Home » অর্থনীতি » ভারতে নোট বাতিলের প্রভাব : নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষন
Jammu: Vaishno Devi pilgrims showing demonetized 500 and 1000 rupees notes in Jammu on Wednesday. PTI Photo (PTI11_9_2016_000308A)

ভারতে নোট বাতিলের প্রভাব : নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষন

কৌশিক বসু

অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ

ভারত সরকার ৮ নভেম্বর সে দেশের সবচেয়ে বড় দুটি নোট অবিলম্বে বাতিলের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। ভারতীয়রা চলতি বছরের শেষ পর্যন্ত বাতিল হওয়া নোটগুলো বদলিয়ে নিতে পারবে। প্রধানমন্ত্রী ‘নরেন্দ্র মোদি’ নামের একটি স্মার্টফোনের মাধ্যমে সরকার একটি সমীক্ষা প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যাতে দেখা গেছে, ৯০ ভাগ লোক তথাকথিত নোটবাতিলকরণ-নীতি সমর্থন করে।

যথার্থভাবেই এই সমীক্ষার সমালোচনা করা হয়েছে। ওই ঘোষণাটির দুই সপ্তাহ পরও ভারতবাসী আতঙ্ক নিয়ে ব্যাংকগুলোতে ছুটছে; এটিএম ও টেলারগুলো সকালে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই টাকাশূন্য হয়ে পড়ছে। ভারতে সব লেনদেনের প্রায় ৯৮ ভাগ হয়ে থাকে নগদে।

বলা হচ্ছে, দুর্নীতি, সন্ত্রাসী কাজে অর্থায়ন ও মুদ্রাস্ফীতি দমনের জন্য এই পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু তা বাস্তবায়ন করার সময় প্রচলিত নিয়মের দিকে নজর না দিয়ে খুবই বাজে রূপরেখা প্রণয়ন করা হয়েছিল। ফলে তা ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এখন পর্যন্ত যে প্রভাব দেখা গেছে তা মধ্য ও নিম্নমধ্যবিত্ত এবং সেইসাথে গরিবদের জন্য বিপর্যয়কর বলে প্রমাণিত হয়েছে। আরো খারাপ কিছুও হতে পারে।

ভারতে ‘কালো টাকা’ নামে পরিচিত কর ফাঁকি দেওয়া নগদ অর্থ বা অন্যান্য আকারে বিপুল সম্পদ রয়েছে। ২০১০ সালের বিশ্বব্যাংকের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, এটাই সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য, ভারতে ‘শ্যাডো অর্থনীতির’ (অবৈধ অর্থনৈতিক কার্যক্রম) পরিমাণ জিডিপির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ।

আয় স্তরের ওপরের স্তরে থাকা লোকজন সবচেয়ে বেশি ফাঁকি দেয় বলে কালো টাকা বৈষম্য বাড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা সৃষ্টি করে। সরকারও অবকাঠামো নির্মাণ, স্বাস্থ্য পরিচর্যা ও শিক্ষার মতো জনসেবামূলক কাজে ব্যয় করার মতো অর্থ থেকে বঞ্চিত হয়। বিশ্বব্যাংকের ২০১২ সালের হিসাব অনুযায়, ভারতে জিডিপির তুলনায় মাত্র ১১ ভাগ লোক কর দিয়ে থাকে। অথচ ব্রাজিলে তা ১৪ ভাগ, দক্ষিণ আফ্রিকায় ২৬ ভাগ এবং ডেনমার্কে প্রায় ৩৫ ভাগ।

এসব সমস্যা নিরসনে সরকারের ইচ্ছা প্রশংসনীয়। তবে নোট বাতিলকরণের কাজটি খুবই কঠোর হয়ে গেছে। এটা দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাময়িকভাবে হয়তো ফলপ্রসূ হবে, কিন্তু তা হলেও পুরো অর্থনীতিকে আঘাত করবে।

পুরনো নোট বদলাতে গিয়ে অনেক ভারতীয় ব্যাংকের সামনে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে গুঁতাগুতি করেছে। বিশেষ করে গরিবদের মধ্যে বেপরোয়া ভাবটি সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। কারণ তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নেই। তারা নগদ আয় দিয়ে দিন চালায়।

আড়াই লাখ রুপির বেশি বদলাতে চাইলে তাকে কারণ দেখাতে হবে; তা না পারলে তাকে জরিমানা গুণতে হবে। এই শর্তটিই দুর্নীতির নতুন পথের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ এখন ছোট ছোট অংশে বিভক্ত হয়ে অবৈধ কুরিয়ারদের বিভিন্ন দল জমা করছে।

নোট বাতিল করার ফলে তারাই সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যারা টার্গেট ছিল না। জুয়েলারি বা ভূ-সম্পত্তি কেনাবেচার কাজটি মূলত নগদে হয়ে থাকে। এদের অনেকেরই অবৈধ অর্থের মজুত থাকে না। আবার তুলনামূলক গরিব নারীরা তাদের সন্তান কিংবা পারিবারিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য স্বামীর অগোচরে কিছু সঞ্চয় করেন। এসবও থাকে নগদ অর্থে। আবার অনেকে কর কর্মকর্তাদের হয়রানির ভয়ে কিছু টাকা গোপন রাখে।

নতুন নীতির কারণে লোকজনের মধ্যে খরচ করার প্রবণতা কমে গেছে। এর ফলে বেশ কিছু নিত্যপণ্যের দাম কমে গেছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কৃষক ও ক্ষুদ্র উৎপাদনকারীরা। তাদের অনেকে তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে আনতে বাধ্য হবে।

আরো বড় সমস্যা আছে। হঠাৎ করে বৈধ নোট অবৈধ হয়ে পড়ায় ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যেতে বাধ্য হবে। তাছাড়া ভারতীয় রুপির এই হাল দেখে অনেকে আরো শক্তিশালী কোনো মুদ্রায় তাদের সঞ্চয় বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হতে পারে।

সরকারের নোট বাতিল করার সিদ্ধান্তে কিছু অবৈধ টাকা বৈধ হবে। এতে কোনো সন্দেহ নেই। অনেকে জরিমানা দিয়ে তাদের কালো টাকা সাদা করবে। কেউ কেউ অবৈধ টাকা নষ্ট করে ফেলবে, যাতে তাদের ব্যবসার দিকে কর্তৃপক্ষের নজর না পড়ে। তবে সার্বিক উপকার হবে কম ও ক্ষণস্থায়ী।

এর একটি কারণ হলো, ভারতে কালো টাকার বড় অংশ আসলে টাকাই নয়। এগুলো সোনা-রুপা, জমি, বিদেশী ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে জমা পড়ে আছে। আর যারা কর ফাঁকি দিয়ে থাকে, তারা এখন আগের নোট বদলিয়ে নতুনগুলো সংগ্রহ করবে।

বাতিলকরণের যৌক্তিকতা দেখাতে গিয়ে সরকার জাল রুপি দিয়ে সন্ত্রাসে অর্থায়নের কথা বলেছিল। এই যুক্তিও ধোপে টেকে না। ইতোমধ্যেই জাল নোট বাজারে চলে এসেছে। ফলে নোট বাতিলকরণ সন্ত্রাসীদের ধরার কাজে সহায়ক হয়নি। বরং যারা বৈধভাবে এই নোট ব্যবহার করতো, যারা জাল নোট তৈরির সাথে জড়িত নয়, তারাই সমস্যায় পড়েছে।

তাছাড়া সাদা টাকার চেয়ে কালো টাকা বেশি মুদ্রাস্ফীতি তৈরি করার যুক্তিও প্রমাণিত নয়। কালো টাকা হলো স্রেফ এমন অর্থ, যা সরকারের বদলে লোকজনের হাতে রয়েছে। মুদ্রাস্ফীতি তৈরি করে অতিরিক্ত অর্থ সরবরাহ। এখানে সাদা বা কালো টাকা পার্থক্য সৃষ্টি করে সামান্যই।

বাতিলকরণের কাজটি হয়তো সদেচ্ছা প্রণোদিত ছিল। কিন্তু তা ছিল একটা বড় ভুল। সরকারের উচিত সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা। অন্তত ৫০০ রুপির নোট বৈধ ঘোষণা করতে পারে। গরিব মানুষেরা এটাই বেশি ব্যবহার করে।

সরকার সত্যিই যদি কালো টাকার পরিমাণ সীমিত করতে চায়, তবে সবচেয়ে ভালো হয় নগদ অর্থহীন সমাজ তৈরির দিকে ভারতকে নিয়ে যাওয়া। ভারতের প্রাপ্তবয়স্ক প্রায় ৫৩ ভাগ লোকের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আছে। তবে এসবের বেশির ভাগই হয়েছে সরকারের উদ্যোগে। ফলে খুব কম অ্যাকাউন্টই ফলপ্রসূ। অন্যদিকে ভারতে রয়েছে ১০০ কোটির বেশি মোবাইল ফোন। এটাই কার্যকর ব্যাংকিং কার্যক্রমের জন্য ব্যবহৃত হতে পারে, যেটাকে বলা হয় মোবাইল ব্যাংকিং।

সব ভারতীয়কে তাদের বায়োমেট্রিক তথ্যের ভিত্তিতে একটি মাত্র আইডি দেওয়ার উদ্যোগটি একটি যথাযথ পদক্ষেপ। ইতোমধ্যেই ১০০ কোটির বেশি লোক নিবন্ধিত হয়েছে।

দুর্নীতি দমন কেবল নগদ এবং এমনকি ব্যাংকিং মুদ্রার মাধ্যমেও সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন পরিবর্তনশীল প্রতিষ্ঠান, মন-মানসিকতার পরিবর্তন এবং অর্থনীতি ও সামাজিক জীবনের জটিলতাকে স্বীকার করে নেওয়া সতর্কভাবে গৃহীত নীতি। সরকার কর ফাঁকির সাজা বাড়াতে পারে, সেকেলে দুর্নীতিবিরোধী আইন সংশোধন করতে পারে।

ভারতের মতো দেশের জন্য, যেখানে অর্থনীতি মূলধারার অর্থনীতির সাথে একেবারে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে, অবৈধ কার্যক্রমের বিরুদ্ধে একটি ব্যর্থ সরকারি হস্তক্ষেপ বৈধভাবে জীবনযাপনের জন্য প্রাণন্তকর সংগ্রামে নিয়োজিত বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে।

কৌশিক বসু : ভারত সরকারের প্রধান উপদেষ্টা (২০০৯-২০১২) এবং বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ (২০১২-২০১৬)