Home » আন্তর্জাতিক » নেপালে ভারতের নির্মম অবরোধ :: জনজীবন অচল ও বিপন্ন

নেপালে ভারতের নির্মম অবরোধ :: জনজীবন অচল ও বিপন্ন

মোহাম্মদ হাসান শরীফ

Nepal crisisনেপালের মনে হচ্ছে, তার শ্বাস চেপে ধরা হয়েছে। গ্যাসোলিন ফুরিয়ে যাচ্ছে। কেবল পেট্রোলিয়াম সামগ্রী নয় ডায়ালাইসিস, আইসিইউ রোগীদের জন্য অপরিহার্য অক্সিজেন, রাসায়নিক এবং হাসপাতালের জরুরি সরবরাহ পর্যন্ত বন্ধ। বিমানের জ্বালানি পর্যন্ত নেই। কোনো কোনো বিমান সংস্থা নয়া দিল্লি থেকে জ্বালানি সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু তাতেও ভারতের কড়াকড়ি। নেপালগামী বিমানের দিল্লি ত্যাগের আগে অনুমতি গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আর প্রায়ই দেখা যায়, অনুমতি পেতে বিলম্ব হচ্ছে। এটা আসলে নেপালে বিমান চলাচল নিরুৎসাহিত করার প্রয়াস। এর সবই হচ্ছে দেশটির প্রায় সব নিত্যপণ্যের একমাত্র সরবরাহকারী প্রতিবেশী ভারতের অঘোষিত অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপের কারণে। অনেক নেপালিই বিশ্বাস করে, তাদের সরকার ২০ সেপ্টেম্বর নতুন সংবিধান গ্রহণ করার পর থেকে তাদের বিরুদ্ধে ভারত প্রতিশোধ নিচ্ছে। নয়া দিল্লির দৃষ্টিতে নতুন সংবিধানে নেপালের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে বসবাসরত ভারতীয় বংশোদ্ভূত মদেশীদের প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করা হয়েছে।

মদেশীরা কয়েক মাস ধরেই সহিংস বিক্ষোভ করছিল। নেপালি আইন প্রণেতারা যখন কয়েক নতুন সংবিধান তৈরি করছিলেন, তখনও তা চলছিল। এতে অন্তত ৪৫ জন নিহত হয়। তবে আইন প্রণেতাদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে সংবিধান পাস হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সহিংসতা বেড়ে যায়। এর অল্প সময়ের মধ্যেই রাজধানী কাঠমান্ডুগামী ভারতীয় পণ্যবাহী ট্রাকগুলো নেপাল সীমান্তে থমকে যায়। এই বুধবার শ’খানেক ট্রাক প্রবেশ করলেও এক হাজারের বেশি যান এখনো ওষুধ, গ্যাসোলিন, রান্নার জ্বালানি, পচনশীল পণ্য নিয়ে সীমান্তে দাঁড়িয়ে অপেক্ষায় করছে সবুজ সঙ্কেতের।

নিজের প্রভাব বলয়ের দেশ বিবেচিত নেপালে ক্রমবর্ধমান চীনা প্রভাবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছে ভারত। গত বছর দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই নরেন্দ্র মোদি ঢাকঢোল পিটিয়ে কাঠমান্ডু গিয়েছিলেনএর দুই বছর আগে চীনা প্রধানমন্ত্রী ওয়েন জিয়াবাও গিয়েছিলেন দেশটিতে। কিন্তু নেপালভারত সম্পর্কে যে উষ্ণতা সৃষ্টি হয়েছিল, তা শীতল হয়ে পড়েছে বলে মনে হচ্ছে। ভারতের নির্মম কূটনীতিতে অতীষ্ঠ হয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চিন্তা করতে থাকে নেপাল।

ভারত ও নেপাল উভয় সরকারই বলেছে, তারা মতপার্থক্য কমিয়ে আনার চেষ্টা করছে, শিগগিরই আবার সরবরাহ শুরু হবে। কিন্তু কোনো পক্ষই বলতে পারেনি, কখন থেকে তা হবে। অনেকেই মনে করছে, কাঠমান্ডুকে ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের দাবি মানতে বাধ্য করার লক্ষ্যে তাদেরকে সীমান্ত পয়েন্টগুলোতে বসানো হয়েছে। ফলে সমাধান সূত্র অনেক দূরে।

ভারত কেন আমাদের ওপর অবরোধ আরোপ করল?’ সোমবার কাঠমান্ডুতে ভারতীয় দূতাবাসের সামনে আয়োজিত এক বিক্ষোভের সময় জানতে চাইলেন স্কুল শিক্ষক নির্মল রায়। আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ধরনের অবরোধ নেই। ভারত বলছে, নেপালে চলমান সহিংস বিক্ষোভের মুখে পড়ে যাওয়ার ভয়ে ট্রাকচালককরা নেপালে ঢুকতে চাচ্ছে না। কিন্তু নেপাল সরকার বলছে, ভারতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তারাই ট্রাকগুলোকে সীমান্ত পার হতে দিচ্ছে না।

ক্ষুদ্র, ভূবেষ্টিত হিমালয়দূহিতা নেপাল তার তেল এবং বেশির ভাগ পণ্যের জন্য দক্ষিণের বৃহৎ প্রতিবেশীর ওপর নির্ভরশীল। ঐতিহাসিকভাবে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ দুটি পরস্পরের ঘনিষ্ঠ মিত্র, তাদের মধ্যকার সীমান্ত খোলাই থাকে। ৩০ লাখের বেশি নেপালি উত্তর ভারতে যাতায়াত করে চাকরি সূত্রে। তবে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে নেপাল মনে করছে, ভারত তাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করছে। আর নিজের প্রভাব বলয়ের দেশ বিবেচিত নেপালে ক্রমবর্ধমান চীনা প্রভাবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছে ভারত। চলতি বছরের প্রথম দিকে নেপালের বিপর্যয়কর ভূমিকম্পের পর এশিয়ার এই দুই বৃহৎ প্রতিবেশী তাদের এ যাবৎকালের বৃহত্তম সাহায্য বহর নিয়ে দেশটিতে হাজির হয়েছিল। গত বছর দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই নরেন্দ্র মোদি ঢাকঢোল পিটিয়ে কাঠমান্ডু গিয়েছিলেন, যা ছিল ১৭ বছরের মধ্যে কোনো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর নেপাল সফর। এর দুই বছর আগে চীনা প্রধানমন্ত্রী ওয়েন জিয়াবাও গিয়েছিলেন দেশটিতে। কিন্তু নেপালভারত সম্পর্কে যে উষ্ণতা সৃষ্টি হয়েছিল, তা শীতল হয়ে পড়েছে বলে মনে হচ্ছে। ভারতের নির্মম কূটনীতিতে অতীষ্ঠ হয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চিন্তা করতে থাকে নেপাল।

এখন ভারতের অঘোষিত অর্থনৈতিক অবরোধের মুখে চীনের রুটগুলো দ্রুতগতিতে খুলছে। অবস্থা ভিন্ন দিকে যাচ্ছে দেখে ভারতও অবরোধ শিথিল করে নিয়েছে। কিন্তু এর মধ্যে যা ক্ষতি হওয়ার তা হয়ে গেছে। কেবল এই রুটগুলো খোলাই নয়, আরো নানাভাবে চীনের সাথে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করার উদ্যোগ নিয়েছে নেপাল। আগামী সপ্তাহেই সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও মাওবাদী প্রধান প্রচন্ড চীন সফরে যাচ্ছেন। নেপালজুড়ে ভারতবিরোধী অনুভূতির মধ্যে মাওবাদী প্রধানের চীনা শীর্ষ নেতাদের সাথে বৈঠকটি কেমন হবে তা সহজেই অনুমান করা যায়।

নতুন সংবিধান অনুমোদনের এক দিন পর নয়া দিল্লি যে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে, তাতে নেপাল পুরোপুরি হতবাক হয়ে পড়ে। তারা মনে করছে, এটা নেপালের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভারতের প্রকাশ্য হস্তক্ষেপ। ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্টভাবেই বলেছে, নয়া দিল্লি ‘বারবার জোরালোভাবে বলে আসছিল যে, নেপালের সব অংশকে তাদের সামনে থাকা রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অবশ্যই একমতে পৌঁছাতে হবে।’

ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব শ্যাম শরন সোমবার ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় প্রকাশিত মতামত কলামে প্রকাশিত এক লেখায় অভিযোগের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দেন এই বলে যে, ‘নেপালের পুরনো উচ্চ বর্ণ এবং পাহাড়ি অভিজাতদের প্রতিনিধিত্বকারী প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দল সাংবিধানিক পরিষদের মাধ্যমে একটি ত্রুটিপূর্ণ সংবিধান চাপিয়ে দিতে এটাকে একটা সুযোগ মনে করেছিল।’ ভারত এই দুশ্চিন্তায় ভুগছে যে, নেপাল সীমান্তের সহিংসতা উত্তর প্রদেশ ও বিহারে বসবাসকারী লাখ লাখ মদেশীর মাধ্যমে উত্তর ভারতেও ছড়িয়ে পড়বে।

ভারতীয় বংশোদ্ভূত মদেশীরা সংবিধানে নেপালকে সাতটি অংশে বিভক্ত করা এবং তাদের পূর্বপুরুষদের কোনো কোনো অংশ দক্ষিণাংশের সাথে জুড়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার। মদেশী এবং আরো কয়েকটি ছোট ছোট গোষ্ঠী রাজ্যগুলোকে আরো বড় এবং স্থানীয় ব্যাপারে আরো বেশি স্বায়াত্তশাসন চায়।

ভারতের খোলাখুলিভাবে অসন্তুষ্ট প্রকাশে নেপালিরা ক্ষুব্ধ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে ভারতবিরোধী মন্তব্যের বন্যা বয়ে গেছে। টুইটারে কয়েক দিন ধরে #BackoffIndia হ্যাশট্যাগের উপস্থিতি চোখে পড়ছে। এমনকি নেপালে ভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলো পর্যন্ত বন্ধ করা হয়েছিল, সিনেমা হলগুলোতে জনপ্রিয় ভারতীয় মুভি দেখানো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিলএই বলে যে, সেগুলো চালানোর মতো জ্বালানি তাদের হাতে নেই।

নেপালি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লক্ষী প্রাসাদ ধাকল উল্লেখ করেছেন, চলমান বিক্ষোভের কারণে নয়, বরং সংবিধান অনুমোদিত হওয়ার পরপরই পণ্যবোঝাই ট্রাকের প্রবেশ বন্ধ হয়ে যায়। তিনি উল্লে#খ করেন, বুধবার যে ১০০ ট্রাক নেপালে প্রবেশ করেছে, তার মধ্যে মাত্র পাঁচটি জ্বালানি ট্যাঙ্কার। তিনি বলেন, ‘ভারতীয় কর্মকর্তারা ফলমূলসবজি এবং অন্যান্য খাদ্যবোঝাই ট্রাক পাঠাতে চান। অথচ সবজি বা ফলের চেয়ে এখন আমাদের বেশি দরকার জ্বালানির।’ তেল ও গ্যাসোলিনের সরবরাহ কমে যাওয়ায় নেপাল যান চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। এক দিন পরপর গাড়ি রাস্তায় নামানোর অনুমতি দিয়েছে।

ভারতের অবরোধটি আন্তর্জাতিক মিডিয়ার নজরে আসতে বেশ সময় লেগেছিল। এই অবরোধের ভয়াবহ প্রকৃতি শুরুতে টের পাওয়া যায়নি। বলা হচ্ছিল, নেপালে সংবিধানবিরোধী বিক্ষোভের কারণে জ্বালানি এবং অন্যান্য নিত্যপণ্য যেতে পারছে না। নেপালের পক্ষ থেকে যখন বলা হলো যেসব পয়েন্টে কোনো ধরনের বিক্ষোভ নেই, সেইসব স্থান দিয়ে কেন ভারতীয় কর্তৃপক্ষ পণ্য সরবরাহ করছে না, তার কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

এ ধরনের আকস্মিক অবরোধের জন্য প্রস্তুত ছিল না নেপাল। গত এপ্রিলে এক বিপর্যয়কর ভূমিকম্পে ৮,০০০ মানুষ নিহত হওয়ার সময় নেপালচীন যোগাযোগ রুটগুলো ধ্বংস হয়ে যায়। ফলে অবরোধের মুখে অপেক্ষা করা ছাড়া নেপালের সামনে বিকল্প ছিল সামান্যই।

বর্তমান অবস্থা নেপালিদের কাছে ১৯৮৯ সালের অবরোধের তিক্ত স্মৃতি নতুন করে দেখা দিয়েছে। চীনা অস্ত্র সংগ্রহের শাস্তি দিতে ওই সময় ১৫ মাস অবরোধ আরোপ করে রেখেছিল ভারত।

কাঠমান্ডুর শীর্ষ স্থানীয় পত্রিকা অন্নপূর্ণা পোস্টের সম্পাদক যুবরাজ ঘিমির বলেন, ‘বিক্ষোভকারীরা যাতে সীমান্ত এলাকায় বসতে না পারে সেটা নিশ্চিত করা কি উভয় দেশের নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের দায়িত্ব নয়? ভারতের অনুমোদনক্রমেই সীমান্ত পয়েন্টগুলোতে বিক্ষোভ হচ্ছে। এটা কৌশলে আরোপ করা অবরোধ।’ আর ভারতে অনেকে বলছেন, নয়া দিল্লি মাত্র কয়েক দশক আগে রাজতন্ত্র বিলুপ্ত করে গণতন্ত্রে ফেরা তার প্রতিবেশীর ওপর অনেক বেশি পেশী শক্তি প্রদর্শন করেছে।

এনডিটিভির ওয়েবসাইটে এক লেখায় বিরোধী দলের আইন প্রণেতা মনি শঙ্কর আয়ার বলেছেন, ‘আমাদের ক্ষমতাসীনরা যে নৃশংস আচরণ করেছেন, সেজন্য আমাদের উচিত হবে নেপালিদের কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং স্থিতিশীল ভবিষ্যতের জন্য তাদের শুভ কামনা করা।’

(সূত্র : ফক্স নিউজ টিভি এবং অন্যান্য ওয়েবসাইট)