Home » আন্তর্জাতিক » ছিটমহল :: অদ্ভূত সীমারেখায় জনভোগান্তির কাহিনী

ছিটমহল :: অদ্ভূত সীমারেখায় জনভোগান্তির কাহিনী

ইকোনোমিস্ট থেকে ভাষান্তর

last 3খামখেয়ালীপূর্ণ ও অদ্ভুত ভৌগোলিক এক সীমারেখার ইতিহাসে সন্ধিক্ষণ হয়ে থাকবে ২০১৫ সাল। আগামী ৩১ জুলাই বাংলাদেশ ও ভারত পরস্পরের মধ্যকার ১৬২ টুকরো জমি তথা ছিটমহল বিনিময় করবে যার প্রত্যেকটিই বাংলাদেশভারত সীমান্তের ‘ভুল’ পাশে অবস্থিত। গত ৬ জুন বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পাদিত একটি চুক্তির অধীনে বিলুপ্তি ঘটবে এ ছিটমহলগুলোর। বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ও বিদঘুটে সীমান্তটিতে রয়েছে বিশ্বের একমাত্র পাল্টাপাল্টি ছিটমহল। এক একটি ভারত আবদ্ধ রয়েছে বাংলাদেশের একটি অঞ্চলে। সেটি আবার বাংলাদেশের মধ্যে ভারতীয় একটি ছিটমহলের ভেতরে অবস্থিত। কিন্তু এই ছিটমহলগুলোর উৎপত্তি হলো কিভাবে?

বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্ত দৈর্ঘ্য ৪১০০ কিলোমিটার। আর এ সীমান্ত ১৯৪৭ সালে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল অঞ্চলগুলোতে বেশ তাড়াহুড়ো করেই আঁকা হয়েছিল। সীমাহীন আঁকাবাঁকা, পেচানোবাক মোড়ের কারণেই এ সীমান্ত বিশ্বের পঞ্চম দীর্ঘতম। ছিটমহল বিনিময় হবে যার ১১১টি পাবে বাংলাদেশ ও ভারত পাবে ৫৬টি, এগুলো বাংলাদেশ সীমান্তের উভয় পাশে রয়েছে। যে ছিটমহল বিনিময় হবে, মানচিত্রেই এগুলোর বেশির ভাগেরই দেখা পাওয়া যায় না, আর অধিকাংশের অস্তিত বাস্তবেও নেই। কিন্তু পাসপোর্ট, ভিসা ব্যবস্থার কারনে এ ছিটমহলগুলোই সেখানকার ৫০ হাজার বাসিন্দার জন্য বড় ধরনের সমস্যা হয়ে উঠেছে। ভারত ও স্বাধীন বাংলাদেশ কেউই তাদের ছিটমহলে অন্য কাউকে প্রশাসনিক ক্ষমতা চালাতে দিতে রাজি ছিল না। এতে ছিটমহলের বাসিন্দাদের অবস্থা ছিল কার্যত রাষ্ট্রবিহীন। কথিত রয়েছে, কয়েকশ’ বছর আগে দুই মহারাজার মধ্যে দাবা খেলার ফলে উৎপত্তি ঘটে এ ছিটমহলগুলোর। তাদের খেলার বাজি ছিল পরস্পরের জমির টুকরো। ফলে এক মহারাজা একবার জিতে অপর মহারাজার এক টুকরো জমি পান, আবার পরে হেরে নিজের এক টুকরো জমি হারান! এগুলোই পরে হয়ে উঠে ছিটমহলে। আরেকটি গল্পও আছে এসবের পেছনে। সেটি অনেকটা এরকমযে বৃটিশ কর্মকর্তার ওপর মানচিত্র এঁকে ভারতপাকিস্তান আলাদা করার দায়িত্ব ছিল, তিনি ছিলেন মদ্যপ। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সীমারেখা আঁকতে গিয়ে ১৯৪৭ সালে তার কলমের কিছু কালির ফোঁটা গিয়ে পড়ে মানচিত্রের উভয় পাশে। সেগুলোই পরে হয়ে উঠে ছিটমহল। রাজনৈতিক ভূগোলবিদ রিস জোনসের মতে, ১৭১১ থেকে ১৭১৩ সালের মধ্যে কোচবিহারের মহারাজা ও দিল্লির মুঘল সম্রাটের মধ্যে বিভিন্ন চুক্তি অনুযায়ী বৃহৎ অঞ্চল থেকে ওই ছিটমহলগুলো আলাদা করে ফেলা হয়। মূলত ছোটখাটো বিভিন্ন যুদ্ধ বন্ধের প্রচেষ্টাই ছিল ওই চুক্তি। যার যার সেনাবাহিনী ওই অঞ্চলগুলো নিয়ন্ত্রণ করতো। বাসিন্দারা নিজেদের শাসককে কর বা খাজনা দিতেন। তবে তারা বাধাহীন চলতে পারতেন কিছু পথ দিয়ে। ৫০ বছর পর বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অগোছালো মানচিত্র ঠিক করার প্রচেষ্টা চালায়। কিন্তু বাসিন্দারা নড়তে রাজি না হওয়ায়, সে প্রচেষ্টা ভেস্তে যায়।

মূলত, ভারতপাকিস্তান বিভাজনের কারণেই ওই ছিটমহলগুলো কার্যত ‘নোম্যান’স ল্যান্ডে পরিণত হয়। কেননা, কোচবিহারের হিন্দু মহারাজা ১৯৪৯ সালে ভারতে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। নিজের সঙ্গে তিনি মুঘল ও বৃটিশদের কাছ থেকে আদায় করা বিভিন্ন এলাকাকেও ভারতের অন্তর্ভুক্ত করান। সীমান্তের অপর পাশের ছিটমহলগুলো তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান অঙ্গীভূত করে ফেলে, যদিও সেটা আর পারা যায়নি। পূর্ব পাকিস্তান পরে স্বাধীন হয়ে বাংলাদেশে পরিণত হয়। ১৯৭৪ সালে এ ব্যাপারে প্রথম বাংলাদেশ ও ভারত একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ভারত সামগ্রিকভাবে জমি হারালেও এসব ভুলে থাকতে রাজি হয়। ওই জমির পরিমাণ মোটামুটি হংকং দ্বীপের অর্ধেক হবে। কিন্তু পরে দুর্বল সরকার ও জাতীয়তাবাদ ব্যাহত করে ভারতের অগ্রগতি। তারও ৪১ বছর পর ২০১৫ সালের মে মাসে, ভারতের পার্লামেন্ট একটি সাংবিধানিক সংশোধনী আনে। বাংলাদেশকে জমি দিতে হলে ও অস্বাভাবিকতার সমাধান করতে হলে, সংশোধনীর দরকার ছিল।

ছিটমহলগুলোকে মানচিত্র থেকে মুছে দেয়ার প্রভাব থাকতে পারে তিনটি। প্রথমত, প্রভাব মূলত অনুভব করবে বাসিন্দারা। ছিটমহলের বাসিন্দারা বর্তমানে নিজের দেশ বেছে নিতে পারেন। এর ফলে তারা পাবেন নাগরিকত্বের মৌলিক সুবিধাদি। দ্বিতীয়ত, এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে বাংলাদেশ ও ভারত নিজেদের মধ্যকার আরও বড় সমস্যাগুলোর দিকে নজর দিতে পারবে। সর্বশেষ প্রভাবটি হলো, বাংলাদেশভারত সীমান্ত এলাকা থেকে হারিয়ে যাবার মাধ্যমে, বিশ্বের ছিটমহলগুলো বিলুপ্তির পথে এগিয়ে গেছে। এ গ্রীস্মের পরই বিশ্বে মাত্র ৪৯টি ছিটমহল অবশিষ্ট থাকবে। এগুলোর বেশিরভাগই অবশ্য পশ্চিম ইউরোপে ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত দেশসমূহের মতো। আর এভাবেই বিশ্বের বেশিরভাগ ছিটমহল রাতারাতি বিলীন হয়ে যাবে।।