Home » Uncategorized

Uncategorized

তাজউদ্দীন আহমদের রাজনৈতিক জীবন-(পর্ব ৯)

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ::

তাঁর ইংরেজী ভাষার চর্চা নিজের ভেতরকার বুর্জোয়া বিকাশেরই অংশ। কিন্তু বুঝতে কোনো অসুবিধা নেই যে, তিনি মোটেই উৎপাটিত নন, সৃষ্টিশীল ও গভীর ভাবে প্রোথিত। দেখতে পাচ্ছি গ্রামে গিয়ে তিনি মুর্শিদী ও জারি গান শুনছেন। বিলে নেমে অন্যদের সঙ্গে মাছ ধরছেন। কর্মরত মানুষজনের সাথে আত্মীয়ের মতো আলাপ করছেন।

যেমনটা প্রত্যাশিত ছিল, ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে তাজউদ্দীন যুক্তফ্রন্টের পক্ষ থেকে প্রার্থী হয়েছেন। পরিস্থিতিটা অবশ্যই উত্তেজানপূর্ণ ছিল। কিন্তু তাজউদ্দীনের ভেতর তার কোনো ছাপ নেই। ডায়েরী পড়ে জানা যাচ্ছে যে, তাঁর নির্বাচনী সভায় মুসলিম লীগের লোকরা আক্রমণ করছে, সভা পন্ড হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তিনি অস্থিরতা প্রদর্শন করছেন না। বিচলিত না হয়ে সাইকেলে করে জনসংযোগ করে চলেছেন। মার্চ মাসের ১০ তারিখে ভোট গ্রহণ হয়েছে, ১৩ তারিখের ডায়েরীর পাতায় বি:দ্র: দিয়ে নোট রাখছেন যে, ওই দিনই তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ল’ ক্লাস শুরু করলেন। তারপর প্রতিদিন সন্ধ্যায় ক্লাশ করছেন। ১৮ তারিখ একটি বিশেষ দিন; সেদিন ভোট গণনা হয়েছে। তাজউদ্দীন জিতেছেন, তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীকে ঠিক তিনগুণ নয়, তার চেয়েও বেশী ভোটে পরাজিত করে দিয়েছেন। ঢাকায় তাঁকে নিয়ে মিছিল বের হয়েছে। কিন্তু বিজয়ের কারণে তিনি যে আবেগে আপ্লুত এমন কোনো লক্ষণ নেই তাঁর ডায়েরীতে। কয়েকদিন পর তাঁকে দেখতে পাই তিনি এই জন্য খুশি হয়েছেন যে তাঁর এলাকায় বৃষ্টিপাত হয়েছে। লিখেছেন ‘‘এই মৌসুমের জন্য এটি শুভ লক্ষণ। এই বৃষ্টি বোরো ধান ও আউষ চাষের জন্য খুব ভালো হবে। জমি বেশ ভিজেছে। কড়া রোদ আর অনাবৃষ্টিতে সারা দেশ কুঁকড়ে উঠেছিল। জলবসন্ত ছড়িয়ে পড়ছিল।’’ ২৯ এপ্রিলের দিনলিপিতে দেখছি চালের দাম নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন; পঞ্চাশ সালে যে মন্বন্তর হয়েছিল তার কথা তাঁর স্মৃতিতে। বলছেন, ‘‘কিছুদিন ধরে শহরে ন্যায্যমূল্যের দোকান চালু হওয়ায় তা শহরের মানুষের জন্য স্বস্তির কারণ হয়েছে। কিন্তু গ্রামের মানুষ আগের মতোই ভুক্তভোগী।’’

নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন, এখন কি কি সুযোগ সুবিধা নেয়া যায় তা নিয়ে কোনো সুচিন্তা ডায়েরীর কোথাও নেই। যে কারণে তিনি রাজনীতিতে এসেছেন ঠিক সে কারণেই তাঁর রাজনীতি ভিন্ন চরিত্র গ্রহণ করেছে। শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাজউদ্দীন আহমদের মাঝে যে সম্পর্কটি স্থাপিত সেটি তাঁদের উভয়ের জন্য তো বটেই, আমাদের সমষ্টিগত ইতিহাসের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটা অনিবার্য ছিল যে তাঁরা এক সাথে কাজ করবেন, এবং কাজের সময়ে ও ভেতর দিয়ে একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠবেন। দু’জনের মধ্যে বয়সের দূরত্ব ছিল পাঁচ বছরের, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবধান ছিল উল্লেখযোগ্য। স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশের প্রথম পররাষ্ট্র সচিব এস. এ করিম তাঁর লেখা শেখ মুজিব, ট্রায়াম্প এ্যান্ড ট্রাজেডি  বইতে এই ব্যবধানের কথা বলতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে মুজিব ছিলেন অতুলনীয় বক্তা, এবং সাধারণ মানুষের মনের ভাব ও ইচ্ছাকে সরল ভাষায় তুলে ধরে তাদের আস্থা ও ভালোবাসা জয় করে নেবার ব্যাপারে তাঁর ক্ষমতা ছিল অসাধারণ। তিনি তাঁর দলকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। অন্যদিকে তাজউদ্দীনের ছিল তীক্ষ্ণ বুদ্ধি এবং সুশৃঙ্খল মন; তিনি যে খুব ভালো বক্তা ছিলেন তা নয়, কিন্তু আলাপ-আলোচনার বেলায় ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ। তাঁর কর্তব্যবোধ ছিল দৃঢ় দুর্দান্ত।

দু’জনের দৃষ্টিভঙ্গিতেও পার্থক্য ছিল। ডা. করিম ছিলেন উভয়েরই বন্ধু; ১৯৬২ সালে তাঁরা এক সঙ্গে জেলে ছিলেন; তখন তিনি দেখেছেন যে পূর্ববঙ্গকে যে স্বাধীন করতে হবে-এ বিষয়ে শেখ মুজিব ও তাজউদ্দীনের ভেতর ঐকমত্য ছিল, কিন্তু কোন পথে এগুতে হবে তা নিয়ে বিস্তর তর্কবিতর্ক হতো। ছোটখাটো ব্যাপার নিয়ে মনকষাকষির ঘটনা যে ঘটতো না তাও নয়। একদিনের কথা তাঁর বিশেষভাবে মনে আছে। সেদিন তাঁরা সবাই মিলে ভলিবল খেলছিলেন। একদিকের দলপতি শেখ মুজিব, অন্যদিকের দলপতি তাজউদ্দীন। হঠাৎ একটি পয়েন্ট নিয়ে দু’দলের ভেতর বচসা বেধে যায়; রেফারি ছিলেন মানিক মিয়া, তিনি রায় দিলেন পয়েন্ট কেউ পাবে না। খেলা নতুন করে শুরু হলো। মুজিবের দল জিতল, করিম লিখছেন, ‘‘মুজিব বললেন, ‘দেখলে ধর্মের কল বাতাসে নড়ে’। তাজউদ্দীন টিপ্পনী কেটে বললো, ‘হ্যাঁ যে-দিকে বাতাস সে-দিকে নড়ে’।’’ তাজউদ্দীন ওই মন্তব্যে দু’জনের ভেতর ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয় এবং কয়েকদিন কথাবার্তা বন্ধ থাকে। করিমের ধারণা শেখ মুজিব মনে করেছিলেন যে, তাজউদ্দীন ধর্মকে তাচ্ছিল্য করেছেন। কিন্তু তিনি নিশ্চিত যে তাজউদ্দীন তা করেননি।

১৯৬২-তে আন্দোলন ছিল না; নেতারা সবাই বন্দী ছিলেন; স্রোতহীনতার ওই সময়ে ভুল বোঝাবুঝিটা অস্বাভাবিক ছিল না; কিন্তু ১৯৬৪-তে যখন রাজনৈতিক তৎপরতার একটি প্রবাহ তৈরি হলো তখন দেখি শেখ মুজিব ও তাজউদ্দীন এক হয়ে গেছেন; মুজিব আছেন সামনে, নেতা তিনিই; কিন্তু সবাই বুঝতে পারছেন যে, তাজউদ্দীন আছেন সঙ্গেই, পরিপূরক হিসেবে। ছয় দফার ঘোষনা দেয়ার পর জুলফিকার আলী ভুট্টো মুজিবকে বিতর্কে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। মুজিব সে-চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন। ভুট্টো তাঁর উপদেষ্টাদের নিয়ে ঢাকায় এলে তাজউদ্দীন তাঁর সঙ্গে দেখা করেন, বিতর্কের আনুষ্ঠানিকতা ঠিক করার জন্য। তাঁর সাথে কথা বলে ভুট্টো বুঝেছেন বিতর্কের জন্য এপক্ষ থেকে যে প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে তাতে তিনি সুবিধা করতে পারবেন না। তর্কযুদ্ধে না নেমে ভুট্টো সদলবলে প্রস্থান করেন।

সাতই মার্চের সেই ঐতিহাসিক বক্তৃতাটি শেখ মুজিবেরই; কিন্তু তার পেছনেও তাজউদ্দীন ছিলেন; কোন কোন পয়েন্টে বলতে হবে তা তিনিই সাজিয়ে দিয়েছেন; এবং মঞ্চে বসে সতর্কতার সঙ্গে লক্ষ্য করেছেন কোনোটি যেন অঘোষিত না থাকে। এরপরে শুরু হয় অসহযোগ, তখন বাংলাদেশের সরকার চলতো আওয়ামী লীগের নির্দেশে। পঁয়ত্রিশটি নির্দেশ জারি করা হয়েছিল, সেগুলো তাজউদ্দীনের হাতেই রচিত। দেশের কাছে মুজিব তখন অদ্বিতীয়, আর তাজউদ্দীন অদ্বিতীয় মুজিবের কাছে।

চরম মুহূর্তটি এসেছিল পঁচিশে মার্চের রাত্রে। পাকিস্তানী হানাদারেরা কী করবে টের পাওয়া যাচ্ছিল, কিন্তু আন্দোলনের নেতারা কী করবেন সেটা ছিল অনিশ্চিত। এখন জানা যাচ্ছে যে, পরিকল্পনা ছিল আত্মগোপন করে স্বাধীনতার ঘোষনা দেয়া হবে এবং অনিবার্য যুদ্ধে মুজিব ও তাজউদ্দীন এক সঙ্গে থাকবেন। তদনুযায়ী তাজউদ্দীন গেলেন মুজিবের কাছে; গিয়ে শোনেন তিনি ঠিক করেছেন বাড়িতেই থাকবেন, তাজউদ্দীনদের সঙ্গে যাবেন না। দেশের ইতিহাস তখন তাকিয়ে ছিল সিদ্ধান্তের দিকে, সিদ্ধান্ত এলো না। তাজউদ্দীন একটি লিখিত বিবৃতি নিয়ে গিয়েছিলেন শেখ মুজিবের স্বাক্ষরের জন্য, একটি টেপ রেকর্ডারও তাঁর সঙ্গে ছিল, নেতার কণ্ঠস্বরে দিকনির্দেশ রেকর্ড করবেন এই আশায়। স্বাক্ষর পেলেন না, কণ্ঠস্বরও পেলেন না। হানাদার বাহিনী যে হত্যাকান্ড শুরু করবে তার সব লক্ষণ তখন স্পষ্ট, খবরও আসছে নানা সূত্রে। মোকাবিলা করতে হলে নেতাকে চাই, শেখ মুজিব তখন জাতির অবিসংবাদিত নেতা, তাঁকে বাদ দিয়ে যুদ্ধ চলবে কি করে? তাছাড়া তাঁর অনুপস্থিতিতে কার পরে কে থাকবেন সেই ক্রমটি যেহেতু তিনি জানিয়ে দেননি, তাই নেতৃত্বের কেবল যে অভাব ঘটবে তা নয়, যাঁরা থাকবেন তাঁদের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেবে, কেউ কাউকে মানতে চাইবেন না, ফলে সংকটের সৃষ্টি হবে। এসব যুক্তি তাজউদ্দীন দিয়েছেন। কিন্তু নেতা অনড় ছিলেন তাঁর সিদ্ধান্তে। (চলবে)

চৈত্র সংক্রান্তি ও নারীর জ্ঞানের চর্চা

ফরিদা আখতার ::

বাংলা সনের বছর শেষ হয় চৈত্র মাসের ৩০ তারিখে। এই দিনটাই চৈত্র স্ংক্রান্তি হিসেবে গ্রামের মানুষ পালন করে খুব নিষ্ঠার সাথে। কোন ঘটা করে নয়, কিন্তু তারা নিয়মটা ঠিকই মেনে চলেন। নিয়মটাও তেমন শক্ত কিছু নয়। সোজা কথা হচ্ছে এই দিনে তারা কমপক্ষে চৌদ্দ রকম শাক বাড়ীর আলানে-পালানে, ক্ষেতের জমি থেকে তুলে এনে রান্না করেন। কিছু শাক মিশ্র আকারে রান্না হয় আর কিছু শাক আলাদাভাবে রান্না, কিংবা ভর্তা বা ভাজি করে খেতে হয়। সাধারণভাবে এই শাকগুলো হচ্ছে হেলেঞ্চা, ঢেকি, সেঞ্চি, নটে শাক (কোথাও ন্যাটাপ্যাটাও বলে) থান কুনি, বথুয়া, তেলাকুচা, গিমা, দন্ডকলস, নুনিয়া,কচু শাক,গুরগুরিয়া শাক,মরুক,ঢেঁকি শাক, নুনিয়া শাক, হাগড়া,আম খুইড়ে শাক,খুড়ে কাটা,থানকুনি পাতা,নুন খুরিয়া,কানাই,পাট, রসুন,পিপল, খাড়কোন সহ আরো অনেক শাক রয়েছে। নারী জানে কোন শাক পুষ্টির দিক থেকে ভাল, কোনটা কি ওষুধি গুন আছে; কোনটা শুধু পাতা তুলতে হবে, কোনটার আগাটা কাটতে হবে।

এদিন কোন রকম মাছ বা মাংস রান্না হয় না, শুধু ডাল জাতীয় বাড়তি কিছু থাকতে পারে। এই চৌদ্দ রকম শাকের মধ্যে অন্তত একটি দুটি তিতা স্বাদের, নোনতা, পানসা এবং টক স্বাদের থাকতে হবে। টক স্বাদের শাক পাওয়া না গেলে কাঁচা আম তো আছেই, ডাল দিয়ে কাঁচা আম রান্না হয়। পানসা স্বাদের কিছু না থাকলে সজনা বা নাজনা সরিষা দিয়ে খেতে খুব স্বাদ।

এটা মনে করার কোন কারণ নেই যে চৈত্র সংক্রান্তি শুধুই শাক রান্নার মধ্যে সীমাবদ্ধ। নারীদের জ্ঞানের দৌড় বুঝি শুধু রান্না ঘর পর্যন্ত। একদিন রান্না করে খেলেই ফুরিয়ে গেল। এর অর্থ নারীর জীবনে অনেক গভীর অর্থ বহন করে এবং সমাজের জন্যেও তার এই ভুমিকা খুব তাৎপর্যপুর্ণ। গ্রামের নারীরা বাজার থেকে কিনে আনা আবাদী শাক রান্না করবেন না। যেমন পুঁই শাক, লাল শাক, পালং শাকের মতো বাণিজ্যিক ও আবাদী শাক দিয়ে চৈত্র সংক্রান্তি হবে না। তার মানে শুধু শাক রান্নার মধ্য দিয়ে চৈত্র সংক্রান্তি পালন হয় না। চৈত্র মাসের এই খর তাপে যে শাক মাঠে, রাস্তার ধারে, পুকুর পাড়ে, আবাদী জমিতে অনাবাদি হিসেবে বা সাথী ফসল হিসেবে পাওয়া যাবে শুধু সেই শাক তুলে রান্না করাই হচ্ছে চৈত্র সংক্রান্তির আয়োজন। তাই মনে করার কোন কারণ নেই যে একই রকমের শাক বাংলাদেশের সব জেলায়, বা গ্রামে একইভাবে পাওয়া যাবে। নির্দিষ্ট এলাকার ফসলের ধরণ, এলাকার আবহাওয়া, কৃষির অবস্থা অনেক কিছুই এর সাথে জড়িত। তা চৌদ্দ রকম শাক চৌদ্দ জায়গায় ভিন্ন হতেও পারে। একটি বিষয়ে কোন আপোষ নেই , সেতা হচ্ছে  এই শাকগুলো অনাবাদী, এগুলো চাষ করা শাক নয়। এই শাকগুলোকে কুড়িয়ে পাওয়া শাক, বা কুড়ানো শাক বলা হয়। অর্থাৎ প্রকৃতিতে যা পাওয়া যায় তাই তারা নেবেন। প্রকৃতি রক্ষার প্রতি তাদের জবাবদিহিতার এটা একটা ধরণ।

শাকের সাথে গ্রামের নারীদের মধ্যে এক আর্থ-সামাজিক সম্পর্কের বন্ধনও তৈরি হয়। গৃহস্থ পরিবারের নারীদের পক্ষে মাঠে গিয়ে শাক তোলা সম্ভব নয়। তার সামাজিক অবস্থান তাকে এই কাজ থেকে বঞ্চিত করে। কিন্তু তাই বলে তিনি চৌদ্দ রকমের শাক দিয়ে চৈত্র সংক্রন্তি করবেন না এমন হতে পারে না। তাই মধ্যবিত্ত গৃহস্থ বাড়ির নারীরা তাদের বাড়ির কাছ্রে  গরিব পরিবারের নারীদের সাথে আবাদী ও অনাবাদী ফসলের বিনিময় করেন। গরিব নারী যখন অনাবাদী শাক কুড়িয়ে আনেন, তখন গৃহস্থ পরিবার তাকে বেগুন, তিতা করলা, চিচিংগা, বা মিষ্টি কুমড়া দিয়ে দেন। এই বিনিময় কোন টাকার অংকে হয় না, বা কে কতো দিল তার ওজন নিক্তিতে মাপা হয় না। কার কোনটা পছন্দ বা কার কোনটা দরকার সেই মাপজোকটাই প্রধান বিষয় হয়ে ওঠে।

গ্রামের কৃষকদের আবাদী জমি থাকে, এবং তাদের আবাদী ফসল এই জমির পরিমানের ওপরই নির্ভরশীল। কিন্তু আবাদী জমিতে যখন সাথী ফসল হিসেবে বথুয়া, দন্ড কলস, জমির আইলে হেলেঞ্চা, হেঞ্চি, থানকুনি পাওয়া গেলে সেটা যে কোন নারী জমির মালিকের অনুমতি ছাড়াই তুলতে পারেন। এই শাক তো মালিক লাগায় নি, এটা নিজ থেকেই জন্মেছে। তাই এই শাক তোলার অধিকার গ্রামের অন্য সকল মানুষের আছে, বিশেষ করে নারীদের আছে। তবে যে নারী এই শাক তোলেন তারাও এটা মেনে চলেন যে আবাদী ফসলের কোন প্রকার ক্ষতি তারা করেন না। এমনকি অনাবাদী শাক তুলতে গিয়ে কখনো গাছ সহ উপড়ে ফেলেন না। শুধু যে অংশটুকু রান্নার জন্যে দরকার সে অংশটুকু তারা অতি যত্নের সাথে তোলেন। এবং সেটা তারা খুব ভালভাবেই করতে পারেন। তাদের হাতের মাপ, আঙ্গুলের ব্যবহার সব কিছুই তারা চ্ছোট বেলা থেকে মায়ের সাথে শাক তুলতে তুলতেই শিখে ফেলেন। যে সাথী ফসল আবাদী ফসলের জন্যে বাড়তি হয়ে যায়, এবং আধুনিক কৃষির ভাষায় যাকে ‘আগাছা’ বলা হয়, সেগুলো তারা পুরোটাই তুলে ফেলেন। যেমন বথুয়া ও দণ্ডকলস। এগুলোর সুবিধা হচ্ছে এই গাছগুলো শুধু মানুষের জন্যে নয় গরু ছাগলের জন্যেও খুব ভাল খাদ্য। বথুয়া গরুর দুধ বাড়ায়। কাজেই প্রকৃতিতে যা আছে তা শুধু মানুষের জন্যে নয়, সব প্রাণীর জন্যে। নারীর জন্যে তা খুব গুরুত্বপুর্ণ।

দুঃখজনক হচ্ছে আধুনিক কৃষি এসে কীটনাশক ও রাসায়নিক সার ব্যবহার করে এই মূল্যবান শাকগুলোকে আগাছা নাম দিয়ে রাসায়নিক আগাছানাশক ব্যবহার করে ধ্বংস করে দিয়েছে। আগাছানাশক ব্যবহারের কারণে আবাদী ফসল ছাড়া বাকী সব সবুজ চারা, লতাপাতা মরে যায়। আবার আবাদী ফসলে পোকা লাগে বলে কীটনাশক ব্যবহার করলে জমির আইলে বা রাস্তার ধারে যদিও বা কোন শাক পাওয়া যায় নারীরা সেই শাক বিষাক্ত বলে তুলে ঘরে আনবেন না। গরুকেও খাওয়াবেন না। আবাদী ফসলে ফলনের কথা বলে কীটনাশক ব্যবহারের হিশাব পুরুষতান্ত্রিক চিন্তা এবং পুরুষরাই তা করে থাকে। কিন্তু নারীরা দেখেন প্রানের বৈচিত্র, শুধু আবাদী এককাট্টা ফসলের পরিমান বাড়ালেই নারীরা সন্তুষ্ট নন, তারা চান আবাদী ও অনাবাদী ফসল ও শাক সব্জির ব্যবহার। সত্যি কথা বলতে কি গ্রামের গরিব নারীদের সারা বছরের মুল খাদ্যের ৪০% আসে অনাবাদী উৎস থেকে। এমন কি মাছও তারা নদী, ডোবা, বা পুকুর থেকে তারা গোসল করতে গিয়েও সংগ্রহ করে আনেন। সেদিক থেকে দেখতে গেলে আধুনিক কৃষি নারী ও গরিব বিরোধী কৃষি ব্যবস্থা। চৈত্র সংক্রান্তি এলে টের পাওয়া যায় শাক পাওয়া সহজ কিনা। যদি পাওয়া না যায়, এবং অনেক ক্ষেত্রেই সেটা ঘটে, তার অর্থ হচ্ছে প্রকৃতিতে এমন অ-ঘটন ঘটে গেছে যেখানে নারী তার জ্ঞানের ব্যবহার করতে পারছে না।

চৈত্র সংক্রান্তি শাক খাওয়ার যে বৈচিত্র তা হঠাৎ করে বৈশাখে ইলিশ-পান্তার মতো করে কারো মাথায় উদ্ভটভাবে আসার কারণে হুজুগের বিষয় নয়। এর মাধ্যমে ইলিশের যে ক্ষতি তারা করছে তা ক্ষমার অযোগ্য। শাক তোলার ব্যাপার সারা বছরই হয়। যেমন বর্ষা কালের পানিতে ভাসা শাকগুলোর মজাই আলাদা, যেমন কলমি, শাপলা ইত্যাদী। কিন্তু চৈত্র মাসটা এমন এক কঠিন সময় যখন চৈতালী ফসল প্রায় উঠে গেছে, পাট ও আউশ ধান বোনার সময়। এই সময় কখনো বৃষ্টি হয়, তবে খরার ভাবটাই বেশী। নারী জানেন গরম বেশী হলে টক জাতীয় খাবার শরীরের জন্যে উপকারি। গিমা শাক সারা বছর পাওয়া যায় না। গিমা শাক রোগ প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে, কাজেই তারা বাচ্চাদের ছোট বেলা থেকে গল্প বলে বলে তিতা খাওয়াবার অভ্যাস করেন। তবে গিমার তিতা আর তিতা করলার তিতা এক নাও হতে পারে এমন সুক্ষ্ম পার্থক্য একমাত্র নারীরাই বোঝেন।

চৈত্র সংক্রান্তি ভুলে গিয়ে পয়লা বৈশাখ দিয়ে নতুন বছর বরণ করার মধ্যে জ্ঞানের চর্চা নেই। আছে শুধু বাণিজ্য। চৈত্র সংক্রান্তি পালনের মধ্য দিয়ে আসুন নারীর জ্ঞানের সাথে পরিচিত হই। প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষার বড় বড় সেমিনারের চেয়ে বেশী উপকার হবে। তাই বলি যুগ যুগ চলুক নারীর জ্ঞানের চর্চা।

কাতারে ফুটবলের বিশ্বকাপ স্টেডিয়াম নির্মান শ্রমিকদের যতো অভিযোগ

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন::

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ‌‌অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, কাতারে ২০২২ সালের ফুটবলের  বিশ্বকাপের জন্য নির্মানাধীন প্রধান স্টেডিয়ামে কাজ করা অভিবাসী শ্রমিকরা  অভিযোগ করেছে, তাদেরকে জোর করে কাজ করানো হচ্ছে। সংস্থাটি দাবি করেছে, অভিবাসী শ্রমিকরা  নিয়োগকারীদের হাতে পদ্ধতিগত অপব্যবহারের শিকার।  নির্মানাধীন খলিফা স্টেডিয়ামের ১৩০ জন অভিবাসী নির্মান শ্রমিকের  সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শ্রমিকরা  তাদের অধিকার খর্বের অভিযোগ করেছে। যার মধ্যে রয়েছে নোংরা বাসস্থান এবং আর্ন্তজাতিক আইনের লংঘন করে জোর করে অতিরিক্ত কাজ করানো। আর ঐসব শ্রমিকের বেশীর ভাগই বাংলাদেশ, ভারত ও নেপাল থেকে এসেছেন। একজন শ্রমীক বলছিলেন-

“প্রতি মাসে বেতন দুইশো ডলার। যা-নিয়োগকারীর ফি দেবার জন্য করা ঋণ পরিশোধ, পরিবারে জন্য বাড়িতে অর্থ পাঠানো এবং আমার জীবনযাপনের জন্য যথেষ্ট নয়।“

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলছিল- অনেক শ্রমিক  জানিয়েছেন, দেশের নিয়োগকারীকে তাদের চার হাজার তিনশো ডলারের বেশী ফি দিতে হয়েছে। ছয়জনের বেশী শ্রমিক বলেছেন, তাদের যে বেতন পাওয়ার কথা ছিল, তার থেকে কম পান। কিছু কিছু ক্ষেত্রে তা নির্ধারিত বেতনের অর্ধেক এবং কখনো কখনো কোন বেতনই পান না।

আর যদি কোন শ্রমিক  অভিযোগ করেন, তাহলে তাকে দেশ থেকে বিতাড়িত অথবা বেতন বন্ধ করে দেবার হুমকী দেয়া হয়। একজন অভিবাসী শ্রমীক বলছিলেন— “আমি যদি চাকরী হারাই তারা আমাকে দেশ থেকে বের করে দেবে। কিন্তু এখনো আমাকে অনেক ঋণ পরিশোধ করতে হবে।“

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলছে, গত বছরের তুলনায় পরিস্থিতির যদিও  কিছুটা উন্নতি হয়েছে, কিন্তু কাতারের তথাকথিত ‘কাফালা’ কর্মসংস্থান পদ্ধতিই প্রধান সমস্যা। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এর জেমস লিনচ বলেন- “পদ্ধতিটি কর্মীদের উপর নিয়োগকারীদের অধিক নিয়ন্ত্রন দেয়। সুনির্দিষ্ট ভাবে কর্মীর দেশ ত্যাগ অথবা চাকরী পরিবর্তনের অধিকার খর্ব করার ক্ষমতা থাকে নিয়োগকারীর।“

তবে কাতার বলছে, ওই দেশে অভিবাসী শ্রমিকদের কাজের পরিবেশ উন্নত করার ওপর জোর দেয়া হয়েছে । যার মধ্যে রয়েছে মজুরী সুরক্ষা পদ্ধতি।

কিন্তু অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল মনে করে, এটাই যথেষ্ট নয়। এবং ফুটবলের বিশ্ব সংস্থা ফিফা’র বিষয়টি নিয়ে কথা বলা উচিত । জেমস লিনচ আরও বলেন- “শক্ত পদক্ষেপ আমরা খুব অল্পই দেখতে পাচ্ছি। এবং আমরা এর মাধ্যমে- কাতারের অভ্যন্তরীন পুর্নগঠনের জন্য প্রবল জনসমর্থন এবং বিশ্ব কাপের স্টেডিয়ামগুলোতে শ্রমিকদের অবস্থা সম্পর্কে সত্যিকারের তদন্তের কথা বোঝাতে চেয়েছি।“

যখন শাসকের আর কোন প্রতিপক্ষের প্রয়োজন নেই

“Those who cast the votes decide nothing. Those who count the votes decide everything.”—- Joseph Stalin

আমীর খসরু ::

প্রতিনিধিত্বশীল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচন পদ্ধতিটি অতি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম জনগণের জন্য এই কারণে যে, তারা প্রতিনিধি নির্বাচন করার জন্য অন্তত একটি সুযোগ পেয়ে থাকেন একটি নির্দিষ্ট সময়ান্তে। আর এই নির্বাচন হচ্ছে যাদের গণতন্ত্র নেই তাদের জন্য গণতন্ত্রে উত্তরণ এবং যাদের গণতন্ত্র আছে তাদের ক্ষেত্রে ওই ব্যবস্থাটি আরও শক্ত-পোক্ত করার জন্য। গণতন্ত্র নিয়ে যারা চিন্তা-ভাবনা করেন তারা এখন বলছেন, গণতন্ত্রের পুরনো সংজ্ঞায় বিষয়টিকে দেখলে আর চলবে না। বর্তমান সময়ে গণতন্ত্র হচ্ছে ক্ষমতার অধিকতর বিকেন্দ্রায়ন। অর্থাৎ ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন বা কর্তৃত্ববাদী শাসনে যাতে রাষ্ট্র ব্যবস্থাটি চলে না যায় তা নিশ্চিত করা। নির্বাচন হচ্ছে এই কারণে গণতন্ত্রের প্রথম ধাপ মাত্র। তবে প্রতিনিধিত্বশীল শাসনে নির্বাচনই সব কিছু এবং শেষ কথা- এমনটা যারা বিশ্বাস করেন তারা ভুল সিদ্ধান্তে পৌছেছেন। গণতন্ত্র হচ্ছে মানুষের দৈনন্দিন প্রাপ্যগুলোকে বুঝিয়ে দিয়ে অন্যান্য যে সব অধিকারগুলো আছে যেমন বাক-ব্যক্তি স্বাধীনতাসহ নানামুখী অধিকার নিশ্চিত করা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে অনুদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শাসক শ্রেণী সব সময়ই নির্বাচনই হচ্ছে সব কিছু এমন একটা ধারণাকে স্বতঃসিদ্ধ করার প্রবল চেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। এটা ঠিক, নির্বাচনী গণতন্ত্র অনিবার্যভাবে কতিপয়ের বা গোষ্ঠীর শাসনে রূপান্তরিত হতে বাধ্য।

কিন্তু এর উল্টোটা হচ্ছে, স্বৈরতান্ত্রিক এবং একনায়কতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায়। এই ব্যবস্থায় নির্বাচনকে নির্বাসনে পাঠানো হয় এবং জনগণকে ভোলানোর জন্য উন্নয়নের শ্লোগান উঠে প্রবলভাবে। এই ধরনের শাসকেরা এটা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করে এবং তাদের মনোজগতে এই বিষয়টি প্রবল যে, উন্নয়নের কথা বললে জনগণ আর গণতন্ত্রের কথা এবং গণতন্ত্রের প্রথম ধাপ নির্বাচনের কথা বলবে না। কারণ নির্বাচন ব্যবস্থাটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং গ্রহণযোগ্য হলে ক্ষমতার পালাবদল সম্ভব। আর এখানেই একনায়কতান্ত্রিক শাসকদের আপত্তি। আপত্তি এই কারণে- তারা পালাবদল চায় না, বরং তারা তাদের ক্ষমতার জন্য জনগণের গণতান্ত্রিক আকাংখার বদল চায়। এরও কারণ হচ্ছে, নানা দোষ-ত্রুটি  সত্ত্বেও নির্বাচন প্রক্রিয়াটি সচল-সজীব ও প্রাণবন্ত থাকলে জনগণের অধিকার কিঞ্চিৎ হলেও যেমন নিশ্চিত হয়, তেমনি ক্ষমতাসীন বা ক্ষমতাশ্রয়ী পক্ষকে সামান্য হলেও জবাবদিহিতার আওতায় আনার সুযোগ তৈরি হয়। এখানেই স্বৈরশাসকদের আপত্তি। তবে এ কথা বার বার বলা হচ্ছে যে, গণতন্ত্রই যে সর্বোচ্চ পন্থা তা নয়, তবে এর চাইতে ভালো পদ্ধতি আবিষ্কার এখনও পর্যন্ত হয়নি।

এখানে আরেকটি কথা বলা প্রয়োজন, গণতন্ত্রের সাথে জনগণের প্রকৃত অর্থনৈতিক উন্নয়ন যাকে অর্থনৈতিক সক্ষমতা বলা যায়- সে বিষয়টিও জড়িত। অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল কোনো রাষ্ট্র ও সমাজ কাঠামোতে এর নাগরিকগণও কম ক্ষমতা ভোগ করেন। অর্থাৎ তাদের অধিকারগুলো থেকে সহজে বঞ্চিত করা যায়। আবার অর্থনৈতিক দিক থেকে সক্ষম বা উন্নত দেশগুলোতে নাগরিকরা উচ্চ মাত্রায় অধিকার ভোগ করে। আমাদের মতো দেশে কতিপয়ের শাসন ও স্বৈরশাসনের উদ্ভব ঘটে অর্থনৈতিক অনুন্নয়নের কারণে, দুর্বল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিদ্যমান থাকার জন্য।

এতো সবের পরেও আমাদের মতো দেশে নির্বাচনই হচ্ছে জনগণের একমাত্র ভরসা- যা থেকে এই জনগণ বার বার বঞ্চিত হচ্ছে। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি স্বাধীন হওয়ার আগে জনগণের সম্মিলিত লড়াই, সংগ্রাম ছিল শক্ত-পোক্ত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নতি সাধনের জন্য। কিন্তু দুর্ভাগ্য হচ্ছে, গণতন্ত্রে উত্তরণের প্রথম সিঁড়ি বা ধাপটি অর্থাৎ নির্বাচনী ব্যবস্থাটি প্রথম দিন থেকেই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণ, শাসকদের মনোজগতে তখনো অতীত বাসা বেধে আছে অর্থাৎ মনেপ্রাণে তারা গণতান্ত্রিক ছিলেন না। গণতন্ত্রের প্রতি যে অসীম ভালোবাস এবং শ্রদ্ধা থাকতে হয় সে শিক্ষাটিই হয়তো তারা পাননি।

এদেশে নির্বাচনী ব্যবস্থার ইতিহাসের দিকে যদি ফিরে তাকাই তাহলে দেখা যাবে, স্বাধীনতার স্বল্পকাল পরেই ১৯৭৩ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নানা অনিয়ম হয়েছে- যা ছিল অবিশ্বাস্য। এরপরে দীর্ঘ সামরিক শাসনে আমরা দেখেছি জিয়াউর রহমানের ‘হ্যাঁ-না’ ভোট। এরশাদ জমানার ১৯৮৬, ১৯৮৮-এর নির্বাচন কেমন হয়েছিল তাও সবার জানা। ১৯৯০-এর পরবর্তী সময়কালের নির্বাচনগুলোতে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মধ্যেও শুনতে হয়েছে সূক্ষ-স্থূল কারচুপি, ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংসহ নানা কথা। ১৯৯০ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত সময়কালের নির্বাচনগুলো যে কোনো অর্থে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছে। ১৯৯৬ সালে অতি স্বল্পস্থায়ী একটি সংসদের জন্য যে নির্বাচনটি বিএনপি সরকার করেছিল তা ছিল এর ব্যাতিক্রম।

কিন্তু বাংলাদেশের অবাধ, সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনের যে রীতিটি গড়ে উঠছিল তার বিদায় সূচিত হয় ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি থেকে। বিনা প্রতিদ্বন্দিতায় ১৫৩ জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা বাংলাদেশ তো বটেই অন্যান্য কোনো দেশে পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ। একদলীয়, ভোটারবিহীন এমন নির্বাচন ইতিহাসে নজিরবিহীন। অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনী ব্যবস্থার অন্তর্ধান ও বিলুপ্তি ঘটানো হলো ওই দিনটিতে। এরপরে উপজেলা, সিটি করপোরেশন, পৌর নির্বাচন এবং সবশেষ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সবই একই বৈশিষ্ট্যের, অভিন্ন চরিত্রের। কোনো হেরফের এখন তাদের তৈরি নির্বাচনী পদ্ধতির ক্ষেত্রে আর হচ্ছে না। এখন দুর্ভাগ্যজনকভাবে নির্বাচনের অর্থই হচ্ছে- বিনা প্রতিদ্বন্দিতায় নির্বাচিত হওয়া, হুমকি, দখল, হামলা, আগুন, ভাংচুর, রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, হত্যা, খুন এবং নির্বাচনের সময়ে ও আগে-পরে নানাবিধ মামলা। বর্তমান সরকার পুরো বৃত্তই সম্পন্ন করে ফেলেছে।

আগেই বলা হয়েছে গণতন্ত্রের আধুনিক সংজ্ঞা হচ্ছে- ক্ষমতার বিকেন্দ্রায়ন। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাটি এই কারণেই খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গণতন্ত্রবিহীন শাসনামলের নির্বাচনগুলো পর্যালোচনায় দেখা যাবে, এই সময়কালে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার নির্বাচনগুলোও মারাত্মক পর্যায়ে ত্রুটিপূর্ণ এবং নানা দোষে দুষ্ট। ১৯৮৮ সালে স্বৈরাচারী এরশাদ শাসনামলে যে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল তাতে অসংখ্য মানুষ নিহত হয়েছিলেন এবং এক কথায় ভোট বলতে আর তখন কিছুই হয়নি।

এবারের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন নানা কারণে নজিরেরও বেশি সৃষ্টি করেছে। এই নির্বাচনের প্রথম দুই দফায় ভোটের নামে কি হয়েছে তা সবারই জানা। প্রথম দুই দফার নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের কমপক্ষে ৮৩ জন বিনা প্রতিদ্ব›িদ্বতায় নির্বাচিত হয়েছেন। ১৩শ’র মতো ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মধ্যে প্রায় দুইশটিতে প্রধান বিরোধী দলের কোনো প্রার্থী থাকতে পারেননি শেষ পর্যন্ত। আর খুন-জখম এখনো অব্যাহত আছে। এই নির্বাচনের সবচেয়ে দুঃখজনক দিকটি হচ্ছে- এমন একটা পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে যে, ক্ষমতাসীন দলের নৌকা প্রতীক পেলে তিনিই বিজয়ী। প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীসমূহ ক্ষমতাসীনদের এমন মনোভাব ও ইচ্ছার ইঙ্গিত পেয়ে গেছে। আর কাজও হচ্ছে সে মতো। তাহলে কি এটা ধরে নেয়া যায়, এই কারণেই প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে পৌর এবং ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হচ্ছে?

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মধ্যদিয়ে যে বিশাল এবং সীমাহীন ক্ষতিটি ইতোমধ্যে হয়ে গেছে তাহলো- তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত ‘ক্ষমতার উগ্রতা, দম্ভ ও শক্তিমত্তা প্রদর্শন’ ছড়িয়ে গেছে। এর প্রতিক্রিয়া ইতোমধ্যেই দেখা যাচ্ছে। স্থানীয় পর্যায়ের অবনতিশীল অভ্যন্তরীণ শৃংখলা আরও ভেঙ্গে পড়তে শুরু করেছে। আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির যে আরও অবনতি হবে, তারও আলামত দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে বিদ্যমান অভ্যন্তরীণ বিভাজন আরও স্পষ্ট হবে, যার ফলশ্রুতিতে হানাহানি আরও বাড়বে। অর্থাৎ একদলীয় শাসনের বিষয়টি গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ছড়িয়ে পড়ছে এবং ভবিষ্যতে আরও পড়বে।

নির্বাচন ব্যবস্থার বিদায়ের মধ্যদিয়ে তিনটি বিষয় স্পষ্ট যে, এক, রাজনৈতিক সংকট আরও প্রকট হয়ে তা আরও ব্যাপকতর বিপর্যয়ের সৃষ্টি করবে। যে শূন্যতা ইতোমধ্যে সৃষ্টি হয়েছে পুরো ব্যবস্থার ভারসাম্যে, তাতে শূন্যতা আরও বাড়বে। দুই, এই বিপর্যয়কর শূন্যতার মধ্যদিয়ে বিদ্যমান পুরো ব্যবস্থাটি টাল-মাটাল হয়ে পড়ার আশংকা তৈরি হয়েছে। আর এ থেকে বের হওয়া কতোটা সম্ভব তা বলা মুশকিল। তিন, এমন পরিস্থিতিতে ক্ষমতাসীনরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে সবচাইতে বেশি। তাদের জনবিচ্ছিন্নতা আরও বাড়বে, ব্যাপক মাত্রায়।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, নির্বাচন ব্যবস্থাকে নিয়ে কেন এই ভয়ংকর খেলা? এর জবাব হচ্ছে, এ সবই করা হচ্ছে জনমনে অধিকতর ভীতি সৃষ্টির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে। কারণ ক্ষমতাসীনরা চায়, জনগণের মধ্যে যাতে কোনো দিনই নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার পালাবদলের আকাংখাটি আর বিদ্যমান না থাকে। আর তেমন এক ভীতিকর, ভয়ংকর পরিস্থিতি সৃষ্টির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়েই সব আয়োজন। আগেই বলেছি, যেকোনো শাসকের জন্য জনবিচ্ছিন্নতাই হচ্ছে তার প্রধানতম শত্রু । কারণ যেকোনো শাসক সীমাহীন শূন্যতার মধ্যে পড়ে গেলে, তার আর প্রতিপক্ষের প্রয়োজন হয় না।

ঘোষণা

ইংরেজি নতুন বছর থেকে আমাদের বুধবারএর আঙ্গিকে কিছু পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এছাড়া দেশী ও আন্তর্জাতিক ঘটনাসমূহের বিশ্লেষণ এবং মূল্যায়ন শুধুমাত্র সপ্তাহের একদিনেই নয়, তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশের একটি উদ্যোগও নেয়া হয়েছে। নতুন এই প্রচেষ্টার ধারায় আমাদের সাথেই থাকুন।।

সম্পাদক

ঘোষণা

অনিবার্যকারণবশত এই সপ্তাহে আমাদের বুধবার প্রকাশিত হচ্ছে না। আগামী সপ্তাহে আমাদের বুধবার প্রকাশিত হবে। প্রকাশনায় বিঘ্ন ঘটায় আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত।।

সম্পাদক

তেলের অর্থ এবং আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসার নেপথ্যে (চতুর্থ পর্ব)

last 6আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসার সাথে তেল সম্পদের অর্থের একটি গভীর সখ্যতা রয়েছে। একটি অপরটিকে টিকিয়ে রাখে। আর পরস্পরের ঘনিষ্ঠ দুই ব্যবসার কুশীলবরা। এই ব্যবসার নেপথ্যে রয়েছে ঘুষ, অর্থ কেলেঙ্কারিসহ নানা ভয়ঙ্কর সব ঘটনাবলী। এরই একটি খচিত্র প্রকাশ করা হচ্ছে ধারাবাহিকভাবে। প্রভাবশালী দ্য গার্ডিয়ানএর প্রখ্যাত দুই সাংবাদিক ডেভিড লে এবং রাব ইভানসএর প্রতিবেদন প্রকাশের পরে এ নিয়ে বিস্তর আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। এ সংখ্যায় ওই প্রতিবেদনের বাংলা অনুবাদের চতুর্থ পর্ব প্রকাশিত হলো। অনুবাদ: জগলুল ফারুক বিস্তারিত »