Home » রাজনীতি (page 7)

রাজনীতি

ভোটের রাজনীতি : হেফাজতের কাছে আত্মসমর্পণ

হায়দার আকবর খান রনো ::

২০১৩ সালে শাহবাগ চত্বরে যখন গণজাগরণ মঞ্চে হাজার হাজার এমনকি লক্ষাধিক মানুষের জমায়েত হচ্ছিল, তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেটাকে ভালো চোখে দেখেননি। তিনি বেশ অস্বস্তির মধ্যে পড়েছিলেন। অন্যদিকে জামায়াতের সঙ্গী বিএনপি প্রথম থেকেই এর বিরুদ্ধে ছিল। খালেদা জিয়া গণজাগরণ মঞ্চকে ‘নাস্তিকদের’ সমাবেশ পর্যন্ত বলেছিলেন।

গণজাগরণ মঞ্চের পাল্টা সমাবেশের আয়োজন করে হেফাজতে ইসলাম। ২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর মতিঝিল এলাকায় তারা লক্ষাধিক মাদ্রাসার ছাত্র ও অন্যান্যদের জমায়েত করেছিলেন সারাদেশ থেকে। সেদিন তারা মতিঝিল, পল্টন এলাকায় তাণ্ডব সৃষ্টি করেছিল। অনেকে ইসলামী বিপ্লবের স্বপ্ন দেখেছিলেন। বেগম খালেদা জিয়া হেফাজতে ইসলামের এই সকল কাজে উৎসাহ যুগিয়েছিলেন। ভেবেছিলেন, হয়তো বা সরকার পরিবর্তন হবে। কিন্তু তা হয়নি। গভীর রাতে শেখ হাসিনার সরকার পুলিশি এ্যাকশন চালিয়ে ছত্রভঙ্গ করে দেয় হেফাজতের সমাবেশকে। একই সঙ্গে স্বপ্নভঙ্গ ঘটলো ইসলামী বিপ্লবের।

এরপর পাশার দান পাল্টে গেল। হেফাজতের সঙ্গে গোপন সমঝোতা হলো আওয়ামী লীগ সরকারের। দুটি প্রধান রাজনৈতিক দল সঙ্গী করলো দুটি ধর্মান্ধ মৌলবাদী সংগঠনকে। খালেদা জিয়ার জোট সঙ্গী জামায়াত। অন্যদিকে অবিশ্বাস্য মনে হলেও হেফাজত হয়ে উঠলো শেখ হাসিনার সরকারের সহযোগী।

এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। কারণ ইতোপূর্বেও দেখেছি, দুটি প্রধান রাজনৈতিক দল ও তাদের নেতৃত্বের কাছে আদর্শ বলে কোন বস্তু নেই। ভোটের রাজনীতির সুবিধার্থে তারা যেকোনো স্তরে নামতে পারেন।

খালেদা জিয়া জামায়াতকে জোট সঙ্গী করেছেন স্রেফ ভোটের রাজনীতির হিসেব থেকে। অন্যদিকে শেখ হাসিনা একদিকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে জামায়াত নেতাদের মৃত্যুদন্ডাদেশ কার্যকর করেছেন, অপরদিকে হেফাজতের কাছে আত্মসমর্পণ করে অসাম্প্রদায়িকতা, ধর্মনিরপেক্ষতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। ২০০৬ সালে একই রকম ভোটের হিসেব-নিকেশ থেকে আওয়ামী লীগ ‘খেলাফত’-এর সঙ্গে পাচ দফা চুক্তি করেছিল, যা ছিল চরম প্রতিক্রিয়াশীল।

প্রায় একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে চলেছে। মাদ্রাসা ছাত্র ও মাদ্রাসা সংশ্লিষ্টদের ভোট পাবেন এই আশায় শেখ হাসিনা হেফাজতের ঘোর সাম্প্রদায়িক ও প্রতিক্রিয়াশীল দাবিগুলো মেনে নিয়েছেন এবং নিচ্ছেন। হেফাজতের দাবি অনুসারে ইতোপূর্বেই পাঠপুস্তক থেকে হিন্দু লেখকদের রচনা বাদ দেয়া হয়েছে। নাস্তিক অভিযোগে কোনো কোনো মুসলমান কবির উৎকৃষ্ট রচনাও বাদ দেয়া হয়েছিল। হেফাজতকে তুষ্ট করার এটা গেল প্রথম ধাপ।

পরবর্তী ধাপে আমরা দেখছি, প্রধানমন্ত্রী শর্তহীনভাবে কওমী মাদ্রাসার সর্বোচ্চ ডিগ্রিকে এম,এ’র সমমর্যাদা দান করার (যেখানে পঞ্চম শ্রেণীর ঊর্ধ্বে বাংলা, ইংরেজী পর্যন্ত পড়ানো হয় না) এবং সুপ্রীম কোর্টের সামনের স্থাপত্যকে সরিয়ে ফেলার অঙ্গীকার করেছেন। এ বড় ভয়ংকর ইঙ্গিত। পহেলা বৈশাখ নিয়ে হেফাজত প্রমুখ এখনো বিতর্ক তৈরি করে চলেছে। চট্টগ্রামে দেওয়ালের আলপনা মবিল দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন আওয়ামী ওলামা লীগ বাংলা নববর্ষ পালনকে ইসলাম সম্মত নয় বলে ঘোষণা করেছে। এক কথায়, বাঙালী কৃষ্টি, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য সব কিছুকেই বাতিল করতে হবে ঘোর প্রতিক্রিয়াশীল, সাম্প্রদায়িক ও নারী বিদ্বেষী হেফাজতের সন্তুষ্টির জন্য। সুস্থ সংস্কৃতিক চর্চা ও গণতান্ত্রিক চেতনাও আজ হুমকির সম্মুখীন। ভোটের রাজনীতির জন্য কি এতোটা নিচে নামতে হবে?

এরশাদ থেকে নুর হোসেন : গডফাদাররা কখনই ধরা পরেনা

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

এক. খুলনার সিরিয়াল কিলার এরশাদ শিকদারের নাম মনে আছে তো! ঘাটের কুলি থেকে সিটি কাউন্সিলর, দোর্দন্ড প্রতাপশালী রাজনীতিবিদ এরশাদ শিকদার। অবশেষে ক্ষমতাধররা রুষ্ট হলে আইন তার নাগাল পেয়ে যায়; বিচারে তার ফাঁসি হয়েছিল। কারা এরশাদ শিকদারকে সৃষ্টি করেছিল এবং তার গডফাদারই কে বা কারা, আইন তার নাগাল পায়নি। বলা হয়, আইনের হাত অনেক লম্বা, কিন্তু আইনের শাসনহীনতার এই দেশে ক্ষমতাসীনরা আইনকে শাসন করেন কিংবা নিয়ন্ত্রন করে থাকেন। এ কারনেই অপরাধ সংঘটনের নেপথ্য ব্যক্তিরা থাকেন নিরাপদ, ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।

সম্প্রতি নারায়নগঞ্জে সাত খুনের মামলায় ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত নুর হোসেনের সাথে এরশাদ শিকদারের প্রোফাইল চমৎকারভাবে মিলে যায়। ট্রাকের হেলপার থেকে ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা, জাতীয় পার্টির নেতা। পরবর্তীতে বিএনপি হয়ে আওয়ামী লীগে। দল পাল্টানোর সাথে সাথে তার গডফাদারও পাল্টে গেছে। সকলে জানে, তার সবশেষ গডফাদার কে?  নুর হোসেনের ভাষায়, “তিনি আমার বাপ লাগেন”।

সামরিক শাসন বা কথিত গণতান্ত্রিক শাসনে এই রাষ্ট্র ও সরকার ব্যবস্থায় প্রতিটি জেলা-উপজেলায়, এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়ে এখন শত শত এরশাদ শিকদার বা নুর হোসেনরা সদম্ভ বিচরনরত। একদা অজ্ঞাত-অখ্যাত, লেখাপড়াবিহীন এসব মানুষ কোটি কোটি টাকার মালিক। নষ্ট-ভ্রষ্ট রাজনীতির হাত ধরে ইউপি, উপজেলা, জেলা চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য এমনকি মন্ত্রীও হয়ে যাচ্ছেন। এদের প্রত্যেকের এক বা একাধিক গডফাদার থাকে – যারা ক্ষমতাসীন দলের নেতা বা অত্যন্ত প্রভাবশালী আমলাও হতে পারেন। এই সন্ত্রাসী ও টাউট শ্রেনী দেশের রাজনীতি-অর্থনীতির নেয়ামক হয়ে উঠেছে।

দুই. এই দেশের সাধারন মানুষ কত অল্পেই না সন্তুষ্ট! একটি মামলার বিচারেই তারা অনেক খুশি। এর অন্যতম কারন হচ্ছে, বিচারহীনতার সংস্কৃতির ধারাবাহিকতার বিপরীতে এটি পরম প্রাপ্তি। আরো বড় মেসেজ, অপরাধী যেই হোক, শাস্তি হতে পারে। আরো বড় প্রাপ্তি, র‌্যাবের মত দায়মুক্ত একটি এলিট ফোর্সের ১৬ সদস্যর মৃত্যুদন্ড। এককালের রক্ষীবাহিনীর মত এই বাহিনীর জবাবদিহিতা প্রশ্নবিদ্ধ এবং গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যা সংঘটনে অভিযোগের আঙুল তাদের দিকে। এরকম একটি বাহিনীর সদস্যদের বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যাপারে দেশে তো বটেই আন্তর্জাতিক মহলগুলিও সচকিত। দেশের পত্র-পত্রিকা, ইলেকট্রোনিক মিডিয়াগুলির রিপোর্ট, সম্পাদকীয়, টক শো-সব জায়গায় দাবি করা হচ্ছে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারলাম।

দায়িত্ব গ্রহনের দু’বছর পূর্তিতে আমরা প্রধান বিচারপতির এমত বক্তব্যে আশ্বস্ত হতে পারি যে, ‘অপরাধী যত বড় হোক দায়মুক্তি পাবে না’। তার সোজা-সাপ্টা কথায় জানতে পারি, সুপ্রীম কোর্টের সময়োপযোগী হস্তক্ষেপের ফলে নারায়নগঞ্জে সাত হত্যা মামলার দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে। মনে পড়ছে, অভিযুক্ত তিন সামরিক অফিসারকে গ্রেফতার করতে কালক্ষেপন ছিল লক্ষ্যণীয়। উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্থানীয় প্রশাসন গ্রেফতারে বাধ্য হয়েছিল। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবি অতিরিক্ত এর্টনী জেনারেল শক্ত সওয়াল কেন করতে পারলেন না, সেজন্য তাকে চাকরি হারাতে হয়েছিল। এই রিটে ড. কামাল হোসেন কেন ভিকটিমদের পক্ষে দাঁড়িয়ে র‌্যাবের কর্মকর্তাদের গ্রেফতারের নির্দেশনা আনলেন, সেজন্য সরকার প্রধান সে সেময় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন।

এজন্যই আম-জনতা একধরনের বৈপরীত্য অনুভব করেন। মানুষ প্রধান অপরাধের দায়মুক্তিতে বিশ্বাস করে না। অথচ প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হোসেইন মুহাম্মদ এরশাদ এমপি, যিনি একজন সাবেক রাষ্ট্রপতি এবং স্বৈরাচারী হিসেবে গণ আন্দোলনে পতিত, যিনি মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার ও ১৯৮১ সালে চট্টগ্রামে ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুর হত্যা মামলার আসামী। এরশাদের বিচার বছরের পর বছর ঝুলে আছে কেন? রায় দেয়ার তারিখ নির্ধারনের পরেও বিচারক বদল হয় কেন? একটি হত্যা মামলায় এতবার বিচারক বদলের পরেও জনসাধারন কি আশ্বস্ত থাকবে, অপরাধী যত বড় হোক দায়মুক্তি পাবে না?

আমি অপটিমিষ্টিক মানুষ হলেও এতটা নই, হয়তো এ কারনে যে, অসংখ্য খুন, গুম, ধর্ষণের ঘটনায় বিচার ঝুলে আছে, কোন কোন ক্ষেত্রে অনন্তকাল ধরে। হিমাগারে চলে গেছে অনেক মামলার ভাগ্য। শীর্ষ পর্যায়ের হস্তক্ষেপ, রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো, দায়মুক্তি, তদন্ত অনুসন্ধানে পক্ষপাত বা গাফিলতি এবং আইনের ফাঁক-ফোঁকড়ের সুবিধে নিয়ে কত যে খুনি-অপরাধী পার পেয়ে গেছে কিংবা যাচ্ছে, তার হিসেব কে রাখে! এমনকি ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত খুনিরা সরকারের পরামর্শ বা সুপারিশক্রমে রাষ্ট্রপতির ক্ষমায় মুক্ত হয়ে গেছে।

তিন. নারায়নগঞ্জের সাতখুন মামলার বিচারে স্পষ্ট যারা এই অপহরণ, খুন ও লাশ গুমের সাথে সরাসরি যুক্ত ছিলেন বলে প্রমানিত হয়েছে আদালত তাদের মৃত্যুদন্ড দিয়েছে। অপরাধ সংঘটনে সহযোগিরাও নানা মেয়াদে দন্ডাদেশ পেয়েছে। স্বস্তি পেয়েছে ক্ষমতাসীন দল। এই মামলার প্রধান আসামী নুর হোসেন, যিনি কিছুকাল আগের প্রতাপশালী রাজনীতিবিদ ও কোটিপতি, সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সম্মানিত সভাপতি ও সিটি কাউন্সিলর, তার শাস্তি নিশ্চিত হওযায় ইমেজ ফিরিয়ে আনতে এটি ভালভাবে ব্যবহার করা যাবে। তারা আরও সন্তুষ্ট এটা ভেবে যে, এই মামলার পুলিশী তদন্তকালে কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে না আসাও নিশ্চিত করতে পেরেছিলেন।

কাশিমপুর জেলের কনডেম সেলে বসে ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত নুর হোসেন এখন নিশ্চয়ই স্লো-মোশন মুভির মত অতীত দেখতে পাচ্ছেন। তবে এখনও ক্ষীণ আশা নিশ্চয়ই করছেন, হাইকোর্ট, সুপ্রীম কোর্টের আপিল-রিভিউ আর সবশেষে রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা ভিক্ষা পর্যন্ত তো থাকছেই! হয়তো তার আফসোস হচ্ছে গডফাদারকে নিয়ে। তদন্তকালে গডফাদারের মুখোশ খুলে দেবার সুযোগ যে তাকে দেয়া হয়নি। ভারত থেকে ফেরত আনার পরে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজনও মনে করেনি পুলিশ। জানে সে, এরকম সব সম্ভাবনা বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। এজন্য একটি প্রশ্ন  ঘুরে-ফিরে আসতেই থাকবে- সাত খুনের মাষ্টারমাইন্ড নুর হোসেন, নাকি ধরাছোঁয়ার বাইরের কেউ?  আইন কি তার  নাগাল পেয়েছে?

পত্রিকা এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ার খবরে জানতে বা মনে করতে পারি, সাত খুনের ঘটনার দুইদিন পর ২৯ এপ্রিল রাত সাড়ে নয়টার দিকে এমপি শামীম ওসমানকে ফোন করেন নুর হোসেন। সেই ফোনের রেকর্ড রয়েছে পুলিশের হাতে। তদন্ত কর্মকর্তার বরাতে পত্রিকা জানায়, শামীম ওসমানকে ফোন করেছিল নুর হোসেন।

শামীম বলেছিলেন, ‘খবরটা পৌছাই দিছিলাম, পাইছিলা’? নুরঃ ‘পাইছি ভাই’। শামীমঃ ‘তুমি অতো চিন্তা কোরনা’। নুর হোসেন কান্নাজড়িত কন্ঠে, ‘ভাই আমি লেখাপড়া করি নাই। আমার অনেক ভুল আছে। আপনি আমার বাপ লাগেন, আপনারে আমি অনেক ভালবাসি, ভাই। আপনি আমারে একটু যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন’। শামীমঃ ‘এখন আর কোন সমস্যা হবে না’। ‘গৌর দা’ বলে এক লোকের সাথে নুর হোসেনকে দেখা করতে বলেন। কথোপকথনের এই পর্যায় শামীম ওসমান জানতে চান, কোন সিল (সম্ভবত: ভিসা) আছে কিনা? উত্তরে নুর হোসেন বলেন, ‘আছে, আছে, সিল আছে, কিন্তু যামু ক্যামনে? যেভাবে বলল এ্যালার্ট (রেড এ্যালার্ট)’। শামীম বলেন, তুমি আগাইতে থাকো। নুরঃ ‘ভাই তাহলে একটু খবর নেন, আমি আবার ফোন দেই’। এই পর্যায়ে শামীম ওসমান বলেন,‘তুমি কোন অপরাধ  করো নাই। আমি জানি, ঘটনা অন্য কেউ ঘটাইয়া এক ঢিলে দুই পাখি মারতেছে’।

মামলার সাথে সম্পর্কিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই আলাপচারিতার ফোন রেকর্ড সাতখুন মামলার অনুসন্ধান ও তদন্ত পর্যায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারতো। রহস্যময় কারনে তদন্তকারীরা এই সূত্রকে কোন গুরুত্বই দেননি। এরকম বক্তব্যের রেকর্ড পাওয়ার পরেও পুলিশের গুরুত্ব না দেয়ার বিষয়টি এখন রহস্যই থেকে যাবে। এমনকি নুর হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদ না করার বিষয়টিও। এ বিষয়ে নারায়নগঞ্জের তৎকালীন এসপি মিডিয়াকে বলেছিলেন, নুর হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন নেই!

চার. সাত খুনের ঘটনা ‘অর্গানাইজড ক্রাইমের’ মডেল ধরলে কতগুলি প্রশ্ন সামনে চলে আসবে। তদন্ত বা অনুসন্ধান পর্যায়ে সে বিষয়গুলো ধামাচাপা দেয়া হয়েছে। অপহরণ এবং খুন হয়েছিলেন সাতজন। টার্গেট ছিল একজন-কাউন্সিলর নজরুল। হত্যা করিয়েছে নুর হোসেন। নজরুল-নুর হোসেন, দু’জনই স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা এবং তাদের গডফাদার একই ব্যক্তি। কথিত ছয় কোটি টাকা ও র‌্যাবের সম্পৃক্ত হওয়ার বিষয়টিও কি পরিকল্পনার অংশ? এর সাথে পূর্বাপর বিষয়গুলো সামনে না আনার কারন কি এটাই ছিল যে, বেরিয়ে পড়বে মূল হোতার নাম-পরিচয়?

এই অপহরণ, হত্যার পেছনে সিদ্ধিরগঞ্জ-নারায়নগঞ্জের রাজনৈতিক সন্ত্রাসের ধারাবাহিক ইতিহাস এবং সন্ত্রাসের নিয়ন্ত্রক ব্যক্তিদের ভূমিকা পর্যালোচনায় আনা হয়নি। কারন সাত অপহরণ ও হত্যাকান্ডের ঘটনা গডফাদার ও তার পরিবারকে নতুন জীবন দান করেছে। নজরুল-নুর হোসেনের মত পথের কাঁটা বিদেয় করে দিয়ে গডফাদার ধুঁয়ে-মুছে জুনিয়র ক্যাডারদের মাধ্যমে পুরো এলাকার নিয়ন্ত্রন নিয়ে নিয়েছে। সুতরাং ঘটনা পরিকল্পিত বা কাকতালীয় যাই হোক, একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

২০১৪ সালের আগষ্টে ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় বিশেষ একজন ব্যক্তি বলেছিলেন, নারায়নগঞ্জ কখনও অপরাধমুক্ত হবে না। কারন এখানে ফি-বছর শত শত কোটি টাকা চাঁদাবাজির মাধ্যমে আয় করা হয়। সরকার পাল্টালে অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রনও পাল্টায়।  যেমন এখানকার বর্তমান গডফাদার ২০০১ সালে দলবলসহ দুবাই পালিয়ে গিয়েছিলেন এবং ফিরে এসেছেন ২০০৯ সালের গোড়ায়। ওই সময়ে চারদলীয় জোটের নেতা ছিলেন গডফাদার। তার মতে, গডফাদারদের জন্য হুমকি হয়ে উঠলেই তাদের সরিয়ে দেয়া হয়। সাতখুনেরও আয়োজন করা হয় ক্রমাগত হুমকি হয়ে ওঠা নজরুল, নুর হোসেনকে সরিয়ে দিতে। এর সাথে র‌্যাবকে যুক্ত করা হয় টাকার লোভ দেখিয়ে।

এ সব বিষয়গুলি নারায়নগঞ্জে তো বটেই, সারাদেশেও ওপেন সিক্রেট। ক্ষমতাসীন দল ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এসব বিষয় আমলে নিয়েছেন, এরকম দৃশ্যমানতা কোথাও নেই। সাতটি মানুষ খুন ও লাশ গুমের চেষ্টার ন্যায়বিচার হয়েছে। কিন্তু অপরাধের শেকড়শুদ্ধ উৎপাটনে তদন্ত ও অনুসন্ধান পর্যায়ে কোন আগ্রহ না থাকায় নারায়নগঞ্জের অন্ধকার জগতের নিয়ন্ত্রকটি আড়ালেই থেকে গেছে। ফলে ন্যায়বিচারের যে প্রসারমানতা আরো বিস্তৃত হতে পারতো সেটি সম্ভাবনা হিসেবেই থেকে গেল।

২০১৬ : জঙ্গীবাদীরা যে বার্তাটি দিয়ে গেল

আমীর খসরু ::

বিদায়ী বছরটি বাংলাদেশের জন্য আপাতদৃষ্টিতে রাজনৈতিকভাবে তেমন ঘটনাবহুল ছিল না। এ বছরটিতে ক্ষমতাসীনরা আগের ধারাবাহিকতায়ই মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগের ধারা অব্যাহত রেখেই বিরোধী মত, পথ, পক্ষ এবং অপরাপর রাজনৈতিক দলগুলোকে দমনের কৌশল গ্রহণ আগের মতোই করেছিল। যে কারণে রাজনৈতিক নানা নিপীড়ন-নির্যাতন, নিখোজ করে দেয়া, গুম, আইন-শৃংখলা রক্ষাবাহিনীর হাতে বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড বেড়েছে। এই ধারা ভবিষ্যতেও জারী থাকবে কিনা- সে প্রশ্নটিই রেখে যাচ্ছে- ২০১৬। সরকারের অঘোষিত যে উদ্যোগ অর্থাৎ বিরোধী দলশূন্য বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা-আপাতদৃষ্টিতে তা সফল হয়েছে বলে তারা মনে করছেন। বিরোধী দলগুলো ক্রমাগত নির্জীব হয়ে যাচ্ছে; মানুষ রাষ্ট্রীয় নানা সন্ত্রাস, অনিয়মের বিরুদ্ধেও আর সোচ্চার নয়; সবাই যেন কেমন চুপচাপ হয়ে গেছেন; আর এমন এক নিদারুন অস্বস্তিকর চুপ থাকার বা চুপ করিয়ে দেয়ার নীতি একটি রাষ্ট্রের জন্য যে কতোটা ভয়ংকরভাবে ক্ষতিকর তা বোঝার বোধবুদ্ধিটুকুও এখন আর বাকি নেই। বাকি নেই বললে ভুল হবে, এটা লোপ পাওয়ানো হয়েছে বা পেয়েছে বহুকাল আগেই। আর বিষয়টি ইচ্ছাকৃত ও কৌশলগত। তবে একথাটি মনে রাখতে হবে যে, বিরোধী দল, মত, পথ, পক্ষকে আপাত দমন করা গেলেও, মানুষের মনোজগতকে কোনোভাবেই দমন করা যায় না এবং এর উপরে কোনো কর্তৃত্বই জারী করা নিস্ফল।

গণতন্ত্রের বদলে উন্নয়ন এবং অল্প-স্বল্প গণতন্ত্র আর বেশি বেশি উন্নয়ন অগণতান্ত্রিক শাসকদের শ্লোগান বটে; তবে তার উদ্দেশ্য ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রবীণ অর্থনীতিবিদ মানকুর অলসন তার বিখ্যাত গ্রন্থ The Rise and Decline of Nations: Economic Growth, Stagflation and Social Rigidities-এ দেখিয়েছেন, আমাদের মতো রাষ্ট্র ব্যবস্থাগুলো আসলে Distributional coalition অর্থাৎ একটি ভাগবাটোয়ারাকারী পক্ষই রাষ্ট্র যন্ত্র নিয়ন্ত্রণ করে।

একথা জোর দিয়ে ২০১৬-তেও বারবার বলা হয়েছে যে, কি কি ব্যবস্থাবলী এবং প্রতিষ্ঠান জনকল্যাণে সরকারের পক্ষ থেকে গ্রহণ করা হয়েছে; কতো কতো উন্নয়ন করা হয়েছে – তার ফিরিস্তিও সরকারের দিক থেকে দীর্ঘ। তবে এই প্রশ্ন উত্থাপন জরুরি যে, এই উন্নয়ন আসলে কার জন্য? জনগণ কিভাবে এবং কতোটুকু উপকৃত হয়েছে সরকার গৃহীত বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে? যদি জনগণ উপকৃত না হয়ে থাকে তাহলে ২০১৬ সালেও সেই একই প্রশ্ন ছিল- উন্নয়নের সাথে জনগণের সম্পৃক্ততা কতোটুকু? বাস্তব জবাব কি হবে তা আমরা সবাই জানি। অর্মত্য সেন তার গ্রন্থ The Idea of Justice -এ বলেছেন, ‘‘আনুষ্ঠানিকভাবে কি কি প্রতিষ্ঠান আছে, শুধু তা দিয়ে গণতন্ত্রের মূল্যায়ন হয় না; ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠীর বহু মানুষের কণ্ঠস্বরগুলো শোনা যাচ্ছে কিনা সেটাও দেখতে হবে’’।

জনগণের জন্য উন্নয়ন ভাবনার ক্ষেত্রে বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ এবং দার্শনিক সামির আমিন বলেছেন, ‘‘উন্নয়নের প্রক্রিয়া বাস্তবায়িত করতে হলে প্রাথমিকভাবে জন-উদ্যোগের প্রয়োজন হয় না, যা প্রয়োজন তাহলো- রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের প্রতি জনগণের সমর্থন’’।

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে, এসব কথা যাদের কাছে পৌছানো প্রয়োজন তাদের কাছে তা পৌছেনা অথবা যতোটা দেখা যাচ্ছে, তারা এতে আদৌ বিশ্বাসী নন।

বাক-ব্যক্তি স্বাধীনতাসহ সংবিধান স্বীকৃত মৌলিক অধিকারগুলো কার্যত স্থগিত রেখে; একটি প্রতিনিধিত্বশীল সরকারের অনুপস্থিতিতে জনগণের উন্নয়ন বাস্তবে কতোটা সম্ভব সে প্রশ্ন ২০১৬ সালের শেষ প্রান্তে এসে আবারও প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। প্রকট হয়েছে- জনগণের সাথে রাষ্ট্র ব্যবস্থার যে সম্পর্ক তা কতোটা শিথিল হয়েছে-সে প্রশ্নটিও। এ কথাটিও উল্লেখ করা প্রয়োজন, সচল-সজীব জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রে প্রতিনিধিত্বশীল সরকার ব্যবস্থায় জনগণ ভোটাধিকারের প্রথম ধাপটি পার হয়ে একে একে অন্যান্য অধিকারগুলো ভোগ করবেন-এটাই হচ্ছে স্বতঃসিদ্ধ নিয়ম। কিন্তু সে ব্যবস্থাটি পুরোপুরি অনুপস্থিত থাকায় জনগণ এটা খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারছেন যে, রাষ্ট্রের সাথে তাদের হয় বৈরিতার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে অথবা অবস্থাটা দাড়িয়েছে এমন যে, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাটি কোনোভাবেই জনগণের সাথে যে চুক্তিতে আবদ্ধ-তার বরখেলাপ হয়ে গেছে। আর এটি করা হয়েছে জনগণকে বিতাড়িত করার জন্য অত্যন্ত কৌশলে।

সাধারণ মানুষের দুর্ভাগ্য হচ্ছে, তারা নিজেদের পুরো মাত্রায় অপ্রাপ্তির বেদনায় পরাজিত বলে মনে করছে। কারণ তেল-গ্যাস, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধিই হোক বা তাদের নামে উন্নয়নের বিষয়ই হোক- তা সবই হচ্ছে তাদেরকে না জানিয়ে, জন-আকাংখাকে পাত্তা না দিয়ে। অথচ সবই হচ্ছে তাদেরই নামে। রাষ্ট্রের পরিচালকেরা রাষ্ট্রের সাথে জনগণের তফাতের ওই সম্পর্কটি তৈরি করে চলছে, ওই পরাজিত মনে করার মনোবৃত্তিটি সৃষ্টির লক্ষ্যে। জনমনে সৃষ্ট এই মনোবৃত্তি আসলে পুরো রাষ্ট্রের জন্যই সৃষ্টি করে নানা ধরনের বৈকল্য, ব্যাধি, সামাজিক অনাচার।

বিদায়ী বছরটিতে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় ছিল জঙ্গীবাদ। ২০১৬-তেই যে জঙ্গীবাদ বাংলাদেশে রাতারাতি আবির্ভূত হয়েছে বা এর অভ্যুদ্বয় ঘটেছে তা নয়। এর ইতিহাসটি বেশ দীর্ঘ না হলেও বেশ কয়েক বছরের। বিএনপির সময়ে ২০০৫ সালে দেশে একযোগে ৬০টি জেলায় বোমা হামলাসহ নানা ঘটনা ঘটেছিল। এরপরে ওই ঘটনার নায়ক শায়খ রহমান, বাংলাভাইসহ বেশ কয়েকজনকে ফাসি দেয়ার ঘটনা ঘটে। ওই সময়ের জঙ্গীবাদীরা ছিল কম মাত্রার ‘রেডিক্যালাইজড’। আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিহীন, স্থানীয় অর্থাৎ অভ্যন্তরীণ জঙ্গীবাদের বিস্তার ঘটেছিল তখন। তবে তখন একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় থাকার কারণে ওই সময়ের জঙ্গীবাদ বর্তমানের মতো কৌশলগতভাবে ততোটা উন্নত ছিল না। তাছাড়া উচ্চবিত্তের সন্তান, ইংরেজী শিক্ষায় শিক্ষিত তরুণ জনগোষ্ঠীকে তারা কোনোভাবেই আকৃষ্ট করতে পারেনি। ওই সময়ের জঙ্গীবাদ সমাজের নিম্নবর্গের মানুষদের অর্থাৎ বড়জোর মাদরাসা পড়ুয়া কিছু মানুষের উদ্যোগে গঠিত হয়েছিল। যতোদূর বোঝা যায় তাতে, তাদের উদ্যোগটি ভিন্ন ধারার ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য ছিল এবং তা ছিল স্থানীক বা এলাকাভিত্তিক।

ইংরেজী শিক্ষায় শিক্ষিত তরুণরা যখন জঙ্গীবাদী দলগুলোতে ঢুকে পড়েছে এবং একের পর এক ব্লগারসহ ভিন্ন চিন্তা ও মাত্রার মানুষদের উপর হামলা ও হত্যাকান্ড চালাতে থাকে- তখন সরকার একে প্রথমে অন্যান্য বিরোধী রাজনৈতিক দল, পরে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে প্রচার এবং আরও পরে স্থানীয় জঙ্গীদের কাজ বলে চালিয়ে দেয়ার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু বেশ জোরেসোরেই তখন বলা হচ্ছিল- দেশে কোনো জঙ্গীবাদ নেই। যখন এসব কথা বলা হয়, ইতোমধ্যে ডজনেরও বেশি ব্লগার, প্রকাশক, লেখক এবং ভিন্নমতাবলম্বীকে হত্যার ঘটনা ঘটে গেছে। অথচ সরকার তখনো ছিল গণতন্ত্র না উন্নয়ন বিতর্কে বিভোড় এবং গণতন্ত্রের ছিটেফোটাটুকুতেও বাধাসৃষ্টিতে উদগ্রীব। গণতন্ত্রহীন পরিস্থিতি যে জঙ্গীবাদের উত্থানের ক্ষেত্র ও চারণভূমি-তা যতোই বলা হয়েছে-সরকার তা শোনেনি; শুনতে চায়নি। দেশে একদিকে রাজনীতিহীনতা, দুর্নীতি, হত্যা, গুমসহ অপশাসনের পরিস্থিতি চলতে থাকে; সাথে সাথে বেড়ে উঠতে থাকে জঙ্গীবাদ। আর এসব জঙ্গীরা নিজেদের শক্তি বৃদ্ধির জন্য স্বাভাবিক কারণেই আন্তর্জাতিক সংযোগ খুজতে থাকে। সরকারের দিক থেকে এখনো পর্যন্ত এ বিষয়টি কবুল করা হয়নি যে, বাংলাদেশে ইসলামিক স্টেট বা আইএস এবং আল কায়েদা রয়েছে। তবে ওই দুই আন্তর্জাতিক জঙ্গীগোষ্ঠী বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রমের কথা জানান দিয়েছে। এসব পাল্টাপাল্টি অবস্থার মধ্যে একজন ইতালীয় ও একজন জাপানী নাগরিক এবং ভিন্ন ধর্মাবলম্বীসহ বেশ কয়েকজনকে হত্যার কাজটি সম্পন্ন করে ফেলেছে জঙ্গীরা। এমনই অবস্থায় ২০১১৬-র পহেলা ও ২ জুলাই ঘটে যায় গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরার দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা। এই ঘটনা অনেকেরই নানা ধারণা পাল্টে দিয়েছে। যারা প্রচার করেছিল দেশে জঙ্গীবাদ নেই বা থাকলেও তা ততোটা প্রবল নয়-জঙ্গীরা তাদের কাছে ওই ঘটনার মধ্যদিয়ে ভিন্ন বার্তা পৌছে দিয়েছে। এছাড়া শুধুমাত্র কিছু মাদরাসা পড়ুয়া হতদরিদ্র মা-বাবার সন্তানরাই যে জঙ্গী হয়- এতো দিনের সে ধারণার আমূল পরিবর্তন ঘটে যায়। আবারও সেই কথাটি প্রমাণিত হয় যে, গণতন্ত্রই রুখে দিতে পারে জঙ্গীবাদ।

জঙ্গীবাদ স্থায়ীভাবে রুখে দেয়ার ব্যাপারে এরপরেও সরকার ভিন্নমত পোষণ করে, ভিন্ন পথ গ্রহণ করেছে। জনগণ এবং অপারপর দল, মত, পক্ষকে আস্থায় এবং সাথে নিয়ে জঙ্গীবাদ, উগ্রবাদ দমনের পথ পরিহার করে, স্বভাবসিদ্ধ রীতি অনুযায়ী তাদের নির্ভরতার স্থান হয়ে দাড়ায় আইন-শৃংখলা রক্ষাবাহিনী। এতে বিভিন্ন সময়ে কথিত বন্দুকযুদ্ধে হত্যার নানা ঘটনা বিভিন্নভাবে শোনা যেতে থাকে। শুনতে হয় পোশাকধারীদের পরিচয়ে কথিত জঙ্গী গ্রেফতারের নামে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা। আইন-শৃংখলা বাহিনী বলছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। কিন্তু এর সাথে সাথে দেখা যাচ্ছে, জঙ্গীবিরোধী অভিযানের নামে কথিত নিখোজদের সংখ্যা দিনে দিনে বাড়ছে। আগে অভিভাবকগণ মুখ না খুললেও এখন তাদের সন্তানদের খবরাখবর জোগাড়ের চেষ্টা করছেন; বিভিন্ন বাহিনীর দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন; করুণ আকুতি নিয়ে দাবি জানাচ্ছেন সন্তান ফেরত পাওয়ার জন্য।

এসব যখন চলছে ঠিক তখনই আইএস এবং আল কায়েদা সিরিয়া, ইরাক থেকে নিজেদের বিশ্বের অন্যত্র ছড়িয়ে দেয়ার যে নীতি-কৌশল গ্রহণ করেছে-সে বিষয়ে বাংলাদেশের করণীয় কী- তা চাপাই পড়ে যাচ্ছে।

আপাত একটি স্বস্তির পরিবেশ বিরাজ করলেও এই প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক যে, সত্যিকারেই কি জঙ্গী দমন সম্ভব হয়েছে? উত্তরটি নিশ্চয়ই হবে নেতিবাচক। কারণ গণতন্ত্রবিহীন সমাজে জঙ্গীবাদ-উগ্রবাদ সমূলে উৎপাটন এবং নির্মূল সম্ভব নয়। ২০১৬ সাল এটাই শিক্ষা দিয়ে বিদায় নিয়ে যাচ্ছে।

রাজনীতিহীন আরও একটি বছর

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

এক. সুদীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন এই ভূখন্ড পয়তাল্লিশ বছর পরে এখন রাজনীতিহীন! পাঠক, চমকে উঠলেন কী! কিন্তু রাষ্ট্রের সর্বাঙ্গে তাকালে দেখবেন, সবই এখানে আছে। রাষ্ট্র আছে, সরকার আছে, কথিত নির্বাচন আছে, সংসদে কথিত বিরোধী দল আছে, আবার রাজপথের বিরোধী দলও আছে, চোখধাঁধানো কসমেটিক উন্নয়ন আছে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন সূচকে পরিবর্তন অনেক। যা নেই তা হচ্ছে, রাজনীতি- গনতান্ত্রিক অংশগ্রহনমূলক রাজনীতি। অসত্য আর শঠতার মিশেলে গড়ে ওঠা উন্নয়ন মিথ এবং দেশজুড়ে গড়ে ওঠা টাউট শ্রেনীটি হয়ে উঠেছে শাসকদের হাতিয়ার, যার কবলে পড়ে রাজনীতি- নির্বাচনে জনগনের অংশগ্রহন তলানীতে গিয়ে ঠেকেছে।

আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় টিকে থাকার বাসনায় ২০১৪ সালের ভোটারবিহীন নির্বাচন মূলত: দুর্বৃত্তায়ন সম্পূর্ন করে রাষ্ট্রকে রাজনীতিহীন ভবিষ্যতের দিকে চালনা করতে শুরু করে। এরকম অভূতপূর্ব পরিস্থিতি অতীতে কথনে দেখা যায়নি। রাষ্ট্র-সমাজ থেকে ক্রমশ: রাজনীতি নির্বাসিত হতে থাকে। ১৯৪৮ থেকে ১৯৭১ সময়কালকে একটি কালপর্ব এবং ১৯৭২ থেকে ২০০৮ সময়কালকে আরেকটি কালপর্ব ধরলে দেখা যাবে, এই রাষ্ট্রে সবসময় কমবেশি শক্তিশালী রাজনীতির উপস্থিতি এবং গনতান্ত্রিক আকাঙ্খা ছিল এবং নির্বাচনমুখী গণতন্ত্রে  জনগনের উৎসাহী ও আবেগীয় অংশগ্রহন ছিল, দু’একটি ব্যতিক্রম বাদে।

রাষ্ট্রের এই যে বিরাজনীতিকরন, তার মূল দর্শনটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা আঁকড়ে ধরার মধ্যে নিহিত। কি গণতান্ত্রিক বা সামরিক, উভয় শাসনকালের প্রথম ও প্রধান প্রচেষ্টা ছিল রাষ্ট্র- সমাজের বিরাজনীতিকরন। ক্ষমতাসীন দলগুলির সবচেয়ে বড় ভয় জনগণ। এজন্য জনগণকে ভয়ার্ত ও আতঙ্কিত রাখতে শাসকদের অপকৌশলের অন্ত থাকে না। ১৯৭৫ সালে একদলীয় শাসনের সূচনার পরে নির্মম ট্রাজেডির মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র বিচ্যুতিময় যাত্রা শুরু করেছিল, তারও আগে যাত্রা শুরু করেছিল রাজনৈতিক বিচ্যুতির দিকে। তার মধ্যেও রাজনীতি সংগঠিত করে রাষ্ট্র হয়ে ওঠার  প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। নব্বইয়ের গণঅভ্যূত্থান, একই দশকে  তত্ত্বাবধায়ক সরকার আন্দোলন এবং সবশেষ ১/১১ এর সরকার আসার আগ পর্যন্ত রাজনীতির নানামূখী ধারাগুলো সক্রিয় ছিল।

আগেই বলেছি, বিরাজনীতিকরনের প্রথম চেষ্টাটি ছিল ১৯৭৫ সালে, সবধরনের রাজনীতি নিষিদ্ধ করে একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করে। পরবর্তীকালে সামরিক-সিভিল শাসনামলে জেনারেল জিয়ার বিখ্যাত-কুখ্যাত উক্তি ÔI will make Politics difficultÕ প্রমান করে যে শাসকরা শক্তিশালী রাজনীতির উপস্থিতি কখনই মানতে পারে না। রাজনৈতিকভাবে জিয়ার এই উক্তিকে তীব্র সমালোচনা ও নিন্দা করা হলেও পরবর্তীকালের প্রতিটি শাসক বা সরকার রাজনীতি জনগনের জন্য ডিফিকাল্ট করেই তুলেছেন।

আরেক সামরিক শাসক এরশাদ গণতান্ত্রিক রাজনীতি যাতে শক্তিশালী না হয় সেজন্য ধর্মাশ্রিত গোষ্ঠিগুলিকে প্রণোদনা দিয়ে পরিপুষ্ট করে তুলেছিলেন। ধর্মীয় উগ্রবাদ ও চরমপন্থার সহিংসতা যাতে রাজনীতির স্থান দখল করে নিতে পারে সেজন্য সংবিধানে অষ্টম সংশোধনী এনে রাষ্ট্রধর্ম জুড়ে দেয়া হয় সংবিধানে। রাষ্ট্রকে বিরাজনীতিকরনে এটি ছিল সবচেয়ে সুকৌশল অপচেষ্টা। এরশাদের পতনের পর রাষ্ট্রধর্ম-ধর্মকে আশ্রয় করে গোষ্ঠিগত স্বার্থ ও দ্বন্দ্ব, সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস এবং যে কোন ইস্যুতে ধর্মের ব্যবহার ধীরে ধীরে রাজনীতিতে স্থায়ী আকার নেয়। এবিষয়ে দুই প্রধান দলের কেউ কারো চেয়ে খুব একটা পিছিয়ে নেই

এই যাত্রায় এরশাদ অনুসরণীয়, তার পথ ধরেই কথিত গণতন্ত্রী, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারী, জাতীয়তাবাদী- সকলেই ধর্মান্ধ গোষ্ঠিগুলিকে আশ্রয় করে ক্ষমতায় টিকে থাকার পথ খুঁজে নেয়। কারন, শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাজনীতির জায়গায় চরম অসহিষ্ণুতা ও উগ্রপন্থা ভর করায় জনগন রাজনীতিকে ভয় পেতে শুরু করে। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য এই ভয় ও আতঙ্ক সৃষ্টি করা শাসকদের জন্য অপরিহার্য হয়ে ওঠে। ফলে জনগনের মনোজগতে বিশাল পরিবর্তন ঘটে যায়, যা বিরাজনীতিকরনে সহায়ক হয়ে ওঠে।

২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নামে সিভিল-মিলিটারী সরকার রাষ্ট্রকে আবারও বিরাজনীতিকরনের দিকে ধাবিত করার প্রধান মিশন হিসেবে দুই প্রধান রাজনৈতিক নেতাকে প্রথমে গ্রেফতার করে এবং পরে নির্বাসনে পাঠানোর চেষ্টা চালায়। ওই সরকারের ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠে বেশ কয়েকটি ‘কিংস পার্টি’। কিন্তু মানুষের রাজনৈতিক সচেতনতা ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্খা মিলে যাওয়ায় দেশ নির্বাচনমুখী গণতন্ত্রের দিকে এগোতে থাকে এবং একটি গ্রহনযোগ্য মানের নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হয়। পরিনামে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হলে ক্ষমতার অন্যতম অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত হয় এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি।

২০০৯ সালের পরে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষমতায় টিকে থাকার কৌশল হিসেবে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে দলীয় নিয়ন্ত্রনে নিয়ে আসা হয়। এসব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে নিজ স্বার্থে ব্যবহার শুরু করা হয়। বিশেষ করে নির্বাচন কমিশনের ওপর নিয়ন্ত্রন। ২০১৩ সালে পাঁচ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে পরাজয়ের পরে এই নিয়ন্ত্রন দৃশ্যমান হয়ে উঠতে শুরু করে এবং নিয়ন্ত্রিত কমিশন ২০১৪ সালের প্রায় ভোটারবিহীন নির্বাচন সম্পন্ন করে আরেকটি কলঙ্কতিলক ধারণ করে।

ফলে মোটামুটি গ্রহনযোগ্য মানের নির্বাচনের সম্ভাবনা ক্রমশ: সূদুর পরাহত হতে থাকে। এ সময়ে বিএনপি-জামায়েত জোটের সহিংস আন্দোলন প্রচেষ্টা ও নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা পরবর্তী পরিস্থিতি ক্ষমতাসীনরা অনুকূলে নিয়ে আসে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি ভোটারবিহীন নির্বাচনের ক্ষেত্রে আরেকটি মাইলষ্টোন স্থাপিত হয়। এ সময় থেকেই মূলত: সরকার রাজনীতির বদলে পুরোপুরি প্রশাসন-পুলিশ নির্ভর হয়ে পড়ে। রাজনীতির রাজপথ দখল করে নেয় পুলিশ এবং চরমপন্থা-উগ্রপন্থা ও আগুন সন্ত্রাস।

দুই. বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ বা দলসমূহ বিরাজনীতিকরনের দিকে নিয়ে যাওয়ার অপচেষ্টা করলেও জনগন কিন্তু এখনও রাজনীতি সচেতন। মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ  সেন্টারের তিন বছর আগের এক গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্য জানাচ্ছে, রাজনীতিতে সবচেয়ে সক্রিয় বাংলাদেশের জনগোষ্ঠি। ৩৩ টি উন্নয়নশীল দেশের ওপর চালানো এই জরিপের ফল হিসেবে জানা গিয়েছিল, এই দেশের শতকরা ৬৫ শতাংশ উঁচুমাত্রায় এবং ২৯ শতাংশ মধ্যম মাত্রায় রাজনীতিতে সক্রিয়। মানেটা পরিষ্কার, শতকরা ৯০ শতাংশ মানুষ মাত্রাভেদে রাজনীতি সচেতন ও সক্রিয়।

সমাজবিজ্ঞান বা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এই হিসেব অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও ইতিবাচক। জনগন রাজনীতি সচেতন ও সক্রিয় হলে স্বৈরশাসন, কর্তৃত্ববাদী শাসন বা দু:শাসন দীর্ঘস্থায়ী হবার কথা নয়। এজন্যই শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলি রাষ্ট্রকে বিরাজনীতিকরনের দিকে নিয়ে যাবার চেষ্টা করে, যাতে সচেতন-সক্রিয় জনগন রাজনীতিতে, মোদ্দাকথা নির্বাচনে অংশ নেয়ার সুযোগ না পায়। এজন্যই ২০১৪ সালের প্রায় ভোটারবিহীন নির্বাচন রাজনীতির দৃশ্যপট পাল্টে দিয়েছে; কর্তৃত্ববাদী শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে।

২০১৫ সালে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি আন্দোলনের নামে যে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে তার পুরোপুরি সুযোগ নেয় সরকার। মাঠ পর্যায়ে তার জোটসঙ্গী জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাস এবং সাথেসাথে কথিত সম্পদ বিনাশ প্রতিরোধে বন্দুকযুদ্ধ ও অজস্র প্রাণহানির মধ্য দিয়ে বিরাজনীতিকরনকে আরও একধাপ এগিয়ে দেয়। অথচ তিন বছর আগের জরিপ জানিয়েছিল, ৪৮ শতাংশ মানুষ রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেয়। ৩৭ শতাংশ অংশ নেয় বিভিন্ন বিক্ষোভ-সমাবেশে। ৩২ শতাংশ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সক্রিয় সদস্য এবং ৩১ শতাংশ মানুষ ধর্মঘটে অংশ নেয়।

এই জরিপ হয়তো শতভাগ নির্ভুল নয়। কিন্তু এই জনগন গত কয়েক বছরে কি রাজনীতিতে আগ্রহ হারিয়েছে? একেবারেই রাজনীতিবিমুখ হয়ে পড়েছে? এই মিরাকল কি ঘটতে পারে? বাংলাদেশের জনগন রাজনীতি বা নির্বাচনের প্রতি উৎসাহ হারিয়েছে?  না, মোটেই না। রাজনীতি বা নির্বাচনে অংশগ্রহন থেকে দুরে সরিয়ে রাখতে বাধ্য করা হচ্ছে। এজন্য তৈরী করা হচ্ছে সীমাহীন আতঙ্ক এবং ভয়। ৬৭ বছর বয়সী আওয়ামী লীগ এই ভূখন্ডের অসংখ্য রাজনৈতিক উত্থান-পতন, স্বায়ত্বশাসন স্বাধিকারের আন্দোলন, সর্বোপরি মুক্তিসংগ্রামের নেতৃত্বদানকারী দল। তারা খুব ভাল করেই জানে যে, জনঅংশগ্রহনের রাজনীতি ও নির্বাচন কি ফল বয়ে আনতে পারে! ক্ষমতার আওয়ামী লীগের সেটি হচ্ছে সবচেয়ে বড় ভয়।

তিন. রাজনীতি বিজ্ঞান, সমাজ বিজ্ঞান এবং তাবৎ উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা একমত যে, রাজনীতি হচ্ছে সমষ্টির উন্নতি; অর্থাৎ উন্নয়নে সমষ্টির ঐক্যমত্য এবং অংশগ্রহন। সুস্থিত ও উন্নয়নকামী বা কল্যাণকামী রাজনীতিকে মাপা হয় সেখানে কতটা অংশগ্রহন রয়েছে, রাজনীতি-নির্বাচনে জনগনের অবারিত সুযোগ রয়েছে কতটা। কিন্তু এই রাষ্ট্রে রাজনীতি ও উন্নয়ন ধারাবাহিকতায় যুক্ত রয়েছে কতিপয় মানুষ। তারাই নিয়ন্ত্রন করছে সবকিছু। সংখ্যাগরিষ্ঠের বদলে কতিপয়ের রাজনীতি সৃষ্টি করছে “কতিপয়তন্ত্র”।

ফলে কসমেটিক উন্নয়ন বিশাল ফারাক তৈরী করে দিচ্ছে গরিষ্ঠ ও লঘিষ্ঠের। রাজনীতিহীন উন্নয়নে লঘিষ্ঠরা রাষ্ট্র-সমাজ, সবকিছুরই নিয়ন্ত্রনে লাভ করছে। জন্ম নিচ্ছে পাহাড়সম বৈষম্য। সম্পদের পাহাড় গড়ে শীর্ষে অবস্থান নিচ্ছে “কতিপয়তন্ত্র”, তা ক্ষমতাসীন বা বিরোধী যেকোন অবস্থানেই তারা থাকুক না কেন। নিচে পড়ে থাকছে জনগন। জনগণকে ঠেকিয়ে রাখতে দীর্ঘস্থায়ী রাজনীতিহীনতা এবং রাজনৈতিক সুস্থিতির বদলে অস্থিতি প্রয়োজন। সেজন্য রাজনীতি-নির্বাচনে জনঅংশগ্রহন ঠেকিয়ে দেয়া হচ্ছে, চোখ ধাঁধানো উন্নয়ন দিয়ে সবকিছু ঢেকে দেবার প্রয়াস চলছে। উপেক্ষিত হচ্ছে উন্নয়নের প্রধান সবক Political development along democratic  development is as important as economic development | কিন্তু রাজনীতির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া এবং নির্বাচন থেকে দুরে সরিয়ে রাখার এই অপকৌশল কোনমতেই স্বাভাবিক নয়। এর প্রতিক্রিয়া হতে বাধ্য এবং সেটি নিশ্চয়ই ইতিবাচক নয়। একটি রাজনীতি সচেতন ও উৎসাহী জনগোষ্ঠিকে ছলে-বলে-কৌশলে স্বাভাবিক প্রক্রিয়াসমূহ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হলে বিপদজ্জনক রাজনৈতিক-সামাজিক প্রবণতা সৃষ্টি হয়। আজকের উগ্রবাদ বা চরমপন্থা জন্ম নিয়েছে এই বিচ্ছিন্নতা থেকেই। এই দেশ বা এর তরুন জনগোষ্ঠি দুই দশক ধরে সেই বিপজ্জনক প্রবণতার পথে হাঁটছে। কারন বিরাজনীতিকরনের ধারাবাহিকতায় তার অংশগ্রহন, মতামত প্রকাশ, ভোটাধিকার সংকুচিত হয়ে আসছে। এই সংকোচন তাকে ভিড়িয়ে দিচ্ছে দেশী-বিদেশী সন্ত্রাসী গোষ্ঠিগুলির সাথে।

তাহলে বিরাজনীতিকরন ধারাবাহিকতায় এই রাষ্ট্রের ভবিষ্যত কি? এটি স্পষ্ট করে এখনই বলা সম্ভব নয়। রাষ্ট্র ও রাজনীতি যেখানে জনগনের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে যায় সেখানে কোনকিছুর কার্যকারিতা থাকে না। রাজনীতির নেতিবাচক প্রবণতা নাগরিকদের মধ্যে বহুমাত্রিক নৈরাজ্য সৃষ্টি করে। এই প্রবণতাকে প্রধান দুই দল তাদের জন্য অনুকূল ভাবছে, অন্ধকারের শক্তিগুলিও অনুকূল ভাবছে। কিন্ত ৯০ শতাংশ রাজনীতি সচেতন মানুষকে কখনই মূলধারা থেকে ছিটকে দেয়া যায়নি, ইতিহাস সেটিই জানাচ্ছে।

একটি অংশগ্রহনমূলক ও সুষ্ঠ নির্বাচন কি এই নঞর্থক রাজনীতির সমাধান? গত ২৭ বছর ধরে নির্বাচনের মাধ্যমে ঘুরে-ফিরে দুটি দল বা জোট ক্ষমতাসীন হচ্ছে। তাদের হাত ধরে মানবতাবিরোধী অপরাধী বা পতিত স্বৈরাচার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অংশীদার হচ্ছে। নির্বাচিত বা পুণঃনির্বাচিত হওয়ার জন্য তারা সংবিধানের মৌল চেতনা, জনগনের অভিপ্রায়, নীতি-নৈতিকতা সবটাই বিসর্জন দিচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় নেতিবাচক রাজনীতি বা বিরাজনীতিকরন-এই প্রক্রিয়া কেবল প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের সামর্থ্য অর্জণ করে-শক্তিশালী করতে পারে না। রাষ্ট্র-রাজনীতি-সমাজ ও জনগণের এরচেয়ে বিপন্ন দশা আর কি হতে পারে!

রকিব-আজিজ মার্কা নির্বাচন কমিশন না পাওয়ার প্রার্থনা

হায়দার আকবর খান রনো ::

২০১৪ সালের পাচ জানুয়ারীর সাধারণ নির্বাচন এবং তৎপরবর্তী যে সকল স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে এসেছে, সেগুলোর একটিকেও সত্যিকার অর্থে নির্বাচন বলা যায় না। ২০১৪ সালের নির্বাচনটি ছিল একতরফা প্রতিদ্বন্দ্বিবিহীন। উপরন্তু ১৫৩ আসনে কোন নির্বাচনই হয়নি। সংবিধান অনুযায়ী একজন প্রার্থী থাকলে তাকেই নির্বাচিত বলে ঘোষণা দিতে হবে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দিন তাই করেছেন। যদিও নির্বাচন হতে হবে সকলের অংশগ্রহণমূলক, তবু এই ক্ষেত্রে কাজী রকিবউদ্দিনকে দোষ দেয়া যায় না। এই ক্ষেত্রে নির্বাচনের বিষয়টি ছিল সম্পূর্ণভাবেই রাজনৈতিক। নির্বাচন কমিশনকে যেহেতু দল নিরপেক্ষ এবং সেই অর্থে অরাজনৈতিক হতে হয় বলে বাধ্যবাধকতা আছে; আর এটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, তাই কাজী রকিবউদ্দিনসহ অন্যান্য কমিশনার ভদ্রলোকগণের করার কিছুই ছিল না। তবু এরশাদকে নিয়ে যে খেলা হয়েছিল সেখানে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। সাবেক স্বৈরশাসক এরশাদ প্রার্থীপদ প্রত্যাহার করে নিলেও তা রকিব সাহেবরা গ্রহণ করলেন না। কোন যুক্তিও দেখানো হয়নি। স্পষ্টতই তারা সরকারের ইচ্ছানুসারে কাজ করেছিলেন।

এরপরে যে সকল স্থানীয় নির্বাচন হয়েছিল তাতে কাজী রকিবের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন নিজেকে একেবারে সরকারের আজ্ঞাবহ প্রমাণ করেছিলেন। ২০১৪ সালে জাতীয় নির্বাচনের পরপরই অনুষ্ঠিত হল উপজেলা নির্বাচন। পাচ দফায় নির্বাচন হয়েছিল। প্রথম দুই দফায় দেখা গেল, সরকার দলীয় প্রার্থীরা দারুনভাবে পরাজিত হয়েছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে জিতেছিল বিএনপি। ব্যস। এরপর সরকারের নীতিনির্ধারণী মহল সিদ্ধান্ত নিলেন, আর বিরোধী দলকে জিততে দেয়া হবে না। শুরু হলো আগের রাতে সিল মারা, প্রিজাইডিং অফিসার ও পুলিশকে নিয়ে ব্যালট বাক্সে সিল মারা ইত্যাদি। বস্তুত: নির্বাচন বলে আর কিছু ছিল না। এমনকি কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরের পৌর নির্বাচন সম্পর্কে আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ক্ষোভের সঙ্গে বলেছিলেন, ‘বাজিতপুরে আমরা হেরে গেলে কি ওরা আমাদের সরকার থেকে নামাতে পারতো?’ সৈয়দ নজরুল ইসলামের পুত্র সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ছিলেন সৎ এবং স্পষ্টভাষী। তাই তিনি এমন সত্য কথা উচ্চারণ করতে পেরেছিলেন।

যে সকল নির্বাচনে সরকারের কোন পরিবর্তন হবে সেখানেই যদি সরকারের নীতিনির্ধারণী মহল এমন অসৎ পদ্ধতির আশ্রয় নেয়, তাহলে মানুষের আর কোনো আস্থা থাকে না নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি।

তবে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জের পৌরসভা নির্বাচনটি সুষ্ঠু হয়েছে বলে সব জায়গা থেকেই খবর এসেছে। এমনটা যে হবে, তা অজানা ছিল না। কারণ এখানে আইভী যে জিতবেন, তা সকলের ধারণার মধ্যে ছিল। পাচ বছর আগে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী প্রভাবশালী ওসমান পরিবারের সদস্য শামীম ওসমানকে পরাজিত করে নির্বাচিত হয়েছিলেন। এবারও তার বিজয়টা ছিল সুনিশ্চিত ব্যাপার। তবে এবার তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী। নৌকা তার প্রতীক।

নৌকা যদি স্বাভাবিকভাবে জেতে, তাহলে সরকার বা অনুগত নির্বাচন কমিশনের অন্য পথ গ্রহণের কোনো প্রয়োজন হয় না। যাই হোক, এমন বিতর্কিত ও পক্ষপাতদুষ্ট এবং অদক্ষ নির্বাচন কমিশন যে তাদের দ্বারা অনুষ্ঠিত শেষ নির্বাচনটি ভালোভাবে করেছেন, সেটা খুশির খবর বৈকি!

বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ শেষ হতে চলেছে। ভবিষ্যতে যদি আবার রকিব মার্কা কমিশন হয় তাহলে আগামী নির্বাচন নিয়ে আশংকা থেকেই যাবে। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি এবং অন্যান্য দলসমূহ অংশ নেবে। কিন্তু তখনো যদি রকিব মার্কা নির্বাচন হয়, তাহলে দেশ বহুদিনের জন্য অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে।

আশা করা যাক, আগামী জাতীয় নির্বাচন হবে সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক। সেটা অনেকাংশে নির্ভর করবে সরকারি দলের সদিচ্ছার উপর। আর নির্ভর করবে নির্বাচন কমিশনটি কেমন হবে। যদি তারা সত্যিকার অর্থে নিরপেক্ষ হন, রকিব বা আজিজ মার্কা না হন এবং যথেষ্ট যোগ্যতা সম্পন্ন হন, তাহলে আমরা আশাবাদী হতে পারি। সে জন্য কার্যকরী সকল দলের কাছে গ্রহণযোগ্য এমন ব্যক্তিকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার করা দরকার।

আশা করা ভালো যে, রাষ্ট্রপতি তেমনই এক যোগ্য নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন করবেন। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতিকে অবশ্য সকল ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুসারে কাজ করতে হবে। নির্বাচন কমিশন গঠনের ক্ষেত্রেও সম্ভবত একই বিধি ও প্রথা প্রযোজ্য হবে। তাই নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রশ্নে সরকারের সদিচ্ছা থাকাটা দরকার।

এ কেমন নির্বাচন?

হায়দার আকবর খান রনো ::

গণতন্ত্রের অন্যতম মূল ভিত্তি হলো নির্বাচন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির পর থেকে নির্বাচন বলে আর কিছুই থাকছে না। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগসহ জোটের দল ছাড়া আর কেউই অংশগ্রহণ করেনি। তিনশ আসনের মধ্যে ১৫৪টি আসনে অর্থাৎ অর্ধেকের বেশি আসনে আওয়ামী জোটের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষিত হয়েছিল। তাই এই নির্বাচন প্রথম থেকেই ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। তাছাড়া নির্বাচন কমিশন নিজে মাঠে নেমে এরশাদকে নিয়ে যেভাবে খেলেছিল, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করা হলেও তা গ্রহণ না করে যেভাবে নিজেই নির্বাচন বিধি লঙ্ঘন করেছিল, তাতে আর যাই হোক নির্বাচন কমিশনকে তখন থেকেই কোনোভাবেই নিরপেক্ষ বলা যায় না। আজ্ঞাবহ এক নির্বাচন কমিশনের অধীনে এমন প্রহসনের নির্বাচন দেশে-বিদেশে কোথাও গ্রহণযোগ্যতা পায়নি।

সেটি ছিল জাতীয় নির্বাচন, যেখানে সরকার বদলের বা সরকার গঠনের বিষয়টি ছিল। কিন্তু স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে যে ধরনের কারচুপি হয়েছে তাতে মনে হয় কোন পর্যায়েই কোন নির্বাচন আর সুষ্ঠু হবে না। অর্থাৎ সিস্টেম হিসাবে নির্বাচন আর থাকছে না। কর্তৃত্ববাদী শাসনের এটাই তো নিয়ম।

জাতীয় নির্বাচনের পর অনুষ্ঠিত হয়েছিল উপজেলা নির্বাচন। পাচ দফায় নির্বাচন হয়েছিল। প্রথম তিন দফায় শাসক দল আওয়ামী লীগের ভরাডুবি হয়েছিল পরবর্তী দুই দফায় শাসক দল তাদের কৌশলে পরিবর্তন আনে; সরাসরি ও নগ্ন কারচুপির আশ্রয় নিয়েছে। আগের রাতে সিল মারা, ভোটকেন্দ্র দখল করে প্রিসাইডিং অফিসারকে দিয়ে সিল মারানো, পুলিশ কর্তৃক সিলমারা, ভোটের ফলাফল পাল্টে দেয়া ইত্যাদি ধরনের প্রকাশ্য কারচুপি ছিল সেই নির্বাচনের বৈশিষ্ট্য। ফলে উপজেলা নির্বাচনের শেষ দুই ধাপে নৌকার একচেটিয়া বিজয় সম্ভব হলো- বলাই বাহুল্য জনগণের ভোটে না, দলীয় মাস্তান, নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের সরাসরি নগ্ন ভূমিকার কারণে।

সেই যে ধারা শুরু হলো তা অব্যাহত থাকলো ঢাকা-চট্টগ্রাম মেয়র নির্বাচনে, পৌরসভা নির্বাচনে এবং সর্বশেষ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে। গত ডিসেম্বরে কিশোরগঞ্জ জেলার বাজিতপুর পৌরসভায় যে ব্যাপক কারচুপি হয়েছে এটাকে প্রকারান্তরে স্বীকার করে শাসক দল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেছিলেন, ‘নির্বাচনের অনেক বিষয় আমি মেনে নিতে পারি না। বাজিতপুরে আমরা হেরে গেলে কি ওরা আমাদের সরকার থেকে সরিয়ে দিতো?’ এমন উপলব্ধি শাসক দলের অধিকাংশের মধ্যেই অনুপস্থিত রয়েছে। গণতন্ত্রের বালাই নেই। সবটাই দখল করতে হবে এবং জোর জবরদস্তি করেই। এই মানসিকতা গণতন্ত্রের কবর রচনা করেছে।

সর্বশেষ ইউপি নির্বাচনে দেখা গেল কারচুপির পাশাপাশি ব্যাপক সহিংসতা। গত ফেব্রুয়ারি ইউপি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা থেকে সর্বশেষ ৪ জুন পর্যন্ত ছয় দফায় যে নির্বাচন হয়েছে তাতে শতাধিক মানুষ খুন হয়েছেন। আজ্ঞাবহ প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকীবউদ্দিন আহমদ পর্যন্তও স্বীকার করেছেন, ‘আগের রাতে সিল মারার ঘটনা কমলেও সহিংসতা বেড়েছে।’ তার মানে অবৈধভাবে সিল মারার ঘটনা ছিল। কিন্তু তিনি কি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। কিছুই করেননি। শাসক দলের ইচ্ছাকে তিনিও সিল দিয়ে কার্যকর করেছেন।

এবারের ইউপি নির্বাচনের তিনটি বড় বৈশিষ্ট লক্ষ্যণীয়- ১, ব্যাপক ও প্রকাশ্য কারচুপি, ২, প্রায় ৫ শতাংশ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় শাসক দলের প্রার্থীকে নির্বাচিত বলে ঘোষণা দেয়া, ৩, ব্যাপক সহিংসতা।

উপজেলা থেকে শুরু করে পরবর্তী সকল নির্বাচনেই প্রকাশ্যে কারচুপি যে হয়েছে তা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। সেই একই ধারা এখানেও অব্যাহত ছিল। তাই নৌকা মার্কা যিনি পেয়েছেন তাকেই যে বিজয়ী ঘোষণা করা হবে, এ ব্যাপারে সকলেই নিশ্চিত ছিলেন। তাই নৌকা মার্কা পাওয়াটাই ছিল সম্ভাব্য প্রার্থীদের লক্ষ্য। মার্কা নিয়ে মনোনয়ন বাণিজ্য ছিল বেশ রমরমা। গত ১২ মে’র প্রথম আলোর লিড নিউজের শিরোনাম ছিল এই রূপ : ‘ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে মনোনয়ন বাণিজ্য : মনোনয়নে টাকা লাগে, ভোট করতে নয়’। এই ভাবে কেবল গণতন্ত্রের ভিত্তিকেই ধ্বংস করা হয়নি, দুর্নীতিকে তৃণমূল পর্যায়ে প্রসারিত করা হয়েছে।

মনোনয়ন বাণিজ্যের কারণে শাসক দলের মধ্যেই সংকট-সংঘর্ষ সৃষ্টি হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে যোগ্যতর প্রার্থী মনোনয়ন পাননি। তিনি যেহেতু শাসক দলের লোক, সেহেতু তিনিই বা ছেড়ে দেবেন কেন? তাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে শাসক দলের নৌকা মার্কার অধিকারীর সঙ্গে বিদ্রোহী আওয়ামী প্রার্থীর। এই কারণে আবার সহিংসতা এতো ব্যাপক হয়েছে। সাবেক নির্বাচন কমিশনার বিগ্রেডিয়ার (অব.) শাখাওয়াত হোসেন দাবি করেছেন, ২০১১ সালে অনুষ্ঠিত ইউপি নির্বাচনে সহিংসতা হয়েছিল অনেক কম। তখন নিহতের সংখ্যা ছিল চার জন। এবারের সহিংসতা ও সংঘর্ষ হয়েছে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আওয়ামী লীগের। বিএনপি বা অন্য কোন দল দৃশ্যপটেই আসতে পারেনি। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে বিদ্রোহী প্রার্থী শাসক দলের বিধায় তিনিও প্রশাসনকে প্রভাবিত করতে পেরেছেন। সব মিলিয়ে এমন নির্বাচন শাসক দলের শৃংখলাকেও ভেঙে চুরমার করেছে। সবচেয়ে বড় কথা, নির্বাচনকেন্দ্রীক এমন সহিংসতা গ্রামীণ সমাজের শৃঙ্খলা ও সংহতিকেও ধ্বংস করে দিলো। শাসক আওয়ামী লীগের এমন নির্বাচনী পরিকল্পনা সমাজ জীবনে ভয়াবহ পরিণতি ডেকে এনেছে।

জাতীয় নির্বাচনে ১৫৪ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হবার ঘটনা নিম্নতর পর্যায়ে একই পদ্ধতিতে নির্বাচিত হবার প্রবণতা তৈরি করেছে। বিরোধী দলের সম্ভাব্য প্রার্থীকে ভয়ভীতির দ্বারা বসিয়ে দেয়া সম্ভব হয়েছে। তাই ২৭১টি আসনে আওয়ামী প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। এটা অস্বাভাবিক ঘটনা। যেখানে স্বদলীয় বিদ্রোহী প্রার্থীকে বসানো সম্ভব হয়নি, সেখানেই নির্বাচন হয়েছে। তবে সেই সকল জায়গায়ও কার্যত নির্বাচন হয়নি; যা হয়েছে তা হলো শক্তির মহড়া এবং প্রশাসনকে প্রভাবিত করার তীব্র প্রতিযোগিতা।

নির্বাচনকে কিভাবে শাসক দলের নেতারা ও সংসদ সদস্যরা প্রভাবিত করেন তার সাম্প্রতিক দৃষ্টান্ত হলো চট্টগ্রামের বাশখালীর ঘটনা। বাশখালীর সরকার দলীয় সংসদ সদস্য মুস্তাফিজুর রহমান এক নির্বাচন কর্মকতাকে মারধর করেছেন। কারণ উক্ত নির্বাচন কর্মকর্তা সংসদ সদস্যের কথা মতো ভোট গ্রহণ কর্মকর্তা নিয়োগ দেননি। সংসদ সদস্য দুটি বড় অপরাধ করেছেন। প্রথমত, নির্বাচন কর্মকর্তার কাজে হস্তক্ষেপ করা যা আইনত অবৈধ ও দ্বিতীয়ত মারধর করা।

অবশ্য মারধর করা এখন সরকার দলীয় সংসদ সদস্যদের অনেকেরই রীতিমতো অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কক্সবাজারের টেকনাফের সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদি প্রথমে এক ইঞ্জিনিয়ারকে প্রহার করে আলোচনায় আসেন। তার মারপিটের ধারা এখনো অব্যাহত আছে। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন বারো বছরের বালক সৌরভের পায়ে গুলি করেছেন হাসতে হাসতে। ঠাকুরগাঁও’র রানীশংকৈলের সংসদ সদস্য হাফিজউদ্দিন আহমদ মহিলা কলেজের অধ্যক্ষকে চড় মেরেছেন। পাবনার সংসদ সদস্য শামসুর রহমান শরীফ স্টেশন মাস্টারকে মারধর করেছেন। বরগুনার এক সংসদ সদস্যের নির্দেশে এক গৃহবধূর মাথায় বিষ্ঠা ঢেলে দেয়া হয়েছিল। ময়মনসিংহের এক সংসদ সদস্যের নির্দেশে এক কলেজ শিক্ষককে দিগম্বর করে রাস্তায় ঘোরানো হয়েছিল। খুলনার সংসদ সদস্য ননী গোপাল মন্ডল লাঞ্ছিত করেছেন দাকোপ উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান জয়ন্তী রানী সরকারকে। আর অতি সাম্প্রতিক ঘটনা হলো, নারায়ণগঞ্জের প্রভাবশালী পরিবারের সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান এক স্কুলের প্রধান শিক্ষককে কান ধরে ‘উঠবস’ করিয়েছেন। সঙ্গে উচ্চারিত হয়েছিল উল্লসিত ‘জয়বাংলা’ ধ্বনী।

অতি নিম্নমানের কালচারের অধিকারী শাসক দলের নেতাকর্মীরা দেশের সামাজিক পরিবেশকে করেছেন কলুষিত। তার সঙ্গে যুক্ত হলো গণতন্ত্রহীনতা। কর্তৃত্ববাদী শাসক দলের ‘নির্বাচন’ দেশের রাজনৈতিক পরিবেশকেও করে তুলেছে কলুষিত। সব মিলিয়ে এ এক অসম্ভব পরিস্থিতি। যতো দ্রুত সম্ভব এর থেকে পরিত্রাণের পথ খুজতে হবে।

আতংক ভীতি ও শংকার ভেতর বসবাস

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

২০১৬ সালের ৮ মে, বাংলা ২৫ বৈশাখ বিশ্বকবি রবি ঠাকুরের ১৫৫ তম জন্মবার্ষিকী রবীন্দ্র সুরের লহরী ভরা ছিল না। একই দিন বিশ্ব মা দিবসে অনেক মা কান্নার সাগরে ডুবেছেন। কার্যত: খুনরঙা সকালটি ছিল অনেকের জন্য বুকভাঙ্গা বেদনার। একটি জাতীয় দৈনিকের শিরোনাম ছিল, প্রাণ গেল আরো পাঁচ জনের, চতুর্থ দফা ইউপি নির্বাচন শেষে মোট নিহত ৬২ জন। অন্যান্য দৈনিকের শিরোনামে খুনের সংখ্যা ৮, মোট ৮৪ জন এবং রাজশাহীতে পীর খুন। প্রতিটি মিডিয়ায় এখন আকছার খুনের খবর প্রতিদিন।

প্রায় প্রতিটি সকালই এখানে খুনরঙা। ঘুম ভেঙ্গে দিন শুরু হয় হত্যার খবর শুনে। দিনে হত্যা, দুপুরে হত্যা, রাতে হত্যা। ২৩ এপ্রিল ২০১৬ কালের কন্ঠের প্রধান শিরোনাম ছিল সাড়ে তিনমাসে ১৫০০ খুন। চলতি মাসে যুগান্তর প্রধান শিরোনাম করেছিল প্রতিদিন গড়ে ১১ জন খুন হচ্ছে। পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান থেকেই তারা এ হিসেব বের করেছে। অপহরণ, গুম, দস্যুতা, নারী-শিশু নির্যাতন সবকিছু সীমা ছাড়িয়েছে।

খুন হচ্ছেন- বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, লেখক-ব্লগার, রাজনৈতিক কর্মী, বিদেশী সংস্থার কর্মকর্তা, মানবাধিকার কর্মী, সাংবাদিক, জনপ্রতিনিধি, ছাত্র-ছাত্রী, গৃহবধূ, কথিত সন্ত্রাসী- কেউই রেহাই পাচ্ছে না। নাস্তিক আখ্যা দিয়ে, কাফের অথবা সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে, কারনে-অকারনে মানুষ খুন করা হচ্ছে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, প্রায় ক্ষেত্রে খুনীরা থাকছে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। আবার দৃশ্যমান খুনীরা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। ট্রিগারহ্যাপি একদল মানুষ পাখি মারার মত মানুষ মারছে।

প্রতিটি খুনের খবর দুঃসহ। একটি পরিবারকে ধ্বংস করে দেয়। গোটা সমাজে জিগীষা-জিঘাংসা বাড়ায়। সমাজের সকল স্থিতি ভেঙ্গে পড়তে থাকে। আরো দুঃসহ হচ্ছে, খুনীরা ধরা পড়ে না। বিচারহীনতার চলমানতা অব্যাহত থাকে। খুনের বয়ান নিয়ে আলোচনায় মাতে সরকার, বিরোধী দল, পুলিশ, সিভিল সোসাইটি, আন্তর্জাতিক স¤প্রদায়, সংবাদপত্র ও টিভি টক শো। শুরু হয় ব্লেইম গেমের পালা। হারিয়ে যায় নিহত মানুষ, পরিবার এবং খুনীরা। বদলে জায়গা করে নেয় অভিযোগ আর পাল্টা অভিযোগের খেলা।

পুলিশ প্রায় ক্ষেত্রে খুনীদের গ্রেফতার করতে পারছে না। কিন্তু তারা নাকি কারণ অনুমান করতে পারে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর রেজাউল করীম খুন হবার পরে তারা অনুমান করেছে,  ব্লগার অনলাইন এক্টিভিষ্টদের হত্যার সাথে মিল রয়েছে। পুলিশের আইজি গত ৩ মে সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেছেন, তিন বছরে ৩৭টি জঙ্গী হামলার ৯০% কারণ তারা সনাক্ত করেছেন। এরমধ্যে একটি মামলায় বিচার শেষ হয়েছে, ৬ মামলা তদন্ত শেষ করে পুলিশ আদালতে চার্জশীট জমা দিয়েছে। ত্রু টিহীন অভিযোগপত্র দিতে চায় বলেই পুলিশ সময় নিচ্ছে। তার দাবি মতে, অভিযোগপত্র না দিলেও পুলিশ ৩৪ টি মামলার মূল কারণ উদঘাটন করেছে।

এগুলি হচ্ছে তথ্য বা পরিসংখ্যান। সরকারী তরফে ভাষ্যগুলো এখন জনগনের মুখস্থ। “কারণ জানে বা মূল রহস্য উদঘাটন হয়েছে, জাল গুটিয়ে আনা হচ্ছে, ৪৮ ঘন্টা বা অচিরেই সব আসামী ধরা পড়বে, কাউকে ছাড়া হবে না”- আকছার এসব শুনতে শুনতে কান পচে গেছে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভাল -এটি বলার পরেও তাদের কৃত পরিসংখ্যান বলে দিচ্ছে প্রতিদিন গড়ে খুন হচ্ছে ১১। একেকটি খুন ও ভয়াবহতা নিয়ে আলোচনা থাকতে থাকতে নতুন এক বা একাধিক খুন আগেরটিকে চাপা দিয়ে দিচ্ছে। ধামাচাপা পড়ছে আগের ভয়াবহতা। এরকম শত শত খুনের কথা ভুলে যাচ্ছে মানুষ।

নিত্য ঘটে যাওয়া খুন-গুমের ঘটনা নিয়ে মিডিয়ার তাৎক্ষণিক সরবতা এবং পরবর্তী নিথরতা এখন বাস্তবতা। মানুষের প্রশ্ন- কেন একের পর এক এই হত্যাকান্ড? কেন ঘটছে, কারা ঘটাচ্ছে? এসবের মধ্য দিয়ে আরো বড় প্রশ্ন হচ্ছে- দেশ আসলে কোন দিকে যাচ্ছে? উত্তর শোনা যাচ্ছে, রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র, গুপ্তহত্যা, ইসলামিক ষ্টেট- ইসলামিক ষ্টেট নয় ইত্যাদি! এভাবেই খুনের কারণ উদঘাটন, অপরাধী গ্রেফতার ও বিচারের বদলে মানুষকে ফেলে দেয়া হচ্ছে গোলকধাঁধায়।

বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক, কলাবাগানে জোড়া খুন, লেখক-ব্লগার-অনলাইন এ্যাক্টিভিষ্টদের খুনগুলি একটি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়। হত্যাকারী, যারাই হোক, পেশাদার, প্রশিক্ষিত ও একধরনের ফ্যানাটিক। হত্যাকান্ডগুলি তাৎক্ষণিক উত্তেজনাপ্রসূত নয়, আচানক কোন ঘটনাও নয় এবং সুপরিকল্পিত তো বটেই। প্রশ্ন হচ্ছে, এই সিরিয়াল কিলিংয়ের পেছনে মাষ্টারমাইন্ড কে বা কারা? সত্যি কি অন্ধকার জগতে এরকম পেশাদার-প্রশিক্ষিত খুনীদের দল গড়ে উঠেছে ,নাকি ভীতি-আতঙ্ক ও বিভ্রান্তি ছড়াতে ষড়যন্ত্রের নিপুন জাল বোনা হচ্ছে?

অতি স¤প্রতি একজন লেখক-ব্লগার খুন হয়েছেন। হত্যাকান্ডের বিষয়টি চাপা পড়ে গেছে। কলেজ ছাত্রী তনু হত্যাকান্ড আড়াল হতে চলেছে। তনুর দ্বিতীয় ময়না তদন্ত রিপোর্ট আলোর মুখ দেখেনি। হত্যাকারী ধরা তো দুরে থাক, শনাক্ত করা যায়নি। ক্ষমতাবান কোন পক্ষ কি এগুলি আড়াল করতে কাজ করছে? রাষ্ট্র কোন সদুত্তর দিতে পারছে না। শুধুই গুজব ডাল-পালা মেলছে। মানুষের মনে সন্দেহ-অবিশ্বাস তৈরী হচ্ছে। পারসেপশন স্থায়ী হচ্ছে, অনেক হত্যাকান্ডের মত এগুলিও অন্ধকারে চলে যাবে।

এই মে মাসে প্রাসঙ্গিকভাবেই উঠে আসবে ২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীতে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ও নজিরবিহীন তান্ডবের ঘটনা। ওই ঘটনায় দায়েরকৃত অর্ধশতাধিক মামলা ভাগ্যে কি ঘটেছে? হিমাগারে চলে গেছে আরও অনেক মামলার মত! সরকার ও হেফাজতের দায়িত্বশীল সূত্রগুলির বরাত দিয়ে একটি জাতীয় দৈনিক জানাচ্ছে, একধরনের অলিখিত সমঝোতার ফলে হেফাজতের বিরুদ্ধে করা মামলাগুলি নিস্ক্রিয় হয়ে আছে (প্রথম আলো: ৫ মে ২০১৬)।

তিন বছর আগের ৫ মে’র তান্ডবে ঢাকার প্রাণকেন্দ্র মতিঝিল, বায়তুল মোকাররম এলাকা জ্বলছিল, সরকারী মহল ছিল চরম উৎকন্ঠায়। এ ঘটনায় রাজধানীসহ সারাদেশে নিহত হয়েছিল সরকারী হিসেবে ২৭ জন, আহতের সংখ্যা ছিল অনধিক দেড় হাজার। এসব ঘটনায় দায়েরকৃত ৫৩ টি মামলার তদন্ত ও বিচারের ক্ষেত্রে সরকারের অনাগ্রহ লক্ষণীয়। ফলে এটি ধরে নেয়ার যথেষ্ট কারন রয়েছে যে, সরকার অনেক ক্ষেত্রে বিচারহীনতার সংস্কৃতি উস্কে দিতে চাইছে এবং ক্ষেত্রবিশেষ পুরোন বা নতুন মামলার গতি ও দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া অনেক প্রশ্নের সুযোগ সৃষ্টি করছে।

এখন উন্নয়নের কাল! যে কোন মূল্যে উন্নয়ন একমাত্র প্রতীতি। গুলি করে, জবাই করে, দখল করে প্রতিদ্ব›দ্বীদের পরাস্ত করে জেতা এবং অপ্রতিদ্বন্দ্বী থাকা মূল লক্ষ্য। এই প্রত্যয় ও উন্নয়নকামীতা ক্রমশ: হয়ে উঠছে প্রাণসংহারী। লাশ পড়ছে, কুচ পরোয়া নেই। উন্নয়ন এবং উন্নয়নই একমাত্র লক্ষ্য। সরকার তরফে প্রধানমন্ত্রী বলছেন, পেট্রোল বোমায় মানুষ পুড়িয়ে মেরে সরকার পতনে ব্যর্থ হয়ে এখন তারা গুপ্তহত্যায় মেতেছে। আর বিএনপি নেতা বলছেন, সরকারকে সকল হত্যার দায় নিতে হবে। এই ব্লেইম গেমের পালায় খুনীরা আড়াল হয়ে গেছে, চাপা পড়ে যাচ্ছে খুনের ঘটনা।

পরিসংখ্যান দিয়ে খুনের ঘটনা মূল্যায়নের সুযোগ নেই। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিদিন ক’টি খুন বা ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে, সেটির সাথে তুলনা করে এ দেশের চিত্র মেলানো যাবে না। এখানে অপরাধের ধরণ, সংঘটিত হবার পর তদন্ত- বিচার এবং অপরাধ সংশ্লিষ্ট পূর্বাপর পরিবেশ দিয়েই গোটা পরিস্থিতির মূল্যায়ন করতে হবে। কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় ধর্ষণের শিকার ছাত্রীর লাশ উদ্ধার, ইউপি নির্বাচনে ৮০ খুন, মঠবাড়িয়া ও বাঁশখালীতে ট্রিগারহ্যাপি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে নিহতের ঘটনা ধরেই মূল্যায়নে যেতে হবে।

খুন, গুম, অপহরণ, নারী নির্যাতনের চিত্র পুরোনো। স্বাধীনতার পরে ৪৫ বছরে লক্ষাধিক পরিবার এসব ঘটনার ভিকটিম। বিচারহীনতার সংস্কৃতি স্থায়ী আকার লাভ করেছে। বিভিন্ন সরকারের সময়ে নির্বাচনী সহিংসতা নানা মাত্রায় আবির্ভূত হয়েছে। কিন্তু উন্নয়ন নিয়ে সহিংসতা সামগ্রিক অপরাধের ক্ষেত্রে ভিন্নমাত্রা যোগ করতে সক্ষম হয়েছে।

পরিসংখ্যানের পাশাপাশি নিরাপত্তাবোধহীনতার বিষয়টি এক্ষেত্রে সবার আগে চলে আসবে। অপরাধ প্রতিকার ব্যবস্থায় ব্যাপক দুর্বলতার কারণে মানুষের মধ্যে সংশয়-অনিশ্চয়তা বাড়ছে, নিরাপত্তাবোধ ভাঙ্গা দালানের পলেস্তরার মত ঘসে পড়ে যাচ্ছে। সমাজে একটি পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অনেক ঘটনায় মানুষের কোন সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না, মেনে নিচ্ছে অবলীলায়। কিছু ঘটনায় ব্যাপক সোচ্চার হচ্ছে। আবার কিছু ঘটনা জনমনে দাগ কাটছে না। এভাবেই অপরাধের বিষয়টি সমাজ-রাষ্ট্রে সহনীয় হয়ে উঠেছে।

ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা মানুষদের চরম বেপরোয়া হয়ে ওঠা এবং সাধারণ জনগোষ্ঠির নিস্ক্রিয় হয়ে যাওয়া যে কোন রাষ্ট্রের জন্য অশনী সংকেত। যে সকল ঘটনায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সম্পৃক্ততা থাকছে সেখানে মানুষ এগোচ্ছে না। কারণ, পরিনতিটা জানা হয়ে গেছে। এজন্যই অভিজিৎ রায়ের হত্যাকান্ডের সময়কালে তাকে বাঁচানোর জন্যে এগিয়ে আসার পরিবর্তে অনেকেই মোবাইলে ছবি তুলেছে। ওয়াসিকুর রহমানের ঘটনায় আসামী ধরে দিয়েছিল কয়েকজন হিজড়া; কিন্তু ওই আসামীদের পুলিশ ছেড়ে দেয়; অজুহাত যারা ধরিয়ে দিয়েছে তারা তৃতীয় লিঙ্গের। অন্যদিকে রানা প্লাজার ঘটনায় পরিনতির বিষয়টি মানুষের কাছে পরিষ্কার ছিল এজন্য তারা স্বেচ্ছায় এগিয়েছে। ফলে এটি এখন সুস্পষ্ট যে, একই জায়গায় মানুষ সহজাত প্রবৃত্তি নিয়ে এগোচ্ছে, অন্য জায়গায় স্বেচ্ছায় নিষ্ক্রিয় থাকছে।

জনগনের এই অনুভূতি, ভীতি-আতঙ্ক সৃষ্টির ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও শাসকদের ভূমিকা ছিল বেশি। সুতরাং এটি তাড়াতে তাদের দায়িত্ব বেশি। ভীতির পরিবেশ থেকে মানুষকে স্বস্তিতে ফিরিয়ে আনতে শাসকদের যে ন্যায়ানুগ আচরন প্রয়োজন তা সূদুর পরাহত হতে চলেছে। তারা অন্তত: একটি কাজ করতে পারেন, গুজবকে উস্কে না দিয়ে সত্য ও স্বচ্ছতার পরিবেশটি সৃষ্টি করতে পারেন। মানুষ উন্নয়ন ও গণতন্ত্র পাশাপাশি দেখতে চায়। সেজন্য ভীতি তাড়িয়ে উন্নয়ন ও গণতন্ত্রকে একইসাথে চলতে না দিলে শাসকদের আশঙ্কাই না সত্যে পরিনত হয়!