Home » আন্তর্জাতিক » দেশে দেশে গণতন্ত্রের পথে বাধা-বিঘ্ন (পর্ব – ৪)

দেশে দেশে গণতন্ত্রের পথে বাধা-বিঘ্ন (পর্ব – ৪)

কোণঠাসা গণতন্ত্র আর স্বৈরাচারীদের শিক্ষা

last 5(প্রভাবশালী সাময়িকী ইকোনমিস্ট বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গণতন্ত্রের সংকট সম্পর্কে এক দীর্ঘ নিবন্ধ প্রকাশ করেছে সম্প্রতি। প্রকাশিত নিবন্ধের বক্তব্য ইকোনমিস্টের নিজস্ব হলেও, গণতন্ত্রের সংকট সম্পর্কে একটা পরিস্কার ধারণা তা থেকে বেরিয়ে আসে। এ কারণেই আমাদের বুধবার নিবন্ধটির অনুবাদ প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।)

ইকোনমিস্ট থেকে অনুবাদ: মোহাম্মদ হাসান শরীফ

গণতন্ত্রের কেন্দ্রভূমিতে এর সমস্যাবলী অন্যান্য স্থানে তার বিপর্যয়ের কারণ ব্যাখ্যা করতে সহায়ক হতে পারে। ২০ শতকে গণতন্ত্র ভালো করার আংশিক কারণ ছিল মার্কিন প্রাধান্য। অন্যান্য দেশ স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বের প্রধান শক্তিকে অনুসরণ করতে চাইত। কিন্তু চীনের প্রভাব বাড়তে থাকায় আমেরিকা ও ইউরোপ রোল মডেল হিসেবে তাদের আবেদন এবং গণতন্ত্র ছড়িয়ে দেওয়ায় তাদের আন্তরিক আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। ওবামা প্রশাসন এখন দৃশ্যত এই আতঙ্কে মরছে যে, গণতন্ত্র দুর্বৃত্ত জান্তা সৃষ্টি কিংবা জিহাদিদের ক্ষমতাপুষ্ট করবে। অধিকন্তু যুক্তরাষ্ট্র সরকারই যেখানে ভবিষ্যত পরিকল্পনা তো দূরের কথা বাজেট পর্যন্ত পাস করতে পারে না, সেখানে উন্নয়নশীল দেশগুলো কেন গণতন্ত্রকে আদর্শ সরকার পদ্ধতি বিবেচনা করবে? ইউরো এলিটরা যখন আর্থিক বিধিবিধান মেনে চলতে আগ্রহী নির্বাচিত নেতাদের বরখাস্ত করছে, তখন কেন স্বৈরাচারীরা ইউরোপের কাছ থেকে গণতন্ত্রের বক্তৃতা শুনবে।

একই সময়ে ধনী বিশ্বের দেশগুলো যেসব সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে, উদীয়মান বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলোও একই অবস্থায় পড়েছে। তারাও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের বদলে স্বল্পমেয়াদি ব্যয়ের দিকে মাত্রাতিরিক্ত ঝুঁকে আছে। ব্রাজিল সরকারি কর্মীদের ৫৩ বছর বয়সে অবসরগ্রহণকে অনুমোদন করেছে, অথচ আধুনিক বিমানবন্দরব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় বলতে গেলে কোনো কাজই করেনি। ভারত বিপুলসংখ্যক প্রার্থী ও গ্রুপকে সহায়তা করছে, কিন্তু অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করছে খুবই সামান্য।

রাজনৈতিকব্যবস্থা আগ্রহী গ্রুপগুলোর হাতে বন্দি এবং গণতন্ত্রবিরোধী আচরণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ প্যাট্রিক ফ্রেঞ্চ উল্লেখ করেছেন, ভারতীয় পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের (লোকসভা) ৩০ বছরের কম বয়সী প্রতিটি সদস্য কোনো না কোনো রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য। এমনকি পুঁজিবাদী এলিটদের মধ্যেও গণতন্ত্রের প্রতি সমর্থন কমে যাচ্ছে : ভারতের বৃহৎ ব্যবসায়ীরা অব্যাহতভাবে অভিযোগ করে যাচ্ছেন যে, তাদের দেশের বিশৃঙ্খল গণতন্ত্র সৃষ্টি করছে পচা অবকাঠামো, অথচ চীনের কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থা তৈরি করছে হাইওয়ে, ঝা চকচকে বিমানবন্দর এবং হাইস্পিড ট্রেন।

গণতন্ত্র আগেও কোণঠাসা অবস্থায় ছিল। ১৯২০ ও ১৯৩০এর দশকে সমাজতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদকে মনে হচ্ছিল আসন্ন বিষয় : ১৯৩১ সালে স্পেনে যখন সাময়িকভাবে পার্লামেন্টারি সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলো, তখন বেনিটো মুসোলিনি এটাকে বৈদ্যুতিক যুগে কেরোসিন তেলের হ্যারিকেন প্রচলনের সাথে তুলনা করেছিলেন। ১৯৭০এর দশকের মধ্যভাগে সাবেক জার্মান চ্যান্সেলর উইলি ব্রান্ডট ঘোষণা করেছিলেন, ‘পশ্চিম ইউরোপের গণতন্ত্রের মেয়াদ আছে মাত্র ২০ থেকে ৩০ বছর। তারপর একনায়কদের প্রবল ভিড়ে এটা হবে পতন্মুখ, ইঞ্জিনবিহীন ও রাডারবিহীন।বর্তমানের অবস্থা ততটা খারাপ নয়। তবে গণতন্ত্র সহজাতভাবেই অনেক ভালো এবং শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রই জয়ী হবে বলে যে আইডিয়াটা বিরাজ করছিল, তার বিরুদ্ধে সমাজতন্ত্রের চেয়ে অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য হুমকি সৃষ্টি করেছে চীন।

অবশ্য, চীনের চমকপ্রদ অগ্রগতির ভেতরেই মারাত্মক সমস্যা লুকিয়ে আছে। এলিটরা নিজেদের স্থায়ীভাবে টিকিয়ে রাখছে এবং আত্মসেবায় ব্যস্ত থাকছে। চীনা ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের সবচেয়ে ধনী ৫০ সদস্যের মোট সম্পদের পরিমাণ ৯৪.৭ বিলিয়ন ডলার, যা আমেরিকান কংগ্রেসের সবচেয়ে ধনী ৫০ সদস্যের মোট সম্পদের চেয়ে ৬০ গুণ বেশি। চীনের প্রবৃদ্ধি হার ১০ শতাংশ থেকে কমে ৮ শতাংশে নেমে গেছে এবং আরো নামবে বলে ধারণা সৃষ্টি হয়েছে। এটা শাসকদের জন্য একটি মারাত্মক চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে। কারণ তাদের কর্তৃত্বের বৈধতা নির্ভর করছে অব্যাহত প্রবৃদ্ধি যোগান দেওয়ার ব্যাপারে তাদের সামর্থ্যরে ওপর।

একই সময়ে, যেমনভাবে ১৯ শতকে আলেক্সিস ডি টকুভিল উল্লেখ করেছিলেন, গণতন্ত্র সত্যিকারভাবে যতটা দুর্বল, বাস্তবে সবসময় তার চেয়ে বেশি দুর্বল দেখায়। গণতন্ত্রের অবয়বে অনেক বিভ্রান্তি থাকে, কিন্তু ভেতরে থাকে প্রচুর শক্তি। কোনো সমস্যার সৃষ্টিশীল সমাধান বের করা এবং অস্তিত্ব সঙ্কটের মুহূর্তে বিকল্প নীতি প্রণয়নে সক্ষম বিকল্প নেতৃত্ব স্থাপনের মাধ্যমে স্বৈরতন্ত্রের চেয়ে গণতন্ত্রই অনেক ভালো করে। অবশ্য মাঝে মাঝে গণতন্ত্রও সঠিক নীতি গ্রহণ না করে এলোমেলো পথে চলতে থাকে। তবে সফল হতে হলে নতুন ও প্রতিষ্ঠিত উভয় ধরনের গণতান্ত্রিক দেশকেই দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা নিশ্চিত হতে হবে।

গণতন্ত্রকে সঠিক পথে পরিচালিত করা

জেমস ম্যাডিসন ও জন স্টুয়ার্ট মিলের মতো আধুনিক গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতাদের ব্যাপারে সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো তারা অত্যন্ত আবেগবর্জিত ছিলেন। তারা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী তবে ত্রুটিপূর্ণ পদ্ধতি মনে করতেন। তাদের কাছে গণতন্ত্র এমন একটা পদ্ধতি যা মানুষের সৃষ্টিশীলতাকে শানিত করার জন্য সতর্কভাবে তৈরি করতে হবে। সেই সাথে এটা যাতে মানবীয় বিচ্যুতির শিকার না হয়, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। তাছাড়া সুষ্ঠুভাবে সক্রিয় রাখার লক্ষ্যে এই মেশিনকে সবসময় তেল দিতে হবে, পরিবেশপরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে এবং কাজ করিয়ে নিতে হবে। বিশেষ করে গণতন্ত্রে সদ্য পা রাখা দেশগুলোর জন্য আবেগবর্জিত থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গণতন্ত্রের এত পরীক্ষা ব্যর্থ হওয়ার অন্যতম কারণ হলো তারা নির্বাচনের ওপর মাত্রাতিরিক্ত গুরুত্ব দেয়, অথচ গণতন্ত্রের অন্যান্য অপরিহার্য বৈশিষ্ট্যের প্রতি নজর দেয় খুবই সামান্য। রাষ্ট্রের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কথা বলার স্বাধীনতা এবং সংগঠন করার স্বাধীনতার মতো ব্যক্তি অধিকারের নিশ্চয়তা থাকতেই হবে। সবচেয়ে সফল নতুন গণতান্ত্রিক দেশগুলোর সাফল্যের নেপথ্য কারণ হলো এরা মোটামুটিভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতাতন্ত্রের (নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া মানে বিজয়ী দল যা ইচ্ছা তাই করার সুযোগ পাওয়ার ধারণা) প্রলোভন এড়াতে পেরেছে। ১৯৪৭ সাল থেকে ভারতের (জরুরি শাসনের অল্প কয়েক বছর বাদে) এবং ১৯৮০এর দশকের মাঝামাঝি থেকে ব্রাজিলের গণতন্ত্র টিকে থাকার কারণ অনেকটা একই : উভয় দেশই সরকারের ক্ষমতা সীমিত করেছে এবং ব্যক্তি অধিকারের নিশ্চয়তা দিয়েছে।

সংবিধান শক্তিশালী করা হলে কেবল দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতাই বিকশিত হয় না, অসন্তুষ্ট সংখ্যালঘুদের সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণের আশঙ্কাও কমে যায়। এতে দুর্নীতির (উন্নয়নশীল দেশগুলোর অভিশাপ) বিরুদ্ধে সংগ্রামও জোরদার হয়। বিপরীতক্রমে, গণতন্ত্রে নতুন সামিল হওয়া কোনো দেশের টালমাটাল অবস্থার দিকে যাওয়ার প্রথম লক্ষণ ফুটে ওঠে যখন নির্বাচিত শাসকেরা প্রায়ই সংখ্যাগরিষ্ঠতার শাসনের নামে তাদের ক্ষমতাকে সংযতকারী রশিগুলো নষ্ট করার চেষ্ট করেন। যেমন মি. মুরসি মিসরের উচ্চকক্ষকে মুসলিম ব্রাদারহুডের সমর্থক দিয়ে ভরে ফেলার চেষ্টা করেছিলেন। মি. ইয়ানুকোভিচ ইউক্রেন পার্লামেন্টের ক্ষমতা হ্রাস করেছিলেন। মি. পুতিন জনগণের নামে রাশিয়ার স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাচ্ছিল্য করে যাচ্ছেন। আফ্রিকার অনেক নেতা রূঢ় সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদ প্রতিষ্ঠা করছেন। তাদের কেউ প্রেসিডেন্টের মেয়াদ বাড়িয়ে দিচ্ছেন। আবার কেউ যেমন উগান্ডার প্রেসিডেন্ট ইয়োয়েরি মুসেভেনি ২৪ ফেব্রুয়ারি হোমোসেক্সুয়াল আচরণের বিরুদ্ধে শাস্তি কঠোরতর করার মতো কাজ করছেন।

বিদেশী নেতাদের উচিত, এ ধরনের অনুদার এমনকি তারা যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন পেয়েও থাকেন এমন আচরণে নিয়োজিত শাসকদের বিরুদ্ধে, স্বতঃস্ফূর্ত অবস্থান নেওয়া। তবে যাদের এই শিক্ষাটা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তারা হলেন নতুন গণতন্ত্রের স্থপতিবৃন্দ। তাদের অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে দৃঢ় নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করাটা সুষ্ঠু গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার করার মতোই অতি দরকারি বিষয়।

আপত বিরোধী মনে হলেও এটাই সত্য যে এমনকি সম্ভাব্য স্বৈরাচারদেরও মিসর এবং ইউক্রেনের ঘটনা থেকে অনেক কিছু শিখতে হবে : নিজেদের হাতে বিপুল ক্ষমতা পুঞ্জিভূত করে দেশবাসীকে ক্ষুব্ধ না করলে মি. মুরসিকে কারাগার আর মিসরীয় আদালতের কাচের বাক্সে যাতায়াত করে সময় কাটাতে হতো না, মি. ইয়ানুকোভিচকে জীবন বাঁচাতে পালাতে হতো না।।

(চলবে…)