Home » বিশেষ নিবন্ধ » উত্তাল ষাটের দশক (দ্বিতীয় পর্ব)

উত্তাল ষাটের দশক (দ্বিতীয় পর্ব)

হায়দার আকবর খান রনো

দুই.

last 4ষাটের দশকে একদিকে যেমন সমাজতান্ত্রিক শিবিরের অসামান্য সাফল্য লক্ষ্য করা গেছে। অপরদিকে এই সময়টিই ছিল পুজিবাদের জন্য স্বর্ণযুগ। হ্যা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী তিন দশকে (১৯৭৪ সাল পর্যন্ত) কোনো অর্থনৈতিক সংকট দেখা দেয়নি যা বুর্জোয়া অর্থনীতিবিদদের আশান্বিত করেছিল। ষাটের দশক হলো সেই সংকটবিহীন টানা তেজিভাবের চরম পর্যায়। সেই সময় প্রায় সকল পুজিবাদী দেশই কেনসীয় নীতিপ্রয়োগ করেছিল। কিন্তু ষাটের দশকের পরই পুজিবাদী অর্থনীতিতে মন্দাভাব দেখা দিয়েছিল। ১৯৭৪ সালে বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তীকালে প্রথম সংকট দেখা দিল। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত প্রতি দশকে একবার করে অর্থনৈতিক সংকট পুজিবাদী বিশ্বকে বিপুলভাবে ধাক্কা দিয়ে যাচ্ছে। সর্বশেষ ২০০৮সালে তা ভয়ংকর রূপ নিয়েছিল।

যাই হোক, আমরা ফিরে যাই ষাটের দশকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্যদিয়ে অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ হিসাবে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আবির্ভাব হয়েছিল, ১৯৪৭ সালে সেই যুক্তরাষ্ট্রের সেক্রেটারি অফ স্টেট (পররাষ্ট্র মন্ত্রী) জেনারেল জর্জ মার্শাল যুদ্ধ বিধ্বস্ত পুজিবাদী বিশ্বের জন্য ঋণ প্রকল্প নিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন, যাকে বলা হয় মার্শাল প্ল্যান। তথাকথিত আমেরিকান এইডএর ধারণা এই ভাবেই এসেছিল। মার্শাল প্ল্যানের অধীনে যুদ্ধ বিধ্বস্ত পশ্চিম জার্মানিসহ পুজিবাদী বিশ্ব বেশ চাঙ্গা হয়ে ওঠে। অবশ্য এই ঋণের একটা অংশ আবার পানিতে পড়ে নষ্ট হয়েছিল। মার্শাল প্ল্যানের অধীনে বড় অংকের ঋণ গ্রহণকারী ছিল কুয়োমিনটাংএর চীন, যারা কমিউনিস্ট নেতৃত্বাধীন সশস্ত্র গণবিপ্লবের তাড়া খেয়ে চীনের মূল ভূখথেকে পালিয়ে ফর্মোজা দ্বীপে (বর্তমানের তাইওয়ান) আশ্রয় নিয়েছিল।

ষাটের দশকে জার্মানি ও জাপান যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে আবার সাম্রাজ্যবাদে পরিণত হয়েছিল। সাম্রাজ্যবাদ ও সমাজতন্ত্রের মধ্যকার দ্বন্দ্ব এবং শীতল যুদ্ধ এই সময় চরমে উঠেছিল। চীনকে তখনো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র স্বীকৃতি দিতে চায়নি। চীন জাতিসংঘের সদস্য পদ পর্যন্ত পায়নি। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনকে ঘিরে মার্কিন নেতৃত্বাধীনে পারমাণকি সামরিক ঘাটি গড়ে তোলা হয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন অনেক আগেই এটম বোমা বানিয়েছিল (১৯৪৯ সালে)। ১৯৬৪ সালে চীনও এটম বোমা বানাতে সক্ষম হয়েছিল। ফলে বিশ্বে ভারসাম্য রক্ষা হয়েছিল। বিশ্ব শান্তি আন্দোলন, সোভিয়েতচীনসহ সমাজতান্ত্রিক শিবিরের শান্তির স্বপক্ষে দৃঢ় ভূমিকা এবং সমাজতান্ত্রিক শিবিরের হাতেও পাল্টা পারমাণবিক অস্ত্র থাকার কারণে সেদিন বিশ্বযুদ্ধ বাধেনি। সেই অর্থে বিশ্ব শান্তি রক্ষা করা সম্ভব হয়েছিল, যদিও ভিয়েতনামসহ সারা বিশ্বে যুদ্ধ লেগেই ছিল।

ষাটের দশকটি নানা দিক দিয়ে বেশ চমকপ্রদ। এই দশকে একদিকে যেমন পুজিবাদী জগতে সংকটবিহীন অগ্রগতি ঘটেছিল, তেমনই পাশাপাশি এবং তারই বিপরীতে সমাজতন্ত্রেরও অবিশ্বাস্য রকমের অগ্রগতি সম্ভব হয়েছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন কেবল পারমাণবিক অস্ত্রের ক্ষেত্রেই মার্কিনীদের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত ছিল না, জ্ঞানবিজ্ঞান, সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও সমান তালে, এমনকি পাশ্চাত্যের তুলনায় কিছুটা দ্রুততার সাথেই অগ্রগতি সাধন করতে সক্ষম হয়েছিল। ষাটের দশকে ক্রুশ্চেভের সুবিধাবাদী নীতি কার্যকরি হওয়া শুরু হলেও স্তালিন আমলের বিপ্লবী রেশ তখনো একেবারে নিঃশেষ হয়ে যায়নি। অন্যদিকে মাও সেতুংএর নেতৃত্বে চীন বিপ্লবের নতুন আশাবাদ জাগ্রত করে চলেছে।

সোভিয়েত ইউনিয়নই প্রথম মহাকাশে উপগ্রহ (স্পুটনিক) এবং মানুষ (ইউরি গ্যাগারিন) প্রেরণ করেছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তখন মহাকাশ বিজ্ঞানে পিছিয়ে ছিল। মার্কিন সামরিক গুরুত্ব উপলব্ধি করে তারাও মহাকাশ বিজ্ঞান চর্চায় টাকা ঢাললো। যেহেতু সাম্রাজ্যবাদী দেশ, তাই টাকা চালার ক্ষমতাও তার বেশি। ১৯৬৯ সালে তারা চাদে মানুষ পাঠালো। প্রথম যে ব্যক্তি চাদের মাটিতে পা রেখেছিল তার নাম নীল আর্মস্ট্রং।

দুই শিবিরের সেই সময়ের তুলনামূলক অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনা করা যাক। আগেই বলেছিল ষাটের দশকটি ছিল পুজিবাদের জন্য স্বর্ণ যুগ এবং একই সাথে তা ছিল সমাজতন্ত্রের শিবিরেরও অগ্রযাত্রার যুগ।

১৯৬১ থেকে ১৯৬৬ সাল এই কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের গড় প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৭.৪ শতাংশ। ১৯৬৬ সালে এই হার ৯ শতাংশে পৌছেছিল। তাহলে ষাটের দশককে এক অর্থে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য স্বর্ণযুগ বলা চলে, যদিও তখন তারা ভিয়েতনাম যুদ্ধে ক্রমাগত মার খাচ্ছে। অর্থনৈতিক ও সামরিক দিক দিয়ে সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনামের মতো এক ছোট্ট দেশের কাছে মার খাচ্ছে, এটা বিস্ময়কর হলেও সত্য ছিল। ভিয়েতনাম যুদ্ধে ভিয়েতনামে যেমন গণহত্যা চালিয়েছিল মার্কিনীরা তেমনই একই সাথে আগ্রাসী মার্কিন বাহিনীর সৈন্যরা ভিয়েতনামের মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে মারা যাচ্ছিল। কিন্তু ওই যুদ্ধে সরবরাহকারী হিসাবে মার্কিন দেশের বড় বড় কর্পোরেশনগুলো জনগণের ট্যাক্সের টাকা থেকে প্রভূত মুনাফা অর্জন করেছিল। ১৯৬৭ সাল থেকে প্রবৃদ্ধির হার নামতে শুরু করে। এটা ছিল ভবিষ্যতের সত্তরের দশকের মন্দার পূর্ব সংকেত মাত্র।

ষাটের দশকে সাম্রাজ্যবাদী ও সমাজতান্ত্রিক শিবিরে উভয়েরই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটেছিল। একই সাথে সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহেরও অর্থনৈতিক উন্নয়ন সামান্য হলেও হয়েছিল। ১৯৬৩ সালে পুজিবাদীসাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর শিল্পোৎপাদন ছিল বিশ্ব শিল্প উৎপাদনের ৬৩ শতাংশ। এই হার সমাজতান্ত্রিক শিবিরের জন্য ছিল ২৯ শতাংশ এবং একক ভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের জন্য ১৯ শতাংশ। তৃতীয় বিশ্বের অবদান ছিল ৯ শতাংশ। ষাটের দশকের শেষভাগে (১৯৭১ সালে) এসে সাম্রাজ্যবাদী শিবির, সমাজতান্ত্রিক শিবির ও তৃতীয় বিশ্বের অবদান এসে দাড়িয়েছিল যথাক্রমে ৬১ শতাংশ (তন্মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের একক অবদান ৩৩ শতাংশ), ২৬ শতাংশ (তন্মধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়নের একক অবদান ১৬ শতাংশ) এবং ১৩ শতাংশ। তার মানে বিশ্ব শিল্প উৎপাদনে তৃতীয় বিশ্বের অবদান বৃদ্ধি পেয়েছিল।

বিশ্ব বাণিজ্য ও বিশ্ব শিল্প উৎপাদনে সমাজতান্ত্রিক শিবিরের অবদানের হার বৃদ্ধি না পেলেও সমাজতন্ত্রের সামাজিক অবদান ছিল বিশাল। প্রত্যেকটি মানুষের জন্য জীবনের মৌলিক চাহিদাসমূহ পূরণ করতে পেরেছিল সমাজতান্ত্রিক শিবির। পাশ্চাত্যের তুলনায় পিছিয়ে পড়া অবস্থাতে থাকলেও সকলের জন্য কর্মসংস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান ইত্যাদির নিশ্চয়তা যেভাবে সমাজতন্ত্র দিতে পেরেছিল তা পুজিবাদী সমাজে কল্পনাও করা যায় না। এর ফলে তৃতীয় বিশ্বে এবং পাশ্চাত্যের ধনী দেশেও সমাজতন্ত্রের আবেদন বেড়েই চলেছিল। সমাজতন্ত্রের প্রভাবকে ঠেকানোর জন্য পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলো শ্রমজীবী ও সাধারণ মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তামূলক কিছু কিছু ব্যবস্থা চালু করেছিল, যদিও তা সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার তুলনায় অনেক কম ছিল। এই নতুন ব্যবস্থার নাম দেয়া হলো ওয়েলফেয়ার স্টেট।

সমাজতন্ত্রের এই সকল বিজয় তখন আমাদের দারুনভাবে উৎসাহিত করেছিল। কিন্তু ঠিক সেই সময়েই সমাজতান্ত্রিক শিবিরের ভাঙ্গন আরেক নতুন অবস্থা সৃষ্টি করেছিল। সেটাও ষাটের দশকে।

তিন.

শুরু হয়েছিল একটু আগে থেকেই। ১৯৫৬ সালে স্তালিনের মৃত্যুর তিন বছর পর সোভিয়েত পার্টির বিশতম কংগ্রেসে নিকিতা ক্রুশ্চেভ যে রিপোর্ট পেশ করেন, সেখান থেকেই নতুন করে সংশোধনবাদের যাত্রা শুরু হলো। একই রিপোর্টের গোপন অংশে স্তালিনের বিরুদ্ধে কুৎসা করা হয়েছিল। সেই গোপন অংশ আবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিডিয়া প্রকাশ করে দেয়। ফলে গোপন আর তা থাকেনি। এটা অনুমান করা হয় যে, ক্রুশ্চেভ চক্রই গোপন রিপোর্টটি গোপনেই মার্কিন দেশে পাচার করে দিয়েছিল। যে ক্রুশ্চেভ একদা স্তালিনকে পিতাবলেও সম্বোধন করতেন, সেই ক্রুশ্চেভই স্তালিনের বিরুদ্ধে যে ভাষায় মিথ্যাচার করেছিল, তাতে মনে হয় ক্রুশ্চেভ মানুষটি ছিলেন বড় ধরনের ভন্ড। স্তালিনের বিরুদ্ধে এই ধরনের কুৎসা আমার মনে ক্রুশ্চেভ সম্পর্কে খুবই খারাপ ধারণা তৈরি করেছিল। আমাদের দেশসহ সারা পৃথিবীতে অনেক কমিউনিস্ট ক্রুশ্চেভের এই স্তালিন বিরোধী বক্তব্য মেনে নিতে পারেননি। চীনের কমিউনিস্ট পার্টি ও আলবেনিয়ায় পার্টি অফ লেবার প্রকাশ্যেই ক্রুশ্চেভের সমালোচনা করেছিলেন।

মার্ক্সবাদলেনিনবাদকে বিকৃত করে বুর্জোয়াদের নিকট গ্রহণযোগ্য করে তোলা, শ্রেণী সংগ্রামের বদলে শ্রেণী সমন্বয়ের তত্ত্ব উপস্থিত করা, মার্ক্সবাদের বিপ্লবী সত্তাকে ছেটে ফেলা দেয়া এই সবই সংশোধনবাদের বৈশিষ্ট্য। দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের সময়কালে তত্ত্ব উপস্থিত করেছিলেন এডওয়ার্ড বার্নস্তাইন। তিনি ছিলেন জার্মান। তিনি মার্ক্সবাদকে সংশোধন করার প্রস্তাব করেছিলেন। তার থেকেই সংশোধনবাদ কথাটি এসেছিল। নিকিতা ক্রুশ্চেভও পরবর্তী যুগেড় মার্কসবাদের সৃজনশীলতার নামে নতুন রূপে সংশোধনবাদী তত্ত্ব আমদানী করেছিলেন। সংশোধনবাদকে গ্রহণযোগ্য করতে হলে মার্কস, লেনিন, স্তালিনকে বাতিল করতে হবে। প্রথম ধাপে ক্রুশ্চেভ স্তালিনকে বাতিল করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। সেই জন্য স্তালিন সম্পর্কে কুৎসা রটনা দরকার হয়ে পড়েছিল।

লেনিনীয় শান্তিপূর্ণ সহঅবস্থানের তত্ত্বকে তিনি একেবারে সাম্রাজ্যবাদের কাছে আত্মসমর্পণের জায়গায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তাছাড়া বিপ্লব নয়, শান্তিপূর্ণ পথে সমাজতন্ত্রে উত্তরণ সম্ভব, শান্তিপূর্ণ প্রতিযোগিতার দ্বারা পুজিবাদকে কোণঠাসা করা সম্ভব ইত্যাদি ভ্রান্ত ধারণা প্রচার করতে শুরু করেন। সোভিয়েত পার্টির আভ্যন্তরীণ কারণে ক্রুশ্চেভ অবশ্য সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে অপসারিত হয়েছিলেন। এরপর দীর্ঘকাল পার্টি ও রাষ্ট্রের ক্ষমতায় ছিলেন ত্রেজনভ। তিনিও বস্তুত একই নীতি অনুসরণ করেছিলেন। লেনিনস্তালিনের হাতে গড়া সোভিয়েত পার্টির সংশোধনবাদী পার্টিতে পরিণত হওয়া ছিল বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনের জন্য খুবই দুঃখজনক ঘটনা। এরই পরিণতিতে গর্ভাচেভের আবির্ভাব ঘটেছিল গত শতাব্দীর আশির দশকে। এরপরের ঘটনা সবারই জানা আছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে গেল। পূর্ব ইউরোপ ও রাশিয়াসহ সাবেক সোভিয়েতের রাজ্যগুলো ফিরে গেল পুজিবাদের পথে। ইতিহাসের এই পশ্চাৎপসরণ এক বেদনাদায়ক ট্র্যাজেডি। যাই হোক, এই বিষয়টি এই নিবন্ধের বিষয়বস্তু নয়। ফিরে যাই ষাটের দশকে।

সোভিয়েত পার্টির ২০তম কংগ্রেস বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছিল। বিশেষ করে বড় দুই সমাজতান্ত্রিক দেশের শাসক পার্টির মধ্যে, সোভিয়েত ও চীন পার্টিল মধ্যে মতাদর্শগত দ্বন্দ্ব দেখা দিল। ষাটের দশকে এই দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে চলে আসে এবং খুবই তীব্র হয়ে ওঠে। দ্বন্দ্ব নিরসনের লক্ষ্যে ১৯৬০ সালে পৃথিবীর প্রায় সকল কমিউনিস্ট ও ওয়ার্কার্স পার্টির সম্মেলন ডাকা হয়েছিল মস্কোতে। এটাই ছিল ঐতিহাসিক ৮১ পার্টির সম্মেলন। বস্তুত সম্মেলনে উপস্থিত ছিল ৮৬ দেশের পার্টি। কিন্তু পাচটি দেশের পার্টি গোপনীয়তার কারণে তাদের নাম প্রকাশ করেনি। তার মধ্যে একটি ছিল তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি। আমাদের এই পার্টিকে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন কমরেড নেপাল নাগ। আমি তাকে কোনদিন দেখিনি। কারণ ষাটের দশকে আমি যখন পার্টিতে যোগদান করি, তখন তিনি অসুস্থতার কারণে কলকাতায় বাস করছিলেন। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিতেও বিভক্তি এসেছিল। শেষ জীবনে তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী)র সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন বলে শুনেছি।

৮১ পার্টির সম্মেলন থেকে ঐকমত্যের ভিত্তিতে যে দলিল রচিত হয়েছিল তার মধ্যে বেশ ত্রুটি ছিল। সোভিয়েত বা চীন কোনপক্ষই এই দলিলের উপর দাড়ায়নি। এবং ঐক্যও স্থায়ী হয়নি।

সেই সময় একটা অতি আশাবাদ দেখা দিয়েছিল। বিশ্ব বিপ্লবী পরিস্থিতিকে অতিরঞ্জিত করে দেখা হয়েছিল। ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশের বিপ্লবী সংগ্রাম এই ধারণার তৈরি করেছিল যে, আর অল্প ধাক্কা দিলেই যেন পুজিবাদ পড়ে যাবে। সাম্রাজ্যবাদ পুজিবাদের বার্ধক্যের যুগএই কথাটিকেও যান্ত্রিকভাবে বোঝা হয়েছিল।

আজকে পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখলে মনে হয় সবচেয়ে বড় তাত্ত্বিক ভুল ছিল এই যে, পুজিবাদকে খাটো করে দেখা হয়েছিল। ৮১ পার্টির দলিলে ধারণা দেয়া হয়েছিল যে, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার দ্বারাই সমাজতন্ত্র কর্তৃক পুজিবাদকে পরাজিত করা সম্ভব। কারণ পুজিবাদ আধুনিক বিজ্ঞানপ্রযুক্তিকে কাজে লাগাতে পারে না। এই ধারণা যে ভুল তা তো পরবর্তীতে দেখাই গেল। বরং দেখা গেল ষাটের দশকে যে প্রযুক্তিগত বিপ্লব সাধিত হয়েছিল তাকে পুজিবাদই কাজে লাগিয়ে নিজের অবস্থানকে শক্ত করে তুলেছিল। মার্কসএঞ্জেলস বহু পূর্বেই কমিউনিস্ট ইশতেহারে যে কথা বলেছিলেন, তা তদানীন্তন বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনের নেতারা ঠিক মতো অনুধাবন করতে পারেননি। কমিউনিস্ট ইশতেহার বলছে, ‘উৎপাদনের উপকরণে অবিরাম বিপ্লবী বদল না এনে, এবং তাতে করে উৎপাদনসম্পর্ক ও সেই সঙ্গে সমাজ সম্পর্কে বিপ্লবী বদল না ঘটিয়ে বুর্জোয়া শ্রেণী বাচতে পারে না।

ইতিহাসের অন্যান্য শোষক শ্রেণীর সাথে যে বুর্জোয়ার মৌলিক পার্থক্য রয়েছে এটা আমরা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিলাম। অথচ ৮১ পার্টির দলিলে কি বলা হলো – ‘সেদিন আর বেশি দূরে নয়, যখন পৃথিবীর সমগ্র উৎপাদনে পুজিবাদের চেয়ে সমাজতন্ত্রের অংশইা হবে বেশি। মানব প্রচেষ্টার চূড়ান্ত ক্ষেত্র বৈষয়িক উৎপাদনের ক্ষেত্রে পুজিবাদ পরাস্ত হবে।

এই কথাটিতে অতি আশাবাদ ব্যক্ত হয়েছিল। কিন্তু ক্রুশ্চেভ সংশোধনবাদীরা এই কথাকে কিভাবে ব্যবহার করলেন? তারা বললেন, দেশে দেশে বিপ্লবী নয়, বরং শান্তিপূর্ণ অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার মধ্যদিয়েই তো পুজিবাদকে পরাস্ত করা সম্ভব। এবং সেই প্রচেষ্টাই তো নিতে হবে। তাহলে মূল জোর বাড়বে সমাজতান্ত্রিক দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ওপর। সে জন্য দরকার শান্তিপূর্ণ সময়। তৃতীয় বিশ্বের সশস্ত্র জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম যদি বিশ্বযুদ্ধের আশংকা তৈরি করে, তবে তা পরিত্যাগ করাই ভালো। ঠিক এই ভাষায় না বললেও সংশোধনবাদীদের সার কথা ছিল এই।

এই জায়গা থেকে সোভিয়েত সংশোধনবাদীরা পার্লামেন্টারি পদ্ধতিতে শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাজতন্ত্রের উত্তরণের বার্নেস্টানের তত্ত্বই আরেকভাবে পরিবেশন করলেন। এমনকি কোন কোন দেশে বুর্জোয়ার নেতৃত্বেই সমাজতন্ত্র অভিমুখী পরিবর্তন সম্ভব বলে ঘোষণা দিলেন। অধনবাদী পথে বিকাশবলে এক নতুন তত্ত্ব আমদানী করা হলো। এই সকল তত্ত্বের বিরুদ্ধে চীনের পার্টি তীব্র মতাদর্শগত সংগ্রাম শুরু করেছিল। দুই দেশের পার্টির মধ্যে পত্র বিনিময় শুরু হয়। পত্রের বিষয়বস্তু প্রকাশ্যেই এসেছিল। মনে পড়ে আমরা তখন খুব আগ্রহ ভরে খুটিয়ে খুটিয়ে দুই পক্ষের চিঠি পড়তাম। তর্কবিতর্ক করতাম। সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে যারা সংগ্রামের পতাকা তুলে ধরেছিলেন, তারা চীনপন্থী বলে পরিচিত হয়েছিলেন। আমিও সেই দলে যোগ দিয়েছিলাম। ১৯৬৩ সালের ১৪ জুন তারিখের লেখা সোভিয়েত পার্টিকে চীনের পার্টির চিঠিটি ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমি এখনো মনে করি সেদিনের প্রেক্ষাপটে এই চিঠির মর্মবস্তু সঠিক ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা হলো এই যে, পরবর্তীতে চীনের পার্টি ঠিক এই জায়গায় দাড়িয়ে থাকেনি।।

(চলবে…)