Home » আন্তর্জাতিক » চীন :: পরাশক্তির বিবর্তন (পর্ব – ৬)

চীন :: পরাশক্তির বিবর্তন (পর্ব – ৬)

সানইয়াৎ সেন এবং প্রজাতন্ত্রের আবির্ভাব

আনু মুহাম্মদ

last 4চীনে সম্রাটের শাসন বা রাজতন্ত্রের ব্যবস্থা নানা আভ্যন্তরীণ সংকটে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে উনিশ শতকে। আগের পর্বগুলোতে আমরা দেখেছি, একদিকে বিদেশি আগ্রাসন এবং অন্যদিকে আভ্যন্তরীণ জনবিদ্রোহ এই সংকট বৃদ্ধি করে এবং এর পতন অনিবার্য হয়ে পড়ে। অনেক ঘটনাবলী, লড়াই, রক্তপাতের পর বিশ শতকের শুরুতেই সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। চীন প্রবেশ করে প্রজাতন্ত্রের পর্বে। প্রজাতন্ত্র হিসেবে চীনকে পুনর্গঠন করা সহজসাধ্য বা শান্তিপূর্ণ ছিলো না। কিন্তু এই পর্ব ছিলো ভবিষ্যতের আরও বড় পরিবর্তনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

চীনের প্রজাতন্ত্র হিসেবে আবির্ভাবের সঙ্গে যার নাম সবচাইতে বেশি শোনা যায় তিনি ডা. সান ইয়াৎ সেন (১২ নভেম্বর ১৮৬৬১২ মার্চ ১৯২৫)। চীনের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের পথিকৃৎ হিসেবে তিনি স্বীকৃত। তাঁকে ১৯১২ সালে প্রতিষ্ঠিত প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়। তিনি চীন প্রজাতন্ত্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ‘বিপ্লবী ঐক্য’ নামের একটি মঞ্চ থেকেই কিং সাম্রাজ্য পতনের আন্দোলন পরিচালিত হয়। পরে এই মঞ্চের ধারাবাহিকতা থেকেই কুওমিংটান নামে রাজনৈতিক দলের জন্ম হয়। সান ইয়াৎ সেন এরও অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শের মূল ভিত্তি ছিলো তিনটি: জাতীয়তাবাদ (minzu), গণতন্ত্র (minquan) ও জনকল্যাণ (minsheng)। সানএর জীবন ছিলো খুবই সংঘাতময়, বহুবার তাঁকে নির্বাসনে যেতে হয়েছে। প্রেসিডেন্ট হবার পরও জীবন সংঘাতমুক্ত হয়নি।

উনিশ শতকের শেষ দিকে কিং সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে উপর্যুপরি বিদ্রোহের কালে সান ইয়াৎ সেন হংকংএ চিকিৎসা শাস্ত্রের ছাত্র ছিলেন। একইসঙ্গে চীনের ভেতর ও বাইরে বহু চীনা নানা সংগঠনের মাধ্যমে তৎপর ছিলেন। তিনি ডাক্তার হিসেবে তাঁর কর্মজীবন স্থগিত করেই চীনকে বদলানোর রাজনৈতিক লক্ষ্য নিয়ে বিভিন্ন কর্মযজ্ঞে যোগ দেন। বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে বহুমুখি তৎপরতার সঙ্গেও যুক্ত হন তিনি। অনেকগুলো গ্রুপ তৈরি হয়েছিলো তখন। কেউ কেউ সম্রাট শাসনের সংস্কার শক্তিশালীকরণের পক্ষে ছিলেন, কেউ কেউ এর পরিবর্তনের নানা মডেল নিয়ে কথা বলছিলেন। অভ্যুত্থান, ক্ষমতাদখলের তৎপরতাও ছিলো। এসবের সাথে যুক্ত থাকার দায়েই সানকে বেশ কয়েকবার নির্বাসনে যেতে হয়েছিলো। সানইয়াৎ সেনএর রাজনৈতিক তৎপরতায় প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন তাঁর হাওয়াই প্রবাসী ভাই। এখানেই সান তাঁর ‘রিভাইভ চায়না সোসাইটি’ নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পরবর্তীতে সান এর ভাই তাঁর ১২ হাজার একর খামারের জমি ও গবাদি পশুর বড় অংশ বিক্রি করে সানএর বিপ্লবী তৎপরতায় অর্থযোগান দেন।

উনিশ শতকের শেষে ফিলিপাইনে বিপ্লবী সংগ্রাম বিস্তার লাভ করে, মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ফিলিপাইনের যুদ্ধও সেই সময়ের ঘটনা। সান এর সাথে ফিলিপিনো বিপ্লবীদের যোগাযোগ আদান প্রদান শুরু হয়। সান এর ধারণা ছিলো ফিলিপাইনে স্বাধীনতা সংগ্রাম বিজয়ী হলে চীনে বিপ্লবী আন্দোলন অনেকগুলো অনুকূল উপাদান পেয়ে আরও গতিপ্রাপ্ত হবে। কিন্তু ১৯০২ সালে যুক্তরাষ্ট্র বিজয়ী হিসেবে ফিলিপাইনে তার দখল নিশ্চিত করে।

বস্তুত সান ইয়াৎ সেনএর বেশ কয়েকটি অভ্যুত্থান পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। সেজন্য তাঁকে বারবারই নির্বাসনে যেতে হয়। শুধু জাপান নয়, নির্বাসনে তাঁকে যেতে হয়েছে ইউরোপের বিভিন্ন শহর, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডাতেও। এসব স্থানে তিনি প্রবাসী চীনা ও সেদেশীদের মধ্যে নতুন চীন নিয়ে জনমত তৈরি করেছেন, তহবিল সংগ্রহ করেছেন। তবে বিভিন্ন স্থানে চীনের রাজকীয় গোয়েন্দা সংস্থার হয়রানির শিকারও হয়েছেন। আটক হয়েছিলেন, হত্যার চেষ্টাও হয়েছিলো।

১৯০৫ সালে তিনি টোকিওতে চীনা ছাত্রদের বিপ্লবী গ্রুপে যোগদান করেন। মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে প্রবাসী চীনাদের মধ্যেও তখন এই ধরনের পরিবর্তনকামী চিন্তার বিস্তার ঘটছিলো দ্রুত। সেকারণে সানএর সাথেও তাঁদের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। এসব অঞ্চলে অনেকগুলো পাঠচক্রের মাধ্যমে নতুন চিন্তার বিকাশ ও বিস্তার ঘটতে থাকে। ১৯০৭৮ এ বেশ কয়েকটি অভ্যুত্থান চেষ্টা ব্যর্থ হয়। এসব ব্যর্থতার কারণে সানবিরোধী বেশ কয়েকটি গ্রুপও তৈরি হয়, সানপন্থী ও সানবিরোধী এই দুই গ্রুপে বিভক্ত হয়ে যায় বিপ্লবী গ্রুপগুলো।

১৯১১ সালের ২৭ এপ্রিল আরেকটি ব্যর্থ অভ্যুত্থান হয়, শহীদ হন অনেকে। কিন্তু একই বছরের ১০ অক্টোবর হুয়াং জিংএর নেতৃত্বে সফল সশস্ত্র অভ্যুত্থান ঘটে, যা দুই হাজার বছরের সাম্রাজ্যিক শাসনের অবসান ঘটায়। কিন্তু এতে সান ইয়াৎ সেন সরাসরি যুক্ত ছিলেন না, তিনি তখন যুক্তরাষ্ট্র সফর করছিলেন, সেখান থেকে ফিরে আসেন এর পরপরই। ১৯১১ সালের ২৯ ডিসেম্বর বিভিন্ন প্রদেশের প্রতিনিধিদের নিয়ে নানকিংএ সর্বদলীয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই সভায় সানইয়াৎ সেনকে অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট, লি ইওয়ান হং ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং হুয়াং জিংকে সামরিক বিষয়ক মন্ত্রী নির্বাচন করা হয়। চীন প্রজাতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয় ১৯১২ সালের ১ জানুয়ারি।।

(চলবে…)