Home » রাজনীতি (page 5)

রাজনীতি

নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন-নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র : রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের অন্দরে-বাহিরে

তোফাজ্জ্বেল হোসেন মঞ্জু ::

রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের বাহির ও ভিতর ব্যাপারটা প্রথমেই পরিষ্কার করে নিচ্ছি। রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের বাহির বলতে, যা কিছু প্রকাশিত, ঘোষিত এবং প্রতিটি পক্ষই নিজের বক্তব্য মেনে নিচ্ছেন। অন্যদিকে, ভিতরের ব্যাপারটা অতটা প্রকাশিত নয়, কেউ বললেও প্রত্যাখান করছেন বা নিরব থাকছেন। আমরা বর্তমান রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের যা কিছু গণমাধ্যমে পাচ্ছি সেটা বেশিরভাগ বাইরের রূপ। দ্বন্দ্বের বাইরের রূপটা মিথ্যা বা অসত্য বলছি না, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। তবে ভেতরের বিষয়টা প্রকাশিত ও জানা না গেলে দ্বন্দ্বটা পুরোপুরি অনুধাবন করা যাবেনা। ভিতরের সত্য ঘিরে সব যুগে রহস্য থাকে। আমরা যাকে রাজনৈতিক গসিপ বলি তা দ্বন্দ্বের ভিতরের উপাদান ঘিরে। কিন্তু এটাও ঠিক চলতি রাজনৈতিক ধারায় ও ভিতরের সত্য জানার ও উদঘাটনের প্রচেষ্টা আছে। স্ট্রিং অপারেশন সেরকম একটি প্রচেষ্টা। স্ট্রিং অপারেশন এর মধ্য দিয়ে সম্প্রতি ভারতের গণমাধ্যমে ও শাসকদলের মধ্যে অর্থের বিনিময় সহযোগিতার করার মনোভাব প্রকাশিত হয়েছে। স্ট্রিং অপারেশন বাইরেও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, গবেষণা, সাক্ষাৎকার – রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের ভিতরে আলো ফেলতে চেষ্টা করা হচ্ছে; সময় ও ইতিহাস ভিতরে সত্যটা তুলে ধরে। ভিতরের সত্য অনুসন্ধানে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক দর্শণ গুরুত্বপূর্ণ। ভিতরের বিষয় বলতে তথ্য ও প্রমাণ সংগ্রহ ক্ষেত্রে নয়া উদারনৈতিক, রক্ষণশীল, কর্তৃত্ববাদী দর্শনের পার্থক্যের কারণে ভিতরের বিষয় ব্যাখা বিশে¬ষণে পার্থক্য হয়। বলা হয়ে থাকে কোন চোখ থেকে দেখছি। এ চোখ তৈরী হয় রাজনৈতিক বিশ্বাস থেকে। ব্যক্তি ও শ্রেণী স্বার্থে রাজনৈতিক বিশ্বাসের পরিবর্তন হয়, দেখার চোখ এক হয়না। এ আলোচনার প্রেক্ষিতে বর্তমান রাজনীতির বাইরের ও ভেতরের বিষয় চিহ্নিত করতে হবে। বাইরের বিষয়গুলো অর্থাৎ নিবার্চন ভিত্তিক রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা; এর ভিতরের বিষয় হচ্ছে রাষ্ট্র ক্ষমতায় টিকে থাকা ও রাষ্ট্র ক্ষমতা পরিবর্তন আনার বহুমুখী কৌশল।

নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন ও নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্রের পর : বাংলাদেশের রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের বাহিরের দিকটায় রূপান্তর হয়েছে- এখন জোরেশোরে উন্নয়নের নামে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন, নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্রের ফেরিওয়ালা ঘুরে বেড়াচ্ছে, এর শুরু ২০১৪ এর ৫ই জানুয়ারীর নির্বাচন থেকে। এ নির্বাচনকে প্রতি-নির্বাচনই (Counter Election)  বলবো। নির্বাচনকে নির্বাচন দিয়ে ধ্বংস  না করা হলেও এর ক্ষয় করা হয়েছে। ১৫৪ জন সাংসদ প্রতিযোগিতাহীনভাবে নির্বাচিত হয়েছেন; এধরনের একটি নির্বাচনের বৈধতা অর্জন দেশে বিদেশে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল শাসকদলে। কিন্তু শাসকদল গিনেস বুক রেকর্ড তৈরী করে এ নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে সব প্রশ্নকে নিঃশেষ করতে সফল হয়েছেন।

শাসকদল এমন একটা অবস্থা তৈরী করলেন, নির্বাচন কিভাবে হয়েছে সেটা বড় কথা নয়- দেশ কিভাবে চলছে দেখুন, দূর্বল নয়, শক্তিশালী’র শাসন। শক্তিশালী শাসক ও শাসন আপনাকে স্বপ্নের সোনার বাংলায় পৌঁছে দেবে- এভাবে কারো ধারণা থেকে নয়, শাসকদের অন্তর্গত দর্শণ থেকে বেরিয়ে আসে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন ও নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র।

নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনে সকলে যে যার কাজ করতে পারবেন, তবে কেউই সীমা লংঘন করতে পারবেন না, সীমা লংঘন করলেই শাস্তি ও বিতাড়ন। সীমার মধ্যে থাকলে শান্তি ও পুরষ্কার। মিলিয়ে দেখুন প্রধান বিচারপতি যতদিন সীমার মধ্যে ছিলেন, পুরষ্কার পেয়েছেন, যখনই সীমা লংঘন করেছেন তখনই ভিন্ন পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো। খালেদা জিয়া যখন আন্দোলন পরিহার করে ব্যক্তিগত দলীয় জীবন যাপন করেছেন, তখন বড় কোন শাস্তি ছিলনা, কিন্তু খালেদা জিয়া উন্নয়নমুখী গণতান্ত্রিক নির্বাচনের হুমকি হতে পারেন, তখনই ভিন্ন পরিস্থিতি। তাদের মনোবাসনা, নির্বাচন এমনভাবে পরিচালিত করতে হবে যাতে ‘‘তাদের নির্বাচন’’ উন্নয়নের অন্তরায় না হয়। কাজেই ৫ই জানুয়ারী-২০১৪ এর মতো অতোটা নয়, ২০১৮/১৯ এর পোষাক পড়িয়ে ভদ্র নির্বাচন করা, যেখানে সকলে অংশগ্রহণ করবে, সাংসদ নির্বাচিত হবেন, কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবেন বর্তমান শাসক দল ও সরকার গঠন করবেন তারা-এটাই ভাবনা। বর্তমান রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের বাইরের চেহারাটা এরকমই দাড়িয়েছে।

ভিতরটা বোঝার মত তথ্য উপাত্ত কম। দ্বন্দ্বের ভিতরটা পরিষ্কার নয়, বিরোধী দলের কাছে তাদের প্রশ্ন হচ্ছে  খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে নির্বাচন না আন্দোলন? এর মধ্যে আন্দোলনের কোন ঈঙ্গিত নাই, দানা বাঁধেনি আন্দোলনের বিষয়; আন্দোলনের খতম। এখানে প্রশ্ন দাড়িয়েছে নির্বাচন হবে, না নির্বাচন বয়কট। শ্লোগান কী হবে- খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে নির্বাচন হবে না।

দ্বন্দ্বের ভিতরের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন কে, কিভাবে শাসকদলে বৈরিতা করছে, করবে? নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনে রাষ্ট্রীয় শক্তির সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন হবে। সাধারণভাবে সরকারী কর্মচারীদের আগাম পুরস্কৃত করা হচ্ছে, গত দু’আমলে একদল উপকারভোগী তৈরী হয়েছে। তবে দ্বিতীয়বার নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্রের সফল যাত্রা শুরু হবে কি? রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের এখন বর্তমান বাইরের ও ভিতরের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এটি। কিন্তু নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্রের একটি কাঠামোগত দূর্বলতা রয়েছে। আপাতত: সকল অনুগত, সকল নিয়ন্ত্রিত নাগরিক কিন্তু সকলের চিন্তা, মনন প্রক্রিয়া, রাগ হিংসা নিয়ন্ত্রন পরিধির বাইরে থেকে যায়, এখানেই ভয়। এই ভীতি  শুধু যে শাসকদলের তাই নয়, জনগণেরও। কারণ চাপা রাগ-হিংসা বিষ্ফোরণ খুবই বিপজ্জনক হয় সকলের জন্যই।

 

 

শিষ্টাচার মিথ্যাচার অনিয়ম আর বিশৃঙ্খলা

শাহাদাত হোসেন বাচ্চু:

এক. মার্কিন প্রেসিডেন্ট দিনে সাড়ে ছয়টা মিথ্যা কথা বলেন! অবাক হচ্ছেন তো? তথ্যটি ওয়াশিংটন পোষ্টের একটি জরীপের। তাদের হিসেব অনুযায়ী ক্ষমতারোহনের ৪৬৬ দিনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ৩ হাজার ১টি মিথ্যা বলেছেন। অর্থাৎ প্রতিদিনের গড় ৬ দশমিক ৪। দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ১’শ দিনে তার মিথ্যা বলার হার ৪ দশমিক ৯। কিন্তু গত এপ্রিল-মে মাসে এই হার বেড়েছে দ্বিগুন। অর্থাৎ দিনে ৯টি মিথ্যা বলেছেন ট্রাম্প।

ওয়াশিংটনের পোষ্টের পরিসংখ্যান আরো জানাচ্ছে, অনেক মিথ্যা আছে যা তিনি বারবার বলছেন। এরকম ১১৩ টি মিথ্যা রয়েছে – যা ট্রাম্প একাধিকবার বলেছেন। উপসংহারে বলা হয়, শাসনকাল যত পুরানো হচ্ছে, প্রেসিডেন্টের মিথ্যা বলা তত বাড়ছে। সিএনএন ভাষ্যকার ক্রিস সিলিজার জানাচ্ছেন, ডাইনে-বাঁয়ে মিথ্যা বলেন এমন কোন প্রেসিডেন্ট আমেরিকায় আগে কখনও ছিলেন না। জর্জ বুশ বা বারাক ওবামা দিনে কতবার মিথ্যা বলেছেন তার হিসেব কেউ রাখেনি। কারন ট্রাম্পের মত তারা কেউ মিথ্যা বলতে এবং সেই মিথ্যা বারবার আওড়াতে অভ্যস্ত ছিলেন না।

ট্রাম্প যা বলেছেন তার মধ্যে মিথ্যা আবিস্কৃত হচ্ছে এবং গণমাধ্যম তা জানিয়ে দিচ্ছে। কারন সে দেশে রয়েছে শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও গণমাধ্যমের দায়। গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি প্রেসিডেন্টের মিথ্যাকেও সনাক্ত করার সক্ষমতা  পেয়েছে। গণতন্ত্র চর্চার ফল হিসেবে গণমাধ্যম সত্য সংবাদ পরিবেশনে কাউকে পরোয়া করছে না। বাংলাদেশে ঘটছে উল্টোটা। এখানে নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্রের মধ্যে প্রতিষ্ঠানসমুহ দুর্বলতর হয়েছে, প্রাতিষ্ঠানিকতা গড়ে উঠতে দেয়া হয়নি। বিপরীতে কর্তৃত্ববাদ প্রধান হয়ে উঠেছে।

এখানে নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র যেহেতু সবসময় ব্যক্তিমুখীন, তেমনি প্রতিষ্ঠানগুলিও ব্যক্তির মুখের দিকে চেয়ে  বলতে ও চলতে অভ্যস্থ। শক্তিমান নির্ভীক, বস্তুনিষ্ঠ এবং জনস্বার্থের বদলে এখন ব্যক্তি ও দলকে সন্তষ্ট করার সাংবাদিকতা সবকিছু ছাপিয়ে উঠছে। ফলে শীর্ষ ব্যক্তিদের কথিত সত্যভাষণ জনমানুষকে খুশি করছে না ব্যথিত করছে-এই প্রশ্ন গণমাধ্যম তুলতে সক্ষম নয়। বরং তারা সামিল হয়েছেন, ক্ষমতার সাথে ইদুর-বেড়াল খেলায়। রাজনীতিতে গণতন্ত্রহীনতা ও স্থিতিশীলতার অভাবই কী এইসব রাজনৈতিক-সামাজিক মনোবৈকল্যের কারন?

দুই. প্রাচীন কবিরা বলে গেছেন, “যে কহে বিস্তর, মিথ্যা কহে বিস্তর”। আবার চালু প্রবাদটি হচ্ছে, “কথায় কথা বাড়ে”। সেসব কথার কতটুকু সত্য-কতটুকু মিথ্যা তাও বিবেচনা ও প্রশ্নসাপেক্ষ। দেশের রাজনৈতিক নেতারা কথা বলতে ভালবাসেন। এমনকি সেসব কথা দল বা নিজের বিরুদ্ধে গেলেও পরোয়া নেই। কথা বলতেই হবে। জনগনও কথা শুনতে ভালবাসে। শীর্ষে যারা থাকেন তাদের কথা মানুষ শোনে আগ্রহভরে। কারন কথামালার রাজনীতি এখানে জনপ্রিয়। নেতা কম কথা বলবেন এটি প্রত্যাশিত নয়। আর সরকার প্রধান বা দলপ্রধান হলে তো কথাই নেই!

রাষ্ট্রীয় নীতি, রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিসহ অনেক বিষয়ে মনোভাব বোঝা যায় সংবাদ সম্মেলনে সরকারের প্রধান নির্বাহীর বক্তব্য থেকে। প্রধানমন্ত্রী সবশেষ সংবাদ সম্মেলন করেছেন গত ২ মে ২০১৮ তারিখে। সেখানে তিনি কথা বলেছেন, সাম্প্রতিককালের বেশকিছু স্পর্শকাতর ইস্যু নিয়ে, বেশ খোলামেলাভাবে। তিনি কথা বলেছেন, কোটা সংস্কার আন্দোলন, সড়ক দুর্ঘটনা, আগত জাতীয় নির্বাচন এবং স্বভাবতই প্রধান প্রতিপক্ষ খালেদা জিয়ার কারাদন্ড নিয়ে। বলেছেন আত্মবিশ্বাস এবং দৃঢ়তা নিয়ে।

সড়ক দুর্ঘটনা প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য ছিল, “আমার এ কথাগুলো অনেকে পছন্দ করবেন না, কিন্তু যা বাস্তব তাই বলছি। রাস্তায় চলার নিয়ম আছে, তা আমরা কতটা মানি। একটি গাড়ি দ্রুতগতিতে আসছে, আমরা একটি হাত তুলে রাস্তায় নেমে গেলাম। যারা পথচারী তাদেরও কিছু নিয়ম-কানুন জানা দরকার, মানা দরকার” (সূত্র: বণিকবার্তা ৩ মে ২০১৮)। আবার বলেছেন,“আপনি বাসে চড়ে যাচ্ছেন, কেন আপনি হাত বাইরে রাখবেন? আপনারা (সাংবাদিক) যার হাত গেলো তার জন্য কান্নাকাটি করছেন, কিন্তু সে যে নিয়ম মানছে না সে কথা তো বলছেন না” (সূত্র: বণিকবার্তা ৩ মে ২০১৮)।

তিন. প্রধানমন্ত্রী সড়ক দুর্ঘটনার কারন হিসেবে পথচারীদের অসচেতনতার কথা বলেছেন, দায়িত্বহীনতার কথা বলেছেন, তা হয়তো ক্ষেত্রবিশেষ সত্য। অথবা এ বিষয়ক তথ্য তিনি যাদের কাছ থেকে পান তারা হয়তো দুর্ঘটনার এমত কারণই তুলে ধরেণ। কিন্তু এগুলিই কি  চুড়ান্ত সত্য ! দুর্ঘটনার প্রধান কারন? আর এই স্পষ্টবাদী সত্যকথন কি রাজীবের হাত হারানো এবং অন্তিমে মৃত্যু কিংবা গৃহকর্মীর পা হারানোর মর্মান্তিক বেদনা লাঘব করে? দুই বাসের নষ্ট প্রতিযোগিতার খেসারত হিসেবে জীবন দিতে হয়েছে রাজীবকে। এই করুণ মৃত্যুতে জনমনে প্রতিক্রিয়ার সাথে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য ‘রাষ্ট্রাচারসুলভ’ কিনা জানা নেই, তবে তার মন্ত্রী, এমপিরা এই বক্তব্য লুফে নিয়েছেন সাথে সাথেই।

দেরী করেননি নৌ পরিবহন মন্ত্রী শাহাজান খান। ৪ মে এক অনুষ্ঠানে বলেই ফেলেন “সড়ক পথে দুর্ঘটনা ঘটলে কেবল চালকদের দোষী বলা ঠিক নয়, দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে যাত্রীদেরও খামখেয়ালীপনা থাকে। দুর্ঘটনা রোধে শুধু চালকদের সচেতন হলে চলবে না, যাত্রী ও পথচারীকে সচেতন হতে হবে। কেউ রাস্তা পার হওয়ার সময় মোবাইল ফোনে কথা বলেন, আবার কেউ জানালার বাইরে হাত রেখে গাড়িতে যাতায়াত করেন। এই কারনেই অনেক দুর্ঘটনা ঘটে” (প্রথম আলো: ৫ মে ২০১৮)।

অতিসম্প্রতি ঢাকায় একজন সংসদ সদস্যের গাড়ি চাপায় একজন নিহত হয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে সংসদ সদস্যের পুত্র গাড়ি চালাচ্ছিলেন। সেটি অস্বীকার করতে গিয়ে গণমাধ্যমের প্রশ্নের জবাবে ঐ সংসদ সদস্যের স্ত্রী, যিনি একজন উপজেলা চেয়ারম্যান, যা বলেছেন তা প্রধানমন্ত্রীর কথারই প্রতিধ্বনি মাত্র। তিনি দাবি করেছেন, পথচারী সতর্ক না হলে ড্রাইভারের কি করার থাকতে পারে!

চার. গত ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সারাদেশে ১৮৭১টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২১২৩ জন এবং গুরুতর আহত হয়েছেন ৫৫৫৮ জন। এদের মধ্যে শতকরা ৯০ ভাগই মানুষই পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি (সূত্র: ডেইলী ষ্টার- ৩০ এপ্রিল ২০১৮)। সাম্প্রতিককালে সড়ক হয়ে উঠেছে মৃত্যুফাঁদ। গত ২৩ জুন মাত্র ২৪ ঘন্টায় সড়কে নিহত হয়েছে ৪৫ জন। এরমধ্যে ৩৯ জনই কর্মক্ষম ব্যক্তি। গাইবান্ধায়্ বেপরোয়া গতির বাস উল্টে নিহত হয়েছে ১৮ জন (সূত্র: প্রথম আলো ২৪ জুন, ২০১৮)।

‘ন্যাশনাল কমিটি টু প্রোটেক্ট শিপিং, রোডস এ্যন্ড রেলওয়ে’ নামক একটি সামাজিক সংগঠন গবেষণায় সড়ক দূর্ঘটনার সাতটি কারন চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে প্রথমটিই হচ্ছে, বেপোরোয়া গাড়ি চালনা। ক্রমানুসারে অন্যগুলি হচ্ছে, অদক্ষ লাইসেন্সবিহীন গাড়িচালক, ওভারটেকিং ও ওভারলোডিংয়ের বিপদজনক প্রবণতা, ট্রাফিক আইন না মানা, অযোগ্য ক্রুটিপূর্ণ  যানবাহন, ঝুঁকিপূর্ণ ও যান চলাচলের অযোগ্য সড়ক, চালকের বিরতীহীন ও বিশ্রামহীন গাড়ি চালনা। এই সাতটি কারনের বাইরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারন, পরিবহন সেক্টরে বিশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় মাফিয়াতন্ত্র কায়েম।

এবারের ঈদযাত্রায় ইতিমধ্যেই তিন শতাধিক প্রাণহানি ঘটেছে। দায়িত্বজ্ঞানহীনতা, বিচারহীনতা ও জবাবদিহিতা না থাকায় অপ্রতিরোধ্য গতি পেয়েছে দুর্ঘটনার মৃত্যু। শুধু সড়কে নয়, রেলপথ-নৌপথ, কল-কারখানা সর্বত্রই দুর্ঘটনায় মৃত্যুর খবর। দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা যায় না, কারন তারা সংগঠিত। এসব সংগঠনের সাথে ক্ষমতাসীনদের শীর্ষ ব্যক্তিরা যুক্ত থাকে, সমর্থনও থাকে। কোন ব্যবস্থার সূচনা ঘটলেই ধর্মঘট, অবরোধসহ দেশকে তারা জিম্মি করে ফেলে।

সরকারপক্ষ, যখনই যারা ক্ষমতায় থেকেছেন, রাজনৈতিক-বাণিজ্যিক-ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার হিসেবে পরিবহন সেক্টর এবং শ্রমিক সংগঠনগুলিকে ব্যবহার করছে। সরকার থেকে দায়িত্বশীল কোন অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়নি। ফল হয়েছে ব্যক্তিখাতে এই সেক্টর গড়ে উঠেছে অনিয়ম আর বিশৃঙ্খলা সঙ্গী করে। রাজনৈতিক নেতা ও শ্রমিক নেতারা শ্রমিকদের নিয়ে মাফিয়াতন্ত্র গড়ে তুলছে, মালিক হচ্ছে বিপুল অর্থ-বিত্তের।

এই বিশৃঙ্খল অরাজক পরিবেশে বেড়ে ওঠা মানুষের হাতে সড়কে মানুষ মরছে। পৃথিবীতে দুর্ঘটনা বন্ধের কথা না ভাবা হলেও কমিয়ে আনার জন্য কাজ করছেন সকলে। কিন্তু এই দেশে সেটি তো দুরে থাক, বিশৃঙ্খল ও মাফিয়া কবলিত পরিবহন সেক্টর মুক্ত করে একটি সুষ্ঠ ও মানসম্মত অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনাও কি আছে?

বহুমাত্রিক বিচ্ছিন্নতা : রাষ্ট্রে মানুষে বিরোধ চরমে

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

বিচ্ছিন্নতা মঙ্গলময় নয়। অনিশ্চিত ভয়ের জগৎ, বড় বিপদের। গনতান্ত্রিক রাজনীতি এবং বহুত্ববাদী সমাজ রাষ্ট্র এজন্যই যে, মানুষে মানুষে মেলবন্ধ তৈরী করে ন্যায্য রাষ্ট্রিক ব্যবস্থা কায়েম করে। কিন্ত রাষ্ট্রের শাসকদের মূল লক্ষ্যই হয় ক্ষমতা এবং অধিকতর ক্ষমতা, আর  শাসকরাই বিচ্ছিন্নতা উস্কে দেয়। কারণ জনগণ বিচ্ছিন্ন থাকলে কর্তৃত্ববাদ জারি রাখা সহজ হয়। এটাই বিপদের মূল কথা। এটা শুধু রাষ্ট্রের  নয়, সমাজ ও ব্যক্তির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে, সংযোগ কমছে। রাষ্ট্রের সাথে প্রতিষ্ঠানের, প্রতিষ্ঠানের সাথে মানুষের, সমাজের সাথে ব্যক্তির, এমনকি পরিবারের ভেতরেও বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে। গণতান্ত্রিক সমাজ ভাঙছে, কর্তৃত্ববাদ, একনায়কতান্ত্রিকতা স্থান করে নিচ্ছে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমুহের নেতৃত্ব চলে যাচ্ছে মাফিয়া ডনদের হাতে। একটি ‘ঠিকাদারী’ সমাজ তৈরী হয়েছে-বিচ্ছিন্নতার ষোলকলা পূর্ণ করে।

ছোট-বড় নগরীর দিকে তাকান! খাল-বিল-জলাধার ভরাট ও দখলের মচ্ছব চলছে। মানুষ ক্রমাগত বিপদাপন্ন হচ্ছে। রাষ্ট্র-সমাজে মুক্তচর্চার জায়গাগুলি বদ্ধ করে দেয়া হচ্ছে। চর্চা চলছে অন্ধত্বের-চরম ভাবাপন্নতায়। মানুষের মধ্যে বাড়ছে অসহনশীলতা। রাষ্ট্র-সরকার বিচ্ছিন্ন হচ্ছে গণতন্ত্র-সুশাসন থেকে। কর্তৃত্ববাদের নিয়ন্ত্রণে বেড়ে ওঠা  বিচ্ছিন্নতায় অসহনশীলতার মাঝে সমাজ ক্রমশ: সহনশীলতা সম্প্রীতির জায়গা চরমপন্থার দিকে ঝুঁকছে।

প্রযুক্তির বিকাশে ডিজিটালাইজেশনের ছাপ সর্বত্র। সংযুক্ত হবার পথ অনেক। বিকাশের সাথে সাথে বিকৃতিও ভর করছে। সংযোগের পথগুলি খুলে গেলেও ‘ভার্চুয়াল ওয়ার্ল্ড’ সৃষ্টি করে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পথ প্রশস্ত করছে ‘ছোট মন’ নিয়ে, সমস্যার মূল সেখানেই। ‘ছোট মন’ নিয়ে বড় জাতি হয়ে ওঠা যায় না। বড় জাতি হয়ে উঠতে হলে সকল জনগনের জন্য বিস্তৃত ক্ষেত্র নির্মান করা প্রয়োজন। বড় এবং বহুমাত্রিকতায় ফিরে যাওয় এখন এই দেশে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জও বটে।

গত কয়েক দশকে আলো ফেললেই অন্ধকার যাত্রার উৎস খুঁজে পাওয়া যাবে। গণতন্ত্রের নামে নানা বিধি-নিষেধ আর নিয়ম বেধে প্রতিষ্ঠানগুলিতে জনগনের সুযোগ ও অভিগম্যতা সীমিত করা হয়েছে। সর্বত্র ‘সংরক্ষণের নামে বহুজনের অবাধ সুযোগকে প্রতিহত করে জনগণকে ‘প্রান্তিক’ করে দেয়া হয়েছে। প্রভাব পড়েছে অবকাঠামোগুলিতে। মানুষ বিচ্ছিন্ন বোধ করছে সকল প্রতিষ্ঠান থেকে। সরকারের মদতে দখল এবং সংরক্ষণ চেষ্টার মধ্য দিয়ে বিচ্ছিন্নতা উস্কে ফল হয়েছে দু’রকম; এক. বহুজনের সুযোগ ও অভিগম্যতাকে প্রতিহত করায় সুযোগ তৈরী হয়েছে কতিপয়ের। দুই. এই কতিপয়ের হাতে পূঞ্জীভূত  রাষ্ট্রের সকল সম্পদ, ক্ষমতার অনুষঙ্গ হিসেবে তৈরী হচ্ছে স্বেচ্ছাচারিতা, অন্তিমে হত্যা-গুম- রক্তপাত। এই ‘কতিপয়’রা হচ্ছেন, ক্ষমতাসীন অথবা ক্ষমতা কাঠামোয় যুক্ত সকল পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি, রাজনীতিক, আমলা, শিক্ষক, সাংবাদিক, কথিত সুশীল সমাজ ইত্যাদি; এবং যথানিয়মে জনগন এদের থেকে যোজন যোজন দুরত্বে।

বিচ্ছিন্নতা অবশ্যই বিপদজনক, অন্তত: জনগনের জন্য তো বটেই। কারন বিচ্ছিন্নতা সমাবেশহীন, জনমানবহীন ধূ-ধূ মরুপ্রান্তর। তাতে উৎসাহী হয়ে ওঠে অপরাধীরা। মানুষ যত বিচ্ছিন্নতার মধ্যে দিয়ে যেতে থাকে, ততই প্রতিষ্ঠানগুলিতে জাঁকিয়ে বসে অপরাধীরা। ক্ষমতাবানরা অবৈধ দখলে নিয়ে নেয় জনগনের প্রতিষ্ঠানসমূহ। গণতত্ত্বাবধান ও জবাবদিহিতা না থাকলে প্রতিষ্ঠান পরিণত হয় অপরাধীদের ভাগারে।

ব্যক্তির সাথে সমাজের বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে। আধুনিকতার নামে, অর্থনৈতিক উন্নয়নের নামে পরিবারগুলি ভাঙছে-বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে; এমনকি স্বামী-স্ত্রী-সন্তানদের মধ্যেও। প্রাইভেসির নামে মানুষ ক্ষুদ্র হতে হতে খোপের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে। যৌথ পরিবারে বড় হওয়া সুযোগবঞ্চিত শিশু-কিশোর ঢুকে পড়ছে ফেসবুক-ট্যুইটার-ইউটিউবের ভার্চুয়াল জগতে। বাস্তব পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কল্পজগতের আত্মহননে সাড়া দিচ্ছে।

বিচ্ছিন্নতা শুধু বিভাজন তৈরী করে না, ভয়ঙ্কর বিক্ষুব্ধতার জন্ম দেয়, পাল্টে দেয় মনোজমিন। গণতন্ত্রের জন্য খুব বড় বিপদের নাম বিচ্ছিন্নতা। মানুষকে বহু ধারার চিন্তা- ভাবনা, মত প্রকাশ- সব কিছু থেকে সরিয়ে দেয়। ভয়-আতঙ্কের অদৃশ্য জগৎ সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়া হয়।  যার সবচেয়ে বড় দৃশ্যমানতা হচ্ছে, উগ্রবাদী সহিংসতা, যা কেবল মৃত্যুময় অন্ধকার এক জগত। তাতেও কি স্বস্তি মিলছে! এভাবেই হনন ও আত্মহনন হয়ে দাঁড়াচ্ছে অমোঘ নিয়তি।

সংযোগ খুবই জরুরী। ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে, পরিবার থেকে সমাজে, প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিষ্ঠানে-সংযোগ খুবই প্রয়োজন। সংযোগ গড়তে হলে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের অধিকার এবং নির্বিঘ্ন, গ্রহনযোগ্য ভোটের বিধান থাকতে হবে। সংযোগহীনতা অপরাধ এবং দুর্বত্তায়নের পথ করে দেয়। অপরাধী, সন্ত্রাসীদের জন্য বড় স্পেস তৈরী করে দেয়। অপরাধী মনোজমিন রাষ্ট্র, সরকার, প্রতিষ্ঠান, পরিবার-সব জায়গা থেকে মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। ফলে কতিপয় মানুষ হয়ে ওঠে সবকিছুর নিয়ন্ত্রক ও সর্বেসর্বা।

রাজনীতির সংযোগ হচ্ছে আম-জনতা। রাজনৈতিক দলগুলো সংযোগ করতে মানুষের কাছে যায়। এই সংযোগের মূল হচ্ছে দলীয় আদর্শ ও কর্মসূচি। সেগুলি নিয়েই জনগনের আস্থা অর্জন করার চেষ্টা করে। ভোটপ্রাপ্তির মাধ্যমে দলটি বুঝিয়ে দেয়, জনগন তার আদর্শ-কর্মসূচির সাথে কতটা যুক্ত কিংবা কতটা বিচ্ছিন্ন। এই সুযোগে বাইরের শক্তি নিয়ন্ত্রণ করতে চায় রাষ্ট্রের রাজনীতি, বানিজ্য এবং তথ্য প্রবাহ পর্যন্ত। সরকার ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে এই সুযোগ করে দেয় শক্তিধর দেশগুলিকে।

বিচ্ছিন্নতা বড় বিপদ। গণতন্ত্র, সুশাসন এবং অধিকারের ক্ষেত্রে। জনগনের ইচ্ছার সাথে, অপ্রাপ্তির সাথে শাসনের কর্মকান্ড বিপরীত হলে বিচ্ছিন্নতা বাড়ে। শাসক এতটাই অসহনশীল হয়ে পড়ে যে, জনগনের যে কোন দাবি হামলা-মামলা অথবা অস্ত্রের ভাষায় দমন করে। জনগন ও সরকারের মাঝে সৃষ্ট যোজনব্যাপী দুরত্ব অবদমিত জনরোষে পরিনত হয়।

এই রোষ এবং ইচ্ছা প্রকাশের নিয়মতান্ত্রিক পথ রুদ্ধ হলে জনগন, বিশেষ তরুণ যুব জনগোষ্ঠি ধ্বসাংত্মক পথ বেছে নেয়। আর সেটিই হচ্ছে চরমপন্থার পথ। বিচ্ছিন্নতা তাকে নিয়ে চরমপন্থার সহিংসতা বা কোন মতাদর্শিক সহিংসতার পথে। বিচ্ছিন্নতার নেতিবাচক পরিনতি এদেশের মানুষ দেখেছে হলি অর্টিজানের নৃশংস হত্যাকান্ডে; শোলাকিয়ার ঈদগাহ মাঠে বোমা হামলায়।

একদিকে বিচ্ছিন্নতার ব্যাপ্তি ঘটছে, বিভাজন বাড়ছে। কতোটা, সেটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অসহিষ্ণু গা হিম করা সব মন্তব্য দেখলে তরুণ-যুবদের মনোজমিন আঁচ করা যায়। গনতন্ত্র ভাঙ্গা হচ্ছে, কর্তৃত্ববাদ জায়গা নিচ্ছে, আবার উন্নয়ন দিয়ে সব মানুষকে এক কাতারে আনার চেষ্টা করছি। এই স্ববিরোধিতা কাজে আসছে না। মানুষের আয় বাড়ছে, তারচেয়েও দ্রুতগতিতে বাড়ছে বৈষম্য। দারিদ্য কমার কথা বলা হচ্ছে, কিন্ত সব সম্পদ কুক্ষীগত হচ্ছে মুষ্টিমেয়’র হাতে।

সেজন্যই বিচ্ছিন্নতা পরিহার করা এখন খুব বড় কাজ। সরকার, ক্ষমতাসীন দল, বিরোধী দলসমূহের সাথে জনগনের নিয়মিত সংযোগ গড়ে বিভাজন কমিয়ে আনা খুব দরকার। বিচ্ছিন্নতার বিভেদ এই দেশ এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। সংযোগ মানুষকে উদার করে, পরার্থপর করে তোলে। বিচ্ছিন্নতা ডেকে আনে মৃত্যু, সংযোগ ফিরিয়ে আনে স্বস্তি-শান্তির সুবাসিত জীবন।

বিচ্ছিন্নতার মধ্য দিয়ে এই দেশ অবধারিতভাবেই এগোচ্ছে নিষ্ঠুরতা ও নৃশংসতার দিকে। মানুষ নি:সঙ্গ হয়ে পড়ছে, অপরাধের মনোজমিন জায়গা পাচ্ছে, নিষ্ঠুরতার আবেগকে ন্যায্যতা বলে স্বীকৃতি দিচ্ছে। বিপদের মূল জায়গা এটি। রাষ্ট্র-সমাজ, ব্যক্তি সব ক্ষেত্রেই এটি প্রযোজ্য। এখান থেকে ফিরে আসতে হলে বিচ্ছিন্নতার চাষাবাদ বন্ধ করে সংযোগের নয়া আবাদ গড়ে তোলা জরুরী।

বাংলাদেশে বর্তমান রাজনীতির দ্বন্দ্বতত্ত্ব !

তোফাজ্জ্বেল হোসেন মঞ্জু ::

বাংলাদেশে বর্তমান রাজনীতির দ্বন্ধ কি? অনেকগুলো সরল উত্তর আছে। এক বাক্যে বলা যায়, আওয়ামী লীগের সাথে বিএনপি’র দ্বন্ধ। অনেকে আর একটু স্থূল করে বলতে পারেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে কারারূদ্ধ সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার। কৈশোর উত্তর রাজনীতির যে শিক্ষা পেয়েছিলাম, সেখানে মুলদ্বন্ধ হচ্ছে, যে দ্বন্ধকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পটভূমি তৈরী হয়। আর গৌণ দ্বন্ধ মূল দ্বন্ধের অধীন। অর্থাৎ গৌণ দ্বন্ধ রাজনীতির পরিবর্তন ধারায় কখনো মূল ঘটক নয়। তবে অনেক সময় গৌণ দ্বন্ধ মূল দ্বন্ধ রূপে নিয়ে পরিবর্তনের লাইম লাইটে আসে।

রাজনৈতিক দ্বন্ধ কতকটা আদর্শের কারণে, কতকটা ক্ষমতার কারণে সে প্রশ্ন বিশ্বব্যাপী। তবে আদর্শকে আর একটু প্রায়োগিকভাবে রাজনৈতিক মত ও পথ বলতে পারি। রাজনৈতিক মত ও পথ এর কারণে একই আদর্শের অনুসারীদের মাঝেও দ্বন্ধের সূচনা হতে পারে। এখানে আরেকটা কথা বলা প্রয়োজন- একই আদর্শের অনুসারীদের মধ্যে প্রথম যে দ্বন্ধ থাকে সেটা অবৈরী অর্থাৎ শক্রতা মূলক হয়না, পরে সেটা বৈরী বা শক্রতাপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ক্ষমতার কারণে রাজনৈতিক দ্বন্ধ ও প্রতিযোগিতা অন্ততঃ আধুুনিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার বাস্তবতায় হিসেবে স্বীকৃত। রাজনৈতিক ক্ষমতার চুড়ান্ত রূপ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিস্তার বহুমাত্রিক, যে কোন সংগঠনের পদ অর্জন রাজনৈতিক ক্ষমতার সাথে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে যুক্ত হতে পারে। কখনোই রাজনৈতিক ক্ষমতা দ্ব›দ্ব শুধু রাষ্ট্র ক্ষমতা অর্জনের ভোট, নিরস্ত্র বা সশস্ত্র অভ্যুথানের মধ্যে সীমিত নয়। আমাদের জীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এর প্রবেশ ঘটে। রাজনৈতিক দ্বন্ধের হিংসা ও অহিংসা শুধু আদর্শগত কারণে নয়- লক্ষ্য অর্জনের কর্মপ্রণালীর সাথে যুক্ত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে অহিংসা রাজনীতিতে বিশ্বাসীরা ও হিংসাআশ্রিত কর্মপ্রণালীর সাথে যুক্ত হতে পারে। এ পর্যন্ত আমি যা বলছি তা বাংলাদেশের রাজনীতির মূল দ্বন্ধ ও গৌণ দ্ব›দ্ব নিয়ে আলোচনার ভনিতা মাত্র। আমরা যদি আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দ্বন্ধকে প্রধাণ দ্বন্ধ হিসেবে মেনে নেই, তবে এ দ্বন্ধের গতি প্রকৃতি বর্তমান প্রেক্ষাপটে আলোচনা করা। অন্য দিকে এ মূল দ্বন্ধের আশে পাশে যেসব গৌণ দ্বন্ধ নিয়ে আলোকপাত করা। এ গৌণ দ্বন্ধ এর মধ্য থেকে কোন একটি সামনে এসে মূল দ্বন্ধে পরিণত হতে পারে।

রাজনৈতিক দ্বন্ধের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বহুপাক্ষিক। যদিও বাহ্যিকভাবে মূলদ্বন্ধ ঘিরে এ দুই পক্ষ থাকে- তবে এই দু পক্ষের কাঠামোর বাইরে; ভিতরে-বাইরে আরো অনেকগুলো পক্ষ থাকে। এর সাথে আরো একটা প্রশ্ন থেকেই যায়, রাজনৈতিক মূল দ্বন্ধে নিরব ভোটারদের ভূমিকা কি? বা নাগরিকরা কিভাবে দ্বন্ধকে প্রভাবিত করেন বা নিজেরা প্রভাবিত হোন। বাংলাদেশে ১৯৯১ এর পর আওয়ামী লীগ বিএনপির দ্বন্ধ ও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ভিত্তিতে দেশের রাজনীতি পরিচালিত হয়েছে। এই মুল দ্বন্ধের সরল বৈশিষ্ট্যের ভিতরে অনেক জটিল উপাদান রয়েছে। মূল দ্বন্ধের জটিল উপাদানগুলি দু’পক্ষের অভ্যন্তর থেকে আসে। দুই পক্ষের প্রান্ত অর্থাৎ ঢাকার বাইরে থেকে তৈরী জটিল উপাদান শেষ পর্যন্ত যুক্ত হয় দুই ক্ষমতার কেন্দ্রের সাথে যেমন- প্রধানমন্ত্রী ও তার পছন্দের বলয়, অন্যদিকে খালেদা জিয়া ও তার পছন্দের বলয়, এটাই সাম্প্রতিক রাজনৈতিক মূলদ্বন্ধের বিশেষ দিক। বাইরের বিষয়গুলি কোনটি গৌণ নয়, যেমন বর্তমান সরকারকে টিকিয়ে রাখতে ভারতের সমর্থনের মাত্রা; দ্বিতীয়তঃ ভারতের বাইরেও অন্য বিদেশী শক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা। তৃতীয়তঃ সশস্ত্র বাহিনীর দেশের রাজনৈতিক সংকটের সংবেদনশীলতা ও সাড়া দেবার প্রবণতা। চতুর্থতঃ রাজনৈতিক মেরুকরণের ধারা। পঞ্চমতঃ সরকারের ক্রাইসিস ম্যানেজম্যাণ্ট কৌশলের সফলতা।

উপরোক্ত পাচটি ধারা থেকে আসা রাজনৈতিক পরিবর্তনকামী উপাদানগুলি চিহ্নিত করতে পারলে, বর্তমান  রাজনৈতিক মূলদ্বন্ধের পরিনতির আভাস পাওয়া যেতে পারে।

মাদক যুদ্ধ : ক্রসফায়ারেই কী সমাধান ?

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

ম্যানিলা সিটির কার্টিলো রামিরেজের মর্ত্যে উচ্চারিত শেষ শব্দটি ছিল “দৌড়াও”। এই চিৎকারই তার স্ত্রীর ভিক্টোরিয়ার প্রাণ বাঁচিয়ে দেয়। কিন্তু কোন সুযোগই পায়নি রামিরেজ। মুখোশধারী ছয় মোটরসাইকেল আরোহীর গুলি তাকে ঝাঁঝরা করে দেয়। আলোকোচ্ছটায় বর্ণিল ম্যানিলায় তখন ১১ ডিসেম্বর ২০১৭’র রাত। ঠিক এক সপ্তাহ পরে তার একমাত্র কন্যা স্বামীসহ নিহত হয় ক্রসফায়ারে। এই খন্ডচিত্রটি ফিলিপাইনে চলতে থাকা ‘ওয়ার অন ড্রাগস’-এর।

‘চরমপন্থী ’ প্রেসিডেন্ট রড্রিগো দুতার্তের ক্ষমতায় আসার পর ২০১৫ থেকেই অনির্দিষ্টকালের জন্য শুরু হওয়া “ওয়ার অন ড্রাগস” বা মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে এরকম ভয়াবহ চিত্র এখন সারা ফিলিপাইনের নিত্যদিনের ঘটনা। সস্ত্রীক চাল কিনতে বাজারে যাওয়া রামিরেজ মাদক কারবারী ছিলেন কিনা তা প্রমানের আগেই পরিবারশুদ্ধ তাকে হত্যা করা হয়। ম্যানিলার দরিদ্র অধ্যূষিত এলাকাগুলিকে ‘ওয়ার অন ড্রাগস’-র  মূল্য দিতে হচ্ছে এভাবেই, জীবন দিয়ে।

অভিযোগ, তদন্ত এবং বিচার-সবই করছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। মারছে শত শত মানুষ। এর মধ্যে দুতার্তের প্রতিপক্ষরা রয়েছে, এমনকি মিন্দানাও শহরের মেয়র পর্যন্ত রয়েছেন। সাউথ চায়না মর্নিং পোষ্ট -এর ২০ জানুয়ারি’১৮ এবং ২০১৭-র ১৬ নভেম্বর সংখ্যার বিশেষ রিপোর্টের ভাষ্যে বলা হয়, মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে দুতার্তে সৃষ্টি করছেন ‘একটি এতিম জেনারেশন’- যা আগামীতে ফিলিপাইনে চরমপন্থা উস্কে দিতে পারে, কারণ হত্যাকান্ড শুরু হলে তার বিস্তৃতিই কেবল ঘটতে থাকে।

বাংলাদেশে ‘ওয়ার অন ড্রাগস’ চলছে অনেকটা ফিলিপিনো ষ্টাইলে। ‘আমরা জঙ্গীবাদ রুখে দিয়েছি। এখন আমরা দেশকে মাদকের হাত থেকে বাঁচাতে চলেছি’। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা’র এই বক্তব্য জানান দেয়, মাদকের বিরুদ্ধে তার সরকার অবশেষে জঙ্গীবাদ দমনের মত কঠোর অবস্থানে। তার পরিনাম আমরা দেখছি, কথিত বন্দুকযুদ্ধ বা ক্রসফায়ারে ইতিমধ্যে নিহতের সংখ্যা শ’ ছুঁতে চলেছে। অভিযান কতদিন অব্যাহত থাকবে সেটি পরিস্কার নয়। তবে ক্ষমতাসীন দলের সাধারন সম্পাদক ও মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ভাষ্যমতে, অভিযোগ এবং প্রমান থাকলে সংসদ সদস্য বদি’রও রেহাই মিলবে না। সুতরাং ধরেই নেয়া যায় এক্ষেত্রেও অভিযোগ, তদন্ত ও বিচার সম্পন্ন করছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী।

বাংলাদেশে মাদকের বিস্তার সর্বগ্রাসী। টাকার অংকে তো বটেই, সংখ্যায়, পরিমানে মাদক এখন মহামারী। কিশোর-তরুণদের বড় অংশ মাদকের কবলে। এর কারবার এতটাই অনিয়ন্ত্রিত এবং সর্বগ্রাসী যে, সরকারকে বন্দুকযুদ্ধে এর সমাধান খুঁজতে হচ্ছে। এতে যারা নিহত হচ্ছেন তারা মূলত: ‘ক্যারিয়ার’ বা ‘পুশার’ এবং ‘এ্যডিক্ট’। কমন ব্যাক-গ্রাউন্ড হচ্ছে, কম-বেশি হতদরিদ্র পরিবারের কিশোররা চুরি-চোট্টামি, ছিঁচকে চুরি-ছিনতাই থেকে একসময় ভিড়ে গেছে মাদক কারবারে, কাজ করছে ড্রাগ চেইনের ‘লিংক’ হিসেবে। যে চেইনের শীর্ষে অমিত ক্ষমতাধররা।

বড় প্রশ্ন হচ্ছে, সীমান্ত পথে বাংলাদেশে মাদক ঢুকছে কিভাবে? সরবরাহ উৎসপথে আটকে যাচ্ছে না কেন? এর মূল কারন হচ্ছে, চোরাচালানের অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা। আর এই কালো অর্থনীতি গ্রাস করছে সরকারের দায়িত্ববানদের। ঠেকানো যাদের দায়িত্ব, তারাই মাদক সরবরাহ নিশ্চিত করছেন। কারন তারা এই কারবারের অংশীজন। এইজন্যই সারাদেশ জুড়ে মাদকের বিস্তার।

বহুল উচ্চারিত মাদক ইয়াবা থেকে আয়কৃত টাকার পরিমান কেমন? ভিমরি খাওয়ার মত তথ্য আছে। মাদক নিয়ন্ত্রন অধিদপ্তরের হিসেব মতে,  মিয়ানমার থেকে বছরে বাংলাদেশে ৮০ কোটি পিস যার মাথাপিছু বরাদ্দ ৫ পিস। এর বাজারমূল্য কমপক্ষে ২৪ হাজার কোটি টাকা, অথচ দুই দেশের আনুষ্ঠানিক বাণিজ্য ৬’শ কোটি বেশি নয়। মিয়ানমার শুধু রোহিঙ্গা বিতাড়নেই বাংলাদেশকে বিপদে ফেলেনি, ইয়াবা সরবরাহ করেও বিপদে ফেলেছে। এর সাথে জড়িত  উভয় দেশের অসৎ রাজনীতিক, সংসদ সদস্য, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু অসৎ সদস্য  ও মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী (বিজিপি)।

কিছু সূত্র ধরিয়ে দেয়া যাক। বর্ডার গার্ড (বিজিবি) নায়েক রাজ্জাককে মিয়ানমারের বর্ডার পুলিশ ধরে নিয়ে যায় বাংলাদেশের সীমানা থেকে ২০১৬ সালে। তখন স্বরাষ্ট প্রতিমন্ত্রী, (এখন পূর্ণমন্ত্রী) বলেছিলেন, সামান্য ভুল বোঝাবুঝির কারণে এটি ঘটেছে। নয় দিনের মাথায় নায়েক রাজ্জাক ফেরত আসার পরে বিজিবি মহাপরিচালক সাংবাদিকদের জানিয়ে দেন, এটি ভুল বোঝাবুঝির কারনে নয়। হাবিলদার লুৎফরের বদলে নায়েক রাজ্জাককে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। বিজিপি মহাপরিচালকের ভাষ্যে সে সময় জানা গিয়েছিল, ২০১৪ সালের ২৭ মে বিজিপি’র গুলিতে নাইক্ষ্যংছড়ি এলাকায় নিহত হয়েছিলেন বিজিবি’র নায়েক মিজানুর রহমান। ইয়াবা পাচারের  এই রুট থেকে প্রচুর ইয়াবা আটক করা হয়েছিল। একবছর পর নায়েক রাজ্জাক নাফনদীর এলাকা থেকে ১২ লাখ পিস ইয়াবা  আটক করেন। এইজন্যই তাকে অপহরন করা হয়। সুতরাং এটি স্পষ্ট যে, ইয়াবা চোরাচালানে কারা, কিভাবে যুক্ত এবং বিজিবি’র সৈনিকদের হত্যা, অপহরণের পেছনের মূল কারণও ইয়াবা ব্যবসা।

গত ২০১৬ সালের ২৮ জুলাই রোহিঙ্গা সলিডারিটি নেতা হাফেজ সালাহ উল ইসলাম বৈঠক করছিলেন সৌদি নাগরিক আহমেদ সালেহ আল তান্দী’র সাথে টেকনাফের একটি বাড়িতে। বৈঠকটি হচ্ছিলো ২৬ কোটি টাকার ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে। বৈঠকরত অবস্থায় বাড়ির মালিক মাওলানা সৈয়দ করিমসহ সবাইকে গ্রেফতার করা হয়। এর পরপরই ঘটনাস্থলে আসেন স্থানীয় সংসদ সদস্য। প্রচন্ড চাপ সৃষ্টি করেন গ্রেফতারকৃতদের ছেড়ে দেবার জন্য। পরে অবশ্য বিজিবি মহাপরিচালকের বরাতে প্রথম আলো’র খবর: আরএসও নেতা ও সৌদি নাগরিকের সাথে বৈঠকে বদির সংশ্লিষ্টতা নেই।

আরএসও নেতা হাফেজ এখন বাংলাদেশী ভোটার ও পাসপোর্টধারী। ২০১৩ সালেও সে গ্রেফতার হয়েছিল। সংসদ সদস্যের অত্যন্ত ঘনিষ্টজন বলে কথিত এই হাফেজ ইয়াবা, অস্ত্র ব্যবসা এবং মানব পাচার ও জঙ্গী অর্থায়নে যুক্ত। রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশী পাসপোর্টে মধ্যপ্রাচ্যসহ নানা দেশে পাঠানোর নেপথ্যের ব্যক্তিও এই হাফেজ। এসব অভিযোগ ওপেন সিক্রেট। তারপরেও রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিরা এসব বিষয় জানেন না, এটি বিশ্বাস করা কঠিন।

অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসা হওয়ায় মিয়ানমার এবং বাংলাদেশের ক্ষমতাবানরা মিলে গড়ে তুলেছেন একটি ‘অর্গানাইজড ক্রাইম সিন্ডিকেট’। অভিযোগ রয়েছে, এটি নিয়ন্ত্রন করছেন একজন সংসদ সদস্য ও মিয়ানমারের কয়েকজন সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তা। আর এই চোরাচালান ঠেকাতে গিয়ে বলি হচ্ছেন বিজিবি’র সদস্যরাও। নিহত, অপহৃত হয়েও ঠেকাতে পারছেন না মাদকের অপ্রতিরোধ্য বিস্তার।

প্রশ্ন হচ্ছে, ইয়াবা চোরাকারবার সিন্ডিকেটটির নিয়ন্ত্রক ও পরিচালনাকারী এবং জড়িতদের একাধিক তালিকা তৈরী করেছিল বিজিবি, গোয়েন্দা সংস্থা। ২০১৩-১৪ সালে করা তালিকার শীর্ষে ছিলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য। তার পাঁচ ভাইসহ তালিকায় ছিল টেকনাফ যুবলীগ নেতা ও উপজেলা চেয়ারম্যানসহ অনেকেরই নাম। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে স্বরাষ্টমন্ত্রী মাদকবিরোধী সপ্তাহের উদ্বোধন করেন সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বদিকে সাথে নিয়ে। সে সময়ে তিনি বলেছিলেন, ‘ইয়াবা ব্যবসার সাথে বদি’র সম্পৃক্ততা নেই”। সেই তিনি এখন বলছেন, ‘বদির বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, প্রমান নেই’।

গত বছর রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের আগে থেকেই রোহিঙ্গাদের ওপর ক্ষমতাসীনদের একক আধিপত্য রয়েছে। রোহিঙ্গাদের বসবাস, ভোটার তালিকায় অর্ন্তভূক্তি পাসপোর্টের ব্যবস্থা, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে গমনাগমন, স্থানীয় রাজনীতিতে অংশগ্রহন-সব ব্যবস্থাই করছে ক্ষমতাবানরা¡। এ যেন সরকারের ভেতরে আরেক সরকার । এই পুরো প্রক্রিয়ার সাথে ক্ষমতাবলয়, হাজার হাজার কোটি টাকার মাদক ব্যবসা, মানব পাচার ও অস্ত্র ব্যবসা এবং এর সাথে উগ্রবাদী তৎপরতা মিলে-মিশে একাকার।

সারাবিশ্বের মত বাংলাদেশেও ড্রাগ বা মাদকের ব্যবসা চলে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায়। বিশেষ করে মৌলবাদী এবং জঙ্গী দলগুলোর অর্থের অন্যতম উৎস মাদক ও অস্ত্র ব্যবসা। অবৈধ এই ব্যবসা চালু রাখতে জঙ্গী-মৌলবাদী এবং শাসকশ্রেনীর ব্যক্তিবর্গ, রাজনীতিক ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু অসৎ ব্যক্তির সাথে গড়ে ওঠে অশুভ আঁতাত। দশকের পর দশক ধরে ভারত থেকে আসা ফেনসিডিল শীর্ষে ছিল। বছর কয়েক হলো সেটি এখন ইয়াবার দখলে। এজন্য বদলে গেছে চোরাচালানের রুট এবং ধরণ। কিন্তু রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার বিষয়টি বদলায়নি।

মাদক ব্যবসার গোড়াশুদ্ধ উপড়ে ফেলা এবং যেকোন মূল্যে সিন্ডিকেট ধ্বংস করে দেয়ার পরিকল্পনা আছে কিনা সেটি কেউ জানে না। মাদক কারবারের মূলস্রোত অক্ষুন্ন রেখে মাঠ পর্যায়ে সরবরাহকারীদের বন্দুকযুদ্ধ বা ক্রসফায়ার কতটা সমাধান বয়ে আনবে ? কথিত বন্দুকযুদ্ধের নামে এডহকভিত্তিতে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে আরেক দফা উস্কে দিচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।

হাজার হাজার কোটি টাকার অবৈধ কারবার বন্ধে এডহক ভিত্তিতে বন্দুকযুদ্ধের সূচনার পেছনের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন আছে অনেক। গত শতকের সত্তর, আশি দশক এবং এর পরেও মেক্সিকো, কলম্বিয়া, বলিভিয়ায় এবং অধূনা ফিলিপাইনে পরিচালিত ‘ওয়ার অন ড্রাগস’-এর উদ্দেশ্য প্রতিপক্ষ ও কমিউনিষ্ট নিধন। যা আসলে ওইসব দেশে মাদক ব্যবসা নির্মূল করতে পারেনি ও করেওনি। যুদ্ধাপরাধ মামলার বিচারে বাংলাদেশ বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে অপরাধীদের আইনের সবশেষ সুযোগ দিয়ে বিচার নিশ্চিত করেছিল।

তাহলে বন্দুকযুদ্ধ, ক্রসফায়ার, বিচারবহির্ভূত হত্যা বা কথিত আত্মরক্ষার্খে হত্যা হয়তো সাময়িক উপশম, কিন্ত দীর্ঘমেয়াদে?

‘মাদকের মূল হোতারা চিহিৃত হচ্ছে না, তারা ধরা ছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে’ : সুলতানা কামাল

এ্যডভোকেট সুলতানা কামাল, বিশিষ্ট মানবাধিকার সক্রিয়বাদী এবং দীর্ঘদিন ধরে মানবাধিকার বিষয়ক কর্মকান্ডে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। দুর্নীতিবিরোধী নজরদারী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর চেয়ারপারসন এবং সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা। মাদক বিরোধী অভিযান সম্পর্কে সুলতানা কামাল বিস্তারিত মূল্যয়ন করেছেন আমাদের বুধবারের সাথে এক সাক্ষাতকারে।

আমাদের বুধবার : মাদকের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী যে যুদ্ধ আইন-শৃংখলাবাহিনী চালাচ্ছে সেটিকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ণ করেন?

সুলতানা কামাল : মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধের যে কথা আইন-শৃংখলাবাহিনী থেকে বলা হচ্ছে, সেটি যদি সত্যি সত্যিই ওয়ার অন ড্রাগস হয়ে থাকে, তবে সে ব্যাপারে আমাদের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। মাদক যে কত ক্ষতিকর হতে পারে এবং একটি জাতিকে কীভাবে অবক্ষয়ের মধ্যে ঠেলে দিতে পারে, সে সম্পর্কে সবার কিছু না কিছু ধারণা রয়েছে। কাজেই এটি একটি জরুরি বিষয়। রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব এর সমাধান করার এবং যাতে করে সমাজে মাদক ঢুকে যেতে না পারে বা বিস্তৃতি লাভ করতে না পারে। হয়তো মাদককে একেবারে নিমূর্ল করা যাবে না, কিন্তু অবশ্যই এক্ষেত্রে একটি নিয়ন্ত্রিত অবস্থানে আমরা পৌঁছাতে পারি। কথা হচ্ছে সেই যুদ্ধটা কোন পদ্ধতিতে পরিচালনা করা হচ্ছে। আমি বলছি বলে না, মানবধিকারের কতগুলো শর্ত আছে। যে শর্তগুলো প্রতিটি রাষ্ট্র মেনে নিয়েছে। যেকোনো সভ্য রাষ্ট্র মানবধিকারের এ শর্তগুলোকে সম্মান করে। মানুষকে তার অপরাধের প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত তার যে শাস্তি প্রাপ্য তার বাইরে কোনো কিছু প্রদান বা আদালতের যে শাস্তি প্রদান করার কথা, তারা ছাড়া অন্য কেউ শাস্তি দিতে পারেন না। এটি আমাদের সংবিধানের ৩১ থেকে ৩৫ ধারার মধ্যে সুষ্পষ্ট ভাষায় লিপিবদ্ধ আছে। আমরা সে জন্যই যে পদ্ধতিতে ‘তথাকথিত বন্দুক যুদ্ধে’র নামে মানুষ হত্যা করা হচ্ছে, আজ পর্যন্ত প্রায় ৮০ জন এ হত্যাকান্ডের স্বীকার হয়েছে এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে কাহিনী একই। অর্থাৎ যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে তাদেরকে পুলিশ বা র‌্যাব ধরতে গেছে, তারা আক্রমণ করেছে, আইন-শৃংখলাবাহিনীর পাল্টা আক্রমণে তারা মৃত্যু বরণ করেছে। ঠিক অবধারিতভাবে যারা আক্রমণ করছে তারা পাল্টা আক্রমণে মৃত্যু বরণ করছে। যাদের হত্যা করা হয়েছে তাদের কারো কারো পরিবার অভিযোগ করেছে তাদের কিছুদিন আগে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং পরিস্থিতি সাজিয়ে বন্দুকযুদ্ধে তাদের হত্যা করা হয়েছে।

আমাদের বুধবার : এটি মানবধিকারের কতটা বিপক্ষে?

সুলতানা কামাল : এটি মানবধিকারের একেবারেই বিরুদ্ধে। মানবধিকারের মূল কথা হলো, প্রাণের অধিকার অ্যাবসিলিউট; এটি কেউ নিতে পারে না, হজম করতে পারে না। কোনো রাষ্ট্রও এটি করতে পারে না। রাষ্ট্র যদি প্রাণের অধিকার হরণ করে, তবে সেটিও একটি অপরাধ। কিছু কিছু রাষ্ট্র শাস্তি হিসেবে  মৃত্যুদন্ড রেখে দিয়েছে, সেটি নিয়েও কথাবার্তা চলছে। যদি  মৃত্যুদন্ড বাংলাদেশে শাস্তি হিসেবে থেকে থাকে, তবে সেটিই শাস্তি। এ শাস্তিটি হবে আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে, সেই অপরাধের শাস্তি যদি  মৃত্যুদন্ড হয়, তখন  মৃত্যুদন্ড হবে। সেটিকে আমরা আইনবর্হিভূত হত্যা ঘটাতে পারি না। আমরা সেটি অপছন্দ করি। কিন্তু এখন যে ঘটনাটি ঘটছে সেটি আইনবর্হিভূত ও সংবিধান বর্হিভূত। এটি পুরোপুরো মানবধিকার বিরোধী।

আমাদের বুধবার : মাদক বিরোধী অভিযানে মূল হোতারা কী ধরা পড়ছে এবং তাদের কোন শাস্তি হচ্ছে বলে কী আপনি মনে করছেন?

সুলতানা কামাল : পত্রপত্রিকায় যে বিশ্লেষণ এসেছে এবং যারা অপরাধ-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ তাদের কাছ থেকে যে মতামত এসেছে- তাতে এ শঙ্কাটাই প্রকাশ করা হচ্ছে যে, যেসব তালিকা এসেছে তাতে হয়তো যারা মাদক ব্যবসার হোতা তাদের নামও আছে, কিন্তু তাদের বিচারের আওতায় আনা হচ্ছে না। বিচারের আওতায় না আনা গেলে, তর্ক-বিতর্কের মাধ্যমে প্রশ্ন এবং জেরা করা প্রভৃতি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে না গেলে, আসলেই একটি মানুষ যে  প্রমাণিত অপরাধী তা বোঝা যায় না। শঙ্কা যেটি প্রকাশ করা হচ্ছে তা হলো, মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ত মূল হোতারা চিহিৃত হচ্ছে না, তারা ধরা ছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে। সাধারণ চোখে সবাই দেখছেন এরা আসলে মাদকের হোতা; কিন্তু মাদকের আসল হোতাদের যে নামগুলো সামনে  রয়েছে তাদেরকে ধরা হচ্ছে না। বলা হচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ নাই বলে তাদের ধরা হচ্ছে না। এসবের কারণে যে কর্মকান্ড এখন পরিচালিত হচ্ছে তা সম্পর্কে মানুষের মধ্যে নানা ধরনের প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে।

আমাদের বুধবার : ফিলিপাইনে মাদক বিরোধী যুদ্ধ চলছে বেশ কিছু সময় ধরে। ১২ হাজারের বেশি মানুষ সেখানে নিহত হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবধিকার সংস্থাগুলো বলছে, এতে সমাজের দরিদ্র্য ও নিম্নবর্গের  মানুষ নিহত হচ্ছে এবং পুরো বিষয়টিকে তারা বলছেন, এটি সমাজে এতিম ও বিধবা সৃষ্টির ব্যবস্থা করা হয়েছে। আরেকটি দিক বলা হচ্ছে, ফিলিপাইনে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনের জন্য এ অভিযানকে ব্যবহার করা হচ্ছে। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় এ অভিজ্ঞতাকে আপনি কীভাবে দেখছেন? 

সুলতানা কামাল : ফিলিপাইনে যে ঘটনা ঘটছে সেটি অত্যন্ত প্রকট আকার ধারণ করেছে। এমনকি বিমানে তুলে নিয়ে ফেলে দেয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে। আমি আশা করব, সেরকম বর্বরতার মধ্যে আমরা যাব না। আমরা যে পর্যায়ে রয়েছি সেটি মানবধিকারের দৃষ্টি থেকে কোনো গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি নয়। আমরা বারবারই বলছি, সাংবিধানিক উপায়ে এ সমস্যারগুলোর সমাধান করা উচিত। ফিলিপাইন সরকারও জোর গলায় দাবি করতে পারে না যে, এসব কর্মকান্ডের মাধ্যমে তারা মাদক নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে। আমরা লাতিন আমেরিকার অভিজ্ঞতাও জানি, সেখানেও এ ধরনের অনেক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, যেগুলো এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের কার্যকর ফল দিয়েছে বলে আমরা শুনিনি। কাজেই আমি আশা করি, বাংলাদেশ এত দূর পর্যন্ত যাবে না। এতদিন তারা যে পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করেছে সেটি তারা পুনর্বিবেচনা করবে। কিন্তু আমরা আশা করব, বাংলাদেশের যে সংবিধান রয়েছে, যে আইন-কানুন রয়েছে তার মধ্যে থেকেই আইন-শৃংখলাবাহিনী মাদক বিরোধী যুদ্ধ পরিচালনা করবে।  আমাদের মুক্তিযুদ্ধ একটি ভূখন্ড দখল করার যুদ্ধ ছিল না। মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম কিছুটা আবশ্যিক ভিত্তিতে। সেটি আবশ্যিক ভিত্তির মধ্যে একটি ছিল মানুষের মানবধিকার কখনো হরণ করা হবে না। মানুষকে কখনো অন্যায়ভাবে অবিচারের মধ্যে ফেলা হবে না। নির্যাতন করা হবে না। কাজেই সেসব ব্যাপারে রাষ্ট্রের একটা সাবধানতা অবলম্বন করার নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে বলে আমি বিশ্বাস করি।

আমাদের বুধবার : বাংলাদেশে ইতোপূর্বেও বিচারবর্হিভূত হত্যাকান্ড ঘটেছে। এটিকে কী তাহলে আবার নতুন নামে ডাকা হচ্ছে ?

সুলতানা কামাল : যৌথবাহিনী থেকে শুরু করে অপারেশন ক্লিন হার্ট প্রতিটিতে আমরা মানুষের মৃত্যু দেখেছি। মানুষ হার্ট ফেল করে মারা যাচ্ছিল, আমরা ক্রয়ফায়ারের গল্প শুনেছি। আমরা এনকাউন্টার শুনেছি, শুট আউট শুনেছি। এখন বলা হচ্ছে বন্দুক যুদ্ধ। প্রতিটির ক্ষেত্রে কাহিনী একই। যারা এ কাজটি করছেন গণমাধ্যমের মাধ্যমে তাদের কাছে একটি প্রশ্ন রাখতে চাই, তারা আমাদের যে কাহিনীগুলো বর্ণনা করছেন এবং জোর গলায় বলার চেষ্টা করছেন এটিই ঘটছে তারা যখন রাতে একা ঘুমাতে যান কিংবা আয়নায় নিজের মুখটা দেখেন তারা নিজেদেরও এ গল্পগুলো বিশ্বাস করাতে পারেন কিনা?

আমাদের বুধবার : আপনাকে অনেক ধন্যবাদ

‘যখনই বিচারবর্হিভূতভাবে কোনো কিছু ঘটে তা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বা ভিন্নমতালম্বী দমনের জন্যই এক সময়ে ব্যপকভাবে ব্যবহৃত হয়’: আদিলুর রহমান খান

এ্যডভোকেট আদিলুর রহমান খান, মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’-এর সেক্রেটারী। আন্তর্জাতিক পুরস্কার প্রাপ্ত মানবাধিকার সক্রিয়বাদী। বর্তমানে সরকার পরিচালিত ওয়ার অন ড্রাগস বা মাদক বিরোধী অভিযান সম্পর্কে তার মতামত দিয়েছেন আমাদের বুধবারের সাথে এক সাক্ষাৎকারে।

আমাদের বুধবার : মাদক বিরোধী অভিযান চলছে বাংলাদেশে। এ অভিযান সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ণ কী?

আদিলুর রহমান খান : মাদক বিরোধী বর্তমান অভিযানের প্রয়োগিক দিকটি হলো, মাদক ব্যবসায়ী বা মাদক নিয়ে যারা ব্যবসা করছেন তাদের লক্ষ্য করে বিচারবর্হিভূতভাবে হত্যা করা হচ্ছে, তা আইনের পরিপন্থি ও ন্যায় বিচারের পরিপন্থি। বিচারবর্হিভূতভাবে কাউকে হত্যা করা যায় না। এতে আইনের শাসন বজায় থাকে না। আইনের শাসন বজায় রাখতে হলে, অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে বিচারের মধ্যে সোপর্দ করতে হবে। বিচারবর্হিভূতভাবে কাউকে হত্যা করা যাবে না। মাদক নিয়ন্ত্রণের নামে যেভাবে মানুষ হত্যা করা হচ্ছে, সেটি বিচারবর্হিভূত হত্যাকান্ড। আমরা মনে করি, এটি বন্ধ হওয়া উচিত।

আমাদের বুধবার : মাদক বিরোধী আইন-শৃংখলাবাহিনীর এ অভিযানে মূল হোতারা কী ধরা পড়ছে?

আদিলুর রহমান খান : এটি তো এরই মধ্যে গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে, মাদকের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বা মূল হোতাদের ধরা হচ্ছে না বা যাচ্ছে না। এমনকি আইন-শৃংখলাবাহিনীর যারা এর সঙ্গে যুক্ত তাদেরকেও শুধু কাজ থেকে সরিয়ে রাখা হচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। যাদেরকে বিচারবর্হিভূত হত্যাকান্ডের মধ্য দিয়ে হত্যা করা হচ্ছে তারা সাধারণ পর্যায়ের মাদক ব্যবসায়ী। মূল হোতারা এর বাইরে থেকে যাচ্ছে। আমরা মূল হোতাদেরও বিচারবর্হিভূতভাবে হত্যার পক্ষে নই। আমরা চাই, সবাইকে আইনের আওতায় এনে উপযুক্ত বিচার প্রক্রিয়ায় শাস্তি দেয়া হবে, যদি তারা সত্যিকারের অপরাধী হয়ে থাকে।

আমাদের বুধবার : ফিলিপাইন-লাতিন আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রে মাদক বিরোধী অভিযানের যে অভিজ্ঞতা রয়েছে তাতে আপনার কি মনে হয় এর মাধ্যমে বাংলাদেশে মাদকের ব্যবসার রাশ টেনে ধরা যাবে? 

আদিলুর রহমান খান : আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, শুধু হত্যা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে কখনোই ফলাফল আসে না। হত্যার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের এর দায় নিতে হয়। ফিলিপাইন বা লাতিন আমেরিকায় অনেককে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু এ হত্যার মধ্য দিয়েও মাদক ব্যবসা নির্মূল করতে পারেনি তারা। তাই সমাজের মধ্যে যখন একটি রোগ দেখা দেয় তখন সমাজকেই নির্ধারণ করতে হয় আইনী কোন প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে তা সমাধানের জন্য। তা না করে আইনবর্হিভূতভাবে কোনো কিছু করা কখনো গ্রহণযোগ্য হয় না। পরবর্তীতে এর দায় নিতে হয়। এতে সমাজে আরো অস্থিরতা তৈরি হয়।

আমাদের বুধবার : ফিলিপাইনের মাদক বিরোধী অভিযান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে দাবি করেছে বিভিন্ন মানবধিকার সংগঠনগুলো। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা কি বলছে?

আদিলুর রহমান খান : আমাদের দেশে যেভাবে মানবধিকার লংঘন হয়ে থাকে, তাতে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এর পরে ভিকটিম হবেন না, সেটি ভাবার কোনো কারণ নেই। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে যে, তাদের কর্মী বা তাদের সমর্থকদের ওপর এর প্রয়োগ ঘটবে। আমরা যারা মানবধিকার নিয়ে কাজ করি তারা এ আশঙ্কা সব সময়ই করে থাকি। যখনই বিচারবর্হিভূতভাবে কোনো কিছু ঘটে তা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বা ভিন্নমতালম্বী দমনের জন্যই এক সময়ে ব্যপকভাবে ব্যবহৃত হয়।

আমাদের বুধবার :  আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।