Home » রাজনীতি » ‘শাসন করা তারই সাজে সোহাগ করে যে গো’

‘শাসন করা তারই সাজে সোহাগ করে যে গো’

এম. জাকির হোসেন খান

Dis 2বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, প্রবাসী বাংলাদেশিরা গত ২০১৪১৫ অর্থবছরে দেশে প্রায় এক হাজার ৫৩০ কোটি মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন যা ২০১৩১৪ অর্থবছরের চেয়ে ১০৮ কোটি মার্কিন ডলার বা ৭ দশমিক ৬০ শতাংশ বেশি। বলা হচ্ছে, এ পরিমাণ রেমিট্যান্স এ যাবৎকালের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে বার্ষিক সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স ১ হাজার ৪৪৬ মার্কিন ডলার ছিল ২০১২১৩ অর্থবছরে। অতীতের মতো বর্তমানেও ক্ষমতাসীনরা এ অর্জনকে তাদের অন্যতম সাফল্য বলে কোরাস গাইতে শুরু করেছে। এরই মধ্যে বিশ্ব ব্যাংক তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে নিম্ন মধ্য আয়ের দেশ বলে ঘোষনা দেয়ার পরই সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে ইতিমধ্যে ঘোষণা করছেন যে, আগামী ৩ বছরের মধ্যেই বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে। অর্থাৎ ৪৪ বছরে মাথাপিছু জাতীয় আয় মাত্র ১০৪৬ ডলার বৃদ্ধি পেলেও মাত্র আগামী ৩ বছরে ক্ষমতাসীনরা তা ৪ গুণ বৃদ্ধি করে কমপক্ষে ৪,১২৫ ডলারে পৌঁছে দিয়ে দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করা হবে। উল্লেখ্য, উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ বা প্রকৃত মধ্যম আয়ের দেশ হতে হলে মাথাপিছু জাতীয় আয় ৪,১২৬ ডলার থেকে ১২,৭৩৬ ডলার হতে হবে।

এটা বলার অপেক্ষা রাখেনা মাথাপিছু এ আয় বৃদ্ধির ক্ষেত্রে প্রধান অবদান হলো বিদেশে অবস্থানরত কর্মজীবিদের কষ্টার্জিত আয় যার ফলে কাঙ্খিত বিনিয়োগ না বাড়লেও অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য মন্দা আসেনি। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রবাসীআয়ের দিক থেকে বিশ্বে বাংলাদেশ এখন সপ্তম। রক্ত পানি করা প্রবাসীদের প্রেরিত রেমিটেন্সের বিশাল রিজার্ভকে ক্ষমতাসীনরা গালভরা বুলির মাধ্যমে তাদের অন্যতম অর্জন বলতে পিছপা নন । কিন্তু মালয়েশিয়া এবং থাইল্যান্ডে নির্যাতিত ও পাঁচারের শিকার শ্রমিকদেরকে দেশে এনে বিচারের মুখোমুখি দাড় করানোর কথা বলা হয়েছিল। জীবিকার অন্বেষণে হাজার হাজার বাংলাদেশি অনাহারে এবং অমানুষিক নির্যাতনে সমুদ্রবক্ষে বা গণকবরে ঠাই নিলেও তাতে সহানুভুতি না দেখিয়ে কিংবা সাহায্যের হাত না বাড়িয়ে উল্টো ক্ষমতাসীনদের এই অবস্থান গ্রহন সবাইকে বিস্মিত করেছে।

প্রথম থেকেই সরকার আশংকাজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়া মানব পাঁচারের বিষয়টি পাঁচারকৃত ব্যক্তি এবং এক শ্রেণীর পাঁচারকারীর ওপর চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল। দায় এড়াতে চাইলেও ক্রমেই থলের বিড়াল বের হয়ে আসতে থাকে। ‘বদি’দের কথা জাতি জানতে শুরু করে। গত ৪ জুলাই কক্সবাজারে মানবপাচারের দায়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত মানবপাচারকারী ও রামুর খুনিয়াপালং ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি ও জেলা সেচ্ছাসেবক লীগের সিনিয়র সহ সভাপতি আব্দুল্লাহ বিদ্যুৎকে আটক করে র‌্যাব। র‌্যাবের মতে, আব্দুল্লাহ বিভিন্ন সময় কক্সবাজার উপকূলকে ব্যবহার করে মানবপাচার করতো, বিভিন্ন থানায় তার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। প্রশ্ন হলো একদিকে রেমিটেন্স নিয়ে মাতামাতি আর অন্যদিকে নাগরিকদের অনিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়ে দাস ব্যবসা সম্প্রসারণের মাধ্যমে বাংলাদেশ কি কথিত মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে চায়? উল্লেখ্য, থাইল্যান্ডের চিংড়ি ও সি ফুড শিল্পে কর্মরত সাড়ে ছয় লাখ শ্রমিকের মধ্যে তিন লাখই ক্রীতদাস হিসেবে কাজ করছেন এবং এদের বেশির ভাগই বাংলাদেশি। সাগরপথে এনে খুব অল্প দামে এঁদের বিক্রি করা হয়েছে। সম্প্রতি জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরএর প্রধান মন্তব্য করেন, ‘দারিদ্রের কারণেই বাংলাদেশ থেকে মানব পাঁচার হচ্ছে’।

বছরের পর বছর ধরে নির্বিঘ্নে পাচার হলেও সরকার ছিলো নির্বিকার। এমনকি অতীতে এবং বর্তমান পাঁচারকৃত অথবা দূর্ভোগের শিকার শ্রমিকদের সম্মানে এবং নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। উল্টো আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থা (আইওম)’র ওপর নির্ভর করে সরকার দায় সেরেছে। এমনকি এসব নিঃস্ব মানুষের পরিবারের ভবিষ্যৎ কি হবে সে সম্পর্কেও সরকার উদাসীন। একটি প্রকৃত জনকলাণমুখী সরকার রাষ্ট্রের নাগরিকদের সম্মান এবং বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয় উপকরণের নিশ্চয়তা দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে চেতনার বুলি আওড়াতে ব্যস্ত ক্ষমতাসীনরা। একদিকে গুটিকয়েকের বিভিন্ন আর্থিক কেলেংকারি এবং লুন্ঠনের মাধ্যমে বিদেশে হাজার হাজার কোটি টাকা পাঁচার, আর অন্যদিকে বিদেশে সামান্য দু’মুঠো অন্নের জন্য হাজার হাজার শ্রমিক মাথার ঘাম পায়ে ফেলে আমাদের রেমিটেন্স এর পাল্লা ভারি করছে। বিদেশে অবস্থান করেও এসব নাগরিকরা নিশ্চিত নয় যে, তাদের আত্মীয় এবং পরিবারের সদস্যরা কোনো নিগ্রহ বা গুমখুনের শিকার হবেনা। বিমান বন্দরে নামার পর থেকেই যেভাবে বিভিন্ন ঘাটে ঘাটে নির্যাতনের শিকার হয় বিদেশে অবস্থানরত কর্মজীবিরা, তার কোনো প্রতিকার কি সরকার কখনো করেছে? যাদের জন্য দেশের অর্থনীতি চলমান বিদেশে অবস্থানরত কর্মজীবি বা দেশে অবস্থানরত তাদের পরিবারের সদস্যদের অভাব, অভিযোগ বা সমস্যা নিরুপনে সরকারের দূতাবাস সমূহ বা জনশক্তি কর্মসংস্থান ব্যুরো এমন কোনো পদক্ষেপ কি গ্রহণ করেছে যার মাধ্যমে দ্রুত এবং সহজে তা সমাধান করা সম্ভব? উত্তর অবশ্যই হবে, না। তাই একথা নির্ধ্বিধায় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে উদ্বৃত করে বলা যায়, শাসন করা তারই সাজে সোহাগ করে যে গো