Home » Uncategorized » তেলের অর্থ এবং আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসার নেপথ্যে (চতুর্থ পর্ব)

তেলের অর্থ এবং আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসার নেপথ্যে (চতুর্থ পর্ব)

last 6আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসার সাথে তেল সম্পদের অর্থের একটি গভীর সখ্যতা রয়েছে। একটি অপরটিকে টিকিয়ে রাখে। আর পরস্পরের ঘনিষ্ঠ দুই ব্যবসার কুশীলবরা। এই ব্যবসার নেপথ্যে রয়েছে ঘুষ, অর্থ কেলেঙ্কারিসহ নানা ভয়ঙ্কর সব ঘটনাবলী। এরই একটি খচিত্র প্রকাশ করা হচ্ছে ধারাবাহিকভাবে। প্রভাবশালী দ্য গার্ডিয়ানএর প্রখ্যাত দুই সাংবাদিক ডেভিড লে এবং রাব ইভানসএর প্রতিবেদন প্রকাশের পরে এ নিয়ে বিস্তর আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। এ সংখ্যায় ওই প্রতিবেদনের বাংলা অনুবাদের চতুর্থ পর্ব প্রকাশিত হলো। অনুবাদ: জগলুল ফারুক

সামরিক বিপণন শাখার পরিচালক হ্যারল্ড হিউবার্ট কিছুটা অসহিষ্ণুতার স্বরেই বললেন, আপনাদের সমস্যাটা আসলে কি সেটিই আমি বুঝে উঠতে পারছি না। একদিকে আপনারা বলছেন যেখানে এজেন্ট নেই, সেখানে অস্ত্র বিক্রি করতে পারার সুযোগও নেই। অন্যদিকে আবার বারবার আপনাদের মুখে উচ্চারিত ঘুষ প্রসঙ্গটি থেকে বোঝা যায়, এ ব্যাপারে ব্রিটিশ সরকারের সংশ্লিষ্টতাকে আপনারা ভয় পান। আমার জানতে ইচ্ছে করছে, আপনারা এমনটাই চান কিনা যে, ব্রিটিশ সরকারের সুনাম নষ্ট হয় এমন কোনো খারাপ কাজে আমরা যেন জড়িত না হই। অস্ত্র ব্যবসার সাথে জড়িত ব্যক্তিরা এমনকি তারা যদি সরকারি চাকুরেও হয়ে থাকেন, দিনে দিনে এসব কাজে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। এমনকি তারা যদি বুঝতেও পারেন, অস্ত্র কেনাবেচার লেনদেনে যে সব অর্থ ব্যবহৃত হচ্ছে সে সব অর্থের একটা পরিমাণ ঘুষ, তবুও তারা এসব কাজ থেকে বিরত হন না। আমি নিশ্চিত করেই বলতে পারি, আমি বা আমার অফিসে কর্মরত কেউই এসব ঘুষ লেনদেনে জড়িত নই। তবে আমি এও বিশ্বাস করি, অস্ত্র বেচাকেনার লেনদেনের কোনো না কোনো পর্যায়ে কিছু মানুষ ঘুষেরও আদানপ্রদান করে থাকে। তারা আমাদের জানায় না তারা কী করছে। একইভাবে আমরাও তাদের এসব কাজকর্ম নিয়ে মাথা ঘামাই না। আমরা কেবল পুরো প্রক্রিয়ার ফলাফলটির দিকেই নজর দেই।

হিউবার্ট রয়াল অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরিতে নির্মিত সামরিক যান ও গোলাবারুদ ক্রয়বিক্রয় সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে কথা বলছিলেন। এ প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, সামরিক যানগুলো এক সরকারের মাধ্যমে আরেক সরকারের কাছে বিক্রয় করা হবে। এগুলো প্রস্তুতকারী মূল কোম্পানিটি যদি ভেনিজুয়েলায় এখন পর্যন্ত তাদের কোনো এজেন্ট নিয়োগ করতে না পেরে থাকে তবে আমরা সেই এজেন্ট নিয়োগ করে দিতে পারি। আর তারা কেবল তাদের নিজের তহবিল থেকে সেই এজেন্টের কমিশনটি দিয়ে দেবে।

আমরা যদি এখন কামান ও গোলাবারুদ বিক্রয়ের কোনো উদ্যোগ নেই তবে সেই ক্রয়বিক্রয়ের চুক্তিটি সম্পাদিত হবে দুটি দেশের দুই সরকারের মধ্যে। এক্ষেত্রে আমিও সেই একই এজেন্টকে নিয়োগ দেব এবং সেও বিক্রয়ের কাজটি সম্পন্ন করার জন্য একইভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাবে। এই এজেন্টরা সাধারণত পর্দার অন্তরালে থেকেই কাজ করে।

ব্রাউন ট্যাংক বিক্রি করার জন্য ওলন্দাজ সরকারের ঘনিষ্ঠ মহলে যাতায়াত আছে এমন একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিকে ৫০ হাজার পাউন্ড ঘুষ প্রদান করেছিলেন। তিনি জানান, ওলন্দাজ সরকারের উচ্চমহলে যোগাযোগ আছে এমন একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিকে আমরা চিনতাম। তিনি আমাদের কথা দেন, সরকারকে ট্যাংক কেনার ব্যাপারে আগ্রহী করে তুলতে পারবেন। এরপরই ওই ব্যক্তিটির সাথে আমরা একটি বোঝাপড়ায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। সরকারের অর্থমন্ত্রকের একজন কর্মকর্তা আমাদের জানান, ওই ব্যক্তিটি হচ্ছেন নেদারল্যান্ডসের প্রিন্স বার্নহার্ড। তিনি ওলন্দাজ রানীর স্বামী। প্রক্রিয়াটির সাথে প্রতিষ্ঠিত একজন ব্যবসায়ীও জড়িত ছিলেন।

কিন্তু সেই পরিকল্পনাটি ভেস্তে গেলে তিনি কর্নেল ডাউয়েস ডেকার নামে ওলন্দাজ সরকারের একজন কর্মকর্তাকে যোগাড় করেন যিনি ৫ শতাংশ কমিশনের বিনিময়ে সরকারের কাছে কামান এবং সামরিক যান বিক্রয় করে দেবেন বলে কথা দেন। অফিসারটি সামরিক বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্বকেও এ ব্যাপারে রাজি করাতে পারবেন বলে জানান। ব্রাউন মধ্যপ্রাচ্যেও গোপনে একজন এজেন্ট নিয়োগ করেছিলেন। তিনি ছিলেন জর্ডানের শেহাদেহ তাওয়াল। বাদশাহর তিনি খুবই ঘনিষ্ঠজন ছিলেন।

তাওয়াল ২.৫ শতাংশ কমিশনের বিনিময়ে ১৬টি ট্যাংক বিক্রি করে দিয়েছিলেন এবং বহুদিন পর্যন্ত তিনি এ কাজে যুক্ত ছিলেন। ব্রাউন বেশ খোলাখুলিভাবেই স্বীকার করেছেন, এসব এজেন্টের কাজই ছিল ঘুষের অর্থ লেনদেন করা। এরাই বলে দিতো কোন জায়গায়, কাকে কি পরিমাণ ঘুষ দেয়া গেলে অস্ত্র বিক্রয় করা সম্ভব হবে। তিনি বৈরুত থেকে আগত দ্বিতীয় আরেক এজেন্ট সুলায়মান আলামউদ্দিনের সাথেও লন্ডনে সাক্ষাত করেন। তারা কমিশনের হার নিয়ে আলোচনা করেন। আলমউদ্দিন মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সরকারের প্রভাবশালীদের সাথে ঘনিষ্ঠ। তিনি এর আগেই ব্রিটিশ কোম্পানি ব্রিটিশ এয়ারক্রাফট করপোরেশনের হয়ে কাজ করেছেন। এ কোম্পানিটি পরবর্তীতে বিএইতে রূপান্তরিত হয়। চার বছর সময়ের মধ্যে ব্রাউন ৮৫ কোটি পাউন্ড মূল্যের সমরাস্ত্র এবং সামরিক সরঞ্জাম বিক্রয় করতে সক্ষম হন। যদিও হিলি তার জন্য বিক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন ২০ কোটি পাউন্ড। মধ্যপ্রাচ্য সম্পর্কে বলতে গিয়ে ব্রাউন বলেন, অস্ত্র বেচাকেনায় এজেন্ট নিয়োগের বিষয়টি মধ্যপ্রাচ্য আজকাল অনেকেই পছন্দ করতে চাচ্ছেন না। তবে মাধ্যমে ঘুষ লেনদেনের ব্যাপারটি তারা নির্মূল করতে চান কিনা, নাকি এর মাধ্যমে তারা লোক দেখানো একটা সততার ভান করছেন সে বিষয়টি স্পষ্ট নয়। ব্রাউনের অফিস একবার অস্ত্র কেনাবেচায় ইরানে ঘুষ প্রদান করতে গেলে সেখানকার দূতাবাস থেকে প্রচণ্ড বাধা আসে। এ প্রসঙ্গে তার অস্ত্র বিক্রেতা হিউবার্ট মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, ইরানিদের ন্যায় ও সততার পথে দীক্ষা দেয়া আমার কাজ নয়। আমি এসেছি ব্রিটিশ যুদ্ধাস্ত্র বিক্রয় করতে। এটিই আমার কাজ। তবে ব্রাউনের উত্তরসূরি লেস্টার সাফিল্ড কিছুদিনের মধ্যেই বড় ধরনের ঘুষ প্রদানের মাধ্যমে ইরানে বিপুল পরিমাণ ব্রিটিশ সমরাস্ত্র বিক্রয় করতে সক্ষম হয়েছিলেন।।

(চলবে…)