Home » আন্তর্জাতিক (page 4)

আন্তর্জাতিক

বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য হ্রাস : বাদ যাচ্ছেনা ইউএসএইডও

আসিফ হাসান, ফরেন পলিসি থেকে ::

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির পরিণতিতে বিশ্বজুড়ে প্রভাব হারানোর শঙ্কায় পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তার পরাশক্তির মর্যাদা থাকবে কিনা সেটা নিয়েও ভাবছেন অনেকেই।

যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজেট নথিপত্র এবং বিভিন্ন সূত্রের বরাতে ফরেন পলিসি জানাচ্ছে, দেশটি অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে তার বাজেট ব্যাপকভাবে কমিয়ে দিচ্ছে। সেইসাথে পররাষ্ট্র দফতরের সাথে একীভূত করে ফেলা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএইডকে।

পররাষ্ট্র দফতরের ১৫ পৃষ্ঠার একটি বাজেট নথির আলোকে ফরেন পলিসি জানিয়েছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মার্চ মাসের সহায়তা এক তৃতীয়াংশ কমানোর পরিকল্পনা করছে ট্রাম্প প্রশাসন। আর সার্বিকভাবেই ২০১৮ অর্থ বছরের বাজেট ব্যাপকভাবে কমানোর কথা বিবেচনা করা হচ্ছে।

ইউএসএইডকের ভারপ্রাপ্ত প্রশাসক ওয়েড ওয়ারেন সম্প্রতি এক স্টাফ মিটিংয়ে  জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ১৩ মার্চের নির্দেশনার আলোকে তারা পররাষ্ট্র দফতরের সাথে মিশে যাচ্ছেন। অবশ্য এ ধরনের পরিকল্পনা এই প্রথম নয়। ১৯৯৯ সালে মার্কিন তথ্য সংস্থা বিদেশে তথ্য ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচি পরিচালনাকারী অংশকে একীভূত করেছিল।

অবশ্য ট্রাম্প তার পরিকল্পনা কতটুকু বাস্তবায়ন করতে পারবেন তা নিশ্চিত নয়। কারণ খোদ রিপাবলিকানরাই তার প্রস্তাবে সম্মতি দেবেন না বলে আভাস পাওয়া গেছে। কিন্তু তারপরও সাহায্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কংগ্রেস ট্রাম্পকে সমর্থন না করলেও কিছু হলেও সাহায্য কমে যাবে।

বিশ্বজুড়ে আমেরিকার প্রভাব বিস্তারের অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে সহায়তা কর্মসূচি। বিভিন্ন অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে ইউএসএইড মিশন পরিচালকরাই হচ্ছেন ওই দেশে সবচেয়ে প্রভাবশালী বিদেশী।

সহায়তা কমানো হলে এসব মিশন বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

অবশ্য কেবল সাহায্যই নয়, বিশ্ব স্বাস্থ্য কর্মসূচিতেও তহবিল কমানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এ ব্যাপরে অমুনাফামূলক প্রতিষ্ঠান প্রজেক্ট হোপের সিইও টম কেনিয়ন বলেন, এর ফলে অনেক মানুষ মারা যাবে। তার মতে, মার্কিন উন্নয়ন অর্থ কোটি কোটি মানুষের জীবন রক্ষা করে থাকে। তবে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কমানো হলে যে কেবল বিভিন্ন দেশের নাগরিকেরাই সমস্যায় পড়বেন তা নয়, খোদ মার্কিনীদের স্বাস্থ্যও ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। কারণ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ইবোলার মতো মহামারী সৃষ্টি হলে সেটা একটা পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রেও পাড়ি দেবে। ফলে সংক্রমণ রোগের সামনে অরক্ষিত হয়ে যাবে খোদ যুক্তরাষ্ট্রও।

আবার জলবায়ু পরিবর্তনে সমস্যায় পড়া দেশগুলোর সহায়তাও কমানোর কথা বিবেচনা করা হচ্ছে। কার্বন নির্গমন কমানোর একটি উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্র এক বিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। এখন তারা তা থেকে সরে আসতে পারে। ফলে বিশ্বজুড়ে উষ্ণতা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সাহায্য হ্রাসের ফলে মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থেও আঘাত হানতে পারে। মার্কিন উন্নয়ন সহায়তা পেয়ে থাকে ৭৭টি দেশ ও অঞ্চল। সুনির্দিষ্ট মার্কিন রাজনৈতিক বা কৌশলগত লক্ষ্যকে সামনে রেখে এসব দেশ ও অঞ্চলে অর্থনৈতিক সহায়তা দেওয়া হয়ে থাকে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা এই সহায়তা হ্রাসের বিরুদ্ধে সোচ্চার।

গত ফেব্রুয়ারিতে ১২১ জন অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল ও অ্যাডমিরাল হোয়াইট হাউজ ও কংগ্রেসের কাছে খোলা চিঠিতে বিদেশি সহায়তা ও কূটনৈতিক কার্যক্রম হ্রাসের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। চিঠিতে তারা ইসলামিক স্টেটের মতো চরমপন্থী গ্রুপগুলোকে দমন করে বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করা, উদ্বাস্তু প্রবাহ হ্রাস করা, ইবোলার মতো সংক্রমণ রোগ প্রতিরোধে পররাষ্ট্র দফতর এবং ইউএসএইডের ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেন। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন, বৈদেশিক সাহায্য হ্রাস করার ফলে অন্যান্য অঞ্চল ও দেশে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমে যাওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি হবে

বাংলা-ভারত সম্পর্ক : নতুন সমীকরণে বড় ফ্যাক্টর চীন

গর্গা চ্যাটার্জি, ফার্স্টপোস্ট ডটকম, ভারত

অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শুক্রবার চার দিনের সফরে ভারত সফর শুরু করতে নয়াদিল্লিতে অবতরণ করেন। বাংলাদেশ এবং চীনের মধ্যকার গভীর হতে থাকা সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে এই সফরটি হলো।

এসব সম্পর্ক বহু খাত-সম্পর্কিত এবং অবকাঠামো উন্নয়ন থেকে শুরু করে প্রতিরক্ষা ক্রয়সহ বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তৃত। দুটি সার্বভৌম সরকারের মধ্যকার সব সম্পর্ক পারস্পরিক স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট এবং চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কও ভিন্ন নয়; আর এমনটাই হওয়া উচিত। ভারতের অন্তরাল শক্তির (ডিপ স্টেট) কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গিতে বাংলাদেশ হলো তার ভূ-কৌশলগত প্রভাব-মন্ডলের অংশবিশেষ। ভারত চাইলে যেকোনো মতবাদ গ্রহণ করতে পারে, তবে বাস্তবে এর অর্থ কী, সেটাই বিবেচ্য বিষয়। বাংলাদেশের ভেতরে থাকা নির্দিষ্ট কিছু লবি যা-ই তুলে ধরতে চাক না কেন, বাংলাদেশ কিন্তু সিকিম বা এমনকি ভুটানও নয়। অবশ্য বিশাল কোনো প্রতিবেশীর সাথে কাজ করার সময় হুঁশিয়ার থাকা ভালো, যখন ওই দেশটির সাথে বাংলাদেশের বিপুল বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে।

এই সময়ে এবং পরিস্থিতিতে যেটা বিবেচ্য বিষয়, তা কিন্তু ১৯ শতকের ইউরোপিয়ান জাতিরাষ্ট্রের মডেলের নিরঙ্কুশ রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব নয়। বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় একীভূত হওয়ার এই সময়টাতে কোনো সত্তাই নিরঙ্কুশ সার্বভৌম নয়। যেটা বিবেচ্য বিষয় তা হলো- পুঁজি, পণ্য ও মানব-প্রবাহ ওই ভূখন্ড দিয়ে আসা-যাওয়ার ওপর তার কতটুকু নিয়ন্ত্রণ আছে এবং সেইসাথে যে দেশটির কাছে অর্থনৈতিকভাবে ঋণগ্রস্ত, সে তার নীতি প্রণয়নে কতটা প্রভাব বিস্তার করে। অর্থাৎ সার্বভৌমত্ব একটি ধারণা, যা দাঁড়িপাল্লার বিপরীত অংশ দুটির মতো উঠা-নামা করে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার মতো কোনো কোনো রাজ্য পানামার মতো জাতিসংঘের কোনো কোনো সদস্যভুক্ত দেশের চেয়ে অনেক ব্যাপারে অনেক বেশি সার্বভৌম।

অর্থাৎ সার্বভৌমত্বের মৌলিক পরিমাপ নির্ভর করে কোনো সত্তা তার প্রয়োজন পূরণ করার জন্য বাহিরের ওপর কতটা নির্ভরশীল তার ওপর। বিষয়টা একটি ইস্যু দিয়ে বোঝানো যায় : কোনো দেশ তার চাহিদা পূরণের জন্য বাইরের পুঁজির ওপর কতটা নির্ভরশীল? ঋণকৃত পুঁজির বিচক্ষণ প্রয়োগের মাধ্যমে সামর্থ্য-সৃষ্টি তার ঋণ গ্রহণের ফলে ত্যাগ করা সার্বভৌমত্ব কতটা পুষিয়ে দিচ্ছে? এটা একটা প্রচ্ছন্ন খেলা। ঋণদাতার ইচ্ছায় ঋণ গ্রহণ করা হোক, কিংবা নিজের ইচ্ছায় ঋণ নেওয়া হোক, যেটাই ঘটুক না কেন, ঋণবিষয়ক যেকোনো পরিস্থিতিতে সবসময়ই এটা মূল্যায়ন করতে হবে। এ ধরনের লেনদেনে উইন-উইন পরিস্থিতিতে পৌঁছানো জটিল একটি কাজ। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিঙের সাম্প্রতিক ঢাকা সফরকালে অনুকূল বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপনের সময় চীনা উদ্যোগটি এর একটি ভালো উদাহরণ।

অনেক লম্বা চীনা পকেটের সাথে ভারত অনেক অনেক পিছিয়ে। বেইজিং যে জিনিসটি ঢাকাকে দিতে পারে না, সেটা পর্যন্ত ঢাকাকে দিতে পারেনি দিল্লিও। সেটা হলো ইন্দো-বাংলাদেশ সীমান্তজুড়ে পশ্চিমবঙ্গ থেকে পূর্ববঙ্গে প্রবাহিত তিস্তা নদীর পানিবণ্টন নিয়ে একটি ব্যাপকভিত্তিক চুক্তি। এই বিষয়টি নিয়ে কলকাতার সাথে কাজ করতে হয়েছে দিল্লির। ঢাকার সাথে চুক্তি করার আগে দিল্লিকে প্রথমে কলকাতার সাথে চুক্তি করতে হবে। তিস্তা চুক্তির ফলে ক্ষতির মুখে পড়া পশ্চিমবঙ্গকে পুষিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা হবে এটা। এখন পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গকে এ ধরনের কোনো ক্ষতিপূরণ করার কোনো প্রতিশ্রুতি দিল্লি দেয়নি। ফলে কিছু সময়ের জন্য হলেও কোনো চুক্তি হয়নি। এতে করে ‘সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের’ মতো গৎবাঁধা অবস্থানে ফিরে গেছে দিল্লি। আন্তর্জাতিক সম্পর্কে বাস্তবে কঠোর মানসিকতার কোনোই স্থান নেই।

‘সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের’ এ ধরনের উল্লেখ যখন ভারত  বর্তমানে ক্ষমতাসীন কেন্দ্রীয় সরকার করে, তখন তা এমনটি আরো বেশি সংশয়পূর্ণ হয়ে পড়ে। ক্ষমতাসীন দলটি বারবার জোরালোভাবে ‘অবৈধ বাংলাদেশী’ পরিভাষা ব্যবহার করে যখন নিজের অনুকূলে কাজে লাগানোর জন্য ঐক্যবদ্ধ ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠবাদের ভোট ব্যাংক সৃষ্টি করে, যেমনটা ভারতের অন্য কোনো সর্বভারতীয় দল কখনো করেনি; আর তখন সংশয়ে না পড়ে থাকা যায় না। যখন কেউ সংকীর্ণ অভ্যন্তরীণ উদ্দেশ্যে কারো কাছে দানব হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করে এবং স্বার্থসিদ্ধির জন্য ওই একই ব্যক্তির প্রতি বিপুল সংবর্ধনার আয়োজন করে, তখন এর সাথে সংশ্লিষ্ট সবার জন্যই বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় এই ধারণায় যে, কারো মন থেকে লজ্জার অনুভূতিটি নির্মূল হয়ে যায়নি।

বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জন্য বেইজিং থেকে দুটি সাবমেরিন কেনায় দিল্লি উদ্বিগ্ন। বাংলাদেশের প্রথম সাবমেরিনও এ দুটি। দিল্লি এতে তার ‘আঙিনায়’ বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান প্রভাব দেখতে পাচ্ছে। কিন্তু ‘আঙিনা’ কল্পনা করা যায় বটে, কিন্ত্তু এর মাধ্যমে বাংলাদেশ যে একটি সার্বভৌম দেশ সেই সত্যটি বাতিল করা যায় না। দেশটির মিয়ানমার ও ভারতের সাথে বিরোধমুক্ত সমুদ্রসীমা রয়েছে। ফলে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক অবয়বে বাংলার স্ব-সার্বভৌমত্বের অনেক বড় বিষয় হলো- বঙ্গোপসাগরের ব্যাপারে তার ন্যায়সঙ্গত অংশ বুঝে নেওয়া।

নিজের ন্যায়সঙ্গত অংশ দাবি করার মধ্যে কোনো বিরোধ থাকতে পারে না। কেউ কারো ন্যায়সঙ্গত অধিকারকে যখন অস্বীকার করে, তখন সে সেটা করতে পারে তার পেশীশক্তি প্রদর্শনের জন্য। ঢাকা ও বেইজিংয়ের সম্পর্ক গভীরতর হওয়ার অর্থ হলো, এই শক্তি প্রদর্শন ভারতের পক্ষে সম্ভব নয়। একটা পর্যায় পর্যন্ত বর্তমান গভীরতার ঢাকা-বেইজিং সম্পর্ক ছাড়াই তা হতে পারে। ফলে দিল্লির পক্ষে যেভাবে পারা সম্ভব সেভাবেই ঢাকার সাথে সম্পর্ক সৃষ্টির চেষ্টা করছে, অন্যদিকে বেইজিং নামে পরিচিত নতুন বন্ধুর কাছ থেকে ঢাকাকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য প্রচ্ছন্নভাবে চেষ্টা করছে।

বাস্তবতা হলো চীন, বাংলাদেশ ও নেপাল এখন যৌথ সামরিক মহড়ার কথা ভাবছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার এই অংশ যে বদলে গেছে, সেটাই তুলে ধরছে। দৃঢ়প্রত্যয় তবে উচ্চ ভাবাদর্শকেন্দ্রিক পরোক্ষ-আগ্রাসী একমুখী সময় অতিক্রম করে আমরা এখন নিরাপত্তাহীনতা ও ঈর্ষার বহুমাত্রিক প্রবাহের পাশাপাশি নানামাত্রিক সময়ে প্রবেশ করছি। বাস্তবতার ধারে কাছেও নেই এমন যে কোনো সম্পর্কের সাথে বিভ্রম-ভিত্তিক সম্পর্কের সাথে কেবল ভালোভাবেই তুলনা করা চলে। এটা শৈশব থেকে কৈশোরে পৌঁছার চিহ্নটি ধারণ করে।

ট্রাম্প : শিশুদেরও যিনি ভয় পান

ডেভিড রথকফ, ফরেইন পলিসি

অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ

ডোনাল্ড ট্রাম্পের হৃদপিন্ডের পুরোটাই ভয়ে ভরা। আবার বিশ্ব তাকে ভয় পায়। এটা কেবলই সন্ত্রাসী হুমকি নিয়ে তার ভয়ের বাড়াবাড়ি কিংবা তথ্য, বিজ্ঞান বা গণতান্ত্রিক-প্রক্রিয়ার ব্যাপারে তার প্রকাশ্য আতঙ্ক নয়।

না, ট্রাম্প দৃশ্যত মিষ্টি রোদে স্নাত আমেরিকান উপশহরগুলোতে যুদ্ধের ক্ষত ছাড়া আর সবই ফেলে আসা অভিবাসী ও উদ্বাস্তু স্কুলশিশুদেরও ভয় পান। তিনি এটা জানেন; কারণ তিনি বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সরকারের শক্তিকে এসব নিরীহদের বিরুদ্ধে ব্যবহারকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। অসৎ উদ্দেশ্য প্রণোদিত রুশ সরকারের সৃষ্ট হুমকি মোকাবিলা করা কিংবা উদীয়মান চীন-বিষয়ক তার কঠোর আলোচনা নিয়ে অগ্রসর হওয়ার বদলে, নতুন প্রেসিডেন্ট এমন সব কর্মসূচি ও প্রটোকল প্রবর্তন করছেন, যার ফলে সারা দেশের শিশুদের ভয়ঙ্কর মূল্য দিতে হবে।

এখন পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্প সবচেয়ে বড় যে কাজটি করেছেন তা হলো – উদ্বাস্তুসহ মুসলিমদের জন্য আমেরিকান সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়া এবং বৈধতাবিহীন নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার করার ব্যবস্থা দ্রুতকরণ। এই দ্বিতীয় কাজটি প্রধানত মেক্সিকানদের টার্গেট করে করা। তিনি এমন সব নির্দেশনা জারি করছেন, যার ফলে বৈধতার কাগজপত্র না থাকা অর্থাৎ বলতে গেলে যে কাউকে সহজেই বহিষ্কার করা যাবে। তিনি নতুন ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) অফিসার নিয়োগ, নতুন নতুন আটক কেন্দ্র এবং তার কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য আদালতের বিরুদ্ধে লড়াই করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

প্রেসিডেন্ট নিজে একবার অসাবধানী মুহূর্তে (তিনি এমন অবস্থায় প্রায়ই থাকেন) এই উদ্যোগকে ‘সামরিক অভিযান’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তবে হোয়াইট হাউজ ওই ভাষাটি ফিরিয়ে নেয় সম্ভবত এই কারণে যে, তার টিম তাকে ‘পস কমিটাটাস অ্যাক্টের’ কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছিল। ওই ফেডারেল অ্যাক্টে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে সামরিক অভিযান পরিচালনা করা অবৈধ করা হয়েছে। তবে তার উদ্দেশ্য স্পষ্ট : তিনি অভিবাসী এবং তাদের পরিবার সদস্যদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হতে চান। এখন পর্যন্ত এসব নীতি কেবল অবৈধ অভিবাসীদের ওপরই নয়, জাতীয় নিরাপত্তা হুমকি সৃষ্টিকারী নাগরিকদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে এবং বিদেশে প্রবল সমালোচনার জবাবে হোয়াইট হাউজ যুক্তি দিচ্ছে , এগুলো কেবল বিপজ্জনক অপরাধীদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এটা ভিত্তিহীন এবং তার নিজের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ডিপার্টমেন্টের সমর্থন ছাড়াই করা।  কিন্তু আমরাই অনেক ভালো জানি।

ট্রাম্পের অনেক সমর্থক সাফাই হিসেবে বলেছেন, বারাক ওবামাও তো তার আমলে অনেককে বহিষ্কার করেছেন। উল্লেখ্য, জর্জ ডব্লিউ বুশ তার আট বছর মেয়াদে যতজনকে বহিষ্কার করেছিলেন, ওবামা তার প্রথম মেয়াদেই তার চেয়ে বেশি করেছিলেন। তবে সেটা নিশ্চিতভাবেই তার ভালো কাজ ছিল না।

অভিবাসীদের প্রতি আমেরিকার নীতির সাম্প্রতিক পরিবর্তনের প্রভাব ইতোমধ্যেই অর্থনীতিতে প্রবলভাবে পড়েছে। ট্রাম্প ক্ষমতা গ্রহণের পর পর্যটন বিষয়ক প্রথম প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার বুকিং ২০১৭ সালে ৬.৫ ভাগ কমে গেছে। মুসলিম দেশগুলো থেকে পর্যটক কমে গেছে ৮০ ভাগ। নিউইয়র্ক, লাসভেগাস, ওরল্যান্ডো, ফ্লোরিডার মতো যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্যের জন্য ফ্লাইট অনুসন্ধান কমেছে ৩০ থেকে ৬০ ভাগ।

বিদেশী পর্যটকদের বছরে যুক্তরাষ্ট্রে ২২১ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করার হিসাব এবং মার্কিন পর্যটন শিল্পে ২০১৫ সালে ৭৫ লাখ লোকের কর্মসংস্থান করার বিষয় দুটি আমলে নিলে বোঝা যাবে- এর ফলে বিপুলসংখ্যক চাকরি সৃষ্টির ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতিতেই তা গভীর গর্তের সৃষ্টি করবে। সীমান্ত এবং বিমানবন্দরগুলোতে হয়রানির খবর প্রকাশিত হতে থাকায় এই খাতের অবস্থা আরো অবনতি ঘটতে পারে। মেক্সিকো থেকে বিপুলসংখ্যক লোক আসার বিষয়টিই বিবেচনা করুন। ২০১৫ সালেই দুই কোটি লোক মেক্সিকো থেকে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিল।

তবে এসব ক্ষীণ-দৃষ্টি সংশ্লিষ্টনীতির আরো বড় মূল্য রয়েছে। গত কয়েক মাসে মেক্সিকো সীমান্তের কাছাকাছি থানা মার্কিন নগরীর বিভিন্ন স্কুল ও কমিউনিটি সেন্টর পরিদর্শন করেছি। এসব নগরীতে অভিবাসী জনসংখ্যা সমাজ জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ দখল করে আছে।

অনেকভাবেই এসব এলাকার শিশুরা বিশেষ ধরনের। অবশ্য শিশুরা তো এমনই হয়। তারা নির্দোষ, খেলাপাগল, তাদের হাতে আসা কাজ করতে কঠোর পরিশ্রম করতে চায়। মেক্সিকো, স্যালভাডোর, নিকারাগুয়া, নিউজিল্যান্ড, আফগানিস্তান, ইরান- অনেক দেশ থেকে এসেছে তারা।

ট্রাম্পের অভিবাসননীতি তাদের ওপর ছায়া ফেলেছে। তাদের প্রিয়জনকে যদি বহিষ্কার করা হয়, তবে তারা ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে পড়বে। কোনো কোনো হিসাবে দেখা গেছে, ৮০ থেকে ৯০ ভাগ পরিবার সদস্যই এখন হুমকির মুখে পড়েছে।

আরো অনেক দেশের মতো যুক্তরাষ্ট্রেও এখন সামনে আসা সত্যিকারের চ্যালেঞ্জগুলো পাশে সরিয়ে রেখে জাতিগত জাতীয়তাবাদের ধোঁয়া উড়ছে। প্রেসিডেন্ট এবং তার সঙ্গীরা যেভাবে পরিবেশকে বিষিয়ে তুলছেন, তাতে করে আমেরিকা আগের চেয়ে নিরাপদ হবে না, এটা যুক্তরাষ্ট্রকে ‘আবার মহান’ও বানাবে না।

তবে এখানকার শ্রেণীকক্ষগুলোতে আমি যা দেখেছি, তাতে আমি আত্মবিশ্বাসী, আমেরিকার শ্রেষ্ঠত্ব ও সমন্বয় সাধনের ক্ষমতা অটুট থাকবে এবং এই প্রেসিডেন্ট যেসব শিশুদের টার্গেট করছেন তারাই, যে দেশ থেকেই তারা এসে থাকুক না কেন, যুক্তরাষ্ট্রকে সর্বোত্তমভাবে প্রতিনিধিত্ব করবে, ভবিষ্যতকে সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিশীল করে তুলবে।

ট্রাম্প প্রশাসন : শিশু তহবিল, শান্তিরক্ষা, জলবায়ুসহ মানবিক খাতের অর্থ কমছে- বাড়বে সামরিক ব্যয়

আসিফ হাসান ::

ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন এবার হাত দিয়েছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক তহবিলে। লক্ষ্য হিসেবে বলা হচ্ছে -অর্থ বাঁচানোর কথা। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রম থেকেই ১শ’ কোটি ডলার অর্থ কমানোর কথা ভাবছে হোয়াইট হাউজ।  অবশ্য প্রস্তাবটি পাস হবে কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। এছাড়াও শিশুদের জন্য যে কোটি কোটি ডলার সাহায্য দেয়া চলমান রয়েছে- তাতে অর্থ দেয়া বন্ধ করে দিয়েও ‘সাশ্রয়ী’ নীতি গ্রহনে উদ্যোগ নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ইতোমধ্যে জলবায়ু  খাতে অর্থ হ্রাসের ঘোষনাও এসেছে। এসব ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয় পক্ষ থেকেই মারাত্মক প্রতিরোধ আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে এর মাধ্যমে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশটির আন্তর্জাতিক নেতৃত্ব প্রদান ও পররাষ্ট্রনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটতে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে বিশ্ব থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার একটি প্রয়াস বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

হোয়াইট হাউজের বাজেট অফিস সম্প্রতি দেশটির পররাষ্ট্র দফতরকে জানিয়েছে, প্রশাসন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও কর্মসূচির জন্য বরাদ্দ করা ৩২ কোটি ৬০ লাখ ডলারের তহবিলের পুরোটাই বাদ দেবে। এতে করে ইউনিসেফ, জাতিসংঘ উন্নয়ন তহবিলের মতো সংস্থাগুলো মারাত্মক বিপদে  পড়বে। বিশেষ করে গরিব শিশুদের নিয়ে নানা কর্মসূচি গ্রহণকারী ইউনিসেফকে অনেক স্থান থেকে গুটিয়ে নিতে হবে। এইডস, যক্ষা, ম্যালেরিয়া ইত্যাদির মতো রোগ প্রতিরোধেও বিপুল সহায়তা দিয়ে আসছিল যুক্তরাষ্ট্র। এসব প্রকল্প এখন হুমকির মুখে পড়বে।

তাছাড়া জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে যুক্তরাষ্ট্র যে চাঁদা দিয়ে থাকে, তার ৪০ ভাগ কমিয়ে ফেলবে বলেও জানিয়েছে হোয়াইট হাউজ। গত বছর জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীর মোট বাজেট ছিল আট শ’ কোটি ডলারের বেশি। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র দিয়েছিল দুই শ’ কোটি ডলারের বেশি। ফলে বিভিন্ন দেশে যুদ্ধ প্রতিরোধে নিয়োজিত জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাহিনীও বেশ সমস্যায় পড়বে।

নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত নিকি হ্যালে ৬ এপ্রিল বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে আলোচনা করতে চাইছেন। সেখানেই জাতিসংঘের ১৬টি শান্তিরক্ষা মিশন নিয়ে মূল্যায়ন করা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এই হ্যালে আগামী মাসে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতির দায়িত্বও পালন করবেন। তিনি হয়তো জাতিসংঘের কয়েকটি শান্তিরক্ষা মিশন বাতিলই করে দেবেন কিংবা ব্যাপক মাত্রায় সঙ্কুচিত করবেন-তা জানাবেন।

ট্রাম্প প্রশাসনের বাজেট হ্রাসের কিছু নথি হাতে পাওয়ার দাবি করেছে প্রভাবশালী ফরেন পলিসি ম্যাগাজিন। তারা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন পররাষ্ট্র দফতরের  বিভিন্ন প্রকল্পের বাজেটে হাত না দিয়ে বরং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার খরচ কমাতে চাইছে। এ কারণেই জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন, ইউনিসেফ ইত্যাদি সংস্থার দিকে তারা নজর দিয়েছে।

অবশ্য কেবল জাতিসংঘ নয়, পাশ্চাত্য সামরিক জোট ন্যাটোর বাজেট, জলবায়ু তহবিলও কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

কেন এসব সংস্থার বাজেট কমানো হচ্ছে, সেটাও জানিয়ে দিয়েছে হোয়াইট হাউজ। হোয়াইট হাউজের এক কর্মকর্তা বলেছেন, প্রেসিডেন্ট দেশের দিকে বেশি নজর দিতে চান, বিদেশের দিকে কম। বিশেষ করে ২০১৮ সালটি হবে ‘যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক’। আর প্রেসিডেন্ট তার বাজেট ঘোষণার সময়ই বিষয়টি পুরোপুরি পরিষ্কার হয়ে যাবে।

গত বছর মার্কিন সরকারি সংস্থাগুলো জাতিসংঘের বিভিন্ন কমসূচিতে মোট একহাজার ৫০ কোটি ডলার দিয়েছিল। শিশুদের টিকা প্রদান, সংঘাতপূর্ন এলাকায় শান্তিরক্ষা বাহিনী পাঠানো, উদ্বাস্তুদের পরিচর্যা, গরিবদের খাদ্য সাহায্য, পরমাণু, রাসায়নিক ও জীবাণু অস্ত্র তদারকির মতো বিষয়গুলোও এতে ছিল।

এই বাজেট হ্রাসের পরিকল্পনা মার্কিননীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিতবাহী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে বিশ্বজুড়ে স্থিতিশীলতার বিকাশ এবং মার্কিন স্বার্থ এগিয়ে নিতেই জাতিসংঘ গঠনে উদ্বুদ্ধ  হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে বিশ্বব্যবস্থায় বড় ধরনের তদারকির কাজ করছে যুক্তরাষ্ট্র।

এখন যদি এসব প্রতিষ্ঠানে চাঁদা প্রদান কমিয়ে দেওয়া হয়, তবে বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাও হ্রাস পাবে।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় চাঁদা কমিয়ে দেওয়া হলেও যুক্তরাষ্ট্র কিন্তু তার প্রতিরক্ষা বাজেট ব্যাপকভাবে বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। হোয়াইট হাউজ জানিয়েছে, তাদের জাতীয় প্রতিরক্ষা বাজেট ৫ হাজার ৪ শ’ বিলিয়ন ডলার থেকে বাড়িয়ে ৬৩ হাজার ৯ শ’ কোটি বিলিয়ন ডলার করা হবে।

 

ভারতীয় দৃষ্টিতে বাংলাদেশ-ভারত প্রতিরক্ষা চুক্তি

জয়িতা ভট্টাচার্য ::

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৭ থেকে ১০ এপ্রিল ভারত সফরকালে বেশ কয়েকটি চুক্তিতে সই হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে দুই দেশের মধ্যকার প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তিটিই সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে। গত কয়েক বছর ধরে ক্রমাগত ঘনিষ্ঠ হওয়া দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক এই চুক্তির ফলে আরো গভীর হবে।

চুক্তির বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করা না হলেও মিডিয়ায় প্রকাশিত কিছু কিছু তথ্যের ভিত্তিতে বলা হচ্ছে, চুক্তিটির মেয়াদ হবে ২৫ বছর। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তির মধ্যে ক্রয় বাণিজ্য, প্রশিক্ষণ ও যৌথ মহড়া এবং সন্ত্রাসদমন বিষয়ক সহযোগিতাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমঝোতা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার সম্পর্কের সূচনা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় থেকে। ভারতীয় সেনাবাহিনী ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর পাশাপাশি যুদ্ধ করে। কিন্তু বিপরীতক্রমে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী ভারতের সাথে দেশের সম্পর্ক নিয়ে সংশয়ে ছিল বলে ধারণা করা হয়।

দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের উন্নতির পাশাপাশি গত কয়েক বছর ধরে দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। সশস্ত্র বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ে নিয়মিত সফর বিনিময়ও হচ্ছে। দুই দেশ প্রশিক্ষণ বিনিময় করছে; যৌথ মহড়ায় অংশ নিচ্ছে, দুই দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে ৬ষ্ট রাউন্ডের ‘অপারেশন সম্প্রীতিও’ হয়েছে। প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রে অগ্রগতি উৎসাহব্যঞ্জক।

চুক্তিটি নিয়ে বাংলাদেশের অনেক নিরাপত্তা বিশ্লেষক এবং রাজনৈতিক নেতা উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। এই চুক্তির বিরুদ্ধে প্রধান যুক্তিগুলো হচ্ছে- এটা দেশের স্বার্থবিরুদ্ধ এবং এতে করে দেশের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে। তাছাড়া এই ভয়ও আছে যে, এর ফলে বাংলাদেশের কৌশলগত অংশীদার এবং বৃহত্তম অস্ত্র সরবরাহকারী চীন মর্মাহত হবে। চুক্তিটি নিয়ে এছাড়াও ভয়ের কারণ হলো, এর ফলে সার্বভৌমত্বে আঘাত দিয়ে, বাংলাদেশের ভূখন্ড ব্যবহার করে ভারতীয় সৈন্যরা উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে চলাচল করতে পারবে। বিদ্যমান সামরিক সহযোগিতার দিকে ইঙ্গিত করে কয়েকজন বিশ্লেষক চুক্তির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন পর্যন্ত তুলেছেন। অধিকন্তু, ভারতীয় অস্ত্রের মান নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করা হচ্ছে।

এসব সংশয় সৃষ্টির বেশির ভাগ কারণ হলো ‘দাদাগিরি সিনড্রোম’; ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক এতে বেশ ভুগেছে। ভারতকে প্রায়ই এই দৃষ্টিভঙ্গি ও মানদন্ড দিয়ে বিচার করা হয়। এ ধরনের ভাবাবেগের সম্পর্ক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিকাশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বাংলাদেশীরা প্রায়ই ’৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী কাছ থেকে আটক সব অস্ত্র নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে ক্ষোভ প্রকাশ করে এবং চুক্তিটির ব্যাপারে তাদের আপত্তির ভিত্তি হিসেবেও এই ঘটনাকে ব্যবহার করে।

অবশ্য পরিস্থিতির অনেক পরিবর্তন ঘটেছে; বাংলাদেশ সব ব্যাপারে ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করেছে বলে। দেশটি অনেক ক্ষেত্রে ইতোমধ্যেই পথিকৃতে পরিণত হয়েছে। মানব উন্নয়নে দেশটি রোল মডেল হয়েছে; বিপুল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হাসিল করেছে, বিশ্বে দেশটি সবচেয়ে দ্রুত প্রবৃদ্ধির অন্যতম। সশস্ত্র বাহিনীর সামর্থ্য ভালোভাবেই স্বীকৃত, শান্তিরক্ষায় আন্তর্জাতিক সাফল্য পেয়েছে। দেশটির এই শক্তি ও সামর্থ্যরে প্রতি স্বীকৃতি দেওয়ার এটাই সময়।

বাংলাদেশ একটি সার্বভৌম দেশ। আর এর রয়েছে নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতি ও বিদেশনীতি । দেশটির চীন-নীতি প্রধানত ভারতের সাথে ভারসাম্য বিধানের জন্য বলে যে যুক্তি দেওয়া হয় তা ধোপে টেকে না এবং তা যুক্তিযুক্ত ও যতার্থও নয়। সার্বভৌম দেশের জন্য ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়; বিশেষ করে প্রতিবেশীদের সাথে সম্পর্ক প্রণয়নের বেলায় তা হতে হবে- যেকোনো পক্ষপাতহীনতার  ভিত্তিতে এবং অবাধে, নিজস্ব নীতির আলোকে ।

অবশ্য মিডিয়ার ওপরও কিছু দায়দায়িত্ব বর্তায়। চুক্তিটির বিরুদ্ধে বাংলাদেশের বেশির ভাগ আপত্তির সৃষ্টি হয়েছে কিছু মিডিয়া প্রতিবেদন ও ভূমিকার কারণে। ওইসব প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এই চুক্তির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশে চীনা প্রভাবের ভারসাম্য বিধানের উদ্দেশ্যে, বিশেষ করে বাংলাদেশ দুটি চীনা সাবমেরিন কেনার পর। বাংলাদেশের জনগণ তাদের জাতিকে নিয়ে চরমভাবে গর্বিত। ফলে এ ধরনের প্রতিবেদন তাদের মর্যাদায় আঘাত হেনেছে, ভারতবিরোধী বাগাড়ম্বড়তায় রসদ জুগিয়েছে। ভারতের বিরুদ্ধে আবেগ উস্কে দিতে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বিরোধিতাকারী অংশটি এ ধরনের ভাবাবেগকে কৌশলে ব্যবহার করছে।

এ ধরনের চুক্তির সুবিধাগুলো উপলব্ধি করার সময় এসেছে। প্রথমত, একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো সামরিক সহযোগিতার পরিমন্ডলে গ্রহণ করা উদ্যোগগুলো অব্যাহত থাকা নিশ্চিত করবে। আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের প্রকৃতিতেও পরিবর্তন আসে। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার সম্পর্ক নির্ভর করে বাংলাদেশের ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক দলের মানসিকতার ওপর।

দ্বিতীয়ত, দুই দেশের ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতি ঘনিষ্ঠতার আলোকে বলা যায়, সন্ত্রাসপ্রতিরোধের মতো অনেক অভিন্ন চ্যালেঞ্জ আছে তাদের সামনে। আর এগুলো যৌথভাবে মোকাবিলা করা প্রয়োজন। এ কারণে সশস্ত্র বাহিনী দুটির মধ্যে আরো ভালো সমন্বয় ও সহযোগিতা প্রয়োজন। যৌথ প্রশিক্ষণ ও মহড়া সশস্ত্র বাহিনী দুটির মধ্যে সামর্থ্যরে সামঞ্জস্য বয়ে আনবে, অভিন্ন হুমকি ব্যবস্থাপনা এবং চ্যালেঞ্জগুলো আরো ভালোভাবে মোকাবিলায় ভূমিকা রাখবে।

তাছাড়া ভারতের অস্ত্র বাজার থেকেও বাংলাদেশ বিপুল ও ব্যপকভাবে উপকৃত হবে। বিশ্বে ভারত বৃহত্তম অস্ত্র আমদানিকারক, তবে শিগগিরই দেশটি প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী দেশে পরিণত হবে। ‘মেক ইন ইন্ডিয়া ইনিশিয়েটিভের’ কারণে অনেক বহুজাতিক কোম্পানি এখন ভারতে তাদের অস্ত্র উৎপাদন ও সংযোজন শিল্পের বিকাশ ঘটাচ্ছে। বাংলাদেশের উচিত এই সুযোগ গ্রহণ করা। কারণ এর মাধ্যমে দেশের খুব কাছ থেকেই সেরা প্রযুক্তি সংগ্রহ করতে পারবে। ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক ঘনিষ্ঠতা ও নৈকট্যের কারণে দেশটির প্রতিরক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পক্ষে এসব প্রযুক্তি ও অস্ত্রের সাথে পরিচিত হওয়া অনেক সহজ হবে। এটা ‘‘কৌশলগত নিজস্বতা ও স্বকীয়তার’’ জন্য ও অস্ত্রের উৎস বৈচিত্র্যময় করতেও সহায়ক হবে। প্রযুক্তি হস্তান্তরে সুযোগ থাকায় এটা অস্ত্র তৈরিতে অগ্রগতি হাসিলেও বাংলাদেশের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করবে। এর অর্থ হলো বাংলাদেশ নিজেকে ‘ব্র্যান্ড বাংলাদেশ’ হিসেবে উচ্চপ্রযুক্তি উৎপাদনকারীতে পরিণত হওয়ার সুযোগ পাবে।

বর্তমান সরকারের উচিত প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধির বিষয়টি ভারতের অংশীদারীত্বমূলক দৃষ্টিভঙ্গির আলোকেই দেখা এবং বিচার করা। এই প্রকল্পে বাংলাদেশ হলো ভারতের প্রধান অংশীদার। এই লক্ষ্য হাসিলে সবার সহযোগিতা প্রয়োজনীয়। চুক্তিটি উভয় দেশের সশস্ত্র বাহিনীকে আরো ঘনিষ্ঠ করবে, শান্তিতে অবদান রাখবে।

(লেখক : ভারতের অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ফেলো। আর নিবন্ধটি ভারতের আউটলুক-এ প্রকাশিত)

ভারতে সাম্প্রদায়িকতার এক দীর্ঘ যুদ্ধ

অধ্যাপক জয়তী ঘোষ ::

গত কয়েক দশকে ভারতীয় রাজনীতি ও সমাজ যেভাবে সাম্প্রদায়িকরণের শিকার হয়েছে, তাতে করে উদ্বিগ্ন এবং একইসাথে ক্ষুব্ধ হওয়ার অনেক কারণ রয়েছে। বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের বদলে বদ্ধমূল সংস্কার আর গুজবে ভর করে স্বাভাবিক জীবনধারাটা বারবার অস্বাভাবিক দিকে বাঁক নিয়েছে। স্থূল ও সূক্ষ্ম উভয় ধরনের বৈষম্যই রয়েছে। তবে এর চেয়েও ভয়াবহ বিষয় হলো সংখ্যালঘুদের, বিশেষ করে দুর্বলদের ‘অন্য’ বা ভিন্ন হিসেবে চিহ্নিত করার প্রয়াস। এতে করে সম্প্রদায়ের মধ্যে অবস্থানগত দৃষ্টিভঙ্গি ক্রমাগত কঠোর হচ্ছে। উদার ও ভিন্নমতালম্বীদের কণ্ঠস্বরের জন্য জায়গা ও অবস্থা অব্যাহতভাবে সঙ্কুচিত হয়ে পড়ছে। তাছাড়া রয়েছে, জীবনধারা এবং সব ধর্মীয় গ্রুপের লোকজনের কল্যাণের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু থেকে সরে যেতে বাধ্য করার পরিকল্পিত প্রয়াস।

তবে সবচেযে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সহিংসতার সদা-উপস্থিত হুমকি। যেকোনো সময় তা দাঙ্গা, ধর্মীয় উত্তেজনা আকারে তীব্র গতিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ব্যক্তির ওপরও হামলা হতে পরে। আর তা ঘটতে পারে ‘উস্কানিতে’ কিংবা বিনা উস্কানিতেই। এর বিধ্বংসী শক্তি ভয়াবহ। কেবল জীবনহানিই নয়, সেইসাথে জীবিতদের মনোস্তাত্ত্বিক ক্ষতিও হয় মারাত্মক পর্যায়ের। তাছাড়া জীবিকায় দেখা দেয় অনিশ্চয়তা, বাস্তুচ্যুতির ঘটনাও ঘটে। সমৃদ্ধ একটি পরিবার রাতারাতি উদ্বাস্তুতে পরিণত হতে পারে। এসবের চেয়েও ভয়ঙ্কর হলো- ভয় আর সন্দেহের পরিবেশ সৃষ্টি। পারস্পরিক আস্থা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। ফলে সব পন্থায় ‘স্বাভাবিক’ কার্যক্রম চালানো হয়ে পড়ে অসম্ভব।

সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার নৃশংসতা এখন সুপরিচিত ও পর্যাপ্তভাবে নথিবদ্ধ। সমাজবিজ্ঞানীরা এ ধরনের সহিংসতা সৃষ্টিকারী সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শক্তি নিয়ে গবেষণা করেছেন। তবে এ ব্যাপারে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপরই আলোকপাত করা হয়েছে সবচেয়ে কম। অথচ ভবিষ্যতের দাঙ্গা এবং আরো সহিংসতার শঙ্কা বজায় রাখতে এর ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি। আর তা হলো দায়মুক্তির সংস্কৃতি। আর এই বিষয়টির দিকেই আলোকপাত করেছেন আইনজীবি ওয়ারিশা ফারাসাত এবং আইনকর্মী প্রীতা ঝা। তাদের পর্যালোচনা তারা তুলে ধরেছেন তাদের Splintered Justice: Living the Horror of Mass Communal Violence in Bhagalpur and Gujarat  (Three Essays Collective, New Delhi, 2016) বইতে। তারা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা তদন্ত করেছেন, ন্যায়বিচারের জন্য আদালতে লড়াই করেছেন। দায়মুক্তির সংস্কৃতি কিভাবে ন্যায়বিচারকে অস্বীকার করে তারা তা ভালোভাবেই উপলব্ধি করেছেন।

লেখকেরা আবেগবর্জিতভাবে কাজটি করেছেন। বিশেষ করে ১৯৮৯ সালে বিহারে এবং ২০০২ সালে গুজরাটের দাঙ্গা নিয়ে তারা নিবিড়ভাবে কাজ করেছেন। উভয় দাঙ্গাতেই টার্গেট ছিলেন মুসলিমরা। দাঙ্গা চলেছিল কয়েক সপ্তাহ ধরে। এতে বিপুলসংখ্যক বয়স্ক ও শিশু নিহত হয়। এছাড়া ধর্ষণ এবং অঙ্গহানির মতো নৃশংস ঘটনাও ঘটতে থাকে। অপরাধীদের শনাক্ত করে শাস্তি প্রদান করা হলে আক্রান্তরা অন্তত বিচার পাওয়ার স্বস্তি অনুভব করতো। কিন্তু দেখা গেছে, বিচার নিশ্চিত করার প্রক্রিয়ায় ভয়াবহভাবে বিঘ্ন সৃষ্টি করা হয়েছে।

আবার তা কিন্তু একটি রাজনৈতিক প্রবণতা কিংবা একটি রাজ্য সরকারে সীমাবদ্ধ নয়। গুজরাটে নরেন্দ্র মোদি সরকারের বিষয়টি সবার জানা। কিন্তু বিহারের ভাগলপুরে তো বিজেপি ছিল না। সেখানে লালু প্রাসাদ, তার স্ত্রী রাবরি দেবী এবং পরে নীতিশ কুমার সরকারে ছিলেন। কিন্তু তেমন কোনো পার্থক্য দেখা যায়নি।

লেখকরা দেখতে পেয়েছেন, পুলিশের ভূমিকা স্পষ্টভাবেই দলীয় আনুগত্যভিত্তিক। আক্রান্তরা সহায়তাদের জন্য ব্যাকুল আবেদন জানাতে থাকলেও পুলিশ নির্মমভাবে উদাসীন থাকে। এমনকি জিডি করা এবং সেটা যথাযথভাবে সম্পন্ন করার কাজটিতেও তারা অযথা বিলম্ব করে থাকে। তদন্ত যথাযথভাবে হয় না। শক্তিমানদের এড়িয়েই তদন্ত শেষ করার প্রবণতা প্রকটভাবে দেখা যায়। সব মিলিয়ে এমন এক অবস্থার সৃষ্টি করা হয়, যার ফলে জীবিতদের আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব না হলেও অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।

তবে পুলিশই কেবল জটিলতা সৃষ্টি করে তা নয়। আদালতও বিষয়গুলো যথাযথভাবে যত্নশীল থাকে না। দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্তরা আদালত থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা বলতে গেলে পায়ই না। আইনের সামগ্রিক-প্রক্রিয়ায় বিচার বিভাগের তদাররিক যথেষ্ট ঘাটতি দেখা যায়। আবার বিচার-প্রক্রিয়া এত দীর্ঘ দিন ধরে চলতে থাকে যে, মনে হবে, কোনো দিনই এটা শেষ হবার নয়। আক্রান্তরা একপর্যায়ে জীবদ্দশায় ন্যায়বিচার পাওয়ার আশা পর্যন্ত হারিয়ে ফেলে। ভাগলপুরের দাঙ্গা হয়েছে ২৮ বছর আগে, আর গুজরাটেরটা ১৫ বছর আগে; অথচ এখন পর্যন্ত বিচার শেষ হয়নি।

দাঙ্গায় অনেকে তাদের পরিবার সদস্যদের হারিয়েছেন, অনেকে সম্পত্তি, জীবিকা খুইয়েছেন। কিন্তু একদিকে ন্যায়বিচার তারা পাননি, ক্ষতিপূরণের মুখও তারা এত দিনে দেখতে পাননি। ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণের প্রক্রিয়াটাও বেশ জটিল। এখানেও নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়।

সার্বিকভাবে বলা যায়, এই বইটিতে ভারতের বিচারব্যবস্থাকে এমন এক ক্ষেত্র হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, দাঙ্গা দমনে কার্যকর পন্থা নিতে হলে এ দিকটির দিকেই বেশি নজর দিতে হবে বলে বলা হয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের সদস্যসহ যে কারো জন্যই এটা বড় ভুল হতে পারে, যদি তারা ধরে নেয়, তারা এতে আক্রান্ত যেহেতু হবে না, তা-ই এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই তাদের। নাগরিকদের একটি ছোট অংশের বেলায়ও যদি নিরাপত্তা ও বিচারব্যবস্থা ব্যর্থ হয়, তবে তা স্পষ্টভাবেই তার অকার্যকারিতার প্রমাণ। আর সেটা একসময় অনিবার্যভাবে আমাদের সবাইকেই আক্রান্ত করবে। ওয়ারিশা ফারাসাত ও প্রীতা ঝা এই বিষয়টিই নজরে এনেছেন। আমাদের এখন যা করতে হবে তা হলো- তাদের পরিশ্রম বৃথা না যাওয়ার নিশ্চয়তা বিধান। সেটা শুরু করতে হবে বিচার বিভাগকে সক্রিয় করার মধ্য দিয়ে।

(ফ্রন্টলাইন থেকে)

‘ট্রাম্প কেন মিথ্যা বলেন’ – বার্নি স্যান্ডার্স যা বললেন

মোহাম্মদ হাসান শরীফ ::

‘‘ডোনাল্ড ট্রাম্প ভয়ঙ্কর মিথ্যাবাদী; লোকটি আমেরিকাকে স্বৈরতন্ত্রের দিকে নিয়ে যাচ্ছে’’ -এমন তীব্রভাবেই আমেরিকান প্রেসিডেন্টকে আক্রমণ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচন করার জন্য সাবেক মনোনয়ন-প্রত্যাশী বার্নি স্যান্ডার্স।

দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে ভারমন্টের এই স্বতন্ত্র সিনেটর মিডিয়া, বিচার বিভাগ এবং আমেরিকান জনজীবনের অন্যান্য স্তম্ভের প্রতি ট্রাম্পের সবচেয়ে বিতর্কিত সমালোচনার বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, ‘‘এগুলো গণতন্ত্রের ওপর সচেতন আক্রমণ’’। তিনি বলেন, ট্রাম্প সবসময় মিথ্যা বলেন। আমি মনে করি, তার মিথ্যা বলাটা ঘটনাক্রমে নয়; এর পেছনে কারণ রয়েছে। তিনি আমেরিকান গণতন্ত্রের ভিত্তিটিই ধ্বংস করার জন্যই মিথ্যা বলেন।

রিয়েল এস্টেট বিজনেসম্যান, রিয়ালিটি টিভি স্টার থেকে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী পদটিতে উত্তরণের ৫০ দিবসের প্রেক্ষাপটে স্যান্ডার্স এই মন্তব্য করলেন। এই সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যেই হোয়াইট হাউজের নতুন ‘‘প্রভু’’ সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার বিশেষ অবদান- স্বাস্থ্য-পরিচর্যানীতি; সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশগুলোতে পর্যটক, উদ্বাস্তু এবং বৈধতাহীন অভিবাসীদের প্রবেশ ব্যবস্থা বাতিল করেছেন। এছাড়া বাণিজ্য ও পরিবেশগত সুরক্ষা চুক্তিগুলোও উড়িয়ে দিয়েছেন।

ওয়াশিংটন ডিসিতে নিজের সিনেট অফিসে গার্ডিয়ানের সাথে কথা বলার সময় স্যান্ডার্স বলেন, বিলিয়নিয়ারদের কর অবকাশ এবং মধ্যবিত্তদের প্রতি ভয়াবহ প্রভাব সৃষ্টিকারী ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়াশীল অর্থনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন। তবে প্রেসিডেন্ট যে স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা দেখাচ্ছেন, তার ব্যাপারেই স্যান্ডার্স সবচেয়ে বেশি ক্রোধ প্রকাশ করেন।

তার মতে, নিজেকে জাতির একমাত্র ত্রাণকর্তা হিসেবে উপস্থাপন করার সচেতন কৌশল হিসেবেই ট্রাম্প মূলধারার মিডিয়া থেকে শুরু করে বিচারক এবং এমনকি খোদ নির্বাচনী-প্রক্রিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ গণ-প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে অন্যায় সমালোচনা করছেন। তিনি একটি বার্তাই দিতে চাইছেন, ‘আমেরিকায় আমিই একমাত্র ব্যক্তি যে আমেরিকার জনগণের পক্ষে দাঁড়িয়েছে, আমিই আমেরিকায় একমাত্র লোক, যে সত্য কথা বলে, আমিই আমেরিকায় একমাত্র লোক, যে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার অধিকার রাখে’।

এই নতুন প্রশাসনের একমাত্র বৈশিষ্ট্য হলো- সত্যের সাথে ট্রাম্পের ভঙ্গুর সম্পর্ক। স্যান্ডার্স বলেন, ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে রায় দেওয়া এক বিচারককে ‘তথাকথিত বিচারক’ হিসেবে ট্রাম্পের অভিহিত করাতে তিনি অবাক হয়েছেন। ট্রাম্প কোনো ধরনের প্রমাণ ছাড়াই বলেছেন, ট্রাম্প টাওয়ারে ওবামা আঁড়ি পেতেছিলেন। ট্রাম্প এ কথাও বলেছিলেন, নভেম্বরের নির্বাচনে ৫০ লাখ লোক অবৈধভাবে ভোট দিয়েছে।

স্যান্ডার্স মনে করেন, বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের জন্যই ট্রাম্প মিথ্যা বলছেন। স্যান্ডার্স যুক্তরাষ্ট্রের ৪৩তম প্রেসিডেন্টের সাথে ৪৫তম প্রেসিডেন্টের তুলনা করেন। তিনি বলেন, ‘জর্জ বুশ ছিলেন খুবই সংরক্ষণবাদী প্রেসিডেন্ট। আমি একেবারে প্রথম দিন থেকে তার বিরোধিতা করেছিলাম। কিন্তু জর্জ বুশ মূলধারার আমেরিকান রাজনৈতিক মূল্যবোধের বাইরে গিয়ে কাজ করেননি।’

মিডিয়া সবসময় ট্রাম্পের দিকে জোরালোভাবে থাকায় এবং তার টুইটার বোমাবর্ষণ সত্ত্বেও স্বঘোষিত গণতান্ত্রিক সমাজবাদী স্যান্ডার্স যে দেশজুড়ে নতুন প্রশাসনের বিরুদ্ধে যে নীরবে আন্দোলন ও প্রতিরোধ গড়ার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন, সেদিকে তেমন কারো নজর পড়েনি। মূলত: ডেমোক্র্যাটিক দলের মনোনয়ন পাওয়ার সময় যে তরুণরা তার প্রতি সাড়া দিয়েছিল, তারাই তার পেছনে এই আন্দোলনে যোগ দিয়েছে।

স্যান্ডার্স বলেন, প্রতিরোধ এখন পূর্ণ গতিতে এগিয়ে চলেছে। বিশেষ করে ‘আওয়ার রেভ্যুলিউশন,’ ‘ওমেন্স মার্চ’ ইত্যাদি সংগঠন গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করতে ফিরে এসেছে। তিনি জানান, ট্রাম্পের স্বৈরতান্ত্রিক ধারাটি রোখার একমাত্র উপায় হচ্ছে তৃণমূল পর্যায়ে প্রতিরোধ আন্দোলন সৃষ্টি করা।

তিনি তার সাফল্যের একটি উদাহরণ হিসেবে বলেন, সম্প্রতি একটি সপ্তাহেই ১৩০টি কংগ্রেস জেলায় ১৫০টি সমাবেশ হয়েছে। লাখ লাখ মানুষ কংগ্রেস সদস্যদের সাথে বৈঠক করার দাবি জানাচ্ছেন- যাতে তারা ‘অ্যাফোরডেবল কেয়ার অ্যাক্টের’ বিরোধিতা করতে পারে।

স্যান্ডার্স তার আন্দোলনে যোগ দেওয়ার জন্য কংগ্রেসে বিশেষ করে রিপাবলিকান সহকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছেন। তিনি স্বৈরতন্ত্র প্রতিরোধ করার জন্য প্রতিরোধ আন্দোলনে নামার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।

তিনি আশা করছেন, আগামী দিনে রক্ষণশীল অনেক রিপাবলিকান সদস্যও তার সাথে কাজ করবেন।

স্যান্ডার্স মার্কিন নির্বাচনে ভ্লাদিমির পুতিনের রাশিয়ার ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, রাশিয়া বেশ সফলতার সাথে কাজটি করেছে বটে ; তবে তা অগ্রহণযোগ্য।