Home » রাজনীতি (page 5)

রাজনীতি

বিলাত ফেরত সহায়ক সরকার

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

প্রায় দশককাল পরে বিএনপি ‘নির্বাচন যাত্রা’ শুরু হয়েছে। নির্বাচনমুখী একটি দল যদি জাতীয় নির্বাচন বর্জন করে এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবি আদায় না করতে পারে, তাহলে তার অবস্থান হয়ে দাঁড়ায় ‘না ঘরকা, না ঘাটকা’- বিএনপি এর একটি প্রকৃষ্ট উদাহরন। নানা পন্থায় সরকারের অদম্য ও সীমাহীন প্রচেষ্টা সত্ত্বেও তাদের সৌভাগ্য যে, ভাঙনের মুখোমুখি হয়নি দলটি অথবা উল্লেখযোগ্য নেতা-কর্মীরা দলছুট হয়নি। মামলা-হামলা-নির্যাতন সয়েও নিষ্ক্রিয় হয়েছেন; কিন্তু দল ছাড়েননি, আনুগত্যও পরিবর্তণ করেননি।

তবে এ বিষয়টি কখনই বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের হিসেবের মধ্যে ছিল না যে, ১৯৮৬ সালে সামরিক শাসনে এরশাদের অধীনে ঘোষিত নির্বাচন বয়কট এবং ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন এক নয়; সময়-কাল- পাত্র ভিন্ন। ২০১৪ সালে বিএনপি আন্দোলনমুখী ছিল না; নেতৃত্বও মাঠে ছিল না; জামায়াত-শিবির নির্ভর আন্দোলন নাশকতার চোরাগলিতে হারিয়ে গেছে। যদিও আতঙ্কিত সরকার বলেছিল, ‘সাংবিধানিক নিয়ম রক্ষার এই নির্বাচন, আলোচনার ভিত্তিতে সহসাই একাদশ সংসদ নির্বাচন ঘোষণা করা হবে’।

ঐ নির্বাচনের পরে বিএনপি নেতৃত্ব আন্দোলনে ইতি-টেনে দিয়েছিলেন এবং পরবর্তীকালে জনগনকে সংগঠিত করে কোন আন্দোলন তারা আর করতে সক্ষম ছিলেন না- যাতে সরকারকে মধ্যবর্তী নির্বাচন দিতে বাধ্য করা যায়। ফলে ভোটারবিহীন নির্বাচনে নির্বাচিত আওয়ামী লীগ সরকার মেয়াদ পূর্ণ করার সুযোগ পেয়ে যায় পুরোপুরিভাবে। নৈতিকভাবে দুর্বল সরকার হয়ে অনিবার্যভাবে হয়ে ওঠে হিংস্র, ক্ষিপ্র ও কর্তৃত্ববাদী। এই আশঙ্কাটি নিয়েই ২০১৪ সালের গোড়াতেই ‘‘আমাদের বুধবার’’-এ বলা হয়েছিল যে, এই সরকার কোন বিরুদ্ধ মত-পথ সহ্য করবে না।

ধারনা করা হয়, ২০১৪ সালে বিএনপি নির্বাচনের অংশগ্রহনের ঘোষণা দিলেই দৃশ্যপট পাল্টে যেতে পারতো। নিশ্চিতভাবেই ক্ষমতাসীনরা বিএনপির অংশগ্রহনে নির্বাচনের ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত ছিল না। ২০১৩ সালে অনুষ্ঠিত পাঁচ সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনের ফলাফল তাদের বার্তা দিয়েই দিয়েছিল। ফলে একটি যেন-তেন প্রকারের নির্বাচনেও ভোট দেয়ার সুযোগ দিলে কি ঘটবে- এটি তাদের জানাই ছিল। সেজন্য বিএনপিকে বাইরে রেখে একক নির্বাচনের পথ-নকশা হয়েছিল- আর বিএনপি সেই ফাঁদেই পা দিয়েছিল, লন্ডন থেকে উসকানী পাঠিয়ে দেয়া হলো।

অনেকের দ্বিমত থাকতে পারে, কিন্তু আলাপচারিতায় দেশের একজন খ্যাতনামা গবেষক ও স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ এ বিষয়ে একমত হয়েছিলেন। তার মতে, ঐ নির্বাচনের মাত্র এক সপ্তাহ আগে বিএনপি অংশগ্রহনের ঘোষণা দিলে গোটা ছকই পাল্টে যেত এবং ১৯৯৬ সালের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারতো। তিনি আরো মনে করেন, মঞ্চ প্রস্তুত ছিল, কিন্তু বিএনপির অপরিনামদর্শী নেতৃত্ব সে বিষয়টি অনুধাবনে সক্ষম ছিল না। যার ফলে নির্বাচনী রাজনীতির মূল¯্রােত থেকে তাকে দীর্ঘ সময়ের জন্য দুরে সরে যেতে হয়েছে।

দুই. নির্বাচন কমিশন একাদশ সংসদ নির্বাচনের ‘রোডম্যাপ’ বা ‘পথ-নকশা’ ঘোষণা করেছে। এ বিষয়ে ক্ষমতাসীন দলটি সন্তোষ ব্যক্ত করে রোডম্যাপ অনুযায়ী শেখ হাসিনা সরকারের অধীনে নির্বাচন করার কথা জানিয়ে দিয়েছেন। তবে বিএনপির মহাসচিবের মতে, “যার কোন রোডই নাই, তার ম্যাপ আসবে কোত্থেকে”। তিনি অবশ্য জানিয়ে দিয়েছেন, সিনিয়র নেতাদের সাথে আলোচনা করে দলীয় প্রতিক্রিয়া জানাবেন। তার মতে, বিএনপি এখন সহায়ক সরকারের অধীনে ছাড়া নির্বাচনে অংশগ্রহনের কথা ভাবছে না।

কিন্তু এবিষয়টি নিশ্চিত যে, ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিচ্ছে। নির্বাচনীমুখী এই দলটির সামনে কি অন্য কোন বিকল্প আছে? ইতিমধ্যেই রাজনীতিতে অনেক ধরনের মেরুকরণ ঘটে গেছে, বহু কিছুণেযা হয়েছে দখলে। ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র ধ্বজাধারী আওয়ামী লীগ ধর্মকে ব্যবহার করার ব্যাপারে বিএনপির চেয়েও পারঙ্গমতা অর্জন করেছে, সেটিও দৃশ্যমান। কিন্তু ভোটের বাজারে তাদের এই তৎপরতা কতটা সুফল এনে দেবে  খোদ ক্ষমতাসীন দলই সে ব্যাপারে ভালো বলতে পারবে। তবে তারা ধর্মীয় দলগুলোর সমর্থন পাবার আশা ছাড়েনি।

বিএনপি এখন নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের আওয়াজ তুলেছে মাত্র। দলীয় চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া ইতিমধ্যে লন্ডনে রওয়ানা হয়ে গেছেন চিকিৎসার উদ্দেশ্যে। সেখানে তার পুত্র ও দলের দ্বিতীয় প্রধান তারেক জিয়ার সাথে আলোচনা করে যে সিদ্ধান্ত নেবেন, সেটিই হবে বিএনপির আগামী কর্মসূচি। লন্ডন থেকে ফিরে এসে খালেদা জিয়া সহায়ক সরকারের রূপরেখা প্রকাশ করবেন। এর আগে নির্বাচনকে মাথায় রেখে ‘ভিশন-২০৩০’ ঘোষণা করা হয়েছে অনেকটাই ‘মিশন’বিহীন পরিস্থতিতে।

তবে গুরুত্বপূর্ন একটি ম্যাসেজ নির্বচন কমিশনের পক্ষ তেকে দেয়া হয়েছে; আর তা হলো-নির্বাচনকালীন সময়ের বিষয়গুলো তাদের এখতিয়ার; এর আগের লেভেল-প্লেইং ফিল্ড গঠন তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। এটিও মনে রাখতে হবে যে, বিএনপিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে মোকাবেলা করতে হবে  নির্বাচনকালে। এটি যে সহজ নয় তা দলটির জানা আছে। এই দেশে প্রতিপক্ষকে মোকাবিলার জন্য তিন ধরনের শক্তির দরকার হয়। ক) রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা; খ) জনগনের শক্তি; গ) আন্তর্জাতিক সমর্থন- বিশেষ করে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের। দশককাল ধরে বিএনপির ক্ষেত্রে এই শক্তিগুলোর সমর্থন হ্রাস পেয়েছে। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ক্ষমতাও নেই। বিএনপির ভোট আছে বটে কিন্তু জনগনের শক্তিকে সংগঠিত করার সক্ষমতা নেই। আন্তর্জাতিক সমর্থনের ক্ষেত্রে তারেক জিয়া এখনও ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ‘অতিবড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন’।

দলের ভঙ্গুর দশা, দলের মধ্যে দল ও অনৈক্য এবং সুবিধাবাদীদের চক্রান্ত মোকাবেলা করতে হচ্ছে বিএনপির। এ সকল বিপত্তিও যে  কোন সময় বিপদের কারণ হতে পারে। খালেদা জিয়া ও তারেক জিয়ার মামলাগুলি আদালতে সহসাই নিস্পন্ন হবে যাচ্ছে-এমন আলামত সুস্পষ্ট। মামলায় দন্ডপ্রাপ্ত হলে আইনী মোকাবেলাসহ আগামী নির্বাচনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে বিএনপিকে। আর এর সাফল্যেই নির্ভর করবে কি ধরনের লক্ষ্যভেদী কৌশল তারা নির্ধারন করতে সক্ষম!

বিএনপির কিছু শুভাকাংখী অবশ্য অবগতিতে রয়েছেন যে, খুব সহজেই ক্ষমতার পালাবদল সম্ভব নয়। আওয়ামী লীগ ২০০১ সালের নির্বাচনের পরিনতির শিক্ষণ মাথায় রেখেই এগোচ্ছে। বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের অনেককেই এই নির্বাচনের বাইরে রাখার তৎপরতা ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। যত দিন যাবে, এই তৎপরতা বহুমাত্রিকতা পাবে। এসব কিছুকে বিবেচনায় নিয়েই নির্বাচনমুখী বিএনপির স্মৃতিতে রয়েছে ২০১৪ সালের অভিজ্ঞতা,পরিস্থিতি আর হাঁ-হুতাশ আছে, তবে দুঃখজনকভাবে বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন নেই।

ষোড়শ সংশোধনী রায় : কেন ক্ষমতাসীনদের এতো ক্ষোভ ?

সি আর আবরার ::

গত ৯ জুলাই জাতীয় সংসদের সদস্যরা সর্বোচ্চ আদালতের ওপর তুমুল আক্রমণ চালিয়েছেন। ষোড়শ সংশোধনী খারিজ করে দেওয়া ২০১৬ সালের হাইকোর্টের রায় বহাল রাখার সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তে তারা তিক্ত প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। ওই সংশোধনীতে অসদাচরণ এবং অক্ষমতাজনিত কারণে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদেরকে অপসারণে পার্লামেন্টকে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল।

এর আগে ক্ষমতাসীন দলের রথী-মহারথীরা ওই বিষয়ে তৈরি হয়ে আসার জন্য সিনিয়র এমপিদের পরামর্শ দিয়েছিলেন। মিত্র দলের নেতাদেরও এ বিষয়ে কথা বলার জন্য প্ররোচিত করা হয়েছিল। তারা দ্বিধাহীন চিত্তে তাদের মনের ‘ঝাল’ ঝেড়েছেন। তারা রায়কে ‘অবৈধ’ ও ‘অসাংবিধানিক’ হিসেবে নিন্দা করতে তাদের ‘ক্ষোভ’ উগরে দিয়েছেন। তাদের বিষোদগারে, এটা কারো কারো মনে হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের রায়টি ‘১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের মৌলিক চেতনার পরিপন্থী।’ জনৈক প্রভাবশালী এমপি তার সহকর্মীদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, ‘শত্রুদের সাথে শত্রু র মতোই আচরণ করতে হবে, প্রয়োজন হলে তাদেরকে ঠান্ডা করে দিতে হবে।’ বিচারকদের হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেন, ‘রায়ের মাধ্যমে তাদের অভিশংসন থামানো যাবে না।’ তিনি ‘নিজেদের ভুল সংশোধনের জন্য’ বিচারকদের পরামর্শও দিয়েছেন।

আওয়ামী লীগের এক মিত্র দলের নেতা ‘বড় ধরনের ষড়যন্ত্রের’ গন্ধ পেয়ে একে ‘সংসদের সার্বভৌমত্বে’ হস্তক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এমপিরা তাদের অবস্থানে ছিলেন দ্ব্যর্থহীন। তারা জোর গলায় বলেন, খারিজ করা সংশোধনীটি ছিল ‘১৯৭২ সালের সংবিধানের ৯৬ ধারা পুনঃবহালের’ লক্ষ্যে একটি অপরিহার্য প্রয়াস, তারা ‘সংবিধানের মৌলিক চরিত্র লঙ্ঘন করতে পারেন না।’ ক্ষমতাসীন জোটের আরেক নেতা বিচারপতিদের স্মরণ করিয়ে দেন, এই পার্লামেন্টেই তাদের অবসরের বয়সসীমা বাড়ানো হয়েছে, ‘মাত্র কয়েক দিন আগে’ তাদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি করা হয়েছে।

পরিতাপের বিষয় হলো, এমপি মহোদয়েরা কোর্টের রায় এবং ১০ অ্যামিকাস কিউরির (তাদের ৯ জনই সংশোধনীটি বাতিল করার সুপারিশ করেছেন) পর্যবেক্ষনের মধ্যে তাদের বক্তব্য সীমাবদ্ধ রাখেননি । তারা প্রধান বিচারপতি এবং দুই অ্যামিকাস কিউরি- ড. কামাল হোসেন এবং ব্যারিস্টার আমির-উল ইসলামের অনভিপ্রেত সমালোচনা করেন। একজন উর্ধ্বতন মন্ত্রী দাবি করেন, রায়ে প্রতিপন্ন হয়েছে যে, প্রধান বিচারপতি পাকিস্তানকে তার আদর্শ বিবেচনা করেন। ড. কামাল হোসেন এবং ব্যারিস্টার আমির-উল ইসলামকে ‘সুযোগসন্ধানী,’ ‘বিবেকবর্জিত,’ এবং ‘বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই দুই অ্যামিকাস কিউরির একজনের শ্বশুর যে ‘পাকিস্তানের নাগরিক’ এবং অপরজনের ‘জামাতা যে ইহুদি’ সেটা জোর দিয়ে বলতে কোনো কসুর করা হয়নি!

যারা এই দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং আইনের শাসন বিকশিত হওয়ার জন্য দশকের পর দশক ধরে সংগ্রাম করেছেন, তাদের জন্য ওই সন্ধ্যার কার্যক্রমটি ছিল বিশেষভাবে হৃদয়বিদারক। তাদের যুক্তি যে কেবল সংসদীয় শিষ্টাচারের বরখেলাপ এবং রাষ্ট্রের তিন অঙ্গের বিশেষ করে বিচার বিভাগ ও আইন পরিষদের মধ্যে ক্ষমতার ভাগাভাগির মূলনীতিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করেনি, সেইসাথে তারা ছিলেন ভ্রান্ত ও স্বার্থন্বেষকও।

এমপিরা দাবি করেছেন, সুপ্রিম কোর্টের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করার কাজটি ছিল ‘অবৈধ’ ও ‘অসাংবিধানিক’ এবং ১৯৭২ সালের মূল সংবিধান ‘পুনঃপ্রতিষ্ঠার’ পরিকল্পনা বানচাল করা। ২০১০ সাল থেকে সুপ্রিম কোর্ট আরো তিনটি সাংবিধানিক সংশোধনী- পঞ্চম, সপ্তম ও ত্রয়োদশ- বাতিল করেছে। বিশ্লেষকেরা উল্লেখ করেছেন, আওয়ামী লীগ পঞ্চম সংশোধনী বিষয়ক রায়কে ‘মাইলফলক’ হিসেবে উল্লেখ করেছিল এবং সপ্তম সংশোধনী বিষয়ক রায়কে স্বাগত জানিয়েছিল। ফলে অত্যন্ত যৌক্তিকভাবেই প্রশ্ন করা যায়, আওয়ামী লীগ এমপিরা যদি ওইসব রায়কে অবৈধ ও অসাংবিধানিক বিবেচনা না করেন, তবে তারা ষোড়শ সংশোধনীর ব্যাপারে এমনটা কেন করছেন?

তাদের ১৯৭২ সালের মূল সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিটিও শূন্যগর্ভ মনে হয়। ক্ষমতাসীন দলের এমপিরা যদি ১৯৭২-এর সংবিধানের মূল্যবোধ ও কার্যকারিতার বিষয়টি এত প্রবলভাবেই অনুভব করে থাকেন, তবে তারা সেটাকেই কেন অবিকলভাবে ফিরিয়ে আনার জন্য সংসদে বিল কেন আনছেন না? দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় এ ধরনের উদ্যোগ যে সফল হবে, তা নিশ্চয়তা দিয়ে বলা যায়।

ষোড়শ সংশোধনী সংবিধানের মূল কাঠামো পরিবর্তন করেনি এবং এর ফলে সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃত্ব-বহির্ভূত কাজ করেছে বলে এমপিদের জোরালো দাবি হালে পানি পায় না। স্বাধীন বিচার বিভাগ সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞান থাকলেই অনুধাবন করা যায়, বিচার বিভাগ থেকে বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা প্রত্যাহার করে পার্লামেন্টের কাছে সমর্পণ করার মানে হলো বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে খর্ব করা এবং সেইসূত্রে সংবিধানের মূল কাঠামোকে দুর্বল করা।

সংসদে ৯ জুলাইয়ের বক্তৃতাবাজির তোড়ে আরেকটি বিষয় পুরোপুরি ধামাচাপা পড়ে গেছে যে, ১৯৭২ সালের সংবিধান থেকে পার্লামেন্টের বিচারপতিদের অপসারণের বহুল আলোচিত ব্যবস্থাটি উচ্ছেদ ও বাতিল করাটা প্রথম আওয়ামী লীগ সরকারেরই কর্ম। তারাই ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সেটা করেছিলেন।

সংসদে ৯ জুলাইয়ের বক্তব্যের সারমর্ম প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে, এমপিরা তাদের এখতিয়ারের মধ্যে আছেন কিনা। জবাব দ্ব্যর্থহীনভাবে না। বাংলাদেশ সংবিধানের ধারা ৯৪(৪)-এ সুস্পষ্টভাবে বলে দেওয়া হয়েছে, প্রধান বিচারপতি এবং সুপ্রিম কোর্টের অন্যান্য বিচারপতি তাদের বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনার ব্যাপারে স্বাধীন থাকবেন। এই প্রেক্ষাপটে প্রখ্যাত আইনজ্ঞ মাহমুদুল ইসলাম বলেছেন, ‘নির্বাহী সরকার বা সংসদ সদস্যরা সুপ্রিম কোর্টের কোনো বিচারকের কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা করতে পারবে না। কার্যপ্রণালীতে বলা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের কোনো বিচারপতি কার্যক্রম নিয়ে থাকা কোনো প্রশ্ন, প্রস্তাব উত্থাপনযোগ্য নয়’ (ধারা ৫৩, ৫৪ ও ১৩৩)। তিনি আরো স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘সংসদ সদস্যরা সংসদে যে কথাই বলুন না কেন, ধারা ৭৮-এর আলোকে থাকা দায়মুক্তির সুবিধাটি নিয়ে তারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের স্বাধীনতা খর্ব করতে পারে- এমন কোনো বিবৃতি বা মন্তব্য করতে পারবেন না’ (কনস্টিটিউশনাল ল অব বাংলাদেশ, তৃতীয় সংস্করণ, ঢাকা : মল্লিক ব্রাদার্স, ২০১২)।

এটাও উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক হবে যে, কার্যপ্রণালীতে ব্যক্তিগত ধরনের কোনো অভিযোগ করা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে এমপিদের। ফলে এটা খুবই সম্ভব যে, অ্যামিকাস কিউরি প্রশ্নে অরুচিকর মন্তব্য করে এমপিরা তাদের প্রণীত কার্যপ্রণালী বিধি লঙ্ঘন করেছেন।

সম্মানিত এমপিরা জোর দিয়ে বলেছেন, কেবল পাকিস্তানেই বিচারপতিদের অপসারণে ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল’ রয়েছে। তারা বলেন, বেশির ভাগ দেশেই এই ক্ষমতা পার্লামেন্টের হাতে দেওয়া আছে। এ ধরনের দাবির পক্ষে প্রমাণের ওপর আলোকপাত করা যাক। ২০১৫ সালে কমনওয়েলথের পক্ষ থেকে প্রকাশিত ‘কমপেনডিয়াম অব অ্যানালাইসিস অব বেস্ট প্রাকটিস অন দি অ্যাপয়েন্টমেন্ট, টেনিউর অব রিমোভাল অব জাজেজ আন্ডার কমনওয়েলথ প্রিন্সিপালস’-এ বলা হয়েছে, কমনওয়েলথভুক্ত ৪৮টি দেশের মধ্যে মাত্র ১৬টিতে সংসদীয় অপসারণ ব্যবস্থা (৩৪.৩%), ৩০টির মতো দেশে নির্বাহী ও আইনপরিষদ থেকে আলাদা একটি সংস্থা (৬২.৫%) রয়েছে। বাকি দুটি দেশে রয়েছে মিশ্রব্যবস্থা (৩.২%)।

কমনওয়েলথ সমীক্ষায় দেখা গেছে, বেশির ভাগ সংসদীয় অপসারণব্যবস্থায় কোনো বিচারকের বিরুদ্ধে অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রাথমিক তদন্ত, তথ্যানুসন্ধান এবং মূল্যায়নে স্বাধীন, বহিরাগত সংস্থার  সম্পৃক্ত করার পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়ে থাকে। সম্মানিত এমপিরা আমলে নিতে পারতেন, যে ১৬টি দেশ সংসদীয় অপসারণের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, তাদের ১২টিই তথ্য তদন্তের দায়িত্বটি আইনপ্রণেতাদের ওপর রাখেনি। তারা এর বদলে আইন পরিষদ ও নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা একটি সংস্থার ওপর এ  দায়িত্বটি দিয়েছে। কেবল শ্রীলঙ্কা, নাউরু ও সামোয়োর অনুসরণ করে বিচারক অপসারণে একচ্ছত্র পার্লামেন্টারি নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে বাংলাদেশ।

সমীক্ষায় সতর্কতা উচ্চারণ করে বলা হয়েছে, সংসদীয় অপসারণ পদ্ধতি ‘প্রয়োগ করা হলে মারাত্মক সাংবিধানিক সঙ্ঘাতের সৃষ্টি করতে পারে।’ এতে উল্লেখ করা হয়েছে, দুই কক্ষবিশিষ্ট পদ্ধতিই অনেকটা নিরাপদ। কিন্তু বাংলাদেশে এ ধরনের কোনো ব্যবস্থা বর্তমানে সম্ভব নয়।

এক সিনিয়র মন্ত্রী উল্লেখ করেছেন, একজন অ্যামিকাস কিউরি ভারতে বিচারক অপসারণের ব্যবস্থা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টকে বিভ্রান্তকর তথ্য দিয়েছেন। তিনি এমন ধারণা সৃষ্টির প্রয়াস চালিয়েছেন যে, মনে হতে পারে, দেশটিতে এখনো সংসদের অপসারণের পুরনো পদ্ধতি চালু আছে। বাস্তবে ভারত, যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ অনেক দেশ বিচারপতি অপসারণে পার্লামেন্টকে দেওয়া ক্ষমতা হ্রাস করে সরকারি প্রভাবমুক্ত একটি ব্যবস্থার ওপর ন্যস্ত করেছে। সংবিধানের ৭০ ধারায় আবদ্ধ আমাদের এমপিদের নতুন বাস্তবতার প্রতি যথাযথ নজর দেওয়ার পরামর্শ দেয়া যেতে পারে।

ষোড়শ সংশোধনী বাতিলে আইন প্রণয়ন বিভাগের অস্বস্তিকর প্রতিক্রিয়া এবং বিচারপতি অপসারণ প্রশ্নে সংসদীয় নিয়ন্ত্রণের প্রায় সার্বজনীনভাবে বহাল থাকার ভ্রান্ত দাবি এই দেশের গণতন্ত্রের জন্য কলাণকর নয়। আশা করা যেতে পারে, যুক্তিই জয়ী হবে এবং রাষ্ট্রের সব অঙ্গ ক্ষমতা বিভাজনের মৌলিক ধারণা এবং আইনের শাসনের প্রতি যথাযথভাবে শ্রদ্ধাশীল থাকবে।

(লেখক : শিক্ষক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)

উদ্বেগ চালের দাম বৃদ্ধি নিয়েই

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

পাহাড়ে লাশের মিছিলের সাথে খবর একটাই! চালের দাম বাড়ছে। বাড়ছে তো বাড়ছেই। তিনবেলা মোটা ভাত খাওয়া সাড়ে পনের কোটি বাঙালীর মাথায় হাত, কোথায় গিয়ে থামবে চালের দাম? এই দেশের মানদন্ডে বিশ্ব খাদ্য সংস্থার হিসেবে ‘সুষম খাদ্য’ বলতে যাই থাকুক, এখন মোটা চালের ভাতই চলে যাচ্ছে নাগালের বাইরে। লাফিয়ে লাফিয়ে দাম বাড়ার কারণে জনপদের মানুষ ক্রমশ: আতঙ্ক গ্রস্ত হয়ে পড়ছে নিকট ভবিষ্যত ভাবনায়।

সরকারের গুদামে চালের মজুত নেমে এসেছে ২ লাখ টনের নিচে। বেসরকারী মজুত ১০ লাখ টন কম। দুই খাতেই চালের মজুত আশঙ্কাজনক। ২০১৭ সাল শুরু করেছিল ব্যবসায়ীরা ১০ লাখ টন মজুত কম নিয়ে। ব্যবসায়ীদের দাবি অনুযায়ী, উচুঁমাত্রার শুল্কের কারণে আমদানী করে পোষাচ্ছে না। এদিকে, সব ধরনের চালের দাম মাত্র একমাসে বেড়েছে কম-বেশি ৮ শতাংশ এবং চলতি বছরে বেড়েছে সবশুদ্ধ ৪৮ শতাংশ।

মাত্র ক’দিন আগেও শুনতে শুনতে কানে আসছিল – প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে মন্ত্রী-এমপি, দলীয় নেতা-পাতি নেতাসহ সুবিধাভোগীরা ও দলদাসদের- সকলের মুখে উন্নয়ন সাফল্যের উপচানো গল্প। বলা হচ্ছিলো, কৃষিতে বাংলাদেশের সাফল্য ঈর্ষণীয়; বাংলাদেশ বিশ্বের উদাহরন হয়ে উঠেছে। সরকারের সকলে একযোগে কোরাস গেয়েছেন, দেশ এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে বিপুল কৃষি উৎপাদন-এই দেশ চাল রপ্তানীকারক দেশে পরিনত হয়ে গেছে।

সরকারের বিশ্বস্ত অর্থনীতিবিদদের একজন কাজী খলীকুজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেছেন, “খাদ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে যা ভুল হওয়ার হয়ে গেছে। আমরা খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পুর্ণ- এ আত্মতুষ্টিতে ভুগে দেশে চালের ঘাটতি ও মজুতের বিষয়টি ভুলে গেছি”। খলীকুজ্জামানের কথা সত্য হলে দাঁড়াচ্ছে যে, সরকারের খাদ্য ব্যবস্থাপনা ছিল না এবং ঘাটতি ও মজুত সম্পর্কে তারা অজ্ঞ ছিল। এটি হলে সরকারকে অবশ্যই দায় নিতে হবে এবং শুরু হতে পারে খাদ্যমন্ত্রীর পদত্যাগের মাধ্যমে।

খাদ্যমন্ত্রী অবশ্য ফতোয়া দিয়েছিলেন, বিএনপিপন্থী ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে চালের দাম বেড়ে গেছে। তবে এখন তারা  চুপ মেরে গেছেন। তার অসত্য ও আজব তথ্য শুনতে শুনতে জনগন আসল পরিস্থিতি সম্পর্কে বুঝে গেছে। তার কথা সত্য ধরে নিলে, বিএনপিপন্থী ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে মন্ত্রী হিসেবে সে বা তার সরকার কোন ব্যবস্থা নেয়নি কেন? অথচ দেশের কে না জানে, চাল ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটগুলি ক্ষমতাসীন রাজনীতির সাথে জড়িত। সুতরাং তাদের অনৈতিক মুনাফার দায়ও সরকারের।

একটি অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে, এদেশে মজুত রাখার বিরুদ্ধে আইন আছে, প্রয়োগ নেই। ২০১১ সালে খাদ্য মন্ত্রণালয় কন্ট্রোল অব এসেনসিয়াল ফুড কমোডিটি এ্যাক্ট সংশোধন ও হালনাগাদ করে। ঐ আইনের আওতায় পণ্য মজুতের হিসেব পাক্ষিকভাবে দেয়া হয়েছিল প্রথম দুই বছর। ২০১৪ সাল থেকে এই হিসেব আর পাওয়া যায় না। ফলে বেসরকারী পর্যায়ে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মজুত গড়ে উঠছে নির্বিঘ্নে এবং মজুতদাররা যখন যেমন খুশি বাড়াচ্ছে চালসহ নানা পণ্যমূল্য।

সরকার এতকাল জানিয়ে এসেছে, ধান-চাল উৎপাদন ও মজুতের পরিমানের দিক থেকে দেশ খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন করেছে। এই নিরাপত্তা কতটা ‘ফানুস’ ছিল এবং বাস্তবতা কতটা ভিন্ন, তা এখন চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখানো হচ্ছে। বছরটি শুরুই হয়েছিল যেখানে ১০ লাখ টন ঘাটতি নিয়ে, সেটি পূরণের বদলে মনে হচ্ছে, সরকার লাফিয়ে লাফিয়ে চালের দাম বৃদ্ধি উপভোগ করছে এবং মন্ত্রী এই বাড়ার পেছনে বিএনপিপন্থীদের কারসাজির ভূত দেখতে পাচ্ছেন!

খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার গল্প বলা হলেও খাদ্য ব্যবস্থাপনার দৈন্য এখন ফুটে উঠেছে দগদগে ঘায়ের মত। অন্যদিকে কৃষি বাজারে অব্যবস্থাপনার কারণে কৃষকের ভাগ্যের কোন উন্নয়ন নেই। সরকার কৃষকদের ব্যাংক হিসেব দিয়েছে। ব্যাংক ঋণ নিতে উৎসাহ জুগিয়েছে। ঋণ নিয়ে কৃষক উৎপাদনে গেছেন। কিন্তু ঘরে ফিরেছেন নিঃস্ব হয়ে। কেউ জেলে থাকছেন, পালিয়ে বেড়াচ্ছেন সার্টিফিকেট মামলা মাথায় নিয়ে। এভাবে কথিত খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতা কৃষককে কারাবাস বা পলাতক করছে।

অধিকাংশ কৃষক মনে করেন, চাল আমদানী ও সিন্ডিকেটের হাতে বাজারের নিয়ন্ত্রন চলে যাওয়ায় তারা বিপুল পরিশ্রম করেও ফসলের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। এজন্য ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করা যাচ্ছে না। আটকে যাচ্ছেন আরো নতুন দেনার জালে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, সরকার যেখানে ক’দিন আগেও চাল রপ্তানী করার কথা বলেছে, সেখানে এখন বিপুল পরিমান চাল আমদানীর কথা উঠবে কেন? ফি-বছর এই আমদানীর কারণেই কৃষক ফসলের দাম পায়নি, আটকা পড়ে গেছে ঋণ-মামলা জালে।

প্রতি বছরই বিপুল পরিমান চাল আমদানী করা হয়। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ২ লাখ টন চাল আমদানীর জন্য বাজেটে ৭৮৭ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। অর্থাৎ চাল রপ্তানীর যুগের অবস্থা এটি এবং অর্থবছরের ছয়মাস পেরোতেই বরাদ্দের দ্বিগুনেরও বেশি চাল আমদানী করা হয়। ওই ছয় মাসের আমদানী আগের বছরের মোট ৩ লাখ ৭৪ হাজার টনেরও বেশি। সে সময়ে সরকার মাত্র ৫০ হাজার টন রপ্তানীর ঘোষণা দিয়ে আমদানী করে ৮ গুন বেশি।

খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা দেখাতে গিয়ে সরকার বিপুল আমদানীর এই হিসেব স্বীকার করেনি। ২০১৪ সাল থেকে শুরু হয় ব্যাপক চাল আমদানী। পরিমান ছিল ৪ লাখ ৯ হাজার টন। মন্ত্রীরা সে সময়ে বলেছিলেন, এসব চাল গো-খাদ্য হিসেবে আমদানী করা হয়েছে। কিন্তু ভারতীয় চালের হিন্দি লেখা মোড়ক ও উৎপাদন তারিখ সরকারের মিথ্যাচার প্রতিষ্ঠিত করেছিল। তারপরেও তারা দাবি করেছে, সুগন্ধী চাল ও গো-খাদ্যের বাইরে কোন চাল আমদানী করা হয়নি।

ভেতরে ভেতরে এই সরকার কতটা সিন্ডিকেটবান্ধব তার একটি নমুনা হচ্ছে ২০১৪ সালে ২৮ নভেম্বর প্রকাশিত একটি জাতীয় দৈনিকের রিপোর্ট।  রিপোর্টের বলা হয়, জুলাই ২০১৪ থেকে ২৭ নভেম্বর পর্যন্ত বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে আমদানীকৃত চালের পরিমান কম-বেশি ৮৭ হাজার টন। দেশে আমন ধান কাটা ও মাড়াইয়ের মৌসুমে এই চাল আমদানী করা চলছিল। ফলে কৃষক ফসলের মূল্য নিশ্চিত করতে পারেননি। এভাবেই কথিত কৃষকবান্ধব সরকার চাল আমদানী ও সিন্ডিকেটকে সবসময় সহায়তা দিয়ে এসেছে এবং বাজারের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিয়েছে।

সরকারী ভাষ্যে উৎপাদন ও উন্নয়ন-দুটোই বাড়ছে। তবে খাতগুলি বিচার করলে দেখা যাবে, উৎপাদকরা আছেন ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে। আর কথিত উন্নয়ন কতিপয় মানুষের সুবিধা এনে দিয়ে একটি লুটেরা ধনিক শ্রেনী গড়ে তুলছে। বিপুলসংখ্যক মানুষ এই কথিত উন্নয়ন বৃত্তের বাইরে। দেশের অর্থনীতির প্রধান তিন ভিত্তি কৃষি, গার্মেন্টস শিল্প ও রেমিট্যান্স। এই তিন খাতের মানুষেরাই সবসময়  মানবেতর জীবন-যাপন করছে।

খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে উৎপাদন, মজুত, রপ্তানী-সবকিছু এখন নগ্ন সত্য হয়ে হাজির হয়েছে। হাওড়ে বন্যায় মৌসুমী বোরো ফসল মার খাওয়া, ধানক্ষেতে ব্লাষ্ট রোগের আক্রমন, অতিবৃষ্টি আর বিএনপিপন্থী ব্যবসায়ীদের কারসাজি- দেশের খাদ্য নিরাপত্তা এক লহমায় ধ্বসিয়ে দিয়েছে, এটাও বিশ্বাস করতে হবে? ফি-বছর লাগাতার মিথ্যাচারের নিট রেজাল্ট হচ্ছে, মোটা চালের ওপর নির্ভরশীল মানুষগুলোর সাধ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে মোটা ভাত, ধ্বসে পড়ছে খাদ্য নিরাপত্তা !

আওয়ামী ‘প্রগতিশীলতা’র নয়া তত্ত্ব

শাহাদত হোসেন বাচ্চুঃ 

রবার্ট লুই ষ্টিভেনসন’র লেখা ‘ড. জেকিল এন্ড মিষ্টার হাইড’ উপন্যাসটির কাহিনী সংক্ষেপ মোটামুটি এরকম- ড. জেকিল একজন সদাশয় মানুষ, চিকিৎসা বিজ্ঞানী ও পরোপকারী। তিনি একটি ওষুধ আবিষ্কার করে বসেন; যেটি খেলে হেন মন্দ ও অমঙ্গলের কাজ নাই যা করা যায় না। বিকল্প ওষুধটিও আবিষ্কার করেন, যা খেলে স্ব-রূপে ফিরতে পারেন।

ভাল মানুষ হেনরী জেকিল ওষুধটি খেয়ে মন্দ মানুষ এডোয়ার্ড হাইডে রূপান্তরিত হচ্ছিলেন এবং সবরকম মন্দ ও অমঙ্গলের কাজ সংঘটন করছিলেন। আবার অন্য ওষুধটি খেয়ে জেকিলে ফেরত আসছিলেন। কিন্তু একসময় বাঁধে বিপত্তি। মন্দ মানুষ হাইডে রূপান্তরিত হতে হতে অন্য ওষুধটি কাজ করছিল না। তিনি ফেরত আসতে পারছিলেন না। ভালকে ছাড়িয়ে গিয়ে মন্দ-কুৎসিত প্রতিষ্ঠা লাভ করতে চলেছিল।

১৮৩৬ সালে লেখা এই কালজয়ী উপন্যাসটি বাংলাদেশের রাজনীতি, রাজনীতিবিদ ও দলদাসদের ক্ষেত্রে চমৎকার রূপক হিসেবে প্রাসঙ্গিক। শাসক শ্রেনী সবকালে কথনে-চলনে-বলনে ড. জেকিলের ভান করেন, আর অন্তরে পুষে রাখেন মি. হাইডের সকল দুষ্কর্ম। তাদের অনেকেই এখন প্রায় হাইডে রূপান্তরিত হয়েছেন, জেকিলে আর ফিরতে পারছেন না।

এক. রাজনীতি এখন আওয়ামী লীগের ‘বাস্তবতা’ এবং ‘প্রগতিশীলতা’- এটি সবশেষ কথিত বয়ান ও তত্ত্ব। তাদের বক্তব্য সত্য হলে ধরে নিতে হবে, কিছুদিন আগেও রাজনীতি ছিল ‘অবাস্তব’ এবং ‘প্রতিক্রিয়াশীল’। ক্ষমতাসীন দলটি এখনও পর্যন্ত খৈ ফোটার মত উচ্চারন করছে ‘স্বাধীনতার পক্ষশক্তি’ এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা। সরকার বা দলের বিপক্ষে যে কোন বক্তব্য, প্রতিবাদ এবং লেখালেখির মধ্যে খুঁজে পায় স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির অপচ্ছায়া বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরোধিতা। সুতরাং তাদের কথায় ধরে নেয়া যায়, সেগুলি ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ এবং ‘অবাস্তব’।

আওয়ামী লীগের মুখপাত্র ও সাধারন সম্পাদকের কথিত ‘রিয়েলষ্টিক এপ্রোচ’- এর রাজনীতি অবশেষে খুঁজে নিয়েছে ধর্মাশ্রয়ী একটি সংগঠনকে। যারা কিছুদিন আগেও ক্ষমতাসীনদের ভাষায় ছিল- স্বাধীনতা বিরোধী, রাজাকার-আলবদরদের উত্তরসূরী এবং পাকিস্তানী গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর অর্থ সাহায্যপুষ্ট। এখন ‘বাস্তব’ রাজনীতির কল্যাণে সেই গোষ্ঠিটি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ শক্তির মিত্রে পরিনত হয়েছে। এর আগে ভোটের রাজনীতিতে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী জামায়াতের সাথে বিএনপির জোটবদ্ধতা ও ক্ষমতা ভাগাভাগি তাহলে ‘বাস্তব’ ছিল?

প্রশ্ন উঠতে পারে, এর মধ্য দিয়ে উনসত্তর বয়সী আওয়ামী লীগ কি তার মৌল চরিত্রের পরিবর্তণ ঘটালো? অথবা কথিত প্রগতি ঘেঁষা দল হিসেবে পুরোনো ধারাই তারা বদলে দিচ্ছেন কিনা? ইতিহাসের আলোচনায় না যেয়ে শেখ হাসিনার আমলে সীমাবদ্ধ থাকছি। আওয়ামী লীগ সবসময় দাবি করে, তারা ধার্মিক তবে ধর্মান্ধ নয়।

এটি বিশ্বাস করলেও নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। আওয়ামী লীগ একসময় জামায়াতের সাথে যুগপৎ আন্দোলন করেছে। ১৯৯১ সালে আওয়ামী লীগের রাষ্ট্রপতি প্রার্থী বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী শীর্ষ দালাল গোলাম আযমকে পবিত্র কোরআন শরীফ উপহার দিয়ে দোয়া চেয়েছেন। ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ খেলাফত মজলিসের সাথে চুক্তি করেছিল। যেমনটি এখন হেফাজতের দাবির কাছে সমর্পিত হয়ে তাদের পক্ষে সাফাই-প্রচারেরও দায়িত্বও নিয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ বিরোধিতাকারী দল জামায়াতে ইসলামের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ভাগাভাগি করার কারণে বিএনপিকে আজ হোক কাল হোক, ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। তেমনি আওয়ামী লীগকে দাঁড়াতে হবে কথিত স্বৈরাচার ও অবৈধ ক্ষমতা দখলকারী এরশাদের বিচার না করে জোটবদ্ধ হয়ে ক্ষমতা ভাগাভাগি করার জন্য। হেফাজতের পৃৃষ্ঠপোষকতা প্রথমে বিএনপি করেছে। এখন আওয়ামী লীগ করছে। আবার সুযোগের অপেক্ষায় বিএনপি। হেফাজত এবং এরশাদের জন্য তারাও অপেক্ষা করে আছে।

দুই. এই আবর্তে ধর্মাশ্রিত ছোট-বড় সংগঠনগুলি আদৃত হয়ে উঠছে বড় দলগুলোর কাছে। কারণ একটাই, ভোটের রাজনীতিতে ধর্মকে ব্যবহার, বেশি বেশি ‘ইসলামী’ হয়ে ওঠা। বামদের সাথে আওয়ামী লীগের বন্ধন থাকলেও তাদের ক্ষীণকায় ভোটের ওপর আওয়ামী লীগের আদৌ ভরসা নেই। আপাতত: নাখোশ হলেও লোম-চর্মবিহীন বামদের কিছুই করার নেই। সেজন্যই হেফাজতসহ উগ্র  ডানপন্থীদের দিকে হাত বাড়িয়েছে ক্ষমতাসীনরা। এরশাদকে দিয়ে ধর্মাশ্রিত দলগুলি নিয়ে গঠন করাচ্ছে আরেকটি জোট।

অভ্যন্তরে অনুদার-অগণতান্ত্রিক চর্চা দলগুলিকে সামন্ত আদলের কাঠামোয় রেখে দিয়েছে। দলের প্রধান ব্যক্তিকে সন্তুষ্ট রাখাই মোক্ষ লাভ। আনুগত্য, অবশ্যই প্রশ্নহীন- এই রাজনীতির মূল বৈশিষ্ট্য। প্রধান ব্যক্তি যদি দেশ বা দলের মৌলিকত্ব বিরোধী কোন পদক্ষেপ নেন বা বক্তব্য দেন, তাহলে সেটি গোটা দলে অনুরণিত হতে থাকে। সকলে প্রধান ব্যক্তিকে সন্তুষ্ট করতে দশ ধাপ এগিয়ে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হন। ভিন্নমত থাকলে এবং তা কষ্মিণকালেও প্রকাশ হয়ে পড়লে আর রক্ষা থাকে না।

এই সর্বময় ক্ষমতা ব্যক্তিকে সাধারন থেকে তো দুরে সরিয়ে দেয়, এমনকি দলের কর্মীদের থেকেও। তিনি ঘেরাটোপে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন ক্ষমতার সর্বোচ্চ মহিমায়। এজন্যই ভারত সফর থেকে ফিরে এসে চুক্তিসমূহ প্রকাশের প্রসঙ্গ উঠলে শেখ হাসিনা তার ওপরে ‘বিশ্বাস’ রাখতে বলেন। একই কথা রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সময় তিনি বলেছেন এবং দাবি করেছেন তারচেয়ে বড় দেশপ্রেমিক আর কেউ নেই। এই কথাগুলি অনেকটা নিয়তিবাদীদের মত, গণতান্ত্রিক নেতৃত্বের মত নয়। আমাদের দেশে ক্ষমতাসীনরা সবসময় একই ভাষায় এবং একই ধরনের কথা বলে থাকেন।

প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় রাজনীতি বা দল এখানে সামর্থ্যবান হয়ে ওঠেনি। শেখ মুজিব, জিয়া, এরশাদ, খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনাই এদেশে এখন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের নাম এবং সবশেষ ও একমাত্র কথা। আগামীতে তারেক বিএনপির এবং জয় হবেন আওয়ামী লীগ নেতা। ব্যক্তি, পরিবার, ডাইন্যাষ্টি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের বিকল্প হয়ে উঠেছে। এর ওপর ভর করে দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতা চক্রাকারে ঘুরপাক খাচ্ছে, সেখানে দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্র চর্চা বা ভিন্নমত প্রকাশের অবকাশ কোথায়!

যে কোন উপায় অবলম্বনে নেতৃত্ব, ক্ষমতায় টিকে থাকার ইচ্ছা শাসকশ্রেনীকে সবসময় টাল-মাটাল করে দেয়। সেক্ষেত্রে বিএনপি বা আওয়ামী লীগ-কারো মধ্যে বৈসাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যাবে না। ফলে যে ন্যূনতম আদর্শ ও নৈতিকতার যে চর্চা বিদ্যমান ছিল- তা রাজনীতি থেকে বিদায় নিয়েছে পুরোপুরিভাবে। এই বিদায় দিতে গিয়ে গনতন্ত্রের প্রথম ধাপ জনগনের ভোটকে প্রথমেই নির্বাসিত করা হয়েছে। আবার ঘোষণাও এসেছে ২০১৪ সালের মত নির্বাচন আর হবে না। সেজন্য আরেকটি নীতি বিগর্হিত কাজের সূচনা হয়েছে ধর্মাশ্রিত সংগঠনগুলিকে ক্ষমতার পালাবদলে রাজনীতির মেইনষ্ট্রিমে বা মূলধারায় নিয়ে আসার মধ্য দিয়ে।

শুধুই ভোটের জন্য হেফাজতের সাথে সখ্যতা!

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

অবশেষে হেফাজতে ইসলামের সাথে গোপন-অপ্রকাশ্য সম্পর্কের অবসান ঘটালেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। হেফাজতের দাবির কাছে সমর্পিত হলেন তিনি। গণভবনে হেফাজতের মাওলানা শফির সাথে আলাপরত প্রধানমন্ত্রীর অত্যন্ত বিনয়াবনত ছবিটি মনে করিয়ে দেয় একসময়ে খালেদা জিয়া ও মতিউর রহমান নিজামীর আলাপচারিতার দৃশ্য। এভাবে ভিন্ন ভিন্ন সময়ের দুটি ছবি ইতিহাসে দুই সময়ের পঙ্কিল রাজনীতির সাক্ষী হয়ে গেল।

উনসত্তর বয়সী ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’ থেকে আওয়ামী লীগ কী পরিশেষে ‘আওয়ামী- হেফাজত লীগে’ পরিনত হতে চলেছে? সব সম্ভবের দেশে এখন ক্ষমতাসীন দলের নেতা-মন্ত্রীদের বক্তব্য শুনে মনে হচ্ছে, মোসাহেবরা অনেক দুর অবধি এগিয়ে। হঠাৎই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য শোনা যাচ্ছে, “কওমী মাদ্রাসা থেকে কখনও জঙ্গী সৃষ্টি হয় না। কওমী মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকরা কোনদিনই জঙ্গী হতে পারেন না।…ওলামাদের পথভ্রষ্ট করতে না পেরে জঙ্গীরা ইংলিশ মাধ্যমের ছাত্র-ছাত্রীদের জঙ্গী তৎপরতায় ব্যবহার করছে”।

দেখে-শুনে মনে হচ্ছে হেফাজতে ইসলাম এবং কওমী মাদ্রাসার নিজেদের আর কোন প্রকার প্রচার বা সাফাই গাওয়ার দরকার নেই। সরকারের মন্ত্রীগন এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতৃবৃন্দ কওমী মাদ্রাসা শিক্ষা এবং হেফাজতে ইসলামের দাবি-দাওয়ার পক্ষে সাফাই ও প্রচারের দায়িত্ব নিয়েছেন। সরকার প্রধান হেফাজতের প্রতি সংবেদনশীল, সুতরাং তারা ‘সবুজ সংকেত’ পেয়েই গেছেন।

মনে করিয়ে দিই, মাত্র কিছুকাল আগেও হেফাজতে ইসলাম সম্পর্কে আওয়ামী লীগের বক্তব্য ছিল- তারা জঙ্গী; তারা মানুষ হত্যা করে, পবিত্র কোরআন শরীফ পোড়ায়; গাছ কেটে ব্যারিকেড দেয়। মাওলানা শফি প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছিলেন, নাস্তিকদের কতল করা ওয়াজিব। এরপর নাস্তিক আখ্যা দিয়ে অনেক তরুন-যুবকে হত্যা করা হয়। সেই হেফাজতের সাথে এখন আওয়ামী লীগের মহামিলনে একাকার। জামায়াত-বিএনপির ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতির প্রতিপক্ষ হিসেবে হেফাজতে ইসলামকে দাঁড় করানোর প্রচেষ্টা ২০১৩ সালের মে মাসে প্রায় ভেস্তে যেতে বসেছিল। পাল্টা কৌশল হিসেবে হেফাজতকে ব্যবহার করে উৎখাতের চেষ্টা হলে সরকার সম্বিৎ ফিরে পায়। প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, “হেফাজতের ওপর ভর করে বিএনপি-জামায়াত সরকার উৎখাত করতে চেয়েছে”। আইন প্রতিমন্ত্রী ছিলেন আরো একধাপ এগিয়ে, “এই উৎখাত প্রচেষ্টার সাথে পাকিস্তানী গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই অর্থ ও প্রণোদনা যুগিয়েছে”।

কথিত ‘উৎখাত তত্ত্ব’ সম্ভবত: সরকারকে আরো কঠোরতা আরোপের মধ্য দিয়ে হেফাজতকে বাগে আনার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা গ্রহনে মনোযোগী করে তোলে। হেফাজত নেতাদের বিরুদ্ধে সব মিলিয়ে ৫৮টি মামলা দায়ের করা হয়। মহাসচিব বাবুনগরীকে গ্রেফতার, রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করার পাশাপাশি সরকারের মন্ত্রী ও এজেন্সিসমূহের নিরন্তর প্রচেষ্টায় অবশেষে হেফাজতকে বাগে আনা সম্ভব হয় এবং ক্ষমতাসীনদের সাথে দীর্ঘ ‘মধুচন্দ্রিমা’র প্রেক্ষাপট তৈরী হয়।

আবার পেছনে ফেরা যাক- ২০১৩ সালের ৫ মে তারিখে হেফাজতে ইসলামকে সমাবেশ করার অনুমতি দিয়ে ঢাকায় আনা জরুরী হয়ে পড়েছিল। কারণ “গণজাগরন মঞ্চ” নামক তরুনদের শাহবাগকেন্দ্রিক একটি সমাবেশ ক্রমশ: হুমকি হয়ে উঠছিল। যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে সমবেত কিছু তরুন ব্লগার সম্ভবত: শুরুতে বুঝতে পারেনি, তাদের দাবি তো বটেই, এরসাথে সবরকম অন্যায়ের বিরুদ্ধে জনগন সমবেত হতে থাকবে।

শাহবাগের দৃশ্যপট প্রতিদিন পাল্টাচ্ছিল। গণজাগরন মঞ্চ হয়ে উঠছিল আগুনে প্রতিবাদের মঞ্চ। ঠিক  তখনই গণজাগরন মঞ্চের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়া হয় রাজনৈতিক কূটচাল ও বিভাজন। অন্যপক্ষে, প্রধান বিরোধী দলের নেতা জামায়াতের মন রক্ষায় গণজাগরন মঞ্চকে ‘নাস্তিক ও শয়তানের আখড়া’ হিসেবে আখ্যায়িত করলে  বিএনপি এর বিরোধিতায় নেমে পড়ে। এই ত্রিশঙ্কু অবস্থায় ব্লগার আহমেদ রাজীব নিষ্ঠুর খুনের শিকার হন। এভাবেই অমিত তেজ ও সম্ভাবনায় দীপ্ত গণজাগরন মঞ্চ রাজনৈতিক জটিলতার ফাদে খাবি খেতে থাকে।

প্রতিবাদের বিকল্প প্লাটফর্ম গণজাগরন মঞ্চকে হটিয়ে দিতে হেফাজতকে ঢাকায় সমাবেশের অনুমতি দেয়া হয়েছিল। এই সমাবেশকে ঘিরে বিএনপি-জামায়াত ও জাতীয় পার্টি গা ঝাড়া দিয়ে ওঠে। বিএনপি এর মধ্যে ‘আরব বসন্ত’র গন্ধ পায় এবং সরকারকে ৪৮ ঘন্টার আল্টিমেটাম দিয়ে পতন বা ‘অন্যরকম কিছু’ ঘটানোর আশায় বিভোর হয়। হেফাজতের মঞ্চ হয়ে ওঠে বিএনপি ও জাতীয় পার্টি নেতাদের মিলনকেন্দ্র।

ঢাকায় হেফাজতে ইসলামী মহাসমাবেশ ও রক্তাক্ত অবরোধ কর্মসূচি দমনে ‘অপারেশন ফ্লাশলাইট’-এর সমাপ্তির পর কওমী মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠনটির সাথে ক্ষমতাসীনদের সম্পর্কে আপাত: ছেদ পড়ে। সে সময়ের আওয়ামী লীগ সাধারন সম্পাদক সৈয়দ আশরাফ ঘোষণা দিয়েছিলেন, “হেফাজতে ইসলাম পাকিস্তানের প্রেতাত্মা। রাজাকার-আলবদরের উত্তরসুরী। হেফাজতকে আর ঘর থেকে বের হতে দেয়া হবে না’’। পাঠক, এটিই ছিল ২০১৩ সালের মে মাসে ক্ষমতাসীন দলের মুখপাত্রের বক্তব্য!

২০১৩ সালে মাওলানা শফি এক ওয়াজে নারীদের বিষয়ে কটুক্তি করার পরে ঐ বছরের ১৩ জুলাই শেখ হাসিনার বক্তব্য; “…আমি তাকে বলতে চাই, তিনি কি কোন মায়ের গর্ভে জন্ম নেন নাই? তিনি সেই মাকে সম্মান করেন না? তার কি স্ত্রী বা কোন বোন নাই? হেফাজত বর্তমানে বিএনপির সাথে জোট বেঁধেছে। কিন্তু বিএনপি প্রধান তো একজন নারী, তাহলে তিনি কিভাবে তাকে নেতা হিসেবে মেনে নিচ্ছেন”…? ১৪ জুলাই শেখ হাসিনা বলেছিলেন, “নারীদের বিরুদ্ধে যাতে আর কেউ কোন দিন অশালীন মন্তব্য করতে না পারে, সেজন্য নারী নেত্রীদের সোচ্চার হতে হবে”।

পরবর্তী ঘটনা পরম্পরা বিপরীত। সকলের মত উপেক্ষা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা দাবির প্রতি সংবেদনশীলতা ও নমনীয়তা প্রদর্শন করেন। পরিস্কার হয়ে যায় ভোটের রাজনীতিতে কওমী মাদ্রাসাভিত্তিক এই সংগঠনটি বিএনপি-জামায়াতের বিরুদ্ধে কতটা গুরুত্বপূর্ন। যে কারণে এক সময়ে আওয়াশী লীগ ২০০৬ সালে খেলাফতে মজলিসের সাথে নির্বাচনী চুক্তি করেছিলেন, সেই একই উদ্দেশ্যে হেফাজতে ইসলামকে তিনি সাথে রাখছেন-শুধুমাত্র ভোটের জন্য।

এজন্য বহুল উচ্চারিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, অসাম্প্রদায়িক চেতনা, ধর্ম নিয়ে রাজনীতি না করা এবং শেখ হাসিনা ও সৈয়দ আশরাফের ২০১৩ সালের উক্তি কী বাণের জলের মত ভেসে গেল? শুধুমাত্র ভোটের জন্য নাকি ভেতরে আরো কোন মাজেজা আছে? এমন কোন বিষয়, যা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আনতে হেফাজতকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু করার প্রয়োজন হয়েছিল?

হেফাজত এখন সরকারের কাছে নাম্বার ওয়ান প্রিভিলেজড। ১৩ দফার প্রতি নমনীয়তা এবং হেফাজতের বিরুদ্ধে সবগুলো মামলা হিমাগারে পাঠানো দিয়ে যার শুরু, তা পূর্ণতা পেতে থাকে পাঠ্যক্রম পরিবর্তন, সুপ্রীম কোর্টের সামনে ভাস্কর্য অপসারণ দাবির সাথে খোদ সরকার প্রধানের ঐক্যমত্য এবং কওমী মাদ্রাসা সনদের প্রতি শর্তহীন স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে। নববর্ষের দেয়ালচিত্র কালিমালিপ্ত করা, মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রতি হুমকি এবং সরকারী তরফে বিকাল ৫ টার মধ্যে নববর্ষের অনুষ্ঠান গুটিয়ে নেয়ার নির্দেশ-সবকিছুকে একসূত্রে গ্রথিত করছেন আওমীপন্থী বুদ্ধিজীবিরাও।

আগামী নির্বাচনই যে হেফাজতের প্রতি সরকার প্রধানের আনুকূল্যের মূল কারণ, সেটি ইতিমধ্যে সকলের জানা হয়ে গেছে। বাম মিত্রদের যৎসামান্য ভোটের ওপর নির্ভর করতে পারছে না ক্ষমতাসীনরা। তাই হেফাজতের ভোট হয়ে উঠছে বড় ভরসা। ক্ষমতাসীন দলের সাধারন সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, “রিয়েলষ্টিক এপ্রোচ নিয়ে দেশ চালাতে হবে। অধিকাংশ জনগনের আবেগ-অনুভূতি তো ইগনোর করতে পারিনা”। তিনি এও বলেছেন, ভাস্কর্য অপসারণের পক্ষে থাকাই প্রগতিশীলতা। পাঠক দেখবেন, মি. কাদেরের বক্তব্য ‘অধিকাংশ জনগনের অনুভূতি’ ‘বাস্তবতা’ ‘প্রগতিশীলতা’ ইত্যাদি কথামালা সবিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

আওয়ামী লীগ সাধারন সম্পাদকের বক্তব্যের অর্থ দাঁড়াচ্ছে, হেফাজত এবং কওমী মাদ্রাসা এখন সবচেয়ে বড় ‘বাস্তবতা’। দেশের অধিকাংশ মানুষ কওমী মাদ্রাসা শিক্ষা ও হেফাজতের পক্ষে এবং ভাস্কর্যের বিরুদ্ধে! মি. কাদের তাঁর ভাষায়, এই অধিকাংশ মানুষের মনোভাব বুঝলেন কি করে? ভাস্কর্য অপসারণ যদি তার ভাষায় প্রগতিশীলতা হয়, তা কি শুধু সুপ্রীম কোর্টের ভাস্কর্যের ক্ষেত্রে? নাকি হেফাজতের সাথে মিলে তারা দেশের সব ভাস্কর্য অপসারণ করে ফেলবেন?  তার ভাষায়, এই ‘রিয়েলষ্টিক এপ্রোচ’ যদি গ্রহনীয় হয়, তাহলে বিএনপি-জামায়াতের জোটবদ্ধতা ‘রিয়েলেষ্টিক’ নয় কেন?

রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গত কয়েক দশকে ভোটারদের কাছে খাঁটি ইসলামী দল প্রমানের চেষ্টা উন্মত্ত প্রতিযোগিতার আকার নিয়েছে। প্রয়োজনে তারা যে কোন দল ধর্মান্ধ, চরমপন্থী গোষ্ঠির সাথে আঁতাত বা জোট করে ফেলছে। বিএনপি এক্ষেত্রে খোলামেলা, মুক্তিযুদ্ধের প্রতিপক্ষ জামায়াতের সাথে জোট করে ক্ষমতা ভাগাভাগি করেছে। কথিত অসা¤প্রদায়িক দল আওয়ামী লীগ এই ক্ষেত্রে এখন আর বিএনপির চেয়ে কোন অংশে কম যাচ্ছে না। জাতীয় পার্টির কথা উল্লেখেরই প্রয়োজন নেই।

ক্ষমতা প্রশ্নে গত সাড়ে চার দশক ধরে জাতির মনোজগতই পরিবর্তন করে দেয়া হয়েছে। ধর্মানুভূতির কোমল দিকগুলো নিয়ে রাজনীতিকরা খেলছে। জনগনের সহজাত সারল্যকে পূঁজি করে নেতিবাচকতা ও অদৃষ্টবাদী রাজনীতির চর্চাই আজকের পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। এর ফলে গোটা জাতির, বিশেষ করে তরুনদের মনোজমিনে নৈরাজ্য সৃষ্টি হচ্ছে। সেই অনিবার্যতায় ভর করা উগ্রপন্থাও হয়ে দাঁড়িয়েছে রাজনীতির অন্যতম হাতিয়ার এবং সেটিকে দমনের বদলে ব্যবহারের প্রবণতাই লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

ভোটের রাজনীতি : হেফাজতের কাছে আত্মসমর্পণ

হায়দার আকবর খান রনো ::

২০১৩ সালে শাহবাগ চত্বরে যখন গণজাগরণ মঞ্চে হাজার হাজার এমনকি লক্ষাধিক মানুষের জমায়েত হচ্ছিল, তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেটাকে ভালো চোখে দেখেননি। তিনি বেশ অস্বস্তির মধ্যে পড়েছিলেন। অন্যদিকে জামায়াতের সঙ্গী বিএনপি প্রথম থেকেই এর বিরুদ্ধে ছিল। খালেদা জিয়া গণজাগরণ মঞ্চকে ‘নাস্তিকদের’ সমাবেশ পর্যন্ত বলেছিলেন।

গণজাগরণ মঞ্চের পাল্টা সমাবেশের আয়োজন করে হেফাজতে ইসলাম। ২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর মতিঝিল এলাকায় তারা লক্ষাধিক মাদ্রাসার ছাত্র ও অন্যান্যদের জমায়েত করেছিলেন সারাদেশ থেকে। সেদিন তারা মতিঝিল, পল্টন এলাকায় তাণ্ডব সৃষ্টি করেছিল। অনেকে ইসলামী বিপ্লবের স্বপ্ন দেখেছিলেন। বেগম খালেদা জিয়া হেফাজতে ইসলামের এই সকল কাজে উৎসাহ যুগিয়েছিলেন। ভেবেছিলেন, হয়তো বা সরকার পরিবর্তন হবে। কিন্তু তা হয়নি। গভীর রাতে শেখ হাসিনার সরকার পুলিশি এ্যাকশন চালিয়ে ছত্রভঙ্গ করে দেয় হেফাজতের সমাবেশকে। একই সঙ্গে স্বপ্নভঙ্গ ঘটলো ইসলামী বিপ্লবের।

এরপর পাশার দান পাল্টে গেল। হেফাজতের সঙ্গে গোপন সমঝোতা হলো আওয়ামী লীগ সরকারের। দুটি প্রধান রাজনৈতিক দল সঙ্গী করলো দুটি ধর্মান্ধ মৌলবাদী সংগঠনকে। খালেদা জিয়ার জোট সঙ্গী জামায়াত। অন্যদিকে অবিশ্বাস্য মনে হলেও হেফাজত হয়ে উঠলো শেখ হাসিনার সরকারের সহযোগী।

এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। কারণ ইতোপূর্বেও দেখেছি, দুটি প্রধান রাজনৈতিক দল ও তাদের নেতৃত্বের কাছে আদর্শ বলে কোন বস্তু নেই। ভোটের রাজনীতির সুবিধার্থে তারা যেকোনো স্তরে নামতে পারেন।

খালেদা জিয়া জামায়াতকে জোট সঙ্গী করেছেন স্রেফ ভোটের রাজনীতির হিসেব থেকে। অন্যদিকে শেখ হাসিনা একদিকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে জামায়াত নেতাদের মৃত্যুদন্ডাদেশ কার্যকর করেছেন, অপরদিকে হেফাজতের কাছে আত্মসমর্পণ করে অসাম্প্রদায়িকতা, ধর্মনিরপেক্ষতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। ২০০৬ সালে একই রকম ভোটের হিসেব-নিকেশ থেকে আওয়ামী লীগ ‘খেলাফত’-এর সঙ্গে পাচ দফা চুক্তি করেছিল, যা ছিল চরম প্রতিক্রিয়াশীল।

প্রায় একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে চলেছে। মাদ্রাসা ছাত্র ও মাদ্রাসা সংশ্লিষ্টদের ভোট পাবেন এই আশায় শেখ হাসিনা হেফাজতের ঘোর সাম্প্রদায়িক ও প্রতিক্রিয়াশীল দাবিগুলো মেনে নিয়েছেন এবং নিচ্ছেন। হেফাজতের দাবি অনুসারে ইতোপূর্বেই পাঠপুস্তক থেকে হিন্দু লেখকদের রচনা বাদ দেয়া হয়েছে। নাস্তিক অভিযোগে কোনো কোনো মুসলমান কবির উৎকৃষ্ট রচনাও বাদ দেয়া হয়েছিল। হেফাজতকে তুষ্ট করার এটা গেল প্রথম ধাপ।

পরবর্তী ধাপে আমরা দেখছি, প্রধানমন্ত্রী শর্তহীনভাবে কওমী মাদ্রাসার সর্বোচ্চ ডিগ্রিকে এম,এ’র সমমর্যাদা দান করার (যেখানে পঞ্চম শ্রেণীর ঊর্ধ্বে বাংলা, ইংরেজী পর্যন্ত পড়ানো হয় না) এবং সুপ্রীম কোর্টের সামনের স্থাপত্যকে সরিয়ে ফেলার অঙ্গীকার করেছেন। এ বড় ভয়ংকর ইঙ্গিত। পহেলা বৈশাখ নিয়ে হেফাজত প্রমুখ এখনো বিতর্ক তৈরি করে চলেছে। চট্টগ্রামে দেওয়ালের আলপনা মবিল দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন আওয়ামী ওলামা লীগ বাংলা নববর্ষ পালনকে ইসলাম সম্মত নয় বলে ঘোষণা করেছে। এক কথায়, বাঙালী কৃষ্টি, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য সব কিছুকেই বাতিল করতে হবে ঘোর প্রতিক্রিয়াশীল, সাম্প্রদায়িক ও নারী বিদ্বেষী হেফাজতের সন্তুষ্টির জন্য। সুস্থ সংস্কৃতিক চর্চা ও গণতান্ত্রিক চেতনাও আজ হুমকির সম্মুখীন। ভোটের রাজনীতির জন্য কি এতোটা নিচে নামতে হবে?

এরশাদ থেকে নুর হোসেন : গডফাদাররা কখনই ধরা পরেনা

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

এক. খুলনার সিরিয়াল কিলার এরশাদ শিকদারের নাম মনে আছে তো! ঘাটের কুলি থেকে সিটি কাউন্সিলর, দোর্দন্ড প্রতাপশালী রাজনীতিবিদ এরশাদ শিকদার। অবশেষে ক্ষমতাধররা রুষ্ট হলে আইন তার নাগাল পেয়ে যায়; বিচারে তার ফাঁসি হয়েছিল। কারা এরশাদ শিকদারকে সৃষ্টি করেছিল এবং তার গডফাদারই কে বা কারা, আইন তার নাগাল পায়নি। বলা হয়, আইনের হাত অনেক লম্বা, কিন্তু আইনের শাসনহীনতার এই দেশে ক্ষমতাসীনরা আইনকে শাসন করেন কিংবা নিয়ন্ত্রন করে থাকেন। এ কারনেই অপরাধ সংঘটনের নেপথ্য ব্যক্তিরা থাকেন নিরাপদ, ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।

সম্প্রতি নারায়নগঞ্জে সাত খুনের মামলায় ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত নুর হোসেনের সাথে এরশাদ শিকদারের প্রোফাইল চমৎকারভাবে মিলে যায়। ট্রাকের হেলপার থেকে ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা, জাতীয় পার্টির নেতা। পরবর্তীতে বিএনপি হয়ে আওয়ামী লীগে। দল পাল্টানোর সাথে সাথে তার গডফাদারও পাল্টে গেছে। সকলে জানে, তার সবশেষ গডফাদার কে?  নুর হোসেনের ভাষায়, “তিনি আমার বাপ লাগেন”।

সামরিক শাসন বা কথিত গণতান্ত্রিক শাসনে এই রাষ্ট্র ও সরকার ব্যবস্থায় প্রতিটি জেলা-উপজেলায়, এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়ে এখন শত শত এরশাদ শিকদার বা নুর হোসেনরা সদম্ভ বিচরনরত। একদা অজ্ঞাত-অখ্যাত, লেখাপড়াবিহীন এসব মানুষ কোটি কোটি টাকার মালিক। নষ্ট-ভ্রষ্ট রাজনীতির হাত ধরে ইউপি, উপজেলা, জেলা চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য এমনকি মন্ত্রীও হয়ে যাচ্ছেন। এদের প্রত্যেকের এক বা একাধিক গডফাদার থাকে – যারা ক্ষমতাসীন দলের নেতা বা অত্যন্ত প্রভাবশালী আমলাও হতে পারেন। এই সন্ত্রাসী ও টাউট শ্রেনী দেশের রাজনীতি-অর্থনীতির নেয়ামক হয়ে উঠেছে।

দুই. এই দেশের সাধারন মানুষ কত অল্পেই না সন্তুষ্ট! একটি মামলার বিচারেই তারা অনেক খুশি। এর অন্যতম কারন হচ্ছে, বিচারহীনতার সংস্কৃতির ধারাবাহিকতার বিপরীতে এটি পরম প্রাপ্তি। আরো বড় মেসেজ, অপরাধী যেই হোক, শাস্তি হতে পারে। আরো বড় প্রাপ্তি, র‌্যাবের মত দায়মুক্ত একটি এলিট ফোর্সের ১৬ সদস্যর মৃত্যুদন্ড। এককালের রক্ষীবাহিনীর মত এই বাহিনীর জবাবদিহিতা প্রশ্নবিদ্ধ এবং গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যা সংঘটনে অভিযোগের আঙুল তাদের দিকে। এরকম একটি বাহিনীর সদস্যদের বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যাপারে দেশে তো বটেই আন্তর্জাতিক মহলগুলিও সচকিত। দেশের পত্র-পত্রিকা, ইলেকট্রোনিক মিডিয়াগুলির রিপোর্ট, সম্পাদকীয়, টক শো-সব জায়গায় দাবি করা হচ্ছে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারলাম।

দায়িত্ব গ্রহনের দু’বছর পূর্তিতে আমরা প্রধান বিচারপতির এমত বক্তব্যে আশ্বস্ত হতে পারি যে, ‘অপরাধী যত বড় হোক দায়মুক্তি পাবে না’। তার সোজা-সাপ্টা কথায় জানতে পারি, সুপ্রীম কোর্টের সময়োপযোগী হস্তক্ষেপের ফলে নারায়নগঞ্জে সাত হত্যা মামলার দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে। মনে পড়ছে, অভিযুক্ত তিন সামরিক অফিসারকে গ্রেফতার করতে কালক্ষেপন ছিল লক্ষ্যণীয়। উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্থানীয় প্রশাসন গ্রেফতারে বাধ্য হয়েছিল। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবি অতিরিক্ত এর্টনী জেনারেল শক্ত সওয়াল কেন করতে পারলেন না, সেজন্য তাকে চাকরি হারাতে হয়েছিল। এই রিটে ড. কামাল হোসেন কেন ভিকটিমদের পক্ষে দাঁড়িয়ে র‌্যাবের কর্মকর্তাদের গ্রেফতারের নির্দেশনা আনলেন, সেজন্য সরকার প্রধান সে সেময় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন।

এজন্যই আম-জনতা একধরনের বৈপরীত্য অনুভব করেন। মানুষ প্রধান অপরাধের দায়মুক্তিতে বিশ্বাস করে না। অথচ প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হোসেইন মুহাম্মদ এরশাদ এমপি, যিনি একজন সাবেক রাষ্ট্রপতি এবং স্বৈরাচারী হিসেবে গণ আন্দোলনে পতিত, যিনি মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার ও ১৯৮১ সালে চট্টগ্রামে ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুর হত্যা মামলার আসামী। এরশাদের বিচার বছরের পর বছর ঝুলে আছে কেন? রায় দেয়ার তারিখ নির্ধারনের পরেও বিচারক বদল হয় কেন? একটি হত্যা মামলায় এতবার বিচারক বদলের পরেও জনসাধারন কি আশ্বস্ত থাকবে, অপরাধী যত বড় হোক দায়মুক্তি পাবে না?

আমি অপটিমিষ্টিক মানুষ হলেও এতটা নই, হয়তো এ কারনে যে, অসংখ্য খুন, গুম, ধর্ষণের ঘটনায় বিচার ঝুলে আছে, কোন কোন ক্ষেত্রে অনন্তকাল ধরে। হিমাগারে চলে গেছে অনেক মামলার ভাগ্য। শীর্ষ পর্যায়ের হস্তক্ষেপ, রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো, দায়মুক্তি, তদন্ত অনুসন্ধানে পক্ষপাত বা গাফিলতি এবং আইনের ফাঁক-ফোঁকড়ের সুবিধে নিয়ে কত যে খুনি-অপরাধী পার পেয়ে গেছে কিংবা যাচ্ছে, তার হিসেব কে রাখে! এমনকি ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত খুনিরা সরকারের পরামর্শ বা সুপারিশক্রমে রাষ্ট্রপতির ক্ষমায় মুক্ত হয়ে গেছে।

তিন. নারায়নগঞ্জের সাতখুন মামলার বিচারে স্পষ্ট যারা এই অপহরণ, খুন ও লাশ গুমের সাথে সরাসরি যুক্ত ছিলেন বলে প্রমানিত হয়েছে আদালত তাদের মৃত্যুদন্ড দিয়েছে। অপরাধ সংঘটনে সহযোগিরাও নানা মেয়াদে দন্ডাদেশ পেয়েছে। স্বস্তি পেয়েছে ক্ষমতাসীন দল। এই মামলার প্রধান আসামী নুর হোসেন, যিনি কিছুকাল আগের প্রতাপশালী রাজনীতিবিদ ও কোটিপতি, সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সম্মানিত সভাপতি ও সিটি কাউন্সিলর, তার শাস্তি নিশ্চিত হওযায় ইমেজ ফিরিয়ে আনতে এটি ভালভাবে ব্যবহার করা যাবে। তারা আরও সন্তুষ্ট এটা ভেবে যে, এই মামলার পুলিশী তদন্তকালে কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে না আসাও নিশ্চিত করতে পেরেছিলেন।

কাশিমপুর জেলের কনডেম সেলে বসে ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত নুর হোসেন এখন নিশ্চয়ই স্লো-মোশন মুভির মত অতীত দেখতে পাচ্ছেন। তবে এখনও ক্ষীণ আশা নিশ্চয়ই করছেন, হাইকোর্ট, সুপ্রীম কোর্টের আপিল-রিভিউ আর সবশেষে রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা ভিক্ষা পর্যন্ত তো থাকছেই! হয়তো তার আফসোস হচ্ছে গডফাদারকে নিয়ে। তদন্তকালে গডফাদারের মুখোশ খুলে দেবার সুযোগ যে তাকে দেয়া হয়নি। ভারত থেকে ফেরত আনার পরে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজনও মনে করেনি পুলিশ। জানে সে, এরকম সব সম্ভাবনা বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। এজন্য একটি প্রশ্ন  ঘুরে-ফিরে আসতেই থাকবে- সাত খুনের মাষ্টারমাইন্ড নুর হোসেন, নাকি ধরাছোঁয়ার বাইরের কেউ?  আইন কি তার  নাগাল পেয়েছে?

পত্রিকা এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ার খবরে জানতে বা মনে করতে পারি, সাত খুনের ঘটনার দুইদিন পর ২৯ এপ্রিল রাত সাড়ে নয়টার দিকে এমপি শামীম ওসমানকে ফোন করেন নুর হোসেন। সেই ফোনের রেকর্ড রয়েছে পুলিশের হাতে। তদন্ত কর্মকর্তার বরাতে পত্রিকা জানায়, শামীম ওসমানকে ফোন করেছিল নুর হোসেন।

শামীম বলেছিলেন, ‘খবরটা পৌছাই দিছিলাম, পাইছিলা’? নুরঃ ‘পাইছি ভাই’। শামীমঃ ‘তুমি অতো চিন্তা কোরনা’। নুর হোসেন কান্নাজড়িত কন্ঠে, ‘ভাই আমি লেখাপড়া করি নাই। আমার অনেক ভুল আছে। আপনি আমার বাপ লাগেন, আপনারে আমি অনেক ভালবাসি, ভাই। আপনি আমারে একটু যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন’। শামীমঃ ‘এখন আর কোন সমস্যা হবে না’। ‘গৌর দা’ বলে এক লোকের সাথে নুর হোসেনকে দেখা করতে বলেন। কথোপকথনের এই পর্যায় শামীম ওসমান জানতে চান, কোন সিল (সম্ভবত: ভিসা) আছে কিনা? উত্তরে নুর হোসেন বলেন, ‘আছে, আছে, সিল আছে, কিন্তু যামু ক্যামনে? যেভাবে বলল এ্যালার্ট (রেড এ্যালার্ট)’। শামীম বলেন, তুমি আগাইতে থাকো। নুরঃ ‘ভাই তাহলে একটু খবর নেন, আমি আবার ফোন দেই’। এই পর্যায়ে শামীম ওসমান বলেন,‘তুমি কোন অপরাধ  করো নাই। আমি জানি, ঘটনা অন্য কেউ ঘটাইয়া এক ঢিলে দুই পাখি মারতেছে’।

মামলার সাথে সম্পর্কিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই আলাপচারিতার ফোন রেকর্ড সাতখুন মামলার অনুসন্ধান ও তদন্ত পর্যায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারতো। রহস্যময় কারনে তদন্তকারীরা এই সূত্রকে কোন গুরুত্বই দেননি। এরকম বক্তব্যের রেকর্ড পাওয়ার পরেও পুলিশের গুরুত্ব না দেয়ার বিষয়টি এখন রহস্যই থেকে যাবে। এমনকি নুর হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদ না করার বিষয়টিও। এ বিষয়ে নারায়নগঞ্জের তৎকালীন এসপি মিডিয়াকে বলেছিলেন, নুর হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন নেই!

চার. সাত খুনের ঘটনা ‘অর্গানাইজড ক্রাইমের’ মডেল ধরলে কতগুলি প্রশ্ন সামনে চলে আসবে। তদন্ত বা অনুসন্ধান পর্যায়ে সে বিষয়গুলো ধামাচাপা দেয়া হয়েছে। অপহরণ এবং খুন হয়েছিলেন সাতজন। টার্গেট ছিল একজন-কাউন্সিলর নজরুল। হত্যা করিয়েছে নুর হোসেন। নজরুল-নুর হোসেন, দু’জনই স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা এবং তাদের গডফাদার একই ব্যক্তি। কথিত ছয় কোটি টাকা ও র‌্যাবের সম্পৃক্ত হওয়ার বিষয়টিও কি পরিকল্পনার অংশ? এর সাথে পূর্বাপর বিষয়গুলো সামনে না আনার কারন কি এটাই ছিল যে, বেরিয়ে পড়বে মূল হোতার নাম-পরিচয়?

এই অপহরণ, হত্যার পেছনে সিদ্ধিরগঞ্জ-নারায়নগঞ্জের রাজনৈতিক সন্ত্রাসের ধারাবাহিক ইতিহাস এবং সন্ত্রাসের নিয়ন্ত্রক ব্যক্তিদের ভূমিকা পর্যালোচনায় আনা হয়নি। কারন সাত অপহরণ ও হত্যাকান্ডের ঘটনা গডফাদার ও তার পরিবারকে নতুন জীবন দান করেছে। নজরুল-নুর হোসেনের মত পথের কাঁটা বিদেয় করে দিয়ে গডফাদার ধুঁয়ে-মুছে জুনিয়র ক্যাডারদের মাধ্যমে পুরো এলাকার নিয়ন্ত্রন নিয়ে নিয়েছে। সুতরাং ঘটনা পরিকল্পিত বা কাকতালীয় যাই হোক, একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

২০১৪ সালের আগষ্টে ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় বিশেষ একজন ব্যক্তি বলেছিলেন, নারায়নগঞ্জ কখনও অপরাধমুক্ত হবে না। কারন এখানে ফি-বছর শত শত কোটি টাকা চাঁদাবাজির মাধ্যমে আয় করা হয়। সরকার পাল্টালে অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রনও পাল্টায়।  যেমন এখানকার বর্তমান গডফাদার ২০০১ সালে দলবলসহ দুবাই পালিয়ে গিয়েছিলেন এবং ফিরে এসেছেন ২০০৯ সালের গোড়ায়। ওই সময়ে চারদলীয় জোটের নেতা ছিলেন গডফাদার। তার মতে, গডফাদারদের জন্য হুমকি হয়ে উঠলেই তাদের সরিয়ে দেয়া হয়। সাতখুনেরও আয়োজন করা হয় ক্রমাগত হুমকি হয়ে ওঠা নজরুল, নুর হোসেনকে সরিয়ে দিতে। এর সাথে র‌্যাবকে যুক্ত করা হয় টাকার লোভ দেখিয়ে।

এ সব বিষয়গুলি নারায়নগঞ্জে তো বটেই, সারাদেশেও ওপেন সিক্রেট। ক্ষমতাসীন দল ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এসব বিষয় আমলে নিয়েছেন, এরকম দৃশ্যমানতা কোথাও নেই। সাতটি মানুষ খুন ও লাশ গুমের চেষ্টার ন্যায়বিচার হয়েছে। কিন্তু অপরাধের শেকড়শুদ্ধ উৎপাটনে তদন্ত ও অনুসন্ধান পর্যায়ে কোন আগ্রহ না থাকায় নারায়নগঞ্জের অন্ধকার জগতের নিয়ন্ত্রকটি আড়ালেই থেকে গেছে। ফলে ন্যায়বিচারের যে প্রসারমানতা আরো বিস্তৃত হতে পারতো সেটি সম্ভাবনা হিসেবেই থেকে গেল।