Home » বিশেষ নিবন্ধ (page 20)

বিশেষ নিবন্ধ

ভারত-বাংলাদেশ প্রাচীর : ট্রাম্পের জন্য উদাহরণ

সুধা রামচন্দ্রন ::

অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ ::

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তার ভাষায় ‘দুর্বৃত্ত, মাদক ব্যবসায়ী এবং ধর্ষণকারীদের’ দূরে রাখতে মেক্সিকোর সাথে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ ৩,২০০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ‘মহা, মহা প্রাচীর’ নির্মাণের যে পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন, সেটা মোটেই নতুন কোনো আইডিয়া নয়। আরো অনেক দেশ- এগুলোর কেউ কেউ ইসলামফোবিয়া বা  ইসলামভীতিতে তাড়িত হয়ে- অবৈধ অভিবাসী, সন্ত্রাসী ও অপরাধীদের দূরে রাখতে তাদের প্রতিবেশীদের সীমান্তে বেড়া দিয়েছে।

এসব দেশের কাছ থেকে শিক্ষা নিলে ট্রাম্প ভালো করবেন। এসব বেড়া বা প্রাচীর কেবল বিশেষভাবে অকার্যকরই হয়নি, এগুলোর নির্মাণ, ব্যবস্থাপনা করা অর্থ ও মানব-জীবনের দিক থেকে বিপুল ব্যয়বহুল।

ভারতের উদাহরণটি বিবেচনা করুন। দেশটি তার প্রতিবেশী পাকিস্তান ও বাংলাদেশ সীমান্তে প্রাচীর দিয়েছে। বাংলাদেশের সাথে সীমান্তে ভারতের প্রাচীর দেওয়ার প্রধান লক্ষ্য হলো- বাংলাদেশী অভিবাসীদের ভারতে প্রবেশ থেকে বিরত রাখা। প্রাচীর নির্মাণের সিদ্ধান্তটি সামনে আসে ১৯৮০-এর দশকে। তখন আসাম রাজ্যে বাংলাদেশীদের অভিবাসন রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত বিস্ফোরক ইস্যুতে পরিণত হয়েছিল।

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে দীর্ঘ ৪,০৯৭ কিলোমিটার ‘ছিদ্রযুক্ত, ঝাঝরা’(পোরাস বর্ডার) সীমান্ত রয়েছে। এই সীমান্ত সমভূমি, নদী, পাহাড়, ধান ক্ষেত দিয়ে এঁকে বেঁকে চলে গেছে। এই সীমান্ত অঞ্চলটি অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ। এখানে বাসকারী লোকজন নানাভাবে আন্তঃসীমান্তের বা এপার-ওপার মিলিয়েই সম্পর্কিত; এই সম্পর্ক কারো কারো কাছে কয়েক শ’বছরের, কারো কারো কাছে নতুন।

আট ফুট উঁচু কাঁটাতারের প্রাচীরের কোনো কোনো স্থান বিদ্যুতায়িত। এ ধরনের প্রাচীর  আছে সীমান্তের প্রায় ৭০ ভাগ এলাকায়; ভয়াবহ কাঠামো। কিন্তু এটা স্বজনদের সাথে সাক্ষাত করা কিংবা জীবিকার নিরাপত্তার সন্ধানে দুর্গম সফর থেকে অভিবাসীদের বিরত রাখতে পারছে না। উভয় পক্ষের চোরাকারবারি, মাদক বাহক, আদম পাচারকারী, গরু কারবারিরা তাদের ব্যবসার জন্য নিয়মিত সীমান্ত অতিক্রম করে থাকে, অনেক সময় ভারতীয় ও বাংলাদেশী সীমান্তরক্ষীদের সম্মতিতেই।

হাওয়াই বিশ্বাবিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং ‘ভায়োলেন্ট বর্ডার্স : রিফ্যুজিস অ্যান্ড দি রাইট টু মুভ’গ্রন্থের লেখক রিস জোন্স বলেন, ‘সীমান্ত বেড়া বলতে গেলে কখনোই অভিবাসন ঠেকাতে পারে না।’ তিনি উল্লেখ করেন, বেশির ভাগ সীমান্ত খুবই দীর্ঘ এবং খুবই হালকাভাবে পাহারা দেওয়া। ফলে ফাঁকা স্থান দিয়ে লোকজনের চলাচলে তেমন কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না।

বাংলাদেশের এক আইনজীবী এবং অভিবাসন নির্গমনের গুরুত্বপূর্ণ সোর্স দ্য ডিপ্লোম্যাটকে বলেন, প্রাচীরটা ‘পানি-নিরোধক’নয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সীমান্ত যখন নদী দিয়ে চলে (সীমান্তের প্রায় ১,১১৬ কিলোমিটার হলো নদীপথে)- সেখানে কোনো প্রাচীর নেই। বাংলাদেশের সাথে আসাম সীমান্তের প্রায় ৪৪ কিলোমিটার ব্র‏হ্মপুত্র নদীতে। এই নদী আবার প্রতি বছর গতি বদলায়। এই নদীতে স্থায়ী প্রাচীর দেওয়া সম্ভব নয়। অবশ্য টহল নৌযান মোতায়েন করা হয়েছে। কিন্তু তা দিয়ে পারাপার তদারকি করা সম্ভব নয়। দুই দেশের লোকজন ফাঁক-ফোকর গলিয়ে ঠিকই পাড়ি দিয়ে দেয়। তাছাড়া প্রাচীরটার ‘অনেক ক্রসিং পয়েন্ট আছে, লোকজন ভুয়া কাগজপত্র কিংবা ঘুষ দিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করতে পারে,’ জানান জোন্স। ফলে সীমান্ত প্রাচীর ‘[মানুষজনের] চলাচলের প্যাটার্ন পাল্টে দিলেও তাদের চলাচল কিন্তু থামাতে পারে না।’

ভারত থেকে সন্ত্রাসীদের দূরে রাখার ব্যাপারে প্রাচীরের সক্ষমতা প্রশ্নে জোন্স বলেন, ভারত-বাংলাদেশ প্রাচীরের ‘সম্ভব কোনো প্রভাব নেই।’তিনি উল্লেখ করেন, সন্ত্রাসীর কাছে ‘ভুয়া কাগজপত্র সংগ্রহ করার মতো টাকা থাকে। সে সহজেই চেকপয়েন্ট দিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করতে পারে। সে বৈধ কাগজপত্র দিয়েও ভ্রমণ করতে পারে।’

অভিবাসী ও অপরাধীদের দূরে রাখতে প্রাচীর কেবল ‘ব্যাপকভাবে অকার্যকরই’নয়, অনেক সময় সেটা বাস্তবায়ন করার জন্য অনেক সহিংস ঘটনাও ঘটে। প্রাচীর দিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করতে চাওয়া লোকজনকে সীমান্তরক্ষীরা নৃশংসবাবে গুলি করে হত্যা করে।

ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের ২০১১ সালে ১৫ বছর বয়স্কা বাংলাদেশী মেয়ে ফেলানির হত্যাকান্ড বিশ্বজুড়ে ক্রোধের সৃষ্টি করে। ২০১০ সালের হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০১ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত বিএসএফ সদস্যরা সীমান্ত অতিক্রমের সময় প্রায় ৯০০ বাংলাদেশীকে হত্যা করেছে।

’এই সহিংসতার শিকার অনেকেই সীমান্ত বেড়া বা  প্রাচীরের  কাছাকাছি বসবাসকারীরা- তাদের জমিতে চাষ করার সময় নিহত হয়েছে,’ জানান ওই বাংলাদেশী আইনজীবী। এভাবে অনেকেই কয়েকদিন সীমান্তের ওপারে তাদের স্বজনের বাড়িতে বেড়ানোর পর বাড়ি ফিরে আসার সময় নিহত হয়েছেন। প্রাচীর দেয়ার মতো যে কাজটি করে সেটা হলো পরিবার ও সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে ঝামেলা পাকানো। আগে লোকজন সহজেই সীমান্ত পাড়ি দিয়ে তাদের স্বজনদের সাথে দেখা করতে যেতে পারতো। কিন্তু প্রাচীর থাকায় এখন ‘তাদেরকে চোরকারবারিদের টাকা দিতে হয়, বিএসএফের সামনে তাদের জীবনের ঝুঁকি নিতে হয়,’ জানান জোন্স।

তাহলে কেন বিশেষ করে সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদী চেতনায় বিশ্বাসী, এমনকি বিদেশীভীতির ‘আবেদনসৃস্টিকারী’ ও এতেকরে সাফল্য লাভকারী সরকারগুলোর কাছে প্রাচীর এত জনপ্রিয়? সীমান্ত প্রাচীর আসলে ‘জাতীয়তাবাদী’ প্রতীক, জানান জোন্স। এগুলো ‘অন্য জনসাধারণকে বাদ দেওয়া-সংক্রান্ত আইডিয়ার’ প্রতিনিধিত্ব করে। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের বেলায় মুসলিম বাংলাদেশীদের কিংবা ট্রাম্পের পরিকল্পিত দেয়ালের বেলায় মেক্সিকানদের দূরে রাখার প্রতীক।

এসব প্রাচীর সরকাকে “কঠোর করে দেখায়, এমনভাবে যেন, তারা তথাকথিত ‘অবৈধ’ ও ‘বহিরাগতদের’ থেকে জনগণকে রক্ষা করতে দৃঢ়প্রত্যয়ী,” জানান ওই আইনজীবী। জোন্সের মতে, প্রাচীর কার্যত যা করে তা হলো, ‘ভারত বা যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসীদের জীবনকে আরো নিরাপত্তাহীন করে দেওয়া।’বস্তুত অভিবাসীদের দূরে না রেখে প্রাচীর ‘প্রায়ই লোকজনকে আরো বেশি সময় রেখে দেয়, সত্যিকার অর্থে সাময়িক শ্রম অভিবাসীদের স্থায়ী অবৈধ বাসিন্দায় পরিণত করে।’

বাংলাদেশের সাথে ভারতের সুসম্পর্ক থাকলেও ভারতের প্রাচীর-নির্মাণ এতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এটা বাংলাদেশী জনসাধারণের চোখে ভারতের ইমেজকে ‘বড়ভাইসুলভ’ হিসেবে বিদ্রুপে পরিণত করেছে। প্রাচীর-নির্মাণকে বন্ধুসুলভ কাজ মনে করা হয় না। বরং প্রাচীরকে ‘অবিশ্বাসের প্রতীক’ বিবেচনা করা হয়, যা পারস্পরিক উপলব্ধিকে চাপা দিয়ে দেয়। বাংলাদেশ এবং দক্ষিণ এশিয়ার বাকি অংশে কাজটি ব্যাপকভাবে সমালোচিত। ২০০৮ সালে দক্ষিণ এশিয়ান ম্যাগাজিন হিমালের এক সম্পাদকীয়তে বলা হয়, প্রাচীর ‘দক্ষিণ এশিয়ার মানচিত্রজুড়ে জনসাধারণের ঐতিহাসিক চলাচলের মুখে উড়ছে, আমাদের অতীত ও বর্তমান উভয়ের কাছে সম্প্রীতিপূর্ণ নয়, এমন কঠোর সীমান্তে পরিণত করেছে।’

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই অঞ্চলের জনসাধারণের মধ্যে মতবিনিময়, বাণিজ্য ও সহযোগিতা বাড়ানোর লক্ষ্যে এসব দেশের মধ্যে বিরতিহীন ভ্রমণের সুযোগ সৃষ্টির পরিকল্পনা নিয়ে বাংলাদেশ, ভুটান, নেপাল ও মিয়ানমারের কাছে ছুটে গেছে। এটা ফলপ্রসূ করার জন্য আন্তঃজাতীয় সড়ক এবং রেল যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রাচীর বৃহত্তর আঞ্চলিক সহযোগিতার এই প্রয়াসের চেতনা ও বিশ্বাসের পরিপন্থী।

দীর্ঘ মেয়াদে প্রাচীর এই অঞ্চলে সাধারণভাবে এবং বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে সমস্যা কেবল বাড়িয়েই তুলতে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ নিচু দেশ। সমুদ্রের স্তর এক মিটার বাড়লে বাংলাদেশের এক পঞ্চমাংশ এলাকা সম্ভবত তলিয়ে যাবে। বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। ভারত তিন দিক দিয়ে দেশটিকে ঘিরে রেখেছে, বেড়া এর জনগণকে কেবল ভেতরে ধাক্কা দিচ্ছে। বাংলাদেশের সবচেয়ে অরক্ষিত উপকূলীয় জেলা হলো খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট। এগুলো ভারতের সীমান্তে অবস্থিত। তাদের বাড়িঘর ও শস্য পানিতে তলিয়ে গেলে তারা কোথায় যাবে?

ভারত সমস্যাটির ব্যাপারে চোখ বন্ধ করে থাকতে পারে না। এটা কেবল অমানবিক হবে বলেই নয়, সমুদ্র স্তর বাড়লে বাংলাদেশের যে সমস্যা হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, ভারতের জন্যও তা একই ধরনের বিপর্যয়কর হবে। বস্তুত, কোনো কোনো সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের সাথে ভারতও জলবায়ু পরিবর্তনে ‘চরম ঝুঁকিপূর্ণ’দেশগুলোর অন্তর্ভুক্ত।

জলবায়ু ইস্যুতে বাংলাদেশের থেকে দূরে না থেকে ভারতের উচিত দেশটির সাথে সহযোগিতা করা। এ জন্য ভারতকে অবশ্যই প্রথমে যে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করতে হবে, তা হলো- প্রাচীর তুলে ফেলা। অবশ্য প্রাচীর দেওয়ার চেয়ে তুলে ফেলা অনেক বেশি কঠিন। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক ইচ্ছা এবং মানসিকতার পরিবর্তন। সবচেয়ে বড় কথা হলো, এটা স্বীকার করা দরকার, ভারত-বাংলাদেশ প্রাচীর এসব দেশের জনগণের জন্য সামান্যই নিরাপত্তা বয়ে এনেছে; বরং এটা নিরাপত্তাহীনতার একটি উৎসে পরিণত হয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো ট্রাম্প কি দেয়ালের লিখন বুঝবেন?

লেখক : ব্যাঙ্গালোরভিত্তিক ফ্রি-ল্যান্স সাংবাদিক ও গবেষক। তিনি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি ও নিরাপত্তা ইস্যুতে লিখে থাকেন। (দ্য ডিপ্লোম্যাট থেকে বাংলা অনুবাদ)

কবি হাসান হাফিজুর রহমান : অন্তরালের এক সংগ্রামী পুরুষ

শাহ আহমদ রেজা ::

ভাষা আন্দোলনের মাসে শহীদ এবং বিখ্যাত নেতাদের পাশাপাশি সব ভাষা সংগ্রামীকেও সমান সম্মান ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করা দরকার। বিশেষ করে এমনজনদের, যাদের সাহসী ও সৃষ্টিশীল ভূমিকার কথা সাধারণ মানুষ জানে না বললেই চলে। কবি হাসান হাফিজুর রহমান ছিলেন তেমন একজন, কম আলোচিত হওয়ার কারণে যিনি আসলে অন্তরালে রয়ে গেছেন। অথচ শহীদ দিবস উপলক্ষে ১৯৫৩ সালে প্রকাশিত প্রথম সংকলন ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’র সম্পাদক হিসেবে শুধু নয়, ১৫ খন্ডে সংকলিত স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসের সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়েও তিনি বাংলাদেশের ইতিহাস এবং জাতির সমগ্র অস্তিত্বের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছেন; যুক্ত থাকবেনও।

সে আলোচনায় যাওয়ার আগে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানিয়ে নেয়া যাক। মহান এই কবি ও ভাষা সংগ্রামীর সান্নিধ্যে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম ১৯৭৯ সালের এপ্রিলে। উপলক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস রচনা। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নির্দেশে তথ্য ও বেতার মন্ত্রণালয় ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস লিখন ও মুদ্রণ প্রকল্প’ নামে একটি প্রকল্প শুরু করেছিল -এপ্রিল, ১৯৭৭-সালে। প্রকল্পের পরিচালক পদে নিযুক্তি পেয়েছিলেন কবি হাসান হাফিজুর রহমান। স্বাধীনতার পর দৈনিক বাংলার প্রধান সম্পাদক বা সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি ছিলেন তিনি। আওয়ামী ঘরানার বুদ্ধিজীবী হিসেবে পরিচিতি থাকলেও স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রথম সরকার তাকে চাকরিচ্যুত করেছিল। কারণটিও ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৭৩ সালের পহেলা জানুয়ারি হাই কোর্টের সামনে তৎকালীন সরকার সমর্থক সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশের গুলিতে দু’জনের মৃত্যু ঘটে। এই খবরকে কেন্দ্র করেই দৈনিক বাংলা সেদিনই একটি ‘টেলিগ্রাম সংখ্যা’ বের করেছিল। দৈনিক বাংলা ছিল ট্রাস্টের তথা সরকারি মালিকানাধীন পত্রিকা। সে কারণে ক্ষমতাসীনরা ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। হাসান হাফিজুর রহমানকে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে দুঃখ প্রকাশের আড়ালে ক্ষমা চাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন শুভাকাংক্ষীরা। তার জন্য আত্মপক্ষ সমর্থনের শক্তিশালী যুক্তি ও অজুহাতও ছিল। কারণ, টেলিগ্রামটি বের করেছিলেন সাংবাদিকরা। হাসান হাফিজুর রহমান সে সময় অফিসে ছিলেন না। তিনি তাই সহজেই দায়িত্ব এড়াতে পারতেন। কিন্তু হাসান হাফিজুর রহমান গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং সাংবাদিকদের অধিকারের প্রশ্নকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। এজন্যই সব দায়িত্ব তিনি নিজের ঘাড়ে নিয়েছিলেন। ফলে তার চাকরি চলে গিয়েছিল।

হাসান হাফিজুর রহমান মাঝখানে কিছুদিন মস্কোতে বাংলাদেশ দূতাবাসে প্রেস কাউন্সিলর পদে চাকরি করলেও বহুদিন বেকার ছিলেন। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তাকে সম্মানের সঙ্গে স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস প্রকল্পের পরিচালক পদে নিযুক্তি দিয়েছিলেন। এই প্রকল্পের চারজন গবেষকের একজন হিসেবেই আমি হাসান হাফিজুর রহমানের সান্নিধ্যে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। ইতিহাসের ছাত্র ছিলাম বলে শুধু নয়, স্বাধীনতামুখী সংগ্রামে অংশ নেয়ার এবং যুদ্ধের দিনগুলোতে বন্দি অবস্থায় পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর হাতে নির্যাতিত হওয়ার অতীত বা পটভূমি থাকার কারণেও স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস আমাকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করতো; এখনো করে। এজন্যই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে প্রথম স্থান নিয়ে এম এ পাস করার পর অন্য চাকরির চেষ্টা না করে রীতিমতো ইন্টারভিউ দিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস প্রকল্পে যোগ দিয়েছিলাম। প্রকল্পের অফিস ছিল ৮১/বি সেগুনবাগিচায়, এক ব্যক্তিমালিকের তিনতলা বাড়ির দোতলায়।

ইন্টারভিউ দিতে গিয়েই প্রথমবারের মতো পরিচিত হয়েছিলাম কবি হাসান হাফিজুর রহমানের সঙ্গে। হাতে জ্বলন্ত হাভানা চুরুট ছিল তার। রসিয়ে পানও খেতেন তিনি। চা তো খেতেনই। সত্যি বলতে কি, নাম জানা থাকলেও তার কবিতা ও সাহিত্য সম্পর্কে তেমন ধারণা ছিল না আমার। ১৯৪৭ সালের আগস্টে ভারত ও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সময় সংঘটিত সাম্প্রদায়িক  দাঙ্গার প্রেক্ষাপটে রচিত ‘আরও দুটি মৃত্যু’ নামের একটি গল্প অবশ্য পড়েছিলাম। ট্রেনের ভেতরে সন্তান প্রসব করতে গিয়ে মৃত্যু ঘটেছিল এক হিন্দু নারীর; সঙ্গে তার সন্তানেরও। হৃদয়বিদারক এ কাহিনীই গল্পে তুলে এনেছিলেন হাসান হাফিজুর রহমান। অসাধারণ ছিল তার উপস্থাপনা।

অন্য একটি তথ্যও জানতাম তার সম্পর্কে। ১৯৫২ সালের ভাষা আান্দোলনে দুর্দান্ত সাহসী ভূমিকা পালন করেছিলেন তিনি। ১৪৪ ধারার নিষেধাজ্ঞা থাকায় একুশে ফেব্রুয়ারি মিছিল করার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চারজন-চারজন করে ছাত্র বের হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। কোন চারজনের পর কোন চারজন যাবেন- সেটা ঠিক করে দেয়ার দায়িত্ব ছিল হাসান হাফিজুর রহমানের ওপর। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যে সে দায়িত্ব ফেলে তিনি নিজেই গিয়ে যোগ দিয়েছিলেন মিছিলে! শহীদ বরকত তার ক্লাসমেট ছিলেন। গুলিবিদ্ধদের হাসপাতালে নেয়ার ক্ষেত্রে প্রচন্ড ঝুঁকি নিয়ে ভূমিকা রেখেছিলেন হাসান হাফিজুর রহমান। গুলি ও হত্যার পর সরকারের বিরুদ্ধে বক্তব্য সংবলিত লিফলেট লেখা ও ছাপানোর ব্যাপারেও সবার আগে ছিলেন তিনি। ১৯৫৩ সালের শহীদ দিবস উপলক্ষে প্রথম সংকলন ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ও তিনিই বের করেছিলেন। নিজে এর সম্পাদক ছিলেন। ঢাকা ও কোলকাতা থেকে একযোগে প্রকাশিত সংকলনটিকে পাকিস্তান সরকার বাজেয়াপ্ত করেছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই একটি বিষয়ে ‘দিশারী’ হিসেবে অমর হয়ে আছেন হাসান হাফিজুর রহমান। সেই থেকে তাকে অনুসরণ করেই প্রতি বছর একুশের সংকলন প্রকাশিত হয়ে আসছে।

ইতিহাস প্রকল্পে যোগ দেয়ার পর হাসান হাফিজুর রহমান সম্পর্কে ধীরে ধীরে অনেক কিছু জেনেছি। যতো জেনেছি, মুগ্ধ ও বিস্মিতও ততোই হয়েছি। আমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছিল তার ইতিহাস সম্পর্কিত জ্ঞান ও পড়াশোনা। ইতিহাসের ছাত্র হিসেবে তো বটেই, ১৯৬৭-৬৮ থেকে ছাত্র রাজনীতিতে জড়িত থাকার এবং স্বাধীনতার পর মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতার কারণেও ভেতরে-ভেতরে কিছুটা অহংকার ছিল। কিন্তু হাসান হাফিজুর রহমানের সান্নিধ্যে যাওয়ার পর সে অহংকার হাওয়ায় মিলিয়ে গিয়েছিল। অবিশ্বাস্য ছিল তার জ্ঞানের গভীরতা- বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের ইতিহাস সম্পর্কে। গুরুত্বপূর্ণ ও দিকনির্ধারণী সব ঘটনা এবং ইতিহাসের প্রতিটি পর্যায় নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তিনি আলোচনা করতেন। ব্যাখ্যা করতেন ঠিক একজন শিক্ষকের মতো। তাই বলে ‘জ্ঞান’ দিতেন না; মনে হতো একজন বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা হচ্ছে। অসম্ভব আড্ডাবাজ ছিলেন হাসান হাফিজুর রহমান। প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে ‘বস’ ছিলেন তিনি, কিন্তু কোনোদিনই বন্ধুর চাইতে বেশি কিছূ মনে হয়নি তাকে। অন্য সরকারি অফিসের মতো ‘স্যার’ বলা নিষেধ ছিল আমাদের চার গবেষকের জন্য (অন্য তিন গবেষক ছিলেন প্রয়াত কবি সৈয়দ আল ইমামুর রশীদ, ড. আফসান চৌধুরী এবং জ আ ম ওয়াহিদুল হক)। আমরা তাকে ‘হাসান ভাই’ ডাকতাম; তার নির্দেশেই।

প্রতিদিন আড্ডা দিতে দিতে আর এটা-ওটা খেতে খেতে পার হয়ে যেতো অনেক সময়। শুনলে মনে হতে পারে যেন সমবেতভাবেই আমরা কাজে ফাঁকি দিতাম। অন্যদিকে যে কোনো বিচারে ইতিহাস প্রকল্পের অর্জন ও সাফল্য ছিল অতুলনীয়। তখন সরকারি অফিসের সময় ছিল সকাল সাড়ে সাতটা থেকে বেলা দুটো পর্যন্ত। কিন্তু আমরা, গবেষকরা কোনোদিনই অতো সকালে যেতাম না। জরুরি কোনো কাজ না থাকলে হাসান ভাইও যেতেন না। এটাই আমাদের জন্য হাসান ভাইয়ের তৈরি করা নিয়ম ছিল। ওদিকে আবার অফিস থেকে চলে যাওয়ারও নির্দিষ্ট কোনো সময় ছিল না। কতদিন যে বেরোতে বেরোতে রাত দশটাও পেরিয়ে গেছে-তার কোনো হিসাব রাখা হয়নি। এখানেই ছিল হাসান ভাইয়ের বৈশিষ্ট্য। চমৎকার কৌশলে তিনি কাজ করিয়ে নিতেন। বুঝতেও দিতেন না যে, কাজে ব্যস্ত রেখেছেন তিনি। এজন্যই আমাদের পক্ষে মাত্র বছর চারেকের মধ্যেই স্বাধীনতা যুদ্ধ সংক্রান্ত চার লাখ পৃষ্ঠার বেশি দলিলপত্র এবং ১৫ হাজারের বেশি ছবি সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছিল।

এখানে ইতিহাস প্রকল্পের কাজের ধরন সম্পর্কে বলা দরকার। শুরুতে পরিকল্পনা ছিল, প্রকল্প থেকে স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস লেখা হবে। কিন্তু হাসান হাফিজুর রহমান নিয়েছিলেন অন্য রকম সিদ্ধান্ত। তার বক্তব্য ছিল, সমসাময়িককালে লিখিত ইতিহাসে পক্ষপাতিত্বের সম্ভাবনা থাকে। বিশেষ কারো কারো ভূমিকাকে মহিমান্বিত করার নির্দেশ এবং চাপ ও তাগিদ থাকায় অনেকে অসত্য লেখেন। ভয়ের কারণেও কারো কারো সম্পর্কে সত্য লেখা যায় না। সুতরাং ইতিহাস লেখার পরিবর্তে বেশি দরকার স্বাধীনতা যুদ্ধ ও তার পটভূমি সংক্রান্ত তথ্য ও খবর, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি, প্রচারপত্র ও পুস্তিকাসহ দলিলপত্র এবং রাজনৈতিক নেতা-কর্মী ও সেনাবাহিনীসহ মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের বক্তব্য-বিবৃতি-বৃত্তান্ত সংগ্রহ ও প্রকাশ করা, যাতে সেসবের ভিত্তিতে ভবিষ্যতের গবেষকরা সঠিক ইতিহাস লিখতে পারেন। হোক ৫০ বা ১০০ বছর বা তারও পর, কিন্তু সেটা যাতে বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস হয়। হাসান হাফিজুর রহমান তার ‘ভূমিকা’য় লিখেও গেছেন, ‘এর ফলে দলিল ও তথ্যাদিই কথা বলবে, ঘটনার বিকাশ ও ধারাবাহিকতা রক্ষা করবে, ঘটনা পরম্পরার সংগতি রক্ষা করবে।’

হাসান হাফিজুর রহমানের এই চিন্তা ও সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই ইতিহাস প্রকল্প লেখার পরিবর্তে ইতিহাসের সোর্স বা উপাদান সংগ্রহ ও সংকলন করার নীতি অনুসরণ করেছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর ও বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ ড. মফিজুল্লাহ কবিরকে চেয়ারম্যান করে নয় সদস্যের একটি অথেন্টিকেশন বা প্রামাণ্যকরণ কমিটি গঠন করেছিলেন তিনি। অন্য আটজন ছিলেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, ইতিহাসবিদ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। কমিটির নয়জনের মধ্যে মাত্র একজনকে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের প্রতি কিছুটা দুর্বল মনে হয়েছে। তিনি ছিলেন জাতীয় জাদুঘরের পরিচালক ড. এনামুল হক। অন্যরা প্রকাশ্যেই ছিলেন জিয়া, তার সরকার এবং বিএনপি’র কঠোর বিরোধী ও সমালোচক। তাদের একজন, প্রয়াত ড. শামসুল হুদা হারুন পরবর্তীকালে শেখ হাসিনার সংবিধান বিষয়ক উপদেষ্টা হয়েছিলেন। অন্য একজন, প্রয়াত ড. সালাহউদ্দিন আহমদ বিশিষ্ট আওয়ামী বুদ্ধিজীবী হিসেবে ভূমিকা পালন করে গেছেন। আরেকজন, বাংলা একাডেমির বর্তমান সভাপতি ও ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান- এখনো আওয়ামী বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছেন। অর্থাৎ ওই প্রামাণ্যকরণ কমিটিকে দিয়ে কোনো ‘ফরমায়েশী’ ইতিহাস লেখানো সম্ভব ছিল না। চমৎকার কৌশলই নিয়েছিলেন বটে হাসান হাফিজুর রহমান!

এই কমিটির সদস্যরা প্রতিটি দলিলপত্র যাচাই-বাছাই করে তার সত্যতা ও সময়ের সঠিকতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতেন। তারা সত্যায়িত করলেই দলিলপত্রগুলো ছাপানোর যোগ্য হিসেবে স্বীকৃত হতো। ইতিহাস প্রকল্প চার লাখ পৃষ্ঠার বেশি দলিলপত্র এবং ১৫ হাজারের বেশি ছবি সংগ্রহ করেছিল। সেগুলো থেকে বাছাই করা দলিলপত্র নিয়েই পরবর্তীকালে, ১৯৮৪ থেকে ১৯৮৮ সালের মধ্যে ১৫ খন্ডে দলিলপত্র এবং এক খন্ডে ফটো অ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছিল। দুর্ভাগের বিষয় হলো, সবকিছুর পেছনে যার চিন্তা, চেষ্টা ও পরিশ্রম ছিল সেই হাসান হাফিজুর রহমান প্রকাশনার আগেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন (১ এপ্রিল, ১৯৮৩)। তিনি অবশ্য তিন-চারটি খন্ড বাঁধাই-পূর্ব অবস্থায় দেখে গেছেন। পর্যায়ক্রমে অন্য তিনজন ব্যক্তি পরিচালকের দায়িত্ব পালন করলেও প্রতিটি খন্ডে সম্পাদক হিসেবে হাসান হাফিজুর রহমানের নামই রাখা হয়েছে। কারণ, আমাদের মাধ্যমে সব কাজ আসলে তিনিই সেরে গিয়েছিলেন। বাকি ছিল শুধু ছাপানো এবং বাঁধাই শেষে বিক্রি ও বন্টনের ব্যবস্থা করা।

হাসান হাফিজুর রহমান সম্পর্কে আরো কিছু কথা না বললেই নয়। তিনি শুধু আড্ডাবাজই ছিলেন না, ছিলেন অতিথিপরায়ণও। বাংলাদেশের এমন কোনো বিশিষ্ট কবি-সাহিত্যিক, সাংবাদিক এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের নাম বলা যাবে না, যিনি ইতিহাস প্রকল্পের ওই অফিসে যাননি; গিয়েছেনও অসংখ্যবার। সাইয়িদ আতিকুল্লাহ, ফয়েজ আহমদ, নির্মল সেন, ফজলে লোহানী, শামসুর রাহমান, ফজল শাহাবুদ্দিন, মুস্তাফা নূর-উল ইসলাম, সৈয়দ শামসুল হক, বেলাল চৌধুরী- কতজনের নাম বলবো? এদের মধ্যে জনাকয়েক ছিলেন, যারা যেতেন দু-একদিন পরপরই। এর কারণ ছিল অফিসের ঠিক সামনে, উল্টোদিকে অবস্থিত ‘চিটাগাং হোটেল’-এর সুস্বাদু খাবার। রুই আর চিতল মাছের পেটি এবং বিরাট বিরাট কই মাছের ঝোল দিয়ে প্লেটের পর প্লেট ভাত গোগ্রাসে খেয়েছেন তারা। পকেট খালি হয়ে গেলেও হাসান ভাইয়ের মুখে সব সময় দেখতাম তৃপ্তি আর সন্তুষ্টির হাসি। অন্যকে খাইয়ে আনন্দ পেতেন তিনি। সাধারণভাবেও কবি-সাহিত্যিক, সাংবাদিক এবং সাংস্কৃতিক জগতের লোকজনকে সাহায্য করতেন হাসান হাফিজুর রহমান। যেমন শুধু সাহায্য করার জন্যই প্রয়াত কবি ত্রিদিব দস্তিদারকে ইতিহাস প্রকল্পে চাকরি দিয়েছিলেন তিনি। হাসান ভাইয়ের সঙ্গে আড্ডা দেয়ার এবং তার পক্ষে এর-ওর কাছে যাতায়াত করার বাইরে ত্রিদিব দস্তিদারকে অফিসের তেমন কোনো কাজ করতে হয়নি। ড. আনিসুজ্জামান প্রমুখের স্মৃতিচারণে জেনেছি, ছাত্রজীবনেও একই রকম আড্ডাবাজ ছিলেন তিনি। দশ টাকা ধার করে বন্ধুদের পেছনে খরচ করার পর অন্য কারো কাছ থেকে দু’টাকা ধার করতেন তিনি, আবারও দশ-বিশ টাকা ধার করার জন্য কোথাও যাওয়ার উদ্দেশ্যে! ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ সংকলনটিও তিনি ধার করেই ছাপিয়েছিলেন। ‘তাঁর স্মৃতি’ শিরোনামে এক নিবন্ধে ড. আনিসুজ্জামান লিখেছেন, “…‘একুশে ফেব্রুয়ারী’- হাসানের মহত্তম অবদান- বের হল, প্রশংসিত হল, বাজেয়াপ্ত হল। আমরা উত্তেজিত হলাম। কিন্তু প্রেসের বাকি শোধ হল না। এ নিয়ে হাসান খুব বিপদগ্রস্ত হলেন। অপমানিত হয়ে একদিন বাড়ি চলে গেলেন। হয় জমি নয় গুড় বিক্রি করে টাকা নিয়ে ফিরে এসে দায় থেকে উদ্ধার পেলেন।” (স্মারক গ্রন্থ ‘হাসান হাফিজুর রহমান’, ১৯৮৩; পৃ- ৩৯০-৯৩)

আসলেও মানুষ হিসেবে অসাধারণ ছিলেন ‘হাসান ভাই’, কবি হাসান হাফিজুর রহমান । বিশেষ করে ইতিহাসের ব্যাপারে তার সততা, আন্তরিকতা, পরিকল্পনা ও পরিশ্রম ছিল অতুলনীয়। একই কারণে ইতিহাসও তাকে অমর করেছে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনকে স্বাধীনতামুখী সংগ্রামের প্রথম পর্যায় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। একে কেন্দ্র করে ১৯৫৩ সালে প্রকাশিত প্রথম সংকলন ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’র সম্পাদক ছিলেন হাসান হাফিজুর রহমান। ১৫ খন্ডে সংকলিত স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসের সম্পাদক হিসেবেও তিনিই দায়িত্ব পালন করেছেন। এভাবে বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে তো বটেই, জাতির সমগ্র অস্তিত্বের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে গেছেন- কবি হাসান হাফিজুর রহমান।

লেখক : সাংবাদিক ও ইতিহাস গবেষক

ই-মেইল: shahahmadreza@yahoo.com

মিয়ানমারে আবারো সামরিক অভ্যুত্থানের আশংকা?

ল্যারি জ্যাগান

অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ

অনেক বিশ্লেষক এবং বিদেশী ব্যবসায়ী আশংকা করছেন, মিয়ানমারের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেশটিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দেবে। ইয়াঙ্গুন বিমানবন্দরের বাইরে প্রখ্যাত মুসলিম আইনজীবী কো নিকে হত্যার ঘটনাটি আরো সহিংসতার আশংকায় থাকা আন্তর্জাতিক আদিবাসীদের প্রতি একটি বড় ধরনের বার্তা পাঠালো।

এটা ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্র্যাসির (এনএলডি) জন্য এটা একটা বড় ধরনের ধাক্কা এবং দলের মধ্যে বিভক্তি বাড়িয়ে দিয়েছে। এবং নিশ্চিতভাবেই সরকারি প্রশাসন এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য মারাত্মক প্রভাব ফেলবে। এছাড়া এই ঘটনা আবারো সামরিক অভ্যুত্থানের সম্ভাবনা সামনে নিয়ে এলো।

এই ঘটনাটি দেশের শীর্ষ নেতাদের মধ্যকার সম্পর্কে বিশেষ করে স্টেট কাউন্সিলর আঙ সান সু কি এবং সেনা প্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন আঙ হলাইঙ-এর মধ্যকার টানাপোড়েনও বাড়িয়ে দিয়েছে। এটা নিরাপত্তা বিষয়ক ইস্যু হওয়ায়, তা সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং বেসামরিক সরকারকে কয়েক ধরনের সংকটে ফেলে দিয়েছে।

এনএলডির আইন উপদেষ্টা এবং সেই সাথে সু কির ব্যক্তিগত উপদেষ্টা কো নিকে প্রায় দুই সপ্তাহ আগে নৃশংসভাবে হত্যা করার ঘটনাটি দেশজুড়ে মর্মপীড়াদায়ক একটি বার্তা বইয়ে দিয়েছে। রেঙ্গুন বিমানবন্দরের মতো একেবারে প্রকাশ্য স্থানে উচ্চপদস্থ লোককে হত্যা করার ঘটনা; অর্থাৎ সর্বোচ্চ দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য এই ব্যবস্থা।

আসল হত্যাকারীকে আটক করা হলেও ইতোমধ্যেই স্পষ্ট হয়ে গেছে, সে আসলে ভাড়াটে লোক, টাকার বিনিময়ে তিনি কাজটি করেছেন। তাকে পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে হত্যার উদ্দেশ্য এবং কে তাকে হত্যা করতে পাঠিয়েছিল, সে সম্পর্কে অতি সামান্য তথ্যই জানা গেছে। কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ফাঁস হওয়া ও ভুল তথ্যে তদন্ত কাজের ব্যর্থতাই প্রকাশ করেছে।

এখনো কিছুই পরিষ্কার নয়, এমনকি বিমানবন্দরে হত্যাকারীর সাথে আরো লোকজনের থাকার অভিযোগের সুরাহা হয়নি। এখন পর্যন্ত পুলিশ মাত্র দুজনকে গ্রেফতার করতে পেরেছে- একজন খোদ হত্যাকারী; অপরজন সম্পর্কে কোনো তথ্য জানা যায়নি। তবে কোনো না কোনোভাবে তিনিও হত্যাকান্ডে জড়িত ছিলেন।

সন্দেহের আঙুল সামরিক বাহিনীর দিকেই ওঠে। কারণ নিহত আইনজীবীকে দেখা হতো অবিলম্বে সংবিধান সংস্কার এবং একেবারে নতুন সংবিধান রচনার দাবি জানানো এনএলডি কট্টরপন্থী হিসেবে। উল্লেখ্য, বর্তমান সংবিধানটি কার্যত লিখেছিলেন সাবেক সামরিক স্বৈরাচার সিনিয়র জেনারেল থান শু – সেটা ২০০৮ সালে ভুয়া গণভোটে বিপুলভাবে পাস হয়েছিল। সংবিধান পরিবর্তনের দাবিটি বিশেষ ঘটনা। কারণ আগের সংবিধানকে পুরোপুরি বাদ দিয়ে নতুন একটি গ্রহণ করাটা সামরিক বাহিনীর জন্য সুখকর বিষয় নয়, বিশেষ করে তারা বর্তমান সংবিধানকে যখন পূতপবিত্র বিবেচনা করে।

তবে শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা কো নিকে অবিশ্বাস করলেও এবং তারা এমনকি তাকে ঘৃণা করলেও, এই হত্যাকান্ড থেকে তারা কোনোভাবেই লাভবান হবে না। বরং বিপরীতটাই হবে। এটা তাদের সুনামের জন্য আরো হানিকর হবে, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দাবৃত্তি সম্পর্কে ক্ষুব্ধ আঙুল তোলা হবে। কারণ বিষয় দুটি মন্ত্রিসভার সামরিক বাহিনী থেকে আসা মন্ত্রীদের হাতে, বিশেষ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যেখানে জেনারেল কেউ সু।

এই হত্যাকান্ড জাতীয় নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা এবং সেইসাথে ভঙ্গুর পরিস্থিতিও বিপর্যয়কর অবস্থায় নিয়ে যেতে পারে মনে করে শীর্ষ সামরিক ক্রমপরম্পরাও উদ্বিগ্ন। আরাকানের ঘটনায় অন্তত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে হলেও সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি অনেকটাই ম্লান করে দিয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে তাদেরও হারানোর অনেক কিছু আছে, সেনাপ্রধান নির্বিকারভাবে পাশ্চাত্যে, বিশেষ করে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছাকাছি হতে চাচ্ছেন।

গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সরকারি দফতর, সরকারি সভা এবং প্রধান বিমানবন্দরগুলোর নিরাপত্তা ব্যাপকভাবে জোরদার করা হয়েছে। বিদেশী কূটনীতিকরাও নিরাপত্তার ব্যাপারে আরো বেশি মনোযোগী হচ্ছেন। অনেকে, বিশেষ করে জাপানি, এমনকি দেশটিতে সর্বোচ্চ পর্যায়ে সফর বাতিল করে দিচ্ছেন, কূটনৈতিক দলের সদস্যদের পুরোপুরি ফিরিয়ে নিতে চাচ্ছেন।

তবে দুই সপ্তাহ পর এখন মনে হতে যাচ্ছে, এটা ছিল একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা। প্রেসিডেন্টের অফিসের এক সিনিয়র কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, ‘এটা ছিল স্পষ্টভাবেই সরকারের প্রতি হুঁশিয়ারি সংকেত।’ একটি লাল-রেখা টেনে দেওয়া হলো, অর্থাৎ সংবিধান পরিবর্তনের দিকে হেঁটো না। প্রেসিডেন্টের অফিস থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এই ঘটনাকে সরকার এবং দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা বলে অভিহিত করা হয়। রাজনীতিবিদ এবং রাজনৈতিক দলগুলো ব্যক্তিগতভাবে এই ভেবে উদ্বিগ্ন যে, আসন্ন উপনির্বাচনগুলোতে সহিংসতা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়বে।

তবে কো নি-র হত্যাকান্ড এনএলডি সরকার এবং সামরিক বাহিনী- উভয়ের মধ্যেই ভবিষ্যতের দিকে নজর দিতে তাগিদ সৃষ্টি করবে। এনএলডির জন্য ইস্যু হলো সংবিধান সংস্কার। তাদের মৃত আইন উপদেষ্টা সংবিধান পরিবর্তনের জন্য কাজ শুরু করতে দলের মধ্যে জোর চেষ্টা চালিয়েছিলেন। তিনি এমনকি ফেডারেল সংবিধান প্রশ্নে চলমান শান্তিপ্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের সমঝোতার আগেই সেটা করার জন্য চাপ দিয়ে আসছিলেন। তবে অন্য আরো অনেকে রয়েছেন। বিশেষ করে দলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, দলের সবচেয়ে সিনিয়র পৃষ্ঠপোষক টিন ওও। তিনি কিন্তু সেনাবাহিনী টসে এমন কোনো কাজ করার ব্যাপারে তাড়াহুড়া না করতে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন।

এনএলডির মধ্যে এই বিভক্তি বেড়েছে কো নির হত্যাকান্ডে। এখন কট্টরপন্থীরা জোর দিয়ে বলছে, পার্টি যদি গণতন্ত্রে যাত্রা জোরদারকরণ এবং যেকোনো ধরনের পিছু হটা প্রতিরোধ করতে চায়, তবে যত দ্রুত সম্ভব সংবিধান পরিবর্তন ছাড়া আর কোনো বিকল্প তাদের কাছে নেই।

সামরিক বাহিনীও নিজেদের অবস্থান থেকে ভবিষ্যত নিয়ে আচ্ছন্ন রয়েছে। বিদ্যমান সংবিধানে তাদের যে ক্ষমতার নিশ্চতা দেওয়া হয়েছে, সেটা কমানোর যেকোনো পদক্ষেপ তারা হালকাভাবে নেবে না। সত্যি সত্যিই সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্তারা দৃঢ় অভিমত পোষণ করেন, দেশের পতন রুখতে তাদেরকে এর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করতেই হবে। তারা নিশ্চিত, আঙ সান সু কির সরকার ব্যর্থ হচ্ছে, তারা কখন দেশকে রক্ষা করার দায়িত্ব গ্রহণ করবেন, সেটা কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র।

‘প্রশাসনিক ক্ষমতা’ গ্রহণের পরিকল্পনাও তৈরি করে রাখা হয়েছে। কমান্ডার-ইন-চিফ যদি মনে করেন, দেশের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা বিপদের মুখে রয়েছে, তবে সংবিধানের আওতায় ‘প্রশাসনিক ক্ষমতা’ গ্রহণের ব্যবস্থা রাখা রয়েছে। তবে সেটা হওয়ার জন্য বড় ধরনের সামাজিক অস্থিরতা কিংবা গৃহযুদ্ধ তীব্র হতে হবে। সামরিক বাহিনীর হাতে অনেক বিকল্প রয়েছে, তারা সেগুলো বিবেচনা করছে।

এসবের মধ্যে রয়েছে পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়া এবং কোনো সিনিয়র সৈনিককে প্রধান করে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা। ওই সিনিয়র সৈনিক হতে পারেন কমান্ডার-ইন-চিফ নিজে। যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচন আয়োজনের ব্যবস্থাও করা যেতে পারে। তবে সবচেয়ে অনুকূল বিকল্প হচ্ছে আঙ সান সু কিকে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগে পর্যন্ত সেনাপ্রধানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে, সাময়িক সময়ের জন্যও হতে পারে, রাজি করানো। ১৯৫৮ সালে এমনটা হয়েছিল। তখনকার প্রধানমন্ত্রী উ নু সামরিক প্রধান জেনারেল নে উইনকে অনুরোধ করেছিলেন দেশ পরিচালনা করতে।

তবে এই মুহূর্তে বল এনএলডির কোর্টে। আগামী ছয় মাসে যা কিছু ঘটতে যাচ্ছে, সেটাই দেশটির তথা দেশটিতে গণতন্ত্র জোরদার হবে না কি সামরিক শাসন ফিরে আসবে- তা নির্ধারণ করবে। কো নির হত্যাকান্ডটি অন্তত অনিশ্চয়তার নতুন যুগের সূচনা করেছে।

 লেখক : ইয়াঙ্গুনভিত্তিক সাংবাদিক এবং মিয়ানমার বিশেষজ্ঞ। ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি এশিয়া অঞ্চলের ওপর লেখালেখি করছেন। প্রায় এক যুগ তিনি ছিলেন বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের এশিয়াবিষয়ক সম্পাদক।

 

চীন: পরাশক্তির বিবর্তন-৫৬ : বাণিজ্যিক নির্মাণ খাত: উত্থান ও বৈশ্বিক বাজার

আনু মুহাম্মদ ::

নতুন পর্যায়ে চীনের চোখ ধাঁধানো ‘উন্নয়ন’-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বাণিজ্যিক আবাসনসহ এর নির্মাণ খাতের বিকাশ। লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে চলা চীনের জিডিপির শতকরা প্রায় ১৫ ভাগ এই খাত এবং সম্পর্কিত নির্মাণ ও অন্যান্য বাণিজ্যিক তৎপরতা থেকে আসে। এই নির্মাণ কাজে চীন যে দক্ষতা ও ক্ষিপ্রগতির স্বাক্ষর রেখেছে তা সারা দুনিয়ার জন্যই বিস্ময়কর। অনেক প্রযুক্তিগত নতুন উদ্ভাবনও ঘটেছে এর মধ্য দিয়েই।

আবাসিকখাতসহ পুরো নির্মাণ খাতের বিকাশের সাথে যুক্ত রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় বেসরকারি নির্মাণকারি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা। চীনের নব্য ধনিক শ্রেণীর বড় সমাবেশ এসব ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানেই ঘটেছে। রাষ্ট্রীয় ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ গ্রহণ এদের বিকাশকে নিরাপদ ও ত্বরান্বিত করেছে। অন্যদিকে ব্যাংকগুলোর ঋণের বড় ক্ষেত্র এই নির্মাণ খাত। ২০১৬ সালের প্রথম দিকের হিসাব অনুযায়ী চীনের বৃহত্তম পাঁচটি ব্যাংক তার শতকরা ২৮ ভাগ ঋণই দিয়েছে আবাসিক নির্মাণ খাতে। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এই ঋণ প্রবাহ অব্যাহত থাকলেও এই খাতে চাহিদার তুলনায় অতিউৎপাদনের কারণে ঋণখেলাপীর হারও আশংকাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। [i]

বড় শহরগুলোতে বিশেষত সাংহাই, শেনজেন এবং নানজিং-এ ভবন সম্পত্তির দাম শতকরা ৩০ ভাগেরও বেশি বেড়ে যায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ থেকে শুরু করে চীনের নির্মাণ ব্যবসায়ী সবচাইতে ধনী ব্যক্তিও একে চীনের ইতিহাসে সবচাইতে বড় সমস্যা বা ‘বুদবুদ’ বলে স্বীকার করেন। বিদেশি ব্যাংক, স্থানীয় দালাল, র্রাষ্ট্রীয় বিশ্লেষক সকলেরই এ বিষয়ে একমত। এমনিতে সমগ্র অর্থনীতির মধ্যে অন্য যেকোন খাতের তুলনায় এই খাতের প্রবৃদ্ধি হার বেশি। আবাসিক নির্মাণে অতিউৎপাদন সমস্যা মোকাবিলা করতে গিয়ে সহজ ঋণের সম্প্রসারণ ঘটানো হয়। এর মধ্যে দিয়ে সাময়িকভাবে হলেও বিক্রি আবার বাড়ে।

চীনের অর্থনীতিতে, জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে, এখন উৎপাদনের চাইতে ভোগ, শিল্পের চাইতে পরিষেবার অবদান বেশি বেড়েছে।[ii]

আগেই বলেছি, চীনের ১০ ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির একটি বড় অংশ নির্মাণ ও সম্পর্কিত তৎপরতা থেকেই আসে। নির্মাণ খাতে চীনের সক্ষমতা, প্রযুক্তি ও পুঁজির পুঞ্জিভবন এই খাতকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে চীনের বিনিয়োগ সম্প্রসারণেও বিশেষ তাগিদ সৃষ্টি করেছে। এই সম্প্রসারণ নিশ্চিত করতে বিভিন্ন দেশে চীনের ব্যয়বহুল প্রকল্প এবং ব্যাংকঋণেরও সম্পসারণ ঘটছে। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে অবকাঠামো নির্মাণে চীনের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা এর একটি বহিপ্রকাশ। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়।

এক হিসেবে দেখা গেছে, শুধুমাত্র ২০১৪ সালে চীনের বিভিন্ন কোম্পানি আফ্রিকায় ৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের নির্মাণ চুক্তি করেছে। আফ্রিকায় এখন চীনের চালু নির্মাণ প্রকল্পের সংখ্যা ৩ সহস্রাধিক। আফ্রিকায় নির্মাণ খাতে ফ্রান্স, ইটালী ও যুক্তরাষ্ট্র সম্মিলিতভাবে বাজার মূল্যে যতো নির্মাণকাজ করছে, চীন করছে তার চাইতে বেশি। পুরো বিশ্বের মোট নির্মাণ প্রকল্পের এক চতুর্থাংশ এখন চীন একাই সম্পাদন করে। ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ কর্মসূচিতে চীন যে বিশাল কর্মযজ্ঞ হাতে নিচ্ছে তাতে তার এই প্রভাব আরও বাড়বে।[iii]

বিশ্বের বৃহত্তম বিমানবন্দর থেকে বিশ্ব অলিম্পিকে নির্মাণ শৈলী এবং উচ্চ ব্যয় পুরো বিশ্বের জন্যই এক চমকে যাবার ব্যাপার ছিলো। একমাত্র বেইজিং অলিম্পিকেই চীন ব্যয় করেছে ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি।

চীনে এখন বিশ্বের সবচাইতে বৃহৎ বৈদেশিক মুদ্রার মজুত আছে, যার পরিমাণ ২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি। চীনের বহু নির্মাণ কোম্পানি ব্যাংক থেকে সহজে ঋণ পাবার কারণেই দেশের বাইরে বিভিন্ন প্রান্তে বিনিয়োগ করছে, চুক্তি করছে। নির্মাণ কাজে নতুন নতুন প্রযুক্তির সফল ব্যবহারের মধ্য দিয়ে চীনা কোম্পানি এখন কার্যত অপ্রতিদ্ব›দ্বী হয়ে উঠছে। সাধারণ ইট ও সিমেন্ট ব্যবহার না করে তারা খুব দ্রুত বহুতল ভবন নির্মাণ শেষ করছে। পূর্ব নির্মিত উপাদান সংযোজনের মাধ্যমে ৬ দিনে ১৫ তলা ভবন নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করা এর একটি দৃষ্টান্ত। এই দৃষ্টান্তের পর বহু প্রতিষ্ঠান চীনে বিভিন্ন নির্মাণ উপাদান তৈরির কারখানা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে এবং তার রফতানির বাজারও তৈরি হচ্ছে। ইতিমধ্যে অস্ট্রেলিয়া, কাতার, ইরান, সুদান, এঙ্গোলাসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে এর চাহিদা বাড়ছে। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, থাইল্যান্ডেও এর বাজারের উজ্জল সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।

নির্মাণ খাতের এই উর্ধ্বমুখি গতির প্রভাব জ্বালানী ও পানির চাহিদার উপরও চাপ ফেলেছে। এই চাপ কমাতে গিয়ে পরিবেশ অনুকূল নির্মাণ প্রযুক্তির বিষয়ে রাষ্ট্র ইদানিং মনোযোগ দিচ্ছে। এছাড়া বড় বড় শহরগুলোতে নির্মাণকাজে ব্যাপক প্রসারের পর এখন সরকারিভাবে গ্রামাঞ্চলে নির্মাণকাজে প্রবৃদ্ধি বাড়ছে।[iv]  কিন্তু গ্রামাঞ্চলে নির্মাণ পুঁজি বিনিয়োগের যোগানের তুলনায় বাণিজ্যিক ভবনের নতুন চাহিদা কম। এক্ষেত্রে কৃত্রিমভাবে চাহিদা বাড়ানোর জন্য স্থানীয় সরকার নিজেই জমি ও ভবন ক্রয় করছে বৃহৎ আকারে, এজন্য তাদের নির্ভর করতে হচ্ছে রাষ্ট্রীয় ব্যাংক থেকে নেয়া ঋণের উপর। এর ফলে নির্মাণখাতে পুঁজি বিনিয়োগ যতো বাড়ছে ততো স্থানীয় সরকারের ঋণগ্রস্ততা বাড়ছে।


[i]http://www.forbes.com/sites/sarahsu/2016/07/06/chinas-real-estate-sector-is-overstocked/#9d8727132873

[ii]https://www.bloomberg.com/news/articles/2016-07-16/china-s-economy-gets-boost-from-property-construction-sectors

[iii]http://thediplomat.com/2015/12/africa-and-chinas-construction-market/

[iv]https://www.spireresearch.com/spire-journal/yr2011/q1/2011-q1-china-construction-industry/

 

নিউইয়র্ক টাইমসের সম্পাদকীয়- ট্রাম্পের মুসলিম নিষিদ্ধকরণ : কাপুরুষোচিত ও বিপজ্জনক

অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ ::

প্রথমত, সিরিয়ার উদ্বাস্তুদের পুনঃবসতিস্থাপন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিতকরণ এবং মুসলিম প্রধান সাতটি দেশের নাগরিকদের সাময়িকভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ নিষিদ্ধ করার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের নিষ্ঠুরতার বিষয়টি বিবেচনা করা যাক। এই নিষেধাজ্ঞার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ওইসব পরিবার ক্ষত-বিক্ষত ও দুর্ভোগে পতিত হয়, যারা নিজেদের দেশে হত্যাযজ্ঞ এবং স্বৈরতন্ত্র থেকে রক্ষা পেতে অনন্য আশাবাদী  হয়ে এই দেশে পৌঁছেছে বলে বিশ্বাস করার যৌক্তিক কারণ ছিল।

এই গোঁড়ামিপূর্ণ, কাপুরুষোচিত, আত্ম-পরাজয়মূলক নীতির প্রথম শিকার হয়েছিল হাস্যকর ‘প্রকেটটিং দি নেশন ফ্রম ফরেন টেরোরিস্ট এনট্রি ইনটু দি ইউনাইটেড স্টেটস’ শিরোনামের নির্বাহী আদেশটি কার্যকর করার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে, আমেরিকান বিমানবন্দরগুলোতে আটকা পড়া লোকজন। ওই ব্রুকলিনের ফেডারেল বিচারপতি জরুরিভিত্তিতে স্থগিতাদেশ দিয়ে রায় দেন, বিমানবন্দরগুলোতে আটকা পড়া লোকজনকে তাদের নিজেদের দেশে ফেরত পাঠানো যাবে না। তবে নির্বাহী আদেশটির অন্য সব বিষয়ের ভবিষ্যতই অমীমাংসিত থেকে গেছে।

এটাকে অবশ্যই ওইসব উদ্বাস্তুর জন্য ভাগ্যের নির্মম খেলা হিসেবে অনুভব করতে হবে, যাদেরকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির দেয়ালে বছরের পর বছর ধরে কঠিন যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার শিকার হতে হবে। এই নিষেধাজ্ঞা ভিসা পেয়ে আমেরিকায় জীবনযাপন করতে আসা লাখ লাখ অভিবাসীর জীবন ও সম্ভাবনাময় ক্যারিয়ার বাধাগ্রস্ত করবে। নিষেধাজ্ঞাটির বিরুদ্ধে বিভিন্ন নগরীতে গণবিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে হোয়াইট হাউজ নীতিটির প্রয়োগসীমা সামান্য কমিয়ে এনে বৈধ স্থায়ী অধিবাসীদের রেহাই দেয়।

দম বন্ধ করা এবং কর্কশ ভাষায় ঘোষণা করা নির্দেশটি ‘হলুকাস্ট রিমেমব্রান্স ডে’-এ ইস্যু করাটা আমেরিকার নিজের মূল্যবোধের প্রতি গভীরতম শিক্ষার প্রতি প্রেসিডেন্টের নির্মমতা ও উদাসীনতাই প্রতিফলিত করেছে।

আদেশটির পেছনে কোনো ধরনের যৌক্তিকতা নেই। এতে যুক্তি হিসেবে ১১ সেপ্টেম্বর হামলার কথা বলা হয়েছে, অথচ ছিনতাইকারীদের সবাই যেসব দেশের নাগরিক সেই সব দেশ এবং সেই সাথে, কাকতালীয়ভাবে সম্ভবত নয়, যেসব দেশের সাথে ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসা আছে- সে সব দেশকে বাদ দেওয়া হয়েছে। নথিটিতে কোনো ধর্মের কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়নি। কিন্তু তবুও মুসলমানদের বাদ দিয়ে অন্যান্য ধর্মের লোকজনকে গ্রহণ করার সরকারি কর্মকর্তাদের সুযোগ করে দেওয়াটা সুস্পষ্টভাবে অসাংবিধানিক কাজ।

নির্দেশটির ভাষা যে বিষয়টি স্পষ্ট করেছে তা হলো- মি. ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণার সময় আবেগ সৃষ্টিকারী ‘বিদেশী-ভীতি’ ও ‘ইসলাম-ভীতি’ তার প্রেসিডেন্ট মেয়াদেও বহাল থাকবে। বিষয়টা ছিল অ-আমেরিকান, কিন্তু এখন সেটাই আমেরিকান নীতি। ‘যুক্তরাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে, এই দেশে যারা প্রবেশ করে, তারা এর প্রতি এবং এর প্রতিষ্ঠার নীতিমালার প্রতি বৈরী মনোভাব ধারণ করতে পারবে না,’ বলে যে নির্দেশটি জারি করা হয়েছে, তা দিয়ে এই বিভ্রান্তিপূর্ণ ধারণা প্রচার করা হয়েছে যে, সব মুসলিমকেই হুমকি বিবেচনা করা হবে। (এতে নারীদের প্রতি সহিংস কর্মকান্ড পরিচালনাকারী লোকজন এবং বর্ণ, জেন্ডার ও যৌনতা-সংক্রান্ত আইনভঙ্গের কারণে শাস্তি পাওয়া লোকজনকে রেহাই দেওয়ার দাবি করা হয়েছে। যৌন হয়রানির কথা গর্বভরে প্রচারকারী এক প্রেসিডেন্ট এবং সমকামীদের বিরুদ্ধে বৈষম্যকারী নীতি সমর্থনকারী একজন ভাইস প্রেসিডেন্ট নিজেদের ওই মানদন্ডের জন্য ভীত হতে পারেন।)

এই নতুন নীতির ভ্রষ্ঠতার কারণেই আদালত, কংগ্রেস এবং মি. ট্রাম্পের মন্ত্রিসভার দায়িত্বশীল  সদস্যদের উচিত অবিলম্বে এটি বাতিল করার জন্য স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসা।  তবে তা করার জন্য এর চেয়েও আরো যে বড় কারন রয়েছে : এটা চরম বিপজ্জনক। চরমপন্থী গ্রুপগুলো এই ধারণাটি জোর গলায় নির্দেশটি প্রচার করে বেড়াবে, আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আজ অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্যভাবে, যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে নয়, ইসলামকেই টার্গেট করে, এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। তারা একটি ভীতিপূর্ণ, বেপরোয়া, যুধ্যমান আমেরিকার চেয়ে বড় কিছু চায় না। ফলে এই নিষেধাজ্ঞা যদি কিছু করে, সেটা হবে উত্তেজিত ও অনভিজ্ঞ প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে আরো বেশি প্রতিক্রিয়া উস্কে দিতে, আমেরিকায় আঘাত হানতে আরো জোর প্রচেষ্টা চালানো।

মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকান মিত্ররা যৌক্তিকভাবেই প্রশ্ন করবে, যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কর্মকর্তারা যেখানে তাদের ধর্মকে নিন্দা করছে, সেখানে তারা কেন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সহযোগিতা করবে এবং তার প্রতি কেন শ্রদ্ধাশীল হবে? আমেরিকার সামরিক অভিযান সমর্থনকারী আফগান ও ইরাকিরা তাদের দেশে বোমা ফেলার ব্যাপারে যথেষ্ট সাহসী হলেও, তাদের সবচেয়ে দুর্বল স্বদেশবাসীদের এবং সম্ভবত তাদেরও আশ্রয় দিতে অত্যন্ত ভীত সরকারের জন্য বিপুল ঝুঁকি নেওয়াটা ঠিক হচ্ছে কিনা- তা নতুন করে মূল্যায়ন করতেই পারে। কংগ্রেসের যেসব নীরব রিপাবলিকান রয়েছেন কিংবা কৌশলে নিষেধাজ্ঞার প্রতি সমর্থন দিচ্ছে, তাদের বোঝা উচিত, ইতিহাস তাদেরকে ভীরু হিসেবে স্মরণ করবে।

এই নীতি স্থগিত করার ব্যাপারে  মি. ট্রাম্পের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জিম ম্যাটিসের চেয়ে ভালো অবস্থায় সম্ভবত আর কেউ নেই। নির্বাচনের সময় প্রস্তাবিত মুসলিম নিষেধাজ্ঞার বিপদ সম্পর্কে মি. ম্যাটিসের যথার্থ ধারণা থাকায় তিনি বলেছিলেন, আমেরিকার মিত্ররা যৌক্তিকভাবেই ভাববে, ‘আমরা সত্যিই যুক্তির প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছি’ কিনা। তিনি আরো বলেছেন, ‘এ ধরনের বিষয় এই মুহূর্তে আমাদের ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হচ্ছে, এবং আন্তর্জাতিকব্যবস্থায় এটা খুবই খারাপ বার্তা পাঠাচ্ছে।’

আমেরিকার নিরাপত্তার প্রতি তার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ নিয়ে প্রশংসাকারী সবাই এখন তার নীরবতা উদ্বিগ্ন। এই হাস্যকর ঘটনায় যে তাদের সুনাম কোনোভাবেই বাড়বে না, সেটা মি. ম্যাটিস এবং সরকারের অন্য সিনিয়র কর্মকর্তারা ভালোভাবেই জানেন। বরং তা করা হলে সেটা তাদের পেশাগত সুনাম শেষ করার চেয়েও বড় কিছু হবে। এটা তাদেরকে আমেরিকান মূল্যবোধ পরিত্যাগ এবং তাদের দেশের অন্য নাগরিকদের বিপদগ্রস্ত করার ভুল পথে ঠেলে দেবে।

‘স্বৈরাচার’কে ভালবাসা দিবস

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

জয়নাল, জাফর, দিপালীদের কথা মনে আছে? অপার সম্ভাবনাময় টগবগে সেইসব তরুন, সামরিক স্বৈরাচারের প্রতিরোধ করতে গিয়ে নিষ্ঠুর হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছিলেন। দিনটি ছিল ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি; এখন যেটি ‘ভালবাসা দিবস’। মনে আছে রাউফুন বসুনিয়া, সেলিম, দেলোয়ার, নুর হোসেনদের কথা? সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে কথা বলায় যাদের গুলি করে, ট্রাক চাপা দিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। এদের অনেকের মরদেহ গ্রামের কৃষক বাবা মায়ের কাছে পৌছোয়নি।

মাত্র আড়াই দশকে সব চাপা পড়ে গেছে। সব রক্তদান, নির্মম হত্যাকান্ডের ঘটনা বিস্মৃত হয়ে গেছে। কারন, যার নির্দেশে এসব হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়েছিল, যেসব ছাত্রনেতা হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছিলেন, তাদের দল এবং হত্যাকারীর দল এখন ক্ষমতার সহভাগী। যুদ্ধাপরাধী জামায়াতকে পুনর্বাসন ও ক্ষমতার সহভাগী করার পাপ যেমন বিএনপির জন্য অমোচনীয়, তেমনি প্রাক্তন সামরিক স্বৈরাচারকে পুনর্বাসন ও ক্ষমতার সহভাগী করার ঐতিহাসিক দায়ও নিতে হবে আওয়ামী লীগকে।

১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি সামরিক স্বৈরাচার বিরোধী স্মারক দিবস। তখন সামরিক স্বৈরশাসক এরশাদ। তার বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ ছাত্রদের। মাত্র দু’বছর আগে প্রতিরোধহীন ক্ষমতা দখল করা সেনাপ্রধান এরশাদের বিরুদ্ধে সেটিই ছিল প্রথম সংগঠিত প্রতিবাদ। হাজারো শিক্ষার্থীর মিছিলে গুলি চালায় স্বৈরাচারের পুলিশ বাহিনী। মিছিল রক্তাক্ত হয় সেদিন ও পরের দিন যারা শহীদ হয়েছিলেন- তাদের মধ্যে কয়েকজনের নাম জানা গিয়েছিল মাত্র।

রক্তাক্ত ঐ দিনগুলিতে কতজন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছিলেন? সঠিক সংখ্যা জানা যায়নি। জানা যায়নি কখনও। অনেকের মরদেহ ইচ্ছাকৃত মাটিচাপা পড়েছে। স্বজনরা জানতে পারেনি কখনও। স্বৈরাচারী শাসকের নির্দেশে হত্যার পরে লাশ ‘গায়েব’ করে ফেলেছিল পুলিশ। নাম না জানা এসব শিক্ষার্থীদের শেষ ঠিকানা কোথায় হয়েছে – তা আজ অবধি অচিহ্নিত থেকে গেছে; হয়তো চিরদিনের জন্যই!

১৪ ফেব্রুয়ারি এখন ভালবাসা দিবস। ভালবাসা প্রকাশের একটি স্মারক দিন হিসেবে ১৪ ফেব্রুয়ারি ছাড়িয়েছে পশ্চিমা জগতের সীমানা। জায়গা করে নিয়েছে এদেশেও। পশ্চিমা ঢেউ, তথ্য প্রযুক্তি আর বাজার অর্থনীতির লোলুপতা এই দিনের ক্রেজ ক্রমশ: বাড়িয়ে দিচ্ছে। কর্পোরেট বাণিজ্যের অংশ হিসেবে মিডিয়াও ফি-বছর দিনটি নিয়ে হচ্ছে মাতোয়ারা। সোশ্যাল মিডিয়ায় এর জয়-জয়াকার। ইলেকট্রনিক মিডিয়ার অনুষ্ঠান, সংবাদ, টক-শো সব হয়ে উঠেছে এই দিবসের ক্রীড়নক।

এর আড়ালেই চাপা পড়ে আছে এই দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গৌরব-গাঁথা এবং অবশ্যই নিষ্ঠুর ট্রাজেডি। চাপা পড়ে আছে সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে দ্রোহ আর বিদ্রোহ। এরশাদের নিয়োগকৃত মজিদ খানের কুখ্যাত শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-প্রতিরোধের অদম্য গল্প অচিহ্নিত লাশের মত মাটিচাপা পড়ে গেছে। ভালবাসা দিবসের বিকিকিনির আড়ালে রক্তস্নাত আত্মত্যাগ কখন হারিয়ে গেছে বাঙালীর স্মৃতিভ্রষ্টতা, আবেগ আর ভাবালুতায়। রঙভরা বর্তমান প্রভাবিত করছে, রাজনৈতিক সুবিধাবাদ ও নীতিভ্রষ্টতায় এখন প্রায় সকলেই মোহাবিষ্ট।

ভালবাসা দিবসের মত নানা দিবস পালিত হয় বিশ্বে। ৩৬৫ দিনে জাতিসংঘের উদ্যেগে পালিত দিবসের সংখ্যা ১৩২টি। অধিকাংশ দিবস তৈরীর নেপথ্যে থাকে কর্পোরেট বাণিজ্যিক স্বার্থ। এর মধ্যে অন্যতম ভালবাসা দিবস। একজন খ্যাতনামা সাংবাদিক সাপ্তাহিক ‘যায় যায় দিন’ পত্রিকার মধ্য দিয়ে এদেশে ভালবাসা দিবস আমদানী করেন। এটি কি তিনি পরিকল্পিতভাবে করেছিলেন? তখনকার দিনে পত্রিকাটির প্রভাব বিবেচনায় তিনি স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস হিসেবেও দিনটিকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারতেন। তিনি তা করেননি। তিনি যা করেছেন, তা সকলকে বিশেষ করে তরুনদের দারুনভাবে প্রভাবিত করেছে। এর সাথে যোগ হয়েছে কর্পোরেট বাণিজ্য। এখন ভালবাসা দিবস আর বাণিজ্য মিলে-মিশে একাকার।

আমাদের রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবি, সাংস্কৃতি অঙ্গনের মহারথীগন-তারা কি কখনও বলেছেন ১৪ ফেব্রুয়ারি ‘স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস’। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের সাফল্যের পরিনতিতে শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া হয়ে উঠেছেন প্রধান জাতীয় নেতা। এরশাদের পতনের পর তারা পালাক্রমে দেশের কর্ণধার হয়েছেন। প্রথমবার ক্ষমতায় এসে খালেদা জিয়া যতটুকু সফল ছিলেন দ্বিতীয়বার এসে বেশি পরিমানে ব্যর্থ হয়েছেন। দ্বিতীয় মেয়াদে গোপনে-প্রকাশ্যে আপোষের চেষ্টা করেছেন এরশাদের সাথে। পিতার খুনী হিসেবে অভিযুক্তের সাথে তারেক রহমান করেছেন আপোষ-রফার সভা।

শেখ হাসিনা প্রথমবার ক্ষমতায় এসে স্বৈরাচার বিরোধী মতাদর্শ দুরে সরিয়ে দেন। ১৯৮২ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের পরে তারা এরশাদকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে এরশাদের সঙ্গী হয়েছিলেন। ১৯৯৬-র প্রথম মেয়াদে এরশাদকে ক্ষমতার সঙ্গী করেছিলেন। দ্বিতীয় মেয়াদে মহাজোট গড়েছেন এবং ক্ষমতার অংশীদার করেছেন। তৃতীয় মেয়াদে এরশাদকে পুরস্কৃত করেছেন ‘বিশেষ দূত’ হিসেবে। এর ফল হিসেবে হত্যা মামলায় অভিযুক্তের গাড়ি জাতীয় পতাকা শোভিত হয়েছে।

রাজনীতির পঙ্কিলতায় আড়াই দশক পেরিয়ে পতিত স্বৈরাচার ইতিমধ্যে মূল রাজনীতির প্রয়োজনীয় চরিত্রে পরিনত। দলে-বলে হয়েছে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অংশীদার। এই কারনে স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস জনমন থেকে মুছে গেছে। উজ্জল হয়ে উঠেছে ‘ভালবাসা দিবস’। সামরিক স্বৈরাচার পতনের পর কথিত গণতান্ত্রিক শাসকরাও তাকেই অনুসরনীয় রেখেছেন। সরকার ও সরকারী বাহিনী এবং দলীয় ক্যাডারদের আক্রমনাত্মক আচরন বহাল থাকায় মানুষ অতীত রক্তাক্ত দিনগুলিকে বর্তমানের যন্ত্রনায় স্মরণে রাখছে না।

ক্ষমতার লোভ দ্বারা পরিচালিত আওয়ামী লীগ ও বিএনপি স্বৈরাচার প্রতিরোধ বা পতন দিবস কোনটিকেই আর ধারন করে না এবং তাদেও পক্ষে তা সম্ভবও নয়। এরশাদ সাক্ষাতকার দিয়ে নুর হোসেনকে ‘মাদকাসক্ত’ বললেও প্রতিবাদ করে না দুই দল। একই সময়ে ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের বিচ্যুতি ছিল সবচেয়ে বড় বিপর্যয়। তারা ভুলে যেতে থাকে স্বৈরাচার প্রতিরোধ ও পতন দিবস। জয়নাল, দিপালী, নুর হোসেন ও ডা: মিলনদের তারা ভুলে যায়। আবার এরশাদ যে সরকারের ‘বিশেষ’জ দূত সেখানে মেনন ও ইনু দু’জনেই মন্ত্রী। রাজনৈতিক সুবিধা-আপোষের এরচেয়ে বড় উদাহরন আর কি হতে পারে!

ভ্রষ্ট রাজনীতিক, ঠিকাদার, ব্যবসায়ী ছাত্রনেতারা এখন সব ভুলে মগ্ন অর্থ ও প্রতিপত্তি অর্জনে। তারা ভালবাসা দিবস পালনে শরীক হয়েছেন। এখনকার ছাত্রনেতারা ক্ষমতার লোভ বা ভয়ে আপন অস্তিত্ব ভুলে গেছেন। কথিত বুদ্ধিজীবি, সাংস্কৃতিক কর্মী প্রায় সকলেই দলদাস ভূমিকায়। ফলে তরুন প্রজন্মকে কে মনে করিয়ে দেবে ভালবাসা দিবস পালনের পাশাপাশি স্বৈরাচার বিরোধী দিবসও পালন করা জরুরী।

এরশাদের বিরুদ্ধে নয় বছরের ধারাবাহিক আন্দোলন, সেই ক্যালেন্ডারের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ তারিখ ১৪ ফেব্রুয়ারি এখন গতায়ু ইতিহাস। অবৈধ ক্ষমতা দখলকারী সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ ও আত্মাহুতির দিন ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি। জাতির ইতিহাসে এটি ‘স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস’। এরশাদ পতনের পর বিএনপি ও আওয়ামী লীগসহ বাম ঘরানার রাজনৈতিক দলগুলো গুরুত্বের সাথে দিনটি পালন করতো। কিন্তু এখন গণতন্ত্র, স্বৈরাচার, বাম-ডান সব মিলে-মিশে একাকার। আর এজন্যই ১৪ ফেব্রুয়ারি এখন শুধুই ভালবাসার!  স্বৈরাচারকে ভালবাসার?

খুন-জখম : এখন শুধুই নিজেরা বনাম নিজেরা

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

সাংবাদিক হত্যায় কে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর কে রাণার আপ, সে কূটতর্কে না গিয়ে বলা হোক- সাংবাদিকরা হত্যা- নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতি, সাংবাদিকদের মধ্যেকার অনৈক্য, সাংবাদিক নেতৃবৃন্দের দলদাস ভূমিকা এবং পেশাগত মানের নিম্নগামিতা, সর্বোপরি আইনের শাসনহীনতায়। অস্বীকার করি কি করে, এই দেশে এখন সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সাংবাদিক, সম্পাদকের বিরুদ্ধে সম্পাদক, গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে গণমাধ্যম। হালের স্বরাষ্টমন্ত্রীর আবিস্কার ‘ধাক্কা-ধাক্কি’ তত্ত্ব। এই তত্ত্বের মূল বিষয় হচ্ছে, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সাংবাদিকদের নির্যাতন করে না, মাঝে-মধ্যে ‘ধাক্কা’ লেগে যায়।  সেজন্যই তাদের ভাবনায়- কথায় সাংবাদিক হত্যায় কেউ চ্যাম্পিয়ন আর কেউ রানার আপ।

প্রতিপক্ষবিহীন ক্ষমতাসীন দল, ছাত্র-যুব-শ্রমিক সংগঠন। গজিয়ে উঠেছে অজস্র ভূঁইফোড় সংগঠন। শহরে-নগরে, গ্রামে-গঞ্জে জায়গা পেলেই দখল করে কোন না কোন লীগের সাইনবোর্ড টাঙ্গিয়ে দেয়া হয়। বিলবোর্ডে ছেয়ে গেছে সকল জনপদ। প্রতিপক্ষ না থাকায় মাঠ পর্যায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও সংঘাত-হানাহানিতে জড়িয়ে পড়ছে ক্ষমতাসীন দল, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। তাদের হাতে গুলিবিদ্ধ হচ্ছে মাতৃগর্ভের শিশু, মারা পড়ছে সাংবাদিক, পথচারীসহ নিরীহ মানুষ। সংঘর্ষের মূূলে থাকছে নির্বাচনী বিরোধ, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, মাদক ব্যবসা, দখল, ভাগাভাগি ইত্যাদি।

গণমাধ্যম জানাচ্ছে, মাত্র তিনদিনে পাঁচ জেলায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছে। জেলাগুলি হচ্ছে- খুলনা, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, নড়াইল ও শেরপুর। গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছে সাংবাদিক, খবর শুনে মারা গেছে তার নানী। নড়াইলে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি খুন হয়েছেন নির্বাচনকালীন বিরোধের জেরে। শেরপুরে কলেজ অধ্যক্ষ ও আওয়ামী লীগ নেতা এবং ঈশ্বরদীতে যুবলীগ-ছাত্রলীগের চার কর্মী গুলিবিদ্ধ ও অস্ত্রের আঘাতে জখম হয়েছেন। খুলনার ফুলতলায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছে যুবলীগ নেতা।

চাঁদপুরের হাইমচরের উপজেলা সভাপতি ও উপজেলা চেয়ারম্যান ছাত্রদের দিয়ে পদ্মা সেতু বানিয়ে তাদের পিঠের ওপর দিয়ে জুতা পায়ে হেঁটে উল্লাস প্রকাশ করেছেন। দলের সাধারন সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, বহিস্কার করা হয়েছে এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাও নেয়া হবে। বলেননি- কি আইনী ব্যবস্থা নেয়া হবে। আশা করি, মধ্যযুগীয় সামন্ত প্রভুদের মত আচরন করা লোকদের জন্য দল ও আইন শীগগিরই ব্যবস্থা নেবে। তবে মাত্র তিনদিনের পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, দলের নেতা-কর্মীরা এখন কতটা বেপরোয়া!

গত ১৭ জানুয়ারি সুনামগঞ্জে জলমহাল দখলকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের মধ্যে সংঘর্ষে খুন হয় ৩ জন, জখম হয় ২২জন। আগের দিন মঠবাড়িয়ায় স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতাকে কুপিয়ে আহত করা হয়। বছর শুরুর আগের রাতে খুলনায় আওয়ামী লীগ নেতা ও সিটি কাউন্সিলরকে লক্ষ্য করে ছোড়া গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে মারা যান পুজোর ফুল নিতে আসা এক নারী। নগরীর কোটি কোটি টাকার মাদক ব্যবসা এ সংঘর্ষের মূল কারণ বলে গণমাধ্যমগুলির অনুসন্ধানে উঠে আসছে।

গত বছর জুলাইয়ে খুলনা ও কুমিল্লায় অভ্যন্তরীন কোন্দলে ছাত্রলীগের তিন নেতা-কর্মী খুন হন। পরের সাড়ে তিনমাস তারা সংঘর্ষবিহীন কাটালেও নভেম্বরের দিকে আবার গণমাধ্যমের শিরোনামে উঠে আসে। চট্টগ্রামে ক্ষমতাসীন দলের নেতা ১৯ নভেম্বর ছাত্রলীগ কর্মীদের হাতে লাঞ্চিত হন। পরদিন নিজ বাসায় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সহ-সম্পাদকের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। পরিবারের অভিযোগ, হত্যা করে লাশ ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে।

২০১৭ সাল শুরু হওয়ার দিনে গণমাধ্যমে প্রধান শিরোনামগুলিই ছিল ‘বাসায় ঢুকে সংসদ সদস্যকে হত্যা’; ‘খুলনায় আওয়ামী লীগ নেতাকে হত্যার চেষ্টা, গুলিতে গৃহবধু নিহত’; এরকমই আতঙ্ক ছড়ানো সব খবর নিয়ে স্বাগত জানাতে হয়েছে নতুন বছরকে। স্বাভাবিকভাবেই উৎকন্ঠিত মানুষ। দিনে-দুপুরে, রাত-বিরেতে নিজেদের প্রতিপক্ষ বানিয়ে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা ঝাঁপিয়ে পড়ছে ‘ট্রিগারহ্যাপী’ হয়ে উঠছে। মারছে নিরীহদের, নিজেদের তো বটেই।

লক্ষ্য করুন, পর পর দু’দিনের জাতীয় সংবাদপত্রগুলির শিরোনাম, ‘ক্ষমতাসীন দলের সংঘর্ষ: হানাহানি ও খুন-জখমের ঘটনা’; ‘আবার হানাহানিতে আ. লীগ গুলিবিদ্ধ সাংবাদিকের মৃত্যু’; ‘ঘরের আগুনে পুড়ছে আওয়ামী লীগ’; ‘ক্ষমতাসীন দল বেপরোয়া’; ‘শাসক দলে কেন এতো খুনোখুনি’; এর কারণ হিসেবে বিভিন্ন সূত্র, রাজনীতিবিদ ও সুশীল সমাজের বরাতে দেয়া বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দীর্ঘ ক্ষমতায় দেশজুড়ে চরম বেপরোয়া হয়ে উঠেছে আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মী। দলের অনেক মন্ত্রী, এমপি, জেলা চেয়ারম্যান, উপজেলা চেয়ারম্যান, মেয়র ও দলীয় পদধারী নেতারা মধ্যযুগীয় সামন্ত শাসকদের মত আচরন করছেন।

এসব ভাষ্য- বিশ্লেষণে দাবি করা হচ্ছে, ব্যক্তিগত স্বার্থ আর ক্ষমতার দ্বন্দ্ব থেকে বের হতে পারছে না ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা। রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও খুনোখুনিতে জড়িয়ে পড়ছে তারা। অপরাধ দমন বা কমে না আসার কারন হচ্ছে, খুন বা সংঘর্ষের সাথে যারা যুক্ত, সামান্য ব্যতিক্রম ছাড়া, তারা আইন ও বিচারের আওতায় আসছে না। ফলে ক্ষমতাসীন দলের যে কোন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের বদ্ধমূল ধারনা তারা যা খুশি তাই করে পার পেয়ে যেতে পারি। সবচেয়ে বড় আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, তাদের দলীয় সংঘর্ষের বলি হচ্ছে নিরীহ সাধারনরা।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ও প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপির মধ্যে ১৩ টি সংঘর্ষে নিহত হয়েছে ১ জন, আহত হয়েছে ১৯০ জন। কিন্তু ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীন অর্থাৎ আওয়ামী লীগ বনাম আওয়ামী লীগের সংঘর্ষের ঘটনা ৮৮ টি। খুন হয়েছে ৮৩ জন, আহত ১০৫২ জন। ছাত্রলীগ বনাম ছাত্রলীগ, যুবলীগ বনাম যুবলীগ, ছাত্রলীগ বনাম ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ৩৫ টি। নিহত ৪, আহত ২০৬ জন।

আগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য দলকে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত প্রস্তুত করার ঘোষণার পর যেন বেড়ে চলেছে অভ্যন্তরীন কোন্দল, হানাহানি ও সংঘর্ষ। ২০১৬ সালে ছয় দফায় অনুষ্ঠিত ইউপি নির্বাচনে দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়া সহিংসতায় খুন হয়েছিলেন ১১৬ জন, যার মধ্যে ৭১ জন আওয়ামী নেতা-কর্মী।  তার আগের দু’বছর ২০১৪ ও ২০১৫ সালে ক্ষমতাসীন এই দলের অভ্যন্তরীন সংঘর্ষে খুন হয়েছে ৬৭ জন নেতা-কর্মী।

এই পরিসংখ্যান বলে দিচ্ছে, আওয়ামী লীগের বর্তমান প্রতিপক্ষ ক্ষমতাসীন দল। দৃশ্যত: তারা আইনের উর্ধে অবস্থান করছেন। প্রকাশ্য দিবালোকে অস্ত্রের মহড়া ও সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে রক্ত ঝরাচ্ছেন। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পদক্ষেপ নেয়ার বদলে দর্শক বনে যাচ্ছে। এর কারনও ওপেন সিক্রেট। পুলিশের সামনে আগ্নেয়াস্র বহনের ছবি প্রকাশিত হলেও ভাষ্য আসে: পুলিশ খবর নিচ্ছে আগ্নেয়াস্ত্রটি কি বৈধ নাকি অবৈধ! মানে দাঁড়াচ্ছে প্রচলিত আইন ক্ষমতাসীনদের জন্য প্রযোজ্য নয়।

সবকিছুর প্রতি ক্ষমতাসীনদের সীমাহীন অবজ্ঞা। বিরোধী রাজনৈতিক দলের প্রতি ক্ষমতাসীনদের অবজ্ঞা ক্ষমতায় থাকতে না হয় জনগন দেখতে অভ্যস্ত। যারা সরকারের সমালোচনা করেন, মার্কিন লেখক এইচ এল মেনকেনের ভাষায়- চিন্তাশীল মানুষই সরকারের সবচেয়ে বড় শত্রু । এদের প্রতি এবং জনগনের প্রতি চরম অবজ্ঞার বিষয়েও সকলে অভ্যস্ততা অর্জন করেছেন। কিন্তু আইনের শাসনের প্রতি অবজ্ঞা মনে করিয়ে দিচ্ছে, ক্ষমতাসীন হলেই তারা জবাবদিহিতার উর্ধে চলে যান। অন্য দিকে একটি দল নিজের সাংগঠনিক শৃঙ্খলা রক্ষা করতে পারছে না, সেজন্য কি নিরীহ জনসাধারন প্রাণ দিতেই থাকবে?

ময়মনসিংেহের গফরগাওয়ের বাদল মিয়া (৫৮) একজন রেলকর্মী, মারা গেলেন রেলে কাটা পড়ে। এরকম মৃত্যু বাংলাদেশে গ্রামে-গঞ্জে, শহর-বন্দরে আকছার ঘটে থাকে। যে দেশে স্বাভাবিক মৃত্যু গ্যারান্টি প্রশ্নবিদ্ধ, সেখানে বাদল মিয়াদের মৃত্যু কি বিশেষ কোন অর্থ বয়ে আনে! কিন্তু এই বাদল মিয়ার মৃত্যু অর্থহীন নয়, কোন বিচারেই নয়। এক মা ও তার শিশু সন্তানকে রেলে কাটা পড়া থেকে বাঁচাতে নিজেই রেলে কাটা পড়লেন। এই মহত্তম মৃত্যু আমাদের ফিরিয়ে দেয় মুক্তিযুদ্ধের সত্যিকার চেতনার কাছে। যারা আমাদের বর্তমানের জন্য তাদের ভবিষ্যত উৎসর্গ করেছিলেন। অথবা মনে করিয়ে দেয়, গ্রীক পূরাণের প্রমিথিউসকে, আগুন আবিষ্কার করতে গিয়ে যিনি পুড়ে মরে, মানুষকে আগুন জ্বালানো শিখিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন।