Home » বিশেষ নিবন্ধ

বিশেষ নিবন্ধ

একই ঘটনা পুনরায় আর ঘটেনা

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

‘মনুষ্য ধর্ম’হারিয়ে যাচ্ছে। হারাচ্ছে রাজনৈতিক মর্যাদাবোধও। যে ‘রক্তপাতময়তা’ রাজনীতিকে বিভাজিত করেছে, পরস্পরকে ‘নিশ্চিহ্ন’ করার প্ররোচনা দিচ্ছে, তার মূল কারণ হচ্ছে, ন্যূনতম সুষ্ঠ একটি নির্বাচন ব্যবস্থা গড়ে না ওঠা। নির্বাচনের মাধ্যমে জনরায়ের প্রকৃত প্রতিফলনে প্রাতিষ্ঠানিকতা তো দুরের কথা, বিকাশমান কোন পথ তৈরী হয়নি। সবসময়ই ক্ষমতাসীনরা জনরায়কে মেনে নেয়াকে তাদের ‘অক্ষমতা এবং প্রতিপক্ষের ‘প্রতিশোধ’র আশংকায় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বাভাবিকত্বটুকুও আর অবশিষ্ট রাখেনি।

এক. সিইসি নুরুল হুদা আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছেন, ভোট সুষ্ঠ হবে। এর মাঝে ইসি মাহবুব তালুকদার ‘বাগড়া দিলেন একথা বলে যে, নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই। সিইসি জানালেন, ইসি মাহবুব ‘অসত্য’বলেছেন। জবাবে মাহবুব তালুকদার বলেন, একথা বলে সিইসি তার অস্তিত্বে আঘাত করেছেন। এসবের মধ্য দিয়ে নিট রেজাল্ট, নির্বাচন কমিশনের মতবিরোধ এখন প্রকাশ্য। তবে ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক কমিশনের ‘সংখ্যাগরিষ্ঠ’র মতামতই গ্রহনীয় বলে জানালেন। কিন্ত জনগণ উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছেন, পার্লামেন্ট এবং মন্ত্রীসভা বহাল রেখে যে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ আছে বলে দাবি করছেন, তা নিয়ে তাদের মতবিরোধ প্রকাশ্য।

আরও উদ্বেগের যে, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী দাবি করছেন যে, বিএনপি ভূয়া ব্যালট ছাপাচ্ছে। কর্মীদের তিনি কোথায় এবং কোন কোন ছাপাখানায় এসব ব্যালট ছাপানো হচ্ছে, কর্মীদের তিনি তা খুঁজে বের করতে বলেছেন। ভোটের দিন মুজিব কোট পরে ভোটকেন্দ্রে হামলার আশঙ্কা করছেন তিনি। সরকারের সর্বোচ্চ পদাধিকারীর এরকম আশঙ্কা এবং সন্দেহ নিশ্চয়ই তথ্যভিত্তিক। জনগণ এই সন্দেহের ভিত্তির যথার্থতা দেখতে চান – আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় কথিত ভুয়া ব্যালট উদ্ধার এবং জড়িতদের গ্রেপ্তার হওয়ার মধ্য দিয়ে।

দুই. কমজোরি গণতন্ত্র বা কর্তৃত্ববাদী শাসনে নির্বাচন সব দেশে সবকালে ‘যুদ্ধ’ হিসেবে বিবেচিত। এটি আসলে মাও সেতুং এর ভাষায় ‘রক্তপাতময় রাজনীতি’। ফলে এর মধ্যে মানবিকতার কোন স্থান নেই। সব নিয়ম, নীতি-নৈতিকতা ভঙ্গ করে জেতাটা হয়ে দাঁড়ায় একমাত্র লক্ষ্য। আর সেটি যে কোন মূল্যেই। ’ভোটযুদ্ধ’ জয়ের সাথে রাজনৈতিক দলগুলোর অস্তিত্বের প্রশ্নটিও জড়িয়ে যায়। নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন প্রাণঘাতী হয়ে উঠে জয়-পরাজয়ের দিকে হাঁটতে থাকে, অনিবার্য পরিনতি হিসেবে।

সারাদেশে নির্বাচন ক্রমাগত সহিংস রূপ ধারন করতে করতে অবশেষে প্রাণ সংহারী হয়ে উঠে। যারা নির্বাচনের কাজটি পরিচালনা করছেন বা দেখ-ভালের কাজ করছেন, তাদের জন্য চাপ বাড়ছে। সেটা কতটা বোঝার জন্য সবশেষ ঐক্যফ্রন্টের সাথে ইসি’র বৈঠক একটি প্রমান। সিইসি’র সাথে উত্তেজিত বাক-বিতন্ডার এক পর্যায়ে ঐক্যফ্রন্ট নেতৃবৃন্দ আলোচনা থেকে ওয়াক আউট করেন। অব্যবহিত পরে একজন কমিশনারের সংবাদ সম্মেলনে প্রদত্ত বক্তব্য প্রমান করে সুষ্ঠ নির্বাচন বিষয়ে কমিশনেই রয়েছে মতানৈক্য।

শক্তিশালী গণতন্ত্রে কর্তৃত্ববাদের স্থান নেই। ক্ষমতা সেখানে ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত নয়, বিকেন্দ্রীকৃত। সেখানে প্রতিষ্ঠানগুলির নিজস্ব শক্তি থাকে, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা থাকে এবং প্রয়োগটি দেখা যায় দায়িত্ব নির্বিঘ্ন করতে। বিশেষ করে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসমূহের মর্যাদা ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করে। এই প্রতিষ্ঠানিক শক্তি নির্বাচন পরিচালনাকারীদের এক ধরনের সুরক্ষা দেয় এবং গোটা বিষয়টি তারা ’রুলস অব বিজনেস ’ হিসেবে পরিচালনা করে থাকে। ফলে কারো মুখাপেক্ষী থাকতে হয়না।

কিন্তু কমজোরি গণতন্ত্রেও বিভিন্ন দেশে নির্বাচন পরিচালনাকারীরা তাকিয়ে থাকেন শক্তিমান বা ক্ষমতাবান রাজনৈতিক পক্ষগুলোর দিকেই। অহেতুক তারা ক্ষমতাবানদের বিরাগভাজন হতে চান না। গা বাঁচিয়ে  কিভাবে শক্তিমান পক্ষগুলোর পক্ষে নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে আসা যায়, সে কাজটিই পারঙ্গমতার সাথে তারা করে থাকেন। এই জায়গাটিতে তারা দৃষ্টিগ্রাহ্যরকম একপেশে এবং একদেশদর্শী।

বাংলাদেশ এ যাবতকাল পর্যন্ত যতগুলো নির্বাচন হয়েছে, সবগুলোর ক্ষেত্রে নির্বাচন পরিচালনাকারী হিসেবে সাংবিধানিকভাবে দায়িত্ব পালন করেছে নির্বাচন কমিশন। সংবিধান প্রদত্ত অভূতপূর্ব শক্তি এবং ক্ষমতার অধিকারী নির্বাচন কমিশন নিজ দায়িত্ব আজ অবধি স্বাধীনভাবে, সক্ষমতার সাথে পালন করতে পারেনি, বলা যেতে পারে করেনি।

ফলে ’স্বাধীন ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান’ বলে নির্বাচন কমিশনের কথা ফি-বছর জনগন শুনে আসছে। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারের ৫.৩ ধারায় বলা হয়েছিল,”নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচন পদ্ধতির চলমান সংস্কার অব্যাহত থাকবে…”। কিন্তু এটি অধরাই থেকে গেছে। অনেকটাই ’কাজীর গরু খাতায় আছে, গোয়ালে নেই’ বা কখনই ছিল না। ১৯৭৩ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত ১০টি সংসদ নির্বাচনে এটিই জাতি প্রত্যক্ষ করেছে। যে তিনটি নির্বাচনে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছিল, তারাও যেভাবে চেয়েছে কমিশন ঠিক সেভাবেই নির্বাচন পরিচালনা করেছে।

তিন. বর্তমান  নির্বাচন কমিশনও তার বাত্যয় নয়- জনগন এটি বিশ্বাস করেন। এখন পর্যন্ত কমিশনের রোজনামচা দেখে বলতেই হবে, তারা নির্বাচনটি অংশগ্রহনমূলক করতে চাচ্ছেন, কিন্তু সুষ্ঠ নয়। ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের বাইরে যারা শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারেন, এমন প্রার্থীদের ওপর নিয়মিত হামলার ঘটনা ঘটছে। কর্মীদের নামে মামলা ও গ্রেফতার চলছে। সবকিছু দেখে-শুনে, বিবেচনায় নিয়েই কি সিইসি বলেছেন তিনি আদতেই সুষ্ঠ নির্বাচন প্রত্যাশা করেন?

প্রশ্নটি গুঞ্জরিত হতে শুরু করেছে, অচিরেই পল্লবিত হবে। একটি ভাল নির্বাচন না হলে শেষতক কি হবে? দশম সংসদ নির্বাচনে একক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীনতার ওপর ভর করে গত পাঁচ বছরের দাপটে শাসন জনগন প্রত্যক্ষ করেছে। আগামীতেও ’উন্নয়ন জোয়ার’ সচল রাখতে যদি সেরকম ব্যবস্থাই ফিরে আসে, তাহলে আপত্তিই বা কোথায়? এই প্রশ্নের সহজ কোন উত্তর নেই। তবে অভিজ্ঞতা বলছে, অনেক দেশেই গণতান্ত্রিক বিধি-ব্যবস্থায় নির্বাচিত সরকারও কর্তৃত্ববাদী ও স্বৈরাচারী হয়ে উঠেছে।

কিন্তু এতে লাভ কার? নির্বাচন ব্যবস্থা ভঙ্গুর হলে দল বা শাসন ব্যবস্থা-কোথাওই গণতন্ত্র বিকশিত হয়না। ফলে ন্যায্যতা ও আইনের শাসন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। সম্ভবনা তৈরী হয় চরমপন্থা ও অরাজনৈতিক শক্তির উত্থানের। সেজন্য আজকে যে বিষয়টি নিয়ে অনেকেই আনন্দিত এবং উল্লাসিত, সেটি নিকট ভবিষ্যতেই যে নেতিবাচক হয়ে উঠবে না, এমন গ্যারান্টি কে দেবে? মনে রাখতে হবে, একই ঘটনা পুনরায় আর ঘটেনা। কার্ল মার্কস হেগেল’কে উদ্বৃত করতেন এভাবে, ”ইতিহাস পূনরাবৃত্তি ঘটায়। তবে প্রথমটি যদি হয় সত্যি ও সঠিক, তাহলে পরেরটি অবধারিতভাবে কৌতুকপ্রদ’অথবা এর বিপরীত।

 

একক কর্তৃত্ব ও আধিপত্যবিস্তারী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিকাশ

তোফাজ্জেল হোসেন মঞ্জু ::

বাংলাদেশে গত ১০ বছরে কৌশলগত একক কর্তৃত্ব ও  আধিপত্যবিস্তারী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিকাশ ঘটছে – যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সুশাসনকে অধিকতর চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে। কৌশলগত একক কর্তৃত্ব ও  আধিপত্যবিস্তারী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বলতে বুঝাতে চাচ্ছি, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মূল উপাদানগুলিকে এমনভাবে বিন্যাস ও উপকারভোগী করে রাখা যা দীর্ঘমেয়াদে  ক্ষমতায় টিকে থাকার শক্তিশালী সহায়ক হয়। একটু খেয়াল করলে বোঝা যাবে, এই অবস্থায় রাষ্ট্রের আইন, নির্বাহী ও বিচার বিভাগ একই কেন্দ্রের অধীন হয়ে পড়ে। ফলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্য ব্যবস্থা ক্ষয় হতে হতে ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির এই অবনতি ধারা আরো বিস্তৃত হয়েছে দু’ভাবে। এক. টার্গেটেড দমন পীড়ন, দ্বিতীয়. নাগরিকদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ সংকুচিত করে জনগণকে বিরাজনৈতিক করণ প্রক্রিয়ার অংশ করে ফেলা। সংসদ সদস্যদের স্থানীয় রাজনীতি-অর্থনীতি-প্রশাসন কেন্দ্র পরিনত করার মধ্যদিয়ে স্থানীয় সরকার আরো ক্ষমতাহীন হয়ে পড়েছে। এর ফলে জনগণ আরো বেশী সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে বিযুক্ত হয়ে পড়েছে। গত দশ বছরে জনগণ বা নাগরিক সবচেয়ে বেশী ক্ষমতাহীন হয়েছে। বর্তমান শাসকদলের রাজনীতি পূর্বের একদলীয় রাজনীতি থেকে কিছুটা ভিন্ন। শাসকদল আরো কৌশলগতভাবে দ্বিদলীয় ব্যবস্থা রাখতে চাচ্ছে। তারা সিনেমার হিরোদের মত কোন প্রতিযোগিতা বা যুদ্ধে পরাজিত হতে চায় না। পরাজিত হলেও পছন্দ অনুযায়ী পরাজিত হতে চায় । বিরোধী পক্ষ থাকবে দু’ভাবে; এক. জাতীয় পার্টির মতো ‘পোষমানা গৃহপালিত’ দল এবং দুই. বিএনপি ও জামায়তের মতো দমিত -অবরুদ্ধ ভিলেন হিসেবে। বর্তমানে শাসকদল সত্যিকার বিরোধী দল হিসেবে চাচ্ছে ভিলেনদেরকে- বিএনপি, জামায়াতকে। এখন বিরোধী বিএনপি, এই দ্বিদলীয় ব্যবস্থায় ভোটের মাধ্যমে এক নম্বর দল হতে পারবে কি?

শাসকদল জানে বিএনপির এই নির্বাচন খেলায় যথেষ্ট ঝুঁকি আছে। তবু সেই ঝুঁকি মেনে নিয়েছে। একথা মনে রাখতে হবে বিএনপি ২০১৪  সালে ভোটের মাধ্যমে শাসকদলের হাত থেকে ক্ষমতা নেয়া কঠিন মনে করেছিল। কারণ শাসকদলের নয়, তারা নির্বাচন করতে চেয়েছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। শেষ পর্যন্ত বিএনপি রাস্তার আন্দোলন দিয়ে  তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের লক্ষ্য অর্জন করতে  পারেনি। এখানে অনেকে বলেন, বিএনপির তুলনামূলক সুবিধা ভোটযুদ্ধে রাস্তার আন্দোলনে নয়। এটাও সত্য নয় কারণ খালেদা জিয়ার বিএনপি’র উত্থান এরশাদ বিরোধী রাস্তার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। কাজেই বিএনপি আন্দোলনে দূর্বল এই যুক্তিতে ২০১৪-এ রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি, এটা বলা সম্পূর্ণভাবে সঠিক নয়। বিএনপি জোট ২০১৪ আন্দোলন লক্ষ্য অর্জন করতে না পারা  নিয়ে নানা মুনির নানা মত রয়েছে। বিএনপি লক্ষ্য অর্জন না করা ছবির একটা দিক মাত্র, অন্যদিক হচ্ছে শাসকদলের আন্দোলন দমনে ‘‘সফলতা’’। গত ৫ বছর শাসনকে স্বাভাবিক করা মেনে সেবার পরিস্থিতি তৈরী করা। ২০১৪ থেকে ২০১৮ পর্ব বিবেচনায় বর্তমান ভোটযুদ্ধের পটভূমি তৈরী করেছে। এ পর্ব নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে বিস্তর মতভেদ রয়েছে; কেউ কেউ বলেছেন ভারতের কৌশলগত অবস্থান ২০১৪ এর জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানে সহায়তাই শাসকদলকে আন্দোলন দমনে শক্তি ও সাহস যুগিয়েছিল। কেউ কেউ বলেন বিএনপি আন্দোলন কৌশলই জনগণ গ্রহণ করে নাই। অবশ্য বিএনপির পক্ষ থেকে পূর্ণ কোন পর্যালোচনা উপস্থাপন করা হয়নি। তবে বর্তমান পরিস্থিতি উদ্ভবের পিছনে পুরোনো অনেকগুলো রাজনৈতিক পূর্ব অনুমান ভুল প্রমাণিত হয়েছে, এক. ভোটার বিহীন নির্বাচনকে আন্তজার্তিক ও পশ্চিমাদের চাপে পূর্ণ ৫ বছর আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় থাকতে পারবেন- মধ্যবর্তী নির্বাচন দিতে হবে। দ্বিতীয়ঃ শাসক দলের দমন-পীড়ন-দূনীর্তির কারণে বিপুল জনরোষ তৈরী হবে, ক্ষোভে বিক্ষোভে মানুষ রাস্তায় নেমে আসবে; বিএনপির এই অনুমান এটা ভুল প্রমানিত হয়েছে। বিরোধীরা যেভাবে জনপ্রিয়হীনতার কথা বলেন তাও কোন সমীক্ষা দ্বারা প্রমানিত হয়নি। জনপ্রিয়তা বর্তমান সময়ে এখন খুবই অষ্পস্ট ধারণায় পরিনত হয়েছে, এমনকি ভোটের জয় পরাজয় দিয়ে যা প্রমান হয়, তাও যথেষ্ট নয়। তবে একটা কথা বলা যায়, শাসকদল নড়েবড়ে নয় যথেষ্ট শক্তিশালী- একক কর্তৃত্ব ও  আধিপত্যবিস্তারী ভূমিকার জন্য। বাংলাদেশে প্রথাগত রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য শক্তিশালী রাজনৈতিক দল ও শাসকের পিছনে জনগণ জড়ো হওয়ার প্রবণতা রয়েছে। এ শক্তির পরিচয় অন্তত তিনটি বিচার প্রক্রিয়া সমাপ্ত করে দিয়েছে। প্রথমতঃ ১৫ ই আগষ্ট হত্যাকান্ডের বিচার, দ্বিতীয়তঃ যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়া, তৃতীয়তঃ ২১ আগষ্টের বিচার প্রক্রিয়া। এ তিনটি বিচার শাসকদলের রাজনৈতিক স্কোর কার্ডকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। অন্যদিকে বিএনপির সমর্থনের অন্যতম কারণ হতে পারে ক্ষমতাসীনদের ব্যপারে ক্ষমতাসীনতার ক্রমাগত অসুন্তষ্টি । তবে একটা বিষয় ষ্পষ্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন ও ক্ষমতা বদল এখন সরল-রৈখিক নয়, পূর্বের অনেক নির্দেশক এখন অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি হলেই সরকারের জনপ্রিয়তায় ধস নামবে সেরকম পরিস্থিতি নাই। রাজনৈতিক প্যারাডাইম সিফট হয়েছে। আর সেটা হয়েছে একক কর্তৃত্ব ও  আধিপত্যবিস্তারী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার উন্মোচনের মধ্য দিয়ে, যদিও রাষ্ট্রের মধ্যেই সবসময় আধিপত্যবিস্তারী ক্ষমতা থাকে। বর্তমান শাসকদল সেই ক্ষমতাকে জাগিয়ে তুলছে এবং দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করছে। গত ১০ বছরে রাজনৈতিক প্যারাডাইম সিফট পরির্তনের কথা বিস্তারিত আলোচনার দাবী রাখে।

‘অনিশ্চয়তা, ভয়ভীতি সহিংসতার বিরুদ্ধে জনগণের শক্তি গড়ে উঠুক’

নির্বাচনে জনগণের ঢল নামুক । ভোটকেন্দ্র হোক ভোটারের

নাগরিকদের পক্ষে আমরা নামে একটি নাগরিক সংগঠনের সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্য-

গণতান্ত্রিক সমাজ এবং জবাবদিহিতামূলক রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার অন্যতম পূর্বশর্ত হলো সুষ্ঠু নির্বাচন। বিশ্বের বহুদেশে শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলেও বাংলাদেশে তা এখনও একটি প্রায় অসম্ভব প্রত্যাশা। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘনিয়ে আসছে, কিন্তু আসন্ন নির্বাচন কেমন হবে, আদৌ শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হবে কিনা কিংবা তা সুষ্ঠু ও অবাধ হবে কিনাজনমনে তা নিয়ে বিরাজ করছে প্রবল সংশয় এবং অবিশ্বাস। উৎসবের পরিবর্তে আতঙ্ক আর উদ্বেগ ঘিরে রেখেছে মানুষকে।

২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচনের মধ্যদিয়ে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসীন হয়েছিল। এর আগেও বাংলাদেশ এরকম ভোটারবিহীন অগ্রহণযোগ্য নির্বাচন দেখেছে আরও দুবার: ১৯৮৮ সালে, এরশাদ শাসনামলে এবং ১৯৯৬ সালে বিএনপি আমলে। তবে পার্থক্য হলো এই যে, ১৯৮৮ ও ১৯৯৬ এর (১৫ই ফেব্রুয়ারি) নির্বাচনে নির্বাচিত সংসদ ক্ষণস্থায়ী হলেও বর্তমান সংসদ তার মেয়াদ পূর্ণ করেছে।

নানা প্রতিকূলতা এবং অনিশ্চয়তার মধ্যেও সকল দল এবারের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করবার পথে একটি ভালো খবর। কিন্তু নির্বাচনী প্রচার শুরু হবার পর থেকে প্রায় প্রতিদিনই ক্ষমতাসীন দল ও জোটের বাইরে বিভিন্ন দল ও জোটের প্রার্থীরা হামলা, মামলা ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন। নিকট অতীতে নাগরিকের মতপ্রকাশের অধিকারকে হরণ করা হয়েছে, ভিন্নমতের কণ্ঠ রোধ করা হয়েছে, মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে দমন করা হয়েছে, জনগণের ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় আড়িপাতা হয়েছে এবং প্রোপাগান্ডার ঢংয়ে তাকে মিডিয়াতে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে, মতপ্রকাশ ও স্বাধীন সাংবাদিকতার পথ রুদ্ধ করবার জন্য ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ বিভিন্ন আইনী ও বেআইনী পথ গ্রহণ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে ভয়ের শাসন। ক্ষেত্রবিশেষে এমন দমনপীড়নের নজির কুখ্যাত সামরিক শাসনামলেও বাংলাদেশে কমই দেখা গেছে। যখন একটা সমাজে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা একরকম হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে, তখনই আমরা উপলব্ধি করি, কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা জারি থাকাটা কতোটা মূল্যবান। এইরকম একটা পরিস্থিতিতে আমরা নির্বাচনের জন্য অপেক্ষা করছি।

আমরা জানি যে, নির্বাচনের মধ্য দিয়ে কেবল ক্ষমতার পালাবদল সম্পন্ন হলেই তাতে জনগণের সত্যিকারের মুক্তি আসবে এমন নয়। নব্বইয়ের গণআন্দোলন পরবর্তী বাংলাদেশ তার সাক্ষী হয়ে আছে। চোরাই টাকা, পেশী শক্তি আর মাস্তানতন্ত্রের কাছে, দেশি বিদেশি লুটেরা শক্তির কাছে নতজানু দলের শাসন তথা রাজনীতির দুর্বৃত্তায়নের অবসান যতদিন না ঘটবে, ততদিন জনগণের প্রান্তিক অবস্থার কোনো বদল হবেনা। সে অর্থে আসন্ন নির্বাচন আমাদের জন্য আশু কোনো সুদিনের বার্তা বয়ে আনবে এতোটা প্রত্যাশা করবার কোনো কারণ নেই। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে জবাবদিহিতার উর্ধ্বে থাকা, জনমতের তোয়াক্কা না করা রাজনীতিবিদরা অন্তত একবার জনগণের সামনে এসে দাঁড়াক সেটা এই মূহুর্তে দেশের সকল মানুষের ন্যূনতম চাওয়া।

একথা সত্য যে, একটানা একদলের শাসনের অধীনে থাকতে থাকতে, দমনপীড়ন ও ভয়ের রাজত্বে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে গিয়ে জনমানুষের আশাবাদের জায়গাটা ক্রমশঃ সঙ্কুচিত হয়েছে। সরকার মুখে যা-ই বলুক না কেন, জনগণের একটা বড় অংশের মধ্যে এই অবিশ্বাস খুঁটি গেঁড়ে বসেছে যে নির্বাচনটি সরকারের সাজানো ছক অনুযায়ী-ই হবে। তাঁরা এও আশঙ্কা করেন যে, এই সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত নানা নির্বাচনের মতো এখানেও তাঁদের ভোটটি অন্য কেউ দিয়ে দেবে। নির্বাচনের দিন যতোই ঘনিয়ে আসছে এইসব আশঙ্কা ক্রমশঃ জোরদার হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, ভূমিকা, সরকারের মন্ত্রী, দলীয় নেতাদের কথাবার্তা অনিশ্চয়তার বাতাবরণকে লঘু করেনা, বরং ভীতি আরো বাড়ে। মিডিয়াতে খবর এলো যে প্রধানমন্ত্রী রিটার্নিং অফিসারদেরকে ডেকে কথা বলেছেন। টেলিভিশনে ‘উন্নয়ন’ কার্যক্রমের বিজ্ঞাপন প্রচারিত হচ্ছে সকাল-বিকাল। অন্যদিকে সরকারী দল/জোটের বাইরে বিভিন্নপ্রার্থীর প্রচারকাজে পুলিশ ও সন্ত্রাসীদের বাধা, হামলা, ভয়ভীতি প্রদর্শনের খবর পাচ্ছি, পোস্টার ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে, ফেস্টুনে আগুন দেয়া হয়েছে। নির্বাচনী প্রচার শুরুর মুখেই সংঘটিত সহিংসতায় প্রাণহানীর খবরে আমরা যুগপৎ শঙ্কিত এবং মর্মাহত হয়েছি। এসবকিছু দেখে শুনে এই ধারণাই মানুষের মনে পোক্ত হয় যে নির্বাচন কমিশন সংবিধানের কাছে নয় সরকারের কাছেই অধিকতর দায়বদ্ধ; কমিশনাররা স্বাধীনভাবে কাজ না করে অনেকক্ষেত্রেই ক্ষমতাসীনদের আজ্ঞাবাহীর মতো আচরণ করছেন। এমন পরিস্থিতিতে মানুষ সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যাপারে সন্দিহান হবে, এটাই স্বাভাবিক। বিরাজমান বাস্তবতায় এটা মনে করবার যথেষ্ট কারণ আছে যে নির্বাচনে প্রতিদ্ব›দ্বীদলগুলোর জন্য ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরির কথাটা একটা ফাঁকাবুলিতে পর্যবসিত হয়েছে।

এমতাবস্থায় বাংলাদেশের নাগরিকদের পক্ষ থেকে আমরা কিছু জরুরি দাবি সুস্পষ্টভাবে উপস্থিত করা দায়িত্ব বলে মনে করছি। এগুলো হলো :-

১.       নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচন আয়োজনের অবশিষ্ট সময়টুকুতে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে; নির্বাচনের কাজে সম্পৃক্ত প্রশাসন যাতে করে নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে;

২.       স্বাধীনভাবে দেশি এবং বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকদের যথাযথ ভূমিকা পালন করতে দিতে হবে;

৩.       হামলা, মামলা, ভয়ভীতি প্রদর্শন, সহিংসতা বন্ধ করতে হবে। এসবে জড়িত ব্যক্তি/গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সক্রিয় ব্যবস্থা নিতে হবে। অবিলম্বে হয়রানিমূলক মামলা দায়ের ও ধরপাকড় বন্ধ করতে হবে, হয়রানিমূলক মামলায় গ্রেফতারকৃতদের এই মুহূর্তে মুক্তি দিতে হবে;

৪.       সকল প্রকার যোগাযোগে বাধা সৃষ্টির বদলে তাকে উন্মুক্ত করে দিতে হবে; এবং

৫.       নির্বাচন কেন্দ্র করে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু এবং প্রান্তিকজনগোষ্ঠীর মানুষদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে; তাদেরকে ভয়-ভীতি প্রদর্শনকারী এবং তাদের ওপরে হামলাকারীদেরকে তাৎক্ষণিকভাবে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।

আমরা মনে করি অন্তত এই ব্যবস্থাগুলো নেয়া গেলেই কেবল গুজব, ধোঁয়াশা কিংবা ষড়যন্ত্রের সম্ভাবনাকে নির্মূল করা সম্ভব হবে। আমরা আশা করি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের লক্ষ্যে কমিশন এবং সরকার এই পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করবে।

সরকার বরাবরই দাবি করেছেন তাঁদের নেতৃত্বে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। বিরোধীরা দাবি করেছেন বর্তমান সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। তাই সরকারের দাবি প্রতিষ্ঠার জন্য সরকার ও তার সমর্থকদের দায়িত্ব ভয়মুক্ত পরিবেশে মানুষ যাতে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

জনগণ দীর্ঘদিন পরে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেয়েছেন। শঙ্কা আছে, আছে অনিশ্চয়তা, কিন্তু আপনার আমার মতো সকল নাগরিকের কর্তব্য হলো সকল শঙ্কাকে দূরে সরিয়ে ভোটকেন্দ্রে হাজির হওয়া। চোরাই টাকা এবং পেশী শক্তির দাপট, ব্যক্তি, পরিবার এবং গোষ্ঠীতন্ত্রের করাল থাবা থেকে আমরা যদি আগামীর বাংলাদেশকে রক্ষা করতে চাই, যদি আমরা রাষ্ট্রের তথা জনগণের প্রতিষ্ঠানগুলোকে দল/গোষ্ঠীর হাত থেকে অবমুক্ত করে জনতার কাছে ফিরিয়ে দিতে চাই, তাহলে এই নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করা বাদে অন্য কোনো বিকল্প এই মুহূর্তে আমাদের হাতে নেই। আমাদের প্রতিজ্ঞা হোক: আমার ভোট আমিই দেবো, জনবিরোধী লুটেরা এবং রাজনৈতিক দুর্বৃত্তদের হাতে আমরা আমাদের আকাঙ্খার বাংলাদেশকে তুলে দেবো না।

আগামী ৩০শে ডিসেম্বরযেমন সরকার ও সকল দলের পরীক্ষা, তেমনি জনগণের জন্যও পরীক্ষা। সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে  না পারলে বাংলাদেশ এক মহাবিপর্যয়ে পতিত হবে। সরকার ও নির্বাচন কমিশন যথাযথ দায়িত্ব পালন করুক। আর ভোটকেন্দ্রগুলোতে জনতার ঢল নামুক; জনগণের শক্তিতেই বাংলাদেশ রক্ষা পাক, ভোটের অতন্দ্রপ্রহরী হয়ে জনগণ সকল শঙ্কা, অনিশ্চয়তা ও সহিংসতা থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করুক। এই চরম অনিশ্চয়তাকালে দেশবাসীর কাছে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

নাগরিকদের পক্ষে আমরা’র পক্ষে- অধ্যাপক আহমেদ কামাল, অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, শাহদীন মালিক, শহিদুল আলম,  অধ্যাপক গীতিআরা নাসরীন, নূরুল কবীর, শিরীন হক, অধ্যাপক সি আর আবরার, অধ্যাপক সাঈদ ফেরদৌস, ব্যারিস্টার সারা হোসেন, ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া, অমল আকাশ, জাকির হোসেন, অধ্যাপক মির্জা তাসলিমা সুলতানা, তাসলিমা আক্তার, পার্সা সাঞ্জানা সাজিদ, শহিদুল ইসলাম সবুজ, কামরুল হাসান, কৃষ্ণকলি ইসলাম, নাসরিন সিরাজ অ্যানি, বীথি ঘোষ, ড. রুশাদ ফরিদী, মেহজাবীন রহমান নাভা,  ড. সামিনা লুৎফা, ড. মোঃ তাঞ্জীমউদ্দিন খান , মাহতাব উদ্দিন আহমেদ, সায়দিয়া গুলরুখ, অরূপ রাহী, রায়হান রাইন, পারভীন জলি, বাকী বিল্লাহ, লাকী আক্তার, ওমর তারেক চৌধুরী, রেহনুমা আহমেদ।

ভোটটি দিতে পারা না পারার শঙ্কা-উদ্বেগ

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

মাও সে তুং যেমনটি বলেছিলেন-“যুদ্ধ হচ্ছে রক্তপাতময় রাজনীতি, আর রাজনীতি হচ্ছে রক্তপাতহীন যুদ্ধ”– সে বিবেচনায় গত সাতচল্লিশ বছরই কী কাটলো যুদ্ধের মধ্যে? কারন কি এই যে, গণতান্ত্রিক চরিত্র হারিয়ে ফেললে রাষ্ট্রের চালিকাশক্তি রাজনীতি আর নাগরিকদের মিত্র থাকে না? বিশেষ করে দুর্বল নাগরিকদের সাথে তার সম্পর্কটা হয়ে দাঁড়ায় সরাসরি শত্রুতার। সেজন্যই রাজনীতিতে কেবল অভিগম্যতা সেই সব নাগরিকদের বা পরিবারের, যারা সবল অর্থে-বিত্তে ও বংশ মর্যাদায়। দুর্বলরা কেবলই রক্তপাতময়তার বলি।

এক. বিজয়ের মাস এবং শীতের আমেজ- সব ছাপিয়ে উঠেছে একাদশ সংসদ নির্বাচন। সর্বত্র আলোচনার বিষয় এখন একটি। খানিকটা আশা-আশঙ্কা অথবা নিস্পৃহতার দোলাচল। নির্বাচন হবে? হলে সুষ্ঠ হবে? জনমনে এই গুঞ্জরণ ও ইতস্তত: বিক্ষিপ্ত আলোচনা ক্রমশ আকার নিচ্ছে। কারন হচ্ছে, অতীত তিক্ত এবং রক্তাক্ত অভিজ্ঞতা। সাতচল্লিশ বয়সী বাংলাদেশের রাজনীতি, নির্বাচন দু’একটি ব্যতিক্রম বাদে সারাটা কাল জুড়ে ছিল রক্তপাতময়-সহিংস এবং নিয়ন্ত্রিত।

জনগনের অভিজ্ঞতা বলছে, কোন একটি রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় যখন জাতীয় নির্বাচন হয়, এই দেশে অমন নির্বাচন কখনই সুষ্ঠ হয় না। অতীতে কখনও হয়নি। সামরিক সরকারগুলোর আমলে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলি ছিল চরম প্রহসন ও সামরিক স্বৈরাচারের অবৈধ ক্ষমতা দখলকে জায়েজ করার মহড়া। ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে নিশ্চিত বিজয়ের মুখে আওয়ামী লীগ খন্দকার মোশতাকসহ কয়েকজন নেতাকে জেতাতে নিজেরাই নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলে, যার ছিল সূদুরপ্রসারী প্রতিক্রিয়া।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়ন পত্র দাখিল থেকে শুরু করে প্রচারনাকালে ইতিমধ্যে খুন হয়েছে অনধিক ১০ জন। কোন দলের সেটি বড় প্রশ্ন নয়, তারা সবাই আদম সন্তান, কারো বাবা, কারো স্বামী। এই হানাহানির মূল কারন হচ্ছে, নির্বাচনী মাঠটি মোটেই সমতল নয়। ক্ষমতাসীন দলের জন্য যতটা মসৃন, বিরোধী দলের জন্য ততটাই এবড়ো-থেবড়ো। এজন্য বড় দুই দল বা জোটের প্রার্থীরা নির্বাচনী প্রচারে নেমেই হয় প্রতিপক্ষের হামলার শিকার হচ্ছেন না হয় হামলা করছেন, ক্রমশ: হয়ে উঠছেন সহিংস।

হামলায় শিকার হওয়ার ক্ষেত্রে বিরোধী প্রার্থী- সমর্থকরা এগিয়ে। তাই বলে ক্ষমতাসীনরা এর শিকার হচ্ছেন তা কিন্তু নয়। মোট কথা একটি সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে দেশজুড়ে। জাতীয় সংসদ বহাল, এমপি পদে বহাল থেকে এক দলের প্রার্থীরা নির্বাচন করছেন, অন্যদিকে রয়েছেন মামলার বোঝায় ন্যূব্জ ও তাড়া খাওয়া প্রার্থীরা। তাদের জন্য মাঠটি অবতল। যেমনটি ঘটেছে গত বুধবার, নির্বাচনী প্রচারকালে একজন প্রার্থীকে পূর্বাপর মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে। এই সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি অব্যাহত থাকছে।

দুই. এহেন পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশন ‘বিব্রত’ ও ‘মর্মাহত’। খোদ সিইসি সেটি প্রকাশ করেছেন। বোঝাই যাচ্ছে, কোথায় গিয়ে ঠেকলে তাঁকে ‘বিব্রত’ ও ‘মর্মাহত’ হতে হচ্ছে। এর আগে আমরা আদালতকে ‘বিব্রত’ হতে দেখেছি। সেক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতি ব্যবস্থা নিয়ে থাকেন, মামলাটি অন্য আদালতে স্থানান্তর করে। কিন্তু সিইসি’র ‘বিব্রত’ হওয়া নিয়ে কি হবে? তিনি শুধু ‘বিব্রত’ হয়েই থাকবেন নাকি রেফারীর ভূমিকায় শক্ত অবস্থান নিয়ে ‘হলুদ কার্ড’ এবং ‘লাল কার্ড’ ব্যবহার করা শুরু করবেন? অথবা বিব্রত হবেন এবং নিরপেক্ষতার নামে পক্ষাবলম্বন করবেন? তাদের এই সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে নির্বাচনী পরিবেশ এবং সুষ্ঠ নির্বাচন।

নির্বাচনী মাঠ সমতল হবে- সে সম্ভাবনা প্রায় নেই। রাষ্ট্রীয় মেশিনারিজ সরকারের অনুকূলেই থাকবে-জনমনের এই ধারনা কমিশন দুর করতে সক্ষম হবেন কী ? সম্ভাবনা ক্ষীণ। নির্বাচন কমিশন সংবিধান প্রদত্ত নিরঙ্কুশ ক্ষমতাবলে সুষ্ঠ নির্বাচন অনুষ্ঠানে কতটা সাহসী হতে পারবেন, সেটি দেখার জন্যও কি হাতে সময় আছে? বিগত ইউপি নির্বাচনে দেশ দেখেছে হত্যাকান্ড, সন্ত্রাস ও লাগামহীন জাল ভোট। তার আগের উপজেলা নির্বাচন ! সাম্প্রতিককালে অনুষ্ঠিত সিটি নির্বাচন নিয়েও অভিযোগ রয়েছে।

নির্বাচন কমিশনকে এসব বিষয়ে কার্যকর কোন ব্যবস্থা নিতে জনগন কখনই দেখেনি। এমনকি সক্রিয় হতেও না। বরং ধামাচাপা দিতে অতীতকালের ধারাবাহিক রেকর্ডটি বাজিয়েছে-“দু’একটি ঘটনা বাদে নির্বাচন মোটামুটি অবাধ, সুষ্ঠ ও গ্রহনযোগ্য হয়েছে”। মাত্র ক’দিন আগে অনুষ্ঠিত সিটি কর্পোরেশনসমূহের নির্বাচন নিয়ে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়টিও ধামাচাপা দেয়া হয়েছে পুরোনো কায়দাই। এর ফলে সাধারন ভোটাররা সবচেয়ে বেশি আশঙ্কিত এটা ভেবে যে,  তার ভোটটি দিতে পারবেন তো ?

এবারের জাতীয় নির্বাচনের শুরুতেই অন্য সব নির্বাচনের চেয়ে আরেকরকম সাংঘর্ষিক অবস্থা বিরাজমান ছিল। অন্যদলের চেয়ে নিজ দলের ভেতরকার সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা ছিল বেশি। সেটি দুই বড় দলের মনোনয়ন বঞ্চিতদের মধ্যে ঘটেছে এবং নিহত হয়েছে আধা ডজন দলীয় নেতা-কর্মী। একটি দলের চেয়ারপার্সনের অফিস ভাংচুর হয়েছে। নেতা-কর্মীরা অবরুদ্ধ করেছে দলের মহাসচিবকে। এলাকায় কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে দেয়া প্রার্থীকে ঘোষণা করেছে অবাঞ্ছিত। এসবই নির্বাচনী শঙ্কায় যোগ করছে নতুন মাত্রা।

দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন, দেশী পর্যবেক্ষকদের বিষয়ে আস্থাহীনতা এবং কমিশনের প্রতি ধোঁয়াশা- অদ্ভুত এক পরিস্থিতি তৈরী করছে। জনগনের বিশ্বাস প্রায় উঠে যাচ্ছে যে, নির্বাচন সুষ্ঠ হবে। দেখে-শুনে এই দেশের জনগনের মধ্যে অদ্ভুত একটি ধারনা গড়ে উঠছে যে, সেনাবাহিনী মাঠে থাকলে এবং বিদেশীরা নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করলে নির্বাচন সুষ্ঠ হয়! মনে করা হয়, তারা কারো প্রতি পক্ষপাত করে না। কিন্ত সেনাসদস্যদের মাঠে নামানোর তারিখ ১৫’র বদলে ২৪ ডিসেম্বর পেছানোয় জনমনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ।

ক্ষমতায় থেকে গড়ে-বেড়ে ওঠা বিএনপি কম-বেশি একযুগ ক্ষমতার বাইরে। দমন-পীড়নে পিষ্ট। দলীয় চেয়ারপারসন দন্ডিত হয়ে জেলে। তার ডেপুটি ও পুত্রও দন্ডিত এবং বিদেশে অবস্থানরত। তাদের এমত প্রতীতি রয়েছে যে, টানা দশ বছর ক্ষমতায় থেকে আওয়ামী লীগ জনবিচ্ছিন্ন। তাদের বিপক্ষে নেতিবাচক ভোটে তারা জিতে যাবেন। এটি ধরে নিয়ে নেতা-কর্মীরা চাঙ্গা। এজন্যই, তাদের ভাষায় সুষ্ঠ নির্বাচনের জন্য তারা মরিয়া। এই মরিয়া ভাব বজায় রেখে তারা কি কৌশল নেবেন, সেটিও দেখার বিষয়।

আইন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, সব দলের ন্যায্যতা ও সুষ্ঠ নির্বাচন নিশ্চিত করতে সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে নির্বাচন করা হচ্ছে সংবিধানিক প্রথা। সংসদীয় গণতন্ত্রে সব দেশে এটি করা হয় না ঠিক, কিন্তু ওয়েষ্ট মিনিষ্টার ধাঁচের গণতন্ত্রে এটি প্রথা ও পালনীয় হিসেবে স্বীকৃত। দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ন্যায্য প্রতিযোগিতার জন্য সংসদ ভেঙ্গে দেয়াটাই ‘সঠিক অভ্যাস’ বলে মনে করা হয়। যে যাই বলুক, এখানে সংসদ ও মন্ত্রীসভা বহাল রয়েছে- তার সুবিধা ক্ষমতাসীনদের পক্ষেই যাবে।

জনমনে যে বিষয়গুলি হামেশাই ঘুরে-ফিরে আসছে তা হচ্ছে, বেসামরিক প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী পক্ষ নেবে। আবার দু’চারজন বিশ্বাস করছেন, প্রধানমন্ত্রী যেহেতু বলেছেন নির্বাাচন হবে অবাধ, সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ। সেজন্য অন্তিমে একটি ভাল নির্বাচন দেখা যাবে। সাম্প্রতিক নজিরগুলো এই বক্তব্যের পক্ষে যায় না। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে সন্ত্রাস ও দখলবাজির এন্তার অভিযোগ রয়েছে। বিরোধী দলের এজেন্টদের বাড়ি তল্লাশিসহ কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়ারও অভিযোগ ছিল।

এবারের আশঙ্কা, “গায়েবী” মামলার। যে কেউ আসামী হয়ে গ্রেফতার হতে পারে। বিরোধী দলগুলো ইতিমধ্যে এসব আশঙ্কা প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশনের কাছে প্রতিকার চেয়েছে। যদিও মামলা-গ্রেফতার অব্যাহত রয়েছে। নির্বাচন কমিশন অতীতের মত পক্ষ হয়ে এসব অভিযোগ খন্ডণ করবেন, এমনটি আশা করা হচ্ছে না। এরই প্রতিফলন হিসেবে কি নির্বাচন কমিশন ‘বিব্রত’ হতে শুরু করেছেন? দেখার বিষয়, ‘বিব্রত’ হওয়ার পরে তাঁরা এর প্রতিকারে কি ধরনের কৌশল গ্রহন করেন?

নির্বাচনকে ঘিরে এরকম শঙ্কা-সম্ভাবনার দোলাচলে সরকার মনে করছে, এগুলি কেবলই বিরোধী দলের অপপ্রচার। সরকারের নেতারা বারবার ঘোষণা দিচ্ছেন, সময়মত নির্বাচন হবে। সহিংসতা মোকাবেলা করার কথাও বলছেন। অথচ দিয়েছিলেন লেভেল প্লেয়িং নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি । এমনকি ইভিএম ‘ম্যানিপুলেট’ না করার নিশ্চয়তা। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের নিরপেক্ষতার কথা। সরকার ও ক্ষমতাসীন মহল আকছার দাবি করে আসছেন, সব ঠিকঠাক আছে, কিন্তু নির্বাচন বানচালে ষড়যন্ত্রের গন্ধও পাচ্ছেন তারা।

বাস্তবতা কি? বিরোধী দল ও জোট বলছে, এসব প্রতিশ্রুতিই সরকারের কৌশল। নির্বাচনকে নিজেদের মতো করার যে কোন সক্ষমতা তাদেরই রয়েছে। এসব প্রতিশ্রুতি নিয়ে জনমনেও রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কারন অভিজ্ঞতা থেকে তারা জানেন, নির্বাচন এগিয়ে এলে রাজনীতিবিদরা প্রতিশ্রুতির ফুলঝুড়ি বইয়ে দেন এবং এর অধিকাংশ যে কথার কথা তা জানা হয়ে গেছে। উদাহরন, গত সিটি নির্বাচনে প্রায় সকল মেয়র প্রার্থী নির্বাচিত হলে ‘সিটি গভার্ণমেন্ট’ চালু করার কথা ইশতেহারে ও মুখে বলেছেন।

এরকম অবাস্তব এবং আকাশচারী সব প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারা জনগনের ভোট নিতে চান। কারন রাজনীতিবিদ, অর্থে-বিত্তে প্রতাপশালী এবং কথিত সুশীল সমাজের কাছে জনগন এখনও বোকার স্বর্গে বাস করছে বলে ধারনা পোষণ করে থাকেন। কারণ, এদের প্রত্যেকেরই দল, সংঘ-সমিতি রয়েছে। কিন্তু এদেশে কেবল সাধারন মানুষের কোন দল নেই-ঠাঁইও নেই। নেই আপাত: কোন সংঘবদ্ধতা।

সিইসিও বিব্রত ও মর্মাহত হতে পারেন!

আমীর খসরু ::

সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১ আসনের বিএনপি প্রার্থী খোন্দকার আবু আশফাককে পুলিশ বুধবার আটক করে ‘ভিন্ন এক পদ্ধতিতে’। দোহার থানার ওসির সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া ভাষ্য মোতাবেক – প্রার্থী  আবু  আশফাকের নিরাপত্তার জন্যই তাকে আটক করে পুলিশ কাস্টোডিতে নেয়া হয়।

১৯৭০-এর প্রথমদিকের ঘটনা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চালানো ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়কালে একটি ঘটনা বোধ করি অনেকেরই মনে নেই অথবা জানা নেই । সেই সময়ে ভিয়েতনামে ঘটে যাওয়া দুনিয়া কাঁপানো একটি ঘটনার কথা মনে পড়ে গেল। তৎকালীন সময়ে আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিমান সাংবাদিক পিটার আর্নেট তখন এ্যসোসিয়েটেড প্রেস বা এপির ভিয়েতনাম বিষয়ক সংবাদদাতা। পিটার আর্নেটের ওই সময়কালের একটি প্রতিবেদন ছিল এই রকম- যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী তখন ভিয়েতনামের একটি গ্রাম জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ধ্বংস করে দেয়। ঘটনাটির খবর ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে পৌছালে দায়িত্বপ্রাপ্ত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, কেন গ্রামটি ধ্বংস করো হলো? জবাবে সেই ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তা জবাব দিয়েছিলেন- “We had to destroy the village in order to save it.”  অর্থাৎ ‘গ্রামটিকে রক্ষার  জন্যই ওই গ্রামটিকে আমাদের ধ্বংস করে দিতে হয়েছে।’ সাম্প্রতিক যেসব ঘটনাবলী ঘটছে তাতে কর্মকর্তাদের ভাষ্য শুনে ওই ঘটনা বারংবার মনে পড়ে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক।

নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর প্রথম থেকেই দেশের বিভিন্নস্থানে প্রতিপক্ষের উপরে হামলা, ভাংচুর, বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়াসহ নানা সহিংস ঘটনা ঘটে চলেছে। ঠাকুরগাঁওয়ে বিএনপি মহাসচিবের গাড়িবহরে হামলা ও ভাংচুর, নোয়াখালীতে যুবলীগ নেতা নিহত হওয়াসহ সংবাদ মাধ্যমের হিসাব মোতাবেক আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণা শুরুর প্রথমদিনেই কমপক্ষে ১৮টি স্থানে সহিংস রক্তাক্ত সংঘর্ষের ঘটনাবলী ঘটেছে। বুধবার সংঘর্ষের ঘটনাবলী ঘটেছে ১৭ জেলায়। এতে হামলা-ভাংচুর, সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ১৩২ জন। বৃহস্পতিবারও ২৩ জেলার বিভিন্নস্থানে হামলা, সংঘর্ষ, বাধা দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ দেশের বিশাল এক এলাকা এখন নির্বাচনী সহিংসতার কবলে।  আর এটি করা হচ্ছে, মূলত ক্ষমতাসীন দল ও  আইন শৃংখলা রক্ষায় দায়িত্বপ্রাপ্তদের মাধ্যমে।

শুক্রবার জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রধান ও গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেনের গাড়িবহরেও হামলা হয়েছে। মিরপুরে শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বের হওয়ার সময় এ ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে নির্বাচনী মাঠের ‘স্থিতিস্থাবকতা বা ভারসাম্য’ বিনষ্ট করা হচ্ছে – যার ফল স্বল্প থেকে দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহভাবে নেতিবাচক হতে বাধ্য। একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, সব ঘটনার খবর সংবাদ মাধ্যমে আসে না, আসতে দেয়াও হয় না। কাজেই পরিস্থিতির ভয়াবহতা যে কতো বিশাল এবং ভীতিকর তার সামান্য হলেও কিছুটা আচ করা যাচ্ছে।

বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম খবর দিচ্ছে-বুধবার আর বৃহস্পতিবার- দুইদিনেই বিএনপির প্রার্থীসহ দুইশতাধিক নেতাকর্মীকে আটক করা হয়েছে। ১৩ ডিসেম্বর প্রথম আলো স্পষ্ট করেই বলেছে, বিএনপিকে চাপে রাখতেই গ্রেফতার, হামলা, বাধার ঘটনা ঘটছে। আসলে কোন দল বা জোট প্রার্থীকে অর্থাৎ আওয়ামী লীগ না বিএনপি প্রার্থীদের বাধা দেয়া হচ্ছে সেটি বড় ও মুখ্য বিষয় নয়। মূল বিষয়টি হচ্ছে, নির্বাচনের জন্য সমান সুযোগ প্রাপ্তির যে আকাঙ্খাটুকু জনমনে ছিল তা যে কোথাও বিদ্যমান নেই; বরং এর উল্টো পরিস্থিতি বিরাজমান – তা চোখে আঙুল দিয়ে আর দেখানোর প্রয়োজন পড়ে না।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন বিষয় হচ্ছে, এতোসব ঘটনা ঘটে যাচ্ছে, অথচ নির্বাচন কমিশনের কোনো কার্যকর ভূমিকাই দৃশ্যমান নয়। অবশ্য নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা যে এরকমটি হবে, সাধারণ মানুষ ইতোপূর্বেই তার আলামত  টের পাচ্ছিলেন বা আচ করতে পারছিলেন। এ কারণে আমজনতা নির্বাচন কমিশনের এই ভূমিকায় অবাক তো হয়ইনি, বিস্ময়ের কোনো বিষয়ও নয় ওই ভূমিকা। এটা সবারই ধারণা ছিল যে, এমনটাই হবে। সাধারণ মানুষ এমনটাও ধারণা করেছিল যে, প্রশাসনের বিভিন্ন বিভাগের সম্ভাব্য ভূমিকা কি হতে পারে? তবে কিছুটা কৌতূহল জেগেছে এই কারণে যে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এত্তোসব সহিংস ঘটনাবলীতে শুধুমাত্র ‘বিব্রত ও মর্মাহত হয়েছেন’। এর মধ্যদিয়ে একটি বিষয় প্রমাণিত হলো যে, সিইসিও বিব্রত ও মর্মাহতবোধ করতে পারেন। এটুকু এখনো অবশিষ্ট আছে। এ জন্য তাকে ধন্যবাদ জানাতেই হয়।

তবে সিইসি’’র এমন বক্তব্য তার এবং পুরো নির্বাচন কমিশনের অসহায়ত্ব আর ব্যর্থতাই প্রমান করে। এমন অসহায়ত্ব থাকলে জনমনে আস্থাহীনতা ও ভীতির সৃষ্টি হয়। ওই বক্তব্য সম্পর্কে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেনের মন্তব্য হচ্ছে- ‘‘নির্বচন কমিশন একটি এ্যকশন ওরিয়েন্টেড প্রতিষ্ঠান। কোনো ঘটনায় তার বিব্রত হওয়া বা মর্মাহত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কমিশন চাইলে যেকোনো সিদ্ধান্তই বাস্তবায়ন করতে পারে।”

কিন্তু সাথে সাথে এ বিষয়টিও যেকোনো কান্ডজ্ঞানসম্পন্ন মানুষের মনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক যে, তফসিল ঘোষণার সাথে সাথে ক্ষমতাসীন দলের অর্ন্তদ্বন্দ্বে ঢাকার আদাবরে ২ জনের নিহত হওয়াসহ ওই সময় যেসব ঘটনাবলী ঘটেছে তাতে নির্বাচন কমিশন কঠোর হলে এখনকার ঘটনাবলী হয়তো এড়ানো যেতো। সিইসি ওই সময় এও বলেছিলেন, পুলিশ প্রশাসন অন্যায্য কিছু করছে না।

এদিকে, প্রচার-প্রচারণার শুরুতেই এমন সহিংস রক্তারক্তির ঘটনাবলীর পরেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, নির্বাচনের সময়ে প্রার্থীরা বৈধ অস্ত্র বহন করতে পারবেন। কিন্তু এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন কেন চুপচাপ? বিগত নির্বাচনগুলোতে বৈধ অস্ত্রও সংশ্লিষ্ট থানায় বা  আইনী হেফাজতে রাখার বিধান ছিল। এবারই তার ব্যতিক্রম হতে যাচ্ছে।

যে ধারায় ও পর্যায়ে হামলা, গ্রেফতার, সহিংসতা চলছে এবং চালানো হচ্ছে এবং প্রশাসনের যে ভূমিকা তাতে সাধারণ মানুষের মন ও মনোজগতে বিদ্যমান উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও শংকা এতোটুকুও তো কমেইনি, বরং দিনে দিনে বাড়ছেই। এ কারণেই সর্বত্র একটি প্রশ্নই এখন উচ্চারিত হচ্ছে- ‘আমরা আমাদের ভোটটি শেষ পর্যন্ত ‘সহি-সালামতে’ দিতে পারবো তো?’ এই ভীতি, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, শংকা দূর করতে না পারার ব্যর্থতা পুরোটাই নির্বাচন কমিশনসহ সংশ্লিষ্টদের নিতে হবে। এ বিষয়টিও মনে রাখতে হবে যে, সিইসি যতোই বিব্রত ও মর্মাহত হবেন, জনমনে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে সংশয় -সন্দেহ ততোই বাড়তেই থাকবে। আসলে পুরো পরিস্থিতি এবং নির্বাচন কমিশনসহ সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা এবং কর্মকান্ডে সাধারণ ভোটাররাই সত্যিকার অর্থে বিব্রত, মর্মাহত।

৭১ এর শক্তি

আনু মুহাম্মদ ::

‘‘আতংকের সমাজ, দখলদার অর্থনীতি, জমিদারী রাজনীতি এটাই বর্তমান বাংলাদেশের প্রধান পরিচয়’’

নির্বাচনের হট্টগোলের মধ্যেও বিজয় দিবসের ডাক আসে, প্রশ্ন আসে, আনন্দ বেদনার সাথে আসে ক্ষোভ। ১৯৭১ এর ২৫ মার্চ রাত থেকে দানবীয় অপশক্তির ভয়ংকর থাবার মধ্যে, নির্যাতন ও প্রতিরোধের যে অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে এইদেশের মানুষ গেছেন, তা যারা দেখেননি তাদের পক্ষে বোঝা কঠিন। সেই অভিজ্ঞতা এই জনপদের সেইসময়ের ও পরবর্তী সকল প্রজন্মের জন্য অনেক কিছুই পাল্টে দিয়েছে। পাকিস্তানী বর্বর সেনাবাহিনী ও তার দোসরদের ভয়ংকর কারাগার থেকে মুক্ত হবার আনন্দ নিয়ে একই বছরের ১৬ ডিসেম্বর নিয়ে এসেছিল নতুন করে শ্বাস নেবার দিন। বেদনার পাহাড় বুকে নিয়েও মানুষের তখন অনেক স্বপ্ন।

কিন্তু এরপর থেকে একে একে দুমড়ে মুচড়ে যায় তার অনেককিছু। সবকিছু দখলে চলে যেতে থাকে ক্ষুদ্র এক গোষ্ঠীর হাতে, তৈরি হয় লুটেরা কোটিপতি, স্বৈরশাসন আসে নানা রূপে। যুদ্ধাপরাধীদের দল আসে, ব্যবসা হয়, ক্ষমতা হয়, গাড়ি হয়,- তাতে উড়ে বাংলাদেশের পতাকা। সাম্রাজ্যবাদ নতুন করে খুঁটি বসায়। তাই সাম্প্রদায়িকতা, জাতিবিদ্বেষ, সংখ্যাগরিষ্ঠ নারীপুরুষের ওপর শোষণ নির্যাতন চলতে থাকে। অসম্পূর্ণ বিজয়ের পর একেকটা পরাজয় জমতে থাকে।

এই বিজয় দিবসে আমাদের সামনে ত্বকী, সাগর-রুনী, তনু, মিতুর লাশ, রামুর বিধ্বস্ত জনপদ, ভাঙাচোরা বুদ্ধের শরীর, গোবিন্দগঞ্জের গুলিবিদ্ধ আগুনে পোড়া মানুষের হাহাকার, নাসিরনগর সাঁথিয়াসহ বহু অঞ্চলে হিন্দু জনগোষ্ঠীর আক্রান্ত মুখ, পার্বত্য চট্টগ্রামে উজাড় পাহাড় আর সহিংসতায় বিপন্ন মানুষ ও প্রকৃতি। আমাদের সামনে ‘ক্রসফায়ারে’ নিহত – গুম হয়ে যাওয়া হাজার মানুষ। আসে শত হাজার নিহত শ্রমিকের মুখ। নিপীড়িত কিশোর ও তরুণেরা। জীবন্ত কবরে সহস্রাধিক, কয়লা হয়ে যাওয়া শতাধিক শ্রমিকের শরীর। সড়কে লঞ্চে হাজার হাজার মানুষ। কোনোভাবেই দুর্ঘটনা নয়, লোভের খুন। আমাদের চোখের সামনে বিশ্বজিতের বিস্ময়, চিৎকার আর রক্তাক্ত দেহের ছায়া। পুলিশের সামনে দলবদ্ধ হয়ে একজন নিরীহ অচেনা তরুণকে কুপিয়ে পিটিয়ে হত্যা। নদী দূষণ ও দখল, পাহাড় বন উজাড় আর রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুন্ঠন বর্তমান সময়ের উন্নয়ন যাত্রার প্রধান চিহ্ন। সমুদ্রের ব্লক নিয়ে আত্মঘাতী তৎপরতা চলছে। বিশেষজ্ঞ মত, জনমত অগ্রাহ্য করে সুন্দরবন বিনাশীবিদ্যুৎ প্রকল্পসহ নানা বাণিজ্যিক বনগ্রাসী ভূমিগ্রাসী তৎপরতাও চলতে পারছে। চলতে পারছে দেশবিনাশী রূপপুর প্রকল্পের কাজ।

গত ৪৭ বছরে দেশের অর্থনীতির আকার অনেক বেড়েছে। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবন এখনও মানুষের হয়নি। এখন অর্থনীতি ধরে রেখেছেন দেশের গার্মেন্টস শ্রমিক, প্রবাসী শ্রমিক আর কৃষকেরা। দেশি ও প্রবাসী শ্রমিকেরা জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেশে বছরে আনেন প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার। এই প্রবাহ না থাকলে লুটেরাদের দাপটে অনেক আগেই ধ্বস নামতো অর্থনীতিতে। আতংকের সমাজ, দখলদার অর্থনীতি, জমিদারী রাজনীতি এটাই বর্তমান বাংলাদেশের প্রধান পরিচয়। এর জন্য তো মানুষ অসম্ভব সাহস ও ঝুঁকি নিয়ে জীবন দিয়ে বাংলাদেশ আনেনি। অথচ এর মধ্যেই এখন আমরা ‘আছি’। দুর্নীতি দখলদারিত্ব, নানা অগণতান্ত্রিক আইনী বেআইনী তৎপরতা, সন্ত্রাস-টেন্ডারবাজি, নিয়োগ বাণিজ্য ইত্যাদি বিস্তারের সুবিধাভোগী খুবই নগণ্য কিন্তু তারাই ক্ষমতাবান।

যাদের ২৪ ঘন্টা রাষ্ট্রীয় অর্থে প্রতিপালিত নানা বাহিনীর পাহারায় কাটে তারা ছাড়া বাকি কারও তাই আতংক আর কাটে না। নিজের ও স্বজনের জীবন নিয়ে, পথের নিরাপত্তা নিয়ে, জিনিষপত্রের দাম, জীবিকা, ভবিষ্যৎ নিয়ে উৎকন্ঠা দিনরাত। উদ্বেগ উৎকন্ঠা নির্বাচন নিয়েও। সবচাইতে বড় ভয়, দিনের পর দিন সবকিছুতে অনিশ্চয়তা। বাংলাদেশের মানুষের অবস্থা এখন এমনই যে, মানুষের জন্য মানুষের শোক, আতংক কিংবা উদ্বেগ নিয়েও একটু স্থির হয়ে বসা যায় না। নতুন আরেক আঘাত পুরনো শোক বা আতংককে ছাড়িয়ে যায়। টিভি বা সংবাদপত্রেরও ঠাঁই নাই সবগুলোকে জায়গা দেবার, কিংবা লেগে থাকার।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রধান দুইদল বা জোটের সংঘাত কখনোই জমিদারী লড়াই এর চরিত্র থেকে বের হতে পারেনি। যে অংশ ক্ষমতায় থাকে তাদের ইচ্ছা হয় চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নেবার। তাই একপর্যায়ে বিরোধ চরমে ওঠে। আফ্রিকার দেশগুলোর মতো এদেশে গোত্র বা এথনিক সংঘাতের অবস্থা নাই। কিন্তু আওয়ামী লীগ বিএনপি লড়াই যেনো তার স্থানই পূরণ করতে যাচ্ছে, রাজনৈতিক বৈরীতা ও সংঘাত নিয়েছে ট্রাইবাল বৈরীতা ও সংঘাতের রূপ। আসলে দলের ব্যানার দেখে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। দেখতে হবে ব্যানারের পেছনে দাঁড়ানো লুটেরা, দখলদার ও কমিশনভোগীদের। দলের ব্যানার আসলে ব্যবহৃত হয় তাদের মুখ ঢাকার জন্য। মানুষ দল দিয়ে বিচার করে, দলের উপর ভরসা করে, দলের উপর বিরক্ত হয়, ক্ষুব্ধ হয়, ক্ষোভে-দুঃখে চিৎকার করে। দল আসে যায়, আসে যাবে। কিন্তু কমিশনভোগী, দখলদার, লুটেরাদের কোন পরিবর্তন হয় না। তাদের শক্তি ও অবস্থান আরও জোরদার হয়।

প্রক্রিয়া যদি একই থাকে ক্ষুধা দিন দিন বাড়তে থাকে। পেট তো ভরতে হবে। তাই এইভাবে চলতে চলতে মাঠ, গাছ, বন, জঙ্গল, পাহাড়, নদী, নালা, খালবিল সব হজম হতে থাকে। ক আর খ এর  যখন যার সুযোগ আসে। কখনও প্রতিযোগিতা কখনও সহযোগিতা। কখনও ঐক্য কখনও সংঘাত। দখল, কমিশনের উপর দাঁড়ানো বিত্ত বৈভব শানশওকতে শহরের কিছু কিছু স্থান ঝলমল করতে থাকে। অনেকে স্মরণ করতে পারেন সেলিম আল দীনের ‘মুনতাসির ফ্যান্টাসী’  নাটক। সবকিছুই ছিলো প্রধান চরিত্র মুনতাসিরের খাদ্য। তার ক্ষুধার কোন শেষ নাই। আমাদের দেশে একের পর এক শাসক গোষ্ঠী একজনের থেকে অন্যজন আরও বেশি ‘মুনতাসির’। ক্ষমতাবানরা যখন এভাবে নিজের অর্থনীতি তৈরি করেন তখন রাজনীতি কেন জমিদারী থেকে আলাদা হবে? আমাদেরই বা সদা আতংক ছাড়া আর কী পাবার আছে?

সেজন্য গুম, খুন, ক্রসফায়ার, উর্দিপরা বা উর্দিছাড়া লোকজনদের ডাকাতি চাঁদাবাজী, কৃত্রিম কিংবা উস্কে তোলা রাজনৈতিক উত্তেজনা, সহিংসতা, দখল, দুর্নীতি এই সবকিছু নিয়ে মানুষের অস্থিরতা, উদ্বেগ, অসুস্থতার কালে পর্দার আড়ালে আরও অনেককিছু হয়ে যেতে থাকে। সহিংসতা বা অস্থিরতায় শতকরা ১ ভাগের হাতে আরও সম্পদ কেন্দ্রীভূত হতে কোনো বাধা নেই। পাহাড় নদী বন দখলকাজে কোন সমস্যা নেই। দেশের সমুদ্র, সম্পদ, অর্থনীতিতে দেশি বিদেশি লুটেরাদের আধিপত্য বৃদ্ধির আয়োজনে কোন প্রতিবন্ধকতা নেই।নির্বাচনের হট্টগোলের আড়ালেও এইসব অপকর্ম চলতে থাকে।

এই অবস্থায় তাহলে কী হবে বাংলাদেশের? দুই জমিদার বা দুই ডাইনাস্টির আড়ালে, চোরাই টাকার মালিক সন্ত্রাসী প্রতারক দখলদার ব্যাংক লুটেরা আর কমিশনভোগীদের হাতে, নিজেদের সর্বনাশ দেখতেই থাকবে শতকরা ৯৯ ভাগ মানুষ? তাহলে কী আর কোন উপায় নেই? শক্তিশালী মিডিয়া ও সুশীল সমাজের দরবারে এই বলয়ের বাইরে আলোচনারও সুযোগ কম। নিপীড়নের খড়গ সর্বত্র। ভিন্নস্বর ভিন্নসত্য ভিন্ন সম্ভাবনা নিয়ে মানুষের চিন্তার সুযোগও সংকুচিত হতে থাকে। ফলে জনগণের মধ্যে এক অসহায়ত্বের বোধ প্রায় স্থায়ীরূপ নেয়।

এসব দেখে বারবার প্রশ্ন আসে, তাহলে কি ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে অগণিত নারী পুরষের অসম্ভব সাহস ও লড়াই-এর অভিজ্ঞতা বৃথা? না। ১৯৭১ এর সেই সাহস এখনও আমাদের শক্তি। এই শক্তি নিয়েই যুদ্ধাপরাধী ও লুটেরাশক্তির, দখলদার ও জমিদারদের রাজনৈতিক মতাদর্শিক প্রভাব অতিক্রম করে জনগণের রাজনৈতিক শক্তির বিকাশ ঘটাতে হবে। নিষ্ক্রিয়, আচ্ছন্ন আর সন্ত্রস্ত জনগণের মধ্যে ক্ষমতার বোধ বিকশিত হওয়া ছাড়া এটা সম্ভব নয়। আচ্ছন্নতা আর ভয় থেকে মুক্ত হলে, নিজেদের নিয়ে স্বপ্ন দেখতে সক্ষম হলে, জনগণ তার অন্তর্গত বিশাল শক্তিও অনুভব করতে সক্ষম হবে। তখন সম্ভব হবে পথের সন্ধান পাওয়া, সম্ভব হবে তার রাজনীতির বিকাশে স্বাধীন পথ গ্রহণ।

বারবার ৭১ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বাংলাদেশের মানুষ, তা সে শারীরিকভাবে যতই দুর্বল অপুষ্ট হোক, জাগ্রত হলে যে কোনো দেশি বিদেশি দানবের মোকাবিলা করতে তারা সক্ষম। সামরিক বেসামরিক স্বৈরশাসন, নির্যাতন, দখলদারিত্ব, সাম্প্রদায়িকতা ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী বিভিন্ন লড়াই-এ জনগণের শক্তির স্ফুরণ তারই বহিপ্রকাশ। তাই শাসক শ্রেণীর বিভিন্ন অংশের প্রতারণামূলক বাগাড়ম্বরের মধ্যে নয়, শোষণ বৈষম্য নিপীড়ন আধিপত্য বিরোধী সকল লড়াই-এর মধ্যেই কেবল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জাগ্রত। আত্নসমর্পণ আর পরাজয়ের বিপরীতে তার অবস্থান। চোরাই টাকা, প্রতারণা, বাগাড়ম্বর আর রক্তচক্ষু দ্বারা পরিচালিত নির্বাচনের মধ্যে পথ হারালে চলবে না। কারণ মানুষ যখন নিজের ভেতরে মুক্ত হয়, তখনই তার মুক্তির পথ তৈরি হয়।

ধর্মভিত্তিক দলগুলোর ক্রমাগত ভাঙ্গন : সম্পর্কের নতুন মাত্রা আওয়ামী লীগের সঙ্গে

জহির উদ্দিন বাবর ::

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মভিত্তিক দলগুলোর একটি প্রভাব বরাবরই ছিল। তারা সরাসরি ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে না যেতে পারলেও বিভিন্ন সময় ক্ষমতার পালাবদলে অনুঘটক হিসেবে ভূমিকা রেখেছে এবং নিজেদের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ও অনিবার্য করার ক্রমাগত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে এসব দলের অবস্থান মূলত; আওয়ামী ও বাম শিবিরের বিপরীতে। তবে জামায়াতসহ কোনকোন দল কৌশল ও নিজেদের অতীত কর্মকান্ডের কারনে মানসিক দূরত্বের আওয়ামী লীগের সাথেও ‘বন্ধুত্ব’ গড়ে তুলেছে। তবে ডানপন্থি বিএনপির সঙ্গে সার্বিকভাবে তাদের সখ্য দীর্ঘদিনের। তবে বামঘেষা আওয়ামী লীগের সঙ্গে ইসলামপন্থিদের দূরত্ব আগের চেয়ে অনেকটা ঘুচে গেছে। বিভিন্ন কারণে ইসলামি দলগুলো আর আগের মতো আওয়ামী বিরোধিতা করে না। আওয়ামী লীগও আর ধর্মভিত্তিক দলগুলোকে আগের মতো তাদের প্রতিপক্ষ ভাবে না। সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনে ওঠে এসেছে, ‘এককালের বাম ও সেক্যুলার ভাবধারার আওয়ামী লীগে ধর্মভিত্তিক দলের সংখ্যাই বেশি’। বাস্তবতা হলো, ধর্মভিত্তিক শক্তির মূলধারাটি এখনও আওয়ামী লীগবিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রেখেই চলছে। ব্যক্তিগত স্বার্থসংশ্লিষ্টতার নানা কারণে ধর্মভিত্তিক দলের কোনো কোনো নেতার সঙ্গে আওয়ামী লীগের একটা ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠেছে। তবে মাঠ পর্যায়ে ইসলামপন্থিদের একটি বড় অংশ এখনও আওয়ামী লীগ ও বামধারার রাজনীতির প্রতি আগের অবস্থান ও মনোভাব থেকে সরে আসেনি।

বাংলাদেশে ইসলামপন্থিদের মধ্যেও আছে নানা ধারা-উপধারা। জামায়াতে ইসলামীকেন্দ্রিক ধারাটি সবচেয়ে শক্তিশালী ছিল ; এখনও মাঠ পর্যায়ে তারাই বেশি শক্তিশালী। যদিও যুদ্ধাপরাধ অপরাধের মামলায় দলের প্রথম সারির নেতাদের মৃত্যুদন্ড কার্যকর হওয়ার পর তাদের আগের সেই অবস্থান আর নেই। চরম কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছে দলটির অনুসারীরা। দলটি একটা সময় এদেশে আওয়ামী লীগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও দীর্ঘদিন ধরে আছে আওয়ামীবিরোধী শিবিরে। সম্পর্কের নানা টানাপোড়েন সত্ত্বেও আছে বিএনপি জোটের সঙ্গেই। তবে জামায়াতে ইসলামী নিছক ধর্মভিত্তিক দল নয়, সংসদীয় মূলধারার রাজনীতির সঙ্গে তাদের সামঞ্জস্য থাকার কারণে তাদেরকে ইসলামি দল হিসেবে মানতে অনেকের আপত্তি আছে।

ইসলামপন্থিদের আরেকটি ধারার সম্পর্ক মাজার ও দরবারকেন্দ্রিক। তারা সাধারণত পীর, খানকা, দরবার, মুরিদ এসবের দ্বারা আবর্তিত রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তাদের সঙ্গে বরাবরই আওয়ামী লীগের সম্পর্ক ভালো। বিশেষ করে গত ১০ বছর ধরে আওয়ামী লীগের ক্ষমতার অন্যতম অংশীদার তারা। জামায়াতে ইসলামী ও কওমিপন্থিরা যেন আওয়ামী লীগের ধারেকাছেও ভিড়তে না পারে এ ব্যাপারে তারা সবসময় তৎপর থাকে।

দেশে ইসলামপন্থিদের সবচেয়ে প্রভাবশালী অংশটি কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক আলেমদের নেতৃত্বে পরিচালিত। দেশের ধর্মীয় অঙ্গন মূলত নিয়ন্ত্রণ করেন তারাই। সমাজের মূলধারার সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা ততটা না থাকলেও প্রভাবিত করার মতো ক্ষমতা তাদের আছে। দেশের কয়েক লাখ মসজিদ, হাজার হাজার মাদ্রাসা সরাসরি তাদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত। দেশের মোট জনগোষ্ঠীর বেশিরভাগের সঙ্গে তাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ একটা সম্পর্ক আছে। বিভিন্ন ইস্যুতে তারা সাধারণ জনগণকে নিজের মতের পক্ষে নাড়া দিতে পারে।

কওমি মাদ্রাসাগুলো প্রায় দেড়শ বছর ধরে সরকারের কোনো স্বীকৃতি ও হস্তক্ষেপ ছাড়া পরিচালিত হয়ে আসছে। তবে কয়েক মাস আগে জাতীয় সংসদে কওমি সনদের স্বীকৃতি বিল পাস হওয়ার পর তারা সমাজের মূলধারা সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেশের প্রায় অর্ধকোটি মানুষ কওমি মাদ্রাসার সঙ্গে সম্পৃক্ত। সরকারি স্বীকৃতি পাওয়ার কারণে ঐতিহ্যগত দিক থেকে কওমি আলেমদের মধ্যে একটা দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে এটাই স্বাভাবিক। বৈষয়িক প্রাপ্তির নানা সমীকরণ যুক্ত হয়ে যাওয়ার কারণে কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক সংগঠন, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো আর আগের মতো প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে না এটাই চরম সত্য।

দুই.

দেশে কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক বেশ কিছু দল রয়েছে। লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের অনেকটা মিল থাকলেও তাদের মধ্যে মতভিন্নত প্রকট। বিভাজন হয়নি, ব্র্যাকেটবন্দি হয়নি – এমন ইসলামি দল খুব কমই আছে। বিগত শতাব্দীর আশির দশকে মোহাম্মাদুল্লাহ হাফেজ্জি হুজুরের হাত ধরে কওমিপন্থিদের ব্যাপকভাবে রাজনীতিতে আগমন। হাফেজ্জি হুজুরের সেই খেলাফত আন্দোলন থেকে এখন এক ডজনের বেশি দল হয়েছে। দল ভেঙে টুকরো টুকরো হয়েছে, নেতৃত্বের লড়াই অব্যাহত আছে বছরের পর বছর ধরে। নব্বই দশকের শেষ দিকে সবগুলো ইসলামি দল নিয়ে গঠিত হয়েছিল ইসলামী ঐক্যজোট। কিন্তু ২০০১ সালের নির্বাচনের পর সেই ইসলামি ঐক্যজোট ভেঙে যায়। এরপর প্রচলিত ধারার স্বার্থের রাজনীতির চর্চা শুরু হয়ে যায় এখানে। কখনও এর সঙ্গে, কখনও ওর সঙ্গে করতে করতে এখন ধর্মভিত্তিক দলগুলো অনেকটা ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। প্রায় কোনো দলেরই আগের সেই অবস্থান নেই। প্রতিটি দলই একটি সুনির্দিষ্ট গন্ডিতে আবর্তিত হচ্ছে। সাধারণ জনমানুষের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা খুব একটা নেই। মসজিদ-মাদ্রাসা আর ছাত্র-শিক্ষকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ তাদের বেশির ভাগ কর্মসূচি। ফলে ইসলামি দলগুলো এখনও এদেশের জনগণের কাছে তাদের প্রাসঙ্গিকতা প্রমাণ করতে পারেনি।

সবশেষ ২০১৩ সালে ইসলামপন্থিদের বড় একটি উত্থান চোখে পড়ে। সেই সময় অনলাইনে ধর্ম সম্পর্কে কটূক্তির অভিযোগে নাস্তিক ব্লগারদের বিচার দাবিতে চাঙা হয়ে উঠে হেফাজতে ইসলামের আন্দোলন। ওই বছরের ৬ জুলাই মতিঝিলে ঐতিহাসিক লংমার্চে তারা সবার নজর কাড়তে সক্ষম হয়। অনেকে এটাকে ‘নতুন শক্তি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তবে ঠিক এর এক মাস পর ৫ মে শাপলা চত্বরেই পতন ঘটে হেফাজতের। এরপর আর হেফাজত মেরুদন্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারেনি। বিভিন্ন সময় নানা আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করলেও তা হালে পানি পায়নি। তবে মজার ব্যাপার হলো, সেই হেফাজতে ইসলাম এখন আর আওয়ামী লীগের শত্রু  নয়, পরম বন্ধু। সংগঠনের আমির ও দেশের সবচেয়ে প্রবীণ আলেম আল্লামা আহমদ শফী নিজেই আওয়ামী লীগের প্রশংসা করেছেন। জাতীয় সংসদে স্বীকৃতি ঘোষণার পর কওমি আলেমরা ঘটা করে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে কথিত শুকরিয়া মাহফিলের নামে প্রধানমন্ত্রীকে সংবর্ধনা জানিয়েছেন। এর দ্বারা ইসলামপন্থীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্ক নতুন মাত্রা লাভ করে। জাতীয় নির্বাচনের কয়েক মাস আগে এই সংবর্ধনা নিজেদের জন্য বিশাল প্রাপ্তি হিসেবে দেখছে আওয়ামী লীগ। এর আগে কোনো সরকার প্রধানকে এভাবে সব আলেম একমঞ্চে এসে সংবর্ধনা জানানোর নজির নেই।

শাসক দলের সঙ্গে এভাবে আলেমদের মাখামাখিকে ভালো চোখে দেখছে না খোদ ইসলামপন্থিদের অনেকেই। তবে নানা কারণে কেই সরাসরি বিরোধিতাও করতে পারছে না। ভেতরে ভেতরে নানা অসন্তোষ ও ক্ষোভ কাজ করলেও কেউ তা প্রকাশের সাহস করছে না। আর নেতৃত্বের আসনে থাকা আলেমরাও নানা কারণে সীমাবদ্ধতার মধ্যে পড়ে গেছেন। একদিকে প্রলোভন আরেক দিকে নানা ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে ঊঠে তারা অনেক ক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্তটি নিতে পারছেন না বলে মনে করছেন অনেকে। আবার কেউ কেউ এটা কৌশল হিসেবে দেখছেন। সময়ের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় টিকে থাকার স্বার্থে আলেমরা একটু কৌশলী ভূমিকা নিয়েছেন বলে মনে করেন কেউ কেউ।

তিন.

জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ধর্মভিত্তিক দলগুলোও আছে আলোচনায়। তবে এবারের নির্বাচনে কোনো দলই তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না। মার্কাহীন, নিবন্ধনবিহীন জামায়াতে ইসলামীর কথা বাদ দিলে বর্তমানে ইসলামি দলগুলোর মধ্যে চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। এই নির্বাচনে দলটি তিনশ আসনেই প্রার্থী দিয়েছে। এই নির্বাচনে তারাই একমাত্র ইসলামী দল যারা সব আসনে একক প্রার্থী দিয়েছে। যদিও একটি আসনেও পাস করার মতো অবস্থান গড়ে উঠেনি তাদের। এই দলটির বিরুদ্ধে বরাবরই আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ করে আসছে অন্যান্য ইসলামি দলগুলো। যদিও এর কোনো ‘‘দালিলিক প্রমাণ’’  নেই ।

তবে একটি বিষয় দৃশ্যমান, অন্যান্য ইসলামি দলকে আওয়ামী লীগ যেভাবে তাদের প্রতিপক্ষ মনে করে চরমোনাই পীরের দলকে সেটা মনে করে না। কয়েকটি সিটি নির্বাচনে তাদের প্রার্থী তৃতীয় অবস্থান লাভ করে বেশ আলোচনায় আসে। অনেকে মনে করেন, তারা ইসলামপন্থিদের যে ভোট কাটেন তা সাধারণত বিএনপির বাক্সে যাওয়ার কথা ছিল। সরাসরি না হলেও তাদের ভোট কাটা সুবিধা করে দেয় আওয়ামী লীগকে। মূলত এই কারণে আওয়ামী লীগ তাদেরকে অনেকটা আনুকূল্য দেয় বলে কারও কারও ধারণা। যদিও তারা বরাবরই অস্বীকার করে আসছে এই অভিযোগ। অন্যান্য দলের সঙ্গে বিগত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করে তারা যে আওয়ামী লীগের সঙ্গে নেই এটার প্রমাণ দেয়ার চেষ্টা করেছে।

মুফতি ফজলুল হক আমিনীর নেতৃত্বাধীন ইসলাম ঐক্যজোট দীর্ঘ সময় বিএনপি জোটে থাকলেও বছর দুয়েক আগে এখান থেকে বেরিয়ে গেছে। এবারের নির্বাচনের আগে ইসলামী ঐক্যজোট নৌকায় চড়ছে বলে জোর প্রচারণা ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত বনিবনা না হওয়ায় তারা নৌকা পায়নি। পরে কয়েকটি আসনে একক নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছে দলটি। যদিও আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক এখনও খুবই মধুর। তাদেরকে নির্বাচনী খরচসহ নানা সুবিধা আওয়ামী লীগ দিচ্ছে বলে কানাঘুষা আছে। তবে তাদেরকে জোরে বা কৌশলে বিএনপি জোট থেকে বের করতে পারাই আওয়ামী লীগের বড় সাফল্য। তবে মুফতি আমিনীর জীবদ্দশায় তাকে নানাভাবে চেষ্টা করেও নত করা যায়নি। নিঃসন্দেহে এটা তাদের কৃতিত্ব। মজার ব্যাপার হলো, ইসলামি ঐক্যজোটকে বিএনপি জোট থেকে বের করলেও একটি ভগ্নাংশ এখনও রয়ে গেছে ২০ দলীয় জোটের সঙ্গে। যদিও অ্যাডভোকেট আবদুর রকিবের নেতৃত্বাধীন অংশটির কার্যক্রম খুব একটা নেই।

শায়খুল হাদিস আল্লাম আজিজুল হকের দল খেলাফত মজলিস ভেঙে যায় তার জীবদ্দশায়ই। দুই ভাগে বিভক্ত খেলাফত মজলিসের যে অংশটির সঙ্গে শায়খুল হাদিসের পরিবারের সম্পৃক্ততা আছে তারা বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস নামে নিবন্ধন পায়। ২০০৬ সালে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে পাঁচ দফা চুক্তি করে এই দলটি আলোচনায় আসে। যদিও এক-এগারোর পর সেই চুক্তি কার্যকারিতা পায়নি। আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাদের নৌকা প্রতীকে ভোটও করা হয়নি। সেই দলটি চলতি বছর নির্বাচনের কয়েক মাস আগে এরশাদের জাতীয় পার্টির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নতুন করে আলোচনায় আসে। তবে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই জোট হলেও চরমভাবে হতাশ হয় দলটি। জাতীয় পার্টি যেখানে আওয়ামী লীগের সঙ্গে নিজেদের ভাগ-ভাটোয়ারা মেটাতে হিমশিম খেয়েছে সেখানে শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের জন্য কিছুই করতে পারেনি। এখন হাতে গোনা কয়েকটি আসনে নিজেদের প্রার্থিতা ঘোষণা করে কোনোরকম মুখরক্ষা করেছে দলটি। শায়খুল হাদিসের ইন্তেকালের পর দলটির আভ্যন্তরীণ অবস্থা তেমন ভালো নয়। শায়খুল হাদিসের পরিবারের বলয়ে কোনোরকম টিকে আছে।

শুধু ‘খেলাফত মজলিস’ নামে নিবন্ধন পাওয়া দলটির নেতৃত্বে আছেন মাওলানা ইসহাক ও আহমদ আবদুল কাদের। দলটি এখনও বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটে আছে। এবারের নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত তারা হবিগঞ্জের দুটি আসন পেয়েছে। যদিও আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত আসন দুটিতে তাদের পাস করে আসার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।  এই দলটিতে জামায়াতে ইসলামীর কিছুটা ছায়া আছে। এই দলের মহাসচিব আহমদ আবদুল কাদের একসময় ছাত্রশিবিরের সভাপতি ছিলেন। যদিও পরে জামায়াতের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিন্ন হয় এবং তিনি হাফেজ্জি হুজুরের তওবার রাজনীতির মাধ্যমে কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক দলের সঙ্গে যুক্ত হন।

২০ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম। প্রাচীন এই দলটি এখন দুই অংশে বিভক্ত। একটি অংশের নেতৃত্বে রয়েছেন মাওলানা আবদুল মুমিন। তবে বয়োবৃদ্ধ এই আলেম ততটা পরিচিত নন। সামনে রয়েছেন মহাসচিব মাওলানা নুর হোসাইন কাসেমি। মূলত মাওলানা কাসেমির নামেই পরিচিত এই অংশটি। অপর অংশের নেতৃত্বে আছেন মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাস। তিনি এরশাদ সরকারের প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। পরবর্তী সময়ে চারদলীয় জোট সরকারের সাংসদ ছিলেন। এবারের নির্বাচনেও তিনি যশোরের একটি আসন থেকে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করছেন। এবারের নির্বাচনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম দুই অংশ মিলে বিএনপির কাছ থেকে তিনটি আসন পেয়েছে। অন্তত দুটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জিতে আসার সম্ভাবনা দেখছেন তারা।

হাফেজ্জি হুজুরের হাতেগড়া খেলাফত আন্দোলন এখন আছে অনেকটা করুণ অবস্থায়। এই দলটি কয়েক ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। রাজধানীর উপকণ্ঠ কামরাঙ্গীচরে নুরিয়া মাদ্রাসার বাইরে তাদের তেমন কোনো কার্যক্রম চোখে পড়ে না। হাফেজ্জি হুজুরের পরিবারের সদস্যদের আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণেই মূলত দলের এই করুণ দশা। অন্যদিকে অনেক প্রাচীন দল নেজামে ইসলামের অবস্থাও হ-য-ব-র-ল। দলটি যে কয়টি অংশে বিভক্ত খুঁজে বের করাও মুশকিল। একটি অংশের নেতৃত্বে আছেন মুফতি ইজহারুল ইসলাম, আরেকটি অংশের নেতৃত্বে মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামী, তিনি আবার ইসলামী ঐক্যজোটেরও চেয়ারম্যান। আরেকটি অংশের নেতৃত্বে আছেন অ্যাডভোকেট আবদুর রকিব। একসময় মিসবাহুর রহমান চৌধুরী একটি অংশের নেতৃত্বের দাবি করলেও তিনি এখন ভিন্ন পরিচয়ে পরিচিত। এছাড়া মাওলানা আবদুর রহিমের নেতৃত্বাধীন ইসলামী ঐক্য আন্দোলন একসময় আলোচনায় থাকলেও এখন তেমন কোনো কার্যক্রম নেই দলটির। এ ধরনের আরও কিছু দল তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। যদিও এসবের কোনো প্রভাব আমাদের সমাজ বা রাজনীতিতে খুব একটা নেই।

চার.

মূলত ইসলামি দলগুলোর এই ভঙ্গুর অবস্থার জন্য দায়ী পরিকল্পনাহীনতা। তারা কী করতে চায়, কোন পথ ধরে এগুতে চায়, আর এর জন্য কী করতে হবে এর সুনির্দিষ্ট কোনো ছক নেই ইসলামি দলগুলোর। গতানুগতিক ধারায় চলছে দল ও রাজনীতি। দলগুলোর গঠনতন্ত্র থাকলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তা অনুসরণ করা হয় না। কারণ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এক ব্যক্তি, পরিবার বা বলয়েই চলছে দল। এখানে তাদের কথাই মুখ্য; গঠনতন্ত্রের কোনো মূল্য নেই। ব্যক্তি ও পরিবার পূজা ইসলামি দলগুলোর বিকাশের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইসলামি রাজনীতি এখনও পরিচালিত হয় মসজিদ-মাদ্রাসাকেন্দ্রিক। বেশির ভাগ দলেরই মূল জনশক্তি কোনো না কোনো মাদ্রাাসা। সারা দেশ থেকে নানা মত ও পথের মানুষের সন্তানেরা রাজধানীর মাদ্রাসাগুলোতে পড়তে আসে। কিন্তু মাদ্রাসাটি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের বলয়ে হলে ওই ছাত্রটিকেও বাধ্যতামূলক এই দলটির কর্মী হয়ে যেতে হয়। কোনো ইস্যুতে মিটিং-মিছিলের প্রয়োজন হলে তাকে নামতে হয় রাজপথে। ওই দলটির মূল জনশক্তি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা। তারা কেউ বুঝে আবার কেউ বাধ্যতামূলকভাবে দলীয় কর্মী হয়ে মাদ্রাসা পরিচালক বা কর্তৃপক্ষের রাজনীতির হাতিয়ার হন। এর বাইরে জনসাধারণের মধ্যে ইসলামি দলগুলোর নেই তেমন কোনো প্রভাব। কেউ কেউ পীর হিসেবে মুরিদদেরও দলীয় কর্মী মনে করেন। কিন্তু নির্বাচনের সময় ওই মুরিদেরাও দলকে ভোট দেয় না।

সাধারণ মানুষদের সঙ্গে ইসলামি দলগুলোর তেমন কোনো যোগসূত্রতা নেই। সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের ভাগীদারও হয় না ইসলামি দলগুলো। শুধু ধর্মীয় কোনো ইস্যু তৈরি হলেই ইসলামি দলগুলো সরব হয়। অন্যথায় তেমন কোনো কার্যক্রমই থাকে না এ দলগুলোর। সাধারণ মানুষের নিত্যনৈমিত্তিক নানা সমস্যার ব্যাপারে মাথা ঘামান না ইসলামি দলের নেতারা। ইসলাম সম্পর্কে কেউ কটূক্তি করলে ইসলামি দলগুলো বক্তৃতা-বিবৃতিতে যেভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে সেটা দেখা যায় না জাতীয় কোনো ইস্যুতে। এসব কারণে ইসলামি দলগুলোর প্রভাব দিন দিন কমে আসছে। এক সময় দেশের শীর্ষ আলেমরা ইসলামি দলগুলোর নেতৃত্ব দিতেন। কিন্তু এখন এসব দলে প্রকটভাবে দেখা দিয়েছে নেতৃত্ব সংকট। তাছাড়া নীতি ও আদর্শের প্রশ্নে বারবার আপস করায় ইসলামি দলগুলোর ভেতরেই তৈরি হয়েছে সংকট। তাদের নিজেদের কর্মী সংখ্যা তেমন বাড়ছে না, বরং উল্টো দলীয় কর্মীরা নানা কারণে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছে। সবমিলিয়ে ধর্মভিত্তিক দলগুলো এখন ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে।