Home » প্রচ্ছদ কথা » কর্তৃত্ববাদী শাসনে ক্ষমতাবানদের দাপট ও দুর্বলের অসহায়ত্ব

কর্তৃত্ববাদী শাসনে ক্ষমতাবানদের দাপট ও দুর্বলের অসহায়ত্ব

হায়দার আকবর খান রনো ::

১৯৯০ পরবর্তীকালে আজকের সরকারের মতো এতো শক্তিশালী সরকার আর আসেনি। আবার একই সঙ্গে এতো গণবিচ্ছিন্ন সরকারও এই সময়কালে কখনো ছিল না। গণবিচ্ছিন্ন তবু শক্তিশালী ? হ্যা, তাই। শক্তিশালী কারণ বিরোধী পক্ষও দুর্বল। প্রধান বিরোধী পক্ষ বিএনপি আজ একেবারে পর্যুদস্ত। নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা-হামলার কারণে দাড়াতেই পারছে না দলটি। হয়তো জনসমর্থন আছে, কিন্তু সেই সমর্থনটা হচ্ছে নেগেটিভ। সরকার বিরোধী ভোটাররা জমায়েত হতে চায় বিএনপির পেছনে। কিন্তু সেই জনসমর্থনকে ইতিবাচক আন্দোলনের শক্তিতে পরিণত করার যোগ্যতা নেই বিএনপির। কারণ বিএনপি কোন আদর্শবাদী দল নয়। এই দলও ক্ষমতায় ছিল। তখন তারা গণবিরোধী ভূমিকাই পালন করে এসেছে। তাছাড়া এখনো মুখে গণতন্ত্রের শ্লোগান তুললেও, জনগণের অর্থনৈতিক দাবি নিয়ে তারা একটি কর্মসূচি পালন করেনি। শ্রমিকের মজুরি, মধ্যবিত্তের শিক্ষা, চিকিৎসার জন্য দাবি অথবা দ্রব্যমূল্য নিয়ে কোন কর্মসূচি তাদের কর্মকৌশল, চিন্তা, ধারণা বা উপলব্ধির মধ্যেও নেই।

অন্যান্য উদারপন্থী বুর্জোয়া দল বলেও তেমন কিছু নেই। বামশক্তিও দুর্বল। এই অবস্থাটা সুযোগ করে দিয়েছে সরকারকে কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠতে। কর্তৃত্ববাদী শাসন ও গণবিচ্ছিন্নতা শাসক দলকে বাধ্য করেছে নির্ভর করতে পুলিশ প্রশাসনের উপর এবং দলীয় মাস্তানদের উপর। পুলিশ, র‌্যাব ও প্রশাসন তাই এক ধরনের আপেক্ষিক স্বাধীনতা ভোগ করছে। পাশাপাশি দলীয় মাস্তান এবং শাসক দলের নিচের পর্যায়ের নেতারাও অবাধ স্বাধীনতা ভোগ করছে- লুটপাটের স্বাধীনতা, দুর্নীতির স্বাধীনতা, ক্ষমতার দাপট দেখানোর স্বাধীনতা। শাসক দলের উপরতলার নেতৃত্বকে যেন অসহায় বোধ করেন। দলের উপর কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। এই পরিস্থিতি সামগ্রিকভাবে অরাজকতার অবস্থা সৃষ্টি করেছে। পাশাপাশি আইনের শাসনের অনুপস্থিতি, শাসক দল ও প্রশাসনের ভয়ংকর ক্ষমতার দাপট এক ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে। চোখের সামনে দুর্নীতি ও লুটপাট হলেও প্রতিবাদ করার সাহস পায় না কেউ। কারণ বিচার বহির্ভূত হত্যা, ক্রসফায়ার, নিখোজ হওয়া, গুম, খুন ইত্যাদির সংখ্যা প্রতিদিন বেড়েই চলেছে। অবস্থা এতোটাই খারাপ যে গত বছর আগস্ট মাসে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান পর্যন্ত বলেছিলেন, ‘রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকলে আইন তাকে স্পর্শ করে না’। খুব সম্প্রতি প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা এক আলোচনায় তনু হত্যা প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে বলেছেন, ‘প্রশাসন চায় না, বিচার বিভাগ ঠিক মতো চলুক’। (প্রথম আলো, ৩ এপ্রিল ২০১৬)।

তবে তনু হত্যার ক্ষেত্রে দেখলাম মানুষ ভয়ভীতি কাটিয়ে বিদ্রোহে ফেটে পড়েছে। তনু হত্যার বিষয়টি খুবই রহস্যজনক। আরও রহস্যজনক পুলিশ ও প্রশাসনের ভূমিকা। নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকায় পাওয়া গেল সোহাগী জাহান তনুর লাশ। কিভাবে এমন জায়গায় লাশ এলো। তাকে কি সেখানেই হত্যা করা হয়েছিল, যেখানে বাইরের লোকের যাতায়াত খুব সহজ ব্যাপার নয়। প্রথম প্রদর্শনে পুলিশ সুপার অনুমান করেছিলেন যে, তাকে ধষর্ণের পর হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু ময়না তদন্তে, যার রিপোর্ট বের হয়েছিল দুই সপ্তাহ পর, সেখানে কিছুই বের হলো না। এমনকি হত্যা না আত্মহত্যা তাও নির্দিষ্ট করে বলা যায়নি। প্রবল প্রতিবাদের মুখে দ্বিতীয়বার ময়না তদন্ত হল। তার রিপোর্টও এখনো বের হয়নি। প্রথম দিকে তনুর মা ও নিকট আত্মীয় ছাড়া আর কাউকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। প্রথমে নেয়া হয় মাকে থানায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। কিন্তু কখন? মধ্যরাতে ঘর থেকে মাকে থানায় নিয়ে আসা হয়। পুলিশের এই আচরণ রহস্যজনক। মিডিয়ায় বলা শুরু হলো, কাউকে রক্ষা করার জন্য নানা কৌশল নেয়া হচ্ছে। মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান স্পষ্ট ভাষায় বললেন, ‘জজ মিয়ার নাটক সাজানো হলে তা মানা যাবে না’। এই মর্মে তিনি একটি চিঠিও দিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে।

ড. মিজানুর রহমান প্রায়ই বেশ সাহসের সঙ্গে সত্য কথা বলে থাকেন। গত বছর আগস্ট মাসে এক আলোচনা সভায় তিনি বলেছিলেন, ‘রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকলে আইন তাকে স্পর্শ করে না’। কথাটা পুরোপুরি সত্য। তার মানে যারা ক্ষমতাবান, তারা বড় বড় অপরাধ করলেও পার পেয়ে যান। আর যারা দুর্বল তারা অত্যাচারের শিকার হন। তনুর বাবা নি¤œবিত্ত কর্মচারী মাত্র। তাই তার জন্য বিচারের দরজা বন্ধ। হত্যাকারী অথবা ধর্ষণকারী যদি শক্তিশালী হয়ে থাকে, তাহলে আইন তাকে স্পর্শ করবে না। এই যে আইনের শাসনের অনুপস্থিতি, তা সমগ্র সমাজকে কলুষিত করেছে, গণতন্ত্রকে করেছে নির্বাসিত, কর্তৃত্ববাদী শাসনের যা হচ্ছে সাধারণ বৈশিষ্ট্য।

দুই একটি উদাহরণ দেয়া যাক। গাইবান্ধার সংসদ সদস্য হাসতে হাসতে একটি বারো বছরের ছেলের পায়ে গুলি করে ছেলেটিকে পঙ্গু করেছিল। তারপরও তিনি জামিন পেয়ে বহাল তবিয়তে এবং দাপটের সঙ্গে সংসদ সদস্যও রয়ে গেছেন। দলও কোনো এ্যাকশন নেয়নি।

এক মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, যিনি ২০১৫ সালে অফিসে অবরুদ্ধ খালেদা জিয়ার বাসার সামনে বালুর ট্রাক সম্বন্ধে বলেছিলেন যে, বাড়ি মেরামতের জন্য বাল আনা হয়েছে এবং এই ভাবে রাষ্ট্রীয় মিথ্যাচার করেছিলেন, সেই মন্ত্রী মায়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা চলা সত্তে¡ও তিনি মন্ত্রীত্বের গদিতে আরামেই বসে আছেন। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত বেঞ্চ দুই মন্ত্রীকে পঞ্চাশ হাজার টাকা দন্ডাদেশ দিয়েছেন। দন্ডপ্রাপ্ত মন্ত্রীরা কিন্তু এখনো মন্ত্রী আছেন। সংবিধানে শাস্তি প্রাপ্ত মন্ত্রীকে পদত্যাগ করার সুস্পষ্টভাবে বলা না থাকলেও নৈতিকতার কারণে তাদের পদত্যাগ করা উচিত ছিল। হায়! নৈতিকতা বহু আগেই বিদায় নিয়েছে। এখানে চলছে দুর্নীতির রাজত্ব, ক্ষমতার দাপট ও ক্ষমতাহীনের অসহায়ত্ব।

দুর্নীতির এক এক করে রেকর্ড তৈরি হচ্ছে। বড় বড় আর্থিক কেলেংকারির খবর আসে একটার পর একটা। রিজার্ভ চুরি, শেয়ারবাজার কেলেংকারি, হলমার্ক, বেসিক ব্যাংক, বিসমিল্লাহ, ডেসটিনি- কোনোটারই বিচার হয়নি। শাস্তি পায়নি কেউ। একটা হিসেব বলে গত সাত বছরে আত্মসাৎ হয়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশের জন্য এটা কম টাকা নিশ্চয়ই নয়।

একদিকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট ও অথনৈতিক নৈরাজ্য, অন্যদিকে বিচারহীনতার সংস্কৃতি। এ যে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি। এর থেকে বেরিয়ে আসতেই হবে। কিন্তু কোথায় সেই প্রতিরোধ শক্তি?

শেষ ভরসা জনগণ। বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম। তনু হত্যার বিচার পায়নি তার গরিব বাবা-মা। কিন্তু ক্ষুব্ধ স্কুল কলেজের ছাত্রছাত্রীরা সারাদেশ জুড়ে যে প্রতিবাদের ঝড় তুলেছে, তারা কোনো দলের নয়। তারা সাধারণ ছাত্র, সাধারণ বিচারের সুযোগ থেকে বঞ্চিত জনগণেরই প্রতিনিধি। শেষ ভরসা এই নতুন প্রজন্মের উপরই রইল।