Home » অর্থনীতি » এশিয়ায় অনিশ্চয়তা আর অস্বস্তি :: চীন-মার্কিন বানিজ্য যুদ্ধ!

এশিয়ায় অনিশ্চয়তা আর অস্বস্তি :: চীন-মার্কিন বানিজ্য যুদ্ধ!

ইকোনমিস্ট-এর বিশ্লেষণ ::

অনেক অনেক দিন আগে থেকে আমেরিকান গ্র্যান্ড স্ট্যাটেজি তিনটি স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত : উন্মুক্ত বাণিজ্য এবং তা থেকে সৃষ্ট সমৃদ্ধি; জাপান থেকে অস্ট্রেলিয়া হয়ে সিঙ্গাপুর পর্যন্ত দৃঢ় আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক মিত্রতা; এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিকাশ। আমেরিকার নব-নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এগুলোর কোনোটিকে পরোয়া করেন কি না, তা স্পষ্ট নয়। তার বিজয়ে এশিয়ায় আমেরিকান শক্তি ও মর্যাদায় বিরাট আঘাত বিবেচিত হচ্ছে।

বাণিজ্য দিয়ে শুরু করা যাক। কয়েক বছর ধরেই ওবামা প্রশাসন সবার জন্য সমান সুযোগ-সংবলিত, স্বচ্ছ বাণিজ্য চুক্তি হিসেবে ১২ জাতি ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপকে (টিপিপি) এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। দেশে এটা সহজে গ্রহণযোগ্য হবে না মনে হলেও, ধারণা করা হচ্ছিল রিপাবলিকান প্রাধান্যপূর্ণ কংগ্রেস শেষ পর্যন্ত এটা পাশ করে দেবে। এখন তা হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। আইনপ্রণেতারা জাতীয় মনোভাবের প্রতি স্পর্শকাতর এবং ট্রাম্পের ভোটাররা আর যা-র জন্যই ভোট দিয়ে থাকুক না কেন, অন্তত এশিয়ার সাথে ওই বাণিজ্য চুক্তির জন্য নয়।

সত্যি সত্যিই আমেরিকার বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার চীনের সাথে বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করতে চান ট্রাম্প। এই লক্ষ্যে তিনি চীনা পণ্যের ওপর ৪৫ ভাগ কঠিন কর আরোপের কথা ভাবছেন। এ ধরনের যুদ্ধ শুরু হলে সম্ভবত আমেরিকাই হবে এর বৃহত্তম শিকার। আর তা এশিয়ায় বিস্তৃত উৎপাদন নেটওয়ার্ক দিয়ে ধেয়ে চাকরি শেষ করে দেবে, আত্মবিশ্বাসে আঘাত হানবে।

ট্রাম্পের অর্থনৈতিক উপদেষ্টাদের মধ্যে থাকা একমাত্র অর্থনীতিবিদ (বাকিরা আসলে ব্যবসায়ী) পিটার ন্যাভ্যারোর মতে, আমেরিকার উৎপাদন খাতে ধস সৃষ্টির জন্য দায়ী চীন। বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতাকে তিনি মনে করেন বিশ্বের অর্থনৈতিক সমস্যার মূল কারণ। মূলধারার জনমতে এসব দৃষ্টিভঙ্গি বেশ আলোচিত। তবে যেহেতু ট্রাম্প প্রশাসনে ন্যাভ্যারো বিশেষ গুরুত্ব পাবেন, তাই তার মনোভাবকে এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই।

ট্রাম্প বলেছেন, তিনি প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে আমেরিকাকে সরিয়ে নেবেন, চীনের সাথে বারাক ওবামার করা জলবায়ু সমঝোতা, যেটাকে সাইনো (চীন) -আমেরিকান সম্পর্কের গুটিকতেক উজ্জ্বল বিন্দুর অন্যতম মনে করা হয়, বাতিল করে দেবেন।

বিশ্বের বৃহত্তম ও সবচেয়ে প্রাণবন্ত মহাদেশ হিসেবে এশিয়ার প্রতি আরো বেশি মনোযোগ দিতে বারাক ওবামা ‘এশিয়া ভরকেন্দ্র’ ধারণা বিকশিত করে তুলেছিলেন। এটাও এখন হুমকির মুখে পড়েছে। তার জয়ে এশিয়ায় আমেরিকার মিত্ররা বেশ অস্বস্তিতে পড়বে। বারাক ওবামা চেয়েছিলেন চীনের মাধ্যমে উত্তর কোরিয়াকে সংযত করতে। তা না হলে এই দেশটি দূরপাল্লার পরমাণু বোমাবাহী ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করে ফেলতে পারে। সেক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র আক্রান্ত হতে পারে। হিলারি ক্লিনটন সেটা বুঝতেন। আর তা-ই জয় নিশ্চিত মনে করে তিনি এশিয়া বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি টিমও গঠন করে ফেলেছিলেন।

ট্রাম্প কিন্তু এসব কিছু বোঝেন না। এসব ব্যাপারে কে তাকে পরামর্শ দেবে, সেটাও নিশ্চিত নয়। নির্বাচনী প্রচারকাজের সময় তিনি আমেরিকার নিরাপত্তার আশ্বাসে বসে না থেকে জাপান আর দক্ষিণ কোরিয়াকে নিজ নিজ প্রতিরক্ষা খাত জোরদার করার আহবান জানিয়েছেন। তিনি এমনকি দক্ষিণ কোরিয়াকে পরমাণু অস্ত্র তৈরির পরামর্শ দিয়েছেন।

তার এসব কথার সূত্র ধরে বলা যায়, তিনি এশিয়ার সাথে তেমনভাবে সম্পৃক্ত থাকবেন না। আর সেটাই যদি হয়, তবে তা হবে চীনের জন্য মহাসুযোগ। চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি মনে করে, চীন হলো উদীয়মান শক্তি, আর আমেরিকার অবস্থা ভাটার দিকে।

ট্রাম্পের জয় আসলে আমেরিকার দুর্বলতাই ফুটিয়ে তুলেছে। সামরিক বাহিনীর সাথে সম্পৃক্ত  গ্লোবাল টাইমস লিখেছে, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও পাশ্চাত্য সম্ভবত চীনের চেয়ে অনেক বেশি দুর্ভোগ পোহাবে। আমরা এখন কেবল তাকে অবাধে তার কাজ করার সুযোগ দিয়ে তিনি কত বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারেন, তা দেখার অপেক্ষায় থাকতে পারি।’