Home » রাজনীতি (page 8)

রাজনীতি

তিন সন্ত্রাসের কবলে বাংলাদেশ

হায়দার আকবর খান রনো ::
তিন সন্ত্রাসের কবলে বাংলাদেশ-রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, দলীয় বা ব্যক্তি সন্ত্রাস এবং ধর্মীয় মৌলবাদী সন্ত্রাস। এই তিন ধরনের সন্ত্রাসের মূল জায়গা কিন্তু একটাই। রাষ্ট্রীয় ও সমাজ জীবনে গণতন্ত্রের অভাব। এমনকি অবাধ গণতন্ত্রের মুক্ত বাতাস প্রবাহিত থাকলে, কোন ধরনের উগ্রপন্থা বিস্তার লাভ করতে পারতো না-ইসলামী জঙ্গী মৌলবাদও নয়।
সামরিক শাসক এরশাদের পতনের পর আশা করা গিয়েছিল গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটবে। কিন্তু ঘটেনি। আর গত ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর গণতন্ত্র পুরোপুরি নির্বাসিত হয়েছে। এই রকম পরিস্থিতিতে অন্যান্য সকল গণতান্ত্রিক অধিকার তো দূরের কথা, প্রত্যেক নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়েছে। একদা খালেদা ক্লিনহার্ট অপারেশনের নামে যে বিচার বহির্ভূত হত্যা শুরু করেছিলেন, তা ক্রমাগত ব্যাপকতর হয়েছে। সেদিন খালেদা জিয়া যে ক্ষমাহীন অপরাধ করেছিলেন তা হলো ক্লিনহার্ট অপারেশনের সময় যারা নির্যাতন করেছিল, এমনকি হত্যা পর্যন্ত করেছিল তাদেরকে দায়মুক্তি দিয়েছিলেন পার্লামেন্টে আইন পাস করে। সেই খালেদা জিয়া এখন গণতন্ত্রের দাবিতে চিৎকার করে গলা ফাটালেও তা বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। তাই তার ডাকে রাস্তায় মানুষ নামে না। অন্যদিকে, প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের এমন বিপর্যস্ত অবস্থা সরকারি দলকে কর্তৃত্ববাদী করে তুলেছে।
ক্লিনহার্ট অপারেশনের জায়গা নিয়েছে ক্রসফায়ারে। এক কথায় বিচার বহির্ভূত হত্যা। এইভাবে গুম, খুন, অপহরণ এবং বিচারহীনতা এক ভয়াবহ পরিবেশ তৈরি করেছে। রাষ্ট্র যখন নিজেই সন্ত্রাসের ভূমিকা নেয় তখন জনগণ বড় অসহায় বোধ করে। আর বিচার? সেও দুরাশা মাত্র। তনু হত্যার বিচার প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেছেন, ‘প্রশাসন চায় না, বিচার বিভাগ ঠিক মতো চলুক।’ (প্রথম আলো, ৩ এপ্রিল ২০১৬)।
তনু হত্যা অবশ্য রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে না। কিন্তু ঘুরে ফিরে রাষ্ট্র বা সরকার এসে পড়ছেই। কারণ ২০ মার্চ তনুর লাশ কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের মতো কঠোর নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা এলাকায় পাওয়া গেলেও এবং দুই দুইবার ময়নাতদন্ত করা হলেও হত্যা রহস্যের কিছুই উদঘাটিত হলো না। জনমনে সন্দেহ- কিছু একটা আড়াল করা হচ্ছে। এমন সন্দেহ সরাসরি প্রকাশ করেছেন-মানবাধিকার সংস্থার চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান। তিনি বলেছেন, তনু হত্যার ব্যাপারে যেন কোন জজ মিয়ার নাটক না হয়।
এই রকম ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সন্ত্রাস রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের সাথে একাকার হয়ে যায়। কারণ বিচারহীনতা সন্ত্রাসকেই উৎসাহিত করে। ক্ষমতাসীন দলের দলীয় সন্ত্রাস, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস থেকে আসলে ভিন্ন কিছু নয়। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের মাস্তানরা যখন পুলিশের উপস্থিতিতে অথবা পুলিশের সহায়তায় ক্ষমতার দাপট দেখায়, জমি দখল, সম্পত্তি দখল, টেন্ডার বাক্স দখল, হিন্দুদের উপর অত্যাচার, ব্যবসা-বাণিজ্য মাস্তানি ট্যাক্স বসায়, তখন তাকে অন্য আর কিভাবে সংজ্ঞায়িত করবো। গত বছর আগস্ট মাসে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান বলেছিলেন, ‘রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকলে আইন তাকে স্পর্শ করে না।’
দলীয় সন্ত্রাস, খুনাখুনি পর্যন্ত পৌছায়। প্রতিপক্ষকে খুন, নারীর উপর যৌন নির্যাতন, টেন্ডার-দখল করতে গিয়ে খুন এবং নিজেদের মধ্যে ক্ষমতার ও লুটের ভাগ নিয়ে খুন। এমনি নিজেদের মধ্যে বন্দুকযুদ্ধে গুলিবিদ্ধ হয়েছিল মাতৃগর্ভের এক কন্যাশিশুও। বাস্তবেই বড় ভয়াবহ পরিস্থিতি।
গাইবান্ধার সরকার দলীয় সংসদ সদস্যে হাসতে হাসতে খেলার ছলে এক বারো বছরের বালককে গুলি করলেন; বালকের পা গুলিবিদ্ধ হয়েছিল। তিনি যে সংসদ সদস্য, ক্ষমতাবান ব্যক্তি, এটি সেই ক্ষমতার একটা প্রদর্শনী মাত্র। তিনি জামিনে মুক্তিলাভ করে এখন বহাল তবিয়তে আছেন। দুর্দান্ত প্রতাপে এলাকায় রাজত্ব করছেন। একটি শিশুকে গুলি করার জন্য সংসদ সদস্য পদও হারাতে হয়নি। দলীয় এ্যাকশনও নেয়নি শাসক দল আওয়ামী লীগ।
এই রকম ক্ষেত্রে বস্তুত রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও দলীয় সন্ত্রাস বা ব্যক্তি সন্ত্রাস একাকার হয়ে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ধর্মীয় মৌলবাদীদের সন্ত্রাস। ধর্মের নামে মানুষ খুন। ধর্মের নামে ধর্মবিরোধী কাজ। এরা সন্ত্রাসী গ্রুপ ; পেছন থেকে ছোবল মারে, কাপুরুষেরাই তো গোপনে হত্যা করে। মানুষ মারা যেন নেশা, তাও আবার পবিত্র ইসলাম ধর্মের নামে। তারা হত্যা করেছে অভিজিৎ রায়, আশিকুর রহমান বাবু, অনন্ত দাস, নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায়, ফয়সাল আরেফীন দীপনকে। এর কোনোটিরই এখনো পর্যন্ত তদন্ত বা বিচার কিছুই হয়নি। এক বছরের বেশী অতিক্রান্ত হওয়ার পর অভিজিতের পিতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক অজয় রায় হতাশা ও ক্ষোভের সঙ্গে বলেছেন, ‘আমাদের সরকার, গোয়েন্দা বাহিনী একটা নিষ্ক্রিয়তার মধ্যে রয়েছে। ওদের খুনি ধরার ইচ্ছেও নেই, সক্ষমতাও নেই। প্রতিটি খুনের পর ওরা যেভাবে কথা বলছে, তাতে খুনিরা আশকারা পাচ্ছে।’ কথাটা মিথ্যা নয়। গত বছর আগস্ট মাসে ব্লগার হত্যা নিয়ে যখন সকলে উদ্বিগ্ন তখন হত্যাকারীকে ধরার ব্যাপারে পুলিশের সক্রিয়তা দেখা না গেলেও পুলিশ প্রধান ব্লগারদের নসিহত করেছিলেন ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত না করতে। উপদেশ দেয়া রাজনীতিবিদ ও সমাজকর্মীর কাজ। পুলিশের কাজ অপরাধীকে ধরা। তাই অনেকেই পুলিশের আইজির বক্তব্যের সমালোচনা করে বলেছিলেন, ‘পুলিশ সঠিক সময় সঠিক বার্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এখন সময় ব্লগার হত্যার সঙ্গে জড়িতদের খুজে বের করে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা।’
দীপনের পিতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকও অধ্যাপক অজয় রায়ের মতো হতাশা ও ক্ষোভ ব্যক্ত করেছেন। বলেছেন, ‘বিচার প্রক্রিয়ায় আমার আস্থা নেই। শুধু অনাস্থা আছে।’
এমন পরিস্থিতিতে খুনিরা তো আরও উৎসাহিত হবে। বস্তুত এমন ইঙ্গিতই দিয়েছিলেন খ্যাতনামা লেখক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গত বছর নভেম্বর মাসে দীপন হত্যার পরপরই। হাসান আজিজুল হক বলেছিলেন, ‘টানা হত্যাকান্ড ঘটিয়ে যাওয়া একজনও কেন ধরা পড়ে না, তা কারো বোধগম্য নয়।’
শুধু বøগার-লেখক-প্রকাশকই নিহত হচ্ছেন না, ধর্মীয় মৌলবাদীদের চাপাতির আঘাতে অথবা বোমা বিস্ফোরণে নিহত হয়েছেন বিদেশী নাগরিক, খ্রিস্টান যাজক, মন্দিরের পূজারী, শিয়া মুসলমান, মহরমের তাজিয়া মিছিলে যোগদানকারী ধর্মপ্রাণ মুসলমান, বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গীতপ্রিয় শিক্ষক- কে না?
সরকার বলছে, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি খুব ভালো। কিন্তু জনগণ তা বিশ্বাস করে না। বরং সাধারণ মানুষ এক ভয়াবহ পরিবেশে আতংকের মধ্যে রয়েছে। সরকার বলছে, এদেশে আইএস নেই। মার্কিন উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ্যান্টনি ব্লিসকেন ভিন্ন কথা বলছেন। তিনি বলছেন, ‘বাংলাদেশ সরকার উগ্রবাদী হামলাগুলোর জন্যে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে দায়ী করলেও আসলে বিভিন্ন জঙ্গী গোষ্ঠীর দায় স্বীকারকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।’
আইএস বা আল কায়েদা বা তালেবানের কোন শাখা আছে কি নেই, সেটা বড় কথা নয়। এটা পরিষ্কার যে, যারা ধারাবাহিক হত্যাকান্ড ঘটিয়ে চলেছে, তারা আন্তর্জাতিক ইসলামিক জঙ্গী নেটওয়ার্কের সঙ্গে একই ভাবাদর্শ দ্বারা অনুপ্রাণিত। সরকারের দায়িত্বহীন কথা ও আচরণ এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি জঙ্গীদের আরও উৎসাহিত করছে।
বহুমুখী সন্ত্রাসের কবলে বাংলাদেশ। আমরা কি দায়িত্ববান সরকারের কাছ থেকে জনজীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি করতে পারি না? এটা কি খুব বেশি দাবি হয়ে গেল?

কর্তৃত্ববাদী শাসনে ক্ষমতাবানদের দাপট ও দুর্বলের অসহায়ত্ব

হায়দার আকবর খান রনো ::

১৯৯০ পরবর্তীকালে আজকের সরকারের মতো এতো শক্তিশালী সরকার আর আসেনি। আবার একই সঙ্গে এতো গণবিচ্ছিন্ন সরকারও এই সময়কালে কখনো ছিল না। গণবিচ্ছিন্ন তবু শক্তিশালী ? হ্যা, তাই। শক্তিশালী কারণ বিরোধী পক্ষও দুর্বল। প্রধান বিরোধী পক্ষ বিএনপি আজ একেবারে পর্যুদস্ত। নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা-হামলার কারণে দাড়াতেই পারছে না দলটি। হয়তো জনসমর্থন আছে, কিন্তু সেই সমর্থনটা হচ্ছে নেগেটিভ। সরকার বিরোধী ভোটাররা জমায়েত হতে চায় বিএনপির পেছনে। কিন্তু সেই জনসমর্থনকে ইতিবাচক আন্দোলনের শক্তিতে পরিণত করার যোগ্যতা নেই বিএনপির। কারণ বিএনপি কোন আদর্শবাদী দল নয়। এই দলও ক্ষমতায় ছিল। তখন তারা গণবিরোধী ভূমিকাই পালন করে এসেছে। তাছাড়া এখনো মুখে গণতন্ত্রের শ্লোগান তুললেও, জনগণের অর্থনৈতিক দাবি নিয়ে তারা একটি কর্মসূচি পালন করেনি। শ্রমিকের মজুরি, মধ্যবিত্তের শিক্ষা, চিকিৎসার জন্য দাবি অথবা দ্রব্যমূল্য নিয়ে কোন কর্মসূচি তাদের কর্মকৌশল, চিন্তা, ধারণা বা উপলব্ধির মধ্যেও নেই।

অন্যান্য উদারপন্থী বুর্জোয়া দল বলেও তেমন কিছু নেই। বামশক্তিও দুর্বল। এই অবস্থাটা সুযোগ করে দিয়েছে সরকারকে কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠতে। কর্তৃত্ববাদী শাসন ও গণবিচ্ছিন্নতা শাসক দলকে বাধ্য করেছে নির্ভর করতে পুলিশ প্রশাসনের উপর এবং দলীয় মাস্তানদের উপর। পুলিশ, র‌্যাব ও প্রশাসন তাই এক ধরনের আপেক্ষিক স্বাধীনতা ভোগ করছে। পাশাপাশি দলীয় মাস্তান এবং শাসক দলের নিচের পর্যায়ের নেতারাও অবাধ স্বাধীনতা ভোগ করছে- লুটপাটের স্বাধীনতা, দুর্নীতির স্বাধীনতা, ক্ষমতার দাপট দেখানোর স্বাধীনতা। শাসক দলের উপরতলার নেতৃত্বকে যেন অসহায় বোধ করেন। দলের উপর কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। এই পরিস্থিতি সামগ্রিকভাবে অরাজকতার অবস্থা সৃষ্টি করেছে। পাশাপাশি আইনের শাসনের অনুপস্থিতি, শাসক দল ও প্রশাসনের ভয়ংকর ক্ষমতার দাপট এক ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে। চোখের সামনে দুর্নীতি ও লুটপাট হলেও প্রতিবাদ করার সাহস পায় না কেউ। কারণ বিচার বহির্ভূত হত্যা, ক্রসফায়ার, নিখোজ হওয়া, গুম, খুন ইত্যাদির সংখ্যা প্রতিদিন বেড়েই চলেছে। অবস্থা এতোটাই খারাপ যে গত বছর আগস্ট মাসে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান পর্যন্ত বলেছিলেন, ‘রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকলে আইন তাকে স্পর্শ করে না’। খুব সম্প্রতি প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা এক আলোচনায় তনু হত্যা প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে বলেছেন, ‘প্রশাসন চায় না, বিচার বিভাগ ঠিক মতো চলুক’। (প্রথম আলো, ৩ এপ্রিল ২০১৬)।

তবে তনু হত্যার ক্ষেত্রে দেখলাম মানুষ ভয়ভীতি কাটিয়ে বিদ্রোহে ফেটে পড়েছে। তনু হত্যার বিষয়টি খুবই রহস্যজনক। আরও রহস্যজনক পুলিশ ও প্রশাসনের ভূমিকা। নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকায় পাওয়া গেল সোহাগী জাহান তনুর লাশ। কিভাবে এমন জায়গায় লাশ এলো। তাকে কি সেখানেই হত্যা করা হয়েছিল, যেখানে বাইরের লোকের যাতায়াত খুব সহজ ব্যাপার নয়। প্রথম প্রদর্শনে পুলিশ সুপার অনুমান করেছিলেন যে, তাকে ধষর্ণের পর হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু ময়না তদন্তে, যার রিপোর্ট বের হয়েছিল দুই সপ্তাহ পর, সেখানে কিছুই বের হলো না। এমনকি হত্যা না আত্মহত্যা তাও নির্দিষ্ট করে বলা যায়নি। প্রবল প্রতিবাদের মুখে দ্বিতীয়বার ময়না তদন্ত হল। তার রিপোর্টও এখনো বের হয়নি। প্রথম দিকে তনুর মা ও নিকট আত্মীয় ছাড়া আর কাউকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। প্রথমে নেয়া হয় মাকে থানায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। কিন্তু কখন? মধ্যরাতে ঘর থেকে মাকে থানায় নিয়ে আসা হয়। পুলিশের এই আচরণ রহস্যজনক। মিডিয়ায় বলা শুরু হলো, কাউকে রক্ষা করার জন্য নানা কৌশল নেয়া হচ্ছে। মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান স্পষ্ট ভাষায় বললেন, ‘জজ মিয়ার নাটক সাজানো হলে তা মানা যাবে না’। এই মর্মে তিনি একটি চিঠিও দিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে।

ড. মিজানুর রহমান প্রায়ই বেশ সাহসের সঙ্গে সত্য কথা বলে থাকেন। গত বছর আগস্ট মাসে এক আলোচনা সভায় তিনি বলেছিলেন, ‘রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকলে আইন তাকে স্পর্শ করে না’। কথাটা পুরোপুরি সত্য। তার মানে যারা ক্ষমতাবান, তারা বড় বড় অপরাধ করলেও পার পেয়ে যান। আর যারা দুর্বল তারা অত্যাচারের শিকার হন। তনুর বাবা নি¤œবিত্ত কর্মচারী মাত্র। তাই তার জন্য বিচারের দরজা বন্ধ। হত্যাকারী অথবা ধর্ষণকারী যদি শক্তিশালী হয়ে থাকে, তাহলে আইন তাকে স্পর্শ করবে না। এই যে আইনের শাসনের অনুপস্থিতি, তা সমগ্র সমাজকে কলুষিত করেছে, গণতন্ত্রকে করেছে নির্বাসিত, কর্তৃত্ববাদী শাসনের যা হচ্ছে সাধারণ বৈশিষ্ট্য।

দুই একটি উদাহরণ দেয়া যাক। গাইবান্ধার সংসদ সদস্য হাসতে হাসতে একটি বারো বছরের ছেলের পায়ে গুলি করে ছেলেটিকে পঙ্গু করেছিল। তারপরও তিনি জামিন পেয়ে বহাল তবিয়তে এবং দাপটের সঙ্গে সংসদ সদস্যও রয়ে গেছেন। দলও কোনো এ্যাকশন নেয়নি।

এক মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, যিনি ২০১৫ সালে অফিসে অবরুদ্ধ খালেদা জিয়ার বাসার সামনে বালুর ট্রাক সম্বন্ধে বলেছিলেন যে, বাড়ি মেরামতের জন্য বাল আনা হয়েছে এবং এই ভাবে রাষ্ট্রীয় মিথ্যাচার করেছিলেন, সেই মন্ত্রী মায়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা চলা সত্তে¡ও তিনি মন্ত্রীত্বের গদিতে আরামেই বসে আছেন। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত বেঞ্চ দুই মন্ত্রীকে পঞ্চাশ হাজার টাকা দন্ডাদেশ দিয়েছেন। দন্ডপ্রাপ্ত মন্ত্রীরা কিন্তু এখনো মন্ত্রী আছেন। সংবিধানে শাস্তি প্রাপ্ত মন্ত্রীকে পদত্যাগ করার সুস্পষ্টভাবে বলা না থাকলেও নৈতিকতার কারণে তাদের পদত্যাগ করা উচিত ছিল। হায়! নৈতিকতা বহু আগেই বিদায় নিয়েছে। এখানে চলছে দুর্নীতির রাজত্ব, ক্ষমতার দাপট ও ক্ষমতাহীনের অসহায়ত্ব।

দুর্নীতির এক এক করে রেকর্ড তৈরি হচ্ছে। বড় বড় আর্থিক কেলেংকারির খবর আসে একটার পর একটা। রিজার্ভ চুরি, শেয়ারবাজার কেলেংকারি, হলমার্ক, বেসিক ব্যাংক, বিসমিল্লাহ, ডেসটিনি- কোনোটারই বিচার হয়নি। শাস্তি পায়নি কেউ। একটা হিসেব বলে গত সাত বছরে আত্মসাৎ হয়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশের জন্য এটা কম টাকা নিশ্চয়ই নয়।

একদিকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট ও অথনৈতিক নৈরাজ্য, অন্যদিকে বিচারহীনতার সংস্কৃতি। এ যে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি। এর থেকে বেরিয়ে আসতেই হবে। কিন্তু কোথায় সেই প্রতিরোধ শক্তি?

শেষ ভরসা জনগণ। বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম। তনু হত্যার বিচার পায়নি তার গরিব বাবা-মা। কিন্তু ক্ষুব্ধ স্কুল কলেজের ছাত্রছাত্রীরা সারাদেশ জুড়ে যে প্রতিবাদের ঝড় তুলেছে, তারা কোনো দলের নয়। তারা সাধারণ ছাত্র, সাধারণ বিচারের সুযোগ থেকে বঞ্চিত জনগণেরই প্রতিনিধি। শেষ ভরসা এই নতুন প্রজন্মের উপরই রইল।

নির্বাচনী ব্যবস্থার সংকট কী দীর্ঘস্থায়ী

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ কী গভীর সংকট ও অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে? সাধারণ অর্থে জনকর্তৃত্বের অনুপস্থিতি অস্থিরতা বাড়িয়ে তোলে সবক্ষেত্রে। কিন্ত বাংলাদেশে তো শাসকদের কর্তৃত্বের অনুপস্থিতি নেই, শাসন ব্যবস্থা বড় বেশী সরল-রৈখিক, একক ও কর্তৃত্ববাদী। সুতরাং এই ধরণের ব্যবস্থা অস্থিরতার কারণ হতে পারে কীনা, সেই প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। এরকম শাসনের প্রধান অনুসঙ্গ হচ্ছে, ক্ষেত্রবিশেষ আইনকে শাসন করা হয়, যা বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে উস্কে দেয় । এই পরিস্থিতির সংকট সবক্ষেত্রে যে অস্থিরতা সৃষ্টি করে তা  প্রবল হয়ে ওঠে এবং ক্ষমতাসীনদের অনেকেই আইনের আওতার বাইরে সুবিধে ভোগ করে থাকে।

দশম সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামী লীগ সরকার হবে নৈতিকভাবে দুর্বল সরকার কর্তৃত্ববাদী হবে, এটি আমাদের বুধবার-এ প্রকাশ করা হয়েছিল ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর পরই এবং এটি এখন বাস্তবতা। নৈতিকভাবে দুর্বল এই সরকার স্বাভাবিকভাবেই হয়ে উঠছে প্রতিশোধপরায়ন ও ক্ষিপ্র। একটি একক নির্বাচনে এবং প্রায় কোন প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়া নির্বাচিত ক্ষমতাসীনদের এই পর্যায়ে জনগনের কাছে দায়বদ্ধতা বলে কিছু আছে কীনা, থাকলে কী আছে, প্রতিষ্ঠানগুলিসহ মিডিয়ার চেহারায় সেটি দৃশ্যমান। দেশের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করার বাসনা তৈরী হচ্ছে। সেই কারনেই অসহিষ্ণুতা ক্রমশ: সুস্থ সমালোচনাকে রুদ্ধ করতে চাইছে।

রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক চরিত্র হারিয়ে ফেলতে থাকলে নাগরিকদের মিত্র থাকতে পারে না। দুর্বল নাগরিকদের সঙ্গে তার সম্পর্কটা হয়ে দাঁড়ায় সরাসরি শত্রুতার। রাষ্ট্রের গুনাগুনের পরীক্ষা অন্য কোথাও তেমন দিতে হয় না, যেমনটা হয় ব্যক্তি নাগরিকের জীবনে। কাদের সুবিধা হচ্ছে, কাদের জন্য ঘনিয়ে আসছে বিপদ, তা দেখেই বোঝা যায়- রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চরিত্র অবশিষ্ট থাকল কিনা! রাষ্ট্রের উত্থান ও পতনের সাথে সাথে ব্যক্তির ভাগ্যের পরিবর্তন, কিছু মানুষের সুখ-সমৃদ্ধি অন্যদের দুর্ভোগ-এর রহস্য নিহিত রয়েছে রাষ্ট্রের চরিত্র এবং রাজনীতিকদের কার্যকলাপের ভেতরেই। ব্যক্তি এখানে শক্তিহীন, এমনকি যাদের ভাগ্যের দুয়ার উন্মুক্ত হয়েছে রাষ্ট্রীয় পরিবর্তনের ফলে- তারাও কি শক্তিশালী?

গত কয়েকমাসে বাংলাদেশে যেসব ঘটনা ঘটেছে, তা এক গভীর সংকট ও অস্থিরতার ইঙ্গিঁত বহন করে। দেশে হত্যা গুম, অপহরন, ধর্ষন লুন্ঠনের বেশুমার ঘটনা ফিবছর ঘটে চলেছে। কিন্তু এর মাঝে রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনা এবং এ নিয়ে শাসক মহলের নিস্পৃহ আচরন চমকে দেয়ার মত। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে দুই মন্ত্রীর বক্তব্য, আদালতের প্রতিক্রিয়া, মন্ত্রীদ্বয়ের শর্তহীন ক্ষমা প্রার্থনা এবং অন্তিমে সংবিধান লংঘন করার অভিযোগে তাদের শাস্তির পরে সরকারের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা না নেয়া বিস্ময়কর হলেও কর্তৃত্ববাদী শাসনে এটিই স্বাভাবিক।

এ অবস্থায় শাসন ক্ষেত্রে সংকট ও অস্থিরতা দেখা দিলে শাসকদের প্রতিক্রিয়া থাকেনা । কেন্দ্রীভূত ক্ষমতায় রাষ্ট্রের অঙ্গগুলি স্বাধীনভাবে কাজ না করায় অখন্ড স্বত্তা হিসেবে আইন-কানুনের অনুশীলন করেনা। বাংলাদেশের শাসন ব্যবস্থায় এমত অস্থিরতা দেখা দিয়েছে কিনা, এটি সমাজ বিজ্ঞানীদের গভীর অনুসন্ধান ও বিশ্লেষনের বিষয়। তবে শাদা চোখে মনে হবে যে, কেন্দ্রীভূত কর্তৃত্বে বসবাসরত দেশের জনগনের জন্য এই পরিস্থিতি দিনকে দিন নৈরাজ্যিক হয়ে উঠছে এবং পরিনামে দেশ গভীর সংকটের মধ্যে ও অস্থির হয়ে পড়ছে।

এই অনিবার্যতায় বাংলাদেশে এখন নির্বাচন ব্যবস্থার সংকট ও অস্থিরতা নৈরাজ্যের দিকে ধাবিত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এটি মোটামুটি নিশ্চিত ছিল যে, ২০১৪ সালের সংসদ নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় উপজেলা, পৌরসভা, সিটি করপোরেশনের মত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনও একপেশে হতে চলেছে। দলীয় মার্কার এই নির্বাচনে ইতিমধ্যেই ক্ষমতাসীন দলের ৭৭ জন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছে। অর্থ দাঁড়ায়, যে কোন প্রকারে প্রতিদ্বন্দ্বীদের  প্রার্থীতা থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বিরা স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতা পেয়েছে। গাদা গাদা অভিযোগ থাকলেও নির্বাচন কমিশন ছিল নির্লিপ্ত, নিস্ক্রিয়।

রাজনৈতিক দলের কথিত মনোনয়নের বাইরে বিদ্রোহী প্রার্থীর সংখ্যা এবারের নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য। দল যে প্রক্রিয়ায় মনোনয়ন দেয় তা মেনে নেয়নি নিজ দলের প্রার্থীরা । ক্ষমতাসীন দলে বিদ্রোহের সংখ্যা বেশি, এখন এটি স্পষ্ট যে, দলীয় মনোনয়নের ক্ষেত্রে কোন প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া ছিলনা। ধমক, চাপ, বহিস্কার, মামলা ও গ্রেফতার- এসব পথে বিদ্রোহী প্রার্থীদের নির্বাচনের বাইরে রাখার চেষ্টা করা তৃনমূলে গনতন্ত্র চর্চার বিষয়টি ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে।

তৃনমূলের রাজনৈতিক দলগুলির এই প্রাতিষ্টানিক ব্যর্থতার ফাঁক গলে সহিংসতা, রক্তপাত, দূর্নীতি-অনাচার আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। প্রার্থী মনোনয়নে তৃনমূলের মতামতের চাইতে আর্থিক লেনদেন ও নেতৃত্বের কোটারি স্বার্থের প্রভাব হয়ে উঠেছিল বড়, ফলে বিদ্রোহী প্রার্থীর অবাধ্যতা না ঠেকাতে পেরে দলীয় নেতারা বহিস্কারের হুমকিসহ নেপথ্যে প্রভাব খাটিয়ে মামলা ও গ্রেফতার করে ক্ষোভ ঠেকাতে চেয়েছেন। নির্বাচনী মাঠ সমতল ছিলনা, প্রচার- প্রচারনা ছিলনা নির্বিঘ্ন। এরকম নির্বাচন শুধুমাত্র ক্ষমতাসীন দলের বিজয় নিশ্চিত করতে পারে, পারেনা উৎসবের আমেজে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সুষ্ঠু নির্বাচন করতে ।

সকল রাজনৈতিক দলের আমলে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা সব নির্বাচনে রকম-ফেরে প্রশাসনের সহযোগিতা পেয়ে থাকে। কিন্তু জনরায় প্রায় ক্ষেত্রেই তাদের বিপক্ষে যেতে দেখা গেছে এভারেই প্রথম প্রশাসনের সহযোগিতায় এতটাই মাত্রা ছাড়িয়েছে যে, শুধুমাত্র পুলিশ ও প্রশাসনের সহায়তায় অনেক প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছে। নিস্ক্রিয়, নির্লিপ্ত ও অনুজ্জল নির্বাচন কমিশন শেষতক সাতক্ষীরার পুলিশ সুপারসহ ৫ জন ওসিকে ডেকে ‘তিরস্কার’ করেছে, বিপরীতে পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের আগে সেখানকার নির্বাচন কমিশন ডিসি, এসপিসহ  ৩৮ জন কর্মকর্তাকে বদলী করেছে নিরপেক্ষ ভূমিকা না থাকার কারণে।

এ পযর্ন্ত দু’দফা ইউপি নির্বাচনে শিশুসহ কুড়িজন মানুষের প্রাণ করেছে। আহত হয়েছে অগনিত মানুষ । ২২ মার্চ মঠবাড়িয়া কলেজ কেন্দ্রে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর বেপরোয়া গুলিতে মারা গেছে ৫ জন। এটি প্রমান করে যে, আমাদের  আইন শৃঙ্খলা বাহিনী কতটা  ‘ট্রিগারহ্যাপি’ হয়ে উঠেছে এবং মানুষের প্রান কতটা সস্তা হয়ে গেছে! এই ঘটনার পর ঐ বাহিনীর ডিজি (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নয় ) সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, ম্যাজিষ্ট্রেটের নির্দেশে তারা গুলি করেছে। এখানেই শেষ নয়, এই পাইকারী হত্যাকান্ডের ঘটনায় পরবর্তীতে ১৩০০ জন অজ্ঞাতনামার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।

গত কয়েক বছরে প্রশাসন ক্ষমতাসীন দলের প্রতি বিশেষ পক্ষপাতিত্ব অব্যাহত রেখেছে। প্রশাসনের এই বিষয়গুলি নির্বাচন কমিশন নিয়ন্ত্রন তো দূরে থাকে, আমলে নিয়ে দৃশ্যমান কোন পদক্ষেপ নিতে সক্ষম হয়নি। ফলে নির্বাচনকালে ও নির্বাচন পরবর্তীতে সংঘটিত সহিংসতায় কেন্দ্র দখল, ব্যালট বাক্স ছিনতাই, জালভোট ও ব্যাপক প্রানহানির ঘটনা ঘটেছে। নিকট অতীতে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনসহ প্রশাসন ন্যুনতম মানসম্পন্ন যে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাগুলি অর্জন করেছিল, ২০১৪ থেকে অনুষ্ঠিত কোন নির্বাচনে তা আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

দুই দফায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে আরো অস্থির করে তুলেছে। ভোটবঞ্চিত জনগন ভয়ে ও ক্ষোভে আগ্রহ হারাচ্ছে তৃনমূল পর্যন্ত। এর মধ্য দিয়ে সহিংসতার বিকেন্দ্রীকরণ ঘটেছে। দলীয় ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে মনোনয়ন পত্র দাখিল তেকে ভোটের দিন পর্যন্ত এবং ভোট পরবর্তী প্রতিটি স্তরে সংঘটিত ক্ষমতাসীনদের দাপট তৃনমূলের সামাজিক সম্প্রীতি ধ্বংসের কিনারে নিয়ে গেছে। এক দলের সঙ্গে অন্য দলের পাশাপাশি  নিজেদের দলের মধ্যে বিরোধ ও শত্রুতা বাড়ছে। আশংকা বাড়ছে, এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে তৃতীয় দফার নির্বাচনে নিচেরা ছাড়া আর কী কোন প্রতিদ্বন্দ্বী নির্বাচনের মাঠে পাওয়া যাবে?

দেশের শাসনব্যবস্থা বা প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতায় এমত অস্থির পরিস্থিতির মূল কারণ হচ্ছে, সাংবিধানিক ও বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলিকে অদৃশ্য দলীয় নিয়ন্ত্রনে নিয়ে আসা। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মধ্য দিযে এটি সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, সরকার দলীয় পরিচয়ের সাথে প্রতিষ্ঠানগুলিকে এক কাতারে নিয়ে এসেছে। প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্তরাও সাংবিধানিক দায়িত্ব না ভেবে অনেকটা সরকারী কর্মকর্তাদের মত আচরন করছেন। এর ফলে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা  হারাচ্ছে রাষ্ট্র, জনআস্থা শূন্যের কোঠায় নেমে যাচ্ছে।

এবারের নির্বাচন তৃনমূলের রাজনৈতিক প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা সমূলে বিনষ্ট করে দিয়েছে। দুই দফায় অনুষ্ঠিত প্রায় দেড় হাজার ইউনিয়নে এই অক্ষমতা সবরকম সামাজিক ভারসাম্য ধ্বংস করে দেবে। ফলে সমাজ জুড়ে আগত সংকট ও অস্থির পরিস্থিতি তৃনমূলকে বিপুল বেগে আঘাত করতে চলেছে। যার শিকার হবে প্রধানত: গ্রামীন জনগোষ্ঠি।  নির্বাচন কমিশন, সরকার ও রাজনৈতিক দল মিলে কি সেদিকেই যাত্রা করলো ?

তাজউদ্দীন আহমদের রাজনৈতিক জীবন – (পর্ব-৭)

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী::

গণ্ডি পার হবার প্রস্তুতিটা চলছিল। শিক্ষা, সামাজিক যোগাযোগ, রাজনীতির অনুশীলন, সংস্কৃতি চর্চা, খেলাধুলা সব দিক দিয়েই নিজেকে প্রস্তুত করছিলেন এই যুবক। দেখা যাচ্ছে ভলিবল, বাডমিন্টন, টেনিস সব কিছুই খেলছেন তিনি। অংশ নিচ্ছেন বিতর্ক প্রতিযোগিতায়, বক্তৃতা দিচ্ছেন জনসভাতে; সভাপতিত্ব করছেন বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, যাতায়াত করছেন পাঠাগারে; আর ম্যানিফেস্টো, বিবৃতি, প্রস্তাব, কার্যবিবরণী – এসব লেখা, টাইপ করা, ছাপিয়ে আনা, বিতরণ করার ব্যাপারে তিনি থাকছেন সবার আগে। তাঁর অতিশয় আপনজন ডা. করিমের সঙ্গে এক পর্যায়ে তাঁর রাজনৈতিক বিচ্ছেদ ঘটেছে, করিম চলে গেছেন কমিউনিস্টদের সঙ্গে, তাজউদ্দীন যোগ দিয়েছেন আওয়ামী লীগে, তবে ১৯৬২-তে আইউব খানের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের সময় দুজনেই কারাবন্দী হয়েছেন এবং সৌভাগ্যক্রমে দুজনের থাকার ব্যবস্থাও হয়েছে একই সেলে। করিম জেলে ছিলেন পাঁচ মাস, আরও অনেকেই তখন জেলে; তাঁদের সাহচর্যে করিমের বন্দী জীবন নিরানন্দে নয়, বেশ আনন্দেই কেটেছে। তাস খেলা ছিল নিত্যদিনের বিনোদন। করিম দেখতেন তাজউদ্দীন একা একা দাবা খেলছেন, কারণ সঙ্গীদের মাঝে কেউই দাবা খেলতে জানত না। করিমের ভাষায়, ‘‘সে নিজেই নিজের প্রতিপক্ষ হয়ে একা একা কেমন করে দাবা খেলত এটা আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারতাম না। প্রতিযোগিতা ছাড়া খেলা জমে? নিজের সাথে নিজের প্রতিযোগিতা এ কেমন? তাজউদ্দীনের মাঝে মাঝে নিজেই নিজেকে ছাড়িয়ে যাবার একটা প্রচেষ্টা হয়তো ছিল।’’

হয় তো নয়, অবশ্যই ছিল। রাজনীতির এই কর্মী সব সময়েই চেষ্টা করতেন কীভাবে নিজেই নিজেকে অতিক্রম করে যাবেন। কারাবন্দী অবস্থায় এই দুই বন্ধুর ভেতর রাজনীতির নানা বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। উভয়েরই আগ্রহ কৃষকের মুক্তির প্রশ্নে। করিম বলেছিলেন, ঋণসালিসী বোর্ডের মাধ্যমে ফজলুল হক কৃষককে ঋণের দাসত্ব থেকে মুক্তি দিয়েছেন। শুনে তাজউদ্দীন মন্তব্য করেছেন,

মুক্তি না ছাই করে গেছেন। কৃষকের মুখে দুধের বদলে চুষনি ঢুকিয়ে চুপ করিয়ে দিয়েছেন। যেখানে কৃষকরা বিদ্রোহী হয়ে উঠত তাদের অধিকার আদায়ে, আপাতত সান্তনা দিয়ে কৃষকের বারটা বাজিয়েছেন।

এমন উক্তিতে করিম চমকে উঠেছেন, বুঝতে পেরেছেন যে তাজউদ্দীন অন্যদের তুলনায় গভীরভাবে চিন্তা করতে অভ্যস্ত। তাঁর লক্ষ্য সংস্কার নয়, মৌলিক পরিবর্তন। ডা. করিমের সময় সময় মনে হতো যে তাজউদ্দীন তাঁদের সমবয়স্ক নন, অগ্রজ।

মওলানা ভাসানীর প্রতি আকর্ষণ সত্তেও তাজউদ্দীন প্রথমে আওয়ামী মুসলিম লীগে যোগ দেননি। স্মরণীয় যে তাজউদ্দীন ছাত্র রাজনীতিতে নয়, উৎসাহী ছিলেন জাতীয় রাজনীতিতে, যদিও ফজলুল হক মুসলিম হলে যে-নির্বাচন হতো তাতে প্রার্থী না হলেও সক্রিয়ভাবে অংশ নিতেন, এবং একবার আক্ষরিক অর্থেই নাওয়া-খাওয়া ভুলে একটানা সাতদিন গোসল না-করে নির্বাচনী কাজে ব্যস্ত ছিলেন, রাজনীতিসচেতনতার তাড়নাতে। ভাসানীর দলে যোগ না-দেয়ার একটি কারণ হতে পারে আওয়ামী লীগের ‘মুসলিম’ পরিচয়। তিনি এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক বন্ধুরা সবাই তখন অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির কথা ভাবছেন। দ্বিতীয় কারণ, সে-সময়ে আওয়ামী মুসলিম লীগে নেতৃস্থানীয় যাঁরা ছিলেন তাঁদের কারো কারো আচরণে ব্যক্তিগত উচ্চাভিলাষ প্রকাশ পাচ্ছিল বলে তাঁর অনুভব।

পিওপলস ফ্রিডম লীগ এগোয় নি, এরপরে ডেমোক্রেটিক ইউথ লীগ গঠনের একটি উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্তু কমরুদ্দিন আহমদ এর সঙ্গে যুক্ত থাকতে চান নি, কারণ তাঁর ধারণা হয়েছিল যে উদ্যোক্তারা প্রো-কমিউনিস্ট। পরবর্তীতে, ১৯৫১ সালে গঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ। সংগঠনটি গঠনের সিদ্ধান্ত বেরিয়ে আসে একটি যুব সম্মেলনের ভেতর থেকে। সরকারী বাধার কারণে এই সম্মেলন ঢাকায় হতে পারেনি; উদ্যোক্তারা তখন নদীর অপর পাড়ে জিঞ্জিরায় চলে যান, কিন্তু সেখানেও পুলিশী হস্তক্ষেপ ঘটে। তখন তাঁরা বুড়িগঙ্গায় চারটি নৌকায় বসে সম্মেলন করেন। কাকতালীয় অবশ্যই, তবু মিলটা বোধ করি তাৎপর্যহীন নয় যে চীনে কমিউনিস্টদের কার্যক্রমের শুরুর দিকে সাংহাই নগরীতে গোপন বৈঠক করবার সময় পুলিশ তাঁদের আস্তানাটি ঘিরে ফেলতে যাচ্ছে টের পেয়ে মাও সে তুঙ-ও তাঁর সহকর্মীদের নিয়ে বের হয়ে গিয়ে নৌকাতে বৈঠকের কাজ সম্পন্ন করেছিলেন। তাঁরা অবশ্য এর পরে আর শহরে ফেরেননি, যুবলীগের সদস্যদের পক্ষে না-ফিরে উপায় ছিল না।

যুবলীগে অলি আহাদ, তোয়াহা, তাজউদ্দীন-সবাই ছিলেন। বায়ান্নর আন্দোলনে সংগঠনটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু এটি রাজনৈতিক দল হিসাবে গড়ে ওঠে নি। না-ওঠার একাধিক কারণ ছিল। সংগঠন ও কর্মীদের সবাই ছিলেন তরুণ, সফল নেতৃত্ব দিতে পারেন এমন কেউ ছিলেন না, তদুপরি তাঁদের ভেতর মতাদর্শিক ঐক্যের বন্ধনটা যে দৃঢ় ছিল তাও নয়। অপরদিকে রাজনৈতিক দল হিসাবে আওয়ামী মুসলিম লীগ দৃশ্যমাণ ও শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। যুবলীগের প্রতিষ্ঠাকালীন সাধারণ সম্পাদক ছিলেন অলি আহাদ, তিনি লিখেছেন,

১৯৫১ সালে কারামুক্তির পর পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি আবদুল হামিদ খান ভাসানী সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক দেশবাসীকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করিবার নিমিত্ত সমগ্র দেশব্যাপী অবিরাম কর্মীসভা, জনসভা ইত্যাদি করিয়া যাইতেছিলেনমুসলিম লীগ মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমিন কোথাও ১৪৪ ধারা জারি করিয়া আবার কোথাও  গুন্ডামীর আশ্রয় গ্রহণ করিয়া আওয়ামী মুসলিম লীগের কর্মসূচি পালনে সর্বপ্রকার ব্যাঘাত সৃষ্টি করিতে থাকেকিন্তু জনতা মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে অবিচল আস্থা স্থাপন করিয়া ক্রমশঃ আওয়ামী মুসলিম লীগের পতাকাতলে কাতারবন্দী হইতে শুরু করে

অবশেষে ১৯৫৩ সালে তাজউদ্দীন আওয়ামী মুসলিম লীগে যোগ দিলেন। একই সময়ে অলি আহাদও যোগ দিয়েছেন। তাজউদ্দীন ওই বছরই ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হন। পরের বছর তিনি যুক্ত ফ্রন্টের মনোনয়ন পেয়ে ব্যবস্থাপক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হলেন। কয়েক মাস পরে ৯২-ক ধারা জারি হলে গ্রেফতার হন; বেরিয়ে এসে আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক ও সমাজসেবা সম্পাদকের দায়িত্ব নেন। ১৯৫৮-তে সামরিক শাসন জারি হলে আবার তাঁকে জেলে যেতে হয়; এবং পরের বছর মুক্তি পান। সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পরে ১৯৬৪ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে আওয়ামী লীগের পুনরুজ্জীবনে তাজউদ্দীনের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য; তিনি দলের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরের বছর পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিরোধী দলের প্রার্থীর পক্ষে প্রচারাভিযানে অংশ নেন। ১৯৬৬-তে লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী দলের যে-সম্মেলনে শেখ মুজিব ৬ দফার ঘোষণা দেন তাতে তাজউদ্দীন উপস্থিত ছিলেন। ৬-দফার রচনায় অনেকেই যুক্ত ছিলেন; তবে এর চূড়ান্ত রূপটি তাজউদ্দীনই দেন। ওই বছরই তিনি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হলেন। এরপরে তিনি গ্রেফতার হন, মুক্তি পান ১৯৬৯-এ, এবং রাওয়ালপিন্ডির গোলটেবিলে অংশ নেন। ১৯৭০-এর নির্বাচনে তিনি জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তারপর অসহযোগ আন্দোলন এবং একাত্তরের গণহত্যা। তাজউদ্দীন আহমদের তখনকার ভূমিকা আমাদের স্মৃতিতে এখনো উজ্জ্বল।

প্রশ্ন থাকে কেন তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দিলেন। (চলবে)

 

বিএনপি’র কাউন্সিল : এসব কী শুধুই কথার কথা

শাহাদত হোসেন বাচ্চু :

ক্ষমতা হারানোর সাত বছর পরে এবারের কাউন্সিলে বিএনপি প্রধানের বক্তব্য শুনে মনে হতে পারে তাঁর দিব্যদর্শন ঘটেছে। নাকি তিনি আর দশ কথার মত অনেকগুলি নীতি নির্ধারনী বিষয়ে বক্তব্য দিলেন, যার মর্মার্থ সম্পর্কে তাঁর বিশ্লেষণ শোনার অপেক্ষায় রইলাম। তাঁর ভাষণ লিখিয়েদের ধন্যবাদ, অনেকগুলি মৌলিক ও সাংবিধানিক সংস্কারের অবতারনা করা হয়েছে, নব্বইয়ের শীত মৌসুমে এরশাদ পতনের পর জোটগত ও দলগতভাবে যেগুলি বাস্তবায়নে তাঁরা অঙ্গীকারাবদ্ধ ছিলেন। কিন্তু একক ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে গিয়ে খালেদা বা হাসিনা সরকার বিকাশমান গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার বদলে দেশকে নিয়ে গেছেন উল্টো যাত্রায়।

কাউন্সিলে বক্তব্য দিতে গিয়ে খালেদা জিয়া বলেছেন, “প্রধানমন্ত্রীর একক নির্বাহী ক্ষমতা সংসদীয় সরকারের আবরনে স্বৈরাচারী একনায়কতান্ত্রিক শাসনের জন্ম দিয়েছে। এই অবস্থার অবসানকল্পে প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতার ক্ষেত্রে ভারসাম্য আনা হবে”।

এই বক্তব্য খালেদা জিয়ার! এটি অবিশ্বাস্য! এটি শুনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, এই বক্তব্য তিনি মনেপ্রানে বিশ্বাস বা ধারন করেন? যার দলে গণতন্ত্র, বিকেন্দ্রীকরণ এবং ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে এক হাজার একটা প্রশ্ন আছে তিনি বলছেন, ক্ষমতায় গেলে প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতায় ভারসাম্য আনা হবে। বিএনপির গঠনতন্ত্র যদ্দুর জেনেছি দলে চেয়ারপার্সন নিরঙ্কুশ, এবারের কাউন্সিলেও সেটি প্রমানিত। কাউন্সিল তাঁকে সর্বময় ক্ষমতা দিয়েছে, তিনি যেভাবে চান সেভাবেই কমিটি গঠিত হবে।

দলে এরকম অবিসংবাদিত ক্ষমতার অধিকারী কোন ব্যক্তি সরকারের প্রধান নির্বাহী ক্ষমতায় আসীন হলে তিনি হয়ে ওঠেন সর্বেসর্বা। আজকের সামগ্রিক সংকটের মূলে রয়েছে ব্যক্তির হাতে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা পূঞ্জিভূত হওয়া। গত সাত বছরে প্রধানমন্ত্রীর কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার বিষয়ে প্রতিদ্বদ্বীকে ইঙ্গিত করে যদি খালেদা জিয়ার এই দিব্যদর্শন ঘটে থাকে, তাহলে প্রথমেই দলের অভ্যন্তরে তাঁর সীমাহীন ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও ভারসাম্য এনে সততার পরীক্ষা দিতে হবে। প্রমান করতে হবে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় তিনি আসলেই বিকেন্দ্রীকরণ ও ভারসাম্য চান এবং ক্ষমতায় গেলে তিনি এভাবেই সেটি করতে চান।

কাউন্সিলের আগেই দলের চেয়ারপার্সন হিসেবে খালেদা জিয়া ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমানের পুণঃনির্বাচন প্রমান করেছে তাদের প্রতিপাদ্য “মুক্ত করবই গণতন্ত্র” কতটা অসাড়। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার জয়-জয়কারের এই দেশে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব দলে প্রতিদ্ব›দ্বীতাহীন, ক্ষমতায় থাকলে অপ্রতিদ্বন্দ্বী এ আর নতুন কিছু নয়। তবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন নিয়ে তাদের হা-হুতাশ এবং সমালোচনার নৈতিক অধিকার এর মধ্য দিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়বে। অপর  অপ্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ নেতা শেখ হাসিনা এতে খুশি, তিনি বলেছেন, “নাটকটা ভালই করেছে”।

গোটা কাউন্সিলের দৃশ্যমান একটি দৃশ্যমান পরিবর্তনের আশা করা হয়েছিল। ছয় বছর পরে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ভারমুক্ত হবেন। দলের পূর্ণ মহাসচিব হবেন। প্রয়াত: মান্নান ভূঁইয়ার পরে সার্বক্ষণিক রাজনীতিবিদ হিসেবে ফখরুল এই পদে বসবেন। সেটি ঝুলে থাকল চেয়ারপার্সনের ইচ্ছায়-অনিচ্ছার ওপর। আওয়ামী লীগ বা বিএনপির মত এক বা দ্বিতীয় নেতৃত্বের দলে সাধারন সম্পাদক কিংবা মহাসচিবের পদ কতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারে এটি কমবেশি সকলের জানা। তারপরেও ষাট দশকে তাজউদ্দিন আহমদ আওয়ামী লীগের নীতি-নির্ধারনে যধেষ্ট প্রভাব সৃষ্টি করেছিলেন। মান্নান ভূঁইয়াও স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেছিলেন।

এটি মধ্যপন্থী দল থেকে ডানপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়া বিএনপির চলমান বিপর্যয় কাটাতে পুরানো নেতৃত্বকেই বহাল রাখা হয়েছে। ২০০১-২০০৬ মেয়াদে ক্ষমতামত্ত বিএনপি কখনই ভাবেনি ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। সে সময়ে রাষ্ট্রের ভেতরের রাষ্ট্র হাওয়া ভবন এবং এর আর্শীবাদপুষ্টরা কাউকেই মানুষ মনে করতে রাজী ছিলেন না। ক্ষমতা হারিয়ে তারেক রহমানের লন্ডন চলে যাবার পরে বিএনপির দোর্দন্ড প্রতাপশালী নেতারা মামলা, জেল ও সরকারের রোষানল থেকে রক্ষা পাবার ক্রমশ: নিষ্ক্রিয় হয়ে যান। আসন্ন ঝড়ের পূর্বাভাসে উটপাখির মত বালুতে মুখ গুঁজে লুকিয়ে পড়েন।

বহু ধারা এবং মত-পথের সমন্বয়ে গঠিত দলটিতে এখন দক্ষিণপন্থীদের প্রভাব সুস্পষ্ট। সাবেক বামরা অনেকটা কোনঠাসা ছিলেন। তবে মির্জা ফখরুল মহাসচিব  হলে এই ধারাটি গা-ঝাড়া দিয়ে উঠতে পারে। ডানদের দৌরাত্মে এই দল সামগ্রিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন করে, প্রতিরোধ বা ক্ষমতাসীনদের পুন:নির্বাচনে বাধ্য না করতে পারায়। এটি আরো ত্বরান্বিত হয়, ২০১৫ সালের শুরুতে হরতাল-অবরোধের নামে চরম নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করায়। সরকার দেশে-বিদেশে এই সুযোগে বিএনপিকে সন্ত্রাসী ও জঙ্গীবাদী দল হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা চালায় এবং যৎকিঞ্চিৎ সাফল্য লাভ করে।

দল হিসেবে বিএনপির এই বিপর্যয়, দুর্গতির কারণ তাদের শীর্ষ পর্যায়ে এখনও অনুদঘাটিত। এটি অনুদঘাটিতই থেকে যাবে কারণ, একটি একক নেতৃত্বের পরিচালিত দলে কখনই প্রশংসা ছাড়া ব্যর্থতার মূল্যায়ন হয় না। ফলে জনসমর্থনপুষ্ট এই দল কেন ব্যর্থ হল, কঠিন দুঃসময়ে পতিত হল-এসব বিশ্লে¬ষণ কখনই হবে না। আগেই বলেছি, বহু ধারা ও মত-পথের এই দলকে সমন্বিত রাখতে পারে একমাত্র ক্ষমতা। দীর্ঘকাল ক্ষমতার বাইরে এই কাঠামোর একটি দলে যে যে দুর্গতি এবং দৈন্য হওয়ার কথা তার সবকিছুই এখন বিএনপির গোটা অবয়বে স্পষ্ট।

রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকার সময় জামায়াতের মত একটি অপরাধ প্রবণ দলের খপ্পরে পড়ার মত বৃহৎ ভুল, অক্ষমতা, অন্যায্যতা, অন্যায় সর্বোপরি রাজনৈতিক অপরিপক্কতার কারণে আজকের যে পরিস্থিতি-এর কোন ব্যাখ্যা বা মূল্যায়ন নেতা-কর্মীদের সামনে বিএনপি উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়নি। ২০০৯ ও ২০১৬ সালের কাউন্সিলে এর সকল দায় তারা চাপাতে চেয়েছে এক/এগারো সেনা সমর্থিত সরকার ও পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগ সরকারের ওপর। দল হিসেবে ইতিহাসের বিশেষ বিশেষ সময়ে ইতিবাচক ভূমিকা পালনে সামগ্রিক ব্যর্থতা উঠে আসেনি।

অনুদঘাটিত, অনির্ণেয় এসব ভুল ও অক্ষমতার পূনরাবৃত্তি অব্যাহত রেখেছে দলটি। দেশের রাজনীতিতে, দলের অভ্যন্তরে-কোন ক্ষেত্রেই চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হয়নি গত সাত বছরে কেন তারা একবার ঘুরে দাঁড়াতে পারলো না। এর অনিবার্যতায় সংঘবদ্ধ, সৃজনশীল রাজনৈতিক ধারাবাহিকতায় যেতে পারছে না দলটি। এই অচলাবস্থার মধ্যে বাধ্য-বাধকতার একটি কাউন্সিল করছে বিএনপি। যেন এই কাউন্সিল ছিল খালেদা জিয়া আর তারেক রহমানের বিনা প্রতিদ্ব›দ্বীতায় নির্বাচিত হওয়ার জন্য! দলের এমন পরিস্থিতিতে তারা কিভাবে আগামী গণতন্ত্রের সারথী হবে?

রাজনীতির একটি সন্ধিক্ষণে, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিচ্ছে। ক্ষমতাসীন দল ও প্রশাসন-পুলিশ সৃষ্ট প্রতিকূল পরিবেশে মাঠ পর্যায়ে আন্দোলন এবং নির্বাচনে অংশ নিয়ে দলের নামটি যারা টিকিয়ে রাখছেন, খালেদা জিয়া কাউন্সিলের আগে তাদের নিয়ে একদিনের জন্যও বসেননি। ভবিষ্যত ভাবনা নিয়ে তাদের বক্তব্য শোনেননি। মাঠ পর্যায়ে টিকে থাকার লড়াইয়ে প্রণোদনা যোগাতে পারেননি। বিএনপির জন্য আগামীর চ্যালেঞ্জ হবে, মাঠ পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের সাথে শীর্ষ নেতৃত্বের দুরত্ব লাঘব।

ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে বিএনপির একটি চটকদার শ্লোগান রয়েছে। চটকদার বলা হচ্ছে, কারণ দলটির অবয়বে কোথাও এই শ্লোগানের সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অতীত-বর্তমানে যেসব দলগুলো ছিল তাদের প্রত্যেকের ক্ষেত্রে এই কথা প্রযোজ্য। কাউন্সিলে বিএনপির শ্লোগান ছিল, “দুর্নীতি দু:শাসন হবেই শেষ, গণতন্ত্রে বাংলাদেশ”। সন্দেহ নেই, শ্লোগান হিসেবে এটি অসামান্য ও তাৎপর্যপূর্ণ। কিন্তু যে দলটির বিরুদ্ধে দুর্নীতি দুঃশাসন নিয়ে অভিযোগের অন্ত নেই, তার কোন ব্যাখ্যা-মীমাংসা ছাড়া এরকম শ্লোগান চটক-চমক সৃষ্টি করতে পারে।

বাংলাদেশের গণতন্ত্র চায় বিএনপি। এজন্য প্রথম প্রশ্নের জবাব দিতে হবে বিএনপিকে, দলে কি গণতন্ত্র চায় তারা? যে দলটির নেতৃত্বই উত্তরাধিকার সূত্রে নির্ধারিত, স্বামী-স্ত্রী, পিতা-পুত্র, কন্যা-জায়া-জননী সেখানে এই শ্লোগানের অসাড়ত্ব বুঝতে পন্ডিত হওয়া লাগে না। এবারের কাউন্সিল প্রকৃত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সচল রাখতে যোগ্য নেতৃত্ব গড়ে তোলার পথে যায়নি।  শীর্ষ নেতৃত্ব এখনও অপ্রতিদ্বন্দ্বী, মাইকে ঘোষণা হবে, হাত উঁচিয়ে সমর্থন ব্যক্ত হবে। অথচ দলটির গঠনতন্ত্রের বিধানঃ জাতীয় কাউন্সিলরদের সরাসরি ভোটে চেয়ারপার্সন নির্বাচিত হবেন।

ব্যক্তির হাতে ক্ষমতা নিরঙ্কুশ হয়েছিল ১৯৭২ সালের সংবিধানেই। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের সংবিধানে যে বাক্যটি যুক্ত হয়ে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা একচ্ছত্র করা হয়েছিল, বাহাত্তরের সংবিধানে সেই বাক্যের প্রেসিডেন্ট শব্দটি মুছে প্রধানমন্ত্রী বসিয়ে দেয়া হয়েছিল। এই বিষয়টি আওয়ামী লীগ কখনও স্বীকার করেনি। অপরপক্ষে বিএনপি পঞ্চম থেকে দ্বাদশ সংশোধনী পাস করা পর্যন্ত একনায়কতান্ত্রিকতা দুর করেনি। বরং প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কিভাবে আরো নিরঙ্কুশ করা যায়, সেই পথেই হেঁটেছে।

১৯৯১ সালে খালেদা জিয়ার সামনে এই সুযোগটি এসেছিল যখন দেশ রাষ্ট্রপতি শাসিত পদ্ধতি থেকে সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় ফিরছে। কিন্তু বিএনপি বাহাত্তরের সংবিধানের ৫৫ অনু্েচ্ছদ, যেখানে মন্ত্রীসভাকে নিঃস্ব করে  প্রধানমন্ত্রীকে সকল ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছিল, সেটি পুণরুজ্জীবিত করে ক্ষান্ত দেয়নি, দলত্যাগ সংক্রান্ত ৭০ অনুচ্ছেদও তারা আরো কঠোর করে (পঞ্চদশ সংশোধনীতে যেটি বাদ পড়েছে), যাতে প্রধানমন্ত্রীর আসন টলে না যায়। সে সময়ে জরুরী অবস্থা জারীতে এবং সংসদ ডাকা ও বাতিল করায় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিস্বাক্ষরের বিধান ছিল না, সেটিও যুক্ত করা হয়।

আওয়ামী লীগও এসব ক্ষেত্রে বিএনপিকে অনুসরণ করেছে এবং প্রধানমন্ত্রীকে সকল কর্তৃত্ব ও দলে তাঁর নিরঙ্কুশ প্রধান্য বজায় রেখেছে। সুতরাং বিএনপি নেতার বক্তব্য যে কথার কথা নয় সেটি প্রমান করতে অতি দ্রুত সংস্কার কমিটি করে সহসাই তার খসড়া জাতির সামনে উপস্থাপন করতে হবে। খালেদা জিয়া কাউন্সিলে শুধু হাসিনামুক্ত নির্বাচনের বিষয়টি স্পষ্ট করলেন, কিন্তু তিনি বা তাঁর দল নির্বাচনকালীন সরকার চায় (তারা অবশ্য এখন আর তত্তাবধায়ক সরকার বলছেন না, বলছেন নিরপেক্ষ সরকার), এর কোন পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা অজতক জাতির সামনে হাজির করতে পারলেন না।

 

বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় গণতন্ত্র শক্তিশালীকরণ

শাহাদত হোসেন বাচ্চু
২০১৬ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ‘‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায়” নির্বাচিত হওযার গণতন্ত্রকে আরো শক্তিশালী করতে যাচ্ছে। জাতীয় নির্বাচনে অপ্রতিদ্বন্দ্বী থাকার বিষয়টি অনেক আগে থেকেই রয়েছে। ২০১৪ সালে এসে সেটি রেকর্ড ছুঁয়েছিল। ৩’শ আসনে ১৫৪ টি, অর্ধেকেরও বেশি। এটি এখন সংক্রামিত হয়ে পড়েছে স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনেও। ২০১৫ সালে অনুষ্ঠিত ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচন, একই বছর শেষে পৌরসভা নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতার আলামত স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল এবং এখন সেটি পরিপূর্ণতা পেতে যাচ্ছে আগত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে।
যে সকল ভিত্তির ওপর ভর করে গণতন্ত্র বিকশিত হতে পারে তার একটি বড় পরিমাপক হচ্ছে অবাধ ও অংশগ্রহনমূলক নির্বাচন। গণতান্ত্রিক বা যে কোন ব্যবস্থায় জনগনের মতামত প্রদানের সবচেয়ে স্বীকৃত মাধ্যম নির্বাচন। এটিকে গণরায় বলা যেতে পারে। উপমহাদেশের ইতিহাসে যে নির্বাচনটিকে সবচেয়ে অবাধ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহনমূলক বলে অভিহিত করা হয়, সেটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল একটি সামরিক সরকারের অধীনে। ১৯৭০ সালে পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে দেয়া গণরায়ের সাথে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের সূচনা।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন এরকম কোন পরিবর্তন না ঘটালেও জনগনের সবচেয়ে কাছের প্রতিষ্ঠান হিসেবে উৎসবে মেতে ওঠার নির্বাচন। কিন্তু দলীয় মার্কার এই নির্বাচনে উৎসব-উৎসাহ সাধারন ভোটারের অন্তত: নেই। নির্বাচনে প্রথম ধাপে ৭৬০টি ইউনিয়ন পরিষদের ৬২টি এবং দ্বিতীয় ধাপে ৬৪৭টির ১৩টিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় নির্বাচিত হয়ে গেছেন। এটি সত্যিই অভূতপূর্ব, অশ্রুতপূর্ব। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দু’একটি সাধারন ব্যতিক্রম ছাড়া এরকম ঘটনা এর আগে কখনও ঘটেনি।
একতরফা, একদলীয় কিংবা একক-কয়েকটি জাতীয় নির্বাচনে কোন কোন রাজনৈতিক দলের বয়কটের কারণে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, এ অভিজ্ঞতা নতুন নয়। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশে এটি শুরু হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১ সালে পাক হানাদারদের ঘোষিত ১২ ও ১৩ ডিসেম্বরের নির্বাচনে, জাতীয় পরিষদের ৭৮টি ও প্রাদেশিক পরিষদের ৭৫টি আসনের ১০০টি ছিল প্রতিদ্বন্দ্বীতাহীন। অবশ্য ঐ নির্বাচনে নির্বাচিতরা কোনদিন পার্লামেন্টে বসার সুযোগ পায়নি। কারণ ঐ বছরের ১৬ ডিসেম্বর অভ্যূদয় ঘটে স্বাধীন বাংলাদেশের।
স্বাধীনতার পরে ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত ঘটনাবহুল নির্বাচনে ১১ জন, ১৯৭৯ সালে ১১ জন, ১৯৮৮ সালে ১৮ জন ও ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির একক নির্বাচনে ৪৯ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৮৬ সালে বিএনপি বর্জন করলেও এবং ১৯৯১, জুন ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৮ সালের নির্বাচনে কোন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বীতাহীন ছিলেন না। এক্ষেত্রে রেকর্ড করেছে ২০১৪ সালের নির্বাচন, এটি আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি নির্বাচন হলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় নির্বাচিত ১২২ জনকে পাওয়া যেত।
সুতরাং বাংলাদেশ এ যাবতকাল মেনে নিয়েছিল যে, জাতীয় নির্বাচন যদি একতরফা, একদলীয় হয় তাহলে ক্ষমতাসীনদের অর্ধেকেরও বেশি প্রতিদ্বন্দ্বীতাহীন থাকতে পারেন। সেখানে মোট ভোটারের অর্ধেকেরও বেশি অংশগ্রহন নাও থাকতে পারে। এমনকি ঐ নির্বাচনে গঠিত পার্লামেন্টে সরকার ও বিরোধী দল মিলে একাকার হয়ে যেতে পারে। কিন্তু গত পৌরসভা নির্বাচন থেকে জনগন এটিও দেখতে শুরু করেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনও একতরফা, একক ও প্রতিদ্বন্দ্বীতাহীন হতে চলেছে।
এই প্রথম রাজনৈতিক মনোনয়নের নির্বাচনে ১৭৪টি ইউনিয়নে দেশের একটি প্রধান দল বিএনপির কোন প্রার্থী নেই। এদিক থেকে টেক্কা দিয়েছে বাগেরহাটের মোল্লারহাট ও চিতলমারী উপজেলার ১৩ টি ইউনিয়ন। এখানে সব ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর বিপরীতে কাউকে প্রার্থী হতে দেয়া হয়নি। এমনকি আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরাও মনোনয়ন পত্র দাখিলের সুযোগ পায়নি। কিভাবে বিপক্ষ প্রার্থীদের বিরত রাখা হয়েছে, তার বিস্তারিত বিবরণ পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। প্রসঙ্গত: এই আসনের সংসদ সদস্য স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর চাচাতো ভাই শেখ হেলাল উদ্দিন।
নির্বাচন কমিশনের নিস্ক্রিয়তা ও নির্বিকারত্ব দেখার মত। হালে দু’একটি ক্ষেত্রে নড়েচড়ে বসার চেষ্টা করলেও হাজার হাজার ঘটনার মধ্যে তা কোন প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়নি। মাত্র কিছুকাল আগে অনুষ্ঠিত পৌরসভা নির্বাচনেও একই দশা হয়েছিল। মনোনয়ন পত্র জমা দিতে না পারার অজস্র ঘটনা, একের পর এক বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় ক্ষমতাসীন প্রার্থীদের নির্বাচিত হওয়াÑ কোন কিছুই আমলে নিচ্ছে না নির্বাচন কমিশন। এখনই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, এই নির্বাচন কি আরো একটি প্রহসনে পরিনত হতে চলেছে?
গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পেতে একটি বড় খুঁটি হচ্ছে, প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো। অবাধ নিরপেক্ষ, অংশগ্রহনমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সেরকম অবকাঠামো হচ্ছে নির্বাচন কমিশন। যে সব দেশে নির্বাচন কমিশন দুর্বল নেতৃত্ব, অযোগ্য ব্যবস্থাপনা ও দলীয় মনোভঙ্গির বাসনা পূরণের ক্ষেত্র হয়ে যায়, সেখানে জনআকাঙ্খা প্রতিফলনের উপায়গুলিও নি:শেষ হয়ে যায়। এ অবস্থায় নির্বাচন যতটা না গণতান্ত্রিক বিকাশের জন্য, তার চেয়ে বেশি কর্তৃত্ববাদী শাসনকে মহিমান্বিত করার জন্য। এজন্যই ২০১৪ থেকে গড়ে ওঠা নির্বাচনের সংস্কৃতি দেশকে ক্রমাগত পেছনের দিকে ঠেলছে।
আগেই বলেছি, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন এই দেশে বরাবরই উৎসাহ, উদ্দীপনা ও উৎসবের। এই নির্বাচনে ভোট দেয়া ও নিজের পছন্দমত প্রার্থী নির্বাচনে ভোটারদের আগ্রহ থাকে মাত্রা ছাড়ানো। আশির দশকে সামরিক শাসনামলে স্থানীয় সরকার নির্বাচন চর দখলের আকার ধারণ করলেও প্রতিদ্বন্দ্বীতা অন্তত: ছিল। ১৯৯১ সালের পরে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর পরোক্ষ মনোনয়ন ও সমর্থনে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনগুলিতে উৎসবের মেজাজ আবার ফিরে আসে। ভোটারদের উচ্ছাসিত অংশগ্রহনে নির্বাচন হয়ে দাঁড়িয়েছিল তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বীতার।
এবারেই প্রথম সরাসরি রাজনৈতিক মনোনয়নে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং হতে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের দাপট এবং প্রশাসন-পুলিশের পক্ষপাত দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। বিরোধী দলীয় প্রার্থী, এমনকি ক্ষমতাসীন দলের কথিত বিদ্রোহী প্রার্থীরাও এলাকাছাড়া। ভোটাররা আতঙ্কিত, ভোট দেবার আগ্রহ কমে যাচ্ছে এবং এটিও অনেকটা একক নির্বাচনের রূপ লাভ করতে যাচ্ছে।
এখন যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে, ক্ষমতাসীনরা ও নির্বাচন কমিশন মিলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় যে নির্বাচনী সংস্কৃতি গড়ে তুলতে চাচ্ছেন, সেটি কি চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হতে চলেছে? ২০১৪ সালের নির্বাচনে অর্ধেকেরও বেশি ভোটারের অংশগ্রহন ছিল না। গত পৌরসভা নির্বাচনে বিরোধী প্রার্থীদের মাঠে নামতে দেয়া হয়নি। আগত ইউপি নির্বাচনে ইতিমধ্যে ৭৯ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় নির্বাচিত। দুই উপজেলার একটি ইউনিয়নও বিরোধী দলীয় প্রার্থী নেই।
জনগনের ভাত ও ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ যে দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের দাবি করে, তাঁর আমলে সেই ভোটের অধিকার নির্বাচন কমিশন যাদুঘরে পাঠাতে চলেছে – সেটিই কি তাঁর এবং জনগনের অনিবার্য নিয়তি!

২০১৫ :: জনমনে আতংক উদ্বেগ আর জঙ্গীবাদের নতুন উত্থানের বছর

আমীর খসরু

বছরটি শুরু হয়েছিল রাজনৈতিক সংঘাতসহিংসতার মধ্যদিয়ে। কারণ ছিল এর আগের বছরের ৫ জানুয়ারি ভোটারবিহীন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রতিবাদকে কেন্দ্র করে। আর বছরটি শেষ হচ্ছে প্রথমবারের মতো দলীয় ভিত্তিতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার অন্যতম প্রতিষ্ঠান পৌর নির্বাচনকে ঘিরে উত্থাপিত নানা অনিয়ম, আচরণবিধি লংঘন এবং ছোটবড় নির্বাচনকেন্দ্রীক সহিংসতার মধ্যদিয়ে। বছরটি জুড়ে ছিল আগে থেকে শুরু হওয়া রাজনৈতিক ভারসাম্যহীনতার কারণে সৃষ্ট নানা বিপদ। আর ওই ভারসাম্যহীনতার কারণে রাজনৈতিক শূন্যতা গাঢ় হয়ে বড় সংকটের দৃশ্যমাণ উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। ওই কারণে বছরটিতে জঙ্গীবাদী কার্যক্রমের নতুন উত্থান ঘটে। আগের চেয়ে শক্তিমান হিসেবে আবির্ভূত হয় তারা এবং নতুন মাত্রায়। পুরো বছরটি জুড়ে রাজনৈতিক শূন্যতার যে ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে তা আগামীতে কমবে এমন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না, ক্রমবর্ধমান গণতন্ত্রহীন পরিস্থিতি ও কর্তৃত্ববাদীতার কারণে। বিস্তারিত »