Home » অর্থনীতি » রিজার্ভ লোপাট আর অন্যান্য ঘটনার বিচারহীনতার বছর

রিজার্ভ লোপাট আর অন্যান্য ঘটনার বিচারহীনতার বছর

এম. জাকির হোসেন খান ::

অর্থ পাচার প্রতিরোধে গঠিত আন্তর্জাতিক সংস্থা এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপ অন মানি লন্ডারিং (এপিজি) গত অক্টোবরে প্রকাশিত ‘অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং অ্যান্ড কাউন্টার টেরোরিস্ট ফিন্যান্সিং মেজারস ইন বাংলাদেশ মিউচুয়াল ইভ্যালুয়েশন রিপোর্ট-২০১৬’ শীর্ষক প্রতিবেদন মতে, ২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত অর্থ পাচার-সংক্রান্ত ৪শ’টি অভিযোগ জমা পড়লেও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) চূড়ান্তভাবে ৪৩টি মামলায় অর্থ পাচারের অভিযোগ নিষ্পত্তি করেছে। এতে ২১৪ জনের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিলেও বিচার শেষে সাজা হয়েছে মাত্র চারজনের, যা প্রাথমিকভাবে প্রাপ্ত মোট অভিযোগের মাত্র ১ শতাংশ। উল্লেখ্য, প্রাথমিকভাবে ১৪০ কোটি ডলার বা ১০ হাজার ৯২০ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে ৭৬টি অভিযোগের বিপরীতে ২৮৪টি এজাহার দায়ের করা হয়। বাংলাদেশও অর্থ পাচার রোধে কমপ্লায়েন্সের মাত্রা মূল্যায়ন, কারিগরি সহায়তা ও প্রশিক্ষণ, গবেষণা, বৈশ্বিক নীতি উন্নয়ন এবং বেসরকারি খাতকে অর্থ পাচার সংক্রান্ত হালনাগাদ তথ্য প্রদানকারী ৪১টি সদস্য দেশের সমন্বয়ে গঠিত এপিজি’র সদস্য । যদিও অর্থ পাচার প্রতিরোধে বাংলাদেশ ২০১২ সালে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে যে আইন করেছে -তা এপিজি’র মতে- তদন্তের দুর্বলতার কারণেই বাংলাদেশে অর্থ পাচার রোধে সাফল্য কম।  যদিও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) মনে করে, এখনো আইনের বিধিমালা চূড়ান্ত না করায় পরিপূর্ণভাবে অর্থ পাচারের ঘটনা তদন্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে, বাস্তবে এটা কতখানি নির্ভরযোগ্য বক্তব্য তা প্রশ্নসাপেক্ষ।

উল্লেখ্য, ওয়াশিংটনভিত্তিক গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটির (জিএফআই) সর্বশেষ হিসাবে, ২০০৪ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে ৫ হাজার ৫৮৮ কোটি ডলার এবং ইউএনডিপির অন্য এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্বাধীনতার পর থেকে চার দশকে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা।

এপিজি’র মতে, বাংলাদেশ সাম্প্রতিক বছরগুলোয় উল্লেখযোগ্য হারে অর্থ পাচারের ঝুঁকির মুখোমুখি হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও ঝুঁকির বিষয়টি ওয়াকিবহাল। এজন্য ন্যাশনাল রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট (এনআরএ) এবং সেক্টরাল (খাতভিত্তিক) রিস্ক অ্যাসেসমেন্টের মাধ্যমে যথাযথ জাতীয় কৌশল নির্ধারণ করে কার্যকরভাবে অপ্রতিরোধ্য অর্থ পাচার নিয়ন্ত্রণের সুযোগ রয়েছে; কিন্তু কেন ও কি কারণে সরকার তা করছেনা, তা বোধগম্য নয়। এ ঝুঁকির মাত্রা আরো বাড়ছে; কারন এ ঝুঁকি এসেসম্যান্টের বাইরেও সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন ও সামগ্রিকভাবে সম্ভাব্য হুমকি মোকাবেলা করছে।

২০০৯ সালের পর থেকে অর্থ পাচারের অভিযোগগুলো অধিকাংশ অন্য দেশের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে চিহ্নিত হয় এবং পরবর্তীতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই গণমাধ্যমে তা প্রকাশিত হওয়ার পরই দুদক তদন্তের উদ্যোগ নেয়।  বিশ্বব্যাপী সন্দেহজনক বা কালো অর্থের পাচার সম্পর্কিত গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই) প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্যে জানা যায় ২০০৩-২০১৪ সময়কালে প্রতি বছর গড় বৃদ্ধির হার হিসাবে (২৮.৮৫%) বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১৮.৪১ বিলিয়ন ডলার বা ১ লাখ ৮৪ হাজার ৪১৩ কোটি টাকা পাচার হয়, যা থেকে সরকার কমপক্ষে প্রায় ৩৫ হাজার ৯০৫ কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব সংগ্রহ করতে পারতো। এর আগে ২০১৪ এর ২০ জুন সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক (এসএনবি) এর ‘‘ব্যাংকস ইন সুইজারল্যান্ড ২০১৩” প্রতিবেদনের বরাতে ২০১২ এর তুলনায় ৬২ শতাংশ বেড়ে সুইস ব্যাংকগুলোয় বাংলাদেশিদের ৩,১৬২.৭২ কোটি টাকা গচ্ছিত থাকার সংবাদ প্রকাশ করে। এনবিআর, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ অন্যান্য বিশ্লেষণে প্রাপ্ত তথ্য মতে, বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা হুন্ডির মাধ্যমে, ১০ থেকে ১৬ হাজার কোটি টাকা ট্রান্সফার প্রাইজিং (কম মূল্যে আমদানি দাম দেখানো) এবং অন্যান্য অবৈধ উপায়ে আরো প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ থেকে পাচার হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মূদ্রানীতি অনুযায়ী ৫ হাজার ডলারের বেশি অথ বিদেশে পাঠানো যায় না। বৈধপথে চিকিৎসা বা শিক্ষা ব্যয়ের জন্য বিদেশে টাকা পাঠাতে গেলেও অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়। আরেকটি চক্র বিদেশ থেকে বৈদেশিক মুদ্রায় প্রবাসীদের রেমিটেন্স সংগ্রহ করে ও  তা বিদেশেই রেখে দিয়ে দেশে টাকায় দায় শোধ করা হয়; তেমনি বিদেশ থেকে আমদানির ক্ষেত্রেও একই পদ্ধতি অনুসরণ করায় প্রায় ৪০ শতাংশ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আসছেনা। আর এ অর্থ কোন না কোন বিদেশি ব্যাংকে জমা হচ্ছে।

২০০৬ এবং ২০০৭ সালে অর্থ পাচার বাড়লেও ২০১১ সাল পর্যন্ত এর পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম থাকলেও এরপর থেকে এর পরিমাণ বাড়তে থাকে। ২০১১ এর তুলনায় ২০১৪ সালে ৫ গুণের বেশি কালো অর্থ বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন দেশে পাচার হয়। আর্থিক বিশেষজ্ঞদের মতে, সুইস ব্যাংকে জমাকৃত অর্থ পাচারকৃত  মোট অর্থের বিশাল অংকের একটি ক্ষুদ্রাংশ হতে পারে। কারণ বেনামে বা অন্য কোন দেশের নাগরিক বা প্রতিষ্ঠানের নামে গচ্ছিত অর্থ, মূল্যবান গহনা ও দূর্লভ সামগ্রীর মূল্য অন্তর্ভুক্ত না করায় প্রাক্কলনের পরিমাণ খুবই কম। আর এসব অর্থের উল্লেখযোগ্য অংশ আর্থিক খাতে জালিয়াতির সাথে জড়িত। আর এর প্রমাণ হলো শেয়ার বাজার, সোনালি ও বেসিক ব্যাংকসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ব এবং বেসরকারি ব্যাংক থেকে নানা সহায়তায় হলমার্ক, বিসমিল্লাহ গ্রুপসহ বিভিন্ন কোম্পানির জালিয়াতি। জালিয়াতির মাধ্যমে ৩০ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনা ঘটলেও শুধু ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠ হওয়ায় অভিযুক্তদের কেউই বিচারের আওতায় আসছেনা বলে অভিযোগ করেছেন, ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞ খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ। ব্যাংকিং খাতে অপ্রতিরোধ্য দুর্নীতি প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী সম্প্রতি উল্লেখ করেছিলেন যে, ‘‘নিজেদের দলীয় লোকের সমর্থনের কারণে সোনালী ও বেসিক ব্যাংকে আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনায় জড়িত সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাচ্ছে না”। উল্লেখ্য, দেশের গোটা ব্যাংকিং খাতের মোট সম্পদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ রাষ্ট্রায়ত্ত ছয়টি ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ করলেও এর বিপরীতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাব অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোর নন-পারফর্মিং লোনের হার ১১ শতাংশ। অথচ উন্নত দেশগুলোর ক্ষেত্রে এ হার কোনোভাবেই ৪ শতাংশের বেশি নয়। এর প্রধান কারণ বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাবানরা হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে তা আত্মসাৎ করে।

আর্থিক খাতে জালিয়াতির এ ধারাবাহিকতায় সবশেষ সংযোজন- বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৮ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার রিজার্ভ চুরির মতো অচিন্তনীয় ঘটনা। বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিলিজেন্স ইউনিট গঠনের পরও অবৈধভাবে কিভাবে দেশের বাইরে অর্থ পাচার হয়েছে বা হচ্ছে তা বোধগম্য নয়। পৃথিবী জুড়ে তুমুলভাবে ঝড় তোলা পানামা পেপারসে’র মাধ্যমে বৈধ-অবৈধ পথে বিদেশে অর্থ পাচারের যে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ বাংলাদেশ সহ পৃথিবীর সকল মানুষের সামনে প্রকাশ পেলো তাতে জানা যায়- কিভাবে স্বল্পোন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর রাজনীতিক এবং ক্ষমতাবানরা অবৈধ পথে উপার্জিত বিত্তবৈভব উন্নত দেশগুলোতে পাচার করছে। উল্লেখ্য, রাজনৈতিক এবং ব্যবসা ক্ষেত্রে ক্ষমতাবান ২০জন বাংলাদেশির বড় ব্যবসায়ী নিজ নামে এবং পরিবারের সদস্যদের নামে ‘‘কর স্বর্গ’’ বলে পরিচিত যেমন জার্সি দ্বীপ এবং বৃটিশ ভার্জিন দ্বীপসমূহে অর্থ পাচার করেছে তার খবর ঢাকার নিউ এইজ পত্রিকায় ২০১৩ সালেই প্রকাশ করা হয়। শুধু তাই নয়- আমেরিকা, দুবাই, ব্যাংকক এবং সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন ব্যাংকে, মালয়েশিয়া এবং ভারতে নাগরিকত্ব গ্রহণ বা ‘সেকেন্ড হোম’ বা কথিত ব্যবসায় বিনিয়োগের নামে কি পরিমাণ অর্থ পাচার করা হয়েছে- তার প্রকৃত হিসাব রাষ্ট্রের নাগরিকদের স্বার্থে জানা জরুরি। ২০১৩ এর  শেষ দিকে বিদেশে পাড়ি জমানোর জন্য সেকেন্ড হোম প্রকল্পে আবেদন করেছিলেন ৬৪৮ জন বিশিষ্ট ব্যাক্তি, যাদের অধিকাংশই সুবিধাভোগী রাজনীতিক, শিল্পপতি, ব্যবসায়ী ও আমলা।

প্রশ্ন হলো দুদক, এনবিআর বা বাংলাদেশ ব্যাংকের চোখ ফাঁকি দিয়ে কিভাবে বিদেশে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হলো? এবিষয়টি এখন বলতে গেলে রেওয়াজে পরিনত হয়েছে যে, বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটের পর অন্য  কোনো কেলেঙ্কারি আগে ঘটা ঘটনায় চাপা পড়ে যায়, আর ধরা পড়লেও নানা প্রভাব খাটিয়ে অর্থ বাজেয়াপ্ত এবং শাস্তির মতো ঝুঁকি এড়িয়ে যায়।

দুই হাজার সালের বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ‘‘অর্থনীতিতে ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে এমন দেশের পর্যায়ে দুর্নীতির মাত্রা যদি বাংলাদেশ কমিয়ে নিয়ে আসতে পারতো, তাহলে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার অতিরিক্ত আরো ২.১৪% বৃদ্ধি পেয়ে  ৬% থেকে ৮.১৪% হতো”। অর্থাৎ মাথাপিছু জাতীয় আয় ২০১০-১১ অর্থ বছরে অর্থাৎ ৫ বছর আগেই ১০৪০ ডলারে পৌছতো।

‘ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্স (এফএটিএফ)’ এর আওতায় ‘এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপ অন মানি লন্ডারিং (এপিজি)’ এগমন্ট গ্রুপের আওতায় বিভিন্ন দেশকে পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করে। অথচ বিভিন্ন সময়ে অর্থ চুরি ও লোপাটের ঘটনা  চেপে রেখে দায়মুক্তির সংস্কৃতির জন্ম দেয়া হয়েছে। অথচ বিভিন্ন তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযুক্তদের সুনির্দিষ্ট করা হলেও তাদের কোনো বিচার এখনও হয়নি। বাংলাদেশ সরকার চাইলে তথ্য বিনিময় এবং পাচারকৃত টাকা ফিরিয়ে আনার দ্রুত এবং সহজ পদ্ধতি নির্ধারণে বিভিন্ন দেশের  সরকার এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সাথে সমঝোতায় পৌছাতে পারে।

জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য ১৬.৪ এর আওতায় রাষ্ট্রসমূহ ঐক্যমতে পৌছেছে যে, ২০৩০ এর মধ্যে তারা সন্দেহজনক বা কালো অর্থের পাচার উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমাতে ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি চুরিকৃত সম্পদ পুনরুদ্ধার এবং ফেরত আনার কাজও শক্তিশালী করবে; একইসাথে সব ধরনের সংগঠিত অপরাধ রোধ করবে। এর পাশাপাশি জাতিসংঘ দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদে সাক্ষর করায় বাংলাদেশ সব ধরনের দুর্নীর্তির মাধ্যমে অর্জিত কালো অর্থের উৎস বন্ধ এবং সুইস ব্যাংক সহ ‘‘কর-স্বর্গ” বলে পরিচিত বিভিন্ন দেশ এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমাকৃত সব অবৈধ অর্থ উদ্ধারে সরকারের দায়বদ্ধতা রয়েছে।