Home » বিশেষ নিবন্ধ » মওলানা ভাসানী : ইতিহাসের নির্মাতা ও স্রষ্টা – (প্রথম পর্ব)

মওলানা ভাসানী : ইতিহাসের নির্মাতা ও স্রষ্টা – (প্রথম পর্ব)

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

গোটা বিশ শতকের সত্তর দশকের মধ্যভাগ পর্যন্ত উপমহাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে হিসেবে মজলুম জনগনের নেতৃত্বের প্রতীক হয়েই ছিলেন মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী। শুধু উপমহাদেশ বলছি কেন, পঞ্চাশ-ষাট দশকে বিশ্বের দেশে দেশে শোষণমুক্তির লড়াইয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন আফ্রো-এশিয়া-লাতিন আমেরিকার নিপীড়িত মানুষের মুক্তির অন্যতম প্রতীক। প্রায় আশি বছরের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের সবটা জুড়েই ছিল ইতিহাস সৃষ্টির। আট দশকের রাজনীতির ইতিহাস পরিবর্তনের প্রতিটি বাঁকে তিনি ছিলেন প্রধান বা অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র। পাকিস্তান জন্মের পর আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে মৃত্যুর মাত্র কিছুদিন আগে শেষ ইতিহাসটি সৃষ্টি করেছেন, ফারাক্কা মিছিলের মধ্য দিয়ে। তখন তার বয়স ৯৬ বছর।

১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠাকালে আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন মওলানা ভাসানী। প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদী এই নেতা ছিলেন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী এবং সমাজতান্ত্রিক শিবিরের প্রতি অনুরক্ত। তার নেতৃত্বেই আওয়ামী লীগ অসম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক চরিত্র অর্জন করে। তৎকালীন পূর্ববাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালী মুসলমানদের স্বপ্নভঙ্গ হচ্ছিলো ততদিনে। সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র পাকিস্তানের ব্যাপারে মোহমুক্তি ঘটছিল। ধীরে ধীরে গোটা জাতি সেক্যুলার জাতীয়তাবাদের দিকে ঝুঁকে পড়ছিল। আর এই ধারার নেতৃত্বে ছিলেন মওলানা ভাসানী।

পাকিস্তানের জমিদার ও নব্য পুঁজিপতিদের প্রতিভূ পরিবারগুলির শোষনের নীল নকশা বাঙালীদের অগ্রবর্তী অংশ অনুধাবন করতে পারছিল। এর ফলে স্বতন্ত্র নির্বাচনের বদলে যুক্ত নির্বাচনের দাবি ওঠে। ভাষা ও স্বাধিকারভিত্তিক স্বায়ত্তশাসিত পূর্ববাংলা গঠনের দাবিও সামনে চলে আসে। শিল্প-বাণিজ্যে বঞ্চনার শিকার হওয়া সত্ত্বেও একটি নগরভিত্তিক শিক্ষিত নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেনী গড়ে উঠতে শুরু করে। সমাজ চেতনায় অধুনিক ও প্রগতিশীল এই শ্রেনী রাজনীতির সামনের কাতারে চলে আসে। ফলে রাজনীতির নতুন মেরুকরণ ও গুনগত পরিবর্তন সূচিত হয়।

যুক্তফ্রন্ট গঠন করে সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে ১৯৫৫ সালে আওয়ামী লীগ প্রথম রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। দল হিসেবে এটি আওয়ামী লীগকে পেছন যাত্রায় সামিল করে দিয়েছিল। ক্ষমতার প্রতি মোহহীন ভাসানী দলীয় সভাপতি হিসেবে প্রাণপন চেষ্টায়ও এই পেছন যাত্রা রুখতে পারেননি। এর মূল কারণ ছিল, ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে সরকারে অংশগ্রহনকারী নেতৃবৃন্দ ছিলেন রাজনীতিতে ডান ঘরানার অনুসারী এবং পাকিস্তানের সামন্ত প্রভু ও নব্য পুঁজিপতিদের সাথে সমঝোতার মাধ্যমে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছিলেন।

সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে ক্ষমতালোভীরা সংগ্রামের চেয়ে আপোষে বেশি বিশ্বাসী ছিলেন। সামরিক বাহিনীর পৃষ্ঠপোষকতায় পাকিস্তানের সাম্প্রদায়িক অবাঙালী শাসকদের সাথে হাত মিলিয়েছিলেন সোহরাওয়ার্দী। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদেরও আস্থাভাজন ছিলেন তিনি। সময়টি ছিল পৃথিবী জুড়ে স্নায়ুযুদ্ধের এবং মার্কিন ও সোভিয়েত বলয় বিস্তারের আগ্রাসী কাল। এ সময়ে সম্পাদিত পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি, সিয়াটো ও সেন্টোসহ মার্কিন সহযোগিতার ব্যাপারে তিনি ছিলেন অত্যন্ত উদার। কেন্দ্রে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার জন্য এ কাজগুলি করলেও তিনি শেষ রক্ষা করতে পারেননি।

১৯৫৪ সালের ১৯ মে স্বাক্ষরিত হয় পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি। দলের মধ্যে মওলানা ভাসানী ছিলেন একমাত্র নেতা যিনি সরকারের করা এই চুক্তির কট্টর বিরোধিতা করেছিলেন। অন্যদিকে সে সময়ে বিরোধী দলের নেতা হওয়া সত্ত্বেও সোহরাওয়ার্দী চুক্তির স্বপক্ষে ছিলেন। এ প্রেক্ষাপটে ১৯৫৫ সালে যুক্তফ্রন্ট ভেঙ্গে যায়। আওয়ামী লীগে ভাসানী ও সোহরাওয়ার্দীর মধ্যেকার দ্বন্দ্ব প্রকট হতে থাকে। এই নীতিগত দ্বন্দ্বের মূলে ছিল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা, পূর্ববাংলার স্বাধিকার ও স্বায়ত্ত্বশাসন, বৈদেশিক নীতিতে জোট নিরপেক্ষ পদ্ধতি অনুসরন।

এরকম একটি আন্ত:দলীয় বিরোধপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশে ১৯৫৭ সালের ০৭ ও ০৮ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইলের কাগমারিতে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক সম্মেলনে দলের মধ্যে ভাঙ্গনের আলামত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সম্মেলনের আগে ১৩ জানুয়ারি ভাসানীর রাজনৈতিক বক্তব্যভিত্তিক প্রচারপত্রে কেন্দ্র ও প্রদেশে প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী সরকারের প্রতি দলীয় সভাপতির তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ পেয়েছিল। একই বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত “কাগমারির ডাক” শিরোনামের প্রচারপত্রে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে দলীয় সভাপতি হিসেবে ভাসানীর মতামত দলের প্রতিই নির্দেশ করা হয়।

কাগমারির ডাক প্রচারপত্রে আহবান জানানো হয়;

এক. সাড়ে চার কোটি বাঙালীর বাঁচার দাবি আঞ্চলিক স্বায়ত্ত্বশাসনের ডাক;

দুই. ঐতিহাসিক মহান একুশ দফা আদায়ের ডাক;

তিন. চাষী, মজুর, কামার, কুমার, ব্যবসায়ী, বুদ্ধিজীবি ও শিল্পী সকল শ্রেনীর মিলনের ডাক;

চার. সাম্রাজ্যবাদের কবল হইতে এশিয়া আফ্রিকার সংগঠিত হইবার ডাক;

পাঁচ. পূর্ববাংলায় ষাট হাজার গ্রামে আওয়ামী লীগকে সংগঠনের ডাক;

প্রচারপত্রে মওলানা ভাসানীর বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়; “একুশ দফার পূর্ণ রূপায়নের জন্য আমাদের নিরবিচ্ছিন্ন আন্দোলন চালাইয়া যাইতে হইবে। ইহা সারা পাকিস্তানের সামাজিক ও আর্থিক পরাধীনতার হাত হইতে মুক্তির মহান শপথ, ইহা যেন আমরা কখনও বিস্মৃত না হই”।

কিন্তু কেন্দ্রীয় প্রাদেশিক সরকারে অংশগ্রহনকারী আওয়ামী লীগ নেতারা ক্ষমতায় গিয়ে একুশ দফা সত্যি বিস্মৃত হয়েছিলেন এবং প্রচারপত্রে দাবিগুলো তুলে তাদের গৃহীত নীতিকেই আঘাত করা হয়েছিল। একমাত্র পাঁচ নম্বর ছাড়া বাকি দফাগুলি উপস্থাপিত হয়েছিল কারন বিদ্যমান আওয়ামী লীগ সরকার সেগুলি পূরণে ব্যর্থ হয়েছেন। চার নম্বর দফা সোহরাওয়ার্দীর বৈদেশিক নীতির প্রত্যক্ষ সমালোচনা। স্বায়ত্ত্বশাসনের দাবিও উপস্থাপিত হয়েছিল সরকারের আপোষকামীতা ও সীমাবদ্ধতার জন্য।

১৯৫৭ সালের ৬ জানুয়ারি মওলানা ভাসানীর বক্তব্য তুলে ধরে দৈনিক সংবাদ; “আমি কোন প্রকার যুদ্ধজোটে বিশ্বাস করি না। বিশ্বশান্তি পরিপন্থী যে কোন প্রকার যুদ্ধজোট মানব সভ্যতা ও মুক্তির পথে বাধা স্বরূপ। … যত কঠিন বাধাই আসুক না কেন আমি পাকিস্তানের জনগনের ভবিষ্যত কল্যানের জন্য স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির জন্য সংগ্রাম করে যাব। কারন আমি বিশ্বাস করি এই সত্যিই পাকিস্তানের জনগনের প্রকৃত মুক্তি ও শান্তির পথ প্রশস্ত করিবে”।

কাউন্সিলের প্রাক্কালে সভাপতির পক্ষ থেকে দলীয় সরকারের বিরোধিতায় প্রকাশ্য বক্তব্য প্রচার, ইত্তেফাকে জবাব দেয়া ও ভাসানীর তীব্র সমালোচনা আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক দ্বিধাবিভক্তি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সম্মেলনের আগের দিন ৬ ফেব্রুয়ারি কাগমারীতে সমবেত চার হাজার দলীয় কর্মীর সামনে মওলানা ভাসানী বলেন, “আমাকে যদি কেহ সামরিক চুক্তি সমর্থন করিতে বলেন, তাহা হইলে কবর হইতেও আমি বলিব না, না, না”।

এসব নিয়ে তীব্র বাক-বিতন্ডার পর ৮ ফেব্রুয়ারি রাতে সমর্থকদের নিয়ে সোহরাওয়ার্দী ঢাকায় চলে আসেন। কাউন্সিল সভা পুনরায় শুরু হলে তাদের অনুপস্থিতিতেই পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি বাতিল ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া চুক্তি সংস্থার (সিয়াটো) সদস্যপদ প্রত্যাহারের দাবিতে প্রস্তাব গৃহীত হয়। সোহরাওয়ার্দী ও সমর্থকগন এই প্রস্তাব অগ্রাহ্য করে ভাসানীর বিরুদ্ধে অপপ্রচারে লিপ্ত হন। পরিনামে ১৯৫৭ সালের ১৮ মার্চ মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে পদত্যাগ পত্র পাঠিয়ে দেন সাধারন সম্পাদকের বরাবরে। কয়েকদিন পরেই স্ব-নামে প্রকাশিত প্রচারপত্রে তার অবস্থান ব্যাখ্যা করেন;

“গদির মোহে মুসলিম লীগের সহিত হাত মিলাইয়া যাহারা সাড়ে চার কোটি বাঙালীকে চিরকালের জন্য ক্রীতদাস বানাইতে, আঞ্চলিক স্বায়ত্ত্বশাসনের দাবি বিসর্জন দিয়া পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র পাশ করিয়াছিল, তাহারাই আমার ও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সংবাদপত্রে বিবৃতি, পোষ্টার, বিজ্ঞাপন ছড়াইয়া সারা দেশময় মিথ্যা প্রচার শুরু করিয়াছে। এইসব কুচক্রীদের দেশবাসী ভাল করিয়া চিনে। তাহারাই গত নয় বছর ধরিয়া পূর্ববাংলা তথা পাকিস্তানের অর্থনীতির কাঠামোকে চরম বিপর্যয়ের মুখে ঠেলিয়া দিয়াছে”।

চূড়ান্ত ভাঙ্গনের দিকে আওয়ামী লীগ এগোতে থাকে বিবৃতি-পাল্টা বিবৃতি, বহিষ্কার-পদত্যাগ ইত্যাদির মধ্য দিয়ে। পরবর্তী জুন মাসের ভোটাভুাটিতে সোহরাওয়ার্দীর বৈদেশিক নীতির পক্ষেই অধিকাংশ প্রতিনিধি ভোট দেন। সুস্পষ্ট অভিযোগ ওঠে যে, ভাসানীর সমর্থকদের একটি বড় অংশকে ভোট প্রয়োগের সুযোগ দেয়া হয়নি। সোহরাওয়ার্দীর সাথে দলের মূল নেতৃত্বের অধিকাংশ এবং প্রাদেশিক মন্ত্রীসভায় মাহমুদ আলী ছাড়া সকলে এর পক্ষে থাকায় এ কারচুপি সম্ভব হয়েছিল।

আওয়ামী লীগে বিবাদমান দুই উপদলই পূর্ববাংলায় স্বায়ত্ত্বশাসন প্রশ্নে একমত ছিলেন, পার্থক্য ছিল প্রকাশভঙ্গির ক্ষেত্রে। ভাসানীপন্থীদের যুক্তি ছিল, পাকিস্তানের জন্মের পর থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানী নেতৃত্ব পূর্ববাংলাকে শোষণ করে চলেছে, এমনকি পশ্চিম পাকিস্তানের প্রদেশ ও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠির ওপর পাঞ্জাবীদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রন চলছে, তাদের সাথে আপোষের কোন স্থান নেই। বরং অধিকারবিহীন জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে পাঞ্জাবকেন্দ্রিক শাসন-শোষণের অবসান ঘটাতে হবে। সোহরাওয়ার্দী পন্থীদের যুক্তি ছিল, আপোষের মাধ্যমে কৌশলে সায়ত্ত্বশাসনের দাবি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

এই যুক্তির নেপথ্যে ছিল, ক্ষমতার অংশীদারিত্ব নিরাপদ রাখা। পশ্চিম পাকিস্তানী নেতৃত্বের সাথে ঘনিষ্ঠতা ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের জন্য জায়গা তৈরী করে দেয়ার বিষয়টি ছিল বাঙালীর স্বাধিকার এবং সায়ত্ত্বশাসনের বিপক্ষে। ইতিহাস প্রমান করে দিয়েছে আপোষকামীতার মাধ্যমে আর যাই হোক দাবি আদায় করা সম্ভব না। এর পরিনতিতে ১৯৬২ সালে বৈরুতে সোহরাওয়ার্দীর রহস্যময় মৃত্যুর পেছনে পাকিস্তানীর সেনাশাসকদের হাত ছিল, সেটি প্রমানের অপেক্ষা রাখে না। পরবর্তীতে এই মূলগত দাবি পরিনত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধে।

পঞ্চাশ-ষাট দশকে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা এবং ইসলামী সাম্যবাদে বিশ্বাসী মওলানা ভাসানী ক্ষমতালোভী নেতাদের বিপরীতে শোষিত জনগনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। সোচ্চার ছিলেন যে কোন ধরনের অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে। তার সাথে যুক্ত হয়েছিল কমিউনিষ্ট মতাদর্শে উদ্ভুদ্ধ ও শ্রমজীবি মানুষের অধিকার আদায়ে অঙ্গীকারাবদ্ধ বিশাল রাজনৈতিক কর্মীদল। বুর্জোয়া গণতন্ত্রে তাদের আস্থা-বিশ্বাস না থাকায় এর মাধ্যমে পূর্ববাংলায় স্বায়ত্ত্বশাসন বা একুশ দফা বাস্তবায়িত হবে-এ বিশ্বাস তাদের ছিল সামান্যই। (চলবে)