Home » প্রচ্ছদ কথা » ক্ষমতাসীনদের নির্বাচনভীতির কারণ

ক্ষমতাসীনদের নির্বাচনভীতির কারণ

আমীর খসরু

Coverক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে এমন একটা ধারণা বদ্ধমূল হয়ে গেছে যে, দেশে এখন আর কোনোই কার্যকর বিরোধী দল নেই, তাদের দমন প্রক্রিয়ায় ক্ষমতাসীনরা ‘বিজয়ী’ হয়েছে এবং এ থেকে তারা লাভবান হয়েছে। আর এ কারণে তাদের ধারণা হচ্ছে, সত্যিকার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিরাজমান রয়েছে, আর এই স্থিতিশীলতাও দীর্ঘমেয়াদী। এমন পরিস্থিতি বিনিয়োগ সহায়ক এবং এর মধ্যদিয়ে দেশের উন্নয়ন হতে থাকবে দ্রুতগতিতে এমনটাও তাদের ধারণা। আয়ের সংখ্যাতাত্ত্বিক মারপ্যাচে নিম্ন মধ্য আয়ের দেশ হিসেবে বিশ্বব্যাংকের তালিকায় নাম ওঠার কৃতিত্ব তারা দাবি করছে। অবশ্য পরীক্ষার ফলাফল থেকে ক্রিকেট খেলাসহ সব কিছুকেই এই সরকার তাদের মহান কৃতিত্ব বলে হাজির করতে কোনোই কুণ্ঠবোধ করে না। বরং সবকিছুকেই তারা তাদের কৃতিত্ব বলে হাজির করতে চায়।

যদিও বিনিয়োগ আর অর্থনৈতিক পরিবেশপরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান প্রতিনিয়ত নাজুক হয়ে পড়ছে এবং একটা নেতিবাচক ধারণারও তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে, ক্ষমতাকে দীর্ঘমেয়াদী করার জন্য সরকার গণতন্ত্র নয় উন্নয়ন প্রয়োজন বলে যতো তত্ত্ব দিক না কেন, তাতে কোনো কাজ হচ্ছে না। এই তত্ত্ব নিয়ে সন্তুষ্ট নয় দেশীবিদেশী বিনিয়োগকারীরা। এর আগে জাতিসংঘের আঙ্কটাড, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ইনডেস্ক ‘বিপিআই’ তালিকা মোতাবেক বাংলাদেশে বিনিয়োগ পরিস্থিতির অবনতির কথাই বলা হয়েছে। অতিসম্প্রতি যুক্তরাজ্যের পক্ষ থেকে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ক্ষেত্রে দুর্নীতির কথাটি বেশ স্পষ্টভাবে জানান দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের ব্যবসায়ী শিল্পপতিদের প্রভাবশালী সংগঠন মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স এ্যন্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই)-এর এক প্রতিবেদনে বিনিয়োগ পরিস্থিতির দুর্দশার কথাই তুলে ধরা হয়েছে। এমসিসিআই বলেছে, ‘দেশীবিদেশী বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগে আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারছেন না। আর বিদেশীরা বিনিয়োগে ধীরে চলো নীতি গ্রহণ করেছে। এই অবস্থা চলছে ২০১৩ সাল থেকে’। এমসিসিআই বিনিয়োগের এই দুর্দশার জন্য অবকাঠামোর অনুন্নয়ন, গ্যাসবিদ্যুতের সঙ্কটসহ বেশ কিছু কারণ উল্লেখ করেছে। তবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অনুপস্থিতিকেই বেশী মাত্রায় দায়ী করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও একইভাবে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও স্থিতিশীলতাকে দায়ী করেছে বিনিয়োগ পরিস্থিতির জন্য।

সরকার এই অবস্থায় তাদের উন্নয়নের যতো স্লোগানই উচ্চারণ করুক না কেন, গণতন্ত্রহীন পরিবেশে যে উন্নয়ন সম্ভব হয় না, আগেও তা স্পষ্ট ছিল এবং এখনো স্পষ্ট। গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের অনুপস্থিতি, ন্যায্যতার প্রশ্নটি ক্ষমতাসীনরা কখনোই ভুলেও উচ্চারণ করে না। কারণ করা সম্ভবও নয়। বরং সর্বগ্রাসী ক্ষমতার আকাঙ্খায় বিরোধী পক্ষ দমনের লক্ষ্যে বিরোধী নেতাকর্মীদের সমূলে বিনাশের জন্য তাদের মামলাগুলোর বিচারে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের কথা বলা হয়েছে এবং কার্যক্রমও চলছে। এর পেছনে অন্য আরেকটি কারণ ক্রিয়াশীল রয়েছে এবং তা হচ্ছে, ওই নেতাকর্মীরা আগামীতে কোনো নির্বাচনেই যাতে অংশ নিতে না পারে।

এ সপ্তাহেই বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া নির্বাচন প্রশ্নে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আগের দাবি থেকে কিছুটা সরে এসেছেন বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। এটি বিএনপি’র পক্ষ থেকে দেয়া নতুন প্রস্তাব, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। অবশ্য সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সময়ও বিএনপি ওই নির্বাচনটিতে অংশগ্রহণ করে ‘নির্বাচনী প্রক্রিয়া’ শুরুর ঘোষণা দিয়েছিল। সরকারও এতে সায় দিয়েছিল। দেশীবিদেশী সব পক্ষই তখন চেয়েছিল, ওই নির্বাচনটি অবাধ ও নিরপেক্ষ হোক। তখন জাতিসংঘসহ পশ্চিমী দেশগুলোর পক্ষ থেকে বক্তব্য ও বিবৃতি দিয়ে এমন মনোভাব প্রকাশ করা হয়েছিল। দেশীবিদেশী সবাই চাইছিল, এর মধ্যদিয়ে হারিয়ে যাওয়া গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের শুভ সূচনা হতে পারে। কিন্তু ক্ষমতাসীনরা ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের মতোই ওই নির্বাচনটিও পুরো মাত্রায় দখল করলো। অবশ্য এই দফায় বলতে গেলে বিনা বাধায়। কারণ বাধা দেয়ার পরিণতি কি হতে পারে তার অভিজ্ঞতা সব বিরোধী দল এবং আমজনতার রয়েছে।

এতোদিন পরে এসে খালেদা জিয়া যে নতুন প্রস্তাব দিয়েছেন তা মাটিতে পড়ার আগেই নাকচ করে দিয়েছে ক্ষমতাসীন পক্ষ। গত ৩১ জুলাই আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ২০১৯ সালের আগে কোনো নির্বাচন নয় এবং আগামী নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের অধীনেই। ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে অন্য কেউ এই ধরনের মন্তব্য করলে তা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা না করলেও কোনো অসুবিধা ছিল না। কিন্তু সৈয়দ আশরাফ যখন এমন মন্তব্য করেছেন, তখন ধরে নিতেই হবে এটি ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে এক প্রকার আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া খালেদা জিয়ার বক্তব্যের জবাবে।

তবে অনেক দেশীবিদেশীর পক্ষ থেকে এমন একটা ধারণা তৈরি হয়েছে যে, ২০১৬ সালের প্রথমদিকে নতুন একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ২০১৪’র ৫ জানুয়ারি নির্বাচন নিয়ে পশ্চিমী দুনিয়া এখনো তাদের আগের অবস্থানেই অনঢ়। অর্থাৎ তারা ওই নির্বাচনটিকে বৈধতা দেয়নি। এমন কি ভারত যারা অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক এবং সর্বোপরি ভূরাজনৈতিক কৌশলগত দিক দিয়ে বাংলাদেশের কাছ থেকে সীমাহীন উপকৃত, তারাও চায় সবার অংশগ্রহণে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক এবং বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসুক। কিন্তু সরকারের সাম্প্রতিক মনোভাব এবং সৈয়দ আশরাফের বক্তব্য এর ঠিক সম্পূর্ণ বিপরীতে। অবশ্য ক্ষমতাসীন পক্ষ জঙ্গীবাদ দমনের নামে ক্ষমতায় থাকতে চাচ্ছে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার জঙ্গীবাদ দমন করতে পারবে এমনটায় বিশ্বাস রাখতে পারছে না পশ্চিমী দুনিয়ার কেউই, এমনকি ভারতও নয়। আর চীনের সাথে সম্পর্ক তো সবারই জানা।

কিন্তু বৈধতার সঙ্কট মোকাবেলার জন্য আওয়ামী লীগ যতোই নির্বাচনের কথা ভাবতে চায়, বাস্তবতার নিরীখে তা সম্ভব হয়না। কারন মনের গহীন ভেতরে দু’টি ভয় তাদের রয়েছে। আর তা হচ্ছে ২০০৯ থেকে এই পর্যন্ত শাসনকালীন কর্মকান্ড, জনপ্রিয়তার মাপকাঠিতে তাদের অবস্থান এবং ভবিষ্যত কি হবে? এটাই ক্ষমতাসীনদের নির্বাচনভীতির প্রধান এবং একমাত্র কারণ।।