Home » মতামত » গুম-অপহরণের ঘটনা উদ্বেগজনক ॥ মানুষ ভয়ের সংস্কৃতির মধ্যে রয়েছে

গুম-অপহরণের ঘটনা উদ্বেগজনক ॥ মানুষ ভয়ের সংস্কৃতির মধ্যে রয়েছে

. আকবর আলি খান, . মীজানূর রহমান শেলী এবং অ্যাডভোকেট সুলতানা কামালের প্রতিক্রিয়া

reactionসংবাদ মাধ্যমের হিসাব অনুযায়ী গত ২৭ ও ২৮ এপ্রিল অর্থাৎ দু’দিনেই গুম এবং অপহরণের ঘটনা ঘটেছে ১৪টি। আইন শালিস কেন্দ্রের হিসাব মতে, ২০১৪ সালের এ পর্যন্ত অপহরণের ঘটনা ঘটেছে কমপক্ষে ৫৩ জন। এই পরিস্থিতিতে মানুষের যে উদ্বেগউৎকণ্ঠা সে সম্পর্কে আমাদের বুধবারএর সঙ্গে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান, বিশিষ্ট সমাজ বিজ্ঞানী ড. মীজানূর রহমান শেলী এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালবাংলাদেশ (টিআইবি) ট্রাস্টি বোর্ড ও আইন শালিস কেন্দ্রের প্রধান অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল।

. আকবর আলি খান

গুমঅপহরণের এই যে পরিস্থিতি তা মারাত্মক পর্যায়ের উদ্বেগজনক। যদি প্রশাসনিক অবক্ষয় দেখা দেয় তবে এ ধরনের পরিস্থিতি বিস্তৃত হয়। মানুষের মধ্যে যে উদ্বেগ, শংকা তা সত্যিকার অর্থেই বিদ্যমান রয়েছে। সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা গ্রহণ দ্রুত করতে হবে, এটা জরুরি।

. মীজানূর রহমান শেলী

গুমঅপহরণসহ সার্বিক পরিস্থিতির রাজনৈতিক কারণ খুজতে গেলে, আমাদের তাকাতে হবে ল্যাতিন আমেরিকার সেই সব দেশের দিকে, যেখানে সামরিক একনায়কত্ব জারি থাকতে বিরোধী পক্ষ, শাসক দলের অপছন্দের ব্যক্তিসহ বিভিন্ন মানুষকে গুম, খুন ও নির্বাসনে যেতে হতো। সেই ধরনের পরিস্থিতি বাংলাদেশে বিদ্যমান রয়েছে কিনা এ নিয়ে হয়তো শাসক দল এবং বিরোধী পক্ষের মধ্যে মতভিন্নতা থাকতে পারে। তবে এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই যে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকারি বাহিনীর সংশ্লিষ্টতা ছিল এবং তারা পরে তা স্বীকারও করেছে। এ সব নিয়ে বেশ বিতর্ক আছে এবং দেশেবিদেশে সকলের কাছেই এক বিরাট সংশয়ের সৃষ্টি করেছে। অন্যদিকে, সরকার বা সরকারি দল কিংবা সংশ্লিষ্টরা সংশ্লিষ্ট নাও থেকে থাকেন, তাহলেও সেখানেও একটি রাজনৈতিক ব্যর্থতার প্রমাণ আছে যে, সুশাসন, সুশৃংখল শাসন এবং আইন শৃংখলা পরিস্থিতি সঠিকভাবে বজায় রাখার ক্ষেত্রে তাদের দারুন নিস্ফল ব্যর্থতা নিশ্চয়ই এর পেছনে রয়েছে এ কথা মানুষ মনে করতে বাধ্য।

বাংলাদেশের রাষ্ট্র কাঠামোর উপরে অবশ্যই এসব ঘটনা প্রভাববিস্তারী। রাষ্ট্রের যে আসল কাঠামো ছিল সংবিধান অনুসারে তা থেকে রাষ্ট্র অনেকখানি সরে গেছে। নানা কারণে তা দলীয়করণের কারণে হোক বা দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের অভাবেই হোক। যেকোনো সময়ই যে কোনো শাসক অর্থাৎ যিনি সরকারের প্রধান নির্বাহী তিনি নির্বাচিত একনায়ক হিসেবে পরিণত হয়ে পরেন বা হয়ে যান। এ কারণে নানা বিচ্যুতি, বিভ্রম এবং ভয়াবহ স্খলন ঘটে। রাষ্ট্র, আদর্শ সঠিকভাবে বিবেচিত হয় না এবং তা রূপায়িতও হয় না।

অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল

সবারই এমন একটা ধারণা হয়ে গেছে যে এবং সংবাদ মাধ্যম ও আমাদের নিজস্ব অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত এক বছরে ৭০ জনেরও বেশি মানুষ গুম হয়েছেন। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, গুমের ঘটনাগুলো ঘটেই যাচ্ছে। ২৮ এপ্রিল অর্থাৎ একদিনেই ৭ জনকে গুমের ঘটনা ঘটেছে। আর এটা সামগ্রিকভাবে জনমনে ভীষণ আতংকের সৃষ্টি করেছে। আমরা যারা মানবাধিকার কর্মী আছি তারাসহ সবাই এ নিয়ে প্রতিবাদ জানাচ্ছি, কথা বলছি, সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছি, আইনশৃংখলা রক্ষাবাহিনীর সঙ্গে কথা বলেছি। কিন্তু সব জায়গায়ই এমন একটা মনোভাব বিরাজ করছে যে হ্যাঁ, এ ধরনের ঘটনাগুলো ঘটেই যাচ্ছে, এ সব বন্ধ করা বা সুরাহা করার মতো ক্ষমতা কারো হাতে নেই। এমন পরিস্থিতি জনগণের জন্য নিদারুন আতংকের সৃষ্টি করেছে যেখানে মানুষ মনে করছে কারোরই কোনো নিরাপত্তা নেই, না ঘরেনা বাইরে।

এমন একটা পরিস্থিতি কি পুরো রাষ্ট্র কাঠামোর জন্যই বিপদের কারণ নয় এমন জিজ্ঞাসার জবাবে সুলতানা কামাল বলেন, এটা সর্বৈব সত্য, এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। এমন পরিস্থিতিতে, মানুষ কোনো ন্যায় বিচারের প্রত্যাশা রাখতে পারছে না, ভরসা হারিয়ে ফেলছে। মানুষ বিচার ব্যবস্থার উপরে আস্থা হারিয়ে ফেলে আইনশৃংখলা রক্ষাবাহিনীর কাছ থেকেও কোনো সাহায্য আশা করে না এবং এ রকম পরিস্থিতিতে নানা রকম ঘটনাবলী ঘটতে থাকে। মানুষ তখন অবিরাম নিজেকে সংকুচিত করে ফেলে এবং আপন স্বার্থকেই বড় করে দেখে এ পরিস্থিতি তাকে সার্বক্ষণিক আচ্ছন্ন করে ফেলে যার ফলশ্রুতিতে নানা ধরনের ঘটনাবলী ঘটে। আর এমন পরিস্থিতিতেই মানুষ নিজের হাতে আইন তুলে নেয়। ফল হিসাবে সমাজে মারামারি, দ্বন্দ্বকলহ, নৈরাজ্যের সৃষ্টি হয়। মানুষ যে উদ্দেশে যুথবদ্ধ হয়, সে সূত্রটিই ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

একটি ভয়ের সংস্কৃতিও সমাজে সৃষ্টি হয়। আগেই বলেছি, মানুষ ভয়ের চোটে নিজেকে গুটিয়ে ফেলে, কথাবার্তা বলে না। আমরা যদি সত্যজিৎ রায়ের ‘গুপি গাইনবাঘা বাইন’ ছবিটি দেখি তাহলে দেখা যাবে যখন গুপি এবং বাঘা হাল্লা রাজার দেশে গেল তখন দেখলো প্রতিটি মানুষের জিভ কাটা। অর্থাৎ যেখানে ভয় দিয়ে শাসন করার ব্যাপার চলে বা ভয় দিয়ে কোনো স্বার্থ উদ্ধারের চেষ্টা করে। যে কেউই এটার জন্য দায়ী হতে পারে। এমন একটা পরিস্থিতির চেষ্টা করা হয়, মানুষ যেন কোনো কথাবার্তা না বলে।।