Home » বিশেষ নিবন্ধ » তদন্তহীনতার তদন্ত কবে হবে

তদন্তহীনতার তদন্ত কবে হবে

শাহাদত হোসেন বাচ্চু

Dis-1ষাটসত্তর দশকের তুখোড় বিপ্লবী নেতা সিরাজ শিকদারের বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পরে সরকার নিয়ন্ত্রিত সংবাদপত্র দৈনিক বাংলায় “পালাতে গিয়ে সিরাজ শিকদার নিহত” শীর্ষক খবরের মাধ্যমে কি বাংলাদেশে হত্যাকাণ্ড সরকারী বৈধতা পেয়েছিল? সত্তর দশকের অস্থির সেই সময়ে, একদলীয় শাসন বাকশাল প্রবর্তণের প্রাক্কালে সংঘটিত এই হত্যাকাণ্ড আর দশটা ঘটনার মত সত্যিই কি ‘স্বাভাবিক ছিল ছিল? সমাজের অগ্রবর্তী অংশের প্রায় কেউই এই ঘটনায় প্রতিবাদী হওয়া দুরে থাকুক, মুখ খুলতেও সাহস পাননি। এরও আগে গণবাহিনী ও সর্বহারা পার্টির সশস্ত্র রাজনীতি দমনে রক্ষী বাহিনীকে অবাধ হত্যার লাইসেন্স দেয়া হয়েছিল।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট সপরিবারে দেশের রাষ্ট্রপতি নিহত হওয়ার মত বর্বর ঘটনায় রাষ্ট্র হত্যাকারীদের ইনডেমনিটি দিয়ে ও সূর্যসন্তান আখ্যায়িত করে সংবিধান আইন, নীতিনৈতিকতা মাড়িয়ে একটি বর্বর সমাজ প্রতিষ্ঠা করেছিল। শেখ মুজিবুর রহমান শুধুমাত্র রাষ্ট্রপতি ছিলেন না, ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি এবং প্রধান জাতীয় নেতাদের অন্যতম। তাঁর বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে সে সময়েও সমাজের অগ্রবর্তী অংশ, এমনকি তাঁর নিজের দল বাকশাল ছিল নীরবনিথর। তারা বরং মুজিব হত্যকাণ্ডের মধ্য দিয়ে গঠিত অবৈধ সরকারে মন্ত্রীসহ নানা পদপদবী অলংকৃত করেছিলেন। এই জঘন্য ইনডেমনিটি, যা রাষ্ট্রকে করেছিল হত্যাকারীদের অধীন, এর বিরুদ্ধে কোন প্রতিষ্ঠান, আইনআদালত, নীতিনৈতিকতা, কিছুই সরব হয়নি। ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে, ক্ষমতায় আসীন হওয়ার আগ পর্যন্ত। সংসদ ইনডেমনিটি বাতিল করেছে, হত্যার সাথে জড়িত প্রত্যক্ষ খুনীদের বিচার হয়েছে। নেপথ্যের পরিকল্পনাকারী, বেনিফিসিয়ারিরা বিচার এড়িয়ে যেতে পেরেছে, সেই সাথে প্রয়াত নেতার স্তাবকে ভরে গেছে দেশ। অথচ তিনি নিহত হবার পর পর কয়েক বছর ১৫ আগষ্ট হত্যার সমর্থকরা পালন করেছে তথাকথিত নাজাত দিবস, প্রতিবাদ করার মতও কি কেউ অবশিষ্ট ছিল? বর্তমানের চাটুকারস্তাবকেরা কোথায় ছিল?

হত্যা ও রক্তপাতময় রাজনীতির ধারাবাহিকতায় ১৯৮১ সালের ৩১ মে নিজেই নিহত হয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তাঁরই সেনাপ্রধানের তৈরী মঞ্চে তিনি নিহত হন যার প্রধান কুশীলব দেখানো হয় জেনারেল মঞ্জুরকে, ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতায় তাঁকে এবং এক বিচারিক প্রহসনে আরো ডজনখানেক মুক্তিযোদ্ধা সামরিক অফিসারকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যাকরা হয়। এরকম অভিযোগ বেগম জিয়া করে আসছেন। যদিও দু’দুবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হয়েও তিনি বা তাঁর দল এই হত্যাকাণ্ডের বিচার করেননি, আগ্রহও বোধ করেননি। তারেক রহমানও পিতৃহত্যার বিচারে আগ্রহী ছিলেন বলে কখনোই মনে হয়নি। বরং রাজনৈতিক মিত্রতায় আবদ্ধ হওয়ার জন্য হত্যায় প্রধান অভিযুক্তের সাথে ২০০৬ সালে সাক্ষাৎ করেছিলেন।

রাজনৈতিক দলগুলির ব্লেইম গেমের কারণে এই দেশে হত্যা, রক্তাক্ত হামলা বা অর্গানাইজড সন্ত্রাসের ঘটনায় তদন্ত শুধু চাইলেই হয়না, প্রকৃত তদন্তের দাবি জানাতে হয়। কারণ একথা সকলেই কমবেশি জানে, ক্ষমতাসীনরা তাদের সুবিধার্থে অপরাধের ঘটনা যে কোন দিকে প্রবাহিত করতে পারে। একুশে আগষ্টের গ্রেনেড হামলায় নিহতদের ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্তের প্রহসন এবং জজ মিয়া নাটকের বিষয়টি এখন তদন্তের ক্ষেত্রে যেন ইউনিভার্সাল ট্রুথ বা চিরন্তন সত্যে পরিনত হতে চলেছে। রাষ্ট্র ধীরে ধীরে এই বিষয়ে এতটাই অভ্যস্ত ও পারঙ্গম হয়ে উঠছে যে, ঘটনা ঘটলেই অতীতের কুৎসিত ওই দৃষ্টান্তই অনুসৃত হচ্ছে।

অনুসন্ধান, তদন্ত ছাড়াই গোয়েন্দা সংস্থার বরাতে ঘটনার দায় প্রতিপক্ষের ওপর চাপিয়ে দেয়া প্রমান করে অপরাধীদের চিহ্নিত করে শাস্তির ব্যবস্থা করার ব্যাপারে শাসকরা অনাগ্রহী। এতে সাময়িক সুবিধা হলেও অতীতের কোন শাসকগোষ্ঠি অন্তিমে লাভবান হয়নি। এই ব্লেইম গেমের বড় শিকার পাকিস্তান সবচেয়ে নিকৃষ্ট উদাহরন হিসেবে একটি উপদ্রুত দেশে পরিনত হয়েছে। ভারতের শাসকগোষ্ঠি অভ্যন্তরে ব্লেইম গেমের মধ্যে যায়নি। অন্তহীন সমস্যা, মাওবাদীদের সশস্ত্র তৎপরতা, হিন্দু জঙ্গীবাদের উত্থান, কাশ্মীরসহ সাত রাজ্যের সমস্যা, পাকিস্তানের সাথে উত্তেজনা সব নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো কাজ করছে ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে।

সেদিক থেকে বাংলাদেশের সমস্যা অনেক কম। এখানে সমস্যা সৃষ্টি হলে সত্য উদঘাটনের বদলে প্রতিপক্ষ নির্মূলে ব্যবহৃত হয়। সেজন্যই একটি বড় প্রশ্ন, এখানে কি ইস্যু তৈরী করা হয় বা জিইয়ে রাখা হয়? এজন্যই হাতবদলের পালায় হেফাজতে ইসলাম প্রজেক্ট চলে যায় ক্ষমতাসীনদের হেফাজতে? কেন ২০১৩ সালে ঢাকায় সংঘটিত হেফাজতি তাণ্ডবের ঘটনার তদন্ত থেমে যায়? কিংবা কথিত জঙ্গী গ্রেফতার বা তাদের আস্তানা আবিস্কারের পরবর্তী ফলোআপ থাকে না। গ্রেফতারকৃত কথিত জঙ্গীরা বিচারের আওতায় আসে না অথবা জামিন পেয়ে কোথায় যায়? এসব ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, তদন্তহীনতা আর বিচারহীনতা।

সাধারন খুনের ঘটনায় পুলিশি তদন্তের পাঁকে জড়িয়ে আইনীবেআইনী সব পক্ষের ধান্ধার পথ উন্মুক্ত করে দেয়। বছরের পর বছর অনুসন্ধানহীনতা, তদন্তহীনতায় এসব মামলা চলে যায় হিমাগারে। কখনও কোন ঘটনায় মিডিয়া সরব হলে, নখদন্তহীন কথিত সিভিল সমাজ নিরাপদ মনে করে প্রতিবাদী হয়ে ওঠার চেষ্টা করে, তাহলে হয়তো সরকারী সংস্থাগুলি সক্রিয় হয় এবং কালেভদ্রে বিচারের সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়। কিন্তু হত্যাকাণ্ডে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা থাকলে সেটি দলগুলির ব্লেইম গেমে পরিনত হয়। তদন্তের আগে দোষী নির্ধারন করা হয় এবং অনুসন্ধান, তদন্ত সেই ডাইরেকশন অনুযায়ী পরিচালিত হয় এটি এখন শুধু পারসেপশন নয়, বাস্তবতা।

হেফাজত বা অন্য উগ্রবাদী গোষ্ঠিগুলি যে ভাষায় কথা বলে আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন ওলামা লীগ বলে তার চেয়েও কঠিন ভাষায়। চলতি বছরের ২৪ জানুয়ারি ওলামা লীগের ভাষায় ‘হিন্দু প্রধান বিচারপতি’ নিয়োগের প্রতিবাদে মানববন্ধন করেছিল। ওলামা লীগের সম্পাদক মো: আবুল হাসান শরিয়তপুরী বলেছিল, ‘মুসলিম প্রধান দেশে একজন হিন্দু বিচারপতি নিয়োগ করা হয়েছে’। এরকম বক্তব্য জামায়াতহেফাজতজঙ্গীরা দেয় কিনা জানা দরকার। ওলামা লীগ আবার দুইভাগে বিভক্ত। এক গ্রুপ অপর গ্রুপকে ‘আনসারউল্লাহ বাংলা টিম’ বলে অভিযুক্ত করে। ব্লগার হত্যাসহ ড্রোন বিমান তৈরীর অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধে তারা কিনা আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠন? অভিযোগটি কি ভয়ঙ্কর! ওলামা লীগের এই অভিযোগের পর বেশ কিছুদিন গড়িয়ে গেলেও গোয়েন্দা সংস্থা বিষয়টি তদন্ত করেছে এমনটি জানা যায়নি। প্রায় সবক্ষেত্রে তদন্ত প্রমাণ ছাড়াই চলছে বায়বীয় অভিযোগ।

গত ৩১ অক্টোবর শনিবার প্রকাশক ও ব্লগার দীপনকে জবাই করে হত্যা করা হয়েছে এবং পরের দিন আন্তর্জাতিক জঙ্গী সংগঠন আনসার আল ইসলাম এর দায় স্বীকার করেছে। তবে বাংলাদেশের গোয়েন্দা বলছে, ঘটনাটি আনসারউল্লাহ বাংলা টিম করে থাকতে পারে। আর তাবৎ পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী বোঝা কাঁধে নিয়ে দীপনের পিতা অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক গভীর হতাশায় জানিয়েছেন, তিনি বিচার চান না। এ কথাটি মনে করিয়ে দেয়, জোট সরকারের আমলে দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চলের মৃত্যু উপত্যকায় একের পর এক সাংবাদিক নিহত হচ্ছেন, তখন বলা হত, ‘বিচার পাই না, তাই বিচার চাই না’। দশকের পর দশক ধরে অধ্যাপক হক দেখছেন, দেশ থেকে উঠে যাচ্ছে আইনের শাসন, জায়গা করে নিচ্ছে আইনকে শাসন, বিচারহীনতা ঘিরে ধরছে, সম্ভবত: সেজন্যই গভীর বেদনা ও আক্ষেপ থেকে বলতে বাধ্য হয়েছেন, কারো বিচার তিনি চান না।

রাজীব হায়দার থেকে ফয়সাল দীপন, একই দিনে হত্যা চেষ্টার শিকার আরো তিনজন। মাঝখানে অভিজিৎ, ওয়াশিকুর, অনন্ত বিজয়, নীলাদ্রি চক্রবর্তীসহ চলতি বছরের নয়মাসে চারজন, এ পর্যন্ত পাচ জন। ঝকঝকে তারুন্য এবং মুক্তচিন্তা ও অসাম্প্রদায়িকতা এখন এই দেশে আক্রমনের প্রধান লক্ষ্যবস্তু। নীলাদ্রি হত্যার পরে যেমনটি ইঙ্গিত ছিল গণজাগরন মঞ্চের একাংশের মুখপত্র ইমরান এইচ সরকারের বক্তব্যে। তিনি বলেছিলেন, সরকার হত্যাকারীদের গ্রেফতার করে প্রমান করুক, এসব ঘটনায় তাদের পৃষ্ঠপোষকতা নেই।

প্রকাশিত খবর অনুযায়ী ব্লগার হত্যা মামলাগুলোর মধ্যে রাজীব হত্যা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে এখনও বিচারাধীন। অন্য মামলাগুলোর তদন্তে তেমন অগ্রগতি নেই এ ভাষ্য তদন্ত কর্মকর্তার। সারাদেশ জুড়ে জঙ্গীরা নিয়ন্ত্রনে, চারিদিকে গোয়েন্দা জাল ছড়ানো, ঢাকা শহর নিরাপত্তার চাদর মোড়ানো এসব বক্তব্য এবং হত্যাকাণ্ডের তদন্তহীনতার তদন্ত হওয়া উচিত সবার আগে। আর ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গসংগঠন ওলামা লীগের বক্তব্যবিবৃতি এবং আওয়ামী লীগের যেসব নেতাদের পৃষ্ঠপোষকতা তারা পায়, তারও তদন্ত হওয়া জরুরি। ইমরান এইচ সরকার কি এরকম কোন ইঙ্গিত করেছিলেন?

অভিজিৎ হত্যার পরে রয়টার্সকে দেয়া প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সজিব ওয়াজেদ জয়ের সাক্ষাতকারটি এখনও খুব পূরোনো প্রসঙ্গ নয়। ওই সাক্ষাতকারে তিনি বলেছিলেন,‘আমরা একটি সরু রশির ওপর দিয়ে হাঁটছি। আমরা নাস্তিক হিসেবে চিহ্নিত হতে চাই না। আমার মা (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) ব্যক্তিগতভাবে অভিজিৎএর বাবাকে (অধ্যাপক অজয় রায়) সমবেদনা জানিয়েছেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এতটাই অস্থির যে, প্রকাশ্যে তার পক্ষে কোন মন্তব্য করা সম্ভব হয়নি’।

এই লেখাটি শেষ করতে গিয়ে পশ্চিম বাংলার প্রখ্যাত কবি জয় গোস্বামীর একটি কবিতার অংশবিশেষ উদ্বৃত করা নি:সন্দেহে প্রাসঙ্গিক হবে;

মুরগীর মাথা কেটে ফেলে

শক্ত মুঠো করে গলা চেপে রাখা দরকার

রক্ত যেন বেরুতে না পারে

ছটফট যতই করুক

মাংস নাকি তারে আরও স্বাদু হয়।

যখন কৈশোরকাল, পাড়ার দাদার মুখে

শুনেছি একথা ক্লাবঘরে ভোজের সময়ে।

হে দুর্লঙ্ঘ্য, এখন তুমিও কি ঠিক সেইভাবে

আমার

গলা চেপে ধরে আছো।

মাথা কাটা গেছে, আমি শুধু

রক্তটুকু বেরুতে দেবার

স্বাধীনতা চাইছি পাচ্ছি না