Home » প্রচ্ছদ কথা » স্বপ্ন-কল্পনার রগরগে কথামালার ফুলঝুড়ি

স্বপ্ন-কল্পনার রগরগে কথামালার ফুলঝুড়ি

শাহাদত হোসেন বাচ্চু

এক.

COVERজাতি হিসেবে বাঙালী স্মৃতিভ্রষ্টএই বদনাম ঘোচাতে নয়, লেখাটি শুরু করার জন্য গত ৮ ও ৯ মে ২০১৫এ প্রকাশিত জাতীয় দৈনিকগুলোর প্রধান প্রধান শিরোনামগুলি স্মরণে আনা যাক – ‘মানবপাচার বেড়েছে ৬১%, ৮০ শতাংশ বন্দীশিবির মালয়েশিয়ায়, থাইল্যান্ডের জঙ্গলে দু’দিনে ১২৩ বাংলাদেশী উদ্ধার (প্রথম আলো)। মানব পাচারে সক্রিয় চার দেশের সিন্ডিকেট, পাচার রোধে ব্যর্থ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রতারক চক্রের কবলে বিদেশগামীরা (ইনকিলাব)। থাইল্যান্ডের আরেকটি জেলায় গণকবর, টেকনাফে শীর্ষ মানবপাচারকারী ধলুসহ নিহত ০৩, থাইল্যান্ডে বেঁচে যাওয়া ১২৩ বাংলাদেশী উদ্ধার (কালের কণ্ঠ)। মানবপাচার বাড়ছে আকাশপথে, তিন মাসে ২৫ হাজার বাংলাদেশী পাচারজাতিসংঘের উদ্বেগ (নয়া দিগন্ত)। টেকনাফে বন্দুকযুদ্ধে তিন পাচারকারী নিহত, থাইল্যান্ডের জঙ্গলে আরো ৩০ কবর (আলোকিত বাংলাদেশ) মানবপাচারে চার দেশের সিন্ডিকেট (ইত্তেফাক), জীবিকার খোঁজে জীবনবাজি (সমকাল), তিনমাসে পাচার ২৫ হাজার (মানবজমিন), দালালচক্রের জন্য মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে (জনকণ্ঠ)। আবার গত ১৮ জুন ২০১৫ প্রথম আলোর প্রধান শিরোনাম : ‘মানবপাচার, ইয়াবা, রোহিঙ্গা বৈধকরণ তিন তালিকাতেই এক নম্বরে সাংসদ বদি’।

২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে টেকনাফে ৭৯ জন মানবপাচারকারী তালিকা তৈরী করে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এই তালিকার এক নম্বরে রয়েছে টেকনাফউখিয়া আসনের সরকার দলীয় সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বদি। সরকারের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তৈরী করা তালিকাতেও ইয়াবা চোরাচালানকারীদের মূল পৃষ্ঠপোষক হিসেবে রয়েছে আব্দুর রহমান বদির নাম। রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারীদের বাংলাদেশী ভোটার তালিকায় নাম লেখানোর ও জাতীয় পরিচয়পত্র থেকে সহায়তাকারীদের তালিকাও বদির নাম এক নম্বরে।

ভয়ঙ্কর মাদকদ্রব্য ইয়াবার শিকার একন দেশের তরুন জনগোষ্ঠি। মানব পাচারের ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ঐ তরুন জনগোষ্ঠিই। মিয়ানমার থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গারা নানারকম অপরাধচক্রের সাথে যুক্ত হয়ে পড়ছে। এইসব মিলিয়ে কক্সবাজার অঞ্চলে একটি শক্তিশালী ক্রাইম সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। সিন্ডিকেটের এক নম্বর ব্যক্তি হিসেবে সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বদির নাম সরকারের তালিকায় এক নম্বরে, গণমাধ্যম এবং এলাকার মানুষের মুখে মুখে আলোচিত হলেও তার বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ করা হচ্ছেনা বা করা যাচ্ছেনা। ফলে জনমনে একটি স্থায়ী পারসেপশন তৈরী হচ্ছে সরকারী দলের সংসদ সদস্য হওয়ার কারনে তিনি আইনের উর্ধ্বে। গুটিকয় মানবপাচারকারী দালাল, যারা এই পাচার নেটওয়ার্কের বিশাল চেইনের একএকটি লিঙ্ক মাত্র তাদেরকে ক্রসফায়ারে হত্যা করা হলে মানবপাচার বন্ধ হবে এমনটি কি করে আশা করা হচ্ছে? যদি না পাচারকারী চক্রের মূল লোকটিকে আইন এবং বিচারের আওতায় নিয়ে আসা না হয়।

কি পরাক্রমশালী আমাদের এই সংসদ সদস্য। রাজনৈতিক নেতানেত্রীদের ভাষায় পবিত্র ও মহান জাতীয় সংসদে ৩’শ ও সংরক্ষিত ৫০ মোট সাড়ে তিনশ আইন প্রণেতার মধ্যে আব্দুর রহমান বদিও একজন। দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলায় অভিযুক্ত এই বদি এখন জামিনে রয়েছেন। এই সংসদ সদস্যটি সম্পর্কে ধারণা করি খোদ প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে ক্ষমতাসীন দল, গোয়েন্দা সংস্থাগুলি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রশাসনসহ সকলে নিশ্চয়ই অবগত হয়েছেন। তিনটি গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধবৃত্তির সাথে জড়িত প্রধান হোতাকে সরকারী সংস্থাগুলো যখন তালিকায় এক নম্বরে রাখে, তখন ধরেই নিতে হয় তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গৃহীত হবে। কিন্তু কোন ব্যবস্থাই যখন না নেয়া হয়, তখন কি দেশের মানুষ ধরে নেবে সংসদ সদস্য হিসেবে বদি কি সব আইনের উর্ধ্বে? তিনি কি প্রচন্ড কোন ক্ষমতাধর ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আশির্বাদপুষ্ট যে তার টিকিটিও কেউ ছুঁতে পারবে না।

দুই.

রাষ্ট্রের মালিকানাধীন বেসিক ব্যাংকের তিন হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের দায়ে অভিযুক্ত ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল হাই বাচ্চুও কি আইনের উর্ধ্বে? তাকে কেন আইনের আওতায় নেয়া হচ্ছে না জাতীয় সংসদে ১৭জুন অর্থমন্ত্রীর কাছে এই প্রশ্নটি করেছেন মহাজোটের সংসদ সদস্য মঈনউদ্দিন খান বাদল। মন্ত্রীর কাছে তিনি জানতে চান, আব্দুল হাই কি আকাশে থাকেন, নাকি হিমালয়ে থাকেন? আইন কি তাকে স্পর্শ করতে পারে না? মঈন উদ্দিন খান বাদলের সাথে একমত হয়ে প্রশ্নটি তোলাই যায়, কি জবাব দেবেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী? তিনিও কি আব্দুর রহমান বদিকে খুঁজে পান না? আব্দুল হাই যেমন তিন হাজার কোটি টাকা আত্মসাত করে নিরাপদ, তেমনি বছরে ৮’শ কোটি টাকার মানবপাচার বানিজ্যের চিহ্নিত হোতা বদির ক্ষমতাপ্রতিপত্তির কাছে অকার্যকর আইন প্রয়োগ ব্যবস্থা। বাদল অবশ্য সংসদে এদেরকে ‘নতুন যুগের মুজাহিদ’ বললেও আব্দুল হাইয়ের আমলনামা বেশ পুরোনো। প্রসঙ্গক্রমে জানানো যায়, ১৯৮৮ সালে বাগেরহাট জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান থাকাকালীন তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ থাকলেও আইন তার নাগাল পায়নি কখনও।

নানাভাবে আলোচিত পুরোনো ঢাকার হাজী মোহাম্মদ সেলিম ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়ন না পেয়ে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য। গত ২০ জুন সংসদে দেশ থেকে সুইস ব্যাংকে টাকা পাচারে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি স্পিকারের রুলিং দাবি করেছেন। হাজী সেলিমের মতে, ‘যে পরিমান টাকা পাচার হয়েছে তা দিয়ে ৬টি পদ্মা সেতু নির্মান করা সম্ভব’। তিনি অবশ্য বলতে পারেননি, পাচারকৃত টাকার পরিমান কিংবা কারা পাচার করছে বাংলাদেশের টাকা। গত ১৮ জুন সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের (এনএসবি) প্রকাশিত ব্যাংকস ইন সুইজারল্যান্ড ২০১৪ শীর্ষক বার্ষিক রিপোর্ট জানাচ্ছে, ২০১৪ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশীদের জমাকৃত টাকার পরিমান ৪ হাজার ৫৫৪ কোটি। ২০১৩ সালে জমা পড়েছিল ৩ হাজার ২৩৬ কোটি টাকা।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) সবশেষ বার্ষিক প্রকাশনা থেকে জানা যাচ্ছে, গত এক দশকে (২০০২২০১১) বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ২০০৬ সালে পাচার হয় ২১ হাজার কোটি টাকা। ২০১০ ও ২০১১ সালে পাচার হয় যথাক্রমে ১৭ হাজার কোটি ও ২২ হাজার কোটি টাকা। রিপোর্টে বলা হয়, যে কোন সরকারের মেয়াদকালের শেষ দিকে পাচার প্রবণতা বেড়ে যায়। বছরওয়ারি হিসেবের দিকে তাকালে এর সত্যতা পাওয়া যাবে। অন্যদিকে ২০০৮ সালে পাচার প্রবণতা কমে দাঁড়িয়েছিল ৮ হাজার ৬৪০ কোটি টাকায়। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অপর প্রতিষ্ঠান ট্যাক্স জাষ্টিস নেটওয়র্ক (টিজেএন) এর হিসেবে ১৯৭৬ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন দেশে পাচারকৃত অর্থের পরিমান ১ লাখ ৯৭ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। ইউএনডিপি’র এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে বছরে গড়ে ৬ হাজার ৪০০ কোটি টাকা পাচার হয়। সে হিসেবে স্বাধীনতার চার দশকে পাচার হয়ে গেছে ০৩ লাখ কোটি টাকা। যা কিনা ২০১০ সালের জিডিপি’র ৩০ শতাংশ।

কারা পাচার করে এই বিপুল পরিমান অর্থ? নি:সন্দেহে প্রভাবশালী এবং শীর্ষ পর্যায়ের অবস্থানগত সেইসব ব্যক্তিবর্গ, যারা অতি অল্প সময়ে অপরিমেয় বিত্তের অধিকারী হয়ে পড়েন। নব্বইয়ের দশকে এরশাদের অপরিমেয় অর্থ ও সুইস ক্ষ্যাংকে জমাকৃত অর্থের উৎস সম্পর্কে আন্তর্জাতিক সংস্থা ফেয়ারফ্যাক্স তদন্ত শুরু করলেও তা থেমে যায়। ২০০৮ সালে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার পুত্র আরাফাত রহমানের অর্থপাচারের ঘটনা উদঘাটন করে মার্কিন সংস্থা এফবিআই। অবৈধ উপায়ে অর্জিত বিপুল পরিমান অর্থের ব্যাপারটি অনেক সময় গণমাধ্যমে আসলেও অচিরেই তা চাপা পড়ে যায়। এর বাইরে মানবপাচার, অস্ত্র ও মাদক ব্যবসা, সোনা চোরাচালানসহ বিভিন্ন অবৈধ ব্যবসার মাধ্যমে আরো কতো হাজার কোটি টাকা গত সাড়ে দশকে পাচার হয়েছে সে হিসেব এর বাইরে। সুইজারল্যান্ড এবং মালয়েশিয়া, হংকং, দুবাইসহ বিভিন্ন দেশে পাচার হচ্ছে এই অর্থ।

তিন.

২০০৯ সালে ক্ষমতাসীন হবার পরে শেখ হাসিনা প্রায় বলতেন, তাঁর মন্ত্রীরা অনভিজ্ঞ হতে পারেন কিন্তু অসৎ নন। প্রধানমন্ত্রীর দৃঢ়তাপূর্ণ এই বক্তব্যে প্রথম যতিচিহ্ন পড়ে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের ঘটনায়। এরপরে আলাদিনের চেরাগের বদৌলতে ফুলেফেঁপে ওঠা কতিপয় সাবেকবর্তমান মন্ত্রীএমপিনেতার বিপুল সম্পদের উৎস অজানাই থেকে যায়। তারপরপর থেকে মনেই পড়ে না প্রধানমন্ত্রী আর কখনও দাবি করেছেন যে, তার মন্ত্রীরা অসৎ নন। অথবা নির্বাচনী ওয়াদা অনুযায়ী মন্ত্রীএমপিদের সম্পদের বিবরণী প্রকাশ করার কথা। দলীয় লোকজনের এরকম অলৌকিক সম্পদের মালিক বনে যাওয়া কিংবা একজন বদির মানব পাচার, ইয়াবা চোরাচালান, রোহিঙ্গা বৈধকরনে যুক্ততা, আব্দুল হাইয়ের ৩ হাজার কোটি টাকা আত্মসাত, দেশ থেকে বছরে সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা পাচার প্রধানমন্ত্রী তখন কি ভাবেন, খুব জানতে ইচ্ছে হয়!

ইচ্ছে তো অনেক কিছুই হয়। ইচ্ছের ডানা অবারিত উন্মুক্ত, পাখা মেলে আকাশে! কিন্তু সব ইচ্ছের কথা তো প্রকাশও করা যায় না। এরকম ইচ্ছে পোষণ করলে জবাবগুলো আসতে পারে আপনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকারকে বিব্রত করছেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হোক তা আপনি চান না। আপনি তো জামায়াতবিএনপির সমর্থক এবং রাজাকারএ সকল অভিধায় আখ্যায়িত করা হতে পারে। তারপরেও জানার বেয়াড়া ইচ্ছে জাগে, তিন তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, বঙ্গবন্ধু কন্যা, গণতন্ত্রের মানসকন্যা, দেশরতœ, বহু সাফল্যের অধিকারী শেখ হাসিনা কি ভাবেন? তাঁর আমলে শুনি এবং জানি জিয়া পুত্রদ্বয় এবং বিএনপি নেতাদের দুর্নীতি ও অর্থপাচারের কাহিনী। আমানের শ’খানেক ফ্ল্যাট রয়েছে ঢাকায়, কোন কামাই না করেও লন্ডনে প্রথম শ্রেনীর জীবনযাপন করেন তারেক, পাচার করা অর্থ উদ্ধার ও বিচার হয় আরাফাতের, নব্বইয়ের পতনের পর এরশাদের বাড়িতে পাওয়া যায় দুই কোটি টাকা।

এসব সংবাদ এক সময় আমাদের বিস্মিত করতো। কিন্তু বর্তমান আমলে হাজার হাজার কোটি টাকার হিসেব সামনে থাকায় আমরা বিস্মিত হচ্ছি না কেউই। আমরা শুধু দেখছিশুনছি উন্নয়ন, উন্নয়ন মাতম। আর মধ্যম আয়ের দেশ হবার স্বপ্ন দেখিয়ে ঢেকে দেয়া হচ্ছে সবকিছু। আড়ালে চলে যাচ্ছে, শেয়ার বাজার লুন্ঠন, বেপরোয়া দুর্নীতি, হাজার কোটি টাকা অর্থপাচার এবং এরসাথে যুক্ত ব্যক্তিবর্গের সকল অপকর্ম। জনগনের জন্য পড়ে থাকছে উন্নয়ন আর মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার স্বপ্নকল্পনার রগরগে কথামালার ফুলঝুড়ি।।