Home » রাজনীতি » স্বৈরাচারের জপ :: গণতন্ত্র বনাম উন্নয়ন

স্বৈরাচারের জপ :: গণতন্ত্র বনাম উন্নয়ন

আনু মুহাম্মদ

Last 3বাংলাদেশের মতো তথাকথিত ‘তৃতীয় বিশ্বের’ দেশগুলোতে গণতন্ত্র নিয়ে বহুরকম সংজ্ঞা আমাদের শুনবার অভিজ্ঞতা হয়েছে। ঔপনিবেশিক আমলে আমরা শুনেছি এখানকার মানুষ গণতন্ত্রের জন্য প্রস্তুত নয়, সেজন্য তাদের নিজ রাষ্ট্রেও যে গণতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থা আছে তা এখানে প্রবর্তন করা সম্ভব নয়। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরও বিভিন্ন সরকারের সময়ে ‘মানুষ গণতন্ত্রের জন্য প্রস্তুত নয়’ এরকম কথা বহুবার শুনতে হয়েছে।

অবশেষে জেনারেল আইয়ুব খানের দীর্ঘ সামরিক শাসন আমলে, যখন হার্ভার্ড এর বিশেষজ্ঞদের দিয়ে দেশের উন্নয়ন পথ ঠিক করা হচ্ছিলো, তখন ‘এই উন্নয়নের স্বার্থে’ এদেশের মানুষের জন্য উপযোগী গণতন্ত্র বানিয়ে উপহার দেয়া হয়। নাম তার বেসিক ডেমোক্রেসি (বিডি) বা বুনিয়াদী গণতন্ত্র। এর অর্থ হলো দেশের নাগরিকেরা সরাসরি ভোটাধিকার পাবে না, তাকে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ও চেয়ারম্যান নির্বাচনের অধিকার দেয়া হবে। সেই বিডি মেম্বরদের ভোটে নির্বাচিত হবে রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। এর পাশাপাশি গ্রামে উন্নয়ন কর্মসূচির নামে, তদারকি বা হিসাব নিকাশের শৈথিল্য রেখে, বিডি মেম্বরদের জন্য যথাসম্ভব অর্থবরাদ্দ দেয়া হলো এমনভাবে যাকে ঘুষ ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। বলা হলো, ‘উন্নয়নের জন্যই এরকম গণতন্ত্র দরকার। সার্বজনীন ভোটাধিকারসহ গণতান্ত্রিক অধিকার উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করবে। এগুলো পশ্চিমা মডেল, আমাদের জন্য প্রযোজ্য নয়।’

আইয়ুব খানের নেতৃত্বে জেনারেল ও বাইশ পরিবারের এই খেলা জনগণ গ্রহণ করেনি, কয়েক বছরের মধ্যেই গ্রামাঞ্চলে বিডি মেম্বর আর কেন্দ্রে আইয়ুব খান প্রবল গণঅভ্যুত্থানের তোড়ে ভেসে যায়। মহা আড়ম্বরে পাকিস্তান জুড়ে ‘উন্নয়নের এক দশক’ পালনের কিছুদিনের মধ্যেই আইয়ুব খানকে পদত্যাগ করতে হয়। আবার সামরিক শাসন। জনমতের চাপে সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নির্বাচন হয়, কিন্তু শাসকেরাই যে গণতন্ত্রের জন্য প্রস্তুত নয় তা আবারও প্রমাণিত হয়। ভয়ংকর গণহত্যা দিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনী গণতন্ত্র ঠেকাতে চেষ্টা করে। পরিণতিতে স্বাধীনতার সশস্ত্র যুদ্ধ এবং গণতন্ত্রের অঙ্গীকার নিয়ে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা।

স্বাধীনতার পর দেশকে পাকিস্তানের স্বৈরশাসনের ধারা থেকে বের করবার সুবর্ণ সম্ভাবনাকে পদদলিত করে স্বৈরাচারী শাসনই চলতে থাকে। জরুরী অবস্থা জারি ও একদলীয় শাসন প্রবর্তনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে গণতন্ত্রের অবসান ঘটে। এর পর পনেরো বছরের সামরিক শাসনের সময় কখনও নিয়ন্ত্রিত, কখনো ঘরোয়া গণতন্ত্রের খেলা দেখেছি আমরা। দেড় দশকের সামরিক শাসনের পর যে নির্বাচিত সরকারের কাল চলছে তাতে তফাৎ হয়েছে সামান্যই। স্বৈরাচারী সামরিক শাসক এরশাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে নির্বাচত সরকারগুলো নিজেদের পকেটের প্রতিষ্ঠান সাজিয়েছে আর ক্ষমতার কেন্দ্রীভবনের ধারা অব্যাহত রেখেছে।

ক্ষমতা চিরস্থায়ী করবার আকাঙ্খায় এরশাদের পর একবার খালেদা ও একবার হাসিনার আমলে ভোটারবিহীন নির্বাচন হয়েছে। নির্বাচনকে পুরোপুরি প্রহসন বানিয়ে এখন যে পরিবারতান্ত্রিক শাসন চলছে তাকে বৈধতা দেবার জন্য আবার তোলা হয়েছে সেই পুরনো সুর: ‘উন্নয়নের জন্য গণতন্ত্র ছাড় দিতে হবে’। কিংবা ‘বাংলাদেশ এখনও গণতন্ত্রের জন্য প্রস্তুত নয়’।

বাংলাদেশে গত ৪৩ বছরে জিডিপি বেড়েছে বহুগুণ, বিপুল বিত্তশালী তৈরি হয়েছে, ভবনসহ সড়ক গাড়ি বাড়ি বেড়েছে অনেক। কিন্তু মানুষের ন্যুনতম অধিকার, গণতন্ত্র এখনও দুরস্ত! গণতন্ত্র মানে যেমন শুধু ভোট দেবার অধিকার বোঝায় না, উন্নয়ন বলতেও তেমনি শুধু জিডিপির প্রবৃদ্ধি বোঝায় না। কিন্তু গণতন্ত্রের ন্যুনতম শর্ত সার্বজনীন ভোটাধিকারই এখন এতোবছর পর আক্রমণের সম্মুখিন। নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করবার জন্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা তা কখনোই শক্ত ভিত পায়নি। ফলে শাসক পরিবার বা গোষ্ঠীর স্বেচ্ছাচারিতাই এই দেশ পরিচালনার মূল ধরন হিসেবে থেকেছে। সংসদ আছে, নির্বাচন আছে, আইন ও বিচার বিভাগ আছে, দুর্নীতি দমন কমিশন আছে, তথ্য অধিকার কমিশন আছে সবই খেলা খেলা।

বস্তুত ক্ষমতা চিরস্থায়ী করবার বাসনা তৈরি হয় লুন্ঠন, দুর্নীতি আর সর্বজনের সম্পদ দখলকে চিরস্থায়ী করবার জন্য। আর ক্ষমতা চিরস্থায়ী করতে গেলে কোন সংজ্ঞাতেই গণতন্ত্র রাখা চলে না। এমনকি দলের ভেতরও নয়। বর্তমানে ‘উন্নয়ন বনাম গণতন্ত্র’ যে আওয়াজ তোলা হয়েছে তার সারকথা হলো এই যে, কিছু দেশি বিদেশি গোষ্ঠীর হাতে বাংলাদেশকে তুলে দিতে গেলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও চর্চা বন্দী করতেই হবে। কেননা জবাবদিহিতা আর স্বচ্ছতা রাখলে কতিপয়ের দস্যুবৃত্তি অব্যাহত রাখা যায় না। এখনকার মূল সুর: দেশের চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে ব্যক্তি/গোষ্ঠী বড়।