Home » আন্তর্জাতিক (page 5)

আন্তর্জাতিক

উগ্র-জাতীয়তাবাদী উত্থানের দ্বারপ্রান্তে ইউরোপ!

আসিফ হাসান ::

বেক্সিট ছিল প্রথম অভ্যুত্থান। তারপর দ্বিতীয়টি। সেটা হলো ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়া;  এবার তৃতীয়টি। সেটা হবে ইউরোপে। সেটা কী? উগ্রপন্থীদের ইউরোপের দেশে দেশে ক্ষমতা গ্রহণ। এমনটাই ধারণা ফ্রান্সের উগ্র ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ম্যারিঁ লে পেনের। তিনি এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য মার্কিন ও ব্রিটিশ ভোটারদের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে ‘জেগে ওঠার’ ডাকও দিয়েছেন।

সম্প্রতি ইউরোপের উগ্রপন্থী নেতৃস্থানীয়রা সমবেত হয়েছিলেন জার্মানিতে। বর্তমান জমানায় এসে এ ধরনের সমাবেশ নজিরবিহীন। সেখানেই লে পেন হুংকার দেন, ‘বেক্সিট ইউরোপজুড়ে অপ্রতিরোধ্য প্লাবন সৃষ্টি করেছে। বেক্সিটের পর ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয় ছিল ‘দ্বিতীয় অভ্যুত্থান।’

উপস্থিত কয়েক শ’ ব্যক্তির উপস্থিতিতে তিনি বলেন, ‘ইউরোপ প্রশ্নে তার অবস্থান স্পষ্ট। জনগণের জন্য ক্ষতিকর কোনো ব্যবস্থা তিনি সমর্থন করেন না।’ তিনি আরো বলেন, ‘২০১৬ সাল ছিল অ্যাংলো-স্যাক্সন বিশ্বের জাগরণের বছর। আমি নিশ্চিত, ২০১৭ সালে মহাদেশীয় ইউরোপ জেগে ওঠবে।’

জার্মানির মধ্যাঞ্চল কোবলেনজে এই সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। এর আয়োজক ছিল জার্মানির অলটারনেটিভ ফার ডচেসল্যান্ড (এএফডি) পার্টি। সভার শ্লোগান ছিল ‘ইউরোপের স্বাধীনতা।’

লে পেন অ্যাঙ্গেলা মেরকেলের উদ্বাস্তুনীতির তীব্র সমালোচনা করেন। তার মতে, এই নীতির কারণেই বিপর্যয় নেমে এসেছে। তিনি বলেন, জার্মান জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে দেশটিতে লাখ লাখ উদ্বাস্তু ঢুকিয়েছেন মেরকেল। সভায় ইউরোপের লোকরঞ্জক দলগুলো অংশ নেয়। বিশেষ করে লে পেনের ফ্রন্ট ন্যাশনাল, এএফডি, ইতালির নর্দার্ন লীগ, নেদারল্যান্ডসের ফ্রিডম পার্টি।

চলতি বছর ইউরোপের রাজনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন হতে পারে। বিশেষ করে ফ্রান্স, জার্মানি ও নেদারল্যান্ডে উগ্র ডানপন্থীদের বিপুল জয় হতে পারে। তারা সত্যি সত্যি মনে করছে- বেক্সিট ও ট্রাম্প যখন বিজয় পেয়েছে, তখন তারাও জিতবে। গির্ট উইল্ডার্স, ফ্রাক পেত্রি ও মেরিঁ পেন- সবাই অভিন্নভাবে মনে করেন, জনগণ চায়- আরো নিয়ন্ত্রণ, সীমান্ত, বাজেট আর ব্রাসেলস নিয়ে আরো কড়াকড়ি।

এ দিকে বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, লোকরঞ্জক দলগুলোর জনপ্রিয়তা বাড়ছে।

ডাচ ফ্রিডম পার্টির (পিভিভি) প্রধান উইল্ডার্স প্রায় সব জরিপেই এগিয়ে আছেন। চলতি মাসের নির্বাচনে তার দল বেশ ভালো করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

আর পেত্রির অভিবাসনবিরোধী আলটারনেটিভ ফর জার্মানি পার্টি (এএফডি) সেপ্টেম্বরের নির্বাচনে মেরকেলকে ধরাশায়ী করতে পারেন। পেত্রি মনে করেন, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের (ইউ) কোনোই ভবিষ্যত নেই। লে পেনও ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে ফ্রান্সকে বের করে নিতে গণভোট তথা ফেক্সিট আয়োজন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তিনি ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট হলে জনগণকে চারটি সার্বভৌমত্ব ক্ষমতা ফিরিয়ে দেবেন। এই চারটি হলো : ভূখন্ডগত সার্বভৌমত্ব, অর্থের সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব এবং আইন পরিষদীয় সার্বভৌমত্ব। এসবের মাধ্যমেই তৃতীয় অভ্যুত্থান এগিয়ে যাবে বলে এই উগ্রপন্থীদের সবাই মনে করছেন।

ট্রাম্প জমানায় টিকে থাকা : স্বৈরতান্ত্রিকতার সর্বব্যপী ভীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ

যোশেফ স্টিগলিৎজ ::

অনুবাদ : আসিফ হাসান

মাত্র একটা মাস। এর মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আশ্চর্য গতিতে বিশৃঙ্খলা আর অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে ফেলেছেন; এমন মাত্রার আতঙ্ক সৃষ্টি করেছেন- যা যেকোনো সন্ত্রাসীকে গর্বিত করবে। ঘাবড়ে যাওয়া নাগরিক এবং ব্যবসায়ী, নাগরিক সমাজ এবং সরকারি নেতারা যথাযথ ও কার্যকরভাবে সাড়া দিতে হিমশিম খাচ্ছেন।

ট্রাম্প এখনো তার প্রস্তাবিত আইনের বিস্তারিত বিবরণ উপস্থাপন করেননি। ফলে সামনে যাওয়া নিয়ে যেকোনো দৃষ্টিভঙ্গি নিশ্চিতভাবেই সাময়িক ব্যবস্থা। কংগ্রেস এবং আদালতগুলোও তার নির্বাহী আদেশ কার্যকর করার ক্ষেত্রে পুরোপুরি সাড়া দেয়নি। অনিশ্চয়তাকে স্বীকৃতি দেওয়া কিন্তু প্রত্যাখ্যানকে যৌক্তিক প্রতিপন্ন করা নয়।

বিপরীতে, এটি এখন পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, ট্রাম্প যা বলেন, টুইট করেন, সেগুলো অবশ্যই গুরত্বসহকারে নিতে হবে। নভেম্বরে নির্বাচনের পর প্রায় সার্বজনীন আশা ছিল, নির্বাচনী প্রচারকাজের সময়কার চরমপন্থা তিনি পরিত্যাগ করতে পারেন। নিশ্চিতভাবেই এটা ছিল শুধুমাত্র এমন চিন্তা যে – অবাস্তবতার এই গুরু বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী পদ হিসেবে কথিত স্থানটির বিপুল দায়িত্বভার গ্রহণের পর ভিন্ন ব্যক্তি হিসেবেই তিনি আবির্ভূত হবেন।

প্রত্যেক নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্টের ক্ষেত্রেই একই ধরনের কিছু ঘটে : আমরা নতুন যাকেই ভোট দেই না কেন, আমরা নিজেরা তাকে যেমনটি দেখতে চাই, তেমনভাবে আমাদের ভাবমূর্তি তাদের ওপর আরাপ করি। আবার বেশির ভাগ নির্বাচিত কর্মকর্তা সব মানুষের সবকিছুকে স্বাগত জানান, কিন্তু ট্রাম্প সংশয়ের কোনো অবকাশই রাখেননি যে, তিনি যা বলেছিলেন, সেগুলো করবেন : মুসলিম অভিবাসন নিষিদ্ধ করা, মেক্সিকো সীমান্তে প্রাচীর দেওয়া, নর্থ আমেরিকান ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট (নাফটা) বাতিল করা, ২০১০ সালের ডোড-ফ্রাঙ্ক আর্থিক সংস্কার বাতিল করা, এবং আরো কিছু যা তার সমর্থকেরা পর্যন্ত প্রত্যাখ্যান করেছেন।

মাঝে মাঝে আমি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিণতিতে জাতিসংঘ, ন্যাটো, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ও সম্পর্কের জালের ভিত্তিতে তৈরি অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাব্যবস্থার বিশেষ বিষয়াদি ও নীতিমালার সমালোচনা করেছি। তবে বিশ্বকে আরো ভালো কাজের উপযোগী করার জন্য এসব প্রতিষ্ঠান ও সম্পর্ককে সংস্কারের প্রয়াস এবং এগুলোকে পুরোপুরি ধ্বংস করার এজেন্ডার মধ্যে একটি বড়রকমের পার্থক্য রয়েছে।

ট্রাম্প বিশ্বকে দেখেন ‘জিরো-সাম গেমের’ পরিভাষায়। বাস্তবে সুনিয়ন্ত্রিত বিশ্বায়ন একটি ‘পজেটিভ-সাম’ শক্তি : আমেরিকা লাভবান হবে যদি তার মিত্র ও বন্ধুরা- তা সে অস্ট্রেলিয়া, ইইউ বা মেক্সিকো যে-ই হোক না কেন- শক্তিশালী হয়। কিন্তু ট্রাম্পের দৃষ্টিভঙ্গি হলো একে ‘নেগেটিভ-সাম গেমে’ পরিণত করা অর্থাৎ আমেরিকা হারবেই।

ওই দৃষ্টিভঙ্গি তার উদ্বোধনী ভাষণে স্পষ্ট ছিল। এতে তিনি তার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ বুলির পুনরাবৃত্তি করেছেন, এর ঐতিহাসিক ফ্যাসিবাদী রূঢ়কণ্ঠে, তার কুৎসিততম রূপরেখার প্রতি তার দায়বদ্ধতার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। আগের প্রশাসনগুলো মার্কিন স্বার্থ এগিয়ে নিতে তাদের দায়দায়িত্ব সবসময়ই আন্তরিকভাবে গ্রহণ করেছিল। তবে তারা সাধারণত যেসব নীতি অনুসরণ করতো, সেগুলো ছিল জাতীয় স্বার্থের আলোকিত উপলব্ধির পরিভাষার কাঠামোবদ্ধ। তারা বিশ্বাস করতো, আমেরিকানরা আরো সমৃদ্ধ বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ দেশগুলোর সাথে জোট গঠন থেকে উপকৃত হবে।

ট্রাম্প মেঘে যদি রুপালি রেখা থেকে থাকে, তবে তা হলো গোপন বা প্রকাশ্য ধর্মান্ধতা ও নারী-বিদ্বেষ সম্পর্কের আলোকে তৈরি এবং সহিষ্ণুতা ও সাম্যতার মতো মৌলিক মূল্যবোধের বিপরীতে সৃষ্ট সংহতির নতুন অনুভূতি। আর ট্রাম্প এবং তার দল সেটাই তৈরি করেছেন। আর গণতান্ত্রিক বিশ্বজুড়ে ট্রাম্প এবং তার মিত্রদের প্রত্যাখ্যান ও প্রতিবাদের মুখে এই সংহতি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।

ট্রাম্প দ্রুততার সাথে ব্যক্তি অধিকার পদদলিত করবেন, এমনটা ধারণা করে যুক্তরাষ্ট্রে আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়ন দেখিয়েছে, তারা যথাযথ প্রক্রিয়া অবলম্বন, সাম্য সুরক্ষা এবং ধর্মের ব্যাপারে সরকারি নিরপেক্ষতার মতো প্রধান সাংবিধানিক নীতিমালা রক্ষায় প্রস্তুত। আর গত মাসে আমেরিকানরা মিলিয়ন মিলিয়ন দান করে এসিএলইউ’র প্রতি তাদের সমর্থন প্রদর্শন করেছে।

একইভাবে দেশজুড়ে কোম্পনিগুলো এবং ক্রেতারা ট্রাম্পকে সমর্থনকারী সিইও এবং বোর্ড সদস্যদের ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ফলে গ্রুপ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের করপোরেট নেতৃবৃন্দ এবং বিনিয়োগকারীরা পরিণত হয়েছে ট্রাম্পের মদতদাতায়। ডাভোসের বার্ষিক বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের চলতি বছরের সভায় আমি উপস্থিত ছিলাম এবং সেখানে তার গোঁড়ামি এবং সংরক্ষণবাদকে সযত্নে অনেকেই পাত্তা না দিয়ে, কর হ্রাস এবং নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তার অনেক গলাবাজি শুনেছেন।

এসবের চেয়েও উদ্বেগের বিষয় ছিল সাহসের অভাব : ট্রাম্পকে নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকলেও অনেকেই এর  বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে ভয় পাচ্ছেন; আর অন্তত তারা শংকিত ও ভীত – যাদের কোম্পানির শেয়ার মূল্য কোনো টুইটের মাধ্যমে টার্গেট হয়ে যেতে পারে। স্বৈরতান্ত্রিক সরকারের ছাপই হলো সবদিক ছাপিয়ে থাকা ভীতি। আর আমরা আমার প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রে তা এখন দেখছি।

এর ফলে একসময় যে আইনের শাসন ছিল অনেক আমেরিকানের কাছে বিমূর্ত বিষয়, তা এখন পরিণত হয়েছে মূর্ত বিষয়ে। আইনের শাসনের আওতায় সরকার যদি আউটসোর্সিং এবং বিদেশকরণ ঠেকাতে চায়, তবে সে যথাযথ উদ্দীপনা সৃষ্টি এবং অনাকাক্সিক্ষত আচরণ নিরুৎসাহিত করতে আইন প্রণয়ন করে। সে বিশেষ কোনো প্রতিষ্ঠানকে ভয় দেখায় না বা হুমকি দেয় না কিংবা নিরাপত্তার হুমকি হিসেবে উদ্বাস্তুদের ভয়ঙ্করভাবে উপস্থাপন করে না।

নিউ ইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্টের মতো আমেরিকার শীর্ষ মিডিয়াগুলো এখন পর্যন্ত ট্রাম্পের আমেরিকান মূল্যবোধ পরিত্যাগের বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে সামগ্রিকভাবে আমেরিকান মূল্যবোধ হিসেবে সর্বজনীন বলে মেনে নিতে অস্বীকার করে আসছে। ট্রাম্প বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং জাতীয় নিরাপত্তা নীতিনির্ধারণের অতি গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো থেকে সবচেয়ে সিনিয়র সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সরিযে সেখানে  বসিয়েছেন অতিডানপন্থীদের- যাদের মিডিয়া অন্ধ উগ্রবাদী বলেই মনে করে। এছাড়াও উত্তর কোরিয়ার সর্বশেষ ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার মুখে নিজ কন্যার ব্যবসায়িক উদ্যোগগুলোকে এগিয়ে নিচ্ছেন যে ব্যক্তি – এমন একজনের যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদে থাকাটা কোনক্রমেই স্বাভাবিক নয়।

কিন্তু নানা ঘটনা ও সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আমাদের বাধা দেওয়ার ফলে গ্রহণযোগ্যতার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে এবং এতে অসাড় হয়ে পড়াটাই স্বাভাবিক। এবং এর ফলে আগামীর আরো বড় ভুল আসতে থাকার প্রেক্ষাপটে, অতীতের বড় বড় ভুল ও ক্ষমতার অপব্যবহারের দিকে তাকিয়ে থাকাটাই  সহজ। এই নতুন যুগের প্রধান চ্যালেঞ্জটি হলো- সতর্কতা বজায় রাখা এবং যেখানে ও যখনই প্রয়োজন, সেখানেই এবং তখনই প্রতিরোধ করা।

(লেখক : ২০০১ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী । কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক)

 

ভারতের সিদ্ধান্ত : আর নয় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প

২০২২ সালের পর ভারতে আর কোনো কয়লাভিত্তিক প্রকল্প  নির্মাণ করা হবে না

ওয়েব সাইট অবলম্বনে মোহাম্মদ হাসান শরীফ ::

প্রবল প্রতিবাদের মধ্যেও যখন বাংলাদেশের রামপালে যৌথ উদ্যোগে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণকাজ এগিয়ে চলছে, তখন খোদ ভারতেই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে নীতিগত অবস্থানের ১৮০ ডিগ্রি পরিবর্তন ঘটেছে; অর্থাৎ পুরো পরিবর্তন হয়েছে এসংক্রান্ত পরিকল্পনায়। দেশটির সেন্ট্রাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটি (সিইএ) জানিয়েছে, পাঁচ বছর পরই তারা আর কোনো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্লান্ট স্থাপন করবে না। তারা বরং নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের দিকে যাবে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীলতা ক্রমাগত কমিয়ে আনা হবে।

ভারত কিন্তু বেশ ভাবনা-চিন্তার পরই কয়লা ছেড়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে যাওয়ার কথা ভাবছে। ২০২২ সালের পরে আর কোন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণকাজ তারা করবেনা। তবে দেশটিতে এখনো যে পরিমাণ কয়লার মজুত আছে, তা দিয়ে তারা ২০২৭ সাল পর্যন্ত আনায়াসে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে যেতে পারবে। কিন্তু তারপরও ওই অবস্থান থেকে তারা সরে আসছে।

এই পরিবর্তনের একটি বড় কারণ হলো পরিবেশ দূষণ। আবার দূষণকারী উপাদানগুলো দূর করতে প্রতিষেধকমূলক যেসব পদক্ষেপ নিতে হয়, সেগুলো নিতে গেলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায় অনেক বেশি। এই ব্যয়ভার মেটানো সম্ভব নয়। এ কারণেই  অত্যাধুনিক এবং পরিবেশ দূষণমুক্ত সরঞ্জাম দিয়ে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপানের চাহিদা কমে যাচ্ছে।  ভারতের ন্যাশনাল ইলেকট্রিসিটি প্লানে (২০১৭-২০২২) এ ব্যাপারে একটি রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে,  ২০২১-২২ এবং ২০২৬-২৭ সময়কালে মোট জ্বালানির যথাক্রমে ২০.৩ ও ২০.৩ ভাগ আসবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে।

কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর বেশির ভাগই তৈরি হয়েছে বেসরকারি খাতে। সরকারের এই নীতিগত পরিবর্তনের ফলে প্লান্টে বিনিয়োগে বড় ধরনের সমস্যা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সরকার সিইএ’র পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অগ্রসর হলে ৪,০০০ মেগাওয়াটের আল্ট্রা মেগা পাওয়ার প্লান্টের প্রয়োজন হবে না বলেও মনে করা হচ্ছে।

গত ডিসেম্বরে সিইএ’র খসড়া জাতীয় বিদ্যুত পরিকল্পনাটি প্রকাশিত হয়। বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের তদারকিতে এটা প্রণয়ন করা হয়। ভারতের দ্বাদশ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা (২০১২-১৭) অনুযায়ী, ওই সময়কালে দেশটিতে ১,০১,৬৪৫ মেগাওয়াট নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদন হওয়ার কথা। এগুলোর ৮৫ ভাগই কয়লাভিত্তিক প্লান্ট থেকে আসবে বলে পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তবে এখন পরিকল্পনা করা হয়েছে, ২০২২ সালের পর আর কোনো কয়লাভিত্তিক প্লান্ট নির্মাণ করা হবে না। ২০২২ সাল থেকেই নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ প্লান্টের কাজ বড় আকারে শুরু হবে। ওই বছরে মোট ১৭৫ গিগাওয়াটের নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ প্লান্ট নির্মাণ করা হবে।

২০১৬ সালের মার্চে ভারতের মোট বিদ্যুতের প্রায় ৬১ ভাগ ছিল কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের, ১৪ ভাগ জলবিদ্যু, ১৪ ভাগ নবায়নযোগ্য (বেশির ভাগই বায়ুভিত্তিক), ৮ ভাগ প্রাকৃতিক গ্যাস, ২ ভাগ পরমাণু এবং ১ ভাগ ডিজেলভিত্তিক কেন্দ্রের।

বিদ্যুৎ স্বল্পতা দূর করা এবং প্রতিটি ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাপকভাবে বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ভারতে ১৯৫০ সালে বিদ্যুৎ সামর্থ্য ছিল ১,৭১৩ মেগাওয়াট, ২০১৬ সালের মার্চে দাঁড়ায় ৩০২,০৮৮ মেগাওয়াট। ভারতের  দিক থেকে এটা বড় ধরনের সাফল্য হিসেবেই দেখা হচ্ছিল। কিন্তু এটা করতে গিয়ে পরিবেশের ভয়াবহ দূষণ ঘটে । কোনো কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে ভারতের রাজধানীকে বলা হয়েছে, বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত নগরী। ভারতের অবস্থানও একই পর্যায়ের। অবশ্য কেবল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্যই যে দূষণ ঘটছে, এমন নয়। তবে এটা অন্যতম কারণ।

আবার ভারতই নয়, পরিবেশ সুরক্ষার দিকে পরোয়া না করা দেশগুলোর তালিকায় ভারতের সাথে যেন প্রতিযোগিতা করছে চীন, ব্রাজিল ইত্যাদি দেশ। পরিবেশ দূষণ ওইসব দেশেই সীমিত থাকছে না। বাংলাদেশের মতো দেশ তার শিকার হয়। সমুদ্র স্তরের উচ্চতা বেড়ে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকা তলিয়ে যাওয়ার যে আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে, তার জন্য কিন্তু বাংলাদেশ দায়ী নয়। কিছুটা অগ্রসর দেশগুলো তাদের উন্নয়ন কার্যক্রম এগিয়ে নিতে গিয়ে এমন সব ব্যবস্থা নিচ্ছে, তার সুফল তারা এককভাবে পেলেও কুফলগুলো গরিব দেশগুলোকেও ভোগ করতে হচ্ছে।

এমন এক প্রেক্ষাপটে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনে ভারত ব্যাপক উদ্যোগ নিয়েছে। ২০১৬ সালের মার্চে যেখানে এই খাত থেকে বিদ্যুৎ আসতো ৫২৩ মেগাওয়াট, সেখানে ২০২২ সাল নাগাদ এই খাত থেকে ৫২৩ গিগাওয়াট করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই পরিকল্পনায় কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ৮৫ ভাগ থেকে কমিয়ে ৪৭.৫ ভাগ করার কথা বলা হয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির মধ্যে পানি, পরমাণু, বাতাস, সৌর বিদ্যুতের দিকেই বেশি নজর দেওয়া হবে।

ফারাক্কা : ভারতে আবারও তীব্র প্রতিবাদ

মোহাম্মদ হাসান শরীফ ::

ফারাক্কা বাঁধ এখন ভারতের জন্যে, বিশেষ করে এর বিহার অঞ্চলের অভিশাপ। বাঁধটি বাংলাদেশের পরিবেশ-প্রতিবেশকে ধ্বংস করে মরুভূমিতে পরিণত করছে, বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনকে হুমকির মুখে ফেলছে, আবার বিহারসহ উজানে সৃষ্টি করছে ভয়াবহ বন্যা আর নদী ভাঙ্গনের। বাঁধটি চালু হওয়ার প্রথম থেকেই বাংলাদেশের মানুষ এর বিরুদ্ধে সোচ্চার। আর এখন সোচ্চার হয়েছে বিহারের মানুষ। অবশ্য এটা ঠিক, এই বাঁধ যে পশ্চিমবঙ্গের জন্যও ভয়াবহ ক্ষতির কারণ, তা প্রথম থেকেই বোঝা যাচ্ছিল। এই প্রকল্পের প্রধান ইঞ্জিনিয়ার বাঁধটির নির্মাণের বিরোধিতা করেছিলেন। ফলে তাকে সরে যেতে হয়েছিল।

কিন্তু এখন ভারতে বাঁধটির বিরুদ্ধে সোচ্চার হচ্ছে অনেক মানুষ। পরিবেশবাদীদের সাথে যোগ দিয়েছেন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমারসহ আরো অনেক সুপরিচিত মুখ।

প্রতিবাদকারীর আরেকজন হচ্ছেন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার বিজয়ী রাজেন্দ্র সিং। তাকে ভারতের ‘ওয়াটারম্যান’ বলে অভিহিত করা হচ্ছে। তিনি ‘ফারাক্কা বাঁধ গুঁড়িয়ে দেওয়া’র প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি বলেন, ফরাক্কা হলো বিহারের কাছে অশুভ। এটা একটা অভিশাপ- যাকে সরানোর প্রয়োজন। কারণ, যতক্ষণ তা না হচ্ছে, ততক্ষণ এগিয়ে যাওয়া অসম্ভব। একটি আন্তর্জাতিক সেমিনারে অংশগ্রহণ করতে গিয়ে রাজেন্দ্র বলেন, এতদিন ফারাক্কার কারিগরি ও প্রযুক্তিগত দিকগুলো নিয়েই আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি, পরিবেশগত থেকে শুরু করে এর সাংস্কৃতিক, প্রাকৃতিক, আধ্যাত্মিক দিকগুলোও খতিয়ে দেখা দরকার।

আরেক বিশেষজ্ঞ হিমাংশু ঠক্কর জানান, ফারাক্কা বাঁধের কার্যকারিতা বলতে কিছুই নেই। সেচ থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ, পানি সরবরাহ- কোনো কাজেই আসছে না ফারাক্কা। তার প্রস্তাব, গোটা বিষয়টি (ফারাক্কার প্রয়োজনীয়তা) খতিয়ে দেখার সময় এসেছে। তিনি যোগ করেন, সাধারণত, প্রত্যেক বাঁধের গুরুত্বের খতিয়ান ২০ বছর অন্তর খতিয়ে দেখা উচিত। কিন্তু, ৪২ বছর হয়ে গেলেও, ফরাক্কা নিয়ে কোনো পর্যালোচনা হয়নি। তার দাবি, ফারাক্কা যতদিন থাকবে, ততদিন গঙ্গার গতি থমকে যাবেই। ফলে, বিহারে ভয়াবহ বন্যা হবে।

এদিকে, গঙ্গা পুনঃজীবীকরণ নিয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের গঠিত উচ্চপর্যায়ের কমিটি প্রস্তাব দিয়েছে, বিহারের বন্যা পরিস্থিতি সামলাতে ফারাক্কা বাঁধ লাগোয়া জলাধারের চরায় ড্রেজিং করতে।

বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমারও চুপ কওে বসে নেই। তিনি ফারাক্কা বাঁধ ভেঙ্গে দেওয়ার জন্য কেন্দ্র সরকারের কাছে প্রবল দাবি জানিয়ে বলেছেন, এর কোনো উপযোগিতা নেই, সেইসাথে এটা প্রতিবছর রাজ্যে বন্যা সৃষ্টি করে। তিনি প্রস্তাবিত ‘বক্সা’র জলাধার এবং উত্তরপ্রদেশগামী ‘এলাহাবাদ-হলদিয়া’ পানিপথেরও তীব্র বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা আগের কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকারের কাছে পশ্চিমবঙ্গের ফারাক্কা বাঁধ ভেঙ্গে দেওয়ার দাবি জানিয়েছিলাম। বিষয়টা আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছেও বলেছিলাম। তাকে বলেছি, ফারাক্কা বাঁধ গঙ্গা নদীতে ব্যাপক পলি জমাচ্ছে, প্রতি বছর বিহারে প্রবল বন্যা সৃষ্টি করছে’। বিহারের মুখ্যমন্ত্রী বলেন, অনেক বিশেষজ্ঞ ফারাক্কা বাঁধের ক্ষতির দিকটি উল্লেখ করেছেন।

এমনকি পশ্চিমবঙ্গের মূল ইঞ্জিনিয়ার এই বাঁধ নির্মাণের সাথে জড়িত ছিলেন তিনিও এর বিরোধিতা করেছিলেন- যাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল, ওই বাধ নির্মানের বিরোধিতার জন্যে। তিনি লোক সংবাদ (গণ-সংলাপ)  অনুষ্ঠানে বলেন, ‘আমি প্রতিটি প্লাটফর্মে ফারাক্কা বাঁধের বিরুদ্ধে দাবি জানিয়েছি। কারণ এটা গঙ্গা নদীতে পলি জমিয়ে দিচ্ছে, শক্তিশালী নদীটির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করছে’। তিনি বলেন, আগের মনমোহন সিং সরকারের আমলে রাজ্য পানিসম্পদমন্ত্রী পবন বনশালকে বাঁধের কাছে নিয়ে গিয়ে দেখানো হয়েছিল, বিহার এবং অন্যান্য উজানের রাজ্যে এটা কেমন সমস্যার সৃষ্টি করছে।

বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার বলেন, ‘গত বছরের বন্যার সময় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যখন আমার সাথে কথা বলেছিলাম, তখন তাকে জানিয়েছিলাম, ফারাক্কা বাঁধ কেমন সমস্যা সৃষ্টি করছে। পরে এক সভায় তাকে এর অপকারের বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছিলাম।’ তিনি বলেন, ফারাক্কা বাঁধ কল্যাণকর কিছুই করছে না। সমীক্ষাতেও এমনটা দেখা গেছে।

এই বাঁধের ব্যাপারে পশ্চিমবঙ্গের অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ওই রাজ্যের ওপরও এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। তবে অন্যরা কী বললো, তাতে আমি মনোযোগ দিচ্ছি না। কারণ বিহারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে এবং আমরা এর বিরোধী।

নীতিশ কুমার বক্সারে এলাহাবাদ-হলদিয়া জাতীয় নৌপথ নম্বর ১-এর জলাধার নির্মাণের প্রস্তাবের প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, ‘গঙ্গার পরিষ্কারকরণ তখনই সম্ভব হবে, যখন এর প্রবাহ থাকবে বাধাহীন।

চীন: পরাশক্তির বিবর্তন-৫৭ : ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড

আনু মুহাম্মদ ::

২০১৩ সালের শেষের দিকে চীন সরকারের পক্ষ থেকে এক জোড়া বিশাল নির্মাণ যজ্ঞ এবং তার সাথে বৈশ্বিক যোগাযোগ ও বাণিজ্যের পরিকল্পনার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়। সড়ক ও সমুদ্র পথ দিয়ে দুটো যোগাযোগ নির্মাণ যজ্ঞ হলো – ‘সিল্ক রোড ইকনমিক বেল্ট’ এবং  ‘টুয়েনটি ফার্স্ট সেঞ্চুরি মেরিটাইম সিল্ক রোড’। এই দুটোকে একসাথে বলা হয় ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড।[i] এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকসহ বিভিন্ন অর্থকরী প্রতিষ্ঠান স্থাপন এবং এই অবকাঠামো সংযোগ উদ্যোগ বৈশ্বিক পর্যায়ে চীনের বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং তার সাথে অর্থনৈতিক রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধির পথ নকশা হিসেবে বিবেচনা করা যায়। এর মধ্যে প্রকাশ ঘটেছে চীনের ভেতরে শিল্প উৎপাদন ক্ষমতা এবং পুঁজি বিনিয়োগের উদ্বৃত্ত ক্ষমতার। কারও কারও ভাষায় চীনের রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের আত্মসম্প্রসারণের তাগিদেরই এটা বহি:প্রকাশ।

সড়কপথে চীন থেকে পাকিস্তান, তুরস্ক, রাশিয়া, ফ্রান্স, ইটালি আবার সমুদ্রপথে ইটালী থেকে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ স্পর্শ করে মালাক্কা প্রণালী মালয়েশিয়া হয়ে আবার চীন। সিঙ্গাপুরের   ভূমিকা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকার কারণে ভারতীয় মহাসাগর থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম চীন পর্যন্ত পাকিস্তান বা বাংলাদেশ হয়ে আরেকটি পথও এই পরিকল্পনার মধ্যে আছে। শ্রীলঙ্কাও এই পথে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সমুদ্রপথের বিভিন্ন বিন্দুতে চীন তাই একাধিক গভীর সমুদ্র বন্দরের কাজে আগ্রহী। প্রথম দিকে রাশিয়া পরিকল্পনায় আগ্রহী না হলেও যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে বিবাদের পর তারা আগ্রহী হয়েছে।

সাম্প্রতিক কালে চীন আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থাতেও বড়ধরনের ভূমিকা গ্রহণ শুরু করেছে। ব্রিকস সদস্যদেশগুলো সহ (ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা) ‘নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক’ প্রতিষ্ঠা বিদ্যমান আর্থিক ব্যবস্থার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। এছাড়া ‘এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক’ (এআইআইবি) চীনের প্রায় একক উদ্যোগে এবং পরিচালনায় কাজ শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ঠেকাতে চেষ্টা করলেও ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশ এর সদস্য হয়েছে। এছাড়া সিল্ক রোড ফান্ডসহ আরও বেশি কিছু আর্থিক ব্যবস্থার উদ্যোগ অব্যাহত রেখেছে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবি, ইউরোপীয় সেন্ট্রাল ব্যাংকের মতো সংস্থার একক কর্তৃত্বশালী অবস্থার জন্য পরিষ্কার একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে চীনের এসব উদ্যোগ।

এসব উদ্যোগের সাথে আর্থিক আয়োজন বিশাল। আগের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে এতো ব্যয়বহুল প্রকল্পের ভার বহন করা সম্ভব নয়। কিন্তু চীন এই প্রকল্পগুলো একের পর এক গ্রহণ করে যাচ্ছে। সিল্ক রোডের সাথে যুক্ত বিভিন্ন দেশে চীনের যেসব প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে সেগুলোর মোট ব্যয় প্রায় ৯০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এআইআইবি, নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, সিল্ক রোড তহবিল এবং এই নেটওয়ার্কে বিভিন্ন প্রকল্পের ব্যয়ভার বহনে মূল ভূমিকা চীনের বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের। চীনের কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ‘এসব বৃহৎ পুঁজিঘন প্রকল্পগুলো নেবার কারণ হলো চীনের উদ্বৃত্ত আভ্যন্তরীণ সঞ্চয় দেশের ভেতর কম উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহার না করে, অতি উৎপাদন ক্ষমতার অপচয় না করে, তা আরও উৎপাদনশীল কাজে লাগানো। যেহেতু ব্যাংকিং খাতেই চীনের আভ্যন্তরীণ সঞ্চয়ের কেন্দ্রীভবন ঘটে সেহেতু এই ব্যাংক এই দায়িত্ব নিতে সক্ষম।’ [ii]

সিএনবিসি-র একই রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, ‘এপর্যন্ত চীনের ব্যাংকগুলো থেকে দেশের বাইরে বিভিন্ন প্রকল্পে যে পরিমাণ ঋণ দেয়া হয়েছে তার পরিমাণ ১.২ ট্রিলিয়ন (বা ১২০০ বিলিয়ন) মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে।’ ঋণের পরিমাণ যেরকম অদৃষ্টপূর্ব হারে বাড়ছে তাতে ভবিষ্যতে এই ঋণের পরিশোধ নিয়ে অবশ্য অনেক বিশেষজ্ঞই চিন্তিত!

এটা ঠিকই যে, চীনে পুঁজি পুঞ্জিভবন ঘটছে অনেক দ্রুত হারে এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার কারণে ব্যক্তি পুঁজিপতির পাশাপাশি রাষ্ট্রের হাতেও বিপুল বিনিয়োগযোগ্য পুঁজির সমাবেশ ঘটেছে। এর কারণে পুঁজির চাপ তৈরি হয়েছে অধিকতর মুনাফাযোগ্য বিনিয়োগের। এই বৈশ্বিক সম্প্রসারণের তাগিদ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বিশ্বের বিদ্যমান ভারসাম্যের সাথে চীনকে বোঝাপড়ায় যেতে হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন চীনকে হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে, ভারত নিজের ও মার্কিন তাগিদে চীনের তৎপরতা বিষয়ে সতর্ক। সিল্করোডের বাস্তবায়ন তাই সামনে মসৃণ হবে না। ইতিমধ্যে চীন সাগরে কর্তৃত্ব নিয়ে জাপানসহ কয়েকটি দেশের প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের মুখে পড়েছে চীন। এরমধ্যে চীনের সামরিক বাজেটও বাড়ানো হয়েছে। এনিয়ে উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে।


[i]Erebus Wong, Lau Kin Chi, Sit Tsui and Wen Tiejun: One Belt, One Road: China’s Strategy for a New Global Financial Order. Monthly Review, vol 68, issue 08, January 2017.  https://monthlyreview.org/2017/01/01/one-belt-one-road/

[ii]http://www.cnbc.com/2017/01/26/ancient-silk-road-revival-plans-could-be-the-new-risk-to-chinese-banks.html

ভারত-বাংলাদেশ প্রাচীর : ট্রাম্পের জন্য উদাহরণ

সুধা রামচন্দ্রন ::

অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ ::

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তার ভাষায় ‘দুর্বৃত্ত, মাদক ব্যবসায়ী এবং ধর্ষণকারীদের’ দূরে রাখতে মেক্সিকোর সাথে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ ৩,২০০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ‘মহা, মহা প্রাচীর’ নির্মাণের যে পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন, সেটা মোটেই নতুন কোনো আইডিয়া নয়। আরো অনেক দেশ- এগুলোর কেউ কেউ ইসলামফোবিয়া বা  ইসলামভীতিতে তাড়িত হয়ে- অবৈধ অভিবাসী, সন্ত্রাসী ও অপরাধীদের দূরে রাখতে তাদের প্রতিবেশীদের সীমান্তে বেড়া দিয়েছে।

এসব দেশের কাছ থেকে শিক্ষা নিলে ট্রাম্প ভালো করবেন। এসব বেড়া বা প্রাচীর কেবল বিশেষভাবে অকার্যকরই হয়নি, এগুলোর নির্মাণ, ব্যবস্থাপনা করা অর্থ ও মানব-জীবনের দিক থেকে বিপুল ব্যয়বহুল।

ভারতের উদাহরণটি বিবেচনা করুন। দেশটি তার প্রতিবেশী পাকিস্তান ও বাংলাদেশ সীমান্তে প্রাচীর দিয়েছে। বাংলাদেশের সাথে সীমান্তে ভারতের প্রাচীর দেওয়ার প্রধান লক্ষ্য হলো- বাংলাদেশী অভিবাসীদের ভারতে প্রবেশ থেকে বিরত রাখা। প্রাচীর নির্মাণের সিদ্ধান্তটি সামনে আসে ১৯৮০-এর দশকে। তখন আসাম রাজ্যে বাংলাদেশীদের অভিবাসন রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত বিস্ফোরক ইস্যুতে পরিণত হয়েছিল।

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে দীর্ঘ ৪,০৯৭ কিলোমিটার ‘ছিদ্রযুক্ত, ঝাঝরা’(পোরাস বর্ডার) সীমান্ত রয়েছে। এই সীমান্ত সমভূমি, নদী, পাহাড়, ধান ক্ষেত দিয়ে এঁকে বেঁকে চলে গেছে। এই সীমান্ত অঞ্চলটি অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ। এখানে বাসকারী লোকজন নানাভাবে আন্তঃসীমান্তের বা এপার-ওপার মিলিয়েই সম্পর্কিত; এই সম্পর্ক কারো কারো কাছে কয়েক শ’বছরের, কারো কারো কাছে নতুন।

আট ফুট উঁচু কাঁটাতারের প্রাচীরের কোনো কোনো স্থান বিদ্যুতায়িত। এ ধরনের প্রাচীর  আছে সীমান্তের প্রায় ৭০ ভাগ এলাকায়; ভয়াবহ কাঠামো। কিন্তু এটা স্বজনদের সাথে সাক্ষাত করা কিংবা জীবিকার নিরাপত্তার সন্ধানে দুর্গম সফর থেকে অভিবাসীদের বিরত রাখতে পারছে না। উভয় পক্ষের চোরাকারবারি, মাদক বাহক, আদম পাচারকারী, গরু কারবারিরা তাদের ব্যবসার জন্য নিয়মিত সীমান্ত অতিক্রম করে থাকে, অনেক সময় ভারতীয় ও বাংলাদেশী সীমান্তরক্ষীদের সম্মতিতেই।

হাওয়াই বিশ্বাবিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং ‘ভায়োলেন্ট বর্ডার্স : রিফ্যুজিস অ্যান্ড দি রাইট টু মুভ’গ্রন্থের লেখক রিস জোন্স বলেন, ‘সীমান্ত বেড়া বলতে গেলে কখনোই অভিবাসন ঠেকাতে পারে না।’ তিনি উল্লেখ করেন, বেশির ভাগ সীমান্ত খুবই দীর্ঘ এবং খুবই হালকাভাবে পাহারা দেওয়া। ফলে ফাঁকা স্থান দিয়ে লোকজনের চলাচলে তেমন কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না।

বাংলাদেশের এক আইনজীবী এবং অভিবাসন নির্গমনের গুরুত্বপূর্ণ সোর্স দ্য ডিপ্লোম্যাটকে বলেন, প্রাচীরটা ‘পানি-নিরোধক’নয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সীমান্ত যখন নদী দিয়ে চলে (সীমান্তের প্রায় ১,১১৬ কিলোমিটার হলো নদীপথে)- সেখানে কোনো প্রাচীর নেই। বাংলাদেশের সাথে আসাম সীমান্তের প্রায় ৪৪ কিলোমিটার ব্র‏হ্মপুত্র নদীতে। এই নদী আবার প্রতি বছর গতি বদলায়। এই নদীতে স্থায়ী প্রাচীর দেওয়া সম্ভব নয়। অবশ্য টহল নৌযান মোতায়েন করা হয়েছে। কিন্তু তা দিয়ে পারাপার তদারকি করা সম্ভব নয়। দুই দেশের লোকজন ফাঁক-ফোকর গলিয়ে ঠিকই পাড়ি দিয়ে দেয়। তাছাড়া প্রাচীরটার ‘অনেক ক্রসিং পয়েন্ট আছে, লোকজন ভুয়া কাগজপত্র কিংবা ঘুষ দিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করতে পারে,’ জানান জোন্স। ফলে সীমান্ত প্রাচীর ‘[মানুষজনের] চলাচলের প্যাটার্ন পাল্টে দিলেও তাদের চলাচল কিন্তু থামাতে পারে না।’

ভারত থেকে সন্ত্রাসীদের দূরে রাখার ব্যাপারে প্রাচীরের সক্ষমতা প্রশ্নে জোন্স বলেন, ভারত-বাংলাদেশ প্রাচীরের ‘সম্ভব কোনো প্রভাব নেই।’তিনি উল্লেখ করেন, সন্ত্রাসীর কাছে ‘ভুয়া কাগজপত্র সংগ্রহ করার মতো টাকা থাকে। সে সহজেই চেকপয়েন্ট দিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করতে পারে। সে বৈধ কাগজপত্র দিয়েও ভ্রমণ করতে পারে।’

অভিবাসী ও অপরাধীদের দূরে রাখতে প্রাচীর কেবল ‘ব্যাপকভাবে অকার্যকরই’নয়, অনেক সময় সেটা বাস্তবায়ন করার জন্য অনেক সহিংস ঘটনাও ঘটে। প্রাচীর দিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করতে চাওয়া লোকজনকে সীমান্তরক্ষীরা নৃশংসবাবে গুলি করে হত্যা করে।

ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের ২০১১ সালে ১৫ বছর বয়স্কা বাংলাদেশী মেয়ে ফেলানির হত্যাকান্ড বিশ্বজুড়ে ক্রোধের সৃষ্টি করে। ২০১০ সালের হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০১ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত বিএসএফ সদস্যরা সীমান্ত অতিক্রমের সময় প্রায় ৯০০ বাংলাদেশীকে হত্যা করেছে।

’এই সহিংসতার শিকার অনেকেই সীমান্ত বেড়া বা  প্রাচীরের  কাছাকাছি বসবাসকারীরা- তাদের জমিতে চাষ করার সময় নিহত হয়েছে,’ জানান ওই বাংলাদেশী আইনজীবী। এভাবে অনেকেই কয়েকদিন সীমান্তের ওপারে তাদের স্বজনের বাড়িতে বেড়ানোর পর বাড়ি ফিরে আসার সময় নিহত হয়েছেন। প্রাচীর দেয়ার মতো যে কাজটি করে সেটা হলো পরিবার ও সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে ঝামেলা পাকানো। আগে লোকজন সহজেই সীমান্ত পাড়ি দিয়ে তাদের স্বজনদের সাথে দেখা করতে যেতে পারতো। কিন্তু প্রাচীর থাকায় এখন ‘তাদেরকে চোরকারবারিদের টাকা দিতে হয়, বিএসএফের সামনে তাদের জীবনের ঝুঁকি নিতে হয়,’ জানান জোন্স।

তাহলে কেন বিশেষ করে সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদী চেতনায় বিশ্বাসী, এমনকি বিদেশীভীতির ‘আবেদনসৃস্টিকারী’ ও এতেকরে সাফল্য লাভকারী সরকারগুলোর কাছে প্রাচীর এত জনপ্রিয়? সীমান্ত প্রাচীর আসলে ‘জাতীয়তাবাদী’ প্রতীক, জানান জোন্স। এগুলো ‘অন্য জনসাধারণকে বাদ দেওয়া-সংক্রান্ত আইডিয়ার’ প্রতিনিধিত্ব করে। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের বেলায় মুসলিম বাংলাদেশীদের কিংবা ট্রাম্পের পরিকল্পিত দেয়ালের বেলায় মেক্সিকানদের দূরে রাখার প্রতীক।

এসব প্রাচীর সরকাকে “কঠোর করে দেখায়, এমনভাবে যেন, তারা তথাকথিত ‘অবৈধ’ ও ‘বহিরাগতদের’ থেকে জনগণকে রক্ষা করতে দৃঢ়প্রত্যয়ী,” জানান ওই আইনজীবী। জোন্সের মতে, প্রাচীর কার্যত যা করে তা হলো, ‘ভারত বা যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসীদের জীবনকে আরো নিরাপত্তাহীন করে দেওয়া।’বস্তুত অভিবাসীদের দূরে না রেখে প্রাচীর ‘প্রায়ই লোকজনকে আরো বেশি সময় রেখে দেয়, সত্যিকার অর্থে সাময়িক শ্রম অভিবাসীদের স্থায়ী অবৈধ বাসিন্দায় পরিণত করে।’

বাংলাদেশের সাথে ভারতের সুসম্পর্ক থাকলেও ভারতের প্রাচীর-নির্মাণ এতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এটা বাংলাদেশী জনসাধারণের চোখে ভারতের ইমেজকে ‘বড়ভাইসুলভ’ হিসেবে বিদ্রুপে পরিণত করেছে। প্রাচীর-নির্মাণকে বন্ধুসুলভ কাজ মনে করা হয় না। বরং প্রাচীরকে ‘অবিশ্বাসের প্রতীক’ বিবেচনা করা হয়, যা পারস্পরিক উপলব্ধিকে চাপা দিয়ে দেয়। বাংলাদেশ এবং দক্ষিণ এশিয়ার বাকি অংশে কাজটি ব্যাপকভাবে সমালোচিত। ২০০৮ সালে দক্ষিণ এশিয়ান ম্যাগাজিন হিমালের এক সম্পাদকীয়তে বলা হয়, প্রাচীর ‘দক্ষিণ এশিয়ার মানচিত্রজুড়ে জনসাধারণের ঐতিহাসিক চলাচলের মুখে উড়ছে, আমাদের অতীত ও বর্তমান উভয়ের কাছে সম্প্রীতিপূর্ণ নয়, এমন কঠোর সীমান্তে পরিণত করেছে।’

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই অঞ্চলের জনসাধারণের মধ্যে মতবিনিময়, বাণিজ্য ও সহযোগিতা বাড়ানোর লক্ষ্যে এসব দেশের মধ্যে বিরতিহীন ভ্রমণের সুযোগ সৃষ্টির পরিকল্পনা নিয়ে বাংলাদেশ, ভুটান, নেপাল ও মিয়ানমারের কাছে ছুটে গেছে। এটা ফলপ্রসূ করার জন্য আন্তঃজাতীয় সড়ক এবং রেল যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রাচীর বৃহত্তর আঞ্চলিক সহযোগিতার এই প্রয়াসের চেতনা ও বিশ্বাসের পরিপন্থী।

দীর্ঘ মেয়াদে প্রাচীর এই অঞ্চলে সাধারণভাবে এবং বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে সমস্যা কেবল বাড়িয়েই তুলতে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ নিচু দেশ। সমুদ্রের স্তর এক মিটার বাড়লে বাংলাদেশের এক পঞ্চমাংশ এলাকা সম্ভবত তলিয়ে যাবে। বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। ভারত তিন দিক দিয়ে দেশটিকে ঘিরে রেখেছে, বেড়া এর জনগণকে কেবল ভেতরে ধাক্কা দিচ্ছে। বাংলাদেশের সবচেয়ে অরক্ষিত উপকূলীয় জেলা হলো খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট। এগুলো ভারতের সীমান্তে অবস্থিত। তাদের বাড়িঘর ও শস্য পানিতে তলিয়ে গেলে তারা কোথায় যাবে?

ভারত সমস্যাটির ব্যাপারে চোখ বন্ধ করে থাকতে পারে না। এটা কেবল অমানবিক হবে বলেই নয়, সমুদ্র স্তর বাড়লে বাংলাদেশের যে সমস্যা হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, ভারতের জন্যও তা একই ধরনের বিপর্যয়কর হবে। বস্তুত, কোনো কোনো সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের সাথে ভারতও জলবায়ু পরিবর্তনে ‘চরম ঝুঁকিপূর্ণ’দেশগুলোর অন্তর্ভুক্ত।

জলবায়ু ইস্যুতে বাংলাদেশের থেকে দূরে না থেকে ভারতের উচিত দেশটির সাথে সহযোগিতা করা। এ জন্য ভারতকে অবশ্যই প্রথমে যে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করতে হবে, তা হলো- প্রাচীর তুলে ফেলা। অবশ্য প্রাচীর দেওয়ার চেয়ে তুলে ফেলা অনেক বেশি কঠিন। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক ইচ্ছা এবং মানসিকতার পরিবর্তন। সবচেয়ে বড় কথা হলো, এটা স্বীকার করা দরকার, ভারত-বাংলাদেশ প্রাচীর এসব দেশের জনগণের জন্য সামান্যই নিরাপত্তা বয়ে এনেছে; বরং এটা নিরাপত্তাহীনতার একটি উৎসে পরিণত হয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো ট্রাম্প কি দেয়ালের লিখন বুঝবেন?

লেখক : ব্যাঙ্গালোরভিত্তিক ফ্রি-ল্যান্স সাংবাদিক ও গবেষক। তিনি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি ও নিরাপত্তা ইস্যুতে লিখে থাকেন। (দ্য ডিপ্লোম্যাট থেকে বাংলা অনুবাদ)

মিয়ানমারে আবারো সামরিক অভ্যুত্থানের আশংকা?

ল্যারি জ্যাগান

অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ

অনেক বিশ্লেষক এবং বিদেশী ব্যবসায়ী আশংকা করছেন, মিয়ানমারের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেশটিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দেবে। ইয়াঙ্গুন বিমানবন্দরের বাইরে প্রখ্যাত মুসলিম আইনজীবী কো নিকে হত্যার ঘটনাটি আরো সহিংসতার আশংকায় থাকা আন্তর্জাতিক আদিবাসীদের প্রতি একটি বড় ধরনের বার্তা পাঠালো।

এটা ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্র্যাসির (এনএলডি) জন্য এটা একটা বড় ধরনের ধাক্কা এবং দলের মধ্যে বিভক্তি বাড়িয়ে দিয়েছে। এবং নিশ্চিতভাবেই সরকারি প্রশাসন এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য মারাত্মক প্রভাব ফেলবে। এছাড়া এই ঘটনা আবারো সামরিক অভ্যুত্থানের সম্ভাবনা সামনে নিয়ে এলো।

এই ঘটনাটি দেশের শীর্ষ নেতাদের মধ্যকার সম্পর্কে বিশেষ করে স্টেট কাউন্সিলর আঙ সান সু কি এবং সেনা প্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন আঙ হলাইঙ-এর মধ্যকার টানাপোড়েনও বাড়িয়ে দিয়েছে। এটা নিরাপত্তা বিষয়ক ইস্যু হওয়ায়, তা সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং বেসামরিক সরকারকে কয়েক ধরনের সংকটে ফেলে দিয়েছে।

এনএলডির আইন উপদেষ্টা এবং সেই সাথে সু কির ব্যক্তিগত উপদেষ্টা কো নিকে প্রায় দুই সপ্তাহ আগে নৃশংসভাবে হত্যা করার ঘটনাটি দেশজুড়ে মর্মপীড়াদায়ক একটি বার্তা বইয়ে দিয়েছে। রেঙ্গুন বিমানবন্দরের মতো একেবারে প্রকাশ্য স্থানে উচ্চপদস্থ লোককে হত্যা করার ঘটনা; অর্থাৎ সর্বোচ্চ দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য এই ব্যবস্থা।

আসল হত্যাকারীকে আটক করা হলেও ইতোমধ্যেই স্পষ্ট হয়ে গেছে, সে আসলে ভাড়াটে লোক, টাকার বিনিময়ে তিনি কাজটি করেছেন। তাকে পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে হত্যার উদ্দেশ্য এবং কে তাকে হত্যা করতে পাঠিয়েছিল, সে সম্পর্কে অতি সামান্য তথ্যই জানা গেছে। কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ফাঁস হওয়া ও ভুল তথ্যে তদন্ত কাজের ব্যর্থতাই প্রকাশ করেছে।

এখনো কিছুই পরিষ্কার নয়, এমনকি বিমানবন্দরে হত্যাকারীর সাথে আরো লোকজনের থাকার অভিযোগের সুরাহা হয়নি। এখন পর্যন্ত পুলিশ মাত্র দুজনকে গ্রেফতার করতে পেরেছে- একজন খোদ হত্যাকারী; অপরজন সম্পর্কে কোনো তথ্য জানা যায়নি। তবে কোনো না কোনোভাবে তিনিও হত্যাকান্ডে জড়িত ছিলেন।

সন্দেহের আঙুল সামরিক বাহিনীর দিকেই ওঠে। কারণ নিহত আইনজীবীকে দেখা হতো অবিলম্বে সংবিধান সংস্কার এবং একেবারে নতুন সংবিধান রচনার দাবি জানানো এনএলডি কট্টরপন্থী হিসেবে। উল্লেখ্য, বর্তমান সংবিধানটি কার্যত লিখেছিলেন সাবেক সামরিক স্বৈরাচার সিনিয়র জেনারেল থান শু – সেটা ২০০৮ সালে ভুয়া গণভোটে বিপুলভাবে পাস হয়েছিল। সংবিধান পরিবর্তনের দাবিটি বিশেষ ঘটনা। কারণ আগের সংবিধানকে পুরোপুরি বাদ দিয়ে নতুন একটি গ্রহণ করাটা সামরিক বাহিনীর জন্য সুখকর বিষয় নয়, বিশেষ করে তারা বর্তমান সংবিধানকে যখন পূতপবিত্র বিবেচনা করে।

তবে শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা কো নিকে অবিশ্বাস করলেও এবং তারা এমনকি তাকে ঘৃণা করলেও, এই হত্যাকান্ড থেকে তারা কোনোভাবেই লাভবান হবে না। বরং বিপরীতটাই হবে। এটা তাদের সুনামের জন্য আরো হানিকর হবে, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দাবৃত্তি সম্পর্কে ক্ষুব্ধ আঙুল তোলা হবে। কারণ বিষয় দুটি মন্ত্রিসভার সামরিক বাহিনী থেকে আসা মন্ত্রীদের হাতে, বিশেষ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যেখানে জেনারেল কেউ সু।

এই হত্যাকান্ড জাতীয় নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা এবং সেইসাথে ভঙ্গুর পরিস্থিতিও বিপর্যয়কর অবস্থায় নিয়ে যেতে পারে মনে করে শীর্ষ সামরিক ক্রমপরম্পরাও উদ্বিগ্ন। আরাকানের ঘটনায় অন্তত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে হলেও সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি অনেকটাই ম্লান করে দিয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে তাদেরও হারানোর অনেক কিছু আছে, সেনাপ্রধান নির্বিকারভাবে পাশ্চাত্যে, বিশেষ করে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছাকাছি হতে চাচ্ছেন।

গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সরকারি দফতর, সরকারি সভা এবং প্রধান বিমানবন্দরগুলোর নিরাপত্তা ব্যাপকভাবে জোরদার করা হয়েছে। বিদেশী কূটনীতিকরাও নিরাপত্তার ব্যাপারে আরো বেশি মনোযোগী হচ্ছেন। অনেকে, বিশেষ করে জাপানি, এমনকি দেশটিতে সর্বোচ্চ পর্যায়ে সফর বাতিল করে দিচ্ছেন, কূটনৈতিক দলের সদস্যদের পুরোপুরি ফিরিয়ে নিতে চাচ্ছেন।

তবে দুই সপ্তাহ পর এখন মনে হতে যাচ্ছে, এটা ছিল একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা। প্রেসিডেন্টের অফিসের এক সিনিয়র কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, ‘এটা ছিল স্পষ্টভাবেই সরকারের প্রতি হুঁশিয়ারি সংকেত।’ একটি লাল-রেখা টেনে দেওয়া হলো, অর্থাৎ সংবিধান পরিবর্তনের দিকে হেঁটো না। প্রেসিডেন্টের অফিস থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এই ঘটনাকে সরকার এবং দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা বলে অভিহিত করা হয়। রাজনীতিবিদ এবং রাজনৈতিক দলগুলো ব্যক্তিগতভাবে এই ভেবে উদ্বিগ্ন যে, আসন্ন উপনির্বাচনগুলোতে সহিংসতা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়বে।

তবে কো নি-র হত্যাকান্ড এনএলডি সরকার এবং সামরিক বাহিনী- উভয়ের মধ্যেই ভবিষ্যতের দিকে নজর দিতে তাগিদ সৃষ্টি করবে। এনএলডির জন্য ইস্যু হলো সংবিধান সংস্কার। তাদের মৃত আইন উপদেষ্টা সংবিধান পরিবর্তনের জন্য কাজ শুরু করতে দলের মধ্যে জোর চেষ্টা চালিয়েছিলেন। তিনি এমনকি ফেডারেল সংবিধান প্রশ্নে চলমান শান্তিপ্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের সমঝোতার আগেই সেটা করার জন্য চাপ দিয়ে আসছিলেন। তবে অন্য আরো অনেকে রয়েছেন। বিশেষ করে দলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, দলের সবচেয়ে সিনিয়র পৃষ্ঠপোষক টিন ওও। তিনি কিন্তু সেনাবাহিনী টসে এমন কোনো কাজ করার ব্যাপারে তাড়াহুড়া না করতে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন।

এনএলডির মধ্যে এই বিভক্তি বেড়েছে কো নির হত্যাকান্ডে। এখন কট্টরপন্থীরা জোর দিয়ে বলছে, পার্টি যদি গণতন্ত্রে যাত্রা জোরদারকরণ এবং যেকোনো ধরনের পিছু হটা প্রতিরোধ করতে চায়, তবে যত দ্রুত সম্ভব সংবিধান পরিবর্তন ছাড়া আর কোনো বিকল্প তাদের কাছে নেই।

সামরিক বাহিনীও নিজেদের অবস্থান থেকে ভবিষ্যত নিয়ে আচ্ছন্ন রয়েছে। বিদ্যমান সংবিধানে তাদের যে ক্ষমতার নিশ্চতা দেওয়া হয়েছে, সেটা কমানোর যেকোনো পদক্ষেপ তারা হালকাভাবে নেবে না। সত্যি সত্যিই সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্তারা দৃঢ় অভিমত পোষণ করেন, দেশের পতন রুখতে তাদেরকে এর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করতেই হবে। তারা নিশ্চিত, আঙ সান সু কির সরকার ব্যর্থ হচ্ছে, তারা কখন দেশকে রক্ষা করার দায়িত্ব গ্রহণ করবেন, সেটা কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র।

‘প্রশাসনিক ক্ষমতা’ গ্রহণের পরিকল্পনাও তৈরি করে রাখা হয়েছে। কমান্ডার-ইন-চিফ যদি মনে করেন, দেশের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা বিপদের মুখে রয়েছে, তবে সংবিধানের আওতায় ‘প্রশাসনিক ক্ষমতা’ গ্রহণের ব্যবস্থা রাখা রয়েছে। তবে সেটা হওয়ার জন্য বড় ধরনের সামাজিক অস্থিরতা কিংবা গৃহযুদ্ধ তীব্র হতে হবে। সামরিক বাহিনীর হাতে অনেক বিকল্প রয়েছে, তারা সেগুলো বিবেচনা করছে।

এসবের মধ্যে রয়েছে পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়া এবং কোনো সিনিয়র সৈনিককে প্রধান করে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা। ওই সিনিয়র সৈনিক হতে পারেন কমান্ডার-ইন-চিফ নিজে। যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচন আয়োজনের ব্যবস্থাও করা যেতে পারে। তবে সবচেয়ে অনুকূল বিকল্প হচ্ছে আঙ সান সু কিকে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগে পর্যন্ত সেনাপ্রধানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে, সাময়িক সময়ের জন্যও হতে পারে, রাজি করানো। ১৯৫৮ সালে এমনটা হয়েছিল। তখনকার প্রধানমন্ত্রী উ নু সামরিক প্রধান জেনারেল নে উইনকে অনুরোধ করেছিলেন দেশ পরিচালনা করতে।

তবে এই মুহূর্তে বল এনএলডির কোর্টে। আগামী ছয় মাসে যা কিছু ঘটতে যাচ্ছে, সেটাই দেশটির তথা দেশটিতে গণতন্ত্র জোরদার হবে না কি সামরিক শাসন ফিরে আসবে- তা নির্ধারণ করবে। কো নির হত্যাকান্ডটি অন্তত অনিশ্চয়তার নতুন যুগের সূচনা করেছে।

 লেখক : ইয়াঙ্গুনভিত্তিক সাংবাদিক এবং মিয়ানমার বিশেষজ্ঞ। ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি এশিয়া অঞ্চলের ওপর লেখালেখি করছেন। প্রায় এক যুগ তিনি ছিলেন বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের এশিয়াবিষয়ক সম্পাদক।