Home » মতামত

মতামত

প্রাণ প্রকৃতি বাংলাদেশ-২ : ধনিক শ্রেণী গঠন : বাংলাদেশে সর্বোচ্চ

আনু মুহাম্মদ ::

সর্বশেষ আন্তর্জাতিক রিপোর্টে (ওয়ার্ল্ড আল্ট্রা ওয়েলথ রিপোর্ট ২০১৮) ধনী ব্যক্তির সংখ্যা বৃদ্ধির হারে বাংলাদেশ বিশ্বে শীর্ষস্থান লাভ করেছে অর্থাৎ বিশ্বে ধনিক শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তির সংখ্যা বৃদ্ধির হার বাংলাদেশে সর্বোচ্চ। ধনী ব্যক্তি বলতে ৩ কোটি মার্কিন ডলার বা প্রায় ২৫০ কোটি টাকার মালিকদের বোঝানো হয়েছে।[1]

বাংলাদেশে পুঁজিবাদ বিকাশ প্রক্রিয়ায় ধনিক শ্রেণী গঠনের ধরন বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। এই গঠনের প্রথম পর্বে ছিলো লাইসেন্স, পারমিট, চোরাচালানী, মজুতদারি, রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প কারখানা সম্পদ আত্মসাৎ ইত্যাদি। দ্বিতীয় পর্বে এর সাথে যোগ হয় ব্যাংক ঋণ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের মালিকানা লাভ। ব্যাংক ঋণের সুবিধা বাড়ে, ঋণখেলাপীও বৃদ্ধি পায়। ব্যবসা ও সরকারি ক্ষমতার মধ্যে যোগাযোগ ও চুক্তির নতুন বিন্যাস ঘটে। নব্য ধনিক শ্রেণীর উপস্থিতি যতো স্পষ্ট হতে থাকে ততো রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যক্তি মালিকানায় যাবার হার বাড়তে থাকে, আবার এই হস্তান্তরে ধনিক গোষ্ঠীর সম্পদ আরও বৃদ্ধি পায়। ৮০ দশকের শুরুতেই ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যাংক এর যাত্রা শুরু হয়। এবং অনেক ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের ঋণ খেলাপীদেরই নতুন ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যাংকের মালিক হিসেবে দেখা যেতে থাকে। দেখা যায়, একজন যতো পরিমাণ ঋণ খেলাফী তার একাংশ দিয়েই তারা নতুন ব্যাংক খুলে বসে। রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলো থেকে নামে বেনামে ঋণ গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক যোগাযোগ, লেনদেন ব্যবস্থা সম্পদ কেন্দ্রীভবনের একটি কার্যকর পথ হিসেবে দাঁড়াতে থাকে।

বাংলাদেশের ধনিক শ্রেণী গঠনের ধরন বোঝাতে আমি ৮০ দশকের শুরুতে ‘লুম্পেন কোটিপতি’ পদ ব্যবহার করি। লুম্পেন কোটিপতি বলতে আমি বুঝিয়েছি এমন একটি শ্রেণী যারা নিজেদের বিত্ত অর্জনের জন্য উৎপাদনশীল পথের চাইতে দ্রুত মুনাফা অর্জনে অন্যান্য সহজ ও চোরাই পথ গ্রহণে বেশি আগ্রহী থাকে, এগুলোর মধ্যে চোরাচালানি, মাদক ব্যবসা, ব্যাংক ঋণ লোপাট, জবরদখল, জালিয়াতি ইত্যাদি অন্যতম। এরজন্য সব অপরাধের পথ তারা গ্রহণ করে নির্দ্বিধায়।[2]

বাংলাদেশে ৮০ দশক ছিলো নব্য ধনিক শ্রেণীর ভিত্তি সংহত করবার জন্য খুবই সুবর্ণ-সময়। একদিকে তখন বড় দুর্নীতিবাজ হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ব্যক্তির নেতৃত্বে স্বৈরাচারী শাসন অন্যদিকে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ-এডিবির ‘কাঠামোগত সমন্বয় কর্মসূচি’র অধীনে সংস্কার কর্মসূচিতে ব্যক্তি গোষ্ঠীর হাতে রাষ্ট্রীয় সম্পদ হস্তান্তরের নীতিমালার চাপ নব্য ধনিকদের জন্য খুবই অনুকুল পরিবেশ সৃষ্টি করেছিলো। বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ-এডিবির নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক ব্যাংক ও থিংকট্যাংক বাংলাদেশের উন্নয়ন ধারার মূল পথপ্রদর্শক ছিলো বরাবরই। বর্তমান বাংলাদেশেও তাদের মতাদর্শই উন্নয়ন পথ ও পদ্ধতি নির্ধারণ করছে।[3]

যাইহোক, ৮০ দশক থেকেই  ক্ষমতাবানদের সাথে যোগাযোগে দক্ষ ব্যক্তিরা রাতারাতি তখন অনেক সম্পদের মালিক হয়ে যায়, এরজন্য তাদের উদারভাবে ব্যাংক ঋণও দেওয়া হয়। [4] এটা সম্ভব হয় ক্ষমতার সাথে একটা অংশীদারীত্বের চুক্তি সফলভাবে সম্পন্ন করবার কারণে। রাষ্ট্র-ব্যবসা-ধর্ম-লুন্ঠনের এরকম প্যাকেজ বাংলাদেশে এর আগে কখনও দেখা যায়নি। দুর্নীতি-লুন্ঠন-ক্ষমতার কেন্দ্রীভবনের যে ভিত্তি তখন নির্মিত হয় তা দিনে দিনে আরও শক্ত হয়েছে। কেননা সেইসময় বিন্যস্ত শাসন-দুর্নীতির পথেই পরবর্তী সরকারগুলোও অগ্রসর হয়েছে। তাই একদিকে দুর্নীতির শত হাতপা বিস্তার এবং অন্যদিকে সম্পদ ও ক্ষমতায় কেন্দ্রীভবন দুটোই ক্রমান্বয়ে বেড়েছে। সেই হিসেবে ৮০ দশকের দুর্নীতিবাজ স্বৈরাচারী শাসককে পরবর্তী শাসকদের গুরু হিসেবে উল্লেখ করা চলে। পরবর্তী সময়ের শাসকেরা বহুভাবে তাঁকে অনুসরণ করে লুন্ঠন দুর্নীতি ও ক্ষমতা কেন্দ্রীভবনের ক্ষেত্রে পরিমাণগত দিক থেকে ধাপে ধাপে বহুগুণ বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছেন।

গত এক দশকে আমরা প্রবেশ করেছি পুঁজি সংবর্ধনের তৃতীয় পর্বে, যখন ব্যাংক ঋণের মধ্যে সম্পদ লুন্ঠন সীমিত নেই। আকাঙ্খা এবং সুযোগ দুটোই এখন অনেক বেশি। তাই পুরো ব্যাংক, ভবন, সেতু, সড়ক খেয়ে ফেলাই এখনকার সফল প্রজেক্ট। কেন্দ্রীয় ব্যাংকও তার বাইরে নয়। শেয়ার বাজারও একটি লোভনীয় ক্ষেত্র। এটা প্রমাণিত যে, প্রশাসন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃঢ় সমর্থন বা অংশীদারীত্ব ছাড়া কোনো বড় দুর্নীতি ঘটতে বা তা বিচারের উর্ধ্বে থাকতে পারে না। ১৯৯৬ সালের পর ২০১০ সালে শেয়ারবাজারের ধ্বস হয়েছে। এর পেছনে কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর ভূমিকা চিহ্নিত হয়েছিলো খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদের তদন্ত রিপোর্টে। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে অর্থ পাচারের বিষয়ে তদন্ত কমিটির নেতৃত্বে ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্ণর ফরাসউদ্দীন। কিন্তু দুটো তদন্ত কমিটির ক্ষেত্রেই ফলাফল হয়েছে অভিন্ন। পুরো রিপোর্ট প্রকাশিতও হয়নি। মূল দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। বরং তারা ক্ষমতার ছড়ি নিয়ে আরও নতুন নতুন অপরাধের কাহিনী তৈরি করছেন।

শুধু ব্যাংক বা শেয়ার বাজার নয়, সর্বজনের (পাবলিক) সব সম্পদই এখন অসীম ক্ষুধায় কাতর এই শ্রেণীর লক্ষ্যবস্তু। বৃহৎ চুক্তিতে বৃহৎ কমিশন, জমি-নদী-খাল-বন দখল, সর্বজনের সম্পদ আত্মসাৎ, মেগা প্রকল্পে মেগা অনিয়মের রাস্তা তৈরিসহ পুরো দেশই এখন ভোগ্যবস্তু। আগেই বলেছি, পুঁজি সঞ্চয়নের বিভিন্ন পর্বে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সমর্থন বা অংশগ্রহণ বরাবরই ছিলো নির্ধারক। মন্ত্রী, আমলাদের সহযোগিতা  বা অংশীদারীত্বের ব্যবস্থারও তাই বিকাশ ঘটেছে নানাভাবে। লুম্পেন রাজনীতিবিদ ও লুম্পেন আমলার বিকাশ ঘটেছে যারা বৃহৎ কমিশন, বড় আকারের ঘুষের মাধ্যমে অর্থবিত্ত অর্জন করে নতুন শ্রেণীতে উত্তরণ লাভ করছেন। আমলাতন্ত্র বস্তুত দেশি-বিদেশি কর্পোরেট গোষ্ঠীর সম্প্রসারিত হস্ত। এর সাথে যুক্ত আরেক গোষ্ঠীর কথা বলা দরকার, এরা লুম্পেন বিশেষজ্ঞ/কনসালট্যান্ট যারা এসব কাজে বৈধতা দিতে নিজের বিশেষজ্ঞ পরিচয় বিক্রি করে, ধ্বংসের প্রকল্পকে উপকারী প্রকল্প বলে ঘোষণা দেয়, এর বদলে নিজেরাও দ্রুত অর্থবিত্তের মালিক হয়। উচ্ছিষ্টভোজী সমর্থক হিসেবে এমবেডেড বুদ্ধিজীবীর আয়তন বিস্তৃত হয়েছে গত এক দশকে। লুম্পেন শ্রেণীর সকল অংশের একটি বৈশিষ্ট অভিন্ন: এই দেশে সম্পদ আত্মসাৎ আর অন্য দেশে ভবিষ্যৎ তৈরি। সুতরাং শিক্ষা, চিকিৎসা, নিরাপত্তা, নদী, বায়ু, পরিবেশ বিপর্যস্ত করে এই দেশকে চরম নাজুক অবস্থায় ফেলতে তাদের কোনো দ্বিধা নেই।

বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে এই শ্রেণী যেভাবে সংহত হয়েছে তার সাথে রাজনীতির নির্দিষ্ট ধরনের বিকাশও সম্পর্কিত। নানা চোরাই পথে কোটি-কোটিপতি হবার চেষ্টা যারা করে তাদের জন্য গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, স্বাধীন গণমাধ্যম, স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা, রাষ্ট্রীয় প্রকল্প ও অর্থবরাদ্দে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, স্বাধীন নির্বাচন ব্যবস্থা, স্বাধীন বিদ্যাচর্চা-সংস্কৃতিচর্চা বিপদজনক। তাই এই গোষ্ঠীর জন্য প্রয়োজন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে রাষ্ট্র পর্যন্ত ক্ষমতা কতিপয় ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত রাখা, যাদের সাথে সহজেই সমঝোতা, অংশীদারীত্ব, চুক্তি করা সম্ভব। তাদের অংশীদার বানিয়ে তরতর করে বিত্তের সিঁড়ি অতিক্রম করা সহজ। সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া যতো অস্বচ্ছ ও অগণতান্ত্রিক হবে ততো তাদের সুবিধা। তাদের জন্য তাই একই সাথে দরকার একটি নিপীড়ন মূলক শাসন ব্যবস্থা, স্বৈরতন্ত্রী আবহাওয়া যেখানে ভিন্নমত ও স্বাধীন চর্চার ওপর চড়াও হবার জন্য নানা ব্যবস্থা সক্রিয় থাকবে। যার বিরুদ্ধে গণমাধ্যমে বা বিচার ব্যবস্থার আশ্রয় গ্রহণ করা সম্ভব হবে না।

যেসব খাত এগিয়ে :

সরকার যেসব বৃহৎ প্রকল্প হাতে নিয়েছে, নিচ্ছে তার আকার ও বরাদ্দ আগের যে কোনো সময়ের চাইতে বেশি। এসব প্রকল্পে ব্যয় বরাদ্দের কোন উর্ধ্বসীমা নেই, এর যৌক্তিক বিন্যাসেরও কোনো ব্যবস্থা নেই, যৌক্তিকতা বিচারের কোনো স্বাধীন প্রতিষ্ঠানও আর কার্যকর নেই। তার ফলে এগুলোর ব্যয় অন্য যে কোনো দেশের তুলনায় ২/৩ গুণ এমনকি ১০ গুণ বেশি হলেও তার জবাবদিহিতার কোনো প্রক্রিয়া নেই। বরং সরকারি অনুমোদন নিয়েই এগুলোর ব্যয় শনৈ শনৈ বেড়ে যাচ্ছে। দেশি বিদেশি বিভিন্ন সমীক্ষা থেকে নিশ্চিতভাবেই দেখা যাচ্ছে যে, সড়ক মহাসড়ক ফ্লাইওভার রেলপথ সেতু সবক্ষেত্রেই বাংলাদেশের ব্যয় বিশ্বে সর্বোচ্চ, ইউরোপ, আমেরিকা, এশিয়ার কোনোদেশেই এতো ব্যয় হয় না।[5] এর পেছনে উর্ধ্বমুখি কমিশন এবং ঋণদাতা সংস্থা বা সরকার প্রভাবিত ঠিকাদার নিয়োগ অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা যায়। গত ৬ বছরে এই অযৌক্তিক ব্যয়বৃদ্ধিতে প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা বাড়তি খরচ হয়েছে।

বাংলাদেশে এখন নির্মাণখাত সবচাইতে বর্ধনশীল। ইটভাটা অসংখ্য, বৈধ যত তার চাইতে অবৈধ সংখ্যা বেশি। সিমেন্ট কারখানার সংখ্যাও বেড়েছে। শীতলক্ষাসহ বিভিন্ন নদীর বাতাসে পানিতে এর প্রবল ছোঁয়া পাওযা যায়। দূষণরোধের কোনো ব্যবস্থা কাজ করে না। রডের উৎপাদন বেড়েছে। নিয়ম মেনে বা না মেনে বালু তোলার পরিমাণ বেড়েছে আগের যে কোনো সময়ের চাইতে বেশি। ফার্নিচারের ব্যবসাও বেড়েছে। এরজন্য বনের গাছের ব্যবসা ভালো। দেশে নির্বিচারে বনজঙ্গল উজাড় করায় প্রশাসন বরাবর সক্রিয় সহযোগী।

জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত অনিয়ম ও অস্বচ্ছতা, দুর্নীতি ও পরিবেশ বিনাশ ক্ষেত্রে অগ্রণী। দায়মুক্তি আইন এক্ষেত্রে অন্যতম রক্ষাকবচ। সরকার দেশের বিদ্যমান আইন ও নিয়মনীতি অমান্য করে দেশি বিদেশি বিভিন্ন কোম্পানিকে উচ্চমূল্যে কাজ দিচ্ছে, আইনের  হাত থেকে বাঁচার জন্য ২০১০ সাল থেকে সরকার চলছে ‘দায়মুক্তি আইন’ ঢাল দিয়ে, নানা সুবিধা ছাড়াও ভয়াবহ দুর্ঘটনার ক্ষতির দায় থেকে বাঁচানোর জন্য দায়মুক্তি দেয়া হচ্ছে রাশিয়ান ও ভারতীয়সহ বিদেশি কোম্পানিকেও (রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প দ্রষ্টব্য)। ভারত, চীন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্রসহ দেশি-বিদেশি কোম্পানির উচ্চলাভ নিশ্চিত করতে গিয়ে দেশে কয়লা, পারমাণবিক ও এলএনজি নির্ভর ব্যবস্থার ব্যাপক বিস্তার ঘটানো হচ্ছে। বন, জমি, উপকূলবিনাশ, অধিক ঋণ ও বিদেশ নির্ভরতা এবং ব্যয়বহুল এই পথ নেয়ার যুক্তি হিসেবে বলা হচ্ছে বিদ্যুতের চাহিদার কথা। কিন্তু যখন পরিবেশবান্ধব, সুলভ এবং টেকসই বিকল্প পথ দেখানো হচ্ছে তখন সরকার সেদিকে যাচ্ছে না কারণ সেই পথ দেশ ও জনগণের জন্য অনেক নির্ভরযোগ্য হয়েও কর্পোরেট গোষ্টীর তাতে লাভ নেই, আমলা মন্ত্রীদের কমিশনের সুযোগ নেই।[6]

আরেকটি ক্ষেত্র সর্বজনের অর্থ দিয়ে বিশাল কেনাকাটা। যন্ত্রপাতি  কেনা হচ্ছে, কাজ নাই; বাস কেনা হচ্ছে, কিছুদিন পরই সেগুলো হাওয়া; ডেমু ট্রেন কেনা হচ্ছে, কিছুদিন পরই তার কেলেঙ্কারি প্রকাশিত হচ্ছে; সিসিটিভি কেনা হচ্ছে কিন্তু প্রয়োজনের সময় তা নষ্ট; ঋণ করে সাবমেরিন সহ সমরাস্ত্র কেনা হচ্ছে। ভারত থেকে ঋণ করে শত শত বাস কেনা হচ্ছে, কিছুদিন পরই যেগুলো বিকল হচ্ছে;  কেনা হচ্ছে গাড়ি, সরকারের বিভিন্ন সংস্থার  মধ্যে গাড়ির মডেল পরিবর্তন করা, আরও বড় আরও দামি গাড়ি কেনার পথে প্রবল উৎসাহ। সর্বজনের অর্থ যে কোনোভাবে বরাদ্দে কার্যত কোনো নিয়ন্ত্রণ বা নেই। কিন্তু এই অর্থ জোগাড়ে বাড়ছে মানুষের ওপরই চাপ। গ্যাস, বিদ্যুতের দাম বাড়ছে, ভ্যাট বসছে সর্বত্র, খাজনা বাড়ছে।

শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতও এখন কিছুলোকের খুব দ্রুত টাকার মালিক হবার জায়গা। এর অন্যতম সুফলভোগী কতিপয় শিক্ষকও। প্রশ্ন ফাঁস, কোচিং আর টিউশনি নির্ভরতার কারণে শিক্ষার্থীদের জীবন বিষময়। শিক্ষা ব্যবস্থাকে পরীক্ষা ব্যবস্থায় রূপান্তর করার কারণে গাইড বই, কোচিং এর বাণিজ্যের পথ খুলেছে। চলছে নিয়োগ বাণিজ্য। চিকিৎসা খাতের অবস্থাও তাই। শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতে তাই একদিকে জৌলুস বাড়ছে অন্যদিকে মানুষের ওপর বোঝাও বাড়ছে। অন্যদিকে জিডিপির অনুপাতে শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতে বাংলাদেশের বরাদ্দ বিশ্বে নীচের সারিতে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে, জিডিপি অনুপাতে, বিশ্বের অধিকাংশ দেশের এমনকি প্রতিবেশী ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ ও আফগানিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশের আনুপাতিক হারে ব্যয় কম।[7]  ফলে সর্বজন প্রতিষ্ঠানের বিকাশ সংকটগ্রস্ত, লক্ষ শিক্ষকের জীবনও বিপর্যস্ত। স্কুল কলেজ মাদ্রাসার বহু প্রতিষ্ঠানের অনাহারী শিক্ষকেরা বারবার ঢাকা আসেন কিন্তু তাঁদের ন্যায্য দাবি পূরণ হয়না। তাঁরা অনশনও করেছেন বহুবার। নন এমপিও এডুকেশনাল ইন্সটিটিউশন টিচারস এ্যান্ড এমপ্লয়ীজ  ফেডারেশনের সভাপতি গোলাম মোহাম্মদ  বলেছেন, ‘২০০৬ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত এই দাবি নিয়ে আমরা ২৮ বার ঢাকা শহরে এসেছি।[8]’  কোনো কাজ হয়নি।

উন্নয়নের ধরনে যদি দুর্নীতি অস্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা হীনতা, দখল, দূষণ থাকে অর্থাৎ যদি উন্নয়ন প্রকল্প অতি উচ্চ মাত্রায় সামাজিক ও পরিবেশগত ক্ষতি/বিপর্যয়ের কারণ হয় তাহলে তা কুশাসন অবধারিত করে তোলে। ব্যবসা- লবিষ্ট- রাজনীতিবিদ- প্রশাসনের দুষ্ট আঁতাত আরো অনেক অপরাধ-সহিংসতাকেও ডাকে। বলপূর্বক টেন্ডার দখল, জমি-ব্যবসা দখল করতে গিয়ে খুন, রাষ্ট্রীয় সংস্থায় সহযোগিতা গুম, আটক বাণিজ্য, দরকষাকষি এগুলোও অনিয়ন্ত্রিত অবস্থায় চলে যায়। প্রশাসন আর দল একাকার হয়ে গেলে দ্রুত অর্থ উপার্জনের বল্গাহীন প্রতিযোগিতা চলবেই। বাড়তেই থাকবে ধর্ষণ, নারী-শিশু- সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা, ক্রসফায়ার, হেফাজতে নির্যাতন, এবং সরকারি দলে বিভিন্ন গোষ্ঠী হানাহানি। এসব কিছু মিলিয়েই পুঁজিবাদী প্রবৃদ্ধির জৌলুস বাড়তে থাকে প্রাণ প্রকৃতির বিনাশ এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বঞ্চনা-অপমান বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে। (নাজমা জেসমিন চৌধুরী স্মারক বক্তৃতা ২০১৮)

[1]https://www.wealthmanagement.com/sites/wealthmanagement.com/files/wealth-x-wealth-report.pdf

[2]পুঁজিপতি শ্রেণীর উৎপাদন বিচ্ছিন্ন-লুটেরা- ধরন বোঝাতে ‘লুম্পেন বুর্জোয়া’ প্রথম ব্যবহার করেন একজন অষ্ট্রিয়ান  লেখক, ১৯২৬ সালে। প্রথম ইংরেজী ভাষায় এর ব্যবহার করেন মার্কিন অর্থনীতিবিদ পল ব্যারেন ১৯৫৭ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত পলিটিক্যাল ইকনমি অব গ্রোথ গ্রন্থে। পরে এ শব্দবন্ধ বিশেষ পরিচিতি পায়  জার্মান-মার্কিন সমাজবিজ্ঞানী  আন্দ্রে গুন্ডার ফ্রাংক এর (১৯৭২) লুম্পেন বুর্জোয়া লুম্পেন ডেভেলপমেন্ট গ্রন্থের মাধ্যমে। তিনি এই গ্রন্থে সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থার অধীনস্থ প্রান্তস্থ দেশগুলোতে পুঁজিবাদের বিকাশ আলোচনায় বিশেষভাবে লক্ষ্য করেন এমন একটি শ্রেণীর বিকাশ যারা সা¤্রাজ্যবাদের সাথে ঝুলে থাকে, নিজস্ব অর্থনীতির উৎপাদনশীল বিকাশের বদলে তারা যে কোনো ভাবে অর্থবিত্ত অর্জনের পথ গ্রহণ করে, নিজেদের স্বার্থে বহুজাতিক পুঁজির আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে সচেষ্ট থাকে।

 

[3] আমার বেশ কয়টি বইতে এবিষয়ে বিস্তারিত তথ্য ও বিশ্লেষণ আছে। কয়টির নাম এখানে উল্লেখ করছি- কোথায় যাচ্ছে বাংলাদেশ, বাংলাদেশের অর্থনীতির গতিমুখ, বিশ্বায়নের বৈপরীত্য, উন্নয়ন বৈপরীত্য, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, সাম্রাজ্যবাদ ও ভারত প্রশ্ন।

 

 

 

[4]কয়েকদশকে ব্যাংকঋণ লোপাট কাহিনী ও তার বিবর্তনের বিস্তারিত আলোচনার জন্য দেখুন- কল্লোল মোস্তফা: সর্বজনকথা, আগস্ট-অক্টোবর ২০১৮। এছাড়া ব্যাংকের খেলাফী ঋণ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা এখনও বিষয়টি বোঝার জন্য প্রাসঙ্গিক। দেখুন মইনুল …..

 

[5] এবিষয়ে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণার সূত্র ধরে বিভিন্ন রিপোর্ট দেশের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। প্রথম আলো, বণিকবার্তা ছাড়াও এসম্পর্কিত আরও রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। এরমধ্যে কয়েকটি:https://www.jamuna.tv/news/24438, http://www.kalerkantho.com/print-edition/first-page/2016/05/31/364233, http://www.kalerkantho.com/print-edition/first-page/2017/01/14/451818, https://www.thedailystar.net/frontpage/road-construction-cost-way-too-high-1423132

[6]এ বিষয়ে দ্রষ্টব্য তেল গ্যাস খনিজসম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির বিকল্প মহাপরকিল্পনার খসড়া। দেখুন: https://drive.google.com/file/d/1hPjRITBhY9cizuxfMJ2eAwieaSXP_EtI/view

[7]গত এক দশকের উন্নয়ন বরাদ্দের ধরন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার জন্য দেখুন- মাহতাব উদ্দীন আহমদ: বাজেট এবং এক দশকের ‘উন্নয়ন চিত্র’, সর্বজনকথা, আগস্ট-অক্টোবর ২০১

[8] নিউ এইজ, জুলাই ৫, ২০১৮

গণতন্ত্রই রুখতে পারে জঙ্গীবাদ-উগ্রবাদ

আমীর খসরু ::

২০১৩ থেকে এ পর্যন্ত ৭ জন ব্লগার ও একজন প্রকাশককে হত্যা করা হয়েছে এবং আহতের সংখ্যাও অনেক। শুধু ব্লগার ও প্রকাশককে হত্যাই নয়, হত্যাকান্ড থেকে বাদ পড়েননি বিদেশী নাগরিকসহ এ দেশের বিভিন্ন ধর্মের মানুষ। এসব ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা বলে মনে করার কোনো কারণ নেই। এর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি। বাংলাদেশে বর্তমানে মুক্তমত প্রকাশে নানামুখী বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। যদি বিষয়টি এমন হতো যে, সরকার মুক্তমত প্রকাশের পক্ষে এবং এ লক্ষ্যে যাবতীয় সুরক্ষামূলক কর্মকান্ড পরিচালনা করতো, নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা বিধানে সচেষ্ট থাকতো- তাহলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারতো। যেহেতু ক্ষমতাসীন পক্ষই স্বাধীন মতপ্রকাশ ও বাক-ব্যক্তি স্বাধীনতাসহ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করছে এবং এরই অনিবার্য সুযোগ নিচ্ছে অরাষ্ট্রীয় উগ্রবাদী অপশক্তি। আর এই অপশক্তিকে ক্ষমতাসীনদের পক্ষে জনগণকে সাথে নিয়ে মোকাবেলা করার ইচ্ছাও যেমন নেই, তেমনি তাদের পক্ষে এটা সম্ভবও নয়।

এ কথা স্পষ্ট করেই বলে নেয়া প্রয়োজন, বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির অভ্যুদ্বয়ের স্বল্পকাল পর থেকে এই পর্যন্ত কোনো সরকারই স্বাধীন মতামত প্রকাশ এবং নাগরিকের বাক-ব্যক্তি স্বাধীনতাসহ সংবিধান বর্ণিত মৌলিক অধিকারগুলোর নিশ্চয়তা দেয়নি। বরং এসব অধিকারগুলোকে হরণ করেছে নানাবিধ কালা-কানুন এবং বিভিন্ন পন্থায়। স্বাধীনতার স্বল্পকাল পরেই সংবাদপত্র বন্ধসহ বেশ কিছু ব্যবস্থা সম্পন্ন হয়। জারি করা হয় বিশেষ ক্ষমতা আইন, সংবিধানে মৌলিক অধিকার স্থগিত করে জরুরি অবস্থার বিধানও চালু করা হয়। এরপরের সামরিক-বেসামরিক সরকারগুলোও কম-বেশি ওই একই পথে গেছে। তবে ওই সব সরকারগুলোকে অতিক্রম করে গেছে বর্তমান সময়। এখনো সংবাদ মাধ্যম বন্ধ হচ্ছে। এর উপরে স্বাধীন মতামত প্রকাশে বাধা সৃষ্টির জন্য তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন জারি রয়েছে। বিশেষ করে ওই আইনের ৫৭ ধারাটি স্বাধীন মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রে বিপজ্জনক এবং বাধা-বিঘ্ন সৃষ্টিকারী। শুধু আইন-কানুন দিয়েই নয়, সামগ্রিকভাবে অলিখিত ও অদৃশ্যভাবে এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়েছে যাতে মানুষ এখন ভীত ও সন্ত্রস্ত।

এ কথাটি সবার জানা যে, স্বাধীন মতামত প্রকাশ ও বাক-ব্যক্তি স্বাধীনতার সাথে গণতন্ত্র বিদ্যমান থাকার বিষয়টি অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। বর্তমান সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের পর গণতন্ত্র চর্চাকে বিপজ্জনক দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে-পরে এবং এখনো দেশী-বিদেশী সবাই বলে যাচ্ছেন, গণতন্ত্র সংকুচিত অথবা বিনাশ করা হলে যেকোনো ধরনের উগ্রবাদ-জঙ্গীবাদ কিংবা যেকোনো অরাষ্ট্রীয় অপশক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। কারণ গণতন্ত্রহীনতার সুযোগটি ওই শক্তি বা শক্তিগুলো অতিমাত্রায় নিয়ে থাকে।

৫ জানুয়ারি নির্বাচনের পরে গণতন্ত্রের উল্টো যাত্রার সাথে সাথে শুধু যে নির্বাচনী ব্যবস্থারই অর্ন্তধান ঘটেছে তা নয়, সব কিছুই বিপদাপন্ন হয়েছে। সংকটাপন্ন হয়েছে বাক-ব্যক্তি স্বাধীনতা। এ কথাটিও বলা প্রয়োজন যে, সরকার গণতান্ত্রিক না হলে ক্রমাগত জনবিচ্ছিন্নতা বাড়ে। আর জনবিচ্ছিন্ন অবস্থায় উগ্রবাদ-জঙ্গীবাদ মোকাবেলাও অসম্ভব হয়ে পরে। কারণ জন-অংশগ্রহণমূলক প্রতিরোধ উগ্র ও জঙ্গীবাদী শক্তির বিরুদ্ধে গড়ে তোলা কার্যত অসম্ভব হয়ে যায়। স্মরণে রাখা প্রয়োজন, জনগণকে বাদ দিয়ে সরকারের পক্ষে এই শক্তিকে মোকাবেলা সম্ভব নয়। এটা স্বতঃসিদ্ধ যে, গণতন্ত্রই হচ্ছে জঙ্গীবাদ, উগ্রবাদ কিংবা অরাষ্ট্রীয় অপশক্তিকে মোকাবেলার একমাত্র পূর্বশর্ত।

কিন্তু ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে সব সময়ই বলা হচ্ছে, জবাবদিহীতা, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য নানা প্রতিষ্ঠান গঠন করা হয়েছে এবং এর সবই জনগণকে সহায়তা করবে। কিন্তু তথ্য কমিশন, মানবাধিকার কমিশন কিংবা দুদকসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দিকে দৃষ্টি দিলেই আমরা বুঝতে সক্ষম যে, এসব প্রতিষ্ঠান কতোটা কার্যকর এবং সক্ষমতার সাথে স্বাধীনভাবে কাজ করছে। এক্ষেত্রে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন তার দ্য আইডিয়া অফ জাস্টিস গ্রন্থে বলেছেন- ‘আনুষ্ঠানিকভাবে কি কি প্রতিষ্ঠান আছে, শুধু তা দিয়েই গণতন্ত্রের মূল্যায়ন হয় না; ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠীর বহু মানুষের কণ্ঠস্বরগুলো শোনা যাচ্ছে কিনা তাও দেখতে হবে’।

সরকার জনঅধিকারগুলোকে উপেক্ষা করে উন্নয়নের কথা বলে যাচ্ছে। এ বিষয়ে বহুবার বলা ও লেখা হয়েছে যে, গণতন্ত্রবিহীন অবস্থায় উন্নয়ন কার্যকর ও টেকসই হতে পারে না। সরকার সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়াসহ কয়েকটি দেশের কথা ইতোপূর্বে বলেছে এবং এখনো বলছে। কিন্তু সেখানে আইনের শাসনহীনতা নেই, বিচারহীনতার সংস্কৃতিও বিদ্যমান নয়।

আগেই বলা হয়েছে যে, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের পরে মানুষের সামগ্রিক অধিকারগুলোর ক্রমান্বয়ে বিলুপ্তি ঘটার সাথে সাথে অনিবার্যভাবে অরাষ্ট্রীয় শক্তিগুলো এর সুযোগ নিচ্ছে এবং জঙ্গীবাদ-উগ্রবাদের উত্থান হচ্ছে।

২০১৫ এবং ২০১৬’র হিসাব যদি দেখা যায় তাহলে দেখা যাচ্ছে, অন্তত ৬ জন ব্লগার, অনলাইন সক্রিয়বাদী, প্রকাশককে হত্যা করা হয়েছে। হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে আরও অনেককে। শুধু তাদেরই নয়, বাদ জাননি ইতালীয় নাগরিক তাবেলা সিজার, জাপানী নাগরিক কোনিও হোশি এবং দেশের মধ্যে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীরাও। কিন্তু এখনো পর্যন্ত কোনো হত্যারই বিচার তো হয়ইনি, সঠিকভাবে তদন্ত কাজ সম্পন্ন হয়েছে এটাও বলা মুশকিল।

এ কারণে প্রশ্ন উঠছে, ক্ষমতাসীনদের স্বদিচ্ছা এবং আন্তরিকতা নিয়ে। এ প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। কারণ যে ভীতির সংস্কৃতির সৃষ্টির চেষ্টা চলছে, এসব হত্যাকান্ড ও হামলার ঘটনাগুলো অনাকাংখিত ও দুঃখজনক হলেও তা পরোক্ষভাবে ওই প্রচেষ্টায় সহায়কা ভূমিকা পালন করছে কি না- সে বিষয়টিও ভেবে দেখতে হবে।

একটি কথা মনে রাখতে হবে, জনগণ প্রত্যাশা করে, রাষ্ট্র সব সময়ই তাদের অর্থাৎ নাগরিকদের সুরক্ষা এবং অধিকারগুলো নিশ্চিত করবে। কিন্তু রাষ্ট্র এখন বিপরীতমুখী আচরণ করছে। এ কারণে রাষ্ট্রের সাথে নাগরিকদের যোজন যোজন দূরত্বের সৃষ্টি হয়েছে। আর এর সুযোগ নিচ্ছে অরাষ্ট্রীয় সহিংস উগ্রবাদী-জঙ্গীবাদী শক্তি। কাজেই স্বাধীন মতপ্রকাশ এখন সব দিক থেকেই সীমাহীন হুমকির মুখে। মানুষ এখন ঝুকি আর আতংকের মধ্যেই বসবাস করছে। এটা কোনো শুভ লক্ষণ নয়। এর একমাত্র সমাধান- সচল, সজীব গণতন্ত্র এবং গণতন্ত্রের চর্চা।

সাঁড়াশি অভিযানের ভিন্ন দিক : বার্তা সংস্থা এপি’র বিশ্লেষণ

ইসলামি জঙ্গিদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযানের ঘোষণা দেওয়ার প্রথম ছয় দিনের মধ্যেই বাংলাদেশের কারাগারগুলো ১১,৬০০ নতুন বন্দি দিয়ে ভরে ফেলাটা আইন প্রয়োগকারী শক্তির বিস্ময়কর প্রদর্শনী হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। সমস্যা হলো, যাদের আটক করা হয়েছে, তাদের দুই শতাংশেরও কম সন্দেহভাজন চরমপন্থী এবং তাদের একজনও উচ্চপর্যায়ের কেউ বিবেচিত হওয়ার মতো নয়। বাকিরা? অভিযুক্তদের বেশির ভাগই চুরি, সিঁধেল চুরি বা টুকটাক মাদক পাচারের মতো ছোট-খাটো অপরাধী। প্রধান বিরোধী দলটির মুখপাত্রের মতে, আটককৃতদের অন্তত দুই হাজার তাদের দলের লোক, বাকিরা তাদের প্রধান মিত্রের দলভুক্ত।

বিশ্লেষক, মানবাধিকার গ্রুপ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সেক্যুলার সরকারের বিরোধীরা এখন অভিযানটি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। এটা কি সত্যিই বিভিন্ন সংখ্যালঘুর ওপর মুসলিম চরমপন্থীদের একের পর প্রাণঘাতী হামলা বন্ধ করার উদ্যোগ, নাকি এসব হত্যাকান্ড থেকে দেশে ও বিদেশে যে ভীতি সৃষ্টি হয়েছে তা থেকে রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা?

ওয়াশিংটন ডিসির থিঙ্ক ট্যাঙ্ক হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক বিশেষজ্ঞ লিসা কার্টিস বলেন, চরমপন্থীদের বিরুদ্ধে অভিযান দরকার ছিল। কিন্তু হাজার হাজার বন্দির মধ্যে জঙ্গি মাত্র ১৭৭ জন বলে পুলিশের দেওয়া তথ্যের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, উদ্যোগটি হামলা বন্ধের আন্তরিক চেষ্টার চেয়ে বরং রাজনৈতিক বিরোধীদের চাপে রাখার একটি হাতিয়ার বলেই বেশি মনে হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর অভিযানের ফলে সত্যিকার অর্থে সেক্যুলার সরকারের সমর্থক এবং ইসলামি শাসন কামনাকারীদের মধ্যকার ব্যবধান বেড়ে যেতে পারে, এমনকি জঙ্গিরা উৎসাহিত পর্যন্ত হতে পারে। কার্টিস বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক অচলাবস্থা ইসলামি চরমপন্থীদের জন্য আরো বেশি সদস্য সংগ্রহ ও প্রভাব বাড়ানোর দরজা খুলে দিচ্ছে এবং চরমপন্থীদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরকারের ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা আরো কঠিন করে তুলবে।

সাঁড়াশি অভিযান নিয়ে সমালোচনার জবাবে বাংলাদেশ প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, ২০১৩ সাল থেকে ডজন দুয়েক নাস্তিক লেখক, প্রকাশক, ধর্মীয় সংখ্যালঘু, সোস্যাল অ্যাক্টিভিস্ট এবং বিদেশী সাহায্যকর্মীকে হত্যার, এসব মৃত্যুর বেশ কয়েকটা হয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে, এর জন্য দায়ী সন্দেহভাজন জঙ্গিদের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রয়াস নতুন করে নজর কাড়বে।

তথাকথিত ‘চাপাতি হামলা’ দেশটির সংখ্যালঘুদের আতঙ্কিত করেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে বিপদাশঙ্কার সৃষ্টি করেছে, কয়েকটি সরকার ঝুঁকির মুখে থাকাদের আশ্রয় দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। বেশির ভাগ হত্যাকান্ডেই তরুণদের একটি গ্রুপ তাদের টার্গেটকে মাংস কাটার ছুরি ও চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে পালিয়ে যায়।

ইসলামিক স্টেট বা আল-কায়েদার সাথে সংশ্লিষ্ট গ্রুপগুলো বেশির ভাগ হামলার দায় স্বীকার করলেও সরকার বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক জিহাদী গ্রুপটির উপস্থিতি অস্বীকার করে আসছে।

পক্ষান্তরে হাসিনার সরকার স্থানীয় সন্ত্রাসী ও ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলোকে- বিশেষ করে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এবং তার মিত্র জামায়াতে ইসলামী- দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির জন্য সহিংসতায় ইন্ধন দিচ্ছে বলে অভিযুক্ত করছে। এই উভয় দলই সব ধরনের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছে।

এক পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রীকে গুলি ও ছুরিকাঘাতে হত্যা করার পর প্রধানমন্ত্রী হাসিনা এই অভিযানের ঘোষণা দেন। হামলার শিকার ছিলেন জঙ্গিদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত আগ্রহী। সরকারের সাথে সংশ্লিষ্ট অনেকের দৃষ্টিতে তাদেরই একজন বিবেচিত ব্যক্তিটির ওপর এই হামলায় তাদের অনেকে হতবিহ্বল হয়ে যায়।

পুলিশ অবশ্য এখন বলছে, অভিযানটি কখনোই কেবল চরমপন্থীদের জন্যই কেবল নির্ধারিত ছিল না, বরং মাদক ও আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবসায় জড়িতদের আটকের লক্ষ্যেও করা হয়েছিল।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ শুক্রবার এক বিবৃতিতে জঙ্গিবিরোধী প্রয়াস জোরদার করার পাশাপাশি অপরাধ করার যথাযথ প্রমাণ ছাড়া নির্বিচারে গ্রেফতার অবিলম্বে বন্ধ করা এবং যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়নি, তাদের অবিলম্বে মুক্তি দেওয়া উচিত বলে জানিয়েছে। গ্রুপটির এশিয়াবিষয়ক পরিচালক ব্র্যাড অ্যাডামস ‘জঙ্গি হামলায় ‘যথাযথ তদন্তের কঠোর পরিশ্রম’ না করে ‘প্রথাগত সন্দেহভাজনদের’ আটক করার পুরনো অভ্যাস অনুসরণ’ করার ‘মন্থর ও আত্মপ্রসাদপূর্ণ’ কাজ করার জন্য সরকারকে অভিযুক্ত করেছেন।

আটকদের বেশির ভাগই শুক্রবার পর্যন্ত আটক ছিলেন, আর তাদের পরিবার ও বন্ধুরা জামিন প্রদান কিংবা অন্যান্য পন্থায় তাদের প্রিয়জনের মুক্তি নিশ্চিত করার জন্য থানা, আদালত ও কারাগারে ভিড় করছিলেন। স্থানীয় মিডিয়ার খবর অনুযায়ী, অন্যান্য পন্থার মধ্যে পুলিশকে উৎকোচ প্রদানও ছিল।

পুলিশ বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহে আটককৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে প্রকাশ পেয়েছে, তাদের মধ্যে দুই সন্দেহভাজন রয়েছে, অক্টোবরে এক প্রকাশকের বিরুদ্ধে হামলার ঘটনায় তাদের খোঁজা হচ্ছিল। একই দিনে পৃথক ঘটনায় অন্য প্রকাশককে হত্যার জন্য খোঁজা অন্য সন্দেহভাজনদের আটকে এটা সহায়ক হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

এখনো বেশির ভাগ সন্দেহভাজন পলাতক রয়েছে। এসব হামলার জন্য কারা জড়িত তা কর্তৃপক্ষ জানে বলে দৃঢ়তার সাথে বলা সত্ত্বেও কেন তদন্ত এত কঠিন হচ্ছে, তার কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।

মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের দক্ষিণ ও মধ্যএশিয়া ব্যুরো চলতি সপ্তাহে ইসলামি চরমপন্থীদের নির্মূলে বাংলাদেশকে সহায়তার কথা পুনর্ব্যক্ত করার পাশাপাশি তদন্তে স্বচ্ছতা রাখা এবং ‘জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইনানুযায়ী নিরপেক্ষ বিচার ও অন্যান্য সুরক্ষার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের’ পরামর্শ দিয়েছে।

বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, বাংলাদেশের নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ প্রশমিত করার জন্যই সম্ভবত এই অভিযান চালানো হয়েছে।

‘অনেক দিন ধরেই বাংলাদেশী কর্মকর্তাদের মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধী ও অপরাধীদের গুলিয়ে ফেলার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। আমরা আরো বেশি পেশাদারী দৃষ্টিভঙ্গি দেখার প্রত্যাশা করতে পারি,’ বলেছেন, জোনাহ ব্ল্যাঙ্ক। তিনি ওয়াশিংটন ডিসির র‌্যান্ড কোরের রাজনীতি বিজ্ঞানী এবং দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক  বিশেষজ্ঞ।

সাবেক এক পুলিশপ্রধান বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঢাকা দেওয়ার জন্য এই অভিযান পরিচালনা করা হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে তথা ২০০৭ থেকে তিন বছর পুলিশ মহাপরিদর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী নূর মোহাম্মদ বলেন, পুলিশ দেশবাসী ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দেখাতে চায়, তারা হত্যাকারীদের গ্রেফতার এবং হামলা মোকাবেলায় সর্বশক্তি নিয়োজিত করেছে। তিনি বলেন, ‘সাধারণত এসব অভিযান চালানো হয় কোনো ধরনের প্রস্তুতি ছাড়াই। এতে করে বিপুলসংখ্যক নিরীহ মানুষ আটক ও হয়রানির শিকার হয়।’

বিএনপি নেতারা বলছেন, নিরাপত্তাজনিত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলায় মনোযোগ সরিয়ে দেওয়ার জন্য পরিচালিত এসব হামলার জন্য সরকার দায়ী। তারা আরো অভিযোগ করেছে, সরকার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা প্রতিরোধ করার জন্য তিনি রাজনৈতিক বিরোধীদের ওপর অভিযান চালাচ্ছেন।

২০১৪ সালে সুষ্ঠু পরিবেশ না থাকার কথা বলে বিরোধী দলের বয়কট করা নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার সহজেই জয়ী হয়েছিল।

পানামা পেপারস : ধামাচাপা পড়ছে আগের মতোই

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন ::

এ যাবৎকালের আর্থিক খাতের অন্যতম তথ্য ফাঁসের ঘটনা ‘পানামা পেপারস’ নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে বিশ্বব্যাপী। গোপনীয়তা রক্ষাকারী হিসেবে স্বীকৃত পৃথিবীর অন্যতম প্রতিষ্ঠান মোসাক ফনসেকা- যেটি পানামার একটি আইনী সহায়তা প্রতিষ্ঠান- সেখান থেকেই সম্প্রতি ফাঁস হয়েছে এক কোটি ১৫ লাখ নথিপত্র। যেখানে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের অর্থপাচারের বিষয়ে শিহরণ জাগানিয়া তথ্য রয়েছে। যেখানে বিশ্বের ধনাঢ্য ও ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের গোপন সম্পদের তথ্য, আর কীভাবে আইনি প্রতিষ্ঠানটি এসব ব্যক্তির অর্থপাচার, নিষেধাজ্ঞা এড়ানো এবং কর ফাঁকিতে সহযোগিতা করেছে, তার চিত্র। ওই নথিপত্রগুলোকেই বলা হচ্ছে পানামা পেপারস।

সুইজারল্যান্ড, সাইপ্রাস, ব্রিটিশ ভার্জিনিয়া দ্বীপপুঞ্জসহ বিভিন্ন করমুক্ত দেশে মোসাক ফনসেকা কার্যক্রম পরিচালনা করে। নিজ দেশের বাইরে অর্থ রাখার বিষয়ে দুনিয়াজুড়ে যেসব প্রতিষ্ঠান গ্রাহকদের সেবা প্রদান করে তার মধ্যে মোসাক ফনসেকার অবস্থান চতুর্থ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তিন লাখেরও বেশি কোম্পানির হয়ে কাজ করে এটি। ব্রিটেনের সঙ্গে রয়েছে এর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। এদের গ্রাহকের অর্ধেকেরও বেশির অবস্থান ব্রিটেনশাসিত এলাকাগুলোয়।

মোসাক ফনসেকার সম্পদশালী  মক্কেলেদের বিষয়ে এরই মধ্যে তদন্ত শুরু করেছে অস্ট্রেলিয়া। ফ্রান্স ও নেদারল্যান্ডসও তদন্তের ঘোষণা দিয়েছে। স্পেনের বিচার বিভাগীয় সূত্র জানিয়েছে, স্পেন এরই মধ্যে আইনি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থ পাচার-বিষয়ক তদন্ত শুরু হয়েছে। কেলেঙ্কারির ঘটনার কারণে আলোচিত পানামা সরকারও বিষয়গুলো তদন্ত করার ঘোষণা দিয়েছে। জানিয়েছে, যদি কোনো অপরাধ হয়ে থাকে এবং আর্থিক ক্ষতি হয়ে থাকে, আর তা প্রমাণিত হয়, তাহলে পুরস্কৃত করা হবে।

বিশ্বসেরা ফুটবলার লিওনেল মেসি ও তার বাবার নাম আছে এ তালিকায়। নথি অনুযায়ী, বাবা-ছেলে মিলে ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান মেগা স্টার এন্টারপ্রাইজের নামে অর্থ পাচার করেছেন। এখন স্পেনে কর ফাঁকি দেওয়ার একটি অভিযোগ আছে মেসির বিরুদ্ধে। এ অভিযোগ তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে তার পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়, তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ মিথ্যা ও অবমাননাকর।

তালিকায় ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট পেত্রো পোরোশেঙ্কোর নাম থাকলেও তিনি কোনো ভুল করেননি বলে দাবি করেছেন। এ ছাড়া লন্ডন হিথ্রো বিমানবন্দরে ১৯৮৩ সালে চার কোটি ডলার মূল্যের ব্রিটিশ সোনা-রুপার বার ডাকাতির ঘটনায় লাখ লাখ ডলার ফাঁকি দেওয়ার বিষয়ে পানামার একটি শেল কোম্পানি সহায়তা করেছে।

পানামা পেপারস নিয়ে ব্যাপক আগ্রহের মূলে রয়েছে এ নথিতে বিশ্বের অনেক বড় বড় ক্ষমতাধর রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী এবং আলোচিত, তারকা ব্যক্তিত্বের বিদেশে অর্থপাচারের গোপন নথি প্রকাশ হওয়া। পানামা পেপারসে দেখা যায় দুর্নীতি, লুটপাট করে অর্জিত সম্পদসহ অনেকে নিজ দেশে ট্যাক্স ফাকি দেয়ার জন্য বিদেশে ভুয়া প্রতিষ্ঠান খুলে অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। লুটেরা ও স্বৈরশাসক, বিভিন্ন রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, দখলদারদের নানা উপায়ে অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং বিদেশে তা পাচার বিষয়ে সাধারণ মানুষ সবসময়ই কমবেশি অবহিত। কিন্তু এভাবে যে তা সমূলে ফাঁস হয়ে যাবে তা যেন ছিল অনেকের কল্পনার বাইরে। বিভিন্ন দেশের অনেক ক্ষমতাসীন নেতৃবৃন্দ চরম আতঙ্কে রয়েছেন পানামা পেপারস ফাঁস হওয়ার পর থেকে। ইতোমধ্যে আইসল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন সম্পদ পাচারে জড়িত হিসেবে তার নাম ফাঁস হয়ে যাওয়ায়। রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, সৌদি আরব, চীনসহ অন্য অনেক দেশের ক্ষমতাসীনেরা বিব্রতকর অবস্থায় রয়েছেন পানামা পেপারসে তাদের এবং তাদের পরিবার ও পরিচিত অনেকের নাম জড়িত থাকায়। বাংলাদেশেও অনেকে যেমন তীব্র আতঙ্কে রয়েছেন পানামা পেপারস বিষয়ে তেমনি অনেকে অপেক্ষা করছেন কার কার নাম ফাঁস হয় তা দেখার জন্য।

বিভিন্ন দেশে প্রতিক্রিয়া: পানামা পেপারস কেলেঙ্কারিতে বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনেতাসহ ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের অর্থ পাচার এবং কর ফাঁকির এ কেলেঙ্কারির ঘটনা ফাঁস হওয়ার পর বিক্ষোভের মুখে পদত্যাগ করেছেন আইসল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী সিগমন্ডুর ডেভিড গুনলাগসন। এর আগে পার্লামেন্ট ভেঙে দিতে দেশের প্রেসিডেন্টকে আহবান জানান তিনি। তবে প্রেসিডেন্ট ওলাফুর র্যা গনার গ্রিমসন তাঁর আহবানে সাড়া দেননি।

অর্থ পাচারের তালিকায় নাম থাকা ধনশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে অস্ট্রেলিয়া সরকার। তদন্ত শুরু হয়েছে ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস ও পানামায়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, রাজনীতিক এবং চলচ্চিত্র ও ক্রীড়া জগতের তারকা ব্যক্তিদের অর্থ পাচারের খবর প্রকাশ হয়। এ ঘটনায় একটি স্বতন্ত্র তদন্ত কমিটি করার ঘোষণা দিয়েছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা কর ফাঁকি দেওয়াকে একটি বৈশ্বিক সমস্যা বলে আখ্যায়িত করেছেন।

আইসল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের কথা জানিয়ে তাঁর দল প্রগ্রেসিভ পার্টির উপনেতা ও কৃষিমন্ত্রী সিগুইডুর ইঙ্গি জোনাসন বলেন, পার্লামেন্টারি পার্টির সভায় প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগের কথা জানিয়েছেন। এখন তিনি (কৃষিমন্ত্রী) প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেবেন বলে জানান।

মোসাক ফনসেকা নামে পানামার একটি আইনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের ১ কোটি ১৫ লাখ গোপন নথি ফাঁস হয়। এ ঘটনা বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলে। নথিতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের নিকটাত্মীয়দের নাম আসে। এ তালিকায় আরও আছে সৌদি আরবের বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ বিন আবদুল রহমান আল সৌদ, মিসরের প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারকের এক ছেলে এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের দুই ছেলে ও মেয়ের নাম। রাজনৈতিক ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের পাশাপাশি ফুটবল তারকা লিওনেল মেসি এবং ভারতের চলচ্চিত্র জগতের খ্যাতিমান অভিনেতা অমিতাভ বচ্চন এবং তাঁর পুত্রবধূ ও অভিনেত্রী ঐশ্বরিয়ার নামও অর্থ পাচারকারীদের তালিকায় স্থান পেয়েছে।

মোসাক ফনসেকার ওই ১ কোটি ১৫ লাখ নথি অজানা সূত্র থেকে জার্মান দৈনিক জিটডয়েচ সাইতং-এর হাতে আসে। পত্রিকাটি সেসব নথি ওয়াশিংটনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টসকে (আইসিআইজে) দেয়। ১৯৭৭ থেকে ২০১৫, প্রায় ৪০ বছরের এসব নথি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তার কিছু অংশ আইসিআইজে প্রকাশ করে।

মোসাক ফনসেকার মাধ্যমে কর ফাঁকি দেওয়া অর্থ কর রেয়াতকারী অঞ্চলে তথাকথিত প্রতিষ্ঠান (অফশোর কোম্পানি) তৈরির মাধ্যমে গচ্ছিত রেখেছিলেন পাচারকারীরা। এসব অঞ্চলের মধ্যে প্রায় সব কটিই যুক্তরাজ্যের রানীশাসিত নানা অঞ্চল (ব্রিটিশ টেরিটোরিজ)। এই অঞ্চলগুলো ‘করের স্বর্গ’ বা ‘ট্যাক্স হেভেন’ নামে পরিচিত। পানামা পেপারস কেলেঙ্কারি নিয়ে তাই বিরোধীদের তোপের মুখে পড়েন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন। বিরোধী দল লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবেন বলেন, এ অঞ্চলগুলো যদি যুক্তরাজ্য সরকারের কর নীতি না মানে, তাহলে ‘প্রত্যক্ষ শাসন’ জারি করা হোক। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেন, কর ফাঁকি দেওয়াটা একটা বৈশ্বিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। ধনী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো কর আইনের ফাঁকফোকর বের করে অর্থ পাচার করছে।

ফ্রান্স ঘোষণা করেছে, তারা এ ঘটনার তদন্ত করবে। ফরাসি অর্থমন্ত্রী মিশেল সাপাঁ পার্লামেন্টে ঘোষণা দেন, ফ্রান্স কর ফাঁকি দেওয়া ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করতে যেসব দেশ সহযোগিতা করে না, এর তালিকায় এখন পানামার নাম যুক্ত করবে। অস্ট্রেলিয়ার কর কার্যালয় তালিকায় নাম থাকা ৮০০ ব্যক্তির বিষয়ে তদন্তের ঘোষণা দেয়। অস্ট্রিয়ার আর্থিক খাত নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ বলেছে, তালিকায় নাম উঠে আসার পর দেশের দুটি ব্যাংক অর্থ পাচারে জড়িত ছিল কি না, তা নিয়ে তারা তদন্ত শুরু করেছে।

মোসাক ফনসেকার দেশ পানামাও তদন্তের ঘোষণা দিয়েছে। আদৌ অর্থ পাচার বা এ জন্য কোনো অপরাধমূলক কাজ হয়েছে কি না, সে লক্ষ্যেই হবে এ তদন্ত। পানামার প্রেসিডেন্ট জুয়ান কার্লোস ভারেলা বলেন, তাঁর সরকার আন্তর্জাতিক যেকোনো তদন্তে সহযোগিতা করতে রাজি। তবে তাঁর দেশের ভাবমূর্তি অক্ষুন্ন রেখেই তিনি সবকিছু করবেন।

যে ৫০০ ভারতীয়র নাম তালিকায় উঠে আসে, তাঁদের বিষয়ে তদন্তের নির্দেশ দেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। আর পরে মুখ খোলেন অভিনেতা অমিতাভ বচ্চন। তিনি বলেন, যে চারটি জাহাজ কোম্পানির পরিচালক হিসেবে তাঁর নাম এসেছে, এগুলো তিনি চেনেন না। এসব প্রতিষ্ঠানে তাঁর নাম ভুলভাবে এসেছে বলে তাঁর ধারণা। তিনি বলেন, ‘আমার প্রদেয় সব কর আমি শোধ করেছি। যেসব অর্থ বিদেশে ব্যয় করেছি, সেসবের করও আমি দিয়েছি।’ অমিতাভের পুত্রবধূ ঐশ্বরিয়া রাইয়ের গণমাধ্যম উপদেষ্টা রাইয়ের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের অভিযোগকে ‘পুরোপুরি মিথ্যা’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

এদিকে, এই কেলেঙ্কারিতে যেসব ক্ষমতাধর ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নাম উঠে এসেছে, তাঁদের অনেকেই নিজেদের সংশ্লিষ্টতার কথা অস্বীকার করেছেন। রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের তিন সহযোগীর নাম উঠে এলে সঙ্গে সঙ্গে এর প্রতিবাদ আসে ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে। আর ক্রেমলিনের মুখপাত্র এই কেলেঙ্কারিতে মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইয়ের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আনেন। তিনি বলেন, ‘আসলে এর মাধ্যমে রাশিয়ায় একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করাই মূল উদ্দেশ্য।’

বাংলাদেশ : বাংলাদেশের বেশকিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে পানামা পেপারসে। এরই মধ্যে গণমাধ্যমে তাদের কারো কারো নামও প্রকাশ হয়েছে। সরকার এদের সম্পর্কে তদন্ত করছে বলে বলা হলেও সবই আইওয়াশ ছাড়া আর কিছু নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

পানামা পেপারস-এ বাংলাদেশীদের নাম প্রকাশিত হবার পরে দুদক, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) নানা উদ্যোগের কথা বললেও বাস্তবে তেমন কোনো অগ্রগতিই নেই। বিষয়টি যে ধীরে ধীরে ধামাচাপা পড়ে যাচ্ছে, তাও বোঝা যাচ্ছে। অথচ পানামা পেপারস-এর তথ্য প্রকাশের পরেই দুদক বলেছিল, ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশী কেউ দুর্নীতিতে জড়িত কিনা- তা খতিয়ে দেখতে দুদকের উপপরিচালক এসএম আখতার হামিদ ভূঁইয়ার নেতৃত্বে তিন সদস্যের টিম গঠন করা হয় এবং শিগগিরই এ টিম কাজ শুরু করবে বলেও বলা হয়েছিল। বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছিল, বাংলাদেশ থেকে বিদেশে অর্থ পাচারকারীদের বিষয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যও সংগ্রহ করা হচ্ছে। শিগগিরই পানামার কাছে তথ্য চাইবে বিএফআইইউ। একইসঙ্গে সংশি¬ষ্ট ওয়েবসাইট থেকেও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এসব সংগ্রহ করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষপর্যায়ের এক কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। কিন্তু আদৌ এর কোনো অগ্রগতি হয়েছে কিনা তা বোঝা যাচ্ছে না। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, এনবিআরের অন্যতম কাজ দেশে-বিদেশে যেখানেই হোক বাংলাদেশীরা যদি ট্যাক্স ফাঁকি দেয় বা অর্থ পাচার করে তা যথা নিয়মে তদন্ত করা। আমরা বিষয়টি দেখব। রিপোর্টের গুরুত্ব বিচার করে যাদের নাম প্রকাশিত হয়েছে তাদের বিষয়ে খোঁজ নেব। এর আগে দেশ থেকে অবৈধভাবে সুইস ব্যাংক ও অন্যান্য স্থানে মুদ্রা পাচার হয়েছে সেগুলোর বিষয়ে রাজস্ব বোর্ড তদন্ত করছে বলে জানিয়েছিল। কিন্তু সব কিছুই যেন ধামাচাপা পড়ে গেছে।

সম্ভাব্য কর ফাঁকি ও অর্থ পাচারে বাংলাদেশিদের সম্পৃক্ততায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। এ ঘটনাকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থাপনায় ‘প্রকট দুর্নীতি-সহায়ক পরিস্থিতির দৃষ্টান্ত’ উল্লেখ করে জড়িতদের বিরুদ্ধে যথাযথ তদন্ত এবং আইনি  প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক ও সংস্থাটি। টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, প্রকাশিত তালিকায় যেসব বাংলাদেশির নাম উল্লেখ আছে তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ও নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই। তবে সম্প্রতি  বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ থেকে উদ্বেগজনক হারে টাকা পাচারের প্রবণতা প্রকাশ পেয়েছে। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংক, দুর্নীতি দমন কমিশন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিসের উদ্যোগে এসব টাকা ফিরিয়ে আনা এবং জড়িতদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তিনি আরও বলেন, দেশের বাইরে নামে-বেনামে কোম্পানি প্রতিষ্ঠা বা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অর্থ পাচারের মূল লক্ষ্য কর ফাঁকি। যার মূল্য জনগণকেই দিতে হয়। সরকারের উচিত এসব কর ফাঁকি ও অর্থ পাচার বন্ধ করা।

টিআইবি নির্বাহী পরিচালক বলেন, পানামা পেপারসে প্রকাশিত তথ্য আংশিক। মোসাক ফনসেকার মতো আরও অনেক তথাকথিত আইন সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠান অর্থ পাচার প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত আছে। তাছাড়া এ দুষ্ট চক্রের সঙ্গে জড়িত বিশ্বের নামি-দামি  ব্যাংক ও অ্যাকাউন্টিং কোম্পানিসহ অসংখ্য মধ্যস্থতাকারী। তাই দেশীয় আইনি কাঠামো জোরদার ও কার্যকর করার মাধ্যমে অর্থ পাচার প্রতিরোধে সুদৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ ও অন্যদিকে জাতিসংঘের দুর্নীতিবিরোধী কনভেনশনসহ আন্তর্জাতিক আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার মাধ্যমে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

নির্বাচন কমিশনের অক্ষমতার শেষ দশা

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

এই নির্বাচন কমিশন স্থায়ী উদাহরণ হয়ে ঢুকে যাচ্ছে ইতিহাসে। বিচারপতি মসউদ, বিচারপতি রউফ, বিচারপতি আজিজ কমিশনের উদাহরণ ছাড়িয়ে যেতে বসেছে বর্তমান কমিশন। তারা এখন ইউপি নির্বাচন সম্ভবত: নিয়তির হাতে ছেড়ে দিয়েছেন। পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী নিহতের সবশেষ সংখ্যা ১১৪ জন। বাকি আছে আরো দু’ধাপ। দেশবাসীর প্রশ্ন আর কত লাশ দেখতে চায় এই নির্বাচন কমিশন? এই হত্যাকান্ডের নৈতিক দায় কার? সরকার না নির্বাচন কমিশনের? সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, তৃণমূলের এই নির্বাচনের অতীত ইতিহাস যতই সংঘাত-সংঘর্ষের হোক না কেন-নির্বাচন কমিশনসহ স্থানীয় প্রশাসন একটি নূন্যতম মানসম্পন্ন প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা দেখিয়েছে। এবারে সেটিও গোল্লায় গেছে।

একটি জাতীয় দৈনিকের খবর- খেই হারিয়ে ফেলেছে ইসি। খবরে বলা হয়, ইউপি নির্বাচনের শেষ পর্যায়ে এসে কমিশন খেই হারিয়ে ফেলেছে। প্রার্থী-সমর্থক, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, ভোট গ্রহন কর্মকর্তা-কাউকেই কমিশন নিয়ন্ত্রনে রাখতে পারছে না। যে কারণে আগের চার ধাপের তুলনায় গত ২৮ মে পঞ্চম দফা নির্বাচনে কেন্দ্র দখল, ভোট জালিয়াতি ও সহিংসতার মাত্রা বেড়েছে। দৈনিকটি নির্বাচনে নিয়োজিত কমিশনের মাঠ কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের বরাতে রিপোর্টটি ছেপেছে।

তাহলে, এই খেই হারানো নির্বাচন কমিশন বাকি দু’ধাপের নির্বাচন কি এভাবেই সম্পন্ন করবে? আগামি নির্বাচনে আরো কত আদম সন্তানের লাশ পড়বে? যাদের জন্য নির্বাচন সেই মানুষই খুন হয়ে গেলে নির্বাচন দিয়ে কি হবে? এত হত্যাকান্ডের পর প্রধান নির্বাচন কমিশনার ভাবছেন, প্রার্থীদের মনোজগতের পরিবর্তন না হলে সহিংসতা কমবে না। তিনি দায় এড়িয়ে যাচ্ছেন এভাবে, নির্বাচনে সহিংসতা বেড়েছে, তবে জাল ভোট ও অনিয়ম কমেছে। এর মধ্য দিয়ে স্বয়ং সিইসি কবুল করে নিচ্ছেন যে, এর আগের ধাপগুলোর নির্বাচন ছিল জাল ভোট আর অনিয়মের।

সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে অসীম ক্ষমতাধর প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশনের অসহায়ত্বের প্রমান মেলে সিইসি কাজী রকিব উদ্দিনের উপর্যুক্ত ভাষ্যে! সেজন্য কমিশনকে প্রশ্নগুলি করা উচিত এবং তার জবাবও তাদের কাছে থাকতে হবে। কেন তারা শুরুতেই প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে নিয়ন্ত্রনে নেননি? কেন তারা প্রথম ধাপের সহিংসতার পরে নির্বাচন বন্ধ করে দিয়ে বলতে পারেননি, যখনই উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি হবে তখনই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

২০১৩ সালে পাঁচটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠানে বর্তমান কমিশনের কিছু ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটি থাকলেও মোটামুটি সুষ্ঠ নির্বাচন হওয়ায় আশাবাদ জেগেছিল তারা পারবেন। কিন্তু পরবর্তীকালে ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচন থেকে আজ অবধি অনুষ্ঠিত সকল নির্বাচন দেখে প্রশ্ন জাগছে ২০১৩ সালে তারা নিরপেক্ষতার ভান করেছিলেন কি কারো বিশেষ নির্দেশে? এরপরে প্রয়োজনের সময় তারা খোলস ছেড়ে আবির্ভূত হলেন স্বমহিমায়, সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস হলো। তারা এটি কেন, কার স্বার্থে করলেন?

কমিশন বোধকরি ভুলতে বসেছে, সাংবিধানিক বা বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলি সরকারের নয়, প্রজাতন্ত্রের অংশ। রাষ্ট্রের মূলনীতি রক্ষায় জন্য তারা সংবিধানের কাছে দায়বদ্ধ। কিন্তু দায়বদ্ধতা গিয়ে ঠেকছে সরকারের কাছে। ইউপি নির্বাচন ২০১৬ এর পাঁচ ধাপে অনিয়ম আর প্রাতিষ্ঠানিক অক্ষমতার যে নজির স্থাপিত হোল তা অব্যাহত থাকলে বলতেই হবে যে, আমরা প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের শেষ সীমানায় উপস্থিত হয়েছি। দ্বিধা না রেখেই বলা যায়, প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের এই আওয়াজ এবার তৃণমূলকে আঘাত করেছে বিপুলতর বেগে।

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অতীতে কোনদিন মনোনয়ন বাণিজ্যের কথা শোনা যায়নি। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন বাণিজ্যের ঘটনা আকছার ঘটেছে। দলীয় প্রতীকের নির্বাচনে এবার মনোনয়ন বাণিজ্য বি¯তৃত হয়েছে তৃণমূল পর্যন্ত। নৌকা মার্কা পেলে বিজয় মোটামুটি হাতের নাগালে- এই নিশ্চিন্ততা থেকে ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়ন পেতে লাখ লাখ টাকা খরচ করেছে প্রার্থীরা। বাণিজ্যের ফাঁক গলে ত্যাগী নেতা-কর্মীদের বদলে নৌকা মার্কা পেয়েছে অনেক এলাকায় জামায়াত ও জঙ্গী গোষ্ঠীর নেতারা।

মনোনয়ন বাণিজ্য ইউপি নির্বাচনে সহিংসতার বড় কারণ। অনেক পরীক্ষিত নেতা-কর্মী বাণিজ্যের কারণে মনোনয়ন বঞ্চিত হয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের বিদ্রোহী প্রার্থীর সংখ্যাধিক্য থাকায় সহিংসতা ও খুনের শিকার বেশি হয়েছেন তাদের নেতা-কর্মীরা। দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের হঠাৎ সিদ্ধান্ত, নিয়ন্ত্রনহীনতা এবং অর্থের বিনিময় যোগ্যতার মাপকাঠি হওয়া তৃণমূলে ক্ষমতাসীনদের বেসামাল করে দিলেও এখন সেটি দৃশ্যমান হবে না। ক্ষমতার রাজনীতির এটিই নিয়তি।

পতনের শেষ সীমানা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য সংগ্রামরত বিএনপির জন্য মনোনয়ন বাণিজ্য হয়ে উঠেছে সবচেয়ে আত্মঘাতী। এ নিয়ে বিবাদে জড়িয়ে পড়েছে দলটির শীর্ষ ও মধ্যম পর্যায়ের নেতৃত্ব। ক্ষমতায় থাকাকালে দুর্নীতি ও অর্থপাচারের দায়ে অভিযুক্ত দলটির তৃণমূলে প্রার্থী মনোনয়নে বাণিজ্য তাদেরকে আবার বড় প্রশ্নের মুখোমুখি করে দিয়েছে- আবার ক্ষমতায় গেলে কি হবে! একে তো দলটির নেতা-কর্মীদের মধ্যে বিরাজ করছে হতাশা, অন্যদিকে জাতীয় সম্মেলনের দু’মাস পরেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষিত হয়নি।

বিএনপির ত্যাগী কমীদের অনেকের হতাশা আরো বাড়বে এ কারণে যে ক্ষমতার বাইরে মামলা-হামলা ও দলীয় কোন্দলে অতলে তলিয়ে যাবার উপক্রম একটি দলের কতিপয় নেতারা কি করে মনোনয়ন বাণিজ্যে মেতে ওঠে? কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। তাহলে গণতান্ত্রিক আন্দোলন বা জনস্বার্থের পক্ষে সরকার বিরোধী আন্দোলনে এই দল কি কোন ভূমিকা রাখতে সক্ষম? কর্মীরা তাকিয়ে আছেন একক নেত্রী খালেদা জিয়ার পানে, কি পদক্ষেপ তিনি নেন?

দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুলের ভাষায়, “আমরা কঠিন সময় পার হচ্ছি, অত্যন্ত দুরূহ সময় অতিক্রম করছি। এই সময় যদি আমরা সঠিকভাবে না চলি, এই সময় যদি আমরা ঐক্যবদ্ধ না থাকি, এই সময় যদি আমরা নিজেদের মধ্যে অযথা দলাদলি, কোন্দল সৃষ্টি করি, তাহলে সত্যিকার অর্থে আমরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাব”।

আপাদমস্তক রাজনীতিবিদ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানেন, বিএনপি ধ্বংসস্তুুপ থেকে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টায় রত। সেই সময়ে দলকে ব্যবহার করে বাণিজ্যের পরিনাম কি হতে পারে তাও তার জানা আছে। অর্ধশতাধিক ফৌজদারী মামলায় ভারাক্রান্ত, ভারপ্রাপ্ত থেকে সদ্য পূর্ণ মহাসচিব হিসেবে এও তিনি জানেন, তাদের রাজনৈতিক ব্যর্থতার পরিনাম কি? তার অন্যতম কারণ হচ্ছে, কাউন্সিলের দু’মাস পরেও পূর্ণাঙ্গ কমিটির দেখা পাওয়া যাচ্ছে না। এটি চেয়ারপার্সনের একক কতৃত্ব, কারণ কাউন্সিলই ক্ষমতা তার হাতে তুলে দিয়েছে। ফলে স্থায়ী কমিটির সদস্যদের ক্ষোভ বাড়ছে, কমিটি গঠনে তারা সম্পৃক্ত নন।

ক্ষমতায় থাকলে কোন কিছুতেই কিছু যায় আসে না। যেমনটি আওয়ামী লীগের অন্তর্কলহ, প্রতিটি জেলা-উপজেলার কোন্দলে দলটি কতটা আক্রান্ত সেটি বেরিয়ে পড়বে কখনও বিরোধী দলে গেলে। নয় নয় করে নয় বছর ক্ষমতার বাইরে বিএনপির ক্ষেত্রে এখন দগদগে ক্ষতের মত দেখা দিয়েছে দলীয় কোন্দল, মনোনয়ন বাণিজ্য ও দল গোছানোর দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর প্রক্রিয়া। এজন্যই মির্জা ফখরুল আশংকা করছেন নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবার, যা ত্বরান্বিত করছে বিএনপি নেতৃত্বের অরাজনৈতিক ও ব্যবসাদার অংশটি।

সব সরকারী দল মনে করে, ক্ষমতায় থাকার মাঝেই গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও নিজেদের কল্যাণ নিহিত রয়েছে। আর বিরোধী দলে থাকলে ক্ষমতায় যাওয়াই হয়ে ওঠে একমাত্র লক্ষ্য, সেটি যে কোন প্রকারেই হোক। এইক্ষেত্রে বাংলাদেশের দুই প্রধান দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে অভূতপূর্ব মিল রয়েছে। এজন্য দু’টি দলই ক্ষমতায় যাওয়া বা টিকে থাকার প্রয়োজনে জোট বাধতে পারে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী যুদ্ধাপরাধী দল জামায়াতের সাথে বা স্বৈরাচার এরশাদ ও ধর্মান্ধ যে কোন গোষ্ঠির সাথে।

প্রয়াত জেনারেল জিয়া সামরিক শাসনের আওতায় রাজনীতিকে ডিফিকাল্ট করার কথা বলেছিলেন। মানি ইজ নো প্রবলেম বলে তিনি দেশকে কথিত উন্নয়ন জোয়ারে ভাসিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। তার পূর্বসূরী পাকিস্তান আমলে আইয়ুব খানও একই কাজ করেছিলেন এবং ঘটা করে উন্নয়ন দশক পালন করেছিলেন। বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ধারার অগণতান্ত্রিক রাজনৈতিক নেতৃত্ব মুখে জিয়ার বিরোধিতা করলেও ক্ষমতায় গেলে রাজনীতিকে ডিফিকাল্ট করে তোলার জন্য জিয়ার পথই অনুসরন করেন।

অন্যদিকে ক্ষমতা যাওয়া বা টিকে থাকার জন্য আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এরশাদীয় কৌশল অনুসরন করতে গিয়ে বারবার কথিত স্বৈরাচারের দ্বারস্থ হয়েছেন। দলের ভেতর তো নয়ই, শাসক হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনার কোথাওই তারা ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করতে চায়নি। ব্যক্তি, পরিবার, আত্মীয়তা প্রধান্য পেয়েছে সব স্তরে। সেদিক থেকে এরশাদ সফল। তার অনৈতিক রাজনীতির দুষণ প্রধান রাজনৈতিক দল ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে আক্রান্ত করেছে পরম স্বার্থকতায়।

রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংকটের বড় একটি কারণ হচ্ছে, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করে তোলা। যখনই প্রতিষ্ঠানগুলি কম-বেশি সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে, তখনই অনেক ইতিবাচক অর্জন হয়েছে। মোটামুটি সুষ্ঠ,নিরপেক্ষ নির্বাচন পাওয়া গেছে। প্রশাসনও একটি নির্দিষ্ট মানে পেশাদারিত্ব দেখাতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় থাকতে অবাধ নির্বাচনকে ভয় পায়। ব্যালটের মধ্য দিয়ে জনগনের মতামত প্রকাশ তাদের জন্য সুখকর নয়। সেজন্যই প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির বদলে দলদাস করে রাখতে চায়। এর নেতিবাচক প্রভাবে আক্রান্ত নির্বাচন ব্যবস্থা, সুশাসন ও গণতন্ত্র চর্চা। এই প্রভাবে সবচেয়ে বিপর্যয়কর শিকার জনগন।

 

 

মোদির দুই বছর : সার্বিক অসহিষ্ণুতার উত্থান

এ জি নুরানি

অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ

দুই বছর আগে এই মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন নরেন্দ্র মোদি। সময়ের পরিক্রমায় অনিবার্যভাবেই ঔজ্জ্বল্য কমে যাবে তা ধরে নেওয়ার পরও  বলা যায়, ভারতে তার ভাবমূর্তি এখন কম আকষর্ণীয় ও আগের চেয়ে অনুজ্জ্বল। বিশেষ করে তাকে ‘কাজের লোক’ হিসেবে অভিহিতকারী ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের জন্য এটা বিশেষভাবে সত্য।

ব্যাংকগুলো টালমাটাল অবস্থায় পড়ে গেছে; ঋণ-পরিশোধ – যা তারা কখনো দিত না, নামকা-ওয়াস্তে জবাবদিহিতার মাধ্যমে। রফতানি, শিল্প উৎপাদন ও কৃষি প্রবৃদ্ধিতে যে পতন হয়েছে তারাও নিজেদের কাহিনী বলছে; ঠিক যেভাবে কৃষকদের আত্মহত্যা বৃদ্ধির কথাও বলছেন তারা নিজেরাই। ক্ষমতাসীন বিজেপি উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। মোদি ‘কংগ্রেস-মুক্ত দেশ’ অভিযান শুরু করে এতে বিরোধীদলের সহযোগিতা আশা করছেন। অরুনাচল প্রদেশ ও উত্তরখন্ড নামের দুটি রাজ্যে বিজেপি এর মধ্যেই সবচেয়ে ভয়াবহভাবে এর শিকার হয়েছে।  গত বছর দিল্লি ও বিহারের নির্বাচনে বিজেপি বিপর্যয়ের শিকার হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গ, আসাম,কেরালা, তামিল নাড়– এবং কেন্দ্র শাসিত এলাকা পাদুচেরির (সাবেক ফরাসি উপনিবেশ পন্ডিচেরি) নির্বাচনে মিশ্র ফলাফল হয়েছে। তবে আসামে তারা ভালোই করেছে।

নির্বাচনী প্রচারকালের ভীতিকর বৈশিষ্ট্য ছিল নরেন্দ্র মোদির অভ্যাসগত সস্তা গলাবাজি, যা কোনো প্রধানমন্ত্রীর জন্য বেমানান।

তামিল নাড়–তে তিনি ইতালির সাথে দুর্নীতি-সংশ্লিষ্ট ‘আগস্তাওয়েস্টল্যান্ড’ হেলিকপ্টার চুক্তির কথা বলার সময় সোনিয়া গান্ধীর ইতালিয়ান কানেকশনের কথা বলেছেন, তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন ইউপিএ সরকার অপরাধী এবং কংগ্রেস সভাপতি সোনিয়া গান্ধী এর জন্য দায়ী। একই কায়দায় তিনি সংবাদপত্র, এনজিও, স্বায়াত্তশাসিত সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়কে আক্রমণ করেছেন। ঠিক একই সময় মোদি দুটি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন, যাতে ইঙ্গিত দেয়, তিনি পূর্ণ ক্ষমতা গ্রহণ করতে চান। একজন তার গুজরাট আমল থেকেই তার আস্থায় রয়েছেন। তিনি হলেন অমিত শাহ, তাকে বিজেপির সভাপতি নিযুক্ত করা হয়েছে। তাকে জায়গামতোই বসানো হয়েছে। এল কে আদভানি, মুরলি মনোহর যোশি, যশোবন্ত সিনহাদের মতো বর্ষীয়ানদের নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে রেখেছেন।

অন্য পরিবর্তনটি ছিল মৌলিক প্রকৃতির। প্রধানমন্ত্রীর অফিসটিকে পরিণত করা হয়েছে নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে। এর প্রধান একজন আমলার কাছ থেকে মন্ত্রীদের প্রাথমিক অনুমোদন নিতে হয়।

শপথ গ্রহণের দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে ভারত সরকারের প্রায় ৫০ জন সচিবের সাথে সাক্ষাত করেন মোদি। তার বার্তা ছিল : কোনো বিষয়ে তাদের সাথে মন্ত্রীদের ‘সংঘাত’ সৃষ্টি হলে তারা ‘সমাধানের’ জন্য বিষয়টিকে সাথে সাথে মোদির নজরে আনবেন। এটা প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব বাড়িয়ে দেয়; মন্ত্রীদের ক্ষমতা, কর্তৃত্ব ও মনোবল কমিয়ে দেয়; মন্ত্রীদের প্রতি সংশ্লিষ্ট বেসামরিক কর্মকর্তাদের শ্রদ্ধা হ্রাস করে; এবং সংসদীয়-ব্যবস্থার জন্য ধ্বংস ডেকে আনে।

বৈদেশিক ব্যাপারে মোদির কর্ম-সম্পাদন দক্ষতা বা এর অভাব প্রবলভাবে ফুটে ওঠেছে বিভিন্ন দেশে বিরামহীন সফরের মাধ্যমে এই দিকে নজর আকর্ষণ করার মাধ্যমে। বহুল আলোচিত কাঠমান্ডু সফরের মাধ্যমে তিনি নেপালের সাথে সম্পর্ক ভালোভাবে সূচনা করেছিলেন। পাঁচ মাসের অবরোধ নেপালকে চীনের সমর্থন কামনা করার পথে চালিত করে। ৯ মে ভারত সফরে যাওয়ার কথা ছিল নেপালের প্রেসিডেন্ট বিদ্যা দেবী ভারতির। তিনি এর মাত্র কয়েক দিন আগে সফরটি বাতিল করেন, তিন দিন আগে ভারতে নিযুক্ত নেপালের রাষ্ট্রদূত দিপ কুমার উপাধ্যায়কে ডেকে নেওয়া হয়। শ্রীলঙ্কা আবার চীনের সাথে সুযোগ সুবিধা চাওয়া শুরু করেছে, যেসব বিষয়ে ভারত আপত্তি উত্থাপন করেছিল।

পাকিস্তানের সাথে সম্পর্কের দোলাচল সমর্থকদের পাশাপাশি সমালোচকদেরও হতবুদ্ধি করে দিচ্ছে। মাত্র চার ঘণ্টার নোটিশে রাইউইন্দে প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের বাসায় আকস্মিক সফরের পরপরই এমন বিপর্যয় ঘটে, যা দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্কে প্রায়ই দেখা যায়।

চীনের সাথে সম্পর্ক এখন মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সময়ের চেয়েও খারাপ। সীমান্ত বিতর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি ত্রু টিপূর্ণ। একইভাবে চীনে তার ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘সম্প্রসারণবাদী’ হিসেবে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কে অগ্রগতি অব্যাহত রয়েছে। তবে প্রত্যাশাগত সংঘাত এবং এই সংঘাত পরে সৌহার্দ্যকে আক্রান্ত করতে পারে।

মাত্র একটি দিকেই নীতি পুরোপুরি পরিষ্কার দেখা যায়। সেটা হলো হিন্দুৎভা বা হিন্দুত্ববাদীতা। গত দুই বছরে মুসলিম ও খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে নৃশংসতা বাড়তে দেখা গেছে; গরু জবাইয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে; ঘর ওয়াপিসি (হিন্দুতে ধর্মান্তর) প্রকল্প ও ভিন্নমতকে চেপে ধরাটা ব্যাপকভাবে দেখা গেছে। অসহিষ্ণুতার পরিবেশে বেড়েছে।

পরিস্থিতিটি বিশ্বব্যাপী ধর্মীয় স্বাধীনতা-বিষয়ক মার্কিন কমিশনের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ভালোভাবেই দেখা গেছে। ‘২০১৫ সালে ধর্মীয় সহিষ্ণুতার অবনতি ঘটেছে, ধর্মীয় স্বাধীনতার লঙ্ঘন বেড়েছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বিশেষ করে খ্রিস্টান, মুসলিম ও শিখরা প্রধানত হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের হাতে ভীতি, হয়রানি ও সহিংসতার শিকার হয়েছে বিপুলভাবে। ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সদস্যরা এসব গ্রুপকে নীরবে সমর্থন দিয়েছে এবং উত্তেজনা আরো বাড়াতে ধর্মীয়ভাবে বিভক্ত ভাষা ব্যবহার করেছেন।’

‘এসব বিষয়, এবং সেইসাথে পুলিশের পক্ষপাতিত্ব এবং বিচারিক কার্যক্রমের অপর্যাপ্ততার কারণে পার পেয়ে যাওয়ার ব্যাপক সুযোগের সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলো ক্রমবর্ধমান হারে অনিরাপদ অনুভব করছে, ধর্মীয় উদ্দীপনাপ্রসূত অপরাধের কোনো প্রতিবিধান হচ্ছে না।’ মোদি এসব ঘটনায় অর্থপূর্ণ নীরবতা অবলম্বন করে চলেছেন।

(লেখক মুম্বাইভিত্তিক প্রখ্যাত চিন্তাবিদ, লেখক ও আইনবিদ)

জঙ্গী আছে, জঙ্গী নেই, আইএস আছে, আইএস নেই

শাহাদত হোসেন বাচ্চু::

…আমি এই দেখিলাম সোনার ছবি, আবার দেখি নাইরে, নদীর কূল নাই…। মরমী শিল্পী আব্দুল আলীমের কালজয়ী এই গানটি নিষ্ঠুরভাবে ফিরে এসেছে আজকের বাংলাদেশে। কান পাতুন, চোখ খোলা রাখুন, শুনবেন-দেখবেন, জঙ্গী আছে, জঙ্গী নেই, আইএস আছে, আইএস নেই। আল-কায়েদা আছে, আল-কায়েদা নেই। এসব বিতর্কের কূটচালের মাঝে চাপাতির খুন অব্যাহত রয়েছে। সময়ের সেরা মানুষগুলো একের পর এক খুন হয়ে যাচ্ছে। অসহায় পরিবারগুলো বিচার পাচ্ছে না। রাষ্ট্র-সমাজে ভয়-আতঙ্কের বাত্যাবরণে জঙ্গী থাকা না থাকার কূটতর্ক এখন আন্তর্জাতিকতা লাভ করেছে।

এদেশে জঙ্গীবাদের চাষাবাদ শুরু হয় আফগানিস্তানে তালেবানদের হাতে সোভিয়েতদের পতনের পর। তালেবানদের সাথে যুদ্ধে অংশগ্রহন করা পাঁচ সহস্রাধিক বাংলাদেশী যুবক দেশে ফিরে আসার পর আফগান ষ্টাইলে বিল্পবের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। তখন দেশে সিভিল আদলে সামরিক সরকার। পাকিস্তানী সামরিক শাসক জিয়াউল হকের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা এবং সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার (আইএসআই) প্রত্যক্ষ সহায়তায় তালেবানরা প্রশিক্ষিত হয়েছিল। এরকম প্রশিক্ষিত বাঙালী যুবকরা দেশে ফিরে সে সময়ে ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতাধর অংশের সহায়তা লাভ করতে সমর্থ হয়েছিল।

জঙ্গীবাদ নিয়ে খেলা-ধূলা করা, নিয়ন্ত্রনে রাখা, অঙ্কুরে বিনাশ না করে বেড়ে উঠতে দেয়া- এগুলি রাষ্ট্রকে সামরিকীকরণের পাকিস্তানী কৌশল এবং অবশ্যই বুমেরাং কৌশল। জঙ্গীবাদ যেখানে সামরিক কিংবা বেসামরিক কতৃত্ববাদী শাসকের নিয়ন্ত্রনে বেড়ে উঠেছে, সেখানেই শক্তি সঞ্চয় করেছে। একসময় চলে গেছে নিয়ন্ত্রনের বাইরে। এই ফ্রাঙ্কেনষ্টাইনের দানবকে এখন চাইলেও নিয়ন্ত্রন করা যাচ্ছে না। বিশ্বে পাকিস্তান এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। ষাট দশকে মিলিটারি জান্তা ধর্মের ব্যবহারে যে অপরাজনীতির সূচনা করেছিল তা রাষ্ট্রটিকে এখন গ্রাস করে ফেলেছে।

তালেবান, আল-কায়েদা বা আইএস-এর মতাদর্শ ধারন করে এদেশে জঙ্গীবাদের চাষবাস হয়েছে। তাদের বিকাশের সোনালী সময়টি ছিল ২০০১-০৬ সময়ে যখন তারা সরাসরি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেছে। এরপরে নির্মূল করার অঙ্গীকার নিয়ে ক্ষমতাসীনরা জঙ্গীবাদ জুজু’র ভয় দেখিয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করতে চেয়েছে। পূর্ববর্তী শিক্ষণ বা অভিজ্ঞতা কাজে লাগেনি, যেসব দেশে এই কাজটি করা হয়েছে সেখানে জঙ্গীবাদ ভয়াল আকারে আবির্ভূত হয়ে রাষ্ট্রকে গিলে ফেলতে উদ্যত হয়েছে। এজন্য এখন সবচেয়ে জরুরী প্রশ্নটি হচ্ছে, বাংলাদেশ কি জঙ্গীবাদী খেলা-ধূলার কেন্দ্রবিন্দুতে এসে দাঁড়িয়েছে?

‘‘বাংলাদেশে জঙ্গী আছে, বিএনপি-জামায়াত দেশকে জঙ্গী রাষ্ট্রে পরিনত করতে চায়, আমরা ক্ষমতায় না থাকলে জঙ্গীরা ক্ষমতা দখল করবে’’- সরকারের এসব বক্তব্য কি বুমেরাং হয়ে উঠলো? এই বক্তব্যের বাস্তবতায় আইএস সমন্বয়ক, আল-কায়েদা সমন্বয়ক গ্রেফতারের খবর মিডিয়ায়ও ফলাও করে প্রচার হয়েছে। তখন কি সরকার বোঝেনি আইএস ইস্যুটি কাজে লাগাতে আন্তর্জাতিক বড় বড় কিছু শক্তি মুখিয়ে আছে? হত্যাকান্ডগুলির পর আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী নানা নামে জঙ্গী সংগঠনের কথা বলছে, সরকারের শীর্ষ মহল বিএনপি-জামায়াতকে দায়ী করছে। এভাবে নিজেদের অপকৌশলে কার্যত: জড়াচ্ছে জালে- আইএস আছে কিংবা আইএস নেই।

জঙ্গীবাদ দমন ও বিনাশে সরকারের কোন সমন্বিত কর্মকৌশল আছে? সামাজিক-সাংস্কৃতিকভাবে মোকাবেলার পরিকল্পনা আছে? উল্টো কওমী মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতী ইসলামী নামে রহস্যময় এক সংগঠনের সাথে তাদের বর্তমান সম্পর্ক সকলেই জানে। ফলে জনমনের পারসেপশন হচ্ছে, সরকারের জঙ্গীবাদ দমনের বিষয়টি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এজন্য দেশীয় জঙ্গী সংগঠনগুলির সাথে আন্তর্জাতিক জঙ্গীদের অর্থাৎ আইএস-এর সাথে সম্পর্ক নিয়ে পরিস্থিতি ধোঁয়াশা রয়েছে। এসব নিয়ে ক্ষমতাসীনদের খন্ডিত আলোচনা ও সামগ্রিক বিশ্লেষণ না থাকার সুযোগ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক শক্তি তার কর্মকৌশল বাস্তবায়নে খুবই তৎপর।

সরকার নিশ্চয়ই এগুলি জানছে। তারপরেও চটুল ও হাল্কা বক্তব্য শুনে মনে হতে পারে যে, কূটনৈতিক মোকাবেলার ক্ষেত্রেও সরকার একই পথ বেছে নিয়েছে। হত্যাকান্ড ঘটছে, কথিত আইএস, আল-কায়েদা দায় স্বীকার করছে। সরকার প্রতিটি ক্ষেত্রে না বলছে। সরকারের এই বক্তব্য দেশে-বিদেশে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠছে না। বিশ্ব গণমাধ্যমে খবর হয়ে উঠছে বাংলাদেশের জঙ্গীবাদ। সিঙ্গাপুরে কয়েকজন বাংলাদেশী কর্মী  জঙ্গী হিসেবে সনাক্তের পর জাপান টাইমসসহ গণমাধ্যমগুলো শিরোনাম করেছে, “গভীর সংকটে বাংলাদেশ”।

অবশ্যই প্রশ্ন আসবে সরকার কেন দেশকে এরকম সংকটের মধ্যে নিয়ে গেল? যদিও সরকার কখনও স্বীকার করছে না দেশে কোন সংকট আছে। দাবী করছে সবকিছুই তাদের নিয়ন্ত্রনে। এসব যে দাবী তার মীমাংসা রয়েছে, উন্নয়নকে গণতন্ত্রের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানোর কৌশলের মাঝে। আর কে না জানে, উন্নয়নকে গণতন্ত্রের প্রতিপক্ষ তখনই করা হয়, যখন শাসকদের জনসমর্থন নিঃশেষ হতে থাকে। বিপুল জনসমর্থণ নিয়ে এসে ধরে না রাখতে পারলে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে সব তুরুপের তাস এক এক করে ব্যবহার করতে থাকে।

এখানেও তাই ঘটছে। এজন্য নানাবিধ আতঙ্ক- ছড়িয়ে সুষ্ঠ নির্বাচন নির্বাসনে পাঠিয়ে “উন্নয়ন না গণতন্ত্র”  তত্ত্ব সামনে নিয়ে আসা হয়েছে। তর্কের খাতিরে যদি একমত হওয়া যায় যে, জঙ্গী দমনে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির ক্ষমতায় থাকা প্রয়োজন। কিন্তু এই প্রয়োজনে নির্বাচন ব্যবস্থা, প্রাতিষ্ঠানিকতা ধ্বংস করে আইনের শাসনহীনতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে? লুন্ঠন ও পাচারের স্থায়ী সংস্কৃতি কায়েম করতে হবে? ২০১৪ সালে যদি দেশ থেকে ৭৬ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে থাকে তার তদন্ত হয় না কেন? শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারী, ব্যাংক লুটসহ ইয়াবা পাচারের হোতারা ধরা পড়ে না কেন?  এ কারনেই কী বাঙালীর সবচেয়ে আবেগের জায়গা মুক্তিযুদ্ধ, জঙ্গী-সাম্প্রদায়িকতা দমন ও ধর্মকে নিয়ে একধরনের খেলা চলছে। আর এর শিকার হচ্ছে সেই মানুষগুলো যারা সমাজে বিবেক।

পৃথিবীর বেশকিছু দেশে জঙ্গীবাদ জুজু নামিয়ে সরকার জনগনকে বিভ্রান্তির মধ্যে রেখে স্বাভাবিক রাজনীতি সংকুচিত করে কর্তৃত্ববাদী শাসনে সবকিছু নিয়ন্ত্রনে নেয়ার চেষ্টা হয়েছে। গণতান্ত্রিক রাজনীতির পরিসর সংকুচিত করে ভয়-আতঙ্ক ছড়িয়ে মানুষকে নিরাপত্তাহীন করে ফেলা হচ্ছে। ওইসব দেশে জঙ্গীবাদী প্রবণতা বিস্তৃত হচ্ছে। বাংলাদেশে এরকম একটি পরিস্থিতি চলছে নাকি তৈরী করা হচ্ছে- যা ক্রমশ: ঝুঁকির দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

অতি সা¤প্রতিক ঘটনাক্রমগুলি কিসের ইঙ্গিত দেয়? ২৫ এপ্রিল ২০১৬, নিহত হন সমকামীদের অধিকার বিষয়ক পত্রিকা সম্পাদক ও ইউএসএইড কর্মকর্তা জুলহাস মান্নান, যিনি পূর্বতন রাষ্ট্রদূতের প্রটোকল অফিসার ছিলেন। সাথে নিহত হন তার বন্ধু মাহবুব তনয়। এটি ইসলামী জঙ্গীদের কাজ বলে মনে করা হয়। প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি তার সরকারের তরফে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। সংসদে প্রধানমন্ত্রী এই হত্যাকান্ডকে জামায়াত-বিএনপির কাজ বলে দাবি করেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আইএস বাংলাদেশে ঘাঁটি গাড়তে পারেনি। ২৭ এপ্রিল তৎপর মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশে সন্ত্রাস দমনে সহায়তা করবে যুক্তরাষ্ট্র। একই তারিখ সংসদে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জঙ্গীবাদ নিয়ন্ত্রন সম্ভব হয়েছে। ২৮ এপ্রিল ওয়াশিংটনে মার্কিন উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ্যান্টনী ক্লিনকেন কংগ্রেসের পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটিকে জানান, বাংলাদেশে জঙ্গীবাদের উত্থান ঘটতে পারে। তার ভাষায়, “আইএস এর শেকড় গেড়ে বসার সম্ভাবনা আমাদের ভাবাচ্ছে”।

৩ মে ২০১৬, সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের পুলিশের আইজি জানান, ২০১৩ থেকে তিন বছরে দেশে সংঘটিত ৩৭ টি জঙ্গী হামলায় ৯০% ঘটনার কারণ পুলিশ শনাক্ত করেছে। ৪ মে ২০১৬, বাংলাদেশ সফরে আসেন দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বিশওয়াল। ধারণা করা হয়, বাংলাদেশ পরিস্থিতির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিবিড় দৃষ্টি ও জন কেরির উদ্বেগ থেকে এই ত্বরিত সফর। তার সফরের আগের দিন সিঙ্গাপুরে জঙ্গী সন্দেহে ৮ বাংলাদেশী আটক ও ৫ জনকে দেশে পাঠানোর খবর  মিডিয়ায় প্রচারিত হয়। ৫ মে ২০১৬ জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এই দেশে জঙ্গী সন্ত্রাসবাদের কোন স্থান নেই। জঙ্গী সন্ত্রাসবাদ নিয়ে অনেকেই খেলতে চাইবেন। কিন্তু সেই খেলা আমি খেলতে দেব না”।

১২ মে ঢাকায় আসেন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব এস জয়শঙ্কর। তিনি জানালেন, সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদ দমনে ভারত ও বাংলাদেশ একসাথে কাজ করবে। এজন্য বাংলাদেশ সরকারের সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদ বিরোধী লড়াইয়ে ভারতের জোরালো সমর্থনের কথাও তিনি জানান। বাংলাদেশে সন্ত্রাস দমনে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত একসাথে কাজ করবে- গণমাধ্যমে প্রকাশিত এমন খবরের বিষয় তিনি ঢাকায় এসে জেনেছেন বলে সুশীল সমাজের সাথে বৈঠকে জানান।

এসব ঘটনা প্রবাহের গভীরে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে এবং কেউ কেউ এমনটা বিশ্বাসও করেন, জঙ্গীদের অস্ত্র ও সরঞ্জাম আসছে ক্ষমতাবান দেশগুলো থেকে। আবার জঙ্গী দমনে ক্রয় করা অস্ত্রের সরবরাহকারীও ঐসব দেশ। বিশ্বে সমরাস্ত্র উৎপাদনকারী দেশগুলোর সামরিক বাণিজ্যের নতুন ক্ষেত্র হচ্ছে এশিয়ার বিকাশমান অর্থনীতির দেশগুলি। যুক্তরাষ্ট্র ভারতে যে বিনিয়োগ সম্ভাবনা তৈরী করছে সেখানে বড় ক্ষেত্র হচ্ছে যৌথ উদ্যোগে সমরাস্ত্র উৎপাদন। এই অস্ত্রের বাজার হবে কোন কোন দেশ?

সুইডেনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান “ষ্টকহোম ইন্টান্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনষ্টিটিউট” স¤প্রতি “ট্রেনডস ইন ইন্টারন্যাশনাল আর্মস ট্রান্সফারস ২০১৫” শিরোনামে গবেষণা নিবন্ধ প্রকাশ করেছে। জানা যাচ্ছে ২০০৬-১০ সময়ের তুলনায় ২০১১-১৫ সালের সারা পৃথিবীতে সমরাস্ত্র সরবরাহ ১৪% বেড়েছে। ২০১১-১৫ সালে পৃথিবীর সমরাস্ত্র বাণিজ্যের ৭৪% ছিল যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স, জার্মানীর। এরমধ্যে ৫৮% হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার। এদের নির্মিত অস্ত্রেই চলছে বিশ্বব্যাপী সহিংসতা, জঙ্গীবাদ ও জীবনহানি।

ক্রমশ: বিস্তৃত হচ্ছে সমরাস্ত্র বাণিজ্য এবং যুদ্ধবাজদের দুনিয়া। শুভবুদ্ধি ও মুক্তবুদ্ধির দুনিয়া সংকুচিত হয়ে পড়ছে দেশ-বিদেশে। নানা কিসিমের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্তের মধ্যে দেশকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে কর্তৃত্ববাদী ও একক শাসনে। নিজেদের জালে নিজেরাই আটকা পড়তে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক দুষ্টচক্রে। এ থেকে বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা ক্রমশ: যেন দুর থেকে দুরাগত হয়ে যাচ্ছে!