Home » বিশেষ নিবন্ধ » তাজউদ্দীন আহমদের রাজনৈতিক জীবন – (৮ পর্ব)

তাজউদ্দীন আহমদের রাজনৈতিক জীবন – (৮ পর্ব)

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ::

প্রশ্ন থাকে কেন তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দিলেন। তাঁর সহযাত্রী মোহাম্মদ তোয়াহা যোগ দিলেন কমিউনিস্ট পার্টিতে, তাজউদ্দীন কেন দিলেন না? কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ না-দেওয়ার অন্তত তিনটি কারণ আমরা দেখতে পাই। প্রথম কারণ সম্বন্ধে তিনি নিজেই বলেছেন, সেটি হলো আবুল হাশিমের প্রভাব। তাঁর ভাষায়, ‘‘আবুল হাশিম সাহেব যদি বেঙ্গল মুসলিম লীগের সেক্রেটারি না থাকতেন, আবুল হাশিম সাহেবের কাজ, ফিলসফি, মিশন যদি আমাদের সামনে না থাকতো, তাহলে আমরা সবাই কমিউনিস্ট হয়ে যেতাম।’’ দ্বিতীয় কারণ, কমিউনিস্ট পার্টি তখন দৃশ্যমাণ ছিল না। পার্টি নিষিদ্ধ হয় ১৯৫৪-তে, কিন্তু ১৯৪৭-এর পর থেকেই পার্টির সদস্যদের ওপর নিপীড়ন শুরু হয়েছে, নেতাদের সবাইকেই থাকতে হয়েছে হয় কারাগারে নয়তো আত্মগোপনে। একটি হিসাব বলছে, অবিভক্ত বঙ্গে পার্টির ৩০ হাজার সদস্যের মধ্যে শতকরা ৫ জন ছিলেন মুসলমান, বাকি সবাই হিন্দু; দেশভাগের পর পূর্ববঙ্গের অধিকাংশ হিন্দু সদস্যই পশ্চিমবঙ্গে চলে গিয়েছিলেন।

পার্টির অফিসে নিয়মিত হামলা হতো, সভা করলে মুসলিম লীগের গুন্ডারা ভাংচুর করতো। ঢাকার রথখোলার মোড়ে পার্টির একটি বইয়ের দোকান ছিল, একদিন পুলিশ এসে সমস্ত বই গাড়িতে করে নিয়ে যায়, যে লোকটি বই বিক্রি করছিল তাকেও গ্রেফতার করে। এক কথায় ওই পার্টির সঙ্গে যুক্ত হওয়াটা মোটেই সহজসাধ্য ছিল না।

তৃতীয় কারণটিই অবশ্য প্রধান। সেটি হলো তাজউদ্দীন আহমদের নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গি। শুরু থেকেই তিনি জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ভেতরেই ছিলেন। জাতীয়তাবাদের মধ্যে দক্ষিণপন্থীদের সংখ্যাধিক্য ছিল এটা ঠিক, কিন্তু একটি বামপন্থী ধারাও ছিল; তাজউদ্দীনের অবস্থান ওই বামপন্থী ধারাতে। এই বামপন্থীরা ছিলেন একই সঙ্গে উপনিবেশবাদবিরোধী ও সামন্তবাদবিরোধী; কিন্তু সমাজতন্ত্রী নন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর তাজউদ্দীনরা দেখছিলেন ব্রিটিশ চলে গেছে ঠিকই, কিন্তু সে জায়গায় অবাঙালী ধনীদের শাসন কায়েম হয়েছে। অন্যদিকে সামন্তবাদের অবসান মোটেই ঘটে নি। দরিদ্র কৃষক আগের মতোই জমিদার, জোতদার, মহাজন ও আমলাদের দ্বারা শোষিত ও নিপীড়িত হচ্ছে। পশ্চাৎপদতা ও অজ্ঞতার কারণে মানুষের মনোজগত ছিল অত্যন্ত সঙ্কুচিত। যাতায়াত ব্যবস্থা অকিঞ্চিৎকর। প্রায় সব গ্রামেই মেয়েদের জন্য পড়াশোনার কোনো সুযোগ ছিল না। আমলা, রাজনীতির লোক ও ব্যবসায়ীরা কখনো একত্রে, কখনো বা নিজ নিজ পদ্ধতিতে অসহায় মানুষকে পীড়ন করতো। তাজউদ্দীন রাজনীতিতে এসেছিলেন, এবং ছিলেন রাষ্ট্র ও সমাজে পরিবর্তন আনবার আকাংখা নিয়ে। পরিবর্তন আনার কাজে যুক্ত হবার যে পথটা তিনি খোলা দেখেছেন সেটি হলো ব্যবস্থাপক পরিষদের সদস্য হওয়া। বলাই বাহুল্য ব্যক্তিগত ক্ষমতা লাভ নয়, সমাজের প্রয়োজনে নিপীড়নকারী ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার ইচ্ছাই ছিল চালিকাশক্তি।

নিজের এলাকার মানুষের অভাব অভিযোগ তুলে ধরবেন, প্রতিকারের ব্যবস্থা করবেন এবং বিদ্যমান রাষ্ট্রের আমলাতান্ত্রিক চরিত্রে পরিবর্তন এনে তাকে গণতান্ত্রিক করে তুলতে সচেষ্ট হবেন, এই আশাকে তিনি লালন করতেন। তাজউদ্দীন যে নির্বাচনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করছিলেন এ খবর তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ জানতো। তাঁর এলাকা থেকে সরকার দলীয় পরিষদ সদস্য ছিলেন প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক ফকির আবদুল মান্নান। তাজউদ্দীনের দিনলিপিতে আভাস আছে তাঁকে নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরিয়ে রাখার জন্য মান্নান সাহেব বিভিন্ন কৌশলের কথা ভাবছেন। তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারী মামলা দেয়ার চিন্তা যে করা হয়নি তাও নয়।

তাজউদ্দীনের চেষ্টা ছিল রক্ষণশীলতার গন্ডিটা ডিঙ্গিয়ে বেরিয়ে যাবেন। একা যাওয়া সম্ভব নয়; অনেককে লাগবে; সে জন্য মুসলিম লীগকে বাদ দিয়ে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করা যায় কিনা সে চেষ্টা করলেন। দেখলেন পারা যাচ্ছে না। ওদিকে নির্বাচন এগিয়ে আসছে; আওয়ামী মুসলিম লীগ মুসলিম লীগের একমাত্র প্রতিপক্ষ হিসাবে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। নেতৃত্ব দিচ্ছেন ভাসানী, যাঁর প্রতি তিনি ইতোমধ্যে আস্থাবান হয়ে উঠেছেন। তাছাড়া এই দল যে তাদের নাম থেকে ‘মুসলিম’ পরিচয়পত্রটি অবলুপ্ত করবে এমন প্রতিশ্রুতিও দলের কার্যক্রমের ভেতরেই দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। এবং সেটা কার্যকরও হয়েছে বৈকি, নির্বাচনের পরের বছরই আওয়ামী লীগ তার ‘মুসলিম’ত্বটি পরিত্যাগ করেছে।

তাজউদ্দীন আহমদ আত্মজীবনী লেখার সময় ও সুযোগ পান নি, রাজনীতি বিষয়ে বই লিখবেন এমন অবকাশও তাঁর ছিল না, তাঁর জীবন মাত্র পঞ্চাশ বছরের, কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক কার্যক্রম ও দিনলিপি অনুসরণ করলে আমরা দেখবো যে তিনি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার জন্য লড়ছিলেন। রাজনীতির পরিভাষায় এটিকে বলা যাবে বুর্জোয়া গণতন্ত্র। এর প্রতিষ্ঠার জন্য পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে যথার্থ সংসদীয় ব্যবস্থার প্রবর্তন এবং রাষ্ট্র ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ অপরিহার্য ছিল। ধারণা করি তিনি ভাবতেন যে, একটি বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব দরকার ছিল সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের জন্য পথ আবিস্কার করার প্রয়োজনেই। দ্বিতীয়টিই লক্ষ্য, প্রথমটি উপায় বটে। তাছাড়া এটা তো সত্য যে, তখনকার বাস্তবতায় জাতিগত নিপীড়নের বিষয়টির মীমাংসা না ঘটালে শ্রেণীগত নিপীড়নের বিষয়টিকে পরিষ্কারভাবে সামনে আনা যাচ্ছিল না।

সব কিছু মিলিয়ে এটাই স্বাভাবিক ছিল যে, তিনি জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রগতিশীল ধারার সঙ্গেই যুক্ত হবেন, কমিউনিস্ট পার্টিতে না গিয়ে। মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে ব্যক্তি তাজউদ্দীন নিজেকে গণতান্ত্রিক মানুষ হিসাবে গড়ে তুলছিলেন। গণতান্ত্রিকতার জন্য অনেক উপাদান আবশ্যক; অপরিহার্য দুটির একটি হলো পরমতসহিষ্ণুতা ও জবাবদিহিতা। এ দুটি গুণের জন্য জাতীয়তাবাদীরা বিখ্যাত নন; তাঁদের ভেতর প্রবণতা থাকে একনায়কতন্ত্রের। জাতীয়তাবাদী তাজউদ্দীন কিন্তু সচেষ্ট ছিলেন গণতান্ত্রিক হবার জন্য। আমরা দেখি যে তিনি আলাপ আলোচনা ও বিতর্কে অত্যন্ত উৎসাহী। আর তিনি যে প্রত্যহ দিনান্তে সযত্নে দিনলিপি তৈরী করতেন ওই খানে দেখা যায় যে নিজেই নিজেকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছেন, হিসাব নিচ্ছেন দিনটা কিভাবে কাটিয়েছেন। কোথায় অপচয় অবহেলা ঘটলো, সার্থকতার জায়গাটা কোনখানে। গণতান্ত্রিকতার আরেকটি শর্ত হচ্ছে সামন্তবাদী সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসা। সেই চেষ্টা তাঁর মধ্যে নিরন্তর। দেখতে পাচ্ছি তিনি উপন্যাস পড়ছেন শরৎচন্দ্রের, নাটক পড়ছেন শেকস্্পীয়রের; খবর রাখছেন বিশ্বের কোথায় কী ঘটছে সে সবের। একান্ন সালের মে মাসের একটি দিনের ডায়েরীতে ফজলুল হক হলের একটি অনুষ্ঠান সম্পর্কে লিখেছেন, ‘এই প্রথমবারের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের অনুষ্ঠানে ছাত্রীরা অংশগ্রহণ করলো। খুরশিদী খানম দুটো গান গাইলেন। দম বন্ধ করা অনুষ্ঠানের মধ্যে এই এটি ছিল সফল একটি আয়োজন।’’ ইংরেজী বিভাগের ছাত্রছাত্রীরা কার্জন হলে ওথেলো নাটকের মঞ্চায়ন করছে; তাজউদ্দীন সেটি উপভোগ করছেন। লিটন হলে চিত্রকলার প্রদর্শনী হয়েছে, দর্শক হিসাবে সেখানে তিনি রয়েছেন। যুবলীগের উদ্যোগে বার লাইব্রেরী হলে তিনি রবীন্দ্র জয়ন্তীর আয়োজন করছেন। একান্ন সালের ডায়েরীতে লিখে রাখছেন এই সংবাদ যে, সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় কৃত্রিমভাবে ইকবাল দিবস প্রতিপালিত হচ্ছে। এর বিপরীতে জনগণের বিরাট অংশ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের জন্মদিন পালন করছে।

খবর পাওয়া গেছে এমন কি প্রত্যন্ত এলাকার মানুষও নতুন লক্ষ্যে দিবস দুটিতে অংশগ্রহণ করেছেজনগণের স্বাভাবিক জাগরণ! (চলবে)