Home » অর্থনীতি » লাগামহীন দ্রব্যমূল্য : কোথায় এখন সরকারের সেই প্রতিশ্রুতি

লাগামহীন দ্রব্যমূল্য : কোথায় এখন সরকারের সেই প্রতিশ্রুতি

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন ::

রমজান আসলে দ্রব্যমূল্য বাড়ে। সরকারী তদারকির অভাবে, অনিচ্ছায় কিছু ব্যবসায়ী এ সময়কে পুঁজি করে অধিক মুনাফা হাসিলের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। বানিজ্য মন্ত্রী যখন বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার কারনে দ্রব্যমূল্য বেড়েছে, তখনই ব্যবসায়ীদের দায়মুক্তির চর্চ্চাটিকে জায়েজ করা হয়। আর এ মাসকে কেন্দ্র করে লাগামহীনভাবে বেড়েছে নিত্যপণ্যের দর। বিশেষ করে ইফতারের অনুষঙ্গ বেগুনের দামে ‘আগুন’ লেগেছে। ইতোমধ্যে ১২০ টাকা কেজি ছুঁয়েছে সবজিটির দাম। চিনির দাম কেজিপ্রতি ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে কিছু ব্যবসায়ীর মজুদদারীর কারনে । এছাড়া কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা বেড়েছে  শশা, কাঁচামরিচ, লেবুসহ সব ধরনের সবজির দাম। পাশাপাশি ছোলাসহ সকল প্রকার ডালের বাজারও লাগামহীন। ব্যবসায়ীরা প্রতিশ্রুতি দিলেও তা রক্ষা করার কোন নজীর নেই। সরকার টিসিবিকে দিয়ে কিছু চেষ্টা চালালেও তা বড় ধরনের ফল দেয় না। চাহিদার তুলনায় বাজারে পণ্য সরবারহ পর্যাপ্ত থাকার পরও অগ্রিম মজুদ প্রবণতার জেরে দর বাড়ছে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। ক্রেতাদের অভিযোগ সরবারহ বেশি থাকা সত্বেও বেশি দামে বিক্রি করছে বিক্রেতারা। পাইকারী বাজারে দাম বাড়ায় তাদেরও বাড়তি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে বলছেন খুচরা ব্যবসায়িরা। আর নিত্যপণ্যের লাগামহীন এ দামে বিপাকে পড়েছে স্বল্প আয়ের মানুষ।

জানা গেছে, রমজান মাসে যেসব পণ্যের চাহিদা বাড়ে তার সবগুলিরই দাম ঊর্ধ্বমুখী। রাজধানীর কাঁচাবাজারগুলোতে তিন দিন আগেও যে লম্বা বেগুন বিক্রি হতো ৩০ টাকা থেকে ৪০ টাকায় (৭ জুন) তা  বেড়ে দাড়িয়েছে ১০০ টাকা থেকে ১২০ টাকায়। তাছাড়া রাজধানীর বাজারগুলোতে প্রতিকেজি কাঁচামরিচ ৮০ থেকে ১০০ টাকা, পেপে ৪০ টাকা থেকে ৪৫ টাকা, শশা ৬০ টাকা থেকে ৭০ টাকা, গাজর ৫০ টাকা থেকে ৬০ টাকা, টমেটো ৪৫ টাকা থেকে ৫০ টাকা, লেবু প্রতিহালি মান ভেদে ২০ থেকে ৫০ টাকা, ধনিয়া পাতা ২০০ টাকা থেকে ২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

ছোলা :  ব্যবসায়ীরা আগেই বলেছিলেন রমজানে ছোলার দাম ১০০ টাকা ছাড়াবে, হয়েছেও তাই। বাজারে অস্ট্রেলিয়া থেকে আমদানি করা ভাল মানের ছোলা বিক্রি হচ্ছে ১১০ থেকে ১১৫ টাকায়। এছাড়া মানভেদে প্রতিকেজি ছোলা ৯৫ থেকে ১১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) অস্ট্রেলিয়া থেকে আমদানি করা ছোলা খোলা বাজারে ট্রাক সেলে প্রতিকেজি ৭০ টাকায় বিক্রি করছে।

চিনি : খুচরা বাজারে প্রতিকেজি চিনি ৬০ থেকে ৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ গত সপ্তাহে দাম ছিল সর্বোচ্চ ৬০ টাকা। সপ্তাহের ব্যবধানে দাম বেড়েছে ৫ টাকা।  টিসিবি প্রতিকেজি চিনি দেশী চিনি ৪৮ টাকায় বিক্রি করছে।

ডাল : খুচরা বাজারে মানভেদে প্রতিকেজি মসুর ডাল ১৫০ থেকে ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তাছাড়া অ্যাংকর (বুটের) ডাল ৬০-৬২ টাকা, খেসারির ডাল ৮০ থেকে ৮৫ টাকা, বুটের ডালের বেসন ১২০ টাকা, অ্যাংকর ডালের বেসন ৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। টিসিবি মশুর ডাল ৮৯ টাকা ৯৫ পয়সায় বিক্রি করছে।

পেঁয়াজ : খুচরা বাজারে মানভেদে প্রতিকেজি দেশী পেঁয়াজ ৪০ থেকে ৪৫ টাকা এবং আমদানি করা পেঁয়াজ ৩২ থেকে ৩৬ টাকা দরে বিক্রি করতে দেখা গেছে।

রসুন : বাজারে চীন থেকে আমদানি করা রসুন ২০০ টাকা থেকে ২২০ টাকায় এবং দেশী রসুন ১২০ থেকে ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

গরুর মাংস : সিটি করপোরেশন থেকে প্রতি কেজি গরুর মাংস ৪২০ টাকা নির্ধারণ করে দিলেও দুয়েকটি বাজারে তা বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে। যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা বাজারে প্রতিকেজি গরুর মাংস ৪৫০ টাকা দরে বিক্রি করতে দেখা গেছে।

ব্রয়লার মুরগি: বাজারে দুয়েকদিন আগের চেয়ে ব্রয়লার মুরগির দাম বেড়েছে। মঙ্গলবার প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ১৭৫ টাকা থেকে ১৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

সয়াবিন তেল : প্রতিকেজি খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ৮৫ থেকে ৯৫ টাকায় (সপ্তাহের ব্যবধানে ৫ টাকা বেড়েছে)। পাঁচ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ৪৫০ টাকা থেকে ৪৫৫ টাকায়। এক লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ৯২ টাকা থেকে ৯৫ টাকায়। তবে সরকারী সংস্থা টিসিবি প্রতিলিটার সয়াবিন তেল বিক্রি করছে ৮০ টাকায়।

বাংলাদেশের জনগণ- কৃষক শ্রমিক মধ্যবিত্তরা, এখন এক অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির চাপের মধ্যে অস্থির। আগে খাদ্যাভাব ও দুর্ভিক্ষের সময় শাকপাতা খেয়ে জীবনধারণের কথা বলা হতো। এখন শাকপাতা খাওয়াও অনেকের পক্ষে অসম্ভব। শাকপাতা যখন কেজিপ্রতি ৩০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়, তখন এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। অথচ এই বাংলাদেশেও কিছুদিন আগে এই অবস্থা ছিল চিন্তার বাইরে। বিশ শতকের ষাটের দশকেও চালের দাম ছিল সেরপ্রতি দশ-বারো আনা, সরষের তেল চার টাকা, ঘি দশ টাকা, চিনি এক-দেড় টাকা, গরুর গোশত দেড় টাকা ইত্যাদি। ইলিশ মাছ পাওয়া যেত দুই-তিন টাকায়।

এটা এক সাধারণ নিয়ম যে, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধির চাপ সাধারণ অল্প আয়ের মানুষের ওপরই বেশি পড়ে। তারাই এর শিকার হয়ে চরমভাবে বিপর্যস্ত। যাদের আয় মাসে কমসেকম দুই লাখ টাকা তাদের কাছে চালের দাম কেজিপ্রতি ৫০ টাকা হলেও অসুবিধা নেই। নানা রকম শাকসবজি ৪০-৫০-৬০ টাকা কেজি হলেও তাদের কিছু যায়-আসে না। কিন্তু মূল্যবৃদ্ধি এ রকম হলে মাসে ৩-৪-৫ হাজার টাকা আয়ের মানুষের সপরিবারে নুন-ভাত খাওয়াও কষ্টের। আগে মানুষ তরকারি ছাড়া ভাত খেলেও খেত নুন-মরিচ দিয়ে। এখন মরিচের দাম কেজিপ্রতি ৪০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত! এ অবস্থায় গরিব মানুষ কীভাবে বেঁচে আছে, বেঁচে থাকলেও তাদের দেহের পুষ্টির অবস্থা তা বুঝতে পারা কী খুব কঠিন?

অথচ বর্তমান সরকার ২০০৯-এ ক্ষমতায় এসেছিল দ্রব্যমূল্য কমানো হবে এমন নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দিয়ে। ২০০৮-এর নির্বাচনে দেয়া নির্বচনী ইশতেহারে দ্রব্যমূল্য হ্রাস ছিলো অগ্রাধিকারের একনম্বর। প্রথম প্রথম নানা হুংকার আর লোক দেখানো কিছু কাজকর্ম করলেও স্বল্পকালেই তা বন্ধ হয়ে যায় তারা যাদের প্রতিনিধিত্ব করেন সেই শক্তি অর্থাৎ ব্যবসায়ীদের কারণেই।