Home » রাজনীতি » রাজনীতির নোংরা খেলা :: জোর করে দলবদল

রাজনীতির নোংরা খেলা :: জোর করে দলবদল

আমীর খসরু

Dis 1বর্তমান সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকেই বিরোধী দল, মত, পক্ষ নিশ্চিহ্ন করার যাবতীয় উদ্যোগ নেয়। এবারে এই উদ্যোগে প্রথম থেকেই ক্ষমতাসীনরা যে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন এবং হিসাবনিকাশ করেছে, তা স্পষ্ট। আর অতীতের ঘটনার পুনরাবৃত্তি একই ধারায় ও পদ্ধতিতে পুনর্বার সম্পন্ন করার অনেক বিপদ আছে এই বিষয়টি তাদের মাথায় রয়েছে। ক্ষমতাসীনরা সে জন্যই অতীতের হঠাৎ করে নেয়া সিদ্ধান্ত যা বাকশাল গঠনের ক্ষেত্রে করা হয়েছিল, সে পথে বা পদ্ধতিতে তারা সরাসরি যায়নি। এবারে সম্পূর্ন ভিন্ন পথ ও পদ্ধতি অর্থাৎ পুরো কর্মপরিকল্পনাই ভিন্নভাবে গ্রহণ করা হয়েছে এবং কিছুটা সময় দেয়া হয়েছে তা সম্পন্ন করার জন্য। বাকশাল গঠনের ক্ষেত্রে যে তাড়াহুড়ো ছিল এক্ষেত্রে তা করা হয়নি, আগেরবারের বিপদআপদ চিন্তা করে। সরকার ক্ষমতায় আসার পরে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখলসহ প্রথম দফার কাজটি সম্পন্ন করা হয় দলীয় লোকজনের মাধ্যমে। এর বিরোধিতা করে যে সব সংবাদ মাধ্যম তখন সোচ্চার হয়েছিল তাদের তীব্র ভাষায় আক্রমণ করা হয় এবং ওই আগাম আক্রমণের কারণটি ছিল ভবিষ্যতে যাতে সংবাদ মাধ্যমগুলো ভীতিহীনভাবে কাজ করতে না পারে। টকশোকে এই আওয়ামী লীগেরই অনেক নেতা সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে বিকল্প পার্লামেন্ট বলে অভিমত দিয়েছিলেন। কিন্তু তারা যখনই ক্ষমতায় এলেন তার পর থেকেই এই টকশোতে যারা অংশ নিতেন তাদের প্রতি চরম নির্দয় ও ব্যঙ্গাত্বক ভাষা ব্যবহার করে সমালোচনা করা হলো। এর মধ্যে শুধু সাংবাদিকই নন, সমাজের বিশিষ্টজনদেরও রেহাই দেয়া হলো না। এরও কারণ হচ্ছে, ভবিষ্যতে এদের সমালোচনাটি বন্ধ করা। ক্রমাগতভাবে সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা হরণ করা হলো যার শুরু কয়েকটি সংবাদপত্র ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া বন্ধ করার মধ্যদিয়েই। শুধু সংবাদ মাধ্যমই নয় সমাজের অপরাপর অংশের অগ্রগামী মানুষেরা যখন নানা অন্যায়, অন্যায্য ও জুলুমমূলক কর্মকান্ডের প্রতিবাদ জানান, তাদেরও রেহাই দেয়া হয়নি। আড়িয়াল বিল ঘটনায় স্থানীয় কৃষকসহ জনগণ যখন তাদের নিজ জমি রক্ষার আন্দোলনে সোচ্চার এবং রাষ্ট্রীয় মামলামোকদ্দমা, গ্রেফতার এবং হয়রানির প্রতিবাদে লিপ্ত তখন বিশিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি তাদের আন্দোলনকে সমর্থন করেছিলেন। আর তখনই বরেণ্য শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীসহ অনেকের নামে মামলা পর্যন্ত হয়েছিল। তেলগ্যাস এবং জাতীয় সম্পদ রক্ষার আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী অধ্যাপক আনু মুহাম্মদকে পুলিশ লাঠিপেটা করে তার পা ভেঙ্গে দিয়েছিল। গ্যাসবিদ্যুৎ, পানির দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদ করায় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ থেকে শুরু করে স্থানীয় পর্যায়ের সাধারণ জনগণের উপর বেশ কয়েকস্থানে হামলা হয়েছে। তখনই বলা হয়েছিল, যারা এসব আন্দোলন করবে তাদের বিরুদ্ধে মামলাসহ উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়া হবে। যৌন নির্যাতনের শিকার এবং তাদের আত্মীয় ও স্বজনদের অনেককেই জীবন দিতে হয়েছে। কিন্তু কোনো প্রতিকার সেদিনও যেমন করা হয়নি, বর্তমানেও করা হচ্ছে না। ছাত্রলীগযুবলীগের চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, সন্ত্রাস সর্বোচ্চ পর্যায়ে গেলেও কোনো প্রতিকার না করায় পুরো বিষয়টি এখন ‘বৈধ’ হয়ে গেছে।

ক্ষমতাসীনরা সামগ্রিকভাবে একটি ভয়ের সংস্কৃতি সৃষ্টি করতে চেয়েছে এ কারণে ও চিন্তায় যে, এ পথেই তারা তাদের বিরুদ্ধ মত, পথ ও পক্ষকে নিশ্চিহ্ন করতে পারবে। আর এর সাথে যুক্ত করা হয়েছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সীমাহীন দলীয়করণ। এই দু’য়ে মিলে ভয়ের সংস্কৃতিকে সর্বোচ্চ সীমায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সরকারের অংশীদার কয়েকটি দল ছাড়া অন্য কাউকেই একদিকে প্রথম থেকেই সভাসমাবেশসহ সার্বিকভাবে মত প্রকাশ করতে দেয়া হয়নি, অন্যদিকে মামলামোকদ্দমা দিয়ে তাদের জন্য পরিস্থিতি জটিল এবং কঠিন করে তোলা হয়েছে। ক্রমাগত এই পরিস্থিতি চলতে থাকায় কার্যত দেশ এখন প্রকৃত বিরোধী দলবিহীন অবস্থায় পৌছেছে। বিরোধী দল, মত, পথ ও পক্ষকে বিদায় জানানোর প্রচেষ্টাটি শুরু হয়েছিল প্রথম থেকেই। এরই ধারাবাহিকতায় সামগ্রিক দলীয়করণ চলতে থাকে। অন্যদিকে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মধ্যদিয়ে এটি চূড়ান্ত রূপ পায়। এরই ধারাবাহিকতায় আসে একদলীয় নির্বাচন।

২০১৪এর ৫ জানুয়ারি নির্বাচনটি ছিল প্রকৃত বিরোধী দলসমূহকে বিদায় জানানোর মধ্যদিয়ে গণতন্ত্রকেও চূড়ান্ত পর্যায়ে বিপন্ন করার একটি মাইলফলক। ওই নির্বাচনটি গণতন্ত্রকে বিপন্ন, বিপর্যস্ত, ভঙ্গুর করার স্মারক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে অনন্তকাল। কারণ এর পর থেকে বিরোধী দল, মত, পক্ষকে নিশ্চিহ্নকরণ প্রচেষ্টাটি কয়েকগুণ উৎসাহে শুরু হয়।

নানা মত, পন্থা গ্রহণের মধ্যে প্রধান বিরোধী দলটিকে ভাঙ্গনের উদ্যোগ নেয়া হয় কয়েক দফায় নানাভাবে। একদলীয় নির্বাচনের আগে একদিকে পদপদবীর লোভ দেখিয়ে, অন্যদিকে মামলাগ্রেফতারের হুমকিধামকি দিয়ে এই চেষ্টাগুলো করা হয়। এমন কি কয়েক মাস আগেও আওয়ামী লীগ নেতা হাসান মাহমুদসহ বেশ কয়েকজন বলেছিলেন, রাতের বেলা অনেক বিএনপি নেতা তাদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলছেন। তিনি এমনও ইঙ্গিত দেন যে, এই নেতারা অচিরেই সরকারের সাথে হাত মেলাবে। এখানে বলে নেয়া ভালো, গুম, খুন, অপহরণের প্রচেষ্টাটি এক সময় ব্যাপকভাবে ঘটছিল রাজনৈতিক ভীতি সৃষ্টির উদ্দেশ্যে। এসব ঘটনাবলীর মধ্যদিয়ে বিরোধী দল দমন এবং শূন্য করার চেষ্টাটি যে কতো প্রবল এবং বিশাল তা প্রমাণিত হয়। বিভিন্ন সময় হাজার হাজার বিরোধী নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে, গ্রেফতার করে তাদের উপরে চাপ সৃষ্টির যে কৌশল ক্ষমতাসীনরা গ্রহণ করেছে, তা এখনো বহাল রয়েছে। ২০১৫’র প্রথম কয়েক মাসের সহিংস আন্দোলন চলাকালে এই মামলা প্রবণতা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এখন সে মামলাগুলো রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, বিরোধী দল ছেড়ে ক্ষমতাসীনদের সাথে যোগ দেয়ার জন্য। এর মধ্যদিয়ে তিনটি বিষয় স্পষ্ট। এক, এতে এই প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে যে, তাহলে যাদের বিরুদ্ধে মামলা দেয়া হয়েছে তাদেরকে রাজনৈতিক হয়রানির উদ্দেশ্যেই তা করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে তারা কি ওই ঘটনার সাথে যুক্ত নন? দুই, মামলাগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দেয়া হলে অবশ্যই প্রশাসনকে যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করা হয়েছে এবং প্রশাসনের কেউ কেউ যতোই না বলুক না কেন, তারা ক্ষমতাসীনদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে আগেই, তা এ ঘটনার মধ্যদিয়ে প্রমাণিত হয়। তিন, দল বদল থেকেও কি বাণিজ্য হচ্ছে?

এদিকে, জাতীয় সংসদে ভবিষ্যতের একটি পরিকল্পনার কথা প্রধানমন্ত্রী জানিয়ে দেয়ার পর থেকেই দলবদলের প্রক্রিয়াটি দ্রুততর হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আন্দোলন চলাকালে নাশকতার অভিযোগে যে সব মামলা হয়েছে তা দ্রুত বিচারে সন্ত্রাস দমন আইনে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হবে। এই বক্তব্যের পরে পুরো দৃশ্যপট পাল্টে যাচ্ছে। একটি বিষয় স্পষ্ট যে, এই বক্তব্য দলবদলকে সহজতর করেছে।

গণতন্ত্রের লেশমাত্র আছে এমন সমাজে জোর করে দলবদলের প্রবণতাটিকে অতি অবশ্যই চরম নেতিবাচক একটি বিষয় হিসেবেই গণ্য করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশের পরিস্থিতি যেহেতু তা নয়, সে কারণে এ কথা ক্ষমতাসীনদের জন্য প্রযোজ্য নয়। তবে জোর করে দলবদলে ওই সব দলগুলোর চাইতে বেশী সংকটে পড়বে বরং আওয়ামী লীগ। কারণ এটা মনে রাখতে হবে বিএনপি, জামায়াতের যারা দলবদল করছেন তারা আদর্শের কারণে নয়, নিজেদের বাচাতে এই পথ বেছে নিয়েছেন। এতে এই ‘নব্য আওয়ামী লীগাররা’ নানা সুযোগসুবিধা নেয়ার চেষ্টা করবে এবং নানা অপকর্মে লিপ্ত হবে। এতে দলে পুরনো ও নতুনের দ্বন্দ্বসংঘাত দেখা দেবে এবং দলটি অভ্যন্তরীণভাবে ক্ষতবিক্ষত হবে। সরকার বদল হলে এই এরাই আবার দলবদল করবে। কিন্তু তখন তিনি বা তারা একা থাকবেন না। আওয়ামী লীগের সুযোগসন্ধানীদেরও দলবদলে সহযোগিতা এরা করবে।

রাজনীতির এই নোংরা খেলায় তখনই মেতে ওঠা সম্ভব যখন রাষ্ট্রে ও সমাজে গণতন্ত্র পরিপূর্ণভাবে অনুপস্থিত থাকে। এর পরিণতি অতীতে কখনো ভালো হয়নি।