Home » রাজনীতি (page 3)

রাজনীতি

নড়বড়ে গণতন্ত্র ও নির্বাচন : বাসা বেঁধেছে দেশি-বিদেশি মাফিয়ারা

আনু মুহাম্মদ ::

শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর পৃথিবীর বহুদেশে একটি সাধারণ ব্যাপার হলেও বাংলাদেশে এখনও তা প্রায় অসম্ভব প্রত্যাশা। বছরে বছরে এর সম্ভাবনা বাড়ার বদলে অনিশ্চতাই বেড়েছে কেবল। এবারের নির্বাচন নিয়েও তাই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার শেষ নেই।

প্রকৃতপক্ষে নজরদারি, পরিবেশবিধ্বংসী প্রান্তস্থ পুঁজিবাদের বিকাশকালে জনগণের জীবন ও অধিকারের সীমা কেমন হতে পারে, উন্নয়নের নামে মুনাফা ও দখলদারিত্ব বিস্তার কী চেহারা নিতে পারে, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে স্বৈরতন্ত্রের হাতিয়ার হতে পারে, বাংলাদেশ তার অন্যতম দৃষ্টান্ত। দেশের সাধারণ নির্বাচন তো বটেই, একেবারে স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনেও টাকা আর ক্ষমতার প্রভাব বেড়েছে অভূতপূর্ব মাত্রায়। নির্বাচনের প্রতি ক্ষমতাবানদের অনীহা ও ভয় প্রকাশিত হচ্ছে বহুভাবে। এমনকি সামরিক শাসন থেকে বের হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সংসদ নির্বাচন বন্ধ রাখাতেও শাসকগোষ্ঠীর এই নির্বাচন-সন্ত্রস্ত চেহারা প্রকাশিত।

নির্বাচন বিষয়টি কী রকম পরিহাসের বিষয়ে পরিণত হয়েছে, তার একটি প্রমাণ নির্বাচনী ব্যয়ের বৈধ ও বাস্তব চেহারা। আসন্ন নির্বাচনে প্রার্থীদের ব্যয়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ২৫ লাখ টাকা। এই অঙ্ক শুনে বড় দলের প্রার্থীরাসহ সবাই হাসে। সবাই জানে যে, যারা নির্বাচনে প্রার্থী হতে আগ্রহী তাদের বড় অংশ এই আগ্রহ প্রকাশ করতেই এর চেয়ে বেশি টাকা খরচ করেছে। এর একশ’গুণ খরচও অনেকের কাছে অপ্রতুল মনে হতে পারে। বড় দলের প্রার্থীদের টাকার কোনো অভাব নেই। প্রথমে মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরির জন্য খরচ করতে হয় অনেক টাকা, মনোনয়নপত্র কেনার সময় সমর্থক এবং সহযোগীদের নিয়ে বহর তৈরিও কম ব্যয়বহুল নয়। মনোনয়ন পাওয়ার ঘটনা একটা বিরাট সাধনা ও ধরাধরি শুধু নয়, অনেক টাকারও বিষয়। সবার জন্য প্রযোজ্য না হলেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রার্থীকে বড় অঙ্কের টাকা জমা দিয়েই মনোনয়ন নিশ্চিত করতে হয়। তারপর শুরু হয় আসল খরচের পর্ব। কত টাকা খরচ হয়? কোটি তো বটেই, একক, দশক না শতক? ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেই এখন কোটি টাকার কথা শোনা যায়। দশক-শতক তো সংসদ নির্বাচনে আসবেই। এই টাকার সঙ্গে আয়ের উৎস মেলাতে গেলে খুবই সমস্যা। এই অঙ্ক গোপন, নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত সীমার তুলনায় শতগুণ বেশি থাকার পরও এসব বিষয়ে কমিশন ভদ্রলোকের মতো চুপ থাকে। প্রচলিত ভাষায় ‘কালো’ ভদ্রভাষায় ‘অপ্রদর্শিত’ এবং প্রকৃত অর্থে চোরাই টাকাই নির্বাচনের প্রধান চালিকাশক্তি। আর এই টাকা বহুগুণে ফেরত নিয়ে আসাই এই চোরাই কোটিপতিদের জীবনের প্রধান বাসনা। নির্বাচন ও নির্বাচনহীনতার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার যে নড়বড়ে অবস্থা দিনে দিনে আরও প্রকট হচ্ছে, তার কারণগুলোর সারসংক্ষেপ করা যায় নিম্নরূপে:

প্রথমত, দুর্নীতি, লণ্ঠন, রাষ্ট্রীয় ও গণসম্পদ আত্মসাতের মাধ্যমে দ্রুত বিত্ত অর্জনের নানা সহজ পথ এর সুবিধাভোগীদের কখনও সুস্থির হতে দেয়নি। একটা উন্মত্ত প্রতিযোগিতা, লুট, দুর্নীতি আর অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যে কোটিপতি গোষ্ঠী গড়ে উঠেছে ও  উঠছে, তাদের বড় অবলম্বন বাজার প্রতিযোগিতা নয়, বরং রাজনৈতিক ক্ষমতা। সুতরাং রাজনৈতিক ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য কিংবা তা নিজের আয়ত্তে আনার জন্য গত কয়েক দশকে প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীগুলো যা করেছে, তাতে গণতান্ত্রিক কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া দাঁড়াতে পারেনি। এর ফাঁকেই বৃদ্ধি পেয়েছে একদিকে চোরাই কোটিপতি, সামরিক ও বেসামরিক আমলাতন্ত্রের প্রভাব; অন্যদিকে নানা ধর্মীয়-অধর্মীয় ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠীর তৎপরতা।

দ্বিতীয়ত, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদসহ বিভিন্ন ধারার মাধ্যমে সব ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়েছে এক ব্যক্তির হাতে। বর্তমান ব্যবস্থায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় দলীয় নেতৃত্বের সঙ্গে ভিন্নমত প্রকাশ করা দলীয় সাংসদদের পক্ষে সম্ভব নয়। দলগুলোর মধ্যেও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া খুঁজে পাওয়া যাবে না। দল ও সংসদে ”এক নেতা এক দল’ নীতি” কার্যকর থাকায় কোনো স্বচ্ছতা, জবাবদিহির সুযোগ থাকে না। তাই যেভাবে দল ও দেশ চলছে, তা কেবল জমিদারি ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করা যায়। দলগুলো দৃশ্যত এক ব্যক্তিনির্ভর, কার্যত তা দলের কর্মীদের কাছেও গোপন বা দায়হীন সুবিধাভোগীদের স্বেচ্ছাচারিতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহূত।

তৃতীয়ত, পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার মধ্যে প্রান্তস্থ অবস্থানের কারণে বাংলাদেশে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নীতি প্রণয়নে বিশ্বসংস্থা ও করপোরেট গোষ্ঠীগুলোর আধিপত্য ক্রমেই বেড়েছে। এখন তার সঙ্গে প্রবলভাবে যুক্ত হয়েছে ভারত রাষ্ট্র ও সে দেশে কেন্দ্রীভূত বৃহৎ পুঁজি। ১৯৯১ থেকে বেশ কয়েকটি নির্বাচিত সংসদ গঠিত হলেও এই সময়কালে গৃহীত কোনো গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রণয়নেই সংসদের কার্যকর ভূমিকা ছিল না। এই সময়কালে গ্যাট চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকার দেশের সব ক্ষেত্র কার্যত উন্মুক্ত করে দিয়েছে আন্তর্জাতিক পুঁজির কাছে; তেল-গ্যাস চুক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন সরকার দেশের খনিজ সম্পদ, যা জনগণের সাধারণ সম্পত্তি তা তুলে দিয়েছে বিভিন্ন বৃহৎ কোম্পানির কাছে; স্বাস্থ্যনীতি-শিল্পনীতি-কৃষিনীতি ইত্যাদি নীতির মধ্য দিয়ে এসব খাতকে অধিক বাণিজ্যিকীকরণ করেছে, নদী, ট্রানজিট, করিডোর, বন্দর, বিদ্যুৎসহ নানা বিষয়ে ভারতের সঙ্গে আত্মঘাতী চুক্তি করে বাংলাদেশকে নাজুক অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এসব চুক্তির কোনোটিই সংসদ প্রক্রিয়ায় হয়নি। যেহেতু কাজের কোনো আলোচনার সুযোগ নেই, তাই তথাকথিত ‘নির্বাচিত’ সংসদ এখন কুৎসা, গালাগাল, নেতাবন্দনা আর বাগাড়ম্বরের ব্যয়বহুল মঞ্চ হয়ে দাঁড়িয়েছে।  রাষ্ট্রের ভূমিকা কেবল অন্যত্র গৃহীত নীতি বাস্তবায়নের, তার জন্য প্রয়োজনে বল প্রয়োগকারী সংস্থার শক্তি বৃদ্ধি। ‘ক্রসফায়ারে’র মতো পদ্ধতি এই তথাকথিত গণতন্ত্রের মধ্যেই শুরু হয়েছে। দিন দিন নির্যাতন ও আতঙ্ক সৃষ্টিতে এসব বাহিনীর নানামুখী তৎপরতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।

চতুর্থত, স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক শাসন ব্যবস্থায় অনেক রকম পরিবর্তন হয়েছে। সামরিক-বেসামরিক, প্রেসিডেন্সিয়াল-সংসদীয়, একদলীয়-বহুদলীয়; কিন্তু সব ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে দেশের অর্থনীতির গতিমুখ নির্মাণে একটি ধারাবাহিকতা দেখা যায়। আর তাতে বাংলাদেশ ক্রমে আরও বাজারিকৃত হয়েছে, রাষ্ট্রের দায়দায়িত্ব কমিয়ে সবকিছুই বাজারের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, উৎপাদনশীল খাতের তুলনায় কেনাবেচার খাত যা ‘সেবা খাত’ নামে পরিচিত, তার বিকাশ ঘটেছে অনেক বেশি হারে, দুর্নীতি ও কমিশন নির্ভর প্রকল্পের সংখ্যা বেড়েছে, ব্যাংক ঋণখেলাপির পরিমাণ রেকর্ড ভেঙে ভেঙে বাড়ছে, আট বছরে পুঁজি পাচার হয়েছে ছয় লাখ কোটি টাকার বেশি ও পরিবেশবিধ্বংসী তৎপরতা বেড়েছে অবিশ্বাস্য হারে। সম্পদ কেন্দ্রীভবনের সঙ্গে সঙ্গে একই সময়ে বেড়েছে বৈষম্য; শহরগুলোতে দামি গাড়ি আর জৌলুসের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে উদ্বাস্তু মানুষের সংখ্যা। বেড়েছে সন্ত্রাস আর দখলদারিত্ব।

পঞ্চমত, এসব কারণে জনগণের জীবন যত দুর্বিষহ হচ্ছে, তত রাষ্ট্র ও প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো বেশি বেশি করে ধর্মকে আঁকড়ে ধরছে। ধর্মপন্থি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নানাভাবে জোটবদ্ধ হয়েছে প্রধান দুই ধারার সঙ্গে। তাদের অনেক এজেন্ডা প্রধান জোট দুটির দ্বারা এখন আত্মীকৃত হয়েছে। ধর্ম আর জাতীয়তাবাদের নামেই শ্রেণি, ভাষা, জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ বৈষম্য ও নিপীড়ন রাষ্ট্রীয় কর্মসূচির মধ্যে সম্পৃক্ত হয়েছে।

ষষ্ঠত, বর্তমানে সাম্রাজ্যবাদ ও উপ-সাম্রাজ্যবাদের আঞ্চলিক কৌশলে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এর কৌশলগত অবস্থান, বৃহৎ বাজার ও বিপুল খনিজ সম্পদের সম্ভাবনার কারণে। বিদ্যমান নীতিকাঠামো বজায় রাখার মতো সরকার ‘নির্বাচিত’ হলে তাদের সমস্যা নেই; কিন্তু প্রকৃত অর্থে জনপ্রতিনিধিত্বশীল ব্যবস্থার তারাও বিরোধী। দেশের নীতিনির্ধারণে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক লুটেরাদের যে শৃঙ্খল, তা থেকে কী করে বের করা যাবে বিশাল সম্ভাবনার এই দেশকে? জনগণ তাদের সত্যিকার প্রতিনিধি নির্বাচনের ব্যবস্থা তাহলে পাবেন কোত্থেকে? শাসক শ্রেণির বিভিন্ন অংশের রাজনীতির মধ্যে যে তার সম্ভাবনা নেই, তা বলাই বাহুল্য। আর বিদ্যমান নীতিকাঠামো বজায় রেখে সৎ ও যোগ্য প্রার্থীর বিজয় তো দূরের কথা, লড়াই করার চেষ্টার চিন্তা করাই কঠিন। কোনো ব্যক্তি যদি পাহাড়-পর্বত ডিঙিয়ে সেখানে যায়ও, তাহলে তার ভূমিকা কী হবে ‘নিধিরাম সর্দার’ সংসদে?

এটা কাণ্ডজ্ঞানের বিষয় যে, যখন জনগণের সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তি এমন পর্যায়ে দাঁড়াবে, যাতে চোরাই অর্থ, অস্ত্র বা গণবিরোধী আইন কোনো বাধা হিসেবে কার্যকর থাকতে পারবে না; একমাত্র তখনই নির্বাচন প্রকৃত জনপ্রতিনিধিত্বমূলক হতে পারবে। জনগণের এই সংগঠিত শক্তি এমনি এমনি গড়ে উঠবে না। তার জন্য দরকার দেশের সর্বত্র মানুষের সে রকম শক্তি বা সংস্থা গড়ে তোলা। গত চার দশকে জনগণের অপ্রতিরোধ্য শক্তির কিছু নমুনা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। কিন্তু তার ধারাবাহিকতা না থাকা জনপন্থি আন্দোলন ও সংগঠনের দুর্বলতা নির্দেশ করেছে বারবার। আর তার সুযোগেই নড়বড়ে গণতন্ত্রের মধ্যে বাসা বেঁধেছে দেশি-বিদেশি মাফিয়াদের নানা গোষ্ঠী।

মন শক্ত ও সহ্য ক্ষমতা বৃদ্ধির নির্বাচন কমিশনের দাওয়াই

আমীর খসরু ::

অনেকেই প্রত্যাশার পারদ উপরে উঠিয়ে এমনটা ধারণা করেছিলেন যে, বিএনপিসহ বিরোধী দল ও পক্ষ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে নির্বাচন কমিশনে কর্তাব্যক্তিদের – মন মস্তিষ্ক ও মনোজগতে সামান্য হলেও একটা ঝাকুনি লাগলেও লাগতে পারে। কারো কারো এমনটাও মনে হয়েছিল যে, পুরো নির্বাচন কমিশনের ব্যাপারে ইতোমধ্যে জনমনে যে বদ্ধমূল  নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে – তা বদলের চেষ্টায় হলেও তারা অন্তত ‘কিছু একটা করবে’ এবং সেটি হবে ইতিবাচক। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে সব প্রত্যাশা উল্টিয়ে, ‘যা আগে ছিল তাই পরে রয়ে গেল’। প্রধান নির্বাচন কমিশনার সিটি করপোরেশনের সময়ের মন্তব্যের পথ ধরে একজন নির্বাচন কমিশনার এবার আগে ভাগেই আগামী নির্বাচনটি কেমন হতে পারে তার ভবিষ্যত সম্পর্কে আগাম জানান দিয়েছেন।  তিনি বলেছেন, ‘‘পৃথিবীর কোনো দেশে শতভাগ অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান হয় না, বাংলাদেশেও হবে না’’। (প্রথম আলো- ১৬ নভেম্বর)। এর আগে-পরে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে শোনানো হলো নিয়ম-নীতির নামে নানা নসিহত। নির্বাচন কমিশন সচিব ১১ নভেম্বর স্পষ্ট করেই জানিয়ে দিলেন, নির্বাচনী পর্যবেক্ষকরা ভোট কেন্দ্রের ছবি তুলতে পারবেন না, সংবাদ মাধ্যমের সাথে নির্বাচনের দিন কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়া, মতামত প্রকাশ, এমনকি আনুষ্ঠানিক কথা পর্যন্ত বলতে পারবেন না। তাদের ‘মূর্তির মতো’ পর্যবেক্ষণ করতে হবে। একই ধারায় আরও কয়েক দফা নীতিমালা ঘোষণা করা হলো পর্যবেক্ষকদের জন্য। সংবাদ মাধ্যমের উদ্দেশ্যও ইতোপূর্বে এই নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকেই যেসব নিয়মনীতি ও নীতিমালার কথা উল্লেখ করা হয়েছে-তাতে সংবাদ মাধ্যম কর্মীদেরও সরাসরি ‘মূর্তি’ হতে না বললেও প্রায় ‘মূতির্’ হওয়ার নির্দেশনামা জারি করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের এবার চোখ পড়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের উপরেও।  নির্বাচন কমিশনের সচিব সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বিশেষ করে ফেসবুকে যাতে তারা ভাষায় ‘প্রোপাগান্ডা’ ছড়ানো না হয় তা নিশ্চিত করার জন্য ওই মাধ্যম মনিটর করা হবে। সরকার কথিত ‘প্রোপাগান্ডা’রোধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন করেছে; নানা বিভাগ ও নানা উদ্যোগে এ কাজটি কৌশলে বহুদিন ধরে করা হচ্ছে। সম্ভবত নির্বাচন কমিশন এতেও নিশ্চিত হতে পারছে না। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, নির্বাচন কমিশন কাকে প্রোপাগান্ডা বলছে ও বলবে। এবং এর মাপকাঠি কি? ইতোমধ্যে কমিশন জানিয়ে দিয়েছে, কিছুসংখ্যক সংশ্লিষ্ঠ কর্মকর্তাকে তারা এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বলে দিয়েছে। তাহলে এই কর্মকর্তারাই কি ঠিক করবেন প্রোপাগান্ডা কোনটি এবং কোনটি প্রোপাগান্ডা নয় ?

একটি বিষয় পরিষ্কার যে, নির্বাচন কমিশনারদের বক্তব্য এবং আমলা সচিবের বক্তব্যের মধ্যে কোনো ফারাক নেই। তারা যা বলছেন তা তারা সহি ও সত্য কথা বলছেন বলেই মনে করাটা বাঞ্ছনীয়। কারণ তারা আগেভাগেই ‘হয়তো’ জানান দিয়ে যাচ্ছেন যে, আগামী নির্বাচনটি তারা কেমন ভাবে করতে চান বা অনুষ্ঠিত হবে। তাদের এই মনোবাসনা কোনো না কোনোভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে এই কারণে যে, ভোটারসহ দেশবাসী এবং বিদেশীরা আশাহতের বেদনায় যেন ভবিষ্যতে হঠাৎ করে বড় ধরনের নিরাশার মুখোমুখি না হন। অর্থাৎ নির্বাচন কমিশন আগামী নির্বাচন কেমন হতে পারে তার জন্য সাধারণ মানুষের বা আম-ভোটারের মন শক্ত ও কঠিন করার লক্ষ্যে, সহ্যক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে – মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতোই- এক ধরনের দাওয়াই দিয়ে যাচ্ছেন।

এ ধরনের অসংখ্য উদাহরণ আছে। সর্বসাম্প্রতিক জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকজন সরকারী কর্মকর্তার ব্যাপারে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট একটি তালিকা দিয়ে তাদের বদলি করার জন্য আবেদন জানিয়েছিল। কিন্তু এতোদিন নির্বাচন কমিশন এ ব্যাপারে মুখ খোলেনি। পরে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট এক চিঠি দিয়ে জানিয়ে দিয়েছে, ওই কর্মকর্তাদের কোনোক্রমেই বদলি করা উচিত হবে না। এক পক্ষের দিক থেকে চিঠির পর চিঠি যাচ্ছে নির্বাচন কমিশনে। কিন্তু এসব অভিযোগের ব্যাপারে কমিশন নিশ্চুপ রয়েছে। সাবেক নির্বাচন কমিশনার অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত হোসেন এক্ষেত্রে তারা মতামত জানিয়ে বলেছেন, ‘প্রতিটি অভিযোগই খতিয়ে দেখতে হবে’। কিন্তু নির্বাচন কমিশন সে পথে হাটছে না। হাটছে না যে, তার আরও উদাহরণ আছে। রাজধানীর আদাবরে ২জন এবং নরসিংদিতে ২জন ইতোমধ্যে নিহত হয়েছে ক্ষমতাসীনদের অর্ন্তদ্বন্দ্বে তফসিল ঘোষণার পরে। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে এমনটা শোনা যায়নি। যশোর বিএনপির একজন নেতার মরদেহ কয়েকদিন নিখোজ থাকার পরে ঢাকায় নদী থেকে উদ্ধার করা হলো এবং এক্ষেত্রে পুলিশ এবং ক্ষমতাসীন দল প্রায় একই বক্তব্য দিয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এক্ষেত্রে বরাবরের মতোই তদন্ত করে ব্যবস্থা নিন বলে তার কর্মসম্পাদন করেছেন। আওয়ামী লীগ অফিসের সামনে মনোনয়ন প্রত্যাশী ও সমর্থকদের ভিড়কে নির্বাচন কমিশন নির্বাচনী উচ্ছাস হিসেবে দেখেছেন; আবার বিএনপি অফিসের সামনের ভিড়কে তারা দেখেছেন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী ঘটনা হিসেবে। একইভাবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে রিটার্নিং অফিসারদের ব্রিফ করাসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যান্য অভিযোগের বিষয়গুলো তেমন কোনো আমলেই নিলেন না। শত শত নেতাকর্মীকে তফসিল ঘোষণার পরে গ্রেফতার করা হলেও প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলে দিয়েছেন এই মামলাগুলো তফসিল ঘোষণার পরে হয়নি। তিনি এও বললেন, বিএনপি অনেক মামলার বিস্তারিত নথিপত্রই দিতে পারেনি। পুলিশ সম্পর্কে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বক্তব্য আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য একই। তিনি জোরের সাথেই বলেছেন, পুলিশ বিনা কারনে কাউকে গ্রেফতার করেনা।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার এসব বাদ দিয়ে বিতর্কিত ইভিএম ব্যবহারের দিকেই পুরো মনোযোগী হয়েছেন। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট, বাম দলগুলো এবং বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা ইভিএম ব্যবহারে নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করা যায় বললেও, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জানিয়ে দিয়েছেন ইভিএম ব্যবহার থেকে তারা পিছপা হবেন না। যে ব্যবস্থাটির সামান্যতম পরীক্ষা-নিরীক্ষাও হলো না, এমন কি জনসম্মুখে যেসব ত্রু টির কথা বলা হচ্ছে তা যে সঠিক নয়- তা জনসম্মুখে ওই ইভিএম মেশিন ব্যবহার করেই পরীক্ষামূলক প্রদর্শনী পর্যন্ত না করে ‘অসীম আশ্বাসে বিশ্বাসী হয়ে’ ইভিএম নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। উল্লেখ্য, পার্শ্ববর্তী ভারতেও ইভিএম-এর ত্রু টি যে কতো ভয়াবহ হতে পারে, নির্বাচনী ফলাফল পাল্টে দেয়ার ক্ষেত্রে তা নিয়ে তোলপাড় চলছে। এমনকি ভারতের পার্লামেন্টে বিজেপি, কংগ্রেসসহ সবদলের সামনে আম-আদমী পার্টির পক্ষ থেকে পার্লামেন্টের অধিবেশনের সময়েই একটি প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হয়। আর এতে দেখানো হয় যে, কিভাবে ইভিএম ব্যবহারে ফলাফল ম্যানিপুলেশন করা যায়।

এতোসব পরিস্থিতির মধ্যেও এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত বাক্যটি হচ্ছে সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি বা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করা। এমন প্রত্যাশার আসল অর্থ হচ্ছে এখানে যে, এই পরিস্থিতি বর্তমানে বিদ্যমান নেই। অর্থাৎ এর চরম অনুপস্থিতি রয়েছে। এই চরম অনুপস্থিতির বিষয়টি ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির একদলীয় নির্বাচনে অনুভূত হয়নি। কারণ ওই নির্বাচনটি ’৯০ পরবর্তী সময়ে প্রথমবারের মতো দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু এবারে সবার জন্য সমান সুযোগের অভাবটি অনুভূত হচ্ছে সব দল ও পক্ষের নির্বাচনে অংশগ্রহণের কারণে। এ কথাটি মনে রাখা প্রয়োজন যে, সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টির জন্য নির্বাচন কমিশনের দক্ষতা, যোগ্যতার পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি প্রয়োজন তা হচ্ছে-একটি অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য তাদের মনেপ্রাণজুড়ে ঐকান্তিক ইচ্ছা। এই ইচ্ছাটি অনুপস্থিত বলেই জনগণ ধারণা করে নেতিবাচক এবং এ কারণে জনমনে শংকা, উদ্বেগ ভীতির সৃষ্টি হয়। এই শংকা, ভীতি ও উদ্বেগ আরও বহু গুণে বেড়ে যায় সরকারের ভূমিকার কারণে।

আর এ কারণেই জনগণ এখন পর্যন্ত আস্থাশীল হতে পারছে না যে, আগামী নির্বাচনটিতে তারা নির্বিঘ্নে, নিরাপদে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন। আর এটাই হচ্ছে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথে এখন পর্যন্ত প্রধান অন্তরায়। নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হলেই জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে এমন পরিস্থিতির নিশ্চয়তা নির্বাচন কমিশন দিতে ব্যর্থ হয়েছে। আর এটাই নির্বাচন কমিশনের বড় ব্যর্থতা এবং ক্ষমতাসীনদের বড় সাফল্য।

সমতল মাঠ আর পশ্চিমীদের ইভিএম পরিত্যাগ

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

এক. ২৪ নভেম্বর সিইসি জানালেন, “লেবেল প্লেয়িং ফিল্ড আছে। পুলিশ তাদের কথা মান্য করছে। অকারনে কাউকে গ্রেফতার করছে না”। একইদিন নির্বাচন কমিশন সচিব জানান, ৬টি সংসদীয় আসনে পূর্নাঙ্গভাবেই ইভিএম ব্যবহার করা হবে। এ আসনগুলি ঠিক করা হবে দৈবচয়ন ভিত্তিতে। কমিশনের এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট, বাম গণতান্ত্রিক জোটসহ অনেকগুলি দলের নির্বাচনে সমান সুযোগ এবং ইভিএম ব্যবহার না করার  মূল দাবি উপেক্ষিত হলো। এর ফলে নির্বাচনের আগামী দিনগুলো কেমন যাবে- সেটি দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থায় জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগে সংসদ ভেঙ্গে দেয়া একটি প্রথা। লেবেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরীর অন্যতম শর্তও বটে। কিন্তু বাংলাদেশ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী অনুযায়ী, সংসদ বর্তমান রেখেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। অর্থাৎ বর্তমান সংসদ সদস্যরা স্বপদে থেকেই নির্বাচনে অংশ নেবেন। সুতরাং বলার অপেক্ষা রাখছে না, আগত নির্বাচনে সকল প্রার্থীর সমান সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়টি কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকছে, প্রয়োগ দেখতে হলে অপেক্ষা করতে হবে।

আওয়ামী লীগ সাধারন সম্পাদক ও মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন, নির্বাচনকালে সংসদ নিষ্ক্রিয় থাকবে, এর কোন কার্যকারীতা দেখা যাবে না। সংসদ সদস্যদের কোন ক্ষমতা থাকবে না। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সরকারের আকার ছোট করলে উন্নয়ন কাজ বাধাগ্রস্ত হবে। সরকার ও দলের পক্ষ থেকে এসব কথা বলার অর্থই হচ্ছে, নামে নির্বাচনকালীন সরকার হলেও তারা অন্য সময়ের মতই সকল কাজ অব্যাহত রাখবেন,  শুধুমাত্র নির্বাচনকালীন সরকারের মত রুটিন দায়িত্ব পালন করবেন না।

সংসদ সদস্যদের ক্ষমতা, সুযোগ-সুবিধা তফসিল ঘোষণার পরে থাকবে না- এমনটিও কিন্তু সংবিধানে লেখা নেই। নির্বাচনী আচরন বিধিতেও “সংসদ সদস্যদের কোন ক্ষমতা থাকবে না”-এমন কোন বিধানও সংযোজন করা হয়নি। সুতরাং ধরেই নেয়া যায়, সংসদ সদস্যদের বিষয়ে ক্ষমতাসীন দল ও সরকারের বক্তব্য নিছকই রাজনৈতিক। মন্ত্রী বা এমপি পদে থেকে নির্বাচন করবেন, কিন্তু কোন ক্ষমতা ব্যবহার করবেন না-এটি কি বিশ্বাসযোগ্য? এমন উদারতা এদেশের রাজনীতি কখনও দেখেছে? সুতরাং মুখে যাই বলা হোক, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরীতে এটি সবচেয়ে বড় বাধা।

পৃথিবীর বহু দেশে ইভিএম ব্যবহার হয়- এটি নির্বাচন কমিশনের যুক্তি এবং তারা সীমিত আকারে ব্যবহার করবেনই এটি এখন বাস্তবতা। মজার বিষয় হচ্ছে, ইউরোপে, জার্মানী, নেদারল্যান্ডস, ইতালী, ফ্রান্সসহ আরো অনেক দেশ ইভিএম ব্যবহার করে না। জার্মানীর সুপ্রীম কোর্ট নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারকে ‘অসাংবিধানিক’ হিসেবে আদেশ দিয়েছেন। ইউরোপের বড় দেশগুলো ইভিএম ব্যবহার শুরু করে ‘নির্ভরযোগ্য’ নয় বলে ফিরে গেছে ব্যালটে। মার্কিন প্রযুক্তিবিদদের গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “গণতন্ত্রকে বাঁচাতে হলে ব্যালটে ফিরতে হবে”।

দুই. “পৃথিবীর কোন দেশে ‘শতভাগ’ সুষ্ঠ নির্বাচন সম্ভব হয় না। ‘শতভাগ’ সুষ্ঠ নির্বাচন সম্ভব নয়”-এ বক্তব্য কোন রাজনৈতিক দলের নয়, খোদ নির্বাচন কমিশনের। যদিও তারা শপথ নিয়েছিলেন এবং দায়বদ্ধ শতভাগ সুষ্ঠ নির্বাচন আয়োজনে এবং সেমত করার জন্য সাংবিধানিক ক্ষমতাও তাদের হাতে ন্যস্ত। যে কোন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের তুলনায় সংবিধান তাদের অপার ক্ষমতা দিয়েছে, সুপ্রীম কোর্টের রায়ও কার্যকর আছে – সুষ্ঠ নির্বাচন আয়োজনে যা যা দরকার সবই তারা করতে পারবেন। সুতরাং কমিশনের এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে প্রশ্ন উঠছে,  ‘নির্বাচনী যুদ্ধ শুরুর আগেই কি তারা পিছু হটছেন’?

“শতভাগ সুষ্ঠ নির্বাচন হয় না”- এটি একটি ভুল তথ্য। অনেকের মত নির্বাচন কমিশনেরও জানা আছে, ইউরোপের অনেক দেশের নির্বাচন নিয়ে সামান্য কোন প্রশ্ন উঠে না। সুতরাং সাংবিধানিক পদে থেকে এমন বক্তব্যের যথার্থতা প্রমান করার দায় কিন্তু তাদের। সেটির বদলে বিতর্কিত ইভিএম এর পেছনে কমিশন নিয়োগ করেছেন সর্বশক্তি। এমন অকার্যকর আচরন দৃশ্যমান হয়ে উঠলে তাদের কার্যকারীতা প্রসঙ্গে গোটা নির্বাচনের সময় তো বটেই, নির্বাচনের পরেও প্রশ্ন উঠতে থাকবে।

জনমনে একটি নেতিবাচক ধারণা সম্ভবত: স্থায়ী হতে চলেছে। ধারণাটি হচ্ছে, সব আমলে নির্বাচন কমিশন সরকারের নির্দেশনা ও পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করেন। ইভিএম নিয়ে তাড়াহুড়ো না করা বিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পরে সিইসি যেমনটি বলেছিলেন, “সরকার ও সংসদ চাইলে ইভিএম ব্যবহার হবে”। সরকার ও সংসদ যেহেতু এখানে সমার্থক, সেজন্য অন্যান্য দলগুলোর মতামত কমিশন বিবেচনায় নেবেন না। মানে দাঁড়ালো, সরকার চাইলেই কেবল তারা বিবেচনায় নেবেন। আর সংসদ তো কাগজে-কলমে নিষ্ক্রিয় থাকছে।

সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ক্ষমতায়িত প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা সংবিধান সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছে। সুষ্ঠ নির্বাচনের প্রয়োজনে যে কোন আইন-বিধি জারি করার এখতিয়ার রয়েছে কমিশনের। ক্ষমতাসীন দলসহ রাজনৈতিক দলগুলোকে দিক নির্দেশনা দেয়ার এখতিয়ারও আছে কমিশনের। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের নির্দেশনা-এমনকি আকার-ইঙ্গিতেও যথেষ্ট হয়ে ওঠে কমিশনের কাছে। অতীত-বর্তমানের সকল কমিশনের ক্ষেত্রেই এটি প্রযোজ্য।

তিন. প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের ‘উন্নয়ন তত্ত্ব’ ১৪ দলীয় জোটের শরীকদের পুনর্বার ক্ষমতায় আসাকে অনিবার্য করে তুলতে চেয়েছে। তাদের দাবি এই উন্নয়ন ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে শেখ হাসিনা’র নেতৃত্বে আবারও সরকার গঠন করতে হবে। না হলে ধারাবাহিকতা থাকবে না। একথা ২০১৩-১৪-এর প্রতিধ্বনি। সুতরাং যে কোন মূল্যে জয় চাইবে আওয়ামী লীগ। তাদের সংসদ, তাদের সরকার, তাদের প্রশাসন বজায় রেখেই হচ্ছে যে নির্বাচন, সেখানে জয় ছাড়া অন্য কিছু তাদের পক্ষে আশা করা সম্ভব নয়।

ইতিহাসে প্রথমবারের মত ২০০১ সালে স্বাভাবিক ক্ষমতা হস্তান্তরের পরে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার অভিজ্ঞতাকে স্মরণে আছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সেমত করেই বলেছেন, এবারের নির্বাচন খুব কঠিন হবে। জাতীয়-আন্তর্জাতিক নানা সমীকরন হিসেব করে মহাজোটের আঙ্গিকে নৌকা প্রতীককে সামনে রেখেই নির্বাচন করছে আওয়ামী লীগ। বিএনপি নির্বাচনে আসুক- এটি তাদের জন্য খুব স্বস্তিকর নয়, সেজন্যই সতর্কতা অনেক বেশি। স্বয়ং শেখ হাসিনা দলীয় নেতা-কর্মীদের সতর্ক করে দিয়েছেন।

কারান্তরালে থাকা খালেদা জিয়াও তার দলের নেতাদের যেকোন মূল্যে জাতীয় ঐক্য গড়ে নির্বাচনী মাঠে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি জানেন, দোধারী ক্ষুরের ওপর রয়েছেন তিনি, এবারের নির্বাচন তারজন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ! সব প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে নির্বাচনের মাঠে-অতল খাদের কিনারায় এটি তাদের টিকে থাকার সবশেষ সুযোগ, খালেদা জিয়া এবং বিএনপি নেতারা সেটি ভালো করেই জানেন। ফলে তাদের জন্য আগত নির্বাচন অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার নেই, নির্বাচনকালীন সরকারের দেখা নেই, খালেদা জিয়ার মুক্তি নেই- তবুও বিএনপিকে নামতে হচ্ছে নির্বাচনে। এতো ছাড় দিয়ে, দলের অভ্যন্তরের কট্টরপন্থীদের দাবিয়ে রেখে বিএনপি কেন নির্বাচনমুখী? সাদা কথায়- নির্বাচনকেই তারা আন্দোলনের পথ হিসেবে নিয়েছে। এজন্যই নীতি ও পুরানো বৈরীতা ভুলে গিয়ে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্ব মেনে নিয়ে গঠন করেছে জাতীয় ঐক্য ফ্রন্ট। আবার ২০ দলীয় জোটের কাঠামো বজায় রাখছে তারা।

প্রশ্ন হচ্ছে, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির আগে এই তত্ত¡ ছিল কোথায়? নির্বাচনকে তখন আন্দোলনের পথ ভাবা হয়নি কেন? প্রতিরোধে সহিংস-রক্তাক্ত পথ বেছে নিতে হলো কেন? রাজনীতির এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের তত্ত্ব-তালাশ বা মূল্যায়ন কোনটিই বিএনপি আজতক করেনি। গত একযুগে শক্তিমান প্রতিপক্ষের ‘নিশ্চিহ্নকরণ’ চেষ্টার আত্মরক্ষায় রত থেকেছে, কর্ম আর কর্মফলের বিশ্লেষণের সুযোগ পায়নি। সেটিই কি একমাত্র কারণ?

বাংলাদেশে একটি সুষ্ঠ নির্বাচন সম্পন্ন করতে এই মুহুর্তে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, এখানে কোন পক্ষই পরাজয় বরণ করতে চায় না। আবার সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলির নিরপেক্ষতা নিয়ে আকছার প্রশ্ন উঠছে, তৈরী হচ্ছে নেতিবাচক পারসেপশন। বিবাদমান পক্ষগুলি পরস্পরকে নিশ্চিহ্ন করদে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। নির্বাহী বিভাগগুলি প্রজাতন্ত্রের হওয়ার বদলে কতটা দলীয়-সে নিয়েও নানা প্রশ্ন। এখানে রাষ্ট্র কিংবা দল বা প্রতিষ্ঠান-কোথাও গণতান্ত্রিক চর্চার ধারাবাহিকতা গড়ে ওঠেনি।

তারপরেও এই দেশের মানুষের আকাঙ্খা একটি সুন্দর নির্বাচনের, এই জনআকাঙ্খাটি সরকার ও নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা অনুধাবন করলেই মঙ্গল।

সমান সুযোগ প্রাপ্তির জন্য কাকুতি-মিনতি

আমীর খসরু ::

প্রথমেই বিষয়টি স্পষ্ট করে নেয়া প্রয়োজন যে, মনে-প্রাণে অগণতান্ত্রিক শাসককূল এবং তাদের নানা কিসিমের তাবেদাররা বহু চেষ্টার পরে সাধারণ মানুষের মনের মধ্যে এই ধারণাটিকে নিয়ম বা নিয়তি বলে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন যে, আসলে নির্বাচনই হচ্ছে সামগ্রিক গণতন্ত্র। অর্থাৎ নির্বাচন হলেই গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পূর্ণমাত্রায় কায়েম ও জারি হয়ে যাবে। সার্বিক ও সামগ্রিক গণতন্ত্রকে বিদায় জানিয়ে নির্বাচনী গণতন্ত্রের মধ্যদিয়ে গণতন্ত্রহীন বা খুবই স্বল্পমাত্রার কথিত গণতান্ত্রিক শাসন- খোদ গণতন্ত্রের জন্য একটি বিশাল সংকট সৃষ্টির পাশাপাশি রাষ্ট্রের মৌল কাঠামোটি নড়বড়ে করে ফেলেছে। আর এই নড়বড়ে পরিস্থিতির সুযোগে নির্বাচনী গণতন্ত্রকে কাজে লাগিয়ে কার্যত: অগণতান্ত্রিক শাসন ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির উত্থান হচ্ছে দেশে দেশে। সংকটাপন্ন নির্বাচনী গণতন্ত্রকেও আরও সংকটময় করে তুলেছে। নির্বাচনী গণতন্ত্রও এখন বিভিন্ন দেশে কার্যত অচল অবস্থার মুখোমুখি।

ওই নির্বাচনী গণতন্ত্রই কাঠামোগত এবং প্রায়োগিক সংকটকে সঙ্গী করে, বাংলাদেশ আরেকটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। মাঝের অর্থাৎ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ছিল ওই নির্বাচনী গণতন্ত্রেরও চরম বিপন্ন ও বিপর্যস্তার কাল। এবারের নির্বাচন নিয়ে এখনো জনমনে বেশ কয়েকটি প্রশ্ন অমীমাংসিত রয়ে গেছে। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ও ড. কামাল হোসেনকে শীর্ষ নেতা করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচনে অংশ নেয়া এবং শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে টিকে থাকার যে প্রত্যয় ঘোষণা করা হয়েছে- তাকে ইতিবাচক ঘটনা হিসেবেই গণ্য করতে হবে। কারণ এর ফলে নির্বাচনী মাঠের পরিবেশ-পরিস্থিতি বেশ বড় মাপে বদলে গেছে। একতরফা নির্বাচনের অথবা নির্বাচনে ভোটারের প্রয়োজন হয় না বলে এই জমিনে যেসব কলংকজনক ঘটনাবলী ঘটেছে ইতোপূর্বে-এটি তার বিপক্ষে এবং বলা যায়, জনগণ যে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন কামনা করে এটি তারই স্বপক্ষে। কিন্তু প্রশ্ন  হচ্ছে, অংশগ্রহণমূলক হলেও আগামী নির্বাচনটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হবে কিনা। এখন পর্যন্ত যে পরিবেশ-পরিস্থিতি বিদ্যমান রয়েছে বা রাখার চেষ্টা হচ্ছে তাকে ইতিবাচক বলে নিশ্চিত করার কোনো কারণ ঘটেনি। কারণ ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন করতে গেলে ক্ষমতাসীনদের ‘রুটিন ওয়ার্ক বা সরকার পরিচালনার জন্য ন্যূনতম যতোটুকু না করলেই নয়’, ততোটুকুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে হয়; প্রশাসনের সব বিভাগকে চলতে হবে দলীয় নয়, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে এবং নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা মোতাবেক। কিন্তু বাস্তবে তা কি বিদ্যমান রয়েছে? বরং নির্বাচন কমিশনই এখনো পর্যন্ত পুরোপুরি জনআস্থা অর্জন করতে পারেনি বা কমিশনও এপর্যন্ত এমত কোন নজীর সৃষ্টি করতে পারেনি। অনেক রাজনৈতিক দল বা জোট নির্বাচন কমিশনকে ‘পুরোপুরি নিরপেক্ষ’ নয় বলে আখ্যা দিচ্ছে।

আসলে নির্বাচন কমিশন কতোটা শক্তিশালী, সক্ষমতা ও যোগ্যতার সাথে দায়িত্ব পালন করতে পারছে এবং ভবিষ্যতে পারবে তার উপরই সবার অংশগ্রহণে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান নির্ভর করে। কিন্তু যেভাবে গ্রেফতার ও নানা ধরনের মামলা চলছে, ভীতির সৃষ্টি হচ্ছে একপক্ষের নেতাকর্মীদের মনে এবং সরকার ও কর্তা ব্যক্তিদের ভাষা ও ‘বডি ল্যাংগুয়েজ’ দেখে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে জনআস্থা তৈরি হয় না। এমন একটি আস্থাহীনতার পরিবেশ এখনো পর্যন্ত বজায় থাকলেও সাধারণ মানুষ প্রত্যাশা করে, প্রত্যক্ষ করতে চায়, আস্থাশীল হতে ইচ্ছুক যে, সবার জন্য সমান সুযোগ অচিরেই তৈরি হবে। সবার জন্য সমান সুযোগ বিদ্যমান থাকা গণতন্ত্রে প্রতিদিনের, নিত্যদিনের বিষয় হওয়াই  বাঞ্চনীয় ও প্রয়োজনীয় ছিল। কিন্তু নির্বাচনের কয়েকটা দিনের জন্য সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি ও প্রাপ্তির জন্য ভিক্ষা চাওয়া, কাকুতি-মিনতি করা- নির্বাচনী গণতন্ত্র তো অবশ্যই খোদ গণতন্ত্রের জন্যও একদিকে যেমন সংকটের তেমনি রাজনৈতিক সংস্কৃতির ক্ষেত্রে একটি বিশাল দুর্ভাগ্যেরও বিষয়।

তবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, ‘নির্বাচন কমিশনের দৃষ্টিতে সবাই সমান’। প্রখ্যাত লেখক জর্জ অরওয়েল-এর বিখ্যাত বই ‘‘এ্যনিমেল  ফার্ম’’-এর সেই বিখ্যাত উক্তিটি আমার নিচের মতো করে বলতে ইচ্ছে করছে.- ‘সব রাজনৈতিক দল ও পক্ষ সমান; তবে কোন কোন রাজনৈতিক দল ও পক্ষ একটু বেশিভাবেই সমান।’ কারণ দক্ষতা, যোগ্যতাসম্পন্ন নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের দৃষ্টি, দৃষ্টিভঙ্গি, আর এর বিপরীতে যারা তাদের দৃষ্টি ও দৃষ্টিভঙ্গি এক নয়- দেখার চোখও আলাদা, মন-মস্তিক এবং মনোজগতও ভিন্ন। আর এখানেই অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও সবার অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মূল সংকটটি লুকিয়ে আছে।

নির্বাচন : রাষ্ট্র কী গণতান্ত্রিক যাত্রাপথের নিশানা খুঁজে পাবে?

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

অর্ধদশকের বড়মাত্রার অগনতান্ত্রিক শাসনেরও বোধ করি ক্লান্তি আছে। সেজন্যই কী প্রাক-নির্বাচনকালে ক্ষমতাসীনদের শীর্ষ নেতৃত্ব একটু-আধটু গণতান্ত্রিক বাত্যাবরণ চাচ্ছিলেন? অন্তত:পক্ষে দেশে এবং আন্তর্জাতিক মহলে এটি জানান দেয়া যে, তারা আলোচনা করেছেন বিরোধীপক্ষের সাথে, হোক না তা নিঃস্ফল। কিন্তু সূচনা হিসেবে এটি একেবারে মন্দ নয়। এর মধ্য দিয়ে খানিকটা হলেও বোঝানো যাচ্ছে, সবকিছু একতরফা হচ্ছেনা !

ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠিত হওয়ার পরে প্রধানমন্ত্রীর সাথে সংলাপ চেয়ে চিঠি পাঠানোর পরে সরকারের তরফ থেকে তাৎক্ষণিক সাড়া এই বার্তা দেয় যে, সরকার বরফ ভাঙ্গতে যাচ্ছে। এই ধারাবাহিকতায় আরো অনেকগুলি দল এবং জোটকে গণভবনে সংলাপের আমন্ত্রন জানান প্রধানমন্ত্রী। ‘সংলাপ’ চলতে থাকে, এমনকি প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত এরশাদ এবং ক্ষমতার অংশীদার তার দলের সাথেও সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়ে যায়।

সংলাপ প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী এবং তার দল ছিল অনেকটাই নির্ভার। তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি চেয়ারপারসন দুর্নীতির দায় মাথায় নিয়ে জেলে এবং নির্বাচনে তার অংশগ্রহন নির্ভর করছে আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর। ভাইস চেয়ারপারসন তারেক রহমান যাবজ্জীবন দন্ডিত, লন্ডনে রাজনৈতিক আশ্রয়ে, নির্বাচনে তিনি অংশ নিতে পারবেন না। সুতরাং শর্তহীন আলোচনায় ঐক্যফ্রন্ট উত্থাপিত সাতদফার একটি দাবিও না মেনে পরপর দু’দফায় সংলাপ শেষ করে ক্ষমতাসীনরা এক ধরনের ইতিবাচক ভাবমূর্ত্ইি বাগালেন বটে।

নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে আসছে, ততই যেন রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়ছে। প্রশ্ন অনেকগুলো। নির্বাচন কী যথাসময়ে অনুষ্ঠিত হবে? ইতিমধ্যে সাত দিন পিছিয়েছে। পুণ:তফসিল ঘোষিত হয়েছে। ঐক্যফ্রন্টের দাবি আরো তিন সপ্তাহ পেছানোর। আওয়ামী লীগও জানিয়ে দেয়, নির্বাচন আর পেছানো যাবেনা। একদিনও নয়, এক ঘন্টাও নয়। নির্বাচন কমিশনও স্পষ্ট জানিয়েছে, তারিখ পেছানো হবেনা।

তারপরেও কী নির্বাচন কাঙ্খিত মান অর্জনে সক্ষম হবে? জনতুষ্টিরওপর গুরুত্ব দিয়ে কমিশন কতটা অনড় থাকতে পারবে, সকল চাপ-তাপ উপেক্ষা করে? আপাতত: এর উত্তর হচ্ছে, না। সে পরীক্ষার মহড়া অনুষ্ঠিত হয়েছে, সিটি-কর্পোরেশন নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। ফলে তফসিল ঘোষণার পরেও আশঙ্কা বাড়ছে। মামলাসহ, প্রতিপক্ষ দমন প্রবৃত্তির অব্যাহত ধারা দেখে।

গত কয়েক দশক ধরেই রাষ্ট্র-সমাজ বিভাজিত। প্রতিহিংসা পরায়নতায় যে অবস্থান সমাজে তৈরী হয়েছে, তার পরিনতি দেখি নির্বাচনে ক্ষমতা বদল হওয়ার পরে। কি ভয়ঙ্কর তান্ডব নেমে আসে জনগোষ্ঠির ওপর, বিরোধী রাজনৈতিক কর্মী- সমর্থকদের ওপর- তা বাংলাদেশ প্রত্যক্ষ করছে ২০০১ সাল থেকে। এ কারনে একটি চমৎকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে, ক্ষমতা হারানোর ভয় কিংবা ক্ষমতায় না যেতে পারার আক্ষেপ!

ক্ষমতাসীনদের একটি হিসেবে বোধ করি গরমিল হয়ে গেছে! তারা ধরে নিয়েছিলেন, খালেদা জিয়া এবং তারেকের বিষয় সুরাহা না করে বিএনপি নির্বাচনে আসছে না। তারা এও সম্ভবত আশা করেছিলেন, এবার নির্বাচনে না এলে বিএনপিতে ভাঙ্গন দেখা দেবে এবং নেতা-কর্মীদের ভাগিয়ে আনা যাবে। বাস্তবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠিত হওয়া এবং এর বড়  শরীক হিসেবে বিএনপি’র নির্বাচনে আসা এবং শেষ পর্যন্ত টিকে থাকার ঘোষণা আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির নির্বাচনী কৌশল পাল্টে দিয়েছে। তারা আবারও মহাজোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করতে যাচ্ছেন, ক্ষমতা ভাগাভাগি নিশ্চিত করতে।

প্রশ্ন হচ্ছে, নির্বাচনী পরিবেশ, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত না করেই, এমনকি সাত দফার প্রায় কোন দফা না মানার পরেও নির্বাচনে যেতে হচ্ছে বিএনপিকে। কারন, এই মূহুর্তে তাদের আর কোন বিকল্প নেই। একটি নির্বাচনমুখী দল হিসেবে এখন তারা যে ট্রাকে রয়েছে, তার বাইরে তাদের কর্মী সমর্থকদের আবেগকেও গুরুত্ব দিতে হচ্ছে। নির্বাচন ও আন্দোলন-এই দুইফ্রন্ট খোলা রাখার ঝুঁকি বিএনপিকে নিতেই হচ্ছে। যে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ২০১৩-১৪ সালে, সেখান থেকে বেরোনোর এটিই তাদের সর্বশেষ সুযোগ।

যে কোন জাতীয় নির্বাচন আসলে নাম সর্বস্ব ক্ষুদ্র দল, গোষ্ঠি ও ব্যক্তিদের তৎপরতা শুরু হয়। ধর্মকেন্দ্রিক দলগুলোর সক্রিয়তাও হয়ে ওঠে লক্ষ্যণীয়। বড় দলগুলো নানা লোভ- টোপ ফেলে তাদের সাথে জোটবদ্ধ হয় অথবা সরাসরি দলে টেনে নেয়। এক্ষেত্রে এরশাদেও অবস্থান সবচেয়ে সুবিধাজনক। রাজনীতির মল্লযুদ্ধে বড় দুই দলের অবস্থান দেখেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি, আবারও ফিরেছেন মহাজোটে। প্রধানমন্ত্রীর এই বিশেষ দূত হয়েও তিনি ও তার দল ছিলেন ক্ষমতার অংশীদার, আবার সংসদের বিরোধী দলও বটে।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রধান শক্তি বিএনপি। আবার বিএনপির নেতৃত্বে রয়েছে ২০ দলীয় জোট। বি. চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিকল্পধারা দুইভাগে ভাগ হওয়ার পর তারা সরকারের সাথে গাঁটছড়া বাঁধছেন। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি মুখিয়ে আছে ইসলামী দলগুলোর সঙ্গ পাবার জন্য। এক্ষেত্রে বিএনপির পুরানো সঙ্গী জামাতের সাথে ক্ষমতাসীনদেও সম্পর্ক নিয়ে অনেক কথা রয়েছে। অন্যদিকে, হেফাজতে ইসলামের সমর্থন আওয়ামী লীগের দিকে। নির্বাচন যতই নিকটবর্তী হবে রাজনৈতিক খেলাধুলাএবং ভাঙ্গা-গড়া বাড়বে। ধর্মীয় দলগুলোর রাজনৈতিক অবস্থানও এই খেলায় সক্রিয় থাকবে।

বাম ঘরানার রাজনৈতিক দলগুলোর একটি অংশ সরকারী জোটের অংশীজন এবং ক্ষমতার ভাগীদার। গত দশ বছরে তাদের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব প্রায় বিলীন। তাদের এখন মহাজোটে থাকা ছাড়া আর কোন বিকল্প নেই। বাম গণতান্ত্রিক জোটের সিপিবি, বাসদ, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি স্বতন্ত্র অবস্থান বজায় রাখলেও বিকল্প শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারেনি। ভোটের ফলাফল যাই হোক, রাজনীতির মাঠে ছোট হলেও বাম দলগুলোর ভিন্ন ইমেজ রয়েছে। বড় দলগুলি তা পূঁজি করতে চাইবে। সুতরাং ভাঙ্গা-গড়ার খেলায় বাম দলগুলি সামিল হবেনা, এমনটি আপাতত জানান হয়েছে।

সত্তর দশকের মাঝামাঝি সামরিক শাসকদের কথিত ‘বহুদলীয় গণতন্ত্রের আবহে শুরু হয়েছিল দল ভাঙ্গা-গড়ার খেলা’। এই ভাঙ্গা-গড়ার প্রভাব একসময় বড় রাজনৈতিক দলগুলিতেও চাপ তৈরী করে। নব্বই দশকের শেষ পর্যন্ত এই দেশের রাজনীতি এই ভাঙ্গা-গড়ার খেলা প্রত্যক্ষ করেছে। সে সময়ে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, এমনকি এরশাদের জাতীয় পার্টিকেও ভাঙ্গনের মুখে পড়তে হয়। বাম ঘরানার দলগুলির ক্ষেত্রে তো কথাই নেই। তাদের অহরহ ভাঙ্গন দলের বদলে ‘ওয়ানম্যান শো’ তৈরী করে আসছে।

গণতান্ত্রিক প্রাতিষ্ঠানিকতা এই দেশে সাতচল্লিশ বছরেও কোন রূপ পরিগ্রহ করেনি। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও গণতান্ত্রিকতার চর্চা দাঁড়ায়নি। ব্যক্তি বা একক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল দল বা বিবদমান পক্ষগুলি যে যার মত জিততে চাইবে। নির্বাচনে যেই জিতুক, প্রশ্ন হচ্ছে, এ রাষ্ট্র কী গণতান্ত্রিক যাত্রাপথের নিশানা খুঁজে পাবে? নাকি আবারও একক কর্তৃত্ববাদী শাসনের নিগঢ়ে বাঁধা পড়বে অনির্দিষ্টকালের জন্য। এখানে এখন এ সকল সংকট ও সম্ভাবনা হাত ধরাধরি করে হাঁটছে।

স্বাধীন বাংলাদেশে সকল দলকে একীভূত করার একটি রাজনৈতিক চেষ্টা হয়েছিল। শেষাবধি তা রক্তাক্ত পরিনতির মধ্য দিয়ে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষণটি রেখে গিয়েছিল। কিন্তু শাসকশ্রেনী ইতিহাসের অমূল্য শিক্ষণগুলি কখনই মেনে নিতে চায়না। দার্শনিক হেগেলকে উদ্ধৃত্ত করে কার্ল মার্কস সেজন্যই বলতেন, “ইতিহাসের পুনারাবৃত্তি ঘটে, প্রথমটি যদি হয় ট্রাজেডি, তাহলে পরেরটি অবশ্যই কমেডি। আর প্রথমটি কমেডি হলে পরেরটি অবশ্যই ট্রাজেডি’’।

সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশন কী আদৌ সক্ষম?

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম সাধারন নির্বাচন হয়েছিল ১৯৭৩ সালে। এখনকার জেনারেশন ভুলে গেলেও প্রফেসর ড. আনিসুজ্জামানের “বিপুলা পৃথিবী” গ্রন্থ করতে গিয়ে স্বপ্নভঙ্গের কথা মনে পড়ে গেল। ড. আনিসুজ্জামান তখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করতেন। লিখেছেন তিনি, “…. ৭ মার্চ ১৯৭৩ দেশের প্রথম সাধারন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। আমাদের ভোটকেন্দ্র ক্যাম্পাসের সন্নিহিত এলাকায়। দুই গাড়ি করে আমরা একসঙ্গে ভোট দিতে গেলাম-উপাচার্য ইন্নাছ আলী, রেজিষ্টার মুহাম্মদ খলিলুর রহমান, ইংরেজী বিভাগের মোহাম্মদ আলী আর আমি। স্বাধীন দেশে এই প্রথম ভোট দিতে যাচ্ছি-মনের মধ্যে প্রচন্ড উৎসাহ। ভোটকেন্দ্রে গিয়ে সব উৎসাহ দপ করে নিভে গেলো। জানলাম, আমাদের ভোট দেয়া হয়ে গেছে”।

এক. বলা যায় ক্ষমতাসীন দলগুলি কখনই চায়নি যে, ভোটের মাধ্যমে জনগন তার স্বাধীন ইচ্ছে প্রকাশ করুক। শাসকশ্রেনী সবসময়ই ভুগেছে ভোটাতঙ্কে। ১৯৯১ এর আগে কোন সরকার নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন-শক্তিশালী, যোগ্য করে তুলতে চায়নি। সেই থেকে পরপর অনুষ্ঠিত তিনটি জাতীয় নির্বাচনে কিছু ত্রু টি-বিচ্যুতি থাকা সত্ত্বেও এটি গ্রহনযোগ্য মান অর্জিত হয়েছিল। সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়েও  অর্থাৎ ২০০৮ সালে হুদা কমিশন যে সকল প্রাতিষ্ঠানিক ইতিবাচকতা অর্জন করেছিল, দুর্ভাগ্যক্রমে রাজনৈতিক সরকারের আমলে সেগুলি ভেস্তে যায় এবং ভোট কালচার বদলাতে থাকে। যার একটি বড় উদাহরন দশম জাতীয় সংসদ  নির্বাচন।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেমন হবে? সঠিক সময়ে, সব দলের অংশগ্রহনে মানসম্মত একটি নির্বাচন কি হবে? বর্তমান নির্বাচন কমিশন কি গ্রহনযোগ্য একটি নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে সক্ষম? সদ্য সমাপ্ত সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন সম্পন্ন করতে গিয়ে অজস্র প্রশ্নবোধক ঝুলিয়ে দিয়েও তারা মনে করছেন, ঐ নির্বাচন সুষ্ঠ এবং অবাধ হয়েছে। এসবের মধ্য দিয়ে নির্বাচন কমিশন ক্ষমতাসীন দল ও জোটের আস্থা অর্জনে সক্ষম হলেও অন্যান্য দল ও জোটের আস্থা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।

একাদশ জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হচ্ছে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে, যা এখন আজ-কালের ব্যাপার। নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসেবে গত বছর ২৪ আগষ্ট থেকে শুরু করে ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন নিবন্ধিত ৪০টি রাজনৈতিক দলের সাথে সংলাপ করে। আলোচনাকালে দলগুলি নির্বাচন প্রসঙ্গে প্রায় সাড়ে চার’শ প্রস্তাব উপস্থাপনা করেছিল। এসব প্রস্তাবের মধ্যে কয়েকটি ঘুরে-ফিরে আলোচনায় আসছে, এবং আসতেই থাকবে অন্তত: নির্বাচনের আগ পর্যন্ত।

প্রস্তাবগুলো হচ্ছে; ১. নির্বাচনকালীন সরকার কেমন হবে? ২. নির্বাচনে সেনাবাহিনীকে কিভাবে ব্যবহার করা হবে? ৩. নির্বাচনী আসনের সীমানা পুন:নির্ধারন করা হবে কিনা? ৪. ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার হবে কিনা? নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে দেশের প্রধান দুই দল ও তাদের রাজনৈতিক মিত্রদের অবস্থান বিপরীত মেরুতে। সম্প্রতি ড. কামালের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ঐক্যফ্রন্ট, যার বড় অংশীদার বিএনপি এবং বাম গণতান্ত্রিক জোটও নির্বাকালীন সরকার প্রশ্নে একই মেরুতে।

সরকারী দল ও তার মিত্ররা বর্তমান দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের বিকল্প কিছু ভাবতে চাচ্ছে না। তারা সবাই এখন এটিকে ‘সাংবিধানিক’ মনে করছেন এবং এর বাইরে চুল পরিমানও নড়বেন না-এই বক্তব্য জোরে-সোরে জানান দিতে ভুল করছেন না। অন্যদিকে, বিএনপি এবং তার মিত্ররা নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের দাবি জোরে-সোরে তুলেছেন। এজন্য তারা প্রয়োজনে সংবিধান সংশোধনের কথাও বলছেন।

নির্বাচনকালীন সময়ে সেনাবাহিনীকে ম্যাজিট্রেসি ক্ষমতা দেয়ার দাবি বিএনপির। ক্ষমতাসীনরা অবশ্য মনে করে নির্বাচনে পুলিশসহ অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়োগই যথেষ্ট। এক্ষেত্রে তারা দেশরক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত সেনাবাহিনীকে নিয়োগের প্রয়োজন মনে করছেন না। নির্বাচন কমিশন সীমিত আকারে ইভিএম ব্যবহার করতে চায় এবং ক্ষমতাসীন দলও তাই চায়। এ ব্যাপারে অন্যান্য দলের অবস্থান অনড়, তারা ইভিএম ব্যবহার চান না। সীমানা পুন:নির্ধারন প্রশ্নেও তাদের অবস্থান বিপরীত মেরুতে।

দুই. জরুরী প্রশ্নটি হচ্ছে, রাজনৈতিক দলগুলোর এমন পরস্পর বিরোধী দাবি মেটানোর ক্ষমতা কমিশনের কতটুকু আছে এবং সুষ্ঠ ও অবাধ নির্বাচন নিশ্চিত করার ‘ইচ্ছাশক্তি’ আদৌ আছে কীনা? যদিও সুপ্রীমকোর্টের একটি ঐতিহাসিক রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা আছে, সুষ্ঠ-অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশন যে কোন আইন করতে পারবে – কিন্তু কোন কমিশনই এ পর্যবেক্ষণকে আমলে নিয়ে কোন আইন করেছেন, এমন দৃষ্টান্ত নেই। সুতরাং এই নির্বাচন কমিশনও গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসাবে এবং নতুন কোন নজির স্থাপন করবে বলে আভাস মেলেনি।

বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসের অতীত বলে, এখানে সবসময় নির্বাচন কমিশন সেই কার্যক্ষমতাই দেখিয়েছে, যেরকমটি নির্বাচনকালীন সরকার চেয়েছে। নির্বাচনকালীন সরকার, রাজনৈতিক দলীয় হলে তাদের বিজয়ই অক্ষুন্ন থেকেছে। ১৯৭৩ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত যতবার দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হয়েছে, ক্ষমতাসীনদের বিজয় নিশ্চিত হয়েছে। সে অর্থে নির্বাচন কমিশন সব সময় দলীয় সরকারের ইচ্ছেকেই প্রধান্য দিয়েছে।

অন্যদিকে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসনামলেও তারা যেভাবে নির্বাচন করতে চেয়েছেন, নির্বাচন কমিশন সেভাবেই নির্বাচন সম্পন্ন করেছে। স্বাধীন-সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান বলা হলেও বাংলাদেশে তার কোন প্রমান অতীতে কোন নির্বাচন কমিশন দেখাতে পারেনি। সুতরাং বর্তমান নির্বাচন কমিশনের সদস্যদের অতীত কর্মকান্ড পর্যালোচনা করলে যে কেউ বলতে পারবে, নির্বাচনকালীন সরকারের ইচ্ছেকে বাদ দিয়ে নিজেদের স্বাধীন সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগে প্রয়াসী হওয়ার মত সাহস বর্তমান নির্বাচন কমিশন দেখাবে- আপাতত: এর চেয়ে দুরাশা আর কি হতে পাবে!

সংবিধানমতে, সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন হবে। সুতরাং এই মধ্যবর্তী সময়ে কমিশনের যদি কিছু করার না থাকে, তাহলে অন্তত তফসিল ঘোষণার পরে নির্বাহী প্রতিষ্ঠানের ওপরে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে জনআস্থা অর্জণ করতে পারে। সরকারের প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রীরা সরকারী কাজে গিয়ে নির্বাচন প্রচারনা চালাচ্ছেন, এটি মেনে নিয়ে কমিশন পূর্বতনদের নজির অব্যাহত রাখছে। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরীতে এটিই সবচেয়ে বড় অন্তরায়। রাজনৈতিক সমঝোতার ব্যাপারে যেহেতু ইসি’র কিছু করণীয় নেই, অনুকূল পরিবেশ ও বিশ্বাসযোগ্যতা সৃষ্টিতে তারা অন্তত: নির্বাহী বিভাগের লাগামটি টেনে ধরতে পারে।

বর্তমান নির্বাচন কমিশনের ভূমিকাও নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে মনে হয় না। ইতিপূর্বে সিইসি আজিজ কমিশন, রকিব কমিশনের সাথে দৃশ্যত: বর্তমানটিও একাকার হয়ে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গেলো নির্বাচন কমিশন আজ্ঞাবহতা, দুর্বলতা, মেরুদন্ডহীনতা ও পরাধীনতার যে নজির রেখে গিয়েছিল সেটি অব্যাহত থাকছে। ফলে ব্যতিক্রমী কিছু না ঘটালে, মেরুদন্ড সোজা করে না দাঁড়ালে জনগনের আস্থা-বিশ্বাস সহসাই ফেরানো যাবে না।

তিন. এই দেশে সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাস খুব লম্বা নয়। দেশটির জন্মের পরে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সামরিক শাসনে কেটেছে ১৭ বছর। ১৯৯০ সালের পরে নির্বাচনমুখী সংসদীয় গণতন্ত্রের একটি ধারা গড়ে উঠতে গিয়েও মুখ থুবড়ে পড়েছে বারবার। এখানে সংসদীয় ধারার নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা সবসময়ই স্বেচ্ছাচারিতায় পর্যবসিত হয়ে কর্তৃত্ববাদী শাসনের পিষ্ট করেছে জনগনকে। ফলে ক্ষমতাসীন কোন দলের পক্ষেই নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের রেকর্ড নেই। কারণ দলের রাজনৈতিক অস্তিত্বের জন্য সেটি মোটেই স্বস্তির নয়।

ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স প্রকাশিত “বাংলাদেশের শাসন পরিস্থিতি ২০১৪-১৫” সংক্রান্ত বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল কেউ সংবিধান লংঘন করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্বাচন কমিশন বাধ্য। কিন্তু অকার্যকর নেতৃত্ব ও নির্বাহী বিভাগের চাপে কার্যত: এমন ব্যবস্থা নেয়ার কোন নজির নির্বাচন কমিশনের নেই। ফলে সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের আয়োজন বহুদুরের লক্ষ্য হিসেবে রয়ে গেছে। রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর প্রভাব খাটানো, অনাস্থা ও বর্জন কমিশনকে বিতর্কের মধ্যে ঠেলে দেয়।

প্রাণ প্রকৃতি বাংলাদেশ-১

আনু মুহাম্মদ ::

 ‘মানুষ ছাড়া বন বাঁচে

বন ছাড়া মানুষ বাঁচে না।

মানুষ ছাড়া নদী বাঁচে

পানি ছাড়া মানুষ বাঁচে না।।’

তাই একটি দেশের বস্তুগত উন্নয়ন কতোটা মানুষের জন্য তা বুঝতে শুধু অর্থকড়ির পরিমাণ বৃদ্ধি দেখলে হবে না।

তাকাতে হবে বন নদী পানিমানুষসহ সর্বপ্রাণের দিকে

 

পুঁজিবাদের বিকাশ ও উন্নয়নের পরিসংখ্যান :

সন্দেহ নেই, গত চারদশকে বাংলাদেশে পুঁজিবাদের বিকাশ ঘটেছে সকল ক্ষেত্রে। গত দুদশকে এর বিকাশ মাত্রা দ্রুততর হয়েছে। ধনিক শ্রেণীর আয়তন বেড়েছে। কয়েক হাজার কোটিপতি সৃষ্টি হয়েছে, স্বচ্ছল মধ্যবিত্তের একটি স্তর তৈরি হয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ ঘটেছে। এই বিকাশ প্রক্রিয়ায় দেশের সমাজ অর্থনীতির সকল ক্ষেত্র এখন পুঁজির আওতায়, একইসাথে একই প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেক বেশি বিশ্ব অর্থনীতির সাথে অঙ্গীভূত।

পুঁজিবাদের এই বিকাশ নিয়ে সরকারি উচ্ছ্বাস সীমাহীন। উন্নয়নে সরকার সার্থক বলে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবিসহ অর্থনীতিবিদদের মধ্যে স্তুতিগানের কমতি নেই। এই স্তুতি বন্দনায় বিশেষভাবে ৭০ দশকের শুরুতে প্রকাশিত একটি বই-এর কথা টানা হয়, নাম – বাংলাদেশ: এ টেস্ট কেস অব ডেভেলপমেন্ট [1]  এর লেখক ছিলেন ১৯৭২-৭৪ সালে ঢাকার বিশ্বব্যাংকের আবাসিক প্রতিনিধি জাস্ট ফাল্যান্ড এবং একই সময়ে ঢাকায় বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র অর্থনীতিবিদ জে . আর. পারকিনসন। এই গ্রন্থে স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশ নিয়ে গভীর হতাশা ব্যক্ত করা হয়েছিল। বিশ্বব্যাংকের দর্শন অনুযায়ী তাঁরা পুঁজিবাদ বিকাশের সম্ভাবনাই বিচার করেছিলেন। তাঁদের বক্তব্যে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশের এমনই অবস্থা যে, যদি বাংলাদেশের উন্নয়ন হয় তাহলে বিশ্বের কোথাও উন্নয়ন কোনো সমস্যা হবে না। এই হতাশাব্যঞ্জক কথার সূত্র টেনে বর্তমান বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সূচক তুলনা করে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করা হয়।

কিন্তু স্বাধীনতার পর বিপুল প্রত্যাশা আর তার বিপরীতে রাষ্ট্রের যাত্রা নিয়ে সেসময়ের অন্য আরও কিছু বই আছে যেগুলোর প্রসঙ্গ টানলে বিশ্লেষণ ভিন্ন হবে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য তৎকালীন পরিকল্পনা কমিশনের প্রধান নূরুল ইসলাম এবং সদস্য রেহমান সোবহান, আনিসুর রহমানের অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা বই।[2]  যদি আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিশ্লেষণ করি, যদি মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী জনগণের প্রত্যাশা বিবেচনা করি, যদি স্বাধীনতা ঘোষণাপত্রে যে তিনটি লক্ষ্য নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছিলো সেই সাম্য, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদা- বর্তমান উন্নয়ন ধারায় কতটা অর্জিত হয়েছে তার বিচার করি, তাহলে উচ্ছ্বাসের বদলে উন্নয়নের গতিধারা নিয়েই প্রশ্ন আসবে। যদি ধনিক শ্রেণীর আয়তন ও জিডিপি বৃদ্ধির পাশাপাশি কতো নদী বিনাশ হলো, কতো বন উজাড় হলো, বাতাস কতো দূষিত হলো, মানুষের জীবন কতো বিপন্ন হলো, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বঞ্চনা ও বৈষম্য কতোটা বাড়লো, শ্রেণী-লিঙ্গীয়-ধর্মীয়-জাতিগত বৈষম্য নিপীড়ন কী দাঁড়ালো তার হিসাব করি তাহলে  উন্নয়নের সংজ্ঞা পাল্টাতে হবে।

সরকারি হিসাবে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার বার্ষিক ৭ শতাংশের বেশি এবং মাথাপিছু আয় এখন বার্ষিক ১৬শ’ মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে।[3]  গত ১০ বছরের গড় হিসাবে বিশ্বের সবচাইতে উচ্চহারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ঘটেছে নাওরু, ইথিওপিয়া, তুর্কমেনিস্তান, কাতার, চীন এবং উজবেকিস্তানে। এক দশকের গড় হিসাবে দ্রুত প্রবৃদ্ধির তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ২০। তবে ২০১৭ সালের প্রবৃদ্ধি হার বিবেচনায় বাংলাদেশের অবস্থান ৫ম। বাংলাদেশের চাইতে বেশি, সমান ও কাছাকাছি প্রবৃদ্ধি হার অর্জনকারী অন্যদেশগুলো হলো: ইথিওপিয়া, মিয়ানমার, ভারত, কম্বোডিয়া, তানজানিয়া, লাওস, ফিলিপাইন, আইভরিকোস্ট ও সেনেগাল।[4]

ভারতে মাথাপিছু আয় ও জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার গত এক দশক ধরে বেশ ভালো দেখালেও তার পদ্ধতিগত বিষয় নিয়ে সেখানকার অর্থনীতিবিদরা অনেক প্রশ্ন তুলছেন, বিতর্ক হচ্ছে। ডাটা-র গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।[5]  ভারতের তুলনায় বাংলাদেশের তথ্য উপাত্ত পরিসংখ্যান হিসাব নিকাশ প্রবৃদ্ধির গতিপ্রকৃতি নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ অনেক বেশি থাকলেও বাংলাদেশে এনিয়ে তেমন কোনো আলোচনা নেই, কোনো বিতর্ক নেই। সরকারি ভাষ্যের সাথে মেলে না এরকম যুক্তি, তথ্য,  প্রশ্ন আর বিতর্ক সরকার পছন্দ করে না বলে প্রায় সকল অর্থনীতিবিদ, থিংক-ট্যাংক, মিডিয়াও বিনাপ্রশ্নে সব গ্রহণ করতে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে। যাইহোক, কতটা এবং কীভাবে তা নিয়ে অনেক প্রশ্নের অবকাশ থাকলেও জাতীয় আয় নিশ্চিতভাবেই বেড়েছে।

কোনো দেশের অর্থনীতিকে জিডিপি/জিএনপি এবং মাথাপিছু আয় দিয়ে পরিমাপ করায় বিশ্বব্যাংক- আইএমএফ-ই প্রধান পথনির্দেশকের ভূমিকা পালন করে। এই পদ্ধতি সারা দুনিয়ার কর্পোরেট শাসকদের প্রিয়, কেননা এতে অনেক সত্য আড়াল করা যায়। বিশ্বব্যাংকই সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে মাথাপিছু আয়ের ভিত্তিতে তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করে থাকে। এগুলো হল: (১) নিম্ন আয়ভুক্ত দেশ (মাথাপিছু আয় ১ হাজার ২৫ মার্কিন ডলার পর্যন্ত)। (২) নিম্ন মধ্য আয়ভুক্ত দেশ (১ হাজার ২৬ মার্কিন ডলার থেকে ৪ হাজার ৩৫ ডলার); (৩) উচ্চ মধ্যম আয় (৪ হাজার ৩৬ মার্কিন ডলার থেকে ১২ হাজার ৪৭৫ ডলার)। (৩) উচ্চ আয়ভুক্ত দেশ (১২ হাজার ৪৭৬ মার্কিন ডলার থেকে বেশি )।

মাথাপিছু আয়সহ আরও কিছু বিষয় নিয়ে জাতিসংঘেরও বিভাজন আছে। তাদের মাপকাঠি অনুযায়ী স্বল্পোন্নত দেশ গ্রুপের পরের ধাপ উন্নয়নশীল (developing)) দেশ; এই পর্বের দেশগুলোকে কম (less developed) বা অনুন্নত (underdeveloped)  দেশও বলা হয়। তাদের সর্বশেষ  তালিকা অনুযায়ী বিশ্বের  ৪৭টি দেশ ও দ্বীপপুঞ্জ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকাভুক্ত। এর মধ্যে ৩৩টি আফ্রিকায়। এশিয়া ও প্যাসিফিক অঞ্চলে আছে ১৩টি, ল্যাটিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ানের মধ্যে একমাত্র হাইতি স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে চিহ্নিত। এশিয়ার মধ্যে তালিকাভুক্ত দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ছাড়াও ছিল আফগানিস্তান, ভুটান, কম্বোডিয়া, লাওস, মিয়ানমার ও নেপাল। জাতিসংঘের বিবেচনায় সবচাইতে দরিদ্র এবং দুর্বল দেশগুলো নিয়ে স্বল্পোন্নত দেশের গ্রুপ গঠন করা হয় ১৯৭১ সালে। বাংলাদেশ এই তালিকাভুক্ত হয় ১৯৭৪-৭৫ সালে।

৪৭ বছর আগে এই গ্রুপ গঠন করবার পরে এর মধ্যে মাত্র ৫টি দেশ স্বল্পোন্নত তালিকা থেকে পুরোপুরি বের হতে পেরেছে। এগুলো হল বতসওয়ানা, কেপ ভার্দে, ইকুয়েটরিয়াল গিনি, মালদ্বীপ এবং সামোয়া। জাতিসংঘের কমিটি বলেছে, আগামী ৩ বছরে আরও দুটি দেশ ভানুয়াতু এবং এ্যাঙ্গোলা এই উত্তরণের তালিকায় আছে। নেপাল এবং তিমুরও শর্ত পূরণ করেছে। তবে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় তাদের বিষয়টি ২০২১ সালে অনুষ্ঠিতব্য পরবর্তী সভায় বিবেচনার জন্য রাখা হয়েছে।

গত ১৫ মার্চ জাতিসংঘের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ, লাওস এবং মিয়ানমার প্রথমবারের মতো স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশ তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য শর্ত পূরণ হয়েছে। আরও কয় বছর দ্বিতীয় দফায় শর্ত পুরণ করতে পারলে চুড়ান্ত ভাবে এলডিসি তালিকা থেকে এ দেশগুলো বের হতে পারবে।[6]

একটি দেশে জিডিপি অনেক বেশি হলেও যে টেকসই উন্নয়ন দুর্বল হতে পারে, মাথাপিছু আয় বেশি হলেও যে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবনযাত্রার মান নিম্ন হতে পারে এবিষয় স্পষ্ট করে অনেক গবেষণামূলক কাজ হয়েছে নানাদেশে। অমর্ত্য সেন এবিষয় পরীক্ষা নিরীক্ষা নতুন প্রস্তাবনা হাজির করেছেন। মাহবুবুল হকের সাথে ‘মানব উন্নয়ন সূচক’ ধারণা প্রবর্তন করেছেন, যার ভিত্তিতে জাতিসংঘ এখন নিয়মিত রিপোর্ট প্রকাশ করে থাকে। জোসেফ স্টিগলিজসহ মূলধারার বহু অর্থনীতিবিদ অর্থনীতি পরিমাপের পদ্ধতি হিসেবে জিডিপি ব্যবহারের সার্থকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।[7]

ভারতের ভেতরেই রাজ্য থেকে রাজ্য তাৎপর্যপূর্ণ তফাৎ পাওয়া যায়। আফ্রিকার বহু দেশে মাথাপিছু আয় বাংলাদেশের চেয়ে বেশি, মধ্যম আয়ের বিবরণে তারা বাংলাদেশ থেকে অনেক আগে থেকেই এগিয়ে, কিন্তু মানুষের জীবনযাত্রার মান নিম্ন। মিয়ানমারে মাথাপিছু আয় বাংলাদেশের প্রায় সমান, মানে তারাও নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ। মিয়ানমারও একইসঙ্গে স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশে যাবার শর্তপূরণ করেছে। নাইজেরিয়ার মাথাপিছু আয় বাংলাদেশের দ্বিগুণেরও বেশি। কিন্তু তাদের জীবনযাত্রার মান বাংলাদেশের চাইতে দ্বিগুণ ভালো, এটা বলা যাবেনা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বরং আরও খারাপ। সেজন্য মানব উন্নয়ন সূচকে নাইজেরিয়া বাংলাদেশেরও পেছনে।

প্রকৃতপক্ষে জি ডি পি দিয়ে একটি দেশের আর্থিক লেনদেন বা বাণিজ্যিক উৎপাদন, বিতরণ, পরিষেবার বিস্তার সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়, কারণ যেকোনো লেনদেন ও বাণিজ্যিক তৎপরতা বৃদ্ধিতেই জিডিপি বাড়ে। কিন্তু এরজন্য সামাজিক ও পরিবেশগত কোনো ক্ষতি হলে তা হিসাবে বিবেচনা করা হয় না। সেকারণে এর মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠ  মানুষের সামাজিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বোঝা যায় না, অর্থনীতির গুণগত অগ্রগতিও বোঝা যায় না।

যেমন চোরাই অর্থনীতির তৎপরতাতেও জি ডি পি বাড়ে কিন্তু সমাজের বড় একটা অংশের জীবন জীবিকা তাতে বিপদগ্রস্ত হয়। নদীনালা, খালবিল, বন দখল ও ধ্বংসের মাধ্যমেও জি ডি পি বাড়তে পারে, কিন্তু তা দীর্ঘ মেয়াদে  টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করে না, বরং অর্থনীতিকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে। এসব তৎপরতায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের প্রকৃত আয় বৃদ্ধি পায় না বরং জীবনমান বিপর্যস্ত হয়। দুর্নীতি ও অপচয়ের কারণে প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি পেলেও তার কারণে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিও বড় দেখায়, জিডিপির অংকও বাড়ে। একইসময়ে শিক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ কমে এসেছে তার ব্যয়বৃদ্ধির কারণে। কিন্তু এই ব্যয়বৃদ্ধি আবার জিডিপি বাড়ায়। অনিয়ন্ত্রিভাবে গৃহীত বৃহৎ প্রকল্পে ব্যয়ের লাগামহীন বৃদ্ধি, আর্থিক খাত থেকে অভাবনীয় মাত্রায় লুন্ঠন ও পাচারও জিডিপি বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।

দ্বিতীয়ত, যে সমাজে বৈষম্য বেশি সেখানে মাথাপিছু আয়ের হিসাব বিভ্রান্তিকর তথ্য দেয়। একটি পরিবার যদি দশ লক্ষ টাকা আয় করে, পাশাপাশি অন্য একটি পরিবার যদি দশ হাজার টাকা আয় করে তাহলে উভয় পরিবারের গড় আয় হবে পাঁচ লাখ পাঁচ হাজার টাকা। এতে কি দুই পরিবারের প্রকৃত অবস্থা বোঝা যায়? বর্তমান মাথাপিছু আয় হিসাবে আমাদের দেশে চার সদস্যের পরিবারের বার্ষিক গড় আয় হয়  প্রায় ৭ হাজার মার্কিন ডলার অর্থাৎ মাসে প্রায় ৫৭ হাজার টাকা। তারমানে বাংলাদেশের সকল নাগরিক শিশু বৃদ্ধ নারীপুরুষ সকলেরই মাথাপিছু আয় মাসে এখন প্রায় ১৪ হাজার টাকা! অথচ সরকারি পরিসংখ্যান বলে বাংলাদেশের শতকরা ৮০ জন  মানুষের মাসিক আয় এর থেকে অনেক নিচে। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু গড় আয় যত শতকরা ৮০ ভাগ মানুষ পায় তার মাত্র ৩০ শতাংশ। (নাজমা জেসমিন চৌধুরী স্মারক বক্তৃতা ২০১৮)

[1]Just Faaland, J.R. Parkinson: Bangladesh A Test Case of Development, S. chand, New Delhi, 1977.

[2]মো: আনিসুর রহমান: পথে যা পেয়েছি, ২য় পর্ব, অ্যাডর্ণ পাবলিকেশন, ঢাকা, ২০০৪। একই লেখকের Anisur Rahman: The Lost Moment, UPL,Dhaka, 1993. Ges Nurul Islam: Development Planning in Bangladesh, UPL, 1981. এছাড়া আরও দেখুন- – – Rehman Sobhan and  Muzaffar Ahmed: Public enterprise in an intermediate regime: a study in the political economy of Bangladesh. Bangladesh Institute of Development Studies,  1980.

[3] বাংলাদেশ সরকার: বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১৮।

[4]https://www.gfmag.com/global-data/economic-data/countries-highest-gdp-growth-2017

[5]Amiya Kumar Bagchi:“What an Obsession with GDP Denotes”, Economic & Political Weekly EPW, September 1, 2018.

[6] একই বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়েছে যে, ভুটান, কিরিবাতি সাওতোম এবং সলোমন দ্বীপপুঞ্জ ইতোমধ্যে সব শর্ত পূরণ করে অর্থাৎ জাতীয় আয় এবং শিক্ষা-চিকিৎসার শর্ত পূরণ করে স্বল্পোন্নত দেশের গ্রুপ থেকে বের হবার এবং উন্নয়নশীল দেশ কাতারে দাঁড়ানোর যোগ্যতা অর্জন করেছে। তাদের নাম এখন জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) জাতিসংঘের ইকনমিক এ্যান্ড সোশাল কাউন্সিল এ পাঠাবে, সেখান থেকে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গিয়ে তা চুড়ান্ত হবে।

[7]`দীপ্তি ভৌমিক: জিডিপি- উচ্ছ্বাস ও বাস্তবতা। সর্বজনকথা, ফেব্রুয়ারি ২০১৭।: : Debra Efroymson: Beyond Apologies: Defining and Achieving an Economics of Wellbeing, March 2015, Institute of Wellbeing, Dhaka.

বাংলাদেশের চাইতে ভুটানের মাথাপিছু আয় দ্বিগুণেরও বেশি। তারপরও ভুটান জিডিপির এই হিসাব পদ্ধতিকে প্রত্যাখ্যান করে তাদের নিজস্ব উদ্ভাবনী পদ্ধতি ব্যবহার করছে। এর নাম মোট জাতীয় সুখ (গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস)। এতে সর্বমোট ৯টি ক্ষেত্র বিবেচনার অন্তর্ভুক্ত করা হয় : মানসিক ভালো থাকা, সময়ের ব্যবহার, সম্প্রদায়, জীবনীশক্তি, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, বাস্তুতান্ত্রিক স্থিতিস্থাপকতা, জীবনযাত্রার মান, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সুশাসন। এছাড়া এসসব ক্ষেত্রের সাথে মাথাপিছু আয় সহ ৩৩টি নির্দেশক আছে। অন্যান্য নির্দেশক হলো নিরাপত্তা, সাম্প্রদায়িক সম্পর্ক, সাক্ষরতা, বাস্তুতান্ত্রিক বিষয় এবং ঘুম এবং কাজে ব্যয়কৃত সময়।