Home » রাজনীতি » স্থানীয় সরকারকে দলীয় ক্লাব বানানোর সর্বাত্মক আয়োজন

স্থানীয় সরকারকে দলীয় ক্লাব বানানোর সর্বাত্মক আয়োজন

এম. জাকির হোসেন খান

Dis 1বৃটিশ শাসনের আগে গ্রামে পঞ্চায়েত ব্যবস্থার প্রচলন থাকলেও তার কোনো আইনগত ভিত্তি না থাকায় ১৮৭০ সালে গ্রাম চৌকিদারি আইন ও ১৮৮৫ সালে বঙ্গীয় স্থানীয় স্বায়ত্ব শাসন আইনের মাধ্যমে এ অঞ্চলে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে আইনে রূপ দেওয়ার সূচনা করা হয়। ১৯১৯ সাল থেকে বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রম করে এটি অনেকটা প্রাতিষ্ঠানিকতা অর্জন করেছে। বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১১, ৫৯ ও ৬০এ স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে সরাসরি গুরুত্ব দেওয়া হলেও এ ব্যবস্থাকে কোন সরকার প্রকৃতপক্ষে জনগণের কল্যাণার্থে ব্যবহার তো করেইনি, উল্টো ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে দলীয় সমর্থকদের অবৈধ সুবিধা প্রদানের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। অথচ এ প্রতিষ্ঠানগুলো হতে পারতো প্রকৃতপক্ষে গণতন্ত্র চর্চা, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে দ্রুত এবং সহজতর পদ্ধতিতে নাগরিকদেও বহুমুখী সুবিধা প্রদানের অন্যতম মাধ্যম। অধ্যাপক হ্যারল্ড লাস্কি, লর্ড ব্রাইস পৌরসভার মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে ‘গণতন্ত্রের বিদ্যালয়’ বলে অভিহিত করেছেন।

জন ক্লার্ক মনে করেন, ‘স্থানীয় স্বশাসিত সরকার জাতীয় বা প্রাদেশিক সরকারের সে অংশ, যা শুধু স্থানীয়পর্যায়ে সম্পৃক্ত, স্থানীয় প্রতিনিধিদের মাধ্যমে পরিচালিত এবং কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে দায়বদ্ধ’। তৃণমূল পর্যায়ের প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রত্যক্ষভাবে নাগরিকদের সাথে সম্পৃক্ত থাকার কারণে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য দলমত নির্বিশেষে সকল নাগরিকদের সব ধরনের সুযোগ সুবিধা প্রদানের কেন্দ্র হবে ইউপি, পৌরসভা বা উপজেলা পরিষদের মতো প্রতিষ্ঠান। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানগুলো ঠুটো জগন্নাথে পরিণত করা হয়েছে। উল্টো বাহ্যিকভাবে নির্দলীয় চরিত্রের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিগত সময়ে কখনো দলীয় মোড়কে নির্বাচন না হলেও এবারই প্রথম দলীয়ভাবে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ক্ষমতাসীনরা। ১৯৭৩ থেকে এ পর্যন্ত যত স্থানীয়পর্যায়ের নির্বাচন হয়েছে, এগুলোতে ক্রমেই রাজনীতির সংযোগ বেশি ঘটছে।

গত ১২ অক্টোবর মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে, স্থানীয় সরকারের পাঁচটি স্তরেই দলীয় পরিচয় ও প্রতীকে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনে মেয়র, চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান এবং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের দলীয় মনোনয়ন ও দলীয় প্রতীক থাকতে হবে। মূলতঃ কেন্দ্রীয়ভাবে ক্ষমতাকে সংহত করার পর স্থানীয় পর্যায়ে কুক্ষিগত করে বাংলাদেশে এক দলীয় শাসনের পথ উন্মুক্ত করতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। দলীয়ভাবে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার নির্বাচনের মাধ্যমে ফলে পরিবারের মধ্যে ইতিমধ্যে সৃষ্টি রাজনৈতিক বিভাজন আরো প্রোথিত হয়ে শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যায়েও আইনের আচ্ছাদনে দলীয়করণ এবং দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রুপ পাবে। উল্লেখ্য, স্থানীয় নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ থাকলেও এমনভাবে বিধি বিধান করা হবে যেন ক্ষমতাসীনদের উদ্দেশ্য সফল হয়। এ বছরের ডিসেম্বরে পৌরসভা নির্বাচন দিয়েই শুরু হবে দলীয় মনোনয়নের ভিত্তিতে প্রথম স্থানীয় নির্বাচন।

ক্ষমতাসীনরা পরপর দু’টি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কারচুপির মাধ্যমে নিজেদের লোকদের মোটামুটি নির্বিঘ্নে ক্ষমতায় বসিয়ে মনে করছে, প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপি সরকারি নিপীড়ননির্যাতনে প্রায় কোণঠাসা থাকা এবং প্রশাসনে শক্ত নিয়ন্ত্রণ থাকার কারণে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের এখনই মোক্ষম সময়। আর শীতকালে বা ৫ জানুয়ারি ২০১৬ কে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক আন্দোলনের সামান্য সম্ভাবনাও অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে, জনগণকে নির্বাচনে ব্যস্ত রেখে। একইসাথে দলীয়ভাবে স্থানীয় নির্বাচন দিয়ে বিরোধী শক্তিকে বেকায়দায় ফেলে আন্দোলন নস্যাতের পাশাপাশি স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় নিরংকুশ নিয়ন্ত্রণে নেওয়া সম্ভব হবে। আর যদি কোন কারণে আগামী ২০১৬ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচন দিতে বাধ্য হয় ক্ষমতাসীনরাতাহলে প্রশাসন, আইনশৃংখলা বাহিনীর মতো রাজনীতির অন্যতম নিয়ামক স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহে যেন দলীয় নির্বাচিতদের মাধ্যমে আবারো ক্ষমতায় নির্বিঘ্নে আসা যায় সেজন্য ক্ষমতাসীনরা দলীয়ভাবে স্থানীয় নির্বাচন দিতে চাচ্ছে। এতে সব ধরনের জনমত বা সমালোচনাকে অগ্রাহ্য করা হচ্ছে। স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘তাদের এ ধরনের বড় সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো এবং সংশ্লিষ্ট সবার সাথে আলাপআলোচনা করা উচিত ছিল’। কিন্তু ক্ষমতাসীনরা এ বিষয়ে উদ্বিগ্ন নয়।

যিনি বা যারা উন্নততর গণতন্ত্রের দেশগুলোর সাথে তুলনা করে বাংলাদেশেও স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয়ভাবে করার পক্ষে কথা বলছেন, তারা আসলে সত্যকে ধামাচাপা দিচ্ছেন। প্রথমত, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সরাসরি দলীয় না হলেও সর্বশেষ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন এবং উপজেলা নির্বাচনে ক্ষমতাসীনরা প্রশাসন ও আইনশৃংখলা বাহিনীকে নগ্নভাবে ব্যবহার করে যেভাবে বিরোধী প্রার্থীদের নানাভাবে বাধা প্রদান এবং নির্বিাচারে আক্রমণ করেছে, কেন্দ্র দখল করে সিল মারা, ব্যাপক ভোট কারচুপি এবং ফলাফল জালিয়াতির মাধ্যমে ক্ষমতসীন দলের সমর্থক প্রার্থীকে জেতানোর চেষ্টা করেছে সেই ধরনের একটি উদাহরণও ঐসব উন্নত দেশে আছে কিনা? এমনকি সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার নামে ১০ম সংসদের ভোটারবিহীন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সমর্থন করলেও বাংলাদেশের ক্ষমতাসীনরা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে যে ব্যাপক কারচুপি ভারতে তা সম্ভব কিনা?

দ্বিতীয়তঃ উন্নত দেশগুলোতে দলীয়ভাবে নির্বাচন হলেও বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা প্রদানে দলীয় বিবেচনা আদৌ স্থান পায় কিনা? অথচ আমরা দেখছি শুধুমাত্র বিরোধী দলের সমর্থক হওয়ায় সারা দেশে নির্বাচিত ২৩ জন মেয়র, ২৭ জন উপজেলা চেয়ারম্যান এবং দেড় শতাধিক ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বারকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে এবং দলীয় সমর্থক কমিশনারদের ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব দিয়ে লুটপাট ও দলীয় ক্লাবে পরিণত করার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। ইতোমধ্যে বড় শহরগুলোর বিএনপি সমর্থিত মেয়রেরা বরখাস্ত হয়েছেন, নতুবা কারাগারে রয়েছেন। ক্ষমতাসীনরা প্রশাসনসহ সব ধরনের প্রতিষ্ঠানকে দলীয় করার পর স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকের মাধ্যমে নির্বাচনের মাধ্যমে বাস্তবে ক্ষমতাসীনদের পক্ষে প্রশাসনকে ব্যবহার করা হবে। সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, ‘দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচন হলে বিরোধী দলের প্রার্থীদের মনোনয়ন জমা দেয়ারই সুযোগ থাকবে না’। তাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির সাথে আর উন্নত দেশগুলোতে যারা তুলনা করছে, তারা আমের সাথে জামের তুলনা করার চেষ্টা করছেন। ঐসব দেশে যে রাজনৈতিক পরমতসহিষ্ণুতা বিরাজমান তা পুরোপুরি বাংলাদেশে অনুপস্থিত তা নিশ্চিতভাবে জেনেও না জানার ভান করছেন।

তৃতীয়তঃ দলীয়ভাবে নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত ব্যাক্তি শুধুমাত্র দলের সমর্থকদের সব ধরনের সুবিধা প্রদানে কুন্ঠা করবে না। এমনিতেই সেবা প্রদানে দুর্নীতি বিদ্যমান স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহে। ২০১২ সালের টিআইবি’র জাতীয় খানা জরিপ অনুসারে, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান সমূহ হতে সেবাগ্রহণকারী খানার মধ্যে ৩০.% খানা সেবা গ্রহণকালে কোনো না কোনো ভাবে দুর্নীতি বা অনিয়মের শিকার হয়েছে, যা গ্রামাঞ্চল বা ইউপি ও উপজেলা পরিষদ এলাকার খানার ৩৪.% ও শহরাঞ্চল এলাকার খানার ২৪.%। খানা পর্যায়ে ঘুষ বা নিয়ম বহির্ভূত অর্থ দেয় ২৫.%। প্রশ্ন হলো, এ ধরনের দুর্নীতি কি উন্নত দেশসমূহের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে সম্ভব কিনা? দলীয়ভাবে নির্বাচিত মেয়র বা চেয়ারম্যানরা তখন এককভাবে ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করতে সব ধরনের আইনকানুন, রীতিনীতি এবং বিধিবিধানকে যে অগ্রাহ্য করবে তার বাস্তব প্রমাণ স্বনির্বাচিত বর্তমান এমপিদের একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ড। টিআইবি’র গবেষণা মতে, ‘স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ও প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা কাঠামোর সীমাবদ্ধতার কারণে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা অনেকসময় জবাবদিহিতার বাইরে থেকে যায়। আইন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি বছরের আয়ব্যয়ের হিসাব জনগণের জানার জন্য কার্যালয়ের প্রকাশ্য স্থানে টাঙ্গিয়ে রাখা ও এ সম্পর্কে জনগণের আপত্তি ও পরামর্শ বিবেচনায় নেওয়ার কথা থাকলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান তা অনুসরণ করে না। বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় জনসম্পৃক্ততা কম দেখা যায় এবং বাজেটে জনমতের প্রতিফলন হয় না। আবার স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের জনপ্রতিনিধিরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হলেও আইন অনুযায়ী তারা জনগণের কাছে নয়, বরং সরকারের কাছে দায়বদ্ধ’।

সরকার স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে কুক্ষিগত করতে দলীয় বিবেচনায় নির্বাচন দিলেও এ প্রতিষ্ঠানসমূহকে শক্তিশালী করতে কোন উদ্যোগই নিচ্ছেনা ক্ষমতাসীনরা। টিআইবি’র গবেষণা অনুসারে, ‘স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনের সিদ্ধান্ত কে নেবে সে সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও নির্বাচন সংক্রান্ত আইন ও বিধিমালায় উল্লেখ করা হয়নি। ফলে সরকার স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় নির্বাচনের সময় নির্ধারণ এবং তফসিল ঘোষণার ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ ও নিয়ন্ত্রণ করে। অনেক ক্ষেত্রে (জেলা পরিষদ, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন) নির্বাচন বিলম্বিত করে অনির্বাচিত প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।’ তাছাড়াও, ‘অধিকাংশ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব আয় যথেষ্ট নয়, ফলে বাজেট প্রণয়নসহ বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনা ও কর্মকাণ্ড পরিচালনার প্রতিটি ধাপে সরকারি সিদ্ধান্ত ও বরাদ্দের ওপর নির্ভরশীল থাকতে হয়। আর্থিক নির্ভরশীলতার এই হার সবচেয়ে বেশি ইউনিয়ন পরিষদে (৫৬% থেকে ৯০%)। এক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো স্থানীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে সংসদ সদস্যদের প্রভাব, পরিকল্পনা প্রণয়নে সরকারের নিয়ন্ত্রণ, দলীয় রাজনীতি ও স্থানীয় প্রশাসনের প্রভাব ইত্যাদি বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়ে থাকে’।

স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহে শুদ্ধাচার চর্চায় বিশেষকরে ‘আয়ের পরিসর বৃদ্ধিকরণ, স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিতকরণের জন্য নাগরিক উদ্যোগ গ্রহণ, সংসদ সদস্য ও সরকারি কর্মকর্তাগণের ভূমিকা ও এখতিয়ার সুনির্দিষ্টকরণ, জেলাকে স্থানীয় সরকারের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে চিহ্নিতকরণ, স্থানীয় সরকার সার্ভিস বিধি প্রবর্তনের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই। এছাড়া জাতীয় বাজেটে এ খাতে টাকার অংকে বরাদ্দ কিছুটা বাড়লেও অন্যান্য খাতের সাপেক্ষে বরাদ্দের হার কমে যাওয়ার প্রবণতা রয়েছে। সর্বোপরি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের সংরক্ষিত আসনের নারী প্রতিনিধিদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে তাদের সুস্পষ্ট ধারণা নেই। এছাড়া স্থায়ী কমিটি, বিচার ও সালিশ এবং বাজেট প্রণয়নে নারী প্রতিনিধিদের মতামত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হয় না’, বলে জানায় টিআইবি গবেষণা (২০১৪)। আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট সংখ্যক স্থায়ী কমিটি গঠন না করা, নাগরিক সনদ না থাকা, ওয়ার্ড সভা না হওয়া, নির্বাচন আচরণ বিধিমালা, সরকারি গাড়ি বিধিমালার লঙ্ঘন, সরকারি ক্রয়বিধি, হোল্ডিং কর, ট্রেড লাইসেন্স বিধিমালা প্রয়োগের ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে।

স্থানীয় সরকার খাতে সুশাসনের ঘাটতি এমনিতেই হয়নি। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বাস্তবায়নে কেন্দ্রীয় সরকার কোনো কোনো ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করে। স্থানীয় পর্যায়ের উন্নয়ন কার্যক্রম (প্রকল্প গ্রহণ, বাস্তবায়ন, বাতিল বা স্থগিতকরণ) কেন্দ্রীয় সরকার নিয়ন্ত্রণ করে। সংসদ সদস্যদের স্থানীয় সরকারের উপদেষ্টা রাখার ফলে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে দলীয় রাজনীতি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। প্রকল্প প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের (দরপত্রে অংশগ্রহণ থেকে শুরু করে কার্যাদেশ প্রদান ও কার্য সম্পাদন) প্রতিটি ক্ষেত্রে দলীয় রাজনীতির প্রভাব বিদ্যমান। এলাকার উন্নয়নে বিরোধী দলসমর্থিত নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাজের সুযোগ সীমিত। এছাড়া নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি প্রভৃতি ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রকল্প প্রণয়ন, পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে সহযোগিতা না করা, অন্যতম চ্যালেঞ্জ। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার তদারকি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় প্রশাসনিক, কাজ বাস্তবায়ন এবং অর্থ ব্যয় সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত, মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রম, জনবল ব্যবস্থাপনা, বিভিন্ন লজিস্টিক ব্যবহার ইত্যাদি ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা থাকে না। যার ফলে অনিয়ম ও দুর্নীতির সুযোগের ক্ষেত্র তৈরি হয়। স্থানীয় সরকার খাতের বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা, অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা এখনো প্রাতিষ্ঠানিক ও আর্থিকভাবে দুর্বল। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সংসদ সদস্য, স্থানীয় রাজনীতিবিদ ও বাস্তবায়নকারী সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগীর অনাকাক্সিক্ষত প্রভাবের কারণে প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে জনগণের চাহিদা অনুযায়ী প্রকল্প তৈরি হয় না, ফলে স্থানীয় উন্নয়ন যথাযথভাবে সম্পন্ন না হওয়ায় টেকসই হয় না কোন অবকাঠামো নির্মাণ বা সংস্কার।

বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তামূলক কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্তি ও বরাদ্দ বিতরণে অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে দরিদ্র জনগোষ্ঠী তাদের প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত হয়, এবং তাদের জীবনযাত্রার মানের উন্নয়ন হয় না। সুনির্দিষ্টভাবে, ভিজিএফ, ভিজিডি সহ বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে দুর্নীতির শিকার হয়েছে প্রায় ৩৫.%, এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৫০.% খানাকে ঘুষ বা নিয়ম বহির্ভূত অর্থের মাধ্যমে কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হতে হয়েছে। এছাড়া নির্ধারিত বরাদ্দ বা ভাতার একটি অংশ কেটে রাখার শিকার ২৪.% খানা, দায়িত্বে অবহেলার শিকার ২২.% খানা, স্বজনপ্রীতির শিকার ১৫.% খানা, প্রতারণার শিকার ৪.% খানা, প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের শিকার ৪.% খানা (টিআইবি খানা জরিপ, ২০১২)। সর্বোপরি রাজনৈতিক প্রভাব ও সুশাসনের দুর্বলতার কারণে স্থানীয় সরকার খাতে দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করা হয়েছে। ফলে এ প্রতিষ্ঠানগুলো নামে থাকলেও বাস্তবে নাগরিকবান্ধব সেবা প্রদানে অকার্যকর। স্থানীয় স্বায়ত্ত্বশাসিত সরকার হলো গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি, অথচ সে প্রতিষ্ঠানসমূহকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ না নিয়ে উল্টো দলীয়ভাবে নির্বাচনের মাধ্যমে এ প্রতিষ্ঠানসমূহের কফিনেই শুধু শেষ পেরেক মারা হচ্ছে না, একইসাথে গণতান্ত্রিক সমাজ এবং রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার শেষ খরকুটোটিকে ডুবিয়ে দেওয়া হচ্ছে।।