Home » মতামত » নির্বাচন কমিশনের অক্ষমতার শেষ দশা

নির্বাচন কমিশনের অক্ষমতার শেষ দশা

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

এই নির্বাচন কমিশন স্থায়ী উদাহরণ হয়ে ঢুকে যাচ্ছে ইতিহাসে। বিচারপতি মসউদ, বিচারপতি রউফ, বিচারপতি আজিজ কমিশনের উদাহরণ ছাড়িয়ে যেতে বসেছে বর্তমান কমিশন। তারা এখন ইউপি নির্বাচন সম্ভবত: নিয়তির হাতে ছেড়ে দিয়েছেন। পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী নিহতের সবশেষ সংখ্যা ১১৪ জন। বাকি আছে আরো দু’ধাপ। দেশবাসীর প্রশ্ন আর কত লাশ দেখতে চায় এই নির্বাচন কমিশন? এই হত্যাকান্ডের নৈতিক দায় কার? সরকার না নির্বাচন কমিশনের? সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, তৃণমূলের এই নির্বাচনের অতীত ইতিহাস যতই সংঘাত-সংঘর্ষের হোক না কেন-নির্বাচন কমিশনসহ স্থানীয় প্রশাসন একটি নূন্যতম মানসম্পন্ন প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা দেখিয়েছে। এবারে সেটিও গোল্লায় গেছে।

একটি জাতীয় দৈনিকের খবর- খেই হারিয়ে ফেলেছে ইসি। খবরে বলা হয়, ইউপি নির্বাচনের শেষ পর্যায়ে এসে কমিশন খেই হারিয়ে ফেলেছে। প্রার্থী-সমর্থক, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, ভোট গ্রহন কর্মকর্তা-কাউকেই কমিশন নিয়ন্ত্রনে রাখতে পারছে না। যে কারণে আগের চার ধাপের তুলনায় গত ২৮ মে পঞ্চম দফা নির্বাচনে কেন্দ্র দখল, ভোট জালিয়াতি ও সহিংসতার মাত্রা বেড়েছে। দৈনিকটি নির্বাচনে নিয়োজিত কমিশনের মাঠ কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের বরাতে রিপোর্টটি ছেপেছে।

তাহলে, এই খেই হারানো নির্বাচন কমিশন বাকি দু’ধাপের নির্বাচন কি এভাবেই সম্পন্ন করবে? আগামি নির্বাচনে আরো কত আদম সন্তানের লাশ পড়বে? যাদের জন্য নির্বাচন সেই মানুষই খুন হয়ে গেলে নির্বাচন দিয়ে কি হবে? এত হত্যাকান্ডের পর প্রধান নির্বাচন কমিশনার ভাবছেন, প্রার্থীদের মনোজগতের পরিবর্তন না হলে সহিংসতা কমবে না। তিনি দায় এড়িয়ে যাচ্ছেন এভাবে, নির্বাচনে সহিংসতা বেড়েছে, তবে জাল ভোট ও অনিয়ম কমেছে। এর মধ্য দিয়ে স্বয়ং সিইসি কবুল করে নিচ্ছেন যে, এর আগের ধাপগুলোর নির্বাচন ছিল জাল ভোট আর অনিয়মের।

সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে অসীম ক্ষমতাধর প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশনের অসহায়ত্বের প্রমান মেলে সিইসি কাজী রকিব উদ্দিনের উপর্যুক্ত ভাষ্যে! সেজন্য কমিশনকে প্রশ্নগুলি করা উচিত এবং তার জবাবও তাদের কাছে থাকতে হবে। কেন তারা শুরুতেই প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে নিয়ন্ত্রনে নেননি? কেন তারা প্রথম ধাপের সহিংসতার পরে নির্বাচন বন্ধ করে দিয়ে বলতে পারেননি, যখনই উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি হবে তখনই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

২০১৩ সালে পাঁচটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠানে বর্তমান কমিশনের কিছু ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটি থাকলেও মোটামুটি সুষ্ঠ নির্বাচন হওয়ায় আশাবাদ জেগেছিল তারা পারবেন। কিন্তু পরবর্তীকালে ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচন থেকে আজ অবধি অনুষ্ঠিত সকল নির্বাচন দেখে প্রশ্ন জাগছে ২০১৩ সালে তারা নিরপেক্ষতার ভান করেছিলেন কি কারো বিশেষ নির্দেশে? এরপরে প্রয়োজনের সময় তারা খোলস ছেড়ে আবির্ভূত হলেন স্বমহিমায়, সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস হলো। তারা এটি কেন, কার স্বার্থে করলেন?

কমিশন বোধকরি ভুলতে বসেছে, সাংবিধানিক বা বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলি সরকারের নয়, প্রজাতন্ত্রের অংশ। রাষ্ট্রের মূলনীতি রক্ষায় জন্য তারা সংবিধানের কাছে দায়বদ্ধ। কিন্তু দায়বদ্ধতা গিয়ে ঠেকছে সরকারের কাছে। ইউপি নির্বাচন ২০১৬ এর পাঁচ ধাপে অনিয়ম আর প্রাতিষ্ঠানিক অক্ষমতার যে নজির স্থাপিত হোল তা অব্যাহত থাকলে বলতেই হবে যে, আমরা প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের শেষ সীমানায় উপস্থিত হয়েছি। দ্বিধা না রেখেই বলা যায়, প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের এই আওয়াজ এবার তৃণমূলকে আঘাত করেছে বিপুলতর বেগে।

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অতীতে কোনদিন মনোনয়ন বাণিজ্যের কথা শোনা যায়নি। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন বাণিজ্যের ঘটনা আকছার ঘটেছে। দলীয় প্রতীকের নির্বাচনে এবার মনোনয়ন বাণিজ্য বি¯তৃত হয়েছে তৃণমূল পর্যন্ত। নৌকা মার্কা পেলে বিজয় মোটামুটি হাতের নাগালে- এই নিশ্চিন্ততা থেকে ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়ন পেতে লাখ লাখ টাকা খরচ করেছে প্রার্থীরা। বাণিজ্যের ফাঁক গলে ত্যাগী নেতা-কর্মীদের বদলে নৌকা মার্কা পেয়েছে অনেক এলাকায় জামায়াত ও জঙ্গী গোষ্ঠীর নেতারা।

মনোনয়ন বাণিজ্য ইউপি নির্বাচনে সহিংসতার বড় কারণ। অনেক পরীক্ষিত নেতা-কর্মী বাণিজ্যের কারণে মনোনয়ন বঞ্চিত হয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের বিদ্রোহী প্রার্থীর সংখ্যাধিক্য থাকায় সহিংসতা ও খুনের শিকার বেশি হয়েছেন তাদের নেতা-কর্মীরা। দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের হঠাৎ সিদ্ধান্ত, নিয়ন্ত্রনহীনতা এবং অর্থের বিনিময় যোগ্যতার মাপকাঠি হওয়া তৃণমূলে ক্ষমতাসীনদের বেসামাল করে দিলেও এখন সেটি দৃশ্যমান হবে না। ক্ষমতার রাজনীতির এটিই নিয়তি।

পতনের শেষ সীমানা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য সংগ্রামরত বিএনপির জন্য মনোনয়ন বাণিজ্য হয়ে উঠেছে সবচেয়ে আত্মঘাতী। এ নিয়ে বিবাদে জড়িয়ে পড়েছে দলটির শীর্ষ ও মধ্যম পর্যায়ের নেতৃত্ব। ক্ষমতায় থাকাকালে দুর্নীতি ও অর্থপাচারের দায়ে অভিযুক্ত দলটির তৃণমূলে প্রার্থী মনোনয়নে বাণিজ্য তাদেরকে আবার বড় প্রশ্নের মুখোমুখি করে দিয়েছে- আবার ক্ষমতায় গেলে কি হবে! একে তো দলটির নেতা-কর্মীদের মধ্যে বিরাজ করছে হতাশা, অন্যদিকে জাতীয় সম্মেলনের দু’মাস পরেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষিত হয়নি।

বিএনপির ত্যাগী কমীদের অনেকের হতাশা আরো বাড়বে এ কারণে যে ক্ষমতার বাইরে মামলা-হামলা ও দলীয় কোন্দলে অতলে তলিয়ে যাবার উপক্রম একটি দলের কতিপয় নেতারা কি করে মনোনয়ন বাণিজ্যে মেতে ওঠে? কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। তাহলে গণতান্ত্রিক আন্দোলন বা জনস্বার্থের পক্ষে সরকার বিরোধী আন্দোলনে এই দল কি কোন ভূমিকা রাখতে সক্ষম? কর্মীরা তাকিয়ে আছেন একক নেত্রী খালেদা জিয়ার পানে, কি পদক্ষেপ তিনি নেন?

দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুলের ভাষায়, “আমরা কঠিন সময় পার হচ্ছি, অত্যন্ত দুরূহ সময় অতিক্রম করছি। এই সময় যদি আমরা সঠিকভাবে না চলি, এই সময় যদি আমরা ঐক্যবদ্ধ না থাকি, এই সময় যদি আমরা নিজেদের মধ্যে অযথা দলাদলি, কোন্দল সৃষ্টি করি, তাহলে সত্যিকার অর্থে আমরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাব”।

আপাদমস্তক রাজনীতিবিদ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানেন, বিএনপি ধ্বংসস্তুুপ থেকে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টায় রত। সেই সময়ে দলকে ব্যবহার করে বাণিজ্যের পরিনাম কি হতে পারে তাও তার জানা আছে। অর্ধশতাধিক ফৌজদারী মামলায় ভারাক্রান্ত, ভারপ্রাপ্ত থেকে সদ্য পূর্ণ মহাসচিব হিসেবে এও তিনি জানেন, তাদের রাজনৈতিক ব্যর্থতার পরিনাম কি? তার অন্যতম কারণ হচ্ছে, কাউন্সিলের দু’মাস পরেও পূর্ণাঙ্গ কমিটির দেখা পাওয়া যাচ্ছে না। এটি চেয়ারপার্সনের একক কতৃত্ব, কারণ কাউন্সিলই ক্ষমতা তার হাতে তুলে দিয়েছে। ফলে স্থায়ী কমিটির সদস্যদের ক্ষোভ বাড়ছে, কমিটি গঠনে তারা সম্পৃক্ত নন।

ক্ষমতায় থাকলে কোন কিছুতেই কিছু যায় আসে না। যেমনটি আওয়ামী লীগের অন্তর্কলহ, প্রতিটি জেলা-উপজেলার কোন্দলে দলটি কতটা আক্রান্ত সেটি বেরিয়ে পড়বে কখনও বিরোধী দলে গেলে। নয় নয় করে নয় বছর ক্ষমতার বাইরে বিএনপির ক্ষেত্রে এখন দগদগে ক্ষতের মত দেখা দিয়েছে দলীয় কোন্দল, মনোনয়ন বাণিজ্য ও দল গোছানোর দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর প্রক্রিয়া। এজন্যই মির্জা ফখরুল আশংকা করছেন নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবার, যা ত্বরান্বিত করছে বিএনপি নেতৃত্বের অরাজনৈতিক ও ব্যবসাদার অংশটি।

সব সরকারী দল মনে করে, ক্ষমতায় থাকার মাঝেই গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও নিজেদের কল্যাণ নিহিত রয়েছে। আর বিরোধী দলে থাকলে ক্ষমতায় যাওয়াই হয়ে ওঠে একমাত্র লক্ষ্য, সেটি যে কোন প্রকারেই হোক। এইক্ষেত্রে বাংলাদেশের দুই প্রধান দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে অভূতপূর্ব মিল রয়েছে। এজন্য দু’টি দলই ক্ষমতায় যাওয়া বা টিকে থাকার প্রয়োজনে জোট বাধতে পারে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী যুদ্ধাপরাধী দল জামায়াতের সাথে বা স্বৈরাচার এরশাদ ও ধর্মান্ধ যে কোন গোষ্ঠির সাথে।

প্রয়াত জেনারেল জিয়া সামরিক শাসনের আওতায় রাজনীতিকে ডিফিকাল্ট করার কথা বলেছিলেন। মানি ইজ নো প্রবলেম বলে তিনি দেশকে কথিত উন্নয়ন জোয়ারে ভাসিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। তার পূর্বসূরী পাকিস্তান আমলে আইয়ুব খানও একই কাজ করেছিলেন এবং ঘটা করে উন্নয়ন দশক পালন করেছিলেন। বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ধারার অগণতান্ত্রিক রাজনৈতিক নেতৃত্ব মুখে জিয়ার বিরোধিতা করলেও ক্ষমতায় গেলে রাজনীতিকে ডিফিকাল্ট করে তোলার জন্য জিয়ার পথই অনুসরন করেন।

অন্যদিকে ক্ষমতা যাওয়া বা টিকে থাকার জন্য আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এরশাদীয় কৌশল অনুসরন করতে গিয়ে বারবার কথিত স্বৈরাচারের দ্বারস্থ হয়েছেন। দলের ভেতর তো নয়ই, শাসক হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনার কোথাওই তারা ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করতে চায়নি। ব্যক্তি, পরিবার, আত্মীয়তা প্রধান্য পেয়েছে সব স্তরে। সেদিক থেকে এরশাদ সফল। তার অনৈতিক রাজনীতির দুষণ প্রধান রাজনৈতিক দল ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে আক্রান্ত করেছে পরম স্বার্থকতায়।

রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংকটের বড় একটি কারণ হচ্ছে, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করে তোলা। যখনই প্রতিষ্ঠানগুলি কম-বেশি সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে, তখনই অনেক ইতিবাচক অর্জন হয়েছে। মোটামুটি সুষ্ঠ,নিরপেক্ষ নির্বাচন পাওয়া গেছে। প্রশাসনও একটি নির্দিষ্ট মানে পেশাদারিত্ব দেখাতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় থাকতে অবাধ নির্বাচনকে ভয় পায়। ব্যালটের মধ্য দিয়ে জনগনের মতামত প্রকাশ তাদের জন্য সুখকর নয়। সেজন্যই প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির বদলে দলদাস করে রাখতে চায়। এর নেতিবাচক প্রভাবে আক্রান্ত নির্বাচন ব্যবস্থা, সুশাসন ও গণতন্ত্র চর্চা। এই প্রভাবে সবচেয়ে বিপর্যয়কর শিকার জনগন।