Home » আন্তর্জাতিক » মিয়ানমারে আবারো সামরিক অভ্যুত্থানের আশংকা?

মিয়ানমারে আবারো সামরিক অভ্যুত্থানের আশংকা?

ল্যারি জ্যাগান

অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ

অনেক বিশ্লেষক এবং বিদেশী ব্যবসায়ী আশংকা করছেন, মিয়ানমারের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেশটিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দেবে। ইয়াঙ্গুন বিমানবন্দরের বাইরে প্রখ্যাত মুসলিম আইনজীবী কো নিকে হত্যার ঘটনাটি আরো সহিংসতার আশংকায় থাকা আন্তর্জাতিক আদিবাসীদের প্রতি একটি বড় ধরনের বার্তা পাঠালো।

এটা ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্র্যাসির (এনএলডি) জন্য এটা একটা বড় ধরনের ধাক্কা এবং দলের মধ্যে বিভক্তি বাড়িয়ে দিয়েছে। এবং নিশ্চিতভাবেই সরকারি প্রশাসন এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য মারাত্মক প্রভাব ফেলবে। এছাড়া এই ঘটনা আবারো সামরিক অভ্যুত্থানের সম্ভাবনা সামনে নিয়ে এলো।

এই ঘটনাটি দেশের শীর্ষ নেতাদের মধ্যকার সম্পর্কে বিশেষ করে স্টেট কাউন্সিলর আঙ সান সু কি এবং সেনা প্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন আঙ হলাইঙ-এর মধ্যকার টানাপোড়েনও বাড়িয়ে দিয়েছে। এটা নিরাপত্তা বিষয়ক ইস্যু হওয়ায়, তা সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং বেসামরিক সরকারকে কয়েক ধরনের সংকটে ফেলে দিয়েছে।

এনএলডির আইন উপদেষ্টা এবং সেই সাথে সু কির ব্যক্তিগত উপদেষ্টা কো নিকে প্রায় দুই সপ্তাহ আগে নৃশংসভাবে হত্যা করার ঘটনাটি দেশজুড়ে মর্মপীড়াদায়ক একটি বার্তা বইয়ে দিয়েছে। রেঙ্গুন বিমানবন্দরের মতো একেবারে প্রকাশ্য স্থানে উচ্চপদস্থ লোককে হত্যা করার ঘটনা; অর্থাৎ সর্বোচ্চ দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য এই ব্যবস্থা।

আসল হত্যাকারীকে আটক করা হলেও ইতোমধ্যেই স্পষ্ট হয়ে গেছে, সে আসলে ভাড়াটে লোক, টাকার বিনিময়ে তিনি কাজটি করেছেন। তাকে পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে হত্যার উদ্দেশ্য এবং কে তাকে হত্যা করতে পাঠিয়েছিল, সে সম্পর্কে অতি সামান্য তথ্যই জানা গেছে। কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ফাঁস হওয়া ও ভুল তথ্যে তদন্ত কাজের ব্যর্থতাই প্রকাশ করেছে।

এখনো কিছুই পরিষ্কার নয়, এমনকি বিমানবন্দরে হত্যাকারীর সাথে আরো লোকজনের থাকার অভিযোগের সুরাহা হয়নি। এখন পর্যন্ত পুলিশ মাত্র দুজনকে গ্রেফতার করতে পেরেছে- একজন খোদ হত্যাকারী; অপরজন সম্পর্কে কোনো তথ্য জানা যায়নি। তবে কোনো না কোনোভাবে তিনিও হত্যাকান্ডে জড়িত ছিলেন।

সন্দেহের আঙুল সামরিক বাহিনীর দিকেই ওঠে। কারণ নিহত আইনজীবীকে দেখা হতো অবিলম্বে সংবিধান সংস্কার এবং একেবারে নতুন সংবিধান রচনার দাবি জানানো এনএলডি কট্টরপন্থী হিসেবে। উল্লেখ্য, বর্তমান সংবিধানটি কার্যত লিখেছিলেন সাবেক সামরিক স্বৈরাচার সিনিয়র জেনারেল থান শু – সেটা ২০০৮ সালে ভুয়া গণভোটে বিপুলভাবে পাস হয়েছিল। সংবিধান পরিবর্তনের দাবিটি বিশেষ ঘটনা। কারণ আগের সংবিধানকে পুরোপুরি বাদ দিয়ে নতুন একটি গ্রহণ করাটা সামরিক বাহিনীর জন্য সুখকর বিষয় নয়, বিশেষ করে তারা বর্তমান সংবিধানকে যখন পূতপবিত্র বিবেচনা করে।

তবে শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা কো নিকে অবিশ্বাস করলেও এবং তারা এমনকি তাকে ঘৃণা করলেও, এই হত্যাকান্ড থেকে তারা কোনোভাবেই লাভবান হবে না। বরং বিপরীতটাই হবে। এটা তাদের সুনামের জন্য আরো হানিকর হবে, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দাবৃত্তি সম্পর্কে ক্ষুব্ধ আঙুল তোলা হবে। কারণ বিষয় দুটি মন্ত্রিসভার সামরিক বাহিনী থেকে আসা মন্ত্রীদের হাতে, বিশেষ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যেখানে জেনারেল কেউ সু।

এই হত্যাকান্ড জাতীয় নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা এবং সেইসাথে ভঙ্গুর পরিস্থিতিও বিপর্যয়কর অবস্থায় নিয়ে যেতে পারে মনে করে শীর্ষ সামরিক ক্রমপরম্পরাও উদ্বিগ্ন। আরাকানের ঘটনায় অন্তত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে হলেও সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি অনেকটাই ম্লান করে দিয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে তাদেরও হারানোর অনেক কিছু আছে, সেনাপ্রধান নির্বিকারভাবে পাশ্চাত্যে, বিশেষ করে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছাকাছি হতে চাচ্ছেন।

গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সরকারি দফতর, সরকারি সভা এবং প্রধান বিমানবন্দরগুলোর নিরাপত্তা ব্যাপকভাবে জোরদার করা হয়েছে। বিদেশী কূটনীতিকরাও নিরাপত্তার ব্যাপারে আরো বেশি মনোযোগী হচ্ছেন। অনেকে, বিশেষ করে জাপানি, এমনকি দেশটিতে সর্বোচ্চ পর্যায়ে সফর বাতিল করে দিচ্ছেন, কূটনৈতিক দলের সদস্যদের পুরোপুরি ফিরিয়ে নিতে চাচ্ছেন।

তবে দুই সপ্তাহ পর এখন মনে হতে যাচ্ছে, এটা ছিল একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা। প্রেসিডেন্টের অফিসের এক সিনিয়র কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, ‘এটা ছিল স্পষ্টভাবেই সরকারের প্রতি হুঁশিয়ারি সংকেত।’ একটি লাল-রেখা টেনে দেওয়া হলো, অর্থাৎ সংবিধান পরিবর্তনের দিকে হেঁটো না। প্রেসিডেন্টের অফিস থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এই ঘটনাকে সরকার এবং দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা বলে অভিহিত করা হয়। রাজনীতিবিদ এবং রাজনৈতিক দলগুলো ব্যক্তিগতভাবে এই ভেবে উদ্বিগ্ন যে, আসন্ন উপনির্বাচনগুলোতে সহিংসতা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়বে।

তবে কো নি-র হত্যাকান্ড এনএলডি সরকার এবং সামরিক বাহিনী- উভয়ের মধ্যেই ভবিষ্যতের দিকে নজর দিতে তাগিদ সৃষ্টি করবে। এনএলডির জন্য ইস্যু হলো সংবিধান সংস্কার। তাদের মৃত আইন উপদেষ্টা সংবিধান পরিবর্তনের জন্য কাজ শুরু করতে দলের মধ্যে জোর চেষ্টা চালিয়েছিলেন। তিনি এমনকি ফেডারেল সংবিধান প্রশ্নে চলমান শান্তিপ্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের সমঝোতার আগেই সেটা করার জন্য চাপ দিয়ে আসছিলেন। তবে অন্য আরো অনেকে রয়েছেন। বিশেষ করে দলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, দলের সবচেয়ে সিনিয়র পৃষ্ঠপোষক টিন ওও। তিনি কিন্তু সেনাবাহিনী টসে এমন কোনো কাজ করার ব্যাপারে তাড়াহুড়া না করতে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন।

এনএলডির মধ্যে এই বিভক্তি বেড়েছে কো নির হত্যাকান্ডে। এখন কট্টরপন্থীরা জোর দিয়ে বলছে, পার্টি যদি গণতন্ত্রে যাত্রা জোরদারকরণ এবং যেকোনো ধরনের পিছু হটা প্রতিরোধ করতে চায়, তবে যত দ্রুত সম্ভব সংবিধান পরিবর্তন ছাড়া আর কোনো বিকল্প তাদের কাছে নেই।

সামরিক বাহিনীও নিজেদের অবস্থান থেকে ভবিষ্যত নিয়ে আচ্ছন্ন রয়েছে। বিদ্যমান সংবিধানে তাদের যে ক্ষমতার নিশ্চতা দেওয়া হয়েছে, সেটা কমানোর যেকোনো পদক্ষেপ তারা হালকাভাবে নেবে না। সত্যি সত্যিই সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্তারা দৃঢ় অভিমত পোষণ করেন, দেশের পতন রুখতে তাদেরকে এর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করতেই হবে। তারা নিশ্চিত, আঙ সান সু কির সরকার ব্যর্থ হচ্ছে, তারা কখন দেশকে রক্ষা করার দায়িত্ব গ্রহণ করবেন, সেটা কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র।

‘প্রশাসনিক ক্ষমতা’ গ্রহণের পরিকল্পনাও তৈরি করে রাখা হয়েছে। কমান্ডার-ইন-চিফ যদি মনে করেন, দেশের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা বিপদের মুখে রয়েছে, তবে সংবিধানের আওতায় ‘প্রশাসনিক ক্ষমতা’ গ্রহণের ব্যবস্থা রাখা রয়েছে। তবে সেটা হওয়ার জন্য বড় ধরনের সামাজিক অস্থিরতা কিংবা গৃহযুদ্ধ তীব্র হতে হবে। সামরিক বাহিনীর হাতে অনেক বিকল্প রয়েছে, তারা সেগুলো বিবেচনা করছে।

এসবের মধ্যে রয়েছে পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়া এবং কোনো সিনিয়র সৈনিককে প্রধান করে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা। ওই সিনিয়র সৈনিক হতে পারেন কমান্ডার-ইন-চিফ নিজে। যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচন আয়োজনের ব্যবস্থাও করা যেতে পারে। তবে সবচেয়ে অনুকূল বিকল্প হচ্ছে আঙ সান সু কিকে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগে পর্যন্ত সেনাপ্রধানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে, সাময়িক সময়ের জন্যও হতে পারে, রাজি করানো। ১৯৫৮ সালে এমনটা হয়েছিল। তখনকার প্রধানমন্ত্রী উ নু সামরিক প্রধান জেনারেল নে উইনকে অনুরোধ করেছিলেন দেশ পরিচালনা করতে।

তবে এই মুহূর্তে বল এনএলডির কোর্টে। আগামী ছয় মাসে যা কিছু ঘটতে যাচ্ছে, সেটাই দেশটির তথা দেশটিতে গণতন্ত্র জোরদার হবে না কি সামরিক শাসন ফিরে আসবে- তা নির্ধারণ করবে। কো নির হত্যাকান্ডটি অন্তত অনিশ্চয়তার নতুন যুগের সূচনা করেছে।

 লেখক : ইয়াঙ্গুনভিত্তিক সাংবাদিক এবং মিয়ানমার বিশেষজ্ঞ। ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি এশিয়া অঞ্চলের ওপর লেখালেখি করছেন। প্রায় এক যুগ তিনি ছিলেন বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের এশিয়াবিষয়ক সম্পাদক।