Home » রাজনীতি (page 3)

রাজনীতি

নির্বাচন : আবার ফিরে আসুক জনআস্থা ও শংকাহীন পরিবেশ

আমীর খসরু ::

গণতান্ত্রিক শাসন যে একটি সামগ্রিক ব্যবস্থা ও পরিপূর্ণ প্যাকেজ- তা জনগণের মনোজগত থেকে মুছে ফেলতে পারাটাই হচ্ছে  বিদ্যমান গণতন্ত্রের বড় সংকট। অনেক দিন ধরেই বিশ্বজুড়ে একশ্রেণীর শাসকদের পক্ষ থেকে এই প্রচেষ্টাটি অব্যহত ছিল যে, শুধুমাত্র নির্বাচনই হচ্ছে গণতন্ত্র অর্থাৎ নির্বাচনের অপরনাম গণতন্ত্র – এমন ধারণাটি প্রতিষ্ঠিত করা। গণতন্ত্রকে সামগ্রিক বিবেচনা, পরিমন্ডল ও এর ব্যপ্তি থেকে শুধুমাত্র নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করতে পারাটাই যেমন ওই শাসককূলের জন্য সাফল্যের বিষয়, তেমনি এটাই অগণতান্ত্রিক শাসন বজায় ও জারী রাখা এবং শাসন ব্যবস্থায় জনঅংশীদারিত্ব থেকে বঞ্চিত করা বা দূরে রাখার লক্ষ্যে ‘‘অগণতান্ত্রিক শাসন’’ একটি কৌশল হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। গণতন্ত্রে উত্তরণের প্রথম একট ধাপ হচ্ছে নির্বাচন। কিন্তু এর বিপরীতে ওই নির্বাচনকেই পরিপূর্ণ গণতন্ত্র বলে প্রতিষ্টিত করার যে প্রচেষ্টাটি শুরু হয় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা সম্ভবও হয়েছে। আর এখান থেকেই সামগ্রিক গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা সীমাহীন সংকটের মধ্যে পড়ে। শুধুমাত্র ওই শাসন ব্যবস্থাই যে সংকটের মধ্যে পড়েছে তা নয়, এর মাধ্যমে রাষ্ট্রও সংকটের মধ্যে পড়েছে। এ কথাটি মনে রাখতে হবে যে, নির্বাচনকেন্দ্রিক গণতন্ত্র এবং পরিপূর্ণ ও পূর্ণমাত্রার গণতন্ত্র এক কথা নয়, এটা হতেও পারে না। কিন্তু কতিপয় শাসক ও ক্ষমতাসীনদের সাফল্য হচ্ছে – ধীরে ধীরে এর বিপরীত কাছটি সুচারুরুপে সম্পন্ন করতে পারা। রাষ্ট্র ব্যবস্থা পরিবর্তনের এক পর্যায়ে প্রতিনিধিত্বশীল শাসন ব্যবস্থার কারণে ক্ষমতার বিকেন্দ্রায়নের মাধ্যমে জনগণের প্রকৃত ক্ষমতায়ন, অধিকার প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়নকে নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নির্বাচনকে একটি স্তর বা ধাপ হিসেবে গণ্য হতে হবে রাষ্ট্র এবং সমাজে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য। কিন্তু দুর্বল, ভঙ্গুর ও স্বল্পমাত্রায় বিদ্যমান গণতন্ত্র রয়েছে এমন রাষ্ট্রে কতৃত্ববাদী শাসনের উত্থানকে ত্বরান্বিত করার জন্য শুধুমাত্র নির্বাচনই হচ্ছে গণতন্ত্র -এমন ধারণাটি এখন মোটামুটিভাবে জনমনেও প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছে। এর ফলে জনগণকে যেমন ক্ষমতার অংশীদারিত্ব থেকে বিতাড়ন করা যায়, তেমনি রাষ্ট্র ও রাষ্ট্র পরিচালনার অংশীদারিত্ব যে জনগণের বুঝ-ব্যবস্থার বিষয় বা এতে তাদের অংশগ্রহণ একটি প্রয়োজনীয় শর্ত, তা মুছে ফেলা হয়েছে। বিপরীতে এমন ধারণাটি তৈরি করা হয়েছে যে, জনগণ ভোট দেবে, কিন্তু রাষ্ট্র ও শাসন ব্যবস্থার ব্যাপারে চিন্তা করা ও সিদ্ধান্ত প্রদান তাদের কর্ম নয়, এটি প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হয়েছে। আর এটাই হচ্ছে নির্বাচনকেন্দ্রিক গণতন্ত্রের মূল সংকট- যার ভুক্তভোগী আমরা সবাই।

নির্বাচনকেন্দ্রীক এই ধারণাটি এখন শুধুমাত্র আর দুর্বল, ভঙ্গুর ও স্বল্পমাত্রার গণতন্ত্রের দেশগুলোতেই সীমাবদ্ধ নেই, ক্রমাগতভাবে বিভিন্ন দেশে কতৃত্ববাদী শাসকদের মধ্যেও এটি সংক্রামিত হতে শুরু করেছে।

কাজেই গণতন্ত্রের এই পুরো অব্যবস্থার ফলাফল হচ্ছে, ক্ষমতার অংশীদারিত্ব থেকে জনগণকে বাদ দেয়া হচ্ছে,  শাসন ব্যবস্থায় জনগণের অধিকার বিলুপ্ত হতে বসেছে এবং কোথাও কোথাও পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। রাষ্ট্র এখন আর জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের ‘সামাজিক চুক্তির’ পর্যায়ে নেই। আর এ কারণেই রাষ্ট্র এখন কতিপয়ের এবং কোথাও কোথাও নির্বাচন নামক ব্যবস্থাটিও বিলুপ্তির পথে। এটি গণতন্ত্র তো বটেই, খোদ রাষ্ট্র ব্যবস্থার জন্য একটি সীমাহীন সংকটের সৃষ্টি করেছে, তেমনি রাষ্ট্রের সাথে জনগণের একটি বিশাল দুরত্ব তৈরি হয়েছে।

গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে খ্যাতিমান দুজন ব্যক্তি অর্থাৎ নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেন এবং প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ সামির আমিনকে স্মরণ করা যায়।

অমর্ত্য সেন ‘দ্য আউডিয়া অফ জাস্টিস’ গ্রন্থে বলেছেন, ‘আনুষ্ঠানিকভাবে কী কী প্রতিষ্ঠান আছে, শুধু তা দিয়ে গনতন্ত্রের মূল্যায়ন হয় না; ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠীর বহু মানুষের কন্ঠস্বরগুলো শোনা যাচ্ছে কি না সেটাও দেখতে হবে।’

অর্থনীতিবিদ সামির আমিন ‘প্রতিরোধের বিশ্বময়তা’ (ফরাসী ভাষা থেকে বাংলা অনুবাদ) গ্রন্থে বলেছেন, ‘উন্নয়ন প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করতে হলে প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের প্রতি জনসমর্থন’।

কাজেই গণতন্ত্র, শাসক, ক্ষমতাসীনদের মনের মধ্যে ও মনোজগতে সার্বক্ষণিক বিদ্যমান ও ক্রিয়াশীল থাকতে হবে।

দুই.

বাংলাদেশেও আগামী জানুয়ারি নাগাদ একটি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে সবাই প্রত্যাশা করছেন। নির্বাচনকে সামনে রেখে অবশ্য নানা ধরনের আলাপ-আলোচনা হচ্ছে জনগণের মধ্যে এবং দেশে বিদেশে নানা মহলে। যদিও বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি গঠিত হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত এ দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ইতিহাস ও ঐতিহ্য আদৌ সুখকর নয়। বিভিন্ন সময়ের নির্বাচনে বিভিন্ন সরকার নির্বাচন নিয়ে নানা ধরনের টালবাহানা করেছে এবং জনগণকে ক্রমাগত ওই নির্বাচনী ব্যবস্থা থেকেও দূরে সরিয়ে নেয়ার ও রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনসহ গত কয়েক বছরের নির্বাচনগুলোর পরে জনমনে নির্বাচন সম্পর্কেই একদিকে যেমন শংকা, ভীতির সৃষ্টির হয়েছে, তেমনি নির্বাচন সম্পর্কে একটি অনাগ্রহের আবহ তৈরি হয়েছে। এটি অনেকেরই বিশ্বাস যে, নির্বাচনে জনগণের অংশীদারিত্ব বা অংশগ্রহণ থাকতেই হবে- এই স্বতঃসিদ্ধ নিয়মের এখন আর প্রয়োজন পড়ে না। তবুও এবারের নির্বাচনটি নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ বলেই বিবেচিত। এ কথাটিও মনে রাখা প্রয়োজন যে, একই ঘটনার একইভাবে দ্বিতীয়বার আর ঘটে না।

তিন.

আগামী যে নির্বাচনটি হতে যাচ্ছে তা নিয়ে ইতোমধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে উত্তাপ সৃষ্টি এবং নির্বাচনের একটি আবহ তৈরির প্রচেষ্টা চলছে। তবে মাত্র মাস তিনেক আগে যেমন পরিস্থিতি, পরিবেশ ও প্রস্তুতি প্রত্যাশিত – তা নানা কারণে অনুপস্থিত বলেই মনে হয়। বিরোধী দলগুলো থেকে বারবার বলা হচ্ছে- নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বা সমান সুযোগ নেই। বিএনপি দাবি করছে, গেলো কিছু দিনেই নতুন করে তাদের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ৪ হাজারের বেশি মামলায় ৮৫ হাজার জনের নাম দেয়া হয়েছে। অজ্ঞাতনামা রয়েছে তিন লাখের বেশি। এসব মামলাকে গায়েবী বলছেন সংবাদমাধ্যমসহ অনেক বিশিষ্টজনরা। আগের মামলা তো রয়েছেই। এছাড়া ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট পাস নিয়ে নানা নেতিবাচক কথা বলা হচ্ছে দেশে-বিদেশে। সম্প্রচার মাধ্যমকেন্দ্রীক একটি আইনের খসড়া মন্ত্রিসভা অনুমোদন করেছে। সভা-সমাবেশ অনুষ্ঠানের সমান সুযোগও অনুপস্থিত বলেই কার্যত দেখা যাচ্ছে। এর  সবকিছু মিলিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দল ও দেশী-বিদেশীদের মধ্যে আগামী নির্বাচনকেন্দ্রীক একটি শংকা, সন্দেহ দেখা দিয়েছে। এরই স্পষ্ট প্রতিধ্বনি শোনা যায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের অদ্ভূত এক জোটসঙ্গী এরশাদের কণ্ঠেও। গত শনিবার ঢাকায় এক জনসভায় খোদ এরশাদ বলেছেন, ‘আমি দেশবাসীর উদ্দেশ্যে কিছু বার্তা পৌঁছে দিতে চাই। নির্বাচন নিয়ে এখন অনেক সংশয় আছে। নির্বাচন কখন হবে জানি না।’

শুধু যে রাজনৈতিক দল, দেশী-বিদেশী নানা পক্ষ নির্বাচন নিয়ে এ ধরনের চিন্তা-ভাবনায় মগ্ন তা নয়, ঠিক একই সাথে জনগণ নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্পর্কে আস্থাশীল হতে চায়। এখন সরকারেরই দায়িত্ব হবে- হারিয়ে যাওয়া জন-আস্থাকে পুনরায় যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত করা। কারণ নির্বাচন দিয়েই গণতন্ত্রের যাত্রাটি আবার শুরু হোক-এমনটি প্রত্যাশা করা নিশ্চয়ই অন্যায্য হবে না।

নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন : তাহলে প্রবল হবে রাজনৈতিক অনিশ্চিয়তা

তোফাজ্জ্বেল হোসেন মঞ্জু ::

নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন শুধুমাত্র শাসকদলই করে তা নয়, বিরোধী দল যখন পোলারাইজেশনের রাজনীতি করে- তখন সত্যিকার রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় সবার সমান সুযোগ বিনষ্ট হয়, সেটাও প্রকৃতার্থে অবাধ নিরপেক্ষ হয়না।  অবাধ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বহু ধরনের মত ও পথ তৈরী হয়েছে। আজকের পৃথিবীতে নির্বাচনের মাধ্যমে ন্যায্য ও নির্ভেজালভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর ও সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামত প্রতিফলন ঘটানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে, জন্ম নিচ্ছে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন। নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন হচ্ছে, ভোটের আগেই জয়লাভ নিশ্চিত ও ফলাফল অদৃশ্যভাবে নির্ধারণ করে রাখা। নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন সুক্ষ্ম, স্থুল বহু ধরণের উপাদানে সমৃদ্ধ হতে পারে; কেন্দ্র ও বুথ দখল, জাল ভোট দেয়া, বুথ বা কেন্দ্রে আসতে বাধা দেয়া নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের কয়েকটি পদ্ধতির উদাহরন । আধুনিক গণতন্ত্রের এই যুগে ক্ষমতাশালীদের কেউ কেউ ও কোন কোন রাজনৈতিক  দল এ পদ্ধতি অনুসরন করে । ক্ষমতাবান রাজনৈতিক দল সুক্ষ্ম পদ্ধতিতে বিরোধী রাজনীতিকে ধ্বংস করে এবং কৌশলগতভাবে রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপর নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠা করা। যার ফলে, নির্বাচনকালে গণমাধ্যম, নির্বাচন কমিশন, প্রশাসনসহ সকল এ্যক্টর কোনভাবেই যেনো শাসকদলের নির্বাচনী নকশা বাস্তবায়নে শক্ত বাধা তৈরী না করে; বরং সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে।

নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন শুধু স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে নয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মতো প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্রের অগ্রসর দেশেও ঘটছে। কিন্তু এসব অগ্রসর প্রাতিষ্ঠানিক গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচনকালীণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান সমূহ অধ:পতিত ভূমিকা পালন করেছেনা, কর্পোরেট বিনিয়োগ ও আনুকল্যে ওই নির্বাচন নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। সম্প্রতি অবশ্য বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন ক্ল্যাসিক ‘কেইসে’ পরিণত হচ্ছে। বাংলাদেশে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের শাসকদলের নক্সার এবং পদ্ধতির উত্তোরোত্তর বিকাশ ঘটছে। এই নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ধারাবাহিকতা রয়েছে, সেটা আমরা তুলে ধরবো।

বাংলাদেশে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের রাজনীতি : বাংলাদেশে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের লক্ষ্য হচ্ছে- পূর্ব নির্ধারিত জয় ও ক্ষমতাকে রক্ষা করা। এটাকে কোনভাবে আমজনতার ভোটের উপর ছেড়ে না দেয়া। নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনে শুধু নিজের জয় নয়, জয়কে ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রতিদন্ধীকে দমন ও অবরুদ্ধ করা। এমনকি তার রাজনৈতিক অধিকার খর্ব করা। এর সাথে রয়েছে প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতা-নেত্রীর কর্তৃত্ববাদী অহং। এই কর্তৃত্ববাদী রাজনৈতিক অহংয়ের কারণে স্বাধীনতা উত্তর প্রথমদিকে ডাকসু নির্বাচনে পরাজয় ও প্রয়াত আলীম রাজী, মেজর (অব:) জলিল সহ কয়েকজনের বিজয় মেনে নেবার গণতান্ত্রিক মনোভাব প্রকাশ পায়নি। নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের ধারাই বাংলাদেশে গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকায়ন ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক বিকাশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বলে মনে করা হয়।

এই অবক্ষয় ‘৯০ এর যে অলিখিত দ্বিদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার সৃষ্ট্রি হয়েছে। এখানে দু’দলই সমানতালে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের  উপাদানগুলিকে বেপরোয়া ব্যবহার করেছে। আজকের শাসকদলই শুধু নয়, দ্বিদলীয় ব্যবস্থার অন্য দলটিও সেই অবক্ষয়ের জন্য সমান দায়ী। নির্বাচনকালীণ কেয়ারটেকার সরকারকে ম্যানিপুলেট করতে গিয়েই ওই দলটি সামরিক বাহিনীকে হস্তক্ষেপের সুযোগ করে দেয়। তারপরের ইতিহাস সকলের জানা- বিএনপিকে তাদের নিয়ন্ত্রন মুক্ত নির্বাচনে ক্ষমতায় হারতে হয়েছিল এবং নির্বাচনের ফলাফলকেও মেনে নিতে হয়েছিল। তারপর ২০১৪ নির্বাচন পরিচালনা নিয়ে সংঘাত ও দ্বন্ধের নতুন অধ্যায় তৈরী হল। রাস্তার আন্দোলন ব্যবহার করে রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপর বিএনপি নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়, আর শাসকদল রাষ্ট্রশক্তিতে ব্যবহার করে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার নামে নিজেদের কর্তত্ব প্রতিষ্ট্রায় সফল হয়। এ সফলতা একদিকে যেমন আওয়ামীলিগকে কর্তৃত্ববাদী শাসকে পরিণত করে, অন্যদিকে, বিএনপিকে পরিণত করে দিশাহীন লক্ষ্যভ্রষ্ট দলে ।

এখন প্রশ্ন শাসকদল  আওয়ামী লীগের এই আপাত সফলতার রাজনৈতিক ফ্যাক্টর গুলি কি? রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ভারত ফ্যাক্টরকে অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। এটা ইতিহাসের আয়রণি, দু’তিন দশক আগেও ভারত বিরোধীতাই ছিল রাষ্ট্র ক্ষমতা আরোহণের মুখ্য উপায়। এখন ভারতের আস্থা ও সহযোগিতায় ক্ষমতায় টিকে থাকা অনেক গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হয়ে পড়েছে। কেন এমন হলো? বাংলাদেশের ক্ষমতা পরিবর্তন প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা শক্তিগুলো অনেকটা নির্বাক ভূমিকা পালন করেছে কার্যত নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা কৌশলগত কারনে ভারতের ওপর নির্ভরশীলতার জন্যে। এছাড়া ভারতের আরো শক্তি অর্জন এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় মিত্রদের নিজস্ব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণেও তারা বাংলাদেশের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা ভারতের হাতে ছেড়ে দিয়েছে। বর্তমান শাসকদল এখন পর্যন্ত আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক সুবিধা ব্যবহার করতে দক্ষতা দেখিয়েছে। আভ্যন্তরীণভাবে আওয়ামীলীগ ও তার নেত্রী শেখ হাসিনা শক্তিশালী শাসক হিসেবে সাহসের সঙ্গে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছেন। যুদ্ধপরাধীদের বিচার এর মধ্যে অন্যতম। দ্বিতীয়ত: পরপর দু’টার্ম ক্ষমতায় থাকার কারনে একটি সুবিধাভোগী গোষ্ঠী গড়ে উঠেছে। কিন্তু সংকটকালে আওয়ামীলীগ ও তার নেত্রী শেখ হাসিনার প্রতি এই সুবিধাভোগী গোষ্ঠী কতোটা আনুগত্য বজায় রাখবে, সহায়ক ভূমিকা নেবে তাতে প্রশ্ন রয়েছে। এমনকি ভোটের বাক্সে তারা আওয়ামীলীগ প্রদত্ত সুবিধার কতটা প্রতিদান দেবে তাতেও সংশয় রয়েছে। হামজা আলাভী নামে একজন মার্ক্সবাদী বিশ্লেষক বাংলাদেশকে পাকিস্তান রাষ্ট্রক্ষমতার উত্তর ঔপনেবেশিক আখ্যা দিয়েছিলেন, যেখানে রাষ্ট্র ঔপনেবেশিক লিগ্যাসি থেকে বের হতে ব্যর্থ হয়েছে। রাষ্ট্র আমলাতন্ত্রের হাতে নাগরিকদের নিপীড়নের যন্ত্র। গত দশ বছর আওয়ামীলীগ ঔপনেবেশিক লিগ্যাসিকে শক্তিশালী করে রাষ্ট্রশক্তিতে নাগরিকের বিরূদ্ধে আরো নিপীড়নমুলক করেছে। এর পটভূমিতে ২০১৯ সনের ৪ঠা জানুয়ারীর মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ নির্বাচিত হতে যাচ্ছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে কোথায় আছি? কিন্তু সন্দেহ নেই এই নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে জটিল ও বিচিত্র উপাদানে সমৃদ্ধ। বহু অমীমাংসিত প্রশ্ন নিয়ে বাংলাদেশ ২০১৮ বা ২০১৯ এর মধ্যে একটি জাতীয় অনুষ্ঠান এর দিকে এগুচ্ছে। সংবিধানের দোহাই দিয়ে নির্বাচন কালীন সরকার গঠিত হচ্ছে। অন্যদিকে, প্রতিদ্বন্ধী বিএনপি ঘোষণা করেছে তারা খালেদা জিয়া ব্যতীত নির্বাচন করবে না। আওয়ামীলীগ মনে করেছে, ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জনের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে এবার বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ নেবে। অগোছালো বিএনপিকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করিয়ে, তাকে কিছু কিছু সিট ছেড়ে দিয়ে বিএনপিকে বিরোধী দলে আসনে বসিয়ে আওয়ামী লীগ তৃতীয় বার সরকার গঠন করতে চায়। বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করলেও শাসকদল একটা যেনো  -তেনো নির্বাচন করে ফেলতে পারবে বলেই তাদের ধারনা। কাজেই বিএনপি’র এ উভয় সংকট থেকে বেরিয়ে আসার আপাতত: ম্যাজিক সমাধান নেই। নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের মাঝে ভোটের বাক্সের নীরব বিপ্লব কি সম্ভব হবে? এ প্রশ্নের মধ্যে আমরা ঘুরপাক খাচ্ছি। এরপর ২০১৮ আগষ্ট হয়ে পড়ল ঘটনা বহুল। এই ঘটনাগুলি এক. ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে  ঐক্যফ্রন্ট, দুই. ২১ শে আগষ্টের হত্যাকান্ডের রায়, তারেক জিয়ার যাবজ্জ্বীবন কারাদন্ড, তিন. নির্বাচন কমিশনের সদস্য মাহবুব তালুকদারের ভিন্নমত ও বিরোধ। এই তিনটি ঘটনার কোনটিই আসলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক আবহাওয়ার কোন গুণগত পরিবর্তন  আনতে পারেনি। কামাল হোসেনের ঐক্যফ্রণ্টের মধ্য দিয়ে ভোটের প্রতিযোগিতায় নির্বাচন নিয়ন্ত্রনের আবহাওয়াকে চ্যালেঞ্জের একটা জানালা খুলে যেতে পারে। তারেক জিয়ার যাবজ্জীবন বিএনপি নেতৃত্বের দেউলিয়াত্ব ও নিষ্ঠুরতাকে সামনে এনেছে। মাহবুব তালুকদারের বিরোধীতা এই নির্বাচন কমিশনের নৈতিক শক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের অর্থনীতি : বাংলাদেশে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের একটি অর্থনৈতিক দিক রয়েছে। ক্ষমতাসীন দল ক্ষমতা হারাবার পর নেতৃবৃন্দ সহজ শিকার হন অর্থনৈতিক দূর্নীতির মামলায়। কাজেই নির্বাচনকে নিয়ন্ত্রিত করতে পারলে এ ধরনের হয়রানির আশংকা থাকবে না। ক্ষমতাসীন দল নির্বাচন সামনে রেখে অর্থনৈতিক সুবিধা বন্টন করে যার প্রতিদান তারা ভোটের বাক্সে পেতে চায়। সুবিধা বন্টন শুধু ভোটারদেরকে নয়, যারা ভোটকে নিয়ন্ত্রন করে তাদের কাছেও পৌছানো হয়, তার পরেও নির্বাচনে বিনিয়োগের ক্ষমতা সবসময় শাসকদলের অনেক অনেকগুনে বেশী থাকে। বর্তমান শাসকদলের নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন অর্থনৈতিক সুশাসনের ঘাটতি থেকে উৎসারিত হয়েছে বললে, তা বেশী বলা হবে না। বিদ্যুৎ রেন্টাল, নানা ধরনের অবকাঠামো নির্মানসহ সকল সরকারী ব্যয়ই গুণগতভাবে প্রশ্ন সাপেক্ষ। কাজেই নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন একমাত্র সমাধান বলে সব শাসকদলই মনে করে।

অনিশ্চিত রাজনৈতিক সুশাসন : অবাধ, অংশগ্রহণমূলক জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা হস্তান্তর রাজনৈতিক সুশাসনের সুচনা হতে পারে। আর বিকাশ ঘটতে পারে রাজনৈতিক সুশাসনই অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সুশাসনের । মনে রাখতে হবে, নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন সুশাসন নয়, কর্তৃত্ববাদী শাসনের পথকেই সুগম করে। কিন্তু সামনের নির্বাচনটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক হবার সম্ভাবনা যেমন এখনও পর্যন্ত দৃশ্যমান নয়, তেমনি আস্থা তৈরী করতে পারেনি সবার মনেও। কাজেই রাজনৈতিক সুশাসনের অনিশ্চয়তা থাকবে কি থাকবেনা –তা বলার সময় এখনও আসেনি।

 

কোটা সংস্কার আন্দোলন : হাতুড়ি, রিমান্ড, নিস্ক্রিয়তা এবং কটাক্ষ

সি আর আবরার ::

বেসামরিক আমলাতন্ত্রে নিয়োগের বিতর্কিত ও পৃষ্ঠপোষকতামূলক কোটাব্যবস্থা সংস্কারের পর্যালোচনার দাবি জানাতে গিয়ে দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে সারা দেশের ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্ররা ভয়াবহ মাত্রায় নৃশংসতার মুখে পড়েছে। ৩০ জুন তারা কোটা সংস্কার প্রশ্নে গ্যাজেট প্রজ্ঞাপন জারির জন্য চাপ সৃষ্টি করতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে একটি সংবাদ সম্মেলন আয়োজনের পরিকল্পনা করেছিল। অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ, নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক একটি পদ্ধতিকে অবশ্য ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকেরা ‘ক্যাম্পাস অস্থিতিশীল করার স্বার্থেন্বেষী মহলের ষড়যন্ত্র’ এবং ‘সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ’ হিসেবে বিবেচনা করে। ফলে তারা আর সময় ক্ষেপণ না করে কোটাব্যবস্থা সংস্কারের আন্দোলনকারীদের সংগঠকদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, ‘সফলভাবে’ সংবাদ সম্মেলন ভন্ডুল করে দেয়। আর এর মাধ্যমে ক্ষমতাসীন দলের উৎসাহী অনুসারীদের হাতে ভিন্নমত প্রকাশকারী ছাত্রদের ওপর দমনপীড়নের নতুন মাত্রা শুরু হয়।

কয়েকটি ঘটনায় রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর নিস্ক্রিয়তায় মনে হয়েছে তারা অপরাধমূলক কাজে সহায়তা করছে এবং অন্য কয়েকটি ঘটনায় দেখা যায়, তারা বিপুল উৎসাহে বিক্ষোভকারী, তাদের পরিবার ও বন্ধুদের প্রতি অপূরণীয় ক্ষতি সাধন করেছে। সুস্পষ্টভাবে অপরাধে জড়িতদের গ্রেফতার করে তাদেরকে আইন লঙ্ঘনের জন্য বিচারের মুখোমুখি করার বদলে তারা কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা ও অংশগ্রহণকারীদের খুঁজছে, আটক করছে ও রিমান্ডে নিচ্ছে। তারা শক্তি প্রদর্শন করে শিক্ষক, অভিভাবক ও উদ্বিগ্ন নাগরিকদের প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ ছত্রভঙ্গ করে দিচ্ছে। মন্ত্রীদের পাশাপাশি বিশ্লেষক, সাংবাদিক ও এমনকি ভিসিরাসহ এস্টাবলিশমেন্টের অ-রাষ্ট্রীয় গ্রুপগুলো ক্ষুব্ধ ছাত্রদের ‘বিঘ্ন সৃষ্টিকারী’ হিসেবে অভিহিত করার  ক্ষেত্রে সুর মেলাচ্ছে।

মিডিয়ায় সহিংসতার মাত্রা ও তীব্রতা ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে। দেশের বিভিন্ন অংশে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের রড, বাঁশ, এমনকি হাতুড়ি দিয়ে নির্মমভাবে প্রহার করার ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের সিনিয়র  নেতাদের ছবি ও ফুটেজ অহরহ দেখা যাচ্ছে। কোটা আন্দোলনের সমর্থক ও সহানুভূতিশীলদের প্রতি বিনা উস্কানিতে সহিংসতা চালানো, ছাত্রীদের হয়রানি ও ভীতি প্রদর্শন করার বিস্তারিত প্রতিবেদন ও সাক্ষী-প্রমাণ প্রিন্ট মিডিয়ায় এই সহিংসতা ব্যাপকভাবে দেখা যায়। এসব কিছু সত্ত্বেও সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের দায়িত্বশীল কোনো সদস্যের এ ধরনের কাজের সমালোচনা করা তো দূরের কথা, এগুলো ঠিক হয়নি পর্যন্ত তারা বলেননি। তার পরেও সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে অপরাধীরা ভিন্নমত দমনের জঘন্য এজেন্ডা বাস্তবায়নে অবাধ সুযোগ পেয়েছে। গত ১৫ জুলাই অবস্থার আরো অবনতি ঘটে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান অনুষদের দুই বিবেকবান শিক্ষক সহিংসতায় আহতদের সাথে সংহতি প্রকাশ করার কারনে অপদস্ত হন।

সহিংসতামূলক কাজ করে অপরাধীরা কেবল বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণের পবিত্রতাই লঙ্ঘন করেনি, ভিন্নমত প্রকাশের প্রতীকি সৌধ শহিদ মিনারের অলঙ্ঘনীয়তাও নস্যাৎ করেছে। প্রতিবাদকারীদের শান্ত করার জন্য সরকারপন্থী ছাত্র সংগঠনের নেতা-কর্মীরা সব ধরনের অপরাধমূলক তৎপরতা চালায় ; গুম ও ধর্ষণ; বাঁশ, রড, চাপাতি, এমনকি হাতুড়ি নিয়ে হামলা করে, নিগৃহীত ও অপহরণ করার হুমকি ও ভীতি প্রদর্শনও করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ যে নৈরাজ্যের সৃষ্টি করে, তা দ্রুততার সাথে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সাভার, রংপুর ও দেশের আরো অনেক নগরীতে ছড়িয়ে পড়ে। ক্যাম্পাসকে ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণে রাখার নামে অনৈতিক কর্তৃত্ব দাবি করে সংগঠনটি ‘ক্যাম্পাস অস্থিতিশীল করার কাজে জড়িতদের’ হাত থেকে মুক্ত করার তাদের দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে ।

কথাকে কাজে পরিণত করার একটি ঘটনায় শহিদ মিনারে প্রতিবাদকারীদের রক্ষা করতে গিয়ে বেশ কয়েকজন ছাত্রী আক্রান্ত হয়েছেন। আরেক ঘটনায় এক কোটা সংস্কার সমর্থককে লাইব্রেরি থেকে টেনে বের করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও লাইব্রেরিয়ানের সামনে প্রহার করার সময় তাকে আহত করে। কয়েকটি ঘটনায় ছাত্রলীগ প্রতিবাদকারী ছাত্রদের আটক করে তাদের সাথে খারাপ আচরণ করে তাদেরকে আইন-শৃঙ্খলা সংস্থার কাছে হস্তান্তর করে। শীর্ষস্থানীয় প্রতিবাদকারীদের তাদের বাড়িতে ও হলে গিয়ে ভয়াবহ পরিণতির জন্যে হুমকি দেওয়া হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনগুলোর প্রতিক্রিয়া ছিল ভয়াবহ রকমের হতাশাজনক। প্রতিবাদকারীদের রক্ষা করা ও উদ্বেগ প্রশমিত করতে বলতে গেলে কিছুই করা হয়নি। দিনের পর দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহিংসতা চলা ও এতে ক্যাম্পাস জীবন বিঘ্নিত হলেও প্রক্টর এমন দাবিও করলেন যে, ‘এ ধরনের হামলা হওয়ার কোনো খবর তার জানা নেই’। তিনি দাবি করলেন, ‘অভিযোগ পাওয়া গেলে, তিনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন’। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডি হামলা ও হয়রানি থেকে ছাত্রদের রক্ষা করতে ভয়াবহভাবে ব্যর্থ হলেও একজন মাত্র শিক্ষক ক্যাম্পাস সহিংসতার প্রতিবাদে নগ্ন পায়ে ক্যাম্পাসে এসে তার বিরক্তি প্রকাশ  করায় আসল কারন রেখে ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধেই বিরল সাফল্য লাভ করেছে। সহিংসতার শিকারদের প্রতি সমর্থন, সহানুভূতি প্রদর্শন ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করার দীর্ঘ ঐতিহ্য ছুঁড়ে ফেলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শিক্ষক সমিতিগুলো হামলাকারীদের  পক্ষেই অবস্থান নিয়েছে বলে মনে হচ্ছে।

কোটাবিরোধী আন্দোলনের ব্যাপারে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর প্রতিক্রিয়া ভীতিকর যদি না-ও হয়ে থাকে, অন্তত তা রীতিমতো চোখে পড়ার মতো। ছাত্রলীগ কর্মীরা যখন কোটা সংস্কারপন্থী ছাত্রদের শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ভন্ডুল করার কর্মসূচি ঘোষণা করে, তখন পুলিশ ও অন্যান্য সংস্থা তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। ছাত্রলীগ কর্মীরা যখন শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের সাথে সঙ্ঘাতে জড়ায়, তখন পুলিশ সদস্যরা প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহন না করে বরং শহিদ মিনার প্রাঙ্গণ খালি করে দেয়। এ ধরনের যেকোনো সহিংস ঘটনার পর হামলাকারীদের গ্রেফতার করার বদলে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা হামলার শিকারদের আটক, গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিচ্ছে। প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও সামাজিক মাধ্যমে হামলাকারীদের ছবি, ভিডিও ব্যাপকভাবে দেখা গেলেও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সুস্পষ্ট উদাসিনতা দেখা যায়। ডেইলি স্টারসহ বেশ কয়েকটি দৈনিকে হামলাকারীদের ছবি, নাম ও পদবি (ছাত্রলীগের বিভিন্ন পদে তারা রয়েছে) প্রকাশ করেছে। তারা অবাধে ক্যাম্পাসজুড়ে বিচরণ করলেও হামলার শিকার শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীরাই আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ধাওয়ার মুখে পড়ছে। এক্ষেত্রে খুব কম সংশয়ই আছে যে, আইনকে নিজের ধারায় চলতে দেওয়া হলে বেশির ভাগ হামলাকারীই ক্ষতিকর অস্ত্র বহন, দৈহিকভাবে মারাত্মক ক্ষতি সাধন, অন্যায়ভাবে আটক ও অপহরণসহ নানা অপরাধমূলক অভিযোগে অভিযুক্ত হতো। মরিয়ম ফারার বক্তব্য ছিল মর্মভেদী। ছাত্রলীগের হাতে হয়রানির শিকার হওয়ার পর বাড়ি ফেরার পথে তাকে থানায় নিয়ে আরেক দফা অপদস্থ ও লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘আমি ভাবতাম, থানা হবে নিরাপদ, কিন্তু এটা মনে হয়েছে দ্বিতীয় দোজখ।’

ছাত্রদের সক্রিয়বাদী বা অ্যাক্টিভিস্টদের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ উপনিবেশিক ও পাকিস্তানি পুলিশের গৃহীত বাড়াবাড়িকে লজ্জায় ফেলে সরকারি হাসপাতালগুলো মারাত্মক আহত অন্তত দুজন কোটা সংস্কারবাদী ছাত্রকে চিকিৎসা দিতে অস্বীকার করেছে। একটি ঘটনায় মা-বাবা অভিযোগ করেছেন, আহত ছাত্রকে একটি বেসরকারি ক্লিনিক থেকেও চলে যেতে বাধ্য করা হয়েছে।

আইন শৃঙ্খলা সংস্থাগুলো সময় ক্ষেপণ না করে নির্দোষ প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছে, এমনকি আহতদের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করে সফলও হয়েছে। সম্মানিত ম্যাজিস্ট্রেটরা কোন যুক্তিকে এসব আবেদন মঞ্জুর করেন, তা ভাবলে বিস্মিত হতে হয়। হতভাগ্য ছাত্ররা তাদের ও জাতির ভবিষ্যতকে আক্রান্ত করতে পারে এমন সরকারি নীতির ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করার তাদের সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগ করছিল। তারা হামলকারী নয়, বরং হৃদয়হীন সহিংসতার শিকার।

বিক্ষুব্ধ ছাত্রদের হতাশা বোধগম্য। প্রধানমন্ত্রী ‘কোটা ব্যবস্থা বিলুপ্তি’ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া সত্তে¡ও বলতে গেলে কোনো পদক্ষেপই গ্রহণ করা হয়নি। মনে রাখতে হবে, ছাত্ররা কিন্তু পুরো কোটাব্যবস্থা বাতিল চায়নি। দীর্ঘ নীরবতা ও প্রায় নিষ্ক্রিয়তার মধ্যে নিয়মিতভাবে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের কাছ থেকে ‘অবগত নই,’ ‘নির্দেশনা নেই,’ ‘অগ্রগতি নেই,’ ‘প্রধানমন্ত্রী ফেরার পর সিদ্ধান্ত,’ ‘ঈদের পর গ্যাজেট’ ইত্যাদি বিভ্রান্তমূলক বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছিল। কয়েক মাস আগে বিক্ষুব্ধ ছাত্রদের সাথে আলোচনার সময় শিগগিরই উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করার প্রতিশ্রতি দেওয়া হয়েছিল। মন্ত্রিপরিষদ সচিবও প্রতিশ্রুতিটি পুনর্ব্যক্ত করেছিলেন। সর্বশেষ দফার বিক্ষোভের পরই কেবল ৩ জুলাই কমিটি গঠন করতে বাধ্য হয় প্রশাসন।

বৈধ চ্যালেঞ্জ রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলগুলোকে অন্যায় ও ভ্রান্ত বক্রোক্তি ও কটাক্ষের আশ্রয় গ্রহণের দিকে ধাবিত করছে। এর ফলে এমনকি আইনমন্ত্রী বলে ফেলেছেন, বিএনপি ও জামায়াতই কোটা সংস্কার আন্দোলনকে উস্কানি দিচ্ছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগৈর শক্তিশালী সাধারন সম্পাদকও একই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন। ক্যাম্পাসে বিশৃঙ্খলার জন্য ছাত্রলীগের দায়দায়িত্ব নাকচ করে দিয়ে তিনি যুক্তি দেখান যে, এখন সেখানে ছাত্রলীগের কোনো কমিটিই যেহেতু নেই, তাই সংগঠনটিকে দায়ী করার কোনো অবকাশই নেই। মন্ত্রী কি সত্যিই জনগণকে বিশ্বাস করাতে চান যে কমিটি ভেঙে দেওয়া হলে ছাত্রলীগের সদস্যরা গুটিয়ে যায় ? পাঠকদের স্মরণে থাকতে পারে যে, একসময়ে তেজোদীপ্ত ছাত্রকর্মী হিসেবে পরিচিত এক সিনিয়র মন্ত্রী গত এপ্রিলে প্রতিবাদকারীদের রাজাকার হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। কোনো প্রমাণ ছাড়াই ঢাবির ভিসির বাসভবন ভাংচুরকারীদের দায় কোটা সংস্কার কর্মীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তা-ই যদি হবে, তবে কি প্রশাসনের দায়িত্ব নয় তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে হামলাকারীদের শাস্তি প্রদান করা? যদি তাই না হবে তবে প্রশ্ন করা যায় কিনা, ঘটনা কী  এতোই বিস্বাদপূর্ণ যে তা প্রকাশ করা সম্ভব নয়?

গোয়েন্দা না হলেও পুলিশের অদৃশ্য পোশাক পরিহিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, কোটা সংস্কার আন্দোলন আসলে ‘অন্তর্ঘাত চালানোর লক্ষ্যে একটি সরকারবিরোধী আন্দোলন।’ আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি একই ধরনের পরিভাষা ব্যবহার করে একে ‘অপ:শক্তির কৌশল’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি সাংবাদিকদের সাথে বেশ খোলামেলাভাবেই বলেছেন, প্রতিবাদকারীদের ভিডিও ফুটেজ তাকে ‘তালেবান, আল শাবাব ও বোকো হারামের উস্কানিমূলক ভিডিও বার্তার’ কথাই মনে করিয়ে দিয়েছে।

কোটা সংস্কার অ্যাক্টিভিস্টদের বৈধ দাবির প্রতি সরকার, ক্ষমতাসীন দল ও তাদের সঙ্গী-সাথীদের প্রতিক্রিয়া সুস্পষ্টভাবে জনগণ ও তাদের সমস্যা থেকে তাদের গভীর বিচ্ছিন্নতার কথাই প্রকাশ করছে। এটি যেকোনো ধরনের সম্মিলিত প্রতিরোধে তাদের নাজুকতাই প্রকাশ করছে। এতে আরো সুস্পষ্ট হয়েছে যে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দলীয় পক্ষপাতিত্ব কেবল অপরাধের শিকারদের রক্ষা করতেই ব্যর্থ হচ্ছে না, সেইসাথে অমানবিক, অবৈধ ও প্রজাতন্ত্রের সংবিধানে থাকা ব্যবস্থার সংঘর্ষিক তৎপরতাও শাস্তির বাইরে থেকে যাচ্ছে।

একথাটি মনে রাখতে হবে যে, তরিকুলের ওপর হাতুড়ির আঘাত কেবল তার পা বা মেরুদন্ডেরই ক্ষতি করেনি, তা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

(সি আর আবরার- অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)

বামদের হাতুড়ি ছিনতাই!

শাহাদাত হোসেন বাচ্চু ::

এক. উৎপাদনের মূল শক্তি কৃষক-শ্রমিকের প্রতীক হিসেবে কাস্তে-হাতুড়ি সারা দুনিয়ার কমিউনিষ্টদের লাল পতাকায় উদ্ভাসিত। সর্বহারা শ্রেনীর রাজনৈতিক দল হিসেবে এ নিয়ে তাদের গর্বও রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে গত কয়েক দশকের রাজনৈতিক ভ্রষ্টাচার এবং ডিগবাজীতে কথিত বাম কমিউনিষ্টরা পেটি-বুর্জোয়াদের সাথে মিলে-মিশে ক্ষমতার অংশীদার। ফলে কাস্তে-হাতুড়ির নিয়তি সেভাবেই নির্ধারিত হয়ে গেছে। হাতুড়ি পরিনত হয়েছে ক্ষমতাসীনদের সংগঠিত সন্ত্রাস ও মানুষকে পঙ্গু করে দেয়ার হাতিয়ারে।

বহুকাল বাদে হাতুড়ি আবার ফিরে এসেছে।  চলমান কোটা সংস্কার আন্দোলন দমনে ও শিক্ষার্থীদের পঙ্গু করতে ছাত্রলীগ ব্যবহার করছে হাতুড়ি। সেজন্য এখন সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক বাক্যটি হচ্ছে, “হাতুড়ির নিচে জীবন”। আশির দশকে রফিক আজাদের লেখা কবিতার শিরোনাম বছর-যুগ পেরিয়ে বারবার ফিরে আসছে নিপীড়নের হিংস্রতায়। আন্দোলন দমন করতে হাতুড়িপেটা করে শিক্ষার্থীদের পঙ্গু করে দিতে চাইছে ছাত্র নামধারী রাজনীতিকরা।

এরশাদের রক্তাক্ত সামরিক নিপীড়নকালে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনেও ছাত্র-জনতার ওপর নেমে এসেছিল হাতুড়ির আঘাত। সব ধুয়ে মুছে এরশাদ এখন ক্ষমতার অংশীদার এবং প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত। এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করে তিনি নিজেই সম্ভবত: হাতুড়ি মাহাত্ম্যে মুগ্ধ হচ্ছেন! কারন সেকালেই সম্প্রতি প্রয়াত: কবি রফিক আজাদ লিখেছিলেন তার গনগনে কবিতা “হাতুড়ির নিচে জীবন”। মাত্র তিন শব্দবন্ধের এই বাক্য বুঝিয়ে দিয়েছিল স্বৈরাচার কিভাবে হাতুড়ির আঘাতে মানুষের অধিকার ছিন্ন-ভিন্ন করছে।

২০০১ সালের অক্টোবর নির্বাচনের পরে মানুষের ওপর মধ্যযুগীয় নির্যাতনে ব্যাপক ব্যবহার হয়েছে হাতুড়ির। সে সময়ে ক্ষমতাসীন বিএনপি-জামায়াত জোট অন্যান্য অস্ত্রের পাশাপাশি হাতুড়ি ব্যবহার করে হত্যা করেছে মানুষ, পঙ্গু করে দিয়েছে চিরতরে। ওই নির্বাচনের পরপর বাগেরহাটে সংবাদ সম্মেলনে হামলা করে হাতুড়ি পেটা ও ক্ষুরাঘাতে জখম করেছিল আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও সাংবাদিকদের।

দুই. যে সকল শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কার আন্দোলনে যুক্ত তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন কেমন? বিষয়টি নিয়ে আলাদা পরিসরে বলার ইচ্ছে আছে। খানিকটা প্রাসঙ্গিক-অপ্রাসঙ্গিক, সব মিলিয়ে অনেকের জানা অনেক ঘটনার একটি মনে করিয়ে দিচ্ছি। ২০১৬ সালের ফরিদপুরের শ্যামপুর গ্রামের অটোরিক্সা চালকের ছেলে হাফিজুর মোল্ল্যা, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল মার্কেটিং বিভাগে। অনেকের মত ঢাকায় আবাসন ছিল না তার। হলেই উঠতে হয়েছিল। জায়গা মেলে এসএম হলে দক্ষিণের বারান্দায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ে হলগুলির সিট, তা যেখানেই হোক, বরাদ্দের মালিক ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠন। এলাকায় পরিচিত বড় ভাই হল শাখার সাধারন সম্পাদক। তার সুবাদেই হাফিজুর বারান্দায় শীতের মধ্যে খোলা জায়গায়। এর সাথে জোটে নেতাদের ‘গেষ্ট রুম ডিউটি’। ফলাফল নিউমোনিয়া ও টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়ে বাড়ি ফেরার পথে ফেরীতে মৃত্যু। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং ক্ষমতাসীন ছাত্র নেতারা এই মৃত্যুর দায় নিতে চায়নি। শুধু হাফিজুরের পিতা বুঝতে পারেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর স্বপ্নের কি মর্মান্তিক পরিনতি!

হাফিজুরের করুণ মৃত্যু মধ্য দিয়ে মানুষ জানতে পারে, বিশ্ববিদ্যালয় গেষ্টরুম ডিউটি সম্পর্কে। ২০০১ সালে বিএনপি জোট ক্ষমতাসীন হওয়ার পর প্রতিটি হলেই চালু হয় গেষ্টরুম। এটি হচ্ছে, ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের আইন-কানুন শেখানোর জন্য নির্ধারিত স্থান। এখানে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। রাত ৯টার পরে সাধারনত: শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ’সহবত’ থেকে শুরু করে আচরনবিধি সম্পর্কে নেতারা নসিহত করে থাকেন।

তিন. সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলন পড়েছে ষড়যন্ত্র তত্তে¡র ঘূর্ণিপাকে। সরকারের প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত এই আন্দোলনের যুক্তি খুঁজে পাচ্ছেন না। এরই মাঝে ১৪ দলের বৈঠকে সরকার কোটা আন্দোলন সঠিকভাবে সামাল দিতে পারছে না উল্লেখ করে এই আন্দোলনকে “নির্বাচনী বছরে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র দাবি করা হয়েছে। যদিও এই ষড়যন্ত্রের বিষয়ে সরকার বা সরকার সমর্থকদের কাছ থেকে দৃষ্টিগ্রাহ্য কোন প্রমান এখনও হাজির করা হয়নি।

“কোটা সংস্কার দাবিতে যে সব শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছেন তারা বিএনপি-জামায়াত। তারা সরকার ও উন্নয়ন বিরোধী। তারা রাজাকারের বাচ্চা। তারা শিক্ষাঙ্গনে অস্থিতিশীলতা সৃস্টি করতে চায়”। এটি হচ্ছে ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতাদের প্রতিক্রিয়া। সাম্প্রতিককালে এটিকে ‘লন্ডন ষড়যন্ত্র’র অংশ করা হয়েছে। অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার মনোনীত উপাচার্য এতটাই এগিয়ে যে তিনি এই আন্দোলনে ‘জঙ্গীবাদের বিশ্বায়ন’ দেখতে পাচ্ছেন। তার এই অত্যুতসাহে ক্ষমতাসীন দলও অস্বস্তি বোধ করছে।

গণমাধ্যমের সংবাদ অনুযায়ী সরকারের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা গত তিনমাস অনুসন্ধান করে কোটা আন্দোলনে সম্পৃক্ত নেতৃবৃন্দের কারো সাথে বিএনপি বা জামায়াতের সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পাননি। সুতরাং সরকারের ঢালাও বক্তব্য যে উদ্দেশ্য প্রণোদিত, বিষয়টি সন্দেহাতীত। যে কোন দাবি জনগন বা ছাত্রদের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে তোলা হবে এটিকে স্বাভাবিক। কিন্তু বর্তমান সরকার যে কোন ন্যায্য দাবির ক্ষেত্রেও সরকার বিরোধিতা হিসেবে চিহ্নিত করার প্রয়াস চালান এবং ষড়যন্ত্রের গন্ধ পান।

এখানে একটি মজার বিষয় রয়েছে। কোটা সংস্কারের আন্দোলনের এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদে কোটা ব্যবস্থা বাতিলের ঘোষণা দেন। সেটি ছিল ‘মেঘ না চাইতেই জল’ পেয়ে যাওয়ার মতো। কারণ আন্দোলনটি ছিল কোটা সংস্কার নিয়ে। সম্ভবত: প্রধানমন্ত্রী খানিকটা বিরক্ত হয়ে কোটা বাতিলের ঘোষণা দেন। কিন্তু কোটা বাতিল পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠি সঙ্কাটাপন্ন হবে সেজন্য বাতিলের পক্ষে খোদ আন্দোলনকারীদের মধ্যেও দ্বিধা রয়েছে।

চার. পুলিশ সবসময় নিস্ত্রিয় থাকে না। সরকার পক্ষ হিসেবে তারা নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করে। কোটা আন্দোলনকারীদের হামলা এবং শিক্ষক লাঞ্চণার বিষয়ে তাদের আগ্রহ ছিল না। তবে উদ্বিগ্ন ও নাগরিকদের সমাবেশ প্রতিহত করতে তাদের তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মত। সমাবেশস্থল ছিল তাদের দখলে। প্রতিবাদকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে সবকিছুই তারা করেছে। সেক্ষেত্রে কোটা সংস্কারপন্থীদের প্রতিপক্ষ হিসেবে পুলিশ ও ছাত্রলীগ অনেকটা সমান্তরাল ভ’মিকা পালন করেছে।

কর্পোরেটাশ্রয়ী সংবাদ মাধ্যম কোটা সংস্কারপন্থীদের ওপর নিপীড়নের বিষয় পাশ কাটিয়েছে অবিমৃষ্যকারীতায়। বিশ্বকাপ নিয়ে তারা ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। দায়সারা গোছের কিছু খবর দিয়েছেন বটে, কিন্তু তথ্য ট্যুইষ্টিং করে। ছাত্রদের ওপরে দিবালোকে হামলার বিষয়টি অভিযোগের বরাতে রিপোর্ট করা হয়েছে। আন্দোলনরত ছাত্রদের গ্রেফতার ও রিমান্ড বিষয়ও নির্লিপ্ততা ছিল চোখে পড়ার মত। সংবাদ মাধ্যমের কোন অনুসন্ধানী রিপোর্ট বা বিশেষ প্রতিবেদন না থাকার মূল কারন হচ্ছে, এর নেপথ্যে নিয়ন্ত্রন এবং মালিকপক্ষ।

যুদ্ধের সময়ও আশা করা হয় আহত ব্যক্তি হাসপাতালে চিকিৎসা পাবে। আহত ব্যক্তির পক্ষ-বিপক্ষ চিকিৎসকের কাছে বিবেচ্য হবে না-এটিও মিথ্যা প্রমানিত হয়েছে কোটা আন্দোলনকারীদের ক্ষেত্রে। সরকারী হাসপাতাল, কোন কোন ক্ষেত্রে প্রাইভেট ক্লিনিক থেকেও আহত ছাত্রদের বের করে দেয়া হয়েছে। এসব ছাত্ররা ছাত্রলীগের হামলায় গুরতর জখম ছিলেন এবং পঙ্গু হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। চিকিৎসকরা এক্ষেত্রে সরকারের প্রতি বিশ্বস্ততা অব্যাহত রেখেছেন।

পাঁচ. ছাত্রলীগের ১৪ নেতা-কর্মীদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়ে মানববন্ধন করে উপাচার্যকে স্মারকলিপি দিয়েছে নিপীড়ন বিরোধী শিক্ষার্থীবৃন্দ। লাঞ্চণার শিকার শিক্ষকরা ছাত্রলীগকে দায়ী করে নিরাপদ ক্যাম্পাসের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করেছেন। তাদের সংহতি সম্মেলনও অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২৩ জুলাই তারা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করবে এবং রাষ্ট্রপতি বরাবরে স্মারকলিপি দেবেন।

কোটা সংস্কার পদ্ধতির পক্ষে দৃশ্যত: “কোথাও কেউ নেই”। গুটিকয়েক শিক্ষক, বুদ্ধিজীবি এবং নাগরিক সমাজের নেতৃবৃন্দ অসীম সাহসিকতায় প্রতিবাদী হওয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সামষ্টিক কোন উদ্যোগ নেই। বরাবরই এই আন্দোলন ষড়যন্ত্র অভিধায়ে আখ্যায়িত হওয়ায়ই কি প্রতিরোধের চিহ্ন নেই? নাকি প্রতিবাদের সীমানা সংকৃচিত করে নিজেরাই নিজেদের মধ্যে খেলা করছেন সকলে মিলে?

হতাশার কাছে হার মানা খুব সহজ কাজ: নোয়াম চমস্কি

আধুনিক সময়ের সেরা বুদ্ধিজীবীদের অন্যতম নোয়াম চমস্কি ছয় দশক ধরে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত হয়ে আছেন। চমস্কির সাহসিকতা, দৃঢ়প্রত্যয় ও অনন্য বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রমের ফলেই বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক জালিয়াতি, সাম্রাজ্যবাদী উদ্দেশ্যের গোমর ফাঁস হয়েছে। ভারতের ফ্রন্টলাইনে প্রকাশিত নোয়াম চমস্কির সাক্ষাতকারের দ্বিতীয় অংশ এখানে প্রকাশিত হলো।

প্রশ্ন : আপনি আর অ্যাডওয়ার্ড এস. হারম্যান ১৯৮৮ সালে ‘ম্যানুফ্যাকচারিং কনসেন্ট’ নামে একটি বই প্রকাশ করেন। এতে আপনারা জোরালোভাবে প্রমাণ করেছেন যে, কিভাবে গণমাধ্যম ক্ষমতাসীন শ্রেণির জন্য সম্মতি নির্মাণ করে। অবশ্য আপনার প্রকাশনার পর মিডিয়া জগতে অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। ইন্টারনেটের ব্যাপক প্রসারের ফলে খবর ও তথ্যে ঐতিহ্যবাহী একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ অনেকাংশেই কমে গেছে। অনেকে বিশ্বাস করেন, সামাজিক মাধ্যম ও অনলাইন মিডিয়া প্লাটফর্মগুলো ‘স্বাধীনতার’ সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। মিডিয়ার দৃশ্যপটে পরিবর্তনকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করেন?

নোয়াম চমস্কি : বইটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৮৮ সালে। এতে দেখানো হয়, কিভাবে গণমাধ্যম ক্ষমতাসীন শ্রেণির জন্য সম্মতি নির্মাণ করে। আমরা ২০০২ সালে বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ করি। ততদিনে ইন্টারনেট ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। কিন্তু আমরা পরিবর্তনের প্রয়োজন মনে করিনি। আমরা সম্প্রতি বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজ নিয়েছি, তবে তেমন কোনো পরিবর্তনের গরজ অনুভব করিনি। অবশ্যই অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। কিন্তু মিডিয়ার কর্মসম্পাদন দক্ষতায় প্রভাব সৃষ্টিকারী প্রাতিষ্ঠানিক উপাদানগুলোতে মনে হচ্ছে- বাস্তবে কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। মূলধারার মিডিয়া তাদের সব সুবিধা ও ত্রুটি সত্ত্বেও এখনো খবর ও তথ্যের প্রধান উৎস হিসেবে বহাল রয়েছে।

যারা উদ্যোগ নেয়, কেবল তাদের জন্যই ইন্টারনেট বিপুল মাত্রার উৎসে প্রবেশের সুযোগ সৃষ্টি করে। গবেষণার জন্য এটি বেশ সহায়ক। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বিস্তৃত তথ্য ও অভিমত জানার সুযোগের ফলে ব্যাপক জ্ঞানার্জন ও উপলব্ধি সৃষ্টি করতে পারে- এমন ইঙ্গিত সামান্যই পাওয়া গেছে। স্বাধীনতার সম্ভাবনা অবশ্যই আছে। তবে তা থেকে সুবিধা গ্রহণও প্রয়োজনীয় বিষয়। তাছাড়া প্রায়ই নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে ব্যাপক বিস্তৃত সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার বদলে যা শুনতে আগ্রহী তাতেই সীমাবদ্ধ থাকার কৃত্রিম স্বস্তিদায়ক এলাকায় আশ্রয় গ্রহণ করাও সহজ মনে হয়।

প্রশ্ন : বেশ কয়েকটি ল্যাতিন আমেরিকান দেশে বাম শক্তিগুলো নির্বাচনী পরাজয় ও নানা ধরনের বিপর্যয়ে পড়েছে। ল্যাতিন আমেরিকায় বাম আন্দোলন দুর্বল হয়ে পড়ার কারণেই এমনটা ঘটেছে? ল্যাতিন আমেরিকায় বামদের সামনে কী কী চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা রয়েছে?

নোয়াম চমস্কি : দুর্বল হয়ে পড়েছে। তবে অনেক স্থায়ী অর্জনও আছে এবং আগের চেয়ে তা অনেক ভালোও। ইতিহাস অগ্রগতি ও প্রত্যাগতি লিপিবদ্ধ রাখে। তবে সাধারণ অগ্রগতি রয়েছে এবং আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, মার্টিন লুথার কিংয়ের বিখ্যাত পরিভাষাটি ধার করে বলতে পারি যে. ন্যায়বিচারের পথে চলতে ইতিহাসের বাঁক নির্মাণ করতে পারি আমরা। হতাশার কাছে হার মানা ও সবচেয়ে খারাপটি ঘটানোকে নিশ্চিত করতে সহায়তা করা খুব সহজ কাজ। বিচক্ষণতা ও সাহসের পথ হলো প্রাপ্য বিপুল সুযোগ সুবিধা ব্যবহার করে তাদের সাথে যোগ দেওয়া যারা আরো উন্নত দুনিয়া নির্মাণের জন্য কাজ করছে।

প্রশ্ন : পূর্বসূরিদের বিপরীতে গিয়ে পোপ ফ্রান্সিস বিশ্বে প্রভাব ফেলছে এমন নানা আর্থ-সামাজিক ইস্যু নিয়ে অত্যন্ত প্রগতিমূলক অবস্থান গ্রহণ করে অত্যন্ত জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। আমরা জানি যে. আপনি প্রকাশ্যে ঘোষিত নাস্তিক। পোপতন্ত্রের সাথে আপনার আদর্শগত পার্থক্য যাই হোক না কেন, পোপ ফ্রান্সিস সম্পর্কে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি কী? আপনি কি আশা করেন, তার ব্যক্তিগত অবস্থান ক্যাথলিক চার্চের গোঁড়ামিতে পরিবর্তন আনবে?

নোয়াম চমস্কি  : অতীত নিয়ে আমি তেমন একমত নই। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, পোপ ত্রয়োদশ জনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রশংসনীয় রেকর্ড ছিল। পোপ ফ্রান্সিসও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে প্রশংসনীয় অবস্থান গ্রহণ করেছেন। ফলে আমি মনে করি, চার্চের ওপর তা ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আমি আশাবাদী।

(অসমাপ্ত)

নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন-নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র : রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের অন্দরে-বাহিরে

তোফাজ্জ্বেল হোসেন মঞ্জু ::

রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের বাহির ও ভিতর ব্যাপারটা প্রথমেই পরিষ্কার করে নিচ্ছি। রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের বাহির বলতে, যা কিছু প্রকাশিত, ঘোষিত এবং প্রতিটি পক্ষই নিজের বক্তব্য মেনে নিচ্ছেন। অন্যদিকে, ভিতরের ব্যাপারটা অতটা প্রকাশিত নয়, কেউ বললেও প্রত্যাখান করছেন বা নিরব থাকছেন। আমরা বর্তমান রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের যা কিছু গণমাধ্যমে পাচ্ছি সেটা বেশিরভাগ বাইরের রূপ। দ্বন্দ্বের বাইরের রূপটা মিথ্যা বা অসত্য বলছি না, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। তবে ভেতরের বিষয়টা প্রকাশিত ও জানা না গেলে দ্বন্দ্বটা পুরোপুরি অনুধাবন করা যাবেনা। ভিতরের সত্য ঘিরে সব যুগে রহস্য থাকে। আমরা যাকে রাজনৈতিক গসিপ বলি তা দ্বন্দ্বের ভিতরের উপাদান ঘিরে। কিন্তু এটাও ঠিক চলতি রাজনৈতিক ধারায় ও ভিতরের সত্য জানার ও উদঘাটনের প্রচেষ্টা আছে। স্ট্রিং অপারেশন সেরকম একটি প্রচেষ্টা। স্ট্রিং অপারেশন এর মধ্য দিয়ে সম্প্রতি ভারতের গণমাধ্যমে ও শাসকদলের মধ্যে অর্থের বিনিময় সহযোগিতার করার মনোভাব প্রকাশিত হয়েছে। স্ট্রিং অপারেশন বাইরেও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, গবেষণা, সাক্ষাৎকার – রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের ভিতরে আলো ফেলতে চেষ্টা করা হচ্ছে; সময় ও ইতিহাস ভিতরে সত্যটা তুলে ধরে। ভিতরের সত্য অনুসন্ধানে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক দর্শণ গুরুত্বপূর্ণ। ভিতরের বিষয় বলতে তথ্য ও প্রমাণ সংগ্রহ ক্ষেত্রে নয়া উদারনৈতিক, রক্ষণশীল, কর্তৃত্ববাদী দর্শনের পার্থক্যের কারণে ভিতরের বিষয় ব্যাখা বিশে¬ষণে পার্থক্য হয়। বলা হয়ে থাকে কোন চোখ থেকে দেখছি। এ চোখ তৈরী হয় রাজনৈতিক বিশ্বাস থেকে। ব্যক্তি ও শ্রেণী স্বার্থে রাজনৈতিক বিশ্বাসের পরিবর্তন হয়, দেখার চোখ এক হয়না। এ আলোচনার প্রেক্ষিতে বর্তমান রাজনীতির বাইরের ও ভেতরের বিষয় চিহ্নিত করতে হবে। বাইরের বিষয়গুলো অর্থাৎ নিবার্চন ভিত্তিক রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা; এর ভিতরের বিষয় হচ্ছে রাষ্ট্র ক্ষমতায় টিকে থাকা ও রাষ্ট্র ক্ষমতা পরিবর্তন আনার বহুমুখী কৌশল।

নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন ও নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্রের পর : বাংলাদেশের রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের বাহিরের দিকটায় রূপান্তর হয়েছে- এখন জোরেশোরে উন্নয়নের নামে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন, নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্রের ফেরিওয়ালা ঘুরে বেড়াচ্ছে, এর শুরু ২০১৪ এর ৫ই জানুয়ারীর নির্বাচন থেকে। এ নির্বাচনকে প্রতি-নির্বাচনই (Counter Election)  বলবো। নির্বাচনকে নির্বাচন দিয়ে ধ্বংস  না করা হলেও এর ক্ষয় করা হয়েছে। ১৫৪ জন সাংসদ প্রতিযোগিতাহীনভাবে নির্বাচিত হয়েছেন; এধরনের একটি নির্বাচনের বৈধতা অর্জন দেশে বিদেশে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল শাসকদলে। কিন্তু শাসকদল গিনেস বুক রেকর্ড তৈরী করে এ নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে সব প্রশ্নকে নিঃশেষ করতে সফল হয়েছেন।

শাসকদল এমন একটা অবস্থা তৈরী করলেন, নির্বাচন কিভাবে হয়েছে সেটা বড় কথা নয়- দেশ কিভাবে চলছে দেখুন, দূর্বল নয়, শক্তিশালী’র শাসন। শক্তিশালী শাসক ও শাসন আপনাকে স্বপ্নের সোনার বাংলায় পৌঁছে দেবে- এভাবে কারো ধারণা থেকে নয়, শাসকদের অন্তর্গত দর্শণ থেকে বেরিয়ে আসে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন ও নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র।

নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনে সকলে যে যার কাজ করতে পারবেন, তবে কেউই সীমা লংঘন করতে পারবেন না, সীমা লংঘন করলেই শাস্তি ও বিতাড়ন। সীমার মধ্যে থাকলে শান্তি ও পুরষ্কার। মিলিয়ে দেখুন প্রধান বিচারপতি যতদিন সীমার মধ্যে ছিলেন, পুরষ্কার পেয়েছেন, যখনই সীমা লংঘন করেছেন তখনই ভিন্ন পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো। খালেদা জিয়া যখন আন্দোলন পরিহার করে ব্যক্তিগত দলীয় জীবন যাপন করেছেন, তখন বড় কোন শাস্তি ছিলনা, কিন্তু খালেদা জিয়া উন্নয়নমুখী গণতান্ত্রিক নির্বাচনের হুমকি হতে পারেন, তখনই ভিন্ন পরিস্থিতি। তাদের মনোবাসনা, নির্বাচন এমনভাবে পরিচালিত করতে হবে যাতে ‘‘তাদের নির্বাচন’’ উন্নয়নের অন্তরায় না হয়। কাজেই ৫ই জানুয়ারী-২০১৪ এর মতো অতোটা নয়, ২০১৮/১৯ এর পোষাক পড়িয়ে ভদ্র নির্বাচন করা, যেখানে সকলে অংশগ্রহণ করবে, সাংসদ নির্বাচিত হবেন, কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবেন বর্তমান শাসক দল ও সরকার গঠন করবেন তারা-এটাই ভাবনা। বর্তমান রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের বাইরের চেহারাটা এরকমই দাড়িয়েছে।

ভিতরটা বোঝার মত তথ্য উপাত্ত কম। দ্বন্দ্বের ভিতরটা পরিষ্কার নয়, বিরোধী দলের কাছে তাদের প্রশ্ন হচ্ছে  খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে নির্বাচন না আন্দোলন? এর মধ্যে আন্দোলনের কোন ঈঙ্গিত নাই, দানা বাঁধেনি আন্দোলনের বিষয়; আন্দোলনের খতম। এখানে প্রশ্ন দাড়িয়েছে নির্বাচন হবে, না নির্বাচন বয়কট। শ্লোগান কী হবে- খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে নির্বাচন হবে না।

দ্বন্দ্বের ভিতরের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন কে, কিভাবে শাসকদলে বৈরিতা করছে, করবে? নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনে রাষ্ট্রীয় শক্তির সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন হবে। সাধারণভাবে সরকারী কর্মচারীদের আগাম পুরস্কৃত করা হচ্ছে, গত দু’আমলে একদল উপকারভোগী তৈরী হয়েছে। তবে দ্বিতীয়বার নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্রের সফল যাত্রা শুরু হবে কি? রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের এখন বর্তমান বাইরের ও ভিতরের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এটি। কিন্তু নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্রের একটি কাঠামোগত দূর্বলতা রয়েছে। আপাতত: সকল অনুগত, সকল নিয়ন্ত্রিত নাগরিক কিন্তু সকলের চিন্তা, মনন প্রক্রিয়া, রাগ হিংসা নিয়ন্ত্রন পরিধির বাইরে থেকে যায়, এখানেই ভয়। এই ভীতি  শুধু যে শাসকদলের তাই নয়, জনগণেরও। কারণ চাপা রাগ-হিংসা বিষ্ফোরণ খুবই বিপজ্জনক হয় সকলের জন্যই।

 

 

শিষ্টাচার মিথ্যাচার অনিয়ম আর বিশৃঙ্খলা

শাহাদাত হোসেন বাচ্চু:

এক. মার্কিন প্রেসিডেন্ট দিনে সাড়ে ছয়টা মিথ্যা কথা বলেন! অবাক হচ্ছেন তো? তথ্যটি ওয়াশিংটন পোষ্টের একটি জরীপের। তাদের হিসেব অনুযায়ী ক্ষমতারোহনের ৪৬৬ দিনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ৩ হাজার ১টি মিথ্যা বলেছেন। অর্থাৎ প্রতিদিনের গড় ৬ দশমিক ৪। দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ১’শ দিনে তার মিথ্যা বলার হার ৪ দশমিক ৯। কিন্তু গত এপ্রিল-মে মাসে এই হার বেড়েছে দ্বিগুন। অর্থাৎ দিনে ৯টি মিথ্যা বলেছেন ট্রাম্প।

ওয়াশিংটনের পোষ্টের পরিসংখ্যান আরো জানাচ্ছে, অনেক মিথ্যা আছে যা তিনি বারবার বলছেন। এরকম ১১৩ টি মিথ্যা রয়েছে – যা ট্রাম্প একাধিকবার বলেছেন। উপসংহারে বলা হয়, শাসনকাল যত পুরানো হচ্ছে, প্রেসিডেন্টের মিথ্যা বলা তত বাড়ছে। সিএনএন ভাষ্যকার ক্রিস সিলিজার জানাচ্ছেন, ডাইনে-বাঁয়ে মিথ্যা বলেন এমন কোন প্রেসিডেন্ট আমেরিকায় আগে কখনও ছিলেন না। জর্জ বুশ বা বারাক ওবামা দিনে কতবার মিথ্যা বলেছেন তার হিসেব কেউ রাখেনি। কারন ট্রাম্পের মত তারা কেউ মিথ্যা বলতে এবং সেই মিথ্যা বারবার আওড়াতে অভ্যস্ত ছিলেন না।

ট্রাম্প যা বলেছেন তার মধ্যে মিথ্যা আবিস্কৃত হচ্ছে এবং গণমাধ্যম তা জানিয়ে দিচ্ছে। কারন সে দেশে রয়েছে শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও গণমাধ্যমের দায়। গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি প্রেসিডেন্টের মিথ্যাকেও সনাক্ত করার সক্ষমতা  পেয়েছে। গণতন্ত্র চর্চার ফল হিসেবে গণমাধ্যম সত্য সংবাদ পরিবেশনে কাউকে পরোয়া করছে না। বাংলাদেশে ঘটছে উল্টোটা। এখানে নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্রের মধ্যে প্রতিষ্ঠানসমুহ দুর্বলতর হয়েছে, প্রাতিষ্ঠানিকতা গড়ে উঠতে দেয়া হয়নি। বিপরীতে কর্তৃত্ববাদ প্রধান হয়ে উঠেছে।

এখানে নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র যেহেতু সবসময় ব্যক্তিমুখীন, তেমনি প্রতিষ্ঠানগুলিও ব্যক্তির মুখের দিকে চেয়ে  বলতে ও চলতে অভ্যস্থ। শক্তিমান নির্ভীক, বস্তুনিষ্ঠ এবং জনস্বার্থের বদলে এখন ব্যক্তি ও দলকে সন্তষ্ট করার সাংবাদিকতা সবকিছু ছাপিয়ে উঠছে। ফলে শীর্ষ ব্যক্তিদের কথিত সত্যভাষণ জনমানুষকে খুশি করছে না ব্যথিত করছে-এই প্রশ্ন গণমাধ্যম তুলতে সক্ষম নয়। বরং তারা সামিল হয়েছেন, ক্ষমতার সাথে ইদুর-বেড়াল খেলায়। রাজনীতিতে গণতন্ত্রহীনতা ও স্থিতিশীলতার অভাবই কী এইসব রাজনৈতিক-সামাজিক মনোবৈকল্যের কারন?

দুই. প্রাচীন কবিরা বলে গেছেন, “যে কহে বিস্তর, মিথ্যা কহে বিস্তর”। আবার চালু প্রবাদটি হচ্ছে, “কথায় কথা বাড়ে”। সেসব কথার কতটুকু সত্য-কতটুকু মিথ্যা তাও বিবেচনা ও প্রশ্নসাপেক্ষ। দেশের রাজনৈতিক নেতারা কথা বলতে ভালবাসেন। এমনকি সেসব কথা দল বা নিজের বিরুদ্ধে গেলেও পরোয়া নেই। কথা বলতেই হবে। জনগনও কথা শুনতে ভালবাসে। শীর্ষে যারা থাকেন তাদের কথা মানুষ শোনে আগ্রহভরে। কারন কথামালার রাজনীতি এখানে জনপ্রিয়। নেতা কম কথা বলবেন এটি প্রত্যাশিত নয়। আর সরকার প্রধান বা দলপ্রধান হলে তো কথাই নেই!

রাষ্ট্রীয় নীতি, রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিসহ অনেক বিষয়ে মনোভাব বোঝা যায় সংবাদ সম্মেলনে সরকারের প্রধান নির্বাহীর বক্তব্য থেকে। প্রধানমন্ত্রী সবশেষ সংবাদ সম্মেলন করেছেন গত ২ মে ২০১৮ তারিখে। সেখানে তিনি কথা বলেছেন, সাম্প্রতিককালের বেশকিছু স্পর্শকাতর ইস্যু নিয়ে, বেশ খোলামেলাভাবে। তিনি কথা বলেছেন, কোটা সংস্কার আন্দোলন, সড়ক দুর্ঘটনা, আগত জাতীয় নির্বাচন এবং স্বভাবতই প্রধান প্রতিপক্ষ খালেদা জিয়ার কারাদন্ড নিয়ে। বলেছেন আত্মবিশ্বাস এবং দৃঢ়তা নিয়ে।

সড়ক দুর্ঘটনা প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য ছিল, “আমার এ কথাগুলো অনেকে পছন্দ করবেন না, কিন্তু যা বাস্তব তাই বলছি। রাস্তায় চলার নিয়ম আছে, তা আমরা কতটা মানি। একটি গাড়ি দ্রুতগতিতে আসছে, আমরা একটি হাত তুলে রাস্তায় নেমে গেলাম। যারা পথচারী তাদেরও কিছু নিয়ম-কানুন জানা দরকার, মানা দরকার” (সূত্র: বণিকবার্তা ৩ মে ২০১৮)। আবার বলেছেন,“আপনি বাসে চড়ে যাচ্ছেন, কেন আপনি হাত বাইরে রাখবেন? আপনারা (সাংবাদিক) যার হাত গেলো তার জন্য কান্নাকাটি করছেন, কিন্তু সে যে নিয়ম মানছে না সে কথা তো বলছেন না” (সূত্র: বণিকবার্তা ৩ মে ২০১৮)।

তিন. প্রধানমন্ত্রী সড়ক দুর্ঘটনার কারন হিসেবে পথচারীদের অসচেতনতার কথা বলেছেন, দায়িত্বহীনতার কথা বলেছেন, তা হয়তো ক্ষেত্রবিশেষ সত্য। অথবা এ বিষয়ক তথ্য তিনি যাদের কাছ থেকে পান তারা হয়তো দুর্ঘটনার এমত কারণই তুলে ধরেণ। কিন্তু এগুলিই কি  চুড়ান্ত সত্য ! দুর্ঘটনার প্রধান কারন? আর এই স্পষ্টবাদী সত্যকথন কি রাজীবের হাত হারানো এবং অন্তিমে মৃত্যু কিংবা গৃহকর্মীর পা হারানোর মর্মান্তিক বেদনা লাঘব করে? দুই বাসের নষ্ট প্রতিযোগিতার খেসারত হিসেবে জীবন দিতে হয়েছে রাজীবকে। এই করুণ মৃত্যুতে জনমনে প্রতিক্রিয়ার সাথে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য ‘রাষ্ট্রাচারসুলভ’ কিনা জানা নেই, তবে তার মন্ত্রী, এমপিরা এই বক্তব্য লুফে নিয়েছেন সাথে সাথেই।

দেরী করেননি নৌ পরিবহন মন্ত্রী শাহাজান খান। ৪ মে এক অনুষ্ঠানে বলেই ফেলেন “সড়ক পথে দুর্ঘটনা ঘটলে কেবল চালকদের দোষী বলা ঠিক নয়, দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে যাত্রীদেরও খামখেয়ালীপনা থাকে। দুর্ঘটনা রোধে শুধু চালকদের সচেতন হলে চলবে না, যাত্রী ও পথচারীকে সচেতন হতে হবে। কেউ রাস্তা পার হওয়ার সময় মোবাইল ফোনে কথা বলেন, আবার কেউ জানালার বাইরে হাত রেখে গাড়িতে যাতায়াত করেন। এই কারনেই অনেক দুর্ঘটনা ঘটে” (প্রথম আলো: ৫ মে ২০১৮)।

অতিসম্প্রতি ঢাকায় একজন সংসদ সদস্যের গাড়ি চাপায় একজন নিহত হয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে সংসদ সদস্যের পুত্র গাড়ি চালাচ্ছিলেন। সেটি অস্বীকার করতে গিয়ে গণমাধ্যমের প্রশ্নের জবাবে ঐ সংসদ সদস্যের স্ত্রী, যিনি একজন উপজেলা চেয়ারম্যান, যা বলেছেন তা প্রধানমন্ত্রীর কথারই প্রতিধ্বনি মাত্র। তিনি দাবি করেছেন, পথচারী সতর্ক না হলে ড্রাইভারের কি করার থাকতে পারে!

চার. গত ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সারাদেশে ১৮৭১টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২১২৩ জন এবং গুরুতর আহত হয়েছেন ৫৫৫৮ জন। এদের মধ্যে শতকরা ৯০ ভাগই মানুষই পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি (সূত্র: ডেইলী ষ্টার- ৩০ এপ্রিল ২০১৮)। সাম্প্রতিককালে সড়ক হয়ে উঠেছে মৃত্যুফাঁদ। গত ২৩ জুন মাত্র ২৪ ঘন্টায় সড়কে নিহত হয়েছে ৪৫ জন। এরমধ্যে ৩৯ জনই কর্মক্ষম ব্যক্তি। গাইবান্ধায়্ বেপরোয়া গতির বাস উল্টে নিহত হয়েছে ১৮ জন (সূত্র: প্রথম আলো ২৪ জুন, ২০১৮)।

‘ন্যাশনাল কমিটি টু প্রোটেক্ট শিপিং, রোডস এ্যন্ড রেলওয়ে’ নামক একটি সামাজিক সংগঠন গবেষণায় সড়ক দূর্ঘটনার সাতটি কারন চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে প্রথমটিই হচ্ছে, বেপোরোয়া গাড়ি চালনা। ক্রমানুসারে অন্যগুলি হচ্ছে, অদক্ষ লাইসেন্সবিহীন গাড়িচালক, ওভারটেকিং ও ওভারলোডিংয়ের বিপদজনক প্রবণতা, ট্রাফিক আইন না মানা, অযোগ্য ক্রুটিপূর্ণ  যানবাহন, ঝুঁকিপূর্ণ ও যান চলাচলের অযোগ্য সড়ক, চালকের বিরতীহীন ও বিশ্রামহীন গাড়ি চালনা। এই সাতটি কারনের বাইরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারন, পরিবহন সেক্টরে বিশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় মাফিয়াতন্ত্র কায়েম।

এবারের ঈদযাত্রায় ইতিমধ্যেই তিন শতাধিক প্রাণহানি ঘটেছে। দায়িত্বজ্ঞানহীনতা, বিচারহীনতা ও জবাবদিহিতা না থাকায় অপ্রতিরোধ্য গতি পেয়েছে দুর্ঘটনার মৃত্যু। শুধু সড়কে নয়, রেলপথ-নৌপথ, কল-কারখানা সর্বত্রই দুর্ঘটনায় মৃত্যুর খবর। দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা যায় না, কারন তারা সংগঠিত। এসব সংগঠনের সাথে ক্ষমতাসীনদের শীর্ষ ব্যক্তিরা যুক্ত থাকে, সমর্থনও থাকে। কোন ব্যবস্থার সূচনা ঘটলেই ধর্মঘট, অবরোধসহ দেশকে তারা জিম্মি করে ফেলে।

সরকারপক্ষ, যখনই যারা ক্ষমতায় থেকেছেন, রাজনৈতিক-বাণিজ্যিক-ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার হিসেবে পরিবহন সেক্টর এবং শ্রমিক সংগঠনগুলিকে ব্যবহার করছে। সরকার থেকে দায়িত্বশীল কোন অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়নি। ফল হয়েছে ব্যক্তিখাতে এই সেক্টর গড়ে উঠেছে অনিয়ম আর বিশৃঙ্খলা সঙ্গী করে। রাজনৈতিক নেতা ও শ্রমিক নেতারা শ্রমিকদের নিয়ে মাফিয়াতন্ত্র গড়ে তুলছে, মালিক হচ্ছে বিপুল অর্থ-বিত্তের।

এই বিশৃঙ্খল অরাজক পরিবেশে বেড়ে ওঠা মানুষের হাতে সড়কে মানুষ মরছে। পৃথিবীতে দুর্ঘটনা বন্ধের কথা না ভাবা হলেও কমিয়ে আনার জন্য কাজ করছেন সকলে। কিন্তু এই দেশে সেটি তো দুরে থাক, বিশৃঙ্খল ও মাফিয়া কবলিত পরিবহন সেক্টর মুক্ত করে একটি সুষ্ঠ ও মানসম্মত অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনাও কি আছে?