Home » আন্তর্জাতিক » প্রধানমন্ত্রী মোদীর বাংলাদেশ সফরের ফলাফল বিশ্লেষণ

প্রধানমন্ত্রী মোদীর বাংলাদেশ সফরের ফলাফল বিশ্লেষণ

আমীর খসরু

COVERনরেন্দ্র মোদীর ঢাকা সফরের আগেই তিনি স্থল সীমান্ত চুক্তিকে ‘বার্লিন ওয়াল’ বা ‘বার্লিন দেয়ালে’র পতনের সাথে তুলনা করেছেন। এছাড়া স্থল সীমান্ত চুক্তির অনুমোদন নিয়ে ভারত এবং বাংলাদেশের দিক থেকে এমন একটা মনোভাব পোষণ করা হচ্ছে যে যাতে মনে হয় ঘটনাটি একেবারে নতুন ঘটেছে এবং ভারত যথেষ্ট দয়াদাক্ষিণ্য দেখাচ্ছে। কিন্তু এটি যে নতুন কোনো ঘটনা নয়, বরং বহু আগেই স্থল সীমান্ত চুক্তি ভারতের দিক থেকে অনুমোদন করা জরুরি ছিল সে বিষয়টি ভারত ও বাংলাদেশের সরকারগুলোর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে না। ১৯৭৪ সালের ১৬ মে যে স্থল সীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল শেখ মুজিব এবং ইন্দিরা গান্ধীর মধ্যে এবং তারই ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশ সাথে সাথে বেরুবাড়ি ভারতকে হস্তান্তর করে। বিনিময়ে ভারত এই দীর্ঘ ৪১ বছর সময় নিয়েছে স্থল সীমান্ত চুক্তিটি অনুমোদন করতে। বিনিময় হিসেবে এরই মধ্যে সীমান্তে কাটাতারের বেড়া উঠেছে এবং সেখানে মানুষ হত্যার ঘটনা ঘটছে অহরহ। কিন্তু ভারতের কর্মকান্ডে এবং নরেন্দ্র মোদীর বক্তৃতায় ১৯৭৪ সালের চুক্তির কোনো নামনিশানাও নেই। এমনকি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যিনি তার পিতার নাম সব সময় স্মরণ করেন, তিনিও এই ঘটনাটির কথা স্মরণ করছেন না। উল্টো সীমান্ত চুক্তির কথা বলে, ছিটমহল বিনিময়ের কৃতিত্ব দাবি করে জাতীয় সংবর্ধনা নিয়েছেন। আর সেখানে তারই পক্ষাবলম্বী লোকজন তাকে ‘দেশরত্ন’ উপাধিতে ভূষিত করেছেন। তাহলে নরেন্দ্র মোদীর সফরে বাংলাদেশ কি পেয়েছে? কোনো অর্জন আছে কি? এক কথায় জবাব অধিকাংশ অর্জন ভারতেরই।

ভারত কানেকটিভিটির নামে পুরো ট্রানজিট যা এতোদিন তারা চাইছিল, তার সবই পেয়েছে। নরেন্দ্র মোদীর এই সফরে ভারত সড়ক, নৌ, সড়কসহ সব ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থা পেয়ে গেছে এবং এর মাধ্যমে ভারতের এক অংশের সাথে আরেক অংশে যোগাযোগ সহজ হয়ে গেল। তিনটি বাস সার্ভিস চালু হয়েছে যাতে ভারতের যাত্রীদের দূরত্ব কমে গেল কয়েক শত মাইল। বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের দুটি চুক্তিও করা হয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্র বন্দর ব্যবহার করার সুফলও পাবে ভারত। এমনকি জীবন বীমা ক্ষেত্রে ভারতীয় বীমা কোম্পানী বাংলাদেশে ব্যবসা করার সুযোগ পাবে। যে ২ বিলিয়ন ঋণ সুবিধা দেয়ার কথা বলা হয়েছে তার সুফলও যাবে ভারতের ঘরে।

কিন্তু বাংলাদেশের যা ন্যায্য প্রাপ্য অর্থাৎ তিস্তার নদীর পানি বন্টনের কি হয়েছে? তিস্তার পানি আগে কয়েক হাজার কিউসেক পাওয়া গেলেও এখন তা আড়াইশ থেকে তিনশ কিউসেকে নেমে এসেছে। অর্থাৎ পানি আসছেই না এমনটা বলা চলে। নরেন্দ্র মোদী তিস্তার পানি বন্টনের কোনো সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা বা কাঠামো না দিয়ে বরং পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে ফেলেছেন বলেই মনে হচ্ছে। তিনি তিস্তা ও ফেনী নদীর পানি বন্টনকে এক করে ফেলেছেন। এতোদিন ধরে দুই দেশ তিস্তা নদীর পানি বন্টনের ক্ষেত্রে একটি অভিন্ন ফর্মূলা বের করার চেষ্টা করছিল। সবশেষ ২০১১ সালে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান বের করা হয়েছিল দু’দেশের পক্ষ থেকেই। শেষ পর্যন্ত চুক্তিটি আর হয়নি। নরেন্দ্র মোদীর তার বক্তৃতায় বলেছেন, দু’দেশের সম্মিলিত উদ্যোগ থাকলে ৫৪টি নদীর পানি সমস্যার সমাধান অচিরেই সম্ভব। এই বক্তব্যের মধ্যদিয়ে শ্রী নরেন্দ্র মোদী তিস্তা নদীর পানি বন্টনকে ওই ৫৪টি নদীর সাথে একাকার করে ফেলেছেন। অন্যান্য নদীর পানি প্রবাহ বৃদ্ধির কোনো দিকনির্দেশনাও তার বক্তব্যে নেই।

বার্লিন ওয়াল পতনের কথা বলা হলেও সীমান্তে কাটাতারের বেড়া এবং সেখানে যে হরহামেশা হত্যাকান্ড ঘটছে, তা বন্ধ করার কোনো দিকনির্দেশনাও ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে শোনা যায়নি। বাংলাদেশভারত সীমান্ত বিশ্বের এক নম্বর রক্তাক্ত সীমান্ত বলে চিহ্নিত হলেও এই হত্যাকান্ড বন্ধে কোনো দিকনির্দেশনা এই সফরে ছিল না।

বাংলাদেশের সাথে বাণিজ্য ঘাটতি পূরণে এক ভিন্ন ধরনের প্রস্তাব ভারতের পক্ষ থেকে এসেছে। ভারত মনে করছে, ভেড়ামারা এবং মংলায় বিশেষ বাণিজ্য অঞ্চল গঠনের ফলে যে ভারতীয় বিনিয়োগ আসবে এর মাধ্যমেই ওই বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাস পাবে।

সব মিলিয়ে তা হলে কি ফলাফল দেখা যাচ্ছে? লাভালাভের হিসাবে কে লাভবান তা স্পষ্ট এবং পরিস্কার। তবে ভূরাজনৈতিক কৌশলগত একটি বিষয়টিকে বিবেচনায় আনা অত্যন্ত জরুরি। নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেয়ার পরে পার্শ্ববর্তী দেশগুলো সফর করছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সফরের মাধ্যমে অর্থনৈতিক এবং বাণিজ্যিক সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়টির বাইরেও ওই সব দেশের উপরে চীনের প্রভাব হ্রাস, তার সফরের একটি উল্লেখযোগ্য কারণ। এ কারণে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তার প্রথম সফরটি করেন ভুটানে এবং এর পরবর্তীকালে নেপালে। বাংলাদেশ কি এর বাইরে?