Home » রাজনীতি » যুদ্ধাপরাধ বিচার প্রশ্নে বিএনপি’র অস্পটতা-দোদুল্যমানতা

যুদ্ধাপরাধ বিচার প্রশ্নে বিএনপি’র অস্পটতা-দোদুল্যমানতা

শাহাদত হোসেন বাচ্চু

Dis 1স্পেনের লেখক, দার্শনিক জর্জ সান্তোয়ানা বলেছিলেন, ‘যারা ইতিহাস ভুলে যায়, ইতিহাসের যন্ত্রনা তারা এড়াতে পারে না। কিন্তু ইতিহাস যারা মনে রাখে তাদের যন্ত্রনা আরো তীব্র। আর এ কারনে ইতিহাস সচেতনঅচেতন সব মানুষকেই অশেষ যন্ত্রনায় ইতিহাসের কাছে পুরুষানুক্রমে ঋণ পরিশোধ করতে হয়’।

এক.

বাংলাদেশের মানুষ গত সাড়ে চার দশক ধরে সেই ঋন বোধ করি পরিশোধ করে আসছে, প্রতিদিনপ্রতিমুহূর্তে। স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের বিরোধীতাকারীরা দেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে দোর্দন্ড প্রতাপে রাজত্ব অব্যাহত রাখতে পেরেছিল কারনআন্তর্জাতিক মানবতা বিরোধী আইনে ১৯৭৩ সালে তাদের বিচারের মুখোমুখি করা হয়নি। গনহত্যা করে তারা পার পেয়ে গিয়েছিল। রাজনীতি করার সুযোগ পেয়েছিল। জাতীয় সংসদে নির্বাচিত হয়েছিল। রাষ্ট্রীয় শীর্ষ পদে অধিষ্ঠিত হয়েছিল। বাসভবন ও গাড়িতে জাতীয় পতাকা উড্ডীন হয়েছিল। সব আমলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার দৃশ্যমান অথবা অদৃশ্যমান সুবিধাভোগী হয়েছে। প্রতিটি সামরিক সরকারের প্রকাশ্যনেপথ্য অংশীদার হিসেবেও তারা ছিল সবচেয়ে বড় বেনিফিশিয়ারি। সর্বোপরি, একটি দেশের মুক্তিসংগ্রামের বিপরীতে দাঁড়িয়ে গনহত্যা, লুন্ঠন, ধর্ষনের দায়ে অভিযুক্তরা চার দশক ধরে বিচার এড়িয়ে থাকতে সক্ষম হয়েছিল। ইতিহাসে এরকম নজির আছে বলে জানা নেই।

সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী (সাকাচৌ) সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে তার কৃত অপরাধের দায়ে অবশেষে ফাঁসিতে ঝুলতে যাচ্ছে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর রিভিউ পিটিশনে আদালত অথবা রাষ্ট্রপতির সাধারন ক্ষমায় এই দন্ড রদ না হয়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সে বেসামরিক নাগরিকদের ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও জাতিগত কারনে হত্যা করেছে, সরকারী ও ব্যক্তিগত সম্পত্তি লুট করেছে, অগ্নিসংযোগ করেছে, নাগরিকদের অপহরণ করে বাড়িতে টর্চার সেল খুলে নির্যাতন করেছে। সুতরাং সে যুদ্ধাপরাধী। সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে সাড়ে চার দশক ধরে কথিত অভিযোগ এখন প্রমানিত সত্য।

উপযুক্ত পিতার উপযুক্ত সন্তানই বটে সাকা! ১৯৪৮ সালে পাকিস্তান জন্মের পরেই তার পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরীর (ফকাচৌ) গুদাম থেকে রেলওয়ের ১১৫ মন চোরাই তামার তার উদ্ধার করা হয়েছিল এবং ১শ টাকা জরিমানা অনাদায়ে দুই সপ্তাহের বিনাশ্রম কারাদন্ড দেয়া হয়েছিল। রাজনৈতিক পরিচয়ে প্রভাব বিস্তার করে হাইকোর্ট থেকে দন্ড মওকুফ করানোর চেষ্টা করলে বিচারপতি সাজা বাড়িয়ে অর্থদন্ডের পরিবর্তে তিনমাস বিনাশ্রম কারাদন্ড দেন (সূত্র: ডিএলআর ১৯৫০, ফজলুল কাদের চৌধুরী বনাম ক্রাউন)। ফকাচৌ ষাট দশকে আইয়ুবী সামরিক শাসনের প্রত্যক্ষ বেনিফিশিয়ারি হিসেবে মন্ত্রী ও ন্যাশনাল এ্যাসেম্বলির স্পিকার নির্বাচিত হয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের শীর্ষ বিরোধিতাকারী ফকাচৌ ও তদীয় পুত্র সাকাচৌ একাত্তরের ১৮ ডিসেম্বর বাড়ি থেকে পালানোর সময় দেড় মন সোনা ও ৭ লাখ টাকাসহ মুক্তিবাহিনীর হাতে ধরা পড়ে (সূত্র: দৈনিক বাংলা ৮ জানুয়ারি ১৯৭২)

ধারাবাহিকতাটি দেখার মত! তার পিতাও সামরিক জান্তার শাসনকালে মন্ত্রী, স্পিকার এমনকি ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতিও হয়েছিলেন। সাকাচৌর শীর্ষ ক্ষমতার অংশীদার বনে যাওয়া কমবেশি পিতার মতই। একজন ভ্রষ্ট সামরিক শাসক এরশাদের মন্ত্রী হিসেবে সে ক্ষমতার শীর্ষে আরোহন করেন। এ সময়ে আরেকজন ব্যবসায়ীর (শেয়ার বাজার লুন্ঠনের হোতাদের একজন) সাথে নানা বৈধঅবৈধ ব্যবসায়ে সাকা অপরিমেয় অর্থসম্পদের মালিক বনে যান। ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’ সম্পর্ক স্বাধীনতার উষালগ্নে এই দেশে তাদের রাজনৈতিকঅর্থনৈতিকভাবে পুনর্বাসিত করেছিল। এ বিষয়ে ৯ জুলাই ১৯৯৮ তারিখে জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রাণিধানযোগ্য। তিনি বলেছিলেন, ‘এখন তিনি টাকার গরম দেখান, ‘৭১ সালে এই টাকা কোথা থেকে এসেছে? সংখ্যালঘুদের সম্পদ লুট করে, সামরিক জান্তার পা চেটে এই টাকা এসেছে। জীবন ভিক্ষার জন্য বাপবেটাদের চোখের পানিতে ৩২ নম্বর বাড়ির সিঁড়ি ভিজেছে। তাদের মুখে বড় কথা শোভা পায় না’।

নষ্ট রাজনীতির সুযোগ নিয়েই সাকার রাজনৈতিক পুনর্বাসন ঘটে। শুধু কি তাই, এমপি, মন্ত্রী, সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা থেকে শুরু করে চার দশকে সে হয়ে ওঠে অসীম ক্ষমতাধর। এক সময় সে তার দলনেত্রী খালেদা জিয়াকে কুকুরের সাথে তুলনা করে মন্তব্য করেছে। শেখ হাসিনাকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ কথাবার্তা বলেছে, সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের অঙ্গ কেটে দেবার কথা বলেছেযা একমাত্র বিকারগ্রস্ত কোন মানুষের পক্ষে বলা সম্ভব। তারপরেও এই ব্যক্তিকে ২০০৩ সালে বিএনপি ইসলামিক সম্মেলন সংস্থার (ওআইসি) মহাসচিব হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছিল। এই জাতির মুক্তিযুদ্ধের পূণ্যের ফল হিসেক্ষে সাকা নির্বাচিত হতে পারেনি। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা ও পরবর্তীকালে স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে বিএনপির রাজনীতিতে প্রভাব বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছিল।

দুই.

গত ২৯ জুলাই ২০১৫ বুধবার সুপ্রিম কোর্ট সাকার ফাঁসির দন্ডাদেশ বহাল রাখে, ঐ দিনই বাংলা ভিশন টিভি রাত সাড়ে দশটার খবরে একটি প্রতিবেদন প্রচার করে। মুক্তিযোদ্ধাদের সাক্ষাতকারভিত্তিক ঐ প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, মুক্তিযুদ্ধকালে তৎকালীন সেক্টর কমান্ডার ও জেড ফোর্সের অধিনায়ক জিয়াউর রহমান সাকাকে হত্যার জন্য একটি স্কোয়াড গঠন করেছিলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমনে সাকা আহত হলেও প্রাণে রক্ষা পেয়েছিল। প্রসঙ্গত: বেসরকারি টিভি চ্যানেল হিসেবে সম্পাদকীয় পলিসিতে বাংলা ভিশন কোন রাজনৈতিক দলের সমর্থক তা কমবেশি অনেকেরই জানা রয়েছে।

পয়তাল্লিশ বছর পরে জিয়াউর রহমান সৃষ্ট রাজনৈতিক দল ও তাঁর আদর্শের দাবিদার বিএনপি সাকাচৌয়ের রায়ের প্রতিক্রিয়া জানাতে ২৯ জুলাই একটি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেছিল। মনে রাখতে হবে, মধ্যপন্থার রাজনীতি করার দাবিদার দলটি এই প্রথম কোন যুদ্ধাপরাধীর বিচারে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাল। এর আগে তাদের জোটসঙ্গী জামায়াতের একাধিক নেতার ফাঁসির দন্ডাদেশ বা বাস্তবায়নে দৃশ্যত: তারা কোন প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। যদিও নেতৃবৃন্দ মনে করেন, এই বিচার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত এবং আন্তর্জাতিক মানদন্ড রক্ষিত হচ্ছে না। বিচার শুরু হবার পরে খালেদা জিয়া সিলেটে এক জনসভায় গ্রেফতারকৃত যুদ্ধাপরধীদের ‘রাজবন্দী’ আখ্যায়িত করে মুক্তি দাবি করেছিলেন। এই প্রসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দাবিদার ‘মধ্যপন্থা’র এই দলটির এরকম অস্বচ্ছ ও অস্পষ্ট বক্তব্য এবং সরকারী মহলের প্রচার জনমনে এই পারসেপশন তৈরী করেছে যে, বিএনপি যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষাবলম্বন করেছে। অথচ বিএনপির অজস্র কর্মী এই বিচার সমর্থন এবং সর্বোচ্চ দন্ডই প্রত্যাশা করেন।

জনগণের পারসেপশন অনুযায়ী সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির প্রতিক্রিয়া অস্বাভাবিক হলেও অপ্রত্যাশিত ছিল না। কারন গত দশককাল ধরে ‘উদ্ভট উটের পিঠে সওয়ার হয়ে আছে বিএনপি’। সেজন্য বিএনপির অনেক নীতিনির্ধারনী বক্তব্য সময়োপযোগী বা প্রাসঙ্গিক তো নয়ই বরং নানা বিতর্ক উস্কে দেবার জন্য যথেষ্ট। সাকার রায়ে দেশের হাতে গোনা দু’চার জন মানুষ বাদে সকলেই আনন্দিত, কারন সাকা গণহত্যাকারী এবং এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে রায়ের মধ্যদিয়ে। সুতরাং বিএনপির পক্ষের জনগণও দেখেশুনে বিষ্মিত ও হতবাক যে, সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে সাকার দন্ডাদেশ বহাল থাকায় বিএনপির নেতৃত্ব ক্ষুব্দ, মর্মাহত ও বিষ্মিত। তাহলে এই বিএনপি নেতৃত্ব কি ঐ দু’চার জনের মধ্যে যারা কিনা গণহত্যাকারীর দন্ডাদেশ মেনে নিতে প্রস্তুত নয়?

সুপ্রিম কোর্টের রায় নিয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ার পরের দিন ইলেক্ট্রোনিক মিডিয়ায় বিএনপি শীর্ষ নেতৃত্বের একাংশের ভিন্নমত পাওয়া গেল। দলের ভাইস চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব🙂 হাফিজ উদ্দিন জানালেন, কারো ব্যক্তিগত অপরাধের দায় বিএনপি নেবে না। স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্রিগেডিয়ার (অব🙂 হান্নান শাহ্ একই কথার প্রতিধ্বনি করে বলেছেন, বিএনপির জন্ম মুক্তিযুদ্ধের পরে। সুতরাং দল তার একাত্তরের অপরাধের দায় নেবে কেন? দলটির শীর্ষ দুই নেতার এরকম অস্বচ্ছ বক্তব্য নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। একজন যুদ্ধপরাধী তাদের দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক পর্যায়ে আছেন, মন্ত্রী ছিলেন, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা ছিলেন, ওআইসির মহাসচিব পদে মনোনয়ন পেয়েছিলেনএতকিছুর পরে বিএনপি তার দায় নেবে নাএটি বললে জনগণ বিশ্বাস করবে? প্রশ্ন উঠবে, বিএনপি তাহলে কার এবং কিসের দায় নেবে?

প্রশ্নটি আলোচিত হচ্ছে বার বার, দল হিসেবে বিএনপির ভবিষ্যত কি, গন্তব্য কোথায়? না মধ্যপন্থা, না উগ্রপন্থা, না দক্ষিণপন্থাকোথায় যেতে চায় তারা? জাতীয় ইস্যুসমূহে তাদের বক্তব্য সুস্পষ্ট হবে কবে? অস্পষ্ট, পলায়নপরতা থাকলে জনগণের আস্থাবিশ্বাস অর্জন করা যায় না। তারা কি জনগণকে বোকা মনে করে? যে দেশের জন্ম হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে, তার বিরোধিতাকারীদের সঙ্গী করে ‘ভোটের সঙ্গী’ বলে কি পার পাওয়া যাবে? এজন্যই যুদ্ধাপরাধী বিচারের প্রশ্নে শুরু থেকেই বিএনপি অস্পষ্ট ও পলায়নপর মনোবৃত্তি দেখিয়ে এসেছে। বিচার বন্ধে প্রকাশ্য তৎপরতা না চালালেও প্রতিটি রায়ের আগে বা পরে জামায়াত আহুত হরতালনাশকতায় নৈতিক সমর্থন যুগিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ও মধ্যপন্থার দল হিসেবে অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে, যা অত্যন্ত নেতিবাচক।

নেতিবাচক এই প্রতিক্রিয়ার ফলাফল বিএনপি নেতৃত্ব কি বোঝে, নাকি চিরকালীন শিশু ‘পিটারপ্যানের’ মত তাদের বয়স বাড়ে না। দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধে সেক্টর ও ফোর্স কমান্ডার ছিলেন। দলে রয়েছে অনেক নেতৃস্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা। আছে অনেক যুদ্ধাপরাধীও। জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগও এরকম লোক রয়েছে। আর জামায়াত তো আদালত ঘোষিত যুদ্ধাপরাধী দল। এই তফাতটা বিএনপি বোঝে না। পার্থক্যটি হচ্ছে যে, আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধকে দলীয় সম্পত্তি ও এর চেতনাকে পূঁজি করে রাজনীতি করে। বিএনপির এই পুজি থাকলেও সেটি ভাঙ্গিয়ে তারা দলকে বানিয়েছে যুদ্ধাপরাধীরাজাকারদের অভয়ারণ্য। এজন্যই বড় প্রশ্ন, মধ্যপন্থার স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিএনপি কবে ফিরবে? আদৌ ফেরা কি হবে? আপাতত: লক্ষণ দেখলে সেরকম কোন আশার জায়গা দলটির বৃহৎ সমর্থকগোষ্ঠি পাচ্ছেন না।।