Home » রাজনীতি

রাজনীতি

একই ঘটনা পুনরায় আর ঘটেনা

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

‘মনুষ্য ধর্ম’হারিয়ে যাচ্ছে। হারাচ্ছে রাজনৈতিক মর্যাদাবোধও। যে ‘রক্তপাতময়তা’ রাজনীতিকে বিভাজিত করেছে, পরস্পরকে ‘নিশ্চিহ্ন’ করার প্ররোচনা দিচ্ছে, তার মূল কারণ হচ্ছে, ন্যূনতম সুষ্ঠ একটি নির্বাচন ব্যবস্থা গড়ে না ওঠা। নির্বাচনের মাধ্যমে জনরায়ের প্রকৃত প্রতিফলনে প্রাতিষ্ঠানিকতা তো দুরের কথা, বিকাশমান কোন পথ তৈরী হয়নি। সবসময়ই ক্ষমতাসীনরা জনরায়কে মেনে নেয়াকে তাদের ‘অক্ষমতা এবং প্রতিপক্ষের ‘প্রতিশোধ’র আশংকায় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বাভাবিকত্বটুকুও আর অবশিষ্ট রাখেনি।

এক. সিইসি নুরুল হুদা আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছেন, ভোট সুষ্ঠ হবে। এর মাঝে ইসি মাহবুব তালুকদার ‘বাগড়া দিলেন একথা বলে যে, নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই। সিইসি জানালেন, ইসি মাহবুব ‘অসত্য’বলেছেন। জবাবে মাহবুব তালুকদার বলেন, একথা বলে সিইসি তার অস্তিত্বে আঘাত করেছেন। এসবের মধ্য দিয়ে নিট রেজাল্ট, নির্বাচন কমিশনের মতবিরোধ এখন প্রকাশ্য। তবে ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক কমিশনের ‘সংখ্যাগরিষ্ঠ’র মতামতই গ্রহনীয় বলে জানালেন। কিন্ত জনগণ উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছেন, পার্লামেন্ট এবং মন্ত্রীসভা বহাল রেখে যে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ আছে বলে দাবি করছেন, তা নিয়ে তাদের মতবিরোধ প্রকাশ্য।

আরও উদ্বেগের যে, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী দাবি করছেন যে, বিএনপি ভূয়া ব্যালট ছাপাচ্ছে। কর্মীদের তিনি কোথায় এবং কোন কোন ছাপাখানায় এসব ব্যালট ছাপানো হচ্ছে, কর্মীদের তিনি তা খুঁজে বের করতে বলেছেন। ভোটের দিন মুজিব কোট পরে ভোটকেন্দ্রে হামলার আশঙ্কা করছেন তিনি। সরকারের সর্বোচ্চ পদাধিকারীর এরকম আশঙ্কা এবং সন্দেহ নিশ্চয়ই তথ্যভিত্তিক। জনগণ এই সন্দেহের ভিত্তির যথার্থতা দেখতে চান – আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় কথিত ভুয়া ব্যালট উদ্ধার এবং জড়িতদের গ্রেপ্তার হওয়ার মধ্য দিয়ে।

দুই. কমজোরি গণতন্ত্র বা কর্তৃত্ববাদী শাসনে নির্বাচন সব দেশে সবকালে ‘যুদ্ধ’ হিসেবে বিবেচিত। এটি আসলে মাও সেতুং এর ভাষায় ‘রক্তপাতময় রাজনীতি’। ফলে এর মধ্যে মানবিকতার কোন স্থান নেই। সব নিয়ম, নীতি-নৈতিকতা ভঙ্গ করে জেতাটা হয়ে দাঁড়ায় একমাত্র লক্ষ্য। আর সেটি যে কোন মূল্যেই। ’ভোটযুদ্ধ’ জয়ের সাথে রাজনৈতিক দলগুলোর অস্তিত্বের প্রশ্নটিও জড়িয়ে যায়। নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন প্রাণঘাতী হয়ে উঠে জয়-পরাজয়ের দিকে হাঁটতে থাকে, অনিবার্য পরিনতি হিসেবে।

সারাদেশে নির্বাচন ক্রমাগত সহিংস রূপ ধারন করতে করতে অবশেষে প্রাণ সংহারী হয়ে উঠে। যারা নির্বাচনের কাজটি পরিচালনা করছেন বা দেখ-ভালের কাজ করছেন, তাদের জন্য চাপ বাড়ছে। সেটা কতটা বোঝার জন্য সবশেষ ঐক্যফ্রন্টের সাথে ইসি’র বৈঠক একটি প্রমান। সিইসি’র সাথে উত্তেজিত বাক-বিতন্ডার এক পর্যায়ে ঐক্যফ্রন্ট নেতৃবৃন্দ আলোচনা থেকে ওয়াক আউট করেন। অব্যবহিত পরে একজন কমিশনারের সংবাদ সম্মেলনে প্রদত্ত বক্তব্য প্রমান করে সুষ্ঠ নির্বাচন বিষয়ে কমিশনেই রয়েছে মতানৈক্য।

শক্তিশালী গণতন্ত্রে কর্তৃত্ববাদের স্থান নেই। ক্ষমতা সেখানে ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত নয়, বিকেন্দ্রীকৃত। সেখানে প্রতিষ্ঠানগুলির নিজস্ব শক্তি থাকে, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা থাকে এবং প্রয়োগটি দেখা যায় দায়িত্ব নির্বিঘ্ন করতে। বিশেষ করে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসমূহের মর্যাদা ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করে। এই প্রতিষ্ঠানিক শক্তি নির্বাচন পরিচালনাকারীদের এক ধরনের সুরক্ষা দেয় এবং গোটা বিষয়টি তারা ’রুলস অব বিজনেস ’ হিসেবে পরিচালনা করে থাকে। ফলে কারো মুখাপেক্ষী থাকতে হয়না।

কিন্তু কমজোরি গণতন্ত্রেও বিভিন্ন দেশে নির্বাচন পরিচালনাকারীরা তাকিয়ে থাকেন শক্তিমান বা ক্ষমতাবান রাজনৈতিক পক্ষগুলোর দিকেই। অহেতুক তারা ক্ষমতাবানদের বিরাগভাজন হতে চান না। গা বাঁচিয়ে  কিভাবে শক্তিমান পক্ষগুলোর পক্ষে নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে আসা যায়, সে কাজটিই পারঙ্গমতার সাথে তারা করে থাকেন। এই জায়গাটিতে তারা দৃষ্টিগ্রাহ্যরকম একপেশে এবং একদেশদর্শী।

বাংলাদেশ এ যাবতকাল পর্যন্ত যতগুলো নির্বাচন হয়েছে, সবগুলোর ক্ষেত্রে নির্বাচন পরিচালনাকারী হিসেবে সাংবিধানিকভাবে দায়িত্ব পালন করেছে নির্বাচন কমিশন। সংবিধান প্রদত্ত অভূতপূর্ব শক্তি এবং ক্ষমতার অধিকারী নির্বাচন কমিশন নিজ দায়িত্ব আজ অবধি স্বাধীনভাবে, সক্ষমতার সাথে পালন করতে পারেনি, বলা যেতে পারে করেনি।

ফলে ’স্বাধীন ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান’ বলে নির্বাচন কমিশনের কথা ফি-বছর জনগন শুনে আসছে। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারের ৫.৩ ধারায় বলা হয়েছিল,”নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচন পদ্ধতির চলমান সংস্কার অব্যাহত থাকবে…”। কিন্তু এটি অধরাই থেকে গেছে। অনেকটাই ’কাজীর গরু খাতায় আছে, গোয়ালে নেই’ বা কখনই ছিল না। ১৯৭৩ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত ১০টি সংসদ নির্বাচনে এটিই জাতি প্রত্যক্ষ করেছে। যে তিনটি নির্বাচনে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছিল, তারাও যেভাবে চেয়েছে কমিশন ঠিক সেভাবেই নির্বাচন পরিচালনা করেছে।

তিন. বর্তমান  নির্বাচন কমিশনও তার বাত্যয় নয়- জনগন এটি বিশ্বাস করেন। এখন পর্যন্ত কমিশনের রোজনামচা দেখে বলতেই হবে, তারা নির্বাচনটি অংশগ্রহনমূলক করতে চাচ্ছেন, কিন্তু সুষ্ঠ নয়। ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের বাইরে যারা শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারেন, এমন প্রার্থীদের ওপর নিয়মিত হামলার ঘটনা ঘটছে। কর্মীদের নামে মামলা ও গ্রেফতার চলছে। সবকিছু দেখে-শুনে, বিবেচনায় নিয়েই কি সিইসি বলেছেন তিনি আদতেই সুষ্ঠ নির্বাচন প্রত্যাশা করেন?

প্রশ্নটি গুঞ্জরিত হতে শুরু করেছে, অচিরেই পল্লবিত হবে। একটি ভাল নির্বাচন না হলে শেষতক কি হবে? দশম সংসদ নির্বাচনে একক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীনতার ওপর ভর করে গত পাঁচ বছরের দাপটে শাসন জনগন প্রত্যক্ষ করেছে। আগামীতেও ’উন্নয়ন জোয়ার’ সচল রাখতে যদি সেরকম ব্যবস্থাই ফিরে আসে, তাহলে আপত্তিই বা কোথায়? এই প্রশ্নের সহজ কোন উত্তর নেই। তবে অভিজ্ঞতা বলছে, অনেক দেশেই গণতান্ত্রিক বিধি-ব্যবস্থায় নির্বাচিত সরকারও কর্তৃত্ববাদী ও স্বৈরাচারী হয়ে উঠেছে।

কিন্তু এতে লাভ কার? নির্বাচন ব্যবস্থা ভঙ্গুর হলে দল বা শাসন ব্যবস্থা-কোথাওই গণতন্ত্র বিকশিত হয়না। ফলে ন্যায্যতা ও আইনের শাসন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। সম্ভবনা তৈরী হয় চরমপন্থা ও অরাজনৈতিক শক্তির উত্থানের। সেজন্য আজকে যে বিষয়টি নিয়ে অনেকেই আনন্দিত এবং উল্লাসিত, সেটি নিকট ভবিষ্যতেই যে নেতিবাচক হয়ে উঠবে না, এমন গ্যারান্টি কে দেবে? মনে রাখতে হবে, একই ঘটনা পুনরায় আর ঘটেনা। কার্ল মার্কস হেগেল’কে উদ্বৃত করতেন এভাবে, ”ইতিহাস পূনরাবৃত্তি ঘটায়। তবে প্রথমটি যদি হয় সত্যি ও সঠিক, তাহলে পরেরটি অবধারিতভাবে কৌতুকপ্রদ’অথবা এর বিপরীত।

 

রাজনৈতিক গণতন্ত্রের সংকট প্রলম্বিত, দ্রুত সমাধান হবে বলে মনে হয়না : ড. তোফায়েল আহমেদ

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংঘাত সহিংসতার কারণে ভোটারদের মধ্যে শঙ্কা ও উদ্বেগের পরিবেশ বিরাজমান এবং ক্রমাগতভাবে এটি বাড়ছে। সামগ্রিক বিবেচনায়  সর্বগ্রাসী অবিশ্বাসের পরিস্থিতি বিদ্যমান রয়েছে। এই পরিবেশ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করযে। এই পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন, নির্বাচন বিশেষজ্ঞ এবং বিট্রানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. তোফায়েল আহমেদ। সাক্ষাতকার নিয়েছেন আমীর খসরু

একক কর্তৃত্ব ও আধিপত্যবিস্তারী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিকাশ

তোফাজ্জেল হোসেন মঞ্জু ::

বাংলাদেশে গত ১০ বছরে কৌশলগত একক কর্তৃত্ব ও  আধিপত্যবিস্তারী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিকাশ ঘটছে – যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সুশাসনকে অধিকতর চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে। কৌশলগত একক কর্তৃত্ব ও  আধিপত্যবিস্তারী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বলতে বুঝাতে চাচ্ছি, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মূল উপাদানগুলিকে এমনভাবে বিন্যাস ও উপকারভোগী করে রাখা যা দীর্ঘমেয়াদে  ক্ষমতায় টিকে থাকার শক্তিশালী সহায়ক হয়। একটু খেয়াল করলে বোঝা যাবে, এই অবস্থায় রাষ্ট্রের আইন, নির্বাহী ও বিচার বিভাগ একই কেন্দ্রের অধীন হয়ে পড়ে। ফলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্য ব্যবস্থা ক্ষয় হতে হতে ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির এই অবনতি ধারা আরো বিস্তৃত হয়েছে দু’ভাবে। এক. টার্গেটেড দমন পীড়ন, দ্বিতীয়. নাগরিকদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ সংকুচিত করে জনগণকে বিরাজনৈতিক করণ প্রক্রিয়ার অংশ করে ফেলা। সংসদ সদস্যদের স্থানীয় রাজনীতি-অর্থনীতি-প্রশাসন কেন্দ্র পরিনত করার মধ্যদিয়ে স্থানীয় সরকার আরো ক্ষমতাহীন হয়ে পড়েছে। এর ফলে জনগণ আরো বেশী সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে বিযুক্ত হয়ে পড়েছে। গত দশ বছরে জনগণ বা নাগরিক সবচেয়ে বেশী ক্ষমতাহীন হয়েছে। বর্তমান শাসকদলের রাজনীতি পূর্বের একদলীয় রাজনীতি থেকে কিছুটা ভিন্ন। শাসকদল আরো কৌশলগতভাবে দ্বিদলীয় ব্যবস্থা রাখতে চাচ্ছে। তারা সিনেমার হিরোদের মত কোন প্রতিযোগিতা বা যুদ্ধে পরাজিত হতে চায় না। পরাজিত হলেও পছন্দ অনুযায়ী পরাজিত হতে চায় । বিরোধী পক্ষ থাকবে দু’ভাবে; এক. জাতীয় পার্টির মতো ‘পোষমানা গৃহপালিত’ দল এবং দুই. বিএনপি ও জামায়তের মতো দমিত -অবরুদ্ধ ভিলেন হিসেবে। বর্তমানে শাসকদল সত্যিকার বিরোধী দল হিসেবে চাচ্ছে ভিলেনদেরকে- বিএনপি, জামায়াতকে। এখন বিরোধী বিএনপি, এই দ্বিদলীয় ব্যবস্থায় ভোটের মাধ্যমে এক নম্বর দল হতে পারবে কি?

শাসকদল জানে বিএনপির এই নির্বাচন খেলায় যথেষ্ট ঝুঁকি আছে। তবু সেই ঝুঁকি মেনে নিয়েছে। একথা মনে রাখতে হবে বিএনপি ২০১৪  সালে ভোটের মাধ্যমে শাসকদলের হাত থেকে ক্ষমতা নেয়া কঠিন মনে করেছিল। কারণ শাসকদলের নয়, তারা নির্বাচন করতে চেয়েছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। শেষ পর্যন্ত বিএনপি রাস্তার আন্দোলন দিয়ে  তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের লক্ষ্য অর্জন করতে  পারেনি। এখানে অনেকে বলেন, বিএনপির তুলনামূলক সুবিধা ভোটযুদ্ধে রাস্তার আন্দোলনে নয়। এটাও সত্য নয় কারণ খালেদা জিয়ার বিএনপি’র উত্থান এরশাদ বিরোধী রাস্তার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। কাজেই বিএনপি আন্দোলনে দূর্বল এই যুক্তিতে ২০১৪-এ রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি, এটা বলা সম্পূর্ণভাবে সঠিক নয়। বিএনপি জোট ২০১৪ আন্দোলন লক্ষ্য অর্জন করতে না পারা  নিয়ে নানা মুনির নানা মত রয়েছে। বিএনপি লক্ষ্য অর্জন না করা ছবির একটা দিক মাত্র, অন্যদিক হচ্ছে শাসকদলের আন্দোলন দমনে ‘‘সফলতা’’। গত ৫ বছর শাসনকে স্বাভাবিক করা মেনে সেবার পরিস্থিতি তৈরী করা। ২০১৪ থেকে ২০১৮ পর্ব বিবেচনায় বর্তমান ভোটযুদ্ধের পটভূমি তৈরী করেছে। এ পর্ব নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে বিস্তর মতভেদ রয়েছে; কেউ কেউ বলেছেন ভারতের কৌশলগত অবস্থান ২০১৪ এর জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানে সহায়তাই শাসকদলকে আন্দোলন দমনে শক্তি ও সাহস যুগিয়েছিল। কেউ কেউ বলেন বিএনপি আন্দোলন কৌশলই জনগণ গ্রহণ করে নাই। অবশ্য বিএনপির পক্ষ থেকে পূর্ণ কোন পর্যালোচনা উপস্থাপন করা হয়নি। তবে বর্তমান পরিস্থিতি উদ্ভবের পিছনে পুরোনো অনেকগুলো রাজনৈতিক পূর্ব অনুমান ভুল প্রমাণিত হয়েছে, এক. ভোটার বিহীন নির্বাচনকে আন্তজার্তিক ও পশ্চিমাদের চাপে পূর্ণ ৫ বছর আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় থাকতে পারবেন- মধ্যবর্তী নির্বাচন দিতে হবে। দ্বিতীয়ঃ শাসক দলের দমন-পীড়ন-দূনীর্তির কারণে বিপুল জনরোষ তৈরী হবে, ক্ষোভে বিক্ষোভে মানুষ রাস্তায় নেমে আসবে; বিএনপির এই অনুমান এটা ভুল প্রমানিত হয়েছে। বিরোধীরা যেভাবে জনপ্রিয়হীনতার কথা বলেন তাও কোন সমীক্ষা দ্বারা প্রমানিত হয়নি। জনপ্রিয়তা বর্তমান সময়ে এখন খুবই অষ্পস্ট ধারণায় পরিনত হয়েছে, এমনকি ভোটের জয় পরাজয় দিয়ে যা প্রমান হয়, তাও যথেষ্ট নয়। তবে একটা কথা বলা যায়, শাসকদল নড়েবড়ে নয় যথেষ্ট শক্তিশালী- একক কর্তৃত্ব ও  আধিপত্যবিস্তারী ভূমিকার জন্য। বাংলাদেশে প্রথাগত রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য শক্তিশালী রাজনৈতিক দল ও শাসকের পিছনে জনগণ জড়ো হওয়ার প্রবণতা রয়েছে। এ শক্তির পরিচয় অন্তত তিনটি বিচার প্রক্রিয়া সমাপ্ত করে দিয়েছে। প্রথমতঃ ১৫ ই আগষ্ট হত্যাকান্ডের বিচার, দ্বিতীয়তঃ যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়া, তৃতীয়তঃ ২১ আগষ্টের বিচার প্রক্রিয়া। এ তিনটি বিচার শাসকদলের রাজনৈতিক স্কোর কার্ডকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। অন্যদিকে বিএনপির সমর্থনের অন্যতম কারণ হতে পারে ক্ষমতাসীনদের ব্যপারে ক্ষমতাসীনতার ক্রমাগত অসুন্তষ্টি । তবে একটা বিষয় ষ্পষ্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন ও ক্ষমতা বদল এখন সরল-রৈখিক নয়, পূর্বের অনেক নির্দেশক এখন অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি হলেই সরকারের জনপ্রিয়তায় ধস নামবে সেরকম পরিস্থিতি নাই। রাজনৈতিক প্যারাডাইম সিফট হয়েছে। আর সেটা হয়েছে একক কর্তৃত্ব ও  আধিপত্যবিস্তারী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার উন্মোচনের মধ্য দিয়ে, যদিও রাষ্ট্রের মধ্যেই সবসময় আধিপত্যবিস্তারী ক্ষমতা থাকে। বর্তমান শাসকদল সেই ক্ষমতাকে জাগিয়ে তুলছে এবং দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করছে। গত ১০ বছরে রাজনৈতিক প্যারাডাইম সিফট পরির্তনের কথা বিস্তারিত আলোচনার দাবী রাখে।

দলীয় বিবেচনায় ‘বসন্তের কোকিল’ও নির্বাচনে পর্যবেক্ষক হয়ে যায় : ড. বদিউল আলম মজুমদার

নির্ধারিত সময়ে ভিসা না দেয়াসহ ভিসা সংক্রান্ত জটিলতা এবং অন্যান্য কারণে এই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিদেশী পর্যবেক্ষকদের সংখ্যা ২০০৮ ও ২০০১ সালের নির্বাচনের চাইতে অনেক কম হবে। ২০০৮ সালে বিদেশ থেকে আগত এবং বিদেশী সংস্থার ৫৯৩ জন; ২০০১ সালে ২২৫ জন বিদেশী পর্যবেক্ষক নির্বাচন পর্যবেক্ষন করেছিলেন। এই বছরে এ সংখ্যা শতাধিক হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। দেশী পর্যবেক্ষকদের সংখ্যাও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অনেক কম হবে। এনজিওব্যুরোর প্রক্রিয়াগত ধীরগতি এবং নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে কম সংখ্যক দেশী পর্যবেক্ষককে অনুমতি দেয়ায় এ নির্বাচনে ২৫ হাজার ৯২০ জন দেশী পর্যবেক্ষক অনুমতি পেয়েছেন। সাড়ে আট হাজার পর্যবেক্ষনে ইচ্ছুককে অনুমতি দেয়া হয়নি। অনুমতি দেয়া হয়নি কিছু কিছু দেশী সংগঠনকেও। ২৫ হাজারের মধ্যে দেশী পর্যবেক্ষকদের সংগঠন ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপের ১৫ হাজার জনকে অনুমতি দেয়া হয়েছে। ২০০১ সালে দেশী পর্যবেক্ষকদের সংখ্যা ছিল ২ লাখ ১৮ হাজার এবং ২০০৮ সালে ছিল ১ লাখ ৫৯ হাজার। অর্থাৎ নির্বাচনে কম সংখ্যায় বিদেশী ও দেশী পর্যবেক্ষক নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করবেন। ইতোমধ্যে দীর্ঘদিনের নির্বাচন পর্যবেক্ষককে সংস্থা ব্রতীর প্রধান নির্বাহী শারমিন মুরশিদ বলেছেন, এবার নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের তালিকাভুক্ত করতে গিয়ে নির্বাচন কমিশন অভিজ্ঞ বেশ কছু পর্যবেক্ষকদের বাদ দিয়েছে। অন্যদিকে বেশ কিছু নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা সংযুক্ত হয়েছে যাদেরকে সত্যি বলতে আমরা চিনি না।  দেশী ও বিদেশী পর্যবেক্ষকদের সংখ্যা কম হলে অবাধ, সুষ্ঠু ও অর্থবহ নির্বাচন অনুষ্ঠানের উপরে এর কোনো প্রভাব পড়বে কিনাসহ সে সব বিষয়ে আলোচনা করেছেন নাগরিক সংগঠন সুশাসনের জন্য নাগরিক বা সুজন-এর প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার। সাক্ষাতকারটি নিয়েছেন আমীর খসরু।

‘অনিশ্চয়তা, ভয়ভীতি সহিংসতার বিরুদ্ধে জনগণের শক্তি গড়ে উঠুক’

নির্বাচনে জনগণের ঢল নামুক । ভোটকেন্দ্র হোক ভোটারের

নাগরিকদের পক্ষে আমরা নামে একটি নাগরিক সংগঠনের সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্য-

গণতান্ত্রিক সমাজ এবং জবাবদিহিতামূলক রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার অন্যতম পূর্বশর্ত হলো সুষ্ঠু নির্বাচন। বিশ্বের বহুদেশে শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলেও বাংলাদেশে তা এখনও একটি প্রায় অসম্ভব প্রত্যাশা। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘনিয়ে আসছে, কিন্তু আসন্ন নির্বাচন কেমন হবে, আদৌ শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হবে কিনা কিংবা তা সুষ্ঠু ও অবাধ হবে কিনাজনমনে তা নিয়ে বিরাজ করছে প্রবল সংশয় এবং অবিশ্বাস। উৎসবের পরিবর্তে আতঙ্ক আর উদ্বেগ ঘিরে রেখেছে মানুষকে।

২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচনের মধ্যদিয়ে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসীন হয়েছিল। এর আগেও বাংলাদেশ এরকম ভোটারবিহীন অগ্রহণযোগ্য নির্বাচন দেখেছে আরও দুবার: ১৯৮৮ সালে, এরশাদ শাসনামলে এবং ১৯৯৬ সালে বিএনপি আমলে। তবে পার্থক্য হলো এই যে, ১৯৮৮ ও ১৯৯৬ এর (১৫ই ফেব্রুয়ারি) নির্বাচনে নির্বাচিত সংসদ ক্ষণস্থায়ী হলেও বর্তমান সংসদ তার মেয়াদ পূর্ণ করেছে।

নানা প্রতিকূলতা এবং অনিশ্চয়তার মধ্যেও সকল দল এবারের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করবার পথে একটি ভালো খবর। কিন্তু নির্বাচনী প্রচার শুরু হবার পর থেকে প্রায় প্রতিদিনই ক্ষমতাসীন দল ও জোটের বাইরে বিভিন্ন দল ও জোটের প্রার্থীরা হামলা, মামলা ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন। নিকট অতীতে নাগরিকের মতপ্রকাশের অধিকারকে হরণ করা হয়েছে, ভিন্নমতের কণ্ঠ রোধ করা হয়েছে, মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে দমন করা হয়েছে, জনগণের ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় আড়িপাতা হয়েছে এবং প্রোপাগান্ডার ঢংয়ে তাকে মিডিয়াতে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে, মতপ্রকাশ ও স্বাধীন সাংবাদিকতার পথ রুদ্ধ করবার জন্য ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ বিভিন্ন আইনী ও বেআইনী পথ গ্রহণ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে ভয়ের শাসন। ক্ষেত্রবিশেষে এমন দমনপীড়নের নজির কুখ্যাত সামরিক শাসনামলেও বাংলাদেশে কমই দেখা গেছে। যখন একটা সমাজে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা একরকম হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে, তখনই আমরা উপলব্ধি করি, কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা জারি থাকাটা কতোটা মূল্যবান। এইরকম একটা পরিস্থিতিতে আমরা নির্বাচনের জন্য অপেক্ষা করছি।

আমরা জানি যে, নির্বাচনের মধ্য দিয়ে কেবল ক্ষমতার পালাবদল সম্পন্ন হলেই তাতে জনগণের সত্যিকারের মুক্তি আসবে এমন নয়। নব্বইয়ের গণআন্দোলন পরবর্তী বাংলাদেশ তার সাক্ষী হয়ে আছে। চোরাই টাকা, পেশী শক্তি আর মাস্তানতন্ত্রের কাছে, দেশি বিদেশি লুটেরা শক্তির কাছে নতজানু দলের শাসন তথা রাজনীতির দুর্বৃত্তায়নের অবসান যতদিন না ঘটবে, ততদিন জনগণের প্রান্তিক অবস্থার কোনো বদল হবেনা। সে অর্থে আসন্ন নির্বাচন আমাদের জন্য আশু কোনো সুদিনের বার্তা বয়ে আনবে এতোটা প্রত্যাশা করবার কোনো কারণ নেই। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে জবাবদিহিতার উর্ধ্বে থাকা, জনমতের তোয়াক্কা না করা রাজনীতিবিদরা অন্তত একবার জনগণের সামনে এসে দাঁড়াক সেটা এই মূহুর্তে দেশের সকল মানুষের ন্যূনতম চাওয়া।

একথা সত্য যে, একটানা একদলের শাসনের অধীনে থাকতে থাকতে, দমনপীড়ন ও ভয়ের রাজত্বে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে গিয়ে জনমানুষের আশাবাদের জায়গাটা ক্রমশঃ সঙ্কুচিত হয়েছে। সরকার মুখে যা-ই বলুক না কেন, জনগণের একটা বড় অংশের মধ্যে এই অবিশ্বাস খুঁটি গেঁড়ে বসেছে যে নির্বাচনটি সরকারের সাজানো ছক অনুযায়ী-ই হবে। তাঁরা এও আশঙ্কা করেন যে, এই সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত নানা নির্বাচনের মতো এখানেও তাঁদের ভোটটি অন্য কেউ দিয়ে দেবে। নির্বাচনের দিন যতোই ঘনিয়ে আসছে এইসব আশঙ্কা ক্রমশঃ জোরদার হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, ভূমিকা, সরকারের মন্ত্রী, দলীয় নেতাদের কথাবার্তা অনিশ্চয়তার বাতাবরণকে লঘু করেনা, বরং ভীতি আরো বাড়ে। মিডিয়াতে খবর এলো যে প্রধানমন্ত্রী রিটার্নিং অফিসারদেরকে ডেকে কথা বলেছেন। টেলিভিশনে ‘উন্নয়ন’ কার্যক্রমের বিজ্ঞাপন প্রচারিত হচ্ছে সকাল-বিকাল। অন্যদিকে সরকারী দল/জোটের বাইরে বিভিন্নপ্রার্থীর প্রচারকাজে পুলিশ ও সন্ত্রাসীদের বাধা, হামলা, ভয়ভীতি প্রদর্শনের খবর পাচ্ছি, পোস্টার ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে, ফেস্টুনে আগুন দেয়া হয়েছে। নির্বাচনী প্রচার শুরুর মুখেই সংঘটিত সহিংসতায় প্রাণহানীর খবরে আমরা যুগপৎ শঙ্কিত এবং মর্মাহত হয়েছি। এসবকিছু দেখে শুনে এই ধারণাই মানুষের মনে পোক্ত হয় যে নির্বাচন কমিশন সংবিধানের কাছে নয় সরকারের কাছেই অধিকতর দায়বদ্ধ; কমিশনাররা স্বাধীনভাবে কাজ না করে অনেকক্ষেত্রেই ক্ষমতাসীনদের আজ্ঞাবাহীর মতো আচরণ করছেন। এমন পরিস্থিতিতে মানুষ সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যাপারে সন্দিহান হবে, এটাই স্বাভাবিক। বিরাজমান বাস্তবতায় এটা মনে করবার যথেষ্ট কারণ আছে যে নির্বাচনে প্রতিদ্ব›দ্বীদলগুলোর জন্য ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরির কথাটা একটা ফাঁকাবুলিতে পর্যবসিত হয়েছে।

এমতাবস্থায় বাংলাদেশের নাগরিকদের পক্ষ থেকে আমরা কিছু জরুরি দাবি সুস্পষ্টভাবে উপস্থিত করা দায়িত্ব বলে মনে করছি। এগুলো হলো :-

১.       নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচন আয়োজনের অবশিষ্ট সময়টুকুতে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে; নির্বাচনের কাজে সম্পৃক্ত প্রশাসন যাতে করে নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে;

২.       স্বাধীনভাবে দেশি এবং বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকদের যথাযথ ভূমিকা পালন করতে দিতে হবে;

৩.       হামলা, মামলা, ভয়ভীতি প্রদর্শন, সহিংসতা বন্ধ করতে হবে। এসবে জড়িত ব্যক্তি/গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সক্রিয় ব্যবস্থা নিতে হবে। অবিলম্বে হয়রানিমূলক মামলা দায়ের ও ধরপাকড় বন্ধ করতে হবে, হয়রানিমূলক মামলায় গ্রেফতারকৃতদের এই মুহূর্তে মুক্তি দিতে হবে;

৪.       সকল প্রকার যোগাযোগে বাধা সৃষ্টির বদলে তাকে উন্মুক্ত করে দিতে হবে; এবং

৫.       নির্বাচন কেন্দ্র করে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু এবং প্রান্তিকজনগোষ্ঠীর মানুষদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে; তাদেরকে ভয়-ভীতি প্রদর্শনকারী এবং তাদের ওপরে হামলাকারীদেরকে তাৎক্ষণিকভাবে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।

আমরা মনে করি অন্তত এই ব্যবস্থাগুলো নেয়া গেলেই কেবল গুজব, ধোঁয়াশা কিংবা ষড়যন্ত্রের সম্ভাবনাকে নির্মূল করা সম্ভব হবে। আমরা আশা করি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের লক্ষ্যে কমিশন এবং সরকার এই পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করবে।

সরকার বরাবরই দাবি করেছেন তাঁদের নেতৃত্বে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। বিরোধীরা দাবি করেছেন বর্তমান সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। তাই সরকারের দাবি প্রতিষ্ঠার জন্য সরকার ও তার সমর্থকদের দায়িত্ব ভয়মুক্ত পরিবেশে মানুষ যাতে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

জনগণ দীর্ঘদিন পরে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেয়েছেন। শঙ্কা আছে, আছে অনিশ্চয়তা, কিন্তু আপনার আমার মতো সকল নাগরিকের কর্তব্য হলো সকল শঙ্কাকে দূরে সরিয়ে ভোটকেন্দ্রে হাজির হওয়া। চোরাই টাকা এবং পেশী শক্তির দাপট, ব্যক্তি, পরিবার এবং গোষ্ঠীতন্ত্রের করাল থাবা থেকে আমরা যদি আগামীর বাংলাদেশকে রক্ষা করতে চাই, যদি আমরা রাষ্ট্রের তথা জনগণের প্রতিষ্ঠানগুলোকে দল/গোষ্ঠীর হাত থেকে অবমুক্ত করে জনতার কাছে ফিরিয়ে দিতে চাই, তাহলে এই নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করা বাদে অন্য কোনো বিকল্প এই মুহূর্তে আমাদের হাতে নেই। আমাদের প্রতিজ্ঞা হোক: আমার ভোট আমিই দেবো, জনবিরোধী লুটেরা এবং রাজনৈতিক দুর্বৃত্তদের হাতে আমরা আমাদের আকাঙ্খার বাংলাদেশকে তুলে দেবো না।

আগামী ৩০শে ডিসেম্বরযেমন সরকার ও সকল দলের পরীক্ষা, তেমনি জনগণের জন্যও পরীক্ষা। সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে  না পারলে বাংলাদেশ এক মহাবিপর্যয়ে পতিত হবে। সরকার ও নির্বাচন কমিশন যথাযথ দায়িত্ব পালন করুক। আর ভোটকেন্দ্রগুলোতে জনতার ঢল নামুক; জনগণের শক্তিতেই বাংলাদেশ রক্ষা পাক, ভোটের অতন্দ্রপ্রহরী হয়ে জনগণ সকল শঙ্কা, অনিশ্চয়তা ও সহিংসতা থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করুক। এই চরম অনিশ্চয়তাকালে দেশবাসীর কাছে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

নাগরিকদের পক্ষে আমরা’র পক্ষে- অধ্যাপক আহমেদ কামাল, অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, শাহদীন মালিক, শহিদুল আলম,  অধ্যাপক গীতিআরা নাসরীন, নূরুল কবীর, শিরীন হক, অধ্যাপক সি আর আবরার, অধ্যাপক সাঈদ ফেরদৌস, ব্যারিস্টার সারা হোসেন, ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া, অমল আকাশ, জাকির হোসেন, অধ্যাপক মির্জা তাসলিমা সুলতানা, তাসলিমা আক্তার, পার্সা সাঞ্জানা সাজিদ, শহিদুল ইসলাম সবুজ, কামরুল হাসান, কৃষ্ণকলি ইসলাম, নাসরিন সিরাজ অ্যানি, বীথি ঘোষ, ড. রুশাদ ফরিদী, মেহজাবীন রহমান নাভা,  ড. সামিনা লুৎফা, ড. মোঃ তাঞ্জীমউদ্দিন খান , মাহতাব উদ্দিন আহমেদ, সায়দিয়া গুলরুখ, অরূপ রাহী, রায়হান রাইন, পারভীন জলি, বাকী বিল্লাহ, লাকী আক্তার, ওমর তারেক চৌধুরী, রেহনুমা আহমেদ।

নির্বাচন কমিশন নিজেই পাথরের মূর্তির ভূমিকা গ্রহণ করেছে : ড. ইফতেখারুজ্জামান

একটি অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে সব দলের সমান সুযোগ প্রাপ্তির পরিবেশ সৃষ্টি এবং সামগ্রিকভাবে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে নির্বাচন কমিশন ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ বা টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। আমাদের বুধবার-কে দেয়া এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেছেন, বর্তমান নির্বাচন কমিশন যে কোনো সময়ের তুলনায় বেশি বিতর্কিত। তিনি প্রশাসন ও আইন-শৃংখলা রক্ষাবাহিনীর যথাযথ ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। ড. ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, ক্ষমতাসীনদের বাইরের রাজনৈতিক দল এবং পক্ষগুলো নির্বাচনের মাঠে কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছে। সামগ্রিক পরিস্থিতিতে মানুষের মধ্যে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে যে প্রত্যাশা ছিল -তা পূরণ নিয়ে সংশয়-সন্দেহ দেখা দিয়েছে বলেও মন্তব্য করেন ড. ইফতেখারুজ্জামান। আমাদের বুধবার-এর পক্ষ থেকে সাক্ষাতকার নিয়েছেন আমীর খসরু

ভোটটি দিতে পারা না পারার শঙ্কা-উদ্বেগ

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

মাও সে তুং যেমনটি বলেছিলেন-“যুদ্ধ হচ্ছে রক্তপাতময় রাজনীতি, আর রাজনীতি হচ্ছে রক্তপাতহীন যুদ্ধ”– সে বিবেচনায় গত সাতচল্লিশ বছরই কী কাটলো যুদ্ধের মধ্যে? কারন কি এই যে, গণতান্ত্রিক চরিত্র হারিয়ে ফেললে রাষ্ট্রের চালিকাশক্তি রাজনীতি আর নাগরিকদের মিত্র থাকে না? বিশেষ করে দুর্বল নাগরিকদের সাথে তার সম্পর্কটা হয়ে দাঁড়ায় সরাসরি শত্রুতার। সেজন্যই রাজনীতিতে কেবল অভিগম্যতা সেই সব নাগরিকদের বা পরিবারের, যারা সবল অর্থে-বিত্তে ও বংশ মর্যাদায়। দুর্বলরা কেবলই রক্তপাতময়তার বলি।

এক. বিজয়ের মাস এবং শীতের আমেজ- সব ছাপিয়ে উঠেছে একাদশ সংসদ নির্বাচন। সর্বত্র আলোচনার বিষয় এখন একটি। খানিকটা আশা-আশঙ্কা অথবা নিস্পৃহতার দোলাচল। নির্বাচন হবে? হলে সুষ্ঠ হবে? জনমনে এই গুঞ্জরণ ও ইতস্তত: বিক্ষিপ্ত আলোচনা ক্রমশ আকার নিচ্ছে। কারন হচ্ছে, অতীত তিক্ত এবং রক্তাক্ত অভিজ্ঞতা। সাতচল্লিশ বয়সী বাংলাদেশের রাজনীতি, নির্বাচন দু’একটি ব্যতিক্রম বাদে সারাটা কাল জুড়ে ছিল রক্তপাতময়-সহিংস এবং নিয়ন্ত্রিত।

জনগনের অভিজ্ঞতা বলছে, কোন একটি রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় যখন জাতীয় নির্বাচন হয়, এই দেশে অমন নির্বাচন কখনই সুষ্ঠ হয় না। অতীতে কখনও হয়নি। সামরিক সরকারগুলোর আমলে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলি ছিল চরম প্রহসন ও সামরিক স্বৈরাচারের অবৈধ ক্ষমতা দখলকে জায়েজ করার মহড়া। ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে নিশ্চিত বিজয়ের মুখে আওয়ামী লীগ খন্দকার মোশতাকসহ কয়েকজন নেতাকে জেতাতে নিজেরাই নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলে, যার ছিল সূদুরপ্রসারী প্রতিক্রিয়া।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়ন পত্র দাখিল থেকে শুরু করে প্রচারনাকালে ইতিমধ্যে খুন হয়েছে অনধিক ১০ জন। কোন দলের সেটি বড় প্রশ্ন নয়, তারা সবাই আদম সন্তান, কারো বাবা, কারো স্বামী। এই হানাহানির মূল কারন হচ্ছে, নির্বাচনী মাঠটি মোটেই সমতল নয়। ক্ষমতাসীন দলের জন্য যতটা মসৃন, বিরোধী দলের জন্য ততটাই এবড়ো-থেবড়ো। এজন্য বড় দুই দল বা জোটের প্রার্থীরা নির্বাচনী প্রচারে নেমেই হয় প্রতিপক্ষের হামলার শিকার হচ্ছেন না হয় হামলা করছেন, ক্রমশ: হয়ে উঠছেন সহিংস।

হামলায় শিকার হওয়ার ক্ষেত্রে বিরোধী প্রার্থী- সমর্থকরা এগিয়ে। তাই বলে ক্ষমতাসীনরা এর শিকার হচ্ছেন তা কিন্তু নয়। মোট কথা একটি সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে দেশজুড়ে। জাতীয় সংসদ বহাল, এমপি পদে বহাল থেকে এক দলের প্রার্থীরা নির্বাচন করছেন, অন্যদিকে রয়েছেন মামলার বোঝায় ন্যূব্জ ও তাড়া খাওয়া প্রার্থীরা। তাদের জন্য মাঠটি অবতল। যেমনটি ঘটেছে গত বুধবার, নির্বাচনী প্রচারকালে একজন প্রার্থীকে পূর্বাপর মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে। এই সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি অব্যাহত থাকছে।

দুই. এহেন পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশন ‘বিব্রত’ ও ‘মর্মাহত’। খোদ সিইসি সেটি প্রকাশ করেছেন। বোঝাই যাচ্ছে, কোথায় গিয়ে ঠেকলে তাঁকে ‘বিব্রত’ ও ‘মর্মাহত’ হতে হচ্ছে। এর আগে আমরা আদালতকে ‘বিব্রত’ হতে দেখেছি। সেক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতি ব্যবস্থা নিয়ে থাকেন, মামলাটি অন্য আদালতে স্থানান্তর করে। কিন্তু সিইসি’র ‘বিব্রত’ হওয়া নিয়ে কি হবে? তিনি শুধু ‘বিব্রত’ হয়েই থাকবেন নাকি রেফারীর ভূমিকায় শক্ত অবস্থান নিয়ে ‘হলুদ কার্ড’ এবং ‘লাল কার্ড’ ব্যবহার করা শুরু করবেন? অথবা বিব্রত হবেন এবং নিরপেক্ষতার নামে পক্ষাবলম্বন করবেন? তাদের এই সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে নির্বাচনী পরিবেশ এবং সুষ্ঠ নির্বাচন।

নির্বাচনী মাঠ সমতল হবে- সে সম্ভাবনা প্রায় নেই। রাষ্ট্রীয় মেশিনারিজ সরকারের অনুকূলেই থাকবে-জনমনের এই ধারনা কমিশন দুর করতে সক্ষম হবেন কী ? সম্ভাবনা ক্ষীণ। নির্বাচন কমিশন সংবিধান প্রদত্ত নিরঙ্কুশ ক্ষমতাবলে সুষ্ঠ নির্বাচন অনুষ্ঠানে কতটা সাহসী হতে পারবেন, সেটি দেখার জন্যও কি হাতে সময় আছে? বিগত ইউপি নির্বাচনে দেশ দেখেছে হত্যাকান্ড, সন্ত্রাস ও লাগামহীন জাল ভোট। তার আগের উপজেলা নির্বাচন ! সাম্প্রতিককালে অনুষ্ঠিত সিটি নির্বাচন নিয়েও অভিযোগ রয়েছে।

নির্বাচন কমিশনকে এসব বিষয়ে কার্যকর কোন ব্যবস্থা নিতে জনগন কখনই দেখেনি। এমনকি সক্রিয় হতেও না। বরং ধামাচাপা দিতে অতীতকালের ধারাবাহিক রেকর্ডটি বাজিয়েছে-“দু’একটি ঘটনা বাদে নির্বাচন মোটামুটি অবাধ, সুষ্ঠ ও গ্রহনযোগ্য হয়েছে”। মাত্র ক’দিন আগে অনুষ্ঠিত সিটি কর্পোরেশনসমূহের নির্বাচন নিয়ে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়টিও ধামাচাপা দেয়া হয়েছে পুরোনো কায়দাই। এর ফলে সাধারন ভোটাররা সবচেয়ে বেশি আশঙ্কিত এটা ভেবে যে,  তার ভোটটি দিতে পারবেন তো ?

এবারের জাতীয় নির্বাচনের শুরুতেই অন্য সব নির্বাচনের চেয়ে আরেকরকম সাংঘর্ষিক অবস্থা বিরাজমান ছিল। অন্যদলের চেয়ে নিজ দলের ভেতরকার সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা ছিল বেশি। সেটি দুই বড় দলের মনোনয়ন বঞ্চিতদের মধ্যে ঘটেছে এবং নিহত হয়েছে আধা ডজন দলীয় নেতা-কর্মী। একটি দলের চেয়ারপার্সনের অফিস ভাংচুর হয়েছে। নেতা-কর্মীরা অবরুদ্ধ করেছে দলের মহাসচিবকে। এলাকায় কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে দেয়া প্রার্থীকে ঘোষণা করেছে অবাঞ্ছিত। এসবই নির্বাচনী শঙ্কায় যোগ করছে নতুন মাত্রা।

দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন, দেশী পর্যবেক্ষকদের বিষয়ে আস্থাহীনতা এবং কমিশনের প্রতি ধোঁয়াশা- অদ্ভুত এক পরিস্থিতি তৈরী করছে। জনগনের বিশ্বাস প্রায় উঠে যাচ্ছে যে, নির্বাচন সুষ্ঠ হবে। দেখে-শুনে এই দেশের জনগনের মধ্যে অদ্ভুত একটি ধারনা গড়ে উঠছে যে, সেনাবাহিনী মাঠে থাকলে এবং বিদেশীরা নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করলে নির্বাচন সুষ্ঠ হয়! মনে করা হয়, তারা কারো প্রতি পক্ষপাত করে না। কিন্ত সেনাসদস্যদের মাঠে নামানোর তারিখ ১৫’র বদলে ২৪ ডিসেম্বর পেছানোয় জনমনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ।

ক্ষমতায় থেকে গড়ে-বেড়ে ওঠা বিএনপি কম-বেশি একযুগ ক্ষমতার বাইরে। দমন-পীড়নে পিষ্ট। দলীয় চেয়ারপারসন দন্ডিত হয়ে জেলে। তার ডেপুটি ও পুত্রও দন্ডিত এবং বিদেশে অবস্থানরত। তাদের এমত প্রতীতি রয়েছে যে, টানা দশ বছর ক্ষমতায় থেকে আওয়ামী লীগ জনবিচ্ছিন্ন। তাদের বিপক্ষে নেতিবাচক ভোটে তারা জিতে যাবেন। এটি ধরে নিয়ে নেতা-কর্মীরা চাঙ্গা। এজন্যই, তাদের ভাষায় সুষ্ঠ নির্বাচনের জন্য তারা মরিয়া। এই মরিয়া ভাব বজায় রেখে তারা কি কৌশল নেবেন, সেটিও দেখার বিষয়।

আইন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, সব দলের ন্যায্যতা ও সুষ্ঠ নির্বাচন নিশ্চিত করতে সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে নির্বাচন করা হচ্ছে সংবিধানিক প্রথা। সংসদীয় গণতন্ত্রে সব দেশে এটি করা হয় না ঠিক, কিন্তু ওয়েষ্ট মিনিষ্টার ধাঁচের গণতন্ত্রে এটি প্রথা ও পালনীয় হিসেবে স্বীকৃত। দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ন্যায্য প্রতিযোগিতার জন্য সংসদ ভেঙ্গে দেয়াটাই ‘সঠিক অভ্যাস’ বলে মনে করা হয়। যে যাই বলুক, এখানে সংসদ ও মন্ত্রীসভা বহাল রয়েছে- তার সুবিধা ক্ষমতাসীনদের পক্ষেই যাবে।

জনমনে যে বিষয়গুলি হামেশাই ঘুরে-ফিরে আসছে তা হচ্ছে, বেসামরিক প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী পক্ষ নেবে। আবার দু’চারজন বিশ্বাস করছেন, প্রধানমন্ত্রী যেহেতু বলেছেন নির্বাাচন হবে অবাধ, সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ। সেজন্য অন্তিমে একটি ভাল নির্বাচন দেখা যাবে। সাম্প্রতিক নজিরগুলো এই বক্তব্যের পক্ষে যায় না। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে সন্ত্রাস ও দখলবাজির এন্তার অভিযোগ রয়েছে। বিরোধী দলের এজেন্টদের বাড়ি তল্লাশিসহ কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়ারও অভিযোগ ছিল।

এবারের আশঙ্কা, “গায়েবী” মামলার। যে কেউ আসামী হয়ে গ্রেফতার হতে পারে। বিরোধী দলগুলো ইতিমধ্যে এসব আশঙ্কা প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশনের কাছে প্রতিকার চেয়েছে। যদিও মামলা-গ্রেফতার অব্যাহত রয়েছে। নির্বাচন কমিশন অতীতের মত পক্ষ হয়ে এসব অভিযোগ খন্ডণ করবেন, এমনটি আশা করা হচ্ছে না। এরই প্রতিফলন হিসেবে কি নির্বাচন কমিশন ‘বিব্রত’ হতে শুরু করেছেন? দেখার বিষয়, ‘বিব্রত’ হওয়ার পরে তাঁরা এর প্রতিকারে কি ধরনের কৌশল গ্রহন করেন?

নির্বাচনকে ঘিরে এরকম শঙ্কা-সম্ভাবনার দোলাচলে সরকার মনে করছে, এগুলি কেবলই বিরোধী দলের অপপ্রচার। সরকারের নেতারা বারবার ঘোষণা দিচ্ছেন, সময়মত নির্বাচন হবে। সহিংসতা মোকাবেলা করার কথাও বলছেন। অথচ দিয়েছিলেন লেভেল প্লেয়িং নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি । এমনকি ইভিএম ‘ম্যানিপুলেট’ না করার নিশ্চয়তা। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের নিরপেক্ষতার কথা। সরকার ও ক্ষমতাসীন মহল আকছার দাবি করে আসছেন, সব ঠিকঠাক আছে, কিন্তু নির্বাচন বানচালে ষড়যন্ত্রের গন্ধও পাচ্ছেন তারা।

বাস্তবতা কি? বিরোধী দল ও জোট বলছে, এসব প্রতিশ্রুতিই সরকারের কৌশল। নির্বাচনকে নিজেদের মতো করার যে কোন সক্ষমতা তাদেরই রয়েছে। এসব প্রতিশ্রুতি নিয়ে জনমনেও রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কারন অভিজ্ঞতা থেকে তারা জানেন, নির্বাচন এগিয়ে এলে রাজনীতিবিদরা প্রতিশ্রুতির ফুলঝুড়ি বইয়ে দেন এবং এর অধিকাংশ যে কথার কথা তা জানা হয়ে গেছে। উদাহরন, গত সিটি নির্বাচনে প্রায় সকল মেয়র প্রার্থী নির্বাচিত হলে ‘সিটি গভার্ণমেন্ট’ চালু করার কথা ইশতেহারে ও মুখে বলেছেন।

এরকম অবাস্তব এবং আকাশচারী সব প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারা জনগনের ভোট নিতে চান। কারন রাজনীতিবিদ, অর্থে-বিত্তে প্রতাপশালী এবং কথিত সুশীল সমাজের কাছে জনগন এখনও বোকার স্বর্গে বাস করছে বলে ধারনা পোষণ করে থাকেন। কারণ, এদের প্রত্যেকেরই দল, সংঘ-সমিতি রয়েছে। কিন্তু এদেশে কেবল সাধারন মানুষের কোন দল নেই-ঠাঁইও নেই। নেই আপাত: কোন সংঘবদ্ধতা।