Home » অর্থনীতি » মোটা চালের দাম বৃদ্ধি : নির্বিকার সরকার, অসহায় মানুষ

মোটা চালের দাম বৃদ্ধি : নির্বিকার সরকার, অসহায় মানুষ

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন ::

চাল নিয়ে চলছে চক্রান্ত; সিন্ডিকেট চাল মজুদ করছে। পরিকল্পিতভাবে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে চালের বাজারে। মিলার, পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ী নিজ অবস্থান থেকে অতিমাত্রায় মুনাফার চেষ্টা করছেন। ফলে এক-দুই মাসের ব্যবধানে মণপ্রতি মোটা চালের দাম বেড়েছে প্রায় পাঁচশ’ টাকা। সরু চালের দাম বেড়েছে তিনশ’ টাকা। এ পরিস্থিতিতে সরকার দুস্থ পরিবারের জন্য ১০ টাকা কেজি দরে চাল বাজারে ছেড়েছে। কিন্তু দুর্নীতির কারণে সরকারের এ কর্মসূচি খুব বেশি সফল হচ্ছে না বলে জানা গেছে।

বর্তমানে ইরি, বোরো এবং আমন মৌসুমের মধ্যবর্তী সময় চলছে। বাজারে ধানের সরবরাহ কম। এই সুযোগ নিচ্ছে চাল ব্যবসায়ীদের অসাধু সিন্ডিকেট। তারা চাল ধরে রাখায় দাম বাড়ছে। এতে সবচেয়ে বেশি বেকায়দায় পড়েছেন দুস্থ মানুষগুলো। ব্যবসায়ীদের কারসাজির কারণে তাদের ২৮ টাকা কেজির মোটা চাল ৪০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। দু’মাস আগে ২৮ টাকা কেজি হিসাবে এক মণ চালের দাম ছিল ১১২০ টাকা। এখন সেই চাল কিনতে হচ্ছে ১৬০০ টাকায়। একইভাবে মানভেদে সরু চালের দাম বেড়েছে কেজিপ্রতি সাত থেকে সাড়ে সাত টাকা। অথচ আড়তে চালের কোনো অভাব নেই। তবুও দাম বাড়ছেই।

দেশে মজুদ খাদ্যশস্যের পরিমাণ ১০ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন। এর মধ্যে ৭ লাখ ২৯ হাজার মেট্রিক টন চাল এবং ২ লাখ ৯১ হাজার মেট্রিক টন গম। পাইকারি ব্যবসায়ীদের মতে, মাত্র ১২ থেকে ১৫ মিল মালিকের কাছে চালের বাজার জিম্মি হয়ে পড়েছে। পর্যাপ্ত মজুদ থাকার পরও তারা চাল নিয়ে কারসাজি করছেন। ইচ্ছেমতো চালের সরবরাহ দিচ্ছেন। তারা মজুদ থেকে বাজারজাত করছেন কম; দাম নিয়ন্ত্রণ করছেন। এর ফলে বাজার স্থির থাকছে না। অজুহাত হিসেবে ব্যবসায়ীরা দোষ চাপাচ্ছেন চলতি মৌসুমে সরকারের অভ্যন্তরীণ ধান-চাল সংগ্রহের নীতিকে। সরকার বেশি দামে বাজার থেকে ধান কিনছে বলে মিল মালিকরা অভিযোগ করছেন। তাদের মতে সরকারের সংগ্রহ মূল্যের কারণে বাজারে ধানের দাম বেশি। মিল মালিকরা বেশি দামে ধান কিনে কম দামে চাল বিক্রি করতে পারবে না।

জানা গেছে, দেশে ১৭ হাজার হাস্কিং মিল আছে। এসব মিল প্রতি ১৫ দিনে সাড়ে ১১ লাখ টন চাল তৈরি করতে পারে। কিন্তু ধানের সরবরাহ না পাওয়ায় শত শত মিল চাল উৎপাদন করতে পারেনি। সরকারের পাশাপাশি চালকল মালিকরা যাতে বাজার থেকে ধান সংগ্রহ করতে পারে সেজন্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছিল। কিন্তু খাদ্য মন্ত্রণালয় তা আমলে নেয়নি। সরকার এককভাবে ৮৫ ভাগ ধান কেনায় বেসরকারি মিল মালিকরা ধানের সংকটে পড়ে। তারা কৃষকের কাছ থেকে বেশি দামে ধান কিনে চাল করেছেন। এ কারণে দাম বেশি পড়ছে বলে মিল মালিকরা দাবি করেন।

বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, দেশে চালের কোনো সংকট নেই। বরং প্রতিবছর ৩০ থেকে ৪০ লাখ টন চালের উদ্বৃত্ত থাকছে। চালের যে চাহিদা আছে তার চেয়ে বেশি উৎপাদন হচ্ছে। তিনি বলেন, চাহিদা ৩ কোটি ২৮ লাখ টন। এ বছর উৎপাদন হয়েছে ৩ কোটি ৮৬ লাখ টন। ফলে বিপুল পরিমাণ চাল উদ্বৃত্ত থাকবে। তিনি স্বীকার করেছেন, দেশীয় কৃষকদের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতেই চাল আমদানির ওপর ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। শুধু এ কথা বলেই ক্ষান্ত হয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী। যারা অবৈধভাবে চালের দাম বাড়াচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না সরকার। কর্তৃপক্ষের নাকের সামনেই দাম বাড়ানো হচ্ছে কিন্তু তারা কিছুই বলছে না।

খবর মিলছে, উত্তরাঞ্চলে ধানপ্রধান কয়েকটি জেলা থেকে দেশে চাল সরবরাহ কমে যাওয়ায় দেশের বিভিন্ন স্থানে আকস্মিকভাবে দাম বেড়ে গেছে। উত্তরাঞ্চলের চালপ্রধান চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নওগাঁ, বগুড়াসহ আশপাশের জেলাগুলোর মিল মালিকরা বলছেন, সরকারের খাদ্য সংগ্রহ বা খাদ্য ক্রয়নীতির প্রভাব পড়েছে চালের বাজারে। খুচরা ও পাইকারি বাজারে চালের দাম বাড়ছে। বিশেষ করে গত এক মাসে অন্য চালের তুলনায় মোটা চালের দাম আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় অসুবিধায় পড়েছেন নিম্ন আয়ের মানুষজন।

বাজারে রোজার ঈদের পর থেকে মোটা চালের দাম কেজিতে ১৫ টাকা থেকে ২০ টাকা করে বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে বাজারে মোটা চাল ও চিকন চালের দামের ব্যবধান বর্তমানে খুবই সামান্য। বাজারে চিকন চালের মধ্যে মিনিকেট চালের ৫০ কেজির বস্তা পাইকারি ২২শ থেকে ২৪শ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। নাজিরশাইল (ভাল) ২৩শ টাকা এবং জিরা নাজির ৫০ কেজির বস্তা ২২শ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। নিম্ন আয়ের মানুষের প্রধান খাবার ভাত। আর দাম কম হওয়ার কারণে তারা মূলত মোটা চালই কিনে থাকেন। কিন্তু মোটা চালের দাম অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়ে এখন প্রায় চিকন চালের কাছাকাছি। মোটা চালের দাম অবিলম্বে সহনীয় মাত্রায় নামিয়ে আনতে সরকারের প্রতি জোর দাবি জানান তারা। চালের দাম বৃদ্ধির ব্যাপারে চাল ব্যবসায়ীদের দাবি, সরকারের কিছু নীতির সুযোগ গ্রহণ করে চাতাল ও মিল মালিকদের স্বেচ্ছাচারিতার কারণে চালের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে করে লাভ কম হওয়ায় তাদের ব্যবসাতেও ক্ষতি হচ্ছে। এবারে মোটা চালের দাম সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। ২২ টাকার চাল ৪০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। কেজিপ্রতি এক টাকাও লাভ হচ্ছে না। যারা মোটা চাল কিনতো তারা, অধিকাংশই চিকন চালের সঙ্গে ব্যবধান কম হওয়ায় বাধ্য হয়ে চিকন চাল কিনছেন। বাজারে চাল কিনতে এসে নিম্নআয়ের মানুষজনকে হাঁসফাঁস করতে দেখা গেছে।

গত রোজার ঈদের পর থেকেই উত্তরবঙ্গসহ সারাদেশে চালের দাম বাড়তে শুরু করে। ২২ টাকা কেজি দরের মোটা চালের দাম বেড়ে ৩৮ থেকে ৪০ টাকায় পৌঁছেছে। সরকারের সংগ্রহ নীতির দুর্বলতার কারণেই মোটা চালের দাম বেড়েছে। এছাড়া কৃষকরাও গত কয়েক বছর ক্ষতির শিকার হয়ে মোটা ধান (স্বর্ণা) চাষ কমিয়ে দিয়েছেন। খবর মিলছে, লাভজনক হওয়ায় সবাই চিকন চালের ধান চাষের দিকে ঝুঁকছেন। এসব কারণে মোটা চালের সঙ্কট দেখা দেওয়ায় ‘অটোমেটিক’ চালের দাম বেড়ে যায়। সরকারের চাহিদা পূরণে প্রতিটি মিল মালিক এক সাথে মাঠে নামার পর ধানের দাম বেড়ে গেল। পরিস্থিতি এমন হয় যে, চালের দাম বাড়ার পরেও ২ থেকে ৩শ টাকা লোকসান দিয়ে সরকারকে চাল দিতে হয়েছিল। আর এর প্রভাব পড়ে সার্বিক চালের বাজারে। চিকন জাতের চালের দাম আরও কমতে পারে। তবে নভেম্বরে আমন ধান বাজারে আসার আগ পর্যন্ত মোটা জাতের ধান কিংবা চালের দাম খুব একটা কমবে না। অনেক দিন ধরেই গরিবের খাদ্য মোটা চালের দাম বাড়ছে। কৃষকরা সরাসরি অসহায় ভুক্তভোগী হলেও মজুদদাররা ঠিকই মুনাফা হাতিয়ে নিচ্ছে।