Home » বিশেষ নিবন্ধ (page 5)

বিশেষ নিবন্ধ

কোটা সংস্কার আন্দোলন : হাতুড়ি, রিমান্ড, নিস্ক্রিয়তা এবং কটাক্ষ

সি আর আবরার ::

বেসামরিক আমলাতন্ত্রে নিয়োগের বিতর্কিত ও পৃষ্ঠপোষকতামূলক কোটাব্যবস্থা সংস্কারের পর্যালোচনার দাবি জানাতে গিয়ে দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে সারা দেশের ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্ররা ভয়াবহ মাত্রায় নৃশংসতার মুখে পড়েছে। ৩০ জুন তারা কোটা সংস্কার প্রশ্নে গ্যাজেট প্রজ্ঞাপন জারির জন্য চাপ সৃষ্টি করতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে একটি সংবাদ সম্মেলন আয়োজনের পরিকল্পনা করেছিল। অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ, নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক একটি পদ্ধতিকে অবশ্য ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকেরা ‘ক্যাম্পাস অস্থিতিশীল করার স্বার্থেন্বেষী মহলের ষড়যন্ত্র’ এবং ‘সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ’ হিসেবে বিবেচনা করে। ফলে তারা আর সময় ক্ষেপণ না করে কোটাব্যবস্থা সংস্কারের আন্দোলনকারীদের সংগঠকদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, ‘সফলভাবে’ সংবাদ সম্মেলন ভন্ডুল করে দেয়। আর এর মাধ্যমে ক্ষমতাসীন দলের উৎসাহী অনুসারীদের হাতে ভিন্নমত প্রকাশকারী ছাত্রদের ওপর দমনপীড়নের নতুন মাত্রা শুরু হয়।

কয়েকটি ঘটনায় রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর নিস্ক্রিয়তায় মনে হয়েছে তারা অপরাধমূলক কাজে সহায়তা করছে এবং অন্য কয়েকটি ঘটনায় দেখা যায়, তারা বিপুল উৎসাহে বিক্ষোভকারী, তাদের পরিবার ও বন্ধুদের প্রতি অপূরণীয় ক্ষতি সাধন করেছে। সুস্পষ্টভাবে অপরাধে জড়িতদের গ্রেফতার করে তাদেরকে আইন লঙ্ঘনের জন্য বিচারের মুখোমুখি করার বদলে তারা কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা ও অংশগ্রহণকারীদের খুঁজছে, আটক করছে ও রিমান্ডে নিচ্ছে। তারা শক্তি প্রদর্শন করে শিক্ষক, অভিভাবক ও উদ্বিগ্ন নাগরিকদের প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ ছত্রভঙ্গ করে দিচ্ছে। মন্ত্রীদের পাশাপাশি বিশ্লেষক, সাংবাদিক ও এমনকি ভিসিরাসহ এস্টাবলিশমেন্টের অ-রাষ্ট্রীয় গ্রুপগুলো ক্ষুব্ধ ছাত্রদের ‘বিঘ্ন সৃষ্টিকারী’ হিসেবে অভিহিত করার  ক্ষেত্রে সুর মেলাচ্ছে।

মিডিয়ায় সহিংসতার মাত্রা ও তীব্রতা ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে। দেশের বিভিন্ন অংশে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের রড, বাঁশ, এমনকি হাতুড়ি দিয়ে নির্মমভাবে প্রহার করার ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের সিনিয়র  নেতাদের ছবি ও ফুটেজ অহরহ দেখা যাচ্ছে। কোটা আন্দোলনের সমর্থক ও সহানুভূতিশীলদের প্রতি বিনা উস্কানিতে সহিংসতা চালানো, ছাত্রীদের হয়রানি ও ভীতি প্রদর্শন করার বিস্তারিত প্রতিবেদন ও সাক্ষী-প্রমাণ প্রিন্ট মিডিয়ায় এই সহিংসতা ব্যাপকভাবে দেখা যায়। এসব কিছু সত্ত্বেও সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের দায়িত্বশীল কোনো সদস্যের এ ধরনের কাজের সমালোচনা করা তো দূরের কথা, এগুলো ঠিক হয়নি পর্যন্ত তারা বলেননি। তার পরেও সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে অপরাধীরা ভিন্নমত দমনের জঘন্য এজেন্ডা বাস্তবায়নে অবাধ সুযোগ পেয়েছে। গত ১৫ জুলাই অবস্থার আরো অবনতি ঘটে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান অনুষদের দুই বিবেকবান শিক্ষক সহিংসতায় আহতদের সাথে সংহতি প্রকাশ করার কারনে অপদস্ত হন।

সহিংসতামূলক কাজ করে অপরাধীরা কেবল বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণের পবিত্রতাই লঙ্ঘন করেনি, ভিন্নমত প্রকাশের প্রতীকি সৌধ শহিদ মিনারের অলঙ্ঘনীয়তাও নস্যাৎ করেছে। প্রতিবাদকারীদের শান্ত করার জন্য সরকারপন্থী ছাত্র সংগঠনের নেতা-কর্মীরা সব ধরনের অপরাধমূলক তৎপরতা চালায় ; গুম ও ধর্ষণ; বাঁশ, রড, চাপাতি, এমনকি হাতুড়ি নিয়ে হামলা করে, নিগৃহীত ও অপহরণ করার হুমকি ও ভীতি প্রদর্শনও করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ যে নৈরাজ্যের সৃষ্টি করে, তা দ্রুততার সাথে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সাভার, রংপুর ও দেশের আরো অনেক নগরীতে ছড়িয়ে পড়ে। ক্যাম্পাসকে ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণে রাখার নামে অনৈতিক কর্তৃত্ব দাবি করে সংগঠনটি ‘ক্যাম্পাস অস্থিতিশীল করার কাজে জড়িতদের’ হাত থেকে মুক্ত করার তাদের দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে ।

কথাকে কাজে পরিণত করার একটি ঘটনায় শহিদ মিনারে প্রতিবাদকারীদের রক্ষা করতে গিয়ে বেশ কয়েকজন ছাত্রী আক্রান্ত হয়েছেন। আরেক ঘটনায় এক কোটা সংস্কার সমর্থককে লাইব্রেরি থেকে টেনে বের করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও লাইব্রেরিয়ানের সামনে প্রহার করার সময় তাকে আহত করে। কয়েকটি ঘটনায় ছাত্রলীগ প্রতিবাদকারী ছাত্রদের আটক করে তাদের সাথে খারাপ আচরণ করে তাদেরকে আইন-শৃঙ্খলা সংস্থার কাছে হস্তান্তর করে। শীর্ষস্থানীয় প্রতিবাদকারীদের তাদের বাড়িতে ও হলে গিয়ে ভয়াবহ পরিণতির জন্যে হুমকি দেওয়া হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনগুলোর প্রতিক্রিয়া ছিল ভয়াবহ রকমের হতাশাজনক। প্রতিবাদকারীদের রক্ষা করা ও উদ্বেগ প্রশমিত করতে বলতে গেলে কিছুই করা হয়নি। দিনের পর দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহিংসতা চলা ও এতে ক্যাম্পাস জীবন বিঘ্নিত হলেও প্রক্টর এমন দাবিও করলেন যে, ‘এ ধরনের হামলা হওয়ার কোনো খবর তার জানা নেই’। তিনি দাবি করলেন, ‘অভিযোগ পাওয়া গেলে, তিনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন’। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডি হামলা ও হয়রানি থেকে ছাত্রদের রক্ষা করতে ভয়াবহভাবে ব্যর্থ হলেও একজন মাত্র শিক্ষক ক্যাম্পাস সহিংসতার প্রতিবাদে নগ্ন পায়ে ক্যাম্পাসে এসে তার বিরক্তি প্রকাশ  করায় আসল কারন রেখে ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধেই বিরল সাফল্য লাভ করেছে। সহিংসতার শিকারদের প্রতি সমর্থন, সহানুভূতি প্রদর্শন ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করার দীর্ঘ ঐতিহ্য ছুঁড়ে ফেলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শিক্ষক সমিতিগুলো হামলাকারীদের  পক্ষেই অবস্থান নিয়েছে বলে মনে হচ্ছে।

কোটাবিরোধী আন্দোলনের ব্যাপারে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর প্রতিক্রিয়া ভীতিকর যদি না-ও হয়ে থাকে, অন্তত তা রীতিমতো চোখে পড়ার মতো। ছাত্রলীগ কর্মীরা যখন কোটা সংস্কারপন্থী ছাত্রদের শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ভন্ডুল করার কর্মসূচি ঘোষণা করে, তখন পুলিশ ও অন্যান্য সংস্থা তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। ছাত্রলীগ কর্মীরা যখন শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের সাথে সঙ্ঘাতে জড়ায়, তখন পুলিশ সদস্যরা প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহন না করে বরং শহিদ মিনার প্রাঙ্গণ খালি করে দেয়। এ ধরনের যেকোনো সহিংস ঘটনার পর হামলাকারীদের গ্রেফতার করার বদলে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা হামলার শিকারদের আটক, গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিচ্ছে। প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও সামাজিক মাধ্যমে হামলাকারীদের ছবি, ভিডিও ব্যাপকভাবে দেখা গেলেও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সুস্পষ্ট উদাসিনতা দেখা যায়। ডেইলি স্টারসহ বেশ কয়েকটি দৈনিকে হামলাকারীদের ছবি, নাম ও পদবি (ছাত্রলীগের বিভিন্ন পদে তারা রয়েছে) প্রকাশ করেছে। তারা অবাধে ক্যাম্পাসজুড়ে বিচরণ করলেও হামলার শিকার শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীরাই আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ধাওয়ার মুখে পড়ছে। এক্ষেত্রে খুব কম সংশয়ই আছে যে, আইনকে নিজের ধারায় চলতে দেওয়া হলে বেশির ভাগ হামলাকারীই ক্ষতিকর অস্ত্র বহন, দৈহিকভাবে মারাত্মক ক্ষতি সাধন, অন্যায়ভাবে আটক ও অপহরণসহ নানা অপরাধমূলক অভিযোগে অভিযুক্ত হতো। মরিয়ম ফারার বক্তব্য ছিল মর্মভেদী। ছাত্রলীগের হাতে হয়রানির শিকার হওয়ার পর বাড়ি ফেরার পথে তাকে থানায় নিয়ে আরেক দফা অপদস্থ ও লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘আমি ভাবতাম, থানা হবে নিরাপদ, কিন্তু এটা মনে হয়েছে দ্বিতীয় দোজখ।’

ছাত্রদের সক্রিয়বাদী বা অ্যাক্টিভিস্টদের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ উপনিবেশিক ও পাকিস্তানি পুলিশের গৃহীত বাড়াবাড়িকে লজ্জায় ফেলে সরকারি হাসপাতালগুলো মারাত্মক আহত অন্তত দুজন কোটা সংস্কারবাদী ছাত্রকে চিকিৎসা দিতে অস্বীকার করেছে। একটি ঘটনায় মা-বাবা অভিযোগ করেছেন, আহত ছাত্রকে একটি বেসরকারি ক্লিনিক থেকেও চলে যেতে বাধ্য করা হয়েছে।

আইন শৃঙ্খলা সংস্থাগুলো সময় ক্ষেপণ না করে নির্দোষ প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছে, এমনকি আহতদের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করে সফলও হয়েছে। সম্মানিত ম্যাজিস্ট্রেটরা কোন যুক্তিকে এসব আবেদন মঞ্জুর করেন, তা ভাবলে বিস্মিত হতে হয়। হতভাগ্য ছাত্ররা তাদের ও জাতির ভবিষ্যতকে আক্রান্ত করতে পারে এমন সরকারি নীতির ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করার তাদের সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগ করছিল। তারা হামলকারী নয়, বরং হৃদয়হীন সহিংসতার শিকার।

বিক্ষুব্ধ ছাত্রদের হতাশা বোধগম্য। প্রধানমন্ত্রী ‘কোটা ব্যবস্থা বিলুপ্তি’ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া সত্তে¡ও বলতে গেলে কোনো পদক্ষেপই গ্রহণ করা হয়নি। মনে রাখতে হবে, ছাত্ররা কিন্তু পুরো কোটাব্যবস্থা বাতিল চায়নি। দীর্ঘ নীরবতা ও প্রায় নিষ্ক্রিয়তার মধ্যে নিয়মিতভাবে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের কাছ থেকে ‘অবগত নই,’ ‘নির্দেশনা নেই,’ ‘অগ্রগতি নেই,’ ‘প্রধানমন্ত্রী ফেরার পর সিদ্ধান্ত,’ ‘ঈদের পর গ্যাজেট’ ইত্যাদি বিভ্রান্তমূলক বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছিল। কয়েক মাস আগে বিক্ষুব্ধ ছাত্রদের সাথে আলোচনার সময় শিগগিরই উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করার প্রতিশ্রতি দেওয়া হয়েছিল। মন্ত্রিপরিষদ সচিবও প্রতিশ্রুতিটি পুনর্ব্যক্ত করেছিলেন। সর্বশেষ দফার বিক্ষোভের পরই কেবল ৩ জুলাই কমিটি গঠন করতে বাধ্য হয় প্রশাসন।

বৈধ চ্যালেঞ্জ রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলগুলোকে অন্যায় ও ভ্রান্ত বক্রোক্তি ও কটাক্ষের আশ্রয় গ্রহণের দিকে ধাবিত করছে। এর ফলে এমনকি আইনমন্ত্রী বলে ফেলেছেন, বিএনপি ও জামায়াতই কোটা সংস্কার আন্দোলনকে উস্কানি দিচ্ছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগৈর শক্তিশালী সাধারন সম্পাদকও একই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন। ক্যাম্পাসে বিশৃঙ্খলার জন্য ছাত্রলীগের দায়দায়িত্ব নাকচ করে দিয়ে তিনি যুক্তি দেখান যে, এখন সেখানে ছাত্রলীগের কোনো কমিটিই যেহেতু নেই, তাই সংগঠনটিকে দায়ী করার কোনো অবকাশই নেই। মন্ত্রী কি সত্যিই জনগণকে বিশ্বাস করাতে চান যে কমিটি ভেঙে দেওয়া হলে ছাত্রলীগের সদস্যরা গুটিয়ে যায় ? পাঠকদের স্মরণে থাকতে পারে যে, একসময়ে তেজোদীপ্ত ছাত্রকর্মী হিসেবে পরিচিত এক সিনিয়র মন্ত্রী গত এপ্রিলে প্রতিবাদকারীদের রাজাকার হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। কোনো প্রমাণ ছাড়াই ঢাবির ভিসির বাসভবন ভাংচুরকারীদের দায় কোটা সংস্কার কর্মীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তা-ই যদি হবে, তবে কি প্রশাসনের দায়িত্ব নয় তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে হামলাকারীদের শাস্তি প্রদান করা? যদি তাই না হবে তবে প্রশ্ন করা যায় কিনা, ঘটনা কী  এতোই বিস্বাদপূর্ণ যে তা প্রকাশ করা সম্ভব নয়?

গোয়েন্দা না হলেও পুলিশের অদৃশ্য পোশাক পরিহিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, কোটা সংস্কার আন্দোলন আসলে ‘অন্তর্ঘাত চালানোর লক্ষ্যে একটি সরকারবিরোধী আন্দোলন।’ আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি একই ধরনের পরিভাষা ব্যবহার করে একে ‘অপ:শক্তির কৌশল’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি সাংবাদিকদের সাথে বেশ খোলামেলাভাবেই বলেছেন, প্রতিবাদকারীদের ভিডিও ফুটেজ তাকে ‘তালেবান, আল শাবাব ও বোকো হারামের উস্কানিমূলক ভিডিও বার্তার’ কথাই মনে করিয়ে দিয়েছে।

কোটা সংস্কার অ্যাক্টিভিস্টদের বৈধ দাবির প্রতি সরকার, ক্ষমতাসীন দল ও তাদের সঙ্গী-সাথীদের প্রতিক্রিয়া সুস্পষ্টভাবে জনগণ ও তাদের সমস্যা থেকে তাদের গভীর বিচ্ছিন্নতার কথাই প্রকাশ করছে। এটি যেকোনো ধরনের সম্মিলিত প্রতিরোধে তাদের নাজুকতাই প্রকাশ করছে। এতে আরো সুস্পষ্ট হয়েছে যে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দলীয় পক্ষপাতিত্ব কেবল অপরাধের শিকারদের রক্ষা করতেই ব্যর্থ হচ্ছে না, সেইসাথে অমানবিক, অবৈধ ও প্রজাতন্ত্রের সংবিধানে থাকা ব্যবস্থার সংঘর্ষিক তৎপরতাও শাস্তির বাইরে থেকে যাচ্ছে।

একথাটি মনে রাখতে হবে যে, তরিকুলের ওপর হাতুড়ির আঘাত কেবল তার পা বা মেরুদন্ডেরই ক্ষতি করেনি, তা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

(সি আর আবরার- অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)

বামদের হাতুড়ি ছিনতাই!

শাহাদাত হোসেন বাচ্চু ::

এক. উৎপাদনের মূল শক্তি কৃষক-শ্রমিকের প্রতীক হিসেবে কাস্তে-হাতুড়ি সারা দুনিয়ার কমিউনিষ্টদের লাল পতাকায় উদ্ভাসিত। সর্বহারা শ্রেনীর রাজনৈতিক দল হিসেবে এ নিয়ে তাদের গর্বও রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে গত কয়েক দশকের রাজনৈতিক ভ্রষ্টাচার এবং ডিগবাজীতে কথিত বাম কমিউনিষ্টরা পেটি-বুর্জোয়াদের সাথে মিলে-মিশে ক্ষমতার অংশীদার। ফলে কাস্তে-হাতুড়ির নিয়তি সেভাবেই নির্ধারিত হয়ে গেছে। হাতুড়ি পরিনত হয়েছে ক্ষমতাসীনদের সংগঠিত সন্ত্রাস ও মানুষকে পঙ্গু করে দেয়ার হাতিয়ারে।

বহুকাল বাদে হাতুড়ি আবার ফিরে এসেছে।  চলমান কোটা সংস্কার আন্দোলন দমনে ও শিক্ষার্থীদের পঙ্গু করতে ছাত্রলীগ ব্যবহার করছে হাতুড়ি। সেজন্য এখন সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক বাক্যটি হচ্ছে, “হাতুড়ির নিচে জীবন”। আশির দশকে রফিক আজাদের লেখা কবিতার শিরোনাম বছর-যুগ পেরিয়ে বারবার ফিরে আসছে নিপীড়নের হিংস্রতায়। আন্দোলন দমন করতে হাতুড়িপেটা করে শিক্ষার্থীদের পঙ্গু করে দিতে চাইছে ছাত্র নামধারী রাজনীতিকরা।

এরশাদের রক্তাক্ত সামরিক নিপীড়নকালে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনেও ছাত্র-জনতার ওপর নেমে এসেছিল হাতুড়ির আঘাত। সব ধুয়ে মুছে এরশাদ এখন ক্ষমতার অংশীদার এবং প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত। এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করে তিনি নিজেই সম্ভবত: হাতুড়ি মাহাত্ম্যে মুগ্ধ হচ্ছেন! কারন সেকালেই সম্প্রতি প্রয়াত: কবি রফিক আজাদ লিখেছিলেন তার গনগনে কবিতা “হাতুড়ির নিচে জীবন”। মাত্র তিন শব্দবন্ধের এই বাক্য বুঝিয়ে দিয়েছিল স্বৈরাচার কিভাবে হাতুড়ির আঘাতে মানুষের অধিকার ছিন্ন-ভিন্ন করছে।

২০০১ সালের অক্টোবর নির্বাচনের পরে মানুষের ওপর মধ্যযুগীয় নির্যাতনে ব্যাপক ব্যবহার হয়েছে হাতুড়ির। সে সময়ে ক্ষমতাসীন বিএনপি-জামায়াত জোট অন্যান্য অস্ত্রের পাশাপাশি হাতুড়ি ব্যবহার করে হত্যা করেছে মানুষ, পঙ্গু করে দিয়েছে চিরতরে। ওই নির্বাচনের পরপর বাগেরহাটে সংবাদ সম্মেলনে হামলা করে হাতুড়ি পেটা ও ক্ষুরাঘাতে জখম করেছিল আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও সাংবাদিকদের।

দুই. যে সকল শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কার আন্দোলনে যুক্ত তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন কেমন? বিষয়টি নিয়ে আলাদা পরিসরে বলার ইচ্ছে আছে। খানিকটা প্রাসঙ্গিক-অপ্রাসঙ্গিক, সব মিলিয়ে অনেকের জানা অনেক ঘটনার একটি মনে করিয়ে দিচ্ছি। ২০১৬ সালের ফরিদপুরের শ্যামপুর গ্রামের অটোরিক্সা চালকের ছেলে হাফিজুর মোল্ল্যা, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল মার্কেটিং বিভাগে। অনেকের মত ঢাকায় আবাসন ছিল না তার। হলেই উঠতে হয়েছিল। জায়গা মেলে এসএম হলে দক্ষিণের বারান্দায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ে হলগুলির সিট, তা যেখানেই হোক, বরাদ্দের মালিক ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠন। এলাকায় পরিচিত বড় ভাই হল শাখার সাধারন সম্পাদক। তার সুবাদেই হাফিজুর বারান্দায় শীতের মধ্যে খোলা জায়গায়। এর সাথে জোটে নেতাদের ‘গেষ্ট রুম ডিউটি’। ফলাফল নিউমোনিয়া ও টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়ে বাড়ি ফেরার পথে ফেরীতে মৃত্যু। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং ক্ষমতাসীন ছাত্র নেতারা এই মৃত্যুর দায় নিতে চায়নি। শুধু হাফিজুরের পিতা বুঝতে পারেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর স্বপ্নের কি মর্মান্তিক পরিনতি!

হাফিজুরের করুণ মৃত্যু মধ্য দিয়ে মানুষ জানতে পারে, বিশ্ববিদ্যালয় গেষ্টরুম ডিউটি সম্পর্কে। ২০০১ সালে বিএনপি জোট ক্ষমতাসীন হওয়ার পর প্রতিটি হলেই চালু হয় গেষ্টরুম। এটি হচ্ছে, ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের আইন-কানুন শেখানোর জন্য নির্ধারিত স্থান। এখানে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। রাত ৯টার পরে সাধারনত: শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ’সহবত’ থেকে শুরু করে আচরনবিধি সম্পর্কে নেতারা নসিহত করে থাকেন।

তিন. সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলন পড়েছে ষড়যন্ত্র তত্তে¡র ঘূর্ণিপাকে। সরকারের প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত এই আন্দোলনের যুক্তি খুঁজে পাচ্ছেন না। এরই মাঝে ১৪ দলের বৈঠকে সরকার কোটা আন্দোলন সঠিকভাবে সামাল দিতে পারছে না উল্লেখ করে এই আন্দোলনকে “নির্বাচনী বছরে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র দাবি করা হয়েছে। যদিও এই ষড়যন্ত্রের বিষয়ে সরকার বা সরকার সমর্থকদের কাছ থেকে দৃষ্টিগ্রাহ্য কোন প্রমান এখনও হাজির করা হয়নি।

“কোটা সংস্কার দাবিতে যে সব শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছেন তারা বিএনপি-জামায়াত। তারা সরকার ও উন্নয়ন বিরোধী। তারা রাজাকারের বাচ্চা। তারা শিক্ষাঙ্গনে অস্থিতিশীলতা সৃস্টি করতে চায়”। এটি হচ্ছে ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতাদের প্রতিক্রিয়া। সাম্প্রতিককালে এটিকে ‘লন্ডন ষড়যন্ত্র’র অংশ করা হয়েছে। অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার মনোনীত উপাচার্য এতটাই এগিয়ে যে তিনি এই আন্দোলনে ‘জঙ্গীবাদের বিশ্বায়ন’ দেখতে পাচ্ছেন। তার এই অত্যুতসাহে ক্ষমতাসীন দলও অস্বস্তি বোধ করছে।

গণমাধ্যমের সংবাদ অনুযায়ী সরকারের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা গত তিনমাস অনুসন্ধান করে কোটা আন্দোলনে সম্পৃক্ত নেতৃবৃন্দের কারো সাথে বিএনপি বা জামায়াতের সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পাননি। সুতরাং সরকারের ঢালাও বক্তব্য যে উদ্দেশ্য প্রণোদিত, বিষয়টি সন্দেহাতীত। যে কোন দাবি জনগন বা ছাত্রদের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে তোলা হবে এটিকে স্বাভাবিক। কিন্তু বর্তমান সরকার যে কোন ন্যায্য দাবির ক্ষেত্রেও সরকার বিরোধিতা হিসেবে চিহ্নিত করার প্রয়াস চালান এবং ষড়যন্ত্রের গন্ধ পান।

এখানে একটি মজার বিষয় রয়েছে। কোটা সংস্কারের আন্দোলনের এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদে কোটা ব্যবস্থা বাতিলের ঘোষণা দেন। সেটি ছিল ‘মেঘ না চাইতেই জল’ পেয়ে যাওয়ার মতো। কারণ আন্দোলনটি ছিল কোটা সংস্কার নিয়ে। সম্ভবত: প্রধানমন্ত্রী খানিকটা বিরক্ত হয়ে কোটা বাতিলের ঘোষণা দেন। কিন্তু কোটা বাতিল পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠি সঙ্কাটাপন্ন হবে সেজন্য বাতিলের পক্ষে খোদ আন্দোলনকারীদের মধ্যেও দ্বিধা রয়েছে।

চার. পুলিশ সবসময় নিস্ত্রিয় থাকে না। সরকার পক্ষ হিসেবে তারা নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করে। কোটা আন্দোলনকারীদের হামলা এবং শিক্ষক লাঞ্চণার বিষয়ে তাদের আগ্রহ ছিল না। তবে উদ্বিগ্ন ও নাগরিকদের সমাবেশ প্রতিহত করতে তাদের তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মত। সমাবেশস্থল ছিল তাদের দখলে। প্রতিবাদকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে সবকিছুই তারা করেছে। সেক্ষেত্রে কোটা সংস্কারপন্থীদের প্রতিপক্ষ হিসেবে পুলিশ ও ছাত্রলীগ অনেকটা সমান্তরাল ভ’মিকা পালন করেছে।

কর্পোরেটাশ্রয়ী সংবাদ মাধ্যম কোটা সংস্কারপন্থীদের ওপর নিপীড়নের বিষয় পাশ কাটিয়েছে অবিমৃষ্যকারীতায়। বিশ্বকাপ নিয়ে তারা ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। দায়সারা গোছের কিছু খবর দিয়েছেন বটে, কিন্তু তথ্য ট্যুইষ্টিং করে। ছাত্রদের ওপরে দিবালোকে হামলার বিষয়টি অভিযোগের বরাতে রিপোর্ট করা হয়েছে। আন্দোলনরত ছাত্রদের গ্রেফতার ও রিমান্ড বিষয়ও নির্লিপ্ততা ছিল চোখে পড়ার মত। সংবাদ মাধ্যমের কোন অনুসন্ধানী রিপোর্ট বা বিশেষ প্রতিবেদন না থাকার মূল কারন হচ্ছে, এর নেপথ্যে নিয়ন্ত্রন এবং মালিকপক্ষ।

যুদ্ধের সময়ও আশা করা হয় আহত ব্যক্তি হাসপাতালে চিকিৎসা পাবে। আহত ব্যক্তির পক্ষ-বিপক্ষ চিকিৎসকের কাছে বিবেচ্য হবে না-এটিও মিথ্যা প্রমানিত হয়েছে কোটা আন্দোলনকারীদের ক্ষেত্রে। সরকারী হাসপাতাল, কোন কোন ক্ষেত্রে প্রাইভেট ক্লিনিক থেকেও আহত ছাত্রদের বের করে দেয়া হয়েছে। এসব ছাত্ররা ছাত্রলীগের হামলায় গুরতর জখম ছিলেন এবং পঙ্গু হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। চিকিৎসকরা এক্ষেত্রে সরকারের প্রতি বিশ্বস্ততা অব্যাহত রেখেছেন।

পাঁচ. ছাত্রলীগের ১৪ নেতা-কর্মীদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়ে মানববন্ধন করে উপাচার্যকে স্মারকলিপি দিয়েছে নিপীড়ন বিরোধী শিক্ষার্থীবৃন্দ। লাঞ্চণার শিকার শিক্ষকরা ছাত্রলীগকে দায়ী করে নিরাপদ ক্যাম্পাসের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করেছেন। তাদের সংহতি সম্মেলনও অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২৩ জুলাই তারা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করবে এবং রাষ্ট্রপতি বরাবরে স্মারকলিপি দেবেন।

কোটা সংস্কার পদ্ধতির পক্ষে দৃশ্যত: “কোথাও কেউ নেই”। গুটিকয়েক শিক্ষক, বুদ্ধিজীবি এবং নাগরিক সমাজের নেতৃবৃন্দ অসীম সাহসিকতায় প্রতিবাদী হওয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সামষ্টিক কোন উদ্যোগ নেই। বরাবরই এই আন্দোলন ষড়যন্ত্র অভিধায়ে আখ্যায়িত হওয়ায়ই কি প্রতিরোধের চিহ্ন নেই? নাকি প্রতিবাদের সীমানা সংকৃচিত করে নিজেরাই নিজেদের মধ্যে খেলা করছেন সকলে মিলে?

তিন মাসেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৫ হাজার কোটি টাকা

বুধবার প্রতিবেদন ::

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান মতে, ২০১৮ সালের মার্চ পর্যন্ত দেশের রাষ্ট্রায়ত্ব বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো মোট ঋণ বিতরণ করেছে ৮ লাখ ২২ হাজার ১৩৭ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়ে গেছে ৮৮ হাজার ৫৮৯ কোটি ৩৭ লাখ টাকা- যা মোট বিতরণ করা ঋণের ১০ দশমিক ৭৮ শতাংশ। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত খেলাপি ছিল ৭৪ হাজার ৩০৩ কোটি ১১ লাখ টাকা। সে হিসাবে মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৪ হাজার ২৮৬ কোটি ২৬ লাখ টাকা। তবে এর বাইরে অবলোপন করা ৫৫ হাজার ৩১১ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ মামলায় আটকে আছে। এ ঋণ হিসাবে নিলে খেলাপি ঋণের প্রকৃত অঙ্ক দাঁড়াবে প্রায় ১ লাখ ৪৩ হাজার ৯০০ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় ব্যাংকের ১ লাখ ৪৬ হাজার ৪১৯ কোটি ৯৯ লাখ টাকা বিতরণের বিপরীতে খেলাপি হয়ে পড়েছে ৪৩ হাজার ৬৮৫ কোটি ৪৪ লাখ টাকা; যা এসব ব্যাংকের মোট বিতরণ করা ঋণের ২৯ দশমিক ৮৪ শতাংশ। তিন মাস আগে এই ছয়টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল ৩৭ হাজার ৩২৬ কোটি টাকা বা ২৬ দশমিক ৫২ শতাংশ। অবলোপন করা ঋণ মন্দ-ঋণ হওয়ায় নীতিমালা অনুযায়ী এসব ঋণ ব্যাংকের খেলাপি ঋণের আর্থিক প্রতিবেদন থেকে আলাদা করে রাখা হয়। এ ছাড়া তথ্য গোপন করে বিপুল অঙ্কের খেলাপিযোগ্য ঋণকে খেলাপি না দেখানোর অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন পরিদর্শনেও এ ধরনের তথ্য উঠে এসেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খেলাপি বা শ্রেণীকৃত ঋণ আদায়ে সবচেয়ে বড় সমস্যা আইনগত জটিলতা। খেলাপি গ্রাহকরা ঋণ পরিশোধ না করার জন্য আইনের বিভিন্ন ফাঁক-ফোকর বের করেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শ্রেণীকরণ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য হাইকোর্টে রিট পিটিশন করে স্থগিতাদেশ নিচ্ছেন। এ সুবাদে তারা অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ সুবিধা নিচ্ছেন। কারণ, একজন ঋণখেলাপি অন্য কোনো ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারেন না। এমনকি জাতীয় কোনো নির্বাচনেও অংশ নিতে পারেন না। এ ক্ষেত্রে আইনগত বাধা না থাকলেও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো প্রকৃতপক্ষে একজন ঋণখেলাপিকেই গ্রাহক হিসেবে গ্রহণ করছে। ওই গ্রাহক আবার খেলাপি হয়ে আবার আদালতে মামলা করছে। এভাবে ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে তারা আইনি প্রক্রিয়া গ্রহণ করছে। এটি মোকাবেলায় ব্যাংকগুলোর ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ আদায় কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।

এদিকে, খেলাপি ঋণ বাড়তে থাকায় ব্যাংকগুলোর তহবিল সংকট প্রকট আকার ধারণ করছে। ব্যাংকগুলো যে ঋণ দিচ্ছে তা আদায় হচ্ছে না। আবার আমানত প্রবাহও কমে গেছে। এতে বেসরকারি ব্যাংকে তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে। এ সংকট মেটাতে ব্যাংকগুলো আমানতের সুদহার সামান্য বাড়িয়ে গ্রাহক টানার চেষ্টা করছে। তবে ঋণের সুদহার বাড়িয়ে দিচ্ছে অনেক বেশি। ২০১৮ সালের মার্চ শেষে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ২১ হাজার ২৯০ কোটি ২৩ লাখ টাকা। এর বিপরীতে খেলাপি হয়েছে ৩৭ হাজার ২৮৯ কোটি টাকা; যা এসব ব্যাংকের মোট বিতরণ করা ঋণের ৬ শতাংশ। তিন মাস আগে ডিসেম্বর পর্যন্ত এ খাতের ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ছিল ২৯ হাজার ৩৯৬ কোটি ১৯ লাখ টাকা। মার্চ শেষে বিদেশি খাতের ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ৩১ হাজার ২২৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকার ঋণের বিপরীতে খেলাপি হয়েছে ২ হাজার ১৮৮ কোটি ৫৯ লাখ টাকা; যা এসব ব্যাংকের মোট বিতরণ করা ঋণের ৭ দশমিক ১ শতাংশ।

তিন মাস আগে বিদেশি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ছিল ২ হাজার ১৫৪ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। অন্যদিকে, এ সময়ে সরকারি মালিকানার দুই বিশেষায়িত ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৩ হাজার ১৯৯ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। এর বিপরীতে খেলাপি হয়েছে ৫ হাজার ৪২৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা; যা এসব ব্যাংকের মোট বিতরণ করা ঋণের ২৩ দশমিক ৩৯ শতাংশ। তিন মাস আগেও এই ব্যাংক দুটির একই পরিমাণ খেলাপি ঋণ ছিল।

গত বছরের শেষ দিকে বিপুল অঙ্কের ঋণ পুন:তফসিলের মাধ্যমে নিয়মিত ও আদায় জোরদায় করায় খেলাপি ঋণ এক অঙ্কের ঘরে নেমে আসে। কিন্তু চলতি বছরে খেলাপি ঋণ আবার লাগামহীনভাবে বাড়তে শুরু করেছে। এর কারণ হিসেবে অর্থনীতিবিদসহ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকগুলো তাদের অডিট রিপোর্ট প্রকাশ করে। তাই সেখানে ভালো অবস্থান দেখাতেই বিভিন্ন কৌশল প্রয়োগ করে থাকে ব্যাংকগুলো। এর মধ্যে অন্যতম হলো খেলাপি ঋণ পুন:তফসিল বা নবায়ন। আর বছরের শেষ সময়ে এসে এই সুবিধা দেয়া-নেয়ার প্রবণতাও বাড়ে। এ ছাড়া শেষ সময়ে ঋণ আদায় কার্যক্রম জোরদার করা হয়। কিন্তু বছরের শুরুতেই ঋণ পুন:তফসিল যেমন কম হয়, তেমনি আদায় কার্যত্রমেও সে রকম গতি থাকে না।

রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তাদের বিশেষ সুবিধা দিতে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ পুন:তফসিল ও পুনর্গঠনে (নিয়মিত) বিশেষ ছাড় দেয়া হয়। ২০১৩ সালের জুলাই থেকে ২০১৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এই আড়াই বছরেই এ সুযোগ নেন দেশের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বড় বড় শিল্প গ্রুপ। এর আওতায় বাংলাদেশ ব্যাংকের অনাপত্তি সাপেক্ষে প্রায় ৪৯ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ নিয়মিত করা হয়েছে। এর বাইরে বিদ্যমান নীতিমালার আওতায় ব্যাংকগুলো নিজেরা আরো ৬৪ হাজার ৮৬২ কোটি টাকার ঋণ নিয়মিত করেছে। সব মিলে ওই সময় পর্যন্ত মোট ১ লাখ ১৩ হাজার ৭৭৬ কোটি টাকার ঋণ বিশেষ সুবিধায় নিয়মিত করা হয়েছে। পরে ব্যাংক খাতে পাঁচ শ’ কোটি টাকার বেশি ঋণ রয়েছে এ রকম ১১টি ব্যবসায়ী গ্রুপকে ১৫ হাজার ২১৮ কোটি টাকার ঋণ পুনর্গঠনের সুযোগ দেয়া হয়। কিন্তু বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত এসব ঋণগ্রাহক যথাসময়ে ফেরত দিচ্ছেন না। ফলে তা আবারো খেলাপি হতে শুরু করেছে।

ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা, রাজনৈতিক বিবেচনায় বড় ঋণখেলাপিদের আইনের আওতায় না আনা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে খেলাপি ঋণ বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ সুবিধায় যেসব ব্যবসায়ী ডাউন পেমেন্ট ছাড়াই খেলাপি ঋণ নবায়ন করেছিলেন ওই সব ঋণ আবার খেলাপিতে পরিণত হচ্ছে। কারণ এ সময়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের কোনো উন্নতি হয়নি। যেসব ব্যবসায়ী খেলাপিতে পরিণত হয়েছিলেন ওই সব ব্যবসায়ী ক্রমন্বয়ে লোকসানের ঘানি টানতে টানতে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন। এর ফলে তারা নবায়ন হওয়া খেলাপি ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে পারছেন না। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক বিবেচনায় অনেক বড় বড় ব্যবসায়ীকে ঋণ দেয়া হয়েছে। কিন্তু ওই সব ব্যবসায়ী ঋণ পরিশোধ করছেন না। আবার রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা ওই সব ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে ব্যাংক মামলা দায়ের করেও তেমন কোনো সুবিধা করতে পারছে না।  তৃতীয়ত, বাংলাদেশ ব্যাংকের দুর্বল তদারকি ব্যবস্থাও খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ার বড় কারণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের দুর্বল তদারকির কারণে হলমার্ক, বিসমিল্লাহ, বেসিক ব্যাংকসহ বড় বড় ঋণ-কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু এসব ঋণ আর পরিশোধ না করায় তা খেলাপিতে পরিণত হচ্ছে। সব মিলে দেশের ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ বেড়ে যাচ্ছে। আর খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকের বিনিয়োগ সক্ষমতাও কমে যাচ্ছে। ব্যাংকগুলো তার আয় থেকে বাড়তি প্রভিশন সংরক্ষণ করতে গিয়ে লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছে।

একজন ঋণখেলাপি অন্য কোনো ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারেন না। এমনকি জাতীয় কোনো নির্বাচনেও অংশগ্রহণ করতে পারেন না। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খেলাপি ঋণ আদায়ের সবচেয়ে বড় জটিলতা হিসেবে দেখা দিয়েছে- আইনগত জটিলতা। শ্রেণীকৃত ঋণ আদায়ে আইনি জটিলতা প্রকট আকার ধারণ করেছে। খেলাপি গ্রাহকেরা ঋণ পরিশোধ না করার জন্য বিভিন্ন আইনি ফাঁকফোকর বের করছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে খেলাপি গ্রাহকরা  শ্রেণীকরন  হতে বেরিয়ে আসার জন্য হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করে শ্রেণীকরনের  ওপর স্থাগিতাদেশ নিচ্ছেন। এ সুবাদে তারা অন্য ব্যাংক থেকে ঋণসুবিধা নিচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে আইনগত বাধা না থাকলেও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো প্রকৃতপক্ষে একজন ঋণখেলাপিকেই গ্রাহক হিসেবে গ্রহণ করছে। ওই গ্রাহক ফের খেলাপি হয়ে আবার আদালতে মামলা দায়ে করছেন। এভাবে ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে তারা আইনি প্রত্রিয়া গ্রহণ করছেন। এতে ব্যাংকগুলোর জন্য অত্যন্ত ব্যয়সাপেক্ষ হয়ে দেখা দিচ্ছে। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ আদায় কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।

রূপপুরের এপিঠ ওপিঠ-৪ : ব্যয় এখনো চূড়ান্ত নয়, পরামর্শকও রাশিয়ার

অরুন কর্মকার ::

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ব্যয়ের প্রকল্প। সরকারিভাবে এখন পর্যন্ত এই প্রকল্পের ব্যয় বলা হচ্ছে এক লাখ ৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ৮০ টাকা হিসাবে ১৩২০ কোটি মার্কিন ডলার)। অর্থাৎ এই প্রকল্পের ব্যয় প্রায় চারটি পদ্মা সেতুর ব্যয়ের সমান। কিন্তু এটাই রূপপুর প্রকল্পের সব ব্যয় নয়। এই প্রকল্পের জন্য আরো অনেক ব্যয়ের হিসাব নিকাশ বাকি আছে।

বিদ্যুৎকেন্দ্রটির আয়ুস্কাল (অন্তত ৬০ বছর) জুড়ে প্রয়োজনীয় জ্বালানি (ইউরেনিয়াম) সরবরাহ, স্পেন্ট ফুয়েল ফেরত নেওয়া, যে কোনো সময় রাশিয়ার কাছ থেকে চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়া, পরামর্শক নিয়োগসহ এখনও রাশিয়ার সঙ্গে কয়েকটি চুক্তি সম্পাদন বাকি আছে। এর প্রতিটি চুক্তির সঙ্গেই আর্থিক সংশ্লেষ রয়েছে। তবে সেই অর্থের পরিমান কত তা চুক্তিগুলো না হওয়া পর্যন্ত বলা সম্ভব নয় বলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানিয়েছে।

এ ছাড়া, রূপপুর প্রকল্পে মালামাল সরবরাহের জন্য নতুন কিছু রেল লাইন স্থাপন, নদীপথ খনন এবং সেখানে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য উন্নত মানের সঞ্চালন লাইন নির্মাণসহ আনুসঙ্গিক অনেক কাজের জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় হবে। সব মিলে এখন পর্যন্ত যে হিসাব সংশ্লিষ্টরা করেছেন তাতে এই প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্রয় হতে পারে ১৮০০ কোটি ডলার। প্রতি ডলার ৮০ টাকা হিসাবে এক লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা।

অন্যদিকে, রূপপুর প্রকল্পের পরামর্শক হিসেবে রাশিয়ারই একটি প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ রুশ সরকারের পক্ষে সে দেশের যে কোম্পানিগুলো রূপপুর প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে তাদের কাজ যথাযথ হচ্ছে কি না, প্রকল্পের যে সব ব্যয় এখনো নির্ধারিত হয়নি সেগুলো নির্ধারণে বাংলাদেশের অবস্থানের পক্ষে কথা বলা, রাশিয়ার সরবরাহকারী কোম্পানিগুলো চুক্তি অনুযায়ী সব যন্ত্রপাতি ও আনুসঙ্গিক জিনিসপত্র দিচ্ছে কি না, এ সবই দেখবে এই পরামর্শক প্রতিষ্ঠান। প্রশ্ন হল—রাশিয়ার সরবরাহকারী কোম্পানিগুলোর কাজকর্ম তদারক করে রাশিয়ারই একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কতটা নিরপেক্ষভাবে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করবে বা করতে পারেব।

ব্যয়: রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে মোট ব্যয় কত হওয়া উচিৎ এবং কত হচ্ছে, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। মোট ২৪০০ মেগাওয়াটের দুই ইউনিটের জন্য রাশিয়ার সঙ্গে সই করা চুক্তিতে ব্যয় নির্ধারিত হয়েছে ১২৬৫ কোটি মার্কিন ডলার। সরকারের পক্ষ থেকে এই ব্যয়কে বলা হচ্ছে ‘ফার্ম অ্যান্ড ফিক্সড’। অর্থাৎ এই ব্যয় আর বাড়বে না।

তবে এর বাইরে সমীক্ষার জন্য ইতিমধ্যে ৫৫০ মিলিয়ন (৫৫ কোটি) ডলার ব্যয় করা হয়েছে। ফলে ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১৩২০ কোটি ডলার। তাতে প্রতি ডলার ৮০ টাকা হিসাবে ব্যয় দাঁড়ায় এক লাখ ৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এই ১৩২০ কোটি ডলারের ৯০ শতাংশ (১১৮৮ কোটি ডলার) রাশিয়ার কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে ঋণ হিসেবে। ঋণের সুদ হবে লন্ডন আন্ত:ব্যাংক লেনদেনের সুদের হার (লাইবর) ও ১ দশমিক ৭৫ শতাংশের যোগফল। অর্থাৎ লাইবর যখন  এক শতাংশ হবে তখন এই সুদের হার হবে ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ। সাধারণত: লাইবর ১ শতাংশের মধ্যেই ওঠানামা করে। এই ঋণ পরিশোধের জন্য ১০ বছর গ্রেস পিরিয়ড থাকবে। তার পরবর্তী ১৮ বছরে সম্পূর্ণ ঋণ সুদাসলে পরিশোধ করতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন হবে প্রায় ১৮০০ কোটি ডলার।

রূপপুর প্রকল্পের ব্যয় ১৩২০ কোটি ডলার ব্যয় ধরেও যদি প্রতি কিলোওয়াট বিদ্যুতের জন্য স্থাপন ব্যয় (ইন্সটলেশন কস্ট) হিসাব করা হয়, তাহলে রূপপুর কেন্দ্রের জন্য তা দাঁড়ায় সাড়ে পাঁচ হাজার ডলার। এর সঙ্গে তুলনা করা যায় আমাদের এই অঞ্চলে রাশিয়ার তৈরি যে সব বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে সেগুলোর। এ রকম একটি হচ্ছে ভারতের তামিলনাড়ুর কুদনকুলম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এই কেন্দ্রের ১ ও ২ নম্বর ইউনিট স্থাপনের কাজ শুরু হয় ২০০২ সালে। এই দুটি ইউনিটে প্রতি কিলোওয়াট বিদ্যুতের জন্য স্থাপন ব্যয় হয়েছে ১৩০০ ডলার।

এরপর ওই একই কেন্দ্রে ৩ ও ৪ নম্বর ইউনিটের কাজ শুরু করা হয়েছে। সেখানে প্রতি কিলোওয়াটের জন্য স্থাপন ব্যয় পড়ছে তিন হাজার ডলার। ১৩০০ থেকে বেড়ে যে তিন হাজার ডলার হয়েছে তার একাধিক কারণ আছে। যেমন, গত ১০/১২ বছরে নির্মাণ সামগ্রির দাম বেড়েছে। ফুকুশিমার দুর্ঘটনার পর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা অনেক বাড়ানো হয়েছে। সে জন্যই এই ব্যয় বৃদ্ধি।

কুদনকুলমের সঙ্গে রূপপুরের পার্থক্য শুধু প্রযুক্তির ক্ষেত্রে। কুদনকুলমের রিঅ্যাক্টর ভিভিইআর-১০০০ মডেলের। আর রূপপুরের রিঅ্যাক্টার ভিভিইআর-১২০০ মডেলের। শুধু এই কারণে প্রতি কিলোওয়াট বিদ্যুতের স্থাপন ব্যয় আড়াই হাজার ডলার বেশি হওয়া অস্বাভাবিক বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।

পরামর্শক রাশিয়ার: রূপপুর প্রকল্পের শুরু থেকেই পরামর্শক নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সরকারের বাইরে বিশেষজ্ঞ মহলে আলোচনা ছিল। বলা হচ্ছিল, আমরা অনেক ছোটখাট সাধারণ প্রকল্পের জন্যও পরামর্শক নিয়োগ করি। কিন্তু রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মত একটি বিশেষায়িত বৈজ্ঞানিক প্রকল্পের জন্য, দেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ ব্যয়ের প্রকল্পের জন্য কোনো পরামর্শক নিয়োগ করছি না কেন।

তা ছাড়া, পরমাণু প্রযুক্তি সম্পর্কে আমাদের জানাশোনাও যখন খুব কম, তখন পরামর্শক নিয়োগ করা খুবই দরকার ছিল। কিন্তু তখন সরকার এ কথা কানে তোলেনি। তবে এখন, প্রকল্পের মূল নির্মাণপর্বে এসে পরামর্শক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ‘রোসটেকনাদজর টিএসও জেএসসি ভিবিও সেফটি’ নামের একটি রুশ কোম্পানিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের পরামর্শক নিয়োগের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এই কোম্পানিকে পরামর্শক নিয়োগ করার প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিপরিষদ কমিটিতে পাঠিয়েছে। এই কোম্পানির পরামর্শক সেবা নেওয়ার জন্য ১২ কোটি (১২০ মিলিয়ন) মার্কিন ডলারের একটি চুক্তি হবে।

কয়েকজন বিশেষজ্ঞ বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকন্দ্রের সব কিছুই করবে রাশিয়া, বাংলাদেশের সঙ্গে রাশিয়ার চুক্তি এমনই। সে ক্ষেত্রে আমাদের উচিৎ ছিল একটা স্বতন্ত্র পরামর্শক নিয়োগ করা যারা আমাদেরকে আমাদের কাজে সাহায্য করবে এবং আমাদের স্বার্থ সুরক্ষা করবে। কিন্তু তা না করে আমরা নিয়োগ করেছি এমন একটি প্রতিষ্ঠানকে যেটি যন্ত্রপাতি সরবরাহকারী কোম্পানিরই একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান। তাঁদের আনুগত্য কোথায় থাকবে, আমাদের প্রতি নাকি তার ‘প্যারেন্টস কোম্পানি’র প্রতি? যদি প্যারেন্টস কোম্পানির প্রতি তার আনুগত্য থাকে সে কি আমাদের সঠিক পরামর্শ দেবে? নাকি সেই কোম্পানির স্বার্থ রক্ষা করে যেটুকু দেওয়া যায় সেটুকু দেবে?

স্বতন্ত্র পরামর্শক থাকলে তাঁরা রাশিয়ানদের বলতো-এই যে তোমরা ১২৬৫ কোটি ডলার দাম নির্ধারণ করেছ এটা অনেক বেশি হয়ে গেছে। আমাদের রাশান কনসালট্যান্ট কি আমাদের সে কথা বলবে যে তোমরা বেশি টাকা দিচ্ছ? এই জিনিসগুলো হলো ‘ম্যাটার অফ এথিকস’ (নৈতিকতার বিষয়)। এই এথিকস কি অমান্য করবে? যদি না করে, তাহলে আমরা তাঁদের কাছ থেকে কী ধরণের পরামর্শ সেবা পেতে পারি সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

ঢাকা থেকে প্রায় ১৬০ কিলোমিটার দূরে পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুরে পদ্মা নদীর পাড়ে দেশের প্রথম এই পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। গত বছর অক্টোবরে প্রকল্পটির মূল নির্মাণপর্ব (ফাস্ট কংক্রিট পোরিং) শুরু হয়েছে। প্রতিটি ১২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিট বিশিষ্ট এই কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে উৎপাদন শুরু হওয়ার কথা ২০২৩ সালে। এর পরের বছর দ্বিতীয় ইউনিটে। রাশিয়ার উদ্ভাবিত সর্বাধুনিক (থ্রি প্লাস জেনারেশন) ভিভিইআর-১২০০ প্রযুক্তির চুল্লি এই কেন্দ্রে বসানো হচ্ছে।

 

 

পাকিস্তান : নেপথ্য শক্তির ঝুলন্ত পার্লামেন্ট

মোহাম্মদ হাসান শরীফ, পাকিস্তান থেকে ফিরে

পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো দ্বিতীয়বারেও নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন ঘটতে যাচ্ছে। ২৫ জুলাই হবে পার্লামেন্ট নির্বাচন। নির্বাচনের ঠিক এক মাস বাকি থাকতে বাংলাদেশ সাংবাদিক প্রতিনিধিদলের সদস্যদের সাথে করাচি পৌঁছে অবাক। পোস্টার, ব্যানার, ফেস্টুন, দেয়াল লিখন- কিছুই নেই। বাংলাদেশে নির্বাচনের সম্ভাবনা আঁচ পেলেই সম্ভাব্য প্রার্থীদের প্রচার-প্রপাগান্ডায় অতীষ্ট হওয়ার যোগাড় দেখে অভ্যস্ত। তার ওপর এখন বিশ্বকাপ মওসুম। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা পতাকায় মোড়া পুরো দেশ। কিন্তু করাচিতে কিছুই নেই। ওই দিন সন্ধ্যায় একটি উর্দু দৈনিকে যাওয়ার পথে গলির মুখে একটি পোস্টার দেখে স্থানীয় এক লোককে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম, এটি নওয়াজ শরিফের এক প্রার্থীর। পরের দিনও করাচি ছিলাম, ঘোরাফেরা একেবারে কম হয়নি। কিন্তু আর কিছুই চোখে পড়েনি। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনাও না। পরে ৩ ও ৪ জুলাই ঢাকা ফেরার পথে করাচিতে যাত্রাবিরতি করেছি। এবার কয়েকটি পোস্টার দেখা গেল। কিন্তু আহামরি কিছু নয়। করাচি হলো পিপিপি ঘাঁটি। কিন্তু রাজপথ অন্তত কাঁপানোর জন্য কিছু করতে দেখা যায়নি।

তবে টেলিভিশন ছিল সরব। নির্বাচনের খবরই প্রায় পুরো সময় প্রচারিত হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা উপস্থিত আছেন পর্দায়, রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্যও প্রচার করা হচ্ছে। সাধারণ মানুষকে জিজ্ঞাসা করলে তারাও জবাব দিচ্ছেন সাবলীলভাবে।

তবে সরকার গঠন করবে কোন দল তা নিয়ে নানা সমীকরণ চলছে। বছর খানেক আগে মনে হচ্ছিল, নওয়াজ শরিফ অবলীলায় জিতে যাবেন। কিন্তু পর্দার অন্তরাল থেকে ঘুঁটি চালে তিনি পর্যুদস্ত। গত সপ্তাহে আরেক মামলায় তাকে ১০ বছরের কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনী যুদ্ধের বদলে তাকে জেলের ঘানি টানতে হবে।

নওয়াজ শরিফ যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলেন, অন্তত নির্বাচন পর্যন্ত যাতে দুর্নীতির মামলার রায় আটকে রাখা যায়; কিন্তু হয়নি। পাকিস্তানের ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টিবিলিটি ব্যুরো লন্ডনের বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ক্রয় মামলায় তাকে সাজাই দিয়েছে। তার মেয়ে মরিয়মকে দেওয়া হয়েছে সাত বছরের কারাদন্ড । নওয়াজ শরিফকে আগেই প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে পদচ্যুত করেছিল দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। তখনই তাকে সব ধরনের সরকারি বা রাজনৈতিক পদে থাকা নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এবার তার কারাদন্ড  হলো।

এই সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেশ বিপাকেই পড়ে গেছেন। ব্যক্তিগত জীবনেও বেশ বড় ধরনের ঝড় বয়ে যাচ্ছে তার ওপর দিয়ে। তার স্ত্রী কুলসুম ক্যান্সারে আক্রান্ত। তিনি লন্ডনে চিকিৎসা নিচ্ছেন। দেশে ফিরে তাকে কারাগারেই যেতে হয়েছে; মেয়ে মরিয়মকেও যেতে হয়েছে কারাগারে।

পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে ‘জিহাদ’ শুরু করেছে, তার প্রথম বড় ধরনের শিকার হলেন নওয়াজ শরিফ। পানামা গেট নামের যে মামলায় তাকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়েছিল, তাতে তিনি বরখাস্ত হবেন, তা কেউ ভাবতে পারেনি। বরং দ্বিতীয় মেয়াদে যখন জয়ী হওয়ার প্রবল সম্ভাবনার মুখে তাকে পদচ্যুত করা হয়েছিল।

পাকিস্তানের রাজনীতির জন্য এটি বড় ধরনের একটি ঘটনা। জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে দলীয় প্রধানকে এমন জটিলতায় ফেলা মানে ওই দলের সম্ভাবনা বেশ কমে যাওয়া। নওয়াজ শরিফের মুসলিম লিগের (এন) বেলাতেও তা-ই হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তিনি পদচ্যুত হয়েছেন, কারাদন্ডের শাস্তি পেয়েছেন বলেই নয়, আরেকটি কারণেও দলটির অবস্থা নাজুক। যেই মাত্র তিনি বরখাস্ত হয়েছেন, সাথে সাথে তার দলের অনেক সদস্য অন্য দলে যোগ দিয়েছেন। বড় অংশ যোগ দিয়েছেন ইমরান খানের তেহরিক-ই-ইনসাফে (পিটিআই)।

এই মুহূর্তে ইমরান খানই এগিয়ে আছেন। যে দুর্নীতির মামলায় নওয়াজ সাজা পেয়েছেন, সেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে বক্তব্যই তার সেরা অস্ত্র। অনেকেই মনে করছে, এবার তার কাছে এসেছে সুবর্ণ সুযোগ। ১৯৯২ সালে যেমন সব প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে বিশ্বকাপ জিতেছিলেন, এবারো তিনি চমক দেখাবেন। তিনিই হতে যাচ্ছেন পাকিস্তানের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী।

কিন্তু পাকিস্তানের মতো দেশে কি জনপ্রিয়তা কিংবা দুর্নীতিবিরোধী শ্লোগান দিয়েই ক্ষমতায় আসা যায়? সম্প্রতি পাকিস্তান সফরকালে কিছু অন্য ভাষ্যও পাওয়া গেছে। ঝুলন্ত পার্লামেন্ট হওয়ার সম্ভাবনার কথাই বিশ্লেষকদের মন্তব্যে ওঠে এসেছে।

পাকিস্তানের সুপরিচিত নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ইকরাম সেহগাল জোর দিয়েই বললেন, নওয়াজ শরিফ বা ইমরান খান- কারো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না। সে ক্ষেত্রে জোট সরকার গঠনের সম্ভাবনাই বেশি। আর ওই সরকার গঠন করতে পারেন নওয়াজ শরিফ সরকারের আমলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা চৌধুরী নিসার কিংবা সদ্য বিদায়ী বেলুচিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী মির আবদুল কুদ্দুস বিজেনজো।

একই ধারণা পোষণ করেন করাচিভিত্তিক উর্দু দৈনিক র্ফাজের এডিটর ইন চিফ মুখতার আকিলও। স্বতন্ত্র সদস্য হয়েও যেভাবে মির আবদুল কুদ্দুস বেজেনজো বেলুচিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন, তা বেশ গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করেন। তিনি সম্ভবত ওই ঘটনাকে পুরো পাকিস্তানের জন্য টেস্ট কেস হিসেবে দেখছেন।

উল্লেখ্য, নওয়াজের পতনের সাথে সাথেই চৌধুরী নিসার দল ত্যাগ করেছেন। তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাথে তার ঘনিষ্ঠতা রয়েছে বলে দেশটির রাজনীতি-সংশ্লিষ্টদের প্রবল ধারণা। একই কথা প্রযোজ্য বেজেনজোর ব্যাপারেও।

তৃতীয় পক্ষ যে ক্ষমতায় আসছে, তা করাচি, ইসলামাবাদ ও লাহোরে বেশ কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তাও এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন। তবে তারা তা করেছেন পরিচয় না করার শর্তে। তাদের অভিমত, ইমরান খান প্রচার-প্রপাগান্ডায় যতই এগিয়ে থাকুন না কেন, তার পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া সম্ভব হবে না। নওয়াজ শরিফের পক্ষেও সম্ভব হবে না পুরো পাকিস্তান থেকে সমর্থন জোগার করা। ফলে নির্বাচনের পর নিসার বা বেজেনজোদের কেউ দল গঠন করে সরকার চালাতে পারেন। আর তাদের সহায়তায় আসতে পারে পর্দার অন্তরালে থাকা কোনো গ্রুপ।

তবে নওয়াজের দল কিংবা ইমরান খানের সংখ্যাগরিষ্ঠতার ব্যাপারে আশাবাদী লোকের সংখ্যাও কম নয়। লাহোর যাওয়ার পথে ইসলামাবাদ বাস স্টেশনে কথা হলো দুবাই প্রবাসী তানভির তাহিরের সাথে। তিনি জোরালোভাবে বলছেন, ইমরান খানই হতে যাচ্ছেন পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী। তিনি অবশ্য স্বীকার করলেন, পাঞ্জাব হলো শরিফদের ঘাঁটি। এখানে তাদের হারানো কঠিন। তবে এখান থেকে ইমরান যদি ৫০ ভাগ আসনও পান, তবে তাকে কেউ ঠেকাতে পারবে না। অন্য কোনো প্রদেশে শরিফরা ভোট পাবেন না। শরিফদের দুর্নীতির কথা তিনিও জোরেসোরে জানালেন। তার মতে, এই অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে পারেন কেবল ইমরান খান। তিনি জানান, তাদের মতো লোকজন বিদেশে গিয়ে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে দেশে অর্থ পাঠান, সেই অর্থ নওয়াজদের মতো লোকজন বিদেশে পাচার করে দেন।

কিন্তু সেই পাঞ্জাবই অন্য সবার দুশ্চিন্তার বিষয় আর শরিফদের জন্য স্বস্তির কারণ। পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের আসনসংখ্যা ৩৪২। সরকার গঠন করতে প্রয়োজন হয় ১৭২টি। এক পাঞ্জাবেই আছে ১৭৪টি আসন। বাকিগুলোর মধ্যে সিন্ধুতে ৭৫, খাইবার পাকতুন খাওয়ায় ৪৮টি, বেলুচিস্তানে ২০টি, ফাটায় ১২টি, কেন্দ্রীয় রাজধানীতে ৩টি।

শরিফের দল যদি পাঞ্জাবে তার অবস্থান ধরে রাখতে পারে তবে অন্যান্য প্রদেশ থেকে সামান্য কিছু সমর্থন নিয়ে তারা শক্ত অবস্থান সৃষ্টি করতে পারবে। যে শক্তিটি তাদের নিশ্চিহ্ন করে দিতে চাইছে, তারা তাদের সাথে সমঝোতা করতে বাধ্য হবে।

লাহোরের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ফয়সালও এই বক্তব্য সমর্থন করলেন। তার মতে, সহানুভূতির ভোট শরিফদের পক্ষেই যাবে। নওয়াজ শরিফের স্ত্রী গুরুতর অসুস্থ, তিনি একটি প্রভাবশালী মহলের শিকার হয়ে অপদস্থ হচ্ছেন। এটিই পরিণামে তাকে ফিরিয়ে আনব। আর পক্ষত্যাগ পাকিস্তানের জন্য নতুন কোনো ঘটনা নয়। সবসময়ই হয়। তবে পক্ষত্যাগীরা ব্যতিক্রম ছাড়া ভালো করতে পারেন না। আবার যে দলে তারা যোগ দেন, তাতেও নতুন সমস্যার সৃষ্টি হয়।

ইসলামাবাদে সামা টিভির ব্যুরো চিফ খালিদ আজিম চৌধুরীও মনে করেন, নওয়াজ শরিফের দল আবার ক্ষমতায় ফিরে আসবে। অন্যরা যতই লাফালাফি করুক, শেষ পর্যন্ত পারবে না। অবশ্য চূড়ান্ত রায়ের জন্য ২৫ জুলাই পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। এর মধ্যে অনেক হিসাবই পাল্টে যেতে পারে।

হতাশার কাছে হার মানা খুব সহজ কাজ: নোয়াম চমস্কি

আধুনিক সময়ের সেরা বুদ্ধিজীবীদের অন্যতম নোয়াম চমস্কি ছয় দশক ধরে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত হয়ে আছেন। চমস্কির সাহসিকতা, দৃঢ়প্রত্যয় ও অনন্য বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রমের ফলেই বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক জালিয়াতি, সাম্রাজ্যবাদী উদ্দেশ্যের গোমর ফাঁস হয়েছে। ভারতের ফ্রন্টলাইনে প্রকাশিত নোয়াম চমস্কির সাক্ষাতকারের দ্বিতীয় অংশ এখানে প্রকাশিত হলো।

প্রশ্ন : আপনি আর অ্যাডওয়ার্ড এস. হারম্যান ১৯৮৮ সালে ‘ম্যানুফ্যাকচারিং কনসেন্ট’ নামে একটি বই প্রকাশ করেন। এতে আপনারা জোরালোভাবে প্রমাণ করেছেন যে, কিভাবে গণমাধ্যম ক্ষমতাসীন শ্রেণির জন্য সম্মতি নির্মাণ করে। অবশ্য আপনার প্রকাশনার পর মিডিয়া জগতে অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। ইন্টারনেটের ব্যাপক প্রসারের ফলে খবর ও তথ্যে ঐতিহ্যবাহী একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ অনেকাংশেই কমে গেছে। অনেকে বিশ্বাস করেন, সামাজিক মাধ্যম ও অনলাইন মিডিয়া প্লাটফর্মগুলো ‘স্বাধীনতার’ সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। মিডিয়ার দৃশ্যপটে পরিবর্তনকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করেন?

নোয়াম চমস্কি : বইটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৮৮ সালে। এতে দেখানো হয়, কিভাবে গণমাধ্যম ক্ষমতাসীন শ্রেণির জন্য সম্মতি নির্মাণ করে। আমরা ২০০২ সালে বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ করি। ততদিনে ইন্টারনেট ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। কিন্তু আমরা পরিবর্তনের প্রয়োজন মনে করিনি। আমরা সম্প্রতি বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজ নিয়েছি, তবে তেমন কোনো পরিবর্তনের গরজ অনুভব করিনি। অবশ্যই অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। কিন্তু মিডিয়ার কর্মসম্পাদন দক্ষতায় প্রভাব সৃষ্টিকারী প্রাতিষ্ঠানিক উপাদানগুলোতে মনে হচ্ছে- বাস্তবে কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। মূলধারার মিডিয়া তাদের সব সুবিধা ও ত্রুটি সত্ত্বেও এখনো খবর ও তথ্যের প্রধান উৎস হিসেবে বহাল রয়েছে।

যারা উদ্যোগ নেয়, কেবল তাদের জন্যই ইন্টারনেট বিপুল মাত্রার উৎসে প্রবেশের সুযোগ সৃষ্টি করে। গবেষণার জন্য এটি বেশ সহায়ক। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বিস্তৃত তথ্য ও অভিমত জানার সুযোগের ফলে ব্যাপক জ্ঞানার্জন ও উপলব্ধি সৃষ্টি করতে পারে- এমন ইঙ্গিত সামান্যই পাওয়া গেছে। স্বাধীনতার সম্ভাবনা অবশ্যই আছে। তবে তা থেকে সুবিধা গ্রহণও প্রয়োজনীয় বিষয়। তাছাড়া প্রায়ই নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে ব্যাপক বিস্তৃত সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার বদলে যা শুনতে আগ্রহী তাতেই সীমাবদ্ধ থাকার কৃত্রিম স্বস্তিদায়ক এলাকায় আশ্রয় গ্রহণ করাও সহজ মনে হয়।

প্রশ্ন : বেশ কয়েকটি ল্যাতিন আমেরিকান দেশে বাম শক্তিগুলো নির্বাচনী পরাজয় ও নানা ধরনের বিপর্যয়ে পড়েছে। ল্যাতিন আমেরিকায় বাম আন্দোলন দুর্বল হয়ে পড়ার কারণেই এমনটা ঘটেছে? ল্যাতিন আমেরিকায় বামদের সামনে কী কী চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা রয়েছে?

নোয়াম চমস্কি : দুর্বল হয়ে পড়েছে। তবে অনেক স্থায়ী অর্জনও আছে এবং আগের চেয়ে তা অনেক ভালোও। ইতিহাস অগ্রগতি ও প্রত্যাগতি লিপিবদ্ধ রাখে। তবে সাধারণ অগ্রগতি রয়েছে এবং আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, মার্টিন লুথার কিংয়ের বিখ্যাত পরিভাষাটি ধার করে বলতে পারি যে. ন্যায়বিচারের পথে চলতে ইতিহাসের বাঁক নির্মাণ করতে পারি আমরা। হতাশার কাছে হার মানা ও সবচেয়ে খারাপটি ঘটানোকে নিশ্চিত করতে সহায়তা করা খুব সহজ কাজ। বিচক্ষণতা ও সাহসের পথ হলো প্রাপ্য বিপুল সুযোগ সুবিধা ব্যবহার করে তাদের সাথে যোগ দেওয়া যারা আরো উন্নত দুনিয়া নির্মাণের জন্য কাজ করছে।

প্রশ্ন : পূর্বসূরিদের বিপরীতে গিয়ে পোপ ফ্রান্সিস বিশ্বে প্রভাব ফেলছে এমন নানা আর্থ-সামাজিক ইস্যু নিয়ে অত্যন্ত প্রগতিমূলক অবস্থান গ্রহণ করে অত্যন্ত জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। আমরা জানি যে. আপনি প্রকাশ্যে ঘোষিত নাস্তিক। পোপতন্ত্রের সাথে আপনার আদর্শগত পার্থক্য যাই হোক না কেন, পোপ ফ্রান্সিস সম্পর্কে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি কী? আপনি কি আশা করেন, তার ব্যক্তিগত অবস্থান ক্যাথলিক চার্চের গোঁড়ামিতে পরিবর্তন আনবে?

নোয়াম চমস্কি  : অতীত নিয়ে আমি তেমন একমত নই। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, পোপ ত্রয়োদশ জনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রশংসনীয় রেকর্ড ছিল। পোপ ফ্রান্সিসও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে প্রশংসনীয় অবস্থান গ্রহণ করেছেন। ফলে আমি মনে করি, চার্চের ওপর তা ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আমি আশাবাদী।

(অসমাপ্ত)

বাংলাদেশে আসছেন জিকো

বুধবার প্রতিবেদন ::

জিকো। পুরো নাম আর্থার আনতুনেস কোইম্ব্রা। তবে সাদা পেলে নামেই তিনি ফুটবল ফ্যানদের কাছে পরিচিত। ব্রাজিল ও বিশ্বের সর্বকালের সেরা ফুটবলারদের একজন তিনি। সেই তিনিই বাংলাদেশে আসছেন। আর তার বাংলাদেশ সফরের আয়োজন করছে ঢাকাস্থ ব্রাজিল দূতাবাস।  আগামী মাসে  তিনি আসতে পারেন বলে জানা গেছে।

বর্তমানে ৬৫ বছর বয়স্ক এই ফুটবলারের বাংলাদেশে আগমন হবে আমাদের ফুটবলের জন্য বিরাট এক ঘটনা। অ্যাটাকিং এই মিডফিল্ডার তার দুর্দান্ত টেকনিক্যাল দক্ষতা, ভিশন আর গোলের নেশার জন্য এখনো ফুটবল ফ্যানদের মধ্যে স্বপ্ন-পুরুষ হিসেবে পরিচিত হয়ে আছেন। ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকের ও ১৯৮০-এর দশকের প্রথম দিকে তিনি সত্যিকার অর্থেই ছিলেন ওই সময়ের সেরা খেলোয়াড়। বিশেষ করে ফ্রি কিকে তার দক্ষতা কিংবদন্তিসম খ্যাতি রয়েছে। বলকে তিনি সব দিকেই বাঁক খাওয়াতে পারতেন। তবে দুর্ভাগ্য তিনি বিশ্বকাপ জয় করতে পারেননি। প্রায় সবার ধারণা ছিল ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপ ব্রাজিলই জিতবে। জিকো ছাড়াও যে দলে ফ্যালকাও, সক্রেটিস, এদার, সেরেজো ও জুনিয়র রয়েছে, ওই দল কি বিশ্বকাপ জয় না করে পারে? কিন্তু পারেনি। দ্বিতীয় রাউন্ডেই তারা বিদায় নিয়েছিলেন পাওলো রসির ইতালির কাছে ২-৩ গোলে হেরে। বিশ্বকাপ জয় করতে না পারা সেরা খেলোয়াড়দের তালিকায় প্রায়ই জিকোর নাম দেখা যায়।

জিকো কেবল খেলোয়াড় হিসেবেই নয়, কোচ হিসেবেও নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছেন। সেই জিকো আসছেন বাংলাদেশে।

এবারের বিশ্বকাপ নানা কারণে বাংলাদেশের মানুষের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এখানকার লোকজন বরাবরই প্রধানত আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের সমর্থক। বিশ্বকাপের মওসুমে বিভিন্ন দেশের, প্রধানত আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের, পতাকা বাংলাদেশ ছাডা আর এভাবে কোথায় ওড়ে না । যেসব দেশে বিশ্বকাপ হয়, ওইসব দেশেও নয়।

এবারের বিশ্বকাপে দ্বিতীয় রাউন্ড থেকে আর্জেন্টিনা ও কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে ব্রাজিল বাদ পড়ায় ফ্যানরা হতাশ হয়ে পড়েন। তবে বিশ্বকাপের আগে বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূত জোয়াও তাবাজেরা অলিভেইরা ডি জুনিয়র মানিকগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্রাজিল নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের উচ্ছাস ও মাতামাতি বেশ উপভোগ করেছেন। ব্রাজিলের প্রতি এখানকার মানুষের সমর্থন তার কল্পনাকেও হার মানিয়েছে। এটিই তাকে ব্রাজিলের ফুটবলকে বাংলাদেশের আরো কাছে আনতে উদ্বুদ্ধ করেছে। এবারের বিশ^কাপে সম্ভবত এটিই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।