Home » বিশেষ নিবন্ধ (page 10)

বিশেষ নিবন্ধ

মোদি’তে ইসরাইলের এত আগ্রহ কেন?

মোহাম্মদ হাসান শরীফ ::

ভারতের প্রথম সরকার প্রধান হিসেবে ইসরাইল সফর করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। একে খুবই সফল সফর হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেওয়ার আগে যখন পোল্যান্ডে যাচ্ছিলেন, সেদিনই শেষ হলো মোদির ইসরাইল সফর।

অস্তিত্বের শুরু থেকেই ইসরাইলের বেশির ভাগ মিত্র পাওয়া গিয়েছিল পাশ্চাত্যে। জনসংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে বড় দুই দেশ চীন ও ভারত আরবদের সমর্থন দিয়েছিল; ইসরাইলের সাথে দেশ দুটির কূটনৈতিক সম্পর্কও ছিল না।

অনেক বছর ধরেই ভারত ছিল বিশেষভাবে ইসরাইলের প্রতি বৈরী। ভারতের নেতৃত্বে থাকা জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন অনেকবারই ইসরাইল বিরোধী ঘোষণা দিয়েছে।

অতীতে ইসরাইলী-ফিলিস্তিনী সংঘাতে ভারত ভারসাম্যপূর্ণ ও স্পর্শকাতর দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করে আসছিল। মোদিই এই ঐতিহ্যের পুরোপুরি ও বেপরোয়া লংঘন ঘটালেন। তিনি ফিলিস্তিনীদের সাথে সাক্ষাত করার গরজই অনুভব করেননি। এমন অবস্থায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এটা বৈশ্বিক-ব্যবস্থায় সবচেয়ে বড় ধরনের জোটগত পুনর্গঠন হিসেবেও আখ্যায়িত করেছেন অনেক।

চীন ও ভারতের সাথে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে ১৯৯২ সালে। একদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন, অন্যদিকে ওসলো শান্তি-প্রক্রিয়া নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। তখন থেকেই চীন, ভারত এবং আরো অনেক দেশের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে ফেলল ইসরাইল।

শুরুতে চীন ও ইসরাইল উভয়ের সাথে ইসরাইলের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হতে থাকে ধীরে ধীরে। কিন্তু গত কয়েক বছরে উভয় দেশের সাথে বাণিজ্য বেড়েছে দ্রুত। ১৯৯২ সালে ইসরাইলের সাথে ভারতের বাণিজ্য ছিল ২০ কোটি ডলার। গত বছর তা দাঁড়িয়েছে ৪২০ কোটি ডলার। অন্যদিকে, চীনের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক আরো নাটকীয়ভাবে বড়েছে। ১৯৯২ সালে যেখানে ছিল মাত্র ২ কোটি ডলার, সেখানে গত বছর দাঁড়িয়েছে ৭৭০ কোটি ডলারে।

শুরুতে বেশির ভাগ বাণিজ্যই ছিল সামরিক সরঞ্জাম খাতে। আমেরিকার আপত্তির কারণে চীনের সাথে অস্ত্র বাণিজ্য সীমিত হলেও ভারতের সাথে সেটা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। তবে চীন ব্যাপকভাবে ইসরাইলী প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিনিয়োগ করে। নতুন প্রতিষ্ঠান এবং প্রতিষ্ঠা কোম্পানি- উভয় দিকেই নজর ছিল চীনাদের।

বাণিজ্য সম্পর্ক বাড়লেও সাম্প্রতিক সময়ের আগে পর্যন্ত চীন ও ভারত উভয় দেশের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিল অনেকটাই নিম্ন পর্যায়ের। তবে চলতি বছর এই অবস্থা বদলে গেছে। গত মে মাসে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ২৫ বছর উদযাপন উপলক্ষে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল নিয়ে চীন সফর করেন। আর অতি সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী সফর করলেন ইসরাইল, যেটাকে কেবল পারস্পরিক ‘ভালোবাসা প্রকাশের প্রতিযোগিতা’ হিসেবেই কেবল বর্ণনা করা যায়।

এমন পরিবর্তন কেন ?

এর তিনটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, ‘স্টার্ট-আপ ন্যাশন’ হিসেবে ইসরাইলের খ্যাতির কারণে চীন বা ভারতের পক্ষে দেশটিকে অগ্রাহ্য করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্রেও পরিণত হয়েছে দেশটি। ইসরাইলে এমন সব বিভিন্ন ধরনের পণ্য নিয়ে গবেষণা ও উন্নয়ন ঘটিয়েছে, যেদিকে চীন বা ভারত আগে নজর দেয়নি। উভয় দেশের সাথে সরাসরি বাণিজ্য এখন বিপুল হলেও, পরোক্ষ বাণিজ্য আরো বিশাল। উভয় দেশই ইসরাইলের সাথে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার মাধ্যমে ব্যাপকভাবে লাভবান হচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, চীন ও ভারত উভয় দেশেরই বিপুল সংখ্যায় মুসলিম সংখ্যালঘুর আছে এবং তারা উভয়েই সন্ত্রাসবাদের ননানাদিক নিয়ে ভীত। পশ্চিম তীরে ইসরাইলী নীতিতে তারা একমত না হলেও ইসরাইলের সাথে উভয় দেশই ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা সহযোগিতায় আগ্রহী।

তৃতীয়ত, আরব দেশগুলোর দুর্বলতা। উপসাগরের অনেক দেশই এখন ইসরাইলের সাথে সহযোগিতা করছে। ফলে ভারত ও চীন উভয়ের জন্যই এখন ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক উন্নতি ঝুঁকিমুক্ত হয়ে পড়েছে।

আরেকটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে, নেতানিয়াহুর সফরের আগে মোদি যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে কোলাকুলি সেরে আসেন। আবার গত মাসে পুতিনের সাথে সাক্ষাত করে মোদি তাকে ‘সহজাত মিত্র’ হিসেবে অভিহিত করেন। ব্যাখ্যা করলে কী দাঁড়ায়? পশ্চিম ইউরোপ ইতোমধ্যেই ট্রাম্পের প্রতি বৈরী হয়ে ওঠেছে। জার্মানি তো ট্রাম্পকে চোখের বালি মনে করছে। ইউরোপের দৃষ্টিতে ইউরোপের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে ট্রাম্পকে তাদের প্রতিরোধ করতেই হবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এমন অবস্থা আর দেখা যায়নি। ৩০ বছর আগে বিশ্ব মোটামুটিভাবে উদার গণতন্ত্র এবং কমিউনিস্ট ব্যবস্থায় বিভক্ত ছিল। এখন উদার গণতন্ত্রের সাথে লড়াই হচ্ছে স্বৈরতান্ত্রিক প্রতাপশালীদের মধ্যে। মোদি, ট্রাম্প, নেতানিয়াহু, পুতিন- কি এক কাতারে পড়ছেন না?

মোদিকে ইসরাইলে স্বাগত জানানোর জন্য নেতানিয়াহু তার মন্ত্রিসভার সব সদস্যকে বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানানোর ব্যবস্থা করেন। এই সফরটি যাতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সমপর্যায়ের হয়, তার সব আয়োজন নিশ্চিত করেন নেতানিয়াহু। মোদির ইসরাইলে অবস্থানের পুরোটা সময় নেতানিয়াহু তার সাথে ছিলেন।

রাস্তায় লোকজনও মোদিকে বিপুল আগ্রহভরে গ্রহণ করেছিল। স্থানীয় এক ব্যবসায়ী না বলে থাকতে পারেননি এবং তিনি বারবার বলছিলেন, ‘আমেরিকা যখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে, তখন মোদির উষ্ণ সফরটি অবশ্যই দারুণ বিষয়’।

এই সফরকে কেন্দ্র করে কয়েকটি বড় ধরনের প্রশ্ন এখন ঘুরপাঁক খাচ্ছে। চীন ও ভারতের সাথে সম্পর্ক গভীর করার মাধ্যমে ইসরাইল কি এখন নতুন মিত্রদের সন্ধান করছে? যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিম ইউরোপে তার ঐতিহ্যবাহী মিত্রদের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে ফেলতে যাচ্ছে?

ট্রাম্পের আমলে বিষয়টা বিশেষভাবে সত্য। একদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলে আসছেন, তিনি ইসরাইলের ঘনিষ্ঠ বন্ধু, অন্যদিকে মনে হচ্ছে, আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতি এলোমেলো হয়ে পড়েছে। এ কথাটাই জাতিসংঘ রাষ্ট্রদূত গর্বভরে বলেছেন, আমেরিকার নীতি এখনো পুরোপুরি অনিশ্চয়তাপূর্ণ।

অনেকেই নতুন দৃষ্টিভঙ্গি বেশ আগ্রহ নিয়ে গ্রহণ করছে। তারা মনে করছেন, চীন ও ভারতের সাথেই তাদের ভবিষ্যত। অবশ্য অনেকে এখনো ততটা উৎসাহী নয়। তাদের মতে, ইসরাইল প্রতিষ্ঠার আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তাদের সম্পর্ক রয়েছে। অভিন্ন মূল্যবোধ পোষণ করে দুই দেশ। তাছাড়া আমেরিকান ইহুদি সম্প্রদায়ের সমর্থনের কথাটা কিভাবে ভোলা যায়?

ইসরাইলের নতুন মিত্রদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার ব্যাপারে সন্দেহে থাকা লোকজন আরেকটি কথাও মনে করিয়ে দিচ্ছে। সেটা হলো যুক্তরাষ্ট্র সবসময় ইসরাইলের পক্ষে ভোট দিয়ে আসছে আর চীন তাদের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে। আর ভারত কিছু দিন ধরে কৌশলগত ভোট দানে বিরত থাকছে।

নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, ইসরাইল দুটির একটি বেছে নেওয়ার মতো কোনো সমস্যায় পড়েনি;  অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য যুদ্ধের কথাটা বাদ দিলে। এই মুহূর্তে প্রাচ্যে তার নতুন জনপ্রিয়তা ব্যাপকভাবে উপভোগ করছে। আবার ঐতিহ্যবাহী মিত্রদের সাথেও সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে।

তবে ইসরাইল যখন বিডিএসের (বয়কট, বিনিয়োগ প্রত্যাহার এবং অবরোধ) যে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, তখন পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে জনবহুল দুটি দেশের সাথে বিপুল সম্পর্ক ইসরাইলকে নিঃসঙ্গ করার তাদের প্রয়াসকে বিদ্রুপে পরিণত করছে। কারন ভারত আর ইসরাইল এখন প্রকাশ্যের ঘনিষ্ট বন্ধু ও মিত্র।

(নিউজ উইক ও দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট অবলম্বনে)

ব্রিটেন থেকে সামরিক পরিবহন বিমান কিনছে বাংলাদেশ

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন ::

বিমান বাহিনীর পরিবহন ক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে ব্রিটেনের কাছ থেকে দুটি সি-১৩০জে সি৫ কৌশলগত পরিবহন বিমান বাংলাদেশ কিনছে বলে খবর দিয়েছে ডিফেন্স ওয়ার্ল্ড.নেট। এ নিয়ে ব্রিটিশ সরকারের সাথে বাংলাদেশ সরকার একটি চুক্তি করেছে।

এর মাধ্যমে বাংলাদেশ এশিয়ায় নবম দেশ হিসেবে সি-১৩০জে সি৫ বিমান চালনাকারী দেশে পরিণত হতে যাচ্ছে। তবে এ ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি।

বাংলাদেশের পরিবহন বহরে বর্তমানে চারটি লকহিড সি-১৩০ই হারকিউলিস এবং দুটি এলইটি এল-৪১০ টারবোলেট পরিবহন বিমানও রয়েছে।

সি-১৩০জে-এ সি৫ সংস্করণে নতুন ‘অ্যালিসন এই’ টারবোপ্রপ ইঞ্জিন এবং ডাউটি অ্যারোস্পেস সিক্স-বেস্নডেড কম্পোজিট প্রপেলার সংযুক্ত করা হয়েছে। সি-১৩০জে বিমান কৌশলগত অভিযান, প্যারাস্যুট সংযুক্তি এবং পরিবহন কাজে ব্যবহার করা যায়।

আরেক জুনের স্মৃতি

ক্ষমতায় যদি সংখ্যাগরিষ্ঠতাসম্পন্ন সরকার থাকে, তখনই কেবল কর্তৃত্ববাদী শাসন ঘোষনা সম্ভব। আর কর্তৃত্ববাদী শাসন তখনই সম্ভব যখন সরকার প্রধান হিসেবে থাকেন  বিপুল কর্মক্ষম ও জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী……

ফ্যালি এস. নরিম্যান

অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ ::

আমার কাছে জুন হলো স্মৃতির মাস : ২৬ জুন ‘জরুরি অবস্থা ঘোষনা দিবস’- আমি এই নামেই একে অভিহিত করে থাকি, আগে দিয়ে ঘটা একটার পর একটা ঘটনা মনে পড়ে। ওই জরুরি অবস্থা ঘোষনা দিবসের কিছু স্মৃতি প্রকাশ করার সময় এখনই। মনে পড়ে ১৯৭৫ সালের ১২ জুন দিনটির কথা। ওই দিনই ইন্দিরা গান্ধীর বিরুদ্ধে রাজ নারায়নের দায়ের করা নির্বাচনী মামলার রায় প্রকাশ করে এলাহাবাদ হাইকোর্ট। এতে অসাধুতা অবলম্বনের দায়ে ইন্দিরা গান্ধীকে দোষী সাব্যস্ত করে ছয় বছরের জন্য সব ধরনের সরকারি পদ গ্রহণে তাকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। কয়েক দিন পর ইন্দিরার আইনজীবী জে বি দাদাচানজি আমাকে বলেছিলেন, ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল আবেদনের যুক্তি এবং স্থগিতাদেশ আবেদন (সুপ্রিম কোর্টে দাখিলের জন্য) পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করার জন্য ইন্দিরা গান্ধী তাকে ব্যক্তিগতভাবে অনুরোধ করেছিলেন। ওইসব নথিপত্র তৈরি করেছিলেন ইন্দিরার নিজস্ব সিনিয়র অ্যাডভোকেট ননি পালকিবালা। তারপরও অনুরোধ করায় তিনি বেশ পুলকিত হয়েছিলেন বলে জানান আমাকে। তিনি কাগজপত্র পুরোপুরি পরীক্ষা করে কিছু পরিবর্তনের পরামর্শ দেন।

আবেদন চূড়ান্ত হওয়ার সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় এবং আমি আইনমন্ত্রী এইচ আর গোখলের (স্থগিত আবেদনের ওপর শেষবারের মতো চোখ বুলিয়ে নিচ্ছিলেন) অফিসে ছিলাম। সিদ্ধার্থ ফোন তুলে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করলেন, কেবল তিনিই এ কাজটি করতে পারতেন। বললেন : ‘আমার কথাটা শুনুন।’ তিনি আবার বললেন, ‘না, ম্যাডাম, আমার কথাটা শুনুন।’ ‘ইন্দিরাজি আমার কথাটা শুনুন।’ একটু ‘শুনুন’- ‘এই আবেদনটি এখনই দাখিল করতে হবে।’ আমি ফোনের অপর প্রান্তে অন্য কারো উপস্থিতি টের পেলাম। ওই সময় ইন্দিরার আশপাশে ভিড় করে থাকা জ্যোতিষীরা আরেকটু শুভ সময়ে আবেদনটি দাখিল করার পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছিলেন! জ্যোতিষীদের পরামর্শে ভক্তি রেখে ১৯৭৫ সালের ২২ জুন আবেদনটি দেরিতে দাখিল করা হলো, অবকাশকালীন বিচারকের বেঞ্চে (বিচারপতি কৃষ্ণা আয়ার) স্থগিত আবেদনটি তালিকাভুক্ত করা হলো। ইন্দিরা গান্ধীর ব্যক্তিগত পছন্দের আইনজীবী পালকিবালা আবেদনের ওপর শুনানিতে অংশ নিলেন। তিনি ভালোভাবেই কাজটি করলেন, স্থগিতাদেশ প্রাপ্য ছিলেন।

পরদিন সন্ধ্যায় আমার স্ত্রী ও আমি ট্রেনযোগে মুম্বাই ছাড়ার সময় আমি ইভিনিং নিউজের একটি খবর পড়লাম। ভেতরের পৃষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ খবরটি প্রকাশ করা হয়েছিল। এতে বলা হয়েছিল, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিবকে বদলি করা হয়েছে। তার জায়গায় রাজস্থান থেকে এস এল খুরানাকে আনা হয়েছে। এই সময় কেনো এই বদলি করা হলো? তখন আমি বিষয়টির দিকে আর কোনো মনোযোগ দেইনি।

ওই সময় স্বরাষ্ট্রসচিব পদে হঠাৎ বদলি আমার কাছে তেমন কোনো ইঙ্গিতবহ বলে মনে হয়নি। পরে বুঝতে পেরেছিলাম, এটা ছিল সতর্কতামূলক প্রস্তুতি। কেবল সঞ্জয় গান্ধী এবং প্রধানমন্ত্রীর দুই-একজন ঘনিষ্ঠজন ছাড়া এই প্রস্তুতি-পর্ব সম্পর্কে কারোরই কোনো ধারণা ছিল না। যদি সুপ্রিম কোর্ট স্থগিতাদেশ খারিজ করে দেন, তবে এই বদলির আলোকে কাজ করা হবে বলে স্থির করা হয়েছিল। কৃষ্ণ আয়ারের নির্দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হলো ২৪ জুন। আমি তখন মুম্বাই। এটা ছিল শর্তসাপেক্ষ স্থগিতাদেশ। ‘অপারেশন ইমার্জেন্সি’ সাথেসাথে চালু হলো। তবে ভারতের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক দায়িত্বশীল রাষ্ট্রপতির সম্মতিহীনভাবে নয়।

ফখরুদ্দিন আলী আহমদের নেতৃত্বে আরো তিন প্রখ্যাত আইনজীবী এইচ আর গোখলে, এস এস রায় ও রজনী প্যাটেল (তারা সবাই কংগ্রেসের সদস্য) ঘোষণায় সই আনার জন্য ২৫ জুনের মধ্যরাতে গেলেন।

এমনকি ২৬ জুন মন্ত্রিসভার সদস্যরা অনুমোদনের আগেই এর আগের রাতেই জরুরি আইনের ঘোষণায় সই হয়ে গেছে এবং কার্যকরও হয়ে গেছে। ওই সময়ের মিসেস গান্ধীর মন্ত্রিসভার অন্যতম যোগ্য সদস্যের মন্তব্য আমার মনে পড়ছে। সকালের মন্ত্রিসভার বৈঠকে মিসেস গান্ধী তাকে জরুরি আইন জারি নিয়ে তার মতামত জানতে চাইলেন। বেশ কায়দা করে বাবুজি জবাবটা দিলেন, ‘ম্যাডাম, আপনি যখন সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছেন, তখন আমি আর কি বলবো?’

আমি ২৭ জুন বোম্বাই থেকে ডাকযোগে দিল্লিতে আইনমন্ত্রীর কাছে আমার পদত্যাগপত্র পাঠালাম। এতে বীরোচিত কিছু ছিল না।

এ ধরনের ঘটনা আমাদের কখনো ভুলে যাওয়া উচিত নয়। আপনারা যারা জরুরি আইনের অভিজ্ঞতা লাভ করেননি, বা এ নিয়ে খুব একটা পড়াশোনা করেননি, তাদের জেনে রাখা উচিত, ক্ষমতায় যদি সংখ্যাগরিষ্ঠতাসম্পন্ন সরকার থাকে, তখনই কেবল কর্তৃত্ববাদী শাসন ঘোষনা সম্ভব। ১৯৭৫ সালের জুনে ভারতে জরুরি আইন জারির সময় দেশটিতে ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার, সরকার প্রধান হিসেবে ছিলেন বিপুল কর্মক্ষম ও জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো সাংবিধানিক দায়িত্বশীলেরা এবং এমনকি সর্বোচ্চ আদালতের কয়েকজন বিচারক পর্যন্ত আমাদের হতাশ করেছেন।

২৫ জুন রাতে পার্লামেন্টের বিরোধী দলের সব এমপিকে প্রতিরোধমূলকভাবে আটক করা হলো, অবশ্য পার্লামেন্টের কার্যক্রম অব্যাহত থাকলো। লোকসভার স্পিকার পর্যন্ত এর প্রশংসা করে প্রকাশ্যে বললেন, এতে করে পার্লামেন্টের কাজকাম ‘আরো সাবলীলভাবে’ করা সম্ভব হবে। আর আদালত রায় দিল, তাদের উচিত পার্লামেন্ট কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করা, কিন্তু আটক থাকার কারণে যেতে পারেননি। কিন্তু তার পরও পার্লামেন্টের এ ধরনের কার্যক্রম বৈধ।

সর্বোচ্চ আদালতের এটা প্রথম লজ্জাজনক রায়। তবে এরপর তারা আরো লজ্জাষ্কর রায় দিয়েছিল (১৯৭৬ সালের এপ্রিলে এডিএম জাবালপুরে)। ওই রায়ে আদালতের সবচেয়ে সিনিয়র পাঁচ বিচারপতির চারজনই সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সংবিধানে প্রদত্ত ব্যক্তি স্বাধীনতার বিধানটি বাতিল করে দিয়েছিলেন। সাহস করে একমাত্র ভিন্নমত প্রকাশ করেছিলেন বিচারপতি এইচ আর খান্না। ভারতের প্রধান বিচারপতি হওয়ার জন্য পরম্পরায় তিনি তিন নম্বর স্থানে ছিলেন। ঐতিহ্য অনুযায়ী, সিনিয়রিটির আলোকেই প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত হয়ে থাকেন। তারপরও তিনি ব্যক্তিগত স্বাধীনতা লঙ্ঘনকে মেনে নিতে পারেননি।

১৯৭৫ সালের জুনে জরুরি অবস্থা জারির পর মিসেস গান্ধী ১৯৭৭ সালের জানুয়ারি নির্বাচনের আয়োজন করেছিলেন। তাতে তিনি পরাজিত হন। ওই সময় বেশির ভাগ মানুষেরই চিন্তায় ছিল, তিনি কি সেনাবাহিনী তলব করবেন? তার তত অবনতি ঘটেনি। তিনি কাজটি করেননি। তিনি কি জনগণের রায় মেনে নেবেন? কয়েকজন আইনজীবী-রাজনীতিবিদের পরামর্শ সত্বেও তিনি মেনে নিয়েছিলেন।  আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের এই ঘটনার ব্যাপারে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী জেমস কালাহানের মন্তব্যও স্মরণ করি। তিনি বলেছিলেন, সত্যিকারের গণতন্ত্রের চূড়ান্ত নিদর্শন হলো, নির্বাচনে পরাজয় বরণকারী সরকারের স্বেচ্ছায় তার বিরোধীদের কাছে ক্ষমতা সমর্পণ করার আগ্রহ।

(লেখক : ভারতের সাংবিধানিক আইন বিশেষজ্ঞ এবং সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট)

গুম : যার উত্তর মিলছে না

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

ফরহাদ মজহার অপহরন ঘটনার আপাত: পরিসমাপ্তি ঘটেছে অনেক প্রশ্ন, অনেক নাটকীয়তা নিয়েই। তিনি কিডন্যাপ করার বর্ণনা পুলিশের কাছে দিয়েছেন, আদালতেও জবানবন্দী দিয়েছেন। পুলিশ বলেছে, তদন্ত করে দেখবেন, জবানবন্দীর সত্যতা। বিএনপি সরকারকেই দায়ী করছে এই অপহরণের জন্য এবং তাদের ভাষায় চাপ সহ্য করতে না পেরে সরকার তাকে ছেড়ে দিয়েছে। তারা আরও বলেছেন, ভারতে মুসলিম নিধন এবং গো-মাংস নিষিদ্ধের প্রতিবাদ করায় মূলত: ফরহাদ মজহারকে এই পরিনতি বরণ করতে হয়েছে।

গত সাড়ে তিন বছরে ফরহাদ মজাহারের মত ‘রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ’ বা অপহৃতদের মধ্যে পরিবারে ফিরতে পেরেছেন মাত্র ২৭ জন। ফিরে আসার এসব ঘটনায় প্রতিটিতে কম-বেশি সমিল লক্ষ্য করা যায়, যেমনটি ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধের ভাষ্য থাকে একই রকম। ঘটনাগুলি মোটামুটি ছক বাঁধা। একটি বড় অংশকে অপহরণের পর ‘উদভ্রান্ত’ বা ‘অপ্রকৃতিস্থ’ অবস্থায় দেশ-বিদেশের কোন সড়কে পাওয়া যায়। ফিরে আসার পরে তারা প্রায়শ: ‘রহস্যজনক স্মৃতিভ্রষ্টতার’ শিকার হন।

২০১৪ সাল থেকে ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত তথাকথিত নিখোঁজ এবং অপহরণ ও গুমের শিকার হয়েছেন ২৮৪ জন। তাদের মধ্যে ৪৪ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। গ্রেফতার দেখানো হয়েছে ৩৬ জনকে এবং পরিবারে ফেরত এসেছেন ২৭ জন। বাকি ১৭৭  হতভাগ্যের কি ঘটেছে জানা যায়নি। আজতক তাদের হদিস মেলেনি। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশকেন্দ্রের ওয়েবসাইট থেকে এই তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এর কোন ঘটনায় অনুসন্ধান, তদন্ত বা বিচার প্রক্রিয়া এগোয়নি।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে ২০১৩ সাল থেকে শত শত মানুষকে অবৈধভাবে আটক করে গোপনে স্থানে লুকিয়ে রাখা হয়েছে বলে উল্লেখ করেছে। প্রতিবেদনে ২০১৬ সালে ৯০ জনকে গুম করা হয়েছে বলে বিস্তারিত তথ্যাদি দেয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে এবছরের প্রথম ৫ মাসেই ৪৮ জনকে গুম করা হয়েছে বলে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়। এছাড়াও আইন শৃংখলা রক্ষাবাহিনীকে এ কাজ পরিচালনায় অবাধ স্বাধীনতা প্রদান করা হয়েছে বলেই প্রতীয়মান হয় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এমনকি মানবাধিকার, মানুষের জীবন ও আইন প্রতি তোয়াক্কা না করাকে সরকারের একটি অভ্যাসে পরিণত হয়েছে বলেও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ওই প্রতিবেদনে বলেছে।

১৬ এপ্রিল ২০১৪ ব্যবসায়ী আবু বকর সিদ্দিক ঢাকা-নারায়নগঞ্জ লিংক রোড থেকে অপহৃত হন। তিনি বাংলাদেশের বিশিষ্ট পরিবেশ আইনবিদ রিজওয়ানা হাসানের স্বামী। অপহরণের ৩৪ ঘন্টা পর চোখ বাঁধা অবস্থায় তাকে মীরপুর রোডে নামিয়ে দেয়া হয়। বাঁধন খুলে কলাবাগানে পুলিশ চেকপোষ্টে আসলে তাকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং জবানবন্দী রেকর্ড করে ছেড়ে দেয়া হয়। এই অপহরণ ঘটনায় দায়েরকৃত মামলাটি হিমাগারে চলে গেছে।

রাজনীতিবিদ মাহমুদুর রহমান মান্না ২০১৫ সালে ২৩ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাতে বনানী থেকে ‘নিখোঁজ’ হন এবং ২১ ঘন্টা পরে পুলিশ তাকে ধানমন্ডী থেকে গ্রেফতার দেখায়। বনানী থেকে সাদা পোষাকধারী পুলিশরা তুলে নিয়ে গেছে বলে তার স্বজনরা অভিযোগ করলেও পুলিশ, র‌্যাব অস্বীকার করে। খুব কমক্ষেত্রেই রাষ্টদ্রোহীতা ও নাশকতা সৃষ্টির অভিযোগ এনে তাকে জেলে রাখা হয়। এরকম স্পর্শকাতর অভিযোগে দায়েরকৃত মামলাটির তদন্ত এগোচ্ছে না বা আদৌ কি হয়েছে জানা যায় না।

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও সে সময়ের মুখপাত্র সালাহউদ্দিন আহমেদ ঢাকার উত্তরা থেকে ‘রহস্যজনক নিখোঁজ’ হন। ৬২ দিন পরে ভারতের শিলংয়ের একটি সড়কে উদভ্রান্ত ও অপ্রকৃতিস্থ অবস্থায় ঘোরাঘুরিরত সালাহউদ্দিনকে পায় ভারতীয় পুলিশ। গণমাধ্যমকে তিনি বলেছিলেন, স্বেচ্ছায় ভারতে যাননি, যারা অপহরণ করেছে তারাই তাকে ভারতে নিয়ে গেছে। এর বেশি তিনি কিছু বলেননি। সালাহউদ্দিনের বিষয়টি নিয়ে বর্তমানে কোন উচ্চ-বাচ্য নেই, এমনকি তার দলও ভুলে গেছে তার কথা!

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির পরে গণমাধ্যমে সাক্ষাতকারদাতা তথ্য ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ তানভীর আহমেদ ২০১৬ সালের ১৬ মার্চ দিনগত রাতে ‘নিখোঁজ’ হন। ৫ দিন পরে এয়ারপোর্ট রোডে উদভ্রান্ত অবস্থায় হাঁটতে থাকা তানভীরকে পুলিশ বাড়ি পৌঁছে দেয়। এই ‘নিখোঁজের’ বিষয়ে কিছুই জানা যায়নি। ঢাকার আদালত পাড়া থেকে নিখোঁজ বিএনপি নেতা হুম্মাম কাদের চৌধুরী ২০১৬ সালের ৪ আগষ্ট ‘নিখোঁজ’ হয়ে সাত মাস পরে অজ্ঞাতস্থান থেকে বাড়ি ফিরে আসলেও কেউ এ বিষয়ে মুখ খোলেনি।

নিখোঁজ, অপহরণ, গুম-যাই বলা হোক- এর শিকার মানুষটির নিকটজনরা প্রায়শ: যে অভিযোগটি করেন-আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তাদের তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। যারা ফিরতে পারেন ভাগ্যের জোরে তাদের বক্তব্যও একইরকম। মাইক্রোবাসে তুলে চোখ বেঁধে তাদের অজ্ঞাতস্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এটুকু বলে আর কিছু মনে করতে পারেন না বা বলেন না  এবং স্রেফ বোবা বনে যান।

ফিরে আসার পর ফরহাদ মজহারের বক্তব্যও ওই একইরকম। পুলিশকে তিনি জানিয়েছেন, শ্যামলীতে তার বাসার সামনে থেকে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে চোখ বেঁধে ফেলা হয়। এরপর তিনি কিছুই জানেন না। কিন্তু চাঞ্চল্যকর হচ্ছে, ‘‘সরকারকে বিব্রত করতে সন্ত্রাসীরা এ কাজ করে থাকতে পারে বলে ফরহাদ মনে করেন’’। ভাবুন তো, জামায়াত-বিএনপি ঘরানার কট্টরপন্থী বুদ্ধিজীবি ফরহাদ মজহার এরকমটিই মনে করছেন! প্রশ্ন উঠেছে, যা ঘটেছিল সেটি কি ফরহাদ মজহার ইচ্ছেকৃত চেপে যাচ্ছেন অথবা নির্দেশিত হয়ে? এ প্রশ্নের উত্তর খুব সহসাই মিলবেনা।

লেখক, কবি, বুদ্ধিজীবি ফরহাদ মজহার কি ঠিক করেছিলেন যে থ্রিলার লিখবেন? এডগার এ্যালান পো’র মত নিজেই থ্রিলারের কেন্দ্রীয় চরিত্র হবেন? সেজন্যই কি সাতসকালে খুলনা যাত্রা করেছিলেন ব্যাগেজ ছাড়াই এবং গফুর নামে টিকিট কেটে ফেরার পথে ব্যাগেজ জোগাড় করে নিয়েছিলেন? নাকি কোন সাজানো মঞ্চে ঈদোত্তর বিশেষ একটি নাটকে মহড়া দিয়ে এলেন। খুব সহসাই এ রহস্যের উন্মোচন হচ্ছে না। পুলিশের খুলনার রেঞ্জ ডিআইজি’র মতে, তিনি ভ্রমনরত অবস্থায় ছিলেন।

ফরহাদ মজহার যদি দিনভর একটি নাটকে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করে থাকেন, তাহলে প্রশ্ন আসবে নাটকের রচয়িতা, পরিকল্পনাকারী ও নির্দেশক কে? এটি কি তিনি নিজেই নাকি বিএনপির দাবি অনুযায়ী সরকার বা কোন এজেন্সি । কিংবা এমন কোন রাজনৈতিক দল যারা অতীত-বর্তমানে এরকম রহস্যজনক নাটক মঞ্চস্থ করতে ও করাতে বিশেষ পারঙ্গমতা অর্জন করেছে।

অনেক প্রশ্ন মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। তিনি এবং তার পরিবারের পক্ষ থেকে শুরু থেকেই বলা হচ্ছিল এটি অপহরণ। বাসা থেকে বের হবার সামান্য পরেই সকাল সাড়ে ৫টার দিকে মোবাইল ফোন করে তার স্ত্রীকে জানালেন, “ওরা আমাকে নিয়ে যাচ্ছে। ওরা আমাকে মেরে ফেলবে”। এই ‘ওরাটা’ কারা সেটি হচ্ছে মূল রহস্যের জায়গা। সরকারের দায়িত্ববান কর্মকর্তারা বলছেন, তিনি ভ্রমন করছিলেন। ক্ষমতাসীন দলের সাধারন সম্পাদক মন্তব্য না করেই পুলিশি তদন্তের হাতে ছেড়ে দিয়েছেন।

সব মিলিয়ে রহস্যোপনাসের প্লট বলে মনে হচ্ছে! কিন্তু দুর্বল গাঁথুনির। ফাঁক-ফোঁকড় অনেক। সত্যি কি ওষুধ কেনার জন্য তিনি বাসা থেকে বেরিয়েছিলেন? নাকি কারো ফোনকলে সাড়া দিয়ে বেরিয়েছিলেন? অপহরণের পরে তাকে ফোন করার সুযোগ দেয়া হয়েছিল এবং তারা ৩৫ লাখ টাকা মুক্তিপণও দাবি করেছে। এরপরে ফোন বন্ধ হয়ে যায়। নাটক নাকি ঘটনা এগিয়ে চলে। জানা যায় ফরহাদ মজহার খুলনায়। রাত ১১ টায় হানিফের গাড়ি থেকে উদ্ধার। সরকারী ভাষ্য, তিনি ভ্রমন করছিলেন।

মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেছেন, “একজন অপহরণ বা নিখোঁজ হওয়ার নির্দিষ্ট সময় পর যদি সরকার বা আইন-শৃংঙ্খলা বাহিনী তার সম্পর্কে কিছু বলতে না পারে তখন সাধারন মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে”। আইনজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, একটা ঘটনারও সুরাহা হয়েছে বলে জানা যায়নি। কারো কোন শাস্তিও হয়নি। ফলে জন-পারসেপশন হচ্ছে, সরকারের সমালোচকদের ক্ষেত্রে রহস্যজনক নিখোঁজের ঘটনা বেশি ঘটছে। এটি দুর করতে হলে অবশ্যই অপরাধীদের খুঁজে বের করে বিচারের সম্মুখীন করতে হবে।

 

পাকিস্তানে চীনা সামরিক ঘাঁটি

আসিফ হাসান ::

চীন তার সামরিক বাহিনীর সামর্থ্য বাড়াচ্ছে, সেইসাথে তার শক্তি প্রদর্শনের সক্ষমতাও গড়ে তুলছে। আর এই লক্ষ্যেই দেশটি বিদেশের মাটিতে দ্বিতীয় ঘাঁটি প্রতিষ্ঠা করার পরিকল্পনা করছে। পাকিস্তানকেই দ্বিতীয় ঘাঁটি স্থাপনের জায়গা হিসেবে বেছে নিয়েছে। সম্প্রতি চীনা সামরিক বাহিনী সম্পর্কে এক প্রতিবেদনে পেন্টাগন এসব কথা জানিয়েছে।

চীনা গণমুক্তি বাহিনী (চায়না পিপলস আর্মি, পিএলএ) বিদেশের মাটিতে প্রথম ঘাঁটি স্থাপন করেছিল ‘হর্ন অব আফ্রিকা’ হিসেবে পরিচিত জিবুতিতে। গত বছরের ফেব্রæয়ারিতে এর নির্মাণকাজ শুরু হয়। আগামী বছর তা শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। চীন আগে বলেছিল, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে আরো বেশি অংশগ্রহণ, সোমালিয়া এবং এডেন উপসাগরীয় এলাকার আশপাশের পানিসীমায় পাহারা কার্যক্রম চালানো এবং মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে তারা এই ঘাঁটিটি প্রতিষ্ঠা করছে।

পেন্টাগনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদেশের মাটিতে ঘাঁটি স্থাপন করা হলে চীন আরো ভালোভাবে এসব কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে। তবে বিদেশে ঘাঁটি নির্মাণে চীনা সামর্থ্য ‘হয়তো দেশগুলোকে তাদের বন্দরে পিএলএ’র উপস্থিতি সমর্থন করতে রাজি হতে বাধ্য করবে।’

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, চীনা নেতারা তাদের সামরিক বাহিনীর ভীতি সৃষ্টিকারী সামর্থ্য বৃদ্ধি, বৈরী শক্তির আস্ফালন প্রতিরোধ এবং তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ মোকাবিলা করার দিকে নজর দিয়ে যাচ্ছেন। এ কারণেই শক্তি প্রদর্শন ক্ষমতা চীনা বলয়ের বাইরেও ছড়িয়ে দেওয়ার বিষয়টি পিএলএ’র আধুনিকায়ন কর্মসূচিতে অনেক বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

তাদের এই আধুনিকায়ন কর্মসূচির অংশ হিসেবেই তারা পূর্ব চীন সাগরে ৪০টিরও বেশি বিমান মোতায়েন করেছে, ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে মিয়াকো প্রণালী ও ফিলিপাইন সাগরে বিশেষ ধরনের প্রশিক্ষণ পরিচালনা করেছে। চীনাদের মোতায়েন করা জিয়ান এইচ-৬কে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ক্যারিয়ার গুয়ামে মার্কিন ঘাঁটিতে আঘাত হানতে পারে বলে পেন্টাগন ধারনা করছে। এইচ-৬কে হলো আধুনিকায়ন করা চীনা নির্মিত, সোভিয়েত আমলের টোপোলেভ টু-১৬ ‘ব্যাজার’ সাবসনিক বোমারু বিমান। এগুলো দূরপাল্লার আক্রমণে ব্যবহার করা যায়। আর ব্যালাস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাণের দিক থেকে চীন এখন শীর্ষ পর্যায়ের দক্ষতা অর্জন করেছে বলেও পেন্টাগনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। চীনের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থাও উন্নত হচ্ছে। তাদের এইচকিউ-১৯ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থা তিন হাজার কিলোমিটার পাল্লার ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও রুখে দিতে পারে।

চীনা সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়ন কর্মসূচির আওতায় সেনা, নৌ ও বিমান- সব বাহিনীর শক্তি বৃদ্ধির বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে বলেও পেন্টাগন মনে করছে।

চীনা নৌবাহিনী অত্যন্ত দ্রুতগতিতে টাইপ ০৫২ ফ্লিট ডিফেন্স ডেসট্রয়ার, টাইপ ০৫৪ ফ্রিগেট নির্মাণে এগিয়ে যাচ্ছে বলেও প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে।

প্রতিবেদনটিতে চীনা সামরিক কার্যক্রম সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকা প্রদান করা হলেও বেশ কিছু দুর্বলতাও চোখে পড়েছে। ডিফেন্স নিউজের মতে, পেন্টাগনের প্রতিবেদনে বেশ কিছু ভ্রান্তি বা সেকেলে তথ্য রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীন চেঙদু-জে-২০ পঞ্চম প্রজন্মের জঙ্গিবিমানের উৎপাদন বাড়াচ্ছে। কিন্তু খবর হলো, গত বছরই চীন এই বিমানের উৎপাদন হার কমিয়ে দিয়েছে।

তাছাড়া প্রতিবেদনে যেসব মানচিত্র ও ইনফোগ্রাফিকস ব্যবহার করা হয়েছে, সেগুলোতে ত্রæটি সহজেই চোখে পড়ে। যেমন হাইনান দ্বীপে চীনা গুরুত্বপূর্ণ নৌবাহিনী ঘাঁটিটির কথা প্রতিবেদনে উল্লেখই নেই। আবার চীনের নর্দার্ন থিয়েটর কমান্ডের বিমান ঘাঁটিটিকে ভুল করে বিমান বাহিনীর বোমারু বিমান ঘাঁটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

আবার চীন নিজেও পেন্টাগনের প্রতিবেদনটি প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, তাদের শক্তি প্রদর্শনের কোনো পরিকল্পনা নেই।

যুক্তরাষ্ট্র হয়তো চীনা সামরিক শক্তি সম্পর্কে ফুলিয়ে ফাপিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। আবার চীনও তাদের সুপ্ত ইচ্ছাটিও অস্বীকার করেছে। দুই বক্তব্যের মাঝামাঝি কিছু একটা কিন্তু থাকতেই পারে। চীনের ‘‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’’- ইনিশিয়েটিভ যেসব দেশের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেছে, সেগুলোর কয়েকটিতে অস্থিতিশীল উপাদান তীব্রভাবে সক্রিয় রয়েছে। চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর ওই প্রকল্পেরই অংশবিশেষ। আর পাকিস্তানে ওই করিডোরের গুরুত্বপূর্ণ অংশটি উত্তপ্ত বেলুচিস্তানে অবস্থিত। সেটার নিরাপত্তা বিধানের জন্য চীন যদি সেখানে সৈন্য মোতায়েন করে, তবে তাতে কি আশ্চর্য হওয়ার কিছু আছে? আফগানিস্তানের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্ক ভালো নয়। ভারতের সাথে তো নয়ই। ভারত ওই চীনা প্রকল্পের বিরোধিতা করছে প্রকাশ্যেই। ফলে প্রকল্পটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি চীনাদের মধ্যে থাকবেই।

চীনা প্রকল্পটির অন্যান্য অংশের ব্যাপারেও একই কথা প্রযোজ্য। বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্য আমাদের আরো কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে বৈকি।

কেনো উন্নয়ন, কাদের জন্য উন্নয়ন

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন ::

অর্থনীতিবিদরা বলেন, উন্নয়ন হচ্ছে মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধি। অর্থাৎ উন্নয়ন তাকেই বলা হয়- যা মানুষের কাজের ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। যেমন পদ্মা সেতু নির্মিত হলে সংযুক্ত জনপদগুলোর জনগণের কর্মক্ষমতা অনেক বেড়ে যাবে । যদি এ সেতুর সংযোগ সড়ক না থাকে, তবে মানুষের কোনো সক্ষমতা বাড়বে না। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যাচ্ছে, বিভিন্ন আমলে সড়কবিহীন শত শত সেতু গ্রামেগঞ্জে ছড়িয়ে রয়েছে যেগুলো শুধু অর্থ লোপাটের প্রতিমূর্তি। বিদ্যুৎবিহীন শত শত খাম্বার কথা ভাবুন। এসব তথাকথিত উন্নয়ন কার্যক্রম মানুষের কাজের ক্ষমতা এক বিন্দুও বাড়ায়নি, বরং ক্ষেত্র বিশেষে ব্যাহত করেছে। তাই উন্নয়ন প্রকল্পগুলো হতে হবে সঠিক জায়গায় ও মানুষের ব্যবহার উপযোগী। অমর্ত্য সেন ভারতবর্ষ ও বাংলাকে দিক নির্দেশনা দিয়ে বলেছেন, অর্থনৈতিক প্রগতি ও সর্বত্র সুষম উন্নয়নের জন্য মানবিক উন্নয়নই এ সময়ের অর্থনৈতিক প্রগতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানবিক উন্নয়ন বলতে মানবসম্পদ, শিক্ষা, চিকিৎসা, পারিবারিক সক্ষমতা অর্জনকে বোঝাতে চেয়েছেন তিনি। আর নাগরিকের এ  মৌল অধিকারগুলোর নিশ্চয়তা দিতে হলে রাষ্ট্র ও সরকারকেই এ ব্যাপারে মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হবে। এ বিষয়ে অমর্ত্য সেন বলেছেন, ভারতবর্ষ ও বাংলায় আর্থ-সামাজিক বৈষম্যের মূলে রয়েছে দরিদ্র মানুষের মৌল অধিকার রক্ষায় সরকারের অপর্যাপ্ত ও লক্ষ্যভ্রষ্ট নীতি সহায়তা ও মন্থর উন্নয়ন কার্যক্রম। একইভাবে চতুর ও সুবিধাভোগী শ্রেণীর ঠগবাজি, ব্যক্তিকেন্দ্রিক ব্যবসার উত্থান এবং তা মানবিক উন্নয়নে ব্যবহার না হওয়া। বিশেষ করে শিক্ষা, চিকিৎসা ও মানবসম্পদ উন্নয়নের মতো মৌল কার্যক্রমগুলো অতিমাত্রার বাণিজ্যিক হয়ে পড়ায় তা সর্বসাধারণের কাছে দুর্লভ ও দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। অমর্ত্য সেন অর্থনৈতিক প্রগতির সঙ্গে মানবিক প্রগতির যোগসূত্র রয়েছে এমনটি স্বীকার করে নিয়েও জোড়ালোভাবে বলেছেন, বেসরকারি খাত দিয়ে কখনও মানবিক উন্নয়ন করা যায় না। অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূলস্রোতে বেসরকারি খাত মুখ্য ভূমিকা রাখলেও মানবিক প্রগতির বিষয়টি কার্যত বেসরকারিখাতের নজরে অবহেলিতই থেকে যায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে দরিদ্র মানুষের এসব অভাব পূরণে রাষ্ট্র কিংবা সরকার যদি তা উন্নয়নে কার্যকরী ভূমিকা না রাখে কিংবা রাখলেও সেটি অপর্যাপ্তই থেকে যায়- তাহলে সমাজে বৈষম্য তৈরি করে।

অমর্ত্য সেন বলেন, বাণিজ্য বাড়লে অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটে। অর্থনৈতিক উন্নতি হলে বেসরকারি খাত সম্প্রসারিত হয়। বেসরকারি খাত বড় হলে মানুষের আয় বাড়ে। এতে ওইসব মানুষের দারিদ্র্য দূর হয়। যখন মানুষে সম্পদ পায় তখন সে উৎসাহিত হয়। এতে তার বিনিয়োগ প্রবণতাও বাড়ে। এর দ্বারা সরকারের রাজস্বও বাড়ে। এভাবেই অর্থনৈতিক প্রগতি ঘটে থাকে। অমর্ত্য সেন বলেন, মানবিক উন্নয়নের দিকে সরকারের নজর না থাকলে বাণিজ্যিক শিক্ষা, চিকিৎসা দিয়ে গণমানুষের চাহিদা পূরণ হয় না। এ ধরনের ব্যবস্থায় ধনীরা সেবা পেলেও, বঞ্চিত হয় গরিব মানুষ। কারণ বাণিজ্যিকীকরণের ফলে এসব সেবার মূল্য বাড়ে এবং সেটি সাধারণের সক্ষমতার বাইরে চলে যায়। তার মতে, এ পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক উন্নয়নে সরকার যতই মনোযোগী হোক না কেন, তা একটা সময় স্থির হয়ে যেতে পারে। মানবিক উন্নয়নের খাতগুলোতে উন্নয়নের দৃষ্টি রাখতে হবে। আর সেটি সরকারকেই করতে হবে। বিশেষ করে দেশের সব নাগরিকের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চিকিৎসার সহজলভ্যতা এবং নারী উন্নয়নসহ মানব উন্নয়নের সর্বদিক নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে।

ব্যক্তি, দেশ ও সমাজ প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়ে চলেছে। সবার স্বপ্ন এগিয়ে যাওয়া। কিন্তু সবাই সমান অগ্রগতি লাভ করতে পারে না। কেউ কেউ পিছিয়েও যায়। কে কি পরিমাণ আগোতে পারছে বা আদৌ পারছে কিনা, না পারলে কেন, এসব জানার দরকার পড়ে। দেশের অগ্রগতি পরিমাপের জন্য সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু পদ্ধতি চালু হয়েছে। জাতীয় আয় বা জিডিপি মেপে কোনো দেশের অগ্রগতি বোঝার প্রচলিত পদ্ধতির ত্রু টি অনেক আগেই চোখে পড়ছে। চেষ্টা চলছে আরো ভালো পদ্ধতি বের করার যাতে একটি দেশের অগ্রগতি সঠিকভাবে বোঝা যায়। এ রকম প্রত্যেক চেষ্টার মূলে রয়েছে মানুষ অর্থাৎ মানুষের কল্যাণ ও সুখ।

অমর্ত্য সেন বলেছেন- জনসাধারণের সক্ষমতার নামই উন্নয়ন। তিনি মনে করেন, ‘মানুষের, সক্ষমতা নির্ভর করে, তার সত্বাধিকারের ওপর, অর্থাৎ কি পরিমাণ দ্রব্য এবং সেবা সামগ্রীতে সে তার স্বত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে তার ওপর। মাথাপিছু কতটা খাদ্য পাওয়া যাবে অথবা মাথাপিছু মোট জাতীয় উৎপাদন কতটা এ ধরনের সাদামাটা নির্দেশকসমূহের ওপর যদি নির্ভর করা হয়, তাহলে অনাহার, ক্ষুধা এবং বঞ্চনার সামগ্রিক চেহারাটা উপলব্ধির পথে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হবে। স্বত্বাধিকার নির্ধারণ ব্যবস্থা, সেই ব্যবস্থায় বিভিন্ন বৃত্তিভোগী কর্মগোষ্ঠীভুক্ত মানুষদের অবস্থা, এ সবের সতর্ক বিশ্লেষণ আবশ্যক। তার মতে, উন্নয়ন আসলে মানুষের স্বাধীনতার চৌহদ্দি বাড়ানোর প্রক্রিয়া। মানুষ তার নিজের চাওয়া-পাওয়া কতদূল মেটাতে পারছে সে প্রশ্নটি উন্নয়নের সংজ্ঞায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

উন্নয়নের কথিত জোয়ারে, সবকিছু দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে, ঐতিহ্যবাহী সমস্যাগুলির সঙ্গে যোগ দিচ্ছে নিত্য নতুন কৃত্রিম সমস্যা। উন্নয়নের নানা তত্ত্বে দেশ ভাসছে, চারিদিকে হৈ হৈ রই রই। অথচ প্রতিদিনই কমছে মানুষের স্বস্তি বোধ। সামাজিক সমস্যার রাষ্ট্রীয়করন এই প্রক্রিয়াকে আরো বেগবান করছে। ‘মাইন্ডসেট’ পরিবর্তনের হাজার এন্তেজাম তথাকথিত উন্নয়নের লক্ষ্য। কিন্তু যাদের উন্নয়নের জন্য এই যজ্ঞ তাদের অকথিত কথা কেউ শোনে না। উন্নয়ন সূচকের উর্ধগতি তত্ত্বেও দিনে দিনে গরীবরা আরো গরীব হচ্ছে, পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নাগরিক ভোগান্তি। অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রথাগত কয়েকটি সূচক হচ্ছে জাতীয় আয়, মাথাপিছু আয়, মানব উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক কল্যাণ। কোন দেশের জাতীয় আয় বাড়তে থাকলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়েছে বলে ধরে নেওয়া হয়। যে কারণে মাথাপিছু আয়কে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সূচক হিসাবে গ্রহণ করা হয়। সে হিসেবে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার অপেক্ষা জাতীয় আয় বৃদ্ধির হার অধিক হলেই তাকে উন্নয়ন বলা যায়। জাতীয় আয়কে দেশের জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে প্রকৃত মাথাপিছু আয় পাওয়া যায়। অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম মাপকাঠি মানব উন্নয়ন সূচক। মানব উন্নয়ন সূচকে মানুষের শিক্ষা, আয়ুষ্কাল, ক্রয় ক্ষমতা প্রভৃতি বিবেচনা করা হয়। তবে এই সূচকে জাতীয়ভাবে তথ্য নেওয়া হয়। কিন্তু ধনী-গরীব বৈষম্য, আঞ্চলিক বা গ্রাম ও শহরের বৈষম্য আমলে নেওয়া হয় না। ফলে এই সূচকে গণমানুষের প্রকৃত উন্নয়ন বোঝা যায় না।

নিম্নআয়ের দেশ থেকে বাংলাদেশের নিম্নমধ্য আয়ের দেশে উত্তরণ ঘটেছে, এটি আমাদের জন্য একটি সুখবর অবশ্যই, যদি সত্য হয়ে থাকে। জনগণের গড় মাথাপিছু আয় বেড়েছে। এতে সুন্দর ভবিষ্যতের কথা ভেবে আমরা নানা স্বপ্নের জাল বুনতে পারি। তবে মনে রাখতে হবে, সেই স্বপ্ন পূরণে জাতীয় আয় বৃদ্ধি বা অর্থনীতির উচ্চ সূচকই যথেষ্ট নয়। দেখা দরকার বৃহত্তর জনগোষ্ঠী এর সুফল কতটা পাচ্ছে। জাতিসংঘের এক সমীক্ষা অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী মাত্র ১ শতাংশ মানুষ পৃথিবীর শতকরা ৪০ ভাগ সম্পদের অধিকারী। আর প্রাপ্তবয়স্ক ১০ শতাংশ বিত্ত-বৈভব ভোগ করছে পৃথিবীর ৮৫ শতাংশ সম্পদ। এই যে ভয়াবহ বৈষম্য- এই জরিপে বাংলাদেশের বাস্তব অবস্থারও প্রতিফলন রয়েছে। এদেশে আয়-বৈষম্য, সম্পদের মালিকানায় বৈষম্য, বিভিন্ন সেবাপ্রাপ্তিতে বৈষম্য এত প্রকট যে তা সাদা চোখেই দেখা যায়, গবেষণার দরকার হয় না। তবুও গবেষণা হওয়া প্রয়োজন; গবেষণা হয়ও। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক গবেষণা জরিপে বলা হয়েছে, দেশে নারী ও শিশুদের উন্নয়নে অনেক অগ্রগতি হলেও ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য এখনও প্রকট। ধনী পরিবারের একজন সদস্য যে সুবিধা পান, তার ছিটেফোঁটাও পান না দরিদ্র পরিবারের কেউ। জরিপে আরও বলা হয়েছে, আঞ্চলিক অবস্থান, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি এখনও চ্যালেঞ্জের মুখে। অর্থাৎ বৈষম্য বড় সমস্যা, এটাই মূলকথা। দেশের গড় আয় বেড়েছে; কিন্তু আয় বৈষম্যের কারণে সমাজে এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। এর কারণ, যে খাতগুলোর মাধ্যমে এই প্রবৃদ্ধি ঘটছে, তার বেশিরভাগ রয়েছে মূলত ধনী বা অবস্থাপন্ন ব্যক্তিদের অধিকারে। দরিদ্রদের নিজেদের সম্পদের পরিমাণ সামান্য। তাই আয় বৃদ্ধি ও উচ্চ প্রবৃদ্ধির সুফল তারা পাচ্ছেন না। জনগণের জীবনমান উন্নয়নের পথে প্রধান অন্তরায় বৈষম্য। যেসব নীতি ও ব্যবস্থার ফলে সমাজে বৈষম্য কমে আসতে পারে, তা কখনও বাস্তবায়িত হয়নি। যেমন সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, শহর ও গ্রামের মধ্যে ব্যবধান কমিয়ে আনা।

চালের দাম : পেটতো আর রাজনীতি বোঝে না

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন ::

দেশের নিম্ন আয়েরর মানুষের প্রতিদিনের খাদ্য ‘মোটা চালে’র দাম এখন ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি। এক কেজি চাল কিনতে হচ্ছে কমপক্ষে  ৪৮ থেকে ৫০  টাকায়। শুধু মোটা চালই নয়, সব ধরনের চালের দামই বিগত যে কোন বছরের তুলনায় অনেক বেড়ে যাওয়ায় কষ্টের মধ্যে পড়েছে শ্রমজীবী মানুষসহ স্বল্প আয়ের পরিবারগুলো। দেশে মোটা চালের দাম বাড়তে বাড়তে কেজিপ্রতি ৫০ টাকায় উঠেছে। এক বছরে বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। বাংলাদেশে এখন মোটা চালের দাম বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। এতে প্রায় দুই কোটি পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তা গুরুতর হুমকির মুখে পড়েছে ও পড়ছে  যাচ্ছে।

প্রশ্ন হলো, চালের দাম এত বেশি বাড়ল কেন? খাদ্যব্যবস্থা পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার ত্রুটি, দূরদৃষ্টির অভাব, খাদ্য নিয়ে সরকারের উদাসিনতাসহ বিভিন্ন কারণের কথা উল্লেখ করতে হচ্ছে। দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ দেখানো; জনগণকে ১০ টাকা কেজি দরে চাল খাওয়ানো’র প্রতিশ্রুতি ইত্যাদির পেছনে যে দলীয় রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করেছে- তা বাস্তবতা সম্পর্কে সঠিক ধারণা রাখার পথে প্রতিবন্ধক হয়েছে। যখন চাল আমদানি করার প্রয়োজন ছিল না, তখন চাল আমদানি করা হয়েছে; একসময় দেশের বাজারে চালের দর এতটা কমে গিয়েছে যে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা পরের মৌসুমে চাল উৎপাদনে নিরুৎসাহিত হয়েছেন। আর এ বছর হাওর-অধ্যুষিত বেশ কয়েকটি জেলায় ব্যাপক ফসলহানি হয়ে বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা সৃষ্টির পরও সরকার আত্মতুষ্টিতে ভুগেছে। অথচ তখনও সরকারের কর্তাব্যক্তিদের মাথায়  চাল আমদানির চিন্তাটুকুও  ঢুকেনি। বরং প্রথম পর্যায়ে চাল আমদানির ওপর ২৮ শতাংশ হারে শুল্কারোপ করা হয়। পরে ঘটনার ভয়াবহতা ও প্রতিক্রিয়া দেখে, অনেক সমালোচনার পর ওই ১৮ শতাংশ শুল্ক কমিয়ে তা ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। কিন্তু তখনই আমদানির চিন্তা করলে আমদানি ব্যয় কম হতো, ওই চালের দামও কম হতো। তাহলে প্রশ্ন ওঠে-এই বিলম্ব কি ইচ্ছাকৃত?

এতা গেলো একটি দিক। তবে যে জটিল বাস্তবতা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা ছিল- তা হলো, সরকারি গুদামে চালের মওজুদ এখন মাত্র ১ লাখ ৮১ হাজার টন (১৮ জুনের হিসাব)। গত ১০ বছরের মধ্যে এটা সর্বনিম্ন মওজুদ। বিশেষজ্ঞরা বলেন, সরকারি গুদামে কমপক্ষে ৬ লাখ টন চাল মওজুদ থাকা অবশ্যই প্রয়োজন। মওজুদ এর চেয়ে কমে গেলে চাল ব্যবসায়ীরা এর সুযোগ নেবেই, আর চালের দাম বাড়বেই। এবার মূলত সেটাই হচ্ছে। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, সরকারের হয় কোন নিয়ন্থন নেই অথবা এটাও ইচ্ছাকৃত; কিংবা ক্ষমতাবানদের হাতে সাধারন মানুষ জিম্মি।

সরকার এখন অভ্যন্তরীন ধান-চালও সংগ্রহ করতেও পারছে না। কারণ, বাজারে চালের দাম ৪৮ থেকে ৫০ টাকা হলেও সরকার-নির্ধারিত ৩৪ টাকা দরে কেউ সরকারকে চাল দেবে না, এটাই স্বাভাবিক। এর চেয়েও গুরুতর বিষয় হলো, বাজারে বর্তমানে কী পরিমাণ চাল আছে, এ সম্পর্কে কোনো তথ্য-উপাত্ত সরকারের কাছেও নেই অথবা তা জনগনের সামনে উপস্থাপিত হচ্ছেনা। অথচ খাদ্য মওজুদ নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী- খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব এটা নিয়মিত মনিটর করা ও হিসাব রাখা। কারণ, এর পরিণতিতে এখন চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত কঠিন হবে।

গত তিন দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতির অবয়বে অনেক পরিবর্তন এসেছে। এক সময় দেশের অর্থনীতির এক তৃতীয়াংশ আসতো কৃষি খাত থেকে। সেখানে বিদায়ী ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে কৃষির জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান চলে এসেছে ১৪ দশমিক ৭৯ শতাংশে। এবার বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো জিডিপির যে হিসাব করেছে- তাতে কৃষি খাতে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে দেখানো হয়েছে। সব চেয়ে বিষ্ময়কর হলো, এতে খাদ্য শস্য খাতে বাড়তি উৎপাদন ধরা হয়েছে ২ দশমিক ৫ শতাংশ। বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদনের ৬০ ভাগ আসে বোরো মৌসুম থেকে । বাকি ৪০ ভাগ আউশ ও আমন থেকে আসে। আউশের উৎপাদন ৭ শতাংশের মতো কম হয়েছে। আমণের উৎপাদন আগের বছরের একই পর্যায়ে রয়েছে। বোরোর উৎপাদনে এবার দুর্যোগ ও হাওরের বিপত্তির কারণে ৬/৭ লাখ টন কম উৎপাদন হবে বলে বলা হচ্ছে। এ হিসাবে কোনভাবেই খাদ্য উৎপাদন বেশি হওয়ার কথা নয়। একই কারণে কৃষিতে ধনাত্মক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাও বাস্তবসম্মত নয়।

চাল নিয়ে রাজনীতির দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে বাংলাদেশে। চাল আর রাজনীতি খুব বেশি দূরের কিছু নয়। এদেশে সবসময়ই চালের দামকে স্পর্শকাতর ইস্যু মনে করা হয়। ভোটের রাজনীতিতেও চাল গুরুত্বপূর্ণ। ‘১০ টাকা কেজি চাল’ নিয়ে বহু বাতচিত হয়েছে। এমন ওয়াদা করা হয়েছিল, নাকি হয়নি তা নিয়েও বিতর্ক চলে আসছে। তবে চালের বর্তমান উচ্চমূল্যে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন মধ্যবিত্ত আর নিম্নবিত্তের মানুষেরা। পেটতো আর রাজনীতি বোঝে না। উচ্চমূল্যে চাল কিনতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারন মানুষ। ওলট-পালট হয়ে যাচ্ছে সংসারের বাজেট। এমনকি পত্রিকায় এও খবর বেরিয়েছে, চালের উচ্চ মূল্যের কারণে নিম্ন আয়ের মানুষ ভাত খাওয়া কমিয়ে দিয়েছেন। ৪-৫ সদস্যের ছোট একটি পরিবারে কেবল চালের পেছনেই খরচ বেড়েছে কমপক্ষে পাঁচশ’ টাকা।