনেরর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক ইম্পিচমেন্ট প্রস্তাব আনা হয়েছিল। কিন্তু সিনেট তাকে অপসারণ করেনি। একই ঘটনা ঘটেছে সাবেক প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু জনসনের বেলায়। সত্যি বলতে কী, এখন পর্যন্ত কোনো প্রেসিডেন্টকে সিনেট দোষী সাব্যস্ত করেনি। তাছাড়া এই প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ এবং বেশ জটিল। তবে এতে করে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতায় চাপ সৃষ্টি হয়, ঐক্যবদ্ধ ও শ্রদ্ধেয় নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালনের সামর্থ্য ক্ষুণ্ণ করে।

কোমিকে বরখাস্ত করার ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের পর বুধবার সকালে তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক ইম্পিচমেন্ট প্রস্তাব আনার দাবিতে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীরা ফেটে পড়েন। দাবিটির পক্ষে টুইটারে #ImpeachTrumpNow বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। প্রেসিডেন্টও পাল্টা জবাব দেন। তিনিও টুইটারের আশ্রয় নেন। তিনি এমন ক্রোধান্বিত হন যে, তিনি বারবার টুইট করে বলতে থাকেন- তিনি এমন একজনকে নিয়ে আসবেন, যিনি আরো অনেক ভালোভাবে কাজটি করবেন, এফবিআইয়ের চেতনা ও মর্যাদা ফিরিয়ে আনবেন। তার আমলে এফবিআইয়ের প্রধান প্রধান কেলেঙ্কারি যে তালিকা-সংবলিত দ্রুত রিপোর্ট রিটুইট করেন ট্রাম্প।

রক্ষণশীল ও উদার মিডিয়াগুলো একজোট হয়ে বলছে, রুশ বিতর্ক এখন ভয়াবহ পর্যায়ে উপনীতি হয়েছে। ফলে চলমান তদন্ত কিংবা নির্বাচনী প্রচারণাকালে রুশ কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততা নিয়ে কোনো না কোনোভাবে মিথ্যা কথা বলার দায়ে যদি কোমিকে অপসারণ করা হয়ে থাকে, তবে ট্রাম্পকে ইম্পিচ করার ভিত তৈরি হয়ে যাবে।

ওয়াশিংটন পোস্টের রক্ষণশীল কলাম লেখক জেনিফার রুবিন বুধবার বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘প্রেসিডেন্টের ত্রু টি তদন্তে নিয়োজিত কাউকে থামানোর জন্য কোনো আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে (বা একদল ব্যক্তিকে) ব্যবহার করাটাই ছিল ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি এবং ইম্পিচমেন্ট প্রক্রিয়ার মূল কথা।’ তিনি বলেন, ‘এখানেও সেই বিষয়টিই রয়েছে কিনা তা আমরা জানি না। তবে প্রেসিডেন্ট কেন কাজটি করলেন এবং ঠিক এখনই তা কেন করলেন, তা নির্ধারণ করা ছাড়া কংগ্রেসের সামনে আর কোনো বিকল্প খোলা নেই। এর অর্থ হচ্ছে বরখাস্ত প্রক্রিয়ায় জড়িত বা অবগত থাকা কোনো ব্যক্তির শপথের আওতায় আছেন কিনা সে প্রশ্নটিই উত্থাপন করা এবং পরিশেষে প্রেসিডেন্টকে তার কাজের জন্য জবাবদিহির আওতায় আনার ব্যবস্থা করা।’

বামধারার প্রকাশনা স্লেটও মঙ্গলবার রাতে এ নিয়ে লিখেছে। তাতে বলা হয়েছে, ‘নিক্সন সফলভাবে বিশেষ প্রসিকিউটরকে বরখাস্ত করেছিলেন। কিন্তু তা ওয়াটারগেট নিয়ে তদন্ত বন্ধ করার বদলে তাকে ইম্পিচমেন্ট করা এবং কংগ্রেসকে ব্যবস্থা গ্রহণে উদ্দীপ্ত করার পথই জোরদার করেছিল। এখন মনে হচ্ছে, ট্রাম্পের বেলাতেও একই ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে।’

হ্যাশট্যাগ, রিটুইট এবং মূলধারার মিডিয়া কোনো প্রেসিডেন্টকে পদচ্যুত করতে পারে না। তারা কার্যকর ইম্পিচমেন্টও করতে পারে না। তবে এতে করে রুশ তদন্ত প্রশ্নে হোয়ইট হাউজ প্রশাসনের স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে জনগণের মধ্যে অবজ্ঞা বাড়তে থাকবে এবং ট্রাম্পের কাজের প্রতি আস্থা ভয়াবহ রকমের কমতে থাকবে। কংগ্রেসের রিপাবলিকানরা হয়তো শিগগিরই তাদের নির্বাচনী এলাকা থেকে চরমপত্র পেতে থাকবেন। তাছাড়া টাউন হল বৈঠকগুলোতেও তারা ট্রাম্প প্রশাসন এবং গত বছরের সাধারণ নির্বাচনে রুশ হস্তক্ষেপ নিয়ে  প্রশ্নবাণে জর্জরিত হওয়ার ভয়ে থাকবেন। কিংবা ২০১৮ সালের নির্বাচনে শোচনীয় পরিস্থিতির মুখে পড়ার শঙ্কায় থাকবেন।

এই পথটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫তম প্রেসিডেন্টকে কোন পথে নিয়ে যায় তা সময়ই বলে দেবে।